কৃতান্তিকা

ব্রহ্মসনাতন বলতে থাকলেন, “পুত্রী, ধারণ পর্বের শুরু হয় সত্যের ব্যখ্যা প্রদান থেকে, অর্থাৎ কৃতান্ত প্রদান করা থেকে, আর তা সমাপ্ত হয় এখন যেই অবস্থায় তুমি রয়েছ, অর্থাৎ যেকালে তুমি আমাকে অর্থাৎ শূন্যতাকে, নিঃশব্দতাকে বা ব্রহ্মকে প্রত্যক্ষ করে ফেলেছে, ততক্ষণ পর্যন্ত। অর্থাৎ এই সেই অধ্যায়, যেখানে এসে এক সাধক প্রকৃত অর্থে কৃতান্তিক হতে সক্ষম হন। আর এই পথ যখন তুমি তোমার সন্তানদের অতিক্রম করাবে, তখন তাঁদের ক্ষেত্রে যেই যেই ধারার পালন করবে, তার সম্বন্ধে এবার তোমাকে বলছি শ্রবণ করো।

প্রথমেই বলি পুত্রী, ধারণ স্বয়ংকেই করতে হয়। কেউ তোমাকে ধারণা করিয়ে দিতে পারবেনা। একবার দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দেখো পুত্রী, কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ভগবৎ গীতায় অর্জুনকে দিব্যদৃষ্টি দ্বারা সত্যের আভাস করাচ্ছেন, কিন্তু তিনি প্রথমেই কেন সেই দিব্যদৃষ্টি প্রদান করছেন না? আমিও তোমাকে দিব্যদৃষ্টি প্রদান করে সত্যের দর্শন করালাম, এবং সত্যে স্নানও করালাম, কিন্তু প্রথমেই কেন তা করলাম না?

পুত্রী, গীতার ন্যায় সত্যের আভাস লাভ করা হউক, বা কৃতান্তের ন্যায় সত্যে নিমগ্ন হওয়া হউক, তা হৃদয় দ্বারাই দর্শন করতে হয়। চর্ম চক্ষুর বা বাহ্য ইন্দ্রিয়ের , এবং পঞ্চভূতের সত্যদর্শনের বা ঈশ্বর দর্শনের সামর্থ্য থাকেনা। তাই তাঁদেরকে প্রথমে হৃদয়ের কাছে সমর্পিত হতে হয়, তবেই তাঁরা ঈশ্বরকে দর্শন করতে সক্ষম হন, ঠিক যেমন তুমি দেখেছিলে যে প্রথমে চারভূত সর্বাম্বাতে মজলেন, এবং হৃদয়ে স্থিত হলেন, অতঃপরেই তাঁরা মাতা সর্বাম্বার সাথে পরিচিত হলেন।

অর্থাৎ হৃদয় দ্বারাই ঈশ্বরকে দর্শন করতে হয়, আর এখন তুমি স্পষ্টই জানো যে, সেই দর্শন নেত্রের দর্শনের থেকে অনেক অধিক স্পষ্ট ও প্রত্যক্ষ হয়। কিন্তু পুত্রী, এই ইন্দ্রিয়দের এবং ভূতদেরকে নিজে থেকেই হৃদয়ে অবগাহন করতে হয়। হ্যাঁ, হৃদয় স্বয়ং তাঁদের আহ্বান করেন, যেমন মাতা সর্বাম্বা ভূতদের মানসী, বোধি, দখিনা তথা হুতাশন রূপে আহ্বান করেছিলেন। কিন্তু এঁদেরকে সেই আহ্বান স্বয়ং গ্রহণ করতে হয়, এবং হৃদয়ে নিমজ্জিত হতে হয়।

আর সেই কর্ম কেউ কারুর জন্য করে দিতে পারেন না। যেমন কৃষ্ণ অর্জুনের জন্য করে দিতে পারেন না, তেমনই আমিও তোমার জন্য করে দিতে পারিনা। আর সেই ধারণা করার জন্যই কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন বিস্তর গীতা কথা বলার পরেই, অর্জুনকে দিব্যদৃষ্টি প্রদান করেন, ও সত্যের আভাস প্রদান করেন। একই ভাবে, ঠিক সেই কারণেই আমি তোমাকে সুবৃহৎ কৃতান্ত কথা বলার শেষেই তোমাকে দিব্যদৃষ্টি প্রদান করে, তোমাকে সত্যের দর্শন করাতে পারলাম আর সত্যে স্নান করাতে পারলাম।

অর্থাৎ কথা এই যে, এই ধারণা তুমি করতে সক্ষম হয়েছ বলেই তোমাকে দিব্যদৃষ্টি প্রদান করা সম্ভব হলো। যদি ধারণা করতে না পারতে কৃতান্তকে, তাহলে তোমাকে দিব্যদৃষ্টি প্রদান করা যেতই না। আর এই ধারণা তোমার হয়ে কেউ করে দিতে পারেন না, স্বয়ং তোমাকেই করতে হয়। হ্যাঁ তোমার হৃদয় তোমাকে সেই ধারণা করার জন্য আহ্বান জানাবে, তবে তোমাকে স্বয়ংকেই সেই আহ্বানে সারা দিয়ে ধারণা করতে হবে।

কেন এই স্বয়ংকৃয়তা? কারণ তুমি অন্য কারুর প্ররোচনায় নয়, অন্য কারুর ইন্ধন লাভ করে নয়, স্বয়ং স্বয়ংকে ভ্রমিত করে, শূন্যতারপরিচয় ত্যাগ করে আমিত্ব ধারণ করেছ। তাই সেই আমিত্বকে ত্যাগ করে, সত্যকে অর্থাৎ শূন্যতার আভাসকে অনুভব করার ও ধারণ করার প্রেরণাও তোমাকে স্বয়ংকে ধারণ করতে হবে। যদি তুমি আমার প্রেরণা লাভ করে শূন্যতা ত্যাগ করে আমিত্বকে ধারণ করতে, তাহলে আমারই কর্তব্য হতো তোমাকে পুনরায় প্রেরণা দেওয়ার যে, সত্যকে শূন্যকে আভাস করো।

কিন্তু আমি সেই প্রেরণা দিইনি তোমাকে বা কনো আত্মকে। তাঁরা স্বয়ংকে স্বয়ং ভ্রমিত করেন, সত্য থেকে। তাই আমার কর্তব্যের মধ্যেও আসেনা যে আমি তোমাদের পুনরায় প্রেরণা প্রদান করবো, সত্যে প্রত্যাবর্তনের জন্য। কিন্তু আমি মা; এক মায়ের কর্তব্য, দায়িত্ব, ইত্যাদে এত ভারিভারি শব্দের বোধ কোথায় থাকে। মা যে সরল হয়, সাবলীল হয়।

তাঁর কর্তব্য কি, তাঁর দায়িত্ব কি, এইসবের চিন্তা করে সে কখনো? না কি করতে পারে? সন্তানকে বুকে করে আগলে রেখে প্রেম দেওয়াতেই তাঁর ধ্যানজ্ঞান। সন্তান সেই প্রেম লাভ করার জন্য উপযুক্ত কিনা, সন্তানকে সেই প্রেম প্রদান তাঁর দায়িত্ব না কর্তব্য, এই সমস্ত কিছুর বোধ তো ছেড়ে দাও, এক মা এই সবের বিচারও করতে ব্যর্থ।

তাই আমার কর্তব্য না হলেও, প্রেম বশত, আমি সকল আত্মের কাছে হৃদয় হয়ে উপস্থাপন করে থাকি সর্বক্ষণ, যতক্ষণ না তাঁর কামনার অগ্নি তাঁর পঞ্চভূতকে আঁচে কঠিন করে দিয়ে আমাকে উপেক্ষা করছে ততক্ষণ। প্রেম যে কনো বাঁধা মানেনা পুত্রী। তাই শতশত উপেক্ষার পরেও, আমি তাঁদের কাছে উপস্থিত থেকেই যাই, যতই তাঁরা আমার দিকে তাকাতেও অস্বীকার করুক। এটাই আমার স্বভাব, এটাই আমার প্রেমের স্বভাব।

হ্যাঁ তুমি বলবে, আমি সত্য, আমি শূন্য। তাই না চাইতেও আমাকে সর্বত্র উপস্থিত থাকতেই হয়, কারণ আমি ছাড়া কনো কিছুর তো কনো অস্তিত্বই নেই। না পুত্রী, তোমার যুক্তি সত্য হলেও, সেই যুক্তি অসত্যও। আমি সত্য, আর কেবল সত্য বলেই অসত্য শব্দে যেমন সত্য লুকিয়ে থাকে, তেমন ভাবে আমি লুকিয়ে থাকিনা।

তুমি আত্ম, কেবল আর কেবল মাত্র তোমার ভ্রান্তভ্রমিত কল্পনার কারণে। অর্থাৎ তুমি কে? তুমি বাস্তবে সত্য হলেও, সেই সত্য তোমার অজ্ঞানে স্থিত, আর জ্ঞানে কি স্থিত? কেবলই কল্পনা, কেবলই মিথ্যা। অর্থাৎ তোমার অস্তিত্বই একটি মিথ্যা। আত্ম, তা কেবল তোমার নয়, সকল জীবের, সকল গ্রহের, এমনকি ধরিত্রীরও আত্মের অস্তিত্বই একটি ভ্রম, একটি ডাহা মিথ্যা।

আর মিথ্যার মধ্যে সত্য কি করে প্রকাশিত হতে পারে। পুত্রী, তাই তোমাদের মধ্যে আমি যে বিরাজ করি, তা আমার জন্য কনো বশ্যতা নয়, এটি আমার চয়ন, কারণ আমি তোমাদের সকলকে প্রেম করি। তোমরা মানো বা না মানো, তোমরা আমারই সন্তান। আমার উপাদান হলো শূন্য, আর সেই উপাদানই তোমাদেরও উপাদান। তাই কেবলই মাতৃত্বের মমতা ও প্রেমের কারণেই, আমি তোমাদের সঙ্গে হৃদয় বেশে থাকি, তা তোমরা যতই অবহেলা করো আমাকে।

কেবল যে হৃদয় হয়ে থাকি, তাই নয়, যখন প্রতিটি আত্ম দেহ ধারণ করে শিশু হয়ে বিরাজ করে, আমিই তাঁর মধ্যে প্রকাশিত হয়ে থাকি, আর তাকে আমার প্রেমের দিকে, আমার অস্তিত্বের দিকে আকর্ষণ করতে থাকি। তাই প্রতিটি আত্মই শিশুকালে শূন্যতার আভাস অনুভব করে, হৃদয়ের টান অনুভব করে। আর সেটিই হয় আমার আহ্বান তোমাদের প্রতি।

যেমন এই দেহে থাকা আত্ম সে আকর্ষণে আকর্ষিত হয়েছিল, আর হয়েছিল বলেই সে সমাজের সমস্ত পঞ্চভূতের জয়গানকে, সমস্ত ইন্দ্রিয়দের হাতছানিকে উপেক্ষা করে, আমারই কাছে নিজেকে সমর্পণ করে আজ সে ব্রহ্মসনাতন। কিন্তু যারা সেই আহ্বান গ্রহণ করেন না, তাঁরা ক্রমশ পঞ্চভূতকেই নিজের স্বামী করে নেন, ইন্দ্রিয়দেরই নিজের মন্ত্রী করে নেন, আর তাঁদের অন্তরে আমি এক অন্ধের সম্মুখে আলোকের ন্যায় বিরাজ করি।

কিন্তু তারপরেও অনেকে আমার আহ্বান গ্রহণ করেন, যেমন তুমি করলে; যেমন তোমার কাকা করেছে। কিন্তু পুত্রী, এই ব্রহ্মসনাতনকেও স্বয়ংই ধারণা করতে হয়, তোমাকেও আর তোমার কাকাকেও, অর্জুনকেও, আর বিবেকানন্দকেও। … অর্থাৎ কথা এই যে, এটি কখনোই সত্য নয় যে, আমি তোমাকে একটি স্পর্শ করে তোমার ধারণাকে সম্ভব করে দেব, বা কেউ এমন করে দিতে পারেন।

হ্যাঁ সম্ভব হয় তা, কিন্তু তা তখনই সম্ভব হয় যখন আমি তোমাকে কনো ভৌতিক ধারণা প্রদান করতে চাই। অর্থাৎ আমি তোমাকে মুষ্ট্যাঘাতের ব্যাথা তোমাকে স্পর্শ করে প্রদান করতে পারি; কামনার নেশা তোমাকে স্পর্শ করে প্রদান করতে পারি; এমনকি জাদুশক্তির বলে আমি তোমাকে স্পর্শ করে ধনবানও করে দিতে পারি। কিন্তু সত্য কনো ভৌতিক উপলব্ধি নয়, আর না তো কনো অতিভৌতিক উপলব্ধিও। সত্য হলেন সত্য, আর তাকে তুমি ও সকল আত্ম স্বয়ং ত্যাগ করে এসেছ, যদিও সেই ত্যাগও কেবলই এক কল্পনা।

তাই সেই সত্যকে তোমাকে স্বয়ংই ধারণা করতে হবে। আমি তোমাকে উপায় বলে দিতে সক্ষম যে, সত্য হলেন শূন্য, সত্য হলেন প্রেম, সত্য হলেন নিঃশব্দতা। আর সেই উপায়ের ধ্যান করে, তুমি সত্যকে উপলব্ধি করতে সক্ষম হবে, আর এই উপায়কেই বলা হয় দিব্যদৃষ্টি, তবে সেই কর্ম তোমাকেই করতে হবে, আমি তোমার হয়ে সেই দর্শন করলে, তুমি তা দর্শন করতে পারবেনা।

পুত্রী, আমি তাজমহল দেখে এলে, তোমার তাজমহল দর্শন হয়ে যায়না। তেমনই আমি ঈশ্বরদর্শন করলে, তোমার ঈশ্বরদর্শন হয়ে যায়না। যেমন আমাকেও তাজমহল পর্যন্ত গিয়ে তাজমহল দেখে আসতে হয়, প্রেমের স্মৃতিসৌধ দেখে আসতে হয়, তেমনই তোমাকেও তাজমহল পর্যন্ত পৌঁছেই সেই প্রেমসৌধ দেখে আসতে হয়। হ্যাঁ আমি যেহেতু তোমার পূর্বে তাজমহল গেছি, তাই তোমাকে মার্গ বলে দিতে পারবো, কিন্তু যাত্রা তোমাকেই করতে হবে, আমি তোমার যাত্রা করে দিতে পারবো না।

ঠিক তেমনই আমি ঈশ্বরদর্শন করে এসে তোমাকে বলতে পারি, ঈশ্বর এমন অমন, আর বলতে পারি এই মার্গে যাত্রা করো, সহজ হবে, তাড়াতাড়ি পৌছবে, সামনাসামনি দেখতে পাবে, ভিড় এড়িয়ে দেখতে পাবে। কিন্তু সেই যাত্রা তোমাকেই করতে হবে, আমি সেই যাত্রা তোমার হয়ে করে দিতে পারবো না। কেন? কারণ আমি একটি ভিন্ন আত্ম, আর তুমি একটি ভিন্ন আত্ম। আমিও ভ্রমিত হয়েছিলাম শূন্য থেকে, আর ভ্রমিত হয়ে নিজেকে আত্মরূপে কল্পনা করেছিলাম, আর তুমিও একই করেছিলে।

কিন্তু না তো আমি তোমার সঙ্গে সলাপরামর্শ করে সেই কল্পনা করেছিলাম, আর না তুমি আমার সাথে সলাপরামর্শ করে এই কল্পনা করেছিলে। আমার কল্পনা তোমার থেকে ভিন্ন, তাই আমাকেও ভিন্ন ভাবে যাত্রা করতে হয়েছে, আর তোমার কল্পনাও আমার থেকে ভিন্ন, তাই তোমাকেও ভিন্ন ভাবেই যাত্রা করতে হবে।

আর এত কথা কেন বললাম পুত্রী? কারণ এই কল্পনায় আবদ্ধ আত্মদের সমাজে একটি মিথ্যাচার প্রচলিত আছে যে কেউ অন্যদের উদ্ধার করে দেবেন। … হ্যাঁ পুত্রী, সম্পূর্ণ ভাবে এটি মিথ্যাচার। কনো অন্য দেহে থাকা আত্ম, অন্য দেহে থাকা আত্মকে উদ্ধার করতে সক্ষমই নন। কারণ সে দেহি, দেহি অর্থাৎ নশ্বর। ঈশ্বর তোমার অন্তরে নিবাস করছেন, আমারও, সবারই। আর তিনিই তোমাকে, আমাকে, সকলকে উদ্ধার করেন।

সমাজ এটিই বলবে তোমাকে যে, ঈশ্বর উদ্ধার করেন। এই কথার মধ্যে কনো মিথ্যা নেই, কারণ সত্য সত্যই একমাত্র ঈশ্বরই উদ্ধার করেন। একমাত্র সত্যই অসত্যের খোলস থেকে অসত্যের, ‘অ’ কে বিনষ্ট করে, সত্যকে উদ্ধার করে। কিন্তু আবারও বলছি, এই কর্ম করেন ঈশ্বর, নশ্বর নন। পুত্রী এই দেহ, তা সামান্য তনু হোক, ভগবৎ তনু হোক, আর আমার তোমার ন্যায় অবতারতনু হোক, সকলেই নশ্বর। আর তাই আমি, এই দেহরূপী আমি, বা কনো দেহরূপীই তোমার উদ্ধার করতে সক্ষম নন।

আমার যেই রূপ তুমি দর্শন করলে কিছুক্ষণ পূর্বে, তা কি আমার এই দেহের মধ্যে দেখলে, না কি তোমার দেহের অভ্যন্তরে?”

দিব্যশ্রী বললেন, “আমার মধ্যে … তারপর সর্বত্র”।

ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “সঠিক পুত্রী, প্রথম নিজের মধ্যে, তারপর সর্বত্র। যেই আমি এই দেহে বিরাজমান, সেই আমি সর্বত্র বিরাজমান। আর তাই প্রথম আমাকে নিজের মধ্যেই দর্শন করতে হয়, তবেই আমাকে সর্বত্র দর্শন করা যায়। … অর্থাৎ কনো মানুষ অন্য কনো মানুষ-এর উদ্ধার করতে পারেন না। প্রতিটি মানুষকে নিজেকেই নিজে উদ্ধার করতে হয়।

আর এটিই হলো সত্য ধারণ। তাই পুত্রী, ধারণ করার ক্ষেত্রে, এই কথাকে নিজেও সর্বদা স্মরণ রাখবে, আর নিজের শিষ্যদেরও স্মরণ করাতে থাকবে যে, ঈশ্বর সর্বত্র বিরাজমান, তবে তাঁকে প্রথমে নিজের অন্তরে দর্শন করতে হয়, কারণ সে তাঁকে দর্শন করতে পারছে না যে, তার একটিই কারণ, আর তা হলো তাঁর নিজের ভ্রম। যখন সে নিজের অন্তরে ঈশ্বরকে দর্শন করবে, তখনই তাঁর সেই ভ্রমের নাশ হবে, আর তখনই সে সর্বত্র ঈশ্বরকে দর্শন করতে সক্ষম হবে।

অর্থাৎ তোমার ছেলেমেয়েরা যেন এই ধারণা না রাখে যে কনো আগন্তুক নশ্বর জীব তাঁদের সম্মুখে আসবেন, আর তাঁদেরকে উদ্ধার করে নিয়ে চলে যাবেন। … এই ধারণা সম্পূর্ণ মিথ্যা, আর উদ্ভ্ররান্ত এক কল্পনা। …

হ্যাঁ যখন তাঁরা সকলে এই উদ্ভ্রান্ত কল্পনাকেই সত্য বলে মানতে শুরু করবে, তখন আমি কনো না কনো তনু ধারণ করে, সেই নশ্বর তনুকে নশ্বর প্রমাণিত করে, সেই নশ্বরের অন্তরে ঈশ্বর স্থাপিত তাও প্রমাণিত করে, পুনরায় এই সত্যকে স্থাপন করে যাবো যে, ঈশ্বরকে অন্তরে দর্শন করো, বাইরে তাঁর দর্শন ততক্ষণ অসম্ভব যতক্ষণ না নিজের ভ্রম দূর করে অন্তরে তাঁকে দর্শন করছো।

সেই নশ্বর তনুতে বিরাজ করে, পুনরায় মার্গ দেখাবো সকলকে, কিন্তু সেই একই কথা উদ্ধার তাঁকে নিজেকেই নিজে করতে হবে, আমি তা বাইরে থেকে করিয়ে দেব না। তাঁদের অন্তরে থেকে সমানে তাঁদেরকে প্রেরণা প্রদান করবো যে, ইন্দ্রিয় নয়, আমি হৃদয়, আমার দ্বারা দর্শন করো; সমানে বলতে থাকবো যে পঞ্চভূতকে স্বতন্ত্র না করে, আমার অধীনে স্থিত করে রাখো। কিন্তু এই সমস্ত কিছু তাঁদের অন্তরেই হবে, বাইরে নয়।

তাই পুত্রী, এই কাল্পনিক ধারণার নাশ করো যে বাইরের কনো নশ্বর জীব তোমাদের উদ্ধার করবেন। উদ্ধার আমিই করবো তোমাদের, কিন্তু আমি তোমাদের বাইরে নয়, অন্তরে স্থিত। … এই ধারণা নিজেও রাখো আর তোমার ছেলেমেয়েদেরও প্রদান করতে থাকবে, যাতে তাঁরা কখনোই ভ্রমিত না হয়ে যায়, আর সাধন পথ থেকে বিচ্যুত না হয়ে যায়।

আর এই চূড়ান্ত চরণে, একটি ব্যাপারকে সর্বদা স্মরণ রাখবে। এই জগতসংসারে কিচ্ছু বোঝার নেই। মিথ্যা এই জগত, আর এই মিথ্যা জগতে বোঝার মত কিছুই নেই। যা আছে এতে, তা বোঝার নয়, তা অনুভব করার, আর তা হলো প্রেম। প্রতিটি মুহূর্তে, প্রতিটি ঘটনা তোমাকে এই প্রেমই অনুভূতি করিয়ে চলেছে, আর তুমি সর্বক্ষণ সেই প্রেমকে উপেক্ষা করে চলেছ।

এই বাতাসকে অনুভব করো। কি বুঝছো এঁকে অনুভব করে, আর কি অনুভব করছো এর থেকে, তা আমাকে বলো”।

দিব্যশ্রী নেত্র বন্ধ করে, বাতাসকে অনুভব করে, নেত্র খুললেন আর বললেন, “এই প্রথম আমি এই বাতাসকে অনুভব করলাম মা, এর আগে আমি কেবলই বুঝেছি। আর এই বুঝতে পেরেছি যে হাওয়া বইছে, আর তা আমার অঙ্গে লাগছে”।

ব্রহ্মসনাতন হাস্যমুখে প্রশ্ন করলেন, “আর আজ অনুভব করে কি অনুভব করলে?”

দিব্যশ্রী বললেন, “আমি একটি পাখির পালকের মত হাল্কা কেউ, আর এই বাতাস আমাকে প্রেম প্রদান করে, সেই পালককে দুলকি চালে দুলিয়ে যেন ঘুম পারাচ্ছে, এই অনুভব করলাম। … ও আচ্ছা, এবার বুঝতে পেয়েছি, তুমি যে বলতে, সাগর যেন মা, আর সেই মা যেন তাঁর সন্তানকে দুলিয়ে, ভিজিয়ে, উঠিয়ে, নামিয়ে আদর করছে। এটা ছিল অনুভব। আর তাই আমি যখন সাগরে স্নান করতে গেছি, তখন কিছুতেই সেই অনুভবকে অনুভব করতে পারিনি, কারণ আমি তো বুঝতে গেছিলাম, অনুভব করতে তো যাইনি!

হ্যাঁ সত্যই তো, এই বাতাস আমাকে দুলিয়ে দুলিয়ে প্রেম দিচ্ছে; স্নান করার কালে জলধারা আমাকে স্নেহকরে প্রেমে সিক্ত করছে; আহারের কালে সমস্ত আহার আমার উর্জ্জাকে তৃপ্ত করে, আমাকে প্রেম দিচ্ছে; নিদ্রার কালে, নিদ্রা স্বয়ং আমাকে স্বস্তি ও শান্তি দিয়ে প্রেম করছে! … মা, সর্বক্ষণ কেবলই প্রেম দেওয়া হচ্ছে আমাকে। … কিন্তু মা, এই অনুভব তো ধ্যানস্থ করছে না আমাকে? বরং একটি ভাব প্রদান করছে, আর তা যেন ধ্যানের থেকেও মধুর!

 যেন আমার আমিই খসে পড়ে যাচ্ছে এই ভাবের কারণে। যেন আমি নেই, আর এই আমি নেই যেন সম্পূর্ণ ভাবে বন্ধনমুক্তি! এমন বন্ধনমুক্তি তো ধ্যানের কালেও অনুভূত হয়না মা! … এ কি তবে? একি ধ্যানের থেকেও উচ্চ কনো কিছু? এ যেন নেত্র খুলে রেখেও আমাকে শূন্যতার অনুভব দিচ্ছে? যেন যেই সত্যের সম্মুখীন হয়ে এলাম, সেই সত্যই আমাকে ঘিরে ধরেছে? কি হচ্ছে মা এটা? একে কি বলে?

কি অদ্ভুত পরিমাণ উত্তেজনা অনুভব করছি, যেন এক বাঁধনছাড়া আনন্দ। যেন আমি সম্পূর্ণ স্বাধীন। যেন সমস্ত কিছু আমাকে অপার অপার প্রেম দিচ্ছে, আর সেই প্রেম লাভ করে করে, আমি তাতে ডুবে যাচ্ছি, মহানন্দে ডুবে যাচ্ছি। এই ডুবে যাওয়াতে যেন কনো ভয় নেই, কনো লাজ নেই, কনো চিন্তা নেই, কনো ইচ্ছা অনিচ্ছা কিচ্ছু নেই, কেবলই তৃপ্তি, কেবলই আনন্দ। একে কি বলে মা?… এর আগে এইরূপ কনোদিনও অনুভব করিনি। এ যেন ধ্যানের থেকে কয়েক সহস্রগুন অধিক মধুর? এটা কি মা?”

ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “কৃতান্ত পাঠের ক্ষেত্রে মাতা সর্বাম্বাকে কখনো ধ্যনস্থ হতে শুনেছ?”

দিব্যশ্রী সামান্য স্মরণ করে বললেন, “না উনাকে ভাবস্থ হতে বলা হয়েছে, ধ্যনস্থ নয়”।

ব্রহ্মসনাতন আবার হাস্যমুখে বললেন, “এই হলো সেই ভাব, আর সেই ভাবে যখন সম্পূর্ণ ভাবে ডুবে যাওয়া হয়, তাকে বলে ভাবস্থ। পুত্রী, এই ভাব একটি অন্য আমির জন্ম দেয়, আত্মকে বিলীন করে, আর তা হলো ভক্তির আমি। এই আমি জন্ম লাভ করে কেবলই সুখ লাভ করে, আর সমস্ত কিছুর প্রেম অনুভব করে। সমস্ত কিছুর থেকে প্রেম অনুভব করে, প্রেমবিকাশ করার কারণেই এই আমির জন্ম হয়।

আর সেই আমি যখন প্রেমানুভব করে তাকে বলে ভাব, আর যখন সেই আমিও প্রেমানুভব করতে করতে বিলীন হয়ে যায় শূন্যের মধ্যে, তা হলো ভাবস্থ অবস্থা”।

দিব্যশ্রী বললেন, “এই কারণে তুমি কখনোই ধ্যানসনে উপবেশন করোনা, কিন্তু আমি অবাক হয়ে যাই দেখে যে, আমি ধ্যানে এমন ভাবে মৃত্যুর ন্যায় শান্তি কখনোই অনুভব করিনা। এত পরিপাটি করে মেরুদণ্ড সোজা রেখে, কঠিন ভাবে বসেও এমন অপার সুখ অনুভব করিনা। কিন্তু তুমি যেন মৃত্যুর শান্তিতে তলিয়ে যাও। মুখে থাকে এক মৃদু হাসি, আর ক্রমে সেই হাসিও বিলিন হয়ে যায়। … অর্থাৎ তুমি ধ্যান করোই না! কেবলই ভাবে ভাবস্থ হয়ে যাও!”

ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “তুমিও তো সেই ভাবেই তলিয়ে গিয়ে, গ্রীষ্মের দুপুর থেকে চন্দ্র সূর্য নক্ষত্রদের সীমা ত্যাগ করে, পরমাশূন্যের মধ্যে লীন হয়ে, তাঁর অমৃতধারাতে স্নান করে এসেছ। তা তুমি কি তখন ধ্যানে ছিলে? ধ্যানে থাকলে, আমি যে তোমাকে সমানে বলতে থাকছিলাম, তা তুমি শুনতে পেতে?”

দিব্যশ্রী বললেন, “সত্যই তো, আমি তো সমস্ত কিছু শুনতে পাচ্ছিলাম, আর কেবল শুনতেই পাচ্ছিলাম, তেমন নয়, এমন স্পষ্ট শব্দ, এর আগে কনোদিনও শুনিনি। … এবার বুঝতে পারছি, আমার এই কান সেই শব্দ শ্রবণ করেই নি, তা শ্রবণ করেছিল আমার হৃদয়, আর তাই সেই শব্দসমূহ এতটা স্পষ্ট ছিল। … অর্থাৎ ধ্যান হলো নিজেকে এই বাহ্য মিথ্যা জগতে ছড়িয়ে যাওয়া থেকে আটকানোর একটি অভ্যাস বা অনুশীলন। আর ভাব?

ভাব হলো নিজেকে প্রেমে উন্মাদিনীর মত ভাসিয়ে দেওয়া! ঠিক যেমন মিরা বোধ হারিয়ে ভাবে ভেসে ভেসে নৃত্য করতো, ঠিক যেমন মহাপ্রভু বোধ হারিয়ে নৃত্য করতে করতে ভাবসমাধিতে নিমজ্জিত হতো, ঠিক যেমন রামকৃষ্ণ ঠাকুর ভাবে গদগদ হয়ে তাঁর ভগবৎতনুকে লুটিয়ে দিতেন, এজে ঠিক তেমনই! এ যে ভাব নয় মা, এ যে মহাভাব! এ যে অভ্যাস নয় মা, এ যে নেশা! শ্রেষ্ঠ নেশা। এই নেশার কাছে মাদক যেন অতি তুচ্ছ!

আচ্ছা মা, গিরীশ ঘোষ কি এই নেশাতেই চূড় অবস্থায় দেখেছিলেন ঠাকুরকে, আর বলেছিলেন এত সুরাপান করেও তাঁর এত নেশা কনোদিন হয়নি! … কি অদ্ভুত নেশা! এতো নেশা, মহানেশা, সমস্ত নেশার শ্রেষ্ঠ নেশা, প্রেমের নেশা! ভগবানের নেশা! … আর এই নেশার আকর্ষণ যেন সমস্ত নেশার থেকে শতশত গুন ভিন্ন! যেন এই নেশার থেকে মুক্ত হতেই মন চায়না!”

ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “এই হলো ধারণের উপায় পুত্রী। একবার এই ভাবের নেশায় নিমজ্জিত হয়ে যেতে পারলে, আর তোমার করনিয় কিচ্ছুই থাকবে না। যেমন আজ আমাকে আর কিচ্ছু বলতে হচ্ছেনা, সমস্ত অনুভব তুমি স্বয়ং করতে পারছো, ঠিক তেমনই এই নেশায় চূড় হলে, তোমার আর কনো করনিয় থাকবেনা, তোমার ছেলেমেয়েরা অনায়সেই সত্যের সম্মুখে স্থিত হয়ে, সত্যকে প্রত্যক্ষ করে, সত্যের নেশাতেই চূড় হয়ে যাবে।

হ্যাঁ পুত্রী, মিথ্যা মাদকের নেশা তো অনেক করলো সকলে। এবার সত্যের নেশার সাথে তাদের পরিচয় করিয়ে দাও। … এই শূন্যতার ভানই সেই নেশা, যেই নেশা সকল নেশার রাজা। যার একবার এই নেশা হয়ে যায়, মোক্ষ না পাওয়া পর্যন্ত তাঁর শান্তিই হয়না। … অর্থাৎ এই নেশা এমন নেশা, যে সমস্ত কল্পনাকে বিনষ্ট করে দিতে পারে, সমস্ত যন্ত্রকে বিকল করে দিতে পারে, সমস্ত তন্ত্রকে অকেজ করে দিতে পারে, সমস্ত মন্ত্রকে নিরর্থক করে দিতে পারে।

হ্যাঁ পুত্রী, যেই ব্যক্তি এই নেশায় মজে গেছেন, তাঁকে বাস্তবেই কনো ব্যবস্থা অর্থাৎ কনো যন্ত্রই মোহিত করতে পারেনা, তাঁর উপর মায়া স্থাপন করতে পারেনা; তাঁকে কনো জাদু, না এমনি জাদু, না কালাজাদু, না তন্ত্রমন্ত্র, না কনো কিছু স্পর্শ করতে পারে। আর একবার তা হলে, কে আটকাবে তাঁকে? কে তাঁকে তাঁর জননীর থেকে দূরে আটকে রাখবে? না আধুনিক বিজ্ঞানের কনো যন্ত্রের সেই সামর্থ্য আছে, না উচাটনাদি তন্ত্রের সেই সামর্থ্য আছে, আর না কনো মন্ত্রের তাঁকে বান্ধা দেবার সামর্থ্য আছে।

এই হলো সেই দিব্যদৃষ্টি পুত্রী, যার মাধ্যমে সত্যে স্থিত হওয়া কেবলই সময়ের অপেক্ষা, আর এটিই সমস্ত সংসারের লক্ষ্য। তবে এই তত্ত্বকে, এই সত্যকে লুক্কায়িত রাখবে, তবেই তা জগতের বুকে স্থিত থাকবে। অর্থাৎ আমার কথা এই যে, একবার যদি এই তত্ত্বকে, এই নেশাকে সর্বজনীন করে দেওয়ার প্রয়াস করো, তবে আধুনিক বিজ্ঞানের সমস্ত যন্ত্রপ্রস্তুতকারক ধনকুবেররা, সমস্ত বশীকরণ উচাটনের বণিকরা, সমস্ত প্রকার ধনমুখিরা এই তত্ত্বকে অশুদ্ধ করে দেবার প্রায়াস করবে।

কেন করবে? কারণ তাঁদের কাছে প্রয়োজন হলো অজ্ঞানতা। যত অধিক মানুষ অজ্ঞান থাকবে, তত অধিক তাঁদের কোষাগার রত্নভাণ্ডারে পরিপূর্ণ হবে; যত অধিক মানুষ জ্ঞানী হবে, ততই তাঁরা যন্ত্রের প্রয়োজন থেকে মুক্ত হবে, আর ততই তাঁর কোষাগার শূন্য হতে শুরু করবে। যত অধিক মানুষ এই ভাবের থেকে মুক্ত থাকবে, ততই তাঁদের উচাটন বশীকরণ ক্রিয়াশীল হবে। যত অধিক মানুষ এই নেশার থেকে মুক্ত হবে, তত অধিক মানুষ চমৎকারে বিশ্বাসী হবে, আর তত অধিক মানুষকে মন্ত্রাদি দ্বারা মূর্খ করা সম্ভব হবে।

তাই যদি তাঁরা, যারা মানুষের প্রবল কামনা, ইচ্ছা, চিন্তা, আর কল্পনাকেই নিজেদের কোষাগার পরিপূর্ণতার মাধ্যম করে রেখেছেন, তাঁরা যদি এই নেশার সন্ধান পায়, তবে এই নেশার বিজ্ঞানকে যতটা শীঘ্র সম্ভব মুছে ফেলার প্রয়াস করবে। আর তাই এঁদের থেকে এই নেশাকে সুরক্ষিত করে রেখে দাও, আর ততক্ষণ সুরক্ষিত করে রেখে দাও, যতক্ষণ না এই নেশায় এক বিশাল গোষ্ঠী নেশাগ্রস্ত হয়ে যাচ্ছেন”।

দিব্যশ্রী মিষ্টহেসে বললেন, “বুঝলাম মা, যতক্ষণ না গাছ বনস্পতি হয়ে যাচ্ছে, ততক্ষণ সেই গাছকে বেড়া দিয়ে রেখে দিয়ে হয়। ঠাকুর রামকৃষ্ণ এই কথাই বলেছিলেন, তবে একটি ব্যক্তিকে বলেছিলেন, তাই ভেবেছিলাম এটি কেবলই একটি ব্যক্তির উন্নতির জন্য কথা। আজ বুঝলাম, এই কথা তো সমস্ত সংসারকে উদ্ধার করার মন্ত্র ছিল!”

ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “হ্যাঁ, সঠিকই ধরেছ পুত্রী। যতক্ষণ না এই নেশাতে শতশত মানুষ নেশাগ্রস্ত হয়ে উঠছে, ততক্ষণ এই নেশার কথা যেন কেউ ঘনাক্ষরেও না জানতে পারে। … কারণ যারা এই নেশা করছেন না, তাঁরা এই নেশার কথা জনেজনে বলে ফিরবে, আর যারা এই নেশা করছেন, তাঁরা কেবল তাঁকেই এই নেশার কথা বলবেন, যিনি এই নেশা করতে চান। …

বুঝতে পারছো কি বলছি? গাঁজাখোর কেবলই আরেক গাঁজাখোরের কাছে গিয়েই প্রশ্ন করবে, “ভাই একটু প্রসাদ হবে না কি?”… অন্য কারুকে এই প্রশ্ন সে করবে না, কে জানে সে হয়তো পুলিশের লোক, তাকে ধরে নিয়ে চলে যাবে। ঠিক তেমনই, এই নেশাকে প্রকাশ্যে রেখো না, লুকিয়ে রাখো, ঠিক যেমন এক গাঁজাখোর নিজের গাঁজার নেশাকে লুকিয়ে রেখে দেয়, তেমন।

তাহলেই এই নেশা সুরক্ষিত থাকবে। ভালো করে দেখো, ঠাকুর রামকৃষ্ণ কারুকে তেমন নেশায় চূড় দেখেন নি, গিরীশ ঘোষ ছাড়া, তাই সকলেকে জ্ঞান নির্দেশ দিলেও, এই নেশার সংবাদ কেবলই গিরীশকে দেন, বিবেকানন্দও এই নেশার মাথামুণ্ডু কিচ্ছু জানতো না, আর কনোদিন জানেও নি। কিন্তু পাশাপাশি চৈতন্যদেবকে দেখো।

তিনি এই নেশার কথাই বলেছেন, আর প্রকাশ্যে এসে নেশা করেছেন। ফল কি হলো? এই নেশা তো কেউই করতে পারলো না, উপরন্তু এই নেশাকেই ব্যবসা করে দিলো প্রচুর ছোটবড় বণিক, আর আজ চৈতন্যদেব বাণিজ্যের এক বিশেষ পণ্যদ্রব্য হয়ে গেছেন জগতে। হ্যাঁ আমার এই কথা যদি তাঁদের কানে যায়, দেখবে, তাঁরাই এই কথার প্রতিবাদ করবেন। এঁদের জন্যও বাংলাভাষা শব্দ রেখে গেছেন, “চোরের মায়ের বড় গলা”।

তাই পুত্রী, এই নেশাকে লুকিয়ে রাখো, আর নিজের সেই ছেলেমেয়েদের কাছেই এই নেশার পরিচয় দেবে, যারা এই নেশায় চূড় হতে চাইছে, ঠিক যেমন ঠাকুর রামকৃষ্ণ দেব কেবল গিরীশকেই এই নেশার কথা বলেছিলেন, তেমন। দেখো, উনি এই নেশাকে লুকিয়ে রেখেছিলেন, তাই উনাকে পণ্য করতে পারেনি বণিকরা, কিন্তু যিনি লুকিয়ে রাখেন নি, তিনি পণ্য হয়ে গেছে।

অর্থাৎ পুত্রী, এই ধারণের ক্ষেত্রে যা অবশ্যই স্মরণ রাখবে, তা হলো ভাব, আর ভাবের নেশা। যদি চাও যে এই ভাবের নেশায় একদিন সম্পূর্ণ মানবজাতি উন্মাদ হয়ে গিয়ে মোক্ষের মেলা বসিয়ে দিক জগতে, তাহলে, এঁকে লুকিয়ে রাখবে। একটি নয়, যতক্ষণ না এক সহস্র মিরা হচ্ছে এই নেশা করে করে, ততক্ষণ এই নেশার কথা জগতকে জানতেও দেবেনা। …

অর্থাৎ পুত্রী, প্রচার নয়, কর্ম করো। প্রচার অনেক করার প্রয়াস হয়েছে, কিন্তু তাতে কনো লাভ হয়নি। এই নেশাকে নিয়ে বাণিজ্যের রচনা হয়েছে খালি। তাই কনো প্রচার নয়, অনাথদের গ্রহণ করো, আর তাঁদেরকে এই নেশায় চূড় করতে থাকো। তাঁদেরকে দিয়েও অনাথদের গ্রহণ করাও, আর নেশার বিস্তার করো। ১০ট অনাথ শিশুকে ১০টি অনাথশিশুর আশ্রম করার নির্দেশ দাও, আর সেই ১০ থেকে ১০টি করে করে, ১০০টি মিরার নির্মাণ করো। সেই ১০০টির থেকে ১ সহস্র মিরার নির্মাণ করো, আর সেই ১ সহস্র থেকে ১০ সহস্র মিরার নির্মাণ করো।

আর এই ১০ সহস্র মিরাকে তারপর জগতে ছেড়ে দাও। দেখবে, এই সমস্ত বাণিজ্য, বণিক, যন্ত্র, তন্ত্র, মন্ত্র মুহূর্তের মধ্যে মানব সমাজ থেকে মুক্ত হয়ে গিয়ে, সম্পূর্ণ মানব সমাজে সত্যযুগ স্থাপিত হয়ে গেছে। আর কেউ তখন বৈরাগ্যকে বিরক্তি বলে চালাতে পারবেনা। আর কেউ তখন মোহকে প্রেম বলে চালিয়ে দিতে পারবেনা জগতে। আর কেউ তখন ঈশ্বরের মন্দিরে গিয়ে কামনা করাকে ভক্তি বলে চালিয়ে বাণিজ্য করতে পারবেনা। আর কেউ তখন ঈশ্বরকে একচোখ বলার সাহস করবেনা।

কিন্তু ততদিন পর্যন্ত এই নেশাকে লুকিয়ে রাখো। প্রচার নয়, কর্ম করো। আশা করো না যে তোমার লেকচার শুনে কারুর মধ্যে চেতনা জাগবে। অনাথ শিশুকে কাছে টেনে, নিঃস্বার্থ প্রেম দিয়ে, তাঁর মধ্যে চেতনার উদয়কে নিশ্চিত করো”।

দিব্যশ্রী বললেন, “তুমি অনাথে দাও চেতনা, অনাথ দেবে অনাথে তা। ১০ অনাথ গড়বে শতকে, শতক গড়বে সহস্রে। সহস্র মিরা যখন উঠবে গড়ে, গর্জে উঠবে একত্রে। খবরের কাগজ, সব খবরে, থাকবে না বাণিজ্য কনো খতে। থাকবে খালি মিরার কথা, এক নয় সহস্র তথা। হয় হবে বিরক্ত, বন্ধ করবে খবর, নয় সকলে হবে আসক্ত, মিরাতে হবে মগন।

সত্যি মা, এমন যোজনা সত্যই কনো মানুষের পক্ষে করা সম্ভবই নয়, কারণ মানুষ তো সবসময়ে তাৎক্ষনিক ফলের আশা করতে থাকে। এই এখনি করবো, এই এখনই ফল পেয়ে যাবো। জল খাওয়াও শেষ হলো না, প্রস্রাব করতে চলে গেলাম। মানুষ তো এই ধৈর্য ধরতেই পারেনা। … আর তাই এই অসাধারণ যোজনা করতেও পারেনা। সত্যই, আমরা অনাথ নই, তাই আমাদের যোজনা বানানোর কনো প্রয়োজনই নেই। কিন্তু তার থেকেও বড় কথা এই যে, আমরা যোজনা করতে জানিই না, তাই যোজনার থেকে দূরে থাকা উচিত আমাদের।

আচ্ছা, এবার তো কৃতান্তিক হয়ে উঠলো সে, এবার তার করনিয় কি?”

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 29 30 31 32 33 34 35 36 37 38 39 40 41 42 43