কৃতান্তিকা

ব্রহ্মসনাতন বললেন, “পুত্রী, তোমাকে বেশ কিছু বিষয়ে এবার বলবো, যেগুলিকে সর্বদা স্মরণ রাখবে, যখন তোমার ছেলেমেয়েদের মানুষ করবে। এঁদের প্রথম হলো, সরলতা। পুত্রী, সরলতার থেকে বড় গুন একটি সাধকের জন্য আর কিছু হতে পারেনা। তবে এই সরলতা কি ভাব, তাকেও স্পষ্ট করে জেনে রাখা আবশ্যক, নাহলে প্রায়শই এই সরলতার নাট্য করা হয়ে থাকে।

সরল মানে সোজা, তাই সরলতা মানে সোজাসাপটা মনোভাব, অর্থাৎ শিশুর মনোভাব। তবে এখানে নাট্য থেকে অত্যন্ত সাবধান থাকবে। প্রায়শই দেখা যায় যে, যার মধ্যে শিশুভাবের লেশমাত্রও নেই, সে শিশুকে নকল করে কথা বলছে, বা বোঝানোর প্রয়াস করছে যে সে শিশুন্যায়। ভুল করেও সেই অভিনেতার খপ্পরে পা দেবেনা, এবং এমন অভিনেতার থেকে অত্যন্ত সাবধানে নিজেও থাকবে, এবং নিজের ছেলেমেয়েদেরও।

শিশুর ভাব মানে, সহজ বিশ্বাস, কনো প্রশ্ন ছাড়া বিশ্বাস। যেমন শিশু মাকে প্রশ্ন করেনা, অমুক কাজটা কেন করবো, মা বলেছে, তাই করছি, তেমন ভাব। তুমি তোমার ছেলেমেয়েদের জননী। তুমি বলেছ যে জগজ্জননী হলেন তাঁর প্রকৃত জননী, তাই সরল বিশ্বাস যে, জগজ্জননীই তাঁদের প্রকৃত জননী। এই হলো সরলতা।

তাই শিশুর মত সুরে কথা বলার অর্থ সরলতা কখনোই না। সরলতা মানে, আনন্দ হলে, বাঁধনছাড়া ভাবের উচ্ছ্বাস, যেখানে কে আমার এই উচ্ছ্বাস দেখে কি মনে করছেন, তার বোধ বা সেই বিষয়ে কুণ্ঠা ক্রিয়া করেনা কনো ভাবেই। সরলতা মানে, ক্রন্দন এলে ক্রন্দন করা, আর ক্রন্দন না এলে ক্রন্দন না করা।

অর্থাৎ যখন সম্মুখে উপস্থিত ব্যক্তি বা কারুকে প্রভাবিত করার জন্য নয়, কেবলই ভাবের সরাসরি অভিব্যক্তি প্রকাশ সহজ ভাবেই হয়, তাই সরলতা। এক শিশু কখনোই কারুকে কিছু প্রমাণ করতে চায়না, আর তাই যখন তোমার সম্মুখের ব্যক্তি কেবলই কিছু প্রমাণ করার জন্য কিছু ভাবের প্রদর্শন করছেন, সেই ব্যক্তি যেই হন না কেন, সমাজে যত সম্মানিতই হন না কেন, তোমার সাংসারিক সম্বন্ধেও যতই প্রিয়জন হোক না কেন, তাঁকে যথাশীঘ্র সম্ভব বর্জন করবে”।

দিব্যশ্রী বললেন, “কিন্তু বুঝবো কি করে, কে নাট্য করছে, আর কার মধ্যে সত্যভাব প্রদর্শিত হচ্ছে?”

ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “বুঝতে গেলে দেখবে, তাঁর মুখমণ্ডলে ক্রন্দনের ভাব নেই, অথচ তাঁর নেত্রে অশ্রুবারি বর্তমান। বুঝতে গেলে এমনও দেখবে যে আকস্মিকই তাঁর ক্রন্দন থেমে গেল, আর ক্রন্দনের পরবর্তী শব্দ উচ্চারণের মধ্যে ক্রন্দনের কনো ভাবই নেই। বুঝতে গেলে দেখবে, এতক্ষণ নাচছিল সে দুই হাত তুলে, সঙ্গীত থামতেই, সেও যেন আকস্মিক থেমে গেল, ইত্যাদি। এক কথায় বলতে গেলে, দম দেওয়া পুতুল দেখেছ তো! সেইরূপ হয়।

তবে বুঝতে গেলে, না বুঝতেও পারো। তাই বোঝার প্রচেষ্টাই করো না। পুত্রী, বুদ্ধি আর মন বোঝার প্রয়াস করে, আর হৃদয় করে অনুভব। মন আর বুদ্ধি নিজের ইন্দ্রিয়দের দিয়ে যা দৃশ্য দেখে, তাই দ্বারাই কিছু বোঝে। কিন্তু হৃদয়! পুত্রী, যিনি অনুভব করেন, তিনিও তাই দেখেন, তাই শোনেন, তাই ঘ্রাণ নেন, তাই স্বাদ নেন, যা এক বুদ্ধিমান ব্যক্তি নিজের ইন্দ্রিয়দের সাহায্যে গ্রহণ করে বোঝেন, কিন্তু এই কনো কাজকে তিনি ইন্দ্রিয়দ্বারা করেন না, তিনি এই সমস্ত কিছুকে হৃদয় দিয়েই করেন।

তাই পুত্রী, নেত্র দিয়ে নয়, হৃদয় দ্বারা দেখো; তোমার দৃষ্টিশক্তি প্রখর এমন অন্যেরা ভাববেন, কিন্তু বাস্তবে তা অন্তর্ভেদী হয়ে গেছে, তাই প্রত্যক্ষদর্শীরা ভাবছেন যেন তোমার দৃষ্টিশক্তি প্রখর। তাই নেত্র দিয়ে নয়, হৃদয় দিয়ে দেখো; নাসিকা দিয়ে নয়, হৃদয় দিয়ে ঘ্রাণ নাও; হৃদয় দিয়ে স্বাদ গ্রহণ করো; হৃদয় দিয়ে ধ্বনি শ্রবণ করো; হৃদয় দিয়ে সমস্ত স্পর্শ অনুভব করো।

পুত্রী, যিনি হৃদয় দ্বারা এই সমস্ত কর্ম করেন, তিনি অচিরেই ইন্দ্রিয়াতীত হয়ে যান; তাঁকে পৃথক ভাবে ইন্দ্রিয়াতীত হবার জন্য সাধনা করতে হয়না। আর তার থেকেও বড় কথা, কনো জটিল বা কুটিল নাট্য দ্বারা একে মজাতে পারবেনা, কারণ হৃদয় সমস্ত কিছুর থেকে, রাজহংসের মত কেবল দুধটা গ্রহণ করেন, আর জলটা ফেলে দেন। তাই যার সমস্তটাই নাট্য, তাঁর সমস্তটাই ইনি ফেলে দেবেন, কিচ্ছু গ্রহণ করবেন না।

আরো একটি গোপন কথা তোমাকে বলি। পুত্রী, জীবের কাছে দুটি স্মৃতিপট আছে, একটি মস্তিষ্কে যা দৈহিক বা ভৌতিক, এবং একটি হৃদয়ে যা সূক্ষ্ম অর্থাৎ অতিভৌতিক। আর জীব নিজের দেহান্তরের সময়ে কেবল এই হৃদয়ের স্মৃতিকেই সঙ্গে নিয়ে যায় এবং পরবর্তী দেহতে এই হৃদয়ের স্মৃতিকেই সঙ্গে নিয়ে আসেন। তাই বুদ্ধি খাটিয়ে, হাজার হাজার তথ্য এবং তত্ত্ব স্মরণ রেখে কনো লাভ নেই, কারণ তা দেহান্তরে এমনিই তোমার থেকে অপসারিত হয়ে গিয়ে, তোমাকে মূর্খই করে দেবে পুনরায়।

তাই হৃদয় দ্বারা দেখো, হৃদয় দ্বারা শোনো, হৃদয়কেই সমস্ত ইন্দ্রিয়ের কর্ম করতে দাও। সে কেবল ভৌতিক দৃশ্যকে, ধ্বনিকে, স্বাদকে, গন্ধকে এবং স্পর্শকেই গ্রহণ করবেনা। সে সেই সমস্ত দৃশ্য, ধ্বনি, স্বাদ, গন্ধ এবং স্পর্শের অন্তরে থাকা নাট্যকে বর্জন করে, তার মধ্যে থাকা ঈশ্বরীয়ভাবকে গ্রহণ করে, তাকে জন্মজন্মান্তরের জন্য তোমার স্মৃতিপটে রেখে দেবে।

তাই সরলতার পরীক্ষণ প্রায়শই করতে থাকবে। তিনিই সরল যিনি ইন্দ্রিয়দ্বারা নয়, হৃদয়দ্বারা সমস্ত কিছুকে অন্বেষণ করেন। আর তাই তাঁর ক্রন্দন হয় হৃদয়ের ক্রন্দন, তাঁর হাস্য হয় হৃদয়ের হাস্য, তাঁর বাক্য হয় হৃদয়ের বাক্য, তাঁর স্নেহ হয় মোহমুক্ত স্নেহ, আর তিনিই যথার্থ সাধক, কারণ তিনি পবিত্র। ঈশ্বরী সকলের জননী, তাই তিনি যখন জননী, তখন তিনি সকলের জন্য সমান।

তখন তিনি কনো ভেদাভেদ করেন না। কিন্তু যখন তিনি ঈশ্বরী, তখন তিনি একটিই ভেদ দেখে, আর তা এই যে সেই সাধকের সমস্ত কিছুর মধ্যে সুদ্ধতা কতখানি, আর নাট্য কতখানি। যার মধ্যে নাট্য অধিক, তিনি সন্তান তো তখনও থাকেন তাঁর, কিন্তু তাঁর সাধনাকে স্বয়ং ঈশ্বরী রোগভোগ, বা অন্য প্রকার সামাজিক ও সাংসারিক বিভ্রান্তিদ্বারা বিনষ্ট করে দেন, কারণ সেই সাধনা তো একটি ছলনা ছিল।

পুত্রী, এর পরবর্তী যেই ভাবকে স্মরণ রাখবে সদা, তা হলো সত্যমিথ্যার ভাব। স্মরণ রেখো পুত্রী, আমি কিন্তু সত্যকথা বা মিথ্যাকথার ব্যাপারে সতর্ক করলাম না তোমাকে। আমি তোমাকে সত্য ও মিথ্যার ব্যাপারে সতর্ক করলাম। মিথ্যাবাদী তো সকল জীব, কারণ সকল জীব নিজেদের কর্তাজ্ঞান করে চলেছেন। যাদের সামান্য একটি চোখের পাতা ফেলার সামর্থ্য নেই, তাঁরা নাকি জগতকে দুষিত করছেন, জগতকে রক্ষা করছেন, সংসারকে বিনষ্ট হওয়া থেকে আটকাচ্ছেন, সন্তানকে জন্ম দিচ্ছেন, সন্তানকে লেখাপড়া শেখাচ্ছেন, আরো কত মিথ্যাকথাই না সক্কলে সর্বক্ষণ বলে চলেছেন।

তাই মিথ্যাকথার বিষয়ে আমি তোমাকে সতর্ক করছিনা। সত্যকথা তো একমাত্র তিনিই বলছেন যিনি বলেছেন যে না তো আজ পর্যন্ত আমি কিছু করেছি, না এক্ষণে করছি, আর না ভবিষ্যতেও আমার কিছু করার সামর্থ্য আছে। বাকি সক্কলে মিথ্যাকথাই বলে চলেছেন অনুক্ষণ। তাই সত্যকথা আর মিথ্যাকথা, এই ভেদ একটি ভৌতিকজগতের কাল্পনিক ভ্রম মাত্র। তাই আমি সেই বিষয়ে বলছিনা তোমাকে। আমি বলছি, সত্য ও মিথ্যার ব্যাপারে সতর্ক থাকতে।

আর যিনি, মিথ্যাকে আঁকড়ে নয়, সত্যকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চাইছেন, সাধনা তাঁর পক্ষেই সম্ভব, অন্যদের পক্ষে তা অসম্ভব, আর ততক্ষণ অসম্ভব যতক্ষণ না তিনি হৃদয় থেকে সত্যকেই আঁকড়ে ধরছেন, আবার বলি হৃদয় থেকে সত্যকে আঁকড়ে ধরছেন, বুদ্ধির দ্বারা বিচার করে নয়”।

দিব্যশ্রী বললেন, “সত্যকে আঁকড়ে ধরছেন মানে কি? সত্য কি তা তো তিনি প্রত্যক্ষ করেনই নি। সত্যকে আঁকড়ে ধরছেন মানে কি এই যে আমি সত্যকে জানিনা, আর সত্যকে জানার জন্য ব্যকুল?”

ব্রহ্মসনাতন মৃদুহাস্যে বললেন, “হ্যাঁ পুত্রী, যিনি অবিরাম সত্যকে জানার, চেনার ও অনুভবের চেষ্টায় মত্ত, তিনিই সত্যবাদী, অন্য সকলে মিথ্যাবাদী। তাই সত্য মিথ্যার যথার্থতা সম্বন্ধে নিজেও সর্বক্ষণ সচেতন থাকবে, এবং নিজের ছেলেমেয়েদেরকেও সেই পথে অঢিক রাখবে।

এর পরবর্তী যেই ধারণাকে স্মরণ রাখবে সর্বদা, তা হলো ন্যায় ও অন্যায়ের ভেদ, ধর্ম ও অধর্মের ভেদ। পুত্রী, প্রথমে যদি ন্যায় আর অন্যায়ের কথা বলি, তাহলে এই বলতে হয় যে প্রতিটি ন্যায়ের মধ্যেই অন্যায় থাকে, আর প্রতিটি অন্যায়ের মধ্যেই ন্যায় থাকে। তাই ন্যায় অন্যায়ের ভেদ করা থেকে নিজেকেও এবং তোমার সন্তানদেরও নিবৃত্ত করবে।

যদি বিচার করে দেখো একটি তস্করের অন্যায়কে, তবে সে যেমন তস্করি করে অন্যায় করেছে, তেমন যার থেকে সে তস্করি করেছে, সেই ব্যক্তি অন্যদের থেকে ছল করে ধন উপার্জন করেছিলেন, তাঁর সেই ছলের দণ্ড প্রদান করে সেই তস্কর ন্যায় করেছে। অর্থাৎ জোর তোমার ন্যায় ও অন্যায়-এর বোধ কে নয়, কাকে তুমি ন্যায় বলছো আর কাকে তুমি অন্যায় বলছো না, তার দিকে দৃষ্টিপাত করো।

একজনকে অন্ধকারে রেখে, শর্তাবলি না বুঝিয়ে, তাঁর ধনকে করায়ত্ত করে নেওয়া, এবং সেই ধনকে করায়ত্ত করে নেবার জন্য, বেতনের বৃদ্ধি লাভ করা, বা উপরি লাভ করা, পুত্রী, যেদিন  আইন এই কর্মকেও তস্করি আখ্যা দিতে সক্ষম হবে, সেদিনই সমাজকথিত ন্যায় বা অন্যায় এক সাধকের যোগ্যতাকে বিচার করতে সক্ষম।

আর সেই বিচারকের কথা দেখো এবার। তিনি ন্যায়দেবতা, কারণ তিনি সমাজে ন্যায়ের স্থাপনা করেন। আচ্ছা, এই তস্করের স্ত্রী বা সন্তানও নিশ্চয়ই সেই সমাজেই স্থিত। তাহলে সেই তস্কর যখন কারাবাস পেল, তখন তাঁর সন্তানরা যে আহার লাভ করতে পারছিলনা, আর তাই তাঁর স্ত্রী যে সমাজের সকলের দ্বারা অপদস্থ হয়ে, নিজের সন্তানের প্রাণরক্ষা করার জন্য বেশ্যা হয়ে উঠলেন, তার দায়ও নিশ্চয়ই সেই বিচারকেরই। তাই না। তা এই তস্করের স্ত্রীপরিবারের যেই পরিণাম হলো, তা ন্যায় তো?

না পুত্রী, আমি তোমাকে এই সমস্ত কিছুর পরিবর্তন করতে একটিবারও বলছি না, কারণ এটিই ভৌতিক জগতের চরিত্র। এখানে সকলে নিজের নিজের কল্পনা করছে, আর যে যেমন কল্পনা করছে, সেই অনুসারে তাঁর কাছে হতাশা নেমে আসবে। যে যত অধিক বাস্তবমুখি কল্পনা  অর্থাৎ অন্যের কল্পনার সাথে মিলে যায়, তার কাছে হতাশা ততই দেরিতে আসবে, আর যে কল্পনার ভিত্তিতেই কল্পনা করছে, তাঁর কাছে হতাশা শীঘ্রই নেমে আসবে।

আর সেই হতাশার মাধ্যম হয়ে বিরাজ করবে, কারুর তস্করি তো কারুর ডাকাতি, কারুর হত্যালীলা তো কারুর শ্লীলতাহানির প্রয়াস। আর তুমি কেবলই তস্করির দিকটা, ডাকাতির দিকটা, হত্যার দিকটা, আর শ্লীলতাহানির দিকটা দেখতে পাবে, অন্যদিকটা নয়, আর তাই তোমার ন্যায় অন্যায় বিচার সকল সময়েই হবে অর্ধেক। আর তাই ন্যায় অন্যায়ের বিচার করে, এক সাধক, সাধনা করার যোগ্য কিনা, তা কখনোই বিচার করবেনা।

আর রইল কথা ধর্মাধর্মের! ধর্ম কি পুত্রী? অধর্মই বা কি? ধর্ম হলো তা, যা সত্যের উদ্দেশ্যে ধাবমান রাখে একটি ব্যক্তিকে, অর্থাৎ যা কিছু ব্যক্তিকে চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনার থেকে মুক্ত করে অহংমুক্ত করে দেয়, তাই ধর্ম। আর এর ঠিক বিপরীতটি হলো অধর্ম, অর্থাৎ যা কিছু জীবকে অধিক ভাবে চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনার মধ্যে আবদ্ধ করে রেখে তাঁর অহং অর্থাৎ আমিত্বের বিকাশ ঘটায়, তাই অধর্ম। তা এবার আমায় বলো তো, তুমিই নেত্র বন্ধ করে কটা ধার্মিককে দেখতে পাচ্ছ?”

দিব্যশ্রী নেত্রবন্ধ করে সামান্য সময়ের মধ্যে বলতে শুরু করলেন, “কোথায় ধার্মিক মা? ধার্মিক তো নেয়ই! … পিতামাতা সন্তানকে যতটা আমিত্বের বিকাশ করতে প্রেরণা দিচ্ছেন, ঠিক ততটাই প্রেরণা দিচ্ছে বিদ্যালয়। বিদ্যালয় যতটা অহং বৃদ্ধি করছে, সর্বক্ষণ বড় হয়ে কি হবে, বড় হয়ে কি হবে বলে বলে, সেই অহংকে যেন শান দিচ্ছে কলেজ, যেখানে আমিত্বকে বিশেষ আভুসনে ভূষিত করা হয়, যাতে সে নিজের আমিকে অন্যের আমির উপর স্থাপন করতে পারে।

কলেজ আমিত্বকে যেই অবস্থায় ছাড়ছে, কর্মক্ষেত্র ঠিক সেইস্থান থেকে আমিত্বকে বিস্তার করছে। আর সেখানে যতটা আমিত্ব বিস্তার পেতে পাচ্ছেনা, তাঁর পরিবার পরিজন সেই আমিত্বকে খোঁচা মেরে মেরে সেই আমিত্বকে ঘায়েল করে দিয়ে, পুনরায় আমিত্বের বিস্তার ঘটাচ্ছে। আর এটিই তো সকলের ক্ষেত্রে হচ্ছে। …

সর্বত্র কেবল প্রতিদ্বন্ধিতার নাম করে এই আমিত্বধারিদের প্রতিযোগিতায় মাতিয়ে, আমিত্বের বিকাশ ঘটাচ্ছে। আর সর্বক্ষণ সরাকরাদি সকলে যন্ত্রাদির নির্মাণ করে করে, নতুন নতুন ভাবে এই আমিত্বকে বিভূষিত করে তুলছে, যাতে এই আমিত্বই সর্বেসর্বা হয়ে বিরাজ করে! মা, এ তো সর্বত্র কেবলই অধর্মই অধর্ম!”

ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “চিন্তা করো না পুত্রী, আর ভুল করেও কারুকে দোষ দিওনা, কারণ এটিই ভৌতিক জগতের ধারা, এটিই তার প্রাকৃতিক ধারা। পুত্রী, গাছ থেকে পড়ে যাওয়া আমের স্বাভাবিক স্বভাবই হলো পচনের দিকে এগিয়ে যাওয়া, আর সেটিই সমাজে হচ্ছে। যখন অতিকায় হয়ে ওঠে এই পচনের নেশা, তখন কনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এসে, সমস্ত কিছুকে তছনছ করে দেয়, আর আবার সেই পচনের শুরু হয় নতুন করে।

পুত্রী, ভৌতিক সংসার অধর্মেরই আঁতুড়ঘর, তাই তাঁকে দোষারোপ করো না, এটিই তার স্বভাব। হ্যাঁ, এতে যদি কনো সত্যবিস্তারের কেন্দ্র থাকে, যাকে বলা হয় আত্মর অধ্যায়ন ক্ষেত্র, বা আধ্যাত্ম ক্ষেত্র, তবে এই পচনরোগের থেকে মুক্তির ঔষধ সমাজে উপস্থিত থাকে, যাতে যেই আত্ম মনে করবেন যে তিনি সেই পচনরোগের থেকে মুক্ত হবেন, তিনি সেই ওষুধ গ্রহণ করে মোক্ষকামী হয়ে, পচনের থেকে মুক্ত হতে পারেন।

পুত্রী, যদি সমগ্র ভারতের সাথে তুলনা করো এই বঙ্গদেশের, তাহলেই বুঝতে পারবে যে তুমি কতটা ভাগ্যবান, এই ভূমিতে জন্মগ্রহণ করে। যেখানে সারা ভারতবর্ষে, যদি বিহার ও বঙ্গকে বাদ দিয়ে দাও, তাহলে দেখবে, এক শঙ্কর, মিরা, আর কবির আছেন, যারা আধ্যাত্মিকতার বিস্তার করেছেন। আর সেখানে বিহারে রয়েছেন দুই প্রকাণ্ড আধ্যাত্মিক জাগরণের সেতু, গৌতমবুদ্ধ, এবং মহাবীর, আর বাংলায় রয়েছে একের পর এক আধ্যাত্মিক জাগরণের সেতু।

কপিল মুনি থেকে শুরু করে, গৌতমবুদ্ধের পূর্বের বৌদ্ধদের তন্ত্রবিস্তার হয়ে এই বাংলায়। সেই বাংলা একের পর এক ঈশ্বরকটিদের হস্তক্ষেপও লাভ করেছে, যেমন মার্কণ্ড, চৈতন্য মহাপ্রভু, সারদামা এবং রামকৃষ্ণ, আবার তেমনই অজস্র জীবকটিরাও সেই জাগরণকে বয়ে নিয়ে বেরিয়েছেন যেমন, বশিষ্ঠ, খনা, নিত্যানন্দ, রামপ্রসাদ, রামমোহন, রাশমনি, বিবেকানন্দ, আনন্দময়ী ইত্যাদিরা ।

কিন্তু এর পরেও দেখো, বঙ্গদেশ কিন্তু পচনমুক্ত নয়। কেন? কারণ এই পচনই যে স্বাভাবিক স্বভাব ভৌতিক জগতের। পুণ্যক্ষেত্রে এই পচন থেকে মুক্ত হবার ওষুধ বারবার দেওয়া হয়, কিন্তু বারবার পচনপ্রেমী ভৌতিক সমাজ সেই ওষুধকে বিনষ্ট করে দিয়ে, পুনরায় পচনকে কার্যত করে দেয়।

তাই পুত্রী, এই ধর্মাধর্মের মানদ্বারা তুমি একজন সাধককে কি ভাবে বিচার করবে? আর সত্য বলতে, এই সমস্ত ভেদাভেদের কনো অর্থই হয়না। আমরা যতক্ষণ সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকবো, ততক্ষণ কল্পনা করতেই থাকবো, আর ততক্ষণ আমরা আমিত্বের আরাধনাই করতে থাকবো। আর যেইক্ষণেই আমরা সত্যের অমৃতে স্নান করবো, সেই মুহূর্তেই, আমাদের থেকে এই আমিত্বের ভ্রম খসে পড়ে যাবে, আর সেই কর্ষণ থেকেই আমরা হয়ে উঠবো ন্যায়অন্যায়, ধর্মাধর্ম ইত্যাদি সমস্ত ভেদাভেদের থেকে মুক্ত।

তাই পুত্রী, এই সমস্ত ভেদাভেদের মধ্যে মাতামাতি থেকে নিজেও দূরে থাকো, আর তোমার সন্তানদেরও দূরে রাখো, আর সত্যের অমৃততে স্নান করো। পুত্রী, কৃতান্তিক হয়ে ওঠার পথে প্রথমে নির্বাচন সম্বন্ধে জেনেছিলে, অর্থাৎ কাকে কৃতান্তিক করে তোলার পথে অগ্রসর করবে, সেই বিষয়ে জেনেছিলে। আর তারপরে, তোমার নির্বাচিত পাত্রদেরকে কর্ষণ করাই তোমার লক্ষ্য ও কর্তব্য।

সেই কর্তব্য তখনই সমাপ্ত হবে, যখন তোমার সন্তানরা আর ইন্দ্রিয়দের দ্বারা দেখবেনা, শুনবেনা, গন্ধ নেবেনা, স্বাদ নেবেনা, এবং স্পর্শ অনুভব করবেনা। যখন তাঁরা এই সমস্ত কিছুকে বন্ধ করে, হৃদয় দ্বারা দেখবে, হৃদয় দ্বারা গন্ধ নেওয়া শুরু করবে, হৃদয় দ্বারা ধ্বনিকে শুনবে, হৃদয় দ্বারা আহারের স্বাদ নেবে, আর হৃদয় দ্বারা স্পর্শ অনুভবকে অনুভব করবে, তখনই তাঁরা ইন্দ্রিয়াতীত হয়ে উঠবে, আর তখনই তাঁদের কর্ষণপর্ব সমাপ্ত হবে।

পুত্রী, যিনি হৃদয় দ্বারা ইন্দ্রিয়দের কর্ম করেন, তাঁরই ক্ষেত্রে মন, বুদ্ধি, প্রাণ, উর্জ্জা, সকলকিছু হৃদয়দ্বারা পরিচালিত হয়, যেমন কৃতান্ততে দেখলে, মাতা সর্বাম্বার দ্বারা সমস্ত ভূত পরিচালিত হতে থাকে। আর তখনই ব্যক্তি অনুভব করেন যে, তিনি তো অনাথ নন, স্বয়ং জগদম্বা তাঁর জননী, তাহলে তাঁর যোজনা করার প্রয়োজন কি? তাহলে তাঁর চিন্তা, ইচ্ছা, কল্পনা করার প্রয়োজনই বা কি!

যদি তিনি অনাথ হতেন, তবে তাঁকেই যোজনা করতে হতো, কিন্তু যেকালে তিনি কখনোই অনাথ নন, সেকালে তাঁর এই যোজনা নির্মাণ চেষ্টাই বৃথা সময়ের অপচয় করা। স্বয়ং নিয়তি তাঁর সম্মুখে সমানেই যোজনাকে প্রস্তুত করছেন। হৃদয় দ্বারাই সেই পথকে অনুধাবন করা সম্ভব, পঞ্চভূত দ্বারা নয়। তাই, হৃদয়কে জাগ্রত করে, তা দ্বারা নিজের জননীর নির্মিত ও প্রদর্শিত যোজনাকে অনুধাবন করতে থাকতে হয়, আর সেই যোজনা অনুসারে চলতে হয়।

পুত্রী, যিনি হৃদয়ের এই গুহ্যরহস্যকে জেনে, নিজের হৃদয়কে জাগ্রত করে নিয়ে, সমস্ত ভূতদের সেই হৃদয়ের অধীনে স্থিত করে নিয়েছেন, সমস্ত ইন্দ্রিয়দের ছুটি দিয়ে, সেই কর্ম হৃদয়দ্বারাই করতে শুরু করে দিয়েছেন, তিনিই সত্যকে জানার উপযুক্ত অবস্থায় উন্নীত হয়েছেন। আর তাই, তোমার সন্তানরা যখন এই সমস্ত ভেদভাব থেকে মুক্ত হয়ে, হৃদয়কে জাগ্রত করে, যোজনার থেকে মুক্ত হয়ে, ইন্দ্রিয় ও ভূতদের সমস্ত কার্যভার হৃদয় দ্বারাই পালন করতে শুরু করবে, তখনই কর্ষণ পর্বের সমাপ্তি রচনা করে, তাঁকে সত্য ধারণ করানো শুরু করবে”।

দিব্যশ্রী প্রশ্ন করলেন, “মা, ধারণ পর্বে যাবার পূর্বে, আমাকে এই হৃদয় দ্বারা দেখার বিষয়ে একটু বিস্তারে বলো”।

ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “পুত্রী, তুমি দেখলে আমি তোমাকে কৃতান্ত প্রদান করছি। এটি কে দেখলো? তোমার ইন্দ্রিয়, তাই তো? … এবার বলো এঁর মধ্যে বুদ্ধিকে স্থাপন করে বলো, যে আমি এই কর্ম কেন করছি?”

দিব্যশ্রী বললেন, “মা, বুদ্ধি একটিই প্রশ্ন করো আর তা হলো কেন। অর্থাৎ এই যে ইন্দ্রিয় দেখলো তুমি কৃতান্ত প্রদান করছো, এটি কেন করছো, তা প্রশ্ন আসবে বুদ্ধির থেকে, আর তার উত্তর এই যে, তুমি তোমার স্রোতাদের উন্নত করতে প্রয়াসরত”।

ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “এবার এঁর উপর মনের প্রভাব বিস্তার হবে। তা হলে কেমন হবে, সেই সম্বন্ধে বলো এবার”।

দিব্যশ্রী বিনা বিচার করে বললেন, “মন এই কর্মের মধ্যে তোমার মানসিকতার সন্ধান করবে। আর এই মানসিকতা রূপে সে দেখবে তুমি পরোপকারী”।

ব্রহ্মসনাতন পুনরায় মৃদু হাস্যপ্রদান করকে বললেন, “এবার হৃদয় এর সঙ্গে যুক্ত হলো। হৃদয় কি করবে এখানে”।

দিব্যশ্রী আবারও বিনা বিচারে বললেন, “মা! … হৃদয় স্পষ্ট ভাবে জানে যে এক ভগবতীই ক্রিয়া করেন, অন্য কেউ কিচ্ছু করেন না, কেবলই কল্পনা করেন। অর্থাৎ এই কর্মও সাখ্যাত তিনিই করছেন। আর তিনি এই কৃতান্ত কেন প্রদান করছেন? কারণ তিনি সমস্ত স্রোতার হৃদয় জাগ্রত করে, তাঁদেরকে সত্যের অমৃতধারাতে স্নান করাতে চান।

আচ্ছা…! এই হলো সম্পূর্ণ দর্শন। অর্থাৎ কেবল ইন্দ্রিয় দ্বারা দেখা যে দেখাই নয়! … বুদ্ধি যুক্ত করে দেখলে, সেটি টুডি হয়ে যায় অর্থাৎ কেন তা দেখলাম যা দেখলাম, তা হলো টুডি। মন যুক্ত করে দেখলে, সেটি থ্রিডি হয়ে যায় অর্থাৎ কর্তার মানসিকতা কি প্রকাশ পেল, যা দেখলাম তার মধ্যে। আর অন্তে হৃদয় যুক্ত হয়ে গেলে, সেটি ফোরডি হয়ে যায় অর্থাৎ স্বয়ং নিয়তিই কর্তা, আর তিনি কেন সমস্ত কর্ম করলেন, তা দেখা।

এই হলো সম্পূর্ণ দর্শন। আর এমন সম্পূর্ণ দর্শন করিনা বলেই, আমরা তা দেখতে পাইনা, যা তুমি দেখে নাও। আর সত্য বলতে প্রথমে মন, বুদ্ধি সকলেই শায়িত হয়ে থাকে, কর্ম করতেই চায়না, আর সমস্ত কিছু অহংকার, চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনা নিজেদের সন্তান অর্থাৎ আবেগদের দ্বারা করিয়ে থাকে, আর আমাদেরকে বদ্ধ করে রাখে। আর এটিই কৃতান্ত একদম প্রথমে বলেছিল। পরে যখন হৃদয় সক্রিয় হতে থাকে সঙ্গীত, জ্ঞান, প্রেম ও ভক্তির মাধ্যমে, তখন পরমাত্মীয়তার বোধ দ্বারা বুদ্ধি ও মনকে জাগ্রত করে, আর তখনই আমরা কেন, মানসিকতা আর নিয়তির প্রভাবকে দেখতে শুরু করি, আর তা একসময়ে আমাদের সত্যের সম্মুখে দণ্ডায়মান করিয়েই দেয়।

এই হলো সম্পূর্ণ দর্শন, আর এই দর্শন, শ্রবণ, ঘ্রাণই তুমি গ্রহণ করতে বললে, অর্থাৎ সম্পূর্ণ দর্শন, সম্পূর্ণ ঘ্রাণ, সম্পূর্ণ স্পর্শ, সম্পূর্ণ স্বাদ, সম্পূর্ণ শ্রবণ। এবার পরিষ্কার হয়েছে মা, এই দর্শনের রহস্য। এবার আমাকে ধারণ করার কথা বলো”।  

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 29 30 31 32 33 34 35 36 37 38 39 40 41 42 43