কৃতান্তিকা

যেখানে কৃতান্ত সত্যকে সম্যক ভাবে ব্যক্ত করেছে, সেখানে আর কনো গ্রন্থের আবশ্যকতা কি ছিল, তা নিয়ে দ্বন্ধ থাকতেই পারে। তবে এখানে একটি কথা বলে রাখা আবশ্যক, সত্যের না তো ব্যাখ্যা সম্ভব আর না ব্যাখ্যার প্রয়োজন। সত্য প্রত্যক্ষ করার বস্তু, সত্য বিলীন হবার বস্তু, সত্য মোক্ষলাভের বস্তু। সত্য অসীম, তাই কনো ব্যাখ্যাই সত্যের সম্যক ব্যাখ্যা হতেই পারেনা। আর সত্য বলতে সত্যের ব্যাখ্যা দেওয়াও সম্ভব নয়।

বিচার করে দেখুন, যদি দক্ষ না থাকতো, তাহলে সতীর ভূমিকাও থাকতো না, আর সতীকে জানার অবস্থারও প্রজনন হতো না। একই ভাবে যদি তারকাসুর না থাকতো, যদি মহিষাসুর, রক্তবীজ, ধূম্রলোচন, শুম্ভনিশুম্ভ না থাকতো, তাহলে আদ্যাশক্তি মাতা পার্বতীর ব্যাখ্যা করার পরিস্থিতিই জন্ম নিতো না। তেমনই অসত্যই সত্যের ব্যাখ্যাকে প্রয়োজনীয় করে তোলে আর যেই সত্যের ব্যাখ্যা সম্ভবই নয়, সেই সত্যেরও ব্যাখ্যাকে সম্ভব করে তোলে।

কৃতান্তকেও এবার একটু বিচার করুন। ইচ্ছা, চিন্তা ও কল্পনার কারণেই সর্বাম্বার উদয় ও কীর্তি। সত্যই তো তাই। ব্রহ্ম যে নিশ্চল, অবিবর্তনিয়, নির্বিকার।  তাঁকে চলমান হতে না হলে, বিবর্তনিয় না হতে হলে, আর বিকারত্বের অধীনে না স্থিত হলে যে, তাঁর ব্যাখ্যা দেবার সুযোগও লাভ হয়না। তেমনই কল্পনা, চিন্তা ও ইচ্ছার কারণেই ব্রহ্মত্বের নিরবিকারত্বকে ত্যাগ করে ব্রহ্মময়ী সর্বাম্বা রূপে তাঁর আবির্ভাব। আর তাই কৃতান্ত ব্যক্ত করাও হলো সম্ভব।

কিন্তু কৃতান্তে অসত্যকেও অতিস্পষ্ট ভাবে দেখানো হয়েছে, এবং সেই অসত্যের নাশকেও অতি স্পষ্ট ভাবে, বিনা কনো রাখঢাক করে দেখানো হয়েছে। তাই সাধকদের অন্তিম গন্তব্য কৃতান্ত থেকে অতিস্পষ্ট হলেও, সেই গন্তব্য পর্যন্ত পৌঁছানর পথ তাঁদের জন্য সুগম নয়। অর্থাৎ মূল অসত্যের বা সমস্ত অসত্যের বিকাশ যার থেকে, তাঁর বিনাশের পূর্বে, অসত্যের যে বিস্তার করা জগত, তার বিনাশ সম্ভব হবে, তবেই না সেই গন্তব্য পৌছাতে পারবে সাধক।

স্পষ্ট ভাবে বলতে, শোণিতপুরের বিনাশ হবে, তবেই না স্কন্ধ তারকাসুরের কাছে পৌঁছাবে! কৃতান্ত সেই তারকাসুরকে দমন করার রহস্য বলে দিয়েছে, কিন্তু শোণিতপুরের নাশ করার রহস্যকে বলেনি। আর তা বলার জন্যই লিপিবদ্ধ হলো কৃতান্তিকা। কেন এমন দুই খণ্ডে রাখা হলো?

প্রায়শই, সম্যক কথাকে কাহানীর আকার বলতে গেলে, সাধকরা কাহিনীর মধ্যেই আসক্ত হয়ে পরেন, আর সেই আসক্তির ফলে, অন্তিম গন্তব্যকে ভেদ করার উপায়কেই সঠিক ভাবে ধারণ করতেই পারেন না। সেই কারণে, মূল গন্তব্যকে ভেদ করার সারকথাকে কৃতান্ত রূপে স্থাপিত করে দিয়ে, সেই গন্তব্য পর্যন্ত পৌছাতে না পারার কারণ আর সেই গন্তব্য পর্যন্ত পৌঁছানোর মার্গকে স্পষ্ট করে বলা হলো কৃতান্তিকাতে।

এই দুই গ্রন্থের একত্রিত কর্মসূচি, পাঠন, বিচার ও ধারণ এক সাধককে সাধকরূপে পরিবর্তিত হয়ে ওঠার পূর্ব অবস্থা থেকে উন্নত করে, সম্যক মোক্ষপর্যন্ত লাভ করাবার জন্য অঙ্গীকারবধ্য।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 29 30 31 32 33 34 35 36 37 38 39 40 41 42 43