সর্বশ্রী কাণ্ড (কৃতান্ত তৃতীয় কাণ্ড)

পূর্বেই বলেছিলাম, রীতির থেকে রীতির অন্তরে বিরাজমান দর্শন অধিক আবশ্যক ও প্রয়োজনীয়। তাই প্রথম জন্মের অভ্যন্তরে থাকা দর্শনকে প্রথম জেনে নাও। অর্থাৎ জন্ম কার হয়, জন্ম কেন হয়, জন্ম কি জন্য হয়, আর জন্ম কিভাবে হয়। এই চার অঙ্গ থাকে জন্মের দর্শন বা জন্মের বিজ্ঞানের মধ্যে। এখন আমি যা বলবো তোমাদের, তার দর্শন আমি করেছি ঠিকই, কিন্তু যার মার্গদর্শনে তা দর্শন করেছি, তিনি হলেন প্রভু ব্রহ্মসনাতন।

যদি কেবল আমার দর্শন হতো, তাহলে তোমরা স্বয়ং অবিশ্বাস করতে বা না করতে, তা আমি জানিনা, তবে আমি স্বয়ং তার উপর অবিশ্বাসই স্থাপন করতাম। কিন্তু যিনি তা দর্শন করেছেন, তিনি স্বয়ং ৯৬ কলা ব্রহ্মময়ীর অবতার, আর তাই যা কিছু তিনি দর্শন করেছেন, তা স্বয়ং জগন্মাতা তাঁকে দর্শন করিয়েছেন। বায়সী রূপে তাঁর থেকে যা জেনেছি, তাই এখন ব্যক্ত করবো। তাই এই কথনের উপর, এই দর্শনের উপর বিন্দুমাত্র সংশয় রেখো না, কারণ তা স্বয়ং ব্রহ্মময়ী জগদম্বার উপর সংশয় রাখা হয়ে যাবে।

জন্মের দর্শন ও মৃত্যুর দর্শন উভয়েই একে অপরের সাথে ঘনিষ্ঠ ভাবে সংযুক্ত কারণ, জীবন নামক গ্রন্থের অজস্র পাতার মধ্যে একটি পাতার প্রথম শব্দাক্ষর যদি জন্ম হয়, তাহলে সেই পাতারই অন্তিম শব্দাক্ষর হলো মৃত্যু। অর্থাৎ, ঠিক যেমন একটি গ্রন্থের একটি পৃষ্ঠার প্রথম শব্দাক্ষর এই নিশ্চিত বার্তা দেয় যে, সেই পৃষ্ঠায় একটি অন্তিম শব্দাক্ষর থাকবে, তেমনই জন্ম নিশ্চয় করে বলে দেয় যে মৃত্যু অবশ্যই থাকবে।

আর ঠিক যেমন সেই গ্রন্থের যেটি অন্তিম পৃষ্ঠা নয়, এমন একটি পৃষ্ঠার অন্তিম শব্দাক্ষর নিশ্চিত ভাবে বলে দেয় যে, আরো একটি পৃষ্ঠা থাকবেই, আর তাতে একটি না একটি প্রথম শব্দাক্ষর থাকবেই, তেমনই জীবনের অন্ত বা মোক্ষলাভ না হওয়া পর্যন্ত মৃত্যুর সাথে সাথে এইটি নিশ্চিত থাকে যে, আবার জন্ম হবে।

অর্থাৎ স্পষ্ট ভাবে বলতে গেলে, মোক্ষলাভ হওয়াতেই জীবনরূপ গ্রন্থের সমাপ্তি হয়, আর তার পূর্বক্ষণ পর্যন্ত জন্ম নিলে মৃত্যুও লাভ করতে হবে, আর মৃত্যু হলে জন্মও লাভ করতে হবে। এটিই এই ভৌতিক জগতের সর্বাধিক বড় সত্য। কিন্তু মজার কথা এই যে, এই জন্ম মৃত্যু বা জীবন স্বয়ং একটি ভ্রম, যার মধ্যে লেশ মাত্রও সত্যতা নেই।

প্রভু ব্রহ্মসনাতন এই ব্যাপারে কি বলতেন জানো! তিনি বলতেন সাহিত্যিকের রম্যরচনা হলো এই জীবন। সৃষ্ট হলে পড়তে বেশ মজা লাগে, সৃষ্ট হলে তাকে পাঠ করতে হয়, বিচার বিশ্লেষণ করতে হয়, ভাব সম্প্রসারণ করতে হয়, কিন্তু যদি না সৃষ্ট হতো, তাহলে কনো কিছুই এসে যেত না, হ্যাঁ কেবল পাঠকদের জন্য পাঠ্যপুস্তক থাকতো না, এই যা।

অর্থাৎ স্পষ্ট ভাষায় বলতে গেলে, যেমন এক সাহিত্যিকের সৃষ্ট রচনাতে কেবলই চেতনা প্রবাহ ব্যতীত আর কিছুই থাকেনা, তেমনই জীবন নামক সৃষ্ট রচনাতে যদি সত্য অর্থে কিছু থাকে, তা হলো চেতনা প্রবাহ। কার চেতনা? কিরূপ চেতনা? সত্যের অর্থাৎ ব্রহ্মের চেতনা ও আত্মের বা ভ্রমের অবচেতনা। যেমন এক সাহিত্য রচনার মধ্যে নায়ক ও খলনায়কের রসায়নই সেই গ্রন্থের, সেই রচনার থেকে গ্রহণযোগ্য শিক্ষা হয়, এবং এর বিশ্লেষণ থেকে জীবনের গুহ্য ভাব জানা যায়, তেমনই জীবন নামক এই সৃষ্ট রচনার খলনায়ক হলেন আত্ম, আর নায়ক! নায়ক নেই এতে, এতে আছে নায়িকা, যিনি হলেন ব্রহ্মময়ী।

আর তাই জীবন থেকে যা জানার, যা শেখার, যা বোঝার, যা উপলব্ধি ও অনুভব করার, তা হলো সত্য অর্থাৎ ব্রহ্ম এবং তাঁরই রূপান্তর, ব্রহ্মময়ী ও আত্মের রসায়ন। আর তাই এই দুইয়েরই চেতনা প্রবাহিত হয় জীবনের মধ্যে, আর তা-ই হলো জন্ম, মৃত্যু, বিবাহ, তথা সম্পূর্ণ জীবনের মূল কথা, যদিও ব্রহ্মেরই চেতনা হয়, আত্মের থেকে কেবলই অবচেতনা পরে থাকে। এছাড়া, ঠিক যেমন সাহিত্যিকের রচনার থেকে চেতনার প্রবাহকে অপসারিত করে দিলে, তাতে কনো সত্যই অবশিষ্ট থাকেনা, তেমনই জীবনের থেকে ব্রহ্মময়ী ও আত্মের চেতনা ও অবচেতনার প্রবাহকে অপসারিত করে দিলে, আর জীবনের মধ্যে সত্য বলতে কিচ্ছু নেই। (হেসে) অর্থাৎ সত্য ভাবে বলতে গেলে, জীবন স্বয়ং অসত্যই, কেবল তাঁর অন্তরে চলতে থাকা চেতনা ও অবচেতনা প্রবাহ ব্যতীত।

তাই ভুল করেও এই ভাব যেন কেউ না রাখে যে, জীবন সত্য, জন্ম সত্য, বিবাহ সত্য, বা মৃত্যু সত্য, বা পুনর্জন্ম সত্য। এগুলি একটিও সত্য নয়, তবে তারা সত্য না হয়েও সত্য হয়েই ততদিন থাকে যতদিন না গ্রন্থ সমাপ্ত হচ্ছে। অর্থাৎ এক পাঠকের কাছে সাহিত্যিকের রচিত গ্রন্থ যেমন ভাস্মর হয়ে থাকে ততদিন যতদিন না সেই গ্রন্থপাঠ সমাপ্ত হচ্ছে, অথচ সেই পাঠক স্পষ্ট ভাবেই জানেন যে, তিনি যা পাঠ করছেন, তা কেবলই গল্প, এর থেকে যেই শিক্ষা তিনি লাভ করবেন, তাই একমাত্র সত্য আর বাকি কিচ্ছু নয়, ঠিক তেমনই তোমাদের কাছে সেই গল্পের বই হওয়া উচিত জীবন।

জীবন একটি গল্পগ্রন্থ, যার অন্তঃরে কথিত গল্পসমূহ অর্থাৎ জন্ম থেকে মৃত্যুর কাহানী সত্য নয়, কেবলই গল্প তা, কিন্তু তার অন্তরে বিরাজমান শিক্ষা অবশ্যই গ্রহণ করার। তবে এখানে প্রশ্ন এসে যায় যে, সেই শিক্ষা আমাদের কাছে এমন আবশ্যক কেন হয়ে গেল যে, জীবন নামক এতো এতো পৃষ্ঠা যুক্ত অর্থাৎ এতো জন্মমৃত্যু যুক্ত গ্রন্থ আমাদের পাঠ করতে হচ্ছে? কিসের অভাব আমাদের মধ্যে? কেন সেই অভাবের রচনা হলো?

এই প্রশ্নের উত্তর রয়েছে সৃষ্টির শুরুতে। সৃষ্টির শুরুতে এমন কিছু হয়েছিল, যার কারণে এই অজ্ঞতার রচনা হয় আমাদের মধ্যে, আর সেই অজ্ঞতা দূর করার জন্যই এই শিক্ষা। আর সেই শুরুর কথা প্রভু ব্রহ্মসনাতন স্বয়ং বলে গেছেন কৃতান্তের প্রথম কাণ্ড অর্থাৎ সর্বাম্বা কাণ্ডে। তাই আমি সেখান থেকে উদ্ধৃতি না করে, সেখানের সার কথা তোমাদের বলছি এখন, মনোনিয়োগ করে শ্রবণ করো।

সৃষ্টি শুরু হবার পূর্বে কিচ্ছু বলতে কিচ্ছু ছিলনা। তবে এমন ভেবো না যে এখনও কিছু আছে। কারণ? কারণ এই কিচ্ছু না থাকাই হলো ব্রহ্মাণ্ডের এবং ব্রহ্মের সত্য। কিচ্ছু না থাকার অর্থই হলো অনন্ত শূন্যের অস্তিত্ব, আর শূন্য মানেই অনন্ত, অসীম, অব্যক্ততা, অচিন্ত্যতা, নিরাকারত্ব, নির্বিকারত্ব, আর তা-ই হলেন ব্রহ্ম। অর্থাৎ গন্ধশূন্য, আকারশূন্য, বিকারশূন্য, আবেগশূন্য, শব্দশূন্য অব্যক্ত অচিন্ত্য অনন্ত অসীম শূন্যই হলেন ব্রহ্ম।

অর্থাৎ এই যে কিচ্ছু ছিলনা বলা হচ্ছে, এই কিচ্ছু না থাকাই হলো ব্রহ্মের অস্তিত্ব আর এটিই সত্য। যেমন যা কিছু হয়ে যাক, সত্যের অস্তিত্ব কখনোই বিপন্ন হয়না, তেমনই আজও যদি কিছুর অস্তিত্ব বাস্তবে থেকে থাকে, তা হলো এই শূন্যের অস্তিত্ব, অর্থাৎ ব্রহ্ম। সেই কারণেই বললাম যে, এমনও ভেবো না যে আজও কিচ্ছু বলতে কিচ্ছু আছে।

বুঝতেই পারছো, বড়ই একাকী ব্রহ্ম, কারণ তিনি বাদে কনো কিছুর অস্তিত্ব সম্ভবও নয়, আর সেই অস্তিত্ব নেইও। ব্রহ্মের কনো আবেগ নেই, নির্বিকার তিনি। তাই তাঁর এই একাকীত্বের কারণে কনো আবেগের টানাপড়েন হয়নি, আর তা সম্ভবও নয়। তবে নির্বিকার হলেও, আবেগশূন্য হলেও, তাঁর অন্তরে ভাব বর্তমান। ভাবের কনো বিভাগ হয়না, আর তাই বৈষম্যও থাকেনা, আর তাই পরমশূন্যের মধ্যে যদি কিছু থাকে, তা হলো ভাব।

এই ভাবের কথা আগেও তোমাদের বলেছি আর এও বলেছি যে কতটা ভিন্ন এই ভাব আবেগের থেকে। যেখানে আবেগ সর্বদা বৈষম্যকামী, সেখানে ভাব সর্বদা সাম্যতাকামী, আর শূন্য মানেই সাম্যতা। তাই ব্রহ্মের মধ্যে যা সর্বদাবিরাজমান থাকে, তা হলো ভাব। আর এই ভাবের স্বভাব কখনই ‘আমি কি পেলাম’ তা হয়না, বরং সর্বদা ‘আমি কি দেব বা দিলাম’ এই থাকে।

আর এই একাকীত্বভাব থেকে ব্রহ্মের অন্তরে যা বিক্রিয়া হয়, তা হলো মাতৃত্বভাবের বিস্তার হয়, অর্থাৎ মাতৃত্ব সুখ প্রদান করার ব্যকুলতার বৃদ্ধি পেতে থাকে। আর সেই ব্যকুলতা যখন চরমে উন্নীত হয়, তখন ব্রহ্ম স্বয়ং ব্রহ্মময়ী হয়ে ওঠেন, সেই মাতৃত্বকে ধারণ করে করে। তবে এমন ভাবার কনো কারণ নেই যে, ব্রহ্ম ও ব্রহ্মময়ীর মধ্যে বিশাল কিছু ভেদ আছে।

যেমন ব্রহ্ম শূন্যকায়, যেমন ব্রহ্ম অচিন্ত্যম অব্যাক্ত, নিরাকার নির্বিকার, অনন্ত অসীম, ব্রহ্মময়ীও তাই, কিন্তু ভেদ না থেকেও ভেদ থেকে যায়, কারণ ব্রহ্ম আর সম্পূর্ণ ভাবে একক থাকেন না, ব্রহ্মময়ী ও মাতৃত্ব, এই দুই অংশতে তিনি বিভক্ত হয়ে যান, যদিও এই দুই অর্থাৎ ব্রহ্মময়ী ও মাতৃত্ব একে অপরের থেকে অবিচ্ছিন্ন। কিন্তু তাও ব্রহ্মের পূর্ণ শূন্যতা অক্ষুণ্ণ আর থাকেনা। অর্থাৎ ব্রহ্মের যেমন নাশ সম্ভনবই নয়, লয় সম্ভবই নয়, ব্রহ্মময়ীর লয় সম্ভব। আর তাঁর লয় কি ভাবে সম্ভব? যেদিন তাঁর মাতৃত্ব প্রদানের ভাব তৃপ্ত হয়ে উঠবে, সেদিনই তাঁর অস্তিত্ব পুনরায় ব্রহ্মে লীন হয় যাবে।

এমত অবস্থা থেকে, ব্রহ্ম ব্রহ্মময়ীর বেশে সম্মুখে এলেন নিজের পূর্ণ মাতৃত্বভাণ্ডার সহ। আর যেই ক্ষণে মাতৃত্ব ব্রহ্মের থেকে পৃথক হয়ে গিয়ে ব্রহ্মময়ীর উৎপত্তি হয়, সেই ক্ষণ থেকে ব্রহ্মময়ী এই মাতৃত্বের প্রতি লালায়িত থাকেন, আর তাঁর পূর্ণ হয়ে ওঠার পিছনে একটিই অভাব থাকে, আর তা হলো মাতৃত্ব সুখ প্রদান করা।

এই সেই অপূর্ণতা, যার থেকে সৃষ্টির শুরু। মাতৃত্ব আদানপ্রদানের অভাব, ব্রহ্মময়ীর মাতৃত্ব সুখ প্রদান করার ব্যকুলতা। আর সেই অভাবকে এবার ধারণ করা শুরু করলেন ব্রহ্মময়ী স্বয়ং। এই হলো সৃষ্টির আদি কারণ, আর এখান থেকেই সৃষ্টির শুরু। কিন্তু কি থাকবে সেই শুরুতে? ব্রহ্মময়ী ব্যতীত না তো কেউ ছিলেন, আর না কারুর থাকা সম্ভব। সেহেতু, ব্রহ্মময়ী নিজকে একে একে তিন রূপে প্রকাশিত করলেন, চেতনা অর্থাৎ মাতৃত্বের ধারক, প্রকৃতি অর্থাৎ মাতৃত্বের প্রকাশক, এবং নিয়তি অর্থাৎ মাতৃত্বের বিকাশক।

সহজ ভাবে বলতে গেলে, নিয়তি প্রকাশিত হলেন ব্রহ্মময়ীর থেকে, যিনি মাতৃত্বকে বিকাশ করেন ব্রহ্মময়ীর চিত্তথেকে; প্রকৃতি যিনি সেই মাতৃত্বকে প্রকাশ করেন, আর চেতনা যিনি সেই মাতৃত্বকে ধারণ করে, মাতৃত্বসুখকে উপভোগ করেন। যেখানেই বাসনা, সেখানেই আত্মের ভাব প্রকাশিত হতে বাধ্য, কারণ এই আমিত্বই তো বিচার করে যে কি পেলাম আর কি পেলাম না, কি দিলাম আর কি দিলাম না। কিন্তু ব্রহ্মময়ী সেই আত্মভাবকে কি করে রাখতে পারেন নিজের অন্তরে!

তাই সেই আত্মভাব প্রকাশিত তো হলো, কিন্তু তা ব্রহ্মময়রি মধ্যেই স্থিত হয়ে নিজকে এক ভিন্ন অস্তিত্ব জ্ঞান করতে থাকলো, যদিও সেই অস্তিত্বের আদি অন্ত আত্মের নিজেরই অজ্ঞাত। যেই ক্ষণে আত্ম প্রকাশিত হয়ে নিজেকে স্বতন্ত্র জ্ঞান করা শুরু করলো, সেই ক্ষণে সে প্রত্যক্ষ করলো যে, প্রকৃতির কাছে সে পরাধীন, কারণ প্রকৃতির মধ্যে দিয়েই সে প্রকাশিত হতে সক্ষম। এছাড়াও সে নিয়তির নিয়ন্ত্রণও অনুমান করে, কিন্তু নিয়তিকে ধারণা করার সামর্থ্যের অভাবে, সে নিয়তিকে অদৃষ্ট অর্থাৎ অদেখা শক্তি বা আদিপরাশক্তি বলেই চিহ্নিত করতে থাকলো।

পূর্ণপবিত্র ব্রহ্ম নিজের অন্তর থেকে যেই শ্লাঘার বিকাশ ঘটিয়েছিলেন, সেই শ্লাঘার কারণেই এই আত্ম বা আমিত্ব। তাই পূর্ণপবিত্রা ব্রহ্মময়ী সেই আত্মকে কনো ভাবেই স্বীকার করে নিলেন না, বিশেষ করে তখন থেকে তো তাকে আর স্বীকার করার প্রশ্নই এলো না, যখন থেকে আত্ম স্বতন্ত্রতা লাভের প্রয়াস করতে তৎপর হয়ে উঠলো। ব্রহ্মময়ীর আত্মের প্রতি এই বিরূপ ভাবের কারণে প্রকৃতি সম্যক ভাবে আত্মকে বেষ্টন করে নিতে শুরু করতে, ব্রহ্মময়ী ত্রিছায়ার নির্মাণ করলেন অর্থাৎ চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনার।

আর এই তিন ছায়া, আত্মকে প্রকৃতির কর্মধারার মধ্যে হস্তক্ষেপের অধিকার থেকে চিরতরে বঞ্চিত করে তোলে। তবে এই বঞ্চনার মধ্যেও, আত্ম নিজেকে শ্রেষ্ঠ জ্ঞান করা বন্ধ করলো না, আর তাই এই চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনা, অর্থাৎ, ছায়াদের দ্বারা মাতা যখন আত্মকে বিচ্ছিন্ন করে দেন, তখন আত্ম এই তিন ছায়াকে নিজের ঘরণী করে গ্রহণ করে নিয়ে প্রবল শক্তিধর হয়ে উঠলেন, কারণ ব্রহ্মময়ীর তিন সামর্থ্যকে সে নিজের সাথে সংযুক্ত করে নেয়।

অন্যদিকে যখন আত্ম ছায়াদের সাথে সঙ্গমক্রীড়াতে আবদ্ধ, তখন ব্রহ্মময়ী মাতৃত্বভাব নিজের চেতনার দিকে নজর দিলে, সেই চেতনা নিজেকে ত্রিভাগে বিভক্ত করে নেন। এঁদের প্রথম ভাগ হলেন মহাভাব অর্থাৎ বিচার, বিবেক ও বৈরাগ্য। এবং মাতা ব্রহ্মময়ী চেতনার এই ত্রিগুণকে সুপ্ত করে রেখে দিলেন, যাতে আত্ম এঁদের সন্ধান না পায়। এরপরের খণ্ড হলো পঞ্চভাব, অর্থাৎ জিজ্ঞাসা, বিশ্বাস, স্নেহ, মমতা ও সমর্পণ, যাদের থেকে জ্ঞান, ভক্তি, নিষ্ঠা, শ্রদ্ধা, সমস্ত কিছু জন্ম নিতে সক্ষম, আর মাতা ব্রহ্মময়ী এঁদেরকে চেতনার ত্রিগুণ অর্থাৎ মহাভাবদের বীর্যের অন্তরে সমাহিত করে দিলেন, যাতে এঁদের সন্ধান বা এঁদের জ্ঞানও আত্মের কাছে অনুপস্থিত থাকে।

আর তৃতীয় খণ্ড, পঞ্চভূতকে সম্মুখে রেখে দিলেন মাতা, তবে একটি বিচিত্র উপায়ে, যাতে একত্রে পঞ্চভূতকে আত্ম কখনোই সম্মুখে না লাভ করে। অর্থাৎ মন বা আকাশতত্ত্ব এবং ধরা বা ধরিত্রী বা মৃত্তিকাতত্ত্বকে তিনি প্রত্যক্ষ করে রাখলেন, আর বাকি তিন ভূতকে তিনি মনের বীর্যে এবং ধরার ডিম্বে সুপ্ত করে রাখলেন, যাতে মানস ও ধরার সঙ্গম থেকে সেই ত্রিভূত প্রকাশিত হয়, এবং সেই ত্রিভূত চেতনাকে ধারণ করে মহাভাবদের জাগ্রত করে, তাঁদের সাথে সঙ্গমে লিপ্ত হয়ে পঞ্চভাবকে ভূমিষ্ঠ করে চেতনাকে সুসম্পন্ন করে, প্রকৃতি ও নিয়তিকে ধারণ করে, পূর্ণ ভাবে ব্রহ্মাণ্ডের সত্য জেনে, মাতৃত্ব লাভ করে, যাত্রা সমাপ্ত করে।

কিন্তু আত্ম থাকতে, সমস্ত কিছু এতো সহজ ভাবে কি করে হতে পারে! … বাঁধ সারলেন আত্ম, আর সে ধরাকে অর্থাৎ মৃত্তিকা তত্ত্বকে মনের থেকে ছিনিয়ে নিতে সচেষ্ট হলেন। এই কৃত্য আত্মের পক্ষেও করা সহজ হলো না, কারণ মন ও ধরার ইতিমধ্যে সঙ্গম হয়ে তাঁদের থেকে দুই ভূত অগ্নি ও বায়ুর জন্ম হয়ে গেছে। তবে এঁর পরেও, মনের ছদ্মবেশ ধারণ করে আত্ম ধরার সাথে সঙ্গমে লিপ্ত হয়ে হয়ে, সহস্র আবেগদের জন্ম দিয়ে, সেই আবেগদের চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনার থেকে লব্ধ সন্তান, অর্থাৎ সত্ত্ব, রজ ও তমের নিয়ন্ত্রণে স্থাপিত করে, যেই বিশেষ ভূতদ্বারা চেতনার জাগরণ সম্ভব হতো, সেই মেধা বা জলতত্ত্বকে জন্ম নেওয়া থেকেই অবরোধ প্রদান করে দেয় আত্ম।

ধরার সাথে করা ছলকে মন যখন উপলব্ধি করে, তখন সে ধরাকে উদ্ধার করতে আগ্রহী হলে, এবার আত্ম বেশ বুঝে যায় যে, মনের সাথে ধরার আর সঙ্গম করতে দেওয়া যাবেনা, কারণ তা করতে দিলে চেতনার জাগরণ হয়ে যাবে, আর চেতনার জাগরণ হয়ে গেলে, প্রকৃতি ও নিয়তি প্রত্যক্ষ হয়ে উঠবে, আর একবার তারা প্রত্যক্ষ হয়ে উঠলে, সাখ্যাত ব্রহ্মময়ী সমস্ত কিছুর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিলে, আর আত্মের পক্ষে নিজেকে স্থাপন করা সম্ভব হবেনা।

চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনা, এই তিন ছায়াবল আত্মের সঙ্গে, তাই মহাশক্তিশালী আত্ম এবার এই তিন ছায়ার বলে, ধরাকে সহস্র লক্ষ কোটি খণ্ডে বিভাজিত করে দিয়ে, মনকে বিচলিত করে তোলে কারণ মন দ্বন্ধে পতিত হয়ে যায় যে কোন ধরা তাঁর পত্নী।

প্রতিটি ধরার কাছে গিয়েই মন দেখে যে সেই ধরাকেই নিজের পত্নী জ্ঞান হচ্ছে। তাই অবশেষে মন বা আকাশও নিজেকে ততগুলি খণ্ডে বিভাজিত করলেন, যতগুলি খণ্ডে ধরা বিভাজিত হয়েছিলেন, আর প্রতিটি ধরার সাথে মিলিত হতে সচেষ্ট হলেন। মনের এই কীর্তির কারণে চেতনাকেও ততগুলি খণ্ডে বিভাজিত হতে হয়, যতগুলি খণ্ডে মন বিভাজিত হয়, কারণ চেতনার বিস্তার তো মনের বীর্যগুণের মধ্যে সমাহিত ছিল।

আর অন্যদিকে ধরার উপর মন অধিকার স্থাপন করে নিলে চেতনার জাগরণ হয়ে যাবে, তাই আত্মও নিজেকে সহস্র খণ্ডে স্থাপিত করে, নিজকে পরমাত্ম রূপে স্থাপিত করে, সমস্ত ধরা ও মনের সাথে আত্ম বেশে স্থাপিত হলেন। আর এই ভাবে, সমস্ত কিছুই সহস্র সহস্র খণ্ডে বিভাজিত হয়ে গেল, যার সমস্তটাই একটি কল্পনা মাত্র, অর্থাৎ বাস্তবে কনো বিভাজনও হয়নি, আর কনো বিস্তারও হয়নি।

প্রভু ব্রহ্মসনাতন এই ব্যাপারে বলতেন কি জানো? তিনি বলতেন ঠিক যেমন এক সাহিত্যিক, নিজের গল্পের রচনা করার জন্য, নিজেকে সহস্র চরিত্রের মধ্যে বিচ্ছিন্ন করে নেন, এও ঠিক তেমন। এখানে রচয়িতা হলেন স্বয়ং ব্রহ্মময়ী, এবং তাঁর দ্বারা নির্মিত হয় সমস্ত চরিত্র। তবে কি জানো তো? এই প্রতিটি চরিত্র মায়ের নির্মিত চরিত্র নয়, প্রতিটি চরিত্র একটি একটি করে গল্প, যার মধ্যে নায়িকা হলেন স্বয়ং চেতনা, এবং খলনায়ক হলেন আত্ম।

এই প্রতিটি গল্প কি জানো? একটি একটি জীবন। আর এই প্রতিটি জীবনের উদ্দেশ্য কি? কখন জীবন সফল? যখন সে ব্রহ্মময়ীর মাতৃত্ব সেবন করে, তাঁতে চিরতরে বিলীন হয়ে যান প্রবল প্রেম ধারণ করে। এই প্রেম ধারণ করার, এই মাতৃত্ব সেবন করার মধ্যে বাঁধা কি? আত্ম ও আত্মের ত্রিছায়ার দ্বারা নির্মিত সহস্র ভ্রম, আত্মের পুত্ররা অর্থাৎ ত্রিগুণ, এবং অজস্র আবেগ।

সমস্ত আবেগ ও ত্রিগুণকে এড়িয়ে, যখন একটি মন ও ধরা মিলিত হয়ে, মেধার জন্ম দিতে সক্ষম হয়, তখন এই মেধা মহাভাব অর্থাৎ বিচার, বিবেক ও বৈরাগ্যকে সুপ্ত থেকে প্রকাশ্যে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়, আর এই মহাভাব ও মেধা, অগ্নি ও বায়ু মিলে পঞ্চভাবদের জন্ম দিয়ে পূর্ণচেতনাকে জাগ্রত করে, আর তখনই মাতৃত্ব সেবন সম্ভব হয়, কারণ তখনই পূর্ণ ভাবে প্রকৃতি ও নিয়তির সাখ্যাত লাভ করে আত্মকে পরাস্ত করে, প্রেম লাভ করা যায়।

অর্থাৎ তখনই এই জীবন সম্পন্ন হয়, যখন এই মাতৃত্ব লাভ হয়, অর্থাৎ কৃতান্ত লাভ করে কৃতান্তিক হওয়া যায়। আর যতক্ষণ না তা সম্পন্ন হচ্ছে, ততক্ষণ ভিন্ন ভিন্ন দেহে জন্ম নিতে হয়, এবং বারে বারে মরতে হয়। কেন এই ভিন্ন ভিন্ন দেহ? এইটির কথা প্রভু ব্রহ্মসনাতন কৃতান্তিকাতে সম্পূর্ণ ভাবে ব্যখ্যা করেছেন। সেই কথা তোমাদেরকে বলছি। বড় বিচিত্র আর আনন্দদায়ক এবং হৃদয়বিদারকও সেই কথা।

একদম শুরুর দিকে, যখন ধরা, বা মন বা আত্মের বিভাজন হয়নি, যখন আত্ম নিজের হীন ভাব প্রকাশিত করেনি, তখন পরাচেতনা সেই মাতৃত্বসুখ লাভ করে পরমানন্দ ভোগ করতে সবে শুরু করেছিলেন। ঠিক সেই কালেই আত্ম নিজের অধিকার বিস্তারের প্রয়াস করতে, ব্রহ্মময়ী মাতা চেতনাকে সুপ্ত করে দিলেন আর চেতনা তখন থেকে সেই মাতৃত্বসুখ বা সেই পরমানন্দ ভোগ করতে প্রগল হয়ে ওঠেন।

ক্রমশ, ধরার, মনের এবং আত্মের বিভাজন হয়, আর চেতনা প্রতিমুহূর্তে আরো আরো সুপ্ত হতে থাকে, কিন্তু তাঁর পরমানন্দ ভোগের ব্যকুলতা কম তো হয়ই না, উপরন্তু তা বৃদ্ধি পেতেই থাকে সমানে। সেই পরমানন্দ ভোগের স্পৃহাতেই আত্ম বা মন বা ধরা সকলে চালিত। তবে সেই পরমানন্দের উৎস সম্বন্ধে না মনের ধারণা থাকে, না আত্মের আর না ধরার।

তাঁদের কাছে তখন এই কল্পব্রহ্মাণ্ড, বা এই ভৌতিক জগতই একমাত্র সত্য। তাই এই ভৌতিক জগতের বিভিন্ন  অবস্থাতে সেই জীবন স্থাপিত হয়ে হয়ে সেই পরমানন্দের সন্ধান করতে থাকে। কখনো নেশার দ্রব্যে, তো কখনো দেহসঙ্গমের সুখের মধ্যে সেই সন্ধান করে; কখনো দেহের জন্মদাতা বা জন্মদাত্রীর কাছে, আবার কখনো মিত্রের কাছে, তো কখনো ভ্রাতা বা ভগিনীর কাছে, আবার কখনো সঙ্গমসুখ প্রদায়িনী পুরুষ বা স্ত্রীর কাছে সেই সুখ সন্ধান করতে থাকে। একটি দেহে সমস্ত সন্ধান সমাপ্ত হয়না। তাই যেই সম্বন্ধের মধ্যে, যেই দ্রব্যের মধ্যে সন্ধান সমাপ্ত হয়নি সেই পরমানন্দের, তা সন্ধান করার জন্যই সে বারংবার নূতন নূতন দেহ ধারণ করে।

ক্রমশ তাঁর ধারণাও পরিবর্তিত হতে থাকে সেই প্রেমলাভের। সে সম্বন্ধে বা বাস্তু দ্রব্যের থেকে সেই প্রেম লাভ সম্পন্ন হবেনা এমন জ্ঞান করে, পরিবার পালটে পালটে সেই পরমসুখের সন্ধান করে, সমাজ বা জাতি পরিবর্তন করে করে সেই সুখের সন্ধান করতে থাকে, আবার যোনি ও দেশ পরিবর্তন করে করেও সেই সুখের সন্ধান করতে থাকে।

অবশেষে যখন সেই সমস্ত কিছুর থেকেও সে সেই পরমসুখ লাভ করেনা, তখন সে সেই সুখের উৎস রূপে সমস্ত বস্তু, সমস্ত দ্রব্য যার উপর দাঁড়িয়ে থাকে, সেই ধন বা সম্পদকে বা ক্ষমতাকে উৎস মনে করলে, সেই সমস্ত ধন, সম্পদ ও ক্ষমতা ধারণ করার জন্যও সহস্র দেহ ধারণ করতেই থাকে।

অবশেষে যখন এই সমস্ত প্রয়াসও ব্যর্থ হয়ে যায়, তখন সে সেই সুখকে অধিক সঠিক ভাবে জানতে আগ্রহী হয়, যাতে করে সেই সুখের উৎসের সন্ধান করতে সক্ষম হয়। আর তাই সে বিভিন্ন বিদ্যার গভীর পর্যন্ত, বিভিন্ন কলার গভীর পর্যন্ত সন্ধান করা শুরু করে, আর এমন করতে করতে একসময়ে সে অন্তর্মুখী হয়ে গেলে, ধ্যানে আত্মের সন্ধান পায়। কিছুদিন বা কিছু জন্ম মনে করে যে সেই আত্মকে ধারণ করতে পারলেই পরমসুখ।

কিন্তু যখন তাও সম্ভব হয়না, তখন আরো গহনে প্রবেশ করে, পরমশূন্যের সন্ধান লাভ করে সমাধির কালে, আর তৎপশ্চাতে প্রগলের ন্যায় ব্রহ্মময়ীর কোলের উদ্দেশ্যে ছুটতে ছুটতে, একসময়ে মহানির্বাণ লাভ করে, স্বয়ং মায়ের সাথে একাকার হয়ে গিয়ে মোক্ষ লাভ করে, এই ভ্রম বা কল্পনা, অর্থাৎ জীবনের থেকে চিরতরে মুক্ত হয়ে যায়।

প্রভু ব্রহ্মসনাতন এই ব্যাপারে বলতেন যে সকলেই একই ভাবে সেই পরমসুখের সন্ধানই করে ফিরছেন। কেউ ধনলাভেই সেই পরমসুখ লাভ, এই ধারণা রাখছে, তো কেউ সেই সুখেরই সন্ধান সম্পদে বা ক্ষমতায় করছে। কেউ দেহের জন্মদাতাদের থেকে সেই সুখের আশা করছে, তো কেউ দেহসঙ্গমসুখ প্রদায়িনীর থেকে, আবার কেউ সন্তানের থেকে। কেউ কনো এক নেশার দ্রব্য সেবন করে সেই সুখের সন্ধান করছে তো কেউ অন্য এক নেশার দ্রব্য থেকে। কেউ কনো এক বিষয়ের থেকে সেই সুখ লাভের ইচ্ছা রাখছে, তো কেউ সমস্ত বিষয় আত্মসাৎ করে নিচ্ছে সেই সুখ লাভের জন্য। কিন্তু সন্ধান সকলে সেই পরমসুখেরই করছে, আর সেই পরম সুখের সন্ধান করাই এই জীবননামক অসংখ্য কল্পলহরিমার একমাত্র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।

জন্ম হলো এই জীবনের একটি নূতন অনুসন্ধান পর্ব, পূর্বের সমস্ত পরমসুখের সন্ধানে ব্যর্থতাই, এক নূতন জন্মের প্রধান ইঙ্গিত। পূর্বের জন্মে পরমসুখের সন্ধান সম্ভব হয়নি বলেই নূতন জন্ম। আর তাই রীতি এমন হওয়া উচিত যাতে করে, সেই নবজাতকের পিতামাতা তথা সকল আত্মীয়দের কাছে এটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে সেই নবজাতকের জন্মের উদ্দেশ্য হলো অসম্পূর্ণ পরমসুখের সন্ধানকে সম্পূর্ণ করা।

আর মৃত্যু হলো জীবনের একটি পরমসুখ সন্ধান পর্ব, হয় সম্পূর্ণ হয়ে নয় অসম্পূর্ণ হয়ে সমাপ্ত হওয়ার ইঙ্গিত। আর তাই শ্রাধ্যের রীতি এমন হওয়া উচিত যাতে এক মৃত ব্যক্তির পরিবারের সদস্যরা এই সমাপ্ত বা অসমাপ্ত পরমসুখের সন্ধানকে উপলব্ধি করে, এবং নিজেদের জীবনের পরমসুখ সন্ধানে অনুপ্রাণিত হয়।

এই হলো রীতির অন্তরালে থাকা দর্শন, আর তাই এবার সেই দর্শনের ধারণা রেখে, এবার আমরা সেই রীতির নির্মাণ করবো।

প্রথমে জন্মের রীতি নির্মাণ, আর সেই ক্ষেত্রে, আমার তোমাদের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন এই যে, এই রীতি কার উদ্দেশ্যে নির্মিত? শিশুর উদ্দেশ্যে?”

রোজ উত্তর দিলেন, “শিশুর তো তখন কনো বোধ উদিতই হয়নি। তাই শিশুর উদ্দেশ্যে সেই রীতি কি করে হতে পারে? অবশ্যই শিশুর অবিভাবকের উদ্দেশ্যে হবে এই রীতি, যা অবিভাবককে স্পষ্ট করে বলে দেবে, বা শিক্ষা প্রদান করবে যে, কিভাবে শিশুর লালন পালন করা আবশ্যক”।

বিজয়া বললেন, “সঠিক কথা বলেছে রোজ। আমি আমার মা’কে দেখেছি, পং রাজ্যের গর্ভবতী স্ত্রীদের একত্রিত করে তিনি কেমন করে সন্তান লালন করতে হয়, তা শেখাতেন। আমি আর দিদি তাঁকে প্রশ্ন করাতে তিনি বলতেন, মাতা সর্বশ্রীর থেকে তিনি শিখেছেন সমস্ত কিছু। আর বলতেন যে, সন্তানকে জননী স্নেহ করবেন, সেটি তো স্বভাবিক, কিন্তু স্নেহ করার কালে তিনি আসক্ত না হয়ে যান, সন্তানের স্বাভাবিক বিকাশকে অবরুদ্ধ না করে দেন, বা সন্তানকে নিয়তির থেকে বিচ্ছিন্ন না করে দেন, তাই জন্য তাঁদেরকে মার্গদর্শন করা আবশ্যক”।

জয়া বললেন, “হ্যাঁ, কাকিমা এই ক্ষেত্রে আরো বলতেন যে, এই কর্ম এক গুরুর, এক আচার্যের। কিন্তু পংরাজ্যে রাজাই সমস্ত কিছু, রাজপরিবারই সমস্ত কিছু। তাই রাজপরিবারের কর্তব্যের মধ্যে পরে, প্রজাকে এই শিক্ষা দেওয়া, কারণ রাজা যে কেবল রাজপুত্র বা রাজকন্যার জনকজননী নন, তাঁরা যে সমস্ত প্রজার জনকজননী”।

মীনাক্ষী হেসে বললেন, “সেই কারণেই তো তাঁরা এই জবম্বুদেশের অধীশ্বর ছিলেন। মহান এই জম্বুদেশ, তাঁর পালকপালিকা কি ভাবে সাধারণ কেউ হতে পারে! … অতি উত্তম বিচার। আর হ্যাঁ, এই বিচারেই আমাদের জন্মের রীতি স্থাপিত হওয়া আবশ্যক। অর্থাৎ এই রীতি সদ্যজাতের অবিভাবকের মার্গদর্শন করবে। … আসলে হতে পারে, যেই চেতনা আজ আমরা ধারণ করে রয়েছি, তা আজ থেকে শতশত বর্ষ পরে, বা হাজার বর্ষ পরে, কৃতান্তিক অনুগামীরা ভুলে যাবেন। কিন্তু এই রীতি তাঁদেরকে তা ভুলতে দেবেনা, আর তাঁদের চেতনাকে জাগ্রত করতেই থাকবে”।

অরিত্রা এবার বললেন, “মীনাক্ষীদি, এক শিশুর প্রকৃত মার্গদর্শক যে স্বয়ং প্রকৃতি। তাই অবিভাবককে প্রকৃতির কাছে সমর্পণ করানোই শ্রেয় হবে, তাই না!”

মীনাক্ষী হেসে বললেন, “অতিব সঠিক কথা বলেছে অরিত্রা। মহামাতৃকা হলেন পরাপ্রকৃতির চেতনাময় প্রকাশ। তাই হয় কৃতান্ত কথন অনুসারে তাঁর পট অঙ্কন করে, নয় তাঁর বিশাল মূর্তি নির্মাণ করে, তাঁর আরাধনা করা আবশ্যক। সকলের আর্থিক অবস্থা এক হয়না। তাই একই বিধান সকলের জন্য দেওয়া অনুচিত। রাজারাজরা বা রাজপরিবার যেখানে মাতা মহামাতৃকার বিশাল মূর্তি নির্মাণ করবেন, সেখানে সাধারণ মানুষ তাঁর পট অঙ্কন করবেন।

তবে স্মরণ রাখা আবশ্যক যে মাতার মূর্তি কখনো সামান্য মানবীয় উচ্চতার মূর্তি হতে পারেনা। তিনি অসীম ও অনন্ত, কিন্তু কনো সাকার মূর্তিই অসীম বা অনন্ত হতে পারেনা, কিন্তু যা হতে পারে তা হলো বিশাল। বিশালাকার মূর্তি তাই আবশ্যক মাতার সকল রূপের জন্য। অর্থাৎ হয় পট অঙ্কন করে আরাধনা করো, নয় বিশালাকার মূর্তি নির্মাণ করো। মূর্তি সুন্দর করার জন্য কুম্ভকার ব্যবহার করা যেতেই পারে, কিন্তু মূর্তিকে বিসর্জন দেবার কালে, অর্থের দ্বারা কারুকে দিয়ে মাতার মূর্তি স্কন্ধে ধারণ করানোর অর্থ মাতাকে অপমান করা।

তখন উদ্যোক্তারা স্বয়ং নিজেদের স্কন্ধে মাতার মূর্তি বহন করবেন। আর যদি তা না পারেন, তাহলে পট অঙ্কন করে পূজা করবেন।

পূর্বেও এমন কীর্তি আকচার দেখা যেত যে, কেবলই অর্থবল আছে বলে, মাতার মূর্তি নির্মাণ করে, অর্থের বলে কারুকে দিয়ে মাতার মূর্তি বিসর্জনের জন্য নিয়ে যেতেন এবং বিসর্জন দিতেন কিছু অধর্মী। হ্যাঁ অধর্মীই তাঁরা। যারা যারা মাকে মা জ্ঞান না করে কেবলই আড়ম্বরের বিষয় জ্ঞান করেন, তারা অধর্মী ব্যতীত কিছুই নন”।

ভূমি বললেন, “কিন্তু দিদি, শিশুর জন্ম তো নিতান্তই ঘরোয়া অনুষ্ঠান। সেখানে এতো লোকবল কি করে থাকবে যে এমন বিশালাকার মূর্তি স্কন্ধে ধারণ করবেন! তাই পটপূজা করাই শ্রেয় হবে, তাই না!”

মীনাক্ষী হেসে বললেন, “রাজপুত্র বা রাজকন্যা একাকী রাজার ও রানীর সন্তান হন না, তাঁরা সমস্ত প্রজার সন্তান হন। সমস্ত প্রজা তাঁদের জন্মের দিকে তাকিয়ে থাকেন, সমস্ত প্রজা তাঁদের জন্মের উৎসব পালন করেন, কারণ তাঁরাই যে তাঁদের ভাবি পিতামাতা। এককথাতে রাজপুত্র বা রাজকন্যার জন্মোৎসব প্রজার কাছে নিজেদের পিতামাতার জন্মোৎসব সমান হয়। তাই সেইক্ষেত্রে বিশালাকার মূর্তি নির্মাণ করা যেতেই পারে। কিন্তু মূর্তি অবশ্যই বিশালাকায় হতে হবে, তবেই সেই মূর্তি অনন্তার অনন্ততাকে বিবৃত করতে সক্ষম”।

এতাবৎ সকলে তৃপ্ত হলে, মীনাক্ষী রীতির কথা আরাও বলতে বললেন, “প্রথমেই যেই কৃতান্তিক মাতার মূর্তির বা পটের আরাধনা করবেন, তাঁর কর্তব্য হবে মাতার বিবরণ প্রদান করা। কৃতান্ত থেকে মাতা মহামাতৃকার বিবরণ উদ্ধৃতি করতে পারেন তিনি, তবে তিনি যদি স্থির করেন যে, তেমন করবেন না, নিজের মত করে বিবৃত করবেন নিজের মাতাকে, তা করতে তিনি অবশ্যই স্বতন্ত্র। তবে যা করতে তিনি বাধ্য, তা হলো এই যে, শিশুর অবিভাবক ও জমায়েত হওয়া সকল আত্মীয়স্বজনকে এই ব্যখ্যা করা যে যেই মূর্তি বা পটের আরাধনা করা হচ্ছে, তা মাতার এক চিহ্ন মাত্র, মাতা নন।

মাতা যে অনন্তা, অসীমা, অব্যাক্ত, অচিন্ত্যা, নিরাকার, এবং সমস্ত কিছু তাঁরই প্রকাশ, তা ব্যখ্যা করা আবশ্যক। এক কৃতান্তিক কনো স্থানে উপস্থিত থাকতে, এবং তাঁকে পূর্ণ স্বতন্ত্রতা প্রদান করে কিছু ব্যক্ত করার অনুমতি প্রদত্ত থাকলে, অবশ্যই এক কৃতান্তিকের কর্তব্য হলো উপস্থিত সকল মানুষের মধ্যের অজ্ঞানতার অন্ধকারকে দূর করা। তাই তিনি যখন ব্যখ্যা করতে স্বতন্ত্র, তখন যেন কারুর মধ্যে এই ধারণা না জন্ম নেয় যে, সেই মূর্তিই, সেই পটই মাতা। সকলের যেন এই ধারণা জন্ম নেয় যে, সেই পট বা সেই মূর্তি মাতার এক প্রকাশ মাত্র, এবং তিনি স্বয়ং নিরাকারা, অনন্তা, অসীমা।

মূর্তি বা পট নির্মাণ যদি মহামাতৃকা পূজার প্রথম চরণ হয়, তাহলে সেই পূজার দ্বিতীয় চরণ হলো সেই পট ও মূর্তির প্রাণ প্রতিষ্ঠা। আর সেই প্রাণপ্রতিষ্ঠা করার উপায়ই হলো, মাতার বাস্তবিক স্বরূপের ব্যাখ্যা উপস্থিত সকলকে ব্যক্ত করে, সেই মাতারই চিহ্নস্বরূপ স্থাপিত পট ও মূর্তির প্রতি ধ্যান কেন্দ্রীভূত করাতে। যার যার হৃদয়ে মাতার বাস্তবিক স্বরূপ অঙ্কিত হয়ে, তাঁর চেতনা পট বা মূর্তিকে মাতাকে ধারণ করার মাধ্যম রূপে গণ্য করবে, তাঁর কাছেই সেই মূর্তি বা পট জীবন্ত হয়ে উঠবে। বাকি সকলের কাছে তা একটি পট বা মূর্তি হয়েই থেকে যাবে। আর এই জীবন্ত হয়ে ওঠার পদ্ধতিকেই বলা হয় প্রাণপ্রতিষ্ঠা।

একবার প্রাণপ্রতিষ্ঠা হয়ে গেলে, এবার শিশুর জন্মরীতি পালনের মূল চরণে উপস্থিত হবার সময়। প্রতিটি শিশুর একটিই উদ্দেশ্য, পরমসুখ লাভ করা আর তার সন্ধান করা। কিন্তু তার পূর্বে, তাঁকে এই ভ্রমজগতে সঠিক ভাবে স্থাপিত হতে হয়। স্মরণ রাখা আবশ্যক যে, এটি ভ্রমজগত, আর তাই এই জগতে কেউই স্বাভাবিক ভাবে সুরক্ষিত নন। অর্থাৎ স্বভাবিক ভাবে এই জগতে কেউই আহার করে, নিবাস করে কালযাপন করতে সক্ষম নন।

যদি এই জগত বাস্তবিক হতো, তাহলে সকলে সহসাই আহার লাভ করতো, পরিশ্রম করে কারুকে শিকারাদি কর্ম করতে হতো না। কিন্তু এই জগত একটি ভ্রমজগত, আর তাই কেউই সহসা আহারাদি লাভ করেন না। সকলকেই কিছু না কিছু পরিশ্রম করে আহারাদি যোগার করতে হয়। আর যদি তা না করতে পারে কেউ, তাহলে পরমসুখের সন্ধান তাঁর কাছে বিলাসিতা হয়ে ওঠে, কারণ এই ভ্রমজগত তাঁর কাছে বিষণ্ণতার পীঠস্থান হয়ে ওঠে।

তাই, এক শিশুকে প্রথম নিজেকে এই ভ্রমজগতে স্থাপিত হতে হয়। এই ভ্রমজগতে আমাদের জীবিত থাকা প্রায় অসম্ভবই, কিন্তু এই অসম্ভবকে যিনি সম্ভব করান তিনি হলেন প্রকৃতি। প্রকৃতি সমস্ত চেতনাদের জন্য একটি একটি করে দেহ নির্মাণ করান আত্মকে বশ্যতা স্থাপনের ইন্ধন জুগিয়ে জুগিয়ে, আর যেহেতু সেই সমস্ত দেহ বা দেহীরা নশ্বর, তা প্রমাণ করা আবশ্যক, তাই প্রকৃতি সকল দেহীকে কারুর না কারুর হিংসার পাত্র করে রেখেছেন।

যেখানে বৃক্ষাদিদের জন্য বিধান দিয়েছেন যে তাঁরা মৃত্তিকার উপর হিংসার প্রয়োগ করে, জলপান করে জলের মধ্যে বিরাজ করা সমস্ত খনিজদের হনন করে, নিজেদের আহার সংগ্রহ করবে, ঠিক তেমনই বিভিন্ন দেহী জীবকে স্থাপন করতে বাধ্য করেছেন তিনি আত্মকে, যারা সেই বৃক্ষাদির উপর হিংসা প্রয়োগ করে, তাদের হত্যা করে নিজেদের দেহকে রক্ষা করে, বৃক্ষাদিদের কাছে প্রমাণ করে দেবে যে তারা নশ্বর।

সেই তৃণহত্যাকারী দেহীদের মধ্যে কেউ জলচর, তো কেউ নভচর আবার গরু, ছাগলাদিরা স্থলচর, আর এই তিনধারার জীবকেই নশ্বর প্রমাণ করার জন্যই জলে যেমন হাঙর বা কুমীর রয়েছে, গগনে তেমন আছে কাকারি এবং গরুড়, এবং স্থলে তেমন আছে ব্যঘ্র, সিংহ বা হায়না। আর এঁদেরকে ভক্ষণ করার জন্য আছে শকুন বা শূয়র। তাই যতক্ষণ না এই নশ্বর শরীরকে এই ভ্রমজগতে স্থিতু করা যাচ্ছে, ততক্ষণ পরমসুখের জন্য বিচার করাও এক মহাবিলাসিতা। আর তাই শিশুর প্রাথমিক কর্তব্য হলো এই ভ্রমজগতে নিজের শেকড় নির্মাণ করে, নিজের ভ্রমদেহকে স্থায়িত্ব প্রদান করা।

প্রকৃতি স্বয়ং এই কর্তব্যের শিক্ষা দেয় আমাদের সকল বৃক্ষাদির দ্বারা। প্রকৃতির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত কনো বৃক্ষই ফুল বা ফল প্রদান করেনা, যতক্ষণ না তার শেকড় বিস্তারিত ও মজবুত হয়। তাই প্রকৃতির থেকে লব্ধ এই প্রাথিমিক শিক্ষাকে স্থাপিত করতে হয় শিশুর অবিভাবকের সম্মুখে, আর তা করতে শ্রেষ্ঠবলধালি শেকড়, অর্থাৎ বটবৃক্ষের শেকড়ের একটি টুকরো রাখতে হয় মহামাতৃকা পটসম্মুখে।

এখানেই শেষ নয়, আর এখানেই যে শেষ নয়, তাও ব্যক্ত করা অত্যন্ত আবশ্যক, কারণ অধিকাংশ সময়তেই অবিভাবকরা এমন জ্ঞান রাখেন যে, তাঁদের শাবকরা নিজেদের শেকড় স্থাপিত করলেই, তাঁদের জীবন সফল হয়ে গেল, আর তাই তাঁরা তাঁদের শাবকদের কেবলই শেকড়কে আরো আরো শক্তিশালী করারই প্রেরণা দিয়ে যেতে থাকেন। তাই রীতির মাধ্যমে অবিভাবকদের এটি বলা আবশ্যক যে, এটি কেবলই শুরু আর কখনোই শেষ নয়।

অর্থাৎ, কেবলই নিজেকে ভৌতিক ভাবে বিত্তবান করে তোলা, প্রভাবশালী করে তোলা, বা খ্যাতনামা করে তোলা, এতেই যদি একটি জীব, একটি মনুষ্য কেন্দ্রীভূত থাকে, তিনি তাঁর জন্মলাভ করাকে যে হেলায় হেলাচ্ছেন, তা যেন স্পষ্ট করে দেওয়া হয় রীতির মাধ্যমে। প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো পরমসুখের সন্ধান করা আর তা লাভ করা। তাই রীতিও এমন হওয়া উচিত যাতে শিশুর অবিভাবকদের এই ব্যাপারে সতর্ক করে দেওয়া হয় যে, তাঁরা যেন কেবলই ধন, প্রসিদ্ধি বা প্রভাব বিস্তারেই শাবককে প্রেরণ না করেন, আর তা যাতে না করেন, তার জন্য মহামাতৃকা সম্মুখে তাঁদেরকে দিয়ে প্রতিজ্ঞা করানো হলো পরবর্তী রীতি।

তোমরা বলবে, এমন প্রতিজ্ঞা করলে, অবিভাবক কি আর সন্তানকে ধনমুখী হওয়ার থেকে রুদ্ধ করবেন! … এর উত্তর এই যে, যেই সন্তানকে অবিভাবক নিজের সন্তান বলে দাবি করছেন, বাস্তবে তিনি হলেন সাখ্যাত ব্রহ্মময়ীর সন্তান, কারণ যাকে ধারণা করে সেই শিশু জীবিত, সেই চেতনা হলেন স্বয়ং ব্রহ্মময়ী বা তাঁর সন্তান। আর রীতির মাধ্যমে শিশুকে তাঁর প্রকৃত মাতার সম্মুখে রেখে, সেই শিশুর জন্মদাতারা, অর্থাৎ অবিভাবকরা প্রতিজ্ঞা করছেন যে, শিশুকে কেবলই ভৌতিকে আবদ্ধ রাখবেন না।

এরপর যদি তাঁরা প্রতিজ্ঞা পালন না করেন, তাহলে শিশুর জননী তাঁদের যথাপোযুক্ত দণ্ড দিতে স্বতন্ত্র রইলেন। অর্থাৎ এই রীতি অবিভাবকদের আবদ্ধ করার জন্য, এবং পরাপ্রকৃতিকে স্বতন্ত্রতা প্রদান করার জন্য। পরাপ্রকৃতি সর্বদাই স্বতন্ত্র। কনো রীতির মাধ্যমে তিনি স্বতন্ত্রতা লাভ করবেন, এটি হতেই পারেনা, কারণ তিনি কনো রীতির বন্ধনে আবদ্ধ নন। এক জননীকে কনো রীতি বন্দী করতে সক্ষম নয়। কিন্তু রীতির মাধ্যমে এই অবিভাবকদের বন্দী করা, এবং পরাপ্রকৃতিকে স্বতন্ত্রতা প্রদান করার অর্থ হলো, অবিভাবকদের সচেতন করে দেওয়া যে, তাঁরা যেই প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করেছেন, তা যদি পালন না করেন, তার পরিণামস্বরূপ সন্তানের প্রকৃত জননী, স্বয়ং মহামাতৃকা তাঁদেরকে যেকোনো প্রকার দণ্ড স্বতত দিতে সক্ষম”।

অরিত্রা বললেন, “সাধারণ মানুষকে ঈশ্বরের থেকে এইরূপ ভয় দেখানো আবশ্যক। উচিত কথা বলেছ দিদি”।

মীনাক্ষী গম্ভীর হয়ে বললেন, “ভুলভাবে অনুভব করলে কথাকে তুমি অরিত্রা। প্রথম কথা এই যে, এখানে কনো প্রকার ভয় দেখানো হয়নি। আমাদের মা সত্যই দণ্ড প্রদান করেন সকল সেই অবিভাবকদের, যারা তাঁদের সন্তানকে কেবলই অর্থ, বৈভব, প্রসিদ্ধি বা প্রভুত্বের দিকে প্রেরণ করেন। সেই সন্তান বা অবিভাবক কৃতান্তিক হলেন বা না হলেন, তাতে তাঁর কিছু এসে যায় না, কারণ তিনি কনো ধর্মের বন্ধনে আবদ্ধ নন।

এমন কখনোই নয় যে, কেবল মাত্র কৃতান্তিক ধর্মের অধীনে যারা স্থিত, তিনি কেবল তাঁদেরই জননী। তিনি সকল জীবের জননী। কৃতান্তিক ধর্ম সেই সত্যকে স্বীকার করা একটি ধর্মসম্প্রদায়ের নাম মাত্র, যার উদ্দেশ্য মাতার কাছে তাঁর সন্তানদের সজ্ঞানে স্থাপন করা। না তার উদ্দেশ্য আর না তাঁর সামর্থ্য আছে যে সে জগন্মাতাকে তাঁর কনো সন্তানের কাছে যাওয়া থেকে প্রতিবন্ধকতা স্থাপন করতে পারে। তিনি সর্বদা স্বতন্ত্র ছিলেন, আর থাকবেন।

তিনি স্বতঃই সকলের জননী, আর তিনি এমনিই সকল সেই অবিভাবক যারা সন্তানদের ধন, প্রভাব বা প্রসিদ্ধির পথেই কেবল চালনা করেন, তাঁদের দণ্ড প্রদান করেন। কখনো অবিভাবকের যখন বয়স্ককাল, যখন তাঁদের ঐকান্তিক ভাবে সন্তানকে প্রয়োজন, সেই কালে সন্তানকে দূরে সরিয়ে দেন অবিভাবকের থেকে, আর এই ভাবে দণ্ড প্রদান করেন, নয় তিনি সন্তানকেই অবিভাবকের সামনে অতিশয় পীড়া প্রদান করে দণ্ড দেন।

তাই প্রথম কথা এটি ভয় দেখানো নয়, এটি সত্যের ব্যাখ্যা, কারণ তিনি সত্যই এই দণ্ড প্রদান করে থাকেন। কৃতান্তিক ধর্ম নিজের রীতির মাধ্যমে কেবল সেই সত্যের ব্যখ্যা করে, কনো অকারণ ভয় দেখিয়ে কারুকে পরাধীন করে রাখা কৃতান্তিক ধর্মের কখনোই উদ্দেশ্য নয়। আর দ্বিতীয় কথা এই যে, এটিকে ঈশ্বরের দেখানো ভয়ও যদি বলো, তা হবে মিথ্যাচারন, কারণ এটি ঈশ্বরের দেওয়া দণ্ড নয়, এটি মাতার শাসন।

যেই শিশুকে তাঁর অবিভাবকরা ধন, ঐশ্বর্য, প্রসিদ্ধি বা প্রভাবের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন, যেমন তাঁর আসল জননী ব্রহ্মময়ী মাতা, তেমন যারা সেই শিশুর অবিভাবক, তাঁদেরও আসল জননী হলেন মাতা ব্রহ্মময়ী। আর তাই সেই অবিভাবক, যারাও তাঁর সন্তান, তাঁদের প্রতি তাঁদের জননীর শাসন হয় এই দণ্ড। তাই একে ঈশ্বরের দণ্ড বলা সম্পূর্ণ ভাবে মিথ্যাচার করা হবে, কারণ এটি সম্পূর্ণ ভাবে মাতার সন্তানের প্রতি শাসন”।

অরিত্রা, ভূমিরা যেমন দেখলেন, তেমন রোজরাও দেখলেন মীনাক্ষীর নিশ্চিত ও অকাট্য বিশ্বাস যে ব্রহ্মময়ী আদপে ঈশ্বরী হন বা না হন, তিনি বাস্তবেই মা, তেমন জয়াবিজয়া ও তন্ত্রসন্তানরা মীনাক্ষীর মাতা ব্রহ্মময়ীকে সর্বভাবে জননী মানার দৃঢ়তা দেখে আপ্লুত হয়ে মনোযোগ সহকারে মীনাক্ষীর সমস্ত কথা শুনতে থাকলেন।

মীনাক্ষী আবার বললেন, “জন্মরীতির তাই পরবর্তী চরণ হলো ফুল স্থাপন, অর্থাৎ যখন বৃক্ষ শেকড়কে মজবুত করে ফেলেছে, যখন শিশু এই ভ্রমজগতে নিজের আহারচিন্তাকে কাটিয়ে উঠেছে, তখন তাঁর পরমসুখের জন্য যাত্রারম্ভের চিহ্ন হলো এই ফুল। অজস্র প্রয়াস থাকবে এই পরমসুখ লাভের প্রচেষ্টাতে, অজস্র মতভেদ থাকবে, অজস্র মার্গ হারানো থাকবে, এবং অজস্র মার্গ লাভ থাকবে। আর সেই সমস্ত কিছুকে একটি ফুলের মাধ্যমেই দেখানো হলো রীতির এই অংশ।

তাই যেই ফুলটি এই রীতিপালনের ক্ষেত্রে মহামাতৃকা চরণে স্থাপিত করা হবে, তা হলো কলাগাছের ফুল অর্থাৎ মোচা। কৃতান্তিক আরাধকের কর্তব্য হবে, সেই মোচাকে ব্যখ্যা করা। দেখানো যে, এই মোচার থেকে যেই কলার কাধি নির্মিত হবে, তাদের মধ্যে প্রচুর কলা শুকনো হবে, অর্থাৎ তাঁরা বিফল প্রয়াস হবে; অনেক কলা কাঁচা বা অপরিপক্ক থাকবে, অর্থাৎ অর্ধেক সাফল্য পেয়েও বিফল হবে সেই প্রয়াস; এবং কিছু কলা পরিপক্ক হবে, অর্থাৎ কিছুই মাত্র সাফল্য লাভ করবে।

এটি অবিভাবকদের শিক্ষা দেওয়া অত্যন্ত আবশ্যক, যাতে তারা সন্তানদের প্রয়াস ব্যর্থ হলেই, তাদেরকে তিরস্কার না করে, হতাশ না করে, বা হতাশ হলে তাদেরকে যাতে তাঁরা পুনরায় উজ্জীবিত করে। বারংবার অসফল প্রয়াসের পরেই, অবশেষে সফল প্রয়াস করা সম্ভব হয়। তাই যাতে শাবক হতাশ না হয়ে যায়, আর অবিভাবক কনো ভাবেই তাঁদেরকে হতাশ অনুভব না করায়, সেই কারণে এই মোচা স্থাপন, আর রীতির এই ধারাকে অবিভাবকের সম্মুখে পূর্ণ ব্যখ্যা সহ স্থাপিত করা এক কৃতান্তিক পূজারির কর্তব্য।

এরপরের রীতি হলো শাবক যখন একটি সফলতা লাভ করছে, সেই সাফল্যের প্রতি কি ভাবে দৃষ্টি স্থাপন করবেন, সেই সংক্রান্ত অবিভাবকদের প্রশিক্ষণ, আর তা করার জন্য ফুলের পর একটি ফল স্থাপন আবশ্যক, যাকে ঘিরে পুনরায় প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করবেন অবিভাবক এবং সংকল্প গ্রহণ করবেন যে, তাঁরা তাঁদের শাবকদের সেই ফলস্বরূপ প্রেরণা প্রদান করবেন। ফলরূপে স্থাপিত থাকবে একটি জলপরিপূর্ণ মিষ্ট শাঁসের নারিকেল।

সেই নারিকেল ভেঙে, নারিকেলের জল মহামাতৃকার পটে বা মহামাতৃকার মূর্তির চরণে অর্পণ করবেন অবিভাবকগণ, এবং সংকল্প নেবেন যে, ঠিক যেমন এই নারিকেল ফল নিজের খোলকে কঠিন করে নিয়ে, সেই ফলকে বিনষ্ট হওয়া থেকে অবরোধ প্রদান করে, তাঁরাও তাঁদের সন্তানকে অনুরূপ শিক্ষা প্রদান করবেন। তাঁরা এই সংকল্প গ্রহণ করবেন যে, ঠিক যেমন এই নারিকেল ফল একই সাথে খাদকের ক্ষুধা ও তৃষ্ণা উভয়ই শান্ত করে, তেমনই অবিভাবকরা তাঁদের সন্তানকে শিক্ষা প্রদান করবে যাতে তারা নিজেদের লব্ধ সুফলকে সকলের ক্ষুধাতৃষ্ণা শান্ত করার উদ্দেশ্যেই অর্পণ করবেন, এবং কনো ভাবেই তা নিজবিলাসের জন্য সঞ্চিত না রাখেন। এটিই হলো জগন্মাতার সন্তানের, তাঁর সমস্ত ভাইবোনদের উদ্দেশ্যে করা কর্তব্যপালন।

চতুর্থ ও অন্তিম রীতি হলো এই যে, এই সমস্ত প্রয়াসের শেষে, একটি শাবকের কর্তব্য হলো নিজের অনুরূপ একটি বীজ অর্পণ করা, অর্থাৎ যেই সমস্ত চেতনা তখনও জন্মমৃত্যুর চক্রে ভ্রম্যমান, তাঁদের মধ্যে কারুকে দেহ প্রদান করে, নিজের অনুরূপ তাঁদেরকেও পরমসুখ সন্ধানের পথে চলমান করা, এবং উদ্ধার লাভ বা মোক্ষলাভের উদ্দেশ্যে অগ্রসর হবার সুযোগ প্রদান করা।

তোমরা বলবে, এই রীতি তো বিবাহ রীতি, কারণ এই কর্তব্য তো একটি দম্পতির, তাহলে কেন এটিকে জন্মরীতির মধ্যে স্থান দেওয়া হচ্ছে? এর উত্তর হল এই যে, এই কর্তব্য অবশ্যই দম্পতির, কিন্তু এক অবিভাবককেও এঁর মাধ্যমে একটি বিশেষ শিক্ষা দেবার আছে। প্রায়শই দেখা যায় যে, নাতিপুতি লাভ করার লালসায়, অবিভাবকরা নিজের পুত্র বা কন্যাকে প্রায়শই তৎপরতা প্রদান করতে থাকেন সন্তান লাভের জন্য।

কিন্তু কথা এই যে, যখন এক শাবকের জন্মদাতা পিতা ও জন্মদাত্রী মাতা স্বয়ংই ফল লাভের জন্য ছুটে বেড়াচ্ছেন, তখন তাঁরা সন্তানকে কি রূপে লালন করবেন, এবং কি রূপে তাঁকে সত্যের পথে চালনা করবেন? তাই প্রথমে সেই দম্পতিকে উপযুক্ত হয়ে উঠতে হয়, সন্তানকে লালনের জন্য, সন্তানকে মার্গদর্শন করার জন্য, অতঃপরেই তাঁদের জনকজননী হওয়া কাম্য। তাই যাতে অবিভাবকরা নিজেদের পুত্রকন্যাদের অতিকায় প্রেরণা না প্রদান করেন সন্তান লাভের জন্য, তাই এই রীতি আবশ্যক। এই সমস্ত কিছু সমাপ্ত হলে, অতঃপরে এই সমস্ত প্রতিজ্ঞাকে স্বয়ং রপ্ত করবেন অবিভাবক, এবং কৃতান্তিক পূজারির কাছে তার ব্রতচারন করে, পট বা মূর্তিকে বিসর্জন প্রদান করবেন, সেই সমস্ত প্রতিজ্ঞাকে স্মরণ করতে করতে। এই হলো জন্ম রীতি”।

বিজয়া বললেন, “অসামান্য লেগেছে আমার এই রীতি। এতে মাতা সর্বাম্বার সহমত পেয়ে গেলে হয়, কি বলো মীনাক্ষী!”

মীনাক্ষী হেসে বললেন, “না না, এ কেমন মানসিকতা! … আমার কর্মে মাতার সমর্থন! না না, মা যথোচিতকে সমর্থন করবেন। যদি এঁটে কনো কিছু ভ্রান্তি থাকে, খুব আনন্দ পাবো, মা যদি তাতে সংশোধন করে দেন। … নিজের উপর সেই বিশ্বাস নেই বিজয়া। বিশ্বাস তো তাঁর উপর কেবল। তিনি যেটি নিশ্চয় করবেন, সেটিই হবে সঠিক, পূর্ণ ভাবে সঠিক”।

জয়া এবার বললেন, “এবার তাহলে অনুরূপ ভাবে শ্রাদ্ধের রীতি বলো আমাদেরকে”।

মীনাক্ষী হেসে বললেন, “শ্রাদ্ধের রীতিতে যাবার পূর্বে, শ্রাদ্ধের উদ্দেশ্য কি, তা বলো আগে আমাকে!”

খানিকক্ষণের নিস্তব্ধতার পরে, বিজয়া বললেন, “যিনি মৃত্যুলাভ করলেন, তাঁকে মৃত্যু সম্বন্ধে সচেতন করা হলো শ্রাদ্ধের উদ্দেশ্য”।

মীনাক্ষী সেই কথা শুনে হাসতে গিয়েও হাসি চেপে রেখে, সকলের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, “বিজয়ার কথার সাথে সকলে কি একমত, নাকি অন্যদের কনো অন্য মত আছে!”

একে একে সকলে সহমত জানালে, মীনাক্ষী এবার হেসে উঠে বললেন, “মেঘ কি ভাবে গর্জন করে, তা তোমরা জানো, মেঘ কেন গর্জন করে, তোমরা কি কেউ জানো?”

শ্রাদ্ধের প্রসঙ্গে এমন কথার উত্থাপনের কারণ ভেবে সকলে নিজেদের ভ্রুকুটি উত্তোলন করলে, মীনাক্ষী হেসে বললেন, “জানো না তো?” … একটি মিষ্ট হাস্য প্রদান করে আবার বললেন, “কি করে জানবে! তাঁদের কথোপকথনের ধারা কি আমাদের কথোপকথনের ধারার সাথে মেলে! … মেলে না। যদি মিলতো, তাহলে জানতে। মেলেনা তাই জানো না। তাহলে এবার তোমরা বলো আমাকে, মৃতদের কথোপকথনের ধারা তুমি কি করে জানবে?”

পুনরায় হেসে বললেন, “না তাঁরা তোমার উচ্চারণ করা শব্দকে আর ধারণ করতে পারে, আর না তোমার ভাবকে অনুভব করতে পারে, তাঁর আত্ম। কেন? কারণ সে তো তখন নিজের অগুছলো আত্ম নিয়ে উলমালা! তাঁর আত্ম যেই ব্রহ্মাণ্ড, অর্থাৎ দেহ নির্মাণ করেছিল, সেই ব্রহ্মাণ্ডের নাশ হয়ে গেছে। তুমিই বলো, তোমার অতি পরিশ্রম করে নির্মাণ করা কনো ব্যবস্থার যদি অকস্মাৎ ধ্বংস হয়ে যায়, তখন কি বহির্বিশ্বে কি হলো না হলো, কে তোমাকে ডাকলো না ডাকলোনা, সেই দিকে হুঁশ থাকে?”

কিছুক্ষণ থেমে আবার বললেন মীনাক্ষী, “কি থাকে না তো? তাহলে সেই মৃত আত্মের কি করে তা থাকবে? প্রথমত সে আর তোমার উচ্চারিত শব্দে প্রভাবিত হয়না, তোমার স্পর্শকে অনুভব করতে পারেনা, তোমার রূপকে প্রত্যক্ষ করতে পারেনা, এমন অবস্থায় চলে গেছে সে; দ্বিতীয়ত সে কিছু যদি তোমাকে বলতেও চায়, তা তোমার বোঝার সামর্থ্য নেই, কারণ না তো তুমি তাঁর সূক্ষ্মরূপকে দেখতে সক্ষম, না স্পর্শ করতে সক্ষম, না শুনতে সক্ষম; আর সর্বোপরি কথা এই যে, সে তখন নিজেকে ও নিজের ধ্বংস হয়ে যাওয়া ব্রহ্মাণ্ড নিয়ে ব্যস্ত। তাহলে সে তোমার কথা শুনবে কেন? তোমার আচরণের দিকে দৃষ্টিই বা দেবে কেন?”

বিজয়া বললেন, “তাহলে শ্রাদ্ধের রীতি কার জন্য মীনাক্ষী?”

মীনাক্ষী এবার একটি সরল হাস্য হেসে বললেন, “যে শ্রাদ্ধ রীতি পালন করছেন, তার জন্যই এই রীতি। তাঁকে মৃত্যু সম্বন্ধে সচেতনতা প্রদান করতেই এই রীতি, যাতে সে যখন মৃত্যু লাভ করবে, সে যেন এমন কনো কিছুর মধ্যে জরিয়ে না পরে, যার কারণে সে দেহলাভের অধিকারী হয়েও দেহ লাভ না করে পিশাচ না হয়ে যায়, সেই উদ্দেশ্যেই এই শ্রাদ্ধরীতি”।

স্নেহের সুরে মীনাক্ষী বললেন, “বিজয়া, তোমরা যখন কারুকে সন্ধান করতে শ্রীপুর থেকে নির্গত হয়েছিলে, মাতা সর্বশ্রী তখন তোমাদের কিছু বলেছিলেন যাত্রায় নির্গত হয়ে যাবার কিছুদিন পরে?”

বিজয়া মীনাক্ষীর কথা বুঝে গিয়ে হেসে উত্তর দিলেন, “বুঝে গেছি তোমার কথা মীনাক্ষী। যাত্রায় বেড়িয়ে পরলে, আর কাকে কি বলবেন তিনি? তিনি না বলে দিলেন আমাদের উদ্দেশ্যে। আমাদের সেই মেধা কোথায় যে তাঁর থেকে এতো দূরে অবস্থান করে আমরা তা শুনতে বা বুঝতে পারবো? তাই যাত্রায় নির্গত হবার আগেই তিনি আমাদের যা যা ভাবে সতর্ক করার, যা যা স্মরণ রাখার তা বলে দিয়েছিলেন।

অর্থাৎ স্পষ্ট কথা এই যে, যিনি মৃত্যু বরণ করে ফেলেছেন, তিনি যাত্রায় নির্গত হয়ে গেছেন ইতিমধ্যে। আর তাকে কনো কিছুই বলা সম্ভব নয়। যদি আমরা কিছু বলতেও থাকি, তাও তাঁর তখন সেই মেধা নেই যে আমাদের কথা শ্রবণ করতে পারবেন, ঠিক যেমন এখন যদি মাতা শ্রী কিছু বলেনও আমাদেরকে, তাও আমাদের সেই মেধা নেই যে আমরা তাঁর কথিত কথা শ্রবণ করি। অর্থাৎ যা কিছু বলার, যত প্রকার সচেতনতা প্রদান করার, তা মৃত্যুর আগেই বলা আবশ্যক।

এর অর্থ, শ্রাদ্ধের রীতি তাঁর উদ্দেশ্যে করা হয়, যিনি শ্রাদ্ধ রীতি পালন করছেন, মৃতের উদ্দেশ্যে নয়। মধ্যা কথা হলো মৃত্যুর জন্য তাকে প্রস্তুত করার জন্য, সতর্ক করার জন্য, এই রীতি। তাহলে মৃত্যুর পর এই যে সামান্য কিছুদিনের বিরতি থাকে, তা কেন?”

মীনাক্ষী সেই কথা শুনে কেবলই একটি অর্ধহাস্য প্রদান করে উঠে চলে গেলেন সেই দিকে, যেই দিকে একটি বাঁশের দরমাকে মধ্যে স্থাপন করে একটি বৃহৎ আকারের কুটির নির্মাণের প্রয়াস করা হচ্ছিল, যাতে সকলে একত্রে থাকতে পারেন। সেই দিকে গিয়ে, বাঁশের দরমাটি সরিয়ে নিলে, যতটুকু আকার নিয়েছিল কুটিরটি, তা ধরমরিয়ে পরে গেল।

মীনাক্ষীর এমন কীর্তিতে সকলে বেশ কিছুক্ষণ হতবম্ব হয়ে ইতস্তত হয়ে উঠলে, খানিক পরে একজন সম্মুখে এসে বললেন, “এমন করার কি কারণ দেবী?”

মীনাক্ষী হেসে উঠে বললেন, “এই কথা বলতে এতো দেরি হলো কেন তোমার আজিবক (ব্যক্তির নাম)?”

বিজয়া সম্মুখে এসে বললেন, “ধারণা করে রাখা যেকোনো জিনিস যখন নষ্ট হয়ে যায়, তখন কিছুটা সময় আমরা কি হলো, কেন হলো, ইত্যাদি কনো কিছু বোঝার অবস্থায় থাকিনা। তাই মৃত্যুর পর শ্রাদ্ধ কর্ম করার এই বিরতি? এটিইকি তুমি এই দরমা সরিয়ে নিয়ে বোঝালে মীনাক্ষী!”

মীনাক্ষী মিষ্ট হাসলে, বিজয়া অকারণ এবার মীনাক্ষীকে প্রবল বলের সাথে আলিঙ্গন করে উঠে বললেন, “তুমি এক্কেবারে আমাদের মায়ের মতন। সহজতম সম্ভব উপায়ে তুমি এমন ভাবে উত্তর দাও যাতে, উত্তর তোমাকে দিতেই না হয়, আমরাই বুঝে যাই সেই উত্তর কি। … যখন যখন মাকে অনেকদিন দেখিনি, একটু অনুভব করতে চাই, তুমি সামনে ঠিক মায়ের বেশে চলে আসো মীনাক্ষী”।

সকলে বিজয়ার কথাকে অনুভব করতে পারলেন, আর মীনাক্ষীর অদ্ভুত উত্তর প্রদান করার মেধাকেও। তা অনুভব করে, মীনাক্ষীকে সকলে নিজেদের হৃদয়ের আরো কাছের ব্যক্তি জেনে, আনন্দমুখরিত হয়ে উঠলেন, আর তাই এই সকলের মধ্যেই একজন, অনন্ত বললেন, “দেবী, আমাদের কনো প্রিয়জন গত হয়েছেন। সেই মৃত্যুকে কেন্দ্র করে, আমাদের মৃত্যুপাঠ প্রদান করার জন্যই শ্রাদ্ধরীতি। তাহলে কি থাকা উচিত এই শ্রাদ্ধরীতিতে? মৃত্যু সম্বন্ধে কি কি সচেতনতা প্রয়োজন আমাদের?”

মীনাক্ষী হেসে বললেন, “দেখলে, তোমরা কতটা মেধাবী! সকলে কেমন বুঝে গেলে যে, মৃত্যু সম্বন্ধে যেই যেই সতর্কতা ধারণ করা আবশ্যক, সেগুলিরই থাকা উচিত শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে। … বেশ যখন তা বুঝেই গেছ, এবার তোমাদেরকে মৃত্যুর কথা কিছু বলি, দেখবে তা শুনে তোমরা রীতিও নির্মাণ করে ফেলবে”।

এমন বললে, সকলে আগ্রহী ও উৎফুল্ল হয়ে মীনাক্ষীর কথা শ্রবণ করলে, মীনাক্ষী বললেন, “জন্ম মানে কি? জন্ম মানে, আমাদের আত্ম একদিকে আমাদের চেতনাকে নতুন করে ভ্রমে আচ্ছন করতে উদ্যোগী হয়, এবং তার জন্য ইচ্ছা, চিন্তা ও কল্পনা অর্থাৎ ছায়াদের সঙ্গে নিয়ে, ত্রিগুণে বিভক্ত হয়ে, সহস্র আবেগের রচনা করে যাদের নেতৃত্ব করে ছয় রিপু, আট পাশ এবং ছয় ইন্দ্রিয়।

আর যেমন যেমন আত্ম উদ্যোগী হয় নতুন করে চেতনাকে ভ্রমিত করার জন্য, তেমন তেমন চেতনাও উদ্যোগী হয়ে ওঠে মেধার জন্ম দিয়ে পঞ্চভূতকে সম্পন্ন করে, মহাভাবদের জাগ্রত করে পঞ্চভাবকে জন্ম দিয়ে, পরাচেতনার ভান করতে। অর্থাৎ জন্ম মানেই আত্ম ও চেতনার চিরপ্রতিদ্বন্ধিতার এক নতুন সূচনা, যেখানে রাজনেতা, বৈজ্ঞানিক, ভণ্ডসাধু ইত্যাদি বহু বেশ ধরে বৈদিক বণিকরা, যাদেরকে তোমরা ব্রাহ্মণ বলে থাকো, তারা আত্মকে বিজেতা করতে সদাসচেষ্ট থাকে, আর আমরা কৃতান্তিকরা চেতনাকে বিজেতা করতে সর্বদা সচেষ্ট থাকি।

আর এই প্রয়াস কতদিন চলতে থাকে? যতদিন এই দেহে তুমি অবস্থান করছো। যাই এই দেহ তুমি ত্যাগ করে দেবে, সেই উদ্যম বিনষ্ট হয়ে যাবে, বৈদিকদের থেকেও আর কৃতান্তিকদের থেকেও। পুনরায় আবার যখন দেহ ধারণ করবে, পুনরায় সেই উদ্যম শুরু হবে নতুন করে। অর্থাৎ এই একটি দেহলাভ ও দেহত্যাগের মধ্যখানের সময় হলো দুই তরফের উদ্যোগ গ্রহণের সময়, যেখানে আত্মের পক্ষ থেকেও কনো না কনো উদ্যম নেওয়া হয়, এবং চেতনার পক্ষ থেকেও।

আত্মের পক্ষ থেকে যেই উদ্যম নেওয়া হয়, তার উদ্দেশ্য কি থাকে? আর চেতনার পক্ষ থেকেও যেই উদ্যম নেওয়া হয়, তার উদ্দেশ্যই বা কি হয়ে থাকে? এই বিষয়ে কেউ বলতে পারবে আমাকে?”

তন্ত্রকন্যা সাধ্বী বললেন, “আত্মের পক্ষ থেকে উদ্যোগ এই থাকে যাতে আমরা চেতনার দিকে, মেধার দিকে না তাকিয়ে, ইচ্ছা, চিন্তা ও কল্পনাকে ধারণ করে নিয়ে, কামক্রোধাদি রিপুপাশকে ধারণ করে নিয়ে, ভ্রমসর্বস্ব অর্থাৎ দেহ, ধন, ঐশ্বর্য, প্রসিদ্ধি এবং প্রভুত্ব প্রসারে উদ্যোগী হয়ে উঠে, সকল আত্মদের সাথে সংগ্রামে লেগে পরি এবং সকল আত্মের সাথে লড়াই করি। এই লড়াইয়ের ফলে আমরা কিছু আত্মের অধীনে থাকবো, আবার কিছু আত্মকে নিজেদের অধীনে স্থিত করে তাদেরকে দাসে পরিণত করবো। আর এই করার কালে আমরা সম্পূর্ণ ভাবে চেতনা সম্বন্ধে, আমাদের নিজেদের মাতা সম্বন্ধে ভ্রমিত হয়ে যাবো, অর্থাৎ সত্য বা শূন্যতা সম্বন্ধে ভ্রমিত হয়ে যাবো।

আর অন্যদিকে চেতনার পক্ষ থেকে যেই উদ্যোগ থাকে, তার উদ্দেশ্য হয় সত্যের সন্ধান করানো, শূন্যের সন্ধান করানো। কনো কর্তা নেই, এই কৃতান্তভাব বোধ করানো, কনো আকার নেই এই সত্য বোধ করানো, শূন্যই একমাত্র সত্য, এই বোধ করিয়ে সমস্ত পরাধীনতাকে ছিন্ন করানো থাকে এই উদ্যমের উদ্দেশ্য। আর থাকে, সেই পরাধীনতা থেকে মুক্ত করে, পরমসুখ অর্থাৎ সমাধি প্রদান করিয়ে, সেই শূন্যের সাখ্যাত করিয়ে, আমাদের জননীর কাছে আমাদেরকে ফিরিয়ে দিয়ে, এই জন্মমৃত্যুর চক্রব্যূহ থেকে চিরতরে মুক্ত করে দেওয়া”।

মীনাক্ষী হেসে বললেন, “অদ্ভুত উত্তর দিলে সাধ্বী, কারুকে আর একটি শব্দও যোগ করার জায়গা ছেড়ে দিলেনা। … আর এই যেই দুই প্রকার উদ্যম, যার কথা সাধ্বী এতক্ষণ বলল আমাদেরকে, তা সম্ভবই হয় এক জন্ম থেকে মৃত্যুর যাত্রাকালে, অর্থাৎ এক দেহী অবস্থায় থাকার কালে। … এর আগেপরে কি থাকে? এই দেহ থাকেনা, আর তাই না আত্মের পক্ষ থেকে কনো উদ্যম থাকে আর না চেতনার পক্ষ থেকে, অর্থাৎ না স্থুল, না কারণ, মধ্যখানের এক সূক্ষ্ম এবং উদ্যমহীন অর্থাৎ জঙ্গম অবস্থায় আমরা পতিত থাকি।

যদি বুঝতে হয় ব্যাপারটা, তাহলে এমন বলতে পারো যে দেহ থাকা অবস্থায় আমরা ধনপতি থাকি, আর দেহ না থাকা অবস্থায় আমরা থাকি কপর্দকশূন্য অবস্থায়। এবার তোমরাই বলো, ধনী না কপর্দকশূন্য, কে ত্যাগ করতে সক্ষম?”

জয়া হেসে বললেন, “যার কাছে কিছু নেই, সে কিই বা ত্যাগ করবে? কপর্দকশূন্য যদি ধনত্যাগের কথা বলে, সেটা রসিকতা বাদে কিছুই নয়”।

মীনাক্ষী মুচকি হেসে বললেন, “একদম সঠিক। তাই যাত্রা আমাদের দেহে থাকা অবস্থাতেই করতে হয়, কারণ যখন আমাদের দেহ নেই, তখন আমরা যাত্রা করার অযোগ্য হয়ে থাকি। এর মানে তো এই যে, মৃত্যু মানে এক অদ্ভুত অবস্থান্তর, যেখানে আমরা ধনী থেকে কপর্দকশূন্য হয়ে ওঠার দিকে অগ্রসর হই। আবার বিচার করে দেখো, আমাদেরকে পুনরায় কপর্দকশূন্য অবস্থা থেকে ধনী হতে হবে, কারণ তবেই আমরা যাত্রা সম্পন্ন করতে পারবো, তাই না?

কিন্তু এখানে একটি অদ্ভুত বিড়ম্বনা রয়েছে দেখ। যতক্ষণ আমরা দেহী, ততক্ষণ আমরা উদ্যোগ নিতে সক্ষম। আমরা উদ্যোগ যেমনই নিই, একদিন আমাদের কপর্দকশূন্য হতেই হবে অর্থাৎ মৃত্যুবরণ করতেই হবে, কারণ যা ধারণ করে আমরা ধনী, অর্থাৎ এই দেহ, তা তো নশ্বর, তাই তার নাশ অবস্বম্ভাবি আর তাই মৃত্যু নিশ্চিত এই দেহের। কিন্তু বিড়ম্বনা কোথায়? বিড়ম্বনা এখানে যে, আমরা মৃত্যুর পর কনো প্রকার উদ্যোগ নিতে পারবো না, অথচ আমাদেরকে ধনী হয়ে প্রত্যাবর্তন করতে হবে। বুঝতে পারছো, কেমন অদ্ভুত বিড়ম্বনা!

যখন আমরা উদ্যোগ নেবার যোগ্য, তখন আমরা উদ্যোগ নিয়েও কপর্দকশূন্য হওয়া থেকে নিজেদের বাঁচাতে পারিনা, আর যখন আমরা উদ্যোগ নেবার জন্য অযোগ্য তখন আমাদের ধনী হয়ে ফিরতে হবে। তা সম্ভব কি ভাবে? … একটু বিচার করো। আমরা কিন্তু প্রতিদিন এমন একটি কাজ করে থাকি, অর্থাৎ এই উদ্যোগী না হয়ে কপর্দকশূন্য অর্থাৎ কর্মহীন অবস্থা থেকে ধনী অর্থাৎ কর্মসম্পন্ন অবস্থায় ফিরে আসি। … বিচার করে দেখো, আমাদের নিত্য করা সেই কর্ম স্মরণে আসছে?”

সকলে বেশ খানিকক্ষণ বিচার করার জন্য চুপ করে থাকলে, একে অপরের দিকে বিকৃত ধরনের মুখ করে তাকাতে থাকলো আর সেই বিকৃতি সময়ে সময়ে বদলাতে থাকলো, যা মীনাক্ষীর কাছে এটি স্পষ্ট করলো সকলের মন ডুবুরি হয়ে নিজেদের নিত্যদিনের ঘটনাসমূহকে দেখছে কিন্তু কিচ্ছু খুঁজে পাচ্ছেনা। এরই মধ্যে বিজয়া কিন্তু কিন্তু করে বললেন, “তুমি কি নিদ্রার কথা বলছো মীনাক্ষী!”

মীনাক্ষী ভ্রু কুঁচকে বললেন, “নিদ্রা! কি রকম? একটু বুঝিয়ে বলো আমাকে”।

বিজয়া বললেন, “নিদ্রায় যাবার আগে পর্যন্ত আমরা কর্মসম্পন্ন থাকি, নিদ্রার কালে আমরা কর্ম থেকে বিরত হয়ে যাই, আবার নিদ্রা থেকে উঠলে কর্মবেষ্টিত হয়ে যাই। কিন্তু এই কর্মবিরতি অবস্থাতে স্থিত হয়ে আমরা কনো প্রকার উদ্যোগ নিতে পারি না যাতে আমরা কর্মউদ্যোগী হয়ে উঠতে পারি”।

মীনাক্ষী গর্বিত জননীর মত নিজের ওষ্ঠের দুই কশ নিম্নমুখী করে একটি তৃপ্তির হাস্য হেসে বললেন, “ধন্য তুমি দেবী নলিনীর কন্যা, ধন্য তুমি মাতা সর্বশ্রীর স্নেহের কন্যা। … যথার্থ বলেছ তুমি বিজয়া। … মৃত্যুও ঠিক সেই একই প্রকার কর্মবিরতি যার উপর আমাদের কনো প্রকার বলপ্রয়োগের অধিকার নেই, অথচ আমাদেরকে সেই কর্মবিরতি কাটিয়ে কর্মতৎপর অবস্থাতে ফিরতে হয়। … আচ্ছা, নিদ্রার কথা যখন বললেই, তখন এটাও বলে দাও যে, সঠিক সময়ে নিদ্রা থেকে উঠতে এবং কর্মতৎপর হয়ে উঠতে আমাদের ঠিক কি কি করি বা করতে পারি?”

বিজয়া বললেন, “মায়ের থেকে শিখেছি এই পদ্ধতি, যখন কিছুতেই সঠিক সময়ে নিদ্রা ভাঙতো না। তিনি শিখিয়েছিলেন, নিদ্রা যাবার কালে, কি করেছ সারা দিন, সেই সমস্ত কিছুর থেকে ভুল ভ্রান্তিকে নিরীক্ষণ করে নিতে হয় প্রথম, আর তারপর পরবর্তীদিন কি কি করবে, সেই ধারণা করতে গেলে, স্বতঃই তাড়াতাড়ি নিদ্রা চলে আসে, আর সঠিক সময়ে নিদ্রা ত্যাগও হয়ে যায়, কারণ আমাদের অন্তরে এই ধ্বনি গুঞ্জন করতে থাকে যে, কাল কি করবো, তা নির্ধারণ করা হয়নি, তাই তাড়াতাড়ি তা নিরীক্ষণ করতে হবে। আমরা সকলে এই পদ্ধতি ধারণ করতে, আমাদের সকলের নিদ্রা নিয়ন্ত্রিত হয়ে গেছে”।

মীনাক্ষী হেসে বললেন, “ব্যাস হয়েই গেল তাহলে। মা তো সমস্ত কিছু বলেই দিয়েছেন”।

জয়া বললেন, “সে তো নিদ্রার আগের কথা, মৃত্যুর আগে কি করতে হয়, তা তো বলো!”

মীনাক্ষী হেসে বলল, “নতুন করে আর কি বলবো, মা তো সমস্ত কিছু বলেই দিয়েছেন। … সারা জীবনে কি কি ভুল ভ্রান্তি করেছি, তার বিচার করে, সমস্ত ভ্রান্তিকে একত্রিত করে  রাখতে হয়, আর পরের জীবনে কি করবো, কি ভাবে করবো, তার নিরীক্ষণ করে রাখতে হয়। যেমন তিনি নিদ্রার ক্ষেত্রে শিখিয়েছেন, একই জিনিস জীবনের ক্ষেত্রে করতে হয়। নিদ্রার ক্ষেত্রে, তাঁর কথামত তোমাদের নিদ্রা সঠিক সময়ে ভেঙে যেত কেন?

কারণ পরের দিনের কাজ কি হবে, তার নিশ্চয় না করতে পারার জন্য, তা নিশ্চয় করে সেই কাজে নিযুক্ত হওয়ার প্রেরণা কাজ করে চেতনার মধ্যে, আর সেই চেতনাই আমাদের নিদ্রাকে শীঘ্র পরিপূর্ণ করিয়ে আমাদের নিদ্রাত্যাগ করিয়ে দেয়। একই ভাবে, জীবনের ক্ষেত্রেও, যখন পরবর্তী জীবনের অর্থাৎ দেহের সমস্ত কীর্তিকে নিশ্চয় করে নিতে যাই, এবং মৃত্যু বরণ করি আমরা, তখন আমাদের কাছে পুনরায় দেহে ফিরে এসে সেই অসম্পূর্ণ কর্মকে সম্পূর্ণ করার প্রেরণা কাজ করে, আর আমরা তাই শীঘ্রই দেহ গ্রহণ করি, এবং পিশাচ হওয়া থেকে বিরত হই।

পিশাচ কেন হয় একজন মৃতব্যক্তি? শ্রাদ্ধ না করলে পিশাচ হয়? শ্রাদ্ধ করলে কি পিশাচ হওয়া থেকে বিরত হয়ে যান তিনি? না, শ্রাদ্ধের সাথে কনো বিধ সম্ভন্ধই নেই এই পিশাচ হবার। মৃত্যুর কালে, যেই যৎসামান্য পঞ্চভূতের সার আমাদের কাছে অবশিষ্ট থাকে, তা থাকতে থাকতেই আমাদের পুনরায় দেহ গ্রহণ করতে হয়। আর তা যখন আমরা না করি, তখনই আমরা পিশাচ হয়ে যাই, এবং দেহ না লাভ করে অশরীরী হয়ে ঘুরে ফিরি।

কিন্তু এবার কথা হলো দেহ কেন ধরিনা আমরা? কারণ আমরা পরের দেহে কি করবো, সেই নিয়ে নয়, বরং এই দেহে কি পাইনি, আর কি পাওয়া উচিত ছিল, সেই নিয়ে চিন্তায় উলমালা থাকি। (হেসে) যখনই আমরা কি করতে হবে, বা কি করা উচিত বা কর্তব্য, এই নিয়ে বিচার করতে শুরু করি, তখন আমরা নিজেদের মধ্যে নবোদ্যম লাভ করি। ঠিক বিপরীতে, যখন আমরা কি পেলাম আর কি পেতে পারতাম, অর্থাৎ ইচ্ছা, চিন্তা ও কল্পনার উপর নিজেদের ভাবনাকে আধারিত রাখি, তখনই জন্ম নেয় আসক্তি।

আর যেই ক্ষণে সেই আসক্তির জন্ম হয়, সেই ক্ষণে আমরা বার বার সেই স্থানে ফিরে আসতে চাই, যা সময় বা প্রকৃতি অতীত রূপে স্বীকার করে নিয়েছে। যা অতীত, তা গত, আর তা কনো ভাবেই প্রত্যাবর্তন করতে পারেনা, কিন্তু আমাদের আসক্তি আমাদেরকে সেই অতীতে ফিরে যাবার কল্পনা করাতেই থাকে। আর সেই কারণে আমরা কিছুতেই দেহত্যাগের পর, অন্য দেহে যাবার বিচার করি না, বরং যা ফেলে এসেছি, তাতে ফিরে আসতে চাই।

এমন অবস্থায় যদি যেই পরিবারে, যেই স্থানে, যেই মানুষের কাছে ফিরে আসতে ইচ্ছা হয় আমাদের, সেই মানুষের আশেপাশে যদি কেউ অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় বিরাজমান হয়, তাহলে আমরা ফিরে আসতে সক্ষম হই, আর না হলে ক্রমে পিশাচ হতে থাকি, তা আমাদের উদ্দেশ্যে শ্রাদ্ধ করা হোক বা না হোক। অর্থাৎ, কি দাঁড়ালো? শ্রাদ্ধের রীতির উদ্দেশ্য কি হওয়া উচিত? উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সেই শ্রাদ্ধ রীতি যিনি পালন করছেন, তাঁকে সচেতন করে তোলা এই সম্যক দর্শনের ব্যাপারে, এবং তাঁকে উন্নীত করা উচিত সেই অবস্থায় যেখানে দাঁড়িয়ে সে নিজের মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হয়ে ওঠা শুরু করে।

অর্থাৎ যাতে সে নিজের মৃত্যুর কালে কনো কিছুতে আসক্তি না রাখে, এবং এই দেহে বিরাজ করে কি কি ভ্রান্তি করেছে, তার নির্ধারণ করে, পরবর্তী জন্মে কি তাঁর কর্তব্য হবে, তাই নির্ধারণ করার প্রয়াস করে। যদি রীতি সেই কর্মের দিকে আমাদের মনোযোগকে আকর্ষণ করে, এর অর্থ সেই রীতি যথার্থ ভাবে আমাদেরকে আমাদের মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত করছে”।

তন্ত্রকন্যা সায়নি বললেন, “কিন্তু মীনাক্ষী, কারুর জীবনচিন্তা অন্য কেউ কি করে করে দিতে পারে? মানে সেটা করার অর্থ কি পরাধীনতা প্রদান নয়? মানে ধর, আমার পিতা গত হলেন, এবং আমি শ্রাদ্ধ করছি, সেই ক্ষেত্রে, রীতি যদি এমন হয় যে, আমার জীবনের ভ্রান্তির নিরীক্ষণ হচ্ছে, এবং আমার পরবর্তী জন্মের উদ্দেশ্য স্থির হচ্ছে, তা যদি করা হয়, তা কি আমাদেরকে অকারণে প্রভাবিত করবেনা। যদি ধরো এমন কিছু বিচার করা হলো আমার জীবনের আর সেই নিরিখে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো যে, আমার পরবর্তী জীবন বৈদ্যের হওয়া উচিত। এমন বিচার করে নেওয়া কতটা সঠিক হবে?”

বিজয়া বললেন, “সঠিক কথা বলেছে সায়নি। আমার ধর পিতা গত হলেন, যখন আমার বয়স ১৫। মাত্র ১৫ বছর বয়সে আমি যদি আমার পরের দেহের হিসাব করতে সচেষ্ট হই, তাহলে সেটা কতখানি সঠিক হবে? আমার এই দেহের জীবন যে তখনও অনেকটাই অবশিষ্ট, তাই না?”

মীনাক্ষী হেসে বললেন, “দারুণ বললে, সত্য বলতে আমাদের রীতি নির্ধারণকে তোমাদের এই দুইজনের কথা অনেক অংশেই সহজ করে দিলো দেখো। … প্রথম কথা এই যে, শ্রাদ্ধ করছি বা শ্রাদ্ধের রীতি পালন করছি আমি, শ্রাদ্ধ আমার হচ্ছেনা। তাই আমার জীবনের ভ্রান্তি বা আমার পরজীবনের হিসাব কেন করা হবে? হিসাব করা হবে তাঁর, যার মৃত্যু উদ্দেশ্যে শ্রাদ্ধ করা হচ্ছে।

সেই ব্যক্তির স্ত্রী বা স্বামী, পিতা ও মাতা, এবং সন্তানরা এবং তাঁরা তাঁরা যারা তাঁর জীবনের সম্বন্ধে বিস্তারিত জানেন, তাঁরা একত্রে উপবেশন করে তাঁর সমস্ত জীবনের ভ্রান্তির চর্চা করবেন, এবং সেই জীবনের ভ্রান্তি ও কীর্তি তথা কি কি করতে উদ্যমী ছিলেন, সেই সমস্ত কিছুর নিরিখে পরবর্তী দেহে স্থিত হয়ে তিনি কি কি করতে উদ্যত হবেন, সেই সমস্ত নিরীক্ষণ করবেন এক কৃতান্তিক পুরোহিতের হস্তক্ষেপের সাহায্যে।

এই রীতি যখন তাঁরা পালন করবেন, তাঁদের অন্তরে এই একই ক্রিয়া নিজেদের নিয়েও করার ভাবনা আসতে বাধ্য, আর তা আসা মাত্রই তাঁরা একই বিচার নিজেদের জীবনেও করা শুরু করে দেবেন। আর তা করার কারণে, যখন তাঁদের মৃত্যুকাল উপস্থিত হবে, তাঁরা আসক্তিতে লিপ্ত না থেকে, ভাবি জীবনের কর্মসূচি নিয়েই ভাবিত থাকবে, আর তারফলে ঠিক যেমন সঠিক সময়ে নিদ্রাত্যাগ হয়ে যায় পরেরদিবসের কর্মসূচি নিয়ে ভাবতে ভাবতে, তেমনই ভাবে এই নবজাগ্রত চারিত্রিক গুণাবলির কারণে তাঁরাও সহজেই পরের দেহ লাভ করে ফেলবেন, এবং পিশাচ হবার সম্ভাবনা এক্কেবারেই থাকবেনা।

এই উপকারিতা লাভের জন্যই তো রীতির নির্মাণ, তাই এই উপকার যদি না-ই হতে পারে, তাহলে রীতির প্রয়োজন বা আবশ্যকতাই বা কি, তাই না?”

জয়া মীনাক্ষীর কাছে এসে বললেন, “তুই কি ধাতু দিয়ে তৈরি রে? … বেশ বুঝতে পারছি, তুই কনো পূর্ব প্রচেষ্টা সঙ্গে নিয়ে, এই রীতি নির্মাণ করতে বসিসনি এখানে। এখানে বসে বসে, তুই আমাদের সাথে কথা বলতে বলতে জন্ম মৃত্যু, ইত্যাদি সমস্ত কিছুর দর্শনের ব্যাখ্যা দিচ্ছিস, আর তার থেকে রীতির নির্মাণ করছিস। কিন্তু এই বিনা প্রস্তুতি সত্ত্বেও, তোর নির্মাণ করা প্রতিটি রীতি কেমন অদ্ভুত ভাবে জনহিতকর, সকলের কল্যাণ সাধন করার রীতি। কি করে করছিস এমন?”

মীনাক্ষী হেসে বললেন, “প্রভু ব্রহ্মসনাতনের মানস কন্যা বলতে পারো আমাকে। তিনি খুব ভালো করে জানতেন যে সেই বায়সী, যা আমার পূর্ব জন্ম ছিল, সে তাঁর সমস্ত কথা শোনেন। কিন্তু পরম স্নেহের সাথে তিনি সেই সমস্ত কথা বলে যেতেন। কন্যা ছাড়া কিচ্ছু জ্ঞান করতেন না তিনি আমায়। কন্যা হয়ে কনো রূপ পিতৃসুখ তাঁকে প্রদান করতে পারিনি, কারণ আমি এক বায়সী যে সমাজে থেকেও সমাজ থেকে বহিষ্কৃত, আর তিনি একজন মানুষ, যিনি সমাজে স্থিত।

কিন্তু তারপরেও, একটি বারের জন্যও তিনি আমাকে কন্যা জ্ঞান করা থেকে পিছুপা হননি। এতটাই স্নেহভাব তাঁর, এতটাই প্রেম তাঁর। আর সেই প্রেম অনুভব করে করে, এমন হয়ে গেছি দিদি। সেই প্রেম অনুভব করতে করতে, সকল জীবকে, সকলকে স্বভাবিক ভাবেই নিজের আপন জ্ঞান করতে থেকেছি। আর তার কারণে যখনই কনো কিছু বিচার করে স্থাপন করার প্রয়াসও করি, তখন তা সকলকে প্রভুর কাছে, তাঁর ধ্যানজ্ঞান যাতে বিরাজ করতো, সেই জগন্মাতা মাতা সর্বাম্বার কাছে পৌঁছে দিতে আগ্রহী থাকি।

এই মানুষটা, প্রভু ব্রহ্মসনাতন দিবারাত্র বলতেন, মাতা সর্বাম্বার অপার প্রেম আর স্নেহ দেখে দেখে, সর্বক্ষণ এই প্রয়াস করতে ইচ্ছা হয় যেন সেই সকলের অম্বার ক্রোড়কে যেন সর্বদা পরিপূর্ণ দেখি। জগতের মা তিনি, সমস্ত কিছুর মা তিনি, কিন্তু তাঁর সন্তানরা তাঁকে ভুলে কামনাবাসনায় আসক্ত হয়ে বসে রয়েছে, আর জগদম্বার ক্রোড় রিক্ত। তার জন্য তিনি একা একা বসে বসে কাঁদতেন দিদি, আমি সেই মানুষটাকে কাঁদতে দেখেছি। দিন রাত পরিশ্রম করতে দেখেছি মায়ের ক্রোড় পরিপূর্ণ করার জন্য।

আর তা দেখে দেখে, তাঁর অপার প্রেম দেখে দেখে, আর তাঁর সেই অপার প্রেম যেই মাতার অনন্ত প্রেমকে নিরীক্ষণ করে করে, সেই প্রেমকে অনুমান করার প্রয়াস করার প্রচেষ্টা করতে করে, আমি এমন হয়ে গেছি দিদি। সত্য বলতেন প্রভু। তিনি বলতেন, ‘আমি এমন ছিলাম না, আমি তো অত্যন্ত গবেট ছিলাম একজন। (মাতা সর্বাম্বার উদ্দেশ্যে বলতেন) তোমার প্রেম দেখতে দেখতে কখন যে এমন হয়ে গেলাম, বুঝতেই পারলাম না’।

না আমার তো এতো সামর্থ্য নেই যে, মাতা সর্বাম্বার প্রেমকে অনুভব করতে পারি। প্রভুর প্রেমকে অনুমান করার প্রয়াস করতে করতেই আমার এই হাল। আমার কিচ্ছু বলতে কিচ্ছু সামর্থ্য ছিলনা দিদি, বিশ্বাস করো। পূর্ব জন্মে তো আমি মানুষও ছিলামনা, সামান্য এক বায়সী ছিলাম। কিন্তু কেবল প্রভুর প্রেমকে নিরীক্ষণ করে করে এমন হয়ে গেছি।

আর জানো দিদি, যখন এমন হয়ে গেছি, তা অনুভব করতে পারলাম, তখন একটি বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে গেলাম। নিশ্চিত হয়ে গেলাম যে, মাতা সর্বাম্বা প্রভু ব্রহ্মসনাতনের নিজের চেতনা স্বয়ং। তা না হলে যেই পরিণাম তাঁর হয়েছিল মাতার প্রেম দেখে দেখে, সেই পরিণাম আমারও কি করে হলো? অর্থাৎ প্রভু ব্রহ্মসনাতন স্বয়ং মাতা সর্বাম্বা। নিরাকার, অনন্ত, অসীম, অব্যাক্ত, অচিন্ত্য মাতা সর্বাম্বার স্থূলপ্রকাশ ছিলেন তিনি, নিরাকারের সাকার রূপ ছিলেন তিনি; অব্যাক্তের ব্যক্ত প্রকাশ ছিলেন তিনি।

দিদি, সত্য বলছি, আমি মাতাকে সচক্ষে দেখেছি, কারণ প্রভু ব্রহ্মসনাতনের হাতে তো আমি আমার শেষ নিশ্বাসও ত্যাগ করেছি। নামেই পুরুষ দেহী ছিলেন তিনি। তাঁর হস্তের স্পর্শ ছিল সম্পূর্ণ এক করুণাময়ী নারীর কোমল স্পর্শ। তাঁর অঙ্গে একবিন্দুও স্বেদগন্ধ থাকতো না, তাঁর অঙ্গের স্পর্শ নারীর থেকেও অধিক কোমল। আর তার থেকেও বড় কথা কি জানো দিদি?

মাতা সর্বাম্বা কেবল প্রভুর চেতনা ছিলেন না, তিনি হলেন পরাচেতনা, সমস্ত জীবঅজীবের চেতনা তিনি, আর সেই কারণেই তো আমাদের সকলের চেতনা প্রভুর চেতনার প্রতি আকৃষ্ট হতো। খল, সৎ সকলে আকৃষ্ট হতেন তাঁর দিকে, আর তাই কৃতান্ত গঠন করার জন্য তাঁকে সকলের থেকে বিচ্ছিন্ন  হয়ে যেতে হয়। নিজেকে সম্পূর্ণ ভাবে একঘরে করে নিয়ে তিনি কৃতান্ত রচনা করতেন আর নিজে নিজেই মায়ের কাছে বলতেন, ‘না মা, অনেক কথা হয়েছে, অনেক প্রচার হয়েছে, এবার নির্দিষ্ট গ্রন্থ দরকার, পূর্ণস্বাধীনতা প্রদানের ধর্ম দরকার। একটিই দেহ, সমস্ত কিছু ত্যাগ করে কাজ করতে হবে, তবেই তা নির্মাণ সম্ভব হবে’ ”।

বিজয়া বললেন, “মীনাক্ষী তাহলে রীতিকে যদি সংক্ষিপ্ত ভাবে ব্যখ্যা করি, তাহলে কি রূপ হবে? একজন কৃতান্তিক পুরোহিত শ্রাদ্ধরীতি পালনকর্তার কাছে যাবেন। কিন্তু শ্রাদ্ধ রীতি কে কে পালন করবে?”

মীনাক্ষী বললেন, “৯ থেকে ১৫ দিন অপেক্ষার বিধান দেবেন কৃতান্তিক পুরোহিত, মৃতের পরিবারকে, মৃতের আয়ুর উপর ভিত্তি করে। যদি মৃতের আয়ু স্বল্প হয়, তাহলে তা ১৫ দিন হবে, আর যদি বেশি আয়ুতে তিনি মৃত্যুলাভ করেন, তাহলে ৯ দিন পর্যন্ত তা যেতে পারে, তবে তা সকল ক্ষেত্রেই বিজর সংখ্যা হবে, কারণ মৃত্যু একজনের হয়েছে। স্বল্পবয়সে যার মৃত্যু হয়েছে, তাঁর পরিবারের শোক ও হতাশা অধিক। তাই তাঁদের শোক জ্ঞাপনের জন্য অধিক দিন দেওয়া উচিত, আর অনেক বয়সে মৃত্যু লাভ করলে শোক স্বল্প, তাই স্বল্প দিনের মধ্যে শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা উচিত।

এবং শ্রাদ্ধের কাছে স্বামীস্ত্রী, সন্তানরা, পিতামাতা, তথা ভাইবোন এবং সঙ্গিসাথিরা সকলে মিলে দুইদিনব্যাপী, অর্থাৎ ৯ দিনের শোক হলে, ১০ম ও ১১তম দিবস মৃতের ভ্রান্তি এবং পরজন্মের অবস্থার বিচার করবেন, যেখানে কৃতান্তিক, পূজারি রূপে সকলকে নির্দেশনা করবেন সেই ভ্রান্তি ও পরজন্ম নিরীক্ষণ করার জন্য।

সেই নিরীক্ষণ করার কালে, মাতা সর্বাম্বার উদ্দেশ্যে প্রহরে প্রহরে মহাআরতি করবেন সকলে মিলে, যাতে তিনি সেই নিরীক্ষণ ক্রিয়ার সাক্ষী থেকে, তাঁদেরকে সেই নিরীক্ষণ করতে নিয়তি বেশে সহায়তা করেন। কনো প্রকার মূর্তি বা পট এক্ষেত্রে স্থাপিত হবেনা। কেবলই মাতার প্রিয় রজনীগন্ধা, বা সিউলি, বা যূথিকা, যেই কালে মৃত্যুলাভ করছেন, সেইকালে এই তিনটির মধ্যে যেই পুষ্প হবে, সেই পুষ্পের সর্বদা তাজা মালাকে শূন্য আকারে স্থাপিত করতে হবে গঙ্গা মৃত্তিকার উপর, এবং তাঁকে আরতি করতে হবে।

যদি মাল্য সিউলির হয় বা যূথিকার হয়, তাহলে প্রহরে প্রহরে মাল্য পাল্টাতেও হতে পারে, কারণ তারা বেশিক্ষণ তাজা থাকেনা। কিন্তু কনো মূর্তি থাকবেনা, মাতাকে এখানে নিয়তি বেশে অর্থাৎ গুহ্যা বেশে আহ্বান করা হচ্ছে। তাই তিনি হলেন পরাশূন্য ব্রহ্মময়ী, অর্থাৎ সম্পূর্ণ ভাবে নিরাকার মহাশূন্য, তাই শূন্যের আকারে মালাঅর্পণ।

আর এই কর্মে দুইদিনে সম্পন্ন করার পর, ঠিক যেমন জন্মের রীতির পর, শিশুর প্রতি সকলের শুভেচ্ছা লাভের জন্য সকল আত্মীয়কে নিমন্ত্রণ করে ভরপেট আমিষ আহার করাতে হয়, এক্ষেত্রেও তেমনই সকলকে নিমন্ত্রণ করে আমিষ আহার করাতে হয়। যতক্ষণ না সকলকে আমিষ আহার করিয়ে সকলের থেকে মৃতের পুনর্জন্ম হবার জন্য বাসনাকে গ্রহণ করা হয়, শ্রাদ্ধে উপনীত ব্যক্তিরা স্বজনের মৃত্যুর মুহূর্ত থেকে ততক্ষণ পর্যন্ত নিরামিষ আহার ভোজন করবেন। এবং অন্তে নিজেরাও আমিষ ভোজন করে, সমস্ত রীতির সমাপ্তি করে, কৃতান্তিককে দক্ষিণা প্রদান করবেন”।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28