১৯। রীতি অধ্যায়
দক্ষিণ থেকে আগত এক পুরুষ, নাম বালেন্দ্র, যাকে সকলে বালা নামেই ডাকেন, তিনি এবার বললেন, “তাহলে কি দেবী, রীতির কনো মূল্য নেই? রীতি থাকা কি তাহলে ভালো নয় সমাজের জন্য বা কনো সপ্রদায়ের জন্য?”
উত্তরে মীনাক্ষী হাস্য প্রদান করে বললেন, “রীতি ততক্ষণই ভালো বা উপকারের যতক্ষণ তা তোমার সম্প্রদায়ের দর্শনকে স্পষ্ট ভাবে ব্যক্ত করছে বা করবে। অর্থাৎ এই নয় যে, তোমার সম্প্রদায়ের দর্শনকে অন্তরে লুকিয়ে রেখে কনো রীতি নির্মিত হবে, আর তাকে তোমরা কেবল এটা জেনেই মান্য করবে যে, তা কনো না কনো দর্শনকে ধারণ করেই স্থাপিত।
যতক্ষণ তোমরা সেই রীতির অন্তরে থাকা পূর্ণ দর্শনকে জানবে, ততক্ষণই সেটি রীতি নয়, দর্শন। আর যেই মুহূর্ত থেকে তার অন্তরের দর্শনকে ভুলে গিয়ে, কেবলই আচার অনুসারে তাকে পালন করবে, তা হয়ে যায় রীতি। সেই দর্শনকে যদি ব্যক্ত করে, সেই দর্শনকে ধারণ করে, সেই দর্শনকে স্মরণ রেখে যতক্ষণ সেই একই আচার পালন করবে, তা তো রীতি থাকেই না, তা যে কেবলই দর্শন সেই কালে।
খেয়াল করো পূর্বেই বলেছি এই কথা যে, যেই ধর্মকে, সম্প্রদায়কে বা সমাজকে তার রীতির দ্বারা চিহ্নিত করতে হয়, সেই ধর্ম, সেই সম্প্রদায়, বা সেই সমাজ একটি আবর্জনাতে পরিণত হয়ে গেছে, যার একটিই পরিণাম হতে পারে, সার্বিক বিনাশ। ধর্ম, সম্প্রদায় বা সমাজকে রীতি দ্বারা নয়, তার দর্শন দ্বারা যতদিন চিহ্নিত করা সম্ভব হয়, ততদিনই সেই সম্প্রদায়, সেই ধর্ম বা সেই সমাজ সজীব, গ্রহণযোগ্য এবং মানবতার কল্যাণকারী।
যেই ক্ষণে সেই দর্শন হারিয়ে গিয়ে, কেবলই সেই দর্শনের খোল অর্থাৎ রীতি পরে থাকে, তা আর মানবতার কল্যাণ সাধনের অবস্থায় স্থাপিত থাকেনা। সেই ধর্ম বা সেই সম্প্রদায় বা সেই সমাজ মানবতাকে তখন কেবলই ধ্বংসের উদ্দেশ্যে নিয়ে যায়। তাই বালা, কোন ধর্ম বা সম্প্রদায়, বা সমাজ কতটা প্রাচীন, তার নিরিখে তার গ্রহণযোগ্যতা কখনোই নির্ভরশীল নয়। যখন কেবলই তার প্রাচীনতার কারণে তা গ্রহণ যোগ্য হয়, তখন তাকে গ্রহণ করার মানেই ধ্বংসের আবাহন করা হয়”।
১৯.১। রীতিদর্শন পর্ব
মীনাক্ষী আবার একটু মৃদু হেসে বললেন, “যদি প্রাচীন হবারই কথা বলো, তাহলে তো এই জম্বুদেশই সর্বাধিক প্রাচীন। তাহলে কেন এঁকে ধারণ করা হচ্ছে না! … বিচার করে দেখো, এই দেশের প্রাচীন নাম কি ছিল? জম্বু দেশ, আর সেই নাম কিসের কারণে উপস্থিত হয়? জম্বুদ্বিপের কারণে। আর সেই দ্বীপ কোথায় স্থাপিত? সাগরের দক্ষিণ পূর্ব কোণে তা স্থাপিত। অর্থাৎ, এই জম্বুদেশ, যাকে এককালে বঙ্গদেশ বলা হতো, আর তারপরে এর বৃহত্তর অংশকে গৌড় দেশ বলা হতো, তাই তো আদিম দেশ।
এখানের অধিবাসীরাই তো এই সম্পূর্ণ দেশের আদিবাসী। তাহলে তাঁদেরকে কেন অনুসরণ করা হয়না! … যাদেরকে তোমরা সনাতন বলো, অর্থাৎ আর্য, তাঁরা তো এই দেশের আদিবাসীই নন! তাঁরা তো ইউরোপীয়। মধ্য ইউরোপীয় দেশের অধিবাসী তাঁরা, যারা আফগান দেশের বালখ অঞ্চলে এসে উপনিবেশ স্থাপন করে মহম্মদের জন্মের আগেপরে।
আব্রামের উত্থানের কালে, সেই আধামানুষ, আধাপশুর মূর্তি নির্মাণ করা, সেই একমাত্র মূর্তিপূজা বিশ্বাসী জাতির জ্বালায় অস্থির হয়ে ওঠে আফগান অধিবাসী, কারণ তাঁরা মূর্তিকে দেব মেনে, সেই দেবকে সন্তুষ্ট করার নাম করে করে, মরদদের বলি চরিয়ে, তাঁদের সমস্ত সম্পত্তি আত্মসাৎ করে নিতেন আর তাঁদের স্ত্রী কন্যাদের দেহসম্ভোগ করে, চরম অত্যাচারী হয়ে উঠেছিলেন। তাই আব্রামের উত্থানের কালে, তাদের আফগানের বালখ অঞ্চল থেকে বহিষ্কার করে দেওয়া হয়, আর তারা এরপর এসে উপস্থিত হয়, জনমানবশূন্য সিন্ধু নদীর উপকুলে।
সিন্ধু নদীর থেকে তাঁরা আর পূর্বে আসতে সক্ষম হয়নি, কারণ সেখানে বৌদ্ধদের বহুপ্রাচীন ও উন্নত দর্শনের প্লাবনে মানুষ প্লাবিত থাকতো। কিন্তু আগ্রাসী জাতি এই আর্যরা। হার মানতে তারা শেখেনি, অত্যাচারের কনো সীমা তাঁরা জানে না, সম্ভোগই তাঁদের অস্তিত্বের একমাত্র উদ্দেশ্য। আমিত্ব বা আত্ম তাঁদের পূজার পাত্র। তাই তাঁরা বৌদ্ধদের পাঠ গ্রহণ করতে শুরু করলো। আর সেই পাঠ গ্রহণ করেই করেই, নিজেদের আরাধ্য অর্থাৎ আত্মকে বিবরণ দেওয়া শুরু করে বেদের রচনা করলো।
আর তা করার পরে, যেমন আর্যদের স্বভাব। স্বভাবসিদ্ধ ভাবেই তারা খল, মিথ্যাচারী আর অত্যাচারী। নাট্য তাদের শীরায় শীরায়, মিথ্যা ও অপপ্রচার তাদের নিশ্বাস প্রশ্বাস। তাই তারা প্রচার করা শুরু করলো যে, বেদ বহু প্রাচীন, আর বেদের থেকেই সকলে সকল দর্শন চৌর্য করেছে। সামর্থ্য তাঁদের অতি ক্ষীণ। আত্মের পূজারি, তাঁদের কাছে চেতনার সামর্থ্য কি ভাবে থাকবে?
তাই, না ছিল তাদের কাছে কনো পবিত্র সম্পদ, আর না ছিল মহাশ্বেতার কনো গুণ অর্থাৎ না ছিল কনো কলাজ্ঞান বা কনো কলার বোধ বা প্রতিভা। অত্যন্ত অলস তারা। কেনই বা হবেন না অলস। যখন কিছু মিথ্যাচার করে করেই অন্যের কষ্টের উপার্জন হরণ করে নিয়ে নিজে ধনী হয়ে ওঠা সম্ভব, তখন পরিশ্রম করার আবশ্যকতাই বা কি?
তবে প্রকৃতি, যার উপাসনা বুদ্ধরা করতেন, যাকে বুদ্ধরা মা নামে ডাকতেন, তাঁকে যমের মত ভয় পান এই আর্যরা, কারণ তাঁরা ছলে বলে কৌশলে যা যা হরপ করে নেন সকলের থেকে, প্রকৃতি প্লাবন, খরা, তুফান, কম্পন ইত্যাদি উপায়ে তাঁদের থেকে সমস্ত কিছু কেড়ে নিত। তাই তাঁরা বৌদ্ধ গ্রন্থ সমূহ, যা দর্শনের আদিম উপস্থাপনা মানব জাতির হতে, তাকে অধিক ধ্যান দ্বারা পাঠ করে, হোমযজ্ঞাদির রীতি শুরু করেন প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করে করে আমিত্ব বা আত্ম বা পরমাত্মের বিস্তার করার উদ্দেশ্যে।
আর এই নিজস্ব আবিষ্কার লাভ করে, তারা এবার বেদকে সর্বসমক্ষে উপস্থাপনের জন্য প্রস্তুত হয়ে ওঠে, কারণ এই বেদে প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণের তত্ত্ব স্থাপিত আছে, এই বিশ্বাস তাঁরা নিজেরাও করতো, আর সকলকে করাতো। তবে কাব্যগুণ তাঁদের নেই, নেই সেই কাব্যকে লিপিবদ্ধ করার জন্য যেই পরিশ্রম প্রয়োজন, সেই পরিশ্রম করার সামর্থ্য। তবে নিজেদের দুর্বলতাকে নিজেদের শক্তিরূপে প্রদর্শন করতে এই নাট্যপ্রিয় সম্প্রদায় বেশ ভালো জানতেন।
তাই তাঁরা এমন প্রচার করলেন যে এই বেদ এতটাই প্রাচীন যে, তা কেবলই লোক মুখে প্রচারিত, তার কোন গ্রন্থ প্রকাশ নেই। এই যুক্তি সকলকে বেশ প্রভাবিত করতে শুরু করে, আর তাই একাংশ মানুষ এই বেদকে, এই আর্যদের এবং এই বেদকে মান্য করা বৈদিক ধর্মীয় ব্যক্তিদের আদিম মানতে শুরু করে দেয়। আর যতই তাদেরকে আদিম মানতে শুরু করে সকলে, ততই এই বৈদিকরা বুদ্ধদের দর্শনকে এই বৃহত্তর জম্বুদেশ থেকে অপসারিত করে, এই দেশকে আর্যবার্ত্য রূপে স্থাপিত করে দেয়, আর এক কথায় বলতে গেলে এই দেশের বৃহত্তর অংশকেই অধিকার করে নেয়।
বুদ্ধরা প্রকৃতির আরাধনা করতেন, আত্মকে এই প্রকৃতি ধ্বংস করার কাণ্ডারি রূপে সনাক্ত করতেন। আর এঁদের ঠিক বিপরতি হলেন এই বৈদিকরা, যারা আত্মের আরাধনা করতেন, পরমাত্মরূপে আত্মের ত্রিগুণ, অর্থাৎ সত্ত্ব, রজ ও তমকে স্থাপিত করে তাঁদের ত্রিদেব রূপে আখ্যা প্রদান করতেন, আর প্রকৃতিকে শত্রু জ্ঞান করে, প্রকৃতিকে বশ করার জন্য যজ্ঞাদি করে ফিরতেন।
ক্রমে তাঁরা রাজা উপরাজা স্থাপিত করেন দেশের বলিষ্ঠ পুরুষদের দ্বারা, আর তাদের যুদ্ধ করে, পরিশ্রম করে স্থাপিত রাজ্যকে প্রকৃতি ধ্বংস করে দেবে, সেই ভয় দেখিয়ে, তাঁদেরকে দিয়েও প্রকৃতি বিরোধী যজ্ঞাদিতে ব্রতী করান, এবং নিজেদের অধিকারে সেই শক্তিশালী রাজনদের স্থাপিত করে নিলে, নিজেদেরকে ব্রাহ্মণ বলেন আর এঁদেরকে ক্ষত্রিয়।
কিন্তু বাঁধ সারে, এই দেশের আদিবাসী, অর্থাৎ এই বঙ্গীয় গৌড়দেশের অধিবাসীরা আর দক্ষিণের আদিবাসী অর্থাৎ দ্রাবিড়রা। বালখ অঞ্চল থেকে বিতাড়িত হলে, সেখানের অধিবাসীদের এক অংশ রোম অঞ্চলে চলে যায় এবং সেখানেও মূর্তিপূজা ধারণ করেন, এবং সেখানের পরিশ্রমীদের ধন সম্পদ ও ইজ্জত লুণ্ঠন করে করে বিশাল রাজবংশ ধারণ করে, নিজেদের উন্নত সভ্যতা বলা শুরু করেন। একই সঙ্গে বিতাড়িত হবার কালে, তাঁদেরই একটি সম্প্রদায় বর্তমান আফ্রিকায় চলে যান।
প্রকৃতি থেকে তাঁরা ভয় পান, তাই আফ্রিকার অরণ্য অঞ্চলে তাঁরা পা দেন না, তবে নদী তাঁরা পছন্দ করেন, তাই নীলনদকে ধারণ করে তাঁরা সেখানে ফেরো সভ্যতা স্থাপন করে, এবং একই ভাবে পরিশ্রমীদের ধন, সম্পদ ও ইজ্জত লুণ্ঠন করে করে, সেখানেও বিত্তবান হয়ে ওঠেন। এই দুই দেশের থেকে, দ্রাবিড়দের বাণিজ্যসহায়তা প্রদান করে করে, তাঁদেরকে ক্রমে অধিকার করে নেন এই বৈদিকরা। কিন্তু বাঁধ সারে এই গৌড়দেশের অধিবাসী।
ভাষায়, দর্শনে, কৃষি কর্মে, এবং প্রকৃতি বিজ্ঞানে তাঁরা অত্যন্ত উর্বর। প্রকৃতি তাঁদের কাছে নিজের জননী, অত্যন্ত আপন, আর প্রকৃতিরও যেন তাঁরা আপন সন্তান, তাই প্রকৃতিও যেন সর্বদা এঁদেরকে ফুল, ফল, খনিজ ইত্যাদিতে পরিপূর্ণ রাখে। তাই কিছুতেই এই অঞ্চলের তিন অংশ, অর্থাৎ অটবিতে আধারিত বঙ্গদেশ, শিক্ষাবলে বলিয়ান মগধ দেশ, এবং শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চায় অদ্বিতিয়ম উৎকলদেশ বৈদিকদের হস্তান্তর হতে পারেনা।
কিন্তু এমনই সময়ে, গৌতম বুদ্ধ, যিনি হলেন অন্তিম ও ২৭তম বুদ্ধ, এবং তীর্থঙ্কর, যিনি হলেন ২৩ তম ও অন্তিম জৈন পয়গম্বর, এঁদের বিস্তার মগধে হতে, বৈদিকরা এক মহাপ্রহার লাভ করে এই আদিবাসী গৌড়দেশ থেকে। এঁদের আগমনের কালে, গুহাবাসী হয়ে যেতে বাধ্য হলেও, এঁরা দেহলীলা সমাপ্ত করার পর পুনরায় আগ্রাসী হয়ে বৈদিকরা প্রসারে নির্গত হয়ে, মগধকে চাণক্যের ধূর্ততা দ্বারা ছিনিয়ে নিতে খানিকটা সচেষ্ট হয়ে, নূতন নাম অর্থাৎ হিন্দু উপাধি পেলেন নিজেদেরই আদিম শাখা, যবনদের থেকে, আর হিন্দুস্থান স্থাপন করলেন।
কিন্তু চাণক্যের দ্বারা যেই আগ্রাসন করেছিলেন বৈদিকরা, সেই ছলকে অতি সহজেই ভেদ করে ফেলেন চন্দ্রগুপ্ত পুত্র বিন্দুসার এবং চাণক্যকে বিষপ্রয়োগ করে মৃত্যু প্রদান করেন। … এরই মাঝে দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ আঘাত পেয়ে যায় বৈদিকরা এই দেশেই, আর এই দেশের বাইরেও। দেশের বাইরে আঘাত আসে ঈশা ও মহম্মদের থেকে, তো দেশের মধ্যে সেই আঘাত নয় মহা-প্রহার আসে মার্কণ্ড, বাল্মীকি ও ব্যাসের থেকে। পরস্পর এই তিন আঘাত, বৈদিকদের সমস্ত সাজানো সাম্রাজ্যকে প্রায় বিনষ্ট করে দিতে উদ্যমী হলে, বৈদিকরা নিজেদের ক্ষতচিহ্ন অপসারণে ব্যস্ত হয়ে ওঠে।
এই সমস্ত উদ্যমের কাণ্ডারি হলেন দধীচি, তাঁকে হত্যা করলেও, তাঁর পুত্র পিপলাদ ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। মার্কণ্ডকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করে, রম্যরচনা করলেও, পিপলাদ তাঁকে রক্ষা করে বঙ্গদেশে প্রেরণ করে তন্ত্রের রচনা করে প্রকৃতির আরাধনা পুনরায় স্থাপিত করতে সহায়তা করেন। অন্যদিকে বাল্মীকি ও ব্যাসের চেতনাকেন্দ্রিক রচনা, অর্থাৎ রামায়ণ ও জয়াকে হজম করে নিতে অত্যন্ত কাঠখড় পোড়াতে হয় বৈদিকদের।
বেদকে এবার বাধ্য হয় লিখিত অবস্থায় আনার জন্য, নাহলে রামায়ণ ও জয়া তাঁদের বেদকেই উৎখাত করে ফেলে দেবে। তাই বেদকে লিখিত রূপে এনে, বাল্মীকি রচিত রামায়ণের মধ্যে স্থানে স্থানে নিজেদের আরাধ্য আত্মের বা অহংকারের ত্রিগুণের নাম প্রবেশ করিয়ে করিয়ে সম্পূর্ণ রামায়ণকে বিক্ষিপ্ত করে দিয়ে, বৈদিকরা প্রচার করা শুরু করে যে, রামায়ণ তাঁদেরই রচনা, বৈদিক গ্রন্থ তা। কিন্তু জয়ার ক্ষেত্রে সেই কাজ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে ওঠে।
তাই ৬০ হাজার শ্লোকের জয়াকে কেবল পরিবর্তিত করেই হয়না, তার সাথে আরো ৪০ হাজার শ্লোক যুক্ত করে তাকে এক লক্ষ শ্লোকের মহাভারত করে তুলে, তাকে প্রচার করতে শুরু করে যে তা বৈদিক গ্রন্থ। কিন্তু এই দুইগ্রন্থকে কনো না কনো ভাবে নিজেদের গ্রন্থ বলে দিলেও, অর্থাৎ এই দুই গ্রন্থে বর্ণিত নায়ক, অর্থাৎ বিবেককে নিজেদের রজগুণের অবতার রূপে ব্যক্ত করে দিলেও, মার্কণ্ডের রচনাকে নিয়ে কিছুই করতে পারেনা তাঁরা।
মার্কণ্ড রচনা যে সম্পূর্ণ পরাপ্রকৃতিকে ঘিরে। তাই মার্কণ্ডের রচনাকে যেখানে যেখানে পেলেন জ্বালিয়ে দেওয়া শুরু করলেন, যদিও এই বঙ্গদেশ থেকে তা সম্পূর্ণ জ্বালিয়ে দিতে পারেন নি, আর এখানে থেকেই পরিবর্তীতে লব্ধ হয় নবদুর্গাতত্ত্ব এবং দশমহাবিদ্যা তত্ত্ব, ভৈরবতত্ত্ব এবং দক্ষতত্ত্ব। আর তা লব্ধ হতেই, সেই কালে দেহে উপস্থিত ব্যাস তাদেরকে নিয়ে রচনা করে করে, শিবপুরাণ, দেবীপুরাণ, স্কন্ধ পুরাণ এবং মার্কণ্ড পুরাণ রূপে স্থাপিত করে দেন অতি কৌশলে।
সেই গ্রন্থাদি বড়ই অদ্ভুত, কারণ একই সাথে মার্কণ্ডের ব্যক্ত সমস্ত তত্ত্বের সার ব্যক্ত করে দেন ব্যাস, আর সেই সঙ্গে তিনি জানেন যে বৈদিকরা মার্কণ্ডের কীর্তির নাশ করতে চান, তাই বৈদিকদের তোষামোদকারী বৈদিকভানও সেই গ্রন্থে স্থাপিত করে রেখে, অক্ষয় করে দেন গ্রন্থাদিদের।
এই তুফান সবে কাটিয়ে উঠতে শুরু করেছিল ব্রাহ্মণ অর্থাৎ বৈদিকরা, মগধে চাণক্যকে প্রেরণ করে, জয়াকে মহাভারত করে, এবং মার্কণ্ড স্থাপিত তন্ত্রদর্শনে বৈদিকদের প্রেরণ করে ভণ্ড তান্ত্রিক নির্মাণ করে করে, ঠিক সেই কালে মহান সম্রাট অশোকের উত্থান হয়ে যায়, আর বৈদিকদের সমস্ত পরিশ্রমে প্রায় জলই ঢেলে দেয়। অশোকের পরাক্রমের কাছে, প্রায় সমস্ত বৈদিক স্থাপিত ক্ষত্রিয়রা মৃত্যু লাভ করতে শুরু করে দেয়। খরকুটোর মত উড়ে যায় অশোকের প্রতাপের সম্মুখে, বৈদিকদের সজ্জিত ক্ষত্রিয়কুল।
অতিক্ষিপ্র এই অশোকের থেকে নিস্তার পেতে, বৈদিকদের গুহাবাসী হতে হয়, আর যাতে নিজেদের সাজানো সাম্রাজ্য নষ্ট না হয়ে যায়, তার কারণে তাদেরকে আজিবকের সাথে সাখ্যাত করে, তাঁদেরকে প্রেরণ করতে হয় অশোককে শান্ত করতে, কারণ অশোক বৈদিকদের সমস্ত কুকীর্তি, কুমন্ত্রণা, এবং ষড়যন্ত্রকে জেনে ফেলে, বৈদিকদের শক্তি অর্থাৎ ক্ষত্রীয়কুলকেই নাশ করার উদ্দেশ্যে ধাবিত ছিল।
তাঁর এই ইতিহাস উদ্ধার, আর মানবতাকে মানবতার বিষ, অর্থাৎ বৈদিকদের থেকে উদ্ধার করার প্রয়াসের কারণে তাঁকে প্রায়শই মহান সম্রাট বলা হতো, আর তার আরো একটি কারণ হলো, সমাজে যেই শূদ্রবৈষম্যের রচনা করে বৈদিকরা সাধারণদের লুণ্ঠন করতো ক্ষত্রিয়দের মাধ্যমে, সেই ব্যবস্থাকে নষ্ট করে, শূদ্রসম্মানের ব্যবস্থা করে মানবতাকে উদ্ধারের ভূমিকায় তিনি আসীন হয়েছিলেন।
কিন্তু অশোকের আগ্রাসন থেকে আজিবকের হস্তক্ষেপও বাচাতে পারেনা বৈদিকদের। বৌদ্ধধারণ করে, অশোক অন্যপ্রকার আগ্রাসন ধারণ করে, এবং প্রায় সম্পূর্ণ ভারতভূমিকে বৌদ্ধরাজ্যে পরিণত করা শুরু করে দেয়। বদ্রিনাথ থেকে কাশি, কলিঙ্গ থেকে চোল, সমস্ত স্থানে বৌদ্ধ ধারার বিস্তার ঘটে অশোকের কালে, এবং ক্রমে তা ভারতের বাইরে লঙ্কা, বা আরাকানদের কাছেও উপস্থিত হতে শুরু করে।
কোণঠাসা বৈদিকরা তাও একটিবারও সাহস দেখালেন না অশোকের সময়ে উত্থান করার। অপেক্ষা করলেন অশোকের মহাপ্রয়াণের। আর তারপরেই পুনরায় আগ্রাসন শুরু করে, অশোকের স্থপিত সমস্ত বৌদ্ধস্তূপকে হয় শিবলিঙ্গ করে, নয় বিষ্ণুমূর্তি করে স্থাপিত করা শুরু করলেন। প্রায় অধিকাংশ বৌদ্ধমঠকে ধ্বংস করে মন্দির স্থাপন করে দেয়, আর বদ্রিনাথের মত বেশ কিছু ক্ষেত্রে তো বৌদ্ধ মন্দিরের আকারও পরিবর্তন না করে তাকে বৈদিকদের উপাসনা ক্ষেত্র করে দেন।
এরপরেও, ব্রাহ্মণত্বের উপর আক্রমণ আসে শঙ্করের বেদান্তের দ্বারা, চৈতন্য মহাপ্রভুর দ্বারা, রামকৃষ্ণ ঠাকুর দ্বারা, কিন্তু বৈদিকদের ইতিহাসকে সম্পূর্ণ ব্যক্ত করতে পারেননি তাঁরা। আর তাই প্রভু ব্রহ্মসনাতন এসে সেই কথাকে সম্পূর্ণ ভাবে ব্যক্ত করে গেলেন। তাঁর থেকে যা কিছু আমি জেনেছিলাম, তা সমস্ত কিছু ব্যক্ত করলাম। আশা করি যে আরো যদি কিছু বলার হয়, তবে নিশ্চিত ভাবে মাতা সর্বাম্বা আমাদেরকে তা কনো না কনো ভাবে প্রদান করবেন।
কিন্তু এবার আসি মধ্যা কথাতে। এই সম্পূর্ণ গাঁথা থেকে কি জানলে? কি বুঝলে? তোমরা যাকে হিন্দু ধর্ম বলো, সেই বৈদিক ধর্ম কি আদি? নাকি তা সনাতন? … দুটিই নয়। না তো সে আদিম, আর না সে সনাতন। সনাতন ধর্ম বলে কিছুই নেই, কারণ যদি ইতিহাসের পাতা ওলটাও, তাহলে দেখবে, মার্কণ্ড-বাল্মীকি-ব্যাসের জন্মের কালে, অর্থাৎ বৈদিক ধর্ম যখন থেকে নিজেকে সঠিক করে সামলাতে শুরু করছে, সেই কালে ২৫ তম নবী এসে গেছে ইসলাম ধর্মে; সেই কালে ২৪ তম জৈন তীর্থঙ্কর এসে গেছে অর্থাৎ মহাবীর; সেই কালে ২৭ তম বুদ্ধ অর্থাৎ গৌতম বুদ্ধ এসে গেছেন।
সেই কাল বর্তমান থেকে প্রায় ৩ হাজার বছরের পুরানো কাল। সেই কালে ২৫, ২৪, ২৭ তম নবী, তীর্থঙ্কর বা বুদ্ধ। প্রতিটি নবীর কালকে যদি এক শত বৎসর ধারণ করো, এবং তাঁর আগেপরে মিলিয়ে একশত বৎসর করে অন্তর রাখো পূর্বের নবীর এবং পরবর্তী নবীর মধ্যে, তাহলেও প্রায় ৫ হাজার বছরের সময়কাল লাভ করো। অর্থাৎ বুঝতে পারছো, যেই কালে বৈদিকদের উত্থান হয়, সেই কালে তিনতিনটি মূলধর্মের স্রোত ইতিমধ্যেই ৫ হাজার বৎসর মানবতার সেবা করে ফেলেছেন।
তাহলে তোমরা প্রবীণের কথা বলো কি ভাবে? স্বয়ং নবীন হয়ে এবং নিজের প্রচার করে, প্রবীণকে গ্রহণ করার কথা বলো কি ভাবে? বৈদিক বা আর্য বা হিন্দু, তা কি নিজে প্রবীণ? সে তো নিজেই প্রবীণ নয়। তাই প্রবীণতার অপপ্রচার যখন হবে, তার সম্মুখে যেমন প্রভু ব্রহ্মসনাতন ইতিহাসের নগ্ন পাতা খুলে দিতেন, তেমন করেই নগ্ন পাতা খুলে দাও।
তবে পুনরায় বলি, প্রভু ব্রহ্মসনাতনও বলতেন, প্রবীণতা বা নবীনতা শ্রেষ্ঠত্বকে বিচার করেনা। শ্রেষ্ঠত্বকে বিচার করে তার দর্শন। যেই দর্শন আত্মসর্বস্ব, যেই ধর্মের বীজই আত্ম, আরাধ্যই পরমাত্ম, অর্থাৎ আমিত্বের পূজারি যারা, তাদের সমস্ত দর্শনও আমিত্বকেন্দ্রিক, আর সকল রীতিও। আর তাই তো তাঁরা ক্রমে ক্রমে সমস্ত রীতির মধ্যে থাকা দর্শনের কথা বলাই বন্ধ করে দেয়, যাতে সেই আমিত্বের পূজার কথা মানুষ ভুলে যান।
বিলিতিরা এই দেশে এসে, রাম কে রামা বলেন, শিবকে শিবা বলেন, আত্মকে আত্মা বলেন, পরমাত্মকে পরমাত্মা বলেন। রামকে রামা বলাতেও বৈদিকরা রাম শব্দকেই ধরে থাকে, শিবকে শিবা বলাতেও শিব শব্দকেই ধরে থাকে বৈদিকরা। কিন্তু যেই ক্ষণে আত্মকে আত্মা, বা পরমাত্মকে পরমাত্মা বলা হয়, আর তারা দেখে যে এই আত্মা আর পরমাত্মা শব্দ শোনা মাত্রই সকলে ভুলে গেলেন যে আত্মার প্রকৃত শব্দ হলো আত্ম যার মানে অহং বা আমিত্ব, তাই আত্ম শব্দকে নিজেদের সমস্ত গ্রন্থপৃষ্ঠা থেকে অপসারণ করে করে আত্মা শব্দকে স্থাপন করতে শুরু করে দিলেন। পরমাত্ম শব্দকে অপসারণ করে করে পরমাত্মা শব্দ প্রয়োগ করা শুরু করে দিলেন।
আর এতে কি হল? যদি কনো মেধাবী সম্মুখে এসে গিয়ে বলেন, এই সম্প্রদায়, এই জাতি আত্মের পূজা করে, আমিত্বের পূজা করে, অহংকারের আরাধনা করে, তাকে মিথ্যা প্রমাণ করার জন্য তাদের কাছে অস্ত্র রইল যে, আত্ম না আত্মার পূজা করি আমরা, পরমাত্ম না পরমাত্মার পূজা করি আমরা। … কিন্তু মূর্খরা ভুলে গেছে যে, সংস্কৃত শব্দাবলীতে, ‘আ’ এই অক্ষরকে মাত্রা রূপে ব্যবহার করার অর্থ হলো নিষ্ক্রিয়কে সক্রিয় বোঝাতে। অর্থাৎ আত্ম না বলে আত্মা বলার অর্থ হলো, সক্রিয় আত্ম, বা আমিত্বের বড়াই করা। অর্থাৎ পূর্বে যদি তাঁরা ব্যঘ্রের খাঁচায় আবদ্ধ ছিল, এখন তাঁরা হায়নার খাঁচায় বদ্ধ। ব্যঘ্র যদি দয়া দেখালেও দেখায়, হায়নার দেহে দয়া নামক বস্তুর কনো অস্তিত্বই নেই।
তাই, যতই আত্ম থেকে আত্মাতে চলে যাক, যতই পরমাত্ম থেকে পরমাত্মাতে চলে যাক, যতই রীতির অন্তরে থাকা আমিত্বের দর্শনকে লুকিয়ে রাখতে, রীতিকে রেওয়াজে পরিণত করে দিক, তারা মানবতার শত্রু ছিল, আর চিরকালই তা থাকবে।
তাই বালা, যদি সত্য সত্যই মানবতার কল্যাণের উদ্দেশ্যে রীতি স্থাপিত করতে হয়, তাহলে সেই রীতির অন্তরে স্থিত দর্শনকে কখনো অবলুপ্ত হতে দেবে না, এবং সেই রীতির মধ্যে একটি অভিন্ন অংশ রেখে দাও যে, যিনি রীতির পালন করাবেন, তিনি যেমন অবশ্যই সেই রিরিত অন্তরে থাকা দর্শন ব্যক্ত করবেন, এবং যাদের দ্বারা সেই রীতির পালন করাবেন, তাদেরকে দিয়ে অবশ্যই সেই দর্শন পাঠ করাবেন, যাতে তাঁরা সেই রীতিকে গ্রহণ করুন বা না করুন, সেই দর্শনকে অবশ্যই বিচার করেন, এবং বিচারের উপরান্তে সহমত হলে তা গ্রহণ করেন।
বালা, বিনা বিচারে কনো কিছু গ্রহণের অর্থই হলো অন্ধবিশ্বাস। তাই যদি তোমার স্থাপিত রীতির দর্শনকে বিচার করার জন্য তোমার ১ শতজন অনুগামী কমে গিয়ে ১০জন অনুগামী হয় যান, তাও শ্রেয়, কিন্তু অন্ধবিশ্বাসের বিস্তার তো কিছুতেই করবেনা। অর্থাৎ স্পষ্ট কথা এই যে, তোমার স্থাপিত রীতির অন্তরে থাকা দর্শনকে প্রথম ব্যক্ত করবে, অতঃপরে যাকে তা ব্যক্ত করলে, তাকে তা বিচার করার অবকাশ প্রদান করবে। যদি বিচার করার পরেও তিনি সেই দর্শনকে গ্রহণ করতে সম্মত থাকেন, তবে সেই দর্শনকে আধার করে রেখে যেই রীতি স্থাপিত, তাকে দর্শনের সাথে মিলিয়ে মিলয়ে বলে, তা পালন করাবে।
এটিই যথার্থ অভ্যাস, আর এই অভ্যাসের ফলে তোমার সম্প্রদায় ছোটো হয়ে যেতে পারে, ক্ষুদ্র হয়ে যেতে পারে, অবলুপ্তও হয়ে যেতে পারে, কিন্তু যতদিন অবলুপ্ত হবেনা, ততদিন নিশ্চিত থাকতে পারো যে, তোমার সম্প্রদায়ে একটিও অন্ধবিশ্বাসী নেই। যারা আছে, তাঁরা হতে পারে মাত্র ১০জন, তাঁরা সজ্ঞানে, পূর্ণ সচেতনতা ধারণ করে, পুর্নাঙ্গ ভাবে তাতে আছেন। বালা, ভাই আমার, আমার পিছনে কয়জন রয়েছে, তা গুরুত্বপূর্ণ নয়, আমার সাথে যেই কয়জন আছে, তারা আমার মৃত্যু পর্যন্ত এবং মৃত্যুর পরেও আমার সাথে থাকবে, সেইটিই গুরুত্বপূর্ণ। আর সেটিকেই সর্বদা গুরুত্ব প্রদান করো।
যেই ক্ষণ থেকে তোমার পিছনে কয়জন আছে, তার বিচার করতে যাবে, সেই ক্ষণ থেকে তুমি মানবিকতার শত্রু হয়ে উঠতে শুরু করবে, কারণ তুমি তোমার পিছনে যারা আছেন, তাঁদের সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য সেই সেই কৌশল অবলম্বন করবে, যা মানবতার বিনাশের কারণ হবে। কিন্তু যেদিন পর্যন্ত কেবল ও কেবল মাত্র যথার্থকেই সঙ্গে রাখার অঙ্গিকার করে রেখে, যিনি আছেন তাঁকে রীতিদ্বারা বন্ধনে আবদ্ধ না করে, দর্শন দ্বারা উর্বর করতে সচেষ্ট হবে, জানবে তুমি হয়তো মাত্র ১০জনের হিত করতে পারবে, কিন্তু সেই মাত্র ১০জন সম্পূর্ণ মানবতাকে রক্ষা করতে সক্ষম ও তৎপর।
তাই, রীতিকে সর্বদা দর্শন মণ্ডিত রাখো, আর সর্বদা রীতি স্থাপনের কালে দর্শনের ব্যখ্যা যেমন দেবে, তেমনই রীতিকে নয়, দর্শনকেই স্মরণ রাখার দিকে দৃষ্টি রাখবে। অর্থাৎ মধ্যা কথা এই যে, রীতি ভুলে গেলেও দর্শন যেন না ভুলে যাওয়া হয়, এটি সর্বক্ষণ স্মরণ রাখবে। রীতি আজ ভাঙবে, কাল গড়বে। একই দর্শনকে কেন্দ্র করে সহস্র রীতি নির্মাণ করা সম্ভব। তাই রীতি কখনোই মার্গ নয়। না তা মার্গ, আর না তা মার্গদর্শন।
মার্গ বা মার্গদর্শন হলো রীতির নেপথ্যে থাকা দর্শন। তবে দর্শন বললে, অনেক সময়ে বিদেশী শব্দ ফিলজফির সাথে গুলিয়ে ফেলা হয়। রোজ, স্মরণ রেখো দর্শন ফিলজফি শব্দের বাংলা শব্দ নয়। ফিলজফি শব্দের বাংলা শব্দ হলো যুক্তিবিজ্ঞান, অর্থাৎ যুক্তি দ্বারা যখন অদেখা বা অমীমাংসিতকে ব্যখ্যা করা হয়। কিন্তু দর্শন মানে কনো যুক্তি নয়, কনো যুক্তি তর্ক নয়, দর্শন মানে যা প্রত্যক্ষ করা হয়েছে। যিনি তা প্রত্যক্ষ করে তার ব্যখ্যা করতে সক্ষম হয়েছেন, তাঁর সেই বিবরণ হলো দর্শন।
অর্থাৎ যিনি যখন সমাধিস্থ হয়ে ব্রহ্ম দর্শন করেছেন, ব্রহ্মময়ীকে লাভ করেছেন, এবং সমাধির থেকে নিচস্তরে স্থিত হয়ে অর্থাৎ ধ্যানের মধ্যে আত্ম অর্থাৎ ভ্রমকে প্রত্যক্ষ করেছেন, তাঁর বিবরণকে দর্শন বলা হয়। তাঁর সেই বিবরণকে কেন্দ্র করেই সম্পূর্ণ ব্রহ্মাণ্ডের ব্যাখ্যা নির্মিত হয়, আর তাঁর ব্যাখ্যাকে কেন্দ্র করেই জীবনের অস্তিত্ব, জীবনের শুরু, জীবনের লক্ষ্য, জীবনের লক্ষ্যের পথে পথচলার ধারা নির্মিত হয়।
যেখানে সেই দর্শনকে কেন্দ্র করে, ব্রহ্মাণ্ডের ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়, তাকে বলে হয়ে প্রজ্ঞা। আর যেখানে সেই ব্যাখ্যাকে কেন্দ্র করে, জীবনের অস্তিত্ব, জীবনের শুরু, জীবনের লক্ষ্য, জীবনের লক্ষ্যের পথে পথচলার ধারা লিপিবদ্ধ হয়, তাকে বলা হয় ধর্মগ্রন্থ।
বৌদ্ধগণ সেই ধর্মের কথাই সাধারণ মানুষের বোধগম্য করে তোলার জন্য বহুবিধ কাহিনী কথার সঞ্চার করেছিলেন। আর বৈদিকদের দাপটের কারণে, তাঁদের থেকে লুকিয়ে সেই একই কথা বলার প্রয়াস করার জন্য বহু ঋষিও এমন বহু গল্প নির্মিত করে, বহু চরিত্রের নির্মাণ করে, সেই চরিত্রদের মাধ্যমে সেই পথ ও পথচলার কথা বলেছেন।
যতক্ষণে বৈদিক ব্রাহ্মণরা সেই কথাকে উদ্ধার করেন যে, এই গল্পসমূহ, এই চরিত্রসমূহের মাধ্যমে ঋষিরা সত্যের বিবরণ দিয়ে গেছেন, ততদিনে অনেকটাই দেরি হয়ে গেছিল, অর্থাৎ সাধারণ মানুষের কাছে সেই সমস্ত গল্প, চরিত্র প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছিল। তাই তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন যে, আর কিছুতেই মানুষের মন থেকে এই কথাকে মুছে দেওয়া সম্ভব নয়। তাই দুটি প্রক্রিয়া শুরু করেন।
প্রথমত তাঁরা বলেন যে, এই গ্রন্থ সমূহ হলো পুণ্যগ্রন্থ, তাই এঁদের কথনের বিচার করা ঘোর পাপ। আর এই বলে, সেই গল্পের আড়ালে থাকা সত্যকে উদ্ধার করা বন্ধ করে দেবার প্রয়াস করা শুরু করেন। আর সঙ্গে সঙ্গে এও শুরু করেন বলা যে সমস্ত কথা হলো ইতিহাসের কথা, অর্থাৎ সমস্ত চরিত্র হলো ভৌতিক চরিত্র। এমন বলার উদ্দশ্যও একই, অর্থাৎ যাতে মানুষ সেই কাহিনী ও চরিত্রদের অন্তরে লুপ্ত, সুপ্ত ও গুপ্ত সত্যকে উদ্ধার করার প্রয়াসও না করে।
আর যেহেতু, সুপ্তভাবে, গুপ্ত ভাবে, আর লুপ্ত ভাবে সত্যকে কাহিনীর অন্তরে লুকিয়ে রাখলে যারা চাননা যে মানুষ সত্য জানুক, তাঁরা সক্রিয় হয়ে ওঠেন, সেহেতু প্রভু ব্রহ্মসনাতন কৃতান্তের মাধ্যমে সেই সমস্ত সত্যকে সরাসরি বলতে শুরু করেন, যাতে আর কেউই সত্যকে লুকিয়ে দিতে সক্ষম না হন, আর মানুষ যথার্থ জ্ঞান আহরণ করেন”।
ভূমি প্রশ্ন করলেন, “বুদ্ধরা দর্শন করে তা ব্যক্ত করেছিলেন। ঋষিরা পুনরায় তা দর্শন করেন, আর ব্যক্ত করেন, আর যাতে সাধারণ মানুষ সেই দর্শনকে না ভুলে যায়, তার জন্য অসংখ্য কাব্যের রচনা করেন, আর বহুবিধ রীতির নির্মাণ করে সেই দর্শনকে অন্তরে স্থিত করে রাখেন। কিন্তু এই বৈদিকদের এতে আপত্তি কেন? কেন তাঁরা রীতি রেখে, অন্তরের দর্শনকে লুপ্ত করে দিয়ে, কেবলই রেওয়াজ রূপে তা স্থাপিত করে রাখতে উদ্যোগী? কেন তাঁরা কাব্য, মহাকব্যের কথাকে ভৌতিক কাহিনীর বিবরণ রূপে প্রচার করে করে, ঋষিদের জ্ঞানী থেকে সাংবাদিক রূপে স্থাপন করতে ব্যকুল? কি তাঁদের স্বার্থ? কি তাঁদের উদ্দেশ্য!”
মীনাক্ষী হাস্যমুখে বললেন, “আত্মের পূজারি তাঁরা। পরমাত্মকে ঈশ্বর মানে তাঁরা। আর আত্ম মানে তো ভ্রম। সত্য এই যে, কিচ্ছু বলতে কিচ্ছু নেই। কেবল ও কেবল পরম শূন্য আছে। না আছে কনো আলো, না আছে কনো গন্ধ, না আছে কনো আকার, বিকার, সীমা, অন্ত, কনো কিচ্ছু নেই। কিন্তু যখন কনো কিচ্ছু নেই, তখন আমি বা আমিত্ব অর্থাৎ আত্ম বা আত্মা থাকার তো কনো প্রশ্নই ওঠেনা।
কেবল চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনার মাধ্যমে এই আমিত্ব বা আত্মের অস্তিত্ব। আর যখন শূন্যকেই একমাত্র সত্য, আমাদের অস্তিত্বের সত্য বলে গণ্য করা হয়ে যায়, তখন তো কনো চিন্তা, ইচ্ছা আর কল্পনার কনো প্রয়োজনই থাকেনা। আর যদি এঁদের প্রয়োজন না থাকে, তাহলে তো আমিত্ব বা আত্মও এক নেহাত ভ্রান্তি ব্যতীত কিছুই নয়। আর যখন আমিত্ব বা আত্ম একটি ভ্রান্তি রূপে প্রমাণিত হয়ে যাবে, তখন যে বৈদিক ধর্মের আধারই মিথ্যা রূপে প্রমাণিত হয়ে যাবে, কারণ এই ধর্মের ভিত্তিই তো এই আত্ম।
আর যদি বৈদিক ধর্ম নিজের ভিত্তিই হারিয়ে ফেলে, তাহলে এঁদের সকল অনুগামীরাই যে এঁদেরকে ত্যাগ দিয়ে চলে যাবেন, কারণ কে আর মিথ্যুককে মিথ্যুক জানার পরও সমর্থন করবে! কেউ নয়। অর্থাৎ একবার যদি সত্যতে মানুষ স্থাপিত হয়ে যায়, সেই ক্ষণে আত্ম বলো বা পরমাত্ম, কনো আমিত্বকেই আর কেউ গ্রহণ করবেনা, অর্থাৎ বেদ, যা আত্মের ও পরমাত্মার পূজার প্রচলন শুরু করেছেন, সেই বেদকেই তখন অমান্য করা শুরু করবে, অর্থাৎ পূর্ণ ভাবে বৈদিকরা নিজেদের অধিকার, নিজেদের আধিপত্য, এবং নিজেদের শাসন হারিয়ে ফেলবে।
আর যেই যৎসামান্য ইতিহাস এই বৈদিকদের অর্থাৎ আর্যদের সম্বন্ধে বলেছি, তার থেকে একটি জিনিস তো তোমাদের কাছে খুব স্পষ্ট ভাবেই পরিষ্কার যে, এঁরা ক্ষমতালোভী। এঁরা ভৌতিক প্রেমী। এঁরা দেহসর্বস্ব, এঁরা ভোগ সর্বস্ব। আর তাই যখনই এঁদের ভোগবাসনায় অভাব অনটন আশার সম্ভাবনা জাগে; বা যখনই এঁদের সন্দেহ হয় যে মানুষ ভৌতিক জগতকে অসত্য মানা শুরু করে দেবে; যখনই মনে হয় যে মানুষ দেহের থেকে মন সরিয়ে নেবে, তখনই এঁদের অন্তরে সমস্ত ক্ষমতা হারিয়ে ফেলার ভীতি প্রসারিত হয়।
আর রীতির অন্তরে স্থিত দর্শন, কাব্যসমূহের অন্তরে, চরিত্রসমূহের অন্তরে স্থিত দর্শন বৈদিকদের বারবার ভয় প্রদান করতে থাকে, নিজেদের শাসন হারিয়ে ফেলার, নিজেদের অধিকার হারিয়ে ফেলার, নিজেদের ভোগবাসনায় ভাঁটা পরার, বিধান দিয়ে সকলে সর্বস্ব সহজে ছিনিয়ে নিতে পারে, সেই অনায়স অলস জীবনসুখ হারিয়ে ফেলার ভয় পেয়ে যায় তারা। আর তাই তারা সর্বদা তৎপর থাকে রীতির অন্তরে স্থিত দর্শন সম্বন্ধে সকলকে ভুলিয়ে দিতে, ঋষি সৃষ্ট কাব্য ও চরিত্রদের অন্তরে লুক্কায়িত দর্শন সম্বন্ধে সকলকে ভুলিয়ে দিতে।
আর তা করার শ্রেষ্ঠ উপায় হলো, দর্শন নয়, দর্শনকে বেষ্টন করে যেই রীতি স্থাপিত, তাতে সকলকে ব্যস্ত করে দেওয়াতে। একবার যদি সকলে সেই রীতিতে ব্যস্ত হয়ে যাওয়া শুরু করে, আর দর্শনকে ভুলে যাওয়া শুরু করে, তাহলে রীতি থাকবে, প্রমাণ থাকবে যে সেই রীতি যারা পালন করছেন, তারা বৈদিক, কিন্তু সেই রীতিপালকরা সত্য সম্বন্ধে অজ্ঞই থেকে যাবে।
একবার তা করতে পারলে, ঋষি সৃষ্ট কাব্য সকলে পাঠ করবে, তাদের অন্তরে স্থিত চরিত্রদের কথা তারা সকলে জানবে, কিন্তু সেই চরিত্রদের সত্যতার বিচার তারা করতে পারবেনা, সেই কাহিনীর মাধ্যমে বলা জীবনদর্শনকে তারা ধারণাও করতে পারবে না। আর এরই সাথে সাথে যখন এই সমস্ত কাহিনীকে ভৌতিক কথা বলে চিহ্নিত করা শুরু করে তারা, তখন বিচার না করা সাধারণ সমর্থক, সহজেই এঁদের কথাকে সত্য বলে বিশ্বাস করে নেয়, আর তা করে নিতেই, এঁরা আর কনো ভাবেই এই কথা বা চরিত্রের অন্তরে স্থিত সত্যের সন্ধান করতে সচেষ্ট হয়না।
সচেষ্ট হয়না তো অন্য কথা, তুমি যদি তাঁদেরকে আচমকা গিয়ে বলো যে এই চরিত্রসমূহ সত্য নয়, সাহিত্যিকের বিবৃত চরিত্র, যাদেরকে মাধ্যম করে সত্যের বিবরণ দিয়েছেন তাঁরা, অমনি তোমাকেই সেই সমর্থকরা মানবতার শত্রু বলে চিহ্নিত করে বসে থাকবে”।
অরিত্রা বললেন, “এর অর্থ তো, নূতন ভাবে আমাদের রীতি নির্মাণ করা উচিত, যার আগা থেকে মাথা পর্যন্ত থাকবে দর্শন। … মীনাক্ষী, তুমি কি আমাদেরকে সেই রীতির বিবরণ প্রদান করতে পারো!”
মীনাক্ষী খানিক চুপ করে থেকে বললেন, “বেশ বলছি আমি সেই রীতির কথা আর তাদের দর্শনের কথা। তবে একটিই কথা বলবো এখানে, আমি বললাম আর রীতিকে পালন করা শুরু করবে না। আমার কথনের কনো মূল্য আমি দিতে পারিনা। তাই আশা করবো যে, মাতা সর্বাম্বার থেকে এর সমর্থন বা এঁর মধ্যে যদি কিছুর পরিবর্তন আবশ্যক হয়ে, তা জেনে নিয়ে, তবেই এই রীতির ধারণ করা শুরু করা উচিত।
আর কথা এই যে, আমার মনে হয়, চারটির অতীতে কনো রীতির কনো প্রয়োজন নেই। জন্ম, বিবাহ, শ্রাদ্ধ ও পূজা, এই হলো চার ধারা, যার মধ্যে শ্রেষ্ঠ দর্শন বিরাজমান থাকে, আর তাই এগুলির অতীতে অন্যত্র রীতির কনো মানেই হয়না।
আর আরো বলবো যে, এই চারটি জীবনের ঘটনার মধ্যেই এমন রহস্য ও দর্শন উপস্থিত যে, পৃথক ভাবে অন্য কনো দর্শনকে এঁদের সাথে মিলিত না করাই সঠিক হবে। তাই এই চারটি ক্রিয়ার নিজস্ব দর্শনকে ঘিরেই সেই দর্শন ও রীতি স্থাপিত থাকলে, জন্ম দেওয়া পিতামাতা, বিবাহ করা বরকনে, এবং মৃতব্যক্তির আত্মীয়স্বজন সেই রীতির দর্শন থেকে জীবনের সত্য অনেকটাই বিস্তারিত ভাবে ধারণ করতে সক্ষম হবেন। তাই, আমি এই তিন ধারার মূল দর্শন আগে ব্যক্ত করে, অতঃপরেই এঁদের রীতির বিবরণ প্রদান করবো”।
জয়া বললেন, “আর পূজার রীতি!”
মীনাক্ষী হেসে বললেন, “পূজার দর্শন এতটাই বিস্তারিত যে তাকে আলাদা করে বলাই শ্রেয় হবে। তাছাড়াও, জন্ম, বিবাহ ও মৃত্যু, এগুলি সমস্তই ভ্রমেরই ভিন্ন ভিন্ন অধ্যায়। তাই এঁদেরকে একত্রে স্থাপিত করে রাখাই শ্রেয় হবে। আর পূজা হলো ভ্রম থেকে সত্যে যাত্রার ধারা, তাই সেই অধ্যায় ভিন্ন থাকাই সঠিক হবে”।
