সর্বশ্রী কাণ্ড (কৃতান্ত তৃতীয় কাণ্ড)

অরিত্রার আরেক সঙ্গিনী, নাম ভূমি বললেন, “আমরা কৃতান্তকে সম্মান করি, আর তার সাথে মাতা সর্বাম্বাকেও। তোমরা সকলে তাঁদেরই অনুগামী, তাই তোমাদেরকেও আমরা সম্মান করি। এই কি যথেষ্ট নয়, সকলকে মানাতে যে তাঁরাও যাতে কৃতান্তকে, মাতা সর্বাম্বাকে এবং তোমাদেরকে সম্মান করে!”

মীনাক্ষী এই কথাতে আর চোখে ভূমির দিকে তাকিয়ে একটি দুষ্টুমি মিশ্রিত মিষ্ট হাস্য প্রদান করে বললেন, “তোমরা কে যে তোমরা কারুকে সম্মান করো বলে, তোমাদের কথা শুনে সকলে তাঁদেরকে সম্মান করবে? বিশেষ কেউ তোমরা? কনো সকলের পূজিত নট তোমরা? কনো সকলের পূজিত ক্রীড়াবিদ তোমরা? কনো নেতা তোমরা? কনো ত্রাতা তোমরা?”

ভূমি একটু ইতস্তত হয়েই বললেন, “না আমরা তেমন কেউ নই, কিন্তু আমাদের সম্মান তো যথাযথ। তাই না!”

মীনাক্ষী পুনরায় মনের খেয়ালে হেসে উঠে বললেন, “তাই! যথাযথ। তো বেশ তো। ধরে নাও, আমি সেই সাথিদের মধ্যে একজন যে তোমাদের সম্মান দেখে প্রভাবিত হচ্ছি না। আমাকে তুমি মানাবে তো! কি মানাবে তো?”

ভূমি উদগ্রীব হয়ে বললেন, “হ্যাঁ মানাবো”।

মীনাক্ষী এবার ভূমির দিকে তাকিয়ে বললেন, “বেশ তো, মানাও আমাকে। … কৃতান্ত সম্বন্ধে, মাতা সর্বাম্বা সম্বন্ধে, কৃতান্তিকদের সম্বন্ধে এমন কিছু বলো, যাতে আমি মেনে যাই তোমার কথাতে, আর আমিও তাঁদেরকে সম্মান করা শুরু করি”।

ভূমি একটু ইতস্তত করে বললেন, “মাতা সর্বাম্বা হলেন সাখ্যাত জগন্মাতা। তাঁকে হৃদয়ে ধারণ করে অবস্থান করছিলেন প্রভু ব্রহ্মসনাতন, আর তাই তিনি পূর্ণ অবতার, আর তাঁরই রচনা হলো কৃতান্ত। সেই রচনাকে কেন্দ্র করে যেই ধর্ম তা হলো কৃতান্তিক ধর্ম, আর সেই ধর্ম যারা ধারণ করেন, তাঁরা হলেন কৃতান্তিক। এর পরেও তাঁদের সম্মান না করার কি কারণ?”

মীনাক্ষী হেসে বললেন, “অবতার তো রাম, অবতার তো কৃষ্ণ। তাঁদেরকে কেউ হৃদয়ে ধারণ করে অবতার হয়েছিলেন নাকি? তাহলে মাতা সর্বাম্বা হলেন অবতার। কই সেই অবতারের কৃত্য তো আমরা কেউ সচক্ষে দেখতে পেলাম না! … তাহলে কি করে মানবো যে আপনার কথা সত্য দেবী!”

ভূমি বেশ কিছুক্ষণ আমতা আমতা করে, অতঃপরে ফ্যালফ্যালে দৃষ্টি রেখে মীনাক্ষীর দিকে তাকালে, মীনাক্ষী আবারও বললেন, “ভগবান হলেন ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ। এঁদের অবতাররাই অবতার। বাকিরা আবার অবতার নাকি! আর ধর্ম! নূতন ধর্মের প্রয়োজন কি? আমাদের কাছে বৈদিক ধর্ম আছে তো। এই ধর্মকে সকলে হিন্দু ধর্ম বলে চেনে, আর একে আমরা সনাতন ধর্মও বলি। তাহলে নবীন কনো ধর্মের আবশ্যকতাই বা কি!”

ভূমি, অরিত্রা, রোজ, তথা সকল ভিন দেশ থেকে আগত সকলে একত্রে ফ্যালফ্যাল করে খানিকক্ষণ মীনাক্ষীর দিকে তাকিয়ে থেকে, অবশেষে বললেন, “এই কথাই তো সকলে বলে আমাদেরকে। আর আমরা নিরুত্তর থাকি। আমরা নিরুত্তর হয়ে যাই এমন কথা শুনে। আর কিছুতেই বোঝাতে পারিনা তাঁদেরকে যে আমাদের সম্মান নিরাধার নয়”।

মীনাক্ষী হেসে বললেন, “কিন্তু তা সত্য নয়। তোমাদের সম্মান নিরাধার এমন বলবো না, তবে তোমাদের সম্মান যথাযথ নয়। নারীকে সম্মান করা উচিত, তাই আমি নারীকে সম্মান করি। প্রকৃতিকে সম্মান করা উচিত, তাই আমি প্রকৃতিকে সম্মান করি। সময়কে সম্মান করা উচিত, তাই আমি সময়কে সম্মান করি। ঈশ্বরকে সম্মান করা উচিত, তাই আমি ঈশ্বরকে সম্মান করি।… কি অর্থ এই সকল সম্মানের?

নারীকে সম্মান করি, অথচ নারীর মাতৃত্বকে আঘাত করতে থাকি। প্রকৃতিকে সম্মান করি, অথচ প্রকৃতির কনো দেয় শিক্ষাই ওঠাতে পারিনা। সময়কে সম্মান করি, অথচ প্রতিদিবস ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় নষ্ট করি। ঈশ্বরকে সম্মান করি, অথচ নশ্বরকে ঈশ্বর জ্ঞান করি। … কি অর্থ এই সকল সম্মানের?”

মাথা নেড়ে ঈষৎ হেসে মীনাক্ষী পুনরায় বললেন, “কনো অর্থ নেই। সমস্ত সম্মান নিরর্থক। সম্মান আকাশ থেকে জন্ম নেয় না। অন্য কেউ সময়কে সম্মান করার কথা বলছেন বলে, কারুকে ঈশ্বর মানতে বলছে বলে, প্রকৃতির সম্মান করার কথা বলছেন বলে, নারীকে সম্মান করার কথা বলছে বলে, এগুলো আকাশ থেকে জন্ম নেওয়া সম্মানই, অর্থাৎ এই সম্মান সম্পূর্ণ ভাবে নিরর্থক। প্রকৃত সম্মানের উৎস হলো জ্ঞান।

যাকে তুমি জানো, সেই জানাই তোমাকে যখন তাঁর প্রতি সম্মান জাগ্রত করে, সেটিই হলো সত্য অর্থে সম্মান। আর যখন যার প্রতি কারুর তেমন সম্মান জন্ম নেয়, তখন তাঁর কাছে সেই ব্যক্তি বা বস্তু সম্বন্ধে যার যাই প্রশ্ন আসুক, তার উত্তর সে অনায়স দিতে সক্ষম। তখন আর তাকে এমন ফ্যালফ্যালে দৃষ্টি রেখে উপনীত হতে হয়না।

তাই অমুককে সম্মান করি, তমুককে সম্মান করি। এমন কিছুর মধ্যে না গিয়ে, যার প্রতি ঈষৎ সম্মান জাগছে, তাঁকে জানো। তাঁর সম্বন্ধে যতটা অধিক সম্ভব, ততটা অধিক জ্ঞান ধারণ করো। কি করে নিশ্চিত হবে যে যতটা জানা সম্ভব, ততটা জানতে পেরেছ না পারোনি! (মিষ্ট হেসে) যখন তাঁকে সম্পূর্ণ ভাবে অনুভব করতে পারবে, সেটিই হলো চিহ্ন যে, যতটা জানা সম্ভব তাঁকে, তা তুমি জেনে নিয়েছ।

কেন বললাম এমন? ধরো ব্রহ্মময়ী মা। তাঁকে সম্পূর্ণ জানা সম্ভবই নয়। কারণ তাঁর না আছে কনো আদি, আর না আছে কনো অন্ত। বা ধরো প্রভু ব্রহ্মসনাতন। তিনি স্বয়ং এই কথা বলতেন যে, তিনি নিজেকে নিজেই জানেন না। তাই এঁদেরকে সম্পূর্ণ জানা তো সম্ভবই নয়। সেই ক্ষেত্রে, কতটা জানলে নিশ্চিত হবে যে, তাঁকে যতটা জানা সম্ভব, ততটা জেনে ফেলেছ? যখন তোমার জানা তোমাকে তাঁর সম্বন্ধে পূর্ণ অনুভব প্রদান করবে।

কি করে বুঝবে যে, তুমি তাঁকে পূর্ণ ভাবে অনুভব করতে সক্ষম হয়েছ? এর উদাহরণ রূপে প্রভু ব্রহ্মসনাতন স্বয়ংকে স্থাপন করে রেখেছিলেন। তিনি মাতা ব্রহ্মময়ীকে, অর্থাৎ পরাচেতনা, পরাপ্রকৃতি, পরানিয়তিকে সম্পূর্ণ ভাবে অনুভব করে নিয়েছিলেন, আর তাই তো তিনি বলতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, ‘তিনি ঈশ্বরী, তিনিই সত্য, তিনিই একমাত্র আরাধ্য, কিন্তু তাঁর সেই সমস্ত কিছুতে কনো প্রকার রুচি নেই। তাঁর রুচি কেবল মাতৃত্বে। তিনি একটিই পরিচয়কে ধারণ করে রাখতে আগ্রহী, আর তা হলো এই যে তিনি মা’।

বুঝতে পারছো নিশ্চয়ই! সম্পূর্ণ ভাবে অনুভব জন্ম নিলে, তবেই কারুর পক্ষে এই কথন বলা সম্ভব। অনুভব অর্থাৎ, তাঁর ধারণা, তাঁর ক্রিয়া, তাঁর প্রতিক্রিয়া, তাঁর গতি, তাঁর প্রগতি, তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণের অন্তরালে থাকা ভিন্ন ভিন্ন বস্তু সামগ্রীকে ভিন্ন ভিন্ন প্রাধান্যতা প্রদান, তাঁর নিষ্ঠা, তাঁর বিশ্বাস, তাঁর স্নেহ, তাঁর বিচার, তাঁর উদ্দেশ্য, তাঁর লক্ষ্য, তাঁর উপলক্ষ, এই সমূহ যখন তোমার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, তখন তুমি তাঁকে অনুভব করে ফেলেছ।

যদি তুমি আমার সমস্ত ধারণা, নিষ্ঠা, বিশ্বাস, স্নেহ, প্রাধান্যতা, লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, ক্রিয়ার ধারা, প্রতিক্রিয়ার ধারা, স্বভাব ইত্যাদি সমস্ত কিছু অনুভব করে নেবে, অর্থাৎ যদি তুমি আমার থেকেও অধিক আমাকে চেনো, এর অর্থ তুমি আমাকে অনুভব করে নিয়েছ। আর একবার তা করে নেবার পর, যদি আমার ধারণা, নিষ্ঠা, বিশ্বাস, ইত্যাদির মধ্যে এমন কনো কিছু উপস্থিত থাকে যা তোমাকে আমার প্রতি সম্মানিত করে, তাই হলো প্রকৃত সম্মান।

আমার সম্বন্ধে কিচ্ছু বলতে কিচ্ছু না জেনে আমাকে সম্মান করো এমন বলে ফেরা, সে তো নেহাতই এক গল্পকথা, এক রম্যরচনা। তা ব্যতীত কিছুই নয়। যখন আমার সম্বন্ধে সমস্ত কিছু জেনে ফেলেও, সেই সম্মান অক্ষুণ্ণ থাকে, তা-ই হলো সম্মান। আর যখন সেই সম্মান জন্ম নিয়ে নেয় কারুর প্রতি, তখন আর কিছুতেই সেই সম্মানকে অবহেলা করা যায়না, যেমন তোমাদের সম্মানকে অবহেলা করা হচ্ছে বলে তোমাদের ধারণা।

কেমন জানো? প্রভু ব্রহ্মসনাতনের কথা। তিনি নিজের সম্বন্ধে বলতে গিয়ে এমন বলেন যে, ‘আমি কনো কালেই ভক্ত ছিলাম না। ভক্তরা যে সমস্ত রীতি রেওয়াজ, আচার অনুষ্ঠান করে থাকে, আমি যে তা কনো কালেই করিনি, আর না কনো কালে আমার পক্ষে তা করা সম্ভব। তাহলে কোন আঁধারে আমাকে ভক্ত বলা যেতে পারে!’

তিনি নিজের সম্বন্ধে বলার কালে আরো বলেন যে, ‘শিশুকালে যখন মা জগদ্ধাত্রীর আরাধনার কালে নিজের সমস্ত উর্জাটুকে দিয়ে দিতে পারলে আনন্দ পেতাম, তখনও যখন মন্ত্রাদি পাঠ করে মায়ের পূজা হতো, সেই স্থান থেকে আমি চলে যেতাম। ভক্ত হলে কি যেতাম? ভক্ত আমি কনো কালেই ছিলাম না, কনো কালেই নই। তাই তো এমন চলে যেতাম’।

তিনি আরো বলেন এই ব্যাপারে যে, ‘যাকে তোমরা ঈশ্বরী বলো, দেবী বলো, আমার অন্তর মন, বহির মন, সমস্ত কিছু জানতো যে তিনি আমার মা, আমার আসল মা। শিশু ছিলাম, তাই বুঝিয়ে বলতে পারতাম না যে তিনি আমার কেমন ভাবে নিজের মা। বড় হলাম যখন তখন বলতে শিখলাম যে, তিনি আমার শরীরের জন্মদাত্রী মা নন, আমার আসল মা, যার থেকে আমি চেতনা লাভ করেছি, যার মাধ্যমে আমি যা কিছু বা যা কিছু নই, সেই সব অনুভব করতে শিখেছি’।

এই সম্বন্ধে তিনি এক স্থানে এমনও বলেছেন যে, তাঁকে অনেকে জোর করে বলেছিলেন যে, ব্রহ্মা ঈশ্বর, বিষ্ণু ঈশ্বর, মহেশ ঈশ্বর, সে কেন জগদম্বার পিছনে দৌড়চ্ছে! এই প্রশ্নে শেষে বিরক্ত হয়ে উঠে তিনি বলেন, আমি কনো ঈশ্বরের পিছনে দৌড়চ্ছি না, আমার কনো ঈশ্বর লাগবে না, আমি আমার মায়ের জন্য ছুটছি। আমি আমার মায়ের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছি, তাই নিজের মাকে খুঁজে চলেছি। …

তিনি আরো বলেন যে, এই কথাতে এমন কি ছিল জানি না, তবে যেই বৈদিক ধর্মের উচ্চপদস্থরা সেই ক্ষণে দাঁড়িয়ে এই কথা আমার মুখ থেকে শুনেছিলেন, তাদের মুখ দেখে আমার হাসি পেয়ে গেছিল। কেমন যেন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছিল। কে যেন কেন?’

বুঝতে পারলে এবার! যখন কারুকে জানার পরে তাঁর প্রতি সম্মান জন্ম নেয়, তখন তাঁর প্রতি কি রূপ প্রত্যয় জন্ম নেয় যে যারা নিজেদের হর্তাকর্তা সর্বজ্ঞাতা মানেন, তাঁরাও ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যান। অনুভব এমন হয়, আর তার জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত জ্ঞান”।

ভূমি এবার বললেন, “আমাকে কৃপা করে সেই প্রশ্ন গুলির উত্তর প্রদান করুন, যেই প্রশ্নগুলি আপনি করেছিলেন আর আমরা তার উত্তর দিতে না পেরে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছিলাম”।

মীনাক্ষী হাস্যমুখে বললেন, “বৈদিক ঋষিরা সর্বক্ষণ বলতে থাকেন যে অন্তরে দেখো, অন্তরে দেখো। তা কি এই জন্য বলেন তাঁরা যে, তাঁরা স্বয়ং বাহ্যমুখি হবেন! … ব্যাসকে মহামুনি বলা হয়, তথাপি বাল্মীকিকে। তা কি এই জন্য যে, তাঁরা বাহ্য জগতে ঘটে চলা একটি ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হয়ে তার রচনা করেছেন! তাহলে কি তাঁরা মুনি নন! তাঁরা কি তাহলে সাহিত্যিক নন! তাঁরা কি তাহলে কেবলই সাংবাদিক, যাদের কাজ হলো সম্মুখে চলা ঘটনাকে দেখা ও সেই ঘটনার বিবরণ দেওয়া!

অর্থাৎ স্পষ্ট কথা এই যে, যদি রাম, কৃষ্ণ, ইত্যাদি সাহিত্যিক রচিত চরিত্রদের ভৌতিক চরিত্র আখ্যা দিতেই হয়, তাহলে প্রথমে এই চরিত্রদের নির্মাতাদের মুনি পদ থেকে বহিষ্কার করে, তাঁদেরকে সাংবাদিক উপাধিতে ভূষিত করা হোক। আর যদি তা না করা হয়, যদি তাঁদেরকে মুনিই বলা হয়, যদি তাঁদেরকে সাহিত্যিকই মানা হয়, তাহলে এটিই সত্য যে, সাহিত্যিক যা যা চরিত্রের রচনা করেন, সেই সমস্ত চরিত্র তাঁরই বিভিন্ন প্রকার অবস্থান হয়, অর্থাৎ তার প্রতিটি চরিত্র সে স্বয়ং হয়।

বাল্মীকির দৃষ্টিতে অধর্মী ও পাতকই হলেন রাবণ ও রাবণের কুল, আর বাল্মীকির দৃষ্টিতে অবতার হলেন রাম ও ভক্ত হলেন হনুমান, আর তাঁর দৃষ্টিতে চেতনা হলেন মা সীতা। কেমন কথা এটি! ঠিক যেমন একটি সাহিত্যিকের নির্মিত উপন্যাসের সমস্ত চরিত্র সে স্বয়ং হয়, নায়কটিও, নায়িকাটিও, খলনায়কও ও পার্শ্বচরিত্রও, ঠিক তেমনই বাল্মীকির রচিত মহাসাহিত্য রামায়ণের সমস্ত চরিত্র তিনি স্বয়ং।

তাঁর চেতনা নিজেকে সীতা বেশে প্রদর্শন করলে, সেই চেতনাকে অপহরণের জন্য ব্যকুল আত্ম হলেন রাবণ, আর সেই চেতনাকে উদ্ধার করার প্রয়াসে রত অবতার হলেন রাম। অর্থাৎ অবতার কে? যিনি অবতার, তাঁর ভৌতিক প্রকাশ কে? রাম নয়, বাল্মীকি হলেন সেই ভৌতিক প্রকাশ। রামায়ণ তো বাল্মীকি রূপ অবতারের অন্তরে চলতে থাকা চেতনাহনন ও চেতনা উদ্ধারের কীর্তি, যা বাহ্যে দৃশ্যমান নয়, কারণ তার প্রত্যক্ষদর্শী এক ও একমাত্র বাল্মীকি। তাহলে রামায়ণোক্ত সমস্ত স্থান কি করে আজও রয়েছে? (মিষ্ট হেসে) থাকবে না কেন? সেই নামকরণ তো রাময়ন রচনাকে কেন্দ্র করেই করা হয়েছে, আর তারা এই ছলকর্ম করেছেন, যারা রামায়ণকে ভৌতিক কথা ও বাল্মীকিকে সাংবাদিক প্রমাণ করতে ব্যস্ত।

ঠিক যেমন বঙ্গভাষার শ্রেষ্ঠদের মধ্যে একজন সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচিত রক্তকরবী নাট্যের চরিত্রসমূহ, অন্য কেউ নন, তিনি স্বয়ং, আর সেই চরিত্রদের কনো ভৌতিক প্রকাশ যদি থাকে, তা এক ও একমাত্র রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্বয়ং; ঠিক যেমন আরথার কোনান ডয়েলের নির্মিত সারলক হোমস-এর ভৌতিক জগতে অবস্থান একমাত্র আরথার কনান ডয়েল স্বয়ং; ঠিক যেমন ফেলুদার ভৌতিক প্রকাশ সত্যজিৎ রায়, ব্যোমকেশের ভৌতিক প্রকাশ শরদিন্দু, রোমিওজুলিয়েটের ভৌতিক প্রকাশ সেক্সপেয়ার, ঠিক তেমনই রামায়ণের ভৌতিক প্রকাশ এক ও একমাত্র বাল্মীকি।

আর যদি তা না হয়, তাহলে তো বাল্মীকি কনো সাহিত্যিকই নন, কেবলই সাংবাদিক। কিন্তু তিনি সাংবাদিক নন, তিনি একজন ১২ কলা অবতার। আর তাই তাঁর অন্তরে চলমান অবতার কীর্তি, অর্থাৎ চেতনাকে হনন প্রয়াস, এবং উদ্ধার প্রয়াস কথাই তিনি বিবৃত করেছেন মহাসাহিত্য রামায়ণ রূপে।

ঠিক একই ভাবে, ভৌতিক জগতে অস্তিত্ব যার দেখা গেছে, তিনি হলেন এক ও একমাত্র ব্যাস, অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণ দ্বৈপায়নের। ভৌতিক জগতে কৃষ্ণ, কৃষ্ণা, দুর্যোধন, এঁদের সন্ধান করার অর্থই হলো, ব্যাসকে এক মুনি থেকে অবতীর্ণ করে এক সাংবাদিক রূপে প্রমাণ করার প্রয়াস। ব্যাস হলেন ১২ কলা নয়, ১৬ কলা অবতার, আর তাই তিনি নিজের অন্তরের চেতনাদৃষ্টিতে যা দেখছেন, তা বাল্মীকি অপেক্ষা ভিন্ন।

যেখানে বাল্মীকি দেখছেন তাঁর চেতনাকে হননের প্রয়াস করা হচ্ছে, সেখানে ব্যাস দেখছেন তাঁর চেতনাকে অর্থাৎ কৃষ্ণাকে কলুষিত করার প্রয়াস করছে তাঁরই আত্ম ও আত্মের সমস্ত গুণাবলি অর্থাৎ আবেগসমূহ। আর সেই কর্মে তিনি দেখছেন যে অবতার অর্থাৎ বিবেক সম্মুখে এসে নিজের পাঁচ গুণ অর্থাৎ পঞ্চপাণ্ডবদের দ্বারা চেতনাকে সুরক্ষিত করছেন।

ঠিক যেমন বাল্মীকি ছিলেন সেই ১২ কলা অবতার, রাম তাঁর অন্তরের অবতার সত্ত্বা; ঠিক যেমন ব্যাস ছিলেন সেই ১৬ কলা অবতার, আর কৃষ্ণ তাঁর অন্তরের অবতার সত্ত্বা; তেমনই প্রভু ব্রহ্মসনাতন হলেন পূর্ণ ৯৬ কলা অবতার। আর যেহেতু তিনি পূর্ণ অবতার, তাই তাঁর অবতার সত্ত্বা আর চেতনাকে উদ্ধার করতে রত নন। অর্থাৎ কথা এই যে, বাল্মীকিও দেখিয়েছেন যে নেপথ্যে সমস্ত লীলা মাতা সীতার, কিন্তু অবতার রূপে স্থিত থাকেন রাম; ব্যাসও দেখিয়েছেন যে সমস্ত কীর্তি কৃষ্ণার, কিন্তু অবতার রূপে স্থিত থাকেন কৃষ্ণ। কিন্তু প্রভু ব্রহ্মসনাতনের ক্ষেত্রে আর এই নেপথ্যের ক্রীড়া থাকেনা।

কেন থাকেনা? কারণ তিনি পূর্ণ ৯৬ কলা অবতার। আর তাই তাঁর চেতনা আর সম্মুখে কারুকে অবতার করে সাজিয়ে রেখে, নেপথ্যে ক্রীড়া করেন না। তিনি স্বয়ং তাই পরানিয়তি অর্থাৎ পরামাতৃকা, পরাপ্রকৃতি অর্থাৎ মহামাতৃকা, এবং পরাচেতনা অর্থাৎ মাতৃকা রূপে আত্মপ্রকাশ করে, নিজের সংগ্রাম নিজেও লড়ছেন এবং আত্মকে তিনি সম্পূর্ণ ভাবে নিশ্চিহ্ন করছেন।

বিচার করে দেখো ভূমি, রাম সম্পূর্ণ আত্মগুণকে নষ্ট করতে পারছেন না। রজগুণ রূপে রাবণের নাশ করছেন, তমগুণ রূপে কুম্ভকর্ণের দমন করছেন, কিন্তু সত্ত্বগুণ রূপে বিভীষণের হত্যা করছেন না। কেন? কারণ তাঁর চেতনা যে প্রত্যক্ষ ভাবে ক্রিয়াশীল নন। একই ভাবে, ব্যাসের কৃষ্ণও কিন্তু সমস্ত আত্মগুণাবলির নাশ করার পরেও, তাদের নাশ হয়নি। তাঁদের সাথে পুনরায় সাখ্যাত হয়েছে বৈকুণ্ঠে। কিন্তু প্রভু ব্রহ্মসনাতনের ক্ষেত্রে ব্রহ্মময়ী পূর্ণ রূপে প্রকাশিতা, আর তাই আত্মকে সমূলে নাশ করছেন তিনি। আর তারপরেও তাঁর যেসামান্য অংশ অবশিষ্ট থাকছে, তাঁর নাশ করছেন তিনি জগদ্ধাত্রী ত্রিসন্তান অর্থাৎ বিচার, বিবেক ও বৈরাগ্য বা ছন্দ-তাল-সুর দ্বারা।

ভূমি, এই হলো জ্ঞান। এই হলো অবতারতত্ত্বের সম্যক জ্ঞান। যতক্ষণ না এই জ্ঞান প্রদান করছো তোমার সম্মুখে স্থিতদের, ততক্ষণ তাঁরা তো এমন অন্ধবিশ্বাস রাখতেই থাকবে যে, রাম, রাবণ, কৃষ্ণ, অর্জুন বা দুর্যোধন, এঁরা সকলে ভৌতিক চরিত্র। আর ততক্ষণ তাঁরা বাল্মীকিকে, বা ব্যাসকে অবতার রূপে গণ্যই করতে পারবেনা। ততক্ষণ তাঁরা সতী বা পার্বতীর সন্ধান করতে থাকবেন, কিন্তু মার্কণ্ডকে ৩২ কলা অবতাররূপে গণ্য করতেই পারবেননা। আর যদি তা না পারেন, তাহলে কি ভাবে তাঁরা প্রভু ব্রহ্মসনাতনকে অবতার রূপে গণ্য করবেন!

এই অবতারতত্ত্ব থেকে তাঁদেরকে অজ্ঞান রাখার জন্য, বৈদিকরা তো এই প্রচার করেই দিয়েছে তাঁদের কাছে যে রাম, রাবণ, কৃষ্ণ, অর্জুন, দক্ষ, সতী, এঁরা সকলে ভৌতিক চরিত্র, আর এঁরা সকলেই ইতিহাসে ছিলেন, তাই এঁদের লীলা কেউ প্রত্যক্ষ করতে পারেনি। আর এই মিথ্যাচার করে রাখার জন্য, তাঁরা তো সকল সময়ে মাতা সর্বাম্বার ভৌতিক প্রকাশের সন্ধান করতেই থাকবেন। আর তা করতে থাকলে, তাঁরা যে সকল সময়েই বলতে থাকবেন যে, তোমরা মিথ্যাচার করছো, আর এই বৈদিকরা সত্য কথা বলেছিল।

তাই এঁদের কাছে প্রথম এটি প্রমাণ করো যে, বৈদিকরা যদি সত্য বলে থাকেন, তাহলে তো মার্কণ্ড, ব্যাস, বাল্মীকি, এঁরা সকলেই কেবলমাত্র সাংবাদিক, তাঁরা কনো মুনি নন। তবেই তো, তাঁরা বিচার করতে বাধ্য হবে তোমাদের কথা নিয়ে। তবেই তো তাঁরা রামায়ণকে বা জয়াকে আর সংবাদপত্রিকা মানা বন্ধ করে, তাদের চেতনার বিস্তার রূপে দর্শন করবে। আর তবেই তো তাঁরা কৃতান্তকেও চেতনার বিস্তার রূপে দর্শন করতে যাবে, আর তবেই তো কৃতান্তে অদ্ভুত চেতনার বিস্তারকে প্রত্যক্ষ করতে সক্ষম হয়ে ব্রহ্মসনাতনকে অবতারশ্রেষ্ঠ রূপে গণ্য করবে।

অর্থাৎ তুমি সম্মান করছো বলে, তাঁরাও সম্মান করবে, এর কনো যুক্তিই নেই। হ্যাঁ যুক্তি থাকে, যখন তোমাদের সম্মান জন্ম নেয় জ্ঞান থেকে। যখন তোমাদের সম্মান জ্ঞান থেকে জন্ম নেয়, তখন তোমাদের জ্ঞান অন্যকেও সম্মান করতে বাধ্য করবে যাকে তুমি সম্মান করো। ঠিক যেমন স্বামী বিবেকানন্দের জ্ঞান চমকিত করেছিল আমেরিকার অধিবাসীদেরকে। আর যখন তাঁর সম্মান দেখেন আমেরিকানরা ঠাকুর রামকৃষ্ণের প্রতি, তখন তাঁকে ধারণ করতে বাধ্য হয়ে ওঠে।

ঠিক তেমনই তোমাদের জ্ঞানও সেই রূপ প্রকাশ যখন হবে যে তোমাদের জ্ঞানতর্কের সম্মুখে সকলে অসহায় হতে শুরু করবে, তখনই তোমরা যাকে সম্মান করো, তাঁকে জানার প্রয়াস করবে সকলে। আর তখনই তাঁরা কৃতান্তকে ধারণ করবে, আর কৃতান্তিক হয়ে উঠবে।

অর্থাৎ মধ্যা কথা এই যে, আমি সম্মান করি, তাই তুমিও সম্মান করো, তা বিভ্রান্তিকর হয়ে ওঠে, যদি তোমার প্রতিই সম্মান না জন্ম নেয়। যখন তোমার প্রতি সম্মান জন্ম নেয়, তখনই তুমি যাকে সম্মান করো, তাঁর প্রতি সম্মান জন্ম নেয়, সেটিই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। তাই নিজেকে, নিজেদেরকে, নিজেদের জ্ঞান চেতনাকে সেই স্তরে নিয়ে যাও, যাতে তোমাকে সম্মান করা শুরু করে সকলে। যিনি তোমাকে সম্মান করবেন, তিনি  তাঁকেও সম্মান করবেন, যাকে তুমি সম্মান করো।

যদি তোমাকেই সম্মান করতে না পারেন কেউ, তাহলে তুমি কাকে সম্মান করছো বা করছোনা, তার দিকে কেউ তাকাবেই বা কেন? এটিই সম্মান অর্জনের প্রজ্ঞা, এটিই সম্মান অর্জনের বিজ্ঞান। অর্থাৎ যদি চাও যে, কনো কিছুকে সম্মান করুক সকলে, তাহলে তোমাকে নিজেকে প্রথমে সম্মানীয় হয়ে উঠতে হবে। যখন স্বয়ং সম্মানীয় হয়ে যাবে, তখন তুমি যাকে সম্মান করো, তোমাকে সম্মান করেন যারা তারা তাঁর প্রতি এমনিই সম্মান জ্ঞাপন করবেন।

তবে এমনিই সম্মান করবে, এই কথার অর্থ বোঝোতো! এর অর্থ হলো, অন্ধবিশ্বাসী হয়ে উঠবে। কেমন জানো? এই বিজ্ঞানের ব্যবহার বৈদিকগণ করেছেন, নিজেদের অন্ধবিশ্বাসী ভক্ত সংখ্যা বৃদ্ধি করার জন্য। কেমন করে জানো? তাঁরা সাধুদের বিশ্বাসের যথাযজ্ঞ পাত্র রূপে একটি হাজার বছর ব্যাপী প্রচার করে করে, এমন বিশ্বাস স্থাপন করে দেয় সকলের নজরে যে, সাধু মানেই বিশ্বাসের পাত্র, আর সাধু মানে তিনি যিনি গেরুয়া ধারণ করে, রুদ্রাক্ষ বা তুলসীর মালা, হাতে কমণ্ডলু ধারণ করে, ললাটে রক্তিম, ভস্মমণ্ডিত বা চন্দনের টিকা ধারণ করে রয়েছেন।

একবার সকলে এঁদেরকে বিশ্বাস করা শুরু করে দিলে, এরপর থেকে এঁদের মাধ্যমে যা কিছু বলে হয়েছে, তাকেই সকলে সত্য রূপে ধারণ করে নিতে শুরু করে, ‘সাধুর বচন’ এই জ্ঞানে। আর তখন থেকে রীতি রেওয়াজ, আচার অনুষ্ঠান, সহস্র সহস্র দেব দেবী, সমস্ত কিছু চাপিয়ে দিতে শুরু করে বৈদিকরা।

আর সেই চাপিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে সকল দেবদেবীর থেকে ভীতি সঞ্চার করিয়ে করিয়ে, তাদেরকে তুষ্ট করে সুখী জীবন সম্ভব, এই বোধ নির্মাণ করে, সকল বৈদিক ঘরে জাত মানুষদেরকে ভ্রমে আবদ্ধ করে, তাদের থেকে সমস্ত ধনসম্পদ, স্ত্রীসন্তান, সমস্ত কিছু লুণ্ঠন করতে থাকে। আশা করি এই বিষয়ে নতুন করে বলতে হবেনা তোমাদের, কারণ তোমরা কমবেশি সকলেই তা প্রত্যক্ষ করেছ।

যা দেখো নি, তা বলে দিলাম তোমাদেরকে। অর্থাৎ প্রথমে সাধুর কথাই শেষ কথা এই প্রচার করেছে, অতঃপরে সাধু মানেই বিশেষ পোশাকধারি এই প্রচার করেছে, অতঃপরে সাধুর কথনকে ধন্বন্তরি এমন বলে বলে সকলকে মাসাহার বন্ধ করিয়ে মনুষ্যদেহে গর্ধব করে তুলেছে, আর একবার সকলে গর্ধব হতে শুরু করলে, সেই বিশেষ পোশাকধারিদের ব্যবহার করে করে, অজস্র প্রকার ভীতির সঞ্চার করেছে।

জানোই তো তোমরা, মনসার কোপ, শনির কোপ, রাহুর কোপ, মঙ্গলের দশা, শিবের তাণ্ডব, ইন্দ্রের প্রকোপ, নক্ষত্রদের দশা, আরো আরো কত কত কিছু। আর এই প্রতিটি কোপের নিরাময় আছে, সেই বিশেষ পোশাকধারিদের, যাদেরকে সকলে বিশ্বাস করেন, তাঁদেরকে দিয়ে দিয়ে এমনই বলিয়েছেন। আর সেই প্রতিটি নিরমায়ের নাম করে করে, সকলের থেকে অর্থ লুণ্ঠন করেই চলেছেন, আজও করে চলেছেন। সময়ে সময়ে সেই লুণ্ঠন অর্থ থেকে স্ত্রী, সন্তান, চরিত্র, এমনকি পিশাচ হয়ে ওঠা পর্যন্ত হতে থাকে।

এটিই বিশ্বাস ও সম্মানের প্রজ্ঞা, বিজ্ঞান, আর একেই নরাধমের মত ব্যবহার করেছে আত্মের পূজারি ওই বৈদিকরা, আর তা করে করে, সম্পূর্ণ মনুষ্যজাতির যেই অংশ সর্বাধিক মেধাবী ছিল, তাদেরকেই আজ পরাধীন করে দিয়ে, সম্পূর্ণ মনুষ্যজাতিকে অবলুপ্তির পথে ঠেলে দিয়েছে বৈদিকরা।

তবে কি জানো তো ভূমি, এই কথা তুমি প্রথমেই কারুকে বলতে পারবেনা, বিশেষ করে কনো বৈদিককে তো নয়ই। যতক্ষণ না তিনি বৈদিক অবস্থা থেকে সম্পূর্ণ ভাবে সরে এসে স্বতন্ত্র হচ্ছেন, ততক্ষণ এই কথা বলার অর্থ কি জানো? এই কথা বলার অর্থ হলো নিন্দা করা। সত্য কথাই বলবে, কিন্তু তোমাকে সত্যবাদী নয়, নিদুক রূপে চিহ্নিত করবে তাঁরা। তাই প্রথমে এই কথা ঘনাক্ষরেও বলবে না। প্রথমে তাঁদেরকে যেই বিশ্বাস প্রজ্ঞাকে নিকৃষ্ট রূপে ব্যবহার করে বৈদিকরা ভয়, কাম, লোভ, ইত্যাদি আবেগের বশবর্তী করেছে, তার থেকে মুক্ত করতে হবে, সেই একই বিশ্বাসের প্রজ্ঞা ব্যবহার করে।

অতঃপরে তাঁদের কাছে সত্যের বিবরণ প্রদান করে, সতর্ক করে দাও যে, আচার অনুষ্ঠান, রীতি রেওয়াজের মধ্যে যাওয়ার অর্থই হলো পুনরায় কেউ এমন নরাধম তাঁদের জীবনে এসে পুনরায় তাঁদেরকে লুণ্ঠন করে চলে যাবে। তাই প্রয়োজন বিচারের, প্রয়োজন জিজ্ঞাসার, প্রয়োজন জ্ঞানের। যথার্থ জ্ঞানই তাঁদেরকে শুদ্ধ করবে, আর তাঁদেরকে এমন করে দেবে যাতে তাঁদেরকে আর কেউ লুণ্ঠন না করতে পারে।

না এই কথা বলে তাঁদেরকে লুণ্ঠন করতে পারবে যে মেঘের আড়াল থেকে তাঁদেরকে কেউ দেখছে, আর তাঁদেরকে চালনা করছে। না এই বলে যে, বাইরে অনেক অনেক ভৌতিক লোক আছে, যেখানে সেই মেঘের আড়ালে থাকা দেবরা বসবাস করে। আর না এই বলে যে বাইরে এমন অনেক গ্রহ আছে ধরিত্রীর মত, আর তাতে অনেক উন্নত জীব আছে, যারা আমাদেরকে অধিগ্রহণ করে নেবে।

বিচার করে দেখো, বৈদিক ব্রাহ্মণরা প্রথম কথাটি বলে সমস্ত মানবজাতিকে লুটেছে, আর দ্বিতীয় কথাটিকে নিরীক্ষণ করো। একই কথা, কেবল দেব শব্দকে ভিন গ্রহের প্রাণী দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। একই কথা, কেবল এই লোক, সেই লোককে, এই গ্রহ, সেই গ্রহ দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। বিচার করে দেখো, একই কথা, কেবল এই রথ, সেই রথকে এই জাহাজ সেই জাহাজ শব্দ দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। অর্থাৎ যেই ভাবে বৈদিকরা একদিন এই দেশের মানুষকে মূর্খ করে  লুণ্ঠন করেছিল, ঠিক তেমনই আজকে আর্যদেরই বংশোদ্ভূত আরো এক জাতি সমস্ত মনুষ্য যোনিকে মূর্খ বানিয়ে লুণ্ঠন করে চলেছে।

সত্যের জ্ঞান প্রদান করো, অসত্যের কথা না বলে। সে অসত্য বলেছে, অন্য কেউ অসত্য বলেছে, এই কথা বলতে বলতেই আমরা জীবন কাটিয়ে দিই। এই কথাসমূহের মধ্যে ডুবে থাকার কারণে, না আমরা নিজেরা জানতে পারি সত্য কি, আর না কারুকে সেই সত্যের বিবরণ প্রদান করি। তাই কে অসত্য, তার বিচার সকলে এমনিই করে নিতে পারবে, সেই নিয়ে চর্চা করে সময় ব্যয় করার মত সময় মনুষ্য যোনির কাছে আর নেই। এই যোনি অবলুপ্তির পথে দ্রুতগামী হয়ে চলছে, কারণ এই বৈদিকরা আর আর্যরা সম্যক ভাবে এই যোনিকে নিজের লক্ষ্যপ্রাপ্তির থেকে অপসারিত করে দিয়েছে।

তাই এই অন্তিম ঘড়িতে যা প্রয়োজন তা হলো সত্যের বিবরণ দেওয়া। তাই যত পারো সত্যের বিবরণ দাও, অসত্য কে বলেছে, কতটা বলেছে, তা বিচার করার সামর্থ্য সকলের আছে। কেবল জ্ঞানচক্ষু মেলতে পারেন নি, তাই তা অনুভব করতে পারেন না। যেদিন জ্ঞান চক্ষু মেলতে পারবেন, সেদিন সকলে এমনিই অনুভব করে নেবে যে, সত্য কে বলছে আর অসত্য কে বলেছে তাদেরকে”।

অরিত্রা প্রশ্ন করলেন, “কিন্তু মীনাক্ষী, কেবল মাত্র বৈদিক ব্রাহ্মণরাই এই লোকের কথা বলেছেন, তা তো নয়! এই কথা তো স্বয়ং ব্যাস বা বাল্মীকি বা মার্কণ্ডও বলেছেন, যারা একাধারে মুনি এবং অবতারও। তাহলে এই লোকের কথা মিথ্যা কি করে হতে পারে!”

মীনাক্ষী হেসে বললেন, “মিথ্যা! এই কথা তোমাদের কখন বললাম অরিত্রা! এই বললাম যে, এই একটি লোকও ভৌতিক জগতের লোক নয়। এরা সমস্তই মনোলোক। যেমন যেমন চেতনার বিকাশ ঘটে, তেমন তেমন যেই যেই নূতন অনুভূতির বোধ প্রকাশিত হয়, তাকেই বুদ্ধগণ, ঋষিগণ লোক বলতেন। বুদ্ধগণ, ঋষিরা কেবল মুখেই বলতেন না যে, অন্তরে দেখো, সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডের সত্য অন্তরে বিরাজ করছে। তাঁরা সত্যই অন্তরে বিরাজমান ছিলেন, আর তাই অন্তরে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে যা যা সত্য তাঁরা প্রত্যক্ষ করেছেন, তাই বলেছেন।

কিন্তু মানুষের মেধা কিছু আত্মপূজারিদের কারণে দিনের পর দিন বিনষ্ট হতে থেকেছে। আর তাই তাঁদের কাছে ঋষিদের কথন, অর্থাৎ ‘বাহ্য জগত এক ভ্রম মাত্র’ তা অবলুপ্ত হয়ে গেছে, আর তাই তাঁদের কাছে বাহ্য জগতই সত্য হয়ে রয়ে গেছে, আর বুদ্ধরা, ঋষিরা যেই অন্তরলোকের, অন্তর জগতের, অন্তর জগতের বিভিন্ন তত্ত্বের কথা বলেগেছিলেন, তাকেই এঁরা বাহ্য জগতে অবস্থান করছে, এমন কল্পনা করা শুরু করে।

সত্য বলতে, বুদ্ধরা, ঋষিরা ছিলেন কল্পনার বিরোধী। যা প্রত্যক্ষ করেন নি, তার সম্বন্ধে একটি কথাও বলতেন না। কিন্তু যেমন যেমন আত্মপূজারিদের কারণে মানুষের মেধা লোপ পেতে থাকলো, তাদের সামর্থ্য হ্রাস পায়, আর বৃদ্ধি পায় কল্পনা। তাই তো সেই আত্মপূজারিরা এই অমৃত কথা, যাকে বুদ্ধরা, ঋষিরা প্রত্যক্ষ করে বিবরণ দিয়েছিলেন, তাকে বাহ্য জগতের কথা রূপে কল্পনা করার দুঃসাহস করেছিলেন, আর এখন তো এঁদের থেকেও এক কাঠি অধিক সরেস আত্মপূজারির আমদানি হয়েছে মনুষ্য যোনিতে।

এই আত্মপূজারিরা তো কেবল কল্পনা করে আর করিয়েই শান্ত হননা। এঁরা তো সেই কল্পনাকে সত্য প্রমাণিত করতেও তৎপর। তবে মজার কথা কি জানো তো! এঁদের গল্পের গরুকে আরামসেই জবাই করা যায়, কিন্তু মানুষের মেধা এতটাই বিনষ্ট হয়ে গেছে, আত্মপূজারিদের খপ্পরে থেকে থেকে যে, তাঁরা সেই গল্পের গরুড় গলায় দড়িটাও পরাতে পারছে না।

নাহলে ভেবে দেখো, কেউ ডাহা মিথ্যা কথা বলছে, সেটাও ধরিয়ে দিচ্ছে তোমার কাছে এসে। কি বলছে সে? সে বলছে যে ৫০ বছর ধরে তারা কনো দূরবীক্ষণ যন্ত্র তাক করে রেখে দিয়েছিল, আর তাতে ১০০০ আলোক বর্ষ দূরে থাকা গ্রহ ধরা পরেছে। (ব্যাঙ্গের হাস্য হেসে) বুঝতে পারলেনা অরিত্রা! একবার কথাটা মিলিয়ে দেখো। ১০০০ আলোক বর্ষ দূরের কনো বস্তুকে নিরীক্ষণ করতে কত বর্ষ সময় লাগার কথা?”

সাবলীল ভাবে উত্তর দিলেন অরিত্রা, “এক হাজার বর্ষ”।

মীনাক্ষী পুনরায় হেসে বললেন, “আর এঁদের দূরবীক্ষণ যন্ত্র কতদিন ধরে নজর রাখছে সেই হাজার আলোক বর্ষ দূরে থাকা বস্তুটির উপর?”

অরিত্রা পুনরায় ভেবে বলতে গিয়ে হেসে ফেলে বললেন, “৫০ বর্ষ! এতো সত্যই গল্পের গরু! কিন্তু এমন কেন বলছে? এঁদের কি ধরা পরে যাবার ভয় নেই!”

মীনাক্ষী হেসে বললেন, “কি করে ভয় থাকবে? আত্মপূজারিদের খপ্পরে থেকে থেকে যে মানব যোনির মেধার নাশ হয়ে গেছে সম্পূর্ণ ভাবে। তা তো তাঁরাও জানে। … আর অন্য ভাবে দেখো, কিছুই তো তারা দেখে নি। কিন্তু যা দেখছে, তা দেখছে এমন দাবি করে, কত মানুষের ভাতের টাকা ছিনতাই করে নিয়ে, তাদেরকে দারিদ্রতা উপহার দিয়ে, বিত্তবান হচ্ছে তারা। এরপরে যদি তারা বলেন যে কিচ্ছু পাইনি, তাহলে তো সেই দারিদ্রতা বিদ্রোহ করে উঠবে। তাই কি বলছে সে, একটি জিনিস তারা দেখেছে। কিন্তু তা এতটাই দূরে যে, তার নাগালও কেউ পাবেনা। কিন্তু তারা সেই নাগাল পেয়ে গেছে। আর এই সমস্ত গল্পগুজব দিয়ে এঁরা মানবযোনিকে বুঝিয়ে যাচ্ছে যে, তারা উন্নতি করছে, আর এই গল্পের গরুর নাম করে করে, অর্থ লুণ্ঠন করে করে বিত্তবান হয়েই চলেছে তারা।

এটিই তো আত্মপূজা। এই আত্মপূজা আমাদের কাছে নূতন নয়, কারণ এই আত্মপূজা আর এই গল্পের গরুর কথা আমরা হাজার হাজার বছর ধরে বৈদিক ব্রাহ্মণদের মুখ থেকে শুনে আসছি। বুদ্ধরা, ঋষিরা যেই মনলোকের কথা বলে গেছেন, সেই সমস্ত কথাকে ভৌতিক জগতের কথা বলে বলে, সকলকে শনি, মঙ্গল, যম, রাহুদের থেকে ভয় দেখিয়ে দেখিয়ে, এঁরা সাধারণ মানুষের সমস্ত অর্থ, আহার, এমনকি স্ত্রী ও সন্তানও লুণ্ঠন করে এসেছে। আমরা তার সাক্ষী। তাই আমাদের কাছে এই গল্পের গরু নতুন কথা নয়।

কিন্তু মজার কথা হচ্ছে এই যে, না আমরা এই ব্রাহ্মণদের গল্পের গরুর গলায় দড়ি বাঁধতে পেরেছিলাম, আর না এখনকার আত্মপূজারিদের। যদি আমরা ব্রাহ্মণদের গল্পের গরুর সত্যতা জেনে ফেলতে পারতাম, আর উপলব্ধি করে ফেলতাম, তাহলে কিন্তু আজকের দিনের আত্মপূজারিদের গল্পের গরুকেও সহজেই ধরে ফেলতে পারতাম। কিন্তু আমরা সেই গরুকেও ধরি নি, তাই এই গরুও আমাদের কাছে অধরা।

নাহলে ভাবো, আমরা কেমন বিতর্কিত সমস্ত কথাকে বিনা বিতর্কে মেনে চলেছি। ভাবো, বর্তমান বিজ্ঞান বলছে, বিনা কনো মাধ্যম ছাড়া তাপ সঞ্চারিত হতে পারেনা। আর তা এও বলছে যে, মহাকাশ কনো মাধ্যম নয়, কারণ সেখানে পঞ্চভূতের কেবল আকাশ আছে, বাকি একটিও নেই। অথচ আমরা মেনে চলেছি যে সূর্যের তাপে ধরিত্রী তপ্ত হচ্ছে। বিচার করে দেখো, যদি মহাকাশ কনো মাধ্যম না হয়, আর তাপ মাধ্যম ছাড়া ভ্রমণ করতে না পারে, তাহলে সূর্যের তাপ কোন মাধ্যমে প্রবাহিত হয়ে ধরিত্রীপৃষ্ঠে উপস্থিত হচ্ছে!

বিচার করার আরো অনেক বিষয় আছে। যেখানে বায়ু নেই, উর্জ্জা বা অগ্নি নেই, জল নেই, মৃত্তিকা নেই অর্থাৎ পঞ্চভূতের মধ্যে চারটি ভূত নেই, সেখানে কনো পঞ্চভূত বস্তু কি স্থিত থাকতে পারে? (হেসে) কিন্তু এঁদের দাবি, এঁদের পঞ্চভূত দ্বারা নির্মিত উড়ন্ত জাহাজ সেই পঞ্চভূতের চার ভূত না থাকা অঞ্চলে দিব্যি বিরাজ করছে। ঠিক যেমন ব্রাহ্মণদের সূক্ষ্মলোকদের ভৌতিক জগতে কল্পনা হাস্যস্কর ছিল, ঠিক যেমন ব্রাহ্মণদের সূক্ষ্ম তত্ত্বদের ভৌতিক জগতের কনো দেব বা দেবী কল্পনা করা হাস্যস্কর ছিল, তার থেকেও অধিক হাস্যস্কর আজকের দিনের আত্মপূজারি লুটেরাদের দাবিসমূহ। কিন্তু আমাদের মেধা এতটাই পতিত হয়ে গেছে যে, আমরা তাই মেনে নিচ্ছি, আর একে অন্যের সাথে তর্ক করে চলেছি যে মানব জাতি অগ্রগতি করছে”।

মীনাক্ষীর আশ্চর্য মেধা দেখে বিস্মিত জয়াবিজয়া হতবাক হয়ে প্রশ্ন করে উঠলেন, “এই অসামান্য মেধা তুমি কি করে লাভ করলে মীনাক্ষী! এই মেধা আমরা মাতা সর্বশ্রীর অতীতে কারুর মধ্যে দেখিনি!”

মীনাক্ষী হেসে বললেন, “জয়াবিজয়া, মাতা সর্বশ্রী কে? দেবী দিব্যশ্রীর, অর্থাৎ ব্রহ্মসনাতন সন্তানের মানসের চেতনা। আর আমি কে? আমি ব্রহ্মসনাতন সন্তানের মানসসন্তানের চেতনা। আর আমার অতীত কি? আমি পূর্ব জন্মে ছিলাম বায়সী, আর সেই বায়সী অবস্থায় আমি সর্বক্ষণ প্রভু ব্রহ্মসনাতনের বাণী শ্রবণ করতাম। … তাই জয়াবিজয়া, আমাদের দুইজনেরই, অর্থাৎ মাতা সর্বশ্রী ও আমার, উভয়েরই মেধা প্রভুব্রহ্মসনাতনের চেতনা, অর্থাৎ স্বয়ং মাতা সর্বাম্বার থেকে, অর্থাৎ পরাচেতনার থেকে লব্ধ। তাই এতো মিল পাও আমাদের মধ্যে”।

রোজ প্রশ্ন করলেন, “তাহলে কি ভৌতিক জগতে কনো দেবদেবী সম্ভবই নয়?”

মীনাক্ষী হেসে বললেন, “না, সম্ভবই নয়। ভৌতিক জগতে সর্বোত্তম ভাবে ব্রহ্মময়ী অর্থাৎ ঈশ্বরের প্রকাশ দেখা যেতে পারে এক অবতারের মধ্যেই। তবে এঁদের মধ্যেও ভেদ থাকে। কেউ ঠাকুর রামকৃষ্ণ বা মার্কণ্ডের মত ৩২ কলার হন, তাঁদের মধ্যে ঈশ্বরত্ব অধিক প্রত্যক্ষ হয়; কেউ ব্যাসের মত বা শঙ্করের মত ১৬ কলা হন, এঁদের মধ্যে ঈশ্বরত্ব সামান্য কমে যায়, আবার প্রভু ব্রহ্ম সনাতন আছেন, যার মধ্যে ঈশ্বরত্ব অনেকটাই অধিক। কিন্তু কি জানো তো? যার মধ্যে যত অধিক ঈশ্বরত্বের প্রকাশ, সে ততটা সহজ সরল, আর সাধারণের থেকেও অধিক সাধারণ, কারণ আমাদের ঈশ্বর, আমাদের মা, আমাদের ব্রহ্মময়ী হলেন সাধারণের থেকেও অধিক সাধারণ। তিনি শুধুই আমাদের মা হয়ে থাকতে চান, কনো প্রকার চমৎকারই তিনি পছন্দ করেন না। তাও কিছু কিছু তো হয়েই যায়।

আর সত্য বলতে, তিনি তো নিরাকার, অসীম, অনন্ত, অব্যাক্ত, অচিন্ত্য। তাঁকে মানবীয় আধার কতটাই বা প্রকাশ করতে সক্ষম! ৯৬ কলা হলো তার উচ্চতম সীমা। আর আমি তুমি সকলে ১ থেকে ২ কলা ধারণ করে বসে আছি। বুঝতে পারছো কি কিছু? ১০৮ কলার মানব দেহ, তার মধ্যে ৯৬ কলা ব্রহ্মময়ী, অর্থাৎ মাত্র ১২ কলা আত্ম ধারণ করে অবস্থান করা! … রোজ, সেই অবস্থা পর্যন্ত আমরা পৌছাতেই পারবো না। আমরা ১ থেকে ২ কলা ব্রহ্মময়ীকে ধারণ করে, বাকি ১০৬-১০৭ কলা আত্মকে ধারণ করে অবস্থান করছি। এর থেকে সামান্য দুই কলা যদি আমরা ব্রহ্মময়ীকে নিজের অন্তরে বিস্তৃত করি, তাহলেই আমরা দেহের থেকে মুক্ত হয়ে যেতে বাধ্য হবো।

বাকি ১০৪ কলার নাশ হতে থাকবে আমাদের সূক্ষ্মশরীরে। … সেখানে প্রভু ব্রহ্মসনাতন কতটা বড় অবতার যে, তিনি মাত্র ১২ কলা আত্মকে ধারণ করে ৯৬ কলা ব্রহ্মময়ীকে ধারণ করে, প্রায় পূর্ণ শূন্যবেশে জীবনযাপন করলেন, শুধুমাত্র যেই সত্য আমরা ধারণা করতেও পারছিলাম না, সেই সত্য আমাদের উদ্দেশ্যে বিবৃত করার জন্য।

অনন্ত ব্রহ্মময়ী যে নিয়তি বেশেও সম্পূর্ণ নন, প্রকৃতি বেশেও নয়, তাহলে চেতনা বেশে তিনি কি করে সম্পূর্ণ রূপ ধারণ করতে সক্ষম হবেন? সেই অসীমকে যে সসীমে স্থাপন করাই সম্ভব নয়। তাই তো প্রভু ব্রহ্মসনাতন যখন নিজের আরাধ্যা মাতা সর্বাম্বার মূর্তিমুখশ্রীকে সাজাতেন, তখন হাসতে হাসতে বলতেন, সসীমকে কতই না সাজিয়ে নাও, অসীমের রূপ কি তাতে প্রকাশ পায়!

তিনি বলতেন, অসীম যে বন্ধনহীন, তাই তাঁর রূপও যে বন্ধনহীন। সসীমকে কতই সাজাও, তাঁর রূপ যে বন্ধনে আবদ্ধই থেকে যায়। আর এমন কথা বলতে বলতে, তিনি অসীমের মধ্যে নিজের যৎসামান্য আত্মকেও হারিয়ে ফেলে, সমাধিস্থ হয়ে যেতেন। মাত্র এক কি দুই কলা আত্ম অবস্থান করতো, যাকে ধারণ করে পুনরায় তিনি দেহে ফিরে আসতেন, আর এক ম্লান হাস্য দিতেন। যেন অসীম থেকে সসীমে ফিরে আসার, বন্ধনহীন অবস্থা থেকে বন্ধনে ফিরে আসার বেদনাও রয়েছে, আবার এতক্ষণ অসীমে বিরাজ করার আনন্দও।

কি ভাবে বিবরণ দিতেন জানো এই সমাধির! বলতেন, মায়ের কখনো কখনো দয়া হয় এই সন্তানের উপর। তাঁকে তখন কোলে টেনে শুইয়ে দেন। অসিমার কোলে শুইয়ে এই সসীম নাশ হতে চায়, আর তাই সেই অসীমকে প্রত্যক্ষ করে, নিজের সসীমকে তুচ্ছ কল্পনা জ্ঞান করতে সমাধিস্থ হয়ে যাই। কিন্তু তখন আবার মা বলেন, ‘বাবা, এখনও সময় হয়নি, কাজ বাকি আছে। আরো বলতে হবে সত্য সকলকে। ফিরে যা সসীমে’। …তিনি বলতেন, মন কি চায়, অসীম ছেড়ে সসীমে আসতে। মায়ের কোলের আনন্দ ছেড়ে এই কল্পনা, চিন্তা, ইচ্ছার জগতে ফিরে আসতে! … কিন্তু মায়ের সকল সন্তানের জন্য চিন্তা। তাই সকল সন্তানের জন্য ফিরতেই হয়।

অর্থাৎ, অবতারই হলেন ঈশ্বরের একমাত্র ভৌতিক প্রকাশ। আর অবতার অত্যন্ত সামান্য হন। জ্ঞানত তিনি কনো প্রকার চমৎকার করেন না, বা করতে চান না। কিন্তু তাও, যদি প্রভু ব্রহ্মসনাতনের ন্যায় ৯৬ কলা অবতার হন, তখন তো সম্পূর্ণ নিয়তি, সম্পূর্ণ প্রকৃতি, সম্পূর্ণ চেতনার উপর অধিকার এসে যায়। তাই তাঁর মুখে কথাতেই নিয়তি অর্থাৎ কালের গতি, প্রকৃতি পরিবর্তীত হয়ে যায়, আর তাই আমাদের সামনে চমৎকার রূপে প্রত্যক্ষ হয়।

তাই সেই চমৎকারকে ব্যতি রাখলে, অবতারকে চেনা অত্যন্ত কঠিন। কনো প্রকার ভিন্ন বেশভূষা, আহার ইত্যাদি ধারণ করতেই তাঁরা অনিচ্ছুক থাকেন। সত্য বলতে কনো প্রকার ইচ্ছা করতেই তাঁরা অনিচ্ছুক থাকেন। এক নিয়তির ইচ্ছাই ইচ্ছা, এক নিয়তির মার্গদর্শনই কর্তব্য, এই বোধ থাকে তাঁদের অন্তরে। কিচ্ছু বলতে কিচ্ছু অধিকার করতে চান না। নিজে তো কারুকে শিষ্য করেনই না। কেউ যদি শিষ্য হতে চান, তখনও তিনি বলেন, আমিও তাঁর থেকে শিখি, তুমিও তাঁর থেকে শিখতে থাকো। গুরুভাই হয়ে যাবো আমরা, আবার আমাকে গুরু বানানো কেন? মা আছেন তো! তিনি থাকতে আমি কি করে গুরু হতে পারি বলোতো!

কিন্তু আমি যতটা বুঝেছি, অবতারকে বোঝার বেশ কিছু উপায় আছে। প্রথম তো, তাঁর অঙ্গে কনো প্রকার গন্ধ থাকেনা। স্বেদে পরিপূর্ণ হয়ে গেলেও কনো গন্ধ থাকেনা, না অঙ্গে না বস্ত্রে। দ্বিতীয়ত তাঁর কোমল অঙ্গ, অত্যন্ত কোমলাঙ্গী হন। পুরুষ দেহে থাকলে, তা আরো স্পষ্ট ভাবে বোঝা যায়। আর তৃতীয় হলো তাঁর প্রেম, সকলের প্রতি প্রেম, আর সর্বস্বকিছুকে নিজের সন্তান জ্ঞান করা। আর এর অতিরিক্ত যদি কিছু থাকে, তা হলো তাঁর জ্ঞানের ভাণ্ডার। আমি কোনদিন কারুকে প্রভু ব্রহ্মসনাতনের কাছে কারুকে এসে কিছু জানার ইচ্ছা করে প্রশ্ন করে, নিরুত্তর হয়ে বা অতৃপ্ত হয়ে যেতে দেখিনি। আর থাকে ব্যাসদেবের চিহ্নিত অঙ্গে তিল অঙ্কন।

যদি সম্মুখের প্রশ্নকর্তা তাঁকে পরখ করার জন্য প্রশ্ন করেন, তিনি অত্যইন্ত বিচিত্র ও ট্যারা ট্যারা উত্তর দিতেন যাতে সম্মুখের ব্যক্তি বিরক্ত হয়ে যান ও তাঁর আত্ম অত্যন্ত বিশ্রী ভাবে আহত হয়ে যান। আর যদি সম্মুখের ব্যক্তি জিজ্ঞাসু মন থেকে কনো প্রশ্ন করেন, তিনি তৃপ্ত হয়েই যেতেন প্রভুর থেকে। এই অদ্ভুত সামর্থ্য আমি অন্য কনো আচার্য, গুরু, কারুর মধ্যে দেখিনি। বায়সী হয়ে থাকা কালীন, প্রভুকে দেখার পর আমি বিভিন্ন গুরু, আচার্যের কাছে গেছিলাম, এটা দেখার জন্য যে প্রভুর এই সামর্থ্য, এই প্রেম, এই জিজ্ঞাসুর প্রতি যত্ন, তা কি অন্যদের মধ্যেও থাকে না থাকেনা, তা দেখার জন্য।

কিন্তু যতই তার সন্ধান করেছি, ততই প্রভুর প্রতি আমার সম্মান বৃদ্ধি হয়েছে, কারণ প্রভু কেবল তৃপ্তই করতেন না নিজের উত্তর দিয়ে সম্মুখের ব্যক্তিকে। সঙ্গে সঙ্গে সেই ব্যক্তিকে নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নেবার জন্য যেই পরিমাণ স্বতন্ত্রতা প্রদান করতেন, আর যেই পরিমাণ স্নেহ প্রদান করতেন, তা আমাকে সর্বক্ষণ লালায়িত করতো, তাঁর পশ্য হয়ে থেকে যাবার জন্য। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমরা যে বায়সীকে কেউ কখনও পশ্য করিনা। তাই আমি তাঁর কাছে এই আবদার করতে পারলাম না”।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28