১৮.২। প্রয়াস পর্ব
যেমন মীনাক্ষী বললেন, তেমনই সকলে করলে, সকলে নেত্রের ফাঁক দিয়ে দেখলেন, প্রায় ৫০জন পৈতেধারি বৈদিক ব্রাহ্মণ, আর ৫০ জন গেরুয়া বস্ত্র ধারি, বৈদিক ভণ্ড সাধু সেখানে উপস্থিত হয়েছেন, আর এঁদের নেতৃত্ব করছে, এক যুবক। সেই যুবকের চেহারা প্রকাণ্ড। প্রায় আড়াই গজ উচ্চতার দৈত্য যেন সে। মুখভঙ্গি ক্রুর হলেও, জয়া বিজয়া তাঁকে একদেখায় দেখে মনে করে যেন করিন্দ্র জীবিত রয়েছে। বেশ বুঝতে পারে যে, করিন্দ্রে পরস্ত্রী নিয়ে যেই সমস্ত অপকর্ম করতেন, তারই ফলস্বরূপ এই যুবক, নিশ্চিত ভাবে প্রতিশোধ নিতে এসেছে পিতার মৃত্যুর।
মীনাক্ষীর অপেক্ষা না করে কোকিলের স্বর নির্গত করতে, এক শত মল্লার অধিবাসী যারা কৃতান্তিক হবার জন্য উদগ্রীব, তাঁরা সরাসরি উঠে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করতে শুরু করে দিলেন। এরা একাকজন বেশ শক্তিশালী যোদ্ধা, তাই এঁদের প্রহারের কাছে বৈদিক ব্রাহ্মণরা তথা ভণ্ড বৈষ্ণবরা অসহায় বোধ করতে থাকলেন। এই সত্য তাঁরাও যে জানতেন না, তেমনটা নয়। আর জানতেন বলেই, এঁদেরকে আহারের সাথে নিদ্রার ওষধি পান করিয়ে বন্দী করে, প্রহার করতে আগ্রহী ছিলেন এঁরা।
কিন্তু সজ্ঞানে, এঁদের সাথে পেরে উঠবেন না বৈদিকরা, আর তাই এদের প্রহারে বৈদিকরা ধরাশায়ী হতে শুরু করলে, সেই দৈত্যাকায় সম্মুখে এসে এবার তাণ্ডব করতে শুরু করলেন। তাঁর নাম উপেন্দ্র, এমনই শুনেছেন জয়াবিজয়া যখন বৈদিকরা ধরাশায়ী হবার কালে এবং প্রাণ ত্যাগ করার কালে এঁর নাম উচ্চারণ করে রক্ষা করার দাবি করছিলেন। আর এই উপেন্দ্র মহাবলবান।
এঁর একার বল ও উর্জ্জা এমনই ভয়ঙ্কর যে তার সম্মুখে যে বা যারা যাচ্ছিল, তাদেরই প্রাণ বিপন্ন হয়ে পরছিল। তাই সকলকে সরিয়ে দিয়ে জয়া ও বিজয়া এঁর সম্মুখে গেলে, বেশ কিছু মোক্ষম প্রহার করেন জয়াবিজয়া উপেন্দ্রের উদ্দেশ্যে। কিন্তু সেই সমস্ত প্রহার উপেন্দ্রের কাছে নিছকই ক্রীড়া বোধ হয় যেন। অট্টহাস্য হেসে, এবার সে ধাওয়া করে, জয়া ও বিজয়ার কেশকে দুই হস্তে ধারণ করে, তাঁদেরকে ভূমি থেকে উঠিয়ে পাছার দিয়ে হত্যা করতে উদ্যত হলে, সকলে ঠিক করে বুঝতেও পারলেন না, একটি যেন উড়ন্ত চাকি উঠে এলো, আর একটি সজোরে মুষ্ট্যাঘাত করলো উপেন্দ্রের মস্তকে। পরবর্তী ক্ষণে সকলে দেখলো উপেন্দ্রের দেহ দাঁড়িয়ে রয়েছে, কিন্তু মুণ্ড নেই তাতে। ভালো করে নিরীক্ষণ করে দেখলে, সকলে দেখতে পেল যে, উপেন্দ্রের মুণ্ড গর্দান থেকে ভেঙে গিয়ে, উপেন্দ্রেরই পৃষ্ঠে তা সংলগ্ন হয়ে আছে।
ক্রমশ উপেন্দ্রের শবদেহের অগ্রভাগ সম্মুখে পরতে থাকলে। তন্ত্রকন্যারা জয়ার তনুকে এবং মীনাক্ষী বিজয়ার তনুকে সুরক্ষিত ভাবে ধারণ করলেও, উপেন্দ্রের মুষ্টিবদ্ধ অবস্থা থেকে তাঁদের কেশগুচ্ছকে সহজে পৃথক করতে পারলো না কেউই। তাই দেখে, ক্রমশ উগ্র রূপ ধারণ করে, পুনরায় এক উড়ন্ত চাকির মত বেশ ধারণ করে, মীনাক্ষী ঈষৎ লম্ফ দিয়ে, উপেন্দ্রের মুষ্টির উপর পদস্থাপন করলে, তার মুষ্টির অস্থি সম্পূর্ণ গুড়গুড় হয়ে গেল।
এই ভাবে জয়া ও বিজয়াকে উদ্ধার করা দেখলে, জীবিত যেই সকল জনা বিশেক বৈদিক ছিলেন, তাঁরা প্রাণরক্ষা করে পলায়ন করলেন। আর সকলে দেখলেন ও জানলেন মীনাক্ষীর অদ্ভুত প্রতাপ, তেজ ও সামর্থ্যের ব্যাপারে। এই সকল করতে করতে প্রভাত হয়ে যেতে, আর অপেক্ষা না করে, সকলে পথ চলতে থাকলেন, বিশেষ করে সকলেরই চিন্তা ছিল যে শীর্ষ কেমন আছে, সেই নিয়ে।
প্রায় এক প্রহর সকলে বিনা কনো বাক্যব্যয় করে পথ অতিক্রম করতে থাকলেন, কারণ সকলেরই ধ্যান ছিল শীর্ষের সন্ধান করার দিকে। অবশেষে, একটি বৃক্ষের নিচে তাঁকে ঘুমন্ত অবস্থায় প্রথম মীনাক্ষী লাভ করেন। তাই তিনি দৌড়ে তাঁর নাম উচ্চারণ করে এগিয়ে গেলে, সকলের দৃষ্টি তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হয়, এবং সকলে ঘুমন্ত শীর্ষের কাছে উপস্থিত হন।
মীনাক্ষীকে এবার যেন সকলে এক ভিন্ন রূপে দেখলেন। শীর্ষের সম্পূর্ণ দেহকে নিজের ক্রোড়ে ধারণ করে, রেখে, মীনাক্ষী বললেন, “শীতল জল নিয়ে এসে, শীর্ষের সম্পূর্ণ দেহে তা প্রদান করিয়ে স্নান করাতে হবে। ওষধির ছাপ সম্পূর্ণ দেহে ছড়িয়ে গেছে ওর। সমস্ত ওষধিকে প্রথমে বাইরে থেকে লঘু করে দিতে হবে। একবার তা হয়ে গিয়ে ওর নিদ্রা ভঙ্গ হলে, ওকে গরম দুগ্ধ পান করাতে হবে, তবে অন্তরেও ওষধির প্রভাব নষ্ট হবে”।
এমন বললে, তন্ত্রকন্যারা শীতল জল আনতে চলে গেলে, জয়াবিজয়া কাষ্ঠ আনতে গেলেন, আর অন্যদিকে মীনাক্ষী একটি দুগ্ধদায়িনী ছাগল দেখতে পেয়ে, তাঁর কাছে গিয়ে, তাঁকে কি বললেন কেউ জানেনা, তবে সেই ছাগলটি যেন স্বেচ্ছায় দুগ্ধ প্রদান করতে রাজি হয়ে গেল। আর তাই খানিকটা দুগ্ধ দুইয়ে নিয়ে আসলো মীনাক্ষী।
তন্ত্রপুত্ররা তাঁদের ভ্রাতাকে স্নান করিয়ে দিলে, সামান্য সময়ের মধ্যেই শীর্ষের নিদ্রা ভঙ্গ হয়। তাই মীনাক্ষী জয়াবিজয়ার আনায়ন করা কাষ্ঠজ্বালিয়ে দুগ্ধ গরম করে নিয়ে এসে, শীর্ষকে সেই দুগ্ধ পান করাতে, ধীরে ধীরে শীর্ষের নিদ্রা সম্পূর্ণ ভাবে কেটে যায়। কিন্তু মীনাক্ষী তাও বলেন, “দিদি, আজকের দিনটা শীর্ষকে ছেড়ো না, বা আরো ভালো হয় যদি শীর্ষের পরিবর্তে অন্য আরেকজনকে যেতে বলো শ্রীপুরে। শীর্ষের আমাদের সাথে থেকে, বারবার জলপান করা আবশ্যক। ওষধির যা কিছু প্রভাব আছে শরীরে, জলপান করতে করতে, তা লঘু হয়ে গিয়ে প্রস্রাবের সাহায্যে তা নির্গত হয়ে, ওকে সুস্থ করে দেবে”।
জয়া সেই কথাতে সম্মতি প্রদান করে, শীর্ষের স্থানে সঙ্গীকে শ্রীপুরে প্রেরণ করলে, বাকি সকলে পথ চলতে শুরু করলেন মল্ল রাজ্যের মধ্য দিয়ে। সকলেই চুপ, কিন্তু কেউই শান্ত নন। মীনাক্ষীর দিব্যতা সকলকে আকর্ষণ করা শুরু করে দিয়েছে ইতিমধ্যেই। যেই দানবের সম্মুখে কেউ দাঁড়াতেও পারছিলেন না, তাঁকে একটি মুষ্ট্যাঘাতে নিহত করে দেওয়া, এতো সামান্য কীর্তি হতে পারেনা!
থাকতে না পেরে দেবী শুদ্ধা প্রশ্ন করলেন মীনাক্ষীকে, “আচ্ছা মীনাক্ষী, তোমার এই দিব্যতার রহস্য কি! এই দিব্যতা কি তুমি শিশুকাল থেকেই নিজের মধ্যে লক্ষ্য করেছ?”
শুদ্ধা সকলের মনের কথা বলে দিলো যেন। তাই সকলেই মীনাক্ষীর উত্তরের অপেক্ষা করতে থাকলো। কিন্তু মীনাক্ষী এই প্রশ্নে হতবাক। সে পরিবর্তে প্রশ্ন করলো, “দিব্যতা! তোমরা আমার মধ্যে দিব্যতা কি ভাবে দেখলে আবার?”
বিজয়া বললেন, “যদি সর্পের বা ব্যঘ্রের আকর্ষণের কারণ প্রেম হয়, তা মেনে নেওয়া যায়, যদিও সেই প্রেমও এমনই দিব্য, যেমন দিব্যতা আমরা মাতা সর্বশ্রীর মধ্যে দেখেছি। কিন্তু ভণ্ডপুত্রের নাশ, বা এই উপেন্দ্র দানবের নাশ, তাও এমন সহজে, এই সমস্ত কিছুর সাক্ষী আমরা। তোমার মনে হয়না, এই সমূহ কিছু এক মহাদিব্যতা!”
মীনাক্ষী এক তাচ্ছিল্যের হাস্য হেসে এবার যা বললেন, তা সকলের অন্তরকে তটস্থ করতে থাকলো। মীনাক্ষী বললেন, “আচ্ছা, বিজয়া, তোমাদের কি মনে হয়, আমরা বর্তমানে রয়েছি!”
বিজয়া হতবাক হয়ে বললেন, “এ কেমন অদ্ভুত প্রশ্ন। অবশ্যই হ্যাঁ, আমরা বর্তমানে রয়েছি”।
মীনাক্ষী পুনরায় বিদ্রূপ প্রকাশ করে বললেন, “ভ্রান্ত ধারণা তোমার বা তোমাদের যে আমরা বর্তমানে রয়েছি। … বিজয়া, প্রভু ব্রহ্মসনাতন ছিলেন পূর্ণ অবতার, অর্থাৎ ৯৬ কলা অবতার সাখ্যাত ব্রহ্মময়ী মাতার। আর তাঁর মনযুদ্ধ পর্বই ছিল একমাত্র বর্তমান, অর্থাৎ যেই যুদ্ধে মাতা সর্বাম্বা সাখ্যাত মাতা গুহ্যা বেশে অবতীর্ণ হয়ে আত্মের নাশ করেছিলেন। এর অতিরিক্ত কিছুই বর্তমান নয় বিজয়া, কিছুটা অতীত, তো কিছুটা ভবিষ্যৎ, আর আমরা এক্ষণে রয়েছি ভবিষ্যতে”।
জয়া এবার উত্তরে বললেন, “কি বলছো এসব মীনাক্ষী!”
মীনাক্ষী হেসে বললেন, “যা বলছি, তা ধ্রুব সত্য দিদি। আর তা কতটা সত্য, তা মাতা সর্বশ্রীর কাছে উপস্থিত হয়ে তোমরা প্রশ্ন করে জেনে যাবে। … তবে হ্যাঁ, তার কিছু প্রমাণ দিতে পারি আমি তোমাদের”।
দেবী শৃঙ্গার বললেন, “বেশ দাও কিছু প্রমাণ”।
মীনাক্ষী হেসে বললেন, “চন্দননগরে মাতা জগদ্ধাত্রীর আরাধনার প্রচলন কবে থেকে? যতদূর ধারণা আছে আমার, তা হলো আজ থেকে প্রায় ৫ শত বর্ষপূর্বের ইতিহাস। আর চন্দননগর দুর্গের ধ্বংসকাল কবে? যতদূর ইতিহাস জানা আছে আমার, তা হলো আজ থেকে প্রায় আড়াইশ বৎসর পূর্বের ইতিহাস। ভুল বলছি আমি? নিজেরা শিক্ষা লাভ করেছ মাতা সর্বশ্রীর থেকে। আমার থেকে সেই ইতিহাস অধিক ভালো ভাবে জানো তোমরা”।
দেবী বিজয়া বললেন, “তোমার কথা তো সঠিক। কিন্তু এর অর্থ তো এই যে আমরা এক্ষণে অতীতে রয়েছি! তুমি যে বললে, আমরা ভবিষ্যতে রয়েছি!”
মীনাক্ষী মুচকি হেসে বললেন, “একবার স্থূল জগতের দিকে দেখো বিজয়া। কি দেখতে পাচ্ছ? কিছু কি দেখতে পাচ্ছ?”
জয়া বিজয়া ও সকলে দেখার প্রয়াস করে বললেন, “তেমন কিছুই বুঝতে পারছিনা। তবে যা দেখতে পাচ্ছি, তা এখানে যা হচ্ছে, তার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন”।
মীনাক্ষী আবার হেসে বললেন, “সঠিক কথা বলছো, সমস্তটাই ভিন্ন। স্থূল আর সূক্ষ্মকে তোমরা গুলিয়ে ফেলেছ। তোমরা কেউই স্থূল নও, না আমি স্থূল। আমরা সকলেই সূক্ষ্ম। প্রভু ব্রহ্মসনাতন ছিলেন পূর্ণ অবতার। তাই তাঁর চেতনা সূক্ষ্মভাব ত্যাগ করে কারণ ভাবে উপনীত হয়ে মহাদেবী মেধা হয়েছিলেন, এবং পরে তিনি স্বয়ং ব্রহ্মময়ী অর্থাৎ পরানিয়তি, পরাপ্রকৃতি, তথা পরাচেতনারূপে মাতা সর্বাম্বা রূপে স্থিতা ছিলেন।
প্রভু ব্রহ্মসনাতন যখন নিজের মনযুদ্ধ জয় করে, নিজের আত্মকে পরাস্ত করে, পরব্রহ্মরূপে স্থাপিত ছিলেন, তাঁরই কথন হলো কৃতান্তের সর্বাম্বা কাণ্ডের কথা। আর আমরা সকলে তাঁরই প্রেরণাতে প্রেরণাপ্রাপ্ত চেতনা। ব্রহ্মসনাতনের সন্তানের মনরূপ হলেন দেবী দিব্যশ্রী, আর তাঁর চেতনা হলেন মাতা সর্বশ্রী। চিত্তাদি ও করিপুত্রাদি সকলে হলেন তাঁরই মনযুদ্ধ জয়ের অবকাশ, আর তাই তাঁর যুদ্ধ জয়ের কাণ্ডকে আমরা কৃতান্তের জগধদাত্রেয় কাণ্ড রূপে সনাক্ত করি।
কিন্তু এবার তোমরা প্রশ্ন করবে যে, সেই কাণ্ডে অতীতের কথা কেন রয়েছে? কারণ ব্রহ্মসনাতন সন্তান পূর্ণ অবতার নন, তিনি হলেন অংশঅবতার, আর তাঁর চেতনা তবে থেকে কর্ম করে চলেছেন, যেই সময়কাল থেকে জগদ্ধাত্রী আরাধনার প্রচলন ঘটে চন্দননগরে। সেই অতীত অতিক্রম করে, যবে থেকে দিব্যশ্রীর চেতনা ব্রহ্মসনাতনের পূর্ণচেতনার সাখ্যাত লাভ করেন, সেইদিনটি হলো চিত্তাপুত্র সুর এবং সর্বাম্বাভগিনী দেবী চিত্তার বিবাহদিবস, অর্থাৎ যেদিন সুর প্রথমবার মাতা সর্বাম্বার ভান লাভ করেন।
চিত্তাপুত্রদের পুনর্জন্ম হয় সাগরদ্বীপে, আর তখন থেকে ব্রহ্মসনাতন চেতনা, মাতা সর্বাম্বাকে অন্তরে ধারণ করতে থাকা দিব্যশ্রী সম্পূর্ণ ভাবে নিজের চেতনার আভাস লাভ করেন। সেই সময়কালটি হলো তখন যখন রাজা নিষ্ঠাবান সর্বশ্রীকে উদ্ধার করে নিজের আলয়ে নিয়ে যান। অর্থাৎ এই যে, মাতা সর্বশ্রী হলেন ব্রহ্মসনাতন সন্তানের চেতনা, যিনি মাতা সর্বাম্বার সান্নিধ্য অর্থাৎ ব্রহ্মসনাতনের সান্নিধ্য লাভ করে পূর্ণভাবে দিব্যতা অর্জন করেছিলেন।
তাঁরই স্বপ্ন ছিল কৃতান্তিক ধর্মের স্থাপনা, আর তাই তিনি সমস্ত চেতনার আবাহন করেছিলেন, যারা মিলে কৃতান্তিক ধর্মের স্থাপনা করবেন। আর সেই সমস্ত চেতনাগুলি কারা কারা? সেই সমস্ত চেতনাগুলির আবাহন প্রকৃত অর্থে করেছিলেন মাতা সর্বাম্বা, আর দেবী সর্বশ্রী তাঁরই আবাহন করা চেতনাদের একত্রিত করে, কৃতান্তিক ধর্মের স্থাপনা করতে আগ্রহী হন। আর জানো সেই সকল চেতনারা কারা? (মৃদু হেসে) তোমরা সকলে। জয়া বিজয়া, তথা তন্ত্রসন্তানরা।
এই একই আবাহন আমাকেও করা হয়েছিল, অর্থাৎ আমি যার চেতনা, তাঁকে, আর আমার চেতনার প্রভাবে জাগ্রত হয়েছে এই মল্লরাজ্যের হবুকৃতান্তিকগণ, অপ্সরারা, দিশারা, এবং আরো অনেকে রয়েছেন, যারা আমাদের সাথে পথে সাখ্যাত করবেন। আর আমরা সকলে এখন কোথায় যাচ্ছি? মাতা সর্বশ্রীর কাছে। তিনি কে, ব্রহ্মসনাতন সন্তানের চেতনা। আর আমি কে? দিব্যশ্রী সম্মুখে দেখো আরো এক মানস বিরাজ করছে, যার নাম শ্রীমতী, আমি তাঁরই চেতনা মীনাক্ষী।
ভালো করে নিরীক্ষণ করো স্থূলকে, প্রভু ব্রহ্মসনাতনের সন্তানের মানস দেবী দিব্যশ্রী আর শ্রীমতী মিলে কৃতান্তিক ধর্মের স্থাপনা করতে চলেছেন, আর তাঁরা যেই যেই চেতনাদের সান্নিধ্য আগামী দিনে পেতে চলেছেন, তারা সকলে কারা? তোমরা। অর্থাৎ দিব্যশ্রী ও শ্রীমতী মিলে খুব শীঘ্রই কৃতান্তিক ধর্মের স্থাপনা করতে চলেছে, যার সদস্য সংখ্যা কয়জন হবেন? তিন শত। আমরা সকলে মিলে তিন শত জন।
অর্থাৎ বুঝতে পারছো কি তোমরা যে, আমরা বর্তমানে আর আবদ্ধ নেই, ভবিষ্যতে চলে এসেছি? ব্রহ্মসনাতনের সন্তানের চেতনার জাগরণের অতীত কথা শ্রীমতী এতক্ষণ তাঁকেই শ্রবণ করালেন জগদ্ধাত্রেয় কাণ্ডরূপে। সেই চেতনার জাগরণ ঘটেছিল অতীতে। আর সেই জাগরণ সমাপ্ত হয় বর্তমানে এসে। তাই জগদ্ধাত্রেয় কাণ্ড ছিল অতীত থেকে বর্তমানের যাত্রার কথা। আর এক্ষণে এই যে সর্বশ্রী কাণ্ডরূপে আমরা সকলে কৃতান্তের মধ্যে প্রবাহিত হয়ে চলেছি, তা হলো আগামী দিনের কথা, অর্থাৎ দিব্যশ্রী ও শ্রীমতি মিলে স্থাপিত কৃতান্তিক ধর্মের উপস্থাপনার কথা।
আমরা সকলেই দিব্য বিজয়া, কারণ আমারা সকলেই সূক্ষ্ম, সকলেই চেতনা। নিজের চেতনাকে উপলব্ধি করে ফেলেছেন দেবী দিব্যশ্রী, আর তাই তাঁর চেতনাও দিব্যতা ধারণ করে মাতা সর্বশ্রী রূপে অবস্থিতা। আর মাতা সর্বাম্বার কৃপায়, মীনাক্ষীও নিজের চেতনাকে উপলব্ধি করছেন, তাই তাঁর চেতনা, এই মীনাক্ষীর মধ্যেও তোমরা দিব্যতা অনুভব করছো। আর এমন যেমন তোমাদের অবয়বও তোমাদেরকে চেতনারূপে সনাক্ত করে নিতে সক্ষম হবে, তোমাদের মধ্যেও দিব্যতার অনুভূতি হওয়া শুরু করবে।
তবে একটি বারের জন্যও এমন ভেবো না যে আমরা কেউ মাতা সর্বাম্বার দ্বিজরূপ। প্রভু ব্রহ্মসনাতনের চেতনা তিনি; পরাচেতনা তিনি, পরাপ্রকৃতি তিনি, স্বয়ং ব্রহ্মময়ী তিনি। যেদিন মাতা সর্বশ্রী, এই মীনাক্ষী সকলে তাঁর ন্যায় হয়ে যাবে, সেদিন না থাকবে আর সর্বশ্রী আর না থাকবে মীনাক্ষী। সেদিন সমস্ত কিছু একাকার হয়ে গিয়ে মাতা সর্বাম্বাই অবশিষ্ট থাকবেন।
বিজয়া, জয়া, সকল তন্ত্রসন্তানগণ, আমরা সকলেই নশ্বর, কারণ আমরা কেবলই চেতনা। ঈশ্বর এক ও একমাত্র মাতা সর্বাম্বা। আর যখন এই নশ্বর চেতনাসমূহ সার্বিক ভাবে ব্রহ্মলাভ করবে, সেদিন তাঁরা সকলে মাতা সর্বাম্বার মধ্যে বিলীন হয়ে গিয়ে মোক্ষ অর্জন করবে। তবে তার মধ্যে মাতা সর্বাম্বার কি কি লীলা থাকবে, তা আমরা কেউ জানিনা। আমরা সকলে তাঁরই লীলার মধ্যে বিরাজমান। আর তাঁর সাথে মিলিত হবার মার্গ নির্মাণ অর্থাৎ কৃতান্তিক ধর্ম নির্মাণের একাকটি মাধ্যম।
তবে আরো দুটি কথা বলতে পারি তোমাদেরকে। একটির ব্যাপারে আমি সুনিশ্চিত, আর অন্যটির ব্যাপারে, আমি অনিশ্চিত। যেই ব্যাপারে আমি সুনিশ্চিত, তা এই যে, মাতা সর্বশ্রী, অর্থাৎ ব্রহ্মসনাতন সন্তানের চেতনা খুব শীঘ্রই অন্তিম লগ্নে উন্নীত হতে চলেছেন, অর্থাৎ তিনি মাতা সর্বাম্বার মধ্যে বিলীন হবার পথে অনেকটাই এগিয়ে রয়েছেন। আর আশা করতে পারি যে, তিনি এই অবয়ব ত্যাগ করার পূর্বেই, মাতা সর্বশ্রী ব্রহ্মময়ী মাতা সর্বাম্বার মধ্যে লীন হয়ে যাবেন।
আর দ্বিতীয় ব্যাপার, যেই সম্বন্ধে আমি অনিশ্চিত, তা হলো প্রলয়। প্রায় প্রতিদিবস নিদ্রার মধ্যে আমি এই প্রলয়কে প্রত্যক্ষ করি, যেন আগামী দিনে, এক্ষণে যেই ব্রহ্মদিবস ও ব্রহ্মরজনীর সন্ধিক্ষণ চলছে, তা সমাপ্ত হয়ে যাবে এক ভৌতিক জগতের প্রলয়ের মাধ্যমে, আর স্থাপিত হবে কেবলই ব্রহ্মরজনী। বিক্ষিপ্ত সেই দৃশ্য, যা আমি দেখি, আর তাতে অদ্ভুত কিছু কীর্তি দেখি ভৌতিক জগতে।
দেখি যে যা কিছু সমুদ্রউর্ধ্বে স্থিত, তার সমস্ত কিছুকে সমুদ্র গ্রাস করে ফেলছে, আর যা কিছু সমুদ্রনিম্নে স্থিত, তা সমুদ্রের থেকে উঠে আসছে। দেখি যে, সেই প্রলয়ের কালে নূতন হিমালয় স্থাপিত হচ্ছে, নূতন দাক্ষিণাত্য স্থাপিত হচ্ছে, ভুমদ্রসাগর থেকে উর্বর জমি উত্তলিত হচ্ছে। আর দেখি যে তিনটি বিশালাকায় জাহাজ সেই নূতন সমুদ্র থেকে উঠে আসা জমিতে ধাক্কা লেগে চুরমার হয়ে ভেঙে পরছে। আর তার থেকে তিনটি সাম্রাজ্য গজিয়ে উঠছে।
এই দৃশ্য আমি কেন দেখি, তা জানিনা, কিন্তু প্রতিদিন নিদ্রার মধ্যে দেখি। অনেক প্রকার প্রয়াস করেছি যাতে এমন গভীর নিদ্রা যাওয়া যায় যে কনো স্বপ্নই না দেখা যায়। গভীর নিদ্রা গেছি, তাও তার মধ্যে এই দৃশ্য দেখেছি। কি এর অর্থ আমি জানিনা। স্বপ্ন না বাস্তব, তাও জানিনা। স্বপ্ন সকল সময়ে অতীতকেন্দ্রিকই হয়, কিন্তু অতীতের এমন কনো ঘটনার কথা কোথাও নেই, তাই বুঝতে পারিনা। আর সেই কারণেই বললাম, এই ব্যাপারে আমি অনিশ্চিত।
তাই হ্যাঁ, যেই প্রসঙ্গে এই সমস্ত কথা তোমাদের বললাম, দিব্যতা। চেতনা যতই প্রকৃতি ও নিয়তির মধ্যে লীন হবার দিশায় যাত্রা করে, ততই দিব্য হয়ে ওঠে বাকি চেতনাদের দৃষ্টিতে। সেই কারণেই মাতা সর্বশ্রী তোমাদের কাছে দিব্য, কারণ তিনি মাতা সর্বাম্বার সর্বাধিক নিকটে স্থিত, আর আমার চেতনার মধ্যেও তোমরা দিব্যতা দর্শন করো, কারণ মাতা সর্বশ্রীর পরে মাতা সর্বাম্বার নিকটে যদি কেউ অবস্থান করে, সে এই মীনাক্ষী”।
সকলে যখন এই সমস্ত কথন শ্রবণ করে অন্তর্মুখী হয়ে সমস্ত কথাকে মেলাচ্ছিলেন, তখন জয়া দেখলেন দক্ষিণ পূর্ব দিক থেকে পাঁচজনের একটি গোষ্ঠী, এবং দক্ষিণ পশ্চিম থেকে একটি ৩ জনের গোষ্ঠীর সম্মুখে আসছে তাঁদের। পাঁচজনের গোষ্ঠীর মধ্যে তিনটি স্ত্রী এবং দুটি পুরুষ বিদ্যমান, যারা সকলেই উচ্চতায় বেশ লম্বা, আর অঙ্গের বর্ণ অতীব শুভ্রতা যুক্ত। আর তিনজনের গোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছেন দুটি স্ত্রী যাদের অঙ্গবর্ণ তৈলাক্ত মৃত্তিকার মত, এবং একটি পুরুষ যার অঙ্গবর্ণ কয়লাসম। জয়া দেখে প্রথম সেই দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করালেন বিজয়ার, অতঃপরে তন্ত্রকন্যাদের, আর শেষে মীনাক্ষীর।
দেহগঠন দৈত্যাকার না হলেও, সকলেই বেশসুউচ্চ, তাই শত্রু হলেও হতে পারে, সেই ভেবে সকলে সতর্ক হয়ে গেলে, ভিন্ন ভাষায় এসে তাঁরা দেবী মীনাক্ষীর কাছে দণ্ডায়মান হয়ে বললেন, “আমরা মাতা সর্বশ্রীর কাছে শ্রীপুরে গেছিলাম। উনি আমাদেরকে তোমাদের কাছে পাঠিয়েছেন, বিশেষ করে বলেছেন যে, দেবী মীনাক্ষীর থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে যেতে”।
মীনাক্ষী বললেন, “তোমাদেরকে দেখে তো এই দেশের মানুষ মনে হচ্ছে না! কোন দেশের অধিবাসী তোমরা?”
শুভ্রগোষ্ঠীর থেকে একটি অতীব সুন্দর দেখতে স্ত্রী সম্মুখে এসে সেই ভিন্নভাষাতেই বললেন, “আমরা সুদূর নাইট দেশ থেকে এসেছি। আর আমরা চাই কৃতান্তিক ধর্মকে জেনে, দেশে ফিরে যেতে। আমরা কিছুতেই কৃতান্তিক গোষ্ঠী নির্মাণ করতে পারছিনা। এখানে থেকে শিক্ষা নিয়ে গিয়ে সেই গোষ্ঠী নির্মাণ করতে চাই আমরা। তাই মাতা সর্বশ্রীর কাছে এসেছিলাম, আর তিনি আমাদেরকে আপনার কাছে প্রেরণ করেছেন”।
একই ভাবে তৈলাক্ত মৃত্তিকা বর্ণের গোষ্ঠীর থেকে একটি মিষ্টি দেখতে স্ত্রী সম্মুখে এসে বললেন, “আমরা পৃথিবীর প্রাচীনতম ভাষা বলা প্রজাতি যেই দ্রাবিড় অঞ্চলে স্থিত, সেখান থেকে এসেছি। প্রাচীন তো আমরা বটেই, তবে আমাদের থেকে কৃতান্তিকদের ধারণা অনেক অধিক উন্নত ও সত্যমুখি। তাই আমরাও কৃতান্তিক ধর্মের সম্বন্ধে জানতে এসেছি। আমাদেরও গোষ্ঠী নির্মাণ করতে অসুবধা হচ্ছে। তাই আমরাও সেই গোষ্ঠী নির্মাণ করতে চাই”।
মীনাক্ষী এবার হেসে বললেন, “বেশ তো, আপনারা সকলে বাংলা ভাষা শ্রবণ করার ও অনুধাবন করার কৌশল শিখে নিন এঁদের থেকে। তারপর না হয়, আপনাদেরকে সেই কথা বলবো, যেই উদ্দেশ্যে মাতা সর্বশ্রী আমার এখানে প্রেরণ করেছেন আপনাদেরকে”।
এমন বললে, একটিই স্থানে স্থিত হয়ে, প্রায় দুটি পূর্ণিমাব্যাপী এই সমস্ত বিদেশীদের বাংলা ভাষা অনুধাবন করা শেখালে, তাঁরা একদিন দেবী মীনাক্ষীর সম্মুখে স্থিত হয়ে প্রশ্ন করলেন, “আচ্ছা, আমরা চেয়েও কিছুতে গোষ্ঠী নির্মাণ করতে পারছিনা কেন? প্রয়াস তো আমরা অনেক করছি, তাও ব্যর্থ হচ্ছি কেন?”
মীনাক্ষী ঈষৎ হেসে সকলের উদ্দেশ্যে বললেন, “প্রয়াস! কাকে প্রয়াস বলো তোমরা! কি করা কে প্রয়াস বলছো তোমরা! … যদি সত্যই প্রয়াস করে থাকো, তাহলে সেই প্রয়াস দেখাও আমাকে। তোমাদের প্রয়াস থেকে হীরা না নির্মিত হোক, কয়লা তো নির্মিত হয়েছেই, তাই না! তা সেই কয়লা দেখাও!”
মীনাক্ষীর এই অদ্ভুত দাবিতে চমকিত হয়ে উঠে, অতিথিরা বললেন, “কিন্তু প্রয়াস করে আমরা বিফল হয়েছি দেবী। সফলতার প্রমাণ হয়। বিফলতার প্রমাণ কি হয়?”
মীনাক্ষী পুনরায় হেসে বললেন, “অবশ্যই হয়। যখন এক স্ত্রী গর্ভধারণে বিফল হন, তখন তিনি কি রজসিলা হবার কালে অসমাপ্ত ভ্রূণকে নির্গত করেন না? একটি বীজ থেকে জাত তরু যখন বেড়ে উঠতে পারেনা, তখন সেই তরুর শুকনো অবস্থা কি পরিত্যক্ত থাকেনা? যখন একটি গিরগিটি নিজের খোল ছাড়ার প্রয়াস করেও ব্যর্থ হয়, তখন তার খোল অর্ধেক উঠে থাকে, আর অর্ধেক লেগে থাকেনা? ধরিত্রীও যখন হীরা নির্মাণের প্রয়াস করেন, তখন হীরা নির্মিত না হলে, কয়লা নির্মিত কি হয়না?
সমস্ত ব্যর্থতাও প্রমাণ সঙ্গে নিয়ে অবস্থান করে। যদি তোমরাও ব্যর্থ হও, তবে সেই ব্যর্থতার সাক্ষর অবশ্যই থাকবে। কারুকে কৃতান্তিক হতে আবাহন করেছ, আর সে তোমাদের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছে, এই প্রমাণ তো থাকবে। প্রমাণ ছাড়া ব্যর্থতার অর্থ জানো তোমরা? প্রমাণ ছাড়া ব্যর্থতার অর্থ এই যে, তোমরা নিছকই কল্পনা করেছ যে তোমরা প্রয়াস করেছ, বাস্তবে তোমরা প্রয়াস করোই নি”।
এক শুভ্রবর্ণীয় স্ত্রী বললেন, “বিশ্বাস করুন দেবী, আমি বহু প্রয়াস করেছি। আমি অনেক কে বলেছি, অনেক ভাবে বলেছি। বুঝিয়েছি, বকেছি, কিন্তু কিচ্ছুতে কিচ্ছু হয়নি”।
মীনাক্ষী হেসে বললেন, “এসব তুমি করেছ? ভেবে বলছো তো! তুমিই করেছ তো সমস্ত কিছু?”
সেই স্ত্রী, নাম রোজ বললেন, “হ্যাঁ দেবী সমস্ত প্রয়াস আমিই করেছি, সজ্ঞানে করেছি। মানুষের বাড়ি গিয়ে গিয়ে করেছি, মানুষকে বাড়িতে ডেকে এনে করেছি”।
মীনাক্ষী পুনরায় হেসে বললেন, “আর সেই মানুষগুলোকেই যে বলতে হতো, সেই মানুষগুলোকেই যে কৃতান্তিক করতে হতো, সেই সিদ্ধান্ত কে নিলো?”
রোজ বললেন, “আমি বিভিন্ন তালিকা থেকে সব থেকে শ্রেষ্ঠ প্রতিভাসম্পন্ন মানুষদের তালিকা নির্মাণ করেছি। তারপর তাঁদেরকে শেখানোর প্রয়াস করেছি”।
মীনাক্ষী এবার একটি শান্তির নিশ্বাস নিয়ে বললেন, “একটা মজার কথা জানো রোজ? তুমি নিজেই কৃতান্তিক নও। আর যে নিজেই কৃতান্তিক নন, তাঁর কথা শুনে কেউ কৃতান্তিক হবেন কি করে?”
রোজ সহ সকলেই একটু হতবাক আর একটু নিরাশ হয়ে উঠলেন সেই কথা শুনে। তাই মীনাক্ষী পুনরায় হেসে বললেন, “যদি কৃতান্তিক হতে তাহলে, প্রথমত নিজের থেকে কারুকে বাছাই করতে না, কৃতান্ত কথা বলার জন্য। কাল বা প্রকৃতির হাতেই সেই অস্ত্র ছাড়তে। তিনিই নির্বাচন করতেন যোগ্য কে আর যোগ্য কে নন, আর তাকে তিনিই তোমার কাছে প্রেরণ করতেন।
আর দ্বিতীয় কথা, এমন ধারণা তোমার কেন জন্ম নিলো যে, শ্রেষ্ঠ প্রতিভাবানই কৃতান্তিক হবেন? রোজ, মাতা সর্বাম্বা জগন্মাতা। তাঁর ধারণা যে যতটা করতে পারেন, সে ততটাই প্রতিভাসম্পন্ন। তাই তাঁকে ধারণা করার জন্য প্রতিভার প্রয়োজন নেই, যখন তিনি নিশ্চয় করে নেন যে তিনি কারুর কাছে ধরা দেবেন, তিনি স্বয়ং তাঁর অন্তরে প্রতিভার জন্ম দেন।
তাঁকে ধারণা করার জন্য যা প্রয়োজন, তা হলো বিশ্বাসের, তা হলো সমর্পণের, আর তা হলো সন্তান ভাবের। যার অন্তরে যত অধিক সন্তানভাব, যার অন্তরে যত অধিক শিক্ষার্থী, তাঁরই পক্ষে তাঁকে ধারণা করা সম্ভব। এক মা’কে ধারণা করা এক পিতার পক্ষে সম্ভব নয়, এক পতির পক্ষেও নয়। এক মা’কে ধারণা কেবল তাঁর সন্তান করতে সক্ষম। শিক্ষাকে ধারণ কেবল শিক্ষার্থী করতে সক্ষম।
তাই রোজ, যদি সন্ধানই করতে হতো কারুকে, তাহলে সন্তানকে সন্ধান করতে, শিক্ষার্থীকে সন্ধান করতে, প্রতিভাবানকে নয়, শিক্ষককে নয়। আর তাও তখনই করতে সক্ষম হতে, যখন তুমি স্বয়ং কৃতান্তিক হতে। তুমি যদি স্বয়ং এক কৃতান্তিক হতে, তাহলে এই সহজ সত্য তুমি সহজেই অনুভব করতে পারতে রোজ। কেন জানো? কারণ প্রতিটি কৃতান্তিক একটি একটি শিক্ষার্থী, একটি একটি সন্তান।
কৃতান্তিকরা কনো ঈশ্বরের আরাধনা করে না, কৃতান্তিক নিজের মায়ের আবাহন করে, নিজের মায়ের কাছে স্নেহ আবদার করে, ঈশ্বরের থেকে কনো বরদানের কামনা করেনা। আর স্নেহ, মাতৃত্ব বোঝার বিষয় নয়। শ্রেষ্ঠ বোঝদার, শ্রেষ্ঠ তোমাদের ভাষায় সায়েন্টিস্টও মাতৃত্বের কিচ্ছু বলতে কিচ্ছু জানেন না, স্নেহ বললেই তাঁরা নিজেদের কামনার পর্বতকে প্রত্যক্ষ করে।
না না, এতে তাঁদের কনো অপারঙ্গমতা নেই। কারণ স্নেহ, মাতৃত্ব, এগুলি যে বোঝার বিষয়ই নয়। আর প্রতিভা! প্রতিভা কি প্রয়োজন? অনুভব করার জন্য প্রতিভার কিই বা ভূমিকা? কনো ভূমিকা নেই। তাই কৃতান্তিক হবার জন্য প্রতিভার কনো প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন অনুভবের। অনুভব কি তা বোঝো তো? অনুভবকে আবেগের সাথে আবার মিলিয়ে ফেলো না। আবেগ হলো তাই যা আত্মকেন্দ্রিক হয়।
অর্থাৎ আমার অন্তরে কি হচ্ছে, এই ভাব। ক্রোধ আসছে, হিংসা জন্মাচ্ছে, লোভ জাগছে, কামনা আমাকে অস্থির করছে, দ্বেষ জন্ম নিচ্ছে, শঙ্কা আসছে, আমার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে তাই কষ্ট হচ্ছে অর্থাৎ আসক্তি বা মোহ জন্ম নিচ্ছে, এই হলো আবেগ। আর অনুভব? অনুভব হলো সমস্ত বিশ্বকে ধারণ করে ফেলা। ধরিত্রীর কষ্ট, ধরিত্রীর আনন্দ, সমস্ত জীবের কষ্ট, সমস্ত জীবের আনন্দ, মনুষ্য জাতির উদ্ধার, মনুষ্য জাতির সত্যলাভ, ঈশ্বরের বেদনা, ঈশ্বরের আনন্দ, মাতৃত্বের জয়জয়কার, মাতৃত্বের মৃত্যু, এই সকল হলো অনুভব।
অর্থাৎ যখন নিজের আমিত্ব বা আত্মকে কিছু প্রভাবিত করে, তা হলো আবেগ। আর যখন আমিত্বকে নয়, সমষ্টির প্রভাবকে ধারণা করা হয়, তা হলো অনুভব। যেমন? মহাকাশের কল্পনা আমি করেছি, আর সেই কল্পনাকে আমি পূর্ণ করেছি, তাই আমার আনন্দ হচ্ছে, আমার মদ জন্ম নিচ্ছে, আর আমি বলে দিচ্ছি যে মানবতার জয়। এটি কি? এটি অনুভব না আবেগ? বলো রোজ?”
রোজ নিজের ঔদ্ধত্য সম্পূর্ণ ভাবে হারিয়ে ফেলেছে। সে এবার গদগদ হয়ে বলল, “এটি আবেগ। মানবতার জয় দেহের আয়ু বৃদ্ধিতে নয়, মানবতার জয় কল্পনার পূর্তিতে নয়, মানবতার জয় স্থূলজগত অধিকারে নয়, মানবতার জয় সূক্ষ্মজগত অধিকারে মানে নিজের সমস্ত কল্পনা, ইচ্ছা ও চিন্তা থেকে নিজেকে মুক্ত করে, সত্যে লীন হওয়াতেই মানবতার জয়। কল্পনা, ইচ্ছা ও চিন্তার অতীতে যিনি স্থিত, তাঁকে অনুভব করতে পারাতেই মানবতার জয়।
সত্যই তো, সমস্ত প্রতিভা, মানে যাদেরকে আমরা প্রতিভা বলে থাকি, তা তো অন্যের কল্পনার সাথে নিজের কল্পনাকে মিলিয়ে নিয়ে, সেই কল্পনাতে জয়লাভ করা। তা কি করে যথার্থ জয়লাভ হতে পারে! যেই জয়লাভের আধারশিলাই কল্পনা, তা বাস্তবিক জয়লাভ কি করে হতে পারে!
সকলের কল্পনা যে, অধিক থেকে অধিক মানুষ তাঁর জন্য পাগল হয়ে যাক, আর সেই কল্পনাতে কেউ এসে, নিজের নৃত্য, সঙ্গীত, বা অন্যান্য কলার দ্বারা অনেক অনেককে পাগল করে তুলছে নিজের দিকে, আকৃষ্ট করে তুলছে নিজের দিকে। তাকে সকলে প্রতিভাবান বলছে, তারকা বলছে। এতো মানবতার জয় নয়, এতো কল্পনার জয়!
সকলকে কল্পনা করানো হচ্ছে যে, এই ধরিত্রী বিশাল মহাকাশের মধ্যে একটি অণুমাত্র, আর তেমন কল্পনার অগ্নিতে ঘৃত দেওয়া হচ্ছে এই বলে যে, আমরা সেই মহাকাশকে জয় করে এসেছি। (বিরক্তির হাস্য হেসে) এটা মানুষের জয় কি করে হতে পারে? এটা তো কল্পনার জয়।
সকলকে কল্পনা করানো হচ্ছে যে, তাঁরা তাঁদের সিদ্ধান্ত স্বয়ং নিতে সক্ষম নয়, আর কেউ সামনে এসে সকলের এই কল্পনাকেই কাজে লাগিয়ে নির্বাচিত হয়ে, সকল সিদ্ধান্ত নিয়ে বাকি সকলকে পরাধীন করে রেখে দিচ্ছে। এটা তো কল্পনার জয়, মানবতার জয় কি করে হতে পারে!
আর আমি মূর্খের মত, এই কল্পনাকে আশ্রয় করেই যারা সমাজে স্থিত, যারা এই কল্পনার বিস্তার করিয়ে করিয়ে, নিজেকে সেই কল্পনার জগতের নায়ক রূপে স্থাপিত করে রেখে, নিজেদেরকে প্রতিভাসম্পন্ন রূপে প্রতিপন্ন করে রেখেছে, তাঁদের কাছেই গিয়ে গিয়ে বলতে থেকেছি যে, ‘তোমার কল্পনার জগত থেকে বেড়িয়ে এসো’।
কি মূর্খ আমি! এতটা মূর্খ আমি? … যেই ব্যক্তিটি নিজে এই কল্পনার জগত নির্মাণ করে, তার নায়ক রূপে নিজেকে সাজিয়ে রেখে দিয়েছে, তাকে আমি বলবো যে, ‘হে ভাই, তুমি যেই কল্পনা নির্মাণ করে নাম যশ ধন কামিয়েছ, সেই সমস্ত ত্যাগ করে চলে এসো’, আর এও ভেবে নিলাম যে, সে আমার কথা শুনে সমস্ত কিছু ত্যাগ করে চলে আসবে?
সত্যই আমরা কর্তা হতেই পারিনা, কারণ কর্তা হলে, আমরা এতটাই বাজে কর্তা যে কি বলবো। আমরা নিজেদেরকে কর্তা জ্ঞান করে করেই, এই জগতটাকে এমন কল্পভূমি করে তুলেছি। সর্বত্র কেবল যন্ত্র আর যন্ত্র করে দিয়েছি। প্রকৃতির ভাষা শিখতে নয়, যন্ত্রের ভাষা শেখাকেই আমরা শ্রেষ্ঠ প্রতিভাশালী বলে দিয়েছি। চেতনার শব্দ শুনতে নয়, দেহের ভাষা শেখাকেই আমরা শ্রেষ্ঠ প্রতিভাবানের পরিচয় বলে অঙ্গিকার করে বসে আছি।
আমরা কর্তা হবার অযোগ্য, আর এই অযোগ্যের হাতে সম্পূর্ণ জগত চলে আসার কারণে, প্রকৃতি যেন অসহায় হয়ে বাধ্য হয়ে যাচ্ছেন যে এই মানবযোনিকে জগত থেকে মুছে ফেলবেন, বিনাশ করতে না চাইলেও যেন প্রকৃতি এই যোনিকে বিনষ্ট করতে বাধ্য হয়ে যাচ্ছেন ক্রমে ক্রমে।
যেখানে আমার উচিত ছিল যারা এই কল্পনার জগতের নায়কদের দেখে দেখে নিজেরাও নায়ক হবার প্রয়াস করে করে ব্যর্থ হয়ে গিয়ে হতাশ, তাঁদের কাছে যাওয়া, আর তাদেরকে বলা যে, ‘ভাই, যেই তারকাদের মত হতে চেয়ে তুমি ব্যর্থ হয়ে হতাশ, তাঁরা কল্পনার জগতে নায়ক, বাস্তবিক জগতের নায়ক নন। বাস্তবিক জগতের নায়ক তো তুমি, তোমরা’, আমি তাঁদের কাছে গেলামই না!
আমি মার্গ দর্শন করতে চলে গেলাম! নিজেই মার্গ হারিয়ে বসে আছি, আবার অন্যকে মার্গ দেখাতে চলে গেছি! … কেন দেখাবেন তিনি আমাকে মার্গ! আমি কি কখনো মার্গ সন্ধান করেছি তাঁর থেকে?” মীনাক্ষীর হাত ধরে ক্রোধে গোলাপি বর্ণের হয়ে ওঠা রোজ বললেন, “ক্রোধ জন্মাচ্ছে আমার নিজের উপর। … মীনাক্ষী, তোমাকে দেবী বলবো নাকি কি বলবো বুঝতে পারছিনা। … কি নামে ডাকি জানিনা, তবে এটুকু বলতে পারি, অত্যন্ত প্রেম জন্ম নিচ্ছে তোমার প্রতি। যেন মনে হচ্ছে, তুমি আমার প্রাণের থেকেও অধিক আপন”।
খানিক থামতে, মীনাক্ষী রোজের গালে হাত রেখে, তাঁকে স্নেহ দিয়ে শান্ত করতে প্রয়াস করলে, রোজ নিজের দুই হাতদ্বারা মীনাক্ষীর হাতকে বেষ্টন করে কাকুতিমিনতি করে বললেন, “ওই হতাশ সকলের কাছে কি ভাবে পৌঁছানো যায় মীনাক্ষী? কি ভাবে তাদের উপর কনো রকম জোর না খাটিয়ে, কনো ভাবে তাদেরকে পরাধীন না করে, তাঁদেরকে সত্যের দিকে নিয়ে আসা যায়, বলো মীনাক্ষী। আমাকে উপায় বলো। আমি এবার সত্যি সত্যি প্রয়াস করবো। আর যতক্ষণ না সফল হবো, ততক্ষণ করতেই থাকবো”।
মীনাক্ষী হেসে বললেন, “প্রভু ব্রহ্মসনাতন এর উপায় করে রেখেছেন ইতিমধ্যেই। তাঁর লেখা এমন অনেক গল্পসমূহ আছে, যা নিয়ে নাট্য নির্মাণ করা যেতে পারে। তোমরা সকলে একত্রিত হয়ে, সেই গল্পসমূহ দ্বারা, এই কল্পনার জগতের নির্মিত মাধ্যম ব্যবহার করে, সেই নাট্যগুলি পরিবেশন করো নিজের নিজের দেশে। মাধ্যম যন্ত্র হলেও, সেই মাধ্যমের মধ্যে অনেক অনেক মাধ্যম হয়, তা তোমরা জানো। ভালো হয় যদি, তোমরা অন্যের মাধ্যমে না প্রবেশ করে, নিজেদের একটি আলাদা মাধ্যম গড়ে নাও।
অর্থাৎ মূল মাধ্যম এই কল্পনার জগতে থাকা ব্যক্তিদের নির্মিত মাধ্যমই হবে। কিন্তু সেই মাধ্যমের মধ্যে জনপ্রিয় মাধ্যমগুলিতে না গিয়ে, নিজেদের মাধ্যম নির্মিত করে, তাতে সমস্ত নাট্যগুলিকে প্রকাশ করো। সেই সমস্ত নাট্যের বাণিজ্যিক ক্ষুদ্রচিত্র করে করে, জনপ্রিয় সমাজ মাধ্যমের মাধ্যমে নিজেদের মাধ্যমের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি করো। অতঃপরে অনুগামীদের থেকে সামান্য অর্থ নিয়ে, নিজেদের অর্থভাণ্ডার পরিপূর্ণ করো।
অর্থ এসে গেলে, যেমন আকারের ক্ষেত্র মাতা সর্বশ্রী নির্মাণ করেছেন, তেমনই ক্ষেত্র নির্মাণ করে, তাতে তোমরা সকলে নিবাস করা শুরু করো। ছোটো গল্পগুলিকে নিয়ে নাট্য পরিবেশন করার সাথে সাথে কৃতান্তকেও নাট্য আকারে দীর্ঘাকায় ধারাবাহিক রূপে পরিবেশন করা শুরু করো। অর্থ আয়ের সাথে সাথে এবার দেখবে অনুগামী আয়ও হওয়া শুরু করবে। সেই অনুগামীরা তোমাদের সাথে নিবিষ্ট হবারও ইচ্ছা জ্ঞাপন করবে। তাঁদের সকলকে শিষ্যরূপ করে রেখে, তোমাদের নির্মিত ক্ষেত্রে তাঁদেরকে সমবেত করে, তাঁদের অন্তরে কৃতান্ত স্থাপন করে, তাঁদেরকে কৃতান্তিক করতে থাকো। ব্যাস আর কি? এরপরে কি হবে, তা আর মাতা সর্বশ্রী বা আমি বলবো না। তখন সাখ্যাত মাতা সর্বাম্বা তোমাদের সকলকে বলে দেবেন, তোমাদের করনীয় কি হবে”।
রোজ আর রোজের সাথে সকলে একত্রে বললেন, “অসামান্য কথা বলেছেন দেবী। যেই মাধ্যমকে ব্যবহার করে করে, কিছু মানুষ বাকি মানুষদের কল্পনার সাগরে তরান্বিত করছে, সেইরূপ মাধ্যম দ্বারাই আমরা কারুর উপর জোর না খাটিয়ে, কারুকে পরাধীন না করে রেখে, স্বতন্ত্রতার স্বাদ প্রদান করে, কল্পনামুক্ত কৃতান্তিক করে তুলবো। … যা করার তা স্বয়ং প্রভু ব্রহ্মসনাতন অর্থাৎ মাতা সর্বাম্বাই করবেন। আমরা কেবলই তাঁর মাধ্যম হবো, তাঁর সেবক, তাঁর সন্তান হবো। এক তিনিই কর্তা, বাকি আমরা সকলে অকর্তা”।
রোজ বললেন, “মীনাক্ষী, দেহের বয়সে তুমি আমার থেকে ছোটো। তাই বোন বলতে ইচ্ছা করছে। আমার কথার অর্থ এই যে, তোমাকে অনাত্মীয় বা শুধুই মিত্র বা সখী মানতে ইচ্ছা করছেনা। ইচ্ছা করছে তোমাকে প্রাণের থেকেও আপন মানি, স্বামীর থেকেও প্রিয় মানি। তাই বোন বলতে চাইছে আমার অন্তর তোমাকে। … আর তাই বোন, আমার একটি ইচ্ছা পুড়ন করবে? … আরো কিছুদিন তুমি আমাদেরকে তোমার কাছে থাকতে দেবে?
আরো বেশ কিছুদিন থেকে তোমার থেকে আরো অনেক কিছু শিখতে, জানতে আর অনুভব করতে ইচ্ছা করছে। সেই অনুমতি কি দেবে আমাকে বোন?”
মীনাক্ষী হেসে বললেন, “বোন মানে ছোটো, দিদি মানে বড়। অনুমতি দিদি বোনকে দেয় রোজ, বোন দিদিকে নয়। দিদি বোনকে আদর দেয়, আর আদেশ দেয়। … তুমি আমাকে এই দুই দিলে, অবশ্যই আরো বেশ কিছুদিন আমরা একসাথে থাকতে পারি। … কিন্তু তুমি কি এই দুই দিতে রাজি!”
রোজ গদগদ হয়ে বললেন, “রাজি, খুব রাজি। খুব খুব রাজি”।
এই কথাতে সকলে তৃপ্তির হাস্য হাসলে, তৈলাক্ত মৃতিকা বর্ণের একটি কন্যা, নাম অরিত্রা বললেন, “মীনাক্ষী, তোমার থেকে জানবো, শিখবো, অনুভব করবো অনেক কিছু। কিন্তু তা ছাড়া আমার একটি বড় জিজ্ঞাসাও আছে। তবে আমি এখনই সেই প্রশ্ন করতে চাইনা। আরো একটু অনুভব জন্ম নিক আমাদের অন্তরে, তবেই প্রশ্নটি করতে চাই। কারণ এখন তুমি যে উত্তর দেবে আমাদেরকে, সেই উত্তর অনুভব করার সামর্থ্য যদি থাকেও, সেই সামর্থ্যের প্রতি এতটুকুও ভরসা নেই। আগে সেই সামর্থ্যের প্রতি ভরসা জাগুক, তারপর তোমার থেকে সেই উত্তর শুনবো”।
