১৮। নিশ্চয় অধ্যায়
বেশ কিছু ডিঙ্গি ধরে গঙ্গা পার করতে করতে, দেবী দক্ষিণা ও উত্তরা মীনাক্ষীর উদ্দেশ্যে বললেন, “তোমার মত কি করে হওয়া যায় দিদি! … মানে, কই আমরা তো এই সহজ ব্যপারগুলিকে অনুভব করতে পারিনা! … এমন কিছু জটিল কথা তো তুমি বলো নি আমাদের”।
বিজয়া বললেন, “হ্যাঁ মীনাক্ষী, তোমার কথা কিন্তু অত্যন্ত সহজ। যদি আমরা অন্ধবিশ্বাসগুলি ফেলে দিয়ে, যথার্থকে ধারণা করতে শুরু করি, তাহলে ধর এই দেব, দৈত্য, ভৈরব, এই সমস্ত কিছু, যার থেকে সাধারণ মানুষ ভয় পেয়ে থাকে, আর এই ভয় দেখিয়ে দেখিয়ে অনেকে নিজেদের বাণিজ্য পেশার বিস্তার করে, সেই সমস্ত কিছুকে বন্ধ করা যেতে পারে। কিন্তু কথা হলো, এই সহজ ব্যাপারকে অনুভব করবো কি করে? তুমি কি করে করো?”
১৮.১। শিক্ষার্থী পর্ব
মীনাক্ষী হাস্যসহ উত্তরে বললেন, “তন্ত্রসিদ্ধ কমলাকান্তের একটি গানে একটি কলি আছে জানো! … কলিটি এইরূপ, ‘তুমি আপনি গাও মা, আপনি নাচো, আপনি দাও মা করতালি’। শুনেছ এই গানের কলিটি!”
বিজয়া বললেন, “হ্যাঁ মীনাক্ষী, নলিনী দেবী, আমার মা খুব গাইতেন এই গানের কলিটি। তবে কার রচনা, কার সঙ্গীত, তা জানতাম না”।
মীনাক্ষী পুনরায় স্নেহময় হয়ে বললেন, “আচ্ছা বলো তো দেখি কিছু ব্যাপার এই কলিটি সম্বন্ধে। এখানে যে জগন্মাতার কথা বলা হয়েছে ‘মা’ শব্দদ্বারা, তা তো বেশ বুঝতে পারছো। কিন্তু এটি বলো তো যে এখানে গাইতে থাকা ‘মা’কে আমরা কি বলি, নাচতে থাকা ‘মা’কে আমরা কি বলি, আর করতালি দেওয়া ‘মা’কে আমরা কি বলে থাকি?”
এমন বিচিত্র প্রশ্ন শুনে সকলে খানিকক্ষণ চুপ করে থাকলে, জয়া বললেন, “এটি তো একটি গান, অর্থাৎ ভাবের ঘনঘটা। ভাবের ঘনঘটাতে আবার এমন গহন অর্থ লুকিয়ে থাকে না কি?”
উত্তরে মীনাক্ষী একটি মিষ্টি হাস্য প্রদান করে বললেন, “দিদি, একজন সিদ্ধ ব্যক্তির সামান্য একটি শব্দ উচ্চারণেও যে গহন অর্থ থাকে; থাকে গুহ্য দর্শনকে ব্যাখ্যা করা তত্ত্ব। তা একটি সামান্য মানুষের সঙ্গীত রচনা করার কালে তো, বইখাতা নিয়ে, বেশ কিছু সময় ব্যয় করে একটি কাব্য রচনা করা হয়, তারপর তাকে সুর প্রদান করা হয়। তা, একটি সিদ্ধ ব্যক্তি কি এমনি এমনিই একটি গানের কলি লিখতে পারেন! … তিনি চাইলেও কি তা এমনি এমনি লিখতে পারেন? তাঁর তো আপাদমস্তক সত্যে বিলীন হয়ে চলেছে অনুক্ষণ, তবেই তো তিনি এক সময়ে সিদ্ধ হতে পারলেন। তা, অনুক্ষণ যিনি সত্যে বিলীন হয়ে চলেছেন, তিনি সত্যের বিবরণ ছাড়া আর কিই বা প্রদান করবেন নিজের কাব্যে বা সঙ্গীতে!”
দেবী শুদ্ধা বললেন, “কথা তো এক্কেবারে সঠিক বলেছ। কিন্তু এতো গভীর ভাবে ডুব তো আমরা কখনোই দিইনি! অনেকের থেকে অধিক ডুবেছি, তাই হয়তো অহংকার করে বলেছি যে তোমরা ভাসো, আর আমরা ডুবি। কিন্তু সত্য অর্থে তো এমন ডুব আমরা কখনোই দিইনি! আমাদের এর অর্থ বলে দাও মীনাক্ষী। আমরা সত্যই জানতে চাই”।
মীনাক্ষী এবার তৃপ্ত হয়ে অন্তর্মুখী হাস্য প্রদান করে বললেন, “আমার ভাইবোনেরা, এখানে গাইতে থাকা ‘মা’ হলেন নিয়তি, অর্থাৎ যিনি কালের বা সময়ের নিয়ন্ত্রণ করতে থাকেন সর্বক্ষণ। তাঁর এই সময়কে নিয়ন্ত্রণ করাই যে শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত। ঠিক যেমন সঙ্গীত আমাদের ভাবকে নির্ধারণ করে দেয়, আমাদের আনন্দিত করে দেয় বা গুহ্যে অবগাহন করিয়ে দেয়, বা খাইয়ে টেনে নিয়ে যায়, দ্রুতলয়ে আমাদের চিত্তকে নিয়ে চলে যায়, সময়ও ঠিক একই কীর্তি করে দেখো।
সময়ও আমাদেরকে ভিন্ন ভিন্ন ভাবের রঙে আমাদের চিত্তকে স্থাপিত করে, চিত্তকে রাঙিয়ে তোলে। কখনো এনে দেয় বেদনার স্রোত, তো কখনো দ্রুতগতির লহরিমা। কখনো এনে দেয় প্রফুল্লতা, তো কখনো গভীর গহন বিচার করতে বাধ্য করে দেয় আমাদেরকে। আর সময় যদি গীত হয়, সেই গীতের গায়ক হলেন কালের বা সময়ের নিয়ন্ত্রক, অর্থাৎ পরানিয়তি।
নৃত্য কি ভাবে হয়? সঙ্গীতের তালে তালে নৃত্য হয়; সঙ্গীতের সমস্ত ভাবকে ব্যক্ত করার কলাশিল্প হলো নৃত্য। আর সময়ের তালে তালে কে নৃত্য করে? এই প্রকৃতি। যেখানে বিষণ্ণতার ভাবকে ব্যক্ত করে মরুভূমি, সেখানে প্রফুল্লতার সুরে নৃত্য করে নদীতট। যেখানে গভীর খাইয়ের সাথে নৃত্য করে পর্বতের খাই, সেখানে দ্রুতলয়ের সঙ্গ দেয় কল্লোলিনী নদী। যেখানে মৃদু ছন্দের সাথে নৃত্য করে বাদল, সেখানে গহন বিচারময় ছন্দের সাথে নৃত্য করে গহন সমুদ্র।
ভিন্ন ভাবেও দেখো, যেখানে সঙ্গীতের বেগকে প্রকাশ করে বর্ষা, সেখানে সঙ্গীতের রুক্ষতাকে প্রকাশ করে শীতের সকাল। যেখানে সঙ্গীতের আরামদায়ক উষ্মা প্রকাশ করে শীতের দুপুর, সেখানে সঙ্গীতের রুদ্রতার ছন্দে নৃত্য করে গ্রীষ্মের দুপুর। যেখানে সঙ্গীতের মনোরম ছন্দের প্রকাশ করে শরত হেমন্ত, সেখানে সঙ্গীতের ক্রমশনব্য ছন্দের বিকাশকে প্রকাশ করে বসন্ত।
আরো দেখো, সঙ্গীতের প্রবল গতিকে যখন চিতা ও হিরণ প্রকাশ করে, তখন তাঁর গুরুগম্ভীর ভাবকে প্রকাশ করে হস্তি, আবার তার ক্ষিপ্রতা প্রকাশ করে ব্যঘ্র সিংহ, তো তার দ্রুততার প্রকাশ করে মৎস্য বা মক্ষী। তার প্রবাহমানতাকে যদি পক্ষী প্রকাশ করে, তাহলে তার স্থবিরতাকে প্রকাশ করে বৃক্ষতরুরাজি।
আর সবের শেষে, এই সমস্ত অবলোকন কে করে? সে যে করতালি দেয়। আর সে কে? সে আমাদের অন্তরে স্থাপিত চেতনা। এই সময়ের সঙ্গীত, এই প্রকৃতির নৃত্যকে অনুক্ষণ যিনি প্রত্যক্ষ করছেন, আর যিনি তা প্রত্যক্ষ করে আনন্দিত হচ্ছেন, তিনি কে? তিনি আমাদের অন্তরের চেতনা। হ্যাঁ সেই চেতনা, যিনি আমিত্ব, অর্থাৎ বৈদিকদের পূজ্য আত্ম বা পরমাত্মের দ্বারা আচ্ছাদিত থাকেন, তিনি।
যেই যেই আমার ভাইবোনেরা যখন যখন এই আমিত্বের, এই পরমাত্মের, এই আত্মের, এই অহংএর পর্দার অপসরণ করায়, তখন তখন যাকে আবিষ্কার করেন, সেই চেতনাই তো সমস্ত কিছু গ্রহণ করে করে আনন্দিত হয়ে উঠে করতালি দিতে থাকেন।
অর্থাৎ সিদ্ধ কমলাকান্ত তো এই কৃতান্ত কথা কবে বলে গেছেন, তাই না! তিনি তো এই কথা যে, আর কনো দ্বিতীয় কর্তা নেই, ব্রহ্মময়ী ছাড়া, তা কবেই বলে গেছেন। সত্য বলতে কৃতান্তিক ধর্ম নির্মিত হবারও প্রায় দুইশ বছর পূর্বে তা বলে গেছেন। … এটিই তো তিনি বলেছেন যে, গায়কও স্বয়ং ব্রহ্মময়ী, নৃত্য পরিবেশনকারীও তিনি, আর সেই সঙ্গীতের শ্রোতা, সেই নৃত্যের দর্শক, এবং তা দেখে প্রফুল্লিত হয়ে করতালি দেওয়া চেতনাও স্বয়ং তিনিই। অর্থাৎ এক ও একমাত্র কর্তা তিনিই।
এই সত্য উদ্ঘাটন করতে থাকাই এক শিক্ষার্থীর কর্ম। এক শিক্ষার্থীর ধর্মই হলো আমিত্বের খোলস সরিয়ে রাখা, আত্মের অভিনয়কে স্তব্ধ করা, পরমাত্মের মিথ্যা অস্তিত্বকে অস্বীকার করা, আর নিজের অন্তরের চেতনাকে উন্মুক্ত করা। আত্মের বা পরমাত্মের, বা আমিত্বের বা অহংকারের, যেই নামেই তাঁকে ডাকো, যেই নামেই নিজের ভ্রমকে বিবেচনা করো, তার ধারাই হলো এটি মনে করা যে আমি শিখে গেছি, আমার আর শেখার কিছু নেই। আমি আত্ম, আমি পরমাত্ম, আমি অমুক, আমি তমুক, এমন ভান করা, আর এমন ভান করে করে চেতনার সম্মুখে অন্তরাল স্থাপন করে, আমাদের অন্তরের শিক্ষার্থীকে মৃত্যু প্রদান করা।
কিন্তু আমার ভাইবোনেরা, যেইদিন, যেইমুহূর্তে, যেইক্ষণে আমাদের মধ্যে এই শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়, সেইদিন থেকে, সেইমুহূর্ত হতে, সেই ক্ষণ হতে, আমরা আমাদের চেতনাকে হারিয়ে ফেলি, আর আমাদের চেতনার সম্মুখে আত্ম বা পরমাত্ম বা আমিত্ব বা অহংকারকে স্থাপিত করে ফেলে, নিজেদের ভ্রমের অন্ধকারে স্থাপিত করে দিই।
সত্য কি জানো! সত্য এই যে আমাদের কনো আলোর প্রয়োজনই নেই, কারণ চেতনা স্বয়ং আলো। কিন্তু যেই ক্ষণে আমরা আত্মের পরমাত্মের গহন আঁধারে স্থাপিত হয়ে যাই, সেইদিন থেকে আমরা আর চেতনার আলোককে অনুভব করতে পারিনা, আর সেইদিন থেকে আমাদের দ্বিতীয় আলোকের প্রয়োজন পরে যায়। সূর্যের আলো, চন্দ্রের আলো, বা আত্মের আলো। …
(মৃদু হেসে) তাই তোমরা যে প্রশ্ন করলে, আমি এরকম কেন, তার উত্তর হলো এই যে, আমি শিক্ষার্থী। আমি শিক্ষিতও নই, আমি শিক্ষকও নই। আমি সর্বদা শিক্ষার্থী ছিলাম, আর সর্বদা শিক্ষার্থীই থাকবো, যতদিন না মাতা স্বয়ং, সমস্ত শিক্ষার স্রষ্টা যিনি, সেই ব্রহ্মময়ী যতদিননা আমাকে তাঁর মধ্যে লীন করে নিচ্ছেন। আর শিক্ষার্থী বলেই, আমিত্বের পূজারি নই আমি, পরমাত্ম বা আত্মের পূজারি নই আমি, বৈদিক নই আমি।
চেতনাকে ধারণ করে, ব্রহ্মময়ীর প্রেমিকা আমি। রোমে রোমে তাঁকে অনুক্ষণ অনুভব করার জন্য ব্যকুল অভিসারিণী তাঁর। নিশ্বাসের বিন্দুতে বিন্দুতে অনুভবের অভিলাষী মিলনসঙ্গিনী তাঁর। তাই তো আমার কনো গন্ধের আবশ্যকতা নেই, কারণ আমার প্রেম যে সমস্ত গন্ধের ঊর্ধ্বে; কনো রূপের প্রয়োজন নেই, কারণ আমার প্রাণ যে রূপের ঊর্ধ্বে; কনো সীমার চিন্তা করতে পারিনা, কারণ আমার জীবন যিনি তিনি তো সমস্ত সীমার ঊর্ধ্বে; কনো চিন্তা করতে পারিনা আমি, কারণ আমার আরাধ্যা যে অচিন্ত্য; কনো কিছুর ব্যখ্যাও দিতে পারিনা বা ব্যখ্যা দিতে শুরু করলে শেষ করতে পারিনা কারণ আমার সর্বস্ব যিনি, তিনি তো অব্যক্ত”।
মীনাক্ষীর অজ্ঞাতেই তাঁর নয়ন সমানে প্রেমাশ্রু বিসর্জন করতে থাকলে, একসময় পথ দেখতে না পেরে, তাঁর হুঁশ হয় যে তিনি রোদন করছেন। তাই নিজের অশ্রু মুছে তিনি আবার বললেন, “তাই আমার ভাইবোনেরা, শিক্ষার্থী হয়ে থাকাই হলো আমার ধর্ম। সর্বক্ষণ আমার অন্তরে বিরাজিত আমার প্রেম, যাকে আমরা চেতনা বলি, তিনি কিছু না কিছু ভাবে নিয়তিকে অর্থাৎ সময়কে, এবং প্রকৃতিকে দেখতেই থাকছেন, শুনতেই থাকছে, আর শিক্ষা নিতেই থাকছে। এই আমার পরিচয়। আমার একটিই পরিচয়, আমি চিরশিক্ষার্থী”।
দেবী লাবণী জিজ্ঞাসু হয়ে বললেন, “কিন্তু দিদি, শিক্ষক না থাকলে, শিক্ষার্থীর উন্নতি কি করে হতে পারবে! শিক্ষকও তো আবশ্যক, তাই না!”
মীনাক্ষী হেসে বললেন, “একটি বিষয়ে গুলিয়ে ফেলছো তুমি লাবণী। শিক্ষক বা শিক্ষার্থী বলতে তুমি সামাজিক বা সাংসারিক পরিচিতিকে গণ্য করছো। লাবণী, সমাজ যাকে যাকে শিক্ষার্থী বলছেন, তারা সকলে কি শিক্ষার্থী! বিচার করে দেখো। আশা করি তুমি নিজেও এমন সমাজ যাকে শিক্ষার্থী বলে, তার সাথে সাখ্যাত করেছ, যে শিক্ষা গ্রহণ করতে অনিচ্ছুক, এবং শিক্ষকের দোষত্রুটি বিচার করতেই সদাব্যস্ত। করো নি!
আবার আমি নিশ্চিত যে এমন শিক্ষকও গ্রহণ করেছ, যার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ, আমার স্থির বিশ্বাস, মাতা সর্বশ্রী স্বয়ং যিনি শিক্ষকের আসনে স্থিত হয়েও শিক্ষার্থী। … তাই সমাজ কাকে শিক্ষক বললেন, বা শিক্ষার্থী বললেন, সেই অনুসারে না তো শিক্ষক হন, আর না শিক্ষার্থী। যিনি প্রকৃত শিক্ষার্থী হন, তাঁকে সমাজ শিক্ষকের আসনে স্থিত করে দিলেও, তিনি শিক্ষার্থীই থেকে যান। …
লাবণী আর আমার সমস্ত ভাইবোনেরা, এক প্রকৃত শিক্ষার্থীকে যদি শিক্ষকের আসনে বসিয়েও দাও, তাও দেখবে, তিনি বলবেন, ‘জানিনা আমার ছাত্রছাত্রীরা আমার থেকে কি শিখলেন, আমি তাঁদের থেকে অনেক অনেক কিছু শিক্ষা লাভ করেছি’। … আসল কথাটা এই নয় যে ছাত্রছাত্রী তাঁকে শিখিয়েছেন। আসল কথা এই যে, ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, আচার্য বা গুরু, সকলেই মাধ্যম। যাদেরকে তুমি এঁদের মধ্যে কিচ্ছুই গণ্য করবেনা, তাঁরাও মাধ্যম। আর সেই সমস্ত কিছু কার মাধ্যম?
তাঁরা সকলেই নিয়তির মাধ্যম, প্রকৃতির মাধ্যম। নিয়তি তাঁদেরকে মাধ্যম করে রেখে, সঙ্গীত শুনিয়ে যাচ্ছেন। প্রকৃতি তাঁদের সকলকে মাধ্যম করে রেখে, নৃত্য দেখিয়ে চলেছেন। আর যিনি শিক্ষার্থী, তিনি নিজের আত্ম বলো বা পরমাত্ম বলো, বা যেই নামেই ডাকো, সেই অহংকার, সেই আমিত্বরূপ পর্দার অপসরণ করে করে, সেই সঙ্গীত শ্রবণ করিয়ে চলেছে নিজের চেতনাকে, সেই নৃত্য দেখিয়ে চলেছেন নিজের চেতনাকে, আর শিক্ষা গ্রহণ করে চলেছে।
অর্থাৎ যাকে সমাজ শিক্ষার্থী বলছে, সেও তখনই সঠিক শিক্ষা গ্রহণ করতে সক্ষম হন, যখন শিক্ষা প্রদত্তা শিক্ষককে, বা গুরুকে, বা আচার্যকে মাধ্যম জ্ঞান করে, নিয়তি নির্দেশিত কালের থেকে ও প্রকৃতির থেকে শিক্ষা অর্জন করছেন। আর ঠিক তেমন ভাবে, যাকে সমাজ শিক্ষকের আসনে স্থিত করেছে, সেও শিক্ষা অর্জন করছেন, এবং নিজের চেতনাকে তা প্রদান করছেন। আর সেই শিক্ষাও তিনি কালের থেকে, প্রকৃতির থেকে গ্রহণ করছেন।
তাই, যদি এমন ধারণা রেখে থাকো যে, যিনি শিক্ষকের আসনে স্থিত, শিক্ষা তাঁর থেকে গ্রহণ করতে হয়, তাহলে কখনোই শিক্ষার্থী হতে পারবেনা, কারণ এক শিক্ষার্থীর কাছে সকলেই শিক্ষক, কারণ সকলেই প্রকৃতি ও সময়ের অর্থাৎ নিয়তির মাধ্যম রূপে স্থিত। তাই সমাজ যাকে শিক্ষার্থী বলছেন, তিনিও তখনই শিক্ষা অর্জন করতে সক্ষম হন, যখন তিনি নিয়তি ও প্রকৃতির থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেন, সমস্ত জীব, উদ্ভিদ, আকাশ, বাতাস, মনুষ্যকে সেই নিয়তি ও প্রকৃতির মাধ্যম জ্ঞান করে। আর যাকে শিক্ষার্থী না বলে শিক্ষক বলে সমাজ, তিনিও যখন একই ভাবে সমস্ত কিছুকে প্রকৃতি ও নিয়তির মাধ্যম জ্ঞান করেন, তখন তিনিও শিক্ষার্থী হয়েই বিরাজ করেন।
তাই লাবণী, সমাজ কি ভাবে তোমাকে স্থাপিত করলো, তা গুরুত্বপূর্ণ নয়, গুরুত্বপূর্ণ তুমি নিজেকে কি ভাবে দেখছো, তা। তুমি যদি নিজেকে কনো একজনের থেকে বা দুইজনের থেকে শিক্ষা অর্জন করার অবস্থায় স্থাপিত করে রাখো, তাহকলে তুমি তোমার আত্মকে স্থাপিত রেখে দিয়েছ চেতনাকে আড়াল করে, আর তাই প্রকৃতি ও নিয়তির থেকে শিক্ষা অর্জন করছো না, বা এক কথাতে বলতে গেলে, তুমি শিক্ষা অর্জনই করছো না।
আর সমাজ তোমাকে যেই অবস্থানেই স্থাপিত রাখুক না কেন, তুমি যদি সমস্ত কিছুকে নিজের শিক্ষকের আসনে স্থাপিত রেখে দিয়ে, সকলের থেকে শিক্ষা অর্জনে রুচিশীল হও, তার অর্থ এই যে, তুমি নিজের আত্মকে, নিজের আমিত্ব রূপ পর্দাকে সরিয়ে রেখে, নিজের চেতনাকে শিক্ষা লাভের জন্য উন্মুক্ত করে রেখে দিয়েছ। আর যদি সেই বেশে স্থিত থাকো, তাহলে দেখবে, প্রবীণ হয়েও নবীনের থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারছো তুমি, মানব হয়েও দানবের থেকে শিক্ষা অর্জন করতে পারছো তুমি, শিক্ষক হয়েও শিক্ষার্থীর থেকে শিক্ষা অর্জন করতে পারছো তুমি।
তখন আর তোমার আলাদা করে কনো শিক্ষকের প্রয়োজন পরবেনা, কারণ সকল কিছুই তোমার শিক্ষক। বৃক্ষটিও, উদ্ভিদটিও, গ্রীষ্মঋতুটিও, আবার জল বায়ু উষ্ণতাটিও। তখন দেখবে, তোমার দেহটিও তোমার শিক্ষক, তোমার মনটিও তোমার শিক্ষক, এমনকি তোমার আত্মটিও তোমার শিক্ষক। কেউ তোমাকে সত্যের আভাস প্রদান করে শিক্ষা প্রদান করছে, তো কেউ তোমাকে ভ্রমের শিক্ষা প্রদান করছে।
ভ্রমকে সঠিক করে না জানলে সত্যকে কিছুতেই জানা সম্ভব নয়, কারণ আমরা সকলেই ভ্রমের জগতে নিবাসরত। তাই এমনও ভাবার নয় যে, আত্মের থেকে কি শিক্ষা লাভ করবো আমি! আত্ম তো ভ্রম। লাবণী, সমস্ত কিছুই আত্মের প্রকাশ, কিন্তু সমস্ত কিছুর মধ্যেই প্রকৃতি, নিয়তি নিয়ত রয়েছে। আত্মরূপ ভ্রম সেই সত্যকে আচ্ছাদিত করে রেখে দিয়েছে আমাদের সম্মুখে।
তাই ভ্রমকে না জানলে, ভ্রমের পর্দা সরাবে কি করে? ভ্রমের পর্দা না সরালে সত্যকে প্রত্যক্ষ করবে কি করে? তাই আত্মের থেকেও শিক্ষা গ্রহণ করতে হয়। ভ্রম কি, ভ্রম কেমন, ভ্রমের চরিত্র কি, ভ্রমের উদ্দেশ্য কি, এই সমস্ত কিছু না জানলে যে ভ্রমকে অপসারণ করাই সম্ভব হয়না। তাই আত্মের থেকেও শিক্ষা গ্রহণ করতে হয়, ভ্রমের শিক্ষা।
তাই লাবণী শিক্ষক সকলে। সকল কিছুই শিক্ষক। তাহলে এবার প্রশ্ন করবে তোমরা যে, সমাজ যাকে শিক্ষক বলেন, তাঁর আবশ্যকতা কোথায়? এই তো? তাঁর ভূমিকা হলো, আমাদেরকে আমাদের প্রকৃত শিক্ষকের সাথে আলাপ করিয়ে দেওয়া। যদি প্রকৃত শিক্ষককে সনাক্ত করতে আমাদের দেহের আয়ুর অধিক ক্ষণ চলেই যায়, তাহলে শিক্ষা আর কবে অর্জন করবো? যাতে তা না হয়, অর্থাৎ দেহের কম আয়ু থেকেই আমরা শিক্ষা গ্রহণ করা শুরু করতে পারি, তাই প্রয়োজন শিক্ষকের।
শিক্ষক, আচার্য, গুরু আমাদের কাছে আমাদের প্রকৃত শিক্ষকের পরিচয় প্রদান করে, আমাদের শিক্ষাগ্রহণকে সহজ করে দেন। এটিই তাঁদের ভূমিকা। এটিই তাঁদের অবদান। দেহের জন্মদাত্রী জননী কেন অবস্থান করেন? আমাদের প্রকৃত জননী, অর্থাৎ ব্রহ্মময়ী জগজ্জননীর সাথে শিশুকালেই আমাদের আলাপ করিয়ে দিতে। ঠিক তেমনই শিক্ষক, আচার্য ও গুরু অবস্থান করেন আমাদেরকে প্রকৃত শিক্ষকের সাথে আলাপ করিয়ে দিতে।
একটি জিনিস জানো? হয়তো তোমরা মাতা সর্বশ্রীর থেকে শুনে থাকবে। তাও আমি তোমাদের আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলি। এক শিক্ষার্থী শিক্ষা লাভ করতে করতে যখন শিক্ষকের আসনে স্থিত হয়ে যায়, তখনও তাঁর একটি শিক্ষা অবশিষ্ট থেকে যায়। বলতে পারো তা কি?”
বিজয়া বললেন, “মা বলেন অহংকারের শিক্ষা, মানে আত্মের শিক্ষা তখনও লাভ করেন না শিক্ষক। শিক্ষক হবার পর তিনি সেই শিক্ষা গ্রহণ করা শুরু করেন। শুনেছি সেই কথা, তবে বুঝিনি। মাকে প্রশ্ন করলে, মা তো কখনোই বিরক্ত হননা। তবে প্রশ্ন করে উঠতে পারিনি মা’কে। মায়ের এই কথা যথার্থ কিনা, সেই নিয়ে সন্দেহ তো বিন্দুমাত্র নেই। তবে আমাকে এই কথার অর্থ বোঝাতে পারবে মীনাক্ষী?”
মীনাক্ষী হেসে বললেন, “শিক্ষক যখন শুধুই শিক্ষার্থী থাকেন, তার ধ্যান জ্ঞান থাকে সত্য জানা, সত্যকে উদ্ধার করা। সত্যকে ধারণ করা। আর তাই তিনি অসত্য বা ভ্রমকে কেবল অপসারণই করতেন। অর্থাৎ কেবল চেতনাকে শিক্ষা অর্জন করা থেকে যেই আত্মরূপ পর্দা আচ্ছাদিত করে, শিক্ষার্থী বেশে তিনি কেবল সেই পর্দাকে অপসারিত করাতেই রুচিশীল থাকতেন, কিন্তু সেই পর্দা সম্বন্ধে জ্ঞান অর্জন করা তাঁর রুচি বা অভিরুচি কিছুই হয়না, কারণ তিনি সত্যতে নিজের ধ্যান কেন্দ্রিত রেখে দিয়েছেন।
কিন্তু যখন তিনি শিক্ষার্থী থেকে শিক্ষকের আসনে স্থিত হয়েছেন, তখন তাদের সম্মুখীন হন, যারা তখন কেবলই শিক্ষার্থী। আর তখন তিনি অবলোকন করেন যে, এই ভ্রমরূপ পর্দা, অর্থাৎ আত্ম বা পরমাত্ম বা অহংকার বা আমিত্ব, যেই নামেই তাকে ডাকো না কেন, সে তাঁর শিক্ষার্থীদের যথার্থ শিক্ষার্থী হতে দিচ্ছেনা। আর তাই তিনি উপায় সন্ধান করতে থাকেন সেই পর্দাকে তাঁর ছাত্রছাত্রীদের চেতনার উপর থেকে অপসারিত করতে।
যখন হাজারও প্রয়াস করেও সেই পর্দা অপসারিত হয়না, তখন তিনি বাধ্য হন, সেই পর্দাকে ভালো করে জানতে। সেই পর্দার অর্থাৎ আমিত্বের গঠন, সংগঠন, চরিত্র, ভাবগতিক, সমস্ত কিছু তিনি জানা শুরু করেন, যার থেকে সেই পর্দার শক্তি ও দুর্বলতার আন্দাজ করে, সেই দুর্বল স্থানে আঘাত করে, তাকে অপসারিত করতে সক্ষম হন, এবং নিজের ছাত্রছাত্রীদের যথার্থ ভাবে শিক্ষার্থী করে তুলতে পারেন।
আর তাই তখনই তিনি প্রকৃত অর্থে ভ্রমের শিক্ষা গ্রহণ করেন। ভ্রম কেমন, ভ্রম কেন, ভ্রম কি করে, ভ্রম কি করতে সক্ষম, আর কি করতে অক্ষম, কি ভাবে তা স্থাপিত হয়েছে, কি ভাবে তা অপসারিত হওয়া সম্ভব, এই সমস্ত কিছুর শিক্ষা তিনি অর্জন করতে শুরু করেন। অর্থাৎ শিক্ষক হয়েও দেখো, তাঁর শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়নি। তিনি শিক্ষা তখনও অর্জন করেই চলেছেন। সামাজিক ভাবে যখন তিনি শিক্ষার্থী ছিলেন তখন সত্যের শিক্ষা অর্জন করেছেন, আর সামাজিক ভাবে যখন শিক্ষকের আসনে তিনি স্থিত, তখন তিনি ভ্রমের শিক্ষা লাভ করে চলেছেন।
(মৃদু হেসে) তাহলে এবার তোমরাই আমাকে বলো, প্রকৃত শিক্ষক কে? কার কারণে আমরা শিক্ষা লাভ করি? কার থেকে আমরা শিক্ষা লাভ করি?”
জয়া প্রসন্নচিত্তে বললেন, “ওই যে তুমি বললে, নিয়তি ও প্রকৃতি। তাঁরাই আমাদের প্রকৃত শিক্ষক”।
মীনাক্ষী পুনরায় স্নেহহাস্য প্রদান করে বললেন, “তোমরা সকলেই কি দেবী জয়ার সাথে একমত?”
সকলে একত্রে সহমত প্রকাশ করলে, মীনাক্ষী পুনরায় হেসে বললেন, “এখানেই তো আমাদের মায়ের লীলা ভাইবোনেরা। তাঁর সমস্ত কৃত্যকে আমরা দর্পণচিত্রের মত করে দেখি, অর্থাৎ উলটো দেখি। … আসল শিক্ষক হলেন শিক্ষার্থী। … এক শিক্ষার্থীই শিক্ষা প্রদান করতে পারে, এক শিক্ষার্থীই শিক্ষা লাভ করার পথ গড়ে তোলে, এক শিক্ষার্থীই প্রকৃত শিক্ষক। … বুঝতে পারছি, হতবাক হচ্ছ তো!
বিচার করে দেখো তাহলে, সত্যের সমস্ত গুপ্ত তত্ত্ব কে উদ্ধার করে? শিক্ষার্থী। আরো বিচার করে দেখো, সত্যের সম্বন্ধে যা কিছু লুপ্ত, তা উদ্ধার করে কে? শিক্ষার্থী। আরো বিচার করতে চাইলে, তাও করে দেখতে পারো। ভ্রমের সুপ্ত প্রভাবকে কে উদ্ধার করে? শিক্ষার্থী। তাহলে তোমরাই বলো, শিক্ষার্থীর থেকে বড় শিক্ষক কে হতে পারে? যদি শিক্ষার্থী না থাকে, তাহলে এই লুপ্ত, সুপ্ত ও গুপ্ত সত্যকে, তত্ত্বকে কে উদ্ধার করতো? কি করে উদ্ধার করতো?
বিচার করে দেখো, যাদেরকে বৈজ্ঞানিক শ্রেষ্ঠ বলে থাকো তোমরা, তারা কে? শিক্ষক না শিক্ষার্থী? শিক্ষক হলে কি তাঁরা কখনো যা আবিষ্কার করেছেন, তা করতে পারতেন? শিক্ষার্থী বলেই না তাঁরা লুপ্তকে, সুপ্তকে এবং গুপ্তকে সন্ধান করেছেন, আপ্রাণ প্রয়াস করেছেন তাদেরকে উদ্ধার করতে, অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন তা জানতে, বুঝতে, শিখতে?”
এই সকল বার্তালাপ করতে করতে, কখন যে সন্ধ্যা নেমে গেছে, কেউই ঠিক করে ঠাওর করেন নি। সন্ধ্যা নেমে গেছে, তা ঠাওর করতেই সকলের মনে হলো, তাঁরা কোথায় চলে এসেছেন! সন্ধ্যার আঁধারে ঠিক করে বুঝতেও পারছেন না তাঁরা যে ঠিক কোন স্থানে তারা এসে উপস্থিত হয়েছেন।
তবে মীনাক্ষী সঠিকই বলেছিল। মাতা ব্রহ্মময়ীই যেন তাঁদের সকলকে যাত্রা করাচ্ছেন। তাই তাঁদের সকল জিজ্ঞাসার উত্তর তিনিই প্রস্তুত করে রেখেছেন। তাই সম্মুখে একদল স্ত্রী এসে বললেন, “প্রণাম গ্রহণ করবেন দেবী মীনাক্ষী। প্রণাম গ্রহণ করবেন কৃতান্তিকগণ, দেবী জয়াবিজয়া”।
দেবী মীনাক্ষী কিছুটা হতবম্ব হয়েই বললেন, “ইনাদেরকে না, চিনতে পারো তোমরা। আশা করি সম্পূর্ণ জম্বুদেশই ইনাদের সাথে হয় নামে, নয় দর্শনে পরিচিত। কিন্তু আমাকে চিনলে কি করে তোমরা? আমি তো তেমন কেউ খ্যতনামা নই!”
রম্ভা নামক এক সুন্দরী তরুণী সম্মুখে এসে বললেন, “আমরা পঞ্চসখী, সকলে আমাদেরকে একত্রে অপ্সরা নামে ডাকে, কারণ বৈদিকদের মতে যেই যেই অপ্সরা আছেন, সেই সেই নামই আমাদের জন্মসুত্রে লব্ধ নাম। আমার নাম রম্ভা, এই আমার সখী উর্বশী, এই আমার আরেক সখী মেনকা, আর এই আমাদের আরো দুই সখী ঘৃতাচী এবং তিলোত্তমা।
দেবী, এটি মল্লার দেশ, আর এখানের বণিকরা প্রায়শই যেমন মালদ রাজ্যে যান, তেমনই নিম্নে বর্ধমান রাজ্যে বা দক্ষিণে মুর্শিদরাজ্যে বা নদিয়াদ রাজ্যে এমনকি কাতা রাজ্যতেও যান। তাই দেবী, আপনার অদ্ভুত কীর্তির কথা যেমন মল্লার রাজ্যে প্রসিদ্ধ হয়ে গেছে, তেমনই সমস্ত রাজ্যে প্রচারিত হয়ে গেছে। আমরা তো এও জেনে গেছিলাম যে, দেবী জয়াবিজয়ার নেতৃত্বে কৃতান্তিকদের সাথে একাত্ম হয়ে আপনি মাতা সর্বশ্রীর কাছে যাচ্ছেন।
তাই দেবী, আমরা পাঁচজন পাঁচজন করে ২০টি টুকরো হয়ে প্রায় সমস্ত মল্ল দেশের সীমান্তকেই ছেয়ে ফেলেছি। সংখ্যায় আমরা ১০০, এবং আমরা সকলে আপনাদের সাথে মাতা সর্বশ্রীর কাছে যাত্রা করে, তাঁর আশ্রয়ে নিবাস করতে ইচ্ছুক। দেবী, আমাদের না করবেননা কৃপা করে। আমরা আর আমাদের মাতাকে ছেড়ে থাকতে পারছিনা।
বিশ্বাস করুন আমাদের। যতদিন জানতাম না যে আমাদের প্রকৃত মা দেহ ধরে রয়েছেন, ততদিন একপ্রকার ছিল। আজ তিনি দেহ ধারণ করে অবস্থান করছেন জেনেও, তাঁর থেকে এই দূরে অবস্থান করা, সে যে বড়ই বিরহের, বড়ই পীড়ার। এই পীড়া আর সহ্য করতে পারছিনা দেবী। আমাদেরকে তাই কৃপা করে সঙ্গে নিন”।
দেবী বিজয়া এগিয়ে গিয়ে বললেন, “আমাদের শ্রীপুরে কক্ষ সংখ্যা মাত্র ৩০, আর আমরা এখনই সংখ্যায় ৬৫। তোমরা যুক্ত হলে সেই সংখ্যা যাবে ১৬৫তে। কে জানে হতে পারে, আরো অনেকে আমাদের সাথে যুক্ত হবেন, ঠিক তোমাদের মত করেই। এতো মানুষ শ্রীপুরে কি করে থাকবেন?”
জয়া সম্মুখে এগিয়ে গিয়ে, বিজয়ার স্কন্ধে হাত রেখে বললেন, “আমাদের প্রতিটি কক্ষ এতটাই বড় যে, অন্তত ১০ জন সেই কক্ষে একাধারে শয়ন করতে সক্ষম। আর আমাদের শ্রীপুরের সমস্ত উৎপাদন অনায়সে ৩০০ জনের উদরপূর্তি করতে সক্ষম। … বিজয়া, যার কাছে এঁরা যেতে চাইছেন, তিনি আমাদের একার মা নন, ইনাদের সকলের মা। ইনারা আমাদের কাছে তাঁদের ইচ্ছা ব্যক্ত করতে পারছেন, এর অর্থ, স্বয়ং মা’ই এঁদের সকলকে আবাহন করেছেন। আমরা তাঁর আবাহনকে কি ভাবে অদেখা করতে পারি! …
(অপ্সরাদের উদ্দেশ্যে হেসে জয়া বললেন) তোমরা আমাদের সাথে এসো। আমরা মিলিত ভাবেই পথ চলবো সকলে, আর আমাদের মায়ের কাছে উপস্থিত হবো। … কিন্তু ভগিনী, আজ রাত্রিটা কি বিশ্রাম করা যেতে পারে! অনেকটা পথ চলেছি আমরা। হ্যাঁ, মীনাক্ষীর অমৃত কথা শুনতে শুনতে পথ চলেছি, তাই পরিশ্রমের বোধ ছিলনা এতক্ষণ। কিন্তু এই একবার দাঁড়িয়ে পরতে, মনে হচ্ছে যেন আমাদের কটিদেশ থেকে নিম্নের অংশ ছিঁড়ে পরে যাচ্ছে। … তাই আজরাত্রিটা বিশ্রাম করে নিয়ে, কাল থেকে পথ চলা কি সম্ভব!”
ঘৃতাচী হেসে বললেন, “খুব ভালো হয় দেবী। … আমরা আশা করেই রেখেছিলাম যে, আপনারা এসে বিশ্রাম করবেন। তাই আহার নিদ্রার ব্যবস্থা আমরা করেই রেখেছি। … আসুন আমাদের সাথে। সেই সুবাদে আমরা সকল ১ শতজন একত্রিতও হয়ে যেতে পারবো রাত্রের মধ্যে। তাহলে কাল প্রভাত থেকেই আমরা পথ চলতে শুরু করতে পারবো”।
জয়া হেসে সকলের উদ্দেশ্যে বললেন, “এসো তোমরা এসো। ইনাদের আপ্যায়ন স্বীকার করি। আর শীর্ষ, তুমি এক কাজ করো। তুমি সরাসরি মায়ের কাছে চলে যাও, আর তাঁকে গিয়ে বার্তা দাও যে, আমরা প্রায় ৩ শত জন আসছি। তিনি যেন আমাদের সকলের বিছানার ব্যবস্থা করেন”।
বিজয়া বললেন, “মা আমাদের অন্তর্যামী। তিনি কি আর জানেন না, এখানে কি হচ্ছে? যা কিছু হচ্ছে, তা তো তাঁর অঙ্গুলিহেলনেই হচ্ছে। তারপরেও, আলাদা করে মাকে সংবাদ প্রেরণের কারণ কি দিদি!”
জয়া হেসে বললেন, “বোন, তিনি সমস্ত কিছুই জানেন, কিন্তু আমাদের কর্তব্য তাঁকে সংবাদ প্রদান করা। যদি তিনি সামান্য কিছুও এদিক সেদিক করে ফেলেন, আর তার কারণে তাঁর একটিও সন্তান না ঘুমিয়ে থাকেন, তাহলে তিনিও তাঁর সেই সন্তানের সাথে না ঘুমিয়েই থাকবেন। তাই বিজয়া, মাকে সংবাদ প্রেরণ অত্যন্ত আবশ্যক। মা নিজের সন্তানদের খেয়াল রাখবেন, এই সম্বন্ধে কনো সন্দেহ নেই আমাদের। কিন্তু মায়ের খেয়াল! তাঁর খেয়াল আমরা রাখবো না!”
জয়াবিজয়ার কথোপকথনের শেষে শীর্ষ শ্রীপুরের উদ্দেশ্যে রওনা দিলে, খানিক বিশ্রাম নিতে দিক দিক থেকে সকলে দেখলেন, নারীপুরুষ একত্রিত হতে শুরু করলেন। সংখ্যায় তাঁরা প্রায় এক শত। আহার করলেন সকলে মিলে। এবং আহারের শেষে মীনাক্ষী জয়া ও বিজয়া একটি কক্ষে গেলে, তন্ত্রকন্যারা একটি কুটিরে গেলেন, এবং তন্ত্রপুত্ররা অন্য একটি কক্ষে। আহারের প্রায় সামান্য সময়ের পূর্বেই বিজয়া বিছনায় শুয়ে পরলেন, জয়াও যেন তাকিয়ে থাকতে পারছেন না আর।
এমন অবস্থায় মীনাক্ষী বললেন, “আমাদের উপর নিদ্রা যাবার ওষধি প্রয়োগ করা হয়েছে দিদি। … এই রূপ নিদ্রা আস্তেই পারেনা! এটা ক্লান্তির নিদ্রা নয়। অস্বাভাবিক এই নিদ্রা”।
বিজয়া যেন চোখ খুলে রাখতে পারছিলেন না। জয়ারও একই অবস্থা। উঠে দাঁড়াতে যেন মনে হলো মাথা ঘুরে পরে যাবে। বারংবার মাথা ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে জয়া বললেন, “কি করবো এখন আমরা! তাহলে কি সমস্তটাই গল্প ছিল এই অপ্সরাদের! আমাদের কাছে তো অর্থকড়িও নেই। তাহলে আমাদের সাথে এমন কেন?”
মীনাক্ষীও বারংবার মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন, “আমরা কৃতান্তিক বলে তো বৈদিকরা আমাদেরকে নিজেদের শত্রু জ্ঞান করেই। … তাই হয়তো। কিন্তু দিদি, আমাদের এক্ষণে এইসমস্ত চর্চা না করে, তাড়াতাড়ি আমাদের নিদ্রা থেকে মুক্ত হতে হবে। তা না হলে, সামনে আমাদের জন্য কি অপেক্ষা করছে, তা আমরা কেউই জানিনা”।
জয়া বললেন, “উপায় কি?”
মীনাক্ষী বললেন, “এই অঞ্চলে প্রবেশ করার পূর্বে, আমি একটি বিস্তীর্ণ স্থানে দূর্বা ঘাস আর একটু দূরে একটি সর্পগন্ধা গাছ দেখেছি। এই দুইকে একত্রে নিয়ে আমাদের ওষধি নির্মাণ করে প্রথমে নিজেদের গ্রহণ করে নিদ্রাত্যাগ করতে হবে, অতঃপরে সকল তন্ত্রসন্তানদের প্রয়োগ করতে হবে। এই আহারই শীর্ষ নিয়ে গেছে। হতে পারে, তারও একই অবস্থা হবে। সে কি করবে, জানিনা দিদি। প্রথমে আমাদেরকে সুরক্ষিত হতে হবে, তবেই আমরা বাকিদের সুরক্ষিত করতে সক্ষম হবো”।
জয়া কনো প্রকারে টলতে টলতে মীনাক্ষীর সাথে যাবার সময়ে বিজয়ার উদ্দেশ্যে বললেন, “বিজয়া, আমরা ফেরা পর্যন্ত নিদ্রা যাবিনা। একবার নিদ্রা গেলে, এই নিদ্রা ভাঙা খুব কঠিন হবে”।
বিজয়া বললেন, “তোমরা যাও দিদি। এখানে একাএকা থাকলে, নিদ্রা চলে যাবো, এটিই স্বভাবিক। আমি তোমাদের ফেরা পর্যন্ত, তন্ত্রসন্তানদের নিদ্রা থেকে ওঠাচ্ছি। তোমরা তাড়াতাড়ি ফিরে এসো”।
জয়া ও মীনাক্ষী যতক্ষণে ওষধি নির্মাণ করে নিয়ে এলেন, ততক্ষণে বিজয়া ও সমস্ত তন্ত্রসন্তানরা সমস্ত মল্লারের একশতজনকে নিদ্রা যাওয়া থেকে অবরুদ্ধ করে রেখেছিলেন। মীনাক্ষী ও জয়া ফিরতে, বিজয়া বললেন, “দিদি, শুধু আমাদের নয়, এঁদের সকলকে এই আহার প্রদান করা হয়েছে। … সকলকে ওষধি প্রদান করো”।
এমন কথন শুনে সকলকে ওষধি প্রদান করতে থাকলে, পরবর্তী একটি ঘণ্টার মধ্যে সকলের নিদ্রা চলে গেল। আর তখন সকলে দেখলেন, দূর থেকে নিকটে একটি বিশাল বাহিনী মশাল জ্বেলে নিয়ে তাদের দিকেই আসছে, কারণ মশালের আলো সমানে স্পষ্ট হয়ে উঠছে, সমানে আরো বড় ও জ্বলজ্বলে হয়ে উঠছে।
সেই দেখে বিজয়া বললেন, “যারা এই দুষ্কৃত্য করেছে, তারা তাদের উদ্দেশ্য পুড়ন করতে এদিকেই আসছে”।
উর্বশী সম্মুখে এসে বলল, “আমরা লড়াই করবো। এত সহজে হার মানবো না!”
সেই কথা শুনে মীনাক্ষী বললেন, “না, এমন করলে, এই দুষ্কৃতিদের আসল উদ্দেশ্য আমরা জানতেই পারবো না। যতক্ষণ তা জানতে পারছি, আমাদেরকে অভিনয় করে যেতে হবে যে আমরা নিদ্রাতে রয়েছি। দেখি তারপর এঁরা কি করে। সঠিক সময়ে, আমরা কোকিলের শব্দ করলে, সরাসরি উঠে সকলে আক্রমণ করা শুরু করবো। স্মরণ থাকবে?”
