১৭.৩। স্নেহশীলা পর্ব
মীনাক্ষী হেসে বললেন, “বিজয়া, মায়ের ন্যায় স্নেহ অনেকেই করেন, তা বোলে তিনি মা হয়ে যান না। না তিনি যিনি জন্ম দিয়ে মা হবার দাবি করেন, না তিনি যিনি জন্ম না দিয়ে স্নেহ করে জননী হবার দাবি করেন, আর না তিনি যিনি দুটিই করে জননী হবার দাবি করেন। … আমার ছোটোবৌদি সেই দাবি করেননি। কারণ তিনি জানেন যে তিনি জননী নন, আর তিনি জানেন যে আমার চেতনা এক জগদম্বা ব্রহ্মময়ীকেই, যিনি মাতা সর্বাম্বা হয়ে বিরাজমান ছিলেন, আর এক্ষণে মাতা সর্বশ্রী হয়ে বিরাজমান রয়েছেন, তাঁকেই মা জানে ও মানে।
তিনি এও জানতেন যে, তাঁর আমাকে এই স্নেহ করার কারণে, তাঁকে একদিন ঘরছাড়া করা হবে। আর তাই তিনি আমাকে বলে রেখেছিলেন যে, যেদিন তিনি ঘরছাড়া হবেন, সেদিন যেন আমি আর অপেক্ষা না করে বাড়ি থেকে মুক্ত হয়ে যাই।
আসলে আমার চেতনার ব্রহ্মময়ীর সন্ধান করাকে, আমার জননীসহ আমার ভ্রাতারা কেউই পছন্দ করেন নি, আর সেটাই স্বাভাবিক। সকল আত্মই চায় যাতে, অন্য আত্মও আত্মকেন্দ্রিক থাকে আর প্রকৃতি বা নিয়তি, অর্থাৎ নিজের মায়ের প্রতি দৃষ্টি না রাখে। কিন্তু যখনই কেউ চেতনার দ্বারস্থ হয়ে যায়, তখনই সকল আত্ম প্রয়াস করতে থাকে, তাকে একঘরে করে দিয়ে, আত্মসকলের অর্থাৎ আত্মীয়ের অভাবের বেদনা তাকে অনুভব করাতে।
আমার ক্ষেত্রেও তেমনটাই হয়েছে। প্রথমে, আমার গর্ভধারিণী যখন দেখলেন যে, তাঁর থেকে ব্রহ্মময়ীর প্রতিই আমার আকর্ষণ অধিক, তখন তিনি ত্যাগ দিলেন। তবে এমন করে তিনি কালীকেই নিজের শত্রু করে নিয়েছিলেন, কারণ কালী তো এই বলেন যে, যাকে তুমি জন্ম দিচ্ছ, সে তোমার সন্তান নয় জেনেই, কেবল তার দেহকেই তুমি প্রদান করেছ, এটি জেনেই তার সেবা করা তোমার ধর্ম, তবেই তুমি জননী হতে পারবে।
কিন্তু তিনি তা করতে না পেরে, তার বিরোধিতা করে স্বয়ং কালীকেই নিজের শত্রু করে নেন, আর তাই কালী তাঁর প্রাণ নিয়ে নেয়।
আর যেই ক্ষণে কালী তাঁর প্রাণ নিয়ে নিলো, অমনি তাঁকে যারা আত্মীয় মানতেন, তাঁরা আমাকে অনাত্মীয় মানা শুরু করে দিলেন, অর্থাৎ আমার ভ্রাতারা ও পিতা। পিতার ক্ষেত্রেও সেই একই নিয়ম বর্তায়, যা মাতার ক্ষেত্রে, তাই সময় বেশে কালী তাঁরও প্রাণ নিয়ে নিলেন, কিন্তু ভ্রাতাদের ক্ষেত্রে সেই নিয়ম বর্তায় না, তাই তাঁরা জীবিত থেকে, আমাকে সর্বক্ষণ নিজেদের অনাত্মীয় রূপে প্রমাণ করতেই থাকলেন।
বড়দাদা বিবাহ করলেন, বড়বৌদি পরিস্থিতি বুঝে, একই ভাবে আমাকে অনাত্মীয় প্রমাণ করতে থাকলেন। মেজবৌদিও অনুরূপ করলেন, কিন্তু ছোটোবৌদি এসে, আমাকে আত্মীয় জ্ঞান করতে থাকলেন। ব্যাস, অত্যন্ত সহজ হিসাব। এবার তো ছোটোবৌদিকে অনাত্মীয় প্রমাণ করতে হবে। তাই, এবার সকলে ছোটোবৌদির বিরোধিতা করতে শুরু করলেন।
বিজয়া, সংসারী মানুষের শত্রুতা, বড়ই বিচিত্র। তাঁরা সম্মুখ যুদ্ধ করেন না, করতে পারেনও না। তাঁরা পিছনে ছুরিকাঘাত করতেই পছন্দ করেন, আর তাই করে থাকেন সর্বক্ষণ। যাদেরকে আত্মীয় জ্ঞান করেন, তাঁদের পিছনেও ছুরিকাঘাত করেন, যাতে সেই আঘাত প্রাপ্ত হয়ে, সেই আত্মীয় তাঁর কাছে বশ হয়ে থাকে। আর যারা অনাত্মীয়, তাঁদেরকে ছুরিকাঘাত করার কালে, সেই সমস্ত সংসারী, যারা তাঁকে অনাত্মীয় মেনে নিয়েছেন, তাঁরা অঘোষিত ভাবেই একত্রিত হয়ে গিয়ে এই ছুরিকাঘাত করেন।
ছোটোবৌদির ক্ষেত্রেও তেমনই হলো। আমার ছোড়দা রাত্রি করে ঘরে ফেরেন, নিজের কাষ্ঠ আসবাব নির্মাণের কাজ সমাপ্ত করে। তাই তিনি একটু দেরি করে ঘর ছেড়ে নির্গত হন। অর্থাৎ বৌদির সাথে তাঁর মিলন বা সঙ্গমের সময়কাল হওয়া উচিত প্রভাত। কিন্তু বড়বৌদি ও মেজবৌদি, যারা পূর্বে খুব প্রভাতে নিদ্রা ত্যাগ করতেনই না, তাঁরা প্রভাতে নিদ্রা ত্যাগ করে, সম্পূর্ণ পরিবারের আহারের ব্যবস্থা করা শুরু করে দিলেন।
অর্থাৎ ছোটোবৌদিকে প্রভাতে কক্ষত্যাগ করতেই হবে, অর্থাৎ তাঁর স্বামীর সাথে তাঁর সঙ্গম অসম্ভব হতে শুরু করলো, অর্থাৎ তাঁর পক্ষে জননী হওয়া দুষ্কর হয়ে ওঠা শুরু হয়ে গেল। তাই ছোড়দা একসময়ে পরিবারের থেকে আলাদা হবেন, যাতে তিনিও পিতা হতে পারেন, সেটিই স্বাভাবিক, আর তাই হলো”।
জয়া বললেন, “কিন্তু তাঁদের তো তাহলে তোমাকে নিয়ে যাওয়া উচিত ছিল, তাই না!”
মীনাক্ষী হেসে বললেন, “ছোটোবৌদি ছোড়দার মিলনসঙ্গিনী, তাই তাঁকে ছোড়দার প্রয়োজন, আমাকে নয়। আমি যেমন বড়দা, মেজদা ও পিতা মাতার কাছে অনাত্মীয় ছিলাম, তেমনই ছোড়দার কাছেও। তাই আমাকে কি করে গ্রহণ করবেন ছোটোবৌদি? তা যে তাঁর নিজের সঙ্গমসঙ্গীর বিরোধিতা করা হয়ে যাবে! তাঁর বিরোধিতা করলে, তিনি কি করে জননী হতে পারবেন?”
বিজয়া বললেন, “আর তুমি? তুমি তাঁর সন্তান নও?”
মীনাক্ষী হেসে বললেন, “ওই যে বললাম, যদি এক জগন্মাতা ব্যতীত কারুকে নিজের মা মনে করো, তাহলে এক না একদিন তোমাকে পস্তাতেই হবে। … তবে, মিথ্যা বলবো না, আমার ছোটোবৌদি কখনো আমার মা হতে চানও নি, মা হবার দাবিও করেন নি। তিনি নিজেকে আমার দিদি মানতেন, আর আমাকে ভগিনীর মত করেই স্নেহ করতেন। আর তাই বলেছিলেন যে, যদি কখনো তাকে ঘোরছাড়া হতে হয়, তাহলে আমিও যে ঘরছাড়া হই, নাহলে অনাত্মীয়রা আমাকে হত্যা করে দেবে।
তিনি বলেছিলেন, ‘দ্যাখ, আমি তোর দিদি, আর তুই আমার বোন। যদি একমাত্র দিদিই বোনের কাছে আশ্রয় হয়, তাহলে হয় দিদির বিবাহ হয়ে গিয়ে দিদিকে স্বামীর সাথে যেতে হলে বোনকে দিদির সাথে যেতে হয়, নয় ঘরছাড়া হতে হয় যদি দিদির স্বামী তাকে স্বীকার না করে। তোর দাদা তোকে কখনো স্বীকার করবে না, তা তুই জানিস। তাই তুই ঘরছাড়া হয়ে যাস’। আর দিদির কথামত আজ আমি ঘরছাড়া”।
বিজয়ার সেই কথা শুনে যেন এক অদ্ভুত আনন্দ হলো। সে কিছু বলতে গেলে, জয়া বলে উঠলেন, “এঁরা কারা! এঁদেরকে চেনা চেনা লাগছেনা! … মীনাক্ষীর কাছে যখন সাপ ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল, তখন এঁরা সেই ভিড়ে ছিলেন, তাই না!”
সেই কথা শুনে, বিজয়া যা বলতে চাইছিলেন, তা আর বলতে পারলেন না। সেই ৪ দম্পতি মীনাক্ষীর নিকটে এসে, মীনাক্ষীর উদ্দেশ্যে প্রনাম করে বললেন, “দেবী মীনাক্ষী, আমাদের ক্ষমা করে দেবেন। আমরা আপনাকে ভুল ভেবেছিলাম। প্রধান অজিতেশের কথা শুনে আমরা আপনাকে শত্রু জ্ঞান করে, মহারাজ সুমিতের দরবারে আপনি পলাতক বলে, তাঁর থেকে আপনার সাজা শুনতে গেছিলাম। কিন্তু তিনি বললেন, আপনি শত্রু তো হতেই পারেন না, কারণ স্বয়ং প্রকৃতি আপনার বল হয়ে অবস্থান করছে। … তাই দেবী ক্ষমা চাইতে এসেছি আপনার কাছে”।
মীনাক্ষী হেসে বললেন, “আরে তোমরা অদ্ভুত তো! ক্ষমা চাইতে এতো দূর চলে এলে?”
জয়া উত্তেজিত হয়ে বললেন, “সত্য করে বলো তো, তোমরা ক্ষমা চাইতেই এসেছ, নাকি অজিতেশের হয়ে, মীনাক্ষীর সঠিক অবস্থানের সন্দেশ লাভ করতে এসেছ!”
সেই দম্পতিদের স্ত্রীরা বললেন, “না দেবী, আমরা আপনাকে চিনি। আপনাকে যখন বহুকাল আগে, ভণ্ড বন্দী করে নিয়ে যাচ্ছিলেন, আর মাতা সর্বশ্রী আপনাদের রক্ষা করেছিলেন, তখন সেই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলাম আমরা। আমরা এই চারজন বাল্যকালের সখী, আর তখন আমরা সকলেই ৫ বৎসরের বালিকা ছিলাম। … আপনি দেবী জয়া না বিজয়া, তা জানিনা, তবে তাঁদের মধ্যে একজন, তা সম্বন্ধে আমরা নিশ্চিত”।
আরেক স্ত্রী বললেন, “বিশ্বাস করুন দেবী, আমরা কারুর প্রেরণাতে আসিনি এখানে। দেবী মীনাক্ষীর কাছে এসেছি। তবে হ্যাঁ, কিছু দ্বন্ধ আমাদেরকে ও আমাদের স্বামীদের বেষ্টন করে রয়েছে। সেই দ্বন্ধের জন্য জোর করে বলতে পারছিনা যে আমরা দেবী মীনাক্ষীর সঙ্গে থাকতে এসেছি। … কিন্তু বিশ্বাস করুন দেবী, আমাদের এই চার স্ত্রীর কাছে দেবী মীনাক্ষী যেন মায়ের মত নন, স্বয়ং মা। তাঁর সঙ্গে ছল করার কথা ভাবতেও পারিনা আমরা”।
মীনাক্ষী হেসে বললেন, “কি তোমাদের দ্বন্ধ! ব্যক্ত করো পুত্রী”।
এই চার দম্পতির একটি স্ত্রী বললেন, “দেবী, আমার নাম দিশা, এই আমার তিন বাল্যবান্ধবী, পূর্বা, দক্ষিণা ও উত্তরা। আমাদের একটিই দ্বন্ধ যে, অজিতেশ প্রধান আমাদের সর্বক্ষণ শিখিয়ে এসেছেন যে, যদি আমরা আমাদেরকে সেখান রীতিরেওয়াজ ত্যাগ করি, তাহলে আমরা ধর্মচ্যুত হবো। কিন্তু দেবী, তুমি তো কনো রীতিরেওয়াজের মধ্যে থাকোই না! তাহলে কি আমরা তোমার সাথে যুক্ত হলে, ধর্মত্যাগী হবো!”
মীনাক্ষী হেসে উত্তরে বললেন, “দিশা, যেই ধর্মের মানদণ্ড তার রীতিরেওয়াজ, তা ধর্ম কি করে হতে পারে!”
সেই উত্তরে সেখানে উপস্থিত সকলেই কম্পিত হয়ে উঠলেন। বিজয়ার যেন মনে হলো, তিনি মাতা সর্বশ্রীর প্রতিবিম্বকে দেখছেন। তাঁদের মাতাও তো একই কথা বলেন!
দেবী উত্তরা বললেন, “কৃপা করো দেবী। আমরা নিজেদেরকে অত্যন্ত মূর্খ বোধ করছি। তাই কৃপা করে, আমাদেরকে তোমার এই কথনের বিস্তার ব্যক্ত করো”।
উত্তরে মীনাক্ষী সামান্য হেসে বললেন, “যদি রীতিরেওয়াজ, আচার অনুষ্ঠান, বা নিয়মকানুন একটি ধর্মকে ধর্ম হবার স্বীকৃতি প্রদান করে, তবে সেই ধর্ম তো জন্মও নেয়নি পুত্রী, সেই ধর্ম তো জন্ম লাভ করার আগেই মৃত্যু লাভ করেছে”। পুনরায় ঈষৎ হেসে মীনাক্ষী বললেন, “ধর্মের মানে কি জানো? ধারণা করা। কিসের ধারণা করা জানো? সত্যের, পরম সত্যের, অর্থাৎ নিষ্ক্রিয়, নিরাকার, অনন্ত অসীম ব্রহ্মের। কেন এই ধারণা?
যিনি তাঁকে প্রত্যক্ষ করে ফেলেন, তাঁকে কনো রূপ ধারণা করতে হয়না। তিনি স্পষ্ট জেনে গেছেন যে তিনি কেমন। আর তিনি জেনেই বলেছেন যে, তিনি আলো নন, কিন্তু সমস্ত আলো তাঁর কারণে। তিনিই তাঁকে প্রত্যক্ষ করে বলেছেন, ব্রহ্ম সেই শব্দশূন্য, আকার শূন্য, বিকার শূন্য, অন্তহীন সত্য, যার কারণেই সমস্ত শব্দ, যার কারণেই সমস্ত আকার, সমস্ত বিকার, সমস্ত অন্ত।
কিন্তু কি জানো তো পুত্রী, তাঁর প্রত্যক্ষদর্শীরা এটা বলেন নি যে, কি ভাবে তিনি সমস্ত শব্দের কারণ, সমস্ত আকারের কারণ, সমস্ত বিকারের কারণ, আর সমস্ত অন্তের সমস্ত সীমার কারণ। সেই প্রত্যক্ষদর্শীদের অনুগামীরা দুই প্রকারের। একজন তাঁকে প্রশ্ন করলেন, ‘কি ভাবে তাঁর কারণে সমস্ত শব্দ, আকার, সীমা, অন্ত, বিকার?’ আর অন্যজনের সাহসে কুলোলো না যে তাঁকে প্রশ্ন করেন যে, ‘তিনি কি ভাবে সমস্ত শব্দ, চিত্র, আকার, গঠন, সীমা, অন্ত, বিকারের কারণ হলেন’।
এরপর কি হলো জানো? যারা প্রশ্ন করলেন না যে, ‘কি ভাবে তিনি সমস্ত কিছুর কারণ হলেন’, তাঁরা ধারণা করে নিলেন যে সেই ব্রহ্মই সমস্ত কিছুর স্রষ্টা। আর যারা অনুগামী হয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘কি ভাবে তিনি সমস্ত কিছুর কারণ হলেন’, তাঁদের উদ্দেশ্যে সেই প্রত্যক্ষদর্শীও উত্তর দিলেন। তিনি বললেন, ‘তিনি একা, বড় একা, আর তাই মাতৃত্ব প্রেম দেবার ইচ্ছা থেকে তিনি ব্রহ্ম থেকে ব্রহ্মময়ী হয়ে, নিজের থেকে আত্ম ও মানসের জন্ম দেন। সেই আত্ম নিজেকেই ভগবান মেনে নিয়ে, নিজের বিস্তার করতে থাকে এই সমস্ত অন্তময়, সমস্ত সসীম রূপে, আর মন তাঁদের একটির মধ্যেও ব্রহ্মকে লাভ করলেন না। আর তা লাভ না করে, ব্রহ্মের সন্ধান করার জন্য, ব্রহ্মময়ীর সাহায্যে শব্দের, কলার এবং ভাবের রচনা করলেন, আর তাঁদের মাধ্যমে ব্রহ্মের ধারণা করতে থাকলেন।
অর্থাৎ পুত্রী, এই ধারণাই ধর্মের মূল আধার নয়। এই ধারণা যেই দর্শনের উপর ভিত্তি স্থাপন করে অবস্থান করে, সেই দর্শন হলো ধর্মের মূল আধার। আর যখন সেই ধারণা প্রত্যক্ষদর্শীকে প্রশ্ন না করে করা হয়, তখন কি হয়? তখন একটি ভ্রান্ত বিশ্বাস রাখা হয় যে, তিনিই সমস্ত কিছুর রচনা করেছেন, আর সেই ভ্রান্তিকে স্থাপিত রাখার জন্য কি করা হয়? রীতিরেওয়াজের অবতরণ করা হয়। আচার অনুষ্ঠানের অবতরণ করা হয়। নিয়মকানুনের রচনা করা হয়। কেন?
কারণ এই রীতিরেওয়াজ, এই নিয়মকানুন, এই আচার অনুষ্ঠানকে ভিত্তি করেই নিজেদের ভ্রান্তিকে সত্য রূপে সাজিয়ে রেখে দেওয়া সম্ভব হয় তাদের পক্ষে। তাই পুত্রী, যেই ধর্ম এই রীতিরেওয়াজ, এই আচার অনুষ্ঠান, এই নিয়মকানুনকেই শিখণ্ডী করে রেখে দেয়, আর তাঁদের অনুগামীদের বলেন যে, সেই সকল কিছুকে অনুসরণ করলেই, তাঁর ধর্মরক্ষা হয়, সেই ধর্মের তো জন্মের পূর্বেই মৃত্যু হয়ে গেছে, কারণ সে তো দর্শনের পরিবর্তে ভ্রান্তিকেই ধারণা রূপে স্বীকার করে নিয়েছে।
পুত্রী, কৃতান্তিক ধর্মের অনুগামী তোমাদের সম্মুখে স্থিত রয়েছেন। এই দেখো, বিজয়া, জয়া; এই দেখো সমস্ত তন্ত্রসন্তানদের। এঁরা স্বয়ং ব্রহ্মময়ীর অবতার ব্রহ্মসনাতনের চেতনা, মাতা সর্বশ্রীর সান্নিধ্যে থেকে কৃতান্তিক ধর্মের অনুগামী হয়েছেন। এঁদের প্রশ্ন করো। এরা কি রীতিরেওয়াজ পালন করেন? প্রশ্ন করো, কি আচার অনুষ্ঠানের পালন করেন এরা। … কি হলো করো!”
ঈষৎ হেসে আবার বললেন মীনাক্ষী, “ইনারা কনো রীতিরেওয়াজের, কনো আচার অনুষ্ঠানের ধার ধারেনা। কেন জানো? কারণ এঁরা কনো ভ্রান্তিকে আঁকড়ে ধরে ধর্ম স্থাপন করেনি। এঁরা সাখ্যাত মাতা ব্রহ্মময়ীকে দর্শন করেন দিবারাত্র, আর তাঁর থেকে সত্যকে শ্রবণ করে, সেই সত্যকে ধারণ করেন ইনারা। তাই না তো এঁদের কনো রীতিরেওয়াজের প্রয়োজন আছে, আর না আছে কনো আচার অনুষ্ঠানের প্রয়োজন।
তোমরা কোন ধর্মের কথা বলছো পুত্রীরা? যেই ধর্মের কথাই বলো তোমরা, তোমাদের কাছে তা একটি জীবিত ধর্ম হতে পারে, কিন্তু আমার কাছে তা একটি মৃত ধর্ম, যার মধ্যে না আছে সত্যের ধারণা, আর না আছে সত্যের দর্শন চেতনা। ব্রহ্মকে আরাধনা না করে, ব্রহ্মময়ীকে আরাধনা না করে, যা আত্মের আরাধনা করে, আত্মের ত্রিগুণের আরাধনা করে, তা ধর্ম কি করে হতে পারে! তা তো কেবলই কিছু ভ্রান্ত অন্ধবিশ্বাসের সমষ্টি মাত্র।
তাই যদি তোমাদের সত্যই এমন মনে হয় যে, রীতিরেওয়াজ না করেও, আচার অনুষ্ঠান না করেও ধর্মপালন করবে, তাহলে এসো, দেবী জয়াবিজয়ার কাছে এসো। তাঁরা তোমাদেরকে কৃতান্তিক গড়ে তুলবেন”।
ঈষৎ হেসে দেবী মীনাক্ষী বললেন, “পুত্রী, কি জানো তো সাঁতার কাটার বিভিন্ন রীতি থাকে, আচার থাকে। ডুবে যাবার জন্য কনো রীতিও থাকেনা, আর আচারও থাকেনা। … ধর্ম হলো ডুবে যাবার সহায়ক, ভেসে বেরানোর বা সাঁতার কাটার সহায়ক নয়। সাঁতার কাটার সহায়ক হলো অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজনীতি, সুরক্ষানীতি এই সমস্ত কিছু।
আর ধর্ম হলো সত্যের সন্ধান করা, সত্যের মধ্যে বিলীন হবার মন্ত্র। অর্থাৎ ডুবে যাবার মন্ত্র। যেই মন্ত্র ডুবে যাবার, সেখানে আচার বা রীতি কি করে থাকতে পারে পুত্রী!… সেখানে তো শুধুই মিথ্যার ধারণা থাকবে, আর সেই সমস্ত মিথ্যার থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে কি ভাবে সত্যে সমর্পণ করা সম্ভব, সেই কথন থাকবে, আর কৃতান্তিক ধর্মে তাই আছে। সেখানে কনো রীতি নেই, নীতি নেই, আচার নেই। আছে কেবল প্রেম, আছে কেবল ভাব, আর তাদের অন্তরালে আছে দর্শন আর সেই দর্শন করা সত্যের ধারণা।
পুত্রী, অনুগামী তোমাকে হতেই হবে, হয় তুমি আত্মের অর্থাৎ অহংকারের অনুগামী হবে, নয় তুমি সত্যের অর্থাৎ ব্রহ্মময়ীর অনুগামী হবে, ঈশ্বরের অনুগামী হবে। তবে পার্থক্য কি জানো তো? আত্ম নিজেকে ভগবান বলে, আর ঈশ্বর বলারও খুব প্রয়াস করে নিজেকে পরমাত্মরূপে প্রকাশ করে। কিন্তু তাও তাঁর স্বভাব তো আত্মেরই স্বভাব, তাই সে নন্দীর ন্যায়, নারদ বা গরুড়ের ন্যায়, দাসই নির্মাণ করে। আর তো আর, সে স্বয়ং ব্রহ্মময়ীকেও নিজের চরণসেবা করিয়ে, নিজেকে সঙ্গীত শ্রবণ করিয়ে, নিজেকে আহার গ্রহণ করিয়ে, দাসী করে রাখার প্রয়াস করেন।
আর ব্রহ্মময়ী! তিনি আত্ম নন, তিনি স্বয়ং প্রকৃতি, স্বয়ং নিয়তি, আর গ্রাহক রূপে তিনি স্বয়ং চেতনা। তিনি দাস করেন না, দাসীও করেন না। তিনি তাঁর অনুগামীকে ঈশ্বর করে তোলেন, ব্রহ্ম করে তোলেন। কেন জানো পুত্রীরা! কারণ এক ব্রহ্মই ব্রহ্মকে প্রত্যক্ষ করতে সক্ষম। না কনো আত্ম সেই কর্মে সক্ষম, আর না কনো মন সেই কর্মে সক্ষম। এক ও একমাত্র ব্রহ্মই ব্রহ্মকে প্রত্যক্ষ করতে সক্ষম, কারণ ব্রহ্ম মানে অসীম, আর যিনি অসীম, তাঁকে কনো সসীম প্রত্যক্ষ করতে পারেন না। তাঁকে প্রত্যক্ষ করতে হলে, সত্যের সাখ্যাতকার করতে হলে, স্বয়ংকে অসীম হতে হয়, স্বয়ংকে সত্য হতে হয়।
আর তাই ব্রহ্মময়ী আমাদেরকে সেই ব্রহ্মই করে তোলেন, যা আমাদের স্বরূপ। তাই তাঁর থেকে দাসত্ব প্রসার নয়, তাঁর থেকে প্রসারিত হয় প্রেম। যখন প্রেম করতে করতে তাঁর কাছে উপস্থিত হবে সেদিন কি উপলব্ধি করবে জানো? উপলব্ধি করবে যে, তুমি কনোদিন তাঁকে প্রেম করতেই পারো নি। যদি তুমি তাঁকে যা করেছ, তা প্রেম হয়, তবে তিনি তোমাকে যা করেন, তাকে কি বলবে? যদি তুমি তাঁকে যা করেছ, তাঁকে বিশ্বাস বলে, তাহলে তিনি যা করেছেন তোমাকে, তাকে কি বলবে? যদি তোমারটিকে স্নেহ বলো, মমতা বলো, তাহলে তাঁরটিকে কি বলবে! তখন দেখবে, ‘আমি’ বা ‘আমার’ শব্দটি উচ্চারণ করতেও লজ্জা লাগবে।
দেবী দিশা সম্মুখে এবার নতজানু হয়ে বসলে, তাঁর তিন বান্ধবীও একই ভাবে বসলেন, এবং তাঁদের স্বামীরাও। আর সকলের মুখ হয়ে দেবী দিশা বললেন, “ক্ষমা দেবী, ক্ষমা। … কৃতান্তিক ধর্মের কেবল নামমাত্রই শুনেছিলাম আমরা। না জানতাম এর বৃত্তান্ত, আর না এখনো এর বিস্তার সম্বন্ধে ধারণা আছে আমাদের। তবে দেবী, এটুকু বুঝে গেছি যে, সম্পূর্ণ ভিন্ন এই ধর্ম।
এই ধর্ম প্রতিবন্ধকতা প্রদান করেনা, চক্ষু রাঙিয়ে বলেনা যে, আমার সাথে এসো। বরং বলে তোমার ইচ্ছা হলে তুমি যেতে পারো, আমি তোমাকে বাধবো না, আর তোমার পিছনেও যাবো না। এই ধর্ম অধিকার ফলায় না, অধিকার পাইয়ে দেয়। জীবনসুত্রে যেই সত্যের প্রতি আমাদের অধিকার, সেই অধিকার পাইয়ে দেওয়াই এই ধর্মের মূল উদ্দেশ্য। আর তাই সে বলে, তোমার যদি আমার সাথে আসার ইচ্ছা না থাকে, তুমি স্বতন্ত্র চলে যেতে।
আর যদি আমার সাথে থাকতেও হয়, তাহলেও তোমাকে কনো আচার অনুষ্ঠান, রীতি রেওয়াজ পালন করতে হবেনা। শুধুই তোমাকে সত্য ধারণ করতে হবে। আর সেই সত্য আমার ধর্মে স্থিত থাকার জন্য তোমাকে করতে হবেনা। যদি তুমি সমস্ত কিছু জেনে বলো, ‘আজ থেকে আমি কৃতান্তিক নই, আমার কনো কৃতান্তিক ধর্মের প্রয়োজন নেই, আমি স্বয়ংই একাকী এই সত্যের ধারণ করতে সক্ষম’, কৃতান্তিক ধর্ম বলে, ‘তুমি সক্ষম হও বা না হও, তুমি যে ইচ্ছা প্রকাশ করেছ স্বতন্ত্র হতে, সেই স্বতন্ত্রতা তোমার সর্বদাই ছিল, আর সর্বদাই থাকবে’।
এই ধর্ম বলে, ‘আমার দুটি চরণ, আর সেই দুটি চরণই আমার সম্বল। এমন হতেও পারে যে, এই দুই চরণ যার, সেই ব্যক্তি দেহত্যাগ করার পরে, কৃতান্তিক ধর্মের অস্তিত্বই মুছে যাবে জগত থেকে। তাহলেও, কৃতান্তিক ধর্ম কখনো কারুর উপর জোর খাটাবে না আর বলবে না যে তোমার দুই চরণ আমার সাথে মিলিয়ে, আমার দুই চরণকে চার চরণ করে দাও’।
দেবী, কৃতান্তিক ধর্ম সম্পূর্ণ ভাবে ভিন্ন। এতাবৎ যত ধর্মের সাথে আমাদের আলাপ হয়েছে, পরিচয় হয়েছে, সকলেই কখনো না কখনো জোর খাটিয়েছে, কখনো না কখনো বলেছে, ‘বিস্তার করো, আরো আরো চরণ জুরে দাও এই ধর্মের কেতনের তলায়। এত এত সংখ্যা চরণ জুরে দাও যে, কনো ভাবে এই ধর্মকে অবহেলা করা যাবেনা। এই ধর্মকে সক্কলে মান্যতা প্রদান করতে বাধ্য হবে’।
কিন্তু কৃতান্তিক বলে, ‘তুমি যখন খুশী নিজের দুই চরণ ত্যাগ করে, আমাকে মাত্র দুই চরণেই ছেড়ে রাখতে পারো। না তো তোমাকে আমি তোমার দুই চরণ যুক্ত করতে বলবো আমার সাথে, আর না বলবো যে আরো আরো চরণ জুরে দাও আমার সাথে। কিন্তু স্মরণ রেখো, আমার সাথে চরণ মেলানোর অর্থ আমার সাথে পথ চলা। আর আমার পথ চলা হলো কেবল ও কেবল সত্যে ডুবে যাওয়া। আমি সাঁতার কাটিনা, আমি ডুবে যাই। তাই ভেবে নাও, ডুবতে আপত্তি নেই তো! যদি আপত্তি থাকে, তাহলে নিজের দুই চরণ সরিয়ে নিয়ে চলে যাও। …
যদি এমন হয় যে, তোমার দুই চরণ সরে গেলে আমার অস্তিত্বই মিটে যাবে, তাও সই, তাতেও আপত্তি নেই আমার, কারণ আমি যে মা। আর মা সন্তানের উপর জোর খাটাতে পারেনা। কিছুতেই পারেনা। মা কিছুতেই সন্তানকে নিজের দাস বা দাসী করে তুলতে পারেনা। যদি আমার সাথে থাকো, তাহলে আমার অঙ্গরূপে থাকো, দাস বা দাসী হয়ে নয়। আর যদি দাস বা দাসী হতে হয় তোমাকে বা করতে হয় কারুকে, তাহলে এই ধর্ম তোমার জন্য নয়, কারণ এই ধর্ম মা, পিতা নয়’।
অর্থাৎ দেবী, এই ধর্ম নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতেও প্রস্তুত, কিন্তু কনো শর্তে, কনো কারণে, না তো নিজের সন্তানদের উপর জোর খাটাতে প্রস্তুত, আর না তা কনো এমন কাউকে গ্রহণ করে, যে জোর খাটায়। এই ধর্ম অবলুপ্ত হয়ে যেতেও প্রস্তুত কিন্তু কনো কারণে নিজের সন্তানদের উপর রীতিরেওয়াজ, আচার অনুষ্ঠানের বোঝা চাপিয়ে দিতে রাজি নয়। না এই ধর্ম কারুর দাস, না কারুকে তা দাস করে রাখতে রাজি। না সে নিজে পরাধীন, আর না সে কারুকে পরাধীন করে রাখতে রাজি।
কেউ যদি স্বেচ্ছাতেও দাস হয়ে থাকতে চায়, তাহলেও এই ধর্ম বলে, দাস হলে তুমি ডুবতে পারবেনা। তোমাকে ডুবতে হবে, এটিই এই ধর্মের তত্ত্ব, আর ডুবতে গেলে তোমাকে আমার দাস বা দাসী হয়ে থাকলে চলবে কেমন করে? তোমাকে আমার সাথে চরণ মেলাতে হবে, তবেই আমার সাথে সাথে তুমিও ডুবতে পারবে। তাই দাস হতে হলে অন্যত্র চলে যেতে পারো। যদি আমার সাথে চরণ মিলিয়ে চলতে চাও, তাহলে এসো এখানে এসো। চলো একসাথে আমরা ডুবি”।
দেবী পূর্বা বললেন, “দেবী, আমরা ডুবতে রাজি। আমরা সত্যের সাগরে ডুবতে রাজি। কিন্তু দেবী, আমরা ডুবতে জানিনা। আমরা ডুবতে প্রস্তুত নই, কারণ কি ভাবে ডুবতে হয়, তা আমাদের জানা নেই। কি কি করার জন্য আমরা ডুবতে পারছিনা, সমানেই ভেসে যাচ্ছি, সাঁতার কেটে বেড়াচ্ছি, তা আমাদের জানা নেই। এটুকু জেনেছি যে, আমিত্ব অর্থাৎ ‘আমি’ আর ‘আমার’ নিয়ে ভাবনার কারণে আমরা কিছুতেই ডুবতে পারছিনা, সমানে সাঁতার কেটে বেড়াচ্ছি। কিন্তু এই আমিত্বকে কি ভাবে ত্যাগ দিতে হয়, তাও আমাদের জানা নেই।
তাই কৃপা করো দেবী, আমাদেরকে তোমার সাথে যুক্ত করো। মাতা না হলেও, মাতা ন্যায় তুমি। আমাদেরকে সন্তানজ্ঞানে নিজের সঙ্গে যুক্ত করো, আর আমাদেরকে এই আত্ম ভাব থেকে কি ভাবে মুক্ত হতে হয়, তার প্রশিক্ষণ দাও মাতা। আমাদেরকে ডুবতে শেখাও মা। কৃপা করো আমাদের উপর”।
দেবী বিজয়া এবার নতজানু হয়ে বসলে, দেবী মীনাক্ষী তাঁর কাছে গিয়ে, তাঁকে উপনীত অবস্থা থেকে উন্নীত করে বললেন, “কি করছো বিজয়া এটা! … তোমরা স্বয়ং মাতা সর্বাম্বার সাথে যুক্ত। অর্থাৎ তোমরা একাকজন তাঁরই অঙ্গ। তিনি কি করে তাঁর কন্যার কাছে নতজানু হতে পারে!”
বিজয়া সজল নয়নে বললেন, “দেবী, তোমাকে নিয়ে যাবার জন্যই মাতা সর্বশ্রী আমাদের প্রেরণ করেছিলেন। তোমাকে আমরা তো চিন্তেও পারতাম না, যদি না তুমি তোমার স্নেহের ভাণ্ডার উন্মোচিত না করতে। তোমার স্নেহের ভাণ্ডারে যখন সাপ, ব্যঘ্র সকলেই প্লাবিত হলো, তখনই তো আমরা অনুভব করলাম যে, মা তোমার কাছেই, তোমার সন্ধানেই আমাদেরকে পাঠিয়েছিলেন।
তাঁর স্বভাব তো জানোই তুমি। তিনি কিছুতেই আদেশ দিতে চান না। আদেশ দেওয়া তাঁর স্বভাবই নয়। আসলে তিনি জানেন যে, সেই আদেশের মর্ম আমরা বুঝতেই পারবোনা। তাই তো তিনি আদেশ দেননা। পরিবর্তে তিনি বলেন, এমন কারুকে নিয়ে এসো যিনি আমার উত্তরসূরি হবে। আমাদের কি সেই সামর্থ্য আছে বলো যে, তাঁর উত্তরসূরিকে সনাক্ত করতে পারবো!
কিন্তু তিনিও জানেন সেটি, আর এও জানেন যে সেই উত্তরসূরি স্বয়ং নিজেকে উন্মোচন করবেন। তাই সেই ব্যাপারে আমাদের কাছে একটি কথাও বললেন না। কেন? কারণ তিনি জানেন যে আমরা এতকাল তাঁর কাছে থেকেও ডুবতে শিখিনী। তাই তিনি চান যে, আমরাও যাতে ডুবতে শিখি। আর সেই কারণেই তো কিচ্ছু না বলে, তোমার কাছে তিনি পাঠিয়ে দিলেন, তোমার কনো রকম পরিচয় না দিয়েই, তোমার বিষয়ে সামান্য কিছুও না বলে।
তাই তো দেখো, আমরা তোমার সামনে আজ উপস্থিত। আসলে, কর্তা তো তিনি একাকীই। কিন্তু আমাদের অহং বোধ কোথায় গেছে যে, আমরা নিজেদের কর্তা জ্ঞান করা বন্ধ করবো? … তাই তো তিনি তোমার ব্যাপারে কিচ্ছু না বলেই আমাদেরকে তোমার কাছে প্রেরণ করলেন। আমরা জানিনা, কিন্তু তিনি তো নিয়তি, তিনি তো স্বয়ং কালকে নিয়ন্ত্রণ করেন। তিনি তো প্রকৃতি, তিনি তো স্বয়ং সমস্ত কিছুকে ধারণ করে চলেন।
তাই তিনি জানেন যে, তোমার কর্তাহীন ভাবকে দেখে আমরা ঠিকই সনাক্ত করে নিতে পারবো, কারণ আমরা তো আমাদের মা ব্যতীত কারুকে এমন কর্তাশূন্য হয়ে থাকতে দেখিই নি। তাই তোমাকে দেখা মাত্রই আমরা দ্বন্ধে পরে যাবো যে তুমিই কি আমাদের মা!…
তাই তোমার সম্বন্ধে একটি কথাও বলেননি তিনি, শুধু তোমাকে নিজেদের সাথে নিয়ে যেতে বলেছেন। এর কারণ এই যে, তুমি তো আমাদের ধরিয়ে দেবে যে কেন আমরা ডুবতে পারছিনা, আর কি ভাবে আমরা ডুবতে পারবো। তাই দিশা, পূর্বা, সকলে সঠিক বলছে দেবী মীনাক্ষী। তুমি কৃপা করে আমাদের সাথে চলো। শ্রীপুরে মাতা সর্বশ্রী তোমার পথ চেয়ে বসে আছেন”।
দেবী মীনাক্ষী হেসে বললেন, “স্বয়ং মা ডেকেছেন, এর থেকে বেশি কিছু আমার জানারই নেই বিজয়া। তবে আমাকে দেবী, বা সেই ধরনের কিছু বলো না। আমি তোমাদের সঙ্গিনী, তোমাদের সখী, তোমাদের ভগিনী, মীনাক্ষী। তাই কেবল মীনাক্ষী, এই নামেই ডেকো আমাকে। শুধুই মীনাক্ষী, তোমাদের মীনাক্ষী। দেবী বলে দূরে ঠেলে দিওনা আমাকে।
আর রইল কথা শ্রীপুরে যাবার। বিজয়া, তোমরা তো মা’কে চেনোই। তিনি বলে কয়ে কিছু করেন! … (ঈষৎ হাস্য হেসে) … তাই পথে যে তিনি কত প্রকার লীলা রেখে, আমাদের সকলকে উন্নীত করবেন, তার জন্য প্রস্তুত থেকো। প্রতিটি পরিস্থিতিই আমাদের জন্য শিক্ষণীয় হবে, এই ব্যাপারে কনো সন্দেহ নেই। কেবল আমাদের সকলকে তাঁর প্রদত্ত শিক্ষা গ্রহণ করার জন্য সর্বদা প্রয়াসরত থাকতে হবে”।
জয়া বললেন, “তাহলে আমরা এবার পথ চলা শুরু করি? মালদ রাজ্য থেকে যাত্রা শুরু করে, আমাদের পৌছাতে হবে কাতারাজ্যের শেষ প্রান্তে। তাই বিস্তর যাত্রাপথ। আমাদের মা নিশ্চয়ই জেনে গেছেন যে, তোমার সাথে আমাদের সাখ্যাত হয়ে গেছে, আর তুমি আমাদের সাথে যাত্রা করছো। তাই নিশ্চিত ভাবে তিনি তোমার পথ চেয়ে বসে আছেন মীনাক্ষী। আমাদের দ্রুততা করা উচিত। অন্তত নিজেদের কায়ার কারণে বিরাম দেওয়া উচিত নয়, এই যাত্রাপথে”।
মীনাক্ষী হেসে বললেন, “হ্যাঁ, চলো যাওয়া যাক। আমরা যে যাই হই না কেন, সর্বপ্রথম আর সর্বশেষ আমরা তাঁর সন্তান। আর মায়ের থেকে অধিক সন্তানের ভালো কেউ জানেন না। তাই আমাদের কখন বিশ্রাম প্রয়োজন, তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ ভাবে জানেন। আর দেখো ঠিক সময়ে সময়ে তিনি লীলা করে করে, আমাদেরকে বিশ্রাম দিয়েই দেবেন। তাই নিজের থেকে বিশ্রাম নেবার প্রয়াস করে বিলম্ব করে লাভ নেই। তাঁর চরণে পতিত হতে যে আমিও অত্যন্ত ব্যকুল। জন্ম থেকে আজ পর্যন্ত, কেবল ও কেবল তাঁরই কারণে জীবিত ছিলাম। আজ নিজের জন্মের উদ্দেশ্য পূর্ণ হবার সময় আসন্ন। তাই আর ধৈর্য ধরতে পারছিনা”।
পথ চলা শুরু করলে, দেবী উত্তরা বললেন, “মীনাক্ষী, কৃতান্তিক ধর্মের নামটি সামনে রেখে, আমাদেরকে সমানে বৈদিক ধর্মের আচার অনুষ্ঠানের মধ্যে রাখা হয়েছিল। আর আমরা অজ্ঞানের মত, সেই সমস্ত কিছুকেই কৃতান্তিক ধর্ম রূপে মেনে চলেছিলাম। কিন্তু সেই সমস্ত কিছু থেকেই, আমরা আত্মের ত্রিগুণ ছাড়াও, বহু দেবদেবীর সাথে পরিচিত হয়েছিলাম। কেন এত দেবদেবীর প্রয়োজন মীনাক্ষী? কৃতান্তিক ধর্মেও কি এমন বহু দেবদেবী আছে?”
মীনাক্ষী হেসে বললেন, “এর শ্রেষ্ঠতম উত্তর তো দিতে পারবেন দেবী জয়াবিজয়া। তাঁরা এখানে উপস্থিত। তাই আমার এই উত্তর দেওয়া উচিত হবেনা”।
জয়া বললেন, “কৃতান্তিক ধর্মে একমাত্র ঈশ্বর হলেন পরব্রহ্ম, অর্থাৎ মহাশূন্য। সেই ঈশ্বরের প্রকাশ রূপে পূজিত এখানে মাতা ব্রহ্মময়ী। আর মাতা ব্রহ্মময়ী তিন মূল বেশে প্রকাশিতা, নিয়তি অর্থাৎ কালনিয়ন্তা, প্রকৃতি এবং চেতনা, যেখানে চেতনা আমাদের অন্তরে স্থিতা হয়ে জ্ঞান আহরণকারী, ভাব প্রদানকারী, আর প্রকৃতি ও নিয়তি আমাদের বাহ্যে অবস্থান করে, পরাশূন্য অর্থাৎ পরব্রহ্মের উদ্দেশ্যে আমাদেরকে যাত্রা করানোর সহায়িকা গুরু বা মা বা অবিভাবক”।
আর কেউ কিছু না বললে, মীনাক্ষী হেসে বললেন, “এই চেতনা আমাদের অন্তরে ক্রিয়া করার কালে, মনের মধ্যে বিভিন্ন বিক্রিয়া ঘটান, আর এই প্রতিটি বিক্রিয়াকে বলা হয় একটি একটি দেব। এই প্রকৃতি আমাদের শিক্ষা প্রদান করার সময়ে বিভিন্ন উপাদানের রচনা করেন, আর তাঁদেরকে তোমরা বলো বিভিন্ন দেব। আর নিয়তি কালকে তোমাদের সম্মুখে প্রসারিত করার কালে বিভিন্ন কালবেশ ধারণ করেন, যাদেরকে তোমরা বলে থাকো বিভিন্ন ভৈরব।
বৈদিক ধর্মে এঁদের উল্লেখ থাকলেও, বৈদিকদের রচিত চরিত্র সমূহ নন এঁরা। তাই বৈদিকরাও সঠিক ভাবে এঁদের উৎস বা অবস্থানের কারণ জানেন না। এঁদের রচনা হয়েছে বৌদ্ধ যুগে, বৌদ্ধদের দ্বারা। আর তাই এঁদের উৎসের সত্য, এঁদের অবস্থানের সত্য রয়েছে বৌদ্ধ গুপ্ত গ্রন্থে।
সেই অনুসারে, মনের উপর চেতনার প্রভাবের কারণে যেই যেই দেবের রচনা হয়েছে, তাঁরা হলেন গ্রহাদি, ও নক্ষত্রাদি, যাদের শীর্ষে রয়েছেন মন স্বয়ং অর্থাৎ ইন্দ্র, কার্ত্তিক বা বিচার ও গণেশ বা বিবেক, এবং আনুসঙ্গিক ভাবে রয়েছেন কামদেব, অগ্নিদেব বা উর্জ্জা, বরুণদেব বা বুদ্ধি, এবং পবনদেব বা বায়ু । প্রকৃতির কারণে যাদের রচনা হয়েছে, তাঁরা হলেন সূর্য, চন্দ্র, যম, এবং অগ্নিদেব, পবনদেব তথা বরুণদেবও অগ্নি, বায়ু তথা জলরূপে অবস্থান করেন। আর কালের প্রতিক্রিয়ার কারণে উৎপন্ন ভৈরবদের বিস্তারিত কথা বৌদ্ধগ্রন্থেও পাবেনা, তা পাবে মার্কণ্ড মহাপুরাণে, যার অধিকাংশই বিনষ্ট করে দেবার কারণে, ব্যাস রচিত মার্কণ্ডপুরাণেই এঁর যা উল্লেখ আপাতত লভ্য।
অর্থাৎ এই দেব বা ভৈরবের সত্যতা কি? এঁদের কনো নিজস্বতা নেই। ঠিক যেমন আমাদের কারুর কনো নিজস্বতা নেই, কাল, প্রকৃতি এবং মনের প্রতিক্রিয়াস্বরূপই আমাদের অস্তিত্ব ও অবস্থান, তেমনই এঁদের অবস্থানও অনুরূপ। এবার তোমরাই বলো, যদি তোমাদের পূজা না হয়, তাহলে এঁদের পূজা কি করে হতে পারে? তোমরা একাধারে কাল, প্রকৃতি ও মনের প্রতিক্রিয়াস্বরূপ অস্তিত্ব, আর তাঁরা কেবল একটির প্রতিক্রিয়াস্বরূপ অস্তিত্ব। তাই যদি পূজা হয়, সেইক্ষেত্রে তোমরা তাঁদের থেকে অধিক পূজনীয়। আর সেই কারণেই, কৃতান্তিক ধর্মে, এরা কেউ আরাধনার বিষয় নন”।
