সর্বশ্রী কাণ্ড (কৃতান্ত তৃতীয় কাণ্ড)

জয়াবিজয়া এবার মীনাক্ষীর সম্মুখে এসে বললেন, “মাতা তো সমস্ত কিছুই জানেন। নিশ্চিত ভাবে তিনি স্বয়ংই সেই চেতনাপ্রকাশ ধারণ করতেন, যা তিনি করবেন বলে প্রতিশ্রুতি প্রদনা করলেন। তাহলে ত্রিগুণদের এখানে তিনি আনলেন কেন?”

মীনাক্ষী হেসে বললেন, “কৃতান্ত কথার সার বলার জন্য, ব্রহ্মময়ীর সত্য প্রকাশ করার জন্য, আর শ্রীপুরকে ত্রিগুণদের থেকে সুরক্ষিত করার জন্য”।

বিজয়া হেসে বললেন, “মায়ের লীলা বড়ই অদ্ভুত। আচ্ছা মীনাক্ষী, আমরা মায়ের এই মহাযুদ্ধকে প্রত্যক্ষ করতে পারবো না!”

দেবী সর্বশ্রী হেসে বললেন, “আমার নেত্রের দিকে তাকাও সকলে, সেই যুদ্ধ প্রত্যক্ষ করতে পারবে”।

সর্বশ্রীর এই কথাতে সকলে উদগ্রীব হলে, তারা সকলে সর্বশ্রীর নেত্রের দিকে একনিষ্ঠ হয়ে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকলো।

সকলে দেখলেন, মাতা সর্বাম্বার নিশ্ছিদ্র শূন্যকায় তমসা থেকে প্রকাশিত হলো ভয়ঙ্করী গুহ্যা, তবে এবারে গুহ্যা নিরস্ত্র কিন্তু প্রকাণ্ড সে। মুণ্ডমালা ও হস্তমালার কারণে, এবং গলিত স্বর্ণ ও রজতের তনুর স্থানে স্থানে আবরণ থাকার কারণে তাঁকে নগ্ন না দেখালেও, নগ্নপ্রায় তো দেখাচ্ছিলই। আর নগ্নপ্রায় উন্নতস্তনা, সাগরলহরের ন্যায় লহরিমাভঙ্গিতে স্থিত ও তরঙ্গায়িত উদর, নিশির রাত্রির ন্যায় গহন অঙ্গবর্ণ, গহন রাত্রির ন্যায় কেশবিন্যাস, এবং তাতে গভীর রাত্রির জলধারাপূর্ণ বাদলের ন্যায় রক্তাভ নয়ন ও দেহের ভাঁজ।

এই সমস্ত কিছু দেখে অত্যন্ত কামাতুর ভাবে আকর্ষিত হয়ে সবিতাসুর এবং বশ্যাসুর আক্রমণের ভাবে দেবীর দিকে এগিয়ে এসে লালায়িত ভাবে কিছু বলতে গেলে, মাতা গুহ্যা কনো কথা বলার অবকাশই না প্রদান করে, সরাসরি একটি লম্ফ মেরে, দুই দানবের বক্ষে দুই চরণ দ্বারা পদাঘাত করলে, সহস্র যোজন দূরে ছিটকে পরে যায় দুই দানব।

দুই দানবের এই পতনের কারণে, প্রায় সম্পূর্ণ ইউরোপ মহাদেশ সাগর তলদেশে নিমজ্জিত হওয়া শুরু করে দেয়। দুই দানবও অতিশয় বিচলিত ও আহত এই আঘাতের ফলে। তাই তাদের উঠে দাঁড়িয়ে পরবর্তী প্রতিক্রিয়া কি হবে সেই নিয়ে চিন্তিত হয়ে পরে, তো মাতা তাদেরকে কনো অবকাশ প্রদান করতেও অনিচ্ছুক।

দুই লম্ফে তিনি দুই দানবের সম্মুখে স্থিত, একটি প্রকাণ্ড ঘূর্ণি প্রদান করে, এক প্রকাণ্ড মুষ্ট্যাঘাত করলে, একই মুষ্ট্যাঘাতে দুই দানব আক্রান্ত হয়, এবং তারা আরো দূরে পতিত হয়ে যায়, একপ্রকার গগন চিড়ে নিজেদের বিশালাকায় দেহ নিয়ে যাত্রা করে। এবার তারা ভূমিতে পতিত হয়ে গেলে, উত্তর আমেরিকা মহাদেশ সমানে সমুদ্রের গর্ভে তলিয়ে যাওয়া শুরু করে সেখানের সমস্ত জীব উদ্ভিদদের সঙ্গে নিয়ে।

এবার দুই দানব প্রতিক্রিয়া প্রদান করতে তৎপর হয়ে ওঠে, যদিও তারা ভয়ানক ভাবে আহত হয়ে গেছে এই দুই প্রহারের ফলে। একপ্রকার ষাঁড়ের ন্যায় সিং পাকিয়ে মাতা গুহ্যার দিকে তেরে গেলে, মাতা গুহ্যা এক ভয়ানক গর্জন করে, গগনে লম্ফ দিয়ে দুই দানবকে তাঁর তনুর অবস্থান থেকে সামান্য এগিয়ে যেতে দিয়ে, দুই দানবের পৃষ্ঠে একটি একটি করে চরণ স্থাপন করে মাতা ভূমিষ্ঠ হলে, দুই দানবের দেহের বেশ কিছু অংশ গুড়িয়ে যায় মাতার পদচাপের কারণে।

আর সেই পদচাপে, উত্তর আমেরিকা প্রায় সম্পূর্ণ ভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল সমুদ্রের নিচে, তো অন্যদিকে বঙ্গভূমির নিম্নে বঙ্গোপসাগরের সাগরস্তর নিচে নেমে গিয়ে, এক নব্য ভূমির রচনা করে দেয়। কিন্তু এই সমস্ত কিছু হলেও বিপুল ভাবে ভুমিকম্পন হবার কারণে ভারত দেশেও লক্ষ লক্ষ জীব মানুষ উদ্ভিদ প্রাণ হারাতে শুরু করে দেয়।

সেই দেখে দেবী সর্বশ্রী নিজের চোখ বন্ধ করে নিলে, সকল কৃতান্তিক মাতার যুদ্ধ দেখার বিরাম টানতে বাধ্য হয়। দেবী সর্বশ্রী এবার তৎপর হয়ে উঠলেন, মীনাক্ষী সহ সকল কৃতান্তিককে একাধিক শকটে স্থাপিত করে দক্ষিণে নবউত্তলিত ভূমির দিকে যাত্রা করাতে। পথে তারা প্রচারিকাদেরও সাখ্যাত লাভ করেন, আর সকলে মিলে দক্ষিণে নব্যদ্বীপে যাত্রা করা শুরু করেন।

তাকে দ্বীপই বা বলা চলে কি ভাবে! কারণ তা যে প্রায় সম্পূর্ণ ভাবেই বঙ্গের আদিভূমির সাথে সংলগ্ন। কেবল দক্ষিণে সুন্দরের বনের ব্যঘ্রপ্রকল্পকে যেন এক ফালি নদী এই নব্যভূমির থেকে পৃথক করে রেখে দেয় এটি নিশ্চয় করতে যে নব্যভূমিতে সেই ব্যঘ্ররা সহজে উপস্থিত হতে পারবেনা।

কিন্তু এই শকটযাত্রাও ততটা সহজ হয়না, কারণ মাতা গুহ্যার পূর্বআঘাতের কারণে এবং আরো আরো পরবর্তী আঘাতের কারণে, মুহুর্মুহু সমস্ত ভূমিতে ভুমিকম্পন হতেই থাকলো। উত্তর আমেরিকার পর দক্ষিণ আমেরিকারও কেবল বন্যপ্রাণীদের আখরা আমাজন নদীর উপকুল এলাকা ব্যতীত সমস্ত অঞ্চলই প্রায় জলের নিচে চলে যেতে থাকলো। সঙ্গে সঙ্গে, ইউরোপের ও আফ্রিকার ক্ষেত্রেও প্রায় একই অবস্থা।

আর একদিকে যেমন বঙ্গোপসাগর থেকে নবভূমির উত্তোলন হয়েছে, তেমনই অন্যদিকে আটলান্টিক মহাসাগরেও এক নব্যভূমির উত্থান হতে, রোজ ও রোজের সাথে প্রায় এক শত মানুষ কেবল সেই নয়াভূমির দিকে যাত্রা করে, তবে তাদেরও যাত্রা তেমন সহজ হয়না ভূমিকম্পের কারণে।

আর অন্যদিকে সর্বাধিক কঠিন যাত্রা হয়, ভূমি ও অরিত্রার ও তাঁদের সাথে থাকা প্রায় ১ শত মানুষের জন্য, কারণ তাদেরকে তো ভূমিকম্পে ধসে ধসে পরে যাওয়া পাহাড় ডিঙ্গিয়ে বঙ্গোপসাগরের উপর নবনির্মিত স্থানে যাত্রা করতে হয়। বাকি যেই ধরিত্রীর অংশ এতাবৎকাল সাগরের উপরে দেখা যেত, তার প্রায় সমস্তই সমুদ্রের গর্ভে চলে যেতে থাকলো। মধ্যে মধ্যে দ্বীপের আকারে, কেবল বনাঞ্চলগুলি থেকে যেতে থাকলো, যেখানে বাকি যোনিরা এবং বহুযোনির উদ্ভিদরা বসবাস করতেন।

তবে ভূমিকম্পের প্রকোপ তাদেরকেও সইতে হয়, মাতার তাণ্ডবের কারণে। তাই তাদেরও অনেকে সেই দুঃসহ ভুমিকম্পন সহ্য করতে না পেরে প্রাণ হারান। টানা জমি যদি সাগরের উপর রইল, তা কেবল পূর্বের জাভা অঞ্চল থেকে বিস্তীর্ণ হয়ে কন্যাকুমারীর থেকে প্রায় ১০০০ যোজন দূর পর্যন্ত স্থিত এক নব্যভূমি, আর আফ্রিকিয় মহাদেশের পশ্চিমে প্রায় ৩ হাজার যোজন দূর থেকে শুরু করে ইংল্যান্ডের থেকে ১০০০ যোজন দূর পর্যন্ত ব্যপ্ত এক নব্যভূমি।

বাকি সমস্ত সরাসরি টানটান বিরাজ করা সমুদ্রপৃষ্ঠের ঊর্ধ্বে থাকা জমি সমুদ্রের নিচে শায়িত হয়ে গেল। মধ্যে মধ্যে প্রচুর প্রচুর সাগর বেষ্টিত দ্বীপ পরে রইল বাকি সমস্ত যোনিদের বসতি রক্ষার জন্য। নব্যস্থাপিত পৃথিবীর উচ্চতম পর্বত আর কুমেরু পর্বত রইলনা, বরং তা হলো সুমেরু পর্বত, যাকে পূর্বের জগত বলতো মুঙা কিয়া।

তবে মুঙা কিয়ার অবস্থান বড়ই অদ্ভুত হয়ে রইল। মুঙা কিয়ার পূর্ব দিকে, বেশ কিছু বিস্তীর্ণ রুক্ষভূমি, আর তারপর অনন্ত সাগর, যার সমাপ্তি ঘটে আটলান্টিসে উদিত নব্যভূমিতে এসে, অর্থাৎ বিস্তীর্ণ সাগরক্ষেত্র সেখানে, যার মাঝে কয়েকটিই অতিক্ষুদ্র দ্বীপ ভেসে বেড়াতে থাকলো কিছু যোনিদের ধারণ করে করে। আর মুঙা কিয়া অর্থাৎ সুমেরুর পশ্চিমে অবস্থান করলো, বেশ কিছু পাহাড়ের চূড়া, যাদের কেউ উঁচু, তো কেউ নিচু, আর তা সমাপ্ত হলে, এক বিস্তীর্ণ রুক্ষক্ষেত্র রইল কিছু হ্রদ ধারণ করে, আর তারপর অবস্থান করে একটি বিশাল মালভূমি, আর তার নিচে পূর্বের বর্মদেশের নিচতল থেকে পূর্বের অন্ধ্রের তীরবর্তী অঞ্চল পর্যন্ত সমতলভূমি, যার ব্যস দক্ষিণ দিকে বেশ বিস্তীর্ণ, প্রায় পূর্বের অস্ট্রেলিয়ার সমান্তরাল স্থান পর্যন্ত।

ঠিক তার পরেই ভেঙে যাওয়া এন্টার্কটিকার অজস্র বরফদ্বীপ স্পষ্ট দেখা যেতে থাকে। আর এই সমতল স্থানেই অবস্থান করা শুরু করলো মীনাক্ষীরা এবং ভূমি-অরিত্রারা। তারা পরবর্তীতে একে অপরের সাথে মিলেছেন এবং নিজেদের মধ্যে সংযোগও স্থাপন করেছিলেন, তবে তা হতে প্রায় আরো ৩০ বৎসর সময় লেগে যায়। একদিকে যেমন মীনাক্ষীদের এই নব্যস্থানকে গুছিয়ে নিতে সময় লাগে, তেমন অরিত্রা, ভূমিদের যাত্রা আরো কঠিন হয়, কারণ পূর্বের মাদ্রাজ থেকে যখন এই নব্যঅঞ্চলে এসেছিল তারা, তখন সেই স্থান তো ছোটো ছোটো পাহাড়ে পরিপূর্ণ। হ্যাঁ তবে সেই স্থানে বৃক্ষরাজি বিশাল হয়নি তখনও। তাই যাত্রা করা সম্ভব হয়।

তবে মিলিত হয়েও তারা ভিন্ন ভিন্ন দুই স্থানেই নিবাস করে। মীনাক্ষী যেখানে নিজেদের স্থানের নামকরণ করে শ্রীপুর, সেখানে অরিত্রা ও ভূমি নিজেদের স্থানের নামকরণ করে মীনাক্ষীপুর। তবে এই দুই স্থান মিলে একটিই দেশ হয় ভবিষ্যতে, যার নাম মীনাক্ষী ও অরিত্রারা মিলিত ভাবেই রাখে কৃতান্তস্থান। অন্যদিকে রোজরা একটি অন্য উপনিবেশ শুরু করে, যার নাম তারা রাখে ফিসআই টাউন। আর এই দুই উপনিবেশের মিলন কথা, আরেক অন্য কথা, যা ঘটে প্রায় আরো এক হাজার বছর পরে।

তবে এই নব্যক্ষেত্র স্থাপন করার কাণ্ডারি যিনি, তিনি হলেন মাতা গুহ্যা। মাতা গুহ্যা দুই দানব, সবিতাসুর এবং বশ্যাসুরকে দমন করার ছল করেই কিনা জানা নেই, সম্যক মানবকুলের নাশ করে দিলেন, এবং কেবল কৃতান্তিক তিনগোষ্ঠীকেই জীবিত রেখে মানবকুলকে আরো একটিবার সুযোগ দিলেন, নিজেদেরকে ঈশ্বরের গর্বের কারণ রূপে চিহ্নিত করার। আর সেই কাজে মীনাক্ষী সর্বদাই তৎপর থাকতো, দেহে থাকারকালীনও, আর দেহত্যাগের পর কৃতান্তিকদের মধ্যে প্রভু ব্রহ্মসনাতনের সাথে বিভিন্ন অবতার নেবার কালেও।

তবে যখন এই সমস্ত ভূমিকম্পের অবসান হয়, যখন হাজার ঝঞ্ঝা পেরিয়ে, একাধিক শকট ভাঙতে ভাঙতে অন্তিম শকটও ভেঙে যাবার পর মীনাক্ষীরা নবউদিত স্থানে, অর্থাৎ যার নাম শ্রীপুর রেখেছিলেন, সেখানে পৌঁছান, তখন দেবী সর্বশ্রীকে আর দেখতে পান না কেউ। বেশ কিছুক্ষণ সকলে মিলে তাঁর সন্ধান করলে, মীনাক্ষী বুঝে যান যে দেবী সর্বশ্রী নিজের কাজ সম্পন্ন করে চলে গেছেন।

মীনাক্ষী ডুকরে কেঁদে উঠলে, একজন বালিকা তাঁর পিঠে হাত রাখতে, মীনাক্ষী চমকে ওঠে। সেই বালিকা বলে, “তুমি চিন্তা কেন করছো। এই দেহের কাজ হয়ে গেলে, তোমার প্রভুর হৃদে প্রত্যাবর্তন করে সেখানেই নিবাস করবে, দেবী সর্বশ্রী বলে গেলেন তো! … আর এও তো বলে গেলেন, তুমি প্রতিবার প্রভুর সাথে অবতরণ করবে!”

মীনাক্ষী সেই কথা শুনে শান্ত হলো। পুনরায় তাঁর মনে হলো, এই বালিকাকে তো তিনি আগে কখনো দেখেননি। ঘুরে তাকালেন, কিন্তু সেই বালিকাকে আর তিনি দেখতে পেলেন না। মনের খেয়ালেই মীনাক্ষী হেসে, মনে মনে প্রভুর চরণকে স্মরণ করে প্রণাম করলেন, আর শ্রীপুর স্থাপন করে, সেখানে প্রভুর আরাধ্যা দেবীমুখকে যত্নে লালন করা মীনাক্ষী, সেই মুরতিকে স্থাপন করে, মাতা সর্বাম্বার আরাধনা শুরু করলেন, এবং কৃতান্তযুগের সূচনা করে, কৃতান্তস্থানের স্থাপনা করলেন।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28