সর্বশ্রী কাণ্ড (কৃতান্ত তৃতীয় কাণ্ড)

এমন গহন তপস্যার শেষে, ত্রিগুণ আচম্বিত হয়ে উঠলো, যখন তার আশেপাশে সমস্ত কিছু তমসাচ্ছন্ন হয়ে উঠলো। ধীরে ধীরে সেই অন্ধকার আরো আরো গহন হতে হতে, এমনই গহন হয়ে উঠলো যে আর কিচ্ছু দেখা গেল না। শুধুই কি অন্ধকার! না তো সেই আঁধারে কনো গন্ধ বর্তমান ছিল, না স্পর্শ আর না শব্দ। এমন অন্ধকার যেন কিচ্ছুর অস্তিত্বই নেই, কনো কিছু কনো কালেই যখন ছিলনা, তখন যেমনটা ছিল, সে যেন তেমনই আঁধার।

কেবলমাত্র আচম্বিতই নয়, ত্রিগুণ প্রচণ্ড ভাবে ভয়ার্ত হয়ে উঠলো, কারণ এমন গহন অন্ধকার তারা প্রথমবার দেখছে না, ঠিক এমনই আঁধার তাঁরা অনুভব করেছিল, যখন দেবী গুহ্যা তাঁদের সম্মুখে এসেছিলেন। তাই ভয়ে ভয়ে বলে উঠলেন, “কে মা!”

সম্পূর্ণ নিঃশব্দতার মধ্য থেকে একটি প্রচণ্ড গম্ভীর অথচ মধুর বা বলা যেতে পারে অতি মসৃণ এক গুরুগম্ভীর নারী কণ্ঠস্বর বলে উঠলেন, “হ্যাঁ, আমি”।

ত্রিগুণের একগুণ বলে উঠলেন, “এই রূপে ভয় লাগছে মা! … তোমার বাস্তবিক রূপে এসো!”

মাতার কণ্ঠস্বর পুনরায় বলে উঠলেন, “এটিই আমার বাস্তবিক স্বরূপ। আমি শূন্য, আমি নির্গুণ, আমি নির্বিকার, আমি নিরাকার। তাই আমার স্বরূপ হলো সেই আঁধার, যেই আঁধার হলো সমস্ত কিছুর আদি। তাই আমার স্বরূপ হলো আমার সেই অবস্থা যেখানে কনো গন্ধের রচনাও হয়নি। কনো বলতে কনো আলোক নেই, কারণ আমি হলাম আদি, আর যে আমি, যখন আমি, তখন আলোকের রচনাও হয়নি। আলোক তো ভ্রম মাত্র, কল্পনা মাত্র। বাস্তবিকতা তো এই নিশ্ছিদ্র অন্ধকার।

সুগন্ধ তো কল্পনা মাত্র, বাস্তবিকতা তো গন্ধবিহীন অবস্থা। সাকার তো কেবলই এক কল্পনা, বাস্তবিকতা তো নিরাকার। আমি বাস্তব, আমি সত্য। তাই আমার কনো আকার নেই, আমার কনো গন্ধ নেই, আমার কনো আলোক নেই, আমার কনো ধ্বনি নেই, আমার কনো স্পর্শ নেই। আমিই একমাত্র সত্য, আমিই ব্রহ্ম, তাই আমার কনো দুই নেই, আমার কনো সীমা নেই, আমার কনো অন্ত নেই, আমার কনো ব্যাখ্যা সম্ভব নয়, আমার চিন্তা করাও সম্ভব নয়। তাই আমি শূন্য।

সেই শূন্য আমি যার কনো অন্ত নেই, সীমা নেই, আকার নেই, আকারের প্রয়োজনও নেই, গন্ধ নেই, ধ্বনি নেই, স্পর্শ নেই। আছে কিছু তা হলো কেবলই প্রেম, লীন হবার ভাব আর লীন করার ভাব। তাও আমি তোদের সম্মুখে পূর্ণ ভাবে প্রকাশিত হইনি, কারণ আমি পূর্ণ ভাবে প্রকাশিত হলে, তোরা আর নিজেদের অস্তিত্ব ধরে রাখতে পারতিস না, আর তাই নিজেদের বক্তব্য ব্যক্ত করতে পারতিস না”।

ত্রিগুণের মধ্যে সত্ত্ব বললেন, “এই কথা মাতা আমরা প্রভু ব্রহ্মসনাতনের থেকে বারংবার শুনেছি, কিন্তু এর অর্থ আমরা বুঝতে পারিনি। কেন মা! যখন তুমি পূর্ণ রূপে প্রকাশিত হও, তখন সকলে নিজের অস্তিত্ব ত্যাগ করতে বাধ্য হয় কেন? কেন প্রভু বলতেন, ঈশ্বরের স্বরূপ সাখ্যাত করতে গেলে, স্বয়ংকেও ঈশ্বরই হতে হয়, আর যদি না হতে পারো, তাহলে তাঁর দর্শন তো পাবে, কিন্তু আর ফিরবে না, তাতেই লীন হয়ে যাবে!”

মাতা সর্বাম্বা এক অট্টহাস্যের মত হাস্য হাসলেন। সেই হাস্য এমন যে ত্রিগুণ ভয়ার্ত হয়ে একে অপরকে আঁকড়ে ধরলেন ভয়ে। মাতা হেসে উঠে বললেন, “ভয় নেই। আমার কনো বন্ধন নেই, কনো বন্ধন সম্ভবও নয়, তাই আমি তোদের মত অবগুণ্ঠনে আচ্ছাদিত হয়ে হাসিনা, আমি প্রাণ খুলে হাসি। … আমার এই প্রাণ খোলা হাসির কলতান শুনতে তোদের ব্রহ্মসনাতন উন্মাদের মত অধৈর্য হয়ে উঠতো, আর তোরা সেই হাসি শুনে ভয় পাচ্ছিস! … বুঝতে পারছিস, প্রেম কি? সে ছিল প্রেমী, তাই আমার সমস্ত কিছুই তার কাছে প্রিয় ছিল, আমার নিরাকারত্ব আমার নির্বিশেষত্বও, আমার অব্যাক্ততাও আর আমার অনন্ততত্বও, আর তোদের কাছে সেই সমস্তই ভীতি সঞ্চারক। ভেদ কেবল প্রেমের। সে ছিল প্রেমী, তাই তার প্রেমের সমস্ত কিছু তার কাছে অত্যন্ত প্রিয়, আর তোদের কাছে তোরা নিজেরাই নিজেদের প্রেম, তাই আমার সমস্ত কিছুই তোদের কাছে ভীতিদায়ক”।

মাতার এমন কথা শুনে ইতস্তত হয়ে উঠলো সকল ত্রিগুণ, অতঃপরে মাতা বললেন, “তোরা সকলে, যা কিছু ভাবতে পারিস তাও, যা ভাতে পারিস না তাও, সমস্ত কিছুর স্বরূপ আমিই, একাকী আমি, কারণ আমিই একমাত্র সত্য, আমিই একমাত্র অস্তিত্ব। একমাত্র আমারই অস্তিত্ব সম্ভব, আর কারুর অস্তিত্ব সম্ভবই নয়। কারুর আত্মের অস্তিত্ব সম্ভব নয়, পরমাত্মেরও অস্তিত্ব সম্ভব নয়, মানুষ তথা অন্য যোনি তো বাদই দে, ধরিত্রী বা অন্য গ্রহদেরও বাদ দে, কারণ ব্রহ্মাণ্ডেরও অস্তিত্ব সম্ভব নয়।

তারপরেও কেন সমস্ত কিছুকে অস্তিত্বশীল মনে হয়? কারণ সেই সমস্ত কিছুর অভ্যন্তরে আমি বিরাজমান, আর আমিই একমাত্র সত্য। তাই সমস্ত কিছুকেই ভাস্মর মনে হয়, কিন্তু সমস্ত কিছুই কল্পনা। আমার উপর কল্পনার লেপ লাগিয়ে তা প্রকাশিত। তাই তারা অনিত্য হলেও মিথ্যা নয়, কারণ তাদেরকে মিথ্যা বললে, তাদের অন্তরে বিরাজমান আমাকেও মিথ্যা বলতে হয়, যার মিথ্যা হওয়া সম্ভবই নয়।

অর্থাৎ যা কিছু স্থূল, যা কিছু সূক্ষ্ম, সমস্তই মিথ্যা, কিন্তু সার্বিক ভাবে তারা মিথ্যা হতে পারেনা, কারণ তাদের অন্তরে স্থাপিত হলাম আমি। সেই কারণকে তোরা বলিস চেতনা, আর যখন সেই চেতনা অপরিপক্ক অবস্থাতে থাকে, তখন তাকে বলিস মেধা, যদিও তোরা তাকে মেধা বলিস না, কারণ তোরা তো কল্পনা করার সামর্থ্যকে মেধা বলিস, তবে যিনি সত্যযুগে স্থিত, তিনি চেতনার অপরিপক্ক রূপকেই মেধা বলে থাকে, আর কলিতে স্থিত জীব যাকে মেধা বলে, তা হলো কল্পনা।

সবার সমস্ত কারণ আমিই, আমি একাকীই, আর কারণ বেশে আমাকে জ্ঞানী বলে চেতনা। আর মেধাকে যিনি চেতনাতে পরিণত করে, সেও আমি, আর আমার সেইরূপকে জ্ঞানী বলে প্রকৃতি। আর প্রকৃতিকে যে পূর্ণ করে, সেও আমিই, আর তাকে জ্ঞানী বলে নিয়তি। আমিই একমাত্র অস্তিত্ব, আর আমি হলাম অসীম অনন্ত। তাই আমি ব্যতীত কনো কিছু সম্ভবই নয়। আমি ব্যতীত যা কিছুর কল্পনা করিস তোরা, সমস্ত কিছু মিথ্যা। তাই সমস্ত স্থুল মিথ্যা, সমস্ত সূক্ষ্ম মিথ্যা, কারণ আমি ব্যতীত সমস্ত কিছুই মিথ্যা।

একটি স্থূলের অস্তিত্ব থাকলেও, একটি সূক্ষ্মের অস্তিত্ব থাকলেও, আমি আর অসীম থাকি না, কারণ সেই স্থূল আর সেই সূক্ষ্মই আমার সীমা হয়ে যায় তখন, আর আমার সীমা সম্ভবই নয়।  তাই যা কিছু স্থুল, যা কিছু সূক্ষ্ম, সমস্ত কিছু মিথ্যা, সমস্ত কিছু কাল্পনিক। আর তাই সেই স্থূলতাকে ধারণ করে থাকলে, সেই সূক্ষ্মতাকে ধারণ করে থাকলে, আমাকে প্রত্যক্ষ করা অসম্ভব, কারণ যাকে তারা প্রত্যক্ষ করবে তা আমি নই, বরং তা তাদেরই কল্পিত এক সাকার রূপ।

সেই জন্য প্রেমীর কল্পনাতে আমি এক সাকার দেবী, আমি হলাম আলোক, আমি হলাম সুগন্ধি, আমি হলাম সুরেলা, আমি হলাম সুস্পর্শী, আমি হলাম সুমধুর। আবার যিনি প্রেমী নয়, তার কাছে আমি প্রচণ্ড আলোক, আমি হলাম ভয়ঙ্করী, আমি হলাম বজ্রকণ্ঠী, প্রকাণ্ড। কিন্তু বাস্তবে আমি যে শূন্য, আমি যে গন্ধবিহীন, স্পর্শবিহীন, আলোকবিহীন, পরাশূন্য, পরাঅস্তিত্ব।

আর আমার সেই বাস্তব স্বরূপ দর্শন করতে হলে, সমস্ত স্থূল, সমস্ত সূক্ষ্মের পারে স্থিত হয়ে চেতনা হয়ে উঠতে হয়, সমস্ত মিথ্যার অপসারণ করে সত্য হয়ে উঠতে হয়। আর চেতনা যে স্বয়ং আমি, আর তাই তোদের প্রভু বলতেন, আমার স্বরূপের দর্শন পেতে হলে আমি হয়ে যেতে হয়। ধ্রুব সত্য বচন তা, কারণ একমাত্র যেই চেতনা সমস্ত স্থূলতার, সমস্ত সূক্ষ্মতার ভান থেকে মুক্ত, সেই আমার স্বরূপ দর্শন করতে পারে, আর তা দর্শন করে আমার সাথে একাত্ম হয়ে গিয়ে সমাধিলাভ করে, আমার অনন্ত প্রেমকে উপভোগ করে।

আমার স্বরূপের ধারণা করতে সক্ষম হলে, এবার বল, কি চাস আমার থেকে? কেন আমার আহ্বান করছিস এতকাল ধরে! … কি তোদের প্রয়োজন!”

রজগুণ বললেন, “মা, সমস্ত কিছুই তো তুমি জানো। চেতনা বেশে সকল কণায় কণায় তুমি বিরাজমান, তাই তোমার অজানা আর কি বা আছে! হ্যাঁ হতে পারে, কল্পনার প্রলেপ তোমার উপর স্থাপিত করে রেখে সকলে কর্তা বোধ করছে নিজেদেরকে। কিন্তু তা সত্ত্বেও, অস্তিত্ব তো কেবল তোমারই। তাই চেতনা রূপে সকলের অন্তরে স্থিত হয়ে, সমস্ত কিছুই তো তোমার জানা। হ্যাঁ, সমস্ত জেনেও তুমি কেবলই নিরপেক্ষ দর্শক মাত্র, কিন্তু জ্ঞাত তো তোমার সমস্ত কিছুই।

কন্দমমনুষ্যরা প্রভুর দ্বারা বিস্তৃত জ্ঞান ও ধননেশা বিমুখতার থেকে জগতকে মুক্ত করে পুনরায় অজ্ঞানতা ও ধনের নেশায় মুখরিত করে তোলার জন্য দীর্ঘমেয়াদি যজ্ঞ করে, দুই অতিকায় দানবের রচনা করেছে, যাদের একজন অজ্ঞানতার প্রতীক, এবং দ্বিতীয়জন ধনের নেশার প্রতীক। যিনি অজ্ঞানতার প্রতীক, তার জন্ম দিনের আলোক থেকে হয়েছে, তাই সূর্যের আলোকই তার পিতা, আর তাই তার নাম হলো সবিতাসুর। আর যিনি ধনের নেশার প্রতীক, তার জন্ম হয়েছে বশীকরণ করার যজ্ঞাগ্নির থেকে, আর তাই তার নাম হয়েছে বশ্যাসুর।

মাতা, এই বশ্যাসুর আর সবিতাসুর অত্যন্ত বলশালী ও অত্যন্ত ভয়ঙ্কর। সূক্ষ্ম আকারে স্থিত এঁরা, বিশালাকায় আর এঁদের বলের কাছে আমাদের ত্রিগুণের বলও অতি সামান্য। যেই কন্দমমনুষ্যরা এঁদেরকে প্রকট করেছিলেন, তাদেরকেও মানছে না এঁরা। সূক্ষ্ম বেশে থাকার জন্য, এঁদেরকে কেউ অনুভব করতে পারছেনা, আর তাই কেউ এঁদের পূজা করছেনা। আর পূজা না পাবার জন্য, এঁরা ভয়ানক ক্ষিপ্ত হয়ে সমস্ত জীবউদ্ভিদের নাশ করে চলেছে। জানিনা আমরা কতকাল তপস্যায় ছিলাম। এতক্ষণে হয়তো তারা সমস্ত যোনিরই প্রায় নাশ করে ফেলেছে।

এঁদের থেকে যোনিদের বাঁচান মা। নাহলে যে সমস্ত সৃষ্টি বিনষ্ট হয়ে যাবে। মানছি, এই ব্রহ্মাণ্ড, এই সৃষ্টি সমস্তই কল্পনা, কিন্তু এই কল্পনার মধ্যে স্থিত হয়ে তুমি, মেধা থেকে চেতনা হয়ে উঠে তোমারই প্রেম লাভ করো, তাই না! … তাই মা, এঁদেরকে দমন করে, সত্যযুগের রচনা করো কৃপা করে!”

মাতা সেই কথা শুনে পুনরায় অট্টহাস্য হেসে উঠলে, পুনরায় ত্রিগুণ ভয়ার্ত হয়ে উঠলো। মাতা হাসি থামিয়ে, হাস্যবেশেই বললেন, “সঠিকই বলে মীনাক্ষী, তোরা সত্যই চিরকাল অজ্ঞানতার আরাধনা করে এসেছিস। … ওরে মূর্খ, যুগ আসেও না যায়ও না। যে যায় বা আসে, তা হলো জীব। জীব সত্যযুগে যায়, কলিযুগে যায় বা অন্য যুগে। বিচার করে দেখ, তোদের প্রভু ব্রহ্মসনাতন কোনযুগে নিবাস করতেন! কলিতে নাকি সত্যে!”

তমগুণ বললেন, “সত্যযুগে নিবাস করতেন। এখানে তোমার আরাধনা করা, কন্যাপুত্ররাও, মানে মীনাক্ষী সর্বশ্রী, জয়াবিজয়াও তো সত্যযুগেই নিবাস করছেন”।

মাতা পুনরায় হাস্যছলে বললেন, “তাহলে তোরাই বল, তোদের মতে এখন তো কলিযুগ চলছে। তাহলে তারা সত্য যুগে নিবাস করলো কি করে?”

ত্রিগুণ উত্তর না খুঁজে পেয়ে একে অপরের মুখচাওয়াচাওয়ি করলে, মাতা হেসে বললেন, “মীনাক্ষী, এঁদের উত্তর দে”।

মীনাক্ষী অনুমতি লাভ করে ঈষৎ হাস্যসহকারে বললেন, “যুগ কনো সময়কাল নয়, বরং সময়ের চরিত্রাঙ্কন। আপনি যেই সময়ে অবস্থান করছেন, সেই সময়ের চার প্রকার চরিত্র হতে পারে, আর সেই চার চরিত্রকে চার যুগ দ্বারা প্রকাশিত করা হয়। অর্থাৎ, আপনি যেই সময়ে বাঁচছেন, তা হতে পারে সত্যকাল, নয় ত্রেতাকাল, নয় দ্বাপরকাল আর নয় কলিকাল।

এই পরিবর্তন কেন? কেন আপনি যেই সময়ে বাঁচছেন তা কলিকাল হতে পারে, আবার আপনার পাসের মানুষটি যেই সময়ে বাঁচছেন, তা সত্যকাল হতে পারে? এই বিভিন্নতা কেন? কারণ আপনার চেতনার বিকাশ ও তাঁর চেতনার বিকাশ ভিন্ন। আসছি সেই কথাতে, তার আগে সময়ের বিবরণ দেওয়া আবশ্যক।

সময় কি? সময় কি কনো নির্দিষ্ট ধারা! … না, সময় কনো নির্দিষ্ট ধারা নয়, তবে হ্যাঁ সময়ের অনেক স্তর থাকে, আর সেই স্তরের কনো না কনো একটি আপনার ও আমার এক, আবার কনো না কনো স্তর আপনার ও আমার এক না হলেও, আপনার ও অন্য কারুর এক। কেন এই ধারাপাত? বিস্তারে বললে বুঝতে সুবিধা হবে।

সময় হলো কালোক্ষয়। কর্ম করার পর সেই কর্মের ফল ভোগ করার যেই অন্তরায়, তাকে সময় বলে থাকি আমরা। কিন্তু কর্ম তো কেবল আপনার স্থূল বা সূক্ষ্মই করছেনা। কর্ম করছে, আপনি যেই ভূমির উপর দাঁড়িয়ে কর্ম করছেন, সেই ভূমি; যেই সঙ্গীদের সাথে কর্ম করছেন, সেই সঙ্গীরা। আর তাই এই সমস্ত আনুসাঙ্গিক কর্মেরও কর্মফল গ্রহণ পর্যন্ত যেই বিরতি, তাকে বলা হয় সময়। আর এই কারণেই সময়ের এতো স্তর। আপনার নিজের কর্ম ও কর্মফলের মধ্যে অন্তরায় তার আপনার নিকটবর্তী কালের প্রথম স্তর হলে, আপনার আনুসাঙ্গিক সকল সঙ্গীদের কর্ম ও কর্মফলের অন্তরায় কালের দ্বিতীয় স্তর, আর ধরিত্রীর কর্ম ও কর্মফল লাভ হলো তৃতীয় সময়ের স্তর।

এবার আসা যাক চারযুগে, অর্থাৎ সময়ের চার ধারার চরিত্রাঙ্কনে। যখন আপনি পূর্ণ ভাবে সত্যের প্রতি আকৃষ্ট, সত্যকে ধারণ করার প্রয়াসে উন্মত্ত, তখন আপনি সত্যযুগে অবস্থান করেন। আপনার প্রতিটি কর্মের মধ্যে তখন সত্যের বিকাশ প্রত্যক্ষ হয়। আপনি তখন আসক্তিকে প্রেম বলে মানেন না, আপনি তখন ভেদাভেদকে গুরুত্ব প্রদান করেন না, আপনি তখন আপনার ইচ্ছাপূর্তি হলে তবেই বিশ্বাস রাখবেন এমন শর্তসাপেক্ষ বিশ্বাস ধারণ করেন না, আপনি তখন রীতিরেওয়াজ পালনের থেকে তাদের অন্তরের দর্শনকে অধিক মান্যতা দেন।

এবার কথা এই যে, আপনি এই প্রকারে বসবাস করছেন, জীবনযাপন করছেন, কিন্তু আপনার সঙ্গিসাথিরা এই বিচারধারাতে অবস্থান করছেন না। তাঁরা হয়তো রীতিরেওয়াজের দর্শনের থেকে অধিক মান্যতা প্রদান করছেন রীতিরেওয়াজকে। তারা হয়তো নিজের ইচ্ছাপূর্তি কারককেই বিশ্বাস করতে আগ্রহী। তিনি হয়তো আসক্তিকেই প্রেম বা মমতা বলছেন। তাই তিনি সত্যযুগে বসবাস করছেন না। যদি এই শর্তসাপেক্ষ বিশ্বাস অত্যন্ত ক্রুর হয়, তাহলে তিনি কলিতে অবস্থান করছেন, আর যদি তার মধ্যে সামান্য হ্রাসভাব থাকে, তাহলে তিনি দ্বাপর বা ত্রেতাতে।

তাই আপনার মত আপনার সঙ্গীরা নন, অর্থাৎ সময়ের দ্বিতীয় স্তর সত্যযুগিয় নয় আপনার ক্ষেত্রে। এবার তৃতীয় স্তরের দিকে তাকিয়ে দেখুন। যেহেতু আপনার একটিও সঙ্গী আপনার মত নয়, সেহেতু আপনি যেই স্থানে অবস্থান করেন, তাও আপনার অনুসারে স্থিত নয়। অর্থাৎ আপনি সত্যযুগিয় হয়েও সত্যযুগে অবস্থান করতে পারছেননা, কারণ আপনার পারিপার্শ্বিক সত্যযুগিয় নয়।

কিন্তু আমাদের এখানে দেখুন, এরা সকলে কৃতান্তিক আর তাই সকলে সত্য কেন্দ্রিক, আর তাই আমরা এখানে সকলে সত্যযুগেই নিবাস করছি, যতই আমাদের এই গোষ্ঠীর বাইরে যদি দেখেন তাহলে কলিযুগ অবস্থান করছে।

অর্থাৎ, সত্যযুগ বা অন্য কনো যুগ যাত্রা করেনা আমাদের সমাজে। বরং আমরা সত্যযুগ বা অন্যযুগে পদার্পণ করি, যেখানে আমরা একাকী যাত্রা করি তো সম্পূর্ণ ভাবে কনো যুগে পদার্পণ করতে পারিনা। কিন্তু আমরা যখন সংগঠিত ভাবে যাত্রা করি তখন আমরা পারিপার্শ্বিক সমাজ যেই অবস্থাতেই থাকুক না কেন, আমরা অন্য যুগে পদার্পণ করতে সক্ষম হই।

তাই এই যুগ চলছে, সেই যুগ আসছে, এগুলি অজ্ঞানতায় পরিপূর্ণ কিছু কথা মাত্র। বাস্তব কথা এই যে, আমি এই যুগে অবস্থান করছি। অর্থাৎ যুগ আমাদের কাছে যায়ও না, আসেও না; আমরা একটি যুগে যাই বা আসি”।

সেই কথা শ্রবণ করে ত্রিগুণ বললেন, “এই অসম্ভব মেধা! … ইনি কি প্রভুর মানসসন্তান?

সর্বশ্রীর উত্তর, “না, প্রভুর মানসসন্তান আমি। আমি তাঁর মানসসন্তানের চেতনা, সর্বশ্রী। আর মীনাক্ষী তাঁর প্রতি পূর্ণ সমর্পিত সত্ত্বার চেতনা। … তাঁর প্রতি পূর্ণ সমর্পিত হবার কারণে, ক্রমশ তাঁর মেধা অসীমতার দিশায় যাত্রারত”।

ত্রিগুণ এবার একসাথে মাতার উদ্দেশ্যে বললেন, “মা দেখো, এঁদের তো রক্ষা পাওয়া উচিত, তাই না! … এঁরা তো মানবতাকে মানবতার মানে স্থিত করে রেখেছে। তাহলে এঁদের রক্ষার জন্য অন্তত ওই দুই দানবের নাশ করো। কৃপা করো মা”।

মাতা সর্বাম্বার অবয়ব তখনও দেখতে পাচ্ছিল না ত্রিগুণসহ কেউই। শুধু কণ্ঠস্বরই শুনতে পাচ্ছিলেন। সেই কণ্ঠস্বর সকলের উদ্দেশ্যেই বললেন, “তোমরা এখনো সত্যকে অনুভব করতে পারছো না ত্রিগুণ। আমি চেয়েও তোমাদের যদি এই বেশে সাহায্য করতে যাই, তাহলে কেবল সেই দুই দানবের নাশ হবেনা, সম্পূর্ণ ব্রহ্মাণ্ডেরই নাশ হয়ে যাবে, কারণ আমি তো শূন্য, আমি তো ব্রহ্ম। ক্রিয়ার কালে কেবলই আমি ব্রহ্মময়ী হয়ে থাকবো। কিন্তু তার কারণে আমার শূন্যত্ব বিনষ্ট হবেনা।

আর শূন্যত্ব বিনষ্ট না হলে, আমি যদি ক্রিয়া করতে সচেষ্টও হই, তাহলে সম্যক ব্রহ্মাণ্ড আমার গ্রাস হয়ে যাবে। স্পষ্ট কথাতে, আমি হলাম সত্য সনাতন, আর যখন সত্য ক্রিয়াশীল হবে, তখন অসত্যের কনো অস্তিত্বই থাকতে পারেনা। তাই আমি যদি এই রূপে ক্রিয়াশীল হই, তাহলে সম্যক ভৌতিক ব্রহ্মাণ্ড, যা অসত্য ব্যতীত কিচ্ছু নয়, তা মুহূর্তের মধ্যে বিনষ্ট হয়ে যাবে, নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে”।

রজগুণ বললেন, “কিন্তু মা, আমাদের পিতা, পরমাত্মের নিধন করার কালে, আপনি তো যুদ্ধে রত হয়েছিলেন। তখন তো ব্রহ্মাণ্ডের নাশ হয়নি!”

মাতা পুনরায় বললেন, “তাহলে তোমরা কৃতান্ত কথার অর্থই বুঝে উঠতে পারো নি এখনো। মীনাক্ষী, কৃতান্তের সারকথা ব্যক্ত কর্‌ এঁদেরকে”।

কথা বলার অবকাশ লাভ করে মীনাক্ষী বলতে শুরু করলেন, “কৃতান্ত কথা হলো মাতা সর্বাম্বার জাগরণের ও বিস্তারের কথা। প্রভু ব্রহ্মসনাতন হলেন পূর্ণ ৯৬ কলা অবতার। কিন্তু এই অনিত্য ব্রহ্মাণ্ডে যেমন সকল ভৌতিক শরীরধারি সত্য সম্বন্ধে অচেতন আর সেই অচেতনতার কারণেই তারা নিজকে ভিন্ন এক অস্তিত্ব অর্থাৎ আত্ম বলে অবিহিত করেন, তেমনই প্রভুকেও নিজআত্ম ধারণ করে উপস্থিত হতে হয় এই ধরাধামে।

সত্যসম্বন্ধে সচেতন হলে, ব্রহ্মে লীন হয়ে যেতে হয়, কারণ ব্রহ্মই একমাত্র সত্য। তাই যতক্ষণ না সত্য সম্বন্ধে অচেতন হয় কেউ, ততক্ষণ সে আত্মকে ধারণই করেনা। এখানে উপস্থিত সকলে, আর এখানে অনুপস্থিত সকলেও সেই আত্মকে ধারণ করে উপস্থাপন করছে, কারণ আমরা সকলেই সত্য সম্বন্ধে অচেতন। আর যেদিন যেই মুহূর্তে আমাদের সমাধি হবে, এবং আমরা সত্যসচেতন হয়ে উঠে, সত্যকে প্রত্যক্ষ করবো, সেদিন আমাদের এই আত্মের বিনাশ নিশ্চিত, কারণ আমরা আর আত্মকে ধারণ করে নিজের ভিন্ন অস্তিত্বকে ধারণ করবো না।

কেন করবো না? কারণ এই যে আত্মকে ধারণ করে নিজকে ভিন্ন এক অস্তিত্ব বলে দাবি করা, এই সম্পূর্ণ দাবিই এক মিথ্যা কারণ বাস্তবে কনো ভিন্ন অস্তিত্ব সম্ভবই নয়, ব্রহ্ম বিনা। তাই এই ভিন্ন অস্তিত্ব, অর্থাৎ আমিত্ব বা আত্মকে ধারণ করতে হলে, অচেতন হতে হয়, সত্য সম্বন্ধে অচেতন হতে হয়। আর তা কেবল আমাদের জীবকটিদের কথা নয়, স্বয়ং প্রভু, যিনি হলেন সম্যক ভাবে ব্রহ্ম, তাঁকেও এই একই অজ্ঞানতা ধারণ করেই আত্মকে ধারণ করেই দেহ ধারণ করতে হয়।

বিনা অজ্ঞানতা ধারণ করে, দেহধারণ অসম্ভব, তা আমাদের মত জীবকটিদের জন্য হোক, আর প্রভুর মত ঈশ্বরকটির জন্য হোক। ভেদ একটিই, আর তা হলো এই যে, আমরা জীবকটিরা আমাদের অজ্ঞানতা ধারণ করার কথা সম্বন্ধে ভ্রমিত হয়ে গেছি। আর প্রভু স্বেচ্ছায় সেই অজ্ঞানতাকে ধারণ করে দেহধারণ করেন, আমাদেরকে সেই ভ্রান্তির কথা স্মরণ করানোর জন্য, আমাদেরকে পুনরায় জ্ঞান ধারণ করার আহ্বান করার জন্য, আমরা যাতে পুনরায় জ্ঞান ধারণ করে পৃথক অস্তিত্ব ত্যাগ করে সমাধির মাধ্যমে ব্রহ্মে লীন হয়ে মুক্ত হয়ে যাই, সেই আহ্বান জানানোর জন্য।

এইটিই এক ঈশ্বরকটির কর্তব্য হয়, আর এই কর্তব্য পালন করার জন্যই তিনি দেহ ধারণ করেন। দেহ ধারণ করে তাঁর প্রমুখ কাজ হয়, আমাদের জীবকটিদের নির্মিত যেই যেই অভ্যাস বা প্রচলনের কারণে আমরা কিছুতেই জ্ঞান ধারণ করার দিকে অগ্রসর হতে পারছিনা, তাকে চিহ্নিত করা এবং সেই প্রচলনের কারাগার থেকে মুক্ত হবার মার্গ প্রদর্শন করা। কিন্তু তা করার জন্য, প্রথম তাঁকে অর্থাৎ অবতারকে সনাক্ত করতে হয় যে তিনি আমাদের ন্যায় জীবকটি অর্থাৎ দেহের পর দেহব্যাপী অজ্ঞানতা ও আত্ম ধারণ করে থাকা ব্যক্তিত্ব নন, বরং তিনি হলেন ঈশ্বরকটি অর্থাৎ আমাদেরকে মার্গ প্রদর্শন করার জন্য দেহধারি ব্রহ্ম।।

সেই উপলব্ধি করার জন্য এবং উপলব্ধি করে নিজের অন্তরের মেধাকে পূর্ণরূপে পরাচেতনা করে তুলে, সেই পরাচেতনাকে পরাপ্রকৃতি রূপে স্থাপিত করতে হয়। আর প্রভু যেইকালে পূর্ণ ৯৬ কলা অবতার রূপে অবতরণ করেছিলেন, তাই তাঁকে পরাপ্রকৃতি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকলেও হতো না, তাঁকে পূর্ণব্রহ্ম অর্থাৎ তাঁর চেতনাকে পরানিয়তি বা ব্রহ্মময়ী বেশে প্রকাশিত করতেই হতো।

আর সেই যাত্রার কালে, যা তাঁকে করতে হতো তা হলো এই যে, তাঁকে তাঁর সম্পূর্ণ ভাবে ভিন্ন অস্তিত্ব ত্যাগ করতে হতো, অর্থাৎ তাঁর আত্মের নাশ করে, তাঁকে পূর্ণভাবে ব্রহ্মের সাথে একাত্ম হতে হতো, তাঁকে পূর্ণ ভাবে ব্রহ্ম হয়ে উঠতে হতো, তাঁর চেতনাকে পূর্ণভাবে ব্রহ্মময়ী পরানিয়তি করে তুলতে হতো। কৃতান্ত কথার প্রথম খণ্ড, অর্থাৎ সর্বাম্বা কাণ্ড প্রভুর সেই যাত্রার কথাই বলে। সেখানে প্রভু নিজের আত্মকে বিনষ্ট করে, নিজেকে ব্রহ্মরূপে, এবং নিজের চেতনাকে ব্রহ্মময়ী মাতা সর্বাম্বারূপে স্থাপন করেন।

আপনারা যেই যুদ্ধের কথা বলছেন, সেই যুদ্ধ তাই প্রভু স্বয়ং নিজের আত্মের সাথে করেছিলেন, এবং সেই যুদ্ধের শেষে তিনি নিজের চেতনাকে বিশ্বচেতনার সাথে একাকার করে তুলে, মাতা সর্বাম্বাকে প্রকাশ করেন, যিনি স্বয়ং পরাচেতনা, স্বয়ং পরাপ্রকৃতি, এবং স্বয়ং পরানিয়তি অর্থাৎ ব্রহ্মময়ী। তাই আজ যদি মাতা সর্বাম্বা সক্রিয় হন, তাহলে কেবল এক আত্মের বা এক দানবের নাশ হবেনা, সম্যক ব্রহ্মাণ্ডেরই নাশ হয়ে যাবে, কারণ আজ আর তিনি কেবল প্রভুর চেতনা নন, আজ তিনি পূর্ণ ভাবে ব্রহ্মময়ী, পরাসত্য তিনি। তাই তিনি যদি আজ সক্রিয় হন, তাহলে সম্পূর্ণ ভাবে সমস্ত অসত্যের নাশ হয়ে যাবে, বা বলতে পারেন, সম্পূর্ণ ব্রহ্মাণ্ডের নাশ হয়ে যাবে”।

ত্রিগুণ এবার নতজানু হয়ে বসে বললেন, “সত্যই আমরা অজ্ঞানী মা, অজ্ঞানতার প্রতীক আমরা। সেই জন্যই তো আমরা বীর্যের তনু ধারণ করে, তোমাকে বাধ্য করেছি তনুত্যাগ করতে”।

মীনাক্ষী মৃদু হেসে বললেন, “আপনাদের ভ্রম এটি যে, আপনারা মাতাকে তনুত্যাগ করিয়েছেন। মাতা তনুত্যাগ করবেন কি করে! তিনি তো তনু ধারণই করেন নি। তিনি তো সার্বিক ভাবে নিরাকার। বরং তিনি তো তনু ধারণ করেছিলেন, আপনাদের কীর্তির কারণে”।

তমগুণ বিচলিত হয়ে উঠে বললেন, “মানে! এর অর্থ কি?”

মীনাক্ষী পুনরায় হাস্যবেশে বললেন, “মাতা সর্বাম্বা হলেন পূর্ণ ভাবে নিরাকার, এবং স্বয়ং ব্রহ্মময়ী। তাই যেমন বললাম, তিনি যদি সামান্য ভাবেও সক্রিয় হয়ে ওঠেন, তাহলে ব্রহ্মাণ্ডের নাশকে কেউ রধিত করতে পারবেনা। … তাই তিনি ধারণ করলেন এক মানবীয় চেতনা, এবং মানবকে উদ্ধার করার কর্মে রত হলেন। জানেন তাঁর সেই মানবীয় চেতনার নাম কি!”

ত্রিগুণ বিচলিত ভাবে একে অপরের মুখের দিকে তাকালে, মীনাক্ষী হাস্যবেশ বললেন, “তাঁর নাম হলো দেবী সর্বশ্রী, যাকে আপনারা প্রভুর মানসসন্তান বললেন। দিব্যশ্রী তাঁর মানসের নাম, আর সর্বশ্রী হলেন দিব্যশ্রীর চেতনা, যিনি মাতা সর্বাম্বারই অংশপ্রকাশ, যার দ্বারা তিনি মানবকে মার্গদর্শন প্রদানের কর্মে লিপ্ত হয়ে, শ্রীপুরের রচনা করেন। একাধিক চেতনাকে তিনি উদ্বুদ্ধ করে করে, শ্রীপুরের রচনা করেন।

অর্থাৎ, আপনারা যে ভাবছেন যে, আপনারা মাতাকে দেহত্যাগ করতে বাধ্য করেছেন, তা আপনাদের ভ্রম ব্যতীত কিছুই নয়, কারণ যেই মাতাকে আপনারা দেহত্যাগ করানোর কথা বলছেন, তিনি তো কখনো কনো দেহ ধারণই করেননি, তাঁর পক্ষে যে অজ্ঞানতা ধারণ করাই সম্ভব নয়, আর তাই তাঁর পক্ষে দেহধারণ করা অসম্ভব।

তিনি সার্বিক ভাবে নিরাকার, নিরবয়ব। তিনি সার্বিক ভাবে অসীম ও অনন্ত, এবং তিনি কেবল প্রভুর অন্তরে স্থাপিত চেতনা নন, তিনি হলেন পরাচেতনা। তিনি হলেন আমাদের সকলের আরাধ্যা, কারণ তিনি স্বয়ং সত্য। যদি তাঁর তনুধারণের কথা বলেন, তাহলে তাঁর তনু হলেন স্বয়ং প্রভু ব্রহ্মসনাতন। তবে তেমন বলাও সঠিক হবেনা, কারণ প্রভু স্বয়ং মাতা সর্বাম্বা হয়ে তখনই ওঠেন, যখন তিনি সমাধিস্থ থাকেন। অন্য সমস্ত সময়ে তিনি মাতা সর্বাম্বা নন, মাতা সর্বশ্রী হয়ে মাতা সর্বাম্বার উপাসক।

আর তাঁরই শ্রীপুর নির্মাণ করে, মানবজাতির একাংশকে সুরক্ষিত করে রাখার যাত্রার বিবরণ হলো কৃতান্তের দ্বিতীয় কাণ্ড, অর্থাৎ জগদ্ধাত্রেয় কাণ্ড। স্বরূপে তিনি মাতা স্বয়ং, তাই তিনি ভালো করেই জানতেন যে আজকের দিনটি আসছে অর্থাৎ মানব নিজেরই সৃষ্ট ধনের নেশা আর অজ্ঞানতার কারণে ব্রহ্মাণ্ড থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে চলেছে। আর তাই তিনি দেবী সর্বশ্রী হয়ে উপস্থাপন করে, শ্রীপুরের নির্মাণ করেন, এবং কিছু হাতেগোনা মানুষদের সেখানে সুরক্ষিত করেন, যাদেরকে তিনি ধনের নেশা ও অজ্ঞানতার থেকে সুরক্ষিত করে রেখে, মানবজাতির নাশ হবার পরেও রেখে দিয়ে, তাদেরকে দিয়ে পুনরায় মানবজাতির সঞ্চার করতে পারেন”।

সত্ত্বগুণ বললেন, “আর আপনি দেবী? দেবী সর্বশ্রী স্বয়ং মাতার প্রকাশিত চেতনা মানবতার রক্ষার কারণে। তাঁকে সামনে রেখে, মাতা যার উপর বিশ্বাস অর্পণ করে আমাদেরকে জ্ঞান প্রদান করার নির্দেশ দিচ্ছেন, তিনি তো সামান্য কেউ হতে পারেন না! … তাই দেবী, আমাদের প্রশ্ন যে আপনি কে? আপনার বাস্তবিকতা কি? আপনার নিজের পরিচয় প্রদান করুন কৃপা করে। আপনিও নিশ্চয়ই মাতা সর্বাম্বারই কনো এক প্রকাশ, তাই না!”

দেবী সর্বশ্রী হেসে উঠে বললেন, “আবেগতাড়িত হয়ে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া তোমাদের স্বভাব থেকে গেল। বিচার করে দেখো, আমি ও মাতা সর্বাম্বা একসাথে দেহে অবস্থান করিনি কভু। প্রভু ব্রহ্মসনাতন যখন দেহত্যাগ করেন, মাতা সর্বাম্বাকেও আপনারা দেখেন যে তনুত্যাগ করে দিতে। কারণ কি এর? কারণ এই যে, মাতা সর্বাম্বাকে যেই তনু ধারণ করে রাখার সামর্থ্য ধরতো, সেই তনুই হলো প্রভুর তনু। তাই প্রভু তনু ত্যাগ করতেই, আপনারা দেখলেন মাতা সর্বাম্বা দেহত্যাগ করে দিলেন।

আমি কে? প্রভু দেহত্যাগ করার পরেও, মাতা থেকেই গেলেন। কেন? কারণ তিনি তো সত্য। সদাসদার জন্য তিনি শ্রীপূরে নিবাস করার জন্য এবং মানবতায় মুখরিত মানবদের মার্গদর্শন প্রদান করার জন্য থেকে গেলেন তিনি। হ্যাঁ তিনি নিরাকার, তাই নিরাকার ভাবেই থাকলেন, কেবল তাঁর প্রতীক রূপে প্রভুর আরাধনা করা মায়ের পট তাঁর প্রতীকী রূপে থেকে গেল।

আর তিনি তনুত্যাগ করার পরেও শ্রীপুর নির্মাণ হয়নি। সেই অসম্পূর্ণ কাজ করার জন্যই আমাকে তিনি স্থাপিত রেখে গেলেন। আমার কাজ সম্পূর্ণ হয়েছে। শ্রীপুর স্থাপিত হয়েছে। জয়াবিজয়া এই শ্রীপুর নির্মাণের কারিগর আর তারা নিজেদের সাথে তন্ত্রসন্তানদের যুক্ত করে সেই কাজ সম্পন্ন করেছে। তবে আমি সম্পূর্ণ ভাবে প্রভুর মধ্যে লীন হতে পারছিলাম না কারণ আমি তেমন কনো উত্তরসূরি খুঁজে পাচ্ছিলাম না, যার হাতে এই শ্রীপুরের দায়িত্ব অর্পণ করতে পারবো।

মীনাক্ষী হলো সেই উত্তরসূরি। সে এক ভিন্ন মানবের চেতনা, কিন্তু সেই মানব ও তাঁর এই চেতনা পূর্ণভাবে প্রভুর প্রতি অনুগত, প্রভুর পদাঙ্ককে সে হৃদয়ের আহ্লাদ দ্বারা পালন করে, কারণ সে প্রভুকে প্রবল ভাবে প্রেম করে। তাই আমি এবার তার হাতে শ্রীপুরের দায়িত্ব অর্পণ করে চিরতরে প্রভুর মধ্যে লীন হয়ে যাবো, কারণ তিনিই আমার পিতা, তাঁর থেকেই আমার জন্ম, তিনিই আমাকে প্রকাশ করেছিলেন শ্রীপুরের কর্ম সম্পন্ন করে মানবতাকে জীবিত রেখে যেতে, তিনিই আমাকে ক্রিয়াশীল করেছিলেন আজ যখন মানবতার নাশ হবে, তখন যাতে মাতা সর্বাম্বা এই শ্রীপুরের মানবদের রক্ষা করতে বিচলিত না হন, সেই উদ্দেশ্যে। আমার উদ্দেশ্য পূর্ণ হয়েছে, তাই আমার যাবার সময় হয়ে গেছে আর মীনাক্ষী আমার উত্তরসূরি হয়ে এই শ্রীপুরকে যথাযোগ্য করে তুলে, সে তাঁর প্রভুর হৃদয়ে স্থাপিত হয়ে যাবে, আর তারই ইচ্ছা অনুসারে প্রভু তাঁকে প্রতিবার যখন তিনি অবতারতনু ধারণ করবেন, তখন মীনাক্ষীকেও সঙ্গে এনে, তার সাথে লীলা করবেন”।

তমগুণ বললেন, “কৃতান্তের সার তো বুঝলাম। সর্বাম্বা কাণ্ড হলো সেই কাণ্ড যেখানে প্রভু নিজের চেতনা কে পরাচেতনারূপে ব্রহ্মময়ীরূপে স্থাপন করলেন। জগদ্ধাত্রেয় কাণ্ড হলো সেই কাণ্ড যেখানে প্রভু নিজের থেকে এক মানবীয় চেতনার প্রকাশ করে শ্রীপুরের নির্মাণকে নিশ্চয় করেন। আর সর্বশ্রী কাণ্ড হলো সেই কাণ্ড যেখানে মীনাক্ষীর হাতে সেই শ্রীপুরের ভার দেওয়া হলো, এবং মানবতার রক্ষা করা হলো। কিন্তু মানবতার রক্ষা হবে কি করে, যদি এই সবিতাসুরবশ্যাসুর, এই দুই দানবকে দমন না করা যেতে পারে!… মাতা সর্বাম্বা পূর্ণব্রহ্ম। তাই তিনি সক্রিয় হলে সম্পূর্ণ সৃষ্টিই বিনষ্ট হয়ে যাবে, কারণ সৃষ্টি হলো এক মিথ্যা কল্পনা মাত্র। কিন্তু দেবী সর্বশ্রী, আপনি তো এই কর্ম গ্রহণ করতে পারেন। তাই না!”

সর্বশ্রী বিদ্রূপের হাস্য হেসে বললেন, “তোমরা অজ্ঞানতা কি কিছুতেই ত্যাগ করবেনা, এমন সংকল্প নিয়ে রেখেছ? … আমি হলাম এক মানবীয় চেতনপ্রকাশ। আর সবিতাসুর ও বশ্যাসুরকে দমন করা কি কনো মানবীয় কর্ম? … তাহলে তোমরা আমাকে সেই কর্ম করার কথ বলো কি ভাবে?”

ত্রিগুণ এবার ক্রন্দন করে উঠে বললেন, “তাহলে কি ভাবে রক্ষা পাবে, … আমরা অজ্ঞান, আমাদের বোধগম্য হচ্ছেনা, এই অবস্থার নিদান কি ভাবে সম্ভব, সেই উপায় সন্ধান করতে। আমাদের মার্গদর্শন প্রদান করুন। হে দেবী মীনাক্ষী, আপনি মহাত্মা, হে দেবী সর্বশ্রী, আপনি স্বয়ং প্রভুর মানসকন্যা। আমাদের মার্গদর্শন প্রদান করুন। আমরা বচন দিচ্ছি, আমরা শ্রীপুরে প্রবেশ করবো না। আমরা বচন দিচ্ছি যে, আমরা শ্রীপুরে কনো আবেগকেও প্রবেশ করতে দেবনা।

বচন দিচ্ছি আমরা যে, শ্রীপুর সমস্ত ইচ্ছা, চিন্তা ও কল্পনা থেকে সর্বদা সুরক্ষিত থাকবে। যদি তারা স্বয়ং আমাদেরকে, ছায়াদেবীদেরকে অর্থাৎ চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনাকে, এবং আবেগকে আবাহন না করেন, অর্থাৎ যিনি শ্রীপুরের অধ্যক্ষা হবেন, তিনি যদি আমাদেরকে আবাহন করেন, তবেই আমরা সেখানে প্রবেশ করবো। যতক্ষণ না তিনি আবাহন করবেন, আমরা সেখানে প্রবেশ করবো না, এবং তাঁকে আমাদের আবাহন করতে বাধ্যও করবো না। এই আমাদের বচন।

তাই যদি শ্রীপুরের অধ্যক্ষা পূর্ণ ভাবে বিবেক, বিচার ও বৈরাগ্য ধারণ করে থাকেন, এবং সত্যকামী হয়ে পূর্ণ ভাবে মাতা সর্বাম্বার প্রতি ভাবস্থ থাকেন, তাহলে আমরা বচন দিচ্ছি যে, শ্রীপুরে আমরা কেউ কখনো প্রবেশ করবো না। … আমাদের উপর করুণা করুন দেবী। আমাদের মার্গ বলে দিন কৃপা করে”।

দেবী সর্বশ্রী তৃপ্ত ভাবে মীনাক্ষীর দিকে তাকিয়ে থাকলেন, যেন এই বলতে চাইলেন যে মীনাক্ষীর থেকে যোগ্য উত্তরসূরি সম্ভবই নয়, কারণ মীনাক্ষী ততক্ষণ কিছুতেই মার্গদর্শন করলো না ত্রিগুণকে যতক্ষণ না ত্রিগুণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলো। যখন তারা প্রতিশ্রুতিতে নিজেদের আবদ্ধ করে নিলো, তখন মীনাক্ষী শুরু করলেন, “মহাবতার মার্কণ্ড মুনির একটি ব্যখ্যা বলি আপনাদেরকে। জানবেন যে এটিই আপনাদের জন্য মার্গদর্শন। শুনুন মনোযোগ দিয়ে”।

এই বলে মীনাক্ষী বলা শুরু করলেন, “মার্কণ্ডমুনি ব্রহ্মময়ীর বিবরণ দেবার কালে মহিষাসুরের আগমনের কথা বলেন। রম্ভ ও করম্ভ, এই দুই অসুর তপস্যা করতে সচেষ্ট হন, যাদের মধ্যে রম্ভ তমগুণের অর্থাৎ মহাদেবের তপস্যা করে, আর করম্ভ ব্রহ্মার অর্থাৎ সত্ত্বগুণের। তেমন অবস্থায় মানস অর্থাৎ ইন্দ্র করম্ভকে কুমীর রূপে আক্রমণ করে হত্যা করে দেয়। কিন্তু রম্ভ মহাদেবের তপস্যা করার পূর্বে অগ্নির তপস্যা করে বরদান লাভ করেছিলেন। তাই রম্ভকে অগ্নি রক্ষা করে, আর তাই ইন্দ্র তাকে হত্যা করতে পারেনা।

রম্ভ তপস্যাতে সফল হলে, মহাদেব অর্থাৎ তমগুণ আবির্ভূত হন বরদান দেবার জন্য। রম্ভ বরদান রূপে এই কামনা করেন যাতে মহাদেব তাঁর সন্তান হয়, যাতে করে তাঁর সন্তান অমর হয়। মহাদেব অর্থাৎ তমগুণ উত্তরে বলেন, ‘আমি তোমার সন্তান হতে প্রস্তুত, কিন্তু অমর হবো কিনা, তা নির্ভর করছে তোমার সন্তানের কীর্তি। তবে আমাকে সন্তান করে পাবার জন্য যে তোমাকে বিবাহ করতে হবে! আমাকে গর্ভে কে ধারণ করবে? তুমি?’

রম্ভ উত্তরে বললেন, ‘প্রভু, আপনাকে ধারণ করবে যেই স্ত্রী, সেও তো সামান্যা হবেন না। আমাকে বলে দিন কার গর্ভে আপনি অবতরণ করবেন?’

মহাদেব উত্তরে বলেন, আমি অবলুপ্ত হবার পর যেই স্ত্রীকে প্রথম দেখবে, তাকেই বিবাহ করবে। আমি তারই গর্ভে অবতরণ করবো’।

রম্ভ বরদান লাভ করে তৃপ্ত হতে না হতেই এক স্ত্রীকে দেখলেন, এবং তাঁর প্রতি কামাতুরও হলেন। কিন্তু সেই স্ত্রীকে রম্ভ বিবাহপ্রস্তাব দিতেই তিনি পলায়ন করতে সচেষ্ট হন। রম্ভ নিশ্চিত যে, এই স্ত্রীর গর্ভেই তিনি অমর পুত্র লাভ করবেন। তাই তাঁর পিছনে ধাবিত হয়ে যখন সেই স্ত্রীকে ধরে ফেলে, তাকে সঙ্গমে লিপ্ত হতে বাধ্য করে, তখন সেই স্ত্রী আর্তনাদ করে উঠলেন এই বলে যে, ‘কি করলেন আপনি স্বামী! আমার যে অভিশাপ ছিল, আমি স্ত্রী হবার মুহূর্তে মহিষী হয়ে যাবো। আমাকে যে এবার মহিষী হয়ে যেতে হবে’।

বলাও যেমনি, মহিষী হয়ে যাওয়াও তেমনি। আর সে মহিষী হয়, তাই তাঁর পরিচয় অনুসারে তাঁর পুত্র, যিনি স্বয়ং তমগুণ, অর্থাৎ মহাদেবের অবতার, তিনি হলেন মহিষাসুর। স্বয়ং মহাদেব। তাই প্রবল বলশালী সে, আর তার ভয়ঙ্কর শক্তির সম্মুখে সমস্ত দেব অসহায় হয়ে পরলেন। আর শুধু দেবই নয়, স্বয়ং ত্রিদেব অর্থাৎ ত্রিগুণও অসহায় হয়ে গেলেন মহিষাসুরের কাছে।

আর তাই অবশেষে তাঁরা সকলে মিলে ব্রহ্মময়ী মায়ের সম্মুখে উপস্থিত হয়ে, ব্যাকুল ভাবে তাঁর আবাহন করলেন। অতি ব্যকুল আবাহন শুনে, মাতা যখন তাঁদের আবাহনে সারা দিয়ে নিজের কণ্ঠস্বর প্রদান করলেন, তখন ঠিক আপনারা আজ যেমন ভাবে বলছেন মাতার উদ্দেশ্যে, তেমন ভাবেই মাতার কাছে বলেছিলেন, তাঁদের মহিষাসুরের থেকে রক্ষাকরার জন্য।

আর যেমন ভাবে মাতা আপনাদেরকে বলছেন যে তিনি হলেন ব্রহ্ম, আর তাই তিনি যদি সক্রিয় হয়ে উঠে ব্রহ্মময়ী হয়ে যান, তাহলে না বাঁচবে দেব, না অসুর, আর না কনো লোক, আর না কনো ব্রহ্মাণ্ড। দেবতারা আপনাদের মত করেই চিন্তিত হয়ে উঠে প্রশ্ন করেছিলেন, যে উপায় কি।

উত্তরে মাতা বলেছিলেন, ‘তোমরা এক কাজ করতে পারো। আমি আমার এক চেতনাপ্রকাশকে স্থপন করতে পারি। কিন্তু তোমাদেরকে তোমাদের সমস্ত গুণদ্বারা সেই চেতনাপ্রকাশকে সজ্জিত করে দিতে হবে। যদি এমন করতে পারো তাহলে মহিষাসুর দমনও হবে, অথচ ব্রহ্মাণ্ডও রক্ষা পেয়ে যাবে’। … সেই কথন অনুসারে, নিজের থেকে এক মহাদিব্য চেতনাপ্রকাশকে মুক্ত করেন, আর দেবরা তাঁকে নিজেদের অস্ত্রদ্বারা সুসজ্জিত করে তাঁকে মাতা দুর্গা নামে অবিহিত করেছিলেন”।

ত্রিগুণ এবার হাস্যমুখে বললেন, “বুঝে গেছি দেবী। মার্গ প্রদান করার জন্য ধন্যবাদ”।

এবার মাতা সর্বাম্বার উদ্দেশ্যে বললেন তাঁরা, “কৃপা করো মা। আমাদের সম্মুখে তোমার এক অনন্ত চেতনাপ্রকাশ প্রদান কর। যদি তুমি বলো, আমরা তাঁকে আমাদের অস্ত্রদ্বারা সজ্জিত করতে প্রস্তুত”।

মাতা সর্বাম্বা পুনরায় এক অট্টহাস্য প্রদান করে বললেন, “তার প্রয়োজন হবেনা। আমার এই চেতনা প্রকাশের অন্য কনো অস্ত্রের প্রয়োজন নেই। মুক্ত হস্তেই সে প্রলয়ঙ্করী। … তোমরা ফিরে যাও। আমার চেতনা প্রকাশ যথাসময়ে যথাস্থানে উপস্থিত হয়ে যাবে”। ত্রিগুণ এবার সন্তুষ্ট হয়ে প্রত্যাবর্তন করলেন।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28