২৪.৩। প্রাগান্তপ্রজ্ঞা পর্ব
মীনাক্ষী জিজ্ঞাসু হয়ে খানিক মাতা সর্বাম্বার নিকটে এগিয়ে গিয়ে বললেন, “মা, আমার একটি জিজ্ঞাস্য আছে। আচ্ছা মা, মৃষুকেই কি জগত গজানন বলে থাকেন! … না, এমনি কৌতূহল নয় আমার। আমি উনাকে দেখেছি। তোমাকে স্নেহ আমরা এখানে সকলেই করি, কিন্তু তাঁর স্নেহ সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল। তাঁর বিশ্বাস আমি দেখেছি, আর তা দেখার পর আমার নিজের বিশ্বাসের প্রশংসা শুনলে লজ্জা লাগে।
তাঁর তোমার জন্য জীবন উৎসর্গ করা দেখেছি, আর তার সাথে এও দেখেছি যে তিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেও নিরহঙ্কার, বরং তাঁর ভাব এই ছিল যে, তিনি নিজের জীবন তোমার কাছে উৎসর্গ করতে পেরে, আর তার থেকেও বড় কথা তুমি তাঁর উৎসর্গিত জীবনকে গ্রহণ করে তাঁকে ধন্য করে দিয়েছ। … আমি তাঁকে দেখেছি মা, খুব কাছ থেকে দেখেছি। দেখেছি যে তিনি নিজেকে ভক্ত বলতেও অনীহা প্রকট করতেন, জ্ঞানী বলতেও।
ভক্ত বললেই, তিনি উগ্র হয়ে উঠে বলতেন, ‘ভক্তের কাছে আমার মা আর মা থাকেনা, ভগবান হয়ে যায়। জ্ঞানীর কাছে আমার মা আর মা থাকেনা, ব্রহ্ম হয়ে যায়। উনি আমার মা, শুধুই মা’। কেউ উনাকে যদি প্রশ্ন করতেন, ‘তুমি কার ভক্ত’, তাহলে উত্তরে বলতেন, ‘আমার মায়ের’। তিনি বলতেন, মা জগদ্ধাত্রী উনার মা নন, পিতা, আর মা হলে তুমি।
উনার বিশ্বাস দেখেছি, মা যা করবেন, সেটিই সঠিক, সেটিই হবে, সেটিই শ্রেষ্ঠ। শুধু মুখের কথা ছিল না মা, সার্বিক ভাবে জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে, এটিই তাঁর কাছে ভাস্মর সত্য ছিল। তা দেখে, আমারও ইচ্ছা হয়েছিল, আমিও এমন হবো। কিন্তু হয়েও হতে পারি নি। কখনো না কখনো আমার কর্তাভাব প্রকাশ্যে এসেই যেত। কিন্তু উনাকে দেখেছি, উনার কর্তা ভাব বলে যেন কিছু নেই-ই। সর্বক্ষণ মা এই পথ দেখিয়েছে, মানে এই পথেই যেতে হবে।
কেউ কেউ উনার এই আচরণে বিরক্ত হয়েও উঠতেন আর বলতেন, ‘তোমার নিজেস্ব কনো মতামত নেই নাকি!’ … উনি উত্তরে হেসে বলতেন, ‘আমার বোধশক্তি কতখানি যে মতামত দেব! কারুর ভালো করতে গেলে, কারুর ক্ষতি করে ফেলবো। মা সর্বব্যাপী, তিনি সকলের মা। সকলের হিত চিন্তা করেন সর্বক্ষণ। তাই উনি যেই উপায় বলবেন, তাতে সকলের উপকার হবে’।
সর্বক্ষণ, সর্বকিছুতে, সর্বসিদ্ধান্তে, কেবলই মা। অপমানিত হলেও বলতেন, ‘বড্ড বাড়ছিলাম মনে হয়, তাই মা দমিয়ে দিতে অপমান করালো’, সম্মানিত করলেও বলতেন, ‘সঠিক পথে যাচ্ছি, তাই মা সম্মান দিয়ে এগিয়ে যেতে বললো’। মানে কি বলবো মা, অদ্ভুত ছিল তাঁর সারল্য। সরল শিশুর মত বিশ্বাস। তুমি উনার কাছে সর্বস্ব কিছু। জগতও তুমি, সত্যও তুমি, জীবনও তুমি, প্রাণও তুমি। তোমার জন্যই যেন জীবিত থাকেন উনি, তোমার জন্যই যেন উনার প্রতিটি শ্বাস!
এতো নিষ্ঠা, এতো বিশ্বাস, এতো প্রেম, নিজের পৃথক অস্তিত্ব নিয়ে কাঁদতেন, আর বিশ্রাম নিতে বললেই উগ্রস্বরে বলতেন, ‘মায়ের থেকে আলাদা হয়েছি, বিশ্রাম করার জন্য! … মা হাপিত্যেশ করে বসে রয়েছেন আমি বিশ্রাম নেব বলে!… এখানের কাজ তাড়াতাড়ি শেষ করে, মায়ের কাছে ফিরতে হবে। মা সেখানে একাকী বসে রয়েছে। এখানে অহেতুক সময় কাটাতে পারবো না’।
সত্যি বলছি মা, তোমাকে আমরা সকলেই মা বলে ডাকি। কিন্তু মা বলে ডাকা, আর মা বলেই মানা, এই দুইয়ের অন্তর আমার কাছে অন্তত দিনের আলোর মত জ্বলজ্বল করে, কারণ আমি প্রভুকে দেখেছি। তাঁর কাছে তুমি কেবল ডাকের কারণে মা ছিলেনা। তুমি ঈশ্বর তিনি জানতেন, তুমিই ব্রহ্ম তাও তিনি জানতেন, তুমিই পরমেশ্বরী সেই ব্যাপারেও উনার কনো সংশয় ছিলনা। কিন্তু সমস্ত কিছু জেনেও যেন অজ্ঞানী তিনি, কারণ তুমি তাঁর কাছে সত্য সত্য মা ছিলে। জন্মদাত্রী মা ছিলেন তাঁর কাছে পালিতা মা, যাকে তুমি পালন করার দায়িত্ব দিয়েছ, কিন্তু সত্য সত্য মা এক ও একমাত্র তুমি।
এবার তুমি বলো মা, এই অঙ্গিকার, এই বিশ্বাস, এই মাতৃপ্রেম বললে, কার কথা স্মরণ আসে! তিনি বলতেনও, গণেশ আর মায়ের মধ্যে ভেদ কি! মার্কণ্ডজির কথাকে ভালো করে নিরীক্ষণ করো। মায়ের অঙ্গের মল থেকে নির্মিত গণেশ। এবার বলো তাঁদের মধ্যে কনো ভেদ আছে! … তিনি বলতেন, ‘মার্কণ্ডজির রসিকতা অদ্ভুত। শিবের স্ত্রীলিঙ্গ শিবানী, নারায়ণের স্ত্রীলিঙ্গ নারায়ণী, ব্রহ্মার স্ত্রীলিঙ্গ ব্রহ্মাণী, ইন্দ্রের স্ত্রীলিঙ্গ ইন্দ্রাণী, সেই কথা অনুসারে সিদ্ধিদাতার স্ত্রীলিঙ্গ কে হয়! সিদ্ধিদাত্রী, তাই না! … উনার রসিকতা দেখ, সিদ্ধিদাতা হলেন গণেশ, আর সিদ্ধিদাত্রী হলেন মা। বুঝিয়ে দিলেন, মা-ছেলের মধ্যে কনো ভেদই নেই’।
তাই মা, আমার বারবার মনে হতো। আর আজ যখন তোমার থেকে জানলাম যে সমস্ত অবতার স্বয়ং মৃষু, তাই প্রশ্ন আসছে মনে, আমরা যাকে গণেশ বলি, তিনিই কি মৃষু!”
মাতা সর্বাম্বা হেসে বললেন, “তোরা কাকে গণেশ বলিস, তা আমি ঠিক ভাবে জানিনা। পার্বতীপুত্রকে গণেশ বলিস নাকি বিঘ্নহর্তাকে, তা আমি সঠিক ভাবে জানিনা। তবে হ্যাঁ, যদি আমাকে বলতে বলিস যে আমার গণেশ কে, তাহলে আমি মৃষুই বলবো। সে আমার অঙ্গজাত সন্তান, আর হ্যাঁ, সে সেই সন্তান যার সাথে আমার সত্য অর্থে কনো ভেদই নেই। … যখন সে দেহ ধারণ করে তখন আমার থেকেই পৃথক হয়ে গিয়ে সে দেহ ধরে, আর দেহত্যাগ করলে, কনোদিকে না তাকিয়ে আমার কাছে ফিরে আসে।
তোদের যম তাঁর দিকে তাকাতেও ভয় পায়, তাকে আটকে রাখা তো অনেক পরের ব্যাপার। তোর হয়তো স্মরণ নেই মীনাক্ষী, বা হয়তো স্মরণ আছে যে, যখন তুই বায়সী রূপ ত্যাগ করেছিলি, তোকে যম কনো দূত মারফত নয়, স্বয়ং এসে নিয়ে গেছিল, আর তোকে একটিই প্রশ্ন বারবার করেছিল, প্রভু কি বলেছেন, তা আমাকে বলো। … বারবার সে তোকে বলেছিল, যেই প্রভুর থেকে বচন শোনার অধিকার বা সামর্থ্য তো আমারও নেই, সেই প্রভুর থেকে বচন শুনে এসেছ তুমি। তাই আমার উপর দয়া করে কিছু বলো”।
মীনাক্ষী হেসে বললেন, “তোমার করুণার কারণে স্মরণ আছে মা। আমি কপটতাও করেছিলাম তাঁর সাথে। বলেছিলাম, ‘বলবো যদি আমাকে পরের দেহটি মানবের দেহ দাও’। … তিনি নিশ্চিত করেছিলেন, আর তাই আজ আমি সেই মানবের চেতনারূপে মীনাক্ষী। … তবে আমার কপটতার কর্মফলও আমাকে ভোগ করতে হতো। তাই আমি জন্মের পরেপরেই পিতামাতা হারিয়েছি। তবে প্রভু যেমন বলতেন, মানলে বরদান, আর না মানলে অভিশাপ। … এই কর্মফল আমার অভিশাপ ছিলনা, বরদানই ছিল, কারণ পালিত মাতাপিতাকে হারিয়ে, কেবল ও কেবল তোমাকে স্মরণ করতে পেরেছি, আর তোমার অঙ্গজাত সন্তান, আমার প্রভুর স্মরণ করতে থেকেছি, যা নিশ্চিত ভাবে পালিত মাতাপিতা থাকলে পারতাম না”।
সর্বশ্রী প্রশ্ন করলেন, “এই যম কে মা! … যম বা যমদূত কি সত্যই আছেন?”
মাতা সর্বাম্বা হেসে বললেন, “হ্যাঁ আছেন। ধরিত্রীর কাছে বাকি সমস্ত ধরাখণ্ডের সূক্ষ্মরূপ যারা জরো হয়েছিল, তারাই সমস্ত যোনিরূপে প্রকাশিত হয়। আর তাঁদের মধ্যেই একসূক্ষ্মপ্রকাশ অবস্থান করে, যে সকল যোনির মধ্যে স্থিত সকল পঞ্চভূতের বিচার করে, তারা কতটা ভাবে মেধাকে চেতনার স্তরে উন্নীত করতে পেরেছে সেই নিরিখে। সেই সূক্ষ্ম বিচারক হলেন যম, আর তাঁর হস্তক্ষেপেই সকল জীব পরবর্তী দেহাদি লাভ করতে থাকে, নিজেদের কর্মের ফলস্বরূপ; কর্ম করা থেকে কর্মফলের নির্মাণ হওয়া পর্যন্ত এবং সেই কর্মফলের থেকে অভিজ্ঞতা লাভ করা পর্যন্ত ব্যপ্ত কাল অনুসারে। তাই যম আছে, আর সে অত্যন্ত ভাবে আমার প্রতি নিষ্ঠ এবং প্রবল ভাবে সমস্ত জীবকে আমার কোলে ফিরিয়ে দিতে সদাব্যস্ত”।
বিজয়া বললেন, “এবার বলো মা, মৃষুর রোমাঞ্চকর যাত্রার পরবর্তী অধ্যায়ের কথা বলো আমাদের”।
মাতা সর্বাম্বা হেসে বলতে শুরু করলেন, “জম্বুদেশের বাইরে আর্যরা মহম্মদ ও ঈশার থেকে বড়সড় ধাক্কা খেয়ে সরে গিয়ে অরাজগতার চরমে উন্নীত হতে শুরু করলে, সেখান থেকে এক গ্রিক গোষ্ঠী জম্বুদেশের দিকে নজর দেওয়া শুরু করে, এবং অঙ্গিকার করে যে, জম্বুদেশ তথা চৈনক অর্থাৎ বর্তমান চীনকে অধিগ্রহণ না করলে, কিছুতেই তারা সমস্ত জগতের অধিপতি হতে পারবেনা। এমন বিচার করে জম্বুদেশকে অধিগ্রহণ করার পরিকল্পনা করে।
অন্যদিকে, ব্যাসের জয়া মহাভারত রূপে সম্মুখে আসতে, সমস্ত জনপ্রিয়তা সে একাকী ছিনিয়ে নিতে থাকলে, ক্রমে এই দেশের নামই জম্বুদেশ থেকে পরিবর্তিত হয়ে ভারত হয়ে যায়। কিন্তু যতই আর্যরা ব্যাসের সমস্ত লিখনিকে পরিবর্তিত করে করে তাদেরকে আর্যগ্রন্থ রূপে স্থাপন করা শুরু করুক, তবুও বঙ্গ, মগধ ও উৎকল নিয়ে তাঁরা চিন্তিত হয়ে উঠতে থাকে। বঙ্গের তন্ত্র, মগধের বৌদ্ধ ও জৈন ব্যপ্তি, এবং উৎকলের বাল্মীকি ব্যাসের বিস্তার তাদেরকে বিশেষ ভাবে আঘাত করে, আর এই বুঝিয়ে দেয় যে এতো সহজে এই দেশে আধিপত্য স্থাপন সম্ভব নয়।
কন্দম-প্রণোদিত আর্যসমাজ, আর বঙ্গ, মগধ তথা উৎকল হলো পূর্ণভাবে মানবদের আধিপত্যে স্থাপিত অঞ্চল, যেখানে সামান্যও মিশেল নেই কন্দমদের। পূর্ণ সপ্তলোকের বিকাশ প্রাপ্ত যোনির উত্তাপ আর্যদের বেশ বেগ দেওয়া শুরু করলে, তারা দেখলো যে, যেই সময়ে তারা মধ্যভারতের ও উত্তর ভারতের গুহায় আত্মগোপন করেছিল, সেই সময়ের অন্তরালে নন্দযুগ শুরু হয়ে গিয়ে, তাদের সমস্ত স্থান অর্থাৎ কাশি তথা সিন্ধু অঞ্চলকেও অধিকার করে ফেলেছে।
তাই এবার তারা এক নূতন কৌশল নির্মাণ করার প্রয়াস করলো। তারা এবার মৌর্যগোত্রের উত্থানের প্রয়াস করা শুরু করলো। মৌর্যগোত্র হলো নন্দের সিপাহীদের এক প্রধান গোত্র। কিন্তু তাদের সেনাপতি পরাজিত ও নিহত হলে, তাঁর ঔরসে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে আত্মসাৎ করার প্রয়াস করে ধনানন্দ। সেই স্ত্রীর ভ্রাতারা তাঁদের ভগিনীকে লুকিয়ে রাখলো এক গোশালায়। আর আর্যরা ঠিক এই সুযোগেরই অপেক্ষাতে ছিল।
আর্যদের মধ্যে সার্বিক ভাবে বিদ্যান যিনি, তেমন এক ব্রাহ্মণকে প্রেরণ করলেন এই স্ত্রীর সন্তানকে উদ্ধার করতে। সেই বিদ্যান ও প্রচণ্ড পরিমাণে ধূর্ত আর্য হলেন কৌটিল্য যিনি চাণক্য নামে পরে পরিচিত হন, আর সেই মৌর্য সন্তানের নাম হলো চন্দ্রগুপ্ত।
চন্দ্রগুপ্তকে ক্ষত্রিয়ত্বের সমস্ত কৌশল প্রদান করে বড় করলেন চাণক্য, এবং উচিত সময়ে, দয়ানন্দের সেনাতে সামিল করে, মৌর্যদের সাথে নন্দদের যুদ্ধে রত করে, সেই যুদ্ধের কালে যখন রাজপুর সেনারোহিত প্রায়, সেই শূন্যতাকে কাজে লাগিয়ে চৌর্যতার সাথে চন্দ্রগুপ্তকে দিয়ে দয়ানন্দের হত্যা করিয়ে নন্দগোষ্ঠীর রাজত্বের নাশ করালেন চাণক্য।
চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যকে সিংহাসনে স্থাপন তো করালেন, কিন্তু বকলমে সম্যক রাজ্য চালনা করলেন চাণক্য ওরফে আর্যসমাজ। প্রায় সম্যক ভারতকে অধিগ্রহণ করে নিলেন, পূর্বের বঙ্গের তন্ত্রক্ষেত্রকে ও দক্ষিণের দ্রাবিড় অঞ্চলকে ব্যতি রেখে। আধিপত্য স্থাপিত রাখার জন্য, বনাঞ্চল কেটে, শস্যের চাষ শুরু করালেন চাণক্য, এবং সকল বৈশ্যদের কৃষি কর্মে স্থিত করে, সেই শস্যের বাণিজ্য করালেন ক্ষত্রিয়দের নিম্নশ্রেণীকে দিয়ে।
সেই থেকে বৈশ্যদের আর বৈশ্য বলা বন্ধ হয়ে গেল এবং তাদেরকে শূদ্র বলা শুরু হয়ে গেল, যাদেরকে ক্ষত্রিয় ও ব্রাহ্মণদের দাস রূপে চিহ্নিত করা শুরু হয়। আর ক্ষত্রিয়দের সেই নিম্নকুল, যাদেরকে সরাসরি এই শূদ্রদের শোষণের ভার সঁপা হয়, তাদেরকে বৈশ্য বলা হতে শুরু হলো। এই বৈশ্যরা শূদ্রদের দিয়ে কৃষি কর্ম ও অন্যান্য কর্ম যেমন বস্ত্র নির্মাণ, আসবাব নির্মাণ করাতে লাগলেন স্বল্প ধন প্রদান করে করে, এবং দারিদ্রতায় ক্লিষ্ট করা শুরু করলেন শূদ্রদেরকে। এবং একই সাথে সেই উদ্ধার করা ধনের থেকে কর প্রদান করতে থাকলেন রাজাকে, এবং সেবা প্রদান করতে থাকলেন ব্রাহ্মণকে।
আর এই ভাবে চতুর্বর্ণের নির্মাণ হয়। বুঝতেই পারছো, ব্যাস যখন জয়া লিখেছিলেন, তখনও চতুর্বর্ণ নির্মাণই হয়নি। তাই জয়াতে চতুর্বর্ণের কনো উল্লেখ থাকতেই পারেনা। উগ্রসভা এই কালেই মহাভারতের রচনা করেন জয়ার সাথে আরো ৪০ হাজার শ্লোক যুক্ত করে, আর যেহেতু এই কালেই চতুর্বর্ণের নির্মাণ হয়, তাই মহাভারত তথা আর্যপ্রণোদিত সমস্ত ব্যাসের পুরাণে চতুর্বর্ণ শব্দের উল্লেখ পাওয়া যায়।
বিপুল পরিমাণ শস্য উৎপাদন করে, সেই শস্য ভারত তথা সমস্ত মানবসমাজে বিস্তৃত করে করে, বিপুল পরিমাণ ধনের সঞ্চয় করেন চন্দ্রগুপ্ত কৌটিল্যের পরামর্শ অনুসারে আর তাই ভারতকে সেই সময়ে স্বর্ণপক্ষী বলা হতো। আর সেই স্বর্ণপক্ষীর উপর নজর পরে গ্রিকদের। তাই তারা ভারত আক্রমণ করে, কিন্তু কৌটিল্যের কূট বুদ্ধির কাছে, তারা পরাজিত হয়, আর তেমন হলে, সেলিউকাস পুত্রী হেলেনাকে চন্দ্রগুপ্তের সাথে বিবাহ দেওয়া হয়, এবং গ্রিক বা যবনদের সাথে সন্ধি করে আর্যশক্তি আরো বিস্তৃত হয়ে ওঠে।
এই যবনরাই বৈদিক আর্যদের সিন্ধুনদীর উপত্যকায় বিরাজ করা হিন্দু বলে আখ্যা দেন, আর হিন্দু নামক আঞ্চলিক জাতির বিস্তার হয়। চন্দ্রগুপ্তের দুই স্ত্রী, ধনানন্দপুত্রী নন্দিনী এবং সেলিউকাসপুত্রী হেলেনা, কিন্তু দুইজনেই সন্তানের জননী হতে পারেন না। তাই দুর্ধরা নামক এক কন্যার সাথে চাণক্য বিবাহ দেন চন্দ্রগুপ্তকে, এবং দুর্ধরা চন্দ্রগুপ্তের ঔরসে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে ওঠেন।
কিন্তু চাণক্যের বরাবরের ভয় থাকে যে ধনানন্দকে অন্যায় ভাবে হত্যা করা হয়েছিল চন্দ্রগুপ্ত দ্বারা, তাই ধনানন্দ কন্যা নন্দিনী চন্দ্রগুপ্তকে হত্যা করার প্রয়াস করবেন। সেই ভয় থেকে, এবং নিজের সমস্ত পরিকল্পনা যাতে বানচাল না হয়ে যায়, সেই ভয় থেকে, চাণক্য প্রতিদিন চন্দ্রগুপ্তকে একটু করে বিষ প্রদান করতেন, যাতে বিষপান চন্দ্রগুপ্তের সহজাত হয়ে যায় আর বিষ তার কনো ক্ষতি করতে না পারে।
কিন্তু চাণক্যের অনুমান সম্পূর্ণ ভাবে ভ্রান্ত হয়, আর তার গণনাও, সঙ্গে ভীতিও। প্রকৃতপক্ষে কর্মফলের দংশনই চাণক্যের কাল হয়। তাই একদিন চন্দ্রগুপ্তকে প্রদান করা বিষ গ্রহণ করে দুর্ধরা, আর সন্তানের জন্ম দিয়ে তিনি মৃত্যু লাভ করেন, এবং সেই সন্তান, বিন্দুসারকে বড় করেন নন্দিনী। আর চাণক্য নিজের কর্মফলও লাভ করেন বিন্দুসারের থেকে, কারণ চন্দ্রগুপ্ত যখন বিন্দুসারকে রাজসিংহাসন সঁপে জৈনসন্ন্যাসী হয়ে যান, তখন বিন্দুসার চাণক্যকে বন্দী করে, তাকে সেই বিষপান করতে বাধ্য করে, যেই বিষের কারণে সে মাতৃহারা হয়েছিল, আর এই ভাবে মহা-অসুর চাণক্যের বিনাশ নিশ্চয় করে বিন্দুসার।
এই চাণক্যই ছিলেন অর্থনীতির রচয়িতা, আর শুধু তাই নয়, প্রকৃতিকে বিনষ্ট করে, সেই প্রকৃতিকে নিজের করমধ্যে স্থাপনের ইন্ধন তিনিই প্রদান করেছিলেন মানবযোনিকে। বনজঙ্গল নষ্ট করে, ফলমূল ও শিকারের উপর জীবনধারণ করা সাধারণ মনুষ্যস্বভাবকে নষ্ট করে, শস্যগ্রহণের ইন্ধন প্রদানকারী এই চাণক্য সমস্ত মানবজাতিকে পরগাছা করে দেন ধনের কাছে, এবং আজ যেই ভাবে সমস্ত মানবযোনিকে ধনের কাছে পরাধীন দেখছো, যেই পরাধীনতার কারণে মানবযোনি অবলুপ্তির পথে চালিত, যেই ধনের কাছে পরাধীনতার থেকে মুক্ত হবার কথা তোমাদের প্রভু ব্রহ্মসনাতন বলতেন তোমাদেরকে, যেই ধনের পরাধীনতার থেকে মুক্ত না হতে পারার জন্য আমি খুব শীঘ্রই সমস্ত মানবকুলের ও সভ্যতার বিনাশ করবো, সেই ধনের কাছে পরাধীনতার অঙ্কুশ স্থাপক হলেন এই মহা-অসুর, সম্পূর্ণ মানবজাতির শত্রু চাণক্য।
তারই বিনাশ করে বিন্দুসার পুনরায় মানবযোনিকে উদ্ধার করার প্রয়াস করলেও, পরে তিনিও দুর্বল হয়ে ওঠেন এই ধনের প্রতি, আর তাই তাঁর পুত্র অশোক তাঁকে বন্দী করে সিংহাসনে আঢ়ুর হন। আর্যরা সমস্ত উৎকলকে আর্যভূমি করে তুলেছিলেন, আর সেখানের আদিবাসীরা আর্যদের কাছে সমর্পণ করেছিলেন। সেই আক্রোশে যেখান যেখানের আদিবাসীরা আর্যদের কাছে সমর্পণ করেছিলেন, তাদেরকে হত্যা করে জগতকে আর্যশূন্য করে দিতে আগ্রহী হন অশোক।
প্রবল আগ্রাসী, ভয়ানক অশোকের দাপট দেখে, আর্যরা পুনরায় গুহাবন্দী হওয়া শুরু করলে, তাঁদের অনুরোধেই চন্দ্রগুপ্তের শিষ্য, আজিবক অশোককে শান্ত করতে সম্মুখে আসেন, এবং বুদ্ধের মহিমাদ্বারা অশোককে উদ্বুদ্ধ করে তোলেন।
উদ্বুদ্ধ অশোক তারপর থেকে যুদ্ধ আর করলেন না। ৮০ হাজার বৌদ্ধ স্তূপ স্থাপন করে সম্পূর্ণ ভারতকে বৌদ্ধদেশ রূপে সমস্ত বিশ্বের দরবারে স্থাপিত করলেন। আর সঙ্গে সঙ্গে নিপীড়িত শূদ্রদের পাশে দাঁড়িয়ে, তাঁদের কর্মের ভিত্তিতে তাঁদের বিবিধ নামকরণ করে করে, তাঁদেরকে সমাজে স্থাপিত করে চাণক্যের নির্মিত ধনতন্ত্রকে বিনষ্ট করে অর্থনৈতিক ভারসাম্য স্থাপন করলেন ভারতে, এবং তাই মহানরাজা অশোক নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন তিনি।
তাঁর প্রতাপ অত্যন্ত ব্যাপক ভাবে আর্যদের ক্ষতিসাধন করেছিল, সেটা বলাই বাহুল্য। বাংলায় যেমন শশাঙ্ক এগিয়ে এসে, সমস্ত আদি জম্বুদেশবাসীদের একত্রিত করে, মগধ, বঙ্গ তথা উৎকলকে নিয়ে গৌড় রাজ্য গড়ে তুলে তাকে বৌদ্ধ তন্ত্র ক্ষেত্র করে তোলেন, তেমনই পাল, সেন, গুপ্ত, বর্ধন, কেকয়, পল্লভ, ইত্যাদি সকল বৌদ্ধগোষ্ঠীরা সম্যক ভারতকে অধিগ্রহণ করে নিয়ে সমৃদ্ধ দেশ রূপে স্থাপিত করে তোলেন ভারতকে।
কিন্তু এই সমৃদ্ধি যে আর্যদের অহংকারে আঘাত করে! আর্যরা তো সমৃদ্ধি পছন্দই করেন না, অর্থাৎ তারা কেবল নিজের সমৃদ্ধি পছন্দ করেন, জাতির নয়, দেশের নয়। এটিই তাঁদের স্বভাব। এই স্বভাবের কারণেই কন্দমদের বিনাশের আবেদন করেছিলেন স্বয়ং ধরিত্রী, আর কন্দমদের সাথে মিশ্রণের ফলে জাত আর্যদের মধ্যে এই স্বভাব অত্যন্ত ব্যাপক ভাবে স্পষ্ট ছিল।
তাই এই সমৃদ্ধির নাশ করতে, রাজপুতদের পুনরত্থান করায় আর্যরা, আর তাদের দিয়ে বিভিন্ন বৌদ্ধরাজ্যদের বিনাশ করে করে, সেখানের সমস্ত বৌদ্ধ শিলাকে হয় শিবলিঙ্গ, নয় নারায়ণশিলা বলে প্রচার করা শুরু করলো আর্যরা। এই ভয়ঙ্কর আগ্রাসনের অন্ত করতে তাই আবারও মৃষুকে প্রকট হতে হলো, আর তিনি এবার প্রকাশিত হলেন শঙ্কর নামে, যার নাম পরে শঙ্করাচার্য হয়ে ওঠে।
উপনিষদ ধারণ করে অদ্বৈত বেদান্ত স্থাপন করে, নিরাকর তত্ত্বের পুনরায় প্রচার করে করে, শঙ্কর আর্যদের দাপটকে রুদ্ধ করলে, ভারতের সমৃদ্ধি এবার ডেকে আনে পাঠানদের। পাঠানরা হলেন সেই দেশের অধিবাসী, যেই দেশ থেকে আর্যদের এককালে ত্যাগ করা হয়েছিল। তাই পাঠানদের দেখা মাত্রই আর্যরা গুটিয়ে গেলেন আসতে আসতে। কিন্তু সেই অবগুণ্ঠনের ফলে পাঠানদের এই ভারতে উত্থান সহজ হয়ে যায়।
তাই তাদের আটকাতে, আর্যরা রাজপুতদের বারংবার উত্তপ্ত করতে থাকলে, এবার মোঘলরা ভারত আক্রমণ করে, এবং রাজপুতদের সাথে সংঘর্ষে নিযুক্ত হয়ে যায়। অবিরাম সংঘর্ষের ফলে, ক্রমশ রাজপুতরা দুর্বল হতে থাকে, এবং একসময়ে আর্যরা ধরাশায়ী হয়ে যায় মোঘলদের কাছে। কিন্তু এই মোঘলশাসনও এক সময়ের পর থেকে জনদরদ থেকে বিমুখ হয়ে উঠলে, প্রথমে শিখদের উত্থান ঘটে, এবং পরে আর্যরা আবারও মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে শিবাজি রূপে।
কিন্তু এই ঘটনার পূর্বে, ইউরোপে একটি ঘটনা হয়ে যায়, তাই শিবাজির এই উত্থানকে আর্যরা নিজেদের উত্থান বলে আর চিহ্নিত করতে পারেনা। ইউরোপের পশ্চিমাঞ্চলে, যেখানে আর্যরা সকলে পলাতক হয়েছিল ঈশা ও মহম্মদের উত্থানের কারণে, সেখানে উপস্থিত হয়ে চূড়ান্ত ধারায় যুদ্ধে মেতে থাকার কারণে এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেছিল ধরিত্রী যে, সেই স্থানকে প্রায় এক শত বৎসরের জন্য বরফের তলে নিমজ্জিত করে রেখেছিল।
খাদ্যের অভাব ও পানীয় জলের অভাবে অসংখ্য কন্দম-প্রণোদিত মানুষের সেখানে হতাহত হলে, ব্রিটিশরাও সেখানে জ্বালানির প্রয়োজন অনুভব করে, এবং অক্লান্ত পরিশ্রম করে কয়লার সন্ধান পায়। ক্রমে তারা অনুভব করে যে এই কয়লা অসামান্য সামগ্রী, অসামান্য জ্বালানি, যার দ্বারা সমস্ত জনজীবনকে গতিশীল করে দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু কয়লা তাদের দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণে নেই।
ডাচরা ও ফরাসিরা সরাসরি আহারের সন্ধান করতে থাকলে, পর্তুগিজরা কনোভাবে জীবিত থাকার কৌশল নির্মাণ করার সময়ে অনুভব করেন মশলার প্রয়োজন আর তাই মশলার সন্ধানে বিভিন্ন দেশে পারি দেওয়া শুরু করে। আর সেই সন্ধান করতে করতে, বিভিন্ন দেশ ঘুরতে থাকলে, ব্রিটিশরা কয়লার আরদরূপে ভারতকে, চীনকে, আফ্রিকাকে এবং সুমাত্রার দ্বিপদেরকে, অর্থাৎ সেই সমস্ত দ্বিপদের চিহ্নিত করে ফেলে যেখানে যেখানে কন্দমদের দেহভস্ম মাটিতে মিশে মিশে খনিজ নির্মিত হয়েছে।
আর তাই ব্রিটিশরা নিশ্চয় করে ফেলে যে, এই দেশগুলিকে তারা পর্যুদস্ত করে এঁদেরকে নিজেদের উপনিবেশ করবে, যাতে করে সমস্ত জ্বালানি তাদের অধিকারে স্থিত থাকে, এবং সম্পূর্ণ মানবজাতির অধিপতি হয়ে উঠতে পারে তারা। খননের কাজের জন্য, বারুদের সন্ধানও অধিক মাত্রায় লাভ করে এঁরা আর তাই সমস্ত দেশগুলিতে যারা যারা শাসন করছিল, তাদেরকে অপসারিত করে নিজেদের আধিপত্য স্থাপন করা এঁদের জন্য তেমন কঠিন কাজ হয়না।
কিন্তু এমন হওয়াতে যা হলো, তা হলো মানবসমাজে অর্থনীতি দ্বিতীয় বৃহত্তম চরণ স্থাপন করলো। চাণক্যের স্থাপিত অর্থনীতি অনুসারে উপার্জনের মানদণ্ড হয়ে উঠেছিল কৃষিজমি ও কৃষিফসল, কিন্তু এবার উপার্জনের মানদণ্ড হয়ে উঠলো কলকারখানা। অর্থাৎ চাণক্যের পূর্বে, মানুষের খেয়েপরে বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন কিছুই ছিলনা, কারণ প্রকৃতির থেকেই ফল গ্রহণ করতো মানুষ, কন্দ ফুল মূল গ্রহণ করতো, আর শিকার করতো। চাণক্যের সময় থেকে মানুষের খেয়েপরে বেঁচে থাকা কঠিনতর হয়ে উঠলো কারণ এবার তাদেরকে কৃষিজমি রাখতে হবে, কর্ষণ করতে হবে, আর তা না থাকলে, অন্য কনো ভাবে পরিশ্রম করে মুদ্রা উপার্জন করে এই সমস্ত ফসল কিনে আহার করতে হবে।
আর এই দ্বিতীয় অর্থনৈতিক পরিভাষা অনুসারে ফসল নয়, ফল নয়, শিকার নয়, প্রকৃতি নয়, কলকারখানায় কর্ম করে উপার্জন করলে তবেই এই সমস্ত ক্রয় করে আহার করা সম্ভব হবে এবং জীবনযাপন সম্ভব হবে। অর্থাৎ, ক্ষেতে কর্ম করা কৃষকেরও অবস্থা দুরূহ হয়ে উঠলো, আর সেই ফসল নিয়ে বাণিজ্য করে যারা রাজা হয়ে বিরাজ করছিল, তাদেরও অবস্থার স্খলন ঘটলো, আর সবচাইতে অধিক স্খলন ঘটলো মানুষের সাথে প্রকৃতির সংযোগের। শিকার আর ফলমূল থেকে বিরত হয়ে কৃষিকর্মে নিযুক্ত হয়ে ওঠার কারণে এমনিই মানুষ প্রকৃতির থেকে দূরে চলে গেছিল, আর এবার তো আরো অধিক ভাবে দূরে চলে গেল মানুষ।
কারণ? কারণ এই যে, ক্ষেত হাজার হোক মৃত্তিকা ছিল, ফসল হাজার হোক উদ্ভিদ। হতে পারে, এঁরা মানুষের থেকে আদি, এবং মানুষের শিক্ষক, সেই কথা ভুলে গিয়ে মানুষ নিজেকে কর্তা জ্ঞানে এঁদেরকে মূর্খ নামে আখ্যা প্রদান করে, তৃণদের বলতে শুরু করলো, ‘তোমরা কিচ্ছু জানো না, আমরা শিখিয়ে দিচ্ছি কি ভাবে বেড়ে উঠতে হয়’, কিন্তু তা হলেও মানুষ প্রকৃতি থেকে দূরে চলে যায়নি।
কিন্তু কলকারখানার কারণে, মানুষের আর প্রকৃতির পৃষ্ঠে, অর্থাৎ মাটির উপর পা-ও পড়লো না, তৃণের গন্ধও ক্রমশ ভুলে যেতে শুরু করলো। আর তাই অর্থনীতির এই দ্বিতীয় পদক্ষেপের সাথে সাথে মানুষ অপ্রাকৃতিক জীব হয়ে উঠতে শুরু করে দিলো, আর ক্রমশ প্রকৃতির মানচিত্র থেকে এই যোনি লুপ্ত হবার পথে এগিয়ে চলল। কিন্তু এখানেই শেষ নয়, বরং এখান থেকে তো এক নতুন অধ্যায়ের শুরু।
সেই নতুন অধ্যায়ের নাম হলো বিশ্বযুদ্ধ। হ্যাঁ বিশ্বযুদ্ধ অধ্যায়ের সূচনা কলকারখানা বিস্তারের ঠিক বছর ৩০এর মধ্যেই শুরু হয়ে যায়, ঠিক যখন জ্বালানি তেলের ভাণ্ডারের সন্ধান পায় বিশ্ব। কৃষিজমি যে অর্থনীতির কাণ্ডারি হয়ে উঠবে, তা যেমন চাণক্যের আগে কেউ জানতো না, তেমনই জ্বালানি যে অর্থনীতির চালক হয়ে উঠবে, সেই ব্যাপারেও ব্রিটিশদের আগে কেউ জানতো না। কিন্তু একবার যখন ব্রিটিশদের দেখে ফেলেছে জগত সেই কীর্তির রচনা করতে, তখন সকলেই জানে পরবর্তী জ্বালানিকে যে হাতিয়ে নিতে পারবে, যে নিজের অধিকারে রাখতে পারবে, আগামীদিনে সে-ই হবে মানবযোনির শাসক।
তাই জ্বালানি তেলের ভাণ্ডার আরব্যদেশে, তা জানাজানি হতেই শুরু হয়ে যায় বিশ্বযুদ্ধের প্রস্তুতি। সমস্ত সেই দেশ যারা স্বতন্ত্র ভাবে খনিজ উত্তোলন করে করে ধরিত্রীর থেকে সমস্ত পুষ্টি হনন করে চলেছিল, তারা সেই পুষ্টি দ্বারা সুপুষ্ট না হয়ে, সেই পুষ্টি দ্বারা ঘাতক অস্ত্র নির্মাণ করে রেখেছিল, আর এবার সেই ঘাতক অস্ত্রসমূহ দ্বারা একে অপরকে বিদ্ধ করে, দ্বিতীয়স্তরের জ্বালানিকে করায়ত্ত করতে শশব্যস্ত হয়ে ওঠে।
যুদ্ধে মেতে ওঠা সমস্ত জনই আর্য, তবে তারা ভিন্ন দেশে দেশে বিরাজ করার জন্য, তাঁদেরকে আর্য রূপে চিহ্নিত করতে পারেনি কেউই, কিন্তু একজন এঁদেরকে আর্য বলে গণ্য করতে না পারলেও, যেই শ্রেণী উপদ্রব করছিল সর্বত্র, তাদেরকে ইহুদি বলে গণ্য করতে সক্ষম হয়, যা আর্যদেরই এক বৃহত্তর অংশরূপ। এই ইহুদিরা খনিজ সম্পন্ন এক দেশে অবস্থান করতে থাকলেও, এঁদের এক বৃহত্তর অংশ বিরাজমান ছিল ইয়োরোপেরই মধ্যে, আর এবার সেই ব্যক্তি যিনি এই ইহুদিদের এই ক্ষমতা কুক্ষিগত করার কাণ্ডারি রূপে চিহ্নিত করে নেন, তিনি মনস্থির করে নেন যে এই ইহুদিদের হত্যা করবেন।
কিন্তু এই ইহুদিরা ভৌতিক জগতে সর্বাধিক ধূর্ত প্রজাতি, যাদের ভিত্তিতে রয়েছে আর্য আর রক্তে রয়েছে কন্দম। তাই ইহুদিরা সেই ষড়যন্ত্রের বিষয়ে আগেভাগেই জেনে গিয়ে, এক বিশেষ জীবাণুর সঞ্চার করে মানব সমাজে, এবং লক্ষলক্ষ জীবনের নাশ করে বলে দাবি করে। কিন্তু সেই ব্যক্তি যিনি ইহুদিদের নিজের নিশানায় স্থাপন করে নিয়েছিলেন, তিনিও নাছোড়বান্দা। আর তাই এই জীবাণুর প্রচার স্তব্ধ হবার পরপরই ইনি ইহুদি হত্যার মঞ্চ সজ্জ করেন, আর লক্ষলক্ষ ইহুদির প্রাণ হনন করেন।
সত্য বলতে ইহুদিরা এই গনক্ষয়ের জন্য প্রস্তুত ছিলনা, কারণ তারা ধরে নিয়েছিল যে তাদের প্রচার করা জীবাণু অস্ত্রের কারণে তাদের হত্যার পরিকল্পনা ত্যাগ করে দিয়েছেন সেই আগ্রাসী ব্যক্তি। তাই হিটলারের প্রথম আক্রমণে পূর্ণ ভাবে ঘায়েল হয়ে যায় ইহুদি জাতি। সর্বত্র গনক্ষয় হওয়া শুরু করলো, ব্রিটিশদের মূল শহর, লন্ডনকে সম্পূর্ণ ভাবে বিনষ্ট করে দিলে, থতমত খেয়ে যাওয়া ব্রিটিশ নিজের ঘর গুছাতে ব্যস্ত হয়ে পরে।
আর অন্যদিকে ইহুদিদের দেশ, আমেরিকা উঠেপড়ে লাগে এবার সমস্ত কিছুকে প্রত্যক্ষ ভাবে করায়ত্ত করার, কারণ তাদের মনে হতে থাকে যে, এবার তারা নিজেদের অধিপতি হবার সম্ভাবনা থেকে পিছিয়ে যাচ্ছে। আর ঠিক সেই সময়েই ওপেনহাইমার নামে এক ইহুদি আমেরিকান সরকারের নজরে আনে তাঁরই একটি আবিষ্কার, যা তৃতীয় জ্বালানির বীজ থেকে প্রস্তুত। তা ছিল এক মহাগ্নেয় অস্ত্র, পরমাণু অস্ত্র। আর আমেরিকান সরকার তার সাখ্যাত করার সঙ্গে সঙ্গেই বুঝে যান যে, তারাই হতে চলেছেন ব্রিটিশদের পরবর্তী দ্বিতীয় রাষ্ট্রশক্তি, তারাই হতে চলেছেন জগতের অধিপতি।
কেবলই সঠিক সময়ের অপেক্ষা, আর তাও তারা পেয়ে গেলেন, যখন বৌদ্ধদেশ আমেরিকার সেনাশিবিরের উপর ঘাতক আঘাত করে। পরমাণু উৎক্ষেপণ ও প্রেরণের পরে, সমস্ত মানবযোনি থতমত খেয়ে যায়, কারণ সম্পূর্ণ ভাবে দুটি শহরকে উজাড় করে দেয় সেই পরমাণু অস্ত্র। সহস্র লক্ষ মানুষের প্রাণ যায়, আর শুধু মানুষ নয়, সেই স্থানে ও তার আশেপাশে যত যোনি আছে, সকলের প্রাণনাশ হয় পরমাণুর আঘাতের ফলে।
হিটলার দমন করা হয়, আরব্য দেশের অধিকার হনন করে নেয় ইহুদিরা, আর তাই ইহুদিরা আরব্য অঞ্চলে একটি দেশকে অধিকার করে নেয় সমস্ত জ্বালানির তত্তাবিধান করার জন্য, এবং আরব্য দেশকে পদতলে রাখার জন্য। ইহুদিরা সমস্ত মানবযোনিকেই পর্যুদস্ত করে দিতে পারলেও, ভারতে কিছু বীর সন্ন্যাসী সন্তানের কারণে তারা কিচ্ছু করতে পারছিলনা। সংগঠন গড়েছিল এখানেও তবে তা ইহুদি নামে ছিলনা, ছিল আর্য নামে, অর্থাৎ হিন্দু নামে, কিন্তু সেই সংগঠন মানুষের স্বীকৃতি পাচ্ছিলনা।
আর্য অনার্য মিলে এই দেশ থেকে ব্রিটিশরূপী ইহুদিদের শাসন থেকে মুক্ত হয়েছে, তাই কিছুতেই আর আর্য শাসনকে প্রশ্রয় দিলোনা মানুষ। কিন্তু আর্যরা যে অত্যন্ত ধূর্ত, তাদেরই তো অংশজাত হলো ইহুদি। তাই আর্যদের আক্রমণের ধারা পালটে যায়। দুই সেনাপতি অনার্য সেনার, সুভাস ও করমচাঁদ। এঁদের হত্যা না করতে পারলে আর্যরাজ স্থাপন হবেনা। তাই আর্যদের আখরা থেকে এক আর্য পণ্ডিতকে নিয়ে আসা হলো।
সেই পণ্ডিতকে শিখণ্ডী রেখে, আর্যদলের রচনা করা হলো, আর সেই পণ্ডিতের ষড়যন্ত্রেই সুভাসকে হত্যার ষড়যন্ত্র করা হলো। হত্যা করা গেল না, তাই নিষিদ্ধ করা হলো তার ভারতে প্রবেশ। অন্যদিকে সেই পণ্ডিতকে ধরে, বঙ্গকে শক্তিহীন করার প্রয়াস করে, বঙ্গভঙ্গ করলো আর্যরা, কারণ তারা বুঝে গেছিলেন, বঙ্গ উজ্জীবিত থাকলে, আর্যশাসন প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব।
আর শেষে, আর্যগোষ্ঠী স্বয়ং করমচাঁদকে হত্যা করলো। কিন্তু তাও শাসকের আসনে বসতে পারলো না সরাসরি ভাবে যদিও শাসকের আসনে তাদেরই প্রতিনিধি, সেই কাশ্মীরি পণ্ডিতকে স্থাপন করলেন তাঁরা। কিন্তু স্থাপন করলেও, পণ্ডিত সম্পূর্ণ ভাবে আর্যদের হাতে ক্ষমতা স্থাপন করতে পারলেন না। কিন্তু তা হলেও, প্রকৃতিবিরোধিতার সঞ্চার তিনিই শুরু করে দেন কলকারখানার বিস্তার করে করে, আর সমানে ভারতভূখণ্ডকে দুষিত করা শুরু করে দিলেন।
এর পরবর্তী মানবযোনির স্খলন শুরু হয়, যখন মানব নিজের সমস্ত সামর্থ্যকে একটি যন্ত্রের মধ্যে স্থাপন করা শুরু করলো। মিথ্যাচার করা আর্য ইহুদিদের একটি নিজস্ব সাক্ষরকরা স্বভাব ছিল। সেই মিথ্যাচার দিয়ে, তারা যেখানে মানবের যাওয়ার সামর্থ্যও নেই কারণ সেখানে কনো ভূতের অস্তিত্বই নেই, সেখানে চলে গেছে তারা এমন প্রচার করতে থাকলো, আর সেই যন্ত্রের মাধ্যমে সকলকে তা বলা শুরু করলে, সকলের চোখে তারা হয়ে উঠলেন মানবযোনিকে শ্রেষ্ঠত্বের শীর্ষে স্থাপনকারী।
সঙ্গে সঙ্গে তারা এই যন্ত্রবিদ্যা দিয়েই, মানবের দেহের অভ্যন্তর দেখা শুরু করা শুরু করলে, ধনের নেশা পূর্ণ করার একটি শ্রেষ্ঠ ক্ষেত্র পেয়ে যায় এই চিকিৎসাক্ষেত্র, যেখানে যেই রোগ নেই, সেই রোগের নাম করে, যেই রোগ নেই, সেই রোগ দ্বারা একজন মারীচকে অসুস্থ করে দিয়ে, সেই অসুস্থতার চিকিৎসার নাম করে করে, ধনলুণ্ঠন শুরু হয়ে যায়। আর শুধু চিকিৎসাই নয়, অটবি বিনষ্ট করে করে বৃহৎ বৃহৎ অট্টালিকা সড়ক নির্মাণ করে, এবং উড়োজাহাজের উড়ানক্ষেত্র নির্মাণ করে করে, এবং জলযানের ক্ষেত্র নির্মাণ করে করে, সম্যক জল, স্থল ও নভতলকে অধিকার করে নিয়ে দুষিত করা শুরু করে।
আর সেই দূষণ ক্রমে যখন সমস্ত ৮৪ লক্ষ যোনির জীবন অতিষ্ঠ করে তুলল, তখন আমার আবাহন করে সমস্ত যোনি মিলে যাতে আমি এই মানবযোনির নাশ করে তাদের রক্ষা করি। সারা দিতাম না, কিন্তু সারা দেবার কারণ, এই দিনের কথা অনুমান করে নিয়ে ধরিত্রী বহু পূর্বেই আমার কাছে এর নিরাময় কামনা করে মানবযোনির মধ্যে শ্রেষ্ঠস্তরকে অপসারণ করে, বাকি মানবযোনির নাশের জন্য আকুতি জানিয়েছিল।
সেই আকুতিতেই, আমার মৃষু নিমাই হয়ে এসে, অনার্যদের মধ্যে যেই আর্যরা মিশে তন্ত্রকে দুষিত করছিল, তাদেরকে পৃথক করে দেয়, এবং সেই আকুতিতেই গদাধর রূপে মৃষু এসে, পূর্ণরূপ অবতার ধারণ করে সত্যজ্ঞান লাভ করার ভূমিকা নির্মাণ করে গেছিল সে, আর অনার্যদেরকে রক্ষা করার বার্তা দিয়ে এও বলে যান মৃষু নিজেরই পরবর্তী অবতারের জন্য যে, এই বঙ্গভূমিকেই তাঁর অবতরণের জন্য ও কর্ম করার জন্য সেই কপিল মার্কণ্ডের কাল থেকে প্রস্তুত করা হয়েছে। বলে যান যে, যেই অনার্যভূমির রক্ষণ করা হবে, তা হলো এই বঙ্গদেশ, আর সেখানে স্থিত অনার্যদেরই কেবল রক্ষা করা হবে, আর্যদের নয়।
তাই সমস্ত আকুতি, প্রস্তুতি, এবং ব্যবস্থায়ন করে মৃষু প্রথমবার পূর্ণরূপে, সম্পূর্ণ ৯৬ কলা ধারণ করে দেহধারণ করে। এর এক বিশেষ কারণ আছে পুত্রী। কারণ এই যে, যখন সে পূর্ণ ৯৬ কলা বেশে দেহ ধারণ করবে, তখন সে পূর্ণ ভাবে আমার প্রতি সমর্পিত থাকবে, অর্থাৎ ঘনাক্ষরেও সে আত্মচিন্তা করবেনা। আর তাই পরিকল্পনা করা তার পক্ষে তখন সম্ভবই হবেনা। তাই পূর্বের সমস্ত অবতারদের দ্বারা সেই পরিকল্পনাকে সজ্জ করে যায় মৃষু আর অন্তে পূর্ণ রূপে এসে পূর্ণ সমর্পিত হয়ে বিরাজ করে সমর্পণের এবং স্বতন্ত্রতার মার্গ প্রদান করে।
সেই মার্গ প্রদান করার কালেই একপ্রকার সে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরু করে দেয়। কি ভাবে? যখন পূর্ণ ৯৬ কলা বেশে মৃষু আসে, অর্থাৎ ব্রহ্মসনাতন বেশে, তখন মানবযোনিকে শাসন করছে ধন ও ধনের নেশা, আর ব্রহ্মসনাতন কেবল কৃতান্ত মাধ্যমে সত্যের সর্বত সম্ভব বিশ্লেষণ প্রকাশ করে নবধর্মের অর্থাৎ কৃতান্তিক ধর্মের সৃষ্টিই করে না, উপরন্তু সে সেই সত্যকে সকলের মধ্যে বিস্তার করার জন্য বহু কাহানী লিখে, সেই কাহানীদেরকে দিয়ে চিত্রনাট্য নির্মাণ করিয়ে, মানবসমাজের নবীনতম প্রজন্মকে প্রকৃতির প্রতি আকৃষ্ট করে করে, এবং ধনের থেকে বিমুখ করে করে, একটি সমাজের নির্মাণ করার ইঙ্গিত দিয়ে যায়।
আর সেই ইঙ্গিতেরই বহন করে আজ তোমরা এই স্থানে সকল কৃতান্তিক একত্রিত হয়েছ। তাহলে তোমরা বলবে, এটি বিশ্বযুদ্ধ কেন? কারণ এই কীর্তির মাধ্যমে মৃষু সমাজের বিকল্প সমাজের নির্মাণ করে দেয়, এবং সমাজের অভ্যন্তরে ভাবান্তরের জন্ম দিয়ে দেয়, আর এমন করার ফলে আর্য তথা আর্যগোষ্ঠী অর্থাৎ ইহুদিদের নির্মাণ করা প্রকৃতিবিরোধকে, বৈষম্যবাদকে, যন্ত্রসর্বস্বতাকে ভয়ানক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে তোলে, আর এই ভাবে সম্পূর্ণ বিশ্বে মানবের সমাজব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ভাবে পরিবর্তিত করে দেয়”।
মীনাক্ষী মৃদু হেসে বললেন, “আর এই সমস্ত কিছু অতি কৌশলে করলেন প্রভু। বাইরে থেকে দেখে মনেই হবেনা যে কনো যুদ্ধ লেগেছে বা যুদ্ধ চলছে। কেবলই কিছু গ্রন্থ লেখা হয়েছে, যাতে কনো বিপক্ষ নেই, কেবলই নায়ক বা নায়িকা আছে, কিন্তু কনো খলনায়ক নেই। আসলে খলনায়ক যে মানুষের অন্তরে বিরাজমান। মানুষের অন্তরে বিরাজমান ধনের নেশা, ইন্দ্রিয়াদির প্রতি বিশ্বাস, আবেগকেই ভাব মনে করা, আসক্তিকেই প্রেম মনে করার মত অজ্ঞানতাই হলো তাঁর সমস্ত কাহিনীর খলনায়ক।
আর তাঁর কাহিনী সমূহ সমানে মানুষের অন্তরের সেই খলনায়কদের হত্যা করতে করতে, আজ এই বিশাল শতাধিক ব্যক্তির কৃতান্তিক সভ্যতা নির্মাণ হয়ে গেছে। কনো খলনায়ককে সমাজ চিহ্নিতই করতে পারলো না, কিন্তু সমস্ত সমাজে এক হিল্লোল লেগে গেছে যে, ধনের পরাধীনতা থেকে মুক্ত হতে হবে, প্রকৃতির কাছে ফিরে যেতে হবে।
মানুষ বুঝে গেছে যে, ধনের নেশায় চূর হয়ে আত্মসর্বস্ব হয়ে উঠে, সে প্রকৃতিকেই বলে বেসেছে যে আমার তোমাকে প্রয়োজনই নেই। সে বলে ফেলেছে যে, আমার কাছে ধন আছে, আমার কাছে সেই ধন দ্বারা নির্মিত বিবিধ যন্ত্র আছে। তাই আমার তোমাকে কনো প্রয়োজনই নেই। আর তার উত্তরে প্রকৃতি তাদেরকে বলে দিয়েছে যে, বেশ আমাকে যখন তোর প্রয়োজন নেই, তখন আমারও তোকে কনো প্রয়োজন নেই।
তা শুনেও মানুষের মাথায় আসেনি যে তাদের সমস্ত যন্ত্র নির্মিত ধন দ্বারা হয়না, প্রকৃতির উপাদান থেকেই তা নির্মিত হয়। শুধু কি যন্ত্র! ধন স্বয়ংও প্রকৃতির থেকে উত্তোলন করা খনিজ ও খনিজের বণ্টন থেকে লব্ধ হয় তাদের কাছে। আর শুধু কি ধন! তাদের স্থূল দেহ, সূক্ষ্ম দেহ, এমনকি তাদের কারণ শরীর অর্থাৎ চেতনাও স্বয়ং প্রকৃতি ও প্রকৃতির উপাদান। তাই প্রকৃতি যদি তাদেরকে বলে যে তোর আর প্রয়োজন নেই, তার মানে এই যে তাদেরকে প্রকৃতির কোল থেকে মুছে ফেলা হবে, মানব যোনির সম্যক বিনাশ হবে।
প্রভু নিজের কাহিনীর মাধ্যমে সেই কথা যথাযথ ভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন। কখনো তিনি প্রকৃতির সাথে একাত্ম থাকার মাহাত্ম বলেছেন, তো কখনো তিনি ইন্দ্রিয়রা কি ভাবে আমাদের সাথে মিথ্যাচার করে তা বলেছেন, আবার কখনো সরাসরিই বলে দিয়েছেন যে প্রকৃতি যদি আমাদের বলে যে আমাদের আর প্রয়োজন নেই, তাহলে আমাদের কি হবে। আর তা বলে বলে, আর্য ও ইহুদিদের সাজানো বিশ্বসমাজ ব্যবস্থা, যাকে ধন ও অহংকারমুখি অর্থাৎ আত্মমুখি করে রেখেছিলেন তাঁরা, তাকে শিকড় থেকে উব্রে ফেলে দিয়েছে।
আজ কেবল আমরা নই মা, দেশে দেশে এমন অনেকে রয়েছে যারা নিজেদের করা ভ্রান্তিকে সংশোধন করে নিতে আগ্রহী, আবার অনেকে আছে যারা বুঝে গেছেন যে ভ্রান্তির সংশোধন আবশ্যক, কিন্তু বুঝতে পারছেন না যে কি ভাবে তা করবেন। আসল কথা এই যে, যতই আমরা কৃতান্তিকরা ধনবিমুখ সমাজ নির্মাণ করি, কিন্তু সমাজ এখনও ধনকে ত্যাগ করেনি, তাই অহংকারও ত্যাগ করেননি, আর অজ্ঞানতাও। আর তার ফলে, অনেকে বুঝে গেছে যে ধনবিমুখ হতে হবে, কিন্তু ধনবিমুখ হবার সাহস পাচ্ছেনা। ভাবছে যে, অনেক অনেক অসুবিধা হবে ধনবিমুখ সমাজ হলে, অনেক অনেক বেশি পরিশ্রম করতে হবে ধনবিমুখ সমাজ হলে।
কিন্তু আমার একটি প্রশ্ন আছে এখানে। আচ্ছা মা, ধনের নেশাগ্রস্ত মানুষরা আর অহংকার বা আত্মের অর্থাৎ পরমাত্মের পূজার বিস্তার করা ব্যক্তির সংখ্যাও তো কম ছিলনা জগতে। হ্যাঁ মানছি যে, প্রভু যেই কৌশল ধারণ করেছিলেন, তার কারণে প্রথমে তারা বুঝতেও পারেন নি যে এটি একটি যুদ্ধ, আর এই যুদ্ধের ফলে তাদের সাজানো সমাজব্যবস্থা ধসে পরে গিয়ে, তাদেরকে নিঃস্ব করে দিতে চলেছে। কিন্তু আজ তো তারা তা বুঝে গেছে। তারপরেও কি তারা কনো প্রকার প্রয়াস করবেনা এই যুদ্ধ জয়ের!”
মাতা সর্বাম্বা হেসে বললেন, “ভবিষ্যৎ নয়, বর্তমান এটি এখন। তারা প্রয়াস করবে এমন নয়, প্রয়াস ইতিমধ্যেই করে দিয়েছে। আর কি ভাবে করেছে তারা সেই প্রয়াস, তা শীঘ্রই সকলের সমক্ষে চলে আসবে। … আর হ্যাঁ, তুই যে বললি না, অনেকেই বুঝে গেছে যে প্রকৃতির কাছে ফিরে যাওয়া উচিত, অথচ ধনের অস্তিত্ব থাকার কারণে দ্বন্ধে রয়েছে, তাদেরকে কিছু সময়ের জন্য এই জগত থেকে অবলুপ্ত করে দিলে কেমন হয়! … এখন সমাজে ধনের অস্তিত্ব আছে, তাই তারা দ্বন্ধে রয়েছে। একটু বিশ্রামের পর তারা যখন ফিরে আসবে তখন আর ধন থাকবেই না! তখন তো আর দ্বন্ধ থাকবেনা, কি বলিস!”
মীনাক্ষী আনন্দিত হয়ে বলল, “এটি বেশ ভালো মা। কিন্তু কি করে করা সম্ভব এটি!”
উত্তর মাতা সর্বাম্বা হেসে বললেন, “দেখছি বিচার করে, কি ভাবে তা করা সম্ভব। এখন আসি তাহলে, দেখি কি উপায় করা যেতে পারে”।
এতো বলে মাতা অবলুপ্ত হলে, মীনাক্ষী দীর্ঘক্ষণ মাতা যেইস্থানে দণ্ডায়মান ছিলেন, সেদিকে তাকিয়ে থাকলো। শেষে সর্বশ্রী তাঁর কাছে এসে, পিছন থেকে আলিঙ্গন করলে, বিজয়া আর জয়া ও সকলে দেখলো, মীনাক্ষী আর সর্বশ্রীর যেন বহুদিনের আলাপ। মীনাক্ষী নিজের শরীরটা এলিয়ে দিলো সর্বশ্রীর স্কন্ধে। দিয়ে বলল, “আর ভালো লাগছে না দিদি, মাকে ছাড়া আর একদণ্ডও থাকতে ইচ্ছা করছেনা!”
সর্বশ্রী বললেন, “তা বললে চলবে! এখনও যে আমাদের বিস্তর কাজ পরে রয়েছে। তবে নিশ্চিত আমরা তাঁর কাছে ফিরে যাবো এবার, দেখে নিস। আমরা দুইজনে হাতধরাধরি করে তাঁর কোলে ফিরে যাবো। আর তুই তোর প্রভুর সাথে আর আমি আমার পিতার সাথে আমার মিলিত হবো”।
