২৪.২। স্থিতপ্রজ্ঞা পর্ব
মাতা সর্বাম্বা মানবের ইতিহাসের বিবরণ প্রদান করতেই থাকলেন। তিনি বললেন, “আর্যরা একদিকে যেমন নিজেদের ব্রাহ্মণ বলা শুরু করে, নিজেদের ভগবান রূপে স্থাপিত করা শুরু করলেন, তেমন অস্ত্রবিদ্যার প্রসার করিয়ে, রাজপুত শ্রেণীর নির্মাণ করা শুরু করলেন, এবং তাঁদেরকেই শাসকের আসনে স্থিত করে, নিজেরা বিধান প্রদান করে করে, সমস্ত মানুষের সর্বস্ব লুণ্ঠন করা শুরু করলেন, এবং নিজদের তথা ক্ষত্রিয়দের বিত্তবান গড়ে তোলা শুরু করলেন।
যতক্ষণ ব্রাহ্মণের নির্দেশ পালন করবেন ক্ষত্রিয় রাজপুতরা, ততক্ষণই ব্রাহ্মণরা নিজেদের বরহস্ত রাখবেন তাঁদের মাথায়, আর ততক্ষণই প্রজার সর্বস্ব হনন সম্ভব হবে, এবং ততক্ষণই রাজপুতরা বিত্তবান হতে থাকবে। সমস্ত প্রকার সম্ভোগের সম্পদ তারা ধারণ করতে পারবেন, আর তার সামান্য সিকিভাগ প্রদান করতে হবে ব্রাহ্মণদের। এই ছিল ধারা জম্বুদেশে।
অন্যদিকে, জম্বুদেশের বাইরেও আর্যদের দাপট বৃদ্ধি পেতেই থাকছিল। যেখানে এই আর্যরা রোমান নামে স্থিত ছিল, তারাও দরিদ্রশোষণে উদগ্রীব হয়ে উঠলে, যেমন করে রাজপুতদের মধ্যে গোষ্ঠী নির্মাণ হয়ে হয়ে, সংগ্রামের রচনা হচ্ছিল যা নির্ণয় করবে যে কে অধিক সম্ভোগ করবে, তেমন সেই দেশেও একই ব্যবস্থা শুরু হচ্ছিল।
কিন্তু জম্বুদেশে যেখানে ব্রাহ্মণরা মাথার উপরে বিধানদাতা ভগবান রূপে স্থাপিত করে রেখেছিলেন নিজেদেরকে এবং তেমন করে রেখে নিজেরা অস্ত্র না ধারণ করেই রাজপুতদের দ্বারা লুণ্ঠিত ধনের সিকিভাগ নিতেন, আর তাছাড়া যা প্রয়োজন পরতো, তা বিবিধ রীতি ও প্রথার বিস্তার করে করে, তার থেকে অর্জন করে নিতো, তেমনটা রোমানদের ক্ষেত্রে ছিলনা।
সেখানে আর্যরাই ক্ষত্রিয়ের আসনে স্থিত। তাই তাদের মধ্যেই সম্ভোগের জন্য আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রাম হতো, আর তারই জেরে, সেখানে দিনপ্রতদিন অরাজগতার বিস্তার পেতে থাকে। অন্যদিকে তুরস্ক, আফগান, পারশ্য, পালেস্তিন ও আরব অঞ্চলেও আর্যদের প্রভাব বৃদ্ধি পেতে থাকে, এবং তাই ক্রমশ বর্বরতা সেখানে চরমে উন্নীত হতে শুরু করে।
এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে প্রয়োজন ছিল বেদবহির্ভূত এক ধারার, আর তা উপহার দেবার জন্য মৃষু দেহ ধারণ করলেন কপিলরূপে। আদিজম্বুদেশ, এই বঙ্গভূমিকে সুসজ্জিত করে তোলাই তাঁর প্রধান কর্ম। এই ভূমি ভাবিকালে আর্যবিরোধী ক্ষেত্র হতে চলেছে, হতে চলেছে একাধিকবার মৃষুর দেহধারণের ক্ষেত্র, হতে চলেছে প্রকৃতির আরাধনার ক্ষেত্র। তাই সাংখ্যদর্শন দ্বারা উদ্ভাসিত করলেন এই অঞ্চলকে, এবং পরবর্তী মৃষুকে এই বঙ্গভূমিতে আনার নিমন্ত্রণপত্র দিয়ে রাখলেন।
আর সেই পরবর্তী মৃষু হলেন ৩২ কলা অবতার, মার্কণ্ড। মার্কণ্ডের মেধাতে আচম্বিত হয়ে যায় আর্যরা, সর্বক্ষণ তাঁকে দাবিয়ে রাখার প্রয়াস করতে থাকলো তারা। মৃত্যু দেবারও বিধান প্রদান করে দিলো ব্রাহ্মণরা মার্কণ্ডের। সেই নির্ঘাত মৃত্যুর থেকে একপ্রকার পলায়ন করে, মার্কণ্ড এই আদিজম্বুদেশে অর্থাৎ বঙ্গদেশে যাত্রা করার প্রয়াস করা শুরু করলেন।
সেই যাত্রার কালে, তিনি আর্যবিরোধী, মহান সাধক দধীচির পুত্র, পিপলাদের সাখ্যাত পেলেন। বিরোধিতা করার জন্য একপ্রকার নির্মম মৃত্যু প্রদান করা হয়েছে দধীচিকে, তাই পিপলাদ তখন প্রতিশোধের অগ্নিতে জ্বলছেন। প্রতিশোধ নিতে না পারার জন্য মৃত্যুর কোলে এগিয়ে গেলেন পিপলাদ। কিন্তু নচিকেতাকে যেন যম মৃত্যু দিলেন না। মার্কণ্ড তাঁকে শান্ত করলেন, উপহার দিলেন মহাজ্ঞান, উপনিষদ। পিপলাদ উপনিষদের রচনা করলেন, ব্রাহ্মন্যবাদকে কোনঠাসা করে দিলেন আর জন্ম দিলেন এক মহাতেজস্বী পুত্রের, যার নাম হয় পুলস্ত।
অন্যদিকে মার্কণ্ড বঙ্গভূমিতে গিয়ে, কচ্ছপপৃষ্ঠের ন্যায় অঞ্চল, কালীক্ষেত্রের স্থাপনা করেন। সেখানে স্থিত হয়ে মার্কণ্ড মহাপুরাণের রচনা করেন, যেখান থেকেই তোমরা নবদুর্গা, দশমহাবিদ্যা এবং গণেশ কার্তিকের কাহিনী জানতে পারো। প্রকৃতির প্রতি অগাধ ভক্তিরসকে সঞ্চার করে, মহাকালীর রূপদান করেন মার্কণ্ড, এবং সেই মূর্তিকে আদিগঙ্গার তটে স্থাপিত করার শেষে, সেই ক্ষেত্রের নামকরণ হয়ে যায় কালীঘাট।
শক্তিতন্ত্রের রচনা করেন মার্কণ্ড এবং শক্তির আরাধনা শুরু করেন, প্রকৃতিই স্বয়ং ব্রহ্মময়ী এই ব্যাখ্যা প্রদান করা হলে, ব্রহ্মলাভের পথে যাত্রা করা শুরু করলেন মার্কণ্ডের বহু শিষ্য, যাদের মধ্যে অন্যতম হলেন বশিষ্ঠ। মার্কণ্ডের ভক্তির কারণে জীবন্ত মূর্তি হয়ে উঠেছেন কালীঘাটের মহাকালী। মার্কণ্ড দেহত্যাগ করলেন, এবং শিষ্যদের নির্দেশ দিলেন, তাঁর স্থাপিত মহাকালীর মূর্তির বিভিন্ন অঙ্গ খণ্ডন করে নিয়ে গিয়ে, তা স্থাপন করে করে, তন্ত্রের বিস্তার করতে।
শিষ্যরা তাঁর আজ্ঞা পালন করতে গেলে, আচম্বিত হয়ে গেলেন কারণ যখন যখন মহাকালীর মূর্তিকে খণ্ডন করেন, তখন তখন তারা দেখেন, সেই খণ্ড যেন সম্পূর্ণ ভাবে রক্তাক্ত। বিশ্বাস জন্ম নেয় যে, মায়ের মূর্তি জীবন্ত, তা কনো প্রস্তরমূর্তি নয়। খণ্ডন করতে করতে, ৫১টুকরো হলে, বশিষ্ঠ সম্মুখে এসে বললেন, ‘প্রভু যেই সতীর ৫১ খণ্ডে খণ্ডনের কথা বলে গেছিলেন, সেই কথা এই আজকের ঘটনাকেই ইঙ্গিত করে গেছিলেন, তাই তো আমরা মায়ের মূর্তির থেকে ৫১টুকরো লাভ করেছি’।
সকলে সেই কথাতে সম্মত হলে, প্রথমে সম্পূর্ণ বঙ্গভূমিকে তন্ত্রসিদ্ধ করে তুলতে শুরু করলেন মার্কণ্ডশিষ্যগণ অর্থাৎ তান্ত্রিকরা। এবং অতঃপরে অবশিষ্ট অংশকে স্থাপন করে তন্ত্রের বিস্তার করা শুরু করলেন সম্পূর্ণ জম্বুদেশে, অর্থাৎ সিন্ধু উপকুলে, মানসসরবর থেকে শুরু করে, সুদূর লঙ্কা পর্যন্ত। ব্রাহ্মণ্যবাদ নিজের প্রতিদ্বন্ধি লাভ করে, অস্বস্তির মধ্যে থেকে, বারংবার প্রচার করা শুরু করলেন যে, আর্যদেরই একটি শাখা হলো তন্ত্র।
সেইকালে সেই প্রচারে তেমন লাভ হয়নি, যদিও আজকের দিনে দাঁড়িয়ে বোঝা যায় যে তাদের এই অপপ্রচার যথাযথই ক্রিয়া করেছিল, কারণ আজ অজ্ঞানীরা তন্ত্রকে আর্যদেরই আরো এক রচনা মনে করে। এই মনে করার আর মনে করানোর পিছনেও অনেক ইতিহাস আছে। সেই কথা পর্যন্ত পৌছলে, তবে তা বুঝতে পারবে তোমরা। কিন্তু এই ক্ষণে যেই সমস্যা দেখা দেয় তান্ত্রিকদের মধ্যে, তা হলো সমাধিলাভ।
উপাসনা সমস্ত হলো, তন্ত্রের বিস্তারও বিস্তর হলো, আর্যদের তন্ত্রকে বেদের অংশ বলার অপপ্রচারও যথাযথ ভাবেই চলতে থাকলো, কিন্তু সমস্ত ইচ্ছার থেকে মুক্ত হবার ধারা অর্থাৎ তন্ত্র ধারণ করেও বশিষ্ঠ কিছুতেই সমাধি পর্যন্ত উপস্থিত হতে পারছিলেন না, অর্থাৎ অন্তিম লক্ষ্যে তিনি কিছুতেই স্থিত হতে পারছিলেন না। আর সেই সুযোগে, ব্রাহ্মণ ও ব্রাহ্মণদের স্নেহধন্য রাজপুতানারা পুনরায় জেগে উঠে, আত্মবিস্তার করা শুরু করলো, নিজেদের মধ্যে কে অধিক সম্ভোগ করবে, সেই নিয়ে লড়াই করা শুরু করলো আর নিজেদের সাথে অসংখ্য সেনাকে নিযুক্ত করে করে, সকলের প্রাণ হরণ করা শুরু করলো।
এমন যখন মানবযোনির অবস্থা, তখন পুনরায় মৃষু দেহ ধারণ করা শুরু করে ভিন্ন ভিন্ন স্থানে একের পর এক ভাবে। প্রথমেই তিনি মহাবীর হয়ে আসেন জৈনদের মধ্যে এবং যুদ্ধ থেকে প্রতিহত হবার বার্তা প্রদান করেন। মগধাঞ্চলে তাঁর বিস্তার ঘটলেও, রাজপুতানাদের বাড়বাড়ন্তের কারণে তারা নিজেদেরকে একপ্রকার গুহাবন্দী করেই রাখা শুরু করলে, ৩২ কলারূপ ধারণ করে পুনরায় মৃষু এবার এলেন বিরাটরাজ্যতে, রাজা শুদ্ধধনের পুত্র হয়ে জন্ম নিলেন।
অনন্ত স্নেহ, মমতা ও দয়ার মূর্তি হয়ে উঠলেন তিনি, এবং সাথে সাথে ব্রাহ্মণদের বাড়বাড়ন্ত, রীতি ও প্রথার নাম করে অন্ধবিশ্বাসের বিস্তার ও মানবযোনিকে নিপীড়নের দিকে তাকিয়ে তিনি প্রজ্বলিত হয়ে উঠলেন। সাথে সাথে এই ব্রাহ্মণদের উত্থানের পিছনে রাজপুতানাদের অনন্ত হিংসাস্ফীতি ও প্রতিযোগিতাস্পৃহা আর সাথে সাথে আত্মের আরাধনা দেখে, তিনি কাতর হয়ে সকল মানুষকে বোঝাতে থাকলেন।
কিন্তু না তো মানুষ বুঝলেন, আর না তাঁর এই বোঝাতে যাবার প্রয়াসকে শুদ্ধধন ও রাজঘরানা ভালো চোখে দেখলেন। সিদ্ধার্থ, অর্থাৎ সেই দেহে মৃষু, বিবেকবাণ হয়ে বিচার করে দেখলেন যে, সম্পূর্ণ মানবযোনি অত্যন্ত ভাবে দুঃখে কাতর। যতটা না তারা দুঃখে কাতর ছিলেন, তার থেকেও অধিক কাতর হয়ে উঠেছেন, ব্রাহ্মণদের দিবারাত্র স্বর্গলাভ, নরকদর্শনের বুলি শুনে শুনে। সকলে যেন তটস্থ থাকেন যে ব্রাহ্মণদের বচন না শুনলে, রাজপুতানাদের শাসন না মানলে, নির্ঘাত নরকদর্শন হবে তাঁদের। অন্যদিকে এঁদের বিধান ও শাসন মানার ফলে, এঁদের সর্বস্ব লুণ্ঠিত হয়ে চলেছে। কিন্তু তা দেখে, তা বুঝেও, নরকদর্শনের ভয়ে তটস্থ সমস্ত মানুষ ব্রাহ্মণের বিধান ও রাজপুতানাদের শাসন মানতে একপ্রকার বাধ্য।
সর্বক্ষণ জ্বরার ভয়। ব্রাহ্মণদের অসন্তুষ্ট করার জন্যই জ্বরালাভ, এমনই ব্রাহ্মণদের অঙ্গিকার, আর তাই জ্বরার জন্য যতটা না কাতরতা, তার থেকে অধিক ভীতি, ব্রাহ্মণ অসন্তুষ্ট হয়েছেন, অর্থাৎ নির্ঘাত নরকদর্শন করতে হবে। সর্বক্ষণ মৃত্যুর ভয়। মৃত্যুর ভয়ের থেকেও অধিক, মৃত্যুর পর নরকযাতনা লাভ করতে হবার ভয়, আর স্বর্গলাভ করে সুখভোগ করার আসক্তি। পতির গতি যেমন হবে তেমনই পত্নীর গতি হবে। তাই এক প্রিয়জনকে স্নেহ করা হোক বা না হোক, সর্বক্ষণ পতির তোষামোদি করাটা একটা বাধ্যকতা মূলক ক্রিয়া, নাহলে যে পতিরও নরকলাভ আর সঙ্গে তাঁরও অর্থাৎ পত্নীরও।
একই কারণে, পতিও সর্বক্ষণ ভীত। স্ত্রীর যদি স্খলন হয়, তাহলে তাঁরও অর্থাৎ পতিকেও নরক যন্ত্রণা ভোগ করতে হবে। একই ভীতি সন্তানদেরও। তাই প্রিয়জন আর প্রিয়জনের স্নেহ মমতার বালাই নাই, রয়েছে কেবল নরকের ভয় আর স্বর্গের আসক্তি, আর সেই আসক্তির জন্য পালন করে চলা পরিবারের মধ্যে রীতিবদ্ধ যান্ত্রিক পরিবেশ। সমস্ত কিছু মিলিয়ে সর্বক্ষেত্রে কেবল আর কেবলই মানুষের বেদনা।
সেই সমস্ত কিছু দেখে, সিদ্ধার্থ অত্যন্ত কাতর। নিজেকে নিরুপায় বোধ করা শুরু করলেন। আর তাই উপায়ের সন্ধান করতে আমার দ্বারস্থ হলেন। চূড়ান্ত উপাসনা করলেন আমার, আর সেই উপাসনার কারণে সিদ্ধাইএর পর সিদ্ধাই লাভ করেও, সেই দিকে না তাকিয়ে তিনি এগিয়ে চলে এলেন সমাধির দিকে। সমাধি হলো তাঁর, সত্যদর্শন হলো, সত্যলাভ হলো। আর নিজের মত করে, সমাধির নামকরণ করলেন তিনি নির্বাণ।
সম্যক ভাবে জগতের সত্যকে প্রত্যক্ষ করে, তিনি উদ্ধার করলেন মানুষের দুঃখের আসল কারণ, আর সেই দুঃখ থেকে মুক্তির উপায়। আর তা করে সকলের উদ্দেশ্যে বললেন, “তোমাদের আসক্তিই তোমাদের বেদনার একমাত্র কারণ। আসক্তি ত্যাগ করো, বেদনার থেকে চিরতরে মুক্তি পাও। আরো বললেন, স্বর্গে গিয়েই বা কি হবে? ফিরে সেই এখানেই আসতে হবে। আর নরক! তোমরা তোমাদের আসক্তি দিয়ে এই মর্তলোককে যা করে দিয়েছ, তা নরকের থেকেও দুরূহ। তাই সেই অবস্থায় যাবার প্রয়াস করো, যেখানে গেলে আর ফিরতে হবেনা, জন্মমৃত্যুর চক্র থেকে সম্পূর্ণ ভাবে মুক্ত হয়ে যাবে।
আকৃষ্ট হলেন অনেকে তাঁর কথাতে। বিশেষ করে আকৃষ্ট হলেন রাজা বিম্বিসার। উদার দৃষ্টিভঙ্গি, সর্বজনে স্নেহ, সর্বদা শান্ত সিদ্ধার্থ ২৮তম ও অন্তিম বুদ্ধ নামে পরিচিত হলেন, আর রাজা বিম্বিসার হয়ে উঠলেন তাঁর ঐকান্তিক ভক্ত। তাঁর পত্নী, অম্বাপালি হয়ে উঠলেন বুদ্ধের ঐকান্তিক সেবিকা এবং তাঁর নামকে ধারণ করেই, এই ২৮তম বুদ্ধের বাণীকে যেই ভাষায় লেখা শুরু হলো, সেই ভাষার নামকরণ হয় পালি ভাষা।
বুদ্ধের বিস্তার ব্যপক হতে থাকলো, বিশেষ করে সেই গোষ্ঠীর মধ্যে, যেই গোষ্ঠীকে ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়রা রীতি, প্রথা ও করের মাধ্যমে শোষণ করে চলতো, অর্থাৎ তৎকালীন বৈশ্য, যা পরবর্তীতে শূদ্র গোষ্ঠী রূপে পরিচিত হয়। আসলে সেই কালে, চারটি জাতি ছিলনা, তিনটিই জাতি ছিল এই জম্বুদেশে। প্রথমত কেবলই আর্য ও অনার্য ছিল, যেখানে অনার্যরা হলেন এই জম্বুদেশের আদি বাসিন্দা, যাদের এখনও দক্ষিণ ভারতে, বঙ্গ, বিহার ও উৎকলে দেখা যায়, আর আর্যরা বহিরাগত, অর্থাৎ আধা মনুষ্য ও আধা কন্দম ছিলেন।
পরবর্তীতে, এখানের অনার্যদের মধ্যেই কিছুকে পৃষ্ঠপোষণ করলেন আর্যরা, এবং তাঁদেরকে শাসনের মুখ করে রেখে, এঁদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে, এঁদেরকে যুদ্ধ করালেন এবং সাধারণ অনার্যদের শোষণ করালেন কর-আদায়ের নাম করে। এই গোষ্ঠীকে তারাই ক্ষত্রিয় নাম প্রদান করেন, কারণ এঁরা ক্ষেত্র, অর্থাৎ জমির সাথে সংযুক্ত জাতি ছিলেন। পরে, এঁরা রাজাসনে স্থিত হলেন, ব্রাহ্মণদের অর্থাৎ মূলত যারা আর্য, তাদের বুদ্ধিতে ও কৌশলে, এবং তখন নামেই কেবল তারা ক্ষাত্র অর্থাৎ ক্ষত্রিয় রইলেন, ক্ষেত্রের থেকে অর্থাৎ ভূমির থেকে বহুদূরে চলে গেলেন।
তখন যারা এই ক্ষত্রিয়দের নিচে থেকে, ব্রাহ্মণদের দ্বারা রীতিতে আবদ্ধ হয়ে ক্ষেত্রের সাথে যুক্ত থাকলেন, তাদেরকে বৈশ্য বলা হতো, কারণ এঁরা সমস্ত কিছুর উৎপাদন করে, সেই উৎপাদন বিক্রয় করে, ধন লাভ করে, সেই ধনের থেকেও, এবং উৎপাদনের থেকেও কর প্রদান করতে বাধ্য ছিলেন, এবং এইভাবে শোষণের শিকার হতে বাধ্য ছিলেন। সেই বৈশ্যরাই অনুপ্রেরণা লাভ করেন সিদ্ধার্থের থেকে, এবং তাই এঁদের বিস্তার শুরু হয় ২৮তম বুদ্ধের আমলে।
এঁদের বিস্তার হতে থাকলে, ব্রাহ্মণরা এবং ক্ষত্রিয়রা প্রায় একঘরে হয়ে যাওয়া শুরু করলো, আর তাই সিদ্ধার্থের ভ্রাতা দেবদত্তকে উস্কানি প্রদান করলেন ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়রা, যাতে সে সিদ্ধার্থের অপযশ বিস্তার করে, এবং সিদ্ধার্থকে সার্বিক ভাবে দমন করে। সেই উস্কানির ফলেই, দেবদত্ত বিম্বিসারের পুত্র, অজাতশত্রুকে নিজের অধীনে নিয়ে আসে, এবং সিদ্ধার্থকে বহুভাবে হেনস্তা করা শুরু করা থেকে, তাকে হত্যা করতেও সচেষ্ট হয়ে ওঠে।
কিন্তু গৌতম বুদ্ধ যে স্বয়ং মৃষু, অর্থাৎ স্বয়ং আমি বা আমার অঙ্গজাত পুত্র। আমি না চাইলে, তার ক্ষতি করবে, এমন কার সামর্থ্য! … তাই যেমন অজাতশত্রু ব্যর্থ হলেন, তেমনই দেবদত্ত। আর ব্যর্থতার শেষে, এঁরা দুজনেই বুদ্ধের স্মরণে আসেন। কিন্তু এঁরই মধ্যে অজাতশত্রু নিজের পিতার হত্যা করেছিলেন, তাই সেই কর্মের কর্মফল তাকে তারা করেই বেড়াচ্ছিল। সেই কর্মফল থেকে তো তাকে কেউই বাঁচাতে পারতো না, তাই সময়ের সাথে তার পুত্রও তাকে হত্যা করে।
তবে, গৌতমের উত্থান আর তাঁর নির্বাণতত্ত্বের বিস্তার বশিষ্ঠের কানেও এসে উপস্থিত হয়। আর তাই তিনি এসে উপস্থিত হন গৌতমের কাছে। মিলন হয় তন্ত্রের ও বৌদ্ধ মতের। তন্ত্রের বিস্তার বৌদ্ধের মধ্যেও বিস্তার লাভ করলে, ভয়ানক শক্তিধর হয়ে ওঠে বৌদ্ধধারা, আর সেই শক্তির চাপে আর্যরা একপ্রকার উত্তরখণ্ডের গুহায় বন্দী হয়ে গিয়ে, গাঙ্গেয় উপত্যকা থেকে সম্পূর্ণ ভাবে প্রায় পলায়ন করে, সিন্ধুর উপকুলে, মধ্যজম্বুদেশে অর্থাৎ উজ্জয়নী মাহিষমতি অঞ্চলে, তথা উত্তরখণ্ডের পর্বতের গুহায় আত্মগোপন করে রইলেন।
অন্যদিকে, গৌতম যখন সম্পূর্ণ ভাবে বৈশ্যদের সচেতন করে দেন, তখন নিজের দেহ রাখেন। আর তিনি দেহ রাখতেই, আর্যরা পুনরায় সমস্ত আবরণ থেকে যমুনার উপত্যকায় এবং সিন্ধু উপত্যকায় নেমে আসেন। মহাবীর ও গৌতমের কারণে মগধ হয়ে উঠেছিল দুর্ভেদ্য। সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গদেশ হয়ে রয়েছে তন্ত্রের আখরা, প্রকৃতির আরাধনা সেখানে চরমে, এবং তাই আত্মের বিস্তার সেখানে ক্ষীণ।
মগধ রুক্ষাঞ্চল, তাই অধিকার জমানো সহজ হলেও, বঙ্গদেশের দুর্ভেদ্য জঙ্গলকে আর্যরা ভয় পায়। আসলে যেখানে যেখানে প্রকৃতির বিস্তার, সেখানে সেখানে আর্যদের ভীতি। তাই বঙ্গদেশকে অধিকার করার ইচ্ছা থাকলেও, তা পারলেন না। কিন্তু যেই অঞ্চলের দিকে তারা তাকালেনও না, সেই অঞ্চল এবার মৃষুর পরবর্তী দুটি অবতার, ১২ কলার অবতার ও ১৬ কলা অবতারের ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। (মৃদু হেসে) আর সেই ক্ষেত্রের নাম হলো উৎকল।
এদিকে যখন উৎকলের বিস্তার হচ্ছিল, সেই কালে আরো দুই ধারায় বিস্তার হচ্ছিল মৃষুর রাজত্বের, আর সেই দুই ক্ষেত্র ছিল পালেস্তিন। ঈশা ও মহম্মদ রূপে অংশ অবতার ধারণ করে, প্রায় সম্যক মধ্যপ্রাচ্যকেই মৃষু আর্যরোহিত করে দিলেন। ইসলাম তার অন্তিম নবী মহম্মদ লাভ করে ব্যাপক ভাবে বিস্তার লাভ করলে, সেখানের কন্দমমিশ্রিত মানুষরা সমাধি পর্যন্ত না পৌছাতে পারলেও, আর্যদের বিস্তার তাদেরকে স্পর্শ করতে পারলো না, আর তাই বর্বরপ্রথার প্রায় নাশ হয়ে যায় সেখানে। স্ত্রীদের সম্মানবৃদ্ধি হয়, সমস্ত সমাজ সুন্দর ভাবে লাভ ও ক্ষতি অর্থাৎ হালাল ও হারামের দ্বারা সুসজ্জিত হওয়া শুরু করে।
তো অন্যদিকে ঈশার কারণে, পালেস্তিন থেকে আরম্ভ করে পারশ্য, সমস্ত স্থানে শান্তির বাতাবরণ স্থিত হওয়া শুরু করে। তাই সর্বক্ষণ যুদ্ধ করে যাওয়া আর্যশাখা সেখান থেকে পলায়ন করে পশ্চিম ইউরোপীয় সমুদ্র উপকুলে যাত্রা করা শুরু করে দেয়, এবং সেখানে গিয়ে আবার তারা সেই লুণ্ঠনপ্রক্রিয়াতে মেতে ওঠে, যাকে তারা নাম দেয় নাইটপ্রথা।
এইদিকে, উৎকলে একে একে মৃষু ১২ কলা ও ১৬ কলা রূপ ধারণ করে। ১২ কলা রূপে, সে বাল্মীকি হয়ে ওঠে এবং প্রকৃতির প্রতি অনাচারকে ব্যক্ত করে সীতা চরিত্র রচনা করলেন, আত্মের বিস্তারকে ব্যক্ত করতে আত্মের ত্রিগুণ অর্থাৎ সত্ত্ব, রজ ও তমের রচনা করে তাদেরকে বিভীষণ, রাবণ ও কুম্ভকর্ণ নাম দিলেন, এবং প্রকৃতির মানকে পুনরায় স্থাপিত করতে, বিবেকের বিস্তার অর্থাৎ রামের বিস্তার রচনা করলেন।
বর্তমানের কেওঞ্ঝারে স্থাপিত হয়ে, পর্বতের আড়ালে স্থিত হয়ে, যেই রামায়ণ রচনা করলেন এই ১২ কলা আমার অবতার, তাতে বৌদ্ধ ও তন্ত্রের দ্বারা সদ্য আঘাত প্রাপ্ত আর্যরা অতিরিক্ত ভাবে ঘায়েল হলেন। সে আঘাত সামলানোর প্রয়াস করতে, এবার তারা রামায়ণের মধ্যে বিকৃতি আনার প্রয়াস করে, রামায়ণকে আর্যদেরই গ্রন্থ বলার প্রয়াস করতে গেলে, সম্মুখে এসে যায় মার্কণ্ড মহাপুরাণ।
প্রচণ্ড ভাবে নাগপাশে বিদ্ধ হয়ে বিধ্বস্ত হয়ে ওঠা আর্যরা তাই মার্কণ্ড মহাপুরাণকে জ্বালিয়ে দেওয়া শুরু করলেন, আর সাথে সাথে, রামায়ণের কথাকে বিকৃত করে করে, বাল্মীকিকে নয়, রামকে অবতার বলা শুরু করলেন আর তাকে নিজেদের আরাধ্য আত্মের রজোগুণ অর্থাৎ নারায়ণের অবতার বলে বিস্তার করার প্রয়াস করলেন আর্যরা।
বাল্মীকি রামায়ণকে অবলুপ্ত করতে ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠলো আর্যরা, কারণ প্রকৃত বাল্মীকি রামায়ণ থাকলে, আর্যদের, বৈদিকদের যে আর নাম ছেড়ে দাও, কনো চিহ্নই অবশিষ্ট থাকবেনা। এক বৌদ্ধ ও তন্ত্রের কারণে তাঁদের প্রতি অবিশ্বাস জন্মেই গেছে। তার সাথে সাথে যদি রামায়ণ ও মার্কণ্ড মহাপুরাণ সকলের কাছে প্রকাশিত হতে শুরু করে, তাহলে যে আর্য জাতিই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।
তাই মরিয়া হয়ে রামায়ণকে বিকৃত করার আর মার্কণ্ড মহাপুরাণকে অবলুপ্ত করার প্রয়াস করলে, উপনিষদের কথা প্রায় ভুলেই যায় ব্রাহ্মণরা। আর ঠিক সেই স্থানেই আঘাত আনলেন মৃষুর পরবর্তী ১৬ কলা অবতার, যিনি পিপলাদপুত্র পুলস্তের ঔরস ধারণ করে দ্বৈপায়ন রূপে জন্ম নিলেন উৎকলের বর্তমানে রাউরকেলা অঞ্চলে।
উপনিষদকে ধারণ করে করে, দ্বৈপায়ন হয়ে উঠলেন মহাজ্ঞানী, আর তাঁর মহাজ্ঞান প্রকাশিত হলো জয়া রূপে। একের পর এক পুরাণ দ্বারা দ্বৈপায়ন সম্পূর্ণ ভাবে বেদকেই ভেঙে তছনছ করে দিলে, তাঁর নাম হয় ব্যাস, বেদব্যাস, অর্থাৎ যিনি বেদকে ভেঙে গুড়িয়ে দিয়েছেন। অবলুপ্ত প্রায় মার্কণ্ডপুরাণকে পুনর্জীবিত করার প্রয়াসে মার্কণ্ড পুরাণ রচনা করলেন তিনি, তো তন্ত্রকে আঘাত করার প্রয়াস থেকে তন্ত্রকে রক্ষা করার জন্য দেবীপুরাণের রচনা করলেন।
মার্কণ্ড কথাকে দেবীপুরাণ, বিষ্ণুপুরাণ, শিবপুরাণ, স্কন্ধপুরাণ, গরুড়পুরাণ, তথা জয়া দ্বারা সম্পূর্ণ ভাবে ব্যক্ত করলে, অজ্ঞানী আর্যরা তা বুঝতেও পারলেন না। আর্যরা ভেবে গেলেন যে মার্কণ্ড মহাপুরাণ বিনষ্ট হয়ে গেছে, কিন্তু দ্বৈপায়নের সমস্ত পুরাণের মধ্যেই বিস্তৃত রয়ে গেল মার্কণ্ড মহাপুরাণ, অর্থাৎ তাঁর রচিত সমস্ত পুরাণকে একত্রিত করলে, আর তার প্রত্যক্ষের অন্তরালে স্থিত পরোক্ষকে ধারণ করলেই, সম্মুখে যা পরে থাকে, তা হলো মার্কণ্ড মহাপুরাণ, আর তার সম্যক দর্শন রূপে সমানে এঁদের অভ্যন্তরে বয়ে চলে উপনিষদ।
কিন্তু তা আর্যদের কাছে অধরাই থেকে গেল। না জানতে পারলো তারা, আর না বুঝতে পারলো। কিন্তু যা বুঝতে পেরেছিল তারা, তা হলো জয়ার ব্যপ্তি। প্রকৃতি সর্বস্ব সেই গ্রন্থ, বিবেক সেখানে শ্রীকৃষ্ণ আর স্বয়ং প্রকৃতি সেখানে কৃষ্ণা বা দ্রৌপদী। পঞ্চভূত সেখানে পঞ্চপাণ্ডব, যার মধ্যে অর্জুন হলেন স্বয়ং মেধা। আর তার সাথে সাথে সমস্ত আত্মগুণ, অর্থাৎ ত্রিগুণ, ছায়া, তথা আবেগদের দমন প্রক্রিয়া শিখিয়ে গেলেন তিনি।
আর্যরা তা বুঝেও বুঝলেন না। আর্যদের আরাধ্য হলেন শিব ও বিষ্ণু, যারা হলেন আত্মের ত্রিগুণের দুই অন্যতম গুণ। সেই বিষ্ণুর সেবক হলেন বসু, আর সেই বসুর অন্যতম দ্যয়ুই বশিষ্ঠের থেকে অভিশাপ লাভ করে হলেন ভীষ্ম এবং সম্পূর্ণ জয়ার অন্যতম আত্মপক্ষ, যার নিধন স্বয়ং মেধা অর্থাৎ অর্জুন করেন, বিবেক অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণের মার্গদর্শনে। তা বুঝেও বুঝতে পারলো না আর্যরা।
শিবের বরদানে গান্ধারী পেলেন ১০১টি সন্তান, আর তারা হলেন সমস্ত আবেগ। ব্যাস স্পষ্ট ভাবে বলে দিলেন যে, তমগুণের থেকেই সমস্ত আবেগের জন্ম হয়, আর তাদেরকে পঞ্চভূতদ্বারা বিবেকের মার্গদর্শন অনুসারে এবং প্রকৃতির নির্দেশনা মেনে দমন করতে হয়, আর সেই দমনপ্রক্রিয়াই হলো কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ। কিন্তু আর্যদের তা বোধগম্য হলো না, আজও হয়নি। কিন্তু প্রকৃতির গুণগান করা হচ্ছে, তা ছিল স্পষ্ট কারণ প্রতিটি ক্ষেত্রে, অর্থাৎ দ্রৌপদির জন্মের ক্ষেত্রে, কৃষ্ণের জন্মক্ষণে মহামায়ার কীর্তি অত্যন্ত স্পষ্ট, আর সাথে সাথে অবতার ঘোষণা করার কালে, কনো বৈদিক দেবের নাম উল্লিখিত নেই।
তাই আবারও আর্যরা ব্যস্ত হয়ে উঠলো জয়াকে বৈদিক গ্রন্থ রূপে আখ্যা দেবার জন্য। বৈশম্পায়নের দ্বারা জয়াকে ভারতরূপে প্রকাশ করলো আর উগ্রসভার দ্বারা তাকে মহভারত করে ৬০ হাজার শ্লোকের জয়াকে ১ লক্ষ শ্লোকের মহভারত রূপ প্রদান করে, তাতে সমস্ত বৈদিক দেবদের নাম ও জয়ঘোষ স্থাপন করলো। একের পর এক আমার অবতারদের প্রয়াসকে এড়িয়ে যেতে থাকলো আর বিফল করতে থাকলো আর্যরা, আর তারা এই ভাবতে থাকলো যে, তারা আমার অবতারদেরকে ব্যর্থ করে দিয়েছে।
কিন্তু তারা এটা আজও বোঝেনি যে, প্রকৃত অবতার কারা, আর এটাও বোঝে নি যে, এই প্রতিটি অবতার আমার আদরের মৃষু কেন নিয়েছিল, নিজের প্রাণ যাতে বসে সেই মায়ের থেকে বার বার দূরে চলে গিয়ে। … তারা আজও এই ভেবে যায় যে, প্রকৃত অবতার হলেন পার্বতী, কিন্তু প্রকৃত অবতার যে মার্কণ্ড, তা তারা একপ্রকার নিজের মুর্খামির জন্যই জেনে উঠতে পারেনি। একই ভাবে রাম ও কৃষ্ণকেই তারা অবতার মেনে গেল, কিন্তু প্রকৃত অবতার যে বাল্মীকি ও ব্যাস, তা তারা অনুভবও করে উঠতে পারেনি আজ পর্যন্ত”।
মীনাক্ষী বেখেয়ালে মৃদু হেসে বলল, “ঠিকই বলেছ মা, নিজেদের মুর্খামির জন্যই আর্যরা জানেনি। … কাহানীকার চরিত্রের রচনা করেন, আর সেই প্রতিটি চরিত্র তিনি স্বয়ং হন। সত্য হলেন কাহানীকার, কাহানীর চরিত্র নন। কাহানী তো তাঁর অন্তরে চলে যাওয়া সংগ্রামের কথা হয়, আর সেই কথা বলার কালে নিজের অন্তরের মলরা হয় রাবণ আর মিত্ররা হয় রাম। কিন্তু কেবলই নিজেদের মুর্খামির জন্য, কাহানীকারের দিকে না তাকিয়ে কেবলই কাহানীর আর কাহানীর চরিত্রের দিকে তাকিয়ে থাকলো তারা। এটা মুর্খামি ব্যতীত আর কিছুই নয়। … (একটু থেমে থেকে) কিন্তু মা, তুমি তো জানতে তারা এই কথা বুঝবেনা। মানে তোমার মায়াতেই তো বদ্ধ ছিল আর্যরা, সেই কারণেই তো তারা এই সত্য বুঝতে পারেনি! … আর তুমি এও বললে যে, সমস্ত অবতারের অবতরণের একটি বিশেষ উদ্দেশ্য ছিল, সেটা কি মা?”
মাতা সর্বাম্বা মীনাক্ষীর চেতনাউদ্দীপ্ত মেধাকে দেখে তৃপ্তির হাস্য হেসে বললেন, “ঠিকই বলেছিস, আমার মায়ার কারনেই তারা বুঝতে পারেনি, কিন্তু জানিস আমার মায়াতে কারা বদ্ধ? (হেসে) যারা অজ্ঞানতার আরাধনা করে তারা। যারা সত্যের আরাধনা করে, তাদের কাছে আমার মায়া হলো বরদান, তাই তারা আমার মায়াকে ঠিক সেই ভাবে সনাক্ত করে যেই ভাবে এক্ষণে তুই করলি। কিন্তু যারা অজ্ঞানতার চর্চা করে, তারা আমার মায়াতে বিভ্রান্ত আর তাই তাদের উপরই আমার মায়া ক্রিয়াশীল।
আর রইল কথা, কেন এমন মায়ার বিস্তার করলাম, তাই তো! এর পরবর্তী মৃষুর অবতরণে আমি বৃহত্তর সত্য ঘোষণা করবো মানবের কাছে। তাই এঁদেরকে এই কাহানীর চরিত্রদের মধ্যেই আবদ্ধ করে রাখলাম, যাতে এরা মনে করতে থাকে যে অবতার মানেই যোদ্ধা। … আর পরের তিনখান মৃষুর অবতরণকে বৃহত্তর সত্য ঘোষণা এই কারণে করাবো, কারণ তারপরবর্তীতে স্বয়ং মৃষু আসবে। সে তো একাধারে পূর্ণ সত্যের বিবরণ দেবে আবার মহাযোদ্ধাও সে। সকলের অগোচরেই মানবজগতের তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু করে যাবে। তাই এই মায়ার স্তরের রচনা।
আর এই প্রতিটি অবতার কেন? মৃষুর জন্য, মানে তোর ব্রহ্মসনাতন প্রভুর জন্যে। সে পূর্ণ অবতার আমার। পূর্ণ ৯৬ কলা ধারণ করবে। কিন্তু সীমিত সময়ের মধ্যে সে যেমন সম্যক সত্যকে উদ্ধার করে বলে যাবে, যা এখন আমি তোদেরকে বলে চলেছি, তেমন সে সেই স্বল্প সময়তেই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনাও করবে। তাই তাঁর বিস্তর কর্ম, অর্থাৎ সমস্ত জীবন সত্য উদ্ধার করার পিছনে ব্যয় করলে তাঁর চলবে না। সেই কারণে এই সমস্ত অবতারদের মাধ্যমে সত্য উদ্ধারের সিঁড়ির রচনা করে রাখার জন্যই এঁদের অবতরণ।
যেমন তোদের বলেছিলাম, মেধার জন্ম দেবার জন্য বাকিদের জন্ম দেওয়া, তেমনই করে ব্রহ্মসনাতনের জন্ম দেবার কারণেই এই এতো লীলা, এতো অবতার, এতো মায়া, এতো ভ্রম, এতো কিছু আয়োজন”।
সর্বশ্রী তৃপ্ত ভাবে হেসে বললেন, “বেশ মা, তাহলে তোমার পরবর্তী মায়া বিস্তারের কথারও বিবরণ প্রদান করো। শুনে আপ্লুত হই আমরা”।
