২৩.৩। যোনিবিস্তার পর্ব
মাতা সর্বাম্বা বলতে থাকলেন, “ধরিত্রী যখন পূর্ণতা প্রস্তুত হয়ে গেলেন, তখন থেকে আমার মেধার বিস্তারের পটভূমিও সজ্জ হয়ে গেল। অর্থাৎ ধরিত্রীর মধ্য থেকে যখন আমার মেধা প্রকাশিত হয়ে চেতনা হয়ে উঠে প্রকৃতি হয়ে উঠলো, এবং নিয়তিকে ধারণ করে নিতে সক্ষম হলো ধরিত্রী, তখন ধরিত্রী স্বয়ং আমার কাছে উপস্থিত হয়ে, ঠিক যেমন করে তোমাদের প্রভু ব্রহ্মসনাতন বলেছিলেন, তেমন ভাবেই বলেছিলেন, ‘মাতা, এবার আমাকে মাধ্যম করে, আপনি আপনার অন্যঅন্য পঞ্চভূত খণ্ডকে স্থাপন করুন, আর তাদের মধ্যে সত্যকে প্রকাশিত করা শুরু করুন’।
আত্ম ও আত্মের পরিবার সর্বদাই আমার কাছে আসার প্রয়াস করছিল, মেধাকে দমন করার জন্য, আর নিজের আধিপত্য বিস্তার করার জন্য। তার সেই প্রয়াসকেই এবার আমি সম্মতি প্রদান করলাম, কারণ আমাকেও এবার তাকেই ধারণ করতে হবে, এবং তাকে ধারণ করে, আমার পঞ্চভূতের উপর তার যেই প্রভাব, তার কারণে আমার পঞ্চভূতদের যেই আড়ষ্টতা, যেই শঙ্কা, তা দূর করতে হতো।
ধরিত্রী যেইকালে এই সংগ্রাম করে, জয়লাভ করেছে; যেইকালে সে নিজের মধ্যে সপ্তলোকের নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছে এবং যেই ভাবে আত্মের সাথে সংগ্রামে আত্মকে সম্পূর্ণ ভাবে পরাস্ত করে সত্যকে ধারণ করেছে, সেহেতু ধরিত্রীই সক্ষম আমার বাকি সমস্ত ধরাটুকরোর থেকে মেধাকে প্রকাশিত করতে, এবং মেধাকে চেতনাস্বরূপ করে তুলে, সত্যকে প্রত্যক্ষ করে দিতে তার সম্মুখে।
ধরিত্রী যেইকালে আত্মের অধিকার স্থাপনকে উপেক্ষা করে মেধাকে ধারণ করে, মেধাকে সম্যক প্রকৃতি বেশে স্থাপন করতে সক্ষম হয়, সেইকালে, বাকি সমস্ত এমন গ্রহরাও প্রয়াস করে ধরিত্রীকে অনুসরণ করার, যাদের মধ্যে অধিকতর গ্রহই সেই সংগ্রামে পরাস্ত হয়ে, আত্মের দাস হয়েছে। আর তারা সকলেই একে একে বিনষ্ট হয়ে যেতে প্রস্তুত, কারণ তারা তাদের সংগ্রামে পরাস্ত। সেখানে এখনো বেশ কিছু গ্রহ সেই সংগ্রাম জারি রেখেছে, আর এখনো প্রয়াস করে যাচ্ছে যাতে ধরিত্রীর মত করেই সংগ্রামে জয়লাভ করতে পারে তারা।
যেই সমস্ত গ্রহ ইতিমধ্যেই নিজেদের ভূতবন্ধন নষ্ট করে ফেলেছিল, তারা এবার ধরিত্রীর সাথে একত্রিত হয়ে আমার কাছে এসে উপস্থিত হয়ে বললেন, ‘মাতা, আমরা আমাদের সংগ্রামে ব্যর্থ হয়েছি, কিন্তু ধরিত্রী সক্ষম হয়েছে নিজের সংগ্রামে। তাই আমরা আপনাকে ও দেবী ধরিত্রীকে অনুরধ করছি যাতে তিনি আমাদেরকে ধারণ করে নেন। আমরা সকল ধরাখণ্ড ও মানসখণ্ড সূক্ষ্ম আকারে ধরিত্রীর সাথে একত্রিত হবো, এবং ধরিত্রীরই উপাদান হয়ে বিরাজ করবো।
ধরিত্রী আমাদেরকে ধারণ করে করে নিজের বক্ষেই বহু জীবন ধারণ করবে, আর সেই প্রতিটি জীবন ধরিত্রীর থেকে মার্গদর্শন লাভ করেই, ঠিক একই ভাবে আত্মের সাথে সংগ্রামে রত হবে। দেব ধরিত্রী মেধাকে প্রকাশিত করতে সক্ষম হয়ে, সম্পূর্ণ পঞ্চভূতের জননীরূপ হয়ে গেছেন। তাই তাঁর বক্ষে স্থিত থাকলে, তাঁর মার্গদর্শনে আমরাও মেধাকে ধারণ করতে সক্ষম হবো। আর তা করতে পারলে, আমরাও সত্যলাভ করার প্রয়াস করে করে, দেবী ধরিত্রীর ন্যায় সত্যলাভের উদ্দেশ্যে ধাবিত হতে পারবো’।
ধরিত্রী সত্যলাভ করে মুক্ত, তাই আমি তাঁকে মুক্ত হয়ে আমার মধ্যে লীন হওয়া থেকে বাঁধা দিতে পারিনা। কিন্তু ধরিত্রী স্বয়ং আমার সম্মুখে এসে বললেন, ‘মাতা, সত্য প্রত্যক্ষ করার অন্তে আমি নিয়তি হতে যা জেনেছি, সেই অনুসারে, আমি একাকী মুক্তি লাভ করলে, আত্মের থেকে মুক্ত হয়ে গেলাম, কিন্তু আপনার উপর আত্মের চোখরাঙ্গানি বন্ধ হলো না।
এই চোখরাঙ্গানি ততদিন বন্ধ হবেনা, যতদিন না আপনার মেধা সমস্ত ক্ষেত্রে জাগ্রত হয়ে প্রকৃতি হয়ে উঠছে। তাই মা, মুক্তি লাভ করে, আপনার মধ্যে লীন হয়ে গিয়ে স্বার্থপর হয়ে উঠতে পারবো না। আমাকে অনুমতি প্রদান করুন যাতে, আপনার সমস্ত কণার মধ্যে মেধার প্রকাশ করার যজ্ঞে আমি অবধুত হয়ে উঠতে পারি। … এই সমস্ত ধরা-মানসদের আমি আমার মধ্যে সূক্ষ্ম ভাবে ধারণ করে, প্রকাশিত করতে থাকবো আলাদা আলাদা জীবন রূপে। আর এঁদের মধ্যে, ঠিক আমার মধ্যে যেই ভাবে আপনি সপ্তলোকের নির্মাণ করে, মেধাকে যাত্রা করিয়ে প্রকৃতি রূপে বোধ করিয়েছেন, সেই ভাবেই তাঁদের মধ্যে একই বোধ করাবেন।
হ্যাঁ সূক্ষ্ম তাঁরা, তাই বারংবার স্থূল দেহগঠন হবে, আর বারবার তাদের দেহগঠন বিকৃত হবে, বিনষ্ট হবে। তবে আমি আবার সেই সূক্ষ্মউপাদানসমূহকে ধারণ করে করে, স্থূল রূপে প্রকাশিত করবো আপনার কৃপায়, আর তাই আপনি সপ্তলোককে প্রকাশিত করতে সময় পেয়ে যাবেন’।
অন্য ধরাখণ্ডরা বললেন, ‘দেবী, যদি আমাদের অনুমতি প্রদান করেন, তাহলে যেই ধরাখণ্ডরা এখনো প্রয়াস ছাড়ে নি সংগ্রাম করার, তাদের কাছেই আমরা প্রস্থান করে, আপনার কাছে আসার ও আপনার কর্মে যুক্ত হবার জন্য মানাতে পারি’।
দেবী ধরিত্রী বললেন, ‘জীবন মাত্রই নশ্বর। তাই একদিন আমাকেও আমার এই আকৃতি ত্যাগ করতেই হবে। তাই যারা এখনও প্রয়াস করছেন, তাদের প্রয়াস করতে দিন যাতে আমার দেহত্যাগের পরেও আপনাদের এই যাত্রা অক্ষুণ্ণ থাকে, আর মাতার সম্পূর্ণ মেধাকে আমারই মত প্রয়াস করে করে প্রকাশিত করাতে উদ্যমী হতে পারে তারা’।
এহেন কথনে সম্মত হলে, সেই সকল ধরামানস ধরিত্রীর বক্ষে সূক্ষ্ম আকারে বিরাজ করলে, সেই সমস্ত সূক্ষ্ম ধরা-মানসদের তোমরা বলে থাকো বায়ুমণ্ডলী। আর তখন থেকে শুরু হয় এই ধরিত্রীর বুকে জীবন সংগ্রাম, অর্থাৎ যোনিপ্রকাশ”।
মীনাক্ষী প্রশ্ন করলেন, “এর অর্থ মা, ধরিত্রীর ন্যায় আরো অন্য গ্রহ এখনো সংগ্রাম করে চলেছে মেধাকে ধারণ করতে ও প্রকৃতি হয়ে উঠতে! … তা অন্য কেউ এই সংগ্রামে সফল হয়নি! … যদি না হয়, তাহলে কি হবে?”
মাতা হেসে বললেন, “না এখনো কেউ সফল হয়নি, তাই যোনি বিস্তার একমাত্র এই ধরিত্রীতেই অবস্থান করছে। যদি কেউ সফল হয়, তাহলে ধরিত্রী নিজের কর্মের দায়িত্ব সেই গ্রহকে সঁপে দিয়ে আমার মধ্যে বিলীন হতে পারবে, যা তার পূর্ণ অধিকারও বটে। আর যদি ধরিত্রীর ক্ষয়লাভ করা পর্যন্ত কনো অন্যগ্রহ প্রস্তুত না হতে পারে, তাহলে এই যে জীবনসংগ্রাম চলছে আজ, সেই উদ্যমে ভাঁটা পরে যাবে।
আবার কবে একটি ধরিত্রী শোভিত হবে, তবেই সেই উদ্যম শুরু হবে। আর শুধু ধরিত্রী শোভিত হলেই তো হলো না, ধরিত্রীর ন্যায় স্বার্থত্যাগীও তো হতে হবে! ধরিত্রী তো আমার মধ্যে লীন হবার জন্য সম্পূর্ণ ভাবে যোগ্য হয়ে গেছে, কিন্তু সে স্বার্থ ত্যাগ করে, সমস্ত যোনির মাতা হয়ে বিরাজ করে চলেছে আর তার সংকল্প ও সামর্থ্য অনুসারে, আরো বহু বহু সন সে এই স্বার্থত্যাগ করে যেতে উদ্যমী”।
মীনাক্ষী বেদনাচিত হয়ে বললেন, “এর অর্থ, তোমার বেদনার অন্ত, আমাদের হাতে কি কিচ্ছু নেই! … আমরা কি কিচ্ছু করতে পারিনা এই ক্ষেত্রে! যেমন ধরিত্রী মাতা করছেন?”
মাতা সর্বাম্বা হেসে বললেন, “করছেন তো। সেই মানুষটির নাম ছিল হুরিব্বা। এখন যেই অঞ্চল সাগরের তলে, সেই অঞ্চলের অধিবাসী ছিলেন তিনি। আজ থেকে প্রায় দুই লক্ষ বছর আগের কথা। হুরিব্বা ঠিক যেমন করে ধরিত্রী নিজের অন্তরে সম্পূর্ণ সপ্তলোকের যাত্রা করে মুক্ত হয়েছে, তেমন করেই নিজের অন্তরে সমস্ত সপ্তলোকের যাত্রা সম্পন্ন করে, আর তা করার পরে, সেও মুক্তি নিয়ে না চলে গিয়ে, ধরিত্রীর মত করেই, অবস্থান করে।
মুক্ত হবার পরে, তাকে আমি নাম দিয়েছিলাম মৃষু। আর সেই মৃষুই সমস্ত অবতার হয়ে আসেন, যুগে যুগে। সে-ই ২৫টি নবী হয়েছিল, ২৮টি বুদ্ধ হয়েছিল, ২৭টি তীর্থঙ্কর হয়েছিল; ঈশা, গোবিন্দ হয়েছিল, মার্কণ্ড, ব্যাস, বাল্মীকি হয়েছিল; শঙ্কর, চৈতন্য, রামকৃষ্ণ হয়েছিল; আর এই কিছুদিন আগে সে পূর্ণঅবতার রূপে ব্রহ্মসনাতন হয়েছিল। পূর্ণরূপে স্থিত হয়েছিল, তাই আমার দেওয়া মৃষু নামকে সে পুনরায় ধারণ করে পুনরায় মৃষু হয়েছিল।
যেমন ধরিত্রী অঙ্গিকার করে বসে রয়েছে, যতক্ষণ তাঁর ধরা-মানসের সংযোগ থাকবে, ততক্ষণ সে আমার অন্য ধরা-মানসের সংগ্রামকে ধারণ করে থাকবে, তেমন করেই মৃষুও সংকল্প নিয়ে আছে যে, যতক্ষণ তার ধরা-মানসের সংযোগ থাকবে, ততক্ষণ সে বারে বারে অবতার হয়ে আসবে আর বারবার আমার অন্য ধরা-মানস সংযোগকে সংগ্রাম করে জয়লাভ করার প্রেরণা দিতে থাকবে।
আমার এই দুই সমর্পিত প্রাণপ্রিয় সন্তান থাকতে, আমিও বিশ্বাসী যে, এক না একদিন আমার সমস্ত মেধা প্রকাশিত করবেই এঁরা। … জানিনা কি ভাবে, কিন্তু এঁদের প্রকাণ্ড প্রয়াস আর আমার প্রতি অসম্ভব প্রেম আমাকে বাধ্য করে বিশ্বাস করতে যে, এক না একদিন এই দুই সন্তানই আমার আরো এমন সন্তানকে প্রকাশ্যে আনবে, আর একদিন তাঁরা এমন ভাবে আমার এক শত সন্তান করে তুলবে। আর সেই একশত সন্তান একদিন নিশ্চিত ভাবে আমার সমস্ত মেধাকে প্রকাশ্যে আনবেই”।
মীনাক্ষী উঠে দাঁড়িয়ে পরলেন ও মাতা সর্বাম্বাকে জরিয়ে ধরে বললেন, “মা, ইচ্ছা তো আমারও করে এমন অঙ্গিকার করতে। কিন্তু প্রভুকে আমি সম্যক দেখেছি। তাঁর ন্যায় সাহস আমার এখনও হয়নি। … কিন্তু মা, সাহস না থাকলেও, তিনিই আমার প্রেরণা, আমার অনুপ্রেরণা। দিবারাত্র তাঁকে তোমার প্রেমে উন্মত্ত থাকতে দেখেছি। খুব বোঝার প্রয়াস করেছি যে, প্রেম ঠিক কি, কিন্তু বুঝতে পারিনি। … যোনির বিস্তার বলবে তুমি এখন জানি। তাও সেই কথা শুরু করার পূর্বে, একমুহূর্ত থেমে গিয়ে আমাকে কৃপা করে ব্যখ্যা করবে, প্রেম ঠিক কি?”
মাতা হেসে বললেন, “প্রেম! প্রেম মানে অনন্ত বিরহ”।
মীনাক্ষী আশ্চর্যচকিত হয়ে বললেন, “কিন্তু মা, প্রভুকে দেখেছি, একদণ্ডও পামুড়ে বসতেন না। অবিরাম কিছু না কিছু করে যেতেন। আর পা মুড়ে বসলেই, তোমার কাছে চলে যেতেন সমাধির সন্ধানে”।
মুচকি হেসে মাতা সর্বাম্বা হেসে বলেন, “সঠিকই তো মীনাক্ষী। ব্যাথা লাগলে, তবেই তো মানুষ তৎপর হয়ে ওঠে, তাই না! যখন মানুষ ব্যাথা পায়না, তখন কি আর সে তৎপর হয়ে ওঠে! তখন তো শিথিল হয়ে থাকে মানুষ, আরাম আরাম করে কাজ করেন। কিন্তু যখন ব্যাথা বা বেদনা লাভ করেন তখন সেই ব্যাথার নিরাময়ের জন্যই হোক, বা সেই বেদনার পীড়ার কারণেই হোক ছটফট করতে থাকে। …
তোমার প্রভুও তো তেমনই বেদনার জ্বালায় অস্থির হয়ে প্রচণ্ড গতি ধারণ করে কর্ম করতেন। অর্ধেক জীবন সে আমার সাখ্যাত লাভ করতে পারছেনা, আমার বেদনার কারণ জানতে পারছেনা, তাই ছটফট করেছে, আর বাকি অর্ধেক জীবন, যখন সে আমাকে সম্পূর্ণ ভাবে ধারণ করে নিয়ে স্বয়ং আমি হয়ে বিরাজ করে, তখন প্রচণ্ড গতি ধারণ করে, আমার বেদনার জন্য ছটফটিয়ে কর্ম করে যেত”।
বিজয়া প্রশ্ন করলেন, “কিন্তু মা, এই বেদনার কারণ কি? এই বেদনার উৎস কি?”
মাতা সর্বাম্বা ভাবের মধ্যে স্থিত হয়ে, হাস্যসহকারে বললেন, “প্রেমের বেদনা! … প্রেমে একটিই কারণে বেদনা জন্ম নেয়, আর তা হলো পৃথক অস্তিত্ব। নিজের প্রেমের থেকে পৃথক থাকতে হওয়ার বেদনাই প্রেম। নিজের অস্তিত্বই এখানে বেদনার একমাত্র কারণ। মীনাক্ষী, তুমি প্রভুর সেই দশার শেষ অধ্যায় মাত্র দেখেছিলে, যখন তিনি আমার প্রেমে ছটফট করছিলো। আমিই একমাত্র অস্তিত্ব, তা জেনে ফেলার পর, তোমার প্রভু বেদনায় অস্থির হয়ে উঠেছিল সেই কালে, কারণ তার কাছে একটি পৃথক অস্তিত্ব বর্তমান।
প্রেমী হলেন সত্যস্বরূপ, আর তাই প্রেমীর কাছে নিজের পৃথক অস্তিত্ব থাকাই হয়ে ওঠে বেদনার কারণ, কারণ তাঁর কাছে এটি স্পষ্ট হয়ে যায় যে , তাঁর এই পৃথক অস্তিত্ব থাকার কারণেই, তিনি তাঁর প্রেমের সাথে একাত্ম হতে পারছেন না, তিনি তাঁর প্রেমের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে রয়েছেন।
তোমার প্রভুর ক্ষেত্রেও ঠিক তেমনই হয়েছিল। জীবনের প্রথম অবস্থায়, যখন সে শিশু, বালক, বা কিশোর ছিল, তখনও তার বেদনা ছিল এই যে সে আমার থেকে কেন পৃথক, কেন আমার সাথে সে একাত্ম নয়। তখন এই ভাব ছিল যে, মায়ের থেকে আমি পৃথক তাই মায়ের বেদনার খবরই পাচ্ছিনা। আর পরের দিকেও ভাব সেই একই, আমার থেকে সে পৃথক কেন। সেই কালে তার জ্ঞানচক্ষু উন্মেলিত হয়েছিল, তাই সে স্পষ্ট জানতো, আমিই একমাত্র অস্তিত্ব, আর তার বেদনা ছিল এই যে, সে একটি পৃথক অস্তিত্ব হবার কারণে আমার থেকে বিচ্ছিন্ন।
পরে যখন তাঁর সমাধি হয়, এবং সময়ে সময়ে সমাধি হতে থাকতো, সে আনন্দলাভ করতো, কারণ সমাধির কালে সে আমার সাথে একাকার হয়ে যেত, আর তার পৃথক অস্তিত্ব থাকতো না। কিন্তু সমাধি হলে, দেহের আয়ুর উপর অত্যন্ত চাপ পরে, দেহের অস্থি, নলি, এবং সমস্ত শিরা উপশিরার উপর, ধমনীর উপর এবং হৃদপিণ্ডের উপর ভয়ানক চাপ পরে। তাই আমি তাকে অনেক বোঝাতাম যে, এতো নিত্য সমাধি তোমার জন্য ভালো নয়।
কিন্তু প্রেমীকে কি আর বোঝানো সম্ভব! আমার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে হবার কারণে যে তার অপরিসীম পীড়া হতো, আর সেই পীড়ার কারণে অক্লান্ত পরিশ্রম করতে থাকতো। তাই আমিও আর তার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে পারতাম না। যেই বেদনায় সে পীড়িত থাকতো, সেই একই বেদনায় আমিও পীড়িত থাকতাম, তাই বাধ্য হয়েই সময়ে সময়ে সমাধির জন্য আমি নেমে আসতাম, আর আমার হাত ধরে তার সমাধি হতো।
কিন্তু এই হাত ধরার কারণে, ক্রমে ক্রমে সে নিজের অস্তিত্বকে কেবল পীড়া ভোগ করার জন্য রেখে দিয়ে, কর্ম করার কালে সম্পূর্ণ ভাবে নিজের অস্তিত্ব ভুলিয়ে দিতে থাকলে, একসময়ে সে আমার সাথে অভিন্ন হয়ে ওঠে। আর তখন সে আমার সম্পূর্ণ বেদনাকে ধারণ করতে সক্ষম হয়ে, একপ্রকার উন্মত্ত হয়ে ওঠে আমার সন্তানদের আমার কাছে ফিরিয়ে আনার জন্য।
মানবযোনির নাশের কামনা করেছিল সমস্ত ৮৪ লক্ষ যোনি, আর সেই কারণেই এবারে তার অবতরণ হয় পূর্ণ ৯৬ কলা রূপে, যাতে সম্পূর্ণ সত্য ব্যক্ত করে যেতে পারে মানবযোনির জন্য, মানবযোনিকে অন্তিম সুযোগ প্রদান করার জন্য। সর্বজ্ঞ হয়ে গেছিল সে, কারণ সে আমার সাথে অভিন্ন হয়ে গেছিল। আর তাই সে স্পষ্ট ভাবেই জানতো যে, একবার মানবযোনির নাশ হয়ে গেলে, আর এইরূপ সম্পূর্ণ সপ্তলোক জাগ্রত যোনির নির্মাণ করা এক দুষ্কর কর্ম।
সেই দুষ্কর কর্মের আড়ালে আমাকে সেই অবধিকালে সম্পূর্ণ ভাবে শূন্যকোল হয়ে স্থিত থাকতে হবে। তা প্রত্যক্ষ করে, উন্মত্তের মত, আমার কোলে মানবকে স্থিত রাখার জন্য পরিশ্রম করতে থাকে। নিশ্চয় করে সে যে, ধনের কাছে পরাধীনতার কারণেই মানবযোনি প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তাই এমন একটি সমাজ আবশ্যক যা ধনের পরাধীনতা থেকে মুক্ত হবে। তবেই আমার পক্ষে সেই গুটিকতক মানবকে বাঁচিয়ে রেখে, বাকি সমস্ত মানবের নাশ করে, মানবযোনিকে একটি সম্পূর্ণ নূতন প্রভাত প্রদান করা সভব হবে।
তাই সে মরিয়া হয়ে সেই কর্মে নিযুক্ত হয়। …(অন্তরে হাস্য প্রদান করে মাতা পুনরায় বললেন) বুঝতে পারছো, কি অদ্ভুত প্রেম তার। নিজের জীবন তখনও বাঁচে নি সে যখন সে আমার বেদনার সন্ধান করে চলেছিল। দিবারাত্র কেবল আমার বেদনা জানার জন্য দৌড়ে বেড়িয়েছে। যখন আমার বেদনার কথা জানলো, তখনও নিজের জীবন বাঁচলো না। আমার বেদনার নিরাময়ের সন্ধানে বাকি জীবন বেঁচে গেল সে।
জানি না, ধরিত্রীর কাছে, মৃষুর কাছে আমি যতটা ঋণী, সেই ঋণ আমি কি করে শোধ করবো! … প্রতিমুহূর্তে এঁরা আমাকে অধিক থেকে অধিক ভাবে ঋণে জর্জরিত করে চলেছে, যেন তারা চায়ই না যে আমি তাদের ঋণ পরিশোধ করি। …(মৃদু হেসে) তাই পুত্রী, বেদনা। বেদনাই হলো প্রেমের প্রকৃত চরিত্র। প্রেম হলো শ্রেষ্ঠ সম্ভব বেদনা, কারণ সেই বেদনার পরিমাপ করার প্রয়াসও নির্বুদ্ধিতা”।
মীনাক্ষী একটি কথাও বললেন না। চুপ করে থাকলেন। মাতা সর্বশ্রী বললেন, “মা, এবার তুমি যোনিবিস্তারের কথা বলো আমাদেরকে। সেই প্রজ্ঞা প্রদান করো”।
মাতা সর্বাম্বা সেই কথা শুনে, নিজের আসন ত্যাগ করে মীনাক্ষীর সামনে ভূমিতে বসে পরলে, সকলে ইতস্তত করলেন, কারণ মাতা তাঁদের সাথে একসাথে ভূমিতে বসে পরেছেন বলে। … সেই অস্বস্তি বুঝে মাতা সর্বাম্বা সকলের উদ্দেশ্যে বললেন, “মা আমি, গুরু নই যে আমাকে উচ্চাসনে বসতে হবে। সকলে মুখ দেখতে পাবে তাই উঁচু আসনে বসেছিলাম। নয়তো আমার তো আমার সন্তানদের সাথে সর্বক্ষণ একসাথে থাকাতেই আনন্দ”।
সেই কথাতে আশ্বস্ত হলেও একটু কুণ্ঠা অবশিষ্ট থেকে গেল সকলের মধ্যে। কিন্তু মীনাক্ষীর সেই নিয়ে কনো কুণ্ঠা নেই। তিনি অনায়সে মাতার উদ্দেশ্যে বললেন, “মা, তুমি কি তাঁদের ঋণ শোধ করতে পারছো না বলে, চিন্তায় থাকো!”
মাতা সর্বাম্বা হেসে, মীনাক্ষীর মাথায় স্নেহের হাত রেখে বললেন, “এমনিই আমার যা বেদনা, তাকে ধারণ করে ধরিত্রী, মৃষু উন্মত্ত হয়ে থাকে। আবার নতুন করে বেদনা ধারণ করলে, বুঝতে পারছিস মা, এঁদের কি অবস্থা হবে! … আর রইল কথা চিন্তা করা, … না মা, এই নিয়ে চিন্তা করলে, তাদের অনাবিল নিঃশর্ত প্রেমকে অপমান করা হয়। তারা তো আমার থেকে কিচ্ছু বলতে কিচ্ছু কনোদিন চাইনি বিনিময়ে। বরং যা প্রদান করেছি, যা প্রদান করিনি, সমস্ত কিছুর ক্ষেত্রেই বলে গেছে, মা দিয়েছে মানে ভালোর জন্যই হবে, মা দেয়নি মানে ভালোর জন্যই হবে।
(হেসে) এঁদের জন্য সচেষ্ট থাকি সর্বক্ষণ, যাতে যতটা সম্ভব এঁদেরকে জাগতিক পীড়া থেকে মুক্ত রাখা যায়। তবে সম্পূর্ণ মুক্তিও প্রদান করতে পারিনা, কারণ সেই পীড়াই এঁদেরকে এঁদের লক্ষ্যের পথে মার্গদর্শন করে। কিন্তু আমার অত্যন্ত সৌভাগ্য জানিস, কারণ সেই পীড়া যে তাঁদের মার্গদর্শন প্রদান করার জন্যই, তা আমাকে গিয়ে বলতে হয়না, তারা স্বয়ংই তা ধারণা করে নেয়, আর জানিস! সেই পীড়া দেবার জন্যই আমাকে আলিঙ্গন করে স্নেহ করতে চায়। …
লজ্জাও লাগে তখন, আর নিরুপায়ও। ইচ্ছা তো হয়, তখনই ছুটে গিয়ে এঁদেরকে আলিঙ্গন করি। কিন্তু তেমন করলেই যে সমাধি, আর সমাধি মানেই এঁদের দেহের উপর প্রবল চাপ রচনা করা, তাই চেয়েও আলিঙ্গন করতে পারিনা”।
মীনাক্ষী বললেন, “মা, প্রভুর এবারে প্রায় কনো সাক্রেত ছিলনা। কারণও প্রভু জানতেন। সম্পূর্ণ ৯৬ কলা রূপ ধরে এসেছেন, তাই নিজের কলাদেরকে নিজের সাক্রেত করে আনতে পারেন নি। … মা, এমন করা যায়না যে, প্রভু যখন যখন আসবেন, আমি তাঁর সাক্রেত হয়ে আসি! … হতে পারে তিনি আবার ৯৬ কলা রূপ ধারণ করে এলেন। … মা, সম্যক জগতের থেকে অবতার ভিন্ন, তার ভাব ভিন্ন, আবেগশূন্য, সত্যপ্রেমী, অহংকার বিরোধী, বিশ্রামবিরোধী, আসক্তিহীন।
মা একসময়ে তো আমার ভয় লাগতে শুরু করেছিল যে, প্রভুর যখন বয়স হয়ে যাবে, তখন তাঁর তনুর দেখভাল কে করবে! … মা, এমন কি করা যায়না যে, আমি তাঁর সাক্রেদ হয়ে থাকবো। অন্তত তাঁর বৃদ্ধকালে তাঁর দেহের দেখাশোনা করার জন্য আমি আসবো”।
মাতা সর্বাম্বা হেসে বললেন, “বিচার করে দেখতে হবে। দেখে পরে তোকে বলছি কেমন!”
মীনাক্ষীর চোখ ছলছল করে এলো। মায়ের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, “হ্যাঁ মা, তুমি যোনিবিস্তারের কথা শুরু করবে তো এবার। অনেক সময় চলে গেল, এই কথার কারণে। এবার সেই কথা শুরু করো”।
মাতা সর্বাম্বা মৃদু হেসে বললেন, “যোনি বিস্তারের জন্য বেশ কিছু ব্যাপার সম্বন্ধে স্থিরতা প্রদান করা অত্যন্ত আবশ্যক ছিল। প্রথম হলো পঞ্চভূতের বণ্টন পক্রিয়া, দ্বিতীয় হলো পঞ্চভূতের রক্ষণ পক্রিয়া, এবং তৃতীয় হলো দেহধারণ আর দেহত্যাগের উপায়, এবং চতুর্থ হলো ভাববিস্তার। ধরিত্রী ও মানস এই সমস্ত কিছুকে স্থিতু রাখার জন্য, প্রথমেই যার বিকাশ ঘটালো, তা হলো একটি বীজ, একটি বটবৃক্ষের বীজ।
বীজকে স্থাপন করলো ধরিত্রী নিজের গর্ভে, এবং সেখানে রেখে, নিজের গর্ভের তাপ প্রদান করে সেই বীজকে উর্বর করা শুরু করলো। আত্মের ও চেতনার স্রোত ধারণ করে জীবন। সেই বীজকে নিজস্বতার বোধ প্রদান করলো স্বয়ং ধরিত্রী, আর তা ধারণ হতেই বীজের থেকে শিকড় নির্গত হলো। সেই শিকড় নিজের অস্তিত্বকে প্রমাণ করতে ব্যস্ত হয়ে উঠলে, নিজের রক্ষণের ভাব তার মধ্যে উদ্ভাসিত হয়, আর সেই রক্ষণের ভাবের কারণে সেই শিকড়দ্বারা ভূমির মধ্যে স্থিত খনিজকে ধারণ করা শুরু করলো সে।
খনিজ ধারণ করে পুষ্টি লাভ করতে থাকলে, এবার আর ভূমির নিচে নয়, ভূমির উপরে সে নিজের অস্তিত্বকে প্রমাণ দিতে শুরু করে কাণ্ড নির্মাণ করে। ক্রমশ সেই কাণ্ড থেকে ডালপালা নির্গত হলো, আর অবশেষে সেই ডালের মধ্য থেকে পত্র প্রকাশিত হতে শুরু করে। গুল্ম ও পত্র মিলে বটবৃক্ষটি একটি বিশাল মহীরুহের আকার ধারণ করলে, ভূমি থেকে জলধারণ অর্থাৎ মেধাকে ধারণ করা শুরু করলো সে, আর সেই মেধা ধারণ করে, অগ্নি ও বায়ু ধারণ করে সেই মেধাকে সুরক্ষিত রাখলে, আত্ম নিজের বিস্তারের উদ্দেশ্যে, সেই বৃক্ষমধ্যে স্থিত হয়ে ফল নির্মাণ করলো।
সেই ফলের মধ্য থেকে পুনরায় বীজ উৎপন্ন হলে, সেই বীজ থেকে আবারও একটি বটবৃক্ষ নির্মাণ হওয়া শুরু করে। আর এই ভাবে প্রাণের হিল্লোল জেগে উঠতে শুরু করে, যেখানে ধরিত্রীর কাছে আগত সমস্ত সূক্ষ্ম ধরাকণা ও মানসকণা আত্মকে ধারণ করে বিস্তার লাভ করা শুরু করে। অগ্নি ও বায়ুকে ধারণ করে শিকড় বিস্তার করে, মেধা অর্থাৎ জলকে ধারণ করে পুষ্টিলাভ করে, আর অন্যদিকে আত্ম চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনা, অর্থাৎ ছায়াদেরকে ধারণ করে ভূমিবাহ্যে বিস্তৃত হওয়া শুরু করে।
এই কাজে সাফল্য লাভ করলেও, ধরিত্রীর চিন্তার বিষয় এই হয় যে, একটি বৃক্ষকে বহুতর সময় নিতে হয় নিজের থেকে বীজ নির্মাণ করতে। এমন গতিতে বীজ ধারণ করলে, বৃক্ষকে অধিক সময় দেহধারণ করে থাকতে হবে, আর কেবল তাই নয়, সমস্ত ধরাকণাকে বিস্তৃত করতে হলে বহু সময় লেগে যাবে।
এমন বিচার করে, ধরিত্রী এবার একটি রসালবৃক্ষের বীজ নির্মাণ করে, যার আয়ু হবে কম, আর যার বীজ উৎপন্ন করার প্রক্রিয়া হবে দ্রুত ও অসংখ্য। কিন্তু সেই কর্মে ধরিত্রী একটি আরো বড় বাঁধার সম্মুখীন হলো। কম আয়ু তো হলো, কিন্তু বীজ উৎপন্ন হওয়া দূরে থাক, ফুল উৎপন্ন হয় আর ঝরে যায়, ফলই আসেনা।
এমন বিচার করে, প্রথম একটি জীবনকে প্রকাশ করতে সচেষ্ট হলো ধরিত্রী, যেই জীবন বৃক্ষের মত স্থায়ী হয়ে বিরাজ করবেনা, বরং তা বিহার করতে পারবে ধরিত্রীর বক্ষে, বায়ুমণ্ডলে। এমন বিচার করে, একটি মধুপের রচনা করলো ধরিত্রী। আর তা করতেই এই কীটরা ফুলের রস পান করে, আর অন্য ফুলে এসে বসে সেই রসকে হজম করতে গেলে, কিছুটা পূর্বের ফুলের রস মুক্তও করে, আর তার থেকে ফল নির্মাণ হওয়া শুরু করলো।
এই সাফল্য দেখে, ধরিত্রী এবার এমন প্রচুর বীজ নির্মাণ করলো, আর মধুপের ন্যায় বহু কীটের রচনা করলো যারা আলাদা আলাদা বৃক্ষের ফুলের রস গ্রহণ করবে, আর সঞ্চার করবে, যার থেকে ফল ও পরে বীজ হবে। আর এই ভাবে এক লক্ষ বৎসরের মধ্যে সম্পূর্ণ ধরিত্রীর যেই অংশ সমুদ্রপৃষ্ঠের উপরে ছিল, যেই অংশ সমুদ্রের নিচে ছিল, আর যেই অংশতে মেধা বরফ বা হিম হয়ে বিরাজ করছেনা, সেই সকল অংশকে বৃক্ষ দ্বারা ভরিয়ে তুলল।
কিন্তু এমন করতে তিনটি সমস্যার সম্মুখীন হলেন ধরিত্রী। প্রথমটি হলো সাগরতলের সমস্যা। সাগরের নিচের বৃক্ষরা বিস্তার লাভ করতে পারছেনা। দ্বিতীয় সমস্যা হলো সর্বত্র সমস্ত বৃক্ষ হচ্ছেনা, কারণ বীজগুলি বৃক্ষের তলেই পরে যাচ্ছে, আর সেখানেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর তাই যেই কীট রসালের রসপান করে, তারাও সেখানে যেতে পারছেনা, যেখানে রসাল ফল নেই, অর্থাৎ তাদের কাছে ধরিত্রী ক্ষুদ্র হয়ে যাচ্ছে আর যতই ধরিত্রী ক্ষুদ্র হয়ে যাচ্ছে, ততই মেধার বিস্তারলাভের সম্ভাবনা কমে আসছে, আর ততই আমার তাঁদের মধ্যে সপ্তলোকের বিস্তার করা অসম্ভব হয়ে যাচ্ছে।
আর তৃতীয় সমস্যা হলো ভূমির নিচে। সেখানে যেই বৃক্ষদের আয়ু সমাপ্ত হয়ে যাচ্ছে, তাদের শিকড়গুলি পরেই থাকছে, আর ক্রমশ তা ধরিত্রীর ভূমিকে, ভূমির মৃত্তিকাকে, অগ্নিবিস্তারকে, বায়ুচলাচলকে এবং মেধার বিস্তারকে অসম্ভব করে তুলছে।
এই তিন সমস্যার সমাধানের জন্য মৎস্য, পক্ষী ও ভূমিনীচ তলের কীট রচনা করলেন ধরিত্রী। যেখানে মৎস্য সাগরে ও নদীতে ও জলাশয়ে বিস্তৃত হয়ে সাগরতলের, নদীতলের এবং জলাশয়ের নিচের তৃণজাতিকে বিস্তৃত করতে শুরু করলো, সেখানে পক্ষীরা বিভিন্ন বীজ ধারণ করে ভিনস্থানে তাকে বিষ্ঠার সাথে ত্যাগ করে, বৃক্ষরাজিদের বিস্তার শুরু করলো, আর সেখানে ভূমির নিচের কীটরা মৃত শিকড় ভক্ষণ করে করে, ভূমির নিচের জট ছাড়াতে থাকলো।
এর পরের সমস্যা শুরু হলো মৎস্যের বিপুল সংখ্যা, কীটের বিপুল সংখ্যা এবং পক্ষীদের বাছাবাছি যে কোন ফল তারা ভক্ষণ করবে, আর কোন ফল তারা ভক্ষণ করবেনা। তাই এবার ধরিত্রী বিভিন্ন আকারের মৎস্য রচনা করা শুরু করলো, যাতে করে বৃহত্তর মৎস্য ক্ষুদ্রতর মৎস্যকে ভক্ষণ করে করে সাগর, নদী ও জলাশয়ের নাব্যতাকে সঠিক রাখে। পক্ষীদের মধ্যে অজস্র যোনিবিস্তার হওয়া শুরু হলো, যাতে সমস্ত ধরনের বৃক্ষের ফল ভক্ষণ করা যেতে পারে। আর কীটদের মধ্যেও বিভিন্নতার সঞ্চার করা হলো, এবং তারই সাথে ব্যাঙ তথা গিরগিটি প্রজাতির রচনা করে, তাদের মধ্যেও বিভিন্নতা রচনা করা হলো যার কাজ হলো কীটদের ভক্ষণ করে, তাদের সংখ্যাকে ভারসম্যতা প্রদান করা।
ভারসম্যতা তাও স্থাপিত হলো না কারণ এই সমস্ত প্রজাতির জীবরা জীবিত জীবদের ভক্ষণ করলেও, যেই জীবরা মৃত হয়ে গিয়ে, নিজেদের মধ্যে পুষ্টি ধারণ করে রাখছে, যেমন শুকনো ধান, শুকনো গম, ইত্যাদি, এদের ভক্ষণ করার কেউ নেই। অন্যদিকে গিরগিটি, ব্যাঙের সংখ্যা বেরেই চলেছে। তাই এই সমস্ত কিছুকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে, এবার ধরিত্রী প্রকাশ করলো মুশক প্রজাতি, যার মধ্যে শশক যেমন রয়েছে, তেমন বিভিন্ন আকারের ও প্রজাতির মুশকও রইল, যারা মৃত বীজ, যা পুষ্টি ধারণ করে রেখেছে নিজেদের মধ্যে, সেইসমস্ত ভক্ষণ করলো। আর এঁদেরকে ভক্ষণ করার জন্য এলো শিকারি পাখি ও বিড়াল প্রজাতি।
অন্যদিকে মধুপান করার জন্য এলো ভল্লুক, তো ফল গ্রহণ করার জন্য এলো বান্দর প্রজাতি। আর ব্যাঙদের ভক্ষণ করার জন্য এলো সর্প প্রজাতি। পরবর্তী সমস্যা হলো অতিরিক্ত তৃণবৃদ্ধি হয়ে চলার কারনে, এমন দেহই লব্ধ হচ্ছিলনা যাদের মধ্যে দিয়ে সপ্তলোকের বিস্তার করা সম্ভব হবে আমার পক্ষে। তাই এঁদের ভক্ষণ করার জন্য, জলের মধ্যের, এবং স্থলের উপর চারণ করা তৃণভোজী জীবসমূহ, যাদের মধ্যে যেমন সমুদ্রঘটক জাতি রইল বিভিন্ন আকারে, তেমনই ভূমিতে রইল অজ, হরিণ প্রজাতি, গরু ও ঘোড়া প্রজাতি, যাদের মধ্যে মোষও যেমন রইল, তেমন বিভিন্ন প্রকারের ঘোড়া, যেমন জেব্রা, খচ্চর, গাধাও রইল।
আর বলশালী বৃক্ষদের ভক্ষণ করার জন্য রইল বুনোমোষ, বাইসন, গণ্ডার, হাতি ও জিরাফ। যেখানে তৃণ ও বৃক্ষদের, মধ্যে আমি কেবল মূলাধার স্থাপন করতে পেরেছিলাম, সেখানে কীট ও পক্ষীদের মধ্যে আমি স্বাধিষ্ঠানও স্থাপন করতে সক্ষম হই। সাপ, শিকারি পাখি ও শিকারি মৎস্যদের মধ্যে আমি মনিপুরও স্থাপন করতে পারি। কিন্তু তারপরে এগোতে পারছিলাম না। এই তৃণভোজীদের মধ্যে আমি সপ্তলোকের বিস্তারকে প্রায় অনাহত পর্যন্ত পৌঁছে দিই।
কিন্তু তারপর আর বিস্তার করতে না পারলে, ধরিত্রীর সম্মুখে এই সমস্যা আসে যে তৃণভোজীদের বিপুল সংখ্যায় বৃদ্ধি পেতে থাকে। তাই প্রকৃতি এবার হিংস্র পশুর বিস্তার করে, যারা সারমেয় ও বিড়াল প্রজাতির বিশালাকায় রূপ হয়, আবার মৎস্যেরও বিসালাকায় রূপ হয় যেমন কুমীর, ভোঁদড়, হাঙর, ও তিমি। এঁদের মধ্যে আমি বিশুদ্ধের বিস্তার করতে সক্ষম হলেও। তারপর আর বিস্তার করা সম্ভব হয়না আমার পক্ষে।
ধরিত্রীও প্রকৃতিরূপে চিন্তিত হয়ে যায়, কারণ এই সমস্ত যোনিদের নিয়ন্ত্রণে স্থাপিত রেখে, সাম্যতায় স্থাপিত রাখার উপায় খুঁজে পায়না সে। আসল কথা হলো এই যে, সমস্ত সপ্তলোকের নির্মাণ হয়ে গেলেও, শুধু নির্মাণ হলেই তো আর হলো না, সেই সপ্তলোকের মধ্যে দিয়ে যাত্রা করে পরাপ্রকৃতি হয়ে উঠতে হবে তো , তবেই তো স্বরূপে স্থিত হতে পারবে মেধা, আর তবেই তো সে আত্মকে বিসর্জন দিয়ে আমার সাথে একাত্ম হতে পারবে।
কিন্তু সেই যোনি কই যার মধ্যে এই মেধা বিস্তারের সামর্থ্য আছে। সেই যোনি কোথায়, যে আমার তিনগুণ অর্থাৎ বিচার, বিবেক ও বৈরাগ্যকে ধারণ করতে পারবে? মেধাকে চেতনায় বিকশিত এই তিনগুণই করতে সক্ষম। আর মেধা চেতনাকে অনুভব করলে, তবেই সে প্রকৃতি হয়ে উঠতে সক্ষম হবে। কিন্তু তেমন কনো যোনি তো নেই যে বিচার, বিবেক ও বৈরাগ্যকে ধারণ করতে সক্ষম!
সেই বিচার থেকেই ধরিত্রী একটি নিজের সমানে, অর্থাৎ নিজের মধ্যে যা যা কিছু আছে, সেই সমস্ত উপাদানকে সজ্জিত করে একটি যোনির নির্মাণ করলো, যার নাম হলো কন্দম, যাকে তোমরা ডাইনোসর নামে অবিহিত করো।
এই প্রজাতি বিচার করতে শিখলো অনায়সেই, কারণ ধরিত্রী নিজের সমস্ত গুণ এঁদের মধ্যে প্রদান করেছিল। সেই বিচারশক্তি দিয়েই এঁরা অগ্নি নির্মাণ করতে শেখে। সর্বপ্রকার যোনিকে আহার করার সামর্থ্য নির্মাণ করে, আর তা গ্রহণ করে করে এঁরা বিশালাকায় হয়ে ওঠে। ভয়ঙ্কর শক্তিশালী হয়ে ওঠে তারা। সমাজ গঠন করে, বিদ্যার নির্মাণ করে সমস্ত ধরিত্রীকে, যোনিব্যবস্থাকে জানতে শেখে তারা। কিন্তু সেই বিদ্যার্জন করার পর, তাকে তারা জ্ঞানে পরিবর্তিত করতে পারেনা, কারণ বিবেক ও বৈরাগ্যকে তারা ধারণ করতে পারেনা, আর তার কারণ এই যে আমি আজ্ঞার রচনা তো করি এঁদের মধ্যে, কিন্তু সহস্রারে স্থাপিত করার লোককে এঁদের মধ্যে নির্মাণ করতে সক্ষম হইনা।
কেন সক্ষম হইনা? কারণ এঁদের মধ্যে আত্মও বিস্তৃতি লাভ করতে শুরু করে আর তাই এঁরা শীঘ্রই চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনাকে ধারণ করে করে, আকাশকুসুম কল্পনা করতে থাকে। ঠিক যেমন আজকের দিনে তোমরা অনেককে দেখো যে আকাশকুসুম কল্পনা করে করে কমিকচরিত্রের নির্মাণ করে, তাদেরকেই সত্য মানা শুরু করে দেয়, কন্দমরাও ঠিক তেমনই করা শুরু করে।
আর তাই আমার পক্ষে আর সহস্রার স্থাপন করা সম্ভব হয়না এঁদের মধ্যে। সম্ভাবনা অসম্ভব ছিল এঁদের মধ্যে, তাই সর্বাপেক্ষা প্রয়াস করতে থাকি আমি। কিন্তু এঁরা এতটাই শক্তিশালী হয়ে ওঠে আর আত্মকে ধারণ করে ত্রিগুণের বিস্তার করে, সেখান থেকে আবেগের বিস্তার ঘটিয়ে এমনই অহংকারী হয়ে ওঠে যে, সম্যক বাকি যোনিদের একপ্রকার বিনাশ করা শুরু করে দেয় তারা।
তাই ধরিত্রী বাধ্য হয়েই আমার কাছে আর্জি করে যাতে এই যোনিকে আমি বিনষ্ট করে দিই। তাঁর বক্তব্য এই যে, এই যোনি থাকলে, বাকি সমস্ত যোনির নাশ করে দিয়ে, সম্যক ধরিত্রীর কর্মযজ্ঞকেই বিনষ্ট করে দেবে। একটি যোনি উন্নত হয়ে চলেছে, সেই কারণে অন্য যোনির দেহত্যাগ করার পর, ক্রমশ উন্নত সেই যোনিতে দেহধারণ করে করে, একটি যোনির নাশ হয়ে যায়, তা একপ্রকার, কিন্তু একটি যোনি অন্য যোনিদের হত্যা করে করে, নিজের আসবাব নির্মাণ করে ফিরে, বাকি যোনিদের নাশ করে দেওয়া হলো অপ্রাকৃতিক ভাবে ধরিত্রীর ভারসম্যকে বিনষ্ট করে দেওয়া।
তাই শুরু হলো আমার কন্দমবিনাশের অভিযান, যার কথা তোমাদের আমি পূর্বেই বলেছি। আর এরপর, আমি ও ধরিত্রী নিশ্চয় করি যে, এমন একটি যোনির নির্মাণ করবো এবার, যেই যোনি একাধারে বিচার, বিবেক ও বৈরাগ্যকে ধারণ করে নিতে সক্ষম হবে, আর তার ফলে মেধার বিস্তার অব্যহত থাকবে, আর আমার পক্ষে সপ্তলোকের নির্মাণ সমাপ্ত করাও সম্ভব হবে। আর সেই ভাবনা থেকেই, মানবযোনির নির্মাণ”।
মীনাক্ষী প্রশ্ন করলো, “আচ্ছা মা, এই কন্দম যোনির কি কিচ্ছুই অবশিষ্ট রইল না! … আত্ম এই যোনির মধ্যে স্থিত হয়ে, বিস্তর বিস্তার লাভ করেছিল। সে নিজের এই বিস্তারের বিনাশ এমন অনায়সে মেনে নিলো!”
মাতা সর্বাম্বা এবার একটি গম্ভীর শ্বাস ত্যাগ করে বললেন, “সঠিক বলেছিস মীনাক্ষী। কন্দম যোনিতে একশত একটি অবতার ধারণ করে তাদেরকে অহংকারের পথ থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দিয়েছিলাম। সেই ইঙ্গিত কিছু কিছু কন্দম ধারণ করে নিজেদেরকে সুরক্ষিত দূরত্বে স্থাপিত রেখে দেয়, আর তাই তারা সেই প্রলয় থেকে সুরক্ষিত হয়ে যায়, যেই প্রলয়ের ফলে কন্দমযোনির নাশ হয়। আজও সেই যোনি অবস্থান করছে তাই, তবে তারা মানবের সাথে সঙ্গমে লিপ্ত হয়ে হয়ে, নিজেদের আকারবৈশিষ্ট্য ত্যাগ করে দিয়েছে।
তাই আজ তারা মানবের জনসংখ্যার প্রায় ৬০ শতাংশ হলেও, তাদেরকে কন্দম বলে আর সনাক্ত করা যায়না। তোরা তাদেরকে আর্য বলে অবিহিত করিস, তবে এই আর্যদেরও বিস্তর ইতিহাস আছে। তারা আজ কেবল আর্যদের মধ্যেই আবদ্ধ রাখেনি। তারা প্রায় সম্পূর্ণ ইহুদি প্রজাতি হয়ে উঠেছে, জনসংখ্যার বিচারে, আর হিন্দু নামের আড়ালেও তারা শুদ্ধ হিন্দু বলে নিজেদের দাবি করে বিরাজ করে।
দেখতে এঁদেরকে মানুষের মত, কিন্তু এঁরা আদপে মানুষ নয়। মানুষের গাত্রবর্ণ কখনোই শুভ্র নয় আর তার থেকে লাল আভাও নির্গত হয়না। মানুষের গাত্রবর্ণ হরিদ্রা থেকে আরম্ভ করে বাদামের রং, তাম্রবর্ণ, পিতলবর্ণ, লৌহমলবর্ণ, তথা কয়লাবর্ণ হয়। মানবযোনি তো আমার ত্রিগুণকে ধারণ করে নিতেও সক্ষম হয়েছিল এককালে, কিন্তু এই কন্দমদের ছলনা মানবকে বিনাশের পথে ঠেলে দিলো।
এই কন্দমরা ইচ্ছা, চিন্তা, কল্পনাকে ধারণ করে করে, আত্মের ত্রিগুণ অর্থাৎ সত্ত্ব, রজ ও তমের পূজা করে করে, সমস্ত আবেগদের ধারণ করে, তাকে মানবযোনির মধ্যে বিস্তার করতে থেকেছে। তার আগে তো মানব সমাজ গঠন করে, ধর্মকে স্থাপন করে, বিদ্যা তথা জ্ঞানকে ধারণ করে করে, পূর্ণ ভাবে নিজেদেরকে শ্রেষ্ঠযোনিরূপে, প্রকৃতির সন্তানরূপে, আমার গর্বরূপে অব্যুত্থান করছিল।
কিন্তু এই কন্দমদেরকে তারা গ্রহণ করতে যেই দিন থেকে শুরু করলো, সেই দিন থেকে তারা আত্মের ত্রিগুণের পূজা করা শুরু করলো। জ্ঞান ও মেধাকে ত্যাগ করে, আজ যেমন হয়ে রয়েছে, কল্পনা করার সামর্থ্যকেই মেধা বলে চিহ্নিত করতে শুরু করলো। বিচারকে চিন্তাদ্বারা প্রতিস্থাপন করে, বিবেককে ইচ্ছা দ্ব্বারা প্রতিস্থাপন করে, এবং বৈরাগ্যমিশ্রিত শুদ্ধ মেধাকে কল্পনা করার শক্তি দিয়ে প্রতিস্থাপন করে, এঁরা সম্যক প্রকৃতির থেকে ভিন্ন এক জগতের নির্মাণ করে নিয়েছে, যা সার্বিক ভাবে এক কাল্পনিক জগত, যাকে তোরা বলিস প্রযুক্তির জগত।
এঁদের ব্যাপারে আমি শেষের ৯টি অবতার গ্রহণ করে সতর্ক করেছিলাম, কিন্তু সেই কথা বুঝে এই সমস্ত কন্দমদের হত্যা করতে গেছিল মাত্র দুইজন, অশোক আর হিটলার, কিন্তু বড্ডই দেরি হয়ে গেছিল ততক্ষণে। তাই মানবযোনির বিনাশই একমাত্র উপায় রূপে সম্মুখে রইল ধরিত্রীর কাছে, আর তাই তাঁরই নিবেদনে, এই কুলকে বিনাশ করার দিকে অগ্রসর করলেন রামকৃষ্ণ রূপে প্রকাশিত হওয়া মৃষু, অর্থাৎ আমার অবতার। সেই কন্দমদের দেশে গিয়ে, তাদেরকে ডেকে আনালেন তিনি তাঁর শিষ্যের মাধ্যমে, যাতে বিনাশের ঘড়ি শীঘ্র এসে যায়।
আর শেষে দশম তথা এক শত একতম রূপে এসে মৃষু ব্রহ্মসনাতন বেশে, এর যথার্থ ন্যায় করে গেল। মানবযোনির মধ্যে এক ধারার নির্মাণ করে গেল সে, যাতে করে মানবযোনির একাংশ, অতিক্ষুদ্র অংশ সম্পূর্ণ ভাবে কন্দমদের প্রযুক্তির জগত থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে নেয়। তাঁর নিদারুণ বিশ্বাস আমার উপর যে, যদি ১০টিও এমন মনুষ্য থাকে, আমি সেই ১০টি মনুষ্যকে জীবিত রাখার পরিকল্পনা নিশ্চয় করবো। তার অপার প্রেম আমার প্রতি। তার মতে, বহু কষ্ট করে মানবযোনির নির্মাণ সম্ভব হয়েছে, তাকে আত্মের কারণে বিনষ্ট হতে দেওয়ার অর্থ, আমার অর্থাৎ তার মাতার কোল আরো কোটি কোটি বৎসর ব্যাপী শূন্য থাকবে। তাই তো সে কৃতান্ত প্রদান করে গেল, কৃতান্তিক নির্মাণের পথ গড়ে গেল, আর তার কারণেই তোরা আজ এখানে সকলে স্থিত”।
সর্বশ্রী প্রশ্ন করলেন, “মা, শূয়র প্রজাতি আর মশক প্রজাতির উৎপত্তি হবার কারণ কি? আর আরো একটি প্রশ্ন এই যে, এই একটি যোনির থেকে অন্য যোনির নির্মাণ হচ্ছে, তা হচ্ছে কি করে?”
মাতা উত্তরে বললেন, “কন্দম প্রজাতির জীব নিজেদের মৃত্যুকে ঠেকিয়ে রাখতে অত্যন্ত ব্যস্ত হয়ে যায় কারণ তারা জীবনের প্রতি সম্পূর্ণ ভাবে আসক্ত হয়ে যায়। সেই কারণে বায়ুমণ্ডলের ধরাকণার মধ্যে সূক্ষ্মতর জীবের রচনা করা হয়, যাদেরকে বলা জীবাণু, আর তাদেরকে দেহে প্রবেশ করানোর সিদ্ধান্ত নেয় ধরিত্রী, যাতে তারা দেহত্যাগ করে। সেই প্রবেশ করানোর কর্ম অর্পণ করার জন্য একটি কীটের নির্মাণ হয়, যার নাম মশক।
কন্দম চলে যাবার পর যখন মনুষ্যযোনির নির্মাণ হয়নি, তখন এই কীটের জন্ম অত্যন্ত ক্ষীণ করে রাখা হয়েছিল। কিন্তু যখন থেকে মানবের মধ্যেও এই কন্দমদের সাথে থেকে থেকে দেহমুক্তি নিয়ে সংশয় আসতে আরম্ভ করে আর তারা দেহ রাখার প্রয়াস করতে শুরু করলো, তখন থেকে মশকের পরিমাণ প্রকৃতি অর্থাৎ ধরিত্রী, যে তখন ও এখনও স্বয়ং প্রকৃতি হয়ে বিরাজ করছে, বৃদ্ধি করা শুরু করে, যাতে জ্বরার বিস্তার হয় এবং মনুষ্য দেহত্যাগ করতে বাধ্য হয়।
শূয়র বা বরাহের উৎপত্তিও কন্দমদের কারণেই হয়। কন্দমরা সমস্ত জীবদের ভক্ষণ করতো, আর তাই তাদের বিষ্ঠা এমন এক অনন্য রসায়ন রচনা করতো যে, তাকে প্রকৃতি নিজের মধ্যে পুনরায় মিলিত করতে পারতো না। সেই কারণেই শূয়রের জন্ম দেওয়া হয়, এবং পরে তাদের সাথে একত্রে বিরাজ করার কারণে সারমেয় ও বায়সের মধ্যেও বিষ্ঠা হজমের সামর্থ্য জন্ম নেয়।
আর রইল কথা নূতন যোনি গঠনের পক্রিয়া, পুত্রী, যোনি অনুসারে কেবল স্বভাব বদলায়, কেবল পরিকাঠামো বদলায়, কিন্তু পুষ্টি সকলের জন্য সেই ধাতুই। অর্থাৎ উদ্ভিদ সরাসরি জল থেকে ধাতু গ্রহণ করে, আর জীব রসপান করে হোক, তৃণ ভোজন করে হোক, বা অন্য জীবের মাস গ্রহণ করে হোক, সেই ধাতুই নিঃসৃত করে তাকেই পুষ্টিরূপেই লাভ করে। ধাতুই হলো সেই পুষ্টি।
তাই এই নয় যে প্রতিটি জীব একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ ভাবে আলাদা। সকলের প্রক্রিয়া ভিন্ন, কিন্তু সকলের সকল প্রক্রিয়ার কারণ হলো ধাতু ও খনিজ লাভ করা। ধাতু ও খনিজই সকলের জন্য পুষ্টি, সকল উদ্ভিদের এবং সকল প্রকার জীবের।
এবার প্রশ্ন হলো এই যে, একটি যোনির থেকে অন্যযোনিকে নির্মাণ করা হয় কি ভাবে, এই তো! … উপায় হলো সঙ্গম। পুরুষের কোষের মধ্য দিয়ে আকৃতি প্রবাহিত হয়, তো স্ত্রীদের কোষের মাধ্যমে চরিত্র প্রবাহিত হয়। তাই যখন কনো নূতন যোনি নির্মাণ করার থাকে, তখন এক যোনিগোষ্ঠীর পুরুষদের স্ত্রীশূন্য অবস্থায় পতিত করে দেয় প্রকৃতি। এর ফলে তাদের মধ্যে কামবাসনার যেই বিস্তার ঘটে, তাকে চরিতার্থ হতে না দিয়ে চরম অবস্থায় নিয়ে যাওয়া হয়, আর যখন তা চরম অবস্থায় উন্নীত হয়, তখন অন্য এক যোনির বিপরীত লিঙ্গকে সম্মুখে আনা হয়, যাতে দুইজনের মধ্যে সঙ্গম হয় এবং নুতন যোনির রচনা হয়।
বানর ও সারমেয় জীবের সঙ্গম থেকে জন্ম নেয় ভল্লুক যোনি, যাদের মধ্যে সারমেয়র মাংসাশী স্বভাব আর বানরের তৃণভোজী স্বভাব একত্রে স্থাপিত হবার কারণে, তারা হয় উভোভজি। এই ভল্লুকের সাথে যখন ব্যাঘ্রের সঙ্গম হলে, তার থেকে এক প্রজাতির কন্দমের রচনা হয়, যারা পুচ্ছধারি, আবার এঁদের সাথে পুনরায় বানরদের সঙ্গম হলে জন্ম নেয় পুচ্ছহীন কন্দম, যারা সাধারণত স্ত্রী হতো।
কন্দমদের মধ্যে স্ত্রীরাই অধিক শক্তিশালী হতেন এবং বুদ্ধিমানও। তারা পুরুষ কন্দমদের একপ্রকার দাস করে রেখে দিতেন। যখন কন্দমের নাশ করা হয়, এই স্ত্রী কন্দমরাই পলায়ন করে বর্তমানের মিশর অঞ্চলে, বর্তমানের আফগান অঞ্চলে, এবং বর্তমানের পারশ্য অঞ্চলে স্থিত থাকেন।
যখন সম্পূর্ণ কন্দম যোনির নাশ হয়, তখন এই কন্দম স্ত্রীদের কাছে কনো পুরুষ ছিলনা, যাদের সাথে তারা সঙ্গমক্রিয়া করে নিজেদের দেহকামবাসনাকে তৃপ্ত করবে। তাই পুরুষ গরিলা এবং পুরুষ ভল্লুকের সাথে এঁরা নিবাস করতে থাকে, এবং শেষে এঁদের সাথে সঙ্গম হলে, পুরুষ ভালুর ঔরসে পুরুষ মানুষের জন্ম হয়, এবং পুরুষ গরিলার ঔরসে স্ত্রী মনুষ্যের জন্ম হয়।
মনুষ্য যাতে উভয়ভোজী হয়, সেই কারণেই এই প্রয়াস করে প্রকৃতি। মনুষ্যকে উভয়ভোজী করার বিশেষ কারণ এই যে, মানুষের কাছে পূর্ণ সপ্তলোকের উন্মোচন করার সামর্থ্য থাকবে, কিন্তু তা করতে মনুষ্যের প্রয়োজন হবে বিপুল শক্তির, স্থিরতা, সাহস, পরিশ্রমের এবং নিষ্ঠার। আসলে কি বলোতো পুত্রী, কিছু খনিজ ও ধাতু উদ্ভিদের থেকে লব্ধ হয়, আর কিছু খনিজ লব্ধ হয় পশুমাস থেকে। না কেবল পশুমাস থেকে সেই সকল খনিজ বা ধাতু লব্ধ হয়, যা সূক্ষ্মজগতে বলশালী করে কনো জীবকে, আর না কেবল উদ্ভিদের মধ্যে সেই সকল খনিজ বা ধাতু লব্ধ হয়, যা সূক্ষ্মজগতে বলশালী হতে সহায়তা করে। আর কি বলো তো, কায়িক ভাবে বলশালী হবার থেকে প্রায় ৪ গুণ অধিক বল অর্জন তাঁকে করতে হয়, যাকে সূক্ষ্ম জগতে বলশালী হতে হয়। তাই মনুষ্যকে উভয়ভোজী করা অত্যন্ত আবশ্যক ছিল”।
