২৩.২। ধরাধাম পর্ব
মাতা সর্বাম্বা বলতে থাকলেন, “আত্ম চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনাকে ধারণ করে, নিজের বিস্তার করার নিশ্চয় করে, অন্যদিকে পঞ্চভূতের মধ্যে মানস অর্থাৎ আকাশ প্রতিটি ধরাখণ্ড অর্থাৎ মৃত্তিকা তত্ত্বের সাথে মিলে অগ্নি, বায়ু ও মেধা মানে জলের রচনা করার প্রয়াস করে করে, চেতনার স্রোতকে প্রকাশিত করার প্রয়াস করলো।
মানস ও ধরার এই প্রয়াসে, সমানেই আত্ম ও আত্মের পরিবার বাঁধা সঞ্চার করে করে, মানস ও ধরাকে বশীকরণ করার প্রয়াস করে, মেধার জন্মকে বিনষ্ট করার প্রয়াস করতে থাকলো। আর এই ভাবে এক অনন্য সংগ্রামের রেখা উৎপন্ন হলো, যেখানে মানস ও ধরা মেধা অর্থাৎ জলের রচনা করতে সচেষ্ট হলো, আর আত্ম ও তার পরিবার সমস্ত ধরা মানসের সাথে নিজেকে নিযুক্ত করে করে, মেধার জন্মকে না হতে দেবার প্রয়াস করতে থাকলো।
আর এই আত্মের স্রোত, অর্থাৎ আত্মের পরিবারের ধরা-মানসের পরিবারের সাথে সংযোগ জীবনের রচনা করলো। অর্থাৎ জীবন হলো একটি স্রোত, যেখানে আত্ম পরিবার ধরা-মানসের পরিবারের সাথে একত্রে স্থিত হয়ে সংগ্রামে রত হয়। তাই জীবনকে একটি সংগ্রাম বলতেই পারো, কারণ জীবন মানেই হলো সংগ্রাম। জীবন মানেই, ধরা-মানসের আত্মের সাথে সংগ্রাম করে, মেধাকে অর্থাৎ জলতত্ত্বকে ধারণ করার প্রয়াস; জীবন মানেই, আত্মের ধরা-মানসের সাথে সংগ্রাম করে, মেধাকে অর্থাৎ জলকে প্রকাশ্যে আসতে না দেবার প্রয়াস; জীবন মানেই আমার মেধার সংগ্রাম নিজের মধ্যে আমাকে প্রকট করে, মেধা থেকে চেতনা হয়ে উঠে, সত্যকে ধারণ করার প্রয়াস।
তাই জীবন মানেই একটি সংগ্রাম। একটিও নয়, দুটি সংগ্রাম তো অবশ্যই, যদিও তৃতীয় সংগ্রাম অর্থাৎ মেধার চেতনা হয়ে ওঠার সংগ্রাম তখনই শুরু হয়, যখন মেধা প্রতিষ্ঠিত হতে সক্ষম হয়। কিন্তু সেই সংগ্রাম শুরু না হলেও, জীবন প্রবাহিত হতে থাকে, কারণ আত্মের সংগ্রাম আর ধরা-মানসের সংগ্রাম সেখানেও বিরাজ করে। ধরা-মানসের আত্মের সাথে সংগ্রাম প্রক্রিয়া আত্মের প্রহারের কারণে অজস্র ধরার প্রতিটি ধরাকণার মধ্যে শুরু হয়ে যায়, কারণ প্রতিটি ধরা-কণার সাথে মানস যুক্তই থাকে।
একাধিক এমন ধরা-মানসের প্রয়াস মেধাকে জন্ম দেওয়ার উদ্দেশ্যে চলতেই থাকে। আর সেই প্রয়াসের কারণেই, একাধিক গ্রহের রচনা হয়। এই প্রতিটি গ্রহই জীবনকে ধারণ করে অবস্থান করে স্থিত, কারণ প্রতিটি গ্রহের ক্ষেত্রেই ধরা-মানস আত্মের সাথে সংগ্রাম করতে থাকে, মেধাকে প্রকাশিত করার জন্য। কিন্তু এই প্রক্রিয়াতে এখনও পর্যন্ত সফল হয়েছে যে, সেই একমাত্র ধরা-মানসের জুটির নাম ধরিত্রী।
ধরিত্রী কেবল আত্মের সাথে সংগ্রাম করে মেধাকে ধারণ করতেই সক্ষম হয়নি, সাথে সাথে, ধরিত্রীর মেধা আমার প্রতি প্রেম জ্ঞাপন করে, নিজের মধ্যে সপ্তলোকের নির্মাণ করে, মেধা থেকে প্রকৃতি হয়ে উঠে আমাকে সাখ্যাত নিয়তি রূপে সনাক্ত করে, আমার কাছে নিবেদিত হতেও সক্ষম হয়। অর্থাৎ ধরিত্রী আত্মকে সংগ্রামে পূর্ণ ভাবে পরাস্ত করে পূর্ণ ভাবে সত্যধারক হয়ে অবস্থান করতে সক্ষম হয়।
তাই এই ধরিত্রীর কথা বলা শুরু করি, তোমরা শ্রবণ করো। প্রতিটি গ্রহের ন্যায়, ধরিত্রীও নিজের থেকে অগ্নিকে এবং বায়ুকে প্রকাশিত করার মাধ্যম নির্মাণ করে। অগ্নি তাঁর অন্তরেই স্থিত থাকে, ঠিক যেমন মাতার অন্তরেই সন্তানের জন্য প্রয়োজনীয় তাপ সঞ্চিত থাকে। কিন্তু আলোক প্রদান করাও আবশ্যক, কেবল তাপ প্রদান করলেই হয়না।
তাই ধরিত্রী নিজের থেকে অন্য গ্রহদের ন্যায়ই তারকাকে জন্ম দেয়, যা একটি আকারে বেশ বড় দর্পণের ন্যায় হয়ে থাকে, যার মূল উপাদান হয় সূক্ষ্ম বালি। আর বায়ু সঞ্চালনের জন্য নির্মাণ করে আরো একটি গ্রহ, যার আকৃতি তারকার থেকেও বড় হয়, আর তার গঠনের মূল উপাদান হয় শুদ্ধ চুন।
ধরিত্রীর এই দুই জন্ম দেওয়া তারকাকে তোমরা বলে থাকো সূর্য ও চন্দ্র। সূর্য হলো সূক্ষ্ম বালুকা নির্মিত ধরিত্রী নক্ষত্র, যা ধরিত্রীর নিকটে অবস্থিত, আর তা আকারে অনেকটা ছোটো ধরিত্রীর থেকে। সেই কারণে ধরিত্রী যেই তাপ প্রকাশ করে নিজের জন্ম দেওয়া সন্তান অর্থাৎ অগ্নির ফলে, সেই তাপকে সূর্য ধারণ করতে না পারলেও, সেই তাপের ফলে উৎপন্ন আলোককে প্রতিফলিত করতে সক্ষম হয় সে।
যখন ধরিত্রী এমন করতে সক্ষম হয়, অর্থাৎ সূর্যকে নির্মাণ করে তার দ্বারা নিজের তাপকে প্রতিফলিত করিয়ে আলোক দ্বারা নিজেকে উদ্ভাসিত করতে সক্ষম হলো, তখন অন্য সমূহ ধরারা যারা ধরিত্রীর নিকটে অবস্থান করছিল, তারাও ধরিত্রীকে বেষ্টন করতে শুরু করলো, যাতে করে তারাও নিজেদের তাপকে প্রতিফলিত করাতে সক্ষম হয় সূর্যের দ্বারা এবং নিজেকে আলোকিত করতে সক্ষম হয়।
এই কারণে ধীরে ধীরে, সূর্য যা একই স্থানে স্থিত, তাকে বেষ্টন করে করে ধরিত্রী সহ, ধরিত্রীর নিকটের সমস্ত ধরাখণ্ডরা ভ্রমণ করতে শুরু করলো, এবং নিজেদের আলোকিত করা শুরু করলো। কিন্তু ধরিত্রী একটি সমস্যার সমাধান করলেও, আরো একটি সমস্যার সম্মুখীন হলো, আর তা হলো এই যে নিজের আকৃতির একটি দিককে আলোকিত করতে পারলে, অন্যদিক অন্ধকারে নিমজ্জিত হওয়া শুরু করলো।
তাই সেই সমস্যার নিরাময়ের প্রয়াস করতে, ধরিত্রী নিজের থেকে চুনের একটি প্রকাণ্ড ডেলা মুক্ত করলে, তা বৃহৎ আকৃতির একটি নক্ষত্রের আকার নেয়, যার নাম চন্দ্র। চন্দ্রকে রচনা করে, সূর্যের ঠিক বিপরীতে অবস্থান করালো ধরিত্রী, যাতে তাঁর যেই অঙ্গ সূর্যের থেকে আলোক প্রাপ্ত হবেনা, সেই অঙ্গটি চন্দ্রের প্রভা লাভ করবে।
এই চন্দ্রের আকার অত্যন্তই বড় হলো। সম্ভবত ধরিত্রীর ওজনের থেকে অনেক কম ওজন হওয়া সত্ত্বেও আকৃতি বড় হয়ে গেল চন্দ্রের, কারণ চুনের স্বভাবই ছড়িয়ে যাওয়া। … তা ছাড়াও, চুনকে না লেপে দিলে, সে একস্থানেই আটকে থাকে। সেই কারণে চন্দ্র ততটা দূরে যাত্রা করতে পারলোনা ধরিত্রীর থেকে, যেমনটা বালুর সরে যাবার স্বভাবের কারণে দূরে চলে গেছিল।
সেই কারণে, আর যেহেতু ধরিত্রীর আকৃতিই এমন, অর্থাৎ সামনেটা গোলকযুক্ত ভোঁতা শঙ্কু আকৃতির যে, না ধরিত্রীর সর্বাঙ্গ সমান ভাবে সূর্যের আলোক পেলো, আর না সমান ভাবে চন্দ্রের আলোক পেল। যেখানে অনেক ধরিত্রীর অংশ সূর্যের আলোক সমানে পেতে থাকলো, সেখানে অনেক অংশ সূর্যের আলোক থেকে বঞ্চিতই থাকলো। তাই ধরিত্রী নিজের গতি, গতিবেগ এবং গতির দিশাকে এমন করা শুরু করলো যাতে তার সমস্ত অংশ পালটে পালটে হলেও আলোক পেতে থাকে।
আর এই গতির দিশার কারণে, সূর্যের আলোক প্রতিফলন করে জ্যোৎস্না প্রদান করা চন্দ্রের চুনের থেকে প্রতিফলিত চন্দ্রপ্রভাকেও ধরিত্রীর সর্বাঙ্গ সমস্ত সময়ে এক ভাবে পেতে পারলো না। ১৪ দিবস একটু একটু করে ধরিত্রীর অংশ চন্দ্রের ও সূর্যের মধ্যে স্থিত থাকার কারণে, চন্দ্রের প্রভা ধরিত্রীতে ১৪ কলা রূপে প্রদর্শিত হতে থাকলো। একটি দিন এমন হলো যখন সম্পূর্ণ চন্দ্রকেই ধরিত্রী ঢেকে দিয়ে আমাবস্যা এনে দিলো, আবার এমন একটি দিনও এলো যেদিন পূর্ণ চন্দ্রপ্রভাকে ধরিত্রী প্রত্যক্ষ করতে পারলো।
এতটা কর্ম সম্পন্ন হওয়ার পর ধরিত্রী দ্বিতীয়বার গর্ভবতী হলো এবং তাঁর থাকে বায়ুর জন্ম হলো। এই বায়ুর কারণে এবার ধরিত্রীর মধ্যে আমূল পরিবর্তন এলো, কারণ বায়ুর প্রবাহকে অগ্নি অর্থাৎ উষ্ণতা চালিত করলে, ধরিত্রীর সূক্ষ্ম রজ এদিক সেদিক চলে যেতে থাকলো। অন্যদিকে, ধরিত্রীর এই কর্মকাণ্ড দেখে, এবং অগ্নি বায়ুর জন্ম দেওয়ার কারণে অন্য ধরা অংশরা প্রভাবিত হতে, দুই প্রকার প্রতিক্রিয়া দেখা গেল।
যেখানে অন্য কিছু ধরা অংশ, ধরিত্রীর দেখাদেখি নিজের নিজের নক্ষত্রের রচনা করা শুরু করলো, সেখানে বিপুল সংখ্যক সেই ধরাখণ্ড, যারা আত্মের আঘাতে এক থেকে বহু হয়ে গেছিল, তারা নিজেদের স্থূল অস্থিত্ব নাশ করে, ধরিত্রীর কর্মযজ্ঞে অংশ নিতে ধরিত্রীর কাছে উপস্থিত হলে, ধরিত্রীর অনুরোধে, তারা ধরিত্রীর উপরিপিষ্টে অবস্থান শুরু করলো, যা ধরিত্রীর দুই সন্তান বায়ু ও অগ্নি ক্রীড়াক্ষেত্র হয়ে উঠলো। অগ্নির উষ্মা, এবং বায়ু সেই ক্রীড়াক্ষেত্রে ক্রীড়া করতে থাকলে, ক্রমে সমস্ত খনিজের সূক্ষ্মরূপ ধারণ করে, বাদল জমা হতে থাকলো সেই ক্রীড়াঙ্গনে, আর তাই তার নাম ক্রমশ হয়ে উঠলো বায়ুমণ্ডল।
আর এই বায়ুমণ্ডলে, উষ্মা ও বায়ু সমানে ক্রীড়া করতে থাকলে, একসময়ে সম্পূর্ণ বায়ুমণ্ডলই বাদলে পরিপূর্ণ হতে থাকলো, যেখানে বায়ু ধরিত্রীর নিকটে উপস্থিত সকল সূক্ষ্মধরাকণাদের নিয়ে বাদল করতে থাকলো, সেখানে উষ্মা তাদেরকে তাপ দিতেই থাকলো। আর তার ফলস্বরূপ এই ক্রীড়া দেখে দেখে উদ্দীপনা জন্ম নিলো ধরা ও মানসের মধ্যে আর সেই উদ্দীপনার কারণে আমার নির্মিত ভ্রূণ, মেধাকে ধরিত্রী ও মানস ধারণ করলো, আর তাই শুরু হলো বাদলের ফাটল, যার থেকে জলধারা নেমে এলো ধরিত্রীর বুকে।
মানবিক সময়কাল অনুসারে লক্ষকোটি বৎসর ব্যাপী সময় লেগেছিল এই বাদল নির্মাণ পর্যন্ত ক্রীড়ার, আর মানবিক সময়কাল অনুসারে ৩ লক্ষ বৎসর সময় লেগেছিল মেধার অর্থাৎ জলধারার জন্ম সম্পন্ন করতে। এই ৩ লক্ষ বৎসর ধরিত্রীর বুকে সমানে বর্ষণ হতে থাকে, বাদল ফেটে ফেটে। আর এই অবিরাম বর্ষণ হতে থাকলে, বিশাল এক সাগরের নির্মাণ হয়ে যায় ধরিত্রীর বুকে, অর্থাৎ মেধা ভ্রূণ অবস্থা থেকে স্থূলে অস্তিত্ব নিশ্চয় করে ধরিত্রীর বুকে।
ধরা, মানস এঁরা সকলেই আমার সন্তান হলেও, আমি এঁদের জন্ম দিতে আগ্রহী হয়ে এঁদের জন্মদান করিনি। আমার সন্তান তো মেধা। তাঁর জন্ম নিশ্চয় করার জন্যই যখন আত্মের থেকে দূরত্ব স্থাপন করার প্রয়াস করেছিলাম, সেই দূরত্ব রচনা করার কালে মানসের জন্ম হয়, আর যখন আত্মের থেকে মেধাকে লুকাবার প্রয়াস করেছিলাম, তখন ধরার জন্ম হয়। সেই কথা তো তোমাদের পূর্বেই বলেছি।
আমার সন্তান হলো মেধা। তাই শ্রেষ্ঠ ভাবে বিশেষ সে। বিশেষ থেকে নির্বিশেষ হয়ে ওঠাই যে তার জন্মপথ, তার জন্মকারণ। তাই মেধা যখন স্থূলে প্রকট হলো, সে এতটাই বিশেষ যে, সম্পূর্ণ ধরিত্রীকে সে একাকী ডুবিয়ে দিলো নিজের ধারার মাধ্যমে। মেধার এই কীর্তিতে ধরা ও মানসের সাথে সাথে, সম্পূর্ণ বায়ুমণ্ডল যেমন পুলকিত হলো, তেমনই পুলকিত হলো অগ্নি ও বায়ু।
আর অগ্নি বায়ু এতটাই পুলকিত হলো মেধার কারণে যে, অগ্নি অতিশয় উষ্মা প্রকাশ করতে থাকলো, এবং বায়ু অতিকায় ভাবে বইতে থাকলো। আর এর ফলে, ধরিত্রীর বহুল ক্ষেত্র ফুলেফেপে উঠতে শুরু করলো। বায়ু সমানে তাদের উপর ক্রিয়া করতে থাকলে, ক্রমে কনো কনো স্থানে ধরিত্রী স্তূপাকার হতে শুরু করলো। আর সেই স্তূপের কারণে ধরিত্রীর উষ্মা সেই স্তূপের উপরি বিভাগে আর পৌছাতেই পারলো না, যার ফলে সেই ধরিত্রীর স্তূপের মাথায় স্থিত মেধা ক্রমশ নিজের মধ্যে যেই তাপ ধরে রেখেছিল, তা ত্যাগ করতে বাধ্য হলো, আর তা ত্যাগ করতে করতে একসময়ে মেধা অর্থাৎ জল বরফে পরিণত হয়ে উঠলো।
বায়ু সমানে ক্রীড়া করে করে, এবার সেই জমা হয়ে যাওয়া ধরিত্রীর মাটিস্তূপকে বিগলিত করার প্রয়াস করতে থাকলে, দুই প্রকার প্রতিক্রিয়া লক্ষিত হলো ধরিত্রীর বুকে। কিছু ধরিত্রীর স্তূপের মাটি দলা পাকিয়ে গিয়ে পাথর রূপ ধারণ করতে থাকলো। আবার বেশ কিছু মাটিকে বায়ু প্রবাহিত করে, স্তূপের নিচের দিকে নিয়ে আসা শুরু করলো। আর সেই থেকে সমতল ভূমির নির্মাণ হলো।
বায়ুর ক্রিয়া অনবরত চলতেই থাকলো, আর তার ফলে এবার মাটির মধ্যে থাকা রুক্ষ বালুকা পৃথক হতে থাকলো মাটির থেকে। সেই বালুর উপরেও বায়ুর ক্রিয়া চলমান থাকলে, লঘু ও ঝুরো বালি মৃত্তিকার থেকে অনেক ক্ষেত্রেই আলাদা হয়ে গিয়ে, মরুভূমি নির্মাণ করা শুরু করলো, যা ধরিত্রীর কনো একটি স্থানে স্থিত হয়ে গেল, আবার কনো কনো স্থানে তা সাগরের তটের কাছে গিয়ে একত্রিত হতে শুরু করলো। আর পরিত্যক্ত বালুকা একত্রিত হতের হতে, বালুপাথরের নির্মাণ করে, বেশ কিছু এমন বালুপাথরের স্তূপবিস্তীর্ণ অঞ্চলও নির্মিত হলো।
অন্যদিকে, পর্বতের চূড়ার বরফ ও মাটির উপরও বায়ু ক্রীড়া করতে থাকার কারণে, বেশ কিছু স্থানে পাহাড়ের মধ্যে গুহার নির্মাণ হওয়া শুরু করলো। আবার বেশ কিছু গুহারও উচ্চতা অনেক হবার কারণে সেখানেও মেধা জল হয়ে উঠলো, আর যেখানে উচ্চতায় গুহা হলো না, সেখানে উষ্মার কারণে বাস্পায়িত হয়ে শুরু করলো সেখানের জল বা মেধা, আর বায়ুর কারণে তা বাদল বা বর্ষণের মেঘে পরিণত হতে থেকে বৃষ্টিপাতকে ধরিত্রীর একটি নিত্যক্রিয়ারূপে স্থাপিত করলো ধরিত্রীর মধ্যে।
যেই স্থান গুলি উচ্চতায় স্থিত, সেখানে উষ্মা না পৌঁছানোর কারণে সেখানের মেধা বরফ হয়েই থাকলো। আবার বেশ কিছু স্থানে উষ্মা বরফকে গলানোর মত উপস্থিত হলেও, বাষ্প করার মত করে উপস্থিত হতে পারলো না। তাই সেই স্থান থেকে মেধা অর্থাৎ জল সমানে গলিত হতে থাকলো, আর তাই তা নদীর আকার ধারণ করলো।
এবার সেই নদীরা, বায়ু ও উষ্মা সমানে ক্রীড়া করে করে, কয়েক হাজার বৎসর ধরে, আজকের যেই ধরিত্রী দেখতে পাচ্ছ তোমরা, তার নির্মাণ করে ফেলে, যেখানে সুউচ্চ পর্বতমালা রয়েছে, যেখানে প্রচুর নদী আছে, যেখানে প্রচুর মরুভূমি ও সমুদ্রতট রয়েছে, সমতল আছে, আর রয়েছে নদীসিক্ত উর্বর মাটি, এবং বালু তথা উষ্মার কারণে নির্মিত বিভিন্ন ধরিত্রীর মৃত্তিকানির্মিত পাথরের স্তূপ, যার প্রতি কণায় কণায় ছড়িয়ে রয়েছে প্রচুর খনিজ, এবং তাঁদের সাথে মিলিত মেধা বা জল।
তবে এমন ভাবার কনো কারণ নেই যে, মেধা বা জল, উষ্মা বা অগ্নি ও বাষ্প বা বায়ু নিজেদের ক্রীড়া করা বন্ধ করে দিয়েছে।
তারা সমানে ক্রীড়া করতে থাকে, আর তার ফলে নিত্য ধরিত্রীর মধ্য থেকে খনিজদের অগ্নি উন্নীত করে সম্মুখে রাখে অগ্নুৎপাতের মাধ্যমে, নিত্য সাগরের নিচে থাকা মৃত্তিকা স্তরের মধ্যে যোগদান হতে থাকে নদীর দ্বারা সাগরে গলিয়ে নিয়ে যাওয়া মৃত্তিকা। আর তাই সমানে সাগরের স্তর উচ্চ হতে থাকে। এরপরেও ধরিত্রী আমার হস্তক্ষেপ কামনা করে কখনো কখনো। তাই আমার প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপের ফলে আকস্মিক সাগরের নিচে স্থিত ভূমির সাথে অধিক মৃত্তিকা যুক্ত হয়ে গিয়ে, সমস্ত ভৌগলিক গঠনই পালটে দেয়।
অর্থাৎ, আজ যেখানে সাগর দেখছো, তাকে সমুদ্রের থেকে ঊর্ধ্বে নিয়ে চলে আসি আমি, আর তার ফলে আজ যেখানে ভূমি তা সাগর হয়ে যায়। তবে আমার থেকে হস্তক্ষেপের কামনা না করেও ধরিত্রীর মধ্যে প্রাকৃতিক ভাবেই তা ঘটে, কিন্তু তা ঘটতে প্রায় মানবিক সময়কাল অনুসারে ১০ লক্ষ বৎসর সময় লাগে, যেখানে আমি হস্তক্ষেপ করলে তা মাত্র ১০ হাজার বৎসরের মধ্যেই সম্পন্ন হয়ে যায়।
অর্থাৎ প্রাকৃতিক ভাবে দেখতে গেলে, প্রতি ১০ লক্ষ বৎসর পরে আজ যেখানে ভূমি দেখছো তা সাগর হয়ে যায়, আর আজ যেখানে সাগর দেখছো তা ভূমি হয়ে যায়। তবে ভূমি হয়ে যাবার পরে, নদীর পূর্ণ রচনা অতি শীঘ্র বা প্রায় ১০ বৎসরের মধ্যে হলেও। সেই নদীর প্রবাহ অর্থাৎ মেধা বা জলের প্রবাহ, অগ্নির ও বায়ুর ক্রিয়ার ফলে সমস্ত ভূমি গঠনের নির্মাণ হতে প্রায় ১০ থেকে ১৫ লক্ষ বৎসর সময় লেগে যায়।
উদাহরণ স্বরূপ দেখো, এই যে মানব যোনি, এই যোনি নির্মাণ হবার প্রায় ১২ লক্ষ বৎসর পূর্বে একটি বৃহৎ আকৃতির অনেকটা মানুষ, গরু এবং বানরের রূপ মেলালে যেমন দেখতে হয়, তেমন আকৃতির একটি যোনি বিরাজ করতো ধরিত্রীর সেই অংশে, যেখানে আজ সাগর রয়েছে। এই যোনি নিজেদের কন্দম নামে অবিহিত করতো, কিন্তু তোমরা এই প্রজাতিকে আজ ডাইনোসর বলে থাকো।
এঁরা অন্য সমস্ত যোনির থেকে উন্নত হবার কারণে, এঁদের অহংকার এতটাই বৃদ্ধি পায় যে সকল যোনির অস্তিত্ব সমাপ্ত করার পথে অগ্রসর ছিল তারা। সমস্ত যোনি আমার কাছে আবদার করেছিল, আর শেষে ধরিত্রী স্বয়ং আবদার করেছিল যে এই যোনিকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে হবে। এই যোনি মাত্র ১ লক্ষ বৎসর এসেছিল জগতসংসারে। এই যোনির উৎপত্তি হয়েছিল যখন ধরিত্রীর সাগর তলের অংশ উন্নীত হয়েছিল তখন থেকে।
সাধারণ ভাবে যখন ধরিত্রীর মধ্যে সাগরের তলের অংশ উঠে আসে, আর সাগরের থেকে উন্নীত স্থল নেমে যায় সাগরের নিচে, তখন ধরিত্রীর পৃষ্ঠে থাকা যোনিদের অসুবিধা হয়না, কারণ এই নিম্নপ্রেরণ ও উত্তোলন অতি মৃদু গতিতে হয়ে থাকে। তাই যোনিরা সহজেই সেই স্থানে চলে যেতে থাকে যা সাগরের থেকে উঠে এসেছে আর সেই স্থান খালি করে চলে যেতে থাকে যা ক্রমশ সাগরের নিচে চলে যাচ্ছে।
তাই এই কন্দম যোনিকে যখন অবলুপ্ত করার নিবেদন আসে আমার কাছে, তখন প্রথম আমি এঁদের মধ্যে অনেক অনেক অবতাররূপ ধারণ করে এসে এঁদেরকে সঠিক পথে আনার প্রয়াস করতে থাকি হাজার হাজার বৎসরব্যাপী। আর পাশাপাশি, আমি এঁদেরকে আজ যেই ছেত্রকে নিরক্ষ রেখা বলো তোমরা, সেই অঞ্চলে নিয়ে আসতে থাকি, প্রকৃতির মধ্যে পরিবর্তন করে করে, আর যেমন তোমাদের বললাম, আমার প্রভাবে ১০ হাজার বৎসরেই সেই পরিবর্তন হয়ে যায়, যা স্বাভাবিক ভাবে ১০ লক্ষ বৎসর লাগে, সেই পরিবর্তনও করতে থাকি।
একশত এক তমবার অবতার গ্রহণ করেছিলাম সেখানেও, ঠিক যেমন মনুষ্য যোনির মধ্যেও আমি ব্রহ্মসনাতনের বেশে একশত এক তম বার জন্ম নিয়েছিলাম। ধরিত্রীর নিবেদন ছিল আমার কাছে যে, কনো যোনিকে নিশ্চিহ্ন করার আগে, তার এক শত বার ভ্রান্তিকে ক্ষমা করার। তাই আমি কনো যোনিকে সঠিক পথে নিয়ে আসার হলে এক শত একবারই প্রয়াস করি, এবং এই অন্তিম প্রয়াসেও যদি না ভ্রান্তি শোধন করে সেই যোনি, তাহলে তার বিনাশ করি।
(মৃদু হেসে) ব্যাস এই সত্যই উদ্ধার করে শিশুপালের ১ শত অপরাধ ক্ষমা করার কথা লিখেছিলেন। সেই কন্দম যোনিকেও তাই আমি ১ শত এক বার সুযোগ প্রদান করেছিলাম শুধরে যাবার জন্য। আর তার অন্তে, সেই এক কোটি বৎসরের সমাপ্তি হতে, আমি ধরিত্রীর সেই অংশকে জলের তলায় প্রেরণ করে দিই, আর আজকের যেই অংশ দেখো হিমালয়ের রেখা থেকে নিরক্ষ রেখার, সেই অংশ সাগরের উপরে উঠে আসে।
বাকি সমস্ত জীবকে আমি তখন আজ ধরিত্রীর যেই উত্তর অঞ্চল, যেখানে সমস্ত সময়ে বরফ থাকে, সেখানে প্রেরণ করে দিয়েছিলাম, যাতে সেই অঞ্চল থেকে সদ্য উন্নত জমিস্থানে তারা সরে আসতে পারে, এবং সুরক্ষিত থাকে, কিন্তু কন্দম যোনিকে যেই স্থানে আবদ্ধ রেখেছিলাম, তাকে সাগরের নিচে প্রেরণ করে, সেই যোনির নাশ করে দিই”।
মীনাক্ষী প্রশ্ন করলেন, “মা, মানবযোনির নাশের জন্যও আজ থেকে এক লক্ষ বৎসর পূর্বে ধরিত্রী তথা সমস্ত যোনিরা আবেদন করেছিলেন তোমার কাছে, প্রভুর মুখ থেকে সেই কথা শুনেছি আমি। আর প্রভুও ছিলেন একশত এক তম অবতার মানুষকে সতর্ক করার জন্য অন্তিম অবতার। … তাই, এবার কি মানবের বিনাশের পালা!”
মাতা সর্বাম্বা হেসে বললেন, “মীনাক্ষী, যতক্ষণ না প্রচারিকারা সমস্ত সেই মানুষদের এখানে নিয়ে এসে উপস্থিত করছে, যাদেরকে রক্ষা করা হবে, ততক্ষণে একটি জাহাজের নির্মাণ করো। আর প্রচারিকারা সকলকে নিয়ে এলে, সকলকে সেই জাহাজে উঠিয়ে নিয়ে, জম্বুদ্বিপের থেকে নিচুতে একটি স্থানে যাত্রা করবে। সেখানে একটি সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত, কেবল উদ্ভিদ ও কিছু কীট, পক্ষী ও শান্ত জীবযুক্ত দ্বিপ পাবে। সেখানে নিজেদের জাহাজ নোঙ্গর করে বসবাস আরম্ভ করবে।
কিছু ভয়াবহ ভূকম্পনের অভিজ্ঞতা হবে তোমাদের। বিচলিত হবেনা। তোমাদের কিচ্ছু হবেনা। তোমরা জীবৎদশাতেই এই ছোট্ট স্থানটিকে বিপুল বিস্তৃত জমি রূপে দেখে যেতে পারবে। আর আজ যেখানে মানব বসবাস করছে, তাকে সাগরে পরিণত হয়ে যেতেও দেখে যাবে। চিন্তা করো না, তোমরা এই কিছুমানুষ ছাড়া অন্য কেউ এই দ্বিপের সন্ধান কিছুতেই পাবেনা, এই দ্বিপ তারা দেখতেও পাবেনা। সেই স্থানে গিয়েও দেখতে পাবেনা”।
মীনাক্ষী প্রশ্ন করলেন, “আর বাকি সমস্ত জীব!”
মাতা সর্বাম্বা হেসে বললেন, “যাদের রক্ষা করার তাদেরকে আমি ঠিকই রক্ষা করে নেব, চিন্তা করিস না মা!”
মাতা সর্বশ্রী বললেন, “মা, ধরিত্রী তো এবার সম্পূর্ণ ভাবে প্রস্তুত হয়ে উঠেছিল সমস্ত যোনি ধারণ করার জন্য। তা কি করে সেই যোনির বিস্তার আরম্ভ হলো ধরিত্রীতে?”
