২৩। ভূমিপ্রজ্ঞা অধ্যায়
মাতা সর্বাম্বার সম্মুখে এবার সকলে ভূমিতে উপবেশন করলে, মাতা সর্বাম্বা মীনাক্ষী ও সর্বশ্রীকে সম্মুখে রেখে, সকলের উদ্দেশ্যে বলা শুরু করলেন, “তখন ভ্রমের কনো অস্তিত্ব ছিল না। কেবলই শূন্য বিরাজ করতো, কেবলই ব্রহ্ম। কিন্তু কিছু না থেকেও, কিছু ছিল। বেদনা ছিল। একাকীত্বের বেদনা। অনন্তের জ্বালা অনন্তই জানে। একাকীত্ব তাঁকে গ্রাস করে নিতে থাকে সর্বক্ষণ। সেই একাকীত্ব, তাঁর অন্তরে মাতৃত্বের সঞ্চার করে।
প্রবল প্রেম উদ্বেলিত হয় তাঁর মধ্যে, আর সেই প্রেম হলাম আমি, অর্থাৎ সকলের মা, সর্বাম্বা। ব্রহ্মের প্রথম প্রকাশ আমি, একমাত্র প্রকাশ আমি। তাই আমাকে যারা সঠিক সঠিক ভাবে চেনে, তাঁরা আমাকে প্রেম বলে জানলেও, ব্রহ্মেরই প্রকাশ বলে আমাকে ব্রহ্মময়ী নামেও ডাকে”।
২৩.১। সীমাসীম পর্ব
মাতা সর্বাম্বা বলতে থাকলেন, “অনন্তের প্রকাশ হলেও আমি অনন্তই রইলাম, অর্থাৎ আমি ব্রহ্মের থেকে বিচ্ছিন্ন কনো প্রকাশ হলাম না, বরং ব্রহ্ম স্বয়ংই হয়ে রইলাম, কেবল মাতৃত্বকে ধারণ করে, নির্বিকারত্ব ত্যাগ করলাম। অর্থাৎ অনন্ততত্ত্ব, অসীমতত্ত্ব, অব্যাক্ততা, অচিন্ত্যতা, নিরাকারত্ব, শূন্যত্ব, এবং নির্বিশেষত্ব ধারণ করেই বিরাজ করলাম আমি।
কিন্তু এই একটি পরিবর্তন, অর্থাৎ নির্বিকারত্ব ত্যাগ হবার ফলে, ব্রহ্মের থেকে বিকারের রচনা হয়, আর সেই বিকারকে সেই কালে আত্ম বলা হলেও, পরে তারই কীর্তির কারণে তাকে পরমাত্ম নামে ভূষিত করা হতে থাকে।
তাঁর প্রথম দর্শনে, আমার মাতৃত্বই জাগ্রত হয়, এবং আমি তাঁকে মাতৃত্বই প্রদান করে প্রেমদ্বারা ভূষিত করতে আগ্রহী হই। কিন্তু আত্মের প্রতিক্রিয়া ছিল ভিন্ন। সে আমার অস্তিত্বের কারণে অসংযমী ও তটস্থ হতে শুরু করে। তার ধারণা জন্ম নেয় যে, আমার অস্তিত্বের কারণে সে অসীম নয়, সে অমর নয়। আমার মাতৃত্ব দেখে তাঁর ধারণা জন্ম নেয় যে, আমার মাতৃত্বের কাছে তাকে পরাধীন হতে হবে, তাকে বশ্যতা স্বীকার করতে হবে। আর তাই সে আমার বিরোধী হয়ে ওঠে।
(হাস্য প্রদান করে) সাগরের লহর যদি সাগরকেই ঈর্ষা করে, কি প্রতিক্রিয়া হতে পারে ভেবে দেখে নাও। আমার থেকেই তার উৎপত্তি, আর সে আমারই অস্তিত্বকে ঈর্ষা করা শুরু করলো। তার মনে হতে থাকলো যে, সাগর থাকলে, সাগরের লহরিমা কখনোই প্রতিষ্ঠা লাভ করবেনা। এমন বিচার করে, সে আমার থেকে অপসারিত হওয়া শুরু করে। আমার থেকে দূরে চলে যেতে শুরু করে।
কিন্তু আমার থেকে দূরে কি করে যাওয়া সম্ভব! আমিই তো একমাত্র অস্তিত্ব! আমি তো স্বয়ং ব্রহ্ম, একম অস্তিত্ব ব্রহ্মময়ী আমি। তাই চেয়েও সে আমার থেকে দূরে যেতে সক্ষম তো হলো না, কিন্তু হ্যাঁ, তার এই দূরে যাবার বাসনা আমার মাতৃত্বকে প্রবল ভাবে আঘাত করে। আমার মধ্যে যেই মাতৃত্ব প্রদানের ভাব সুপ্ত হয়ে অবস্থান করছিল, তাকে উস্কানি দিয়ে দিল আত্মের এই ঈর্ষার ভাবের কারণে দূরে যাওয়ার প্রয়াস।
আর তাই আমার মাতৃত্ব ইচ্ছা প্রকট করলে, সেই ইচ্ছা থেকে প্রথম ভ্রূণ জন্ম নেয়, যার নাম হয় মেধা। এই মেধাকে দেখা মাত্রই, আত্ম শঙ্কিত হয়ে ওঠে, আর মনে করতে থাকে যে, এক লহর যাতে প্রতিষ্ঠা লাভ না করে, তাই আমি আরো লহরের রচনা করছি। আর এমন বিচার করে হত্যা করতে উদ্যত হয় মেধাকে। আর সেই হত্যার প্রবণতা আমার মাতৃত্বকে ভিন্ন ভিন্ন রং প্রদান করা শুরু করে।
আমি এবার আমার প্রাণের সন্তান, এই মেধাকে রক্ষা করার প্রয়াস করতে সচেষ্ট হবার চিন্তা প্রকট করি এবং আত্মের থেকে আমি দূরত্ব স্থাপনের প্রয়াস করি। আত্ম ভ্রম, অর্থাৎ বিকার আর আমি সত্য অর্থাৎ ব্রহ্মময়ী। আর তাই আমার আর তার এই দূরত্ব স্থাপনের ক্রীড়া, এক ভূতের রচনা করে, যা না তো পূর্ণ ভাবে অসত্য আর না পূর্ণ ভাবে সত্য। এই ভূতকে তোমরা বলো আকাশ, আর আমি নাম দিয়েছিলাম মানস।
আত্ম এবার তৃতীয় লহরের দর্শন করে, যার প্রথম লহর স্বয়ং সে ছিল, দ্বিতীয় লহর মেধা অর্থাৎ আমার ভ্রূণ, যার মধ্যে স্বয়ং আমিই বিরাজ করি, আর তৃতীয় লহর এই মানস বা আকাশ। এবার আর সে সংযত থাকতে পারেনা, প্রবল ভাবে আঘাত করার প্রয়াস করে সে মানসকে, আর মানসকে আঘাত করে, আমার সাথে দূরত্ব কমিয়ে মেধার নাগাল পাবার প্রয়াস করে, যাতে মেধাকে সে হত্যা করতে পারে।
এমন প্রয়াস দেখে, মাতৃত্বের কারণে আমি আত্মকে হত্যাও করতে পারিনা, আবার একই মাতৃত্বের কারণে আমি আত্মকে মেধার নিকটেও আসতে দিতে পারিনা। তাই আমার মধ্যে আত্মের থেকে মেধাকে রক্ষা করার কল্পনা জন্ম নেয়, যার কারণে আমার মাতৃত্বের পরবর্তী রং দৃশ্যমান হয়। সেই রং মেধাকে আত্মের দৃষ্টি থেকে লুক্কায়িত করার রং হয়, আর তা করার জন্য, আমি রচনা করি ধরার অর্থাৎ যাকে তোমরা বলো প্রস্তর বা মৃত্তিকা।
প্রস্তরের বা মৃত্তিকার কারণে অর্থাৎ ধরার কারণে মেধাকে আর আত্ম দেখতে পায়না। তাই সে অতিক্রুদ্ধ হয়ে গিয়ে, এবার ধরাকে আঘাত করে। কিন্তু তার আঘাত ধরাকে স্পর্শও করতে পারেনা। বারংবার আঘাত করার প্রয়াস করেও আত্ম ধরার কিচ্ছু করতে পারেনা কারণ মানস ধরা ও আত্মের মধ্যে স্থাপিত হয়ে আত্মকে বারংবার বিফল করতে থাকে।
সেই দেখে ক্রুদ্ধ আত্ম এবার বলসংগ্রহ করার প্রয়াস করতে থাকে। মেধার জন্মের কালে আমার থেকে উৎপত্তি হওয়া ইচ্ছা, মানসের জন্মের কালে আমার থেকে উৎপত্তি হওয়া চিন্তা এবং ধরার রচনার কালে আমার থেকে জাত কল্পনাকে আমি বর্জন করেছিলাম, সেই বর্জিত তিন ছায়াশক্তিকে ধারণ করে আত্ম, এবং প্রবল বল ধারণ করে নিয়ে মানসকে প্রতিহত করে, ধরাকে সক্ষম ভাবে আঘাত করে।
সেই আঘাতের ফলে, ধরা সহস্র টুকরো হয়ে গেলে, মানস সেই প্রতিটি ধরার টুকরোকে রক্ষা করার প্রয়াসে, স্বয়ংও সমান খণ্ডে খণ্ডিত হলো। আর আত্ম দেখলো, ধরা টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়াতে তার অন্তরালে লুকানো মেধাও টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। অথচ নাতো ধরা আর না মেধা নষ্ট হয়েছে, বরং তাঁরা টুকরো টুকরো হয়ে গিয়ে, এক থেকে বহু হয়ে গেছে।
তাই আত্মও এবার নিজেকে বহু টুকরো করে নেয়, এবং তাঁর সাথে যুক্ত, কল্পনা, চিন্তা ও ইচ্ছাকেও বহু টুকরে খণ্ডিত করে, নিজের সাথে যুক্ত রাখে। এমন করার ফলে, সমস্ত আত্মের সমষ্টির নাম পরমাত্ম হলো আর প্রতিটি খণ্ডের নাম আত্ম হয়। আত্ম তখনও মেধার হত্যা করা থেকে অপসারিত হয়নি দেখে, সন্ত্রস্ত এই মাতা এবার নিজের প্রবল শ্বাস ও নিজের উষ্মা দ্বারা আত্মকে প্রথমবার আঘাত করে। এই শ্বাসকে তোমরা বায়ু বলো, আর এই উষ্মাকে তোমরা অগ্নি বলো।
আমার সেই আঘাতে আত্ম রীতিমত আঘাতপ্রাপ্ত হলে, আমার মাতৃত্ব তার উপরও ফলিত হয়। আর সেই মাতৃত্বের কারণে তিনছায়া, অর্থাৎ কল্পনা, চিন্তা ও ইচ্ছা সকল আত্মের সেবা করে, আর এই সেবার কালে সান্নিধ্যের ফলে আত্মের থেকে তিন ছায়া, একটি একটি করে সন্তান লাভ করে, যারা আত্মের ত্রিগুণ অর্থাৎ সত্ত্ব, রজ ও তম নামে প্রসিদ্ধ হয়।
আত্ম সুস্থ হলেও, সে আমার মাতৃত্বকে বরাবরের মত এবারও প্রত্যাখ্যান করে, আমার যেই দুই বল দ্বারা সে আক্রান্ত হয়, অর্থাৎ বায়ু ও অগ্নি, তাদেরকে বশীকরণ করার জন্য তাঁর তিনপুত্রকে নির্দেশ দেয়। এবার আত্মের কৃত্য আর কেবল ঈর্ষা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকেনা। এবার সে পরামর্শ করে ষড়যন্ত্র করা শুরু করে, আর পরামর্শ করে কাদের সাথে! আমারই তিন ছায়াশক্তির সাথে। তাই আমি এবার সতর্ক হয়ে যাই।
আমার ভ্রূণ, অর্থাৎ মেধাকে আমি আমার পূর্ণ মাতৃত্বদ্বারা রক্ষা করবো, এমন অঙ্গিকার করে, এবার আমি আমার মধ্য থেকে আমার ত্রিগুণকে সঞ্চার করি, যাতে তারা মিলে মেধার অর্থাৎ জলতত্ত্ব, বায়ুর অর্থাৎ পবনতত্ত্বের, এবং অগ্নির অর্থাৎ অগ্নিতত্ত্বের রক্ষা করতে পারে। সেই তিন গুণকে তোমরা বলো বিচার, বিবেক ও বৈরাগ্য।
আত্ম ও আত্মের ত্রিগুণ সমানেই বায়ু ও অগ্নিকে কুক্ষিগত করে, মেধার কাছে উপস্থিত হবার প্রয়াস করে, আর আমার ত্রিগুণ, অর্থাৎ বিচার, বিবেক ও বৈরাগ্য সমানে এঁদেরকে রক্ষা করার প্রয়াস করে যায়। আর এই দুইপক্ষের প্রয়াসের কারণে, আত্ম একটি একটি করে বিকারের রচনা করতে থাকে, আর আমি সেই একটি একটি বিকারের থেকে রক্ষাকবচ নির্মাণ করতে করতে, সপ্তলোক নির্মাণ করে ফেলি, যার তিনটি প্রবেশ দ্বার হয়।
একটি প্রবেশ দ্বার আমার ত্রিগুণের কাছেই উন্মুক্ত রাখি, আর সেই দ্বারকে তখনই উন্মুক্ত হাবর অনুমতি প্রদান করি যখন এই সপ্তলোককে মেধা ধারণ করার যোগ্য হয়ে উঠবে তখন। দ্বিতীয় দ্বারে রাখি আমার মাতৃত্বকে, অর্থাৎ এই মাতৃত্বকে ধারণ করতে পারলে তবেই সেই দ্বার উন্মোচিত হবে। এই দ্বারকে তোমরা বলে থাকো ইরা। আর তৃতীয়দ্বারে রাখি আমার দায়িত্ববোধকে অর্থাৎ পিতৃত্বকে। আর একে তোমরা বলো পিঙ্গলা। আর সেই সপ্তলোককে তোমরা বলে থাকো সুষুম্না।
এই সপ্তলোকের দেশ নির্মাণ করার প্রক্রিয়া যতক্ষণ সূক্ষ্মজগতে চলছিল, ততক্ষণে ধরা, অগ্নি, বায়ু, মেধা অর্থাৎ জল এবং মানসকে বহু সংঘাতের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হতে হয় আত্মের সাথে, আর সেই প্রতিটি সংঘাতের কারণে, এঁদেরকে বহুবিধ স্তর অতিক্রম করতে হয়, তবেই যখন এই সপ্তলোক নির্মাণ সমাপ্ত হয়, তখন মনুষ্যযোনির নির্মাণ সম্ভব হয়।
এর পূর্বে, ধরিত্রীর নির্মাণ হয়, এবং ধরিত্রীকে ঘিরে নির্মাণ হয় বিবিধ গ্রহাদির। ধরিত্রী আমার বহুতর পঞ্চভূতকে ধারণ করতে সক্ষম হবার কারণে, তার বক্ষস্থলকে অধিকার করে নিতে আত্ম প্রদান করে একাধিক যোনি যারা আমারই সকল সন্তানদের ধারণ করে জীবিত থাকে, এবং এই একটি একটি যোনির মধ্য দিয়ে আমি সপ্তলোকের বিস্তার করতে থাকি, যতক্ষণ না মনুষ্যযোনিতে উপনীত হয়ে এই সপ্তলোক নির্মাণ সমাপ্ত হয়।
এই সপ্তলোক নির্মাণ সমাপ্ত হলে, আমার ত্রিগুণ সক্ষম হয় মেধা, অগ্নি ও বায়ু তথা সকল ধরা ও মানসপক্ষকে নিয়ে উপস্থিত হতে। এবং তা করতে সক্ষম হলে, তবেই মেধার থেকে সমস্ত আমার ভাব প্রকাশিত হয়, আর সেই সমস্ত প্রকাশিত ভাবকে ধারণ করে, মেধা স্বয়ং আমি, অর্থাৎ পরাচেতনা রূপে প্রত্যক্ষ হয়ে ওঠে। পরাচেতনা রূপ ধারণ করার পরেই সে সপ্তলোকে বিহার করতে প্রস্তুত হয়, এবং তেমন করার শেষে, সে নিজেকে স্বয়ং আমি বলে চিহ্নিত করতে পারে।
সে যখন নিজেকে স্বয়ং আমি বলে চিহ্নিত করে, অর্থাৎ সে যখন নিজেকে পরাপ্রকৃতি, পরানিয়তি রূপে সনাক্ত করে নেয়, তখন সে সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়ে যায় আমার সাথে মিলিত হতে, নিজের মায়ের সাথে মিলনের জন্য। আর সেই মিলনের পথে যখন আত্ম ও পরমাত্ম স্বভাবমতই বাঁধা দেবার প্রয়াস করে, সে তখন নিজের আত্মের দমন করে, আমার থেকে প্রকাশিত সমস্ত কিছু, অর্থাৎ পঞ্চভূত, পঞ্চভাব তথা আমার ত্রিগুণ অর্থাৎ মহাভাবদের সঙ্গে নিয়ে আমাতে মিলিত হয়ে যায় সমাধির মাধ্যমে।
এই হলো সম্পূর্ণরূপে এই ব্রহ্মাণ্ডের যাত্রা। এই মা’কে আত্ম বাধ্য করে সন্তান বিস্তারের জন্য। আর তাই এই মাও ব্যাকুল থাকে তাঁর সন্তানদের ফিরে পেতে, আর সন্তানরাও ব্যকুল থাকে তাদের মায়ের সাথে পুনরায় মিলিত হতে। আর এই মিলনের পর্ব যতক্ষণ সূক্ষ্মজগতে চলতে থাকে, ততক্ষণে স্থুল জগতে অর্থাৎ পঞ্চভূতের জগতে চলে বহুল নাট্য।
আর এবার আমি তোমাদেরকে সেই নাট্যের কথাই বলবো। ধরার রচনা কি কারণে হয়, তোমাদের বললাম। এবার সেই ধরা সমস্ত ভূত ধারণ করে কি ভাবে ধরিত্রী হয়ে ওঠে, এবং ধরিত্রী হয়ে উঠে কি ভাবে সমস্ত যোনিরূপ অর্থাৎ, বাকি সমস্ত ধরা তথা ভূতদেরকে নিজের কাছে টেনে এনে, ধারণ করে সেই কথা বলবো।
সেই কথার সাথে সাথে, যখন আমি সূক্ষ্মদেহে সপ্তলোক স্থাপন করার প্রক্রিয়াতে রত থাকি, তখন কেমন ভাবে একের পর এক যোনিরূপ প্রকাশিত হয় পঞ্চভূতকে ধারণ করে করে, আর সেই যোনিদের ধরিত্রী কিভাবে ধারণ করে, চলমান রাখে, সেই কথাও বলবো। আর তার সাথে সাথে, যখন আমার সপ্তলোক নির্মাণ সমাপ্ত হয়, তখন যেই যোনি নির্মিত হয়, সেই মানবযোনির বিস্তারকথাও আমি বলবো। সেই মানবযোনির উপর আত্মের ও পরমাত্মের বিস্তার কিরূপ হয়, কিরূপে হয়েছে, এবং মানবযোনি সেই বিস্তারের থেকে কি ভাবে পূর্ণভাবে মুক্ত হয়ে উঠতে পারে, সেই কথাও বলবো।
আসল কথা হলো, সমস্ত যোনিরূপই আমার সন্তান, কারণ যতই তার আত্মের প্রভাবে প্রকাশ্যে আসুক না কেন, তারা সকলেই আমার সমস্ত ভূতদের ধারণ করে বিরাজ করে। কিন্তু যেহেতু আমার সপ্তলোক নির্মাণ সমাপ্ত হয়না তাদের মধ্যে, সেহেতু তাদের পক্ষে আত্মের থেকে পূর্ণভাবে মুক্ত হওয়াও সম্ভব হয়না। আর তাই, আমি বারবার তাঁদের অন্তরে মেধা হয়ে প্রবেশ করলেও, পূর্ণভাবে চেতনা হয়ে উঠতে পারিনা। আর তাই বারংবার আমি দেহ পালটাই।
অবশেষে মানবযোনির দেহ ধারণ করি। কিন্তু সপ্তলোক নির্মাণ করার পূর্বেই, আত্ম যেই ভাবে আমার সমস্ত সন্তানদের উপর আধিপত্য স্থাপন করে উপস্থিত থাকে, তার কারণে মানবের মধ্যে আত্মের প্রকোপ থেকে মুক্ত হবার সামর্থ্য আমি অঙ্কিত করে দেবার পরেও, মানব আত্মের সাথে যুদ্ধে রত হতে পারেনা, এবং আত্মের দ্বারা বশ হয়ে বহু কীর্তি করে থাকে। অবশেষে মানবের সামর্থ্য তো আছে আত্মের থেকে মুক্ত হবার, আর তাই তাঁদের লক্ষ্যই হলো আত্মের থেকে মুক্ত হয়ে আমার সাথে পুনরায় মিলিত হওয়া।
সেই পথে কি ভাবে চলতে সক্ষম মানব, আর আত্মের প্রকোপের কারণে সেই পথ থেকে ঠিক কতটা দূরে স্থিত মানব, সেই কথাও তোমাদেরকে আমি বলবো। কিন্তু সেই কথা বলার পূর্বে, তোমাদেরকে আমি ধরিত্রীর কথা বলবো। ধরিত্রী হলো আমার থেকে জন্মলাভ করা ধরা যখন আত্মের দ্বারা চূর্ণ হয়, সেই চূর্ণ হবার পরের বৃহত্তম টুকরো। আর সেই টুকরো ক্রমশ আমার বাকি সমস্ত ধরা টুকরোদেরকেও নিজের বক্ষে স্থান দেয়।
তাই প্রজ্ঞার দ্বিতীয় পর্বে, আমি তোমাদের প্রথম এই ধরিত্রীর অস্তিত্বের কথা বলবো এবং কীর্তিকলাপের কথা বলবো, যেই কীর্তিকলাপের ভিত্তিতেই সমস্ত যোনিরা, অর্থাৎ আমার বাকি সমস্ত ধরাটুকরোরা তাঁর বক্ষে স্থান লাভ করতে সক্ষম হয়। তাই এর পরবর্তী পর্বের নাম রেখো, ধরাধাম পর্ব।
সেই পর্বের শেষে, আমি তোমাদেরকে ধরিত্রীর দ্বারা সমস্ত যোনিকে কারপর কার ধারণ করেছেন, আমার সপ্তলোক গঠনের প্রক্রিয়া অনুসারে, সেই কথা বলবো। তাই সেই পর্বের নাম রেখো, যোনিবিস্তার পর্ব। অতঃপরে আমি তোমাদেরকে সেই যোনির কথা বলবো, যেই যোনিতে আমার সপ্তলোক নির্মাণ সমাপ্ত হয়ে যায়। সেই যোনির নাম মানবযোনি আর সেই যোনির থেকে নির্মাণ হয় এক নূতন অধ্যায়।
তাই তার পরবর্তী কথাকে তোমরা নরপ্রজ্ঞা রূপে এক ভিন্ন অধ্যায় রূপে চিহ্নিত করো। নরপ্রজ্ঞাতে আমি তোমাদের মানবের তথা সমস্ত জীবের শারীরিক বিস্তার, আর মানসিক বিস্তার সম্বন্ধে বলবো। তা বলার বিশেষ কারণ আছে, আর তা হলো, সেই সমস্ত বিস্তারের মধ্যে যেমন আত্মের বিস্তারপ্রয়াস থাকে, তেমন আমার ত্রিগুণ অর্থাৎ মহাভাব ও মেধার বিস্তারপ্রয়াসও থাকে।
সেই বিস্তারপ্রয়াসের বিজ্ঞান জানার পরে যা তোমাদের বলবো, তা আরো একটি অধ্যায়। সেই অধ্যায়তে আত্মের বিস্তারকথা জানবে এই মানবযোনির উপর, যার থেকে উদ্ধার লাভের উপায়ও তোমাদেরকে অন্তে বলবো আমার সম্যক প্রজ্ঞা কথার বিবরণ সমাপ্ত করার পূর্বে। তাই এবার আমি তোমাদের একে একে সমস্ত প্রজ্ঞা ব্যক্ত করবো। তোমরা সকলে মনোনিয়োগ দিয়ে শ্রবণ করো, কারণ এই প্রজ্ঞাই তোমাদেরকে আগামীদিনে তোমাদের লক্ষে, অর্থাৎ আমার সাথে মিলনের পথে সহায়িকার ভূমিকা পালন করবে”।
