১৭। পরীক্ষা অধ্যায়
জয়াবিজয়ার প্রশ্নের জট খুব শীঘ্রই কাটা শুরু হলো, যখন সেই কন্যা, মীনাক্ষী প্রথমবার কথা বলল। মিষ্ট নয় ঠিক তাঁর কণ্ঠস্বর, কারণ সুমিষ্ট কণ্ঠস্বর তাঁরা মাতা শ্রীর থেকে শুনেছেন। এই মেয়ের গলা মিষ্ট, কিন্তু সেই মিষ্টতার মধ্যেও যেন এক লুক্কায়িত গাম্ভীর্য আছে। তবে চেহারা আর চঞ্চল প্রকৃতি, যা জয়াদের দেখে মনে হচ্ছিল, তার সাথে সেই কণ্ঠস্বর একদমই মিলছিল না।
না, চঞ্চল স্বভাব ভুল নয়। কারণ সে প্রথম কথাই যা বলল, রাজা সুমিতকে, তা হলো এই যে, “পেন্নাম মহারাজ। … আমি সেই ডানপিটে মেয়ে, মীনাক্ষী। … দেখো না রাজা, আমাকে ধরা দিতে বলল, আমি তো নিজেই চলে এসেছিলাম। তারপরেও এই হাতে পায়ে দড়ি বেঁধে দিয়েছে। লাগছে বড়। … আচ্ছা তুমিই বলো রাজা, পায়ে এমন দড়ি বাঁধা থাকলে, হাঁটা যায়!”
রাজা সুমিত বললেন, “সত্যিই তো! এই ভাবে পায়ে দড়ি পরে হাঁটা যায়! … দড়ির ওজন তো ওর থেকেও বেশি! … ও হাঁটবে কি করে!… খুলে দাও পায়ের দড়ি, হাতের দড়িও খুলে দাও। এই মেয়ে পালাবে না! … সে তো নিজে থেকে ধরা দিয়েছে! তাহলে ভয় কিসের! খুলে দাও!”
মীনাক্ষী উত্তেজিত হয়ে বলল, “না না রাজা, ওরা আমার পায়ে ধরবে কেন! তুমি বলেছ, তাতেই হবে। আমি খুলে নিচ্ছি”। … এই বলে নিজের চরণ দুটিকে একবার একবার করে শূন্যে তুলে ঝাঁকা দিলে, আর হাতদুটিকে একত্রে ঝাঁকা দিলে, সমস্ত দড়ি খুলে পরে যায়। আর সে হাসি মুখে রাজা সুমিতের দিকে এগিয়ে যায়।
সেই দেখে, রাজা সুমিত বললেন, “ও জাদু বিদ্যাও জানা আছে দেখছি! … তা শিখলি কোথা থেকে এই জাদুবিদ্যা!”
মীনাক্ষীও অকপট উত্তর দিল, “আজ্ঞে, বাপের থেকে। বাপ জাদুর খেলা দেখাতো। বছর নয় তাঁকে পেয়েছি। বেশি জাদু শিখতে পারিনি, তবে দড়ি গলানো, দড়ি খোলা, মাথা ঝাঁকিয়ে বিনুনি বেঁধে ফেলা আর এলোকেশী হয়ে যাওয়া, এই সহজ জাদুগুলি শিখে নিয়েছিলাম”।
১৭.১। বিষক্রিয়া পর্ব
রাজা সুমিত হেসে বললেন, “তা বেশ। দেখি মাথা ঝাঁকিয়ে তোর এলোমেলো চুলটাকে বেণি করে ফেল দেখি!”
আদেশ পাওয়াও যেমন আর মীনাক্ষীর কীর্তিকলাপও তেমন। সঙ্গে সঙ্গে মাথাটি দুই থেকে চারবার ঝাঁকিয়ে নিলে, তাঁর মাথার কেশ বিনুনি হয়ে যায়। সেই দেখে রাজা সুমিত হেসে বললেন, “তা কাপরজামার এমন অবস্থা কেন? খাওয়া দাওয়া করিস ঠিক করে?”
মীনাক্ষী উত্তরে বললেন, “আজ্ঞে মহারাজ, আহার করি। বন থেকে ফল পেরে খাই। পেট ভরে যায়। দুচারদিন আগে ক্ষুধা লেগেছিল, তা এক হরিণ এসে বাঁট বাড়িয়ে দিল। দুই ঢোক দুধ খেয়েছি। ক্ষুধা জ্বালা লাগেনা। … কিন্তু বস্ত্র নেই রাজা। এই একখানই আছে। মলিন হইছে, ধুইতে পারিনি। … ছাড়লে পরবো কি! … তাই …”।
রাজা সুমিত অজিতেশের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এর বাড়িতে কে কে আছে!”
অজিতেশ মাথা নামিয়ে বললেন, “আজ্ঞে মহারাজ, অনাথ। চার জনের মধ্যে কনিষ্ঠ সন্তান। মাথার উপরে তিন দাদা, বয়সে অনেকটাই বড়। বিবাহ হয়ে গেছে। তাঁদের কনো সন্তান নেই এখনো পর্যন্ত”।
রাজা সুমিত বললেন, “এঁর গুরু আলয় নেই?”
অজিতেশ উত্তরে বললেন, “দুই ভ্রাতা ক্ষেতি করে, এক ভ্রাতা কাষ্ঠ শিল্প। এঁরা কেউ এঁকে গুরুর কাছে প্রেরণ করেনি মহারাজ। আমি বলেছিলাম তাঁদেরকে, তাঁরা কেউ গা করেনি সেই ব্যাপারে। এঁর ছোটো বৌদি প্রয়াস করেছিল, কিন্তু ১২ বৎসর বয়স হয়ে গেছিল ততক্ষণে, তাই কনো গুরু তাঁকে নেয়নি আশ্রমে”।
রাজা সুমিত এবার মীনাক্ষীকে প্রশ্ন করলেন, “পড়তে লিখতে জানো?”
মীনাক্ষী উত্তরে বলল, “হ্যাঁ মহারাজ, যখন কনো গুরু নেয়নি, তখন ছোটো বৌদি নিজের থেকেই পড়ালেখা শিখিয়েছেন নিজের সামর্থ্য মত”।
রাজা সুমিত ভ্রুকুঁচকে বললেন, “তাহলে এঁকে তোমার গুদাম, আস্তাবল, গোশালার কাজ দাওনি কেন?”
অজিতেশ উত্তর দেবার আগেই মীনাক্ষী বলল, “আজ্ঞে দিয়েছিলেন মহারাজ। গোশালায় কাজ দিয়েছিলেন। কিন্তু গরুর দুধ খাবার অপরাধে কাজ ছাড়িয়ে দিয়েছে। … কি করি বলো! গরুরা নিজে এসে বাঁট বাড়িয়ে দেয়। … বলেছিলাম, বোঝে নি। ভাবে আমি বানিয়ে বানিয়ে বলছি। … তাই ছাড়িয়ে দিয়েছে কাজ থেকে”।
জয়াবিজয়া আশ্বস্ত হলেন এই কথা শুনে, না, তাহলে রাজ্যে অব্যবস্থা নেই। এ মেয়েটারই পাকামির ফল। আশ্বস্ত হয়ে এবার রাজার বিধানের দিকে দৃষ্টি রাখলেন সকলে।
রাজা এবার ইঙ্গিত দিতে, দুটি বিষধর সাপকে মুক্ত করা হলো, সেই স্থানে। বিষধর সর্পদুটিকে দেখে, যে যেদিকে পারলো দৌড় লাগালও প্রাণের ভয় নিয়ে। জয়াবিজয়াও খানিকটা পিছিয়ে এলে, সাধ্বী বললেন, “চিন্তা করো না। কাছে এসে গেলে, স্থবির করে দিতে পারবো আমরা”।
সেই শুনে খানিক আশ্বস্ত হয়ে, মাথার ঘাম মুছে দাঁড়িয়ে দেখলেন মীনাক্ষীর প্রতিক্রিয়া ঠিক কি হয়। মীনাক্ষীকে দেখলেন একটি মিষ্ট হাস্য হেসে দাঁড়িয়ে পরলে, একটি সাপ তাঁর চরণ বেয়ে, শাড়ীর উপর দিয়ে, তাঁর অঙ্গকে জরিয়ে জরিয়ে মাথার দিকে উঠতে শুরু করে দিয়েছে। মীনাক্ষী যে কতটা কোমলাঙ্গী, তা এবার নিরীক্ষণ করলেন বিজয়া।
বিজয়া দেখলেন সাপটির সামান্য দেহচাপের ফলে, মীনাক্ষীর উরুর চর্ম ও মাস খানিকটা দেবে গেল; উদর দেশের উপর দিয়ে সাপটি ঊর্ধ্বে উঠতে থাকলে, মীনাক্ষী সাপের শীতল স্পর্শের কারণে খানিক শিহরন অনুভব করে নেত্র বন্ধ করলেও, সাপের গতির কারণে, মীনাক্ষীর উদরের স্থান এমন ভাবে সঙ্কুচিত হয়ে গেল যেন তুলা দিয়ে ভরা রয়েছে তাঁর উদর দেশ।
অবশেষে মীনাক্ষীর স্তনযুগলকে বেষ্টন করে, সর্পটি কুণ্ডলী পাকিয়ে বসেও যেন ইতস্তত করছিল। সেই স্থান ছেড়ে সে এগিয়ে যেতে চাইছিল না, কিন্তু সেই স্থানেও স্বস্তি পাচ্ছিল না সর্পটি। তাই এবার মীনাক্ষী মৃদু হেসে বললেন, “দাঁড়া ছটফট করছিস কেন? মাটিতে পরে যাবি নে! … চুপ করে বস ওখানে, আমি গরম করে দিচ্ছি”।
এই বলে নিজের দুই হাতকে আসতে করে নিজের স্তনের নিকটে নিয়ে গিয়ে, শিশুকে ক্রোড়ে নেবার মত করে হস্তদুইকে স্থাপন করলে, সর্পটি এবার নিশ্চিন্তে বসে রইল, নিজের ফণা নামিয়ে, চুপিসারে। অন্যদিকে সাপুড়ে দ্বিতীয় সর্পটি অন্যদিকে যাচ্ছিল বলে তাকে চেপে ধরতে, মীনাক্ষী বলে উঠলো, “আহা কাকা, ওকে বাঁধো কেন? দুটিই মেয়ে, সখী ওরা। সখী আদর খাচ্ছে, তাই হিংসা হচ্ছে। আর কাছে আসতে চাইছে। ছেড়ে দাও কাকা ওরে। ওর সখী যতক্ষণ না কোল থেকে নামবে, ততক্ষণ ও উঠবে না, জায়গা হবেনা কোলে দুজনের, ও দেখে বুঝে গেছে। আর আমার চোখে চোখ রেখে ওর অনুমান যে সঠিক তাও নিশ্চয় করে ফেলেছে। তাই যতক্ষণ না ওর সখী নামছে, ও একটু ছটফট করছে”।
আসতে আসতে আবার ভিড় জমে উঠলো মীনাক্ষীকে ঘিরে, আর সকলে দেখলো বেশ কিছুক্ষণ পরে যেই সাপটি কোল পর্যন্ত গেছিল, সে তেমন ভাবেই নেমে গেল, আর অন্য সাপটি অবিকল এক ভাবে উঠে মীনাক্ষীর কোলে চুপচাপ শুয়ে পরলো। এক্কেবারে নির্বিকার। যেন ঘুমিয়ে পরেছে”।
রাজা সুমিত সমস্ত কিছু দেখে অবাক। সকলেরই এক অবস্থা। তিনি বললেন, “সাপুড়ে, নিয়ে চলে এসো সাপটিকে”।
মীনাক্ষী আসতে করে বললেন, “কাকা! আগে ওকে তোমার জিম্মায় নাও। ও যদি দেখে ওর ঘুমন্ত বান্ধবীকে আমার কোল থেকে নিয়ে নিচ্ছ, তাহলে ও তোমাকে ছেড়ে কথা বলবেনা। আর এই চন্দ্রবোড়ার এমনই বিষ যে, এক নিমেষে তোমাকে শেষ করে দেবে”।
সাপুড়ে মীনাক্ষীর কথা না শুনে, মীনাক্ষীর দিকে দুই পা এগতেই, পূর্বের সাপটি এবার ফণা তুলে দাঁড়িয়েছে। … মীনাক্ষী মাথা নেড়ে বললেন, “কিচ্ছু হবেনা মা… তোমার বান্ধবী আমার কোলে আছে। কেউ তারে নিতে পারবেনা। আমি দেবই না!”
সাপুড়েকে ঘায়েল করার মনসা নিয়ে ছুটে আসা সাপটি যেন মীনাক্ষীর সমস্ত কথা শুনতেও পেল আর বুঝতেও পারলো। তাই ফণা নামিয়ে নিতে, এবার সাপুড়ের মীনাক্ষীর কথাতে বিশ্বাস হয়েছে। সে এবার পিছনের দিক থেকে এসে, সেই সাপটির মাথাকে চেপে ধরে, নিজের ধামার মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে সচেষ্ট হলে, মীনাক্ষী বললেন, “কাকা, তুমি এদিকে এসো না। এর ধামা আমার দিকে ছুড়ে দাও। ওর বন্ধু ধামায় ঢুকে একবার হিস আওয়াজ করলেই, এঁর ঘুম ভেঙে যাবে। তখন আর তোমার রক্ষা নেই”।
সাপুড়ে ধামাটি ছুড়ে দিলে, পা দিয়ে সেই ধামাকে ধরে, সুন্দর করে পা দিয়েই ডালা খুলে পাশে ঢাকনা সরিয়ে রেখে, ঘুমন্ত সাপটিকে সুইয়ে দিলো খুব আসতে করে। সবে ডালাটি অর্ধেক দিয়েছে, অমনি অন্য সাপটি হিসশব্দ করতেই, এই সাপটির ঘুম ভেঙে গিয়ে, সে ফণা তুলতে যাবে, মীনাক্ষী তাড়াতাড়ি ডালাটি চাপিয়ে দিলেন, আর হাসিমুখে ডালাটি সাপুড়েকে ফিরিয়ে দিলে, রাজা সাপুড়ের দিকে কটমট করে তাকিয়ে রইলে, সাপুড়ে ভয়ে সিটিয়ে গেলেন।
ভয়ে ময়ে সে বলে উঠলো, “মহারাজ, জানিনা আমি, কি হলো! … বিশ্বাস করেন মহারাজ। সত্যিই আমি জানিনে কি হলো। আমার পোষ মানানো সাপ আমার দিকেয় ধেয়ে আসে, কি এর কারণ! আমার মাথায় কিচ্ছু প্রবেশ করেনা মহারাজ!”
অজিতেশ বললেন, “মায়াবিনী বশীকরণ করে নিয়েছিল সাপদুটিকে। নিশ্চিত মহারাজ, জাদু জানে। তাই বশীকরণও নিশ্চয়ই জানে এই মেয়ে”।
মীনাক্ষী হেসে বললেন, “তোমার মাথাটা এক্কেবারে গেছে অজিতকাকা! … সাপরে বিনের ধ্বনি ছাড়া কিছুতে যদি বশ করা যায়, তা হলো একমাত্র গাঁজা। … তা দেখো আমার কাছে কি গাঁজা আছে! … দেখে নাও, এখানে অনেক স্ত্রী আছে। তাঁদের কারুকে পাঠিয়ে দেখে নাও একবার। তাছাড়া সাপকে বশ করা অসম্ভব, এক যদি তুমি সিদ্ধ না হও তবে।
সমস্ত জীবের মধ্যে সাপের মনঃসংযোগ সর্বাধিক। আর যার তীব্র মনঃসংযোগ করার সামর্থ্য আছে, তাকে কনো মাধ্যম ছাড়া বশীকরণ করা অসম্ভব। আমার কথায় বিশ্বাস করবে কেন? কাকারে জিগিয়ে নাও, একবার। আর তার থেকেও বড় কথা মহারাজ, জাদুর অন্তিম বিদ্যা হলো বশীকরণ। অন্তিম বিদ্যা পর্যন্ত বিদ্যাগ্রহণের জন্য আমি আমার বাপরে পেয়েছি কই!”
মহারাজ সুমিত সাপুড়ের দিকে তাকালে, সাপুড়ে চোখের ইশারায় বললেন, “মীনাক্ষী সঠিক বলছে”। সেই ইশারা বুঝে মহারাজ ঘার নেড়ে অজিতেশের দিকে তাকিয়ে বললেন, “অজিতেশ তুমি তো শুধু এটুকু বলেছিলে যে, এই মেয়ে প্রকৃতি আর প্রকৃতির সমস্ত জীবের ভাষা বোঝে, আর তা এঁর নিজের দাবি!”
মীনাক্ষী ভ্রুকুঁচকে বললেন, “এই অজিত কাকা, তুমি মিছে কান ভাঙ্গিয়েছ আমার নামে! … দাঁড়াও ফিরি গাঁয়ে, তারপর ভোলাকে দিয়ে তোমাকে গাট্টা খাওয়াবো। হচ্ছে তোমার!”
মহারাজ সুমিত বললেন, “ভোলাটি আবার কে?”
মীনাক্ষী বললেন, “আমার বানর বন্ধু। … মিথ্যা বলছে রাজা, ওই অজিত কাকা। আমি কখনো কিছু দাবি করিনি। নিজের মত নিজে বনে জঙ্গলে খেলে বেড়াই। ওইসব নিজের ব্যাপারে বড়াই করে বলা আমার দ্বারা হয় না বাপু। … আর কি বলবো নিজের ব্যাপারে! জানি আমি? আমি কি পারি, তাই তো আমি জানি না! শুধু বাবা আমাকে চারটে জাদু শিখিয়েছে, সেটা জানি যে আমি জানি। বাকি আমি কি জানি, তা আমি নিজেই জানিনা, তাহলে আমি তা বলবো কি করে!”
রাজা সুমিত বললেন, “জীবদের কথা বুঝতে পারো, তা তো বুঝলাম। কিন্তু নিজের ভাষা তাদেরকে বোঝাও কি করে?”
মীনাক্ষী উত্তরে বলল, “মহারাজ, মাতা ব্রহ্মময়ী সকলের মধ্যে বিরাজমান, সকলের চেতনা রূপে। আর তিনি কেবল প্রেম দিতে পছন্দ করেন, আর তাঁর প্রেম সকলে লাভ করার জন্য লালায়িত থাকে। আমি তো কেবল মা’কে স্মরণ করি, আর সকলকে প্রেম দিতে চাই। স্নেহ ভরে কোলে রেখে উষ্মা দিতে চাই। তারা সকলে সেটা পছন্দ করে কাছে চলে আসে। এই যা। সবাই ভাবে, আমার ভাষা বোধ হয় তারা বোঝে। … সত্য বলতে কি মহারাজ, ভাষাটি আমার নয়, ভাষাটি ব্রহ্মময়ী মায়ের। আর সেই ভাষার নাম প্রেম। এই প্রেমটা সবাই বোঝে, আমার ভাষা নয়”।
রাজা বললেন, “বটে। বেশ অপেক্ষা করো এখানে। আমি একটু বনের অন্দর থেকে আসছি। প্রকৃতি আমাকে ডাক দিয়েছেন”।
মীনাক্ষী অবাক নেত্রে রাজা সুমিতকে খানিক দেখলেন, তারপর রাজার চঞ্চল ভাব দেখে বুঝলেন যে রাজার মূত্রত্যাগের ডাক এসেছে, আর তা বুঝে হেসে বললেন, “একি মহারাজ, আপনি গেলেন না এখনো!”
রাজা অস্থির ভাবে বললেন, “তুমি তো কিছু উত্তর দিলেনা। আমি অনুমতি চাইলাম বনের অন্তর থেকে ঘুরে আসার। কিন্তু তুমি তো!”
মীনাক্ষী জীব কেটে বললেন, “ছি ছি মহারাজ। তুমি তো মহারাজ। তুমি কেন অনুমতি নেবে! … আমি অপেক্ষা করছি। তুমি ঘুরে এসো রাজা”।
রাজা বোধ হয় মীনাক্ষীর মধ্যের সাবলীলতাকে একটু পরীক্ষণ করার জন্যই এমন করলেন। তাই কিছু না বলে, একটি মুচকি হাস্য প্রদান করে, বনের অন্দরে চলে গেলেন। বেশ কিছুক্ষণ পরে, দুটি বিকট ব্যঘ্রের আওয়াজে সকলে চমকিত হলেন। মীনাক্ষীও। কিন্তু সকলের সাথে মীনাক্ষীর ভাব ভিন্ন। সকলে যেখানে ব্যঘ্রের আওয়াজে, ভীত হয়ে উঠলেন, সেখানে মীনাক্ষী অতর্কিতে বলে উঠলেন, “মহারাজ যেদিকে গেছেন, সেদিক থেকেই আওয়াজ আসছে!”
এত বলে, সে হন হন করে মহারাজের দিকে এগিয়ে গেল। সেই দেখে জয়াবিজয়া ও তন্ত্রসন্তানরাও অন্য পথ ধরে পিছু নিলেন। কিন্তু পিছু নিয়ে যা প্রত্যক্ষ করলেন তাঁরা সকলে, তা তাঁদের সর্প ও মীনাক্ষীর সামনাসামনি হওয়া দেখার থেকে যেই বিস্ময় জন্ম নিয়েছিল, তাকে সুদূর প্রসারিত করে দিলো।
তাঁরা দেখলেন, দুটি ব্যঘ্র মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একে অপরকে হুংকার মারছে। কিন্তু এই একে অপরকে হুংকার মারার কালে, মহারাজ সুমিত রয়েছেন এঁদের দুইজনের ঠিক মাঝে, আর তিনি চেয়েও পিছিয়ে আসতে পারছেন না, কারণ তাঁর পাদুকা সহ চরণ আটকে গেছে দুটি পাথরের ফাঁকে। আর ব্যঘ্র দুটিই বা একে অপরকে হুংকার ছাড়ছে কেন? মহারাজ সুমিতকে কে শিকার করবে, সেই নিয়ে দ্বন্ধ!
অন্যদিকে জয়াবিজয়া দেখলেন, উলটোদিক থেকে মীনাক্ষী এই দৃশ্য দেখে, ঊর্ধ্বশ্বাসে, নিজের চলার পথের একটি গাছের ডাল ভেঙে, সেই ডালকে একটি পাথরে ঠুকলো। আর সেই ডাল ঠোকা সামান্য কিছু ছিলনা। তার থেকে যেমন বিকট শব্দ উৎপন্ন হলো, তেমনই কম্পনের রচনা হলো। মহারাজের চরণ ও পাদুকা মুক্ত হলো পাথরের বন্ধন থেকে। আর তা মুক্ত হতেই মহারাজ পলায়ন করলেন সেই স্থান থেকে।
মহারাজ পলায়ন করছেন দেখে দুটি ব্যঘ্রই মহারাজের দিকে ধাবিত হতে সচেষ্ট হলে, মীনাক্ষী পুনরায় সেই ডাল দ্বারা প্রস্তরে আঘাত করতে, পুনরায় কম্পন অনুভব হলো। আর সেই কম্পনে বাম দিকের ও দক্ষিণ দিকের দুটি ব্যঘ্রই ভীত হলে, বাম দিকের ব্যঘ্রটি ফিরে গেলেন একজনের দিকে, আর তিনি সেই ব্যঘ্রটির গাঁয়ে, গলায় হাত দিয়ে, ব্যঘ্রটিকে সঙ্গে নিয়ে চলে গেলেন। সকলে বুঝতে পারলেন, রাজার নির্দেশে, কেউ একজন নিজের পোষা একটি ব্যঘ্রকে দিয়ে মীনাক্ষীর পরীক্ষণ করছিলেন।
কিন্তু দ্বিতীয় ব্যঘ্রটি তাহলে কার? সে কি আগন্তুক! অজ্ঞাত অতিথি! …
কিছু ভেবে ওঠার আগেই, এক দল মানুষকে দেখলেন তন্ত্রসন্তানরা, যারা মীনাক্ষীর দিকে লাঠিসোটা নিয়ে তেরে আসছিলেন, আর বলছিলেন, “হতচ্ছাড়ি, তুই আমাদের রাজাকেও বশ করে নিয়েছিস! আজ তোর মৃত্যু আমাদের হাতে হবে। এমন ভাবে রে রে করে এলে, মীনাক্ষী এবার রুখে না দাঁড়িয়ে বনের অন্দরে চলে গেল। তন্ত্রসন্তান ও জয়াবিজয়াও তাঁকে অন্তরাল থেকে অনুসরণ করতে থাকলে, একটা সময় পর যখন তাঁরা সকলেই গভীর অরণ্যে প্রবেশ করে গেছেন, তখন অজিতেশ ও তাঁর লোকজন পিছু করা ছেড়ে দিয়েছেন, কিন্তু তাও জয়াবিজয়া যেন অনুভব করলেন যে কেউ তাঁদেরকে ছায়ার মত অনুসরণ করছে।
কে যে তাঁদের অনুরসন করছিল ছায়ার মত করে, তা প্রত্যক্ষ হলো যখন মালদের বনাঞ্চল সমাপ্ত হলো, আর পংরাজ্য তথা কোচি রাজ্যের সীমান্তের অনুর্বর রিক্ত অঞ্চল সম্মুখে এলো। তিনটি ব্যঘ্র ছানা তখন মীনাক্ষীর সামনে এসে, মীনাক্ষীর চরণের নিকট চলে আসে, আর মীনাক্ষী বসে পরে, তাঁদেরকে বক্ষে ধারণ করে স্নেহ করতে থাকে। সেই দৃশ্য বড়ই মনোরম। যেন নিঃস্বার্থ স্নেহের আদান প্রদান হচ্ছিল সেই স্থানে।
কিন্তু পরমুহূর্তে যা হলো, তা হার হিম করে দিল জয়াবিজয়ার তথা তন্ত্র সন্তানদেরও। একটি পূর্ণ আকারের ব্যঘ্র এবার সম্মুখে এলে, যেই শাবকগুলি একটু আগে মীনাক্ষীর সাথে খেলা করছিল, তারা সেই বাঘিনীর দিকে এগিয়ে গেলে, সকলেই বুঝতে পারলেন, সেই শাবকগুলির জননী এই বাঘিনী। আরো ভালো করে দেখলো সকলে, সেই বাঘিনী অত্যন্ত পরিচিত তাঁদের কাছে। এই বাঘিনী সেই দ্বিতীয় ব্যঘ্রটি যা রাজা সুমিতের নিকট এসেছিল। এর অর্থ এই বাঘিনীই এতক্ষণ তাঁদের ছায়ার মত অনুসরণ করছিল।
শোভন এগিয়ে গিয়ে বাঘিনীটিকে বশ করে মীনাক্ষীকে বাঁচানোর প্রয়াস করলে, বিজয়া তাঁকে থামিয়ে বললেন, “ভালো করে নিরীক্ষণ করো শোভন, বাঘিনীটির ব্যবহার অন্যরকম। সে নিজের শাবকগুলিকে মীনাক্ষীর কাছে ফিরিয়ে দিচ্ছে, ভালো করে দেখো! … এ যেন এক অভাবনীয় দৃশ্য। প্রস্তুত থেকো বাঘিনীকে বশ করার জন্য, কিন্তু এখনই বশ করো না”।
শোভন বললেন, “বশ করতে, বাঘিনীর সম্মুখে যেতে হবে দিদি! সঙ্গে সঙ্গে বশ হবেনা। …”
জয়া বললেন, “তাহলেও অপেক্ষা করো শোভন। এখানে যা হচ্ছে, তা স্বাভাবিক ঘটনা নয়। বাঘিনী নিজের শাবকদের মীনাক্ষীর কাছে ঠেলে দিচ্ছে, যাতে মীনাক্ষী তাঁদেরকে স্নেহ করতে পারে। যেন বাঘিনী নিজের শাবকদের মীনাক্ষীর স্নেহলাভের জন্য প্রেরণা যোগাচ্ছে। কিন্তু কেন? কি হচ্ছে এখানে অনুভব করো শোভন। এখন কর্তা সাজার নয়, দর্শক সাজার সময়”।
সত্যই দর্শন করারই মত দৃশ্য। মীনাক্ষীও বাঘিনীর নিকটে অবস্থান করার জন্য, কিছুটা নিশ্চয়ই ভয়ার্ত। কিন্তু সে শাবকদের স্নেহ প্রদান করা থেকে বিরত নয়। তাই সে শাবকদের স্নেহ করছে, আর বাঘিনীকে বারবার আড়চোখে দেখছে। তবে অধিকক্ষণ এই চলচ্চিত্র চলল না। কিছুক্ষণের মধ্যে, শাবকগুলি তাঁদের মায়ের কাছে ফিরে গেলে, মীনাক্ষীর অতি নিকটে বসে বসে বিশ্রাম করা বাঘিনীটি এবার উঠে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে মীনাক্ষীর নিকটে এগিয়ে গেল।
সকলেই সেই দৃশ্যে তটস্থ। কিন্তু বিজয়া বললেন, “ভয়ের কি সত্যই কিছু আছে? বাঘিনীর চোখের দিকে তাকাও দিদি। মনে হচ্ছে যেন বাঘিনী নয়, কনো বিড়াল সে! চোখের মধ্যে কনো প্রকার হিংস্রতা নেই”।
মীনাক্ষীও যেন তা দেখেছে। দুই থেকে তিনবার কুণ্ঠিত ছিল, কিন্তু তারপরে যেন সে নিশ্চিত যে ব্যঘ্রটির বাসনা ঠিক কি, আর তাই নিজের দুই বাহু প্রসারিত করে, বাঘিনীকে আবাহন করলো সে। বাঘিনীর নেত্র সজল। সে এবার মীনাক্ষীর অঙ্গের কাছে গিয়ে, মীনাক্ষীর সর্বাঙ্গকে নিজের মস্তক দ্বারা স্নেহ করতে থাকলো। যেন সন্তান মায়ের নিকট চলে এসেছে বহুকাল পরে। বাঘিনীর আচরণ ঠিক তেমন।
সে প্রথমে মীনাক্ষীর বামবাহু, অতঃপরে বক্ষস্থল, অতঃপরে দক্ষিণ বাহুতে এমনই ভাবে মীনাক্ষীর অঙ্গে নিজের অঙ্গ ঘসতে থাকলো যে, মীনাক্ষীর বক্ষের আঁচল ঈষৎ আলগা হয়ে গেল। মীনাক্ষী দুই বাহুকে এবার নিকটে এনে, বাঘিনীর মুণ্ডকে নিজের বাহুপাশে আবদ্ধ করে স্নেহ করতে থাকলে, পরের কিছুমুহূর্ত যেন এমন মনে হলো সেই বাঘিনী মীনাক্ষীর পষ্য আর বহুকাল পরে যেন মীনাক্ষীর সাথে তাঁর সাখ্যাত হয়েছে।
বেশ কিছুক্ষণ বাঘিনী ধ্বস্তাধস্তি করলে, মীনাক্ষী সমানে তাঁর মস্তকে স্নেহের হস্ত বুলিয়ে বুলিয়ে শান্ত করলে, খানিকক্ষণ ঠিক ছোট্ট শিশুর যেমন মায়ের পাশে শুয়ে পরে, তেমন করে মীনাক্ষীর পাশে শুয়ে পরলে, আরো বেশ কিছুক্ষণ পরে মীনাক্ষী ও বাঘিনী উভয়েই যেন ঘুমিয়ে পরলো।
ব্যঘ্রশাবকগুলি এবার তাঁদের মায়ের কাছে এসে মায়ের বাঁটে মুখে দেবার প্রয়াস করলে, বাঘিনীর নিদ্রা ত্যাগ হয়। সে নিদ্রা ত্যাগ করে পুনরায় মীনাক্ষীর অঙ্গঘ্রাণ নিয়ে, শেষে তাঁর চরণের কাছে গিয়ে নিজের মস্তক তাতে ঘসে, শাবকদের নিয়ে বনের অভ্যন্তরে চলে গেল।
সমস্ত দৃশ্য দেখে হতবাক সকলে, কিন্তু এবার তাঁদের চিন্তা হয় যে মীনাক্ষী কেন নড়ছে না! … “তবে কি!” আরো সাতপাঁচ ভেবে, জয়াবিজয়া উভয়েই সম্মুখে এগিয়ে এসে মীনাক্ষীকে স্পর্শ করার প্রয়াস করতে গেলে, দুটি মোটাজাল তাঁদেরকে উপর থেকে বেষ্টন করে, বেঁধে নিলে, বেশ কিছু যুবক জয়াবিজয়াকে সঙ্গে নিয়ে একটি ঘোড়ার গাড়ির পিছনে রেখে, ঊর্ধ্বশ্বাসে গাড়ি চালাতে থাকলে, জয়াবিজয়ার আওয়াজে নিদ্রা ত্যাগ হয়ে যায় মীনাক্ষীর।
তন্ত্রসন্তানরাও জয়াবিজয়ার পশ্চাতে দৌড় লাগাতে থাকলে, মীনাক্ষীও উঠে এসে দৌড় লাগাতে থাকে। কিন্তু ঘোড়ার গাড়ি একসময়ে এমন দূরত্বে চলে যায় যে, আর দৌড়ে তাকে ধরা যাবেনা। তাই সকলেই নিজের নিজের জানুর উপর দুই কর রেখে জোরে জোরে শ্বাস নিতে থাকে। কিন্তু এই অবস্থাতেও সকলে মীনাক্ষীকে দেখলো, সে নতজানু না হয়ে, সরাসরি দাঁড়িয়ে থেকে, স্থির দৃষ্টি নিক্ষেপ করে আছে কনো দিকে।
বেশ কিছুক্ষণ এমন দেখার পর, মীনাক্ষী বলে উঠলো, “এই রুক্ষভূমির ঠিক মাঝে রেখেছে দুই কন্যাকে। আমাদের যেতি হবে। অনেকে আছে, প্রায় ১৫-২০টি যুবক রয়েছে সেখানে। আমাদের এখনই যেতি হবে”।
শ্রুতি ও লাবণী বললেন, “তুমি দেখতে পাচ্ছ ওই দূরে কি হচ্ছে!”
মীনাক্ষী বলল, “স্থির ভাবে দৃষ্টি নিক্ষেপ করো। তোমরাও দেখতে পাবে”।
