সর্বশ্রী কাণ্ড (কৃতান্ত তৃতীয় কাণ্ড)

মীনাক্ষী মৃদু হেসে বললেন, “সহজ ভাবে একটি কথা বলতেন প্রভু, ভাব আর আবেগের মধ্যে ভেদ বোঝাতে। তিনি বলতেন, ‘পুঁথিগত ভাবে অনেক অনেক কথা বলা যেতে পারে ভাব আর আবেগের সম্বন্ধে, কিন্তু যখন বাস্তব জীবনে পথ অতিক্রম করছো, তখন কোনটি ভাব আর কোনটি আবেগ, তা আলাদা করা অতি দুষ্কর হয়ে ওঠে। তাই তোমাদের একটি সহজ বিভেদ বলে রাখি ভাব আর আবেগের মধ্যে। আবেগ মানে সঙ্কুচন, আর ভাব মানে বিস্তার’।

শ্রোতা এই কথার অর্থ বুঝতে না পারার জন্য প্রভুর থেকে এই কথার বিস্তার জানতে চাইলে, প্রভু বলেন, ‘যখন যখন তোমার এই বোধ জাগবে যে, তুমি কি পেলে বা পেলে না, তখন তখন তা আবেগের সঞ্চার করে। যা পেয়েছ, তার জন্য মদ জাগে, মোহ জাগে, শিল জাগে, কুল জাগে, ভয় জাগে, লজ্জা লাগে। যা পাওনি তার প্রতি লোভ জাগে, কাম জাগে, মাৎসর্য জাগে, হিংসা জাগে। যা পেতে চাওনা তার প্রতি দ্বেষ জাগে, ঘৃণা জাগে। আর এছাড়াও, এঁদের সাক্রেত রূপে, আরো অনেক অনেক সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম আবেগ জন্ম নেয়।

আর অন্যদিকে যখন তুমি কিছু প্রদান করার জন্য ব্যকুল হও, তখন জাগে ভাব। বাৎসল্যরস প্রদান করার বাসনার জন্য জাগে মমতা, স্নেহ; সমর্পণ স্পৃহার থেকে জাগে বিশ্বাস, ভক্তি, প্রেম। অর্থাৎ পাবার বেলায় আবেগ, আর দেবার বেলায় ভাব। পাওয়া মানে কি? পাওয়া মানে আত্মসুখ চিন্তা, অর্থাৎ সঙ্কুচন। অর্থাৎ আবেগ মানেই সঙ্কুচন। অন্যদিকে দেওয়া মানেই হলো বিস্তার, আর তাই ভাব মানেই হলো বিস্তার।

এই হলো নিজের জীবনে তুমি আবেগের পাশে পরাধীন, নাকি ভাবের সাগরে স্বতন্ত্র, তার বিচার করার সহজ হিসাব। যখন যখন তোমাদের মধ্যে আমি কি পেলামের চিন্তা আসবে, জানবে আবেগের চোখরাঙ্গানিতে তুমি পরাধীন হয়ে বসে রয়েছ। আবার যখন যখন তোমার মধ্যে কি দিলাম এই ভাবনা আসবে, জানবে তুমি ভাবের সাগরে ডুব দিয়ে স্বতন্ত্র হতে চাইছো’।

প্রভুর এই কথা আজও স্পষ্ট ভাবে স্মরণ আছে আমার, কারণ সত্য বলতে, এর থেকে সহজ ভাবে আবেগ আর ভাবের বিভেদ আমি আর শুনিনি। … অত্যন্ত সহজ অথচ অত্যন্ত স্পষ্ট এই ব্যাখ্যা। তাই আজও এই কথার ভিত্তিতেই আমি বিচার করি যে আমি আবেগের কবলে পরাধীন নাকি ভাবের সাগরে স্বতন্ত্র। তবে এই অভ্যাস করতে গিয়ে দেখেছি যে, একটিই ব্যক্তি একই সাথে এই দুইয়ের মধ্যে থাকতে পারেন না এবং থাকেন না।

অর্থাৎ হয় সেই ব্যক্তি আবেগের কবলে স্থিত, নয় ভাবের সাগরে নিমজ্জিত, কিন্তু একত্রে দুই ক্রিয়া হয়না। আবার তার সাথেও দেখেছি যে, যিনি আবেগে চূর, তিনিই আবার যখন তাঁর পুত্র তাঁকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে, তখন মমতার বুলি আওরাচ্ছেন। … প্রথমে তা শুনে একটু চমকেই গেছিলাম। ভেবেছিলাম, একই সাথে আবেগ ও ভাব! … (হেসে) কিন্তু নিরীক্ষণ করার সময়ে প্রত্যক্ষ করলাম যে, সেই ব্যক্তি আবেগেই স্থিত। পুত্রকে হারাতে চলেছেন, আর তাই পুত্রের সামনে মমতার বুলি বলছেন, যা পেয়েছেন তাকে না হারাতে হয় যাতে, সেই প্রয়াস করে।

অর্থাৎ সহজ কথা, যিনি আবেগের দ্বারা তাড়িত, তিনি মুখে যতই মমতা, স্নেহ, প্রেম, বিশ্বাসের কথা বলুন না কেন, তিনি কেবলই নিজের লব্ধ বস্তুকে না হারানোর জন্যই সেই কথাগুলি বলে থাকেন, বা যা লব্ধ হয়নি, তা লাভ করারই ছলনা হয় সেগুলি। অন্যদিকে যিনি ভাবের সাগরে নিমজ্জিত, তিনি স্বতঃই সমস্ত আবেগ থেকে মুক্ত।

স্ত্রীকে স্নেহ করেন, স্ত্রী অজ্ঞান হয়ে আসক্তির কর্ম করেছেন, সেই কথা বলতে গেলে, স্ত্রী দ্বেষ দেখাতে, স্বামী যিনি ভাবে নিমজ্জিত তিনি চুপ করে গেলেন। অপেক্ষা করলেন কবে তাঁর স্ত্রী নিজের ভুল বুঝতে পারে, কিন্তু ক্রোধিত হয়ে রইলেন না, কারণ তিনি তো আবেগের সীমার অতীতে বিরাজ করেন। স্ত্রী কনোদিনও নিজের ভুল বুঝতে পেলেন না। স্নেহ করা সত্ত্বেও স্বামী স্ত্রীর সাথে দূরত্বই স্থাপন করে রেখে দিলেন, কিন্তু ক্রোধ কিছুতেই ধারণ করলেন না। এই হলো ভাবের সাগরে নিমজ্জিত থাকার কারণে মানুষের স্বভাব।

স্নেহ এমনই। যাকে তুমি স্নেহ করবে, তার হিত চাইবে, কিন্তু সেই ব্যক্তি যদি নিজের হিতের দিকে উদাসীন থাকে, তাহলে ক্রোধ প্রদর্শন করবে, কিন্তু ক্রোধ ধারণ করবেনা। অর্থাৎ ভাব হলো পলিমাটির ন্যায়, মাটি অথচ নরম। কিন্তু সেই স্ত্রীটি, যাকে স্বামী ক্রোধ দেখিয়েছিলেন, যাতে তিনি নিজের ভুল সংশোধন করেন, তিনি কঠিন হয়েই রইলেন। আবেগ হলো কঠিন। এখানে ক্রোধ দেখাওনা তুমি ক্রোধিত হয়ে থাকো, ঠিক যেমন সেই স্ত্রীটি।

যেই কারণে ক্রোধিত হয়ে ছিলে, সেই কারণ সমাপ্ত হয়ে গেছে, কিন্তু তুমি ক্রোধিত হয়েই আছো। কেন? কারণ তোমার আত্মতে আঘাত লেগেছে। স্ত্রীটি নিজের ভুল বুঝতে পারলেন না, কিন্তু স্বামী তাঁকে অপকথা কেন বলেছেন, কেন অপমান করেছেন, তাই ক্রোধকে তিনি সমস্ত জীবন পুষে রেখে দিলেন। অর্থাৎ আবেগ হলো অত্যন্ত কঠিন এবং প্রস্তরের সমান। আবেগ ব্যক্তিকে প্রস্তরের গুণ প্রদান করে, অর্থাৎ যেমন প্রস্তর সম্পূর্ণ জড়সড় হয়ে থাকে, তেমনই ব্যক্তিকে জড়সড় করে দেয় আবেগ।

অন্যদিকে ভাব হলো পলিমাটির মত। যেমন হাজারো কাজে পলিমাটি নিজেকে সর্বক্ষণ ব্যস্ত করে রেখে সর্বদা পরিবর্তনশীল, সর্বদা ও নিত্য নতুন নতুন আকার, নতুন আকৃতি, নতুন নতুন আসবাব নির্মাণ করা হয়, তেমনই ভাব সর্বদা ব্যক্তিকে প্রবাহিত রাখে। সর্বদা ব্যক্তিকে নূতনকে বিচার করে ধারণ করার জন্য প্রস্তুত রাখে, সর্বদা ব্যক্তিকে তৎপর রাখে সত্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে।

অন্যদিকে দেখো, প্রস্তর দিয়ে অস্ত্র নির্মাণ হয়, সেই অস্ত্র দিয়ে শিকার করা যায়, আবার হিংসার সঞ্চার করে অন্যকে পরাধীনও করা যায়। তেমনই ভাবে আবেগের প্রয়োজন থাকে আহার লাভের ক্ষেত্রে। শিকার করার জন্য ক্রোধ ও হিংসা ধারণ করতে হয়। আবার সেই আবেগকে যদি শিকারের পরও রেখে দাও, তাহলে কি হবে? ঠিক যেমন যেই অস্ত্র দিয়ে শিকার করো, সেই অস্ত্র দিয়ে বাহ্য জগতে যুদ্ধ ও দুষ্কৃতিমূলক ক্রিয়াও করা হয়, তেমনই আবেগকে রেখে দিলে, সেই দিয়ে যুদ্ধ করা হয়, আর দুষ্কৃতিমূলক ক্রিয়া করা হয়।

কিন্তু এই যুদ্ধ আত্ম বা অহংকে কনো প্রকার আঘাত করেনা। না তোমার অর্থাৎ যিনি যুদ্ধে কারুর হত্যা করছেন, আর না তাঁর যিনি যুদ্ধে কারুর কাছে হত্যা হচ্ছেন। যিনি হত্যা করছেন, তাঁর আত্ম অহংকারী হয়ে উঠছে, মদাক্রান্ত হচ্ছে, আর যিনি হত্যা হচ্ছেন, তাঁর মদচূর্ণ হচ্ছে ঠিকই কিন্তু তাঁর মধ্যে কি জন্ম নিচ্ছে! দ্বেষ, ভয়, ঘৃণা এই সমস্ত কিছু জন্ম নিচ্ছে। অর্থাৎ এক আবেগ মৃত্যুলাভ করে, অন্য আবেগের জন্ম হচ্ছে, কিন্তু আবেগের নাশ হচ্ছেনা, অর্থাৎ আত্ম বা অহংএর কনো ক্ষতি হচ্ছেনা।

তুমি বলবে, তাহলে কি যিনি ভাবের সাগরে নিমজ্জিত, তিনি ক্রুদ্ধ হনই না! তাহলে মাতা সর্বাম্বা আত্মের প্রতি কি হয়েছিলেন? না তাঁরা ক্রুদ্ধ হনইনা। তাঁরা বিরক্ত হন, আর তাঁদের বিরক্তি তোমার আমার ক্রোধের থেকে অনেক অনেক গুণ অধিক ভয়ঙ্কর। কেন জানো? কারণ তিনি আবেগ ত্যাগ করে আত্মের পক্ষ ত্যাগ করে দিয়েছেন, আর ভাব গ্রহণ করে প্রকৃতির সাথে একাত্ম হয়ে গেছেন।

এর ফলে, তাঁর বিরক্তি অনেক অনেক অধিক ঘাতক আত্মের ক্রোধের থেকে। আত্ম ক্রোধের ফলে কি করতে পারে? কারুকে হত্যা করতে পারে, অধিক শক্তিশালী আত্ম কনো স্থানকেই নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে। কিন্তু যিনি ভাবের সাগরে নিমজ্জিত, তাঁর কারুকে হত্যা করার জন্য ক্রোধের প্রয়োজনই নেই। সামান্য বিরক্তিই কারুকে হত্যা করার জন্য যথেষ্ট।

তিনি স্বয়ং প্রকৃতির সাথে একাত্ম। তাই যেই ক্ষণে তিনি বিরক্ত হয়ে কারুর প্রাণনাশ হোক, এমন বলবেন, সম্যক প্রকৃতি সেই ব্যক্তির প্রাণ নাশের উদ্দেশ্যে ঝাঁপিয়ে পড়বে। অর্থাৎ সেই ভাবে সম্পন্ন ব্যক্তিকে কিচ্ছু করতেই হবেনা দৈহিক ভাবে। কেবল তাঁর বিরক্তিই যথেষ্ট কারুর হত্যা করার জন্য। আর যদি তাঁর বিরক্তি আরো বৃদ্ধি পায় এবং একটি ব্যক্তির পরিবর্তে একটি সমাজের উপর সেই বিরক্তি প্রকাশিত হিয়, তাহলে মহামারির সম্মুখীন হতে হয় সেই সমাজকে।

আর যদি সেই বিরক্তি প্রবল হয়ে উঠে, মহাদণ্ড প্রদানের জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠে! তাহলে তা একটি ব্যক্তির উপর যদি স্থাপিত হয়, যা সাধারণত হয়না, কারণ করুণাই তাঁর মূলধন হয়, ক্ষমাই তাঁর স্বাভাবিক স্রোত হয়, তাহলে জীবিত অবস্থাতেই সেই ব্যক্তি যার উপর তিনি বিরক্ত হয়েছেন, তাকে পিশাচের জীবন বাঁচতে হয়। যেই কারণে তিনি তাঁর প্রতি চরমরূপে বিরক্ত হয়েছেন, তা যদি সংশোধন করে ফেলতে পারেন সেই ব্যক্তি, তাহলে তিনি নবজীবন লাভ করেন, আর তা না হলে মৃত্যুর পরেও তাকে পিশাচ হয়ে থাকতে হয়, এবং বেদেহি হয়ে বিরাজ করতে হয়।

আর যদি এই বিরক্তি চরমে ওঠে একটি সমাজ বা একটি যোনির প্রতি, তাহলে সেই সমাজকেই, সেই যোনিকেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে হয়, যা প্রকৃতি স্বয়ং করেন।  এত নিখুঁত ভাবে আমি এইসমস্ত কথা বলতে পারছি কি করে? কারণ আমি প্রভুকে সাখ্যাত করেছিলাম। এই সমস্ত কিছু তাঁর মধ্যে আমি দেখেছি। তাঁর বিরক্তিকে আমি অত্যন্ত ভয় পেতাম আর ভয় পাই।

যার উপর বিরক্ত হতেন তিনি, কেবল আমার এই বোধ জন্ম নিত যে, কেন তিনি প্রভুর কাছে এসে ক্ষমা চাইছেন না। তিনি তো পর নন, নিজের মা। তাহলে তাঁর কাছে ক্ষমা চাইতে অসুবিধা কোথায়! … আসলে তাঁর বিরক্তির কারনে মহামারি হতে আমি দেখেছি। দেখেছি কারুকে জীবিত অবস্থাতেই পিশাচ হতে, আবার মৃত্যুর পরেও পিশাচ হতে। দেখেছি প্রকৃতিকে তৎপর হয়ে উঠতে কনো একটি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করে দেবার জন্য, আর দেখেছি মানবযোনির উপর কি প্রকাণ্ড আঘাত এসেছিল, যা এখনো বর্তমান বলা চলে।

তাই আমি স্পষ্ট ভাবে জানি যে, যিনি ভাবের সাগরে নিমজ্জিত, তাঁর বিরক্তির সামনে আত্মের ছেড়ে দাও, পরমাত্মের ক্রোধই অতি নগণ্য, অতি লাচার, অতি তুচ্ছ। আসলে তিনি স্বয়ং প্রকৃতি হয়ে বিরাজমান হয়ে গেছেন, আর তাই সম্যক প্রকৃতি তাঁর সাথে যুক্ত। তাঁর বিরক্তির অর্থ সম্যক প্রকৃতির বিরক্তি। তাঁর দণ্ড প্রদানে তৎপরতা মানে সম্যক প্রকৃতির দণ্ডপ্রদান করার তৎপরতা।

বোঝার মত আরো অনেক কিছু আছে। আত্মের ক্রোধ হোক বা পরমাত্মের, স্বার্থ চিন্তা তাঁদের সর্বক্ষণ আছে। আমার সুনাম, আমার বদনাম, আমার উদ্দেশ্যপূর্তি, আমার প্রভুত্ব। তাই যদি ইনি কারুর উপর ক্রোধিত হয়ে তাঁকে নাশ করতেও উদ্যত হন, ইনার স্মরণে তিনি আশ্রয় নিলে, ইনার ক্রোধ শীতল হয়ে যায়। কেন? কারণ ইনি নিজের প্রতিষ্ঠার অপেক্ষা কনো কিছুকে অধিক প্রাধান্য দেন না। অন্যদিকে, যিনি ভাবের সাগরে নিমজ্জিত, তিনি সম্পূর্ণ বৈরাগী। তাই তাঁকে তুষ্ট করতে গিয়েও কনো লাভ নেই।

যেমন ধরে নাও প্রভু। প্রভুকে যারা যারা সনাক্ত করেছিলেন প্রভু বলে, তাঁরা প্রভুর স্মরণে থাকার প্রয়াস করতেন। প্রভুর থেকে তারা জেনেই ফেলেছিলেন যে, সমস্ত ৮৪ লক্ষ যোনির নিবেদনে তিনি অবতার তনু ধারণ করেছেন মানবযোনিকে অন্তিমবার সচেতন করার জন্য। যদি মানবযোনি সচেতন না হন, তাহলে তিনি মানবযোনিকে নিশ্চিহ্ন করে দেবেন। তাই অনেক মানবই তাঁর কাছে নিবেদিত হয়ে, তাঁকে তুষ্ট করতে চেয়েছিলেন, এমন ধারণা নিয়ে যে, তিনি স্মরণে এসেছেন, তাই কেউ রক্ষা পান আর না পান, তিনি তো রক্ষা পাবেন।

কিন্তু প্রভু যে সাখ্যাত মাতা। বৈরাগ্য তাঁর মূলধন। তাঁকে কনো অছিলাতে প্রভাবিত করা সম্ভব নয়। হয় তুমি মানবযোনিকে উদ্ধার করার পথে নিমজ্জিত হও, মানবযোনিকে সমস্ত যোনির শোষণ করা থেকে আটকাও, ধনের নেশা ছাড়িয়ে প্রকৃতির প্রতি সমর্পিত করাও, নয় তোমাকেও বাকি মানবদের মতই নিশ্চিহ্ন হতে হবে, তুমি আমার স্মরণে এসেছ বলে কনো ভাবে পার পাবেনা।

এই হলো তাঁর স্বভাব, যিনি ভাব ধারণ করে থাকেন। তাঁকে তাঁর প্রশস্তিগীত গেয়ে তুষ্ট করা যায়না। মা তিনি, মায়ের মূল ধনই তাঁর সন্তান। যখন তাঁর সন্তানদের স্নেহ করবে, প্রেম করবে, আপন করে নেবে, স্বতন্ত্রতা প্রদান করবে, তখনই তিনি তুষ্ট হন, নচেৎ নন। যখন তুমি তোমার ভ্রান্তি সংশোধন করে, ভ্রম থেকে সত্যের পথে যাত্রা করবে, তখনই তিনি তুষ্ট, নচেৎ নন। আত্মের বা পরমাত্মের প্রশস্তিগীত গাইলে যেমন যেকেউ সুরক্ষিত থাকতে পারে, ভাবের সাগরে নিমজ্জিত কারুর থেকে সেই ভাবে রক্ষা লাভ করা যায়না।

হ্যাঁ তিনি দিতে ভালো বাসেন, সর্বক্ষণ স্নেহ, মমতা, স্বতন্ত্রতা, প্রেম দিতে চান। তাই তাঁর সন্তানদের স্নেহ, মমতা, স্বতন্ত্রতা, প্রেম প্রদান করে তাঁকে তুষ্ট করা যেতে পারে। মা তিনি, তাই সমস্ত সন্তানকে এই ভ্রমজগতের বিহার থেকে মুক্ত করে, নিজের কোলে ফিরে পেতে ব্যকুল। তাই তাঁর সন্তানদের সত্যের বোধ করিয়ে, ভ্রমজগত থেকে মুক্ত করতে ব্যস্ত হয়ে যাও, তিনি তোমাকে নিজের কোলে রেখে দেবেন, সম্পূর্ণ ভার নিয়ে নেবেন। নচেৎ তাঁর কাছে যতই কান্নাকাটি করো, তোমার ভার নেবার জন্য, বারবার বললে, তোমার প্রতি বিরক্ত হয়ে উঠে, তিনি তোমার দিকে দৃষ্টি রাখাই বন্ধ করে দেবেন”।

দিয়া ও বহ্নি একত্রে এবার গদগদ হয়ে বললেন, “বুঝে গেছি দিদি। মা তিনি। মায়ের সাথে কনো প্রকার ছল চলেনা। মায়ের সন্তানদের যখন হৃদয় থেকে স্নেহ করতে পারবো, তাঁর কাছে ভার নেবার জন্য আবদার করতে হবেনা। তিনি স্বয়ং ভার নিয়ে নেবেন। কারণও খুব স্পষ্ট। ধরে নিই, আমি একটি বস্তু এখানে উপস্থিত সকলকে প্রদান করতে চাইছি। যদি এমন কেউ আমার সম্মুখে এসে আমাকে সেই কাজ করতে সাহায্য প্রদান করতে থাকে, অথচ আমি দেখি যে, সে এই কাজের জন্য সজ্জ নয়, তখন আমি কি করবো?

যখন মা পরিবেশন করেন, আর কন্যা বা বউমা সেই কাজে এগিয়ে আসেন, আর মা দেখেন যে তারা সেই কাজে পটু নন, মা কি করেন? মা তাঁদেরকে দায়িত্ব নিয়ে সেই কাজ শিখিয়ে দেন, যাতে তারাও সেই কাজ করতে সক্ষম হয়। মায়ের কাছে এসে বলতে হয়না মেয়েকে বা বউমাকে যে, আমাকে শিখিয়ে দিন। মা নিজেই তা করেন।

ঠিক তেমনই, আমাদের মা তাঁর সমস্ত সন্তানকে এই ভ্রমজগতে বিহার করা থেকে বিরত করে, নিজের কাছে পেতে চান। তিনি চান যাতে তাঁর সমস্ত সন্তান নিজেদের বাড়ি ফিরে যাক, মায়ের আঁচলে নিজেদেরকে ঢেকে রাখুক, আর পরমানন্দ লাভ করুক। আমি, তাঁর একটি সন্তান, যদি সেই একই কাজে এগিয়ে যাই, এতো নিশ্চিত যে, তিনি আমার ভার গ্রহণ করবেন, কারণ আমি সেই কাজ করতে গেলেও, সেই কাজ করতে আমি না তো পটু আর না সক্ষম। তাই মা স্বয়ং দায়িত্ব গ্রহণ করে, আমাকে সেই কাজে পটু ও সক্ষম করে তুলবেন, কারণ তাতে তো তাঁরই যে ব্যকুলতা, সেই ব্যকুলতার উদ্দেশ্যেই কীর্তি করা হবে।

তা না হলে, আমি যদি এমনি এমনি মাকে বলি, আমার ভার নাও, আমি তোমার কাজ করবো। তিনি কি বলবেন? মেয়ে যদি বলে, মা আমার পড়ালেখাটা তুমি করে দাও, আমি তোমার রান্না করে দিচ্ছি, মা কি বলবেন? তিনি এই তো বলবেন যে, ‘তোকে রান্না করতে হবেনা, আমি করে নেব। তুই তোর পড়াশুনা কর’। আমাদেরকেও ঠিক এই কথাই মা বলেছেন, ‘তোদেরকে আমার কাজ করে দিতে হবেনা। তোরা নিজের জীবন বাঁচ নিজের মত করে’।

এই সহজ কথাটা কেন বুঝলাম না আমরা দিদি! … আমরা কি শুধুই মুখে তাঁকে মা বলি? বাস্তবে কি তাঁকে মা মানিই না! যদি বাস্তবে তাঁকে মা মানতাম, তাহলে মায়ের ভাব কেন বুঝতে পারতাম না! কেন দায়িত্ব নাও, দায়িত্ব নাও বলে ফিরতাম! … যেন আমাদের কাছে, তিনি আমাদের দায়িত্ব নেবেন, এটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যেন তিনি দায়িত্ব নেবার কারণে, প্রতিদান স্বরূপ তাঁর কাজ করবো আমরা, এমন ভাব আমাদের। … ছি, নিজের প্রতি নিজের ঘৃণা হচ্ছে।

কত নীচ আমরা। ইতর প্রজাতি আমরা। … নাহলে নিজের মায়ের সাথে কেউ বাণিজ্য করতে যায়! … ছি! … যেখানে আমাদের প্রচার করে করে, সর্বসাধারণকে মায়ের দিকে প্রেরণ করে করে, মায়ের কোল পূর্ণ রাখার প্রয়াস করাই আমাদের জীবনের ব্রত হওয়া উচিত ছিল, যেখানে আমাদের মানবযোনির কাছে সত্যের বাণী প্রচার করে করে, মানবযোনিকে অবলুপ্ত হওয়া থেকে বাঁচানোর প্রয়াস করাই লক্ষ্য হওয়া উচিত ছিল, সেখানে আমাদের চিন্তা তো কেবল আমাদের নিজেদের দায়িত্ব অর্পণ ছিল। … ছি, ছি!”

দিয়া চোখ নামিয়ে বলল, “দিদি, চোখে চোখে রাখার মত সাহস আর আমার বেঁচে নেই। তাই চোখে চোখ রাখতে বলো না দয়া করে। আগে নিজেকে শুদ্ধ করি, আগে নিজের জীবনের ব্রত মায়ের সন্তানদের সত্যমুখি করে তোলা করি, অতঃপরে তোমার চোখে চোখ মেলাবো। … আমরা আমাদের মাকেই বাণিজ্যের সামগ্রী করে দিয়েছি, আগে তাঁকে মা জ্ঞান করে, তাঁর অন্যসন্তানদের জন্য নিজেদের নিয়জিত করি, অতঃপরে তোমার সাথে চোখে চোখ মেলাবো। কিন্তু একটি প্রশ্ন আমার আছে দিদি। প্রচার যে আমরা করবো, আমাদের কোন বিষয়ে সতর্ক থাকা অত্যন্ত আবশ্যক, সেই বিষয়ে যদি আমাদেরকে বলে দাও”।

মীনাক্ষী হেসে বললেন, “প্রচার করার কালে, শব্দচয়নে অত্যন্ত সতর্ক থাকবে। মনে রাখবে, কনো একটি শব্দকে অন্য শব্দ দ্বারা প্রতিস্থাপন করা যায়না। যেমন ধরো আত্ম, এই শব্দ। আত্ম মানে কি? আমিত্ব। অর্থাৎ অহং। যখন আমি বলছি আত্ম মানে ঈশ্বর, বা পরমাত্ম মানে ঈশ্বর, তখন আমি ঈশ্বরকেই নশ্বর করে দিচ্ছি। কি করে?

আত্ম মানে আমিত্ব, আর এই আমিত্ব অবশ্যই মরণশীল, কারণ কি এটি? আমার এই বোধ যে আমি একটি বিচ্ছিন্ন অস্তিত্ব। মোক্ষ বা নির্বাণ লাভের কালেই এই ভিন্ন অস্তিত্বের নাশ হয়ে যায়। অর্থাৎ এই আমিত্ব নশ্বরত্বের জলজ্যান্ত প্রমাণ, আর যখন এই শব্দকে আমরা এই ভাবে ব্যবহার করছি যে, ঈশ্বর হলেন পরমাত্ম, অর্থাৎ কি বলছি আমরা? ঈশ্বর হলেন পরমনশ্বর। … বুঝতে পারছো? সম্পূর্ণ সত্যই পরিবর্তিত হয়ে গেল এই ভাবে।

আবার দেখো, অনেককে দেখবে, আত্ম বলছেন না, পরমাত্ম বলছেন না। ইংরেজদের প্রভাবে এই আকার যুক্ত শব্দ আমরা পেয়েছি। অর্থাৎ শিব, শিবা হয়ে গেছে; রাম রামা হয়ে গেছে; তেমনই আত্ম আত্মা হয়ে গেছে, পরমাত্ম পরমাত্মা হয়ে গেছে। … কিন্তু যখন তোমরা প্রচার করবে, তখন এই কথা বললেও প্রতিবাদ শুনতে পাবে। সেই ক্ষেত্রে একটি কথা বলে রাখি শুনে রাখো। আমাদের ভাষায়, প্রতিটি ধাতুর অর্থ আছে।

যেমন ধরে নাও এই শব্দ শিব। শ’এর অর্থ হলো শক্তি। ই যুক্ত হচ্ছে শি নির্মাণের জন্য, এই ই’কারের অর্থ হলো সক্রিয়, অর্থাৎ শ মানে শক্তি, আর শি’র অর্থ হলো সক্রিয় শক্তি। ব’এর অর্থ হলো বাহক, অর্থাৎ যিনি বহন করেন। সব মিলিয়ে কি হলো? সক্রিয় শক্তির বাহক। আবার ‘আ’কারের অর্থ হলো কর্মরতা। অর্থাৎ যখন তুমি শিব না বলে শিবা বলছো, তখন কি হয়ে যাচ্ছে শব্দার্থ? সক্রিয় শক্তির কর্মতৎপর বাহক, অর্থাৎ আদিশক্তি বলে যাকে আমরা চিহ্নিত করি। অর্থাৎ শিব শব্দ এই ভান দেয় যে শিব হলো জঙ্গম, যিনি কেবল সক্রিয় শক্তির বাহক। আর শিবা হলো সক্রিয় শক্তির কর্মরত বাহক, অর্থাৎ অজঙ্গম বা চঞ্চল।

কিন্তু শব্দজ্ঞান না থাকলে, কি বলছো তোমরা? শিবকে শিবা বলে দিচ্ছ। অথচ শিব মানে জঙ্গম, আর শিবা মানে চঞ্চল। ঠিক তেমনই আত্ম মানে আমিত্ব, আর আত্মা বললে কি হয়ে যায়? কর্মরত আমিত্ব, অর্থাৎ যখন আমি আমিত্বের প্রচার করতে তৎপর, বা নশ্বরত্বকেই ঈশ্বর মানতে ব্যকুল। বুঝতে পারছো কথাটা? যখন তুমি তোমার ধর্মের ভিত্তিরূপে এই আত্ম বা পরমাত্মকে স্থপন করে রেখেছ, তখনই তুমি প্রচার করছো যে, তোমার ধর্ম হলো আত্মের বিস্তারের জন্য স্থাপিত, অর্থাৎ সঙ্কীর্ণতা স্থাপন করাই তোমার ধর্মের মূল লক্ষ্য, কারণ আমিত্ব মানেই সঙ্কুচন।

এর উপর যখন তুমি তাঁকে আত্ম না বলে আত্মা বলে অবিহিত করছো, আর বলছো যে তোমার ধর্মের মূলস্রোতই হলো আমিত্বের বিস্তার করা, তার অর্থ তুমি এই বলছো যে, তোমার ধর্ম সম্পূর্ণ ভাবে একটি আসুরিক ধর্ম, কারণ আমিত্বের বিস্তার করার ধারা তো অসুরের প্রবৃত্তি। … অর্থাৎ বুঝতে পারছো! তোমাকে তোমার শব্দচয়নে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে। একটি শব্দকে এদিক থেকে অন্যদিকে প্রয়োগের অর্থ, তুমি সত্যধর্মের স্থানে আসুরিক ধর্মের বিস্তার করছো।

এই একটিই বিষয়ে নজর রাখা আবশ্যক প্রচার করার কালে। জানবে, তোমার ব্যবহার করা শব্দ তোমার অভিব্যাক্তি ব্যক্ত করে, তুমি অন্তরে কি ধারণ করে রেখেছ, তা নয়। তাই তোমার ব্যবহার করা শব্দকে নিজের অভিব্যক্তির সাথে সর্বদা মিলিয়ে মিলিয়ে দেখে প্রয়োগ করবে। যদি এমন করতে পারো, তবে দেখবে আত্মপ্রচার করছো না, পরমাত্মপ্রচারও করছো না, আত্মের ত্রিগুণের প্রচারও করছো না। প্রচার করবে তখন পরাচেতনার, পরাপ্রকৃতির, পরানিয়তির, কারণ তিনিই ব্রহ্মময়ী, আর তিনিই পরব্রহ্মের সক্রিয় প্রকাশ, সেই পরব্রহ্মের পূর্ণ প্রকাশ তিনি, যিনি পূর্ণাঙ্গ ভাবে শূন্য, পূর্ণাঙ্গ ভাবে নিরাকার, পূর্ণাঙ্গ ভাবে নির্বিকার, পূর্ণাঙ্গ ভাবে অব্যাক্ত, পূর্ণাঙ্গ ভাবে অচিন্ত্য, পূর্ণাঙ্গ ভাবে অনন্ত, এবং পূর্ণাঙ্গ ভাবে অসীম”।

এতো কথা বলার পর, যখন দিয়া ও তাঁর সঙ্গীরা যাত্রা করতে তৎপর হলেন, সেইক্ষণে একটি কণ্ঠস্বর শুনে সকলেই দাঁড়িয়ে গেলেন। মীনাক্ষীর চোখের পাতা পরলো না তাঁকে দেখে, আর জয়াবিজয়া আনন্দিত হয়ে তাঁর কাছে ছুটে গেলেন। বিজয়া আনন্দে মুখরিত হয়ে বললেন, “মা তুমি এসেছ! … এই দেখো মা, আমাদের মীনাক্ষী! … জানো মা, ও না আগের দেহে…”

দেবী সর্বশ্রী হেসে বললেন, “জানি, ওকে নিয়ে আসার জন্যই তো তোমাদের সকলকে পাঠিয়েছিলাম। … যাই হোক, জয়াবিজয়া, মীনাক্ষী, আর দিয়া ও বহ্নি, বাকি সকলে আমার সাথে এসো। আমাদের জন্য কেউ অপেক্ষা করছেন বনে”।

বনে সকলে যাত্রা করতে একটু অগ্রসর হলেই, এক গহন অন্ধকার যেন সকলকে ঘিরে ফেলে। ক্রমশ এমন হয় যে কেউ কারুকে দেখতে পায়না। বিজয়া আতঙ্কিত হয়ে উঠে বললেন, “কি হচ্ছে মীনাক্ষী! … আমরা কোথায় এসে গেলাম!”

মীনাক্ষী উত্তরে বললেন, “দিদি, আমার মন যদি সঠিক কথা বলে, তাহলে এটা আতঙ্কের নয়, আনন্দের সময়। … খেয়াল করে দেখো, কেবল অন্ধকার নয়, সমস্ত গন্ধ, সমস্ত আকৃতি সমস্ত কিছুই যেন মিছে হয়ে যাচ্ছে। যেন আমরা অনন্তের সম্মুখীন হচ্ছি ক্রমে ক্রমে। … যেন সাখ্যাত মা সর্বাম্বা অপেক্ষা করছেন আমাদের সাথে সাখ্যাত করবেন বলে!” …

এতো কথা বলার শেষে, মীনাক্ষীর থেকে একটি আর্তনাদ শ্রবণ করা গেল, “আ …আ…!”

বিজয়া চিৎকার করে উঠলো, “মীনাক্ষী! … কি হয়েছে … তোমার কথা শোনা যাচ্ছে না কেন? … মীনাক্ষী! … কি হয়েছে তোর! … কি রে সারা দিচ্ছিস না কেন?”

এমন আর্তনাদের পর, ক্রমশ সমস্ত কিছু আলোকিত হতে শুরু করলো, সমস্ত কিছু আলোকিত হয়ে গেল, আর সকলে সম্মুখে দেখতে পেলেন, স্বমহিমায়, মাতা সর্বাম্বা বিরাজমান, আর তিনি মীনাক্ষীকে ক্রোড়ে রেখে তাঁর উদ্দেশ্যে বলছেন, “তুই এতটা স্নেহ করিস হ্যাঁরে! … আমার সত্যস্বরূপের আভাসও তুই অনুভব করে নিতে পারলি! … গন্ধ নেই মানে মা! … রূপ নেই মানে মা!”

মীনাক্ষীর চোখ ছলছল করছে, গদগদ হয়ে সে বলল, “তোমার কাছেই তো সর্বদা আমার মন পরে থাকে মা! … সন্তান হয়ে মাকে চিনতে পারবো না! … আমার মা যে অনন্ত!”

মাতা সর্বাম্বা মৃদু হেসে বললেন, “তোর সাখ্যাত করবো বলেই, শ্রীকে তোর কাছে নিয়ে এসেছি। আর তোদের সকলকে কিছু বলার আছে আমার। তাই বলার আছে, যা মীনাক্ষী আমার থেকে শুনতে ব্যকুল ছিল। যার হৃদয় থেকে আমি প্রথম বার প্রকাশ্যে আসি বলে তোরা পরাপ্রকৃতিকে, পরানিয়তিকে সাকার বেশে প্রত্যক্ষ করতে সক্ষম হয়েছিলিস, সেই ব্রহ্মসনাতনের কথা বলার কালে বারবার মীনাক্ষী আমার কাছে আবদার করে গেছে যাতে, আমি সম্পূর্ণ প্রজ্ঞা সাখ্যাতে বলি। পূর্ণ সমর্পিত মীনাক্ষীর এই আবদার কি করে না রেখে থাকতে পারি! তাই সকলের সামনে এসে সেই কথা সকলকে বলছি”।

এবার দিয়ার উদ্দেশ্যে মাতা সর্বাম্বা বললেন, “দিয়া!”

দিয়ার সমস্ত দেহ থরথর করে কম্পনাই ছিল এতক্ষণ। তাঁর নাম ধরে মাতা ডাকতে, তাঁর কম্পন যেন অতিকায় হয়ে গেল। রীতিমত অঙ্গের তাপমাত্রা অতিরিক্ত বেড়ে গেলে যেমন কাঁপুনি আসে, তেমন কাঁপুনি নিয়েই মাতার সম্মুখে এগিয়ে গেল দিয়া। মাতা সর্বাম্বা দিয়ার দিকে নেত্রমণি স্থির করতে, দিয়ার যেন মনে হলো তার অস্তিত্বের আর কনো প্রয়োজনই নেই।

মাতা সর্বাম্বা মৃদু হেসে দিয়াকে বললেন, “প্রয়োজন আছে এখনো অস্তিত্বের দিয়া। এখন আমি যা বলবো, তাই শ্রবণ করে, তোমরা ১০জন ১০ দিশায় ছড়িয়ে গিয়ে, সেই কথাই সকলকে বলবে। আর সেই কথা বলার শেষে, যাকে দেখবে তোমাদের এই কথনকে পূর্ণ ভাবে বিশ্বাস করে তোমাদের নিকটে আসছেন, তাকেই নিয়ে আসবে এই ক্ষেত্রে, আর নিজেদের পরিচয় দেবে প্রচারিকা বলে, এই নামেই তোমাদের এবং তোমাদের গোষ্ঠীকে এই কৃতান্তিক সমাজে পরিচিত থাকবে চিরকাল”।

যথাজ্ঞা বলার মতও কণ্ঠস্বরে চাপ দিতে পারলো না দিয়া, তাই অগত্যা মাথা নেড়ে সম্মতি দিলো মাতার কথাতে। অতঃপরে মাতা সর্বাম্বা এবার জয়াবিজয়ার উদ্দেশ্যে বললেন, “জয়াবিজয়া, তোমাদের দায়িত্ব দিলাম একটি বিশাল জাহাজ নির্মাণের। তোমরা সেই বিদ্যা, তোমাদের মাতা দেবী নলিনীর থেকে জানো। সেই বিদ্যাকে ব্যবহার করে একটি বিশালাকায় জাহাজ নির্মাণ করতে হবে তোমাদেরকে”।

এবার তন্ত্রসন্তানদের উদ্দেশ্যে মাতা বললেন, “তন্ত্রপুত্ররা, তোমাদের দায়িত্ব হবে, এই জাহাজকে যথাযথ ভাবে মাটিদ্বারা পরিপূর্ণ করতে, যাতে এঁর মধ্যেই সমস্ত কৃষিকর্ম সম্পন্ন করা সম্ভব হয়। … অতঃপরে, তন্ত্রকন্যারা, তোমাদের দায়িত্ব হবে, সকলকে এই জাহাজে স্থাপিত রাখা। অতঃপরে যেমন মীনাক্ষী আর শ্রী বলবে, সেই অনুসারে এই জাহাজের উপর সমাজ স্থাপন করবে”।

মাতার কথাতে সকলে সায় দিলে, মাতা বললেন, “এবার আমি মীনাক্ষীর বারবার আমার কাছে শুনতে আবদার করা প্রজ্ঞা শ্রবণ করাবো। … প্রজ্ঞা অর্থাৎ সম্পূর্ণ জ্ঞান। সম্পূর্ণ জ্ঞানের মানে কখনোই কেবল সত্যের জ্ঞান নয়, কেবল ভ্রমের জ্ঞান নয়। উপরন্তু সত্য থেকে ভ্রম, তথা ভ্রম থেক সত্য, সমস্ত জ্ঞানের সমষ্টি হলো প্রজ্ঞা। তাই এবার তোমরা সকুলে প্রস্তুত হয়ে আমার সম্মুখে উপবেশন করো। আমি আমার কথন শুরু করবো”।

মীনাক্ষী বললেন, “আমাকেও ওদের সাথে একসাথে বসে কথা শুনতে দাও মা!”

মাতা সর্বাম্বা হেসে বললেন, “আমার কোলে বসবি না!”

মীনাক্ষী হেসে বললেন, “এখানে বসলে একটা কথাও শুনতে ইচ্ছা হবেনা মা। যেখানে তোমার কোল পেয়েছি, সেখানে কি বা আর জ্ঞান, কি বা আর অজ্ঞান! … এই কোলে আমি আবার ফিরবো। যেদিন তুমি নিশ্চিন্ত হয়ে যাবে, সেদিন ফিরবো। সেদিন এসে আমাকে কোলে তুলে নিয়ে যাবে তো?”

মাতা সর্বাম্বা হেসে বললেন, “যাবো, শ্রী আর তোকে, দুই কোলে বসিয়ে নিয়ে যাবো সেদিন। সেদিন আসছে, খুব শীঘ্রই আসছে। আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি সেই দিনটিকে”।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28