সর্বশ্রী কাণ্ড (কৃতান্ত তৃতীয় কাণ্ড)

এমন কথা বলে যখন রোজরা এবং অরিত্রারা প্রত্যাবর্তনের তজ্জরি উরা শুরু করলো, তখন একদল হতাশগোষ্ঠীর আগমন ঘটলো মীনাক্ষীদের কাছে। জয়া ও বিজয়ার কাছে তারা এসে হাহুতাশ করে বলা শুরু করলো, আর বলতে থাকলো, “এই জীবন আমাদের অভিশাপ হয়ে গেছে দেবী! … এতো কাঁদলাম, এতো আবদার করলাম, কই মা তো আমাদের ভার গ্রহণ করলেন না! আমাদের স্থির বিশ্বাস ছিল যে, আমাদের ভার মা গ্রহণ করলে, আমরা নিশ্চিত ভাবে বহু বহুর কাছে প্রসিদ্ধ হয়ে উঠতাম আর কৃতান্তিক ধারার বিস্তার করতে পারতাম। কিন্তু তা তো হলো না!”

১০জনের সদস্যবৃন্দদের মধ্যে এক স্ত্রী এবার বললেন, “প্রচার করার সামর্থ্যই আমাদের শক্তি, এমন জ্ঞান করতাম, আজ জানলাম, সেটিই আমাদের দুর্বলতা। সেই কারণেই তো মা আমাদের ভার গ্রহণ করলেন না, তাই না! আসলে তিনি যে প্রচার পছন্দই করেন না। আর তাই আমাদের শক্তিই আমাদের দুর্বলতা হয়ে উঠলো আজ, আর আমরা অভিশপ্ত হয়ে উঠলাম”।

বিজয়া এই ১০ জনের সদস্যদের মীনাক্ষীর সমক্ষে নিয়ে গিয়ে উপস্থিত করে মীনাক্ষীর উদ্দেশ্যে বললেন, “মীনাক্ষী, ইনারা সকলে হতাশার শিকার হয়েছেন। এঁদের মনে হয়েছে যে এঁদের জীবন অভিশপ্ত হয়ে গেছে। এঁদের আবদার ছিল, মা ইনাদের ভার গ্রহণ করবেন, আর তেমন করলে, ইনারা প্রসিদ্ধ হয়ে উঠবেন আর কৃতান্তের প্রচার করতে সক্ষম হবেন, আর তেমন করে নিজেদের জীবন সার্থক করবেন। কিন্তু মাতা এঁদের ভার গ্রহণ করেন নি। তুমি কি বলো এই উদ্দেশ্যে?”

মীনাক্ষী হেসে বললেন, “ভার গ্রহণ! তিনি পৃথক ভাবে কার ভার গ্রহণ করবেন! কারুর পৃথক ভাবে ভার গ্রহণ করার জন্য যে, কারুর না কারুর ভার গ্রহণ না করেও তাঁকে থাকতে হবে। কিন্তু কার ভার গ্রহণ করেন নি তিনি! তিনি ভার না গ্রহণ করলে, তোমরা জীবিত কি ভাবে রয়েছ? তোমাদের অন্তরে এই যে শ্বাস চলছে, তা কি? তা তো তাঁরই প্রবাহধারা। তোমাদের যে খিদা লাগে, তোমরা আহার করো আর সেই আহারকে হজম করো, তার জন্য যেই অগ্নির সঞ্চার রয়েছে তোমাদের মধ্যে, সেটিই বা কি? তাঁরই উষ্মা সেই তাপ। তোমাদের এই দেহ যেই মৃত্তিকা ও খনিজ দ্বারা নির্মিত, তাও তো তাঁরই উপস্থিতির ভান। তোমাদের যেই প্রচার করার মেধা, সেই মেধাও তো তাঁরই চেতনার প্রভা, তাহলে তোমরা কেন এমন মনে করছো যে তিনি তোমাদের ভার গ্রহণ করেন নি!”

ঈষৎ হাস্য প্রদান করে মীনাক্ষী আবার বললেন, “ভার তিনি গ্রহণ না করে থাকলে যে কনো কিছুর অস্তিত্বকে অস্তিত্ব বলেই মনে হতো না, কারণ এই ব্রহ্মাণ্ড চরাচর কিচ্ছু নেই, কেবল শূন্যই সত্য, কেবল শূন্যই অস্তিত্বে আছে, বাকি কিচ্ছু বলতে কিচ্ছু নেই। কিন্তু তিনি স্বয়ং সত্য। তাই তো তিনি চেতনারূপে, প্রকৃতিরূপে এবং নিয়তিরূপে বিরাজ করছেন বলে, সেই সমস্ত ভ্রম-অস্তিত্বকেও বাস্তব অস্তিত্ব রূপে জ্ঞান হচ্ছে। অর্থাৎ তিনি তো স্বয়ং তোমাদের চেতনা রূপে বিরাজ করছেন। তারপরেও তোমরা এই অভিযোগ করছো যে, তিনি তোমাদের ভার নেন নি!

তিনি তো সকলের ভার গ্রহণ করে রয়েছেন, কারণ সকলের অন্তরের মেধা যে স্বয়ং তিনি, উষ্মাও যে স্বয়ং তিনি। প্রতিটি উচ্চারিত ধ্বনি স্বয়ং তাঁর বাণী, প্রতিটি স্পন্দন তাঁর অনুভূতির বিস্তার। কিন্তু তারপরেও তোমাদের মনে হচ্ছে যে, তিনি ভার নেন নি!”

এক স্ত্রী, নাম দিয়া সম্মুখে এসে করজোড়ে বললেন, “কিন্তু দিদি, আমাদের যা প্রয়োজন, তা তো মিটছে না! … আপনি ধরুন আমার ভার গ্রহণ করেছেন, সেক্ষেত্রে আমার সমস্ত প্রয়োজন তো আপনিই মেটাবেন, তাই না! কিন্তু তা তো হচ্ছেনা!”

মীনাক্ষী হেসে বললেন, “মা তিনি, সন্তান তুমি। না তিনি মালিক, আর না তুমি শ্রমিক। শ্রমিক মালিকের প্রয়োজন মেটায়, তাই মালিক শ্রমিকের প্রয়োজন মেটায়। দেনাপাওনার সম্পর্ক। কিন্তু মা-সন্তানের সম্পর্ক তো দেনাপাওনার সম্পর্ক নয়। মা-সন্তানের সম্পর্কে, মা কেবলই দেন, আর সন্তান কেবলই নেন। তোমার যদি মনে হয় যে, তুমি তোমার প্রয়োজন বোঝো, সেটিই তোমার অভিশাপ, প্রয়োজন না মেটাটি অভিশাপ নয়। কেন এমন বললাম?

কারণ তুমি কেবল দুই নেত্র দিয়ে জগত দেখো। অত্যন্ত ক্ষীণ দৃষ্টি তোমার, তাই তো সামান্যই দেখতে পাও এই জগতের সেই দুই নেত্র দিয়ে। আর যেটুকু দেখো, সেটুকু থেকে নিজের প্রয়োজনের হিসাব লাগাও তুমি। আর এমন করা তোমাদের অভ্যাস হয়ে যাবার কারণে, তা দেখতেও পাওনা যা তোমাদের দৃষ্টির অগোচর, আর তাকে তোমাদের প্রয়োজন মনেও করো না।

কেমন জানো? যখন শিশু ছিলে, তখন তোমাদের অবিভাবকরা তোমাদের বলতেন, নিত্য নির্দিষ্ট সময়ে স্নান করার কথা, নির্দিষ্ট সময়ে আহার করার কথা, নির্দিষ্ট সময়ে নিদ্রা যাবার কথা, আর তোমরা মনে করতে, আহার করলেই তো হলো, নিদ্রা গেলেই তো হলো, স্নান করলেই তো হলো, নির্দিষ্ট সময়ের প্রয়োজন কি? কিন্তু আজ তোমরা যুবতী হয়ে গিয়ে অনুভব করতে পারছো যে, নির্দিষ্ট সময়ে নিদ্রা গেলে, জীবন ও জীবনকে বেষ্টন করা সময়ও তোমার চারিপাশে নির্দিষ্ট গতিপথে চালিত হয়।

যদি যখন তখন নিদ্রা যাও, তাহলে দেখা যায় যে তোমার জীবনকে অগ্রগতি প্রদান করার সুযোগ সেই সময়ে তোমার জীবনে এসে উপস্থিত হলো, যেই সময়ে তুমি নিদ্রাতে নিমগ্ন ছিলে। আর তাই সেই সুযোগ সমূহ তোমাকে স্পর্শ না করেই তোমাকে ত্যাগ দিয়ে চলে যায়। আজ বুঝতে পারছো যে, নির্দিষ্ট সময়ে আহার করলে, দেহ ও দেহের পাচনপদ্ধতি দেহের সঞ্চালন পদ্ধতিকে নিয়মাবদ্ধ করে রাখে, আর তার ফলে দেহ রোগবিমুখ হয়, আর তোমরাও সুস্থতার সাথে জীবনযাপন করতে পারো।

অর্থাৎ কি দাঁড়ালো? তোমরা তোমাদের দৃষ্টি যতদূর যায়, সেই অনুসারে নিজেদের প্রয়োজন জ্ঞান করতে, আর তাই মনে করতে নিদ্রা গেলেই তো হলো, আহার করলেই তো হলো, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তা করার কি কারণ। কিন্তু তোমার অবিভাবকরা অভিজ্ঞ, তাই তাঁরা তা জানতেন, যা তোমরা জানতে না। ফলস্বরূপ, তাঁরা তাই করার কথা বলতেন, যা তোমাদের কাছে অপ্রয়োজন।

এক্ষেত্রেও ঠিক তেমনই। তোমরা তোমাদের ক্ষীণ দৃষ্টিদিয়েই জগত দেখো। তাই তোমাদের তাই তাই প্রয়োজন মনে হয়, যা আদপে অপ্রয়োজন। আবার তোমাদের তা তা অপ্রয়োজন মনে হয়, যা আদপে প্রয়োজন। তোমরা ইতিহাস পাঠ করার সময়ে বলো, এতো অতীত জেনে আমার কি হবে? কিন্তু ভবিষ্যতে যখন কনো মিথ্যাচারী এসে অসত্য বলে তোমাকে বশীকরণ করার প্রয়াস করবেন, তখন এই ইতিহাসই তোমাদের রক্ষা করবে। …

তাই নিজেদের ধারণা করা প্রয়োজন বা অপ্রয়োজনকে মান্যতা প্রদান বন্ধ করো, দেখবে তোমাদের ভার তিনি প্রথমদিন থেকেই গ্রহণ করে আছেন। তোমরা যখন তাঁর থেকে ভার গ্রহণের আবদারও করো নি, তারও পূর্ব থেকে তিনি তোমাদের ভার গ্রহণ করেই অবস্থান করছেন। আর তাই তো তিনি তোমাদের সর্বক্ষণ তাই তাই প্রদান করে গেছেন, যা তোমাদের বাস্তবে প্রয়োজন, আর তা কিছুতেই প্রদান করেননি, যাদেরকে তোমরা প্রয়োজন মেনেছ, কিন্তু বাস্তবে তা তোমার জন্য অপ্রয়োজন।

তোমাদের তাহলে প্রভু ব্রহ্মসনাতনের কথা বলি, তাঁর জীবনের কথা বলি শোনো। তিনি বরাবরই প্রকৃতির প্রতি আকৃষ্ট। আর তাই তিনি যুবাকালে প্রকৃতিকেন্দ্রিক পাঠ গ্রহণ করে, প্রকৃতিকে কেন্দ্র করেই নিজের পেশা নির্মাণ করাতে আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু কাল তাঁর পিতার রূপ ধরে, তাঁকে সেই কর্মে নিযুক্ত হতে দেন নি। তাঁর পিতা তাঁকে যান্ত্রিক বিদ্যাতে পারদর্শী করে পেশায় নিযুক্ত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেইক্ষেত্রে কাল স্বয়ং সম্মুখে দাঁড়িয়ে তাকেও বাস্তবায়িত হতে দেন নি।

অবশেষে যখন তিনি তেজারতি সংক্রান্ত পেশায় নিযুক্ত থেকে কর্পোরেট জগতকে প্রত্যক্ষ করছিলেন, তখন তিনি নিজের পদোন্নতির জন্য একটি প্রতিযোগিতায় ভাগ নিতে আগ্রহী হন। তাঁর মেধা তখন সেই পর্যায় উন্নীত হয়ে গেছিল যে, প্রতিযোগিতায় তাঁর প্রতিদ্বন্ধিতা করার সামর্থ্য ছাত্রছাত্রী কেন, অধ্যাপকদেরও ছিলনা। কিন্তু যেদিন সেই প্রতিযোগিতার প্রারম্ভ, ঠিক তার পূর্বের দিন, প্রকৃতি তাঁর সমক্ষে একটি তুফান রূপে ধরা দিয়ে, একটি আরশি ভেঙে, তাঁর ডান হাত, যার দ্বারা তিনি প্রতিদ্বন্ধিতা করতেন, তাকে বিশ্রী ভাবে জখম করে দিলে, প্রভু বাধ্য হলেন সেই প্রতিদ্বন্ধিতা থেকে অপসারিত হতে।

আর এই সমস্ত কিছুর পরে গিয়ে তিনি কি জানলেন? জানলেন যে তিনি পূর্ণ ৯৬ কলা অবতার। জানলেন যে তাঁর অবতরণই হয়েছে মনুষ্যযোনিকে কৃতান্ত দর্শন প্রদান করার জন্য। প্রভু তখন মুচকি হেসে প্রকৃতির উদ্দেশ্যে, আমাদের সকলের মায়ের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘মা, যা ঠিক, তাও ভুল হয়ে যেতে পারে, কিন্তু তুই ভুল হতে পারিস না। … প্রকৃতিকেন্দ্রিক পেশা, প্রতিদ্বন্ধিতা করে তেজারতির উন্নত পেশা, এগুলি তো আমার জন্য অপ্রয়োজন ছিল। কিন্তু আমি ভাবতাম তা আমার প্রয়োজন। মূল্যহীন আত্ম আমার, অজ্ঞান আত্ম আমার। কিন্তু তুই তো মা। তাই তুই ঠিকই অপ্রয়োজনের থেকে আমাকে দূরে সরিয়ে রেখে দিলি’।

কি বুঝলে এঁর থেকে, বলো দিয়া! কি অনুভব হলো তোমাদের সকলের প্রভুর জীবনের এই কথা থেকে? তোমরা যা প্রয়োজন মনে করছো, সেটি কি আদপেই প্রয়োজন? বিচার করে দেখো, যা তোমাদের প্রয়োজন, তাই হয়েছে তোমাদের জীবনে, আর সেই কারণেই আজ তোমরা দেবী বিজয়া ও জয়ার সম্মুখে উপস্থিত হয়েছ। কি বলছে তোমাদের বিচার?”

দিয়া তথা সকলে এবার বিচারের পর, নিজেদের নির্বুদ্ধিতার জন্য লজ্জিত হয়ে মাথা নত করলে, মীনাক্ষী মিষ্ট মমতামাখা হাস্য প্রদান করে বললেন, “যাকে তোমরা অভিশাপ বলো, বাস্তবে সেটিই হলো বরদান; আর যাকে তোমরা বরদান বলো, তা যে বাস্তবে অভিশাপ। … কি জানো তো, আহার যত ভালোই হোক, যেই পাত্রে সেই আহার রাখছো, তা যদি সঠিক না হয়, তাহলে তা বিষাক্ত হয়ে যায়।

ধর তোমাকে ধনী হবার বরদান প্রদান করা হলো, কিন্তু তুমি একজন লোভী। এর ফল কি হবে? এর ফল এই হবে যে, তুমি ধনী হয়ে উঠে, একজন স্বৈরাচারী হয়ে উঠবে, এবং অন্যের জীবনের সাথে সাথে, নিজের জীবনকেও বিশ্রী করে তুলবে। … কি বলো তো, তুমি কেমন পাত্র, সেই অনুসারে নির্ভর করছে, কনো কিছু বরদান না অভিশাপ।

ধরো তুমি একটি দুঃস্বপ্ন দেখলে। যদি তুমি পাত্র রূপে যথার্থ না হও, তাহলে সেই দুঃস্বপ্ন কেন দেখলে, কি বিপদ আসছে তোমার কাছে, সেই নিয়েই সর্বক্ষণ চিন্তা করতে থাকবে। কিন্তু যদি তুমি তেমন ভালো পাত্র হও, তবে সেই দুঃস্বপ্নকে নিয়েই তুমি একটি কাহিনীর রচনা করে ফেলবে। অর্থাৎ কনো কিছু বরদান না অভিশাপ, তা নির্ভর করে, তুমি কিরূপ আধার, সেই অনুসারে। ভালো আধারের কাছে অভিশাপ বলে কিছু হয়না, প্রতিটি পদক্ষেপই, প্রতিটি ঘটনাই তাঁর কাছে বরদান।

তাঁর কাছে ইচ্ছা পূর্তি হওয়ার অর্থ দায়িত্ব অর্পণ, আর ইচ্ছাপূর্তি না হওয়ার অর্থ অপ্রয়োজন। তাঁর কাছে স্বপ্ন সুন্দর হোক বা বিশ্রী হোক, তা তার কিছু রচনার সামগ্রী হয়ে যায়। তাই কনো কিছুকেই বরদান বা অভিশাপ বলে নির্দিষ্ট করতে পারো না। তা বরদান বা অভিশাপ রূপে প্রত্যক্ষ হয়, তুমি কিরূপ আধার, সেই অনুসারে। অর্থাৎ পূর্ব থেকে কনো কিছুই বরদান বা অভিশাপ রূপে চিহ্নিত নয়।

তাই কনো কিছুকে নিয়ে, আমি বরদান লাভ করেছি, এই উচ্ছ্বাসও যেমন উচিত নয়, তেমন আমি অভিশপ্ত হয়েছি, এই আক্ষেপও অর্থহীন। তিনি আমাদের মা, আর আমরা সকলে তাঁর প্রিয় সন্তান। তাই তিনি আমাদের কনো কালেই কনো অভিশাপ দেবেন না, দেনও না। কিন্তু আমরা আমাদের চাওয়াপাওয়ার অঙ্ক কষে রেখে দিই আমাদের আত্মের কাছে, আর তার সাথে মিলিয়ে মিলিয়ে আমরা তাঁর কনো দানকে বরদান বলে অহংকারী হয়ে উঠি, আবার কনো দানকে অভিশাপ বলে, তাঁকে দোষারোপ করা শুরু করে দিই।

দিয়া, আত্ম মানে আমিত্ব, এই আমিত্বের বিস্তার কখনোই বরদান নয়। কিন্তু বিচার করে দেখো, আমি ধনী হলাম, আমি খ্যাতি পেলাম, এই সমস্তকেই আমরা বরদান বলি। কিন্তু এই সমস্ত কিছুই যদি ব্যক্তিগত স্বার্থে লাভ করা হয়, তাহলে তা বরদান নয় অভিশাপ হয়ে যায়, কারণ তা আমাদের লোভী করে দেয়, এবং আমাদেরকে সত্য থেকে বিমুখ করে দেয়।

তাই দিয়া, প্রথম নিজেকে সুযোগ্য করে তলো। পূর্বে যদি তোমাদের ভার নিয়েছেন, এই কথা নীতি প্রত্যক্ষ হয়ে বলতেন, জানো তোমাদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া কি হতো? তোমরা বলতে, আমরা ভক্ত, আমরা ভক্তি করেছি, আর তার ফল পেয়েছি। অর্থাৎ কার প্রশস্তিগীত গাইতে তোমরা? নিজদের আত্মের। আর আত্মের প্রশস্তি মানে জানো তো কি? কেবলই অহংকার, কেবলই বিস্মৃতি, কেবলই ভ্রম, আর ভ্রম মানেই সত্য হতে বিচ্যুতি, অর্থাৎ অধমযোনি হয়ে উঠতে, যাকে তোমরা বলো অভিশাপ।

তাই প্রথম নিজেদের যোগ্য করে তলো, যাতে তিনি যদি প্রত্যক্ষ হয়ে বলেনও যে তোমাদের ভার নিলেন তিনি, তাহলে তোমরা নিজেদের ভক্তির বা আমিত্বের প্রশস্তিগীত না গেয়ে, এই গীত গাইতে থাকো যে তাঁর অদ্ভুত করুণা। কতজনেই না তাঁর ভক্তি করছেন, কিন্তু তাঁর করুণা এতো অপার যে, তিনি আমাদেরকে এই অভয়দান করলেন।

না, এমন কখনোই ভেবো না যে আমাদের মা নিজের প্রশস্তিগীত শ্রবণ করতে ভালো বাসেন। কিন্তু তোমাদের অহং যাতে বিনষ্ট হয়, যাতে তোমরা আত্মমুখী না হয়ে ওঠো, যাতে তোমরা সত্যবিমুখ না হয়ে যাও, তার জন্যই এমন হওয়া আবশ্যক। (মিষ্ট হেসে) যখন দেখবে, তোমরা এমন করছো, তখন তিনি কনো না কনো রূপে এসে বলে যাবেন যে, তিনি ধন্য হয়ে গেছেন যে তোমরা তাঁর সন্তান। অর্থাৎ কিছু বুঝলে?

(পুনরায় হেসে) তিনি তোমাদেরকে তোমাদের আত্মভাব থেকে মুক্ত করতে নিজে প্রশংসা শুনে তো নেবেন, কিন্তু তিনি তো মা, তাই তাঁর প্রশংসা হজম হয়না। (হাস্যমুখেই) তাই তিনি স্বয়ং এসে সেই প্রশংসা তোমাদেরকে ফিরিয়ে দেন। তবে তখনই তা ফিরিয়ে দেন তোমাদেরকে, যখন আর তোমরা সেই প্রশংসা লাভ করে, অহমিকার ফাঁদে পা দেবেনা। এই হলো মায়ের প্রেম। প্রশংসা তাঁর কাছে বিষ। আমাদের কাছেও। তাই যখন সেই বিষ আমাদেরকে আঘাত করবে, তখন তিনি সেই বিষ নিজের কাছে গ্রহণ করে নেন, আর যখন আর আমাদের উপর বিষ কনোরূপ প্রভাব ফেলতে পারবেনা, তখন সেই বিষ আমাদের কাছে ফিরিয়ে দেন, আর সেই বিষের ফলে আমাদের উপর কনো প্রভাব পরে না, তা তিনি তাঁর অন্যসন্তানদের দেখান এবং তাঁদেরকেও একই ভাবে চালিত করেন, যেই পথে তোমাদেরকে তিনি চালনা করিয়েছেন।

তাই নিজেদেরকে সেই স্তরে উন্নীত করো প্রথমে, যাতে কনো ভাবে নিজেদের আমিত্ব না জাগে। সেই স্তরে উন্নীত করে যখন নিজের ভক্তির বাখান করতে লাজ লাগবে। মনে হবে যে, যদি আমি প্রেমী হই, তাহলে তিনি কি? বলবে যে, বেশ আমি প্রেমী, কিন্তু যেই প্রেমকে ধারণ করে আমি প্রেমী, সেই প্রেম স্বয়ং আমাদের মা। বলবে যে, বেশ আমি জ্ঞানী, কিন্তু যেই জ্ঞানকে ধারণ করে আমি জ্ঞানী, সেই জ্ঞান হলেন আমার মা।

অর্থাৎ জেনে রেখো যে, যতক্ষণ তোমাদের কনো কিছুর শ্রেয় নেবার প্রয়াস থাকবে, ততক্ষণ তোমরা প্রস্তুত হওনি; যতক্ষণ তোমাদের দোষারোপ করার প্রয়াস থাকবে, ততক্ষণ তোমরা প্রস্তুত হওনি; যতক্ষণ তোমাদের মধ্যে নিজত্রুটিকে স্বকণ্ঠে ঘোষণা করতে কুণ্ঠা বিরাজ করছে, তখন তোমরা প্রস্তুত হওনি। তাই প্রথম নিজেদেরকে প্রস্তুত করো। আমিত্বের নেশা থেকে প্রতিহত করো। নিজেকে কর্তা জ্ঞান করা থেকে প্রতিহত করো। তিনিই করছেন। ভক্তি, জ্ঞান, প্রেম, সমস্ত কিছু তিনি দিচ্ছেন। আর আমরা আমাদের আমিত্ব, আমাদের আত্মকে সেই দানের সম্মুখে পর্দা করে রেখে দিয়ে, সমস্ত কিছুকে আমাদের কৃতিত্ব মনে করে চলেছি।

আর সেই কৃতিত্ব মনে করে চলার কারণে, তাঁর থেকে জ্ঞান এসে উপস্থিত হওয়া সত্ত্বেও আমরা অজ্ঞানী, তাঁর থেকে প্রেম এসে উপস্থিত হওয়া সত্ত্বেও আমরা অহংকারী, তাঁর থেকে ভক্তি এসে উপস্থিত হওয়া সত্ত্বেও আমরা পামর, তাঁর থেকে চেতনা এসে উপস্থিত হওয়ার পরেও আমরা অচেতন, তাঁর থেকে মমতা এসে উপস্থিত হলেও আত্মসুখী, তাঁর থেকে যুক্তি এসে উপস্থিত হলেও আমরা প্রযুক্তিমুখি, তাঁর থেকে স্নেহ এসে উপস্থিত হবার পরেও আমরা আগ্রাসী আবেগপ্রবণ।

তাই নিজের থেকে আমি করেছি, আমি কেঁদেছি, আমি চেয়েছি, এই সমস্ত আমিত্ব ত্যাগ করো, দেখবে তোমাদের যা প্রয়োজন তা তিনি তোমাদের কাছে পূর্ব থেকেই দিয়ে রেখেছেন। ততদিন তাঁর প্রদত্ত কনো কিছুকেই উপলব্ধি করতে পারবেনা, ততদিন তাঁর প্রদত্ত যেসমস্ত প্রতিভা তোমাদের কাছে দেওয়া আছে, তা কিছুতেই উপলব্ধি করতে পারবেনা, যতদিন আসক্ত হয়ে যাবার প্রবণতা তোমাদের মধ্যে থাকবে।

তাই এই আসক্ত হয়ে ওঠার প্রবণতা ত্যাগ করো প্রথমে। স্মরণ রাখো একটি স্পষ্ট কথা যে, এটি হলো ভ্রম জগত, যেখানে আমার তোমার বলে কনো কিছুই নেই। বাস্তবে কনো সাকারই সম্ভব নয়, কারণ সাকার মানেই সসীমতা, আর যেখানে অসীম রূপে কেউ বিরাজমান, সেখানে দ্বিতীয় কিছুর অস্তিত্বই তাঁকে সসীম করে দেয়, কিন্তু তিনি সসীম হয়ে যাবেন, তা যে অসম্ভব আর তাই কনো কিছুর কনো অস্তিত্বই সম্ভব নয়।

এই কথা স্মরণ রাখলে, একটি স্পষ্ট কথা আরো তোমরা অনুধাবন করতে পারবে যে, যেখানে কনো কিছুই সত্য নয়, সেখানে প্রতিভার প্রয়োজন কি? প্রতিভার একটিই প্রয়োজন আর তা হলো, যারা এই শূন্যতার অস্তিত্ব, এই নিরাকরত্বের অস্তিত্ব হতে অজ্ঞান, যারা সাকারের অস্তিত্ব নিয়ে, সসীমের অস্তিত্ব নিয়ে উলমালা, তাদের ভ্রমকে জিজ্ঞাসা চিহ্ন প্রদান করে, তাঁদের হৃদয়ে সত্যকে অঙ্কিত করে দেওয়া।

অর্থাৎ, এই ভ্রমজগতে লব্ধ প্রতিভা কখনোই নিজ আত্মকে প্রসিদ্ধ করার জন্য প্রদত্ত হয়না, নিজকে শ্রেষ্ঠ প্রতিপন্ন করার জন্যও তা প্রদত্ত হয়না। সেই প্রতিভার একটি উদ্দেশ্য, আর তা হলো নিজের ভ্রম ত্যাগ করার সাথে সাথে অন্য ভ্রাতাভগিনী, অর্থাৎ আমাদের মায়ের অন্য সন্তানদেরও ভ্রমকে প্রশ্ন করা। তাই যতক্ষণ তোমরা তোমাদের প্রতিভা সম্বন্ধে আসক্ত থাকবে, ততদিন তোমাদের সেই প্রতিভা তোমাদেরই দুর্বলতা হয়ে বিরাজ করবে।

সেই প্রতিভা যতদিন তোমাদের দুর্বলতা হয়ে বিরাজ করবে ততদিন তোমাদেরকে সেই প্রতিভাই কোণঠাসা করে দেবে। উন্নত মাচায় তুমি স্থিত থাকবে, নিচে অসংখ্য মানুষ তোমার প্রতিভাকে দেখবে, কিন্তু সেই একটি মানুষের সাথেও তোমার আলাপ থাকবেনা, অর্থাৎ তুমি হবে তাদের কাছে পরিচিত, কিন্তু তারা হবে তোমার কাছে অপরিচিত। আর এই ভাবেই, যতক্ষণ তুমি তোমার প্রতিভাকে তোমার শ্রেষ্ঠত্ব জ্ঞান করে তার প্রতি আসক্ত থাকবে, ততক্ষণ তা তোমারই দুর্বলতা হয়ে বিরাজ করবে, কারণ তা তোমার কাছে বহু ভ্রাতাভগিনীকে এনেও, তাদের সাথে তোমাকে আলাপ করতে দেবেনা।

কিন্তু যেদিন তুমি তোমার প্রতিভা সম্বন্ধে অনাসক্ত হয়ে উঠবে, যেদিন উপলব্ধি করবে যে, তোমার কাছে প্রতিভা প্রদান করাই হয়েছে সত্যকে উপলব্ধি করার জন্য, এবং তা উপলব্ধি করে অন্যকে তা উপলব্ধি করতে সাহায্য করার জন্য, সেদিন দেখবে সমস্ত রসায়ন পরিবর্তিত হয়ে গেছে। সেদিন দেখবে, তোমার প্রতিভা তোমাকে অনেক অনেকের সাথে আলাপ করাচ্ছে, আর তোমার প্রতিভা তোমাকে আর আরো অনেককে উন্নত করে তুলছে। এটিই হলো প্রতিভার যথার্থ প্রয়োজন ও ব্যবহার।

সেই প্রতিভা সঙ্গীতের হোক, নৃত্যের হোক, বা কাব্যের বা লিখনির হোক, ক্রীড়ার হোক বা চিন্ত্রাঙ্কনের হোক বা নাট্যের হোক। যেই প্রতিভা তোমাকে সত্যের বোধ করায় না, সেই প্রতিভা কনো প্রতিভাই নয়, সে যে অহংকারের সামগ্রী মাত্র। প্রকৃত প্রতিভা সেটিই যা তোমাদেরকে সত্যের বোধ করাবে, আর তোমাদেরকে মাধ্যম করে, অনেককে সত্যের বোধ করাবে।

সত্য ত্যাগ করে এসে, নিত্য ত্যাগ করে এসে, স্বরূপ ত্যাগ করে এসে, আমরা যে এই ভ্রমজগতকেই সত্য মেনে এখানে বিরাজ করছি, এটিই তো বিনোদন, এখানে আর আলাদা করে বিনোদনের কি প্রয়োজন? তুমি যখন তোমার নিজের গৃহ ত্যাগ করে বিহারে ভিন দেশে যাত্রা করো, সেটিই তো বিনোদন। তার উপর আবার নতুন করে বিনোদনের কিই বা প্রয়োজন?

প্রভু এই বিষয়ে, ঠাকুর রামকৃষ্ণের একটি উদ্ধৃতি টেনে এনে বলতেন, ‘মা এর উপর আবার করে আকার বসালেও, তা মা’ই থাকে, অন্য কিছু হয়ে যায়না’। অর্থাৎ বিনোদন করতেই এই ভ্রমজগতে বিহারে এসেছি আমরা, সত্য ত্যাগ করে, নিজের গৃহ ত্যাগ করে, নিজের জননীর আঁচল ত্যাগ করে। তার উপর আবার নতুন করে বিনোদনের আবশ্যকতা কি?

জানো প্রভু কি বলতেন এই বিষয়ে! তিনি বিরক্ত হয়ে বলতেন, ‘অবতারদের যত জ্বালা। তোরা (সাধারণ জীবকটিরা) বিনোদনের জন্য এই ভ্রমজগতে ভ্রমণ করতে এসে হারিয়ে গেছিস, তাই আমাদেরকে তোদেরকে ফিরে যেতে বলতে বারবার আসতে হয়। তোরা তো তোদের মা’কে ভুলে বসে, এখানে এই ভ্রমজগতে বিনোদন করছিস। আমরা তো আর আমাদের মা’কে ভুলে নেই। বেদনায় হৃদয়টা ফেটে যায়, মায়ের সাথে কতদিন সাখ্যাত হয়নি মনে করে করে। মা তাই আমাদের সমাধি প্রদান করে, কোলে নেন খানিকক্ষণ, শূন্যে বিরাজ করান, নিজের ঘরের, নিজের মায়ের আঁচলের স্বাদ প্রদান করেন, আর প্রতিবার বলেন, সমাধি হলে দেহের ক্ষয় হয়, তাই বেশি সমাধি ভালো নয়। … বুঝতে পারছিস, তোরা এখানে বিনোদন করে যাচ্ছিস, আর আমাদের অবতারদের যত জ্বালা! মা’ই হলেন আমাদের সর্বস্ব কিছু, তোদেরও। কিন্তু তোরা তো সেই শূন্যকে সেই নিরাকারাকে দিব্যি ভুলে রয়েছিস। আর তোদের এই ভুলে থাকার জন্য, আমাদেরকে বারবার মা কে ফেলে চলে আসতে হয়’।

তা বুঝতে পারলে তাঁর কথা থেকে যে, এই ভ্রমজগত সম্পূর্ণটাই বিনোদন জগত। যেই জগত নেই, সেই ভ্রমকে সত্য রূপে স্থাপন করে এখানে তোমরা বিনোদনের জন্যই এসেছ, আর এসে নিজেদের মা’কে ভুলে গিয়ে, এখানেই থেকে গেছ, যেন এটিই তোমাদের বাড়িঘর। তাহলে এখানে আর নতুন করে বিনোদনের কি প্রয়োজন?

তাই বিনোদনের জন্য তিনি কারুকে কনো প্রতিভা প্রদান করেননি, আর করেনও না। প্রতিভার প্রয়োজন সত্যকে উপলব্ধি করার জন্য, আর তাই সত্য উপলব্ধি করা ও করানোই প্রতিভার যথার্থ ব্যবহার। তাই তোমাদের মা প্রতিভা তো দিয়েছেন প্রচার করার, কিন্তু সেই প্রতিভাই তোমাদের আজ দুর্বলতা হয়ে বিরাজ করছে। কেন? কারণ তোমরা প্রচার করাকে নিজেদের আনন্দের, নিজেদের আত্মপ্রতিষ্ঠার বিষয় রূপে গণ্য করে বসে রয়েছ। তাই তোমাদেরকে প্রচার করার প্রতিভা তো তিনি দিয়ে রেখেছেন, কিন্তু প্রচার করার বিষয় বা প্রচার করার পাত্র প্রদানই করছেন না।

উপযুক্ত পাত্রের নিকটে প্রচারই যথার্থ প্রচার। ধরে নাও একটি ব্যক্তি যিনি অন্ধবিশ্বাসী। আজ সে অন্ধবিশ্বাসী হয়ে বৈদিক ধর্মকে ধারণ করে রয়েছেন। তাঁর কাছে উপস্থিত হয়ে তোমরা কৃতান্তিক ধর্মের প্রচার করলে। লাভ কি হবে? কনো লাভ হবেনা। সে একটি অন্ধবিশ্বাস ত্যাগ করে, আরো একটি অন্ধবিশ্বাস গ্রহণ করবে। তার নিজের উন্নতি তো হবেই না, বরং কৃতান্তিক ধর্মে একটি অন্ধবিশ্বাসীর আগমন ঘটবে, যার জন্য কৃতান্তিক ধর্মের উদারতা, যুক্তিবাদিতা সীমাবদ্ধ হয়ে উঠবে, এবং সমস্ত ধর্মের মত এই ধর্মও সঙ্কীর্ণ হয়ে উঠবে।

তাহলে বুঝতে পারছো তো, যথার্থ ভাবে প্রচার করার জন্য যথার্থ পাত্রও আবশ্যক হয়, কেবল যথার্থ প্রতিভা নয়। তাই প্রথমত নিজেদের প্রতিভাকে যথার্থ রূপে গণ্য করো। তোমাদের কাছে যে এই প্রচার করার প্রতিভা প্রদান করা রয়েছে, এই প্রতিভা তোমাদেরকে আত্মতুষ্টি প্রদান করার জন্য দেওয়া হয়নি। আত্মতুষ্টি বা বিনোদনের জন্য কনো প্রতিভাই হয়না। এই বিনোদনসর্বস্ব জগতে নতুন করে কনো বিনোদনের কনো আবশ্যকতা কনো কালে না তো ছিল আর না থাকবে।

প্রতিভার উদ্দেশ্য হলো সত্যলাভ করা ও উচিতপাত্রকে সত্যের দিকে অগ্রসর করানো। তাই প্রথম নিজেদের কাছে যেই প্রতিভা উপলব্ধ, যেই প্রতিভা তিনি তোমাদেরকে দিয়ে রেখেছেন, তাকে তাঁর প্রদত্ত দান রূপে মান্যতা দাও। তাহলেই দেখবে, তোমরা অভিশপ্ত, তোমাদের ভার তিনি গ্রহণ করেন নি, এই সমস্ত সঙ্কীর্ণতা তোমাদের হৃদয় থেকে অপসারিত হয়ে যাবে। তোমরা স্পষ্ট অনুভব করতে পারবে যে, তোমাদের উপর তাঁর কৃপা তো বরাবরই ছিল। তোমরা তো তাঁর দেওয়া বরদানে প্রথম থেকেই ভূষিত। সেই কারণেই তো তিনি তোমাদেরকে ভার অর্পণ করে প্রচার করার প্রতিভাদ্বারা ভূষিত করে রেখেছেন।

আর একবার এই দান তাঁর রূপে চিহ্নিত করে, তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা অর্পণ করবে তো দেখবে, তোমাদের এই প্রতিভাকে তিনিই সুসজ্জিত করে দেবেন, যথার্থ জ্ঞান, স্নেহ ও প্রেম রূপ রত্নখচিত করে। অর্থাৎ, তোমাদের কাছে আজ প্রচার করার প্রতিভাই কেবল রয়েছে, কিন্তু কি প্রচার করবে তোমরা? জানো কি তা? শুষ্ক জ্ঞান? নাকি ধাতুমুক্ত জল?

(মিষ্ট হেসে)  ধাতুমুক্ত জলের কনো ব্যবহার নেই। না তো তা তোমাদেরকে যথার্থ পুষ্টি প্রদান করে, আর না তা বৃক্ষ গ্রহণ করে, কেবলই কিছু বণিকের ধনভাণ্ডার পূর্ণ করে তা। শুষ্কজ্ঞানকে প্রভু বলতেন মরুভূমির বালু, যা দিয়ে কনো কাজ হয়না। … যথার্থ প্রচারের বিষয় কি জানো? পলিমাটি, অর্থাৎ যাতে জল ও ধাতু বালুর সাথে মিশে থাকে।

অর্থাৎ কি? অর্থাৎ এই যে, তোমাদের কাছে প্রেম নামক নদীর জলে সিক্ত জ্ঞান অর্থাৎ মৃত্তিকা প্রয়োজন। এককথায় পলিমাটি প্রয়োজন। পলিমাটি দিয়েই মায়ের মূর্তি নির্মাণ করা সম্ভব, অন্য কিছু দিয়ে তা নির্মাণ করলে, তার মধ্যে লাবণ্য থাকেনা। সুন্দর তো হতে পারে, কিন্তু তাঁর লালিমা, তাঁর স্নেহভাব তার মধ্যে প্রত্যক্ষ করা যায়না।

অর্থাৎ প্রচার করার জন্য, কেবল ভক্তিগানও যেমন যথার্থ নয়, তা মানুষকে ভাব প্রদান করার বিপরীতে আবেগে আবদ্ধ করে তুলে আত্মপ্রেমী করে তোলে। আবার প্রচারের জন্য শুষ্কজ্ঞানও যথার্থ নয়, কারণ তা মানুষকে শুষ্কতা প্রদান করে, কঠোর ও মমতাবিরোধী করে তোলে। যথার্থ প্রচারের সামগ্রী হলো, প্রেমের ধারাতে স্নাত বালু, অর্থাৎ পলিমাটি। যেই জ্ঞানের কণায় কণায় প্রেম মিশ্রিত আছে, সেটিই হলো যথার্থ প্রচারের বিষয়, প্রচারের সামগ্রী। তা আছে তোমাদের কাছে তা?”

অন্য এক স্ত্রী, নাম বহ্নি বললেন, “না দিদি, আমাদের কাছে শুষ্ক জ্ঞান আছে যে, ঈশ্বর নিরাকার, ঈশ্বর অসীম, আর ঈশ্বর শূন্য। আবার আমাদের কাছে কেবলই ধাতুমুক্ত অর্থাৎ জ্ঞানরোহিত আবেগপূর্ণ গান আছে, যাকে কেন্দ্র করে উদ্যম নৃত্য করে বিনোদন প্রদান করা যেতে পারে। কিন্তু আমাদের কাছে তা নেই, যা রামপ্রসাদের কাছে ছিল, কমলাকান্তের কাছে ছিল, মীরার কাছে ছিল।

ইনাদের সঙ্গীতে যেমন সুরের মাধ্যমে ছিল ভাবের ঘনঘটা, তেমনই এঁদের প্রতিটি সঙ্গীতের লিখনিতে ছিল অগাধ জ্ঞান। তা আমাদের কাছে নেই। … এই দেখো না, কমলাকান্তের গানে কি আছে? ‘তুমি আপনি গাও মা, আপনি নাচো, আপনি দাও মা করতালি’, অর্থাৎ তুমিই নিয়তি বেশে গায়িকা, প্রকৃতি বেশে নর্তকী, আর তুমিই আমাদের অন্তরে চেতনা হয়ে বিরাজ করে, সেই সঙ্গীত আর নৃত্যতে করতালি দিচ্ছ। … অর্থাৎ এই সঙ্গীত যে, সম্পূর্ণ ভাবে পলিমাটি। এতে যেমন গহন জ্ঞান রয়েছে, তেমনই সুরের প্রলেপে, এই জ্ঞান শুষ্ক নয়, অত্যন্তভাবে ভাবমুখি যা শ্রবণের কালে আমাদেরকে অন্তরমুখি করে দেয়।

একই ভাবে দিদি, রামপ্রসাদের গান রয়েছে কত কত। ‘দিতে পারিনি অজ বলি, তাই দিলাম রিপুপাশে বলি’, আরো আছে, ‘একই ব্রহ্ম, দ্বিধা ভেদে, মন আমার হয়েছে পাজি’। … তেমনই মীরার গান আছে, ‘তুম ভাই সরোবর, হাম ভাই মাছিয়া’ মানে তুমি দিঘি তো আমি তোমারই দিঘিতে খেলে বেড়ানো একটি মাছ। … এই সমস্ত সঙ্গীতের মধ্যে যেমন সুরের দ্বারা হৃদয়কে অন্তর্মুখী করে দেওয়া গুণ আছে, তেমনই রয়েছে গহন গভীর জ্ঞান, যা আমাদেরকে সত্যের সাথে আলাপ করিয়ে দেয়। কিন্তু আমাদের কাছে না তো তেমন সুর আছে, আর না তেমন জ্ঞান”।

মৃদু হেসে মীনাক্ষী বললেন, “কেন নেই তা? সেই খবর কি আছে তোমাদের কাছে?”

সকলে নিরুত্তর হয়ে মাথা নত করে থাকলে, মীনাক্ষী পুনরায় হেসে বললেন, “কারণ তোমাদের কাছে অনুভব নেই। সর্বক্ষণ কেবল নিজেদের আবেগ নিয়ে চিন্তিত থাকলে, সত্যের অনুভব কি করে করবে?”

দিয়া সম্মুখে এসে বললেন, “দিদি, আমরা যেন বুঝেও বুঝছি না। কনো এক জায়গায় যেন আমরা যুক্ত হয়েও বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছি। এই আবেগ আর ভাবের মধ্যে ভেদ কি, তা আমাদের প্রথম পরিষ্কার করে দেবে? … দিদি, তোমার পরিচয় আমরা পেয়েছি, কিন্তু মাতা সর্বশ্রীর কাছে দেবী জয়াবিজয়াই সর্বক্ষণ থাকেন, তাই তাঁদের কাছেই এসেছিলাম।

যখন তারাই হাত ধরে আমাদেরকে তোমার কাছে নিয়ে এলো, তখন তোমার প্রতি ভরসা জন্মালো। কিন্তু এক্ষণে ভরসা নয়, তোমাকে আমাদের অত্যন্ত আপন জ্ঞান হচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন, তোমার কাছে বসে, নিজেদের সমস্ত ত্রুটি স্মরণ করি আর বলে মন হাল্কা করি। তাই দিদি, আবদার করছি তোমার কাছে। আমাদেরকে ভাব আর আবেগের মধ্যে ভেদ অঙ্কন করে দাও। … আমাদেরকে মা যেই প্রতিভা প্রদান করেছেন, তার যথার্থ ব্যবহার করার উপযোগী করে তলো। মায়ের কাজে আসতে পেরে, নিশ্চিত ভাবে তাঁর উপযুক্ত সন্তান হয়ে উঠতে পারবো, নিশ্চিত তিনি একটিবার আলিঙ্গন করে প্রেম দেবেন। ধন্য হয়ে যাবো দিদি। জন্মমৃত্যু সমস্ত কিছু ধন্য হয়ে যাবে, তাঁর একটিবার আলিঙ্গন লাভ করে। করুণা করো দিদি, আমাদেরকে তাঁর স্নেহলাভের জন্য যোগ্য করে দাও।

হ্যাঁ মানছি, একটু স্বার্থপর আমরা। সমস্ত কিছুর শেষে, তাঁর স্পর্শেরই চিন্তা থেকে যাচ্ছে। তাঁর সন্তানদের উন্নতি করা আমাদের স্বপ্ন হতে পারছে না, বরং এই মনে হচ্ছ যে, তাঁর সন্তানদের উন্নত করতেই হবে। তিনি তো মা, তাই তাঁর প্রেম তো তাঁর উপরই বর্ষিত হবে, যে তাঁর সন্তানদের মায়ের সাথে আলাপ করিয়ে দেবে। … হ্যাঁ দিদি, এই আমাদের মনে হচ্ছে। মানে আমাদের মনে এটা আসছেনা যে, সন্তানদের উন্নতি করানোই আমাদের লক্ষ্য, বরং এটা আসছে যে, এমন করতেই হবে আমাদেরকে নাহলে মায়ের স্পর্শ পাবো না। লোভী লাগছে নিজেদেরকে। কিন্তু দিদি, এটাও বুঝতে পারছিনা যে, এই লোভ উচিত না অনোচিত। আমাদের মার্গ দর্শন করো দিদি”।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28