সর্বশ্রী কাণ্ড (কৃতান্ত তৃতীয় কাণ্ড)

মীনাক্ষী হেসে বললেন, “মাতা সর্বশ্রীর কথা তো তোমরা জানোই। তাঁর বিবেক, তাঁর বৈরাগ্য আর তাঁর বিচার কি কর্ম করেছিল, তা জানো তো?”

রোজ উত্তরে বললেন, “জম্বুদেশকে পুনরায় স্থাপন করেছিলেন তাঁরা”।

মীনাক্ষী হেসে উত্তরে বললেন, “আর তা কি ভাবে করেছিলেন? তাঁরা কি কারুর কাছে গিয়ে তাঁদেরকে রাজত্ব প্রদান করার দাবি করেছিলেন? নাকি কারুর কাছে আবদার করে নিজেদের রাজ্যে স্থাপিত হবার কথা বলেছিলেন?”

রোজ উত্তরে বললেন, “না, তেমন করে তো কনো কাজও হতো না।

মীনাক্ষী ভ্রুকুঁচকে, মৃদু হেসে বললেন, “লাভ হতো না, এমন কেন বলছো?”

রোজ উত্তরে বললেন, “কথা এখানে দুটি। প্রথম কথা এই যে করিন্দ্র তাঁদের থেকে একপ্রকার জোর করেই রাজ্য ছিনিয়ে নিয়েছিল। তাই কনো দাবি, কনো শর্তে সে তো সেই রাজ্য ফিরিয়ে দিতোই না। অর্থাৎ মধ্যা কথা এই যে, যদি আমরা জানি যে, কেউ আমাদের দাবি পুড়ন করবেন না, সামর্থ্য থাকলেও করবেন না, তার কাছে দাবি রেখে লাভ কি?

আর দ্বিতীয় কথা এই যে, যা স্থাপন করার প্রয়াস করছিলেন সুরতালছন্দ, তার সম্বন্ধে তো কারুর কনো ধারণাও ছিলনা, তাই কারুর কাছে কনো প্রকার আর্জি রেখেই বা কি লাভ”।

মীনাক্ষী হেসে বললেন, “তাই তাঁরা কি করেছিলেন?”

ভূমি উত্তরে বললেন, “সরাসরি সেই ব্যবস্থার স্থাপন করে দিলেন, বিনা কারুর কাছে কনো দাবি রেখে, বিনা কারুর কাছে কনোরূপ আর্জি রেখে”।

মীনাক্ষী হেসে বললেন, “একে বলে সমান্তরাল ব্যবস্থা। যখন তুমি জানো যে তোমার দাবি পুড়ন করার কেউ নেই, যার কাছে সেই দাবি করবে, সে কনো ভাবেই সেই দাবি পুড়ন করবেনা, কারণ সেই দাবি পুড়ন করে তাঁর কনো স্বার্থপূর্তি হবেনা, তখন এই ব্যবস্থাই স্থাপন করতে হয়। যখন তুমি জানো যে তোমার ব্যবস্থা সম্বন্ধে সর্বসাধারণের কনো ধারণাই নেই, তাই তারা তোমার ব্যবস্থার সাথে যুক্ত হবেন না হবেননা, সেই বিষয়ে সন্দিহান এবং উদাসীন থাকবেন, তখন এই ব্যবস্থাই গ্রহণ করতে হয়।

রোজ, ভূমি, অরিত্রা, তোমরা জানো খুব ভালো করেই যে, বর্তমানে যারা শাসকের আসনে স্থাপিত, আর সেই শাসকগোষ্ঠীকে যারা চালনা করছেন, সেই বণিকমণ্ডলী, তারা সকলেই ধনের নেশায় চূর, এবং সর্বক্ষণ তাঁরা ধনের নেশারই বিস্তার করার প্রয়াস করে চলেছেন। তোমরা জানো যে, তারা সর্বক্ষণ সেই গোষ্ঠীর নির্মাণে ব্যস্ত, যারাও এই ধনের নেশা করবে, আর সেই ধনের নেশা করার ফলে, তার সর্বক্ষণ সকলকে ধনের আওতায় আনতে বাধ্য করবে।

জানো তো, তোমরা এই সমস্ত কিছু! … জানো তো যে, যদি এমন কনো গোষ্ঠী নির্মিত হয়ে যায়, যাদের কাছে ধন উপার্জন কনো কর্মই হবেনা, বরং ধন উপার্জন করে করে, যেই যেই বস্তু ক্রয় করা আবশ্যক ছিল তাদের জন্য, সেই সমস্ত কিছুর স্বয়ং উৎপাদন করবেন, তাদেরকে এই শাসকগোষ্ঠী বা বণিকমণ্ডলী শত্রু রূপে দেখবেন, কারণ তাদের কনো প্রকার চোখরাঙ্গানি, কনো প্রকার নির্দেশ, আচারের আদেশ এঁদের উপর কনোরূপ ক্রিয়া করবেনা।

কি? জানো তো এই কথা? … যদি জানো তাহলে বলো যে, যদি তোমরা তাঁদের কাছে উপস্থিত হয়ে এমন কিছু করার নির্দেশ কামনা করো, তাহলে কেন তাঁরা তোমাদের এই কর্মের অনুমতি প্রদান করবেন? করবেন কি?”

রোজ উত্তরে বললেন, “না, কখনোই করবেন না। তাঁরা তো এই চান যে, সমস্ত মানুষের কাছে ধন আবশ্যক হয়ে যাক। যে সবজী উৎপাদন করবে, তার কাছে দুধ না থাক, বস্ত্র না থাক, আর গৃহ নির্মাণের সামগ্রী না থাক। আর তাই সেও ধন উপার্জনের জন্য বাধ্য হয়ে যাক। তারা তো এই চান যে, যে বস্ত্র নির্মাণ করছে, তার কাছেও বাকি সামগ্রী না থাক, আর সে তাই বাধ্য হোক ধন উপার্জনের জন্য।

আর এই ভাবে যখন সকলেই ধন উপার্জন করবেন, তখন তাদের ধনকে লুণ্ঠন করার জন্য, অন্য অন্য বণিকরা ঝাঁপিয়ে পড়বে। মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে বিমা করাবে, প্রয়োজনীয়তার মিথ্যাবুলি আওড়ে সেই সমস্ত আসবাব ক্রয় করাবে, যা আবশ্যক নয় বরং বিলাসিতা কেবল। অনুষ্ঠানের নাম করে, এবং যৌনতার বৃদ্ধি করিয়ে, দামি বস্ত্র ক্রয় করাবে। নিজেরাই উদ্ভিদ কেটে কেটে উত্তপ্ত করবে ধরণীতলকে, আর নিজেরাই বাতানুকূল প্রদান করে, তাকে আবশ্যক যন্ত্র রূপে স্থাপন করবে।

নিজেরাই বিভিন্ন প্রকার জীবাণুর বিস্তার করবে, আর বিভিন্ন ওষধি সম্মুখে রেখে বাধ্য করবে সেই ওষধি ক্রয় করে জীবিত থাকতে। আর এই ভাবে, তার উপার্জিত ধন সমস্ত ক্ষয় করিয়ে দেবার পর, তাকে বাধ্য করবে যাতে সে সময়সীমা ভুলে গিয়ে, সর্বক্ষণ ধন উপার্জনের জন্য প্রয়াস করে, যাতে সে সমস্ত কিছুতে ভেজাল প্রদান করে আরো অধিক অর্থ আয় করে এবং নিজের বিলাসিতা করার পরেও আহার করার ধন অবশিষ্ট রাখতে পারে।

বাধ্য করে তাকে যাতে সে দুস্থকেও নিজের অট্টালিকায় থাকতে না দেয়, বরং তার থেকে অধিক থেকে অধিক ধন লাভ করা যায় সেই দুস্থের থেকে। বাধ্য করে যাতে রুগীকে এমন চিকিৎসা প্রদান করতে যাতে সে বারবার চিকিৎসা করাতে আসতে পারে, হতে পারে সেই কারণে সেই ব্যক্তি ও তার পরিবার অনাহারের সম্মুখীন হয়ে যাক, কিন্তু তাও তাকে এমন ভাবেই ধন লুণ্ঠন করতে হবে, নাহলে যে বিলাসিতার সামগ্রী ক্রয় করার পর, আর আহার বস্ত্র লাভ করার ধন অবশিষ্টই থাকেনা, কারণ ধনের প্রভাবে যে মানুষ নিত্যপ্রয়োজন পরে মেটায়, প্রথম বিলাসিতার চিন্তা করে।

তাই এমন কিছু ব্যবস্থাকে তারা কিছুতেই সমর্থন করবেনা। এমন দাবি করলে তো মেটাবেনই না, এমন কিছু করতে গেলে, তার বিরোধিতাও করতে পারেন”।

মীনাক্ষী হেসে উত্তরে বললেন, “তাহলে বিচার করো, তোমরা দাবি করে এই ব্যবস্থা আদায় করার কথা বলছিলে। সেই দাবি কে পুড়ন করবে?”

অরিত্রা বললেন, “দাবি পুড়ন করবেনা, সেতো বুঝতে পেলাম। কিন্তু প্রসঙ্গ এই যে, যদি সমান্তরাল ব্যবস্থা রূপেও তা স্থাপন করতে সচেষ্ট হই, তাহলেও তো এর বিরোধিতা করবেই এই ধনের নেশারুরা, তাই না?”

মীনাক্ষী এই কথাতে ঈষৎ হেসে উত্তরে বললেন, “আমরা বড় অশ্বত্থ গাছকে তো চিনি, কিন্তু প্রায়শই ছোটো বা চারা অবস্থায় থাকা অশ্বত্থকে চিনিনা। জানো এই না চেনার ফলে কি হয়?”

ভূমি উত্তরে বলল, “শিকড় অনেক দূর পর্যন্ত চলে যায়। আর তাই একটু বড় অবস্থাতে উপরে ফেললেও, শিকড়ের নাগাল পাওয়া যায়না, আর তাই আবার গজিয়ে ওঠে। আর এই ভাবে একসময়ে বড় হয়ে গেলে, আর কিচ্ছু করা যায়না। সম্পূর্ণ বাড়িটাকেই ফাটিয়ে ফুটিয়ে নষ্ট করে দেয় আর নিজেকে নিজে স্থাপিত করে নেয়”।

মীনাক্ষী হাস্যমুখে বললেন, “এই ছোটো অশ্বত্থ গাছ হও, দেখবে একদিন এতটা বড় হয়ে যাবে যে, তোমাকে আর বিনষ্ট করা সম্ভবই হবেনা। যে তোমাকে বিনষ্ট করতে যাবে, সে স্বয়ং বিনষ্ট হয়ে যাবে। … প্রকৃতির থেকে দেখে শেখো ভূমি। প্রকৃতি কখনো কনো বড় বটগাছ স্থাপন করে কি? না। পাখির বিষ্ঠার মাধ্যমে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বীজ বপন করেন প্রকৃতি।

এতটাই ক্ষুদ্র হয় সেই বীজ, আর এমন ভাবে তা মাটির মধ্যে ধীরে ধীরে প্রবেশ করে যায় যে, তাকে সরিয়ে ফেলা তো দূরে থাক, তাকে সনাক্তও করা যায় না। আর যখন সনাক্ত করতে পারো তাকে, তখন ইতিমধ্যেই সে তরু হয়ে উঠেছে। … তাই ভূমি, কেন বড় অপ্রাকৃতিক ভাবনার মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ রাখছো যে বটগাছ স্থাপন করবে? কেন বীজ স্থাপনের পদ্ধতিতে বিশ্বাস রাখছো না? কেন প্রাকৃতিক উপায়ের উপর ভরসা করছো না?

যখন তুমি একটি বীজ স্থাপন করবে, তখন কাকপক্ষী জানতেও পারেনা সেই বীজের ব্যাপারে। কেউ খেয়ালই করেনা, কেউ নজরই দেয়না। কিন্তু যখন সেই বীজ তরু থেকে বৃক্ষ হয়ে ওঠে, তখন সকলে তাকে দেখতে পায়। সকলে তাকে অনুভব করতে পারে। যারা সেই বৃক্ষের থেকে সুফল লাভ করা শুরু করে দেয়, তারাই তখন সেই বৃক্ষের রক্ষক হয়ে ওঠে, আর যারা সেই বৃক্ষের কারণে নিজেদের সাজানো নেশার জগত ধ্বংস হয়ে যেতে পারে, এমন সন্দেহ করে সেই বৃক্ষকে কাটতে যায়, সেই রক্ষকরাই তখন তাদের প্রতিহত করে এবং বৃক্ষের রক্ষা করে। এই তো প্রকৃতির নিয়ম ভূমি। তাহলে কেন এর থেকে সরে আসার প্রয়াসও করছো?

কেন বড় কিছুকে একবারে স্থাপনের প্রয়াস করছো? ভূমি, এই ধরিত্রী একটি দর্পণচিত্র, এটি কখনো ভুলে যেও না। আজ তুমি যদি কনো বড় কিছুকে স্থাপন করে দাও, তাহলেও এঁর ভূমি মজবুত হয়না। আর তাই তা ক্রমশ নষ্ট হতে শুরু করে। যেই মুহূর্তে তুমি একটি ভালো আখরা নির্মাণ করবে, যা আকারে বড় হলেও, যার ভূমি বা ভিত তেমন মজবুত নয়, তখনই এই নেশারুরা তাকে ক্রমশ দুষ্কৃতির আখরা করে তুলবে, আর শত বৎসরের মধ্যে দেখবে তা আর কনো কাজে লাগছে না, বরং তাকে কেন্দ্র করে ভণ্ডামো হচ্ছে আর তাকে মাধ্যম করে করে অসামাজিক ক্রিয়াকলাপ করা হচ্ছে।

এটি কেবল হয় বা হয়ে থাকে বলে ব্যাপার নয়, এটিই বৈজ্ঞানিক। যেই অট্টালিকাকে দেখবে সরাসরি বড় আকারের করে তোলা হয়েছে, তা একসময় পরে হেলে পরে। অন্যদিকে তাদেরকে দেখো যারা ৫ তোলা অট্টালিকার ভীত স্থাপন করেও দুইতোলা করেন, পরে একটি একটি করে তোলা বৃদ্ধি করেন। তাদের প্রতিটি তোলা নিজের মাথার তোলার ভার সহন করার সামর্থ্য লাভ করার পর, নিজের মাথায় ভার লাভ করেন, আর তাই সর্বক্ষণ তা অটল হয়ে থাকে।

হ্যাঁ, বড় কিছুর নির্মাণ তুমি করলে, তোমার খ্যাতি হবে অনেক। কিন্তু কি চাও? খ্যাতি নাকি প্রকৃত কাজ, প্রকৃত সৃজন? কোনটা? যদি প্রকৃত কাজ চাও, যথাযথ ভাবে মানবজাতিকে অগ্রগতি প্রদান করতে চাও, তাহলে অপ্রাকৃতিক ভাবে বড় বটগাছ স্থাপনের প্রয়াসও করো না, বরং একটি ছোটোবীজ অর্পণ করার প্রয়াস করো। এতে যারা বিরোধ করতেন, তারাও বিরোধ করবেন না, কারণ এতো ছোটো একটি ব্যবস্থাকে তারা গুরুত্বই প্রদান করবেন না।

অর্থাৎ তুমি হাতে সময় পেয়ে যাবে, বিনা প্রতিরোধে তোমার বীজকে পুষ্টি প্রদান করতে, তোমার বীজকে উন্নত তরুতে পরিণত করতে। সেই তরুর ভিত ও শেকড় মজবুত করতে। আর একবার তা করে ফেলতে পারলে, ওই যেমন ঠাকুর রামকৃষ্ণ বলতেন, গাছে হাতি বেঁধে দিলেও, গাছ হেলবে না, তেমন হয়ে যাবে”।

রোজ উত্তরে বললেন, “ঠিক যেমন মাতা সর্বশ্রী করেছেন? কেবলই জয়াবিজয়া আর তন্ত্রসন্তানদের নিয়ে একটি ছোট্ট বীজ করেছিলেন, যার ব্যাপারে কেউ জানতোই না, আর জানলেও খবর রাখতো না। আর সেই বীজ থেকে আজ এখানে এক শত মানুষ বসে রয়েছে, আর মাতা সর্বশ্রীর সাথেও প্রায় ৩০ জন রয়েছেন, অর্থাৎ মাত্র কিছু থেকে আজ ১৩০জনের পরিবার হয়ে উঠে, তা একটি সমাজ হয়ে উঠেছে। একটি ধনশূন্য সমাজ, যেখানে সকলে যথার্থ ভাবে স্বতন্ত্র কারণ কেউই এখানে ধনের কাছে পরাধীন নন। … সকলে স্বতন্ত্র হয়ে কৃতান্ত ধারার হাত ধোরে, কর্তা ভাব ত্যাগ কোরে, প্রকৃতির থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে মোক্ষকামী”।

অরিত্রা প্রশ্ন করলেন, “আচ্ছা দিদি, কতজন সন্তানকে নিয়ে এই যাত্রা শুরু করা যেতে পারে?”

মীনাক্ষী মৃদু হেসে উত্তরে বললেন, “প্রভু এর সর্বাধিক সহজ উত্তরে প্রদান করতেন। তিনি বলতেন, ‘শিশু দুটি জিনিসের জন্য সদা ব্যাকুল থাকে। একটি হলো মায়ের অঙ্গের গন্ধ, আর দ্বিতীয় হলো মায়ের কণ্ঠস্বর’। এই সংখ্যা কতজন হবে, প্রশ্ন করলে তিনি আরো বলতেন যে, ‘ঠিক ততজন, যতজন তোমাকে একত্রে জরিয়ে ধরে তোমার অঙ্গের গন্ধ নিতে পারবে’। …

(সেই কথার খেয়াল আসায় আনন্দের হাস্য হেসে মীনাক্ষী আবার বললেন) তিনি বলতেন, ‘প্রেমের থেকে বড় শিক্ষক কেউ হতে পারেনা। … যেই কথা তুমি ধরে বেঁধে, বকে ঝকে শেখাতে পারবে না, সেই একই কথা অনাবিল ভাবে তুমি শেখাতে পারবে, কেবলই প্রেমের মাধ্যমে। তাই শিক্ষক হবার প্রয়াস করো না, মা হবার প্রয়াস করো। তোমার আশেপাশে উপস্থিত শাবকরা যদি তোমাকে মা মানে, জানবে তোমার অর্ধেক শিক্ষা দান সমাপ্ত হয়ে গেল, কারণ তারা তোমাকে মা মেনেছে, অর্থাৎ তোমাকে তারা অনুকরণ করবে আর তাই তুমি তাদেরকে যা যা প্রদর্শন করে অনুকরণ করতে দেবে, তারা তেই তাই ধারণ করে করে চরিত্রবান হয়ে উঠবে’।

(আবার মৃদু হেসে মীনাক্ষী বললেন) তিনি বলতেন, ‘একবার তারা তোমাকে মা মেনে ফেললে, তারা তোমাকে সর্বক্ষণ বেষ্টন করে থাকবে। কেউ তোমার বাম কোলে বসবে, তো কেউ তোমার ডান কোলে, আবার কেউ তোমার বাম হাতে ঠেস দিয়ে বসবে তো কেউ তোমার ডান হাতে, আর অন্তিমজন তোমার গলা জরিয়ে, নিজের বদনকে তোমার স্কন্ধে রাখবে। অর্থাৎ ৫ জন যদি হয়, তাহলে একসঙ্গে তারা তোমার শরীরের ঘ্রাণ নিতে পারবে একত্রে। তাই শিক্ষার্থীর সংখ্যা সর্বক্ষণ ৫ রেখো। প্রতিজন পিছু ৫জন শাবক’।

তবে তিনি নিশ্চিত করেই বলতেন, ‘মা হতে হবে, শিক্ষক নয়। যখন মা হয়ে উঠবে, তখন তারা তোমার ছায়া হয়ে বেড়ে উঠবে। তোমার অঙ্গরূপ আত্মীয় হয়ে উঠবে, তোমার অত্যন্ত আপনজন হয়ে উঠবে। আর তাই তোমার থেকে তারা সমস্তকিছু গ্রহণ করবে। তোমার জীবনধারা থেকে শুরু করে তোমার প্রদত্ত শিক্ষা, তোমার বচন থেকে শুরু করে কথা বলার ধরন, তোমার হাসি থেকে শুরু করে তোমার হেঁটে চলার ধরন। এই সমস্ত কিছু ধারণ করে নেবে তারা, কারণ তুমি তো তাদের আর পর নও, তুমি তো তাদের শিক্ষক নয়, তুমি তো তাদের আপন, অতি আপন জননী’।

এই ছিল প্রভুর বিধান। তাঁর মধ্যা কথা এই ছিল যে, শিক্ষার্থীর মা হয়ে উঠতে হয়, তবেই তুমি এক যথার্থ শিক্ষক। যতক্ষণ না তোমাকে মা মনে করছে তোমার শিক্ষার্থী, ততক্ষণ সবটাই একটি নাট্যন্যায়, বাস্তব শিক্ষা গ্রহণ সম্ভবই হয়না। যখন তুমি আর তাদের কাছে শিক্ষক নও, তুমি তাঁদের মা। তোমাকে তারা ধামসাতে পারে, ব্যাথা দিতে পারে, আবার স্নেহরূপ যতন করে ঘুম পারাতেও পারে, তখনই তুমি মা হয়ে উঠলে। আর একবার তা হয়ে উঠলে, তোমার এই মা হওয়াই তাদের শিক্ষাকে অর্ধেক সম্পন্ন করে দিলো, কারণ সন্তান নিজের গরজে মায়ের থেকে শিক্ষা নিতে ব্যস্ত থাকে’।

বিজয়া এবার প্রশ্ন করার ভঙ্গিমাতে বললেন, “এর অর্থ এই যে, জ্ঞান ও প্রেমের মধ্যে প্রভু সর্বদা প্রেমকেই প্রাধান্য প্রদান করতেন?”

মীনাক্ষী হেসে উত্তরে বললেন, “হ্যাঁ বিজয়া, প্রভুর কথার মাত্রা ছিল প্রেম। তিনি বলতেন কৃতান্তের মাধ্যমেও তিনি জ্ঞান প্রদান করছেন না, প্রেম প্রদান করছেন তাঁর সমস্ত সন্তানদের। তিনি বলতেন, শুষ্ক জ্ঞান মানে তো মরুভূমি। কিন্তু সেই জ্ঞানের উপরেই যখন নদীর প্রেম স্থাপিত হয়, তখন তা আর বালি থাকেনা, পলিমাটি হয়ে যায়। উর্বর ভূমি হয়ে ওঠে তা। তাই, তিনি সর্বদা বলতেন, নদীরূপ প্রেম আবশ্যক। আলাদা করে জ্ঞানরূপ বালুকা সন্ধানের কনো প্রয়োজন নেই। যখন নদী প্রবাহিত হবে, তখন মাটিতো সে নিজের সঙ্গেই নিয়ে আসবে”।

জয়া মীনাক্ষীর কাছে এগিয়ে গিয়ে বললেন, “অদ্ভুত সুন্দর কথা। নদী নিজের সাথেই মাটি নিয়ে আসে। অর্থাৎ প্রেম নিজের সাথেই জ্ঞান নিয়ে আসে। সত্যই তো কৃতান্ত কথার মধ্যে সমানে জ্ঞানের ভাণ্ডার উপস্থিত, অথচ কৃতান্ত স্বয়ং প্রেমের অনন্ত স্রোত যেন। … সত্যই তো, আমাদের মাতা, মানে মাতা সর্বশ্রীও তো তাই করেছেন। তিনি তো প্রেমই প্রদান করেছেন। সেই প্রেমের কারণে আমরাই জিজ্ঞাসু হয়েছি, আর সেই জিজ্ঞাসার পিপাসাকে তিনি জ্ঞান দ্বারা উদ্বুদ্ধ করেছেন”।

বিজয়া বললেন, “তুমি সঠিকই বলেছ মীনাক্ষী। আমরা না প্রকৃতি কি প্রদান করলেন, কেন তা প্রদান করলেন, কি ভাবে তা প্রদান করলেন, তার বিচারই করিনা। যদি বিচার করতাম, তাহলে আমাদের মাতা কিভাবে আমাদের জ্ঞান প্রদান করেছেন, তা কি আমাদের জানা থাকতো না! … কিন্তু দেখো আমরা তা জানতামও না। আজ তুমি যখন নদীর কথা বলে বললে যে, নদী নিজের সাথে মাটি নিয়ে আসে পাহাড় গুড়িয়ে গুড়িয়ে, তখন অনুভব করলাম যে আমাদের মাতাও তো আমাদেরকে এই ভাবেই শিক্ষিত করেছেন”।

রোজ বললেন, “বেশ দিদি, আমাদের করনীয় কি হবে আমরা বুঝে গেছি। অতি স্বাভাবিক ভাবে, আমরা আমাদের পাঁচ শাবককে নিয়ে, সংসার বসাবো। মা আর তাঁর পাঁচ সন্তান, ঠিক যেমন পাণ্ডবকুল। আর সেখান থেকে আমার পাঁচসন্তানকে আমি সম্পূর্ণ ভাবে স্বতন্ত্র করে তুলবো ধনের থেকে। আর একবার তারা স্বতন্ত্র হয়ে গেলে, তাদেরকে প্রেরণা প্রদান করবো যাতে তারা একাকজন ৫ সন্তানের মা হয়ে ওঠে। এই ভাবে, আমার বংশ ৫ থেকে ২৫ হয়ে উঠবে।

তারপর তারা একাকজন ৫ সন্তানের মা হয়ে উঠলে, ২৫ থেকে ১২৫ সন্তান হয়ে যাবে আমার বংশে। এই ভাবে ৬২৫, ৩১২৫, ১৫৬২৫, ৭৮১২৫… আর যদি এই ভাবে ১০ পিড়ি চালনা করতে পারা যায়, তাহলে একটি দেশ হয়ে যাবে আমাদের বংশ। সত্যই অদ্ভুত ছিলেন প্রভু। জটিল থেকে জটিলতম কথাকে সহজ ভাবে বলে দিতেন। মাত্র ৫ থেকে একটি দেশ। মাত্র একটি বীজ থেকে, একটি বটগাছ।

আসলে এটি জটিল কথা নয়, তাই না দিদি!… অত্যন্ত সহজ কথা এটি। প্রকৃতির কথা। প্রকৃতি সমস্ত কিছুর শুরু করেন বীজ দিয়ে, যা অতি নগণ্য, যার দিকে দৃষ্টিই যায়না। আর সেই থেকে একটি বিশাল বনস্পতি করে তোলেন, একটি বিশাল অরণ্য করে তোলেন। আসল কথা আমরাই মূর্খ। আমরাই মহাত্মাকাঙ্ক্ষা ধারণ করে, সর্বক্ষণ আমিত্ব আর আত্মকে ধরে বসে থাকি।

সেই কারণেই তো অপ্রাকৃতিক উপায়ে চিন্তা করি আমরা। কখনো কেউ দেখেছে, একটি বড় বটগাছকে ধরে এনে কোথাও স্থাপন করা হয়! যদি কেউ করে, তার বিশাল নাম হয়, খ্যাতি হয়। বটগাছ পুঁতেছে, এমন বলা শুরু করে সকলে। কিন্তু পরবর্তী প্রজন্ম এসে কি দেখে? দেখে বটগাছটা মরে গেল, শুকিয়ে গেল। সেটিই তো স্বাভাবিক। বিশাল বটগাছ কতটা মাটির নিচে গিয়ে, কত অধিক জল সংগ্রহ করে তার থেকে খনিজ গ্রহণ করে। একটি বিশাল বটগাছ কি রাতারাতি নিজের শেকড় মাটির অতো গভীরে নিয়ে চলে যাবে!

মূর্খের মত ভাবনা আমাদের! আসলে বড় কিছু করার ফলে আমাদের নাম হবে, আমাদের খ্যাতি হবে, সেই জন্য আমরা বড় কিছুর জন্যই ছুটি। কিন্তু একবার প্রকৃতির দিকে তাকালেই বুঝতে পারা যায় যে, রাতারাতি বড় কিছু করতে যাবার অর্থ হলো, সময়ের আর পরিশ্রমের অপচয় মাত্র। আসলে আমরা যথার্থ কর্মের দিকে মনযোগীই নই, আমরা কেবল আমি কি করলাম, আমি কি পেলাম, আমার কি নাম হলো, আমার কি পরিচয় স্থাপিত হলো, সেই নিয়েই উলমালা।

যদি যথার্থ কর্মের দিকে মনযোগী হতাম, তাহলে প্রকৃতিকে দেখেই বড় হতাম। একাকজন ৫০টি করে শাবক ধারণ করতাম না, কারণ ৫০টি শাবক আমার ছাত্রছাত্রী হতে পারে, আমার সন্তান নয়। আর প্রেম সন্তানকে দেওয়া যায়, ছাত্রছাত্রীদের কেবলই শিক্ষা দেওয়া যায়, প্রেম নয়। …

অর্থাৎ আমার কাজ সত্যি বলতে গেলে, খুব সহজ, আর খুব সরল। ৫টি শাবককে ধারণ করে, তাদের মা হয়ে ওঠো। রক্তের সম্পর্ক নয়, নিশ্বাস হয়ে উঠবে সেই শাবকরা আমার কাছে। নিজের যোনিজ সন্তানের সাথে রক্তের সম্পর্ক হয়। কিন্তু রক্ত কিছু শরীর থেকে চলে গেলেও বেঁচে থাকা যায়। কিন্তু এই শাবকরা আমার নিশ্বাস হবে, যাদেরকে ছাড়া বেঁচে থাকাই অসম্ভব হবে। … এমনই গভীর সম্বন্ধ হবে আমার সাথে এঁদের।

তারপর এঁদেরকে ধনের পরাধীনতা থেকে মুক্ত করে তুলে মানুষ করতে হবে, আর যখন এঁরা মানুষ হয়ে যাবে, এঁদেরকে একটিই কথা বলা, ‘বাবা, আমি যেমন তোমাদের ৫ জনকে বড় করেছি, তোমরাও ৫ জন ৫জন করে শাবকের জননী হয়ে উঠে, তাঁদেরকে নিজেদের শ্বাস রূপে ধারণ করে, একি ভাবে তাদেরকে মানুষ করো, আর স্মরণ রেখো, মানুষ হয়ে যাবার পর, তাদেরকেও এই একি কথা বলে যেও, যাতে তারাও সকলে ৫জন ৫জন করে শাবকের মা হয়ে উঠতে পারে।

(ঈষৎ হেসে) আমরা বৃথাই এতশত ভেবে মরি। এই করতে হবে, সেই করতে হবে, কত সাতপাঁচই না ভাবি আমরা! অর্থহীন সমস্ত ভাবনা। কনো প্রয়োজনই নেই, এই ভাবনা সমূহের। সরাসরি ৫টি শিশুকে বুকে আগলে ধরতে হবে। তাদের সাথে কনো নাট্য নয়, সত্য সত্য তাদের মা হয়ে উঠতে হবে। ব্যাস, তাহলেই হয়ে গেল। মা হয়ে উঠলে, তারা আপনা আপনি তোমার সাথে যুক্ত হয়ে থাকবে, তোমার সাথে একাত্ম হয়ে থাকবে, আর তোমার থেকে সমস্ত শিক্ষা স্বতঃই গ্রহণ করতে থাকবে”।

ভূমিও নিজের মনেই হেসে উঠে বলল, “সত্য বাস্তবেই অত্যন্ত সহজ ও সরল। আসল কথা এই যে, আমরা এতটাই জটিল যে সমস্ত কিছুকে আমরা জটিল করেই দেখি। সহজ ভাবে দেখতেই পারিনা। সহজ ভাবে দেখলে, সমস্ত কিছুই সহজ। … আচ্ছা দিদি, এবার আমাদের অনুমতি দাও। … আমরা আমাদের কাজ এবার শুরু করতে চাই। আর দেরি নয়, আর নতুন কনো জটিলতার সঞ্চার হতে দিতে চাইনা আমাদের অন্তরে। আরো কনো জটিলতার বিস্তার হবার আগেই, যেই নদীর সাখ্যাত করলাম, সেই নদীতে ডুব দিতে চাই।

হ্যাঁ দিদি, একবার নদীতে ডুব দিয়ে দিলে, এই বালি আর বালি থাকবেনা, এও পলি হয়ে যাবে। আর তখন তা স্বতঃই উর্বর হয়ে উঠবে। তাই অনুমতি দাও দিদি এবার আমাদেরকে”।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28