২১.৩। মৃষু পর্ব
মীনাক্ষী বলতে থাকলেন আর সকলে তাঁর কথা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনতে থাকলেন। তিনি বললেন, “আমরা সকলেই প্রকৃতির পাঠশালায় স্থিত তাঁর ছাত্রছাত্রী। তবে যিনি আমাদের শিক্ষিকা সেজে বসে থাকেন, তিনি অন্য কেউ নন, স্বয়ং আমাদের জননী। এটি হলো জীবনের থেকে লব্ধ এক মহামর্মার্থ। আর এর থেকেও বড় মর্মার্থ এই যে, তিনি আমাদের কেবল মা’ই নন, স্বয়ং আমাদের স্বরূপ, অর্থাৎ আমরা সকলেই স্বরূপে তিনি, আর আমরা নিজেদের আত্মবোধকে সম্মুখে পর্দা করে রেখে, আমরা নিজেদের স্বরূপ থেকে বিচ্ছিন্ন, আমরা নিজেদের স্বরূপ থেকে ভ্রমিত, আমরা নিজেদের অসীমতা থেকে ভ্রমিত ও বঞ্চিত, এবং আমাদের এক ও একমাত্র জননীর সম্বন্ধে বিস্মৃত।
এই হলো সমস্ত জীবনের, সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডের, সমস্ত কিছুর মর্মার্থ, যা জেনে ফেলার পর একমাত্র যা পরে থাকে, তা হলো মুক্তি আর প্রাপ্তি। কিসের থেকে মুক্তি? কি প্রাপ্তি? নিজের আত্মবোধ থেকে মুক্তি, পরমাত্মের চোখরাঙ্গানির থেকে মুক্তি। আর প্রাপ্তি! নিজের মা’কে ফিরে পাওয়াই হলো প্রাপ্তি; সাকারভাব ত্যাগ করে নিরাকরত্ব ফিরে পাওয়াই হলো প্রাপ্তি; অনিত্য ত্যাগ করে নিত্য লাভ করাই প্রাপ্তি; নিজের সসীম ভ্রম অস্তিত্ব থেকে মুক্ত হয়ে অসীমতা লাভ করাই হলো প্রাপ্তি।
আর এই মুক্তি আর প্রাপ্তির বোধ যার কাছে পূর্ণভাবে বিরাজ করে, তিনি হলেন মৃষু, অর্থাৎ তিনি প্রকৃতির পাঠশালায় থেকে সম্যক পাঠ গ্রহণ করে নিয়েছেন। এটিই আমাদের জীবনের লক্ষ্য, গন্তব্য, উদ্দেশ্য এবং ধর্ম। আর তা আমাদের দৃষ্টির গোচর করে তোলার জন্যই প্রভু পূর্ণ অবতার বেশে এসেছিলেন। সামান্য এক শিশু থেকে তিনি ক্রমশ মৃষু হয়ে ওঠেন। স্বয়ং প্রকৃতি হয়ে, তিনি নিজেও প্রকৃতির পাঠশালায় ছাত্র হয়ে অবস্থান করেন।
স্বয়ং ব্রহ্ম, এই সত্যের বোধ থাকার পরেও, এই সত্যকে প্রত্যক্ষ করার পরেও, এই সত্যকে অনুভব করার পরেও তিনি ব্রহ্মময়ীকে নিজের মাতাজ্ঞানে তাঁর জন্য নিজের প্রতিটি শ্বাস লিখে দিয়েছিলেন। স্বয়ং নিয়িতি তিনি, তাঁর প্রতিটি উচ্চারিত শব্দ নিয়তির ব্যক্ত কথা। তা সত্ত্বেও তিনি নিজেকে অকর্তা জ্ঞান করে আমাদের সম্মুখে নিদর্শন রূপে রেখেছেন যে কেমন ভাবে মৃষু হতে হয়।
নিজের সম্পূর্ণ বোধ থাকা সত্ত্বেও যে, তিনি হলেন শূন্য, তিনি হলেন ব্রহ্ম, তিনি হলেন নিত্য ও সত্য, তিনি হলেন একমাত্র অস্তিত্ব, তিনি হলেন অসীম, অনন্ত, অব্যাক্ত ও অচিন্ত্য, তিনি নিজেকে সসীমের খোলে রাখলেন, কারণ আমরা সকলে, এই ব্রহ্মময়ীর সকল সন্তান, এই সমস্ত অসীম যারা আত্মকে ধারণ করে সসীম হয়ে অবস্থান করছি, তাদেরকে তিনি দেখাতে চাইলেন যে, কিভাবে সসীম থেকে অসীম হয়ে উঠতে হয়।
প্রকৃতির থেকে কি ভাবে শিক্ষা গ্রহণ করতে হয়, বিদ্যার থেকে কি ভাবে জ্ঞান অর্জন করতে হয়, আত্মের বোধ কি ভাবে ত্যাগ করতে হয়, সত্যে কি ভাবে প্রেম ধারণ করে করে লীন হতে হয়, সম্যক ভাবে নিজের সমস্ত ভ্রম কি ভাবে ত্যাগ করে মৃষু হতে হয়। এই তাঁর লীলা, এটিই ছিল তাঁর এইবারের অবতার লীলা। হ্যাঁ বিশেষ অবতার ছিল তাঁর এটি। মহাবতার ছিলেন তিনি। কেন? না না, এই কারণে নয় যে তিনি পূর্ণ ৯৬ কলা অবতার ছিলেন, বরং তিনি মহাবতার লীলা করবেন বলেই, এই পূর্ণ ৯৬ কলার অবতার রূপ ধারণ করেছিলেন।
কি সেই বিশেষত্ব? পূর্বেও বহু রূপে অবতরণ করেছেন ব্রহ্মময়ী মা। কখনো তিনি ২৮টি বুদ্ধ হয়েছেন, তো কখনো ২৭টি তীর্থঙ্কর, আবার কখনো তিনি ২৫টি নবী হয়েছেন। কখনো তিনি মার্কণ্ড হয়ে এসেছেন, তো কখনো বাল্মীকি, ব্যাস হয়েছেন, তো কখনো তিনি শঙ্কর, চৈতন্য, বা রামকৃষ্ণ হয়েছেন। প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি সত্যের বিবরণ প্রদান করার প্রয়াস করেছেন, কিন্তু এইটি ছিল প্রভুর মহালীলা কারণ তিনি কেবল সত্যের শ্রেষ্ঠ সম্ভব ব্যখ্যা প্রদান করেন নি, বরং স্বয়ং সেই যাত্রা করে দেখিয়ে দিয়েছেন যে কি ভাবে সত্যে যাত্রা করতে হয়। তাই এইটি ছিল তাঁর মহালীলা, বা বলা যেতে পারে এতাবৎ কাল পর্যন্ত সমস্ত অবতারলীলার মধ্যে শ্রেষ্ঠ লীলা। তিনি শুধু গুরু নন, সমস্ত মানবযোনির জন্য, সমস্ত ৮৪ লক্ষ যোনির জন্য শ্রেষ্ঠ গুরু, মহাগুরু তিনি।
কেন তিনি এই বিশেষ রূপ ধারণ করলেন? না, এবার তিনি মানুষের আবাহনে অবতার দেহ ধারণ করেনই নি। এবার তিনি ৮৪ লক্ষ যোনির নিবেদনে অবতারদেহ ধারণ করেছিলেন। আর তাই মনুষ্যের কাছে না তো ধারণা ছিল আর না খবর ছিল তাঁর আগমন বা আবির্ভাবের, আর না তিনি খবর পৌঁছে দিতে উৎসাহী বা আগ্রহী ছিলেন যে তিনি এসেছেন বা এসেছিলেন। কেন এসেছিলেন তিনি ৮৪ লক্ষ যোনির দূত হয়ে? কারণ তাঁরা তাঁদের মাতা, জগন্মাতা, ব্রহ্মময়ী মাতা জগদ্ধাত্রীর কাছে আবেদন করেছিলেন, আর্জি জানিয়েছিলেন যে, এই মনুষ্য যোনির জন্য তাঁদের অস্তিত্ব সংকটাপন্ন হয়ে গেছে, তাঁদের যাত্রা করা অসম্ভব হয়ে যাচ্ছে।
তাই মাতা স্বয়ং এলেন, একটি মানব শরীরে যতখানি ধরেন তিনি, সেই পূর্ণ ৯৬ কলারূপ ধারণ করে এলেন আর মানবযোনিকে তিনটি কথা বললেন। প্রথম কথা এই যে, মনুষ্য যদি ভেবে থাকে যে একমাত্র সে’ই তাঁর সন্তান, তাহলে সেই ভ্রম থেকে যেন শীঘ্র, অতিশীঘ্র মুক্ত হয়, কারণ তিনি কেবল মনুষ্যের নয়, সমস্ত যোনির জননী। একমাত্র মা তিনি, একমাত্র পিতা তিনি। তিনি ব্যতীত না তো কনো দ্বিতীয় মা আছে আর না পিতা।
এই প্রথম কথা বলে দ্বিতীয় কথা বললেন যে, মনুষ্য যোনির উদ্ভব হয়েছে সমস্ত ৮৪ লক্ষ যোনির যাত্রা অতিক্রম করার পর, আর তাই মনুষ্যযোনি নিজের জননীর সাথে একাত্ম হবার সেই লক্ষে, যেই লক্ষে সমস্ত যোনি ধাবমান, সেই লক্ষের সর্বাধিক নিকটে স্থিত, আর তাই মনুষ্য যোনির কর্তব্য হলো সর্বক্ষণ সত্যমুখি হয়ে থাকা। কামনামুখি হয়ে উঠে, ভ্রমমুখি হয়ে উঠে, দেহসর্বস্ব হয়ে থাকা, এই ভ্রমজগত সর্বস্ব হয়ে থাকা, এই স্থূলজগতকেই সত্য মানা, মনুষ্য যোনিকে শোভা পায়না।
তাই যদি মনুষ্য এই ভ্রমজগতকেই সত্য মানে; এই কল্প স্থূলজগতই মনুষ্যের কাছে সত্য হয়; আত্ম বা পরমাত্ম বোধই মনুষ্যের কাছে সত্য পতিত হয়; দেহসর্বস্ব, কামনাসর্বস্ব হয়ে থাকাকেই যদি মনুষ্য নিজের অস্তিত্বের সত্য মেনে থাকে, তাহলে মনুষ্য যোনির কনো আবশ্যকতাই নেই, কারণ এই একই ভাবনা অন্য ৮৪ লক্ষ যোনি ধারণ করে, মনুষ্যের থেকে অধিক সমর্থ এই স্থূলজগতকে সজ্জিত রাখার জন্য, এবং তাঁরা মনুষ্য অপেক্ষা অনেক অনেক গুণ অধিক তৎপর সেই কর্মে, এবং যোগ্যও।
তাই এই প্রথম ও দ্বিতীয় কথাকে মধ্যে রেখে, তিনি অন্তিম ও তৃতীয় কথা বলেন মনুষ্যযোনিকে, হ্যাঁ সমগ্র মনুষ্যযোনিকে। আর সেটি যতটা না কথা, তার থেকে অধিক সতর্কবার্তা। তিনি বলেন, ‘দেহ সর্বস্ব হয়ে থাকার জন্য, আত্মসর্বস্ব হয়ে থাকার জন্য, কামনাসর্বস্ব হয়ে থাকার জন্য, মনুষ্যযোনিকে অস্তিত্বে আসতে দেওয়া হয়নি। এই সমস্তই যদি হয়ে থাকতে হয়, তাহলে মনুষ্যযোনির কনো প্রয়োজন নেই অস্তিত্বে থাকার, কারণ বাকি ৮৪ লক্ষ যোনি এই একই ভাবনা রেখে, মনুষ্যের থেকে অনেক শ্রেয় ভাবে এই ভ্রমজগতের রক্ষক, আর মনুষ্য এই ভাবনা রেখেও এই ভ্রমজগতের ভক্ষক।
মনুষ্যযোনি প্রকৃতির থেকে শিক্ষালাভ পূর্ণ করে, সত্যে স্থিত হবার উদ্দেশ্যে অস্তিত্বে এসেছিল। সেই কর্ম যদি মনুষ্য করতে সক্রিয় হয়, তাহলেই মনুষ্য যোনিকে প্রকৃতির কোলে স্থাপিত রাখবো, নয়তো এই যোনির সমূল বিনাশ প্রকৃতি স্বয়ং করবেন’। তিনি অন্তে বললেন, ‘আমি স্বয়ং নিয়তি আজ এই ঘোষণা করছি যে, আমি তোমাদেরকে এই বার্তাই দেব বলে, আর বার্তা দেবার শেষে কি রূপে এই যাত্রা করতে হয় তার নিদর্শন প্রদান করার জন্য দেহ ধারণ করে অবতার হয়ে এসেছিলাম। তাই আজ স্বয়ং এই নিয়তি তোমাদেরকে সতর্ক করে দিচ্ছে, আর কিছু শতকই তোমাদের এই বেয়াদপি সহ্য করবো। যেই মার্গ দেখিয়ে গেছি, সেই পথে চলে যদি মনুষ্যযোনির অস্তিত্বের কারণ চরিতার্থ করতে পারো তো ভালো, আর যদি সেই পথে না চলো, তাহলে আমি স্বয়ং তোমাদের বিনাশের ঘড়ি নিশ্চয় করে গেলাম’।
তিনি আরো বলেন, ‘হ্যাঁ আমি বাকিদের যেমন মা, তোমাদেরও মা। আর মা বলেই এই সময় প্রদান করলাম, এক্ষণে তোমাদের বিনাশ না করে। এক মা তাঁর সমস্ত সন্তানকে চান। কিন্তু সেই পথে যদি দেখেন যে তাঁর কনো এক সন্তান বাকি সন্তানদের বিনষ্ট করে দিতে উদ্যত, তাহলে মা সেই এক সন্তানের বিনাশ করতে একটি বারের জন্যও পিছুপা হননা। তাই এমন ভাবার কনো কারণ নেই যে, তোমরা আমার সন্তান বলে পার পেয়ে যাবে। আর নয়, অনেক হয়ে গেছে। অনেক রূপে এসে, অনেকবার বুঝিয়েছি যে তোমরা যা করছো, তা তোমাদের উদ্দেশ্য নয়, আমিত্ব ত্যাগ করে সত্যে এসো, এটিই তোমাদের গন্তব্য।
একটিবারের কথাও শ্রবণ করোনি তোমরা, গ্রাহ্যও করো নি। যদি আমার দেখানো মার্গে চলো, তাহলে এই কৃতান্ত মার্গেই আমি আবার দেহধারণ করে আসবো। আর না হলে, এই দেহ ত্যাগ করার পর আর কনো দেহীরূপে আসবো না। প্রকৃতি ও নিয়তি রূপ ধারণ করে সম্পূর্ণ মনুষ্য যোনির নাম ও চিহ্ন থেকে এই ধরিত্রীকে চিরতরে মুক্ত করে দেব। স্মরণ রেখো কথাটা’।
এই ছিল প্রভুর সম্পূর্ণ অবতার রূপের মর্মার্থ, কিন্তু যখন প্রভু এই সমস্ত কথা বলেন, তার পূর্বে বহু মর্মার্থ তাঁকে নিঃসৃত করতে হয়। আর তাদের মধ্যে প্রকৃতি প্রদত্ত যেই তৃতীয় আকরিক ছিল, তা ছিল সমাজ ও সমাজনীতি, যার মধ্যে সমাজ চালনা, রাজনীতি সমস্ত কিছুই উপস্থিত হয়। প্রভু এই সমস্ত কিছুর জ্ঞান বিদ্যার থেকে অর্জন করলেও, তিনি প্রত্যক্ষ করতে চেয়েছিলেন এই সমস্ত কিছু। আর সেই কারণে জ্ঞান অর্জন করার পরে, তিনি দীনহীনদের উপর ধনের নেশারুরা সেবা করার নাম করে কি কি ভাবে শোষণ করেন, তা দেখতে মাঠে ও মঠে যান, এবং দীনহীনদের সাথে দিবসযাপন করেন।
আর সাথে সাথে, রাজনীতির ধ্বজাধারি দলগুলির সাথেও তিনি যুক্ত হয়ে যান, এবং তারা অভ্যন্তরে কি ভাবে জল্পনা, কল্পনা করে করে মনুষ্যযোনিকে উদ্ধারের পথে ও বিনাশের পথে কি কি ভাবে নিয়ে যাচ্ছে, তাও প্রত্যক্ষ করে আসেন। … (হেসে) প্রভুর এটিই ছিল বিশেষত্ব। তিনি এক দণ্ডও পা মুড়ে বসতেন না। বিদ্যার থেকে জ্ঞান অর্জন করতেন, কিন্তু তারপরেও তিনি বাস্তবে সমস্ত কিছু প্রত্যক্ষ করতে চাইতেন।
যেমন করে, কর্পোরেট-এর দাপাদাপি, ধনের নেশারুদের উপদ্রবকে প্রত্যক্ষ করার জন্য তাদের ডেরায় প্রবেশ করে সমস্ত কিছু চাক্ষুষ করে এসেছিলেন, তেমন করেই রাজনৈতিকদলগুলির অভ্যন্তরের কার্যালয়ে সদস্যপদ নিয়ে প্রত্যক্ষ করে এসেছেন বর্তমান রাজনীতিকে। আবার মাঠ ও মঠে তিনি নিজে গমন করে নিবাস করে করে চাক্ষুষ করে আসেন যে বর্তমানে মনুষ্যযোনিকে উন্নতি করার ভূমিকাতে যারা যারা স্থিত বলে দাবি করছেন, তারা ঠিক কি করছেন।
তিনি কি বলতেন জানো? তিনি বলতেন, ‘বিদ্যার থেকে যেই জ্ঞান পেলাম, তাতে রাজনীতির, সমাজনীতির ভিত আর ভিত্তির সন্ধান পেলাম, ইতিহাস জানলাম; কিন্তু বাস্তবে, বর্তমানে কি চলছে তা যদি না দেখি, তাহলে মনুষ্য যোনির বাস্তবিক অবস্থান, তাৎক্ষনিক অবস্থান, বর্তমান অবস্থান কি করে জানবো। আর তা না জানলে, মর্মার্থ নিষ্কাসন যে বেঠিক হয়ে যাবে। এমন তো হতেও পারে যে, যেমন করে ইতিহাসকে বিকৃত করে গ্রন্থে লিখিত হয়, ছদ্মবেশে লিখিত হয়, যেমন ধরো মার্কণ্ডের তন্ত্রস্থাপনার প্রক্রিয়া, তেমন করেই এই সমস্ত গ্রন্থে লিখিত রাখা হয়েছে। তাই বর্তমান সমস্ত ব্যবস্থার অভ্যন্তরে খানিকক্ষণ থেকে, তাকে প্রত্যক্ষ করে, তাকে অনুভব করেই মর্মার্থ নিষ্কাসন সঠিক হবে, তবেই মর্মার্থ যথার্থ হবে’।
তিনি আরো বলতেন এই বিষয়ে, ‘ব্রহ্মময়ীর দূত হয়ে এসেছি। আমার প্রত্যক্ষ করা সমস্ত কিছুর ভিত্তিতে মনুষ্যযোনির উদ্দেশ্যে বিধান হবে পরানিয়তির। তাই আমার নিঃসৃত মর্মার্থ যদি পক্ষপাতিত্ব করে, যদি ভ্রান্তিপূর্ণ তথ্য প্রদান করে, তাহলে পরানিয়তির নেওয়া সংকল্প ও দেওয়া বিধানও ভ্রমিত হয়ে যাবে, ভ্রান্ত হয়ে যাবে, কলুষিত হয়ে যাবে। তিনি আমার মা, আমার প্রেয়সী, আমার আরাধ্যা, আমার সর্বস্ব কিছু। তাঁর নামে কলঙ্ক আমি লাগতে দিতে পারিনা। তাই আমাকে প্রতিটি ক্ষেত্রে স্থিত হতে হবে, স্থিত হয়ে অনুভব করতে হবে সমস্ত কিছুর বর্তমান অবস্থা ও অবস্থান, তবেই আমি মর্মার্থের বিবরণ প্রদান করতে সক্ষম’।
এই ছিল, তাঁর সমস্ত মর্মার্থ নিষ্কাসন করার পরের বার্তা সকলের কাছে। বুঝতে পারছো, কি পরিমাণ পরিশ্রম তিনি করেছেন প্রতিটি মর্মার্থ স্থাপন করার পূর্বে! বুঝতে পারছো, কি অক্লান্ত পরিশ্রম তিনি করেছেন তাঁর অবতার জীবনে!”
বিজয়া হেসে বললেন, “প্রেমই সততার উৎসেচক, তাই না মীনাক্ষী! … অপার প্রেম করতেন জননীকে তিনি। তাই সর্বভাবে সৎ ছিলেন তিনি, সার্বিক ভাবে নিরপেক্ষ ছিলেন তিনি। … সত্যই বলেছেন তিনি। তাঁর দেওয়া আদেশ কেবল নয়, প্রকৃত শিক্ষা তো তাঁর জীবন স্বয়ং। … আগে বলো মীনাক্ষী, সমস্ত কিছু প্রত্যক্ষ করে তিনি সমাজ ও সমাজনীতি, রাজা ও রাজনীতি সম্বন্ধে কি মর্মার্থ প্রদান করেন?”
মীনাক্ষী হেসে উত্তরে বললেন, “এই মর্মার্থ নিষ্কাসনের যাত্রা বড়ই সুদীর্ঘ ছিল, আর তা সুদীর্ঘ হবার অন্তরালে প্রভুর পক্ষ থেকে কারণ ছিল অত্যন্ত নিদারুণ। শিশুকাল থেকেই প্রভু মাতার প্রতি প্রবল ভাবে আকৃষ্ট, আর সেই আকর্ষণ সাধারণের ঈশ্বরের প্রতি আকর্ষণের ন্যায় নয়, বরং এক শাবকের তাঁর জননীর প্রতি আকর্ষণের ন্যায় ছিল।
সেই আকর্ষণের থেকেই তিনি এই উপলব্ধি করেন শিশুকালেই যে, সকলেই তাঁর মায়ের কাছে গমন করে নিজেদের ইচ্ছা, কামনা ও অভিব্যক্তি ব্যক্ত করে চলেছেন। পূজারি-আদিদের তিনি তাই প্রশ্ন করেন যে, মা তাঁর ইচ্ছা, তাঁর কামনা আর তাঁর অভিব্যক্তি কার কাছে আর কিভাবে ব্যক্ত করেন। অধিকতর পুরোহিত শিশু প্রভুর এই প্রশ্নের কারণে প্রভুর থেকে দূরত্ব স্থাপন করে রাখলেও, এক সুহৃদ পূজারির প্রভুর এই কথার মধ্যে এক সরল শিশুর মায়ের প্রতি আকর্ষণ দেখে প্রভুর প্রশ্নের উত্তর প্রদান করতে আকর্ষণ অনুভব করেন।
তাই তিনি প্রভুকে বলেন যে, ‘মা নিজের কথা কখনোই বলেন না, মায়ের তো তেমনই স্বভাব হয় বাছা, তাই না! … যেই সন্তান মায়ের কাছে নিবদ্ধ হয়ে থাকে, মা-সর্বস্ব হয়ে থাকে, নিজের ইচ্ছার কদর করেনা, তাকেই মা নিজের ইচ্ছার কথা বলেন, নিজের কথা বলেন’।
এই উত্তর শিশু প্রভুর হৃদয়ে এক প্রবল আঘাত এনেছিল। … অন্তরে ঘাতক আঘাত লাভ করেন সেই পূজারির কথা থেকে। আর সেই আঘাত প্রভুকে এমন বেদনাদায়ক ভাবনা দেয় যে, ‘যিনি সকলের মা, সকলকে জীবিত রাখছেন, সকলের দেখভাল করে চলেছেন নিরন্তর, তাঁর কথা বলার স্থানই নেই, এ কেমন নির্মমতা তাঁর প্রতি। … না এর প্রতিকার করতে হবে’। আর তাই সেই শিশুকাল থেকেই তিনি সংকল্প নিয়ে নেন যে, সমস্ত জীবনে তাঁর নিজের ইচ্ছা বলে কিছু থাকবেনা। তিনি সংকল্প নিয়ে নেন যে, তিনি সম্পূর্ণ জীবন মায়ের জন্যই বাঁচবেন। নিজের জন্য একটিবার শ্বাসও গ্রহণ করবেন না।
তারুণ্যের অস্তাচলে, যৌবনের প্রারম্ভে, প্রভুর কাছে সেই সংকল্প জ্বলজ্বল করতে শুরু করলো। প্রভুর মধ্যে সমানেই মাতার কথা জানার, মাতার কথা শোনার ব্যকুলতা বিরাজ করতো। আর যৌবনের শুরুতে, যখন যুক্তি ও উপলব্ধি অভিজ্ঞতার পুটুলিকে অনেকটাই ভরিয়ে দিয়েছে, সেই সাহাহ্নে শুরু হয় প্রভুর ঐকান্তিক আবেদন মাতার কাছে, তাঁর কথা শ্রবণ করানোর জন্য।
রাত্রে শয্যায় শুয়ে নিরন্তর নিদ্রাহীন রজনী জ্ঞাপন করতেন আর উপাধানকে নেত্রের জলে সিক্ত করতেন, আর সমস্ত রাত্রি মাতার কাছে আবদার করে বলতেন, ‘মা, দেখো চেয়ে, আমার কনো নিজের ইচ্ছা নেই। আমার কনো কামনা নেই। কিচ্ছু চাইনা আমার। বেঁচে থাকার জন্য যা যা দরকার, সমস্ত কিছু তুমি দিয়েছ, আর কিচ্ছু বলতে কিচ্ছুর প্রয়োজন নেই। এবার কৃপা করে তোমার কথা বলো। তোমার কথা আমি যে শুনতে পাচ্ছিনা। কি করে শুনতে পাবো বলো মা!”
আমাদের মা হলেন পরাচেতনা। তাঁকে প্রত্যক্ষ হতে হয়না কিছু বলার জন্য। হৃদয়ের অভ্যন্তরে চেতনারূপেই তিনি সমস্ত কথা অঙ্কিত করে দিতে পারেন। প্রভুর অন্তরেও তাই করলেন তিনি। বললেন, ‘আমার নামে যেই অন্য সংকল্প নেওয়া ব্যক্তিরা আছে, তাদের থেকে আমার কথা শ্রবণ করে নিতে হবে’।
সেই কথার অর্থ উপলব্ধি করাতে একটু দিশাহারা হলেও, মার্গদর্শন লাভ করলেন প্রভু। কিছুদিবস সময় গেল সেই কথার অর্থ অনুধাবন করতে; অতঃপরে প্রভু হিমালয়ের পাহাড়ের গুহায় গুহায় সাধুর সন্ধান করা শুরু করলেন, কারণ তিনি বিচার করে এই পান যে, সাধুই তিনি যিনি সম্ভবত মায়ের কাছে নিজেদের অর্পণ করেছেন।
দীর্ঘ একটি বছর এমন যাত্রা করে করে, প্রায় ১১টি সাধুর সম্মুখে উপস্থিত হন প্রভু। তবে সাধু সঙ্গ লাভ করে প্রভু বেশ উপলব্ধি করেন যে, মায়ের কাছে সাধুরা নিজেদের সর্বস্বকিছু অর্পণ তো করেন নি, কারণ এই সকল সাধু নিজেদের আত্মকে নিয়েই উলমালা। তবে তার সাথে এও অনুভব হয় প্রভুর যে, বাকি সমস্ত মানুষের থেকে অনেক অধিক ভাবে যুক্ত এই সাধুরা মাতার সাথে। …
কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এও অনুভব করেন, এবং প্রথম দিকে সাধুদের কিছু বলার সাহস না করতে পারলেও, পরের দিকে বেশ কিছুবার বেশ কিছু সাধুকে বলেনও যে, ‘এত আত্ম আত্ম করলে, আত্মের অতীতে যিনি আছেন, তার কাছে যাবে কি করে! … আত্ম পরমাত্ম ভুলে তাঁর কাছে যাও। মা সে তোমার, সন্তান তিনি তোমাকে মানেনও, তাই সব সময়ে তোমার যত্ন করছেন। নিজেকে তাঁর সন্তান রূপে পরিচয় তো দাও। তাঁর যত্ন করার প্রয়াস করো, নাহলে আর এই সাধনার কিই বা কারণ!’
যাই হোক, এই কথা প্রভুর তরফ থেকে, প্রভুর চেতনার বমন ছিল, কারণ তাঁর চেতনা সাধুর থেকে অনেক অনেক অধিক সমর্পণ, অনেক অধিক আত্মত্যাগ আশা করেছিলেন। তাই তিনি এই সাধুদের ক্রিয়া কলাপ প্রত্যক্ষ করার পর, সর্বক্ষণ তাঁদের মুখ থেকে আত্ম, আত্ম শুনে শুনে বিরক্ত হয়ে বলেছিলেন, ‘তোমরা আত্ম পরমাত্ম নিয়েই বসে থাকো, ব্রহ্ম তোমাদের গাঁয়ে থুতুও ফেলবে না’।
এই ১১জন সাধুর মধ্যে একজন সাধুই প্রভুর কাছে প্রভুর কথার অর্থ জানতে চেয়েছিলেন। তাই সেই একজনকেই বিস্তারে প্রভু এই বলেছিলেন যে, ‘সংসার ত্যাগ করা কনো সাধনা নয়। সংসার কি? সংসার হলো তোমাদের আত্মের একটি গুহা। যা তোমাদের আরাধ্যা, অর্থাৎ পরমসত্য পরব্রহ্মের থেকে তোমাদেরকে সরিয়ে রেখেছে, সেটা সেই গুহা নয়, সেটা তোমাদের আত্মবোধ, আমি’র বোধ। … সেখানে থাকতে, আমাকে দিচ্ছেনা, আমাকে দেখছে না, আমাকে বুঝছে না, এসব করতে আর এখানে এসে আমি করছি, আমি বলছি, আমি ঠেলছি করছো। আমি তো ওখানেও ছিল, আর এখানেও। সাধনা কি হলো তাহলে!’
চমকিত হয়েছিলেন সেই সাধক আর প্রশ্ন করেছিলেন প্রভুকে, ‘কে তুমি!’
প্রভু তখন স্বয়ংও জানতেন না যে তিনি কে। তাই উত্তরে বলেছিলেন, ‘তোমাদের মত এতো বড় সাধু টাধু তো কনো ভাবেই নই আমি। আর আমি কনো ভক্তটক্তও নই। ভক্ত অনেক রীতিরেওয়াজ, তিলককাঞ্চন, মালাজপ ধারণ করে, অসব যে কিছুই করিনে আমি। … অতোশত বোধ নেই আমার, অজ্ঞানই মনে হয় নিজেকে। শুধু এটুক বোধ আছে যে, আমি এই দেহে এসে আমার একমাত্র সম্বল, আমার মা’কে হারিয়ে ফেলেছি। (ডুকরে কেঁদে উঠে বলেছিলেন) মায়ের কাছে যাবো! … তোমাদের কাছে এসেছিলাম, যদি তোমরা মায়ের কাছে কি করে যাবো বলে দাও। … মা ছাড়া আর বাঁচতেও ভালো লাগছে না। মায়ের কাছে যাবো!’
(চোখের জল মীনাক্ষী মুছে বললেন) ঈশ্বর আমার ত্রুটি মার্জনা করুন, কিন্তু আমার আজকে সত্যই বলতে ইচ্ছা হচ্ছে যে, সাধুর বস্ত্র পরলেই সাধু হওয়া যায়না, সংসার ত্যাগ করে পাহাড়ের গুহায় থাকলেই সাধু হওয়া যায় না, অঙ্গে ছাইভস্ম লেপে, সিঁদুরতিলক মেখে গেঁজা টানলেই সাধু হওয়া যায়না। যদি তা যেত, তাহলে তোদের সাধনার ফল দিতে স্বয়ং পরব্রহ্ম তোদের গুহায় উপস্থিত হয়েছিলেন। কিন্তু তোদের সাধনা কেমন তা তোরাই বিচার কর, তাঁকে তোরা চিনতেও পারলিনা”।
মীনাক্ষী বারবার চোখের জল মুছতে থাকলে, বিজয়ার অন্তরচিত্ত বলতে থাকে, ‘এই নেত্রের জল স্পষ্ট বলে দেয় যে, প্রভুকে কতটা প্রত্যক্ষ করেছে মীনাক্ষী, আর কতটা স্নেহ করে সে প্রভুকে’। অতঃপরের মীনাক্ষীর কথা বিজয়ার অন্তরচিত্তের সেই কথাকেই পুষ্টি প্রদান করলো। মীনাক্ষী পুনরায় বললেন, “ভালই হয়েছে চিনতে পারে নি। চিনলেই তো এই দাও, সেই দাও করে বেড়াতো। একবারও চিন্তা আসে না যে তুমি কি চাও, খালি আমার কি চাই, এই চিন্তা”।
পুনরায় বললেন মীনাক্ষী, “যাই হোক, প্রভু এই সাধুদের কথা থেকে, একটি স্পষ্ট কথা অনুভব করতে পারেন যে, না চাইতেও প্রতিটি জীব মায়ের অনুচর। আর যার যত স্বল্প কামনা, তার অনুভূতিতে মায়ের ভাব তত অধিক বিরাজ করে। … এই নিয়ে আরো বিচার করে প্রভু একদিন সম্পূর্ণ ভাবেই এই অনুভব করেন যে, ‘মা তিনি। সন্তানের হিতই তো মায়ের একমাত্র কামনা হয়। সন্তানের বন্ধনই মায়ের কাছে একমাত্র বেদনার কারণ হয়। … তাই আমাকে অধিক থেকে অধিক মায়ের সন্তানদের কাছে যেতে হবে। তাঁদের বন্ধনের কথা জানতে হবে, তবেই মায়ের বেদনার কথা জানতে সক্ষম হবো আমি’।
এই উপলব্ধি করার পর, প্রভু তাই দীনহীনদের কাছে যেমন যাত্রা করে করে, তাদের সাথে নিবাস করে করে, তাদের বন্ধনের কথা জানার প্রয়াস করেন, তেমনই বনেজঙ্গলে যাত্রা করে করে, অন্যযোনিদের সংস্পর্শে গিয়ে, তাঁদের বন্ধনের কথা জানার প্রয়াস করেন।
বনে যাত্রা করে সেই কাজ করা অনেক সহজ ছিল। লোকে মানলো বা জানলো যে, তিনি ভ্রমণ করতে এসেছেন, কিন্তু বাস্তবে তিনি মায়ের সন্তানদের বন্ধনের কারণ জানতে এসেছেন। তবে দীনহীনদের কাছে এই ভাবে যখন গেলেন প্রভু, তখন না তো দীনহীনরা ভালো চোখে দেখলেন, আর না তাঁদেরকে ঘিরে যেই পেশাদাররা থাকেন তারা ভালো চোখে দেখলেন।
একটি দীনহীন তো প্রভুর মনসা জেনে একদিন প্রভুকে সরাসরি বলেই দিলেন, ‘আমরা কি চিরিয়াখানার জন্তু যে আমাদের দেখতে আসো তুমি!’ আর অন্যদিকে এঁদেরকে ঘিরে যেই পেশাদাররা থাকে, তারা তো প্রভুকে ‘সন্ত্রাসবাদীর চর’ও বলে প্রহরণ করতে এগিয়ে এলেন একদিন। …
প্রভু বার বার বলতেন, না চাইতেও সকলেই মায়ের চর। তাই যখন মায়ের সন্তান বিপদে পরে, তখন কারুকে না কারুকে মা চেতনা দিয়েই দেন আর নিজের সন্তানকে বাঁচিয়ে নেন। সেই ভিড়েও একজন এগিয়ে এলেন, আর প্রভুকে যেই পেশাদাররা দীনহীনদের সেবাদানের জন্য রত থাকতেন, সেই পেশার মধ্যে নিযুক্ত করলেন।
প্রভুর মনে প্রশ্ন জাগলো, ‘কেন প্রয়োজন এই মানুষগুলোর সেবা!… এঁরা কি অসুস্থ! এঁরা কি বিপর্যস্ত! … কই না তো? এঁরা তো দিব্যি হেঁটেচলে বেড়াচ্ছেন, খাচ্ছেন দাচ্ছেন, খাদ্য হজমও করছেন, সমস্ত কিছু সঠিক সঠিক ভাবেই করছেন এঁরা। তাহলে এঁদের সেবাদান কেন?’
সময় লাগলো প্রভুর। কিছু দিন নয়, কিছু মাস নয়, কিছু বছর সময় লাগলো প্রভুর, এই সেবাদানের কারণ অনুভব করতে। আর তার কারণ হলো, এই সেবাদানের সম্পূর্ণ চক্রকে দেখতে তাঁর এই ৩-৪ বছর লাগলো। যখন সমস্তটা দেখলেন তিনি, তখন চোয়াল শক্ত হয়ে গেল প্রভুর। তিনি দেখলেন, আর যা দেখেছিলেন, তা পরে একজনকে ব্যক্ত করে বলেছিলেন, ‘সেবা তো নিজেদের চালিয়ে যাওয়া কর্মপ্রক্রিয়াকে নিজেরাই নাম দিয়েছিলেন এঁরা। আসলে সেখানে সেবা হয়না, কারণ যাদের সেবা করার প্রয়াস হচ্ছে, না তো তারা অসুস্থ, আর না দুস্থ। তারা কর্মঠ, চঞ্চল, সুস্থ, এবং যথাযথ চেতনাযুক্ত। সত্য বলতে যারা তাঁদেরকে সেবাদান করার অঙ্গিকার করেন, তাদের থেকে অধিক সুস্থ তাঁরা, এমন অধিক চেতনাযুক্ত’।
আরো বলেন তিনি এই বিষয়ে, যখন সেই শ্রোতা প্রভুকে প্রশ্ন করেন যে, কি হয় তাহলে সেবার নাম করে। তিনি উত্তরে বলেন, ‘ধনের নেশাতে যারা চূর, তাদের কাছে এই মানুষগুলো একাকটি নেশার সামগ্রী। … এই প্রতিটি মানুষের থেকে এঁদের কামনা এই যে, তারাও সেই সেই বস্তুর কামনা করুক, যেই বস্তুর কামনা অন্যরা করেন। এঁদের থেকে এই কামনা তাদের যে, এঁরাও সেই সমস্ত কামনার বস্তুকে কামনা করুক, আর সেই ধন উপার্জন করুক যাতে সেই কামনার বস্তুদের ধারণ করতে পারে তারা’।
তিনি আরো বলেন এই ব্যাপারে যে, ‘সেই কারণেই এই সেবাদান। এই সেবাদানের নাম করে, এঁদেরকে সেই সমস্ত কামনার বস্তুর নমুনা দেখানো হয়, আর যাদের প্রতি এঁদের লালসা নেই, তাদের প্রতি এঁদেরকে লালায়িত করা হয়। এমন করতে করতে, একসময়ে এঁদের লালসাকেই এঁরা বাকি মানুষের মতই নিত্যপ্রয়োজন বলে আখ্যা দিতে শুরু করবেন, আর তারফলে এঁরা সেই বস্তু লাভের জন্য ধনরাশির সন্ধান করবেন। আর তাঁর এই প্রয়াসের ফলে সেই সমস্ত কামনার বস্তু নিয়ে বাণিজ্য করা ধনের নেশারুদের কাছে অধিক অধিক ধন প্রবাহিত হবে, আর তাদের নেশার সামগ্রীর বৃদ্ধি হবে’।
এই মর্মার্থ নিষ্কাসন নিয়ে সেই শ্রোতা বলেন, ‘তাহলে এই মার্ক্সতন্ত্র, ধনতন্ত্র এবং সমাজতন্ত্র, এই তিন প্রকার শাসনব্যবস্থা কেন? কি প্রয়োজনে এই সমূহের?’
মাতার প্রদান করা সমাজবিজ্ঞানের বিদ্যার থেকেও সেই কালে প্রভু সেই জ্ঞান ধারণ করে নিয়েছিলেন। তাই সেই শ্রোতাকে তিনি হেসে উত্তরে বলেছিলেন, ‘প্রশ্নটা কি প্রয়োজন নয়, প্রশ্নটা হলো কার প্রয়োজন। … প্রয়োজনটা এই মানুষের নয়। প্রয়োজনটা সেই মানুষজনের, যারা এই তিন তন্ত্রকে মানুষের উপর প্রয়োগ করেন। আর প্রয়োজন তাঁদের বলেই তারা এই তন্ত্রসমূহকে প্রয়োগ করেন’।
এই কথার বিস্তারে তিনি বলেন, ‘এই তিন তন্ত্র কি জানো? এঁরা হলো আত্মের ত্রিগুণ। সত্ত্ব, রজ ও তম। আমার নয়, ঠাকুর রামকৃষ্ণের কথন, এই তিনজনেই ডাকাত। একজন ধরে বেঁধে রাখে, একজন সেই ধরে রাখা বন্দিনীর কাছে আহার নিয়ে যায়, আর অন্যজন সেই বন্দিনীর সমস্ত কিছু লুণ্ঠন করার পর বলে, ভাই আমাদের কাজ হয়ে গেছে, তোমাকেও মুক্ত করে দিলাম। … যিনি বন্দী করলেন, তিনি হলেন রজগুনি, যিনি আহার প্রদান করতে দয়া দেখালেন তিনি তমগুনি, আর যিনি শেষে লুণ্ঠন করা হয়ে গেলে বন্ধন খুলে দিলেন, তিনি সত্ত্বগুনি।
এই তিন শাসনতন্ত্রও হলো এই তিনগুণেরই প্রতিলিপি। যেখানে ধনতন্ত্র হলো সেই ডাকাত অর্থাৎ রজগুনি যে বেঁধে রাখে সকলকে। মার্ক্সতন্ত্র বা সাম্যবাদ হলো সেই ডাকাত অর্থাৎ তমগুনি যে আহার প্রদান করে, আর সমাজতন্ত্র হলো সেই সেই ডাকাত যে লুণ্ঠন করার শেষে বাঁধন খুলে দেয়।
বিচার করে দেখো, ধনতন্ত্র কি কথা বলে? ধনতন্ত্র বলে ধনের পাহাড় নির্মাণ করতে হবে, ধনকেই সমাজের চালকের আসনে বসাতে হবে। ধন কি? মানুষের কামনার একক। অর্থাৎ কাকে সমাজের চালকের আসনে বসানোর কথা হচ্ছে এখানে? মানুষের কামনাকে। অর্থাৎ মানবজাতিকে, মানবযোনিকে অধিক থেকে অধিক ভাবে কামনার দাস করে তোলাই হলো এঁদের লক্ষ। ডাকাত কেন তাহলে? কি লুণ্ঠন করছে এঁরা?
চেতনার লুণ্ঠন করছেন এঁরা। যতই কামনার বৃদ্ধি হয়, ততই চেতনা লোপ পায়, ততই প্রকৃতির সাথে আমাদের যেই সম্বন্ধ তা লুপ্ত হয়। আর সেই চেতনাকেই লুণ্ঠন করা ডাকাত এই তিন তন্ত্র, যাদের মধ্যে যে সরাসরি এই প্রসঙ্গে চলমান, তা হলো রজগুণ অর্থাৎ ধনতন্ত্র। এই ডাকাতের প্রভাবে সকলেই রয়েছে। এই ডাকাতের প্রভাবের কারণেই সমস্ত পেশার মধ্যে মানুষকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, এবং তাদেরকে বাধ্য করা হচ্ছে যাতে তারা অধিক থেকে অধিক ধন উপার্জন করে, অধিক থেকে অধিক কামনা করে, আর অধিক থেকে অধিক ভাবে নিজেদের চেতনাকে বিনষ্ট করে।
এরপরে রয়েছে সাম্যবাদী অর্থাৎ মার্ক্সতন্ত্র। কি বলছে তা? সমস্ত ধন কিছু হাতে গচ্ছিত থাকলে হবেনা, সমস্ত হাতে সেই ধন প্রদান করতে হবে, এই তাদের দাবি। বিচার করে দেখো, এই কথার মর্মার্থ কি। এর অর্থ এই যে যেই ধন দ্বারা কিছু মানুষ কামনা করছে, মনুষ্যযোনির কিছু মানুষ কামনার দাস হয়ে উঠে চেতনার জলাঞ্জলি দিচ্ছে, সেই দাসত্ব কেবল কিছু মানুষের অধিকার নয়, সমস্ত মানুষের অধিকার। আর তাই সেই কামনা সকলের মধ্যে প্রসারিত করতে হবে, সকলকে ধন প্রদান করতে হবে, অর্থাৎ সকলকে ধনের নেশা করতে দিতে হবে, এবং সকলের চেতনা হনন করতে হবে।
বিচার করে দেখো, ঠাকুর রামকৃষ্ণের ঠিক সেই দ্বিতীয় ডাকাতের চরিত্র এঁরা। লুণ্ঠন এঁরাও করবে। এঁদের কাছেও মানুষের চেতনার কনো মূল্য নেই। কেবল ধনের অর্থাৎ কামনার এককের মূল্য। আর এঁরা কি বলছে? সেই ডাকাত যেমন বলছিল, ভাই আমরা একা খাবো, নে তুইও খা, তেমনই কথা, তোমরা একা ধন ভোগ করবে, সকলকে সেই ভোগ দিতে হবে, সকলকে কামনা করতে দিতে হবে, সকলের চেতনা হনন করতে হবে।
আর একদম শেষে আসে সমাজতন্ত্র। কি বলে এই তন্ত্র? বলে সমাজের সকলের বাঁচার অধিকার আছে। অর্থাৎ কামনা সকলের আছে, সকলে সকলের কামনা পূর্তির জন্য সহায়ক, কারণ সকলে মিলেই ধন উপার্জন করছে। কেউ ধান কাটছে, তো কেউ ধান বিক্রয় করে ধন আনছে। যে ধান কাটছে, সে যদি ধান না কাটতো, তাহলে ধনও আসতো না। তাই সকলকে সম্মান প্রদান করতে হবে, সকলের মতামত জানতে হবে।
বিচার করে দেখো, ঠাকুর রামকৃষ্ণের প্রদান করা তৃতীয় উদাহরণ ইনি। সমস্ত লুণ্ঠন অর্থাৎ চেতনার সম্যক লুণ্ঠন হয়ে যাবার পর, বলা যে ভাই আমাদের লুণ্ঠন হয়ে গেছে, আর তোমাকে বন্দী করে রেখে আমাদের কি লাভ। এসো তোমাকে বন্ধন মুক্ত করে দিই। আর যা বললেন না সেই ডাকাত, তা এই যে, আজ যদি তোমাকে বন্ধনমুক্ত না করি, তাহলে তুমি পুনরায় ধন উপার্জন করবে কি করে? আর যদি পুনরায় ধন উপার্জন না করো, তাহলে আমরা কাল কাকে লুণ্ঠন করবো?’
এই কথা বলে হেসে প্রভু বলতেন, ‘তাই এই তিন তন্ত্র তাদের প্রয়োজন নেই যাদের উপর এগুলিকে ব্যবহার করা হয়। মাছের তরকারিতে লঙ্কাবাটা দেবে, আদাবাটা দেবে, তা মাছের কি সেই সমস্ত কিছু প্রয়োজন? না যে রন্ধন করছে, যে আহার করবে, তার প্রয়োজন। ঠিক তেমনই এই দীনহীনরা, এই বনজঙ্গলের জীবরা হলো সেই মাছ। এঁদের না তো ধনের প্রয়োজন, না ধনের সাম্যতা, আর না ধন উপার্জনের জন্য স্বতন্ত্রতা। …
এঁরা তো প্রকৃতির উপর আশ্রিত। বনের বাঘকে কি মাংস রান্না করে খেতে দিতে হয়! নাকি বনের হাতিকে গাজরের হালুয়া করে খাওয়াতে হয়! … চাষিকে কি সবজী কিনে খাওয়াতে হয়, নাকি গোয়ালাকে দুধ কিনে এনে খাওয়াতে হয়? … এঁরা সকলেই নিজের নিজের খেয়াল রাখতে সক্ষম, কারণ এঁরা প্রকৃতির কাছে আশ্রিত, আর প্রকৃতি এঁদের জন্য আহারাদি করে দেন। … ধনের প্রয়োজন এঁদের কনো কালেই ছিলনা।
ধনের প্রয়োজন ছিল শাসকের, কারণ তার যে ধনের নেশা। অধিক ধনের প্রয়োজন শাসকের কারণ ধন মানেই যে কামনার একক, আর তাকে তো সমস্ত মানুষের কামনাকে নিজের অধীনে রেখে, ক্ষমতাশালী হতে হবে। বিচার করে দেখো, তোমার যদি কামনাই না থাকে, তাহলে তোমার ধনের কি প্রয়োজন? আর যদি ধনের প্রয়োজন না থাকে, তাহলে কার কাছে তুমি বদ্ধ? রাজার কাছে? সরকারের কাছে? পুঁজিপতির কাছে? (হেসে) কারুর কাছে নয়।
তাই তোমার কামনা থাকুক, তা তোমার যতটা না প্রয়োজন, তার থেকে অনেক বেশি প্রয়োজন এই শাসকদের, এই সরকারপক্ষদের, এই পুঁজিপতিদের, কারণ তারা ধনের নেশা করে, তারা ক্ষমতার নেশা করে, আর ক্ষমতা মানেই কত কত ব্যক্তি আমার পদতলে স্থিত হয়ে আমার দয়ার পাত্র হয়ে বিরাজ করে, তার সংখ্যার গণনা। তাই তোমার প্রয়োজনে না তো ধনতন্ত্র, না মার্ক্সতন্ত্র, আর সমাজতন্ত্র। সমস্ত কিছুই সেই নেশারুদের প্রয়োজন, আর তোমরা হলে সেই সামগ্রী, সেই ব্যক্তি, যাকে তিন ডাকাত মিলে লুণ্ঠন করে চলে অনুক্ষণ।
আর মজার কথা জানো? মানুষ এই বন্যপশুদেরও ছাড়েনি। পশুপ্রেমের কারণে এঁদেরকে বনজঙ্গল প্রদান করেনি মানুষ। আরে মানুষ কি বনজঙ্গল প্রদান করবে! মানুষ কি বনজঙ্গলের নির্মাতা? আমি যা নির্মাণই করিনা, তার নিয়ন্ত্রণের অধিকার আমার কাছে কি করে থাকতে পারে! এই দেহকে আমরা নির্মাণ করিনা, এঁকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি! নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে, মৃত্যু হতে দিতাম আমরা! (হেসে) সমস্ত কিছুর মূলে রয়েছে ধন। … এই ধনই একমাত্র বন্ধন মনুষ্যযোনির কাছে, এই ধনই সেই বন্ধন যার কারণে সমস্ত অন্যযোনিদের পণ্য করে রেখে দিয়েছে মানুষ। আর তাই যতক্ষণ না এই ধনের থেকে মুক্ত এক সমাজ গঠন করতে পারবে, ততক্ষণ মুক্তিকে সামাজিক প্রক্রিয়াতে কিছুতেই রূপান্তরিত করতে পারবেনা।
যদি চাও সমাজে মুক্তির উৎসব পালিত হোক, তাহলে ধনমুক্ত একটি সমাজ নির্মাণ করো। এই ধন আমাদের আমিত্বকে, আমাদের আত্মকে প্রকাণ্ড শক্তিশালী করে তোলে, কারণ ধন মানেই কামনা, আর কামনা মানেই আত্মের বিস্তার, পরমাত্মের বিস্তার। মুক্তি সত্যের বিস্তারে, আত্মের বিস্তারে নয়, আর সত্য মানেই এই ব্রহ্মাণ্ড থেকে, এই জীবনমৃত্যুর চক্র থেকে মুক্তি, আর তা সাধিত করতে গেলে, সমস্ত কামনার থেকে মুক্ত হতে হয়। আর ধনের প্রতি আশ্রিত হয়ে যতদিন থাকবে, ততদিন কামনার থেকে মুক্ত কিছুতেই হতে পারবেনা, অর্থাৎ জীবনমৃত্যুর থেকে মুক্তি তখন দুরস্ত। তাই ধনথেকে মুক্ত সমাজ গঠন করো, এটিই মানবযোনিকে উদ্ধার করতে সক্ষম, আর বাকি সমস্ত যোনিকেও সুস্থ জীবনপ্রদান করতে সক্ষম’।
এই ছিল প্রভুর সমাজ ও সমাজবিজ্ঞানের ব্যাপারে নিঃসৃত মর্মার্থ। সরাসরি বলতে হলে, মর্মার্থ এই যে, সমাজ তথা সমাজকে চালনা করার যতগুলি তন্ত্র বর্তমানে রয়েছে, সেই সমস্তই হলো মানুষকে আত্মকেন্দ্রিক করে তোলার যন্ত্র, আর এর পশ্চাতে রয়েছে তাদের স্বার্থ যারা ধন ও খ্যাতির নেশায় চূর। যতক্ষণ না সর্বজন আত্মকেন্দ্রিক হয়ে উঠবেন, ততক্ষণ মানুষ প্রকৃতির প্রতি আকৃষ্ট থাকবে, আর যতক্ষণ মানুষ প্রকৃতির প্রতি আকৃষ্ট থাকবে, ততক্ষণ তাঁদের কামনা সীমিত থাকবে, আর কামনা সীমিত থাকার অর্থই হলো ধনের প্রয়োজন সামান্য থাকবে।
কিন্তু ধনের প্রয়োজন যদি সামান্য হয়, তাহলে অধিক ধনলাভের জন্য পরিশ্রম কেন করবেন তাঁরা! আর তাঁরা যদি অধিক ধনলাভের নেশা করে, পরিশ্রম না করেন, তাহলে তাদের পরিশ্রমের থেকে লাভের গুড়ের আশায় যারা বসে রয়েছেন, সেই ধনপতিরা, সেই শাসকগোষ্ঠীরা কি রূপে ধন লাভ করবেন। সাধারণ মানুষকে যতটা না কামনা পূর্তির জন্য ধন উপার্জন করতে হয়, তার থেকেও অধিক তাদেরকে নিজেদের প্রয়োজন পূর্ণ করতে ধনের উপার্জন করতে হয়, কিন্তু যারা ধনের নেশা করেন! তাদের তো আহার না করলেও চলবে, কিন্তু ধন যে তাদের নেশা, ধন ছাড়া যে তাদের ফুসফুস যে কাজ করাই বন্ধ করে দেবে!
তাই প্রভু স্পষ্ট ভাবে বলেন, সমাজ গঠনের জন্য যেই তিন তন্ত্র, অর্থাৎ ধনতন্ত্র, সাম্যবাদ বা মার্ক্সতন্ত্র এবং সমাজতন্ত্র, এই তিনই হলো আত্মের ত্রিগুণ, অর্থাৎ যথাক্রমে তারা হলো রজগুণ, তমগুণ ও সত্ত্বগুণ, আর তিনজনেই ডাকাত, অর্থাৎ তিনজনেই ধনকে মানুষের কাছে আবশ্যক করে তুলে মানুষের থেকে চৈতন্য লুণ্ঠন করতে ব্যস্ত। মুক্তি প্রকৃতির থেকে শিক্ষা লাভে, আর তাই প্রকৃতির থেকে যতটা অধিক সম্ভব সংযোগ স্থাপনই মানুষের মুক্তির কাণ্ডারি। আর ধন মানেই হলো কামনা, আর কামনা যতই বাড়বাড়ন্ত হয়ে ওঠে, মেধা ও তার কারণে চেতনা ততই ক্ষীণ হয়ে ওঠে, কল্পনাই মেধার স্থান গ্রহণ করে নেয়, আর মানুষকে সম্যক ভাবে প্রকৃতির থেকে দূরে অপসারিত করে দেয়।
তাই সম্যক মর্মার্থ প্রদর্শন করে, প্রভু আমাদের সকলকে আবাহন করেন এমন একটি সমাজ গঠনের জন্য, যেখানে ধন ব্রাত্য হয়ে উঠবে, অর্থাৎ শ্রীপুর নির্মাণের জন্য আবাহন করে গেছেন। প্রভু এই নিরিখে একবার স্পষ্ট করে বলেছিলেন, ‘সমাজের যথার্থতা প্রচুর মানুষকে একত্রে স্থাপিত রেখে, সকলের কামনাপূর্তি করতে থাকা কখনোই নয়। সমাজের যথার্থতা তখনই যখন প্রচুর মানুষকে একত্রিত করে, সকলকে মুক্তির স্বাদ প্রদান করা হয়। মানুষ ধনের কাছে বন্দী, পরাধীন। আর তাই যথার্থ সমাজ তখন গঠিত হবে, যখন প্রচুর মানুষকে একত্রিত করে রেখে, সকলকে ধনের থেকে মুক্ত করে চদেতনার আস্বাদ প্রদান সম্ভব হবে’।
(ঈষৎ হাস্য প্রদান করে মীনাক্ষী বললেন) এই ছিল সমাজবিজ্ঞানের থেকে নিঃসৃত এক মৃষুর মর্মার্থ। প্রভু স্বয়ং ছিলেন প্রথম মৃষু, আর তিনি আগামীদিনের সমস্ত মৃষুদের পথ সহজ ও সুগম করে তোলার জন্য, স্বয়ংকে কেবল বিদ্যার থেকে জ্ঞান অর্জন করেই ক্ষান্ত রাখেন নি। যখন যার মর্মার্থ উদ্ধার করেছেন, তখন সেই ব্যবস্থা, সেই বস্তুর, সেই প্রক্রিয়ার মধ্যে স্বয়ংকে স্থিত করে, সমস্ত কিছু সম্যক ভাবে প্রত্যক্ষ করে, তার মর্মার্থ স্থাপন করেছেন, যাতে অন্য মৃষুরা সেই মর্মার্থকে হৃদয় দ্বারা অনুভব করলেই, নিজেদেরকে মৃষু পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।
অর্থাৎ মধ্যা কথা এই যে, সমস্ত কিছু দেখার পরেও, সমস্ত বিদ্যা লাভের পরেও, আমরা জীবকটিরা নিরপেক্ষতার সাথে সমস্ত কিছুকে নিরীক্ষণ করতে পারিনা। আর তাই মর্মার্থ উদ্ধারও করতে পারিনা। আরো স্পষ্ট ভাবে বলতে গেলে, আমরা যেই প্রথা চলমান, একপ্রকার তাকেই নিত্য মেনে এগিয়ে যাই, আর তাই যা চলমান প্রথা, তার দোষগুণ বিচারই করতে সক্ষম হইনা। আর তাই, প্রভু স্বয়ং পরিশ্রম করে, অক্লান্ত পরিশ্রম করে করে, সমস্ত কিছুকে প্রত্যক্ষ করে, সেই প্রত্যক্ষ করা কথার উদাহরণ প্রদান করে মর্মার্থ ব্যক্ত করে গেছেন।
অর্থাৎ বাকি জীবকটিদের মৃষু হতে গেলে, কেবলই সেই নিঃসৃত মর্মার্থকে হৃদয় দ্বারা, চেতনার দৃষ্টি দ্বারা প্রত্যক্ষ করতে হবে, আর তাকে ধারণ করতে হবে। এতটাই সহজ করে দিয়েছেন প্রভু আমাদের সকলের জন্য; এতটাই মসৃণ করে দিয়েছেন তিনি আমাদের যাত্রা পথ”।
বিজয়া বললেন, “মীনাক্ষী, সমাজনীতির এই যে তিন ধারা, এদেরকে ধারণ করেই তো রাজনীতি স্থাপিত। তাই রাজনীতির সারও এখানে থেকেই পেয়ে গেলাম। কিন্তু শুধুই কি ধন আমাদের বাঁধা! শুধুই কি ধন আমাদের বন্ধন! … আমাদের দেহ আমাদের বন্ধন নয়? আমাদের অজানা ভবিষ্যৎ আমাদের বন্ধন নয়? জ্যোতিষ রয়েছে আমাদের সেই বন্দীদশা থেকে মুক্ত করার জন্য, কিন্তু সত্যই কি জ্যোতিষ আমাদের সেই বাঁধাকে অতিক্রম করায়, নাকি সেই বাঁধাকে আরো বীভৎস করে দেয়! এই দেহ ধারণ করে, এই অজানা ভবিষ্যৎকে সুনিশ্চিত করার জন্য, আমরা বহু ধারার ক্রিয়া করি, আর এই ক্রিয়া সমূহ আমাদের সম্মুখে বহুল প্রশ্ন স্থাপিত করে দেয়, যেমন কোনটি ন্যায় কনটি অন্যায়। এই সমূহ কি আমাদের বন্দী করে রাখে না!”
মীনাক্ষী হেসে বললেন, “বিজয়া তুমি প্রকৃতির থেকে গ্রহণ করা চতুর্থ স্তম্ভ, অর্থাৎ চতুর্থ আকরিকের কথা বললে এক্ষণে। জানো প্রভু এই সমূহের ব্যাপারে কি বলতেন! তিনি বলতেন, ‘অনিত্য এই সমস্ত কিছু। এই আছে, এই নেই; এই এক প্রকার, পরমুহূর্তে অন্য প্রকার’। তবে তিনি প্রকৃতির থেকে লব্ধ শিক্ষার ভিত্তিতে এও বলতেন যে, ‘যতই অনিত্য হোক না কেন, প্রকৃতির মধ্যে স্থিত মানে, প্রকৃতির নিয়মেই সমস্ত কিছু স্থাপিত। একবার সেই নিয়মাবলীকে ধারণা করে নিতে পারলে, আর কনো কিছু নিয়ে দ্বন্ধ থাকেনা। আর তাই বন্দী দশাও থাকেনা।
তাই আমি তোমাদের এবার প্রভু দেহবিজ্ঞানের সার রূপে কি বলতেন, জ্যোতিষের প্রয়োজন নিয়ে কি বলতেন, আর নীতি-অনীতি নিয়ে কি মর্মার্থ উদ্ধার করেছিলেন, সেই কথাই বলবো। তাহলে, প্রকৃতির এই চতুর্থ আকরিকের সম্যক জ্ঞান লাভ করে ফেলে তোমরা পঞ্চম ও অন্তিম আকরিক সম্বন্ধে মর্মার্থ জানবে”।
এত বলে মীনাক্ষী পুনরায় বলা শুরু করলেন, “প্রভু দেহের সার রূপে বলেছিলেন যে মানব তথা জীবদেহ হলো ধরিত্রীর একটি একটি নমুনা। যেই যেই উপাদান দ্বারা ধরিত্রী নির্মিত, সেই সমস্ত ধাতু উপাদান দেহতেও বর্তমান, তবে যতটা ধরিত্রীর উপাদান সমূহ তথা ধরিত্রীর সংগঠন আমাদের আত্মের একটি চেতনাদ্বারা সম্মতি প্রদত্ত কল্পনা, ততটাই সমস্ত দেহ। প্রশ্ন এখন এই যে, স্বয়ং চেতনা কেন সম্মতি প্রদান করেন এই কল্পনাকে?
কারণ দুটি, প্রথমত ব্রহ্মের একাকীত্বের বিনাশের জন্য, তিনি নিজেকে নিজে সন্তানরূপে লাভ করতে উৎসাহী হন, এবং স্বয়ং স্বয়ংকে প্রেম প্রদান ও প্রেম গ্রহণে রুচিশীল হন। আর দ্বিতীয়তো, তাঁর নিজেকে নিজকে জানা। তিনি স্বয়ং স্বয়ংএর নিত্যতা, অব্যক্ততা, অচিন্ত্যতা, অবিনশ্বরতা, অখণ্ডতাকে প্রত্যক্ষ করতে চান। আর তাই তিনি বৈপরীত্য ধারণ করাতে সম্মতি প্রদান করেন, কারণ বৈপরীত্যই সত্যকে সত্য বলে মান্যতা প্রদান করে।
অসত্য থাকলে সত্য বলে কিচ্ছু থাকতে পারেনা। তাই অসত্য একটি কল্পনা মাত্র, কারণ সত্য একমই অস্তিত্ব। কিন্তু সেই কল্পনাকে স্থিত রাখতে হয়, তবেই সত্যের ধারণা করা সম্ভব হয়। শূন্যতাই একমাত্র সত্য, শূন্যতা বিনা কনো কিছুর অস্তিত্বই সম্ভব নয়; শূন্যতা বিনা সমস্ত কিছুই এক কল্পনা। কিন্তু তাও সেই কল্পনাকে স্থিত হতে দিতে হয়, তবেই শূন্যতার ভান করা সম্ভব হয়। বেদনা মাত্রই আসক্তির ফলস্বরূপ, আর আসক্তি সকল সময়েই ভ্রমের উপর স্থিত থাকে। তাই বেদনার বাস্তবে কনো অস্তিত্বই সম্ভব নয়। কিন্তু তাও বেদনার অনুভব আমাদেরকে আনন্দের অস্তিত্বের ভান প্রদান করে।
অর্থাৎ স্পষ্ট কথা এই যে, ভ্রমই সত্যের ভান প্রদান করে, তবে তার জন্য ভ্রমকে স্থাপিত হতে দিতে হয়, এবং ভ্রমকে ভ্রম রূপে সনাক্ত করতে হয়, তবেই সত্য প্রত্যক্ষ হয়। দেহ অবশ্যই ভ্রম, এ ব্যাপারে কনো সন্দেহ নেই, কারণ এক ও একমাত্র শূন্যই সত্য, শূন্য ব্যতীত কনো কিচ্ছুই সত্য নয়। কিন্তু তাও এই ভ্রম স্থাপিত থাকা আবশ্যক, কারণ তা না হলে এই ভ্রম থেকে মুক্তি লাভ করে সত্যকে, শূন্যকে প্রত্যক্ষ করাই সম্ভব নয়।
আরো নিখুঁত ভাবে বলতে গেলে, ব্রহ্ম অনন্ত ও অসীম, অর্থাৎ তিনি এক ও অভিন্ন। যিনি এক ও অভিন্ন, তাঁর আঁখি থাকাই সম্ভব নয়, কারণ সেই আঁখির কনো প্রয়োজনই থাকেনা। যা আমাদের কনো প্রয়োজনের নয়, তা আমরা ধারণই করিনা। তাই ব্রহ্ম স্বয়ংকে স্বয়ং প্রত্যক্ষই করতে পারেন না। আর সেই কারণেই ভ্রম অর্থাৎ আত্ম যখন দেহ গঠন করে প্রত্যক্ষ করার সামর্থ্যশীল দেহ ধারণ করতে আগ্রহী হন, ব্রহ্মময়ী তাতে সমর্থন প্রদান করেন, কারণ সেই সমর্থনের ফলে, সেই দেহে চেতনার বিস্তার করে ব্রহ্মময়ী স্বয়ংকে স্বয়ং দেখতে পান।
অর্থাৎ যা কিছু স্থূল, তা বাস্তবে একটি একটি দর্পণ, তা বাস্তবে ব্রহ্মময়ীর দর্পণ, যাতে মা নিজেকে নিজে দর্শন করেন। তবে যেমন দর্পণে সমস্ত কিছু বিপরীত দেখায়, তেমনই এই দেহ থেকে ব্রহ্মময়ী বিপরীত দৃশ্যই দর্শন করেন, আর আমরাই তাঁকে বিপরীত দৃষ্টিতেই দেখি। অর্থাৎ তাঁর এই ব্রহ্মাণ্ড গঠনের মূলে যেখানে মাতৃত্ব বর্তমান, সেখানে আমরা পিতৃত্ব অবলোকন করি; যেখানে তিনি ঈশ্বর হবার পূর্বে মাতা, সেখানে আমরা তাঁকে মাতা কম জ্ঞান করি, আর ঈশ্বর অধিক’।
অর্থাৎ প্রভু যেই মর্মার্থ প্রদান করেছেন দেহের ব্যাপারে, তা এই যে, এই দেহ একটি ভ্রমপদার্থ হলেও, তার অস্তিত্বকে স্বয়ং মাতা সমর্থন করেন, কারণ এই দেহের কারণে আমরা সত্যকে অবলোকন করতে পারি। তাঁর ব্যক্ত সত্যবাণী অনুসারে, এই দেহ সেই উপাদানদ্বারাই নির্মিত, যা দ্বারা ধরিত্রী নির্মিত, আর তা আমাদের সর্বক্ষণ দর্পণ চিত্র, অর্থাৎ বিপরীত চিত্র প্রদান করে। অর্থাৎ আমাদের যদি সত্যকে প্রত্যক্ষ করতে হয়, তাহলে সর্বক্ষণ আমাদেরকে বিচার করতে হবে, কারণ বিনা বিচার কনো কিছু গ্রহণ করার অর্থ হলো আমরা বিপরীত কিছুকেই সত্য মানতে থাকবো।
এবার তোমরাই বিচার করে দেখো, দর্পণে যখন নিজের চিত্র দেখো, তখন খেয়াল করে দেখবে, যার চিত্র দর্পণে দেখছো, সেটির মধ্যরেখা কিন্তু অবিকৃত থাকে, আর সেই মধ্যরেখার বামপার্শের যা কিছু ডানপাশে চলে যায়, আর ডানপাশের সমস্ত কিছুর বামপার্শে চলে যায়। কি তাই তো?”
সকলে সেই কথাতে সম্মত হয়ে উদগ্রীব হয়ে উঠলেন, এই নিয়ে মীনাক্ষী কি বলে সেই ব্যাপারে। মীনাক্ষী সে দেখে হেসে বললেন, “অর্থাৎ, দর্পণচিত্রের মধ্যে একটি রেখা থাকে স্থির, আর সেটিই হলো সম্যক চিত্রের মধ্যে অপরিবর্তিত অংশ। … আর আমাদেরকে কনো কিছুর বাস্তবতাকে ধরতে হলে, এই অপরিবর্তিত অংশকে কেন্দ্র করেই ধরতে হয়। তাই না!”
সকলে এই কথাতেও সম্মত হলে, আরো বেশি চঞ্চল হয়ে ওঠেন, মীনাক্ষীর আগামী কথা শ্রবণে। তাই মীনাক্ষী বললেন, “স্থূলজগতের বিচার করার ক্ষেত্রেও ঠিক এই পদ্ধতি অনুসরণ করেই বিচার করতে হয়। আর জানো, এই মধ্যরেখাকে কি বলা হয় সেখানে?”
বিজয়া প্রশ্নসূচক ভাবে বললেন, “বর্তমান!”
মীনাক্ষী বিজয়ার দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, “একদম সঠিক। … এই মধ্যরেখা হলো বর্তমান। আর বিচার কি ভাবে করতে হয় এই মধ্যরেখাকে অর্থাৎ বর্তমানকে কেন্দ্রে রেখে?”
বিজয়া মৃদু হেসে বললেন, “মাতা সর্বশ্রীর থেকেই এই কথা জেনেছি মীনাক্ষী। তাই আমার নিজের কথা ভেবো না এই কথাকে। তিনি শিখিয়েছেন যে, বর্তমানের দুইদিকে দুটি অবস্থা থাকে, অতীত ও ভবিষ্যৎ। অতীতের কি কি, কার কার কি কি ভূমিকা অনুসরণ করে যা বর্তমান, তা বর্তমানে স্থাপিত হয়েছে, এই হলো বিচারের অর্ধাংশ। আর বর্তমানে যা কিছু স্থিত, তাকে অনুসরণ করে ভবিষ্যতে কার কার উপর কি কি প্রভাব বিস্তার করতে চলেছে এই বর্তমান, তা হলো বিচারের পরবর্তী অংশ। আর এই দুই অংশকে ধারণ করেই, সম্যক সত্যকে অনুধাবন করা সম্ভব হয়”।
মীনাক্ষী সেই কথাতে কনোপ্রকার অন্য কথা যুক্ত না করে বললেন, “বুঝলে, বিজয়া কি বলল? … এই হলো বিচার করার কৌশল। আর এই কৌশলকে ধারণ করে সমস্ত কিছুরই বিচার করতে হয়ে, এমনকি দেহেরও। শরীরে কি দেওয়া হয়েছে, কি দেওয়া হয়নি, সেই অনুসারেই শরীরের বর্তমান অবস্থা হয়, আর বর্তমানে শরীর কি করছে, সেই অনুসারে নির্মিত হয় শরীরের পরবর্তী অবস্থা।
পরিশ্রম করলে, শরীরের উর্জ্জাক্ষয় হয়, আর উর্জ্জাক্ষয় হলে শরীর পরিশ্রান্ত হয়, আর পরিশ্রান্ত শরীরের বিশ্রাম প্রয়োজন হয়, আর তাই সেই শরীরে সহজে নিদ্রা আসে। ঠিক বিপরিত ভাবে, পরিশ্রম না করলে, শরীরের উর্জ্জাক্ষয় হয়না, আর তাই বিশ্রামের প্রয়োজন পরে না, আর তাই নিদ্রা আসেনা। এবার কথা এই যে, পরিশ্রম করলে, শরীরের পুষ্টিক্ষয়ও হয়, আর যতই পুষ্টিক্ষয় হয়, তত অধিক তাকে পুষ্টি প্রদান করতে হয়, অর্থাৎ আহার প্রদান করতে হয়।
আর অন্যদিকে দেহের ব্যাপারে আরো একটি কথা প্রভু বলতেন। তিনি বলতেন, ‘আহার কি জানো? আহার হলো খনিজ। বৃক্ষও যা আহার করে, সমস্ত জীবও তাই আহার করে, কেবল গঠনের তারতম্যের কারণে, সেই খনিজ গ্রহণের পদ্ধতি আলাদা। বৃক্ষ কায়িক পরিশ্রম করেনা, তাই বৃক্ষ সরাসরি জল গ্রহণ করে তার থেকে খনিজ ধারণ করে, কারণ কায়িক পরিশ্রম না করার কারণে, সেই সামর্থ্য নেই তার মধ্যে যে অন্য কিছু থেকেও সে খনিজ গ্রহণ করে নিতে পারবে।
কিন্তু জীবরা কায়িক পরিশ্রম করার কারণে, তাদের সামর্থ্য জন্ম নেয় যে, যেখানে খনিজ অত্যন্ত সুপ্ত আকারে স্থিত, তার থেকেও খনিজ গ্রহণ করে নিতে পারে। খনিজ সর্বাধিক সুপ্ত অবস্থায় থাকে বৃক্ষে, আর তাই বৃক্ষতরু হজম করা জীবের জন্য অধিক কঠিন। অন্যদিকে লহুরূপে খনিজ তরল জীবের মধ্যে প্রবাহিত হবার কারনে, জীবমাংস থেকে সেই খনিজ আহরণ সহজ। আর তাই মাংসাদি পদার্থ হজম করা সহজ জীবের জন্য।
তবে জীবকে দুইই গ্রহণ করতে হয়, কারণ বৃক্ষের মধ্যে থেকে এমন কিছু ধাতু অর্জন করা যায়, যা জীবের মাংস থেকে লাভ করা যায় না। অন্যদিকে, জীব নিজেদের খনিজ নিষ্কাসন করে নেবার জন্য নিজেদের দেহের মধ্যে ধাতুদের রসায়নিক বিক্রিয়া ধারণ করে অম্ল ও ক্ষার উৎপাদন করে থাকে, যার কারণে জীবের দেহের মাংসে এমন কিছু ধাতু উৎপাদিত হয়, যা বৃক্ষের মধ্য থেকে লাভ করা যায়না। তাই উপযুক্ত দেহের পুষ্টি তখনই লব্ধ হয় যখন এই দুই, অর্থাৎ তরু ও মাংস উভয়কেই সাম্যতা ধারণ করে ভক্ষণ করা যায়’।
এই অম্ল ও ক্ষারের ব্যাপারে প্রভু আরো একটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য কথা প্রায়শই বলতেন। তিনি বলতেন, এই অম্ল ও ক্ষারের মিশ্রণের কথা। তিনি বলতেন যে, যখন এক জীব শিশু থাকে, তখন তার দেহে ক্ষারের আধিক্য থাকে, কারণ সে জননীর স্তনপান করে। তারপর যখন থেকে সে মৎস্য ও মাংস আহার করা শুরু করে, তার মধ্যে অম্লের হার বৃদ্ধি পায়। আর তখনই এই অম্ল ও ক্ষারের সংমিশ্রণে জন্ম নেয় জল ও লবণ।
যেই জীব স্বল্প বা লেশ মাত্রও মাংস বা মৎস্য আহার করেনা, তার মধ্যে তাই কোষ্ঠকাঠিন্য যেমন অধিক হয়, তেমনই রক্তচাপ হ্রাস পায় এবং তাঁর মধ্যে লাবণ্যও হ্রাস পায়। আবার বয়োবৃদ্ধির সাথে সাথে আহারের পরিমাণ কম করতে হয়, নাহলে অম্লের হার অধিক হয়ে যায়, এবং তার কারণে বদহজম হয়’।
অর্থাৎ প্রভুর স্পষ্ট কথা এই যে, এই ভ্রমময় দেহ স্থিত থাকে, তার আহারের ধারা অনুসারে, এবং তার পরিশ্রম করার ধারা অনুসারে। তাই যতক্ষণ এই দেহকে যথাযথ পরিশ্রম করানো এবং যথাযথ আহার প্রদান করা সম্ভব হবে, ততক্ষণই এই দেহ যথার্থ ভাবে ক্রিয়ারত থাকবে, এবং যথার্থ ভাবে মনবিকাশ হতে সক্ষম হবে।
এই মনবিকাশ সম্বন্ধে স্পষ্ট ভাবে প্রভু বলতেন, ‘দেহে লবণের পরিমাণ কম থাকলে, মনবিকাশ সম্ভব হয়না, কারণ লবণের বৃদ্ধি মানেই জলের বৃদ্ধি, কারণ অম্ল ও ক্ষার একত্রিত হয়ে এই দুই উপাদানই নির্মাণ করে। আর লাবণ্যের বৃদ্ধি মানে কেবল দেহের সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায়না, সঙ্গে সঙ্গে দেহে জলের পরিমাণও বৃদ্ধি পায়, আর জলের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়া মানেই জলতত্ত্বের অর্থাৎ মেধার বিকাশ ঘটে। অর্থাৎ, দেহে অম্লের বৃদ্ধির জন্য সচেতন থাকতে হয় বিশেষ করে তারুণ্যে এবং যৌবনে। এতে কল্পনা হ্রাস পায়, এবং মেধার বিকাশ ঘটে’।
তাঁকে এই বিষয়ে প্রশ্ন করলে, তিনি বলেন, ‘যতই কল্পনার বিকাশ ঘটবে, ততই যান্ত্রিকতার দিকে প্রবণতা বৃদ্ধি পাবে মনুষ্যের। আর ততই সত্যের থেকে দূরে চলে যাবে। আর যতই মেধার বিস্তার ঘটে ততই কলা, জ্ঞান, যুক্তির প্রতি আস্থা বৃদ্ধি পায়, আর ততই সত্যের অনুভূতি হৃদয়ে অঙ্কিত হতে থাকে’।
অর্থাৎ প্রভু যেই দেহের ব্যাপারে সারকথা বলেছেন তা এই যে, এই দেহ তথা সমস্ত স্থূল জগত দর্পণচিত, অর্থাৎ যা এখানে নেত্রে দেখি আমরা, বাস্তবে ঠিক তার বিপরীত হতে থাকে। তাই যা কিছু দেখি আমরা, তার মধ্যরেখা অর্থাৎ বর্তমানকে ধারণ করে করে সত্যের বিচার করতে হয়, তবেই সত্য একসময়ে প্রত্যক্ষ হয়। আর তিনি বলেন যে, এই বিচারকে যথার্থতা প্রদানের জন্য প্রয়োজন দেহে লবণ ও জলের প্রসার, আর তা নিশ্চিত করার জন্য জীব-উদ্ভিদ মিশিয়ে আহার করতে হয়।
এই নিরিখেই তিনি ভবিষ্যতের প্রসঙ্গে আসেন, কারণ বিবিধ ব্যক্তি তাঁকে বিবিধবার সেই বিষয়ে প্রশ্ন করেছেন। তিনি তাই ভবিষ্যৎজানার বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে একটিই কথা বারংবার বলতেন যে, ‘ভবিষ্যৎ কখনোই নিশ্চিত নয়। অতীত বর্তমানকে নিশ্চিত করে, আর বর্তমান ভবিষ্যৎকে’।
আরো স্পষ্ট করে বলার কথা বললে, তিনি বলতেন, ‘বর্তমানের নির্মাতা হলো অতীত। আর ভবিষ্যতের নির্মাতা হলো বর্তমান। যা তুমি করে এসেছ, তার কারণেই বর্তমানে যা কিছু লাভ করছো, তা তোমার আশেপাশে উপস্থিত। আর বর্তমানে যা করবে, সেই অনুসারেই ভবিষ্যতে যা কিছু তোমার আশেপাশে স্থিত থাকবে’।
এই বিষয়ে বলার ক্ষেত্রে প্রভু অত্যন্ত সচেতন থাকতেন যাতে শ্রোতার মধ্যে কর্তাভাবের উত্থান না হয়। তাই তিনি বলতেন, ‘তুমি একটি ভ্রমঅস্তিত্ব কি বাস্তব অস্তিত্ব, তা নির্ভর করছে, তুমি নিজেকে কি জ্ঞান করছো, তার নিরিখে। যদি তুমি নিজেকে দেহ জ্ঞান করে, সমস্ত কিছু দেহের মস্তিষ্ক দ্বারা নিশ্চিত করার প্রয়াস করতে থাকো, তাহলে এই দেহ ও মস্তিষ্ক যেমন নশ্বর ও ভ্রমমাত্র, তুমিও তেমন একটি ভ্রম, আর তাই তোমার সমস্ত কৃত্যও ভ্রম ও ভ্রান্তিতে পরিপূর্ণ থাকবে, এটিই স্বাভাবিক।
যখন তুমি চেতনা সর্বস্ব হয়ে, নিজকে নিয়তির কাছে অর্পণ করে দেবে, এবং তাঁর পরিকল্পনা অনুসারে চলার সংকল্প গ্রহণ করবে, যেহেতু তিনি হলেন সত্য, সেহেতু তোমার কৃত্য সমূহও ভাস্মর হয়ে উঠবে, আর তা সুফল প্রদান করবে তোমাকে, অর্থাৎ সত্যের দিকে তোমাকে অগ্রসর করবে’।
অর্থাৎ প্রভু যা বলতেন বা নির্দেশনা দিতেন, তা এই যে, নিজেকে সময় ও প্রকৃতির কাছে অর্পণ করে, সত্যের পাঠ গ্রহণ করতে থাকতে হয়, নিরপেক্ষ হয়ে বিচার করে চলতে হয়, আর কর্তা না হয়ে দর্শক হয়ে সমস্ত কিছুকে নির্লিপ্ত ভাবে গ্রহণ করতে হয়। এই ভ্রমজগতের সমস্ত কিছুই মন্দ যখন তা আত্মদ্বারা পরিচালিত হবে, কারণ আত্ম নিজেই ভ্রম। কিন্তু সেই সমস্ত কিছুর মধ্যে যতটা আত্মের ভূমিকা থাকে, ততটা নিয়তির ও প্রকৃতির হস্তক্ষেপ থাকে ততক্ষণ যতক্ষণ না প্রযুক্তির ব্যবহার করে প্রকৃতির থেকে নিজকে মুক্ত করে এক কাল্পনিক জগতের তুমি বিরাজ করছো।
তাই প্রযুক্তির থেকে যতটা সম্ভব দূরে থেকে, নির্লিপ্ত হয়ে বিরাজ করতে হয়, কারণ নির্লিপ্ত হয়ে বিরাজ করলে তবেই প্রকৃতির প্রদত্ত শিক্ষা গ্রহণ করা সম্ভব হয়, আর আত্মের সাথে লিপ্ত হয়ে উঠলে, সমস্ত কিছুর মধ্য থেকে কেবল ভ্রমই ভাস্মর রূপে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
অর্থাৎ, যদি আত্মের নিরিখে জগত দেখো, তাহলে তোমার মস্তিষ্ক প্রসূত পরিকল্পনা অনুসারে গৃহত্যাগ করার কালে ঝড়তুফান আসলে, তুমি বিরক্ত হয়ে উঠবে। আর যদি নির্লিপ্ত হয়ে জগত দেখো, তাহলে অনুভব করবে যে, প্রকৃতি তোমাকে তোমার পরিকল্পিত পথে যেতে বারং করছেন, কারণ তা অহিতকর হবে তোমার জন্য।
প্রভু বলতেন খেয়াল করে দেখো, অন্তত একবার তোমার জীবনে তুমি তোমার পরিকল্পনা থেকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে অপসারিত হতে বাধ্য হয়েছ, আর খবর নিয়ে দেখো, তোমার পরিকল্পনা অনুসারে যেখানে তুমি সেই কালে যেতে, সেখানে কনো না কনো একটি অঘটন ঘটেছে। প্রকৃতি আমাদের জননী, এবং তাঁর দায়িত্বগ্রহণে তিনি সর্বদাই তৎপর। তাই যেখানে যেখানে তোমার অহিত লুক্কায়িত, তিনি সেখানে সেখানে তোমার পরিকল্পনাকে ভেস্তে দেন দায়িত্ব নিয়ে। কিন্তু আমরা তারপরেও শিখিনা। তারপরেও আমরা পরিকল্পনা করতেই থাকি, কিন্তু প্রকৃতির ধারা অনুসারে চলতে আমাদের আত্মের বহুতর অনীহা’।
এই সংক্রান্ত কথা বলার ক্ষেত্রে, তাঁর সম্মুখে একবার না একাধিক বার জ্যোতিষের প্রসঙ্গ উত্থাপন করলে, তিনি বলেন, জ্যোতিষ একটি গণনা। তা কিছু অংশে সঠিক হয়, আবার কিছু অংশে বেঠিক। কি হিসাবে এই গণনা করা হয়, যার কারণে এই সঠিক বা বেঠিক, উভয়ই হতেই থাকে তার সাথে? … ভবিষ্যতের নির্মাণ হবার ক্ষেত্রে দুটি ক্রিয়া সচল থাকে। একটি তোমার করা কর্মের ভূমিকা, আর দ্বিতীয় হলো নিয়তির ভূমিকা।
আর এই দুটিই অত্যন্ত নির্দিষ্ট সকলের কাছে। কেন? কারণ প্রতিটি জীবের সম্মুখে ক্রিয়া করার কালে, সর্বক্ষণ দুটি পথ খোলা থাকে। একটি হলো প্রকৃতি প্রদত্ত পথ, এবং দ্বিতীয় হলো আত্ম প্রদত্ত পথ। কখন যে তুমি কোন পথে চলবে, তা কেউ গণনা করে দিতে পারেনা। সেই ক্রিয়া করার কালে যদি তোমার চেতনা সক্রিয় থাকে, তাহলে তুমি প্রকৃতি নির্দিষ্ট পথে চলবে, আর যদি তোমার আত্মবোধ অর্থাৎ আমিত্ব সক্রিয় থাকে তাহলে তুমি আত্ম নির্দিষ্ট পথে চলবে।
জ্যোতিষ গণনা বিজ্ঞান নির্মিতই হয়েছে আত্মের ভূমিকাকে স্থিত রেখে। তাই যদি তুমি আত্মের দ্বারা পরিচালিত হও, যতক্ষণ সেই ভাবে চালিত হবে, তোমার ক্ষেত্রে জ্যোতিষ প্রায় সঠিক সঠিক বলতে থাকবে। আর যদি তুমি চেতনার মার্গদর্শন অনুধাবন করে চলো, তাহলে জ্যোতিষ কনো ভাবেই তোমার গণনা করতে পারবেনা। … তুমি অবতার, তাই তোমার কথাই স্বয়ং নিয়তির কথা। আর নিয়তির কথা পূর্বলিখিত থাকবেনা। তাই আত্মের নিরিখে সেই সমস্ত কথা মিথ্যা কথা হবে। আর তাই জ্যোতিষ তোমার কথা বলার ক্ষেত্রে বলবে যে তুমি সর্বক্ষণ মিথ্যাকথা বলবে। এবার নিজেই বুঝে নাও, জ্যোতিষ গণনা কতটা বিশ্বাসযোগ্য।
তাই জ্যোতিষ ততক্ষণ তোমার সম্বন্ধে প্রায় সঠিক সঠিক কথা বলবে, যতক্ষণ তুমি আত্ম দ্বারা পরিচালিত, কিন্তু যখন তুমি চেতনার দ্বারা পরিচালিত হয়ে সাধনার পথে চালিত হবে, তখন থেকে জ্যোতিষ কনো ভাবেই তোমার কথা সঠিক ভাবে বলতে সক্ষম হবেনা। সেই জন্য দেখবে, জ্যোতিষ শাস্ত্রে, এমন কনো বিজ্ঞানই নেই যার দ্বারা অনুধাবন করা সম্ভব যে কেউ মোক্ষলাভ করবে না করবেনা, কেউ ব্রহ্মদর্শন করবে না করবেনা। কেন?
কারণ জ্যোতিষ আত্মকেই সত্য মেনে চলে, আর আত্ম তো শূন্যতা থেকে ভীত, সত্য থেকে সঙ্কুচিত। আর তাই জ্যোতিষ শাস্ত্রে শূন্যলাভ বা সত্যলাভের ব্যাপারে একটি শব্দও উচ্চারণ করেনা। অন্যদিকে, কেন প্রায় শব্দ ব্যবহার করলাম যখন তুমি আত্ম দ্বারা পরিচালিত? কারণ তুমি যতই আত্ম দ্বারা পরিচালিত হওনা কেন, শেষ কথা বলবেন নিয়তি, আর নিয়তি হলেন স্বয়ং ব্রহ্মময়ী, অর্থাৎ পরমসত্য, আর তাঁর প্রগতি অনুধাবন করা আত্ম বা আত্মনির্মিত কনো বিজ্ঞানেরই সামর্থ্য নেই। কেন নেই?
কারণ আত্ম কখনোই তাঁকে ঈশ্বরের আগে মা জ্ঞান করতে সক্ষম নয়। কিন্তু বাস্তবে তিনি আগে মা, পরে ঈশ্বর। আর তাই তিনি সমস্ত জীবকে মাতৃত্বদ্বারাই সিঞ্চন করেন, ঈশ্বরত্ব দ্বারা নয়। কিন্তু জ্যোতিষ যখন গণনা করে, তখন তাঁকে মাতা নয়, ঈশ্বর রূপেই গণনা করে, আর সেখানেই ভ্রান্তি করে ফেলে। কেমন ধারার ভ্রান্তি? যেমন ধরো, তোমার জন্মকুণ্ডলী দেখে জ্যোতিষী বললেন যে, ৩০ বছর বয়সে তোমার একটি মৃত্যুযোগ দেখতে পাচ্ছেন তিনি। ৩০ বছর বয়সে গিয়ে কি হলো জানো তোমার? তুমি শূন্যতার দর্শন লাভ করলে, বা অবতারের সাখ্যাত লাভ করলে। জ্যোতিষ এই সত্যলাভকে তোমার মৃত্যু বলেই দেখতে পাবে, কারণ আত্মের কাছে যে সত্যলাভ মানে তার মৃত্যু।
আবার ধর জ্যোতিষী তোমাকে বললেন যে, তোমার কনো দুরারোগ্য ব্যাধি হবে। তুমি সমস্ত প্রকার প্রয়াস করলে যাতে সেই ব্যাধি না হয়। ব্যাধিটি হলোও না, কিন্তু তোমার আত্ম এতটাই এই কথন নিয়ে কেন্দ্রীভূত হয়ে রইল যে, ব্যাধিটি না হতেও, তুমি ধারণা করতে থাকলে যে তোমার ব্যাধি হয়েছে, আর তার ফলে তুমি সমস্ত কিছু হারিয়ে ফেললে, যা কিছু অর্জন করে রেখেছিলে।
মধ্যা কথা হলো এই যে, ঈশ্বরের বিধান আর মায়ের বিধানের মধ্যে বহুল পার্থক্য থাকে, আর তাকে জ্যোতিষ ধারণা করতে পারেনা। যখন যখন জ্যোতিষ দেখেন ঈশ্বরের বা শূন্যতার আভাস আসছে কারুর জীবনে, সে ধারণা করে নেয় যে, হয় তুমি বিপুল ভাবে ভৌতিক সুখ লাভ করবে নয় তুমি কনো বড়সর ভৌতিক বস্তুর ক্ষয়ের সম্মুখীন হবে। কেন এমন ধারণা রাখে জ্যোতিষ? কারণ জ্যোতিষ যে আত্মদ্বারা পরিচালিত, আর আত্মের কাছে যে এই ভৌতিক জগতই সত্য।
তাই ঈশ্বরের প্রবেশ হয় তোমাকে ভৌতিক সুখ দেবে, নয় তোমার ভৌতিক সুখ হনন করবে, এই বিধান জ্যোতিষের। কিন্তু যিনি ঈশ্বর, তিনি যে ঈশ্বর হবার পূর্বে জননী। আর তাই তাঁর প্রেমই হলো তোমাকে ভৌতিক জগতের বেষ্টনী থেকে মুক্ত করে দেওয়া, আর তাঁর দণ্ডই হলো তোমাকে ভৌতিক জগতের বেষ্টনীর মধ্যে আবদ্ধ করে দেওয়া।
কেন? কারণ ভৌতিক জগতের বেষ্টনীর প্রতি তুমি আকর্ষিত হলেই তোমার চেতনা হ্রাস পাবে আর আত্মবোধ উন্মুক্ত হবে। আর অন্যদিকে ভৌতিক জগতের বেষ্টনীর প্রতি উদাসীন হবার অর্থই হলো, তোমার চেতনার বিস্তার হবে আর তুমি সত্যপ্রেমী হয়ে উঠবে। অর্থাৎ জ্যোতিষ প্রায়শই তোমাকে উল্টো কথা বলে থাকে, বিশেষত যখন তুমি প্রকৃতিপ্রেমী বা প্রকৃতিকেন্দ্রিক হবে’।
তাই প্রভুর বলতেন যে, ‘জ্যোতিষের প্রয়োজন কি? ভবিষ্যৎ জানারই প্রয়োজন কি? মা আছেন তো আমাদের দেখভাল করার জন্য। তিনি আমাদেরকে একক একক ভাবে দেখভাল করেন, একক একক ভাবে আমাদেরকে মার্গদর্শন প্রদান করেন। আমাদের যার যেমন অবস্থা, তাকে তেমন সমস্ত কিছু প্রদান করেন প্রকৃতি। যার বিকাশের জন্য যেমন পরিবার প্রয়োজন তেমন পরিবার প্রদান করেন তিনি; যার বিকাশের জন্য যেমন বন্ধু দরকার, তাকে তেমন বন্ধুসঙ্গ প্রদান করেন তিনি; যার বিকাশের জন্য যেমন বিদ্যাধারা আবশ্যক, তাকে তেমন বিদ্যর ধারা প্রদান করেন তিনি; যার বিকাশের জন্য যেমন বেষ্টনী প্রয়োজন, তিনি তেমন বেষ্টনী প্রদান করেন।
তাই প্রয়োজন কি জ্যোতিষের! প্রয়োজন কি আগে ভাগে ভবিষ্যৎ জানার! … আমাদের জননী দায়িত্ব নিয়ে রেখেছেন যে, আমাদের অতীত যেমনই হোক না কেন, আমাদের বর্তমান যেন হতাশাদায়ক না হয়, আমাদের বর্তমান যেন আমাদেরকে শিক্ষা প্রদান করা থেকে কুণ্ঠিত না থাকে, আমাদের সত্যের পথে থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে না হয়। তাই বর্তমানেই স্থিত থেকে, সত্যের পাঠ গ্রহণ করলেই তো হয়’।
তিনি এই ক্ষেত্রে হতাশ হয়েই বলেন, ‘যদি মনুষ্য যোনি ভবিষ্যতের চিন্তা না করে, বর্তমানে তাঁদের জননী তাঁদের কি দিয়েছেন, সেই দিকে মনোনিয়োগ করতো, আর তার থেকে পাঠ গ্রহণ করতে থাকতো, তাহলে সমস্ত যোনি মনুষ্য যোনির প্রতি বিরক্তও হতো না, আমাকেও তাই আসতে হতো না, আর মনুষ্যযোনিকে অন্তিমবার সতর্কও করতে হতো না’।
আরো বলতেন তিনি এই বিষয়ে যে, ‘সর্বক্ষণ ভবিষ্যৎকে আগে ভাগে জানার প্রয়াস করে করে, নিজেদের ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত করার প্রয়াস করে করে, আজ মনুষ্যযোনি এই স্থানে এসে পৌঁছেছে যে, সম্ভবত তাদের ভবিষ্যৎ বলেই আর কিছু থাকবেনা, কারণ তাদের সম্ভবত নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে হবে। তাহলে ভবিষ্যৎ জেনে জেনে কি লাভ হলো! … মনুষ্য যোনি কনোদিনই এই সত্যকে স্বীকার করতে পারলো না যে, যে যেমন সে সেই ভাবেই সুন্দর।
অতীত সুন্দর কারণ তা অতীত বলে, বর্তমান সুন্দর কারণ তা বর্তমান বলে, ভবিষ্যৎ সুন্দর তা ভবিষ্যৎ বলেই। সর্বদা যার যা সৌন্দর্য, তাতে অসন্তোষ প্রকাশ করে করে, তাকে অতিসুন্দর করতে গিয়ে মনুষ্যযোনি সমস্ত সুন্দরকে নষ্ট করে ফেলেছে, আর যা বাকি আছে তাকেও নষ্ট করার দিকে অগ্রসর। …
নারী যেমন, তেমনই সুন্দর। তাকে সামান্য স্বচ্ছ করলে, তবেই তা সুন্দর। কিন্তু না, মানুষের সাধ তাকে শ্রেষ্ঠ সুন্দর দেখাতে হবে। আর তা দেখাতে গিয়ে কত কত দম্পতির সংসার ভেঙে দিয়েছে, কারণ সৌন্দর্যের প্রলেপ মুছে গেলে, স্ত্রীর নিজস্ব সৌন্দর্য তখন স্বামীর কাছে অপ্রিয় লাগা শুরু হয়ে গেছে। …
বৃক্ষ যেমন আছে, তেমনই সুন্দর। তার ডালপালাকে ছাঁটতে ছাঁটতে সেই বৃক্ষটিকেই হত্যা করে দিয়েছে। সেই বৃক্ষের ফলনকে অতিকায় করতে গিয়ে, বৃক্ষ নিজের লাবণ্য হারিয়ে স্বল্পসময়ে দেহত্যাগ করে দেয়। বন্যের পশু বনেই সুন্দর। বন থেকে গৃহে তুলে এনে, বনকেও অসুন্দর করে দিয়েছে, আর গৃহকেও। সমস্ত সুন্দরকে আরো সুন্দর করতে গিয়ে, সমস্ত ধরণীকে কুৎসিত করে তুলেছে মনুষ্য। এতটাই কুৎসিত করে তুলেছে যে, সমস্ত যোনি আমার কাছে এসে আবেদন করতে বাধ্য হয়েছে যে, এই মনুষ্যযোনির নাশ যেন শীঘ্র হয়।
একটি সত্য এখনো মনুষ্য অনুধাবন করতে পারলো না যে, এক আমাদের মা-ই সত্য, তিনি বিনা কিচ্ছু সত্য নয়। কালের নিয়ন্তা রূপে তিনিই নিয়তি, যাকে নিয়ন্ত্রণ করেন তিনি, সেই প্রকৃতিও তিনি, আর সেই নিয়ত্রন করে যাকে শিক্ষা প্রদান করেন, সেই চেতনাও তিনি। যদি এই সত্যকে একবার মনুষ্য বুঝে যেত, তাহলে আর আত্ম আত্ম করে মাথাখারাপ করতো না, নিজের জননীর কাছে নিজেকে অর্পণ করে নিজেও আনন্দ লাভ করতো আর আমাদের মায়েরও আনন্দের কারণ হতো’।
আর এই সমস্ত কিছুকে আশ্রিত করে, প্রভু তৃতীয় প্রকৃতিশিক্ষার স্তম্ভকে ধারণ করে, মর্মার্থ রূপে বলেন যে নীতি কি আর অনীতি কি; আর সেই থেকে তিনি অন্তিম ও পঞ্চম আকরিক, অর্থাৎ ধর্মাধর্মের মর্মার্থ অনুধাবনের পথে অগ্রসর হন। তিনি বলেন, “প্রকৃতির কোলে স্থিত হয়ে, কালের মার্গদর্শন যা, সেই অনুসরণ করাই নীতি, আর তার বিরোধিতা করে করে আত্মসর্বস্ব হয়ে যাওয়াই অনীতি। কাল যদি হত্যা করতেও বলে, সেই হত্যা করাও নীতি, আর আত্ম যদি রক্ষা করতেও বলে, সেই রক্ষা করতে যাওয়াও অনীতি’।
আর ধর্মাধর্মের ক্ষেত্রে প্রভু বলেন, “আত্মের চিন্তন করাই অধর্ম। আমার কি হবে, আমার কি হলো, আমি কি পেলাম, এই হলো অধর্ম। আর আমি কি দিলাম, আমি কি প্রদান করলাম, এটিই হলো ধর্ম’। ধর্মাচরণের পথকে প্রভু বলতেন যোগ, কারণ তা আমাদেরকে মাতার সাথে যুক্ত করে, আর সেই পথকে তিনি আরো দুই নামে ডাকতেন, জ্ঞানার্জন ও প্রেমার্জন। কেন?
তিনি বলতেন, ‘সম্পূর্ণটা মিলেই তো জ্ঞানার্জন। গ্রন্থ পাঠ করে, শ্লোক মুখস্ত করে কি আর জ্ঞান লাভ হয়! না তো। জ্ঞানার্জনের প্রথম চরণই হলো প্রকৃতিপ্রদত্ত পাঠ লাভ করে করে ধারণা করা। অতঃপরে তাকে যুক্তিদ্বারা বিশ্লেষণ করে এবং প্রকৃতির মার্গদর্শন অনুসারে কর্ম করে, সেই সমস্ত জ্ঞানকে প্রত্যক্ষ করা। যখন আমরা তা প্রত্যক্ষ করতে কর্ম করতে চাই, তখন আমাদের বহুল ধারণা পালটে যায়, আর সেই সমস্ত পালটাপালটি হয়ে ঠিক ঠিক জ্ঞান ধারণা হয়।
সেই ধারণ করা জ্ঞানের সাথে এবার যুক্ত হয় কর্ম করার ফলে, কর্মের অভিজ্ঞতা, আর এই অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান একত্রিত হয়ে প্রস্তুত হয় অনুভূতি। সেই অনুভূতি আমাদের ক্রমশ মাতাকে চেনাতে থাকে, বলতে থাকে যে তিনি আগে মা আর পরে ঈশ্বর, বলতে থাকে যে তাঁর কাছে প্রেম প্রথম অতঃপরে বিধান, রীতি। আর শেষে গিয়ে তা আমাদের হৃদয়কে আমাদের মাকে ফিরে পাবার জন্য ব্যকুল করে তোলে। তাঁর প্রেম তো পূর্বেই লাভ হয়ে যায়, তাঁর শাসন রূপে, তাঁর বকাঝকা রূপে, তাঁর ব্যাথা পেলে আদর রূপে। আর সেই সমস্ত কিছু তিনি করছেন, যখন অনুভূতি জাগে, তখন পাগল পাগল লাগে, আর আমাদের হৃদয় বলে ওঠে, মা তুমি কোথায়! সর্বক্ষণ তোমার প্রেম পাচ্ছি, কিন্তু তোমাকে পাচ্ছিনা।
ঠাকুর বলতেন, একবার তাঁকে পেয়ে গেলে, তিনিই বুঝিয়ে দেন, তিনি সাকার না নিরাকার, সত্য না ভ্রম। সত্যই তা। এই ব্যকুলতা যখন তাঁকে একবার প্রত্যক্ষ করে দেয় হৃদয়ের সকাশে, তখন সত্যই অনুভব হয়ে যায় যে, সাকারকে কতই সাজাও, সে নিরাকারের মত সুন্দর হতেই পারেনা, কারণ নিরাকার মানে যে অনন্ত আর সাকার মানেই যে অন্তময়, নিরাকার মানেই যে অবিনশ্বর আর সাকার মানেই নশ্বর, নিরাকার মানেই অসীম আর সাকার মানেই সসীম’।
আর তিনি বলতেন, ‘যখন এই অবস্থা হয় জীবের, তখন সে সংসারে থাকুক বা গুহায় সর্বক্ষণই সন্ন্যাসী; সে তখন একাকী থাকুন বা রমণীর শয্যায়, সে তখন সম্পূর্ণ ভাবে বৈরাগী হয়ে যায়; তার কাছে আর তখন কনো যোনির ভেদ থাকেনা, সকলেই সন্তান হয়ে যায়; ভিড় সড়কে থাকুক বা নির্জন গুহায়, সে সর্বক্ষণ অন্তর্মুখী হয়ে যায়। আর তেমন করতে এক সময়ে তার হয়ে যায় সমাধি, অর্থাৎ একাকার হয়ে যায় মায়ের সাথে।
যদি নিত্যের থাক হয়, ঈশ্বরকটি হয় সেই সমাধি থেকে ফিরে এসে মায়ের কাজ করতে থাকে, মায়ের সমস্ত সন্তনাদের কাছে মায়ের প্রকৃত পরিচয় প্রদান করতে থাকে, আর যদি জীবকটি হয়, তাহলে আর সমাধি থেকে ফেরে না। ফিরলেও সে হয়ে থাকে সিদ্ধ আর তাই আর কিছু দিবসই দেহ রাখে, তারপর দেহ ত্যাগ করে দেয় চিরতরে, আর জীবনমৃত্যুর চক্রে স্থিত থাকেনা সে। দেহ যে তার কাছে সম্পূর্ণ ভাবে ভ্রম হয়ে গেছে, আর সে দেহ রাখবে কি করে!’
এই ছিল প্রকৃতির থেকে সম্পূর্ণ শিক্ষা অর্জনের কথার মর্মার্থ। প্রভুর থেকে আমি কেবল মর্মার্থই লাভ করেছি। হ্যাঁ আমি তাতে তৃপ্ত হয়েও অতৃপ্ত। জানিনা কেন অতৃপ্ত, হয়তো প্রভুর কণ্ঠস্বরেই আমার নেশা হয়ে গেছিল, তাই অতৃপ্ত। কিন্তু ইচ্ছা হয় যেন পরাপ্রকৃতির থেকে সম্যক এই প্রজ্ঞা লাভ করি, মর্মার্থ নয়। (মনের খেয়ালে হেসে) ইচ্ছা হলেই তো আর হলো না, সেই যোগ্যতা কি আমার আছে! জানিনা”।
ভূমি প্রশ্ন করলেন, “আচ্ছা দিদি, এই সমস্ত কিছু প্রত্যক্ষ কি যে কেউ করতে পারে? তুমি পেরেছ, তাও তুমি বলছো প্রভুর মার্গদর্শনের কারণেই তোমার এই পারা সম্ভব হয়েছে। তাহলে আমাদের পক্ষে কি এই সমস্ত শিক্ষা গ্রহণ করা সম্ভব!”
মীনাক্ষী হেসে বললেন, “সম্ভব, অবশ্যই সম্ভব। তবে তার জন্য প্রভু সেই যে বলে গেছিলেন, ধনশূন্য সমাজের প্রয়োজন। ধন আর ধনের নেশা আর ধনের যারা নেশা করেন নিত্য, এঁদের প্রভাবে থাকলে আমাদেরকে এই তিনজন সর্বক্ষণ প্রয়াস করবে সত্য থেকে দূরে স্থিত করতে, প্রকৃতির থেকে শিক্ষা গ্রহণ তো দূরে থাক, প্রকৃতির থেকেই আমাদের দূরে স্থিত করে এক যান্ত্রিক কাল্পনিক জগতে বন্দী করে দেবে। তাই সেই ধনশূন্য জগত অত্যন্ত আবশ্যক, যাকেই আমার জ্যেষ্ঠা, আমার মাতাসমান দেবী দিব্যশ্রীর চেতনা, মাতা সর্বশ্রী শ্রীপুর রূপে স্থাপন করে রেখেছেন, বিজয়াদি, জয়াদি আর এই সমস্ত তন্ত্রসন্তানদের সহায়তায়”।
অরিত্রা বললেন, “কিন্তু আমরা আমাদের ক্ষেত্রে একে স্থাপন করবো কি করে? তার উপায় কি?” রোজ বললেন, “আমার সাথে একাধিক মানুষ যুক্ত আছে, কিন্তু যুক্ত থেকেও তারা পিছিয়ে যাচ্ছে এই মনোভাব ব্যক্ত করে যে, আমরা দাবি করলেই কি আমাদেরকে এই কর্ম করতে দেওয়া হবে!”
