২১। প্রকৃতজ্ঞ অধ্যায়
অরিত্রা প্রশ্ন করলেন মীনাক্ষীকে, “দিদি, প্রকৃতিকে কি ভাবে জানা যায়? প্রকৃতির থেকে কি ভাবে শিক্ষা নেওয়া যায়? কি কি শেখা উচিত তাঁর থেকে, আর কি ভাবে তা শেখা যায়?”
মীনাক্ষী হেসে উত্তরে বললেন, “প্রকৃতি কি? প্রকৃতি হলেন আমাদের সম্মুখে যা কিছু স্থিত, তাদের চেতনার সমষ্টি। অর্থাৎ আমাদের জননী স্বয়ং। সেহেতু প্রকৃতির থেকে যা শেখা প্রয়োজন তোমার, তাই তোমার সম্মুখে তিনি রাখবেন। প্রথম এই ব্যাপারটিকে স্মরণে রাখা অত্যন্ত আবশ্যক। প্রকৃতি বাহ্য কেউ নন, প্রকৃতি হলেন আমাদের নিজেদের জননী। আমাদের দেহের, মনের, সমস্ত কিছুর সমস্ত উপাদান তাঁর থেকেই গৃহীত। আর একজন মা কখনোই সন্তানের সম্মুখে অহেতুক বস্তু রাখেন না। কেবল যা শেখা উচিত সন্তানের, তাই তাঁর সম্মুখে রাখেন। তাই প্রকৃতিও সম্মুখে তাই রাখেন আমাদের, যা আমাদের শিক্ষণীয়।
অর্থাৎ, বাছাবাছির কনো প্রয়োজন নেই যে কি শেখা উচিত প্রকৃতির থেকে, আর কি শিক্ষণীয় নয়। যা আমাদের জন্য শিক্ষণীয়, তাই প্রকৃতি আমাদের জীবনের সম্মুখে রাখেন। তাই প্রকৃতির থেকে সমস্ত কিছুই গ্রহণ করার। বর্জন করার ন্যায় কিচ্ছুই নেই। তবে এখানে অনেক খুঁটিনাটি ব্যাপার আছে, বিশেষত সেই বিষয়ে, যেই বিষয়ে আমরা প্রায়শই ভুল করে ফেলি”।
২১.১। প্রকৃতিশিক্ষা পর্ব
ভূমি জিজ্ঞাসু হয়ে বললেন, “কি সেই ব্যাপার সমূহ দিদি? সেগুলি সম্বন্ধে আমাদের আগে সচেতন করো, যাতে আমাদের যাত্রার পথে আমরা যথাসম্ভব কম ভ্রান্তি করি”।
মীনাক্ষী মিষ্ট হাস্য হেসে বললেন, “আমাদের স্বভাবে দুটি জিনিস অত্যন্ত স্বাভাবিক ভাবে দেখা যায়। প্রথম এই যে, যাকিছু আমাদের সম্মুখে আসে, আমরা তাকে আমাদের ভালো লাগা বা খারাপ লাগা, এই দুই ভাগে বিভক্ত করে নিই। আর দ্বিতীয়ত এই যে, এই খারাপ লাগা বস্তুর থেকে আমরা দূরত্ব স্থাপনের প্রয়াস করি, আর ভালো লাগা বস্তুদের প্রতি আসক্ত হয়ে যাই।
প্রথম কথা এই যে, এই ভালো লাগা আর খারাপ লাগাতে বিভাজন করাই আমাদের প্রথম ভ্রান্তি। মীমাংসা কখনোই আমাদের কি লাগলো, তার ভিত্তিতে হতে পারেনা। এমন অনেক জিনিস হয়, যা বাস্তবে অত্যন্ত খারাপ, কিন্তু আমাদের তা ভালো লাগে। যেমন? যেমন নেশার সমূহ দ্রব্যকে আমাদের অত্যন্ত ভালো লাগে, কিন্তু বাস্তবে তারা ঘাতক। এঁদের মধ্যে যেমন দেহনাশী নেশাসামগ্রী যেমন তামাকজাতীয় বস্তুরা থাকে, তেমন চরিত্রনাশী নেশাসামগ্রী যেমন দেহকাম বা ধনসম্পদও রয়েছে।
আবার অন্যদিকে দেখো, এমন অনেক কিছু রয়েছে যা বাস্তবে অত্যন্ত সৎগুণ বিস্তারক, কিন্তু তা আমাদের খারাপ লাগে। এঁদের মধ্যে যেমন ইতিহাসের পাঠ রয়েছে, তেমন রয়েছে ধ্যান সমাধি ইত্যাদি। এই সব জিনিসের থেকে আমরা পলায়নের প্রয়াস করি, কিন্তু তা অত্যন্ত অধিক ভাবে আমাদেরকে উন্নীত ও মুক্ত করে তোলে।
তাই আমার ভালো লাগলো না খারাপ লাগলো, এর কনো মূল্য দেওয়ার অর্থই হলো আমরা ভ্রান্তির পথে চলমান। অর্থাৎ, প্রকৃতির থেকে শিক্ষা নেবার জন্য প্রথম এই ভালো লাগা আর খারাপ লাগার থেকে আমাদের মুক্ত হতে হয়। কি ভাবে মুক্ত হবো এঁর থেকে? মুক্ত হবার উপায় হলো যুক্তি। যুক্তি দ্বারা বিচার করে, তবেই কনো জিনিস ধারণ করা কর্তব্য আমাদের।
যদি আমরা নিজেরা ভালো লাগা বা খারাপ লাগাকে গুরুত্ব নাও দিই, তাও এমন হয় যে, আমাদের ঘনিষ্ঠ কেউ সম্মুখে এসে দাবি করেন, এটি ভালো বা এটি খারাপ। তাই সেই ব্যক্তি যেই হন না কেন, আত্মীয় হন, স্বজন হন, গুরু হন, বা জনকজননী হন, স্মরণ রাখবে সত্যের উপরে কেউ নন। স্বয়ং আমাদের মাও নিজেকে সত্যের উপরে স্থান দেন না বলে, নিজেকে ঈশ্বরী বলেননা, বরং নিজেকে মা রূপে স্থাপন করেন।
তাই যেকালে, স্বয়ং ব্রহ্মময়ী নিজেকে সত্যের উপরে স্থান প্রদান করছেন না, সেখানে জনকজননী, গুরু, স্বজন, আত্মীয়, গুরুজন, কেউই সত্যের উপরে স্থান পেতে পারেন না। তাই, যেই হোক, যখন তোমার সম্মুখে তিনি কনো কিছুকে ভালো বা খারাপ বলে প্রতিপন্ন করছেন, তোমাদের কর্তব্য হলো তাঁকে প্রশ্ন করা এবং যুক্তি সহকারে তাঁর থেকে জানতে চাওয়া যে তা কেন সঠিক বা কেন বেঠিক।
আমার পূর্বপুরুষ এমন করতেন, সেই কারণে কনো কাজ, কনো রীতি, কনো কিছু সঠিকও হয়ে যায়না, আবার বেঠিকও হয়ে যায়না। সেই কাজে যদি যথার্থ যুক্তি থাকে, তবেই তা গ্রহণ করো, নাহলে তা বর্জন করো। স্মরণ রাখবে, অন্ধবিশ্বাসের অপেক্ষা অবিশ্বাস অনেক অনেক শ্রেয়, কারণ অবিশ্বাসীকে আমাদের মা স্নেহ করতে কনো ভাবে কুণ্ঠিত থাকেন না, কিন্তু অন্ধবিশ্বাসীর দিকে তিনি ফিরেও তাকান না। তাই কনো কিছুকে অন্ধবিশ্বাসের ভরসায় গ্রহণ করবেনা। না নিজে ভালো লাগা খারাপ লাগা রূপে তা ধারণ করবে, আর না অন্যের ভালো লাগা বা খারাপ লাগাকে প্রাধান্য দেবে, আর না পূর্বপুরুষ থেকে চলে আসছে বলে কনো কিছুকে, কনো রীতিকে, কনো প্রথাকে গ্রহণ বা বর্জন করবে।
স্মরণ রাখবে, এই প্রকৃতিতে কনো কিছুই ব্যবহারযোগ্য রূপে উপলব্ধ নয়। সমস্ত কিছুই এখানে আকরিক ভাবে উপলব্ধ, আর তাকে যুক্তিদ্বারা বিশ্লেষণ করেই গ্রহণ করতে হয়। বিচার করে দেখতে পারো এই কথাকে। সমুদ্রমন্থন করে তৈললাভ হয়, কিন্তু সেই তৈলতে তুমি অগ্নি সংযোগ করলেও, তা জ্বলে না। সেই তেলকে যখন তুমি আকরিক অবস্থা থেকে পরিবর্তিত করবে, তখনই তা জ্বালানি হয়ে ওঠে।
একই ভাবে দেখো, খনি থেকে যেই কয়লা উদ্ধার হয়, তা কালো ত্যালত্যালে মাটির থেকে কনো ভাবে ভিন্ন নয়। তাকে শুকনো করে তবেই তাকে জ্বালানি রূপে ব্যবহার করা যায়। সেই কারণেই খেয়াল করে দেখবে, বিশেষ কিছু জীব বাদে, কনো জীবই বৃষ্টির জল পান করেনা। সেই জল মাটিতে পতিত হয়ে জমা হয়ে থাকার পর যখন মাটির গুণ সেই জলকে পানীয় জলে পরিণত করে, তখনই তা গ্রহণ করে।
অর্থাৎ এই যে, যা কিছু তুমি জীবনে লাভ করবে, তা সমস্তই প্রকৃতির দান। তার থেকে শিক্ষা গ্রহণ তোমার কর্তব্য বলেই তোমার কাছে তা উপলব্ধ হয়েছে। কিন্তু তাদের একটিকেও তুমি সরাসরি গ্রহণ করতে পারবেনা, কারণ সেই সমস্ত কিছুই আকরিক অবস্থাতে থাকে, ব্যবহারযোগ্য অবস্থাতে থাকেনা। যুক্তিদ্বারা তাকে আকরিক অবস্থা থেকে ব্যবহার যোগ্য অবস্থায় আনায়ন করতে হয়, তবেই তা গ্রহণ করা যেতে পারে।
সরিষার বীজ থেকে তৈল নিঃসৃত হয়, যা জ্বালানির কাজও করে আবার রন্ধনের কাজও করে, আবার অঙ্গের ত্বককে বাষ্পও প্রদান করে। কিন্তু যদি সেই বীজ তুলে নিয়ে অঙ্গে লেপন করো, তার থেকে কনো বাষ্প লাভ হবেনা, তা দিয়ে প্রদীপও জ্বলবে না, আর তা দিয়ে রন্ধন কর্মও সম্পন্ন হবেনা। ঠাকুর রামকৃষ্ণদেবও এই একই কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, “সিদ্ধি সিদ্ধি বলে চেঁচালে নেশা হয়না। সিদ্ধি বেটে খেতে হয়, তবে নেশা হয়”।
তেমনই প্রকৃতির থেকে লব্ধ কনো কিছুই ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় থাকেনা। তা থাকে আকরিক অবস্থাতে। আর যুক্তি সহায়তায় তাকে ব্যবহারযোগ্য করে নিতে হয়, তবেই তাকে দিয়ে কনো কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হয়।
তাই প্রথম কথা এই যে, প্রকৃতি তোমার জীবনে তাই সম্মুখে রাখেন, যা তোমার শিক্ষা লাভ করার জন্য উপযুক্ত। তাই তাদের মধ্যে একটিকেও ভালো লাগে বা খারাপ লাগে, নিজের বা অন্যের এই অন্ধবিশ্বাস দ্বারা বর্জন তো করবেই না। আর দ্বিতীয় কথা এই যে, বর্জন না করার পর, তাকে যখন গ্রহণ করবে, তখন তা জমিয়ে রেখে দিয়ে কনো লাভ নেই।
ঘর ভর্তি করে আকরিক লহা, আকরিক কয়লা, সিদ্ধি, তামাকপাতা, বিড়িপাতা জমিয়ে রেখে কনো লাভ নেই। তারা কনো কাজে আসবে না। বরং একটি সময়ের পর তারা নষ্ট হয়ে যাবে। তেমনই জীবন তোমাকে যা কিছু দিচ্ছে, তার প্রতি আসক্ত থেকে কনো লাভ নেই। তা গ্রহণ করে সঞ্চয় করে কনো লাভ নেই। ঠিক যেমন আমি তোমাকে এখন যেই কথাগুলি বলছি, সেই কথাগুলিকে তোমাদের মস্তিষ্কে সঞ্চিত করে রেখে কনো লাভ নেই। এক সময়ে সেই কথাগুলি হারিয়ে যাবে, আর যতক্ষণ থাকবেও স্মরণে, তখনও তা কনো ফল দেবেনা।
তাহলে করনীয় কি? যুক্তির দ্বারা সেই কথাগুলিকে বিচার করা, আর বিচার করে যা উপলব্ধি হবে, সেই উপলব্ধিকে সঞ্চয় করে রাখতে হয়। সেই উপলব্ধিই হলো ব্যবহারযোগ্য পদার্থ, আর তারাই তোমাদেরকে অগ্রগতিশীল করবে। অর্থাৎ আমি ধর এখন যা বলছি, বা যেই রীতির কথা একটু আগে বললাম, ধর তোমরা সেই রীতিগুলিকে স্মরণে রেখে দিলে, আর তাকে কেবল রীতিরূপে ব্যবহার করলে। তাতে কি হবে?
অন্ধবিশ্বাস জন্ম নেবে, আর তোমার পরবর্তী প্রজন্ম সেই একই কথা বলবে, ‘আমার পূর্বপ্রজন্ম এটি করে আসতেন। তাই এটিই প্রথা, এটিই করা উচিত’।
তাহলে কর্তব্য কি? কর্তব্য এই যে, সেই রীতির মধ্যে থাকা যেই দর্শন অর্থাৎ যুক্তির কথা বলা হয়েছে, তাকে ধারণ করা, আর তাকে পালন করা, এবং পরবর্তী প্রজন্মকে অবশ্যই এই কথা বলা যে, ‘এই রীতি যখন পালন করবে, তখন অবশ্যই সেই রীতির পশ্চাতে থাকা যুক্তির কথা দর্শনের কথা ব্যক্ত করবে যাতে, রীতিটি কেবল প্রথার মত করে প্রবাহিত না হয়, রীতির সাথে সাথে রীতির অন্তরে বিরাজমান দর্শন ও যুক্তিও প্রবাহিত হয়, এবং কখনোই অন্ধবিশ্বাস প্রসারিত না হয়, তা স্মরণ রাখবে।
এটিই প্রকৃতির থেকে শিক্ষা গ্রহণের প্রথম পদক্ষেপ। সমস্ত কিছুকে গ্রহণ করো, আর সমস্ত কিছুকে যুক্তি দ্বারা বিশ্লেষণ করো যাতে প্রকৃতি প্রদত্ত আকরিক অবস্থায় থাকা শিক্ষণীয় সামগ্রী, বাস্তবে শিক্ষণীয় হয়ে ওঠে। কেমন ব্যাপার জানো এটি? ঠিক যেমন একটি শিশু।
একটি শিশু হলো একটি আকর। কেন আকর সে? কারণ তার মধ্যে থাকা প্রতিভা সমূহ সকলই সুপ্ত। বাহ্যে সেই প্রতিভার কনো রূপ প্রকাশ নেই। একই ভাবে দেখো, একটি মৃত্তিকার ঢেলা, যার কনো আকার নেই, আর তাই সে হলো আকর। এবার এই শিশুকে আর মাটিকে আকার প্রদান করতে হয়। কি ভাবে?
মাটিকে খরের উপর লেপন করতে হয়, তবেই তা আকার ধারণ করা শুরু করে। শিশুকেও বিদ্যালয়ে, সঙ্গীত ও কলাক্ষেত্রে, ক্রীড়াক্ষেত্রে এবং চিত্রাঙ্কন ক্ষেত্রে প্রেরণ করতে হয়। কেন? বিদ্যালয় যেখানে শিশুকে বাহ্যিক ভৌতিক জগত, মানব সমাজ, মানব দেহ, ইত্যাদি সম্বন্ধে শিক্ষা প্রদান করে, শিশুর অন্তরে সুপ্ত প্রতিভাকে হাতছানি দেয়, ঠিক তেমনই ক্রীড়া শিশুর মধ্যে সময় ও গতির বাস্তবিক ধারণা প্রদান করে। সঙ্গীত ও কলা যেকালে শিশুর মধ্যে বাস্তবিক ধ্বনির জ্ঞান প্রদান করে, শিশুর অন্তরে ধ্বনি নিয়ে বিস্তারের সূচনা প্রদান করে, সেখানে চিত্রাঙ্কন শিশুর চিত্তে সপ্তরং তথা আলোছায়ার ভাষার বিস্তার করে।
আর এই ভাবে দেখো, আকরিক মাটিও যেমন মূর্তি নির্মাণ করার পথে অগ্রসর হয়, তেমন রক্তের ডেলা শিশুও নিজের অন্তরের প্রতিভাদের সন্ধান পেতে শুরু করে করে শৈশব ত্যাগ করে বাল্য অবস্থায় চলে যায়। জন্মের ক্ষণ থেকে ৬ বৎসর অবস্থা পর্যন্ত হলো শৈশব। এই সময়ে শিশুকে নিজের মত করে ছেড়ে দিতে হয়, এবং গুরু, আচার্য, সমাজ ইত্যাদির সম্বন্ধে ধারণা প্রদান করে, শিক্ষা গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত করতে হয় তাদের চিত্তকে।
যেমন শিশুর অন্তরের প্রশ্ন করার প্রয়াসকে প্রশ্রয় দিয়ে দিয়ে বিচারশীলতা প্রদান করতে হয় এই সময়ে, তেমন এই সময়ে শিশুকে একজন নিষ্ঠাবান শ্রোতা ও দর্শক করে তুলতে হয়। এই সময়ে যদি শিশুকে নিরপেক্ষ দর্শক ও শ্রোতা না করে তোলা হয়, তাহলে সম্মুখের জীবনে শিশু প্রায়শই ভ্রমিত পথে চালিত হবে, এবং সমাজকে সমানে যান্ত্রিক করে করে প্রকৃতিবিরোধী করে তুলে, মানবজাতিকে সত্যভ্রষ্ট করে, সম্পূর্ণ মানবযোনিকেই নিশ্চিহ্ন করে দেবার পথে অগ্রসর হবে। এই সময়ে যদি যুক্তিবাদী না করে তোলা হয় শিশুকে, তাহলে সে নিজের বয়োবৃদ্ধির সাথে সাথে সমানেই অন্ধবিশ্বাসী হবার দিকে অগ্রসর হতে থাকবে।
তাই এটি শিশুকে শিক্ষা প্রদান করার সময় নয়। এটি তাঁকে সংখ্যাজ্ঞান ও অক্ষরজ্ঞান প্রদান করার সময়, আর সাথে সাথে তার অন্তরে অসংখ্য জিজ্ঞাসাকে দানা বাঁধাতে হয়, সঙ্গে সঙ্গে তাঁর অন্তরে নিরপেক্ষতা স্থাপন করে সমস্ত কিছুকে নিষ্ঠাবান ভাবে দর্শন করতে ও শ্রবণ করতে শেখাতে হয়।
এবার প্রশ্ন এই যে, কি ভাবে শিশুকে তা শেখাবে? শিশু একটি আকর, নরম মাটির ডেলা। ঠিক যেমন নরম মাটির ডেলাকে যেকোনো আকার দেওয়া যায়, তেমনই একটি শিশুকেও যেকোনো আকার দেওয়া যেতে পারে। একটি শিশু স্বাভাবিক ভাবেই নিজের জনকজননী অর্থাৎ অবিভাবকের অনুকরণ করতে সচেষ্ট থাকে। তাই শিশুর অবিভাবক যা যা করেন, শিশুও তাই তাই করেন। অর্থাৎ শিশুর অবিভাবক যদি নিরপেক্ষতা ধারণ করে নিষ্ঠাসহকারে কনো কিছু দেখেন বা শোনেন, শিশুও সেই অভ্যাস করে নেয়।
আমার ছোটোবৌদি আমাকে পড়তে বসাতেন না। তিনি আমার সামনে বসে বসে অক্ষরজ্ঞানের বই, সংখ্যাজ্ঞানের বই খুলে নিজে পড়তেন। সেই দেখে, আমি বৌদির কাছে ঘেঁসে ঘেঁসে দেখতাম বৌদি কি করে। বৌদি যখন হেঁসেলে চলে যেত, আমি তখন বৌদির পড়ার বইগুলো নিয়ে পড়তে চেষ্টা করতাম। কিচ্ছু বুঝতে পারতাম না। বৌদি পর্দার আড়াল থেকে আমাকে এমন করতে দেখতেন আর মুখ টিপে টিপে হাসতেন। এমন কিছুদিন যাবার পর যখন বৌদি পড়তে বসতো, তখন আমি তাঁর পাসে চুপটি করে বসতাম। বৌদির নকল করতাম, আর এই ভাবেই অক্ষরজ্ঞান বা সংখ্যাজ্ঞান অর্জন করি।
বৌদি কিন্তু পড়তেন না। বৌদি আগে থেকেই জানতেন সমস্ত কিছু। আমাকে পড়ানোর আর শেখানোর এই কৌশল ছিল বৌদির। শিশু নকল করতে খুব ভালো বাসে। তাই তার সামনে তাই তাই করতে হয়, যাকে যাকে সে নকল করবে, আর নকল করতে করতে তা শিখে যাবে। তাই শিশুকে কনো কিছু শেখানো কখনোই কঠিন জিনিস নয়। তার সামনে তুমি পড়তে বসো, সেও পড়তে বসে যাবে। তার সাথে কনো শব্দ নিরীক্ষণ করে তুমি শ্রবণ করো, সেও শ্রবণ করতে থাকবে। তার সামনে তুমিও কনো কিছুকে দেখো, সেও দেখতে থাকবে। তাকে তুমি প্রশ্ন করো, সেও প্রশ্ন করতে শিখে যাবে।
এই ভাবে শিশুর অন্তরে নিরপেক্ষ দর্শন ও শ্রবণ, অক্ষর ও সংখ্যাজ্ঞান, এবং প্রশ্ন করার মানসিকতা তথা শিক্ষা অর্জন করতে নিষ্ঠাবান করার সময় হলো তাঁর ছয় বৎসর বয়স পর্যন্ত। তাঁর ছয় বৎসর বয়স পর্যন্ত যদি এমন করো, তাহলে সেও তা শিখে যাবে, এবং বাল্য অবস্থায় অর্থাৎ আকরিক অবস্থা থেকে উন্নত হওয়ার অবস্থায় চলে যাবে।
প্রভু ব্রহ্মসনাতনের থেকে শুনেছি। তাঁর কাছে জননী বা অবিভাবক মানে কেবলই মা জগদ্ধাত্রী ছিলেন। মা জগদ্ধাত্রীর মূর্তির দিকে তিনি শিশুকালে তাকিয়ে দেখতেন, নির্লিপ্ত ভাবে তিনি তাঁকে দেখেই যান। নিশ্চিত হবার জন্য, তিনি নিজের অবস্থান বাম থেকে ডান করতেন, সম্মুখ থেকে পশ্চাৎ করতেন, কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি দেখতেন মা তাঁকে দেখেই যাচ্ছেন। সেই দেখে দেখে তিনি নির্লিপ্ত ভাবে দেখতে শেখেন।
সমস্ত অবস্থায় তিনি মা জগদ্ধাত্রীকে দেখতেন অবিচল ভাবে একস্থান অবস্থান করে সমস্ত কিছুকে বিনা স্পর্শ করে, বিনা লিপ্ত হয়ে দেখে যেতে। সেই দেখে দেখে তিনি প্রকৃতির কনো কিছুকে স্পর্শ করতেন না, কিন্তু সমানে নিরীক্ষণ করতে শেখেন। কুকুর, বিড়াল, গরু, গাছপালা, পাখি, নদী, সমস্ত কিছু দেখতেন তিনি, কিন্তু কারুকে স্পর্শ করতেন না, কারুর সাথে লিপ্ত হতেন না। শিশুর এমনই বিশ্বাস হয়। মা যা করছেন, সেটিই সঠিক। তাই মা শিশুর কাছে যেমন থাকেন, শিশুও তেমনই থাকতে শেখেন। মা জগদ্ধাত্রী ছিলেন প্রভু ব্রহ্মসনাতনের কাছে মা, তাই তিনি তাঁর থেকেই শিখেছেন, আর তাই তিনি তাই তাই শিখেছেন, যা মনুষ্য জাতি করা ভুলেই গেছে।
আমরা জনক জননীর থেকে সমস্ত কিছু শিখি, আর জনক জননী এই নিরীক্ষণ করা, নির্লিপ্ত থাকা, প্রশ্ন করা, এই সমস্ত থেকে দূরে সরে যান, আর তাই তাঁদের শাবকরাও দূরে সরে যায় এইসবের থেকে। অন্যদিকে, প্রভু ব্রহ্মসনাতন জগদম্বাকেই মা বলে জানতেন ও মানতেন। তাই তিনি তাঁর থেকেই শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। আর তাই তিনি তাই তাই শিখেছিলেন, যা মনুষ্যজাতি সম্পূর্ণ ভাবে ভুলেই গেছেন। তাই শাবককে যথার্থ ভাবে বাল্য অবস্থায় উন্নীত করা এমন কনো কঠিন কর্ম নয়, যদি তুমি নিজে সঠিক ভাবে নিজেকে সজ্জিত করে রাখতে পারো।
একবার বাল্য অবস্থায় উন্নীত হতেই, শুরু হয় আকর থেকে ব্যবহারিক হয়ে ওঠা। মা জগদ্ধাত্রী ছিলেন প্রভুর মা। তাই মা জগদ্ধাত্রীর বিভিন্ন মূর্তির রংকে নিরীক্ষণ করে ফিরতেন তিনি। আর তাই তাঁর মধ্যে রংবাহারের, আলোছায়ার প্রতি আকর্ষণ জন্ম নেয়। আর তাই তাঁর জনকজননী বাধ্য হন, তাঁদের শাবককে চিত্রাঙ্কনের ক্ষেত্রে প্রেরণ করতে। মা জগদ্ধাত্রীই ছিলেন প্রভুর মা। আর সেই মায়ের আরাধনার কালে বাজতো ঢাক কুরকুরি, আর তাই বাদ্যশব্দের প্রতি ছিল প্রভুর প্রবল আকর্ষণ। আর সেই কারণে তাঁর জনকজননী বাধ্য হন তাকে বাদ্যদ্রব্যের প্রশিক্ষণ প্রদান করতে। আর এই রঙের ভিন্নতা, এই ধ্বনির বিভিন্নতা ধারণ করে, প্রভু উন্নীত হন কিশোর বয়সে। অর্থাৎ খরের মূর্তিতে মাটিলেপন সমাপ্ত। এবার একমেটে মাটির মূর্তির ফেটে চৌচির হবার সময়। মাটির মধ্যে থাকা সমস্ত বাষ্প নিঃশেষিত হয়ে গঠনকে মজবুত করার সময়।
আর তাই বাল অবস্থার শেষে, কিশোর অবস্থার শুরু থেকে অর্থাৎ ১৩ বৎসর বয়স থেকে শুরু হয় প্রভুর অনুভব করার সময়। নদনদী, আকাশপাহাড়, পশুপাখি, বিভিন্ন আহার, সমস্ত কিছুকে তিনি অনুভব করতে থাকলেন, আর নিজের মা, নিজের জননী, মা জগদ্ধাত্রীকে সমস্ত কিছুর মধ্যে সন্ধান করতে থাকলেন। মাটি ফেটে চৌচির হওয়া শুরু হলো। একমেটে মূর্তি যখন ফেটে চৌচির হয়ে যায়, তা দেখে মনে হয় যেন এই মূর্তি বিনষ্ট হয়ে গেছে। প্রভুরও একই হাল হয়।
প্রকৃতির একটিই নিয়ম। সমস্ত ক্ষেত্রেই তাই হয়। শিশু কুকুর, বিড়াল যখন কিশোর হয়ে ওঠে, তাদের অঙ্গের লোমাদি এমন ভাবে এলোমেলো থাকে যেন মনে হয়, নষ্ট হয়ে গেল কুকুরটা। গাছপালাও যখন কিশোর হবার দিকে এগিয়ে যায়, তখন এতটা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে যে, তা দেখে মনে হয় যেন গাছটা আর প্রগতিই লাভ করবেনা। প্রভুর ক্ষেত্রেও ঠিক তাই হয়, কারণ তাঁর অবিভাবক যে সাখ্যাত প্রকৃতি। মা জগদ্ধাত্রী, অর্থাৎ পরাপ্রকৃতি যে তাঁর জননী।
প্রকৃতি থেকে শিক্ষা অর্জনের এই হলো দ্বিতীয় চরণ। অনুভব করার পর্যায়। আকরকে যুক্তি দ্বারা বিশ্লেষণ করে, বিশ্লেষিত সামগ্রীকে সঞ্চয় করে রাখা ছিল প্রথম অধ্যায়। সেই অধ্যায়ের পর, এবার সেই সমস্ত সামগ্রীকে ব্যবহার করে করে অনুভব করতে হয়। তখনও আমরা জানিনা যে কোথায় কোথায় তার ব্যবহার করা সঠিক বা কোথায় কোথায় তার ব্যবহার করা বেঠিক। তাই আমরা সর্বত্র তার ব্যবহার করবো, আর তা ব্যবহার করে করে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমরা ব্যর্থ হবো, কারণ ভ্রান্ত ব্যবহারই অধিক করবো, আর তাই মাটি তখন ফেটেফুটে চৌচির হয়ে যাবে।
এই ফেটেফুটে চৌচির হয়ে যাবার সময়কাল মানবজীবনে হলো কৈশোর, অর্থাৎ ১৩ থেকে ১৯ বৎসর বয়স পর্যন্ত, আর প্রভুর জীবনেও ঠিক তাই হলো। প্রকৃতি অর্থাৎ জগজ্জননী যার মা, তার জীবনে সময়ের ভ্রান্তি কি করে হতে পারে! মা যে ভুল করেও ভুল করেন না, প্রভু এই কথা বারবার বলতেন।
এই বিবিধ অনুভব সঞ্চিত হতে হতে, এসে যায় বিপুল অভিজ্ঞতা। আর এই অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার পরিপূর্ণ হবার সময়কাল হলো মানবজীবনের যৌবন, অর্থাৎ ২০ বৎসর বয়স থেকে ৩৫ বৎসর বয়স। এই হলো প্রকৃতির থেকে শিক্ষা গ্রহণের তৃতীয় অধ্যায়, অর্থাৎ আকরিক প্রাপ্তিকে যুক্তি দ্বারা বিশ্লেষণ করে, বিশ্লেষিত সামগ্রীকে ব্যবহার করে করে অনুভব করার থেকে লব্ধ অভিজ্ঞতাকে এবার একত্রিত করার সময়। প্রবল গতি এই অধ্যায়ে, প্রবল কর্ম এই অধ্যায়ে, প্রবল চেতনা এই অধ্যায়ে, আর প্রবল প্রগতি এই অধ্যায়ে। প্রভুর জীবনে ঠিক ঠিক ভাবে তাই হলো। কাপড়ের উপর গোলা মাটি লেপে, সেই দিয়ে সমস্ত মূর্তিকে মুড়ে দেওয়া হলো। দোমেটে সম্পন্ন হলো।
দোমেটে সম্পন্ন হতেই মূর্তি আকার লাভ করলো। মূর্তিকে এবার সকলে সনাক্ত করাও শুরু করলো। প্রভু নিজেকে নিজে চিনতে শুরু করলেন। আর মূর্তি যখন নিশ্চিত হয়ে যায় যে সে মা জগদ্ধাত্রীর মূর্তিই ধারণ করতে চলেছে, তখন সেই মূর্তি হয়ে ওঠে ব্যাকুল। দর্শনের জন্য ব্যকুল। প্রত্যক্ষ করার জন্য ব্যকুল। স্বরূপকে প্রত্যক্ষ করার জন্য ব্যকুল। আর ঠিক তাই হলো প্রভুর জীবনে। ৩৫ বৎসর ২৪ দিন অষ্টম ঘণ্টা থেকে আরম্ভ হলো তাঁর প্রত্যক্ষীকরণ।
প্রথম প্রত্যক্ষীকরণে হলো সমাধি। ক্রমে আরো আরো, আরো পরে সম্পূর্ণ ভাবে প্রত্যক্ষ করা শুরু হতে হতে কৃতান্ত গঠিত হলো। মূর্তিতে চুন পরলো, রং পরলো, চোখ আঁকা হলো, সাজ হলো, সম্পূর্ণ ভাবে মা জগদ্ধাত্রীর মূর্তি হলো। প্রভুও নিজের প্রাপ্ত অবস্থায় নিশ্চিত ভাবে জেনে গেলেন যে তিনিই সেই ব্রহ্মময়ী। ব্রহ্মময়ীর পূর্ণ ৯৬ কলা অবতার তিনি।
কিন্তু জানলে কি হবে! মাতৃপ্রেম! যাকে প্রাণপণে নিজের মা জেনে এসেছে, যার কাছে নিজের সম্পূর্ণ জীবন অর্পণ করে এসেছেন, যার জন্য নিজের প্রতি শ্বাসকে অর্পণ করে এসেছেন, যাকে নিজের জননী, প্রেয়সী, সঙ্গিনী, আরাধ্যা, সমস্ত কিছু জেনে মেনে এসেছেন, তিনি যে নিজেই সেই জগদ্ধাত্রী তা জানার পর, তাঁকে জননী মানা কি করে স্তব্ধ করে দিতে পারেন। তাই সমস্ত সত্য জেনেও, নিজের সাকাররূপকে নিরাকারা ব্রহ্মময়ীর সন্তানই মেনে গেলেন শেষ পর্যন্ত।
এই হলো প্রকৃতির থেকে শিক্ষা অর্জনের চতুর্থ ও অন্তিম অধ্যায়, অর্থাৎ প্রত্যক্ষীকরণ। এই চারটি অধ্যায়ের আঁধারে সম্পূর্ণ প্রকৃতি স্থিত। আর সম্যক প্রকৃতিকে এই চার অধ্যায়ের মাধ্যমে জানা, চেনা, ও শেখা সম্ভব। আকরকে যুক্তি দিয়ে বিশ্লেষণ হলো প্রথম অধ্যায়, বিশ্লেষিত সামগ্রীকে ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে ব্যবহার করে অনুভব করা হলো দ্বিতীয় অধ্যায়, অনুভব সমূহ থেকে অভিজ্ঞতা অর্জন করে করে সেই অভিজ্ঞতার সমাহার নির্মাণ করা হলো তৃতীয় অধ্যায়, এবং সমূহ অভিজ্ঞতার নিরিখে সত্যকে প্রত্যক্ষ করা হলো চতুর্থ ও অন্তিম অধ্যায়।
এই চার অধ্যায়ের মাধ্যমে সম্পূর্ণ পরাপ্রকৃতিকে জানা সম্ভব, সম্যক সত্যকে জানা সম্ভব, আর এটি অবশ্যই জেনে রেখো যে, প্রকৃতি কনো ভাবেই জটিল নন। পূর্ণ ভাবে সরল তিনি, আর তাই তাঁর মধ্যে হাজার হাজার অনুপাত নেই, একটিই অনুপাত আছে, আর তা হলো এই চার অধ্যায়ের অনুপাত, যুক্তি, অনুভব, অভিজ্ঞতা এবং প্রত্যক্ষীকরণের অনুপাত।
তাই এই চার অধ্যায়কে ধারণ করে করেই প্রকৃতির থেকে সমস্ত শিক্ষা অর্জন করতে হয়। সমস্ত ক্ষেত্রে এই অনুপাত প্রযোজ্য। জীব থেকে অজীব, অসত্য থেকে সত্য, জীবন থেকে মরণ, পাহাড় থেকে সমুদ্র, সমস্তকিছু এই অনুপাতেই স্থিত। তাই এই অনুপাতকে ধারণ করে করেই সম্যক প্রকৃতিকে, সম্যক সত্যকে ধারণ করা সম্ভব”।
রোজ বললেন, “দিদি, তুমি বললে, শিশুর উপর জোর করে কিচ্ছু চাপাতে হয়না। সহজ পদ্ধতিতে তাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়। বেশ মেনে নিলাম। কিন্তু ধর্ম? ধর্ম তো জোর করেই চাপাতে হয়। জোর করে না চাপালে যে ধর্মকে কেউ মানতেই চায়না। যুক্তি দ্বারা যখন ধর্মের কথা বলার প্রয়াস হয়, তখন যে সকলে মুখবিকৃত করে সরে যায়। কেউ আর এগিয়ে আসতে চায়না। যখন ভয় দেখানাও হয়, মৃত্যুর ভয়, পাপের ভয়, নরকের ভয়, তখনই গিয়ে ধর্মের কথা শ্রবণ করে সকলে। কিন্তু তুমি তো বলছো, ধর্ম জোর করে চাপানোর জিনিসই নয়। এই চার অধ্যায়ের অনুপাত বললে, সেই নিরিখেই যখন ধর্মবোধ আসে, তাই হলো যথার্থ ধর্মবোধ। এই চার অধ্যায়ের অনুসরণ করে ধর্মকে যিনি ধারণ করেছেন, তিনিই ধার্মিক, অন্য সকলে অধর্মী। কিন্তু জোর না খাটিয়ে কি এই চার অধ্যায়কে স্থাপন করা সম্ভব!”
মীনাক্ষী এই কথা শুনে মনের খেয়ালে হেসে উঠে বললেন, “তোমার এই কথা শুনে, প্রভু ব্রহ্মসনাতনের কথা খুব মনে পরছে। তিনি বলতেন, ঈশ্বর না হলে ঈশ্বরের দর্শন পাওয়া যায়না। তিনি আরো বলতেন, ঈশ্বরকে প্রত্যক্ষ করতে হয়, তবে ঈশ্বরকে এই চামড়ার চোখ নিরীক্ষণ করার সামর্থ্য ধরে না। তাঁকে প্রত্যক্ষ করতে হয় চেতনার দৃষ্টি দ্বারা, যেই দৃষ্টিশক্তি অনেক অনেক গুণ সামর্থ্যশালী।
এই ক্ষেত্রে, তিনি বলতেন যে, ঈশ্বর কি করে হতে হয়? সহজ ভাবে তিনি বলতেন এঁর উত্তর। তিনি বলতেন, সাকার থেকে নিরাকার হয়ে উঠতে হয়। নিজের অন্তরকে এতটা বিশাল করে দিতে হয় যে, সমস্ত সাকার একত্রিত হয়েও তার মাত্র একাংশে ভরে যাবে। আর পরে থাকবে বাকি ৯৯ শতাংশ, আর এই ভাবে পূর্ণ ভাবে নিরাকার হয়ে ওঠা যায়, এবং হয়ে উঠতে হয়, তবেই ঈশ্বরকে চাক্ষুষ করা সম্ভব, চেতনার দৃষ্টি দ্বারা।
এই ক্ষেত্রে, যখন তাঁকে কেউ প্রশ্ন করতেন, তিনি উত্তরে বলতেন, তিনি কখনোই ঈশ্বরের কাছে দাবি করেন নি যে তিনি তাঁকে দর্শন প্রদান করুন। যখনই তাঁর অন্তরে ব্যকুলতা জন্ম নিতো ঈশ্বরের দর্শন পাবার, তিনি নিজেকে বোঝাতেন যে, ‘আমি এখনো তাঁর দর্শন লাভ করার যোগ্য হয়ে উঠতে পারিনি, সেই কারণেই তাঁর দর্শন লাভ করছিনা’।
তিনি বলতেন, ঈশ্বর হলেন সর্বত্র বিরাজমান। তাঁকে না তো কোথাও যেতে হয় কারুকে দর্শন প্রদান করার জন্য, আর না তো তোমাকে কোথাও যেতে হয় তাঁর দর্শন পাবার জন্য। যতক্ষণ আমাদের চোখের সামনে আমিত্বের পর্দা থাকে, আর আত্ম আত্ম করে ফিরি আমরা, পরমাত্ম পরমাত্ম করে ফিরি আমরা, ততক্ষণ ঈশ্বর অধরাই থেকে যায়। মূল সমস্যা এই পর্দা, এই পর্দা সরে গেলে, ঈশ্বর সর্বদা আমাদের সম্মুখে দাঁড়িয়েই ছিলেন তা স্পষ্ট ভাবে অনুভব হয়ে যায়।
এই পর্দা আমাদের নির্মিত। আমরাই আমি আমি করে করে, আত্ম আত্ম, পরমাত্ম পরমাত্ম করে করে, আত্মের আরাধনা করে করে, ত্রিগুণকে ত্রিদেব রূপে আরাধনা করে করে, নিজেদের মনকে চাওয়াপাওয়া, জ্ঞানঅজ্ঞান, নীতিঅনীতিতে, ধর্মাধর্মে আবদ্ধ করে করে, এই পর্দাকে আমরা ঘন করে রেখেছি, আর তাই সেই পর্দাকে অপসারণের দায়িত্বও আমাদেরই।
তবে যতই সেই দায়িত্ব একাকী আমাদের হোকনা কেন, ঈশ্বর স্বয়ং ঈশ্বর হওয়ার থেকেও মা হয়ে বিরাজমান থাকতেই অধিক পছন্দ করেন, আর তাই তিনি প্রকৃতি বেশে, নিয়তি হয়ে সময়ের দ্বারা আমাদেরকে এই পর্দা অপসারণের জন্য বারংবার বলতেও থাকেন, আর সেই কথা শুনে অগ্রসর হতে গেলে, তিনি প্রকৃতি ও নিয়তি হয়ে মার্গ দর্শনও করেন সেই পর্দাকে অপসারিত করার। মা তিনি, তাই সন্তানের দায় বলে সরে যান না, সন্তানের হাতকে চেপে ধরেন সেই বাঁধাকে অতিক্রম করার জন্য।
আর আমাদের কর্তব্য হলো তাঁর হাতকে শক্ত করে ধরে থেকে, সেই পর্দাকে অপসারিত করা। এই কর্তব্যই হলো ধর্ম, একেই ধর্ম বলা হয়, কারণ ধর্মের শব্দার্থ হলো ধারণ করা, আর কে কাকে ধারণ করে? আমাদের চেতনা পরমসত্যকে, পরমানন্দকে ধারণ করে। আমাদের মা-ই হলেন সেই পরমানন্দ, সেই পরমসত্য। অর্থাৎ তাঁকেই ধারণ করতে হয়। আর চেতনা সেই কর্ম করতে গেলে, তাঁর সম্মুখে বাঁধা হলো আমাদের আমিত্ব, অর্থাৎ পরমাত্ম বা আত্ম, আর সেই আত্মভাবকেই অতিক্রম করতে হয়। সেই কারণে, এটিই আমাদের ধর্ম, আর একেই ধর্ম বলে চিহ্নিত করা হয়।
অর্থাৎ ধর্ম কি? ধর্ম হলো আত্মের থেকে নিজেকে মুক্ত করা, সসীম থেকে নিজেকে অসীম করে তোলা। এই আমিত্ব, এই আত্ম, এই পরমাত্ম ভাবই আমাদেরকে পরমশূন্য, পরমানন্দ ব্রহ্মের থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখে দিয়েছে। সেই আত্ম, বা পরমাত্ম, বা আমিত্ব, যেই নামেই তাকে ডাকো, তার থেকে মুক্ত হলে, তবেই আমাদের চেতনা ব্রহ্মের সাখ্যাতকার করতে সক্ষম হয়, কারণ তখন আর ব্রহ্ম ও চেতনার মধ্যে কনো প্রকার ভেদ থাকেনা। আর তবেই, সত্যকে ধারণা করা সম্ভব হয়। অর্থাৎ ধর্মলাভ বা মোক্ষলাভ সম্ভব হয়।
তাহলে কি বুঝলে? আমিত্ব বা আত্ম বা পরমাত্মকে ধারণ করে রেখেই, আমরা অসীমতা ত্যাগ করে সসীম হয়ে বিরাজমান, স্বয়ং ব্রহ্ম হয়েও, ব্রহ্মের থেকে বিচ্ছিন্ন। আর তাই, এঁদেরকে ত্যাগ করলে, তবেই আমরা পুনরায় সত্যকে অর্থাৎ ব্রহ্মকে ধারণ করতে সক্ষম হই, আর সসীম থেকে অসীম হয়ে উঠে, সমাধিস্থ হয়ে মোক্ষলাভ করি। অর্থাৎ ধর্ম কি? ধর্ম হলো আমিত্বের থেকে পূর্ণতা মুক্তি। আমিত্বের থেকে পূর্ণভাবে মুক্ত হলে, তবে আমরা কে? আমরা সেই একই ব্রহ্ম, কারণ ব্রহ্ম ব্যতীত কনো কিছুর তো অস্তিত্ব কনো কালেই ছিল না। কেবল মায়া অর্থাৎ ভ্রম ধারণ করে আমরা আত্ম হয়ে জীবনযাপন করছিলাম।
এবার বুঝতে পারলে, কেন প্রভু বলতেন, ঈশ্বরের দর্শন পেতে গেলে, ঈশ্বর হতে হয়? (সহাস্যে) সহজ ব্যাপার। আত্মকে ধারণ করে আমরা সসীম, আমরা নশ্বর। সেই আমিত্ব ত্যাগ করলে, আমরাই ব্রহ্ম, আর তখনই ব্রহ্মকে প্রত্যক্ষ করা সম্ভব, এবং অন্তে সমাধিস্থ হয়ে তাঁর সাথে একাত্ম হয়ে যাওয়া যায়। যদি এটি বুঝতে পারো, তাহলে ধর্ম কি তাও নিশ্চিত ভাবেই বুঝে গেছ।
যদি তা বুঝে থাকো, তাহলে এবার তুমিই বলো রোজ যে ধর্মের কাজ কি করে চাপিয়ে দেওয়া হতে পারে? আত্মবোধ কারুর উপর চাপিয়ে দেওয়া যেতেই পারে। বর্তমান সমাজ সেই কর্মই করে চলেছে সকল শিশুর উপর। প্রতিটি শিশুকে সর্বদা তাঁদের অবিভাবকরা বলে চলেছেন, তাঁকে কিছু হতে হবে, তাঁকে বিশেষ হতে হবে, অন্যের থেকে শ্রেয় হতে হবে তাকে। আর এই ভাবে সর্বক্ষণ আমিত্ব বা আত্মবোধ তাঁদের উপর চাপিয়ে চলেছে। কিন্তু আমিত্ব থেকে মুক্ত হওয়ার ভাব কি করে কারুর উপর চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব!”
অরিত্রা এবার বললেন, “দিদি, মৃত্যুর পরে তো দেহ থাকেনা, তখন তো আমিত্ব থেকে মুক্ত হয়েই থাকি আমরা, তাই না!”
মীনাক্ষী হেসে বললেন, “মৃত্যুর পর কি হয়, তা যদি আমি বলি, তা কেবলই একটি কল্পনা হবে, কারণ মৃত্যুর পর কি হয়, তা আমি প্রত্যক্ষ করিনি। আর যা প্রত্যক্ষ করিনি, তা সম্বন্ধে নিজের কথা বলার অর্থ, অন্ধ অন্ধকে পথ দেখানো। তবে মায়ের কৃপায় আমি এমন ব্যক্তিত্বের সম্মুখীন হয়েছি, যিনি মৃত্যুকে প্রত্যক্ষ করেছেন। তিনি হলেন প্রভু ব্রহ্মসনাতন।
প্রভুর যখন ধ্যান হয়ে যেত, তখন তিনি মৃত্যু প্রাপ্ত হয়ে যেতেন। তিনি বলতেন, ধ্যানে যা হয়, তা মোক্ষ নয়, সমাধির সময়ে আমিত্বের লেশ মাত্রও থাকেনা। সেটিই হলো মোক্ষ। ধ্যানের কালে, দেহের বোধ থাকেনা ঠিকই, কিন্তু সূক্ষ্ম শরীর থাকে ঠিক যেমন মৃত্যুর পর থাকে। সূক্ষ্ম শরীরে সেই সমস্ত কিছু থাকে যা স্থূল শরীরে রয়েছে, কেবলই তা অত্যন্ত সূক্ষ্ম। আর যেহেতু সূক্ষ্ম, সেহেতু সে স্থূল জগতের কনো কিছুকে না স্পর্শ করতে পারে, না আহার করতে পারে, না অন্য কিচ্ছু করতে পারে।
ইন্দ্রিয়াদিদের মধ্যে পঞ্চইন্দ্রিয় স্থূলশরীরের সাথে সাথেই সঙ্ঘবদ্ধ এবং ক্রিয়াশীল। তাই সূক্ষ্মশরীরে সেই পঞ্চইন্দ্রিয়ও নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়, আর দেহ তথা দেহের সমস্ত অঙ্গের বোধও তাই থাকেনা, কারণ এই পঞ্চইন্দ্রিয়ই তাদের বোধ প্রদান করে আমাদের আত্মকে। তিনি আরো বলেন এই ক্ষেত্রে যে, তবে আমাদের যেই ষষ্ঠম ইন্দ্রিয়, অর্থাৎ মনেন্দ্রিয় তখনও অবস্থান করে, আর আত্ম তাই সেই ষষ্ঠম ইন্দ্রিয় দ্বারা সমস্ত কিছু নিরীক্ষণ করতে পারে।
তাঁর প্রত্যক্ষীকরণের ব্যাখ্যা অনুসারে, সূক্ষ্মশরীরে, অর্থাৎ মৃত্যুর পরের অনুভব পূর্ণ ভাবে ধ্যানে লব্ধ করা যায়। তবে তিনি এই ক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন করে বলতেন, ‘তবে কি মৃত্যু মানে ধ্যানস্থ হওয়া?’ … উত্তর তিনি ছাড়া কেউ দিতে সক্ষম নন। তাই তিনিই উত্তরে বলতেন, ‘না, মৃত্যু মানে ধ্যান নয়। সূক্ষ্ম শরীরে নিরীক্ষণ করার জন্য যেমন মনেন্দ্রিয় থাকে, তেমন চেতনাও থাকে। ধ্যানের কালে, আমরা নিরীক্ষণ করি সত্যকে, আমাদের চেতনার সাহায্যে। আর মৃত্যুর কালে আমরা নিরীক্ষণ করি এই ভ্রমজগত অর্থাৎ স্থূল জগতকে, আর তা আমাদের আত্ম করে মনেন্দ্রিয়ের সহায়তায়’।
তিনি বলতেন, ‘সূক্ষ্ম শরীরে, এই দুইয়েরই অবস্থান থাকে, মনেন্দ্রিয় ও চেতনা। তবে ধ্যানের কালে আমরা চেতনাদ্বারা নিরীক্ষণ করি, আর তাই সত্যের দর্শন লাভ করি। আর অন্যদিকে মৃত্যুর কালে আমরা মনেন্দ্রিয়ের সহায়তায় স্থূল অর্থাৎ ভ্রমজগতকে নিরীক্ষণ করি, অর্থাৎ অসত্যকে দর্শন করি’।
অর্থাৎ, মৃত্যুর পরে আমিত্ব বা আত্মের নাশ হয়না। তাই এমন ভাবার কনো কারণ নেই যে, যেই কর্ম দেহে থাকা অবস্থায় করা সম্ভব হয়নি, তা মৃত্যুর পরে করে ফেলবে। সূক্ষ্মশরীরে স্থিত হবার কালে, যদি চেতনা ক্রিয়া করে, যা ধ্যানের কালে হয়ে থাকে, তা কারণকে দর্শন করে, অর্থাৎ আমাদের মা’কে। আর যদি আত্ম ক্রিয়া করে, তাহলে মনেন্দ্রিয়ের সহায়তায় আমরা স্থূলকে দর্শন করি অর্থাৎ ভ্রমজগতকে।
কিন্তু না তো আমাদের মা সূক্ষ্ম, আর না এই ভৌতিক ভ্রমজগত সূক্ষ্ম। তাই সূক্ষ্মে স্থিত হয়ে থাকার কালে, কি ধ্যানে আর কি মৃত্যুতে, কনো ভাবেই কনো ক্রিয়া করতে সক্ষম থাকিনা। তাই যা করার দেহে বিরাজমান থেকেই করতে হয়, মৃত্যুর পরে কনো কিছুই করা সম্ভব হয়না। স্থূলে বিরাজ করেই সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মকে অনুভব করতে হয়, কারণকে অনুভব করতে হয়, এবং অন্তে কারণ, সূক্ষ্ম তথা স্থুল ত্যাগ করে সত্যে, অর্থাৎ অনন্তশূন্যে লীন হয়ে মোক্ষ অর্জন করতে হয়”।
ভূমি প্রশ্ন করলেন, “এক কথায় বলতে গেলে, যোগ্যতা অর্জন করতে হয়। কিন্তু কি ভাবে যোগ্যতা অর্জন করতে হয়? কার পর কি কি যোগ্যতা অর্জন করলে, যথার্থ যোগ্যতা অর্জন করা সম্ভব? … দিদি আমিত্বপূর্ণ জগতে তো, সেনা নিজেকে শ্রেষ্ঠ যোগ্য বলে। কিন্তু তার বল তো কেবলই দৈহিক। আর যেখানে দেহ স্বয়ংই একটি ভ্রম, সেখানে দেহের বল বা কৌশল কি করে যোগ্যতার পরিমাপ হয়ে পারে?
এই ভৌম জগতে, বৈদ্য নিজেকে যোগ্য বলেন, যন্ত্রশিল্পী নিজেকে যোগ্য বলেন, কিন্তু তারাও তো স্থূলের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তাহলে কি করে তাঁরাও যোগ্য হতে পারে? যোগ্যতা অর্জনের উপায় কি দিদি? কাকে যোগ্য বলা উচিত? কি ভাবে সেই ঔচিত্যপূর্ণ যোগ্যতা পর্যন্ত উপস্থিত হওয়া সম্ভব?”
