২০.৩। ভ্রম পর্ব
রোজ প্রশ্ন করলেন এবার, “জগত, বস্তু, জীবন, সমস্ত কিছুই কি তবে ভ্রম! এদের একটিও সত্য নয়? কিন্তু মাতার মাতৃত্ব প্রদানের ইচ্ছার কারণেই তো এঁদের অস্তিত্ব। কেন করলেন তিনি এই সমস্ত বাসনা! … মীনাক্ষী তুমি বললে, আমাদের মধ্যে কিছুর অজ্ঞতা আছে যা দূর করার জন্যই এই কল্পজীবন। আমাদের মধ্যে সেই অজ্ঞতা কি? অজ্ঞতা কেন? আর অজ্ঞতা কিভাবে দূর হওয়া সম্ভব?”
মীনাক্ষী হেসে বললেন, “পরম সুখে আমরা ছিলাম, আর সেই পরমসুখের কারণ বা উৎস কি, তা আমাদের কাছে অজ্ঞাত। আর সেই অজ্ঞতা দূর করাই এই ভ্রমজগতের নেপথ্যে থাকা উৎস। কেন নেপথ্যে? কারণ সম্মুখে রয়েছে আত্মের অহং এবং কর্তা বোধ।
পূর্বেও বলেছিলাম, “কর্তা এক ও এক মাত্র মাতা। ব্রহ্মময়ী বিনা দ্বিতীয় কর্তা সম্ভবই নয়। তাঁর অনুমুতি বিনা একটি গাছের পাতারও হেলার সামর্থ্য নেই, বায়ুর প্রবাহ করারও সামর্থ্য নেই, জলের বহমান হবারও সামর্থ্য নেই, অগ্নির প্রজ্বলনেরও সামর্থ্য নেই, আর সত্য বলতে এঁদের অস্তিত্বও সম্ভব নয়, ব্রহ্মময়ীর অনুমতি বিনা। আত্ম নিজেকে কর্তা জ্ঞান করে, নিজের অস্তিত্বের আস্ফালন করে। কিন্তু তার অস্তিত্বের নেপথ্যেও সেই মহামায়া ব্রহ্মময়ীরই হাত রয়েছে।
যেই পরমসুখের উৎসের সন্ধান আমরা করি, সেই পরমসুখের কারণ ব্রহ্মময়ী স্বয়ং আর সেই উপলব্ধিই আমাদেরকে লাভ করতে হয়। সেই উপলব্ধি লাভ করার কারণেই আত্মের ও মনের উৎপত্তি, ধরার উৎপত্তি, তাঁদের থেকে সমস্ত অন্যভূতদের উৎপত্তি। সমস্ত মহাভাব ও পঞ্চভাবদের উৎপত্তি, চিন্তা ইচ্ছা ও কল্পনা এই তিন ছায়ারও উৎপত্তি। এমনকি এই তিন ছায়া ও আত্মের মিলন থেকে ত্রিগুণের জন্মও তাঁরই অঙ্গুলিহেলনে। সেই উৎপত্তির কারণে আবেগদের ঘনঘটাও তাঁরই অঙ্গুলিহেলনে।
মন, ধরা, আত্ম, ছায়া, এঁদের সকলের কারণে, এঁদের অন্তরে এসে নিবাস করা মাতার প্রকাশ অর্থাৎ চেতনা সম্পূর্ণ ভাবে নিজের পরিচয়, অর্থাৎ সে যে স্বয়ং মাতা, সে যে স্বয়ং অনন্তা, সেই বোধ হারিয়ে ফেলেছেন। তাই সে যে পরমসুখের উৎস সন্ধান করার জন্যই সমস্ত ছায়া, আত্ম, আবেগ, ভূত, ভাব বেষ্টিত দেহ ধারণ করেছে, সেই বোধই সে হারিয়ে ফেলেছে।
আর সেই স্মৃতি ফিরিয়ে দেবার কারণেই যেমন ভাব সমূহ, তেমনই আবেগ সমূহ। যখন পরম বেদনার সঞ্চার হয়, তখনই পরমসুখ লাভের ব্যকুলতার ভাব বিস্তৃত হয়, আর তা হওয়া মাত্রই স্মৃতি ফিরে আসে যে, কে সে, কি তার উৎস আর কেন সে স্বরূপ অর্থাৎ নিরাকার অনন্তা রূপ ত্যাগ করে এমন সাকার। আর সেই পরম বেদনা প্রদানের জন্যই আত্মের রচনা, আর ছায়ার রচনা।
ছায়া ও আত্ম মিলিত ভাবে যে দেহী জীবনকে করুন করে তুলবে, তা মাতার স্বতঃই পূর্বজ্ঞাত। তাও তিনি এঁদের জন্ম হতে দিয়েছেন, এবং এঁদেরকে পরমবেদনা প্রসারের পথে অগ্রসর হতে দিয়েছেন। ঠাকুর রামকৃষ্ণদেব বলতেন, ‘জটিলে কুটিলে না হলে, লীলা পোষ্টাই হয়না’, এও ঠিক তেমন ব্যাপার। মাতার অঙ্গুলিহেলন বিনা, কারুর কনো কিছু করার সামর্থ্য নেই, না মনের, না ছায়ার, না ধরার আর না আত্মের, আর না এঁদের থেকে জাত গুণসমূহের, আবেগসমূহের এবং ভাবসমূহের।
তাই এঁরা যা কিছু করে, মনধরা ও ভাবদের ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষে, এবং আত্মছায়াদের ক্ষেত্রে নেপথ্যে মাতারই অঙ্গুলিহেলন ক্রিয়া করে, কারণ ক্রিয়া করে কে? এঁদের সকলে মিলেও কনো ক্রিয়া করতে পারেনা। সকলেই জঙ্গম। এক ও একমাত্র চেতনাই ক্রিয়াসামর্থ্য ধরে, আর সেই চেতনাই ক্রিয়া করে। কখনো আত্মের দ্বারা চালিত হয়ে সে ক্রিয়া করে, আবার কখনো মনের দ্বারা চালিত হয়ে। কিন্তু এই দুই ধারার ক্রিয়াতেই সত্যলাভ হয়না, অর্থাৎ এই দুই ধারার ক্রিয়াতেই চেতনা এটি উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়না যে সে স্বয়ং অনন্তা ব্রহ্মময়ী, এবং স্বয়ংই পরমসুখের উৎস।
যেখানে আত্মের পরিচালনায় চেতনা দক্ষকন্যা সতী হয়ে যায়, সেখানে মনের পরিচালনায় চেতনা হিমাবনকন্যা পার্বতী হয়েই থেকে যান। দুই ক্ষেত্রেই তিনি কালী হয়ে উঠতে পারেন না। অর্থাৎ যখন আত্মের দ্বারা পরিচালিত হন চেতনা, তখন দাসী হয়ে থেকে যান, আর যখন মনের দ্বারা পরিচালিত হন চেতনা, তখন লাজুক কন্যা হয়েই। এই দুই ক্ষেত্রেই তাঁদের অন্তরে মেধাও জাগ্রত হয়না, আর তাই মহাভাবরা, বা পঞ্চভাবরাও জাগ্রত হয়না।
আর তাই দুই ক্ষেত্রেই অসংখ্য বেদনা দ্বারাই চেতনা বেষ্টিত থাকেন। আর সেই বেদনার সমাধান সন্ধান করতে করতেই চেতনা, ও চেতনার প্রভাবে মন ও আত্ম অসংখ্য দেহ ধারণ করে ফেরে। প্রতিবার নূতন দেহ ধরে, প্রতিবার আত্ম ও মন সম্মুখে এসে তাঁকে সুখের আশ্বাসবাণী শ্রবণ করায়। সম্মুখে তার জনক, জননী, ভ্রাতাভগিনী, সঙ্গিসাথি, প্রেমিক প্রেমিকা এনে জোটান আর সেই সমস্ত কিছুর দ্বারা সুখ লাভের আশ্বাসবাণী প্রদান করে। প্রতিবারই সেই সমস্ত আশ্বাসে কর্ণপাত করেন, আর পরমসুখের সন্ধান করেন, কিন্তু প্রতিবারই ব্যর্থ হন, কারণ এঁরা সকলেও তো আত্ম অর্থাৎ ভ্রমেরই উপাদান সমূহের সমষ্টি।
যেমন তাঁর অস্তিত্বও এই আত্ম, ছায়া, ভূত, আবেগদের সমষ্টি আর তারা সকলেই ভ্রম হবার কারণে যেমন তাঁর অস্তিত্বই একটি ভ্রম, তেমনই প্রতিটি জীব-অজীবই। আর ভ্রম কি করে পরমসুখ প্রদান করতে পারে! তাই প্রতিটি দেহতেই চেতনা এঁদের আশ্বাসবাণী শ্রবণ করে, বিশ্বাস করে সেই আশ্বাসবাণীকে আর হতাশ হয়, কারণ যে সেই আশ্বাসবাণী প্রদান করে, সেও ভ্রম আর তাই তাঁদের আশ্বাসও ভ্রম ব্যতীত কিছুই নয়।
বহু বহু দেহ চলে যায় এঁদের আশ্বাসবাণী শ্রবণ করতে করতে আর বিশ্বাস করতে করতে। শত শত দেহ যায় জনকজননীকে সেই পরমসুখ প্রদানের উৎস মেনে, শত শত দেহ যায় ভ্রাতাভগিনীকে পরমসুখ প্রদানের উৎস জ্ঞানে, শত শত দেহ যায় সঙ্গিসাথিদের পরমসুখের উৎসজ্ঞানে, আবার সহস্র সহস্র দেহ যায় প্রেমিক প্রেমিকাকে, এবং সন্তানসন্ততিকে সেই পরম সুখের উৎস জ্ঞানে।
লক্ষাধিক দেহ ধারণ হয়ে গেলেও যখন পরমসুখের উৎসের সন্ধান পায়না চেতনা, তখন সে পোষা নিচজীবের থেকেও সেই পরমসুখ লাভের প্রয়াস করে আত্মের ও মনের কথা শুনে শুনে। তাতেও যখন লাভ হয়না পরমসুখ, তখন আত্ম সম্মুখে এসে বলে, ‘আমিই ভগবান, আমার কারণেই পরম সুখ’। সেই কথাতে প্রভাবিত হয়ে হাজার হাজার দেহ ধারণ করে ফ্যালে চেতনা, আবার অনেক সময়ে তার থেকেও অধিক।
সেই দেহসমূহতে সে আত্মকেই পরমসুখের উৎস মেনে চলে, আর তাই ক্রমশ আত্মসুখী হয়ে ওঠে। এই আত্মসুখী হয়ে ওঠার কারণে সে নিজকে খ্যাতনামা করে তুলতে চায়, নিজেকে শ্রেষ্ঠরূপে সর্বত্র স্থাপন করার প্রয়াস করে, আর তা করে করে একপ্রকার অসুর হয়ে ওঠে। দম্ভে, অহংকারে মত্ত এক অসুর, যে সর্বক্ষণ আমিত্ব বিস্তারেই ব্যস্ত। সর্বক্ষণ নিজেকে অধিক অধিক ভাবে ধনী করে তুলতে, অধিক অধিক ভাবে প্রভাবশালী করে তুলতে এবং অধিক অধিক ভাবে প্রতিপত্তিশালী করে তুলতে ব্যস্ত হয়ে ওঠে।
হাজার হাজার জন্ম এই সমস্ত প্রতিপত্তি, প্রভাব ও প্রাধান্য অর্জন করতে কেটে যায়, আর দশক দশক জন্ম সেই সমস্ত প্রতিপত্তি, প্রভাব ও প্রাধান্য ধারণ করে কেটে যায়। সহস্র জন্ম এমন ভাবে চলে যাবার পর, তার খেয়াল জন্ম নেয় যে, পরমসুখের সন্ধান সে তখনও পায়নি। (হেসে) পাবে কি করে? এই সমস্ত কিছুই তো ততটাই ভ্রম, ততটাই মিথ্যা যতটা তার নিজের দেহ।
আর এবার সে ব্যকুল হয়ে ওঠে। সে বুঝে যায় যে, না আত্মের জানা আছে যে পরমসত্যের উৎস কি, আর না মনের। এঁদের কারুর জানাই নেই যে পরমসুখের উৎস কি, আর তাই এঁরা যাকে যাকে পরমসুখের উৎস রূপে চিহ্নিত করে চলেছে, তারা সকলেই অপারগ পরমসুখ প্রদানের জন্য। আর যখন এমন ভাবে সে ব্যকুল হয়ে ওঠে, তখন প্রকৃতির দিকে নজর যায় তার, সময়ের দিকে নজর যায় তার।
গুটিকতক দেহ আরো ধারণ করে সে, কিন্তু এবার সে প্রকৃতিকে নিরীক্ষণ করতে ব্যস্ত থাকে, কালকে নিরীক্ষণ করতে ব্যস্ত থাকে। আত্ম তাঁর প্রতি অখুশি হয়ে ওঠে, মনও। কিন্তু যতই প্রকৃতি ও কালকে নিরীক্ষণ করতে থাকে সে, যেন এক অথৈ সাগরে পতিত হয়ে গেছে, এমন বোধ জন্ম নেয়, আর তাই আত্ম বা মনের ভ্রুক্ষেপ না করেই, অবিচল ভাবে কালপ্রকৃতিকে নিরীক্ষণ করতেই থাকে।
আর অবশেষে গিয়ে, প্রকৃতি ও কালের ধারক ব্রহ্মময়ীর সন্ধান লাভ করে সে, এবং প্রত্যক্ষ করে যে স্বয়ং ব্রহ্মময়ীই সমস্ত কিছুর ধারক, একমাত্র তিনিই জগদ্ধাত্রী। আর তা প্রত্যক্ষ করা মাত্রই ব্যস্ত হয়ে ওঠে সে মাতার কাছে যাবার জন্য। অসীম ব্যকুলতা সহ, অমানুষিক নিষ্ঠাকে ধারণ করে, প্রেমে আবক্ষ স্থাপিত হয়ে, একপ্রকার হাঁকপাঁক করেই মাতার ক্রোড়ে এসে সে যখন ওঠে, তখন সমাধি তাঁকে বেষ্টন করে নেয়, আর পরম সুখে সে ভেসে যায়, ডুবে যায়।
এই হাঁকপাঁকানি যতক্ষণ না জন্ম নেয় চেতনার মধ্যে ততক্ষণ পরমসুখ কি, পরমসুখের বিশেষত্ব কি, এসব কিছুই উপলব্ধি করে না সে। আর তাই যতক্ষণ না সেই হাঁকপাঁকানি জন্ম নেয় তাঁর মধ্যে ততক্ষণ পরমসুখকে দুরূহ করে তোলেন মাতা চেতনার সমক্ষে, আর সেই দুরূহ করে তোলার জন্যই এই ভূত সমূহ, এই আত্ম ছায়া সমূহ। যখন এই হাঁকপাঁকানি জন্ম নিয়ে নেয়, তখনই তাঁর মধ্যে মেধার জন্ম হয়, সেই হাঁকপাঁকানি থেকেই।
সেই হাঁকপাঁকানির থেকেই মহাভাবদের ও পঞ্চভাবদের জন্ম হয়, আর এঁরা সকলে মিলে প্রকৃতি ও কালের নিয়ন্তা, অর্থাৎ নিয়তির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে, মাতাকে সর্বক্ষণ নিরীক্ষণ করে করে, মাতার ঈশ্বরত্বকে এবং মাতৃত্বকে প্রত্যক্ষ করে, পরমসুখে নিমজ্জিত হয়ে গিয়ে যতই আপ্লুত হতে শুরু করে ততই ধ্যান হতে থাকে তার, আর অবশেষে যখন সমাধি হয়ে গিয়ে ব্রহ্মময়ীর ক্রোড়ে উত্থাপিত হয়ে গিয়ে পরমসুখের আস্বাদন করে সে, তখন তাঁর কাছে এই জগত আর অনিত্য থাকেনা, মিথ্যা হয়ে যায়।
তখন তাঁর কাছে জনকজননী, ভ্রাতাভগিনি, প্রেমিকপ্রেমিকা, সন্তানসন্ততি, সঙ্গিসাথি, ধন-যশ, প্রভাব প্রতিপত্তি, অস্ত্র-শাস্ত্র, ন্যায়-অন্যায়, জ্ঞান-অজ্ঞান, সুর-অসুর, দিন-রাত্রি, জাতপাত, ভাষা-কুভাষা, সমস্তই একাকটি ভ্রমে পরিণত হয়ে যায়, আর তাই সে আর সমাধি থেকে প্রত্যাবর্তন করেনা এই ভ্রমজগতে।
চিরতরে সে মাতার ক্রোড়ে স্থাপিত হয়ে গিয়ে, পরমসুখে অনন্তা হয়ে ওঠে। চেতনা থেকে সে স্বয়ং প্রকৃতি হয়ে ওঠে। প্রকৃতি থেকে সে স্বয়ং কালনিয়ন্তা নিয়তি হয়ে ওঠে আর অন্তে নিয়তি থেকে সে স্বয়ং ব্রহ্মময়ী হয়ে উঠে অনন্ত, অসীম, অব্যক্ত, অচিন্ত্য, নিরাকার ব্রহ্ম হয়ে উঠে মোক্ষলাভ করে অর্থাৎ জীবনমৃত্যুর চক্র থেকে, দেহ-বিদেহের চক্র থেকে সদাসদার জন্য মুক্ত হয়ে পরমেশ্বর হয়ে ওঠে।
এই হলো সমস্ত ভ্রমের কারণ আর সমস্ত ভ্রম থেকে মুক্তির মার্গ। পরমসুখের সন্ধানই এই ভ্রমের অস্তিত্বের কারণ, আর পরমসুখ লাভেই এই ভ্রমের নিরাময়। ভ্রমের কারণেই এই ব্রহ্মাণ্ডসমূহের অস্তিত্ব, এই ধরাধাম, এই জীবনমৃত্যু, জ্ঞাতিগুষ্ঠির অস্তিত্ব, ধন সম্পদ জাতি প্রজাতি শাসক প্রজা এই সমস্ত কিছুর অস্তিত্ব। আর এই সমস্ত কিছুকে কখনোই ভ্রম মনে হয়না, কারণ আমরা স্বয়ং ভ্রমেই স্থিত থাকি।
যখন এই ভ্রমের থেকে আমাদের উত্থান হয়, যখন আমরা যথার্থকে প্রত্যক্ষ করি, তখনই এঁদেরকে ভ্রম বলে চিহ্নিত করতে পারি। আর সেই প্রক্রিয়া তখন থেকে শুরু হয়, যখন আমাদের প্রথম ধ্যান হয়”।
ভূমি প্রশ্ন করলেন, “আচ্ছা দিদি, ধ্যান কাকে বলে? ধ্যান হলে কি হয়? ধ্যানের কারণে কেন এই প্রক্রিয়ার শুরু হয়? আর ধ্যান হবার পূর্বে এই প্রক্রিয়ার শুরু হতে পারেনা কেন?”
মীনাক্ষী মৃদু হেসে বললেন, “যখন মন হৃদয়মুখি হয়ে ওঠে, তখন ধ্যান হয়ে যায়। অর্থাৎ ধ্যানের কালে, কেবল মন থাকে আর সত্য অর্থাৎ মাতা ব্রহ্মময়ীর থাকেন। মাতা ব্রহ্মময়ীকে প্রত্যক্ষ করা যায় তখন। নিরাকার, অনন্তা, অসীমা, অব্যাক্তকে তখন প্রত্যক্ষ করা যায়। গন্ধ না থাকা যে সুগন্ধের থেকেও অধিক মনোমুগ্ধকর, আকার না থাকা যে সুন্দর আকারের থেকেও অধিক তৃপ্তিকর, ব্যাখ্যা না থাকা যে শ্রেষ্ঠ ব্যাখ্যা অপেক্ষাও অধিক শান্তিপ্রদায়ক, এই বোধ তখন চেতনার মধ্যে ভাস্মর হয়ে ওঠে।
আর তা ভাস্মর হওয়া মাত্রেই, ব্রহ্মাণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ওঠে চেতনা। ভ্রম সমূহ থেকে চেতনা নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে তুলে, সম্পূর্ণ ভাবে সমর্পণ করতে ব্যকুল হয়ে ওঠে চেতনা। কার কাছে? ব্রহ্মময়ীর কাছে। তাঁর প্রেমে হাবুডুবু খেতে প্রগল ন্যায় হয়ে ওঠে চেতনা। আর সেই প্রগলতা এতটাই ক্ষিপ্র ও তীব্র হয় যে, ভ্রমব্রহ্মাণ্ড অর্থাৎ বাহ্যিক স্থূল ব্রহ্মাণ্ড তখন কেবল মাত্র তন্মাত্র হয়েই থেকে যায়, আর সত্য বলতে ক্রমশ সেই তন্মাত্রের থেকেও চেতনা নিজেকে অপসারিত করতেই থাকে, কারণ সে সমানেই ব্রহ্মময়ীর কাছে সমর্পিত হতে ব্যস্ত হয়ে ওঠে।
এই হলো ধ্যানের অবিভ্যক্তি, যেখানে ক্রমাগত দেহবোধ যেতে যেতে অন্তে দেহবোধ বলে কিচ্ছু আর অবশিষ্ট থাকেনা। ধ্যানের ছয় চরণ, কারণ চেতনা ছয়টি অবস্থানে স্থিত হয় ধ্যানের অবস্থায়। প্রথমত সে সমস্ত পূর্বজন্ম সংস্কার বিমুখ হয়ে উঠে মূলাধারে স্থিত হয়। দেহবোধ তখনও বেশ থাকে, তবে দেহের প্রতি আকর্ষণ ফিকে হয়ে যায়। এরপর, পুনর্জন্মের সত্যজ্ঞাত হয়ে ওঠে চেতনা এবং স্বাধিষ্ঠানে স্থিত হয়। এখানেও দেহবোধ থাকে, তবে দেহবোধের প্রতি উদাসীনতা তীব্র হয়ে ওঠে।
এরপরের স্তরে কলার সপ্তরঙে রঙ্গিন হয়ে ওঠে চেতনা। লজ্জা, ঘৃণা, ভয় সমস্ত সমাপ্ত হয়ে গিয়ে চেতনা তখন নগ্নতা ধারণ করে মাতৃত্বের আস্বাদ গ্রহণ করা শুরু করে মনিপুরে স্থিত হয়ে। মাতৃত্বের প্রতি প্রবল আকর্ষণ এবার ক্রমশ তাঁর মধ্যে মাতৃত্বের বিকাশ ঘটাতে শুরু করলে, সমস্ত শব্দের অতীত অবস্থায় প্রথমে যাত্রা করে অনাহতে স্থিত হন, এরপর পূর্ণ পবিত্রতা অর্থাৎ শ্রেষ্ঠ সম্পদ ধারণ করে তিনি বিশুদ্ধে স্থিত হন, এবং অন্তে ধ্যানের শ্রেষ্ঠ অবস্থান অর্থাৎ সম্পূর্ণ ভাবে দেহবোধ থেকে মুক্ত হয়ে উঠে পূর্ণ ভাবে প্রকৃতিরূপ হয়ে ওঠেন তিনি, অর্থাৎ আজ্ঞাতে স্থিত হয়ে যান তিনি। এই হলো ধ্যানের ছয় চরণ। এর পরবর্তী চরণ হলো সমাধির চরণ। সেখানে স্থিত হলে অর্থাৎ সহস্রারে স্থিত হলে, দেহবোধ কেন, ব্রহ্মাণ্ডের বোধও থাকেনা।
তন্মাত্রও থাকেনা, আত্মও থাকেনা, আর ভূতরাও থাকেনা। অবশিষ্ট থাকে কেবলই সত্য, কেবলই শূন্য। ব্রহ্মময়ীর ক্রোড়ে ব্রহ্মময়ীর সেই সন্তান চিরতরে শায়িত হয়ে গিয়ে সমস্ত বন্ধন, সমস্ত ভ্রম, সম্পূর্ণ কল্পব্রহ্মাণ্ড থেকে মুক্ত হয়ে ওঠে, অর্থাৎ মোক্ষপ্রাপ্ত হয়”।
রোজ বললেন, “দিদি, ধ্যান হলে কি হয়, তা তো জানলাম। কিন্তু ধ্যান হয় কি করে? কোন অবস্থায় উন্নীত হতে পারলে তবে ধ্যান হয়?”
মীনাক্ষী মুখমিষ্টতা ধারণ করে বললেন, “যতক্ষণ আত্মনির্ভরতা, ততক্ষণ ধ্যান হয়না। যতক্ষণ কর্তা ভাব সম্পন্নতা, ততক্ষণ ধ্যান হয়না। যতক্ষণ ধন, প্রতিভা, প্রসিদ্ধি, প্রভাব বিস্তার, ইত্যাদির প্রতি আকর্ষণ থাকে, অর্থাৎ তাদেরকে হয় লাভ করার প্রতি আকর্ষণ থাকে বা যার সেইগুলি আছে তার কাছে সেইগুলি আছে বলে তাঁর প্রতি আকর্ষণ থাকে, ততক্ষণ ধ্যান হয়না।
যখন সম্পূর্ণ ভাবে এই বোধ জন্ম নেয় যে, এই দেহ একটি ভ্রম, সমস্ত আকার একাকটি ভ্রম, সমস্ত সম্বন্ধ একাকটি ভ্রম, ধন, প্রভাব, প্রসিদ্ধি, প্রতিভা, সমস্তই একটি একটি ভ্রমবিস্তার, সমস্ত সামাজিক পদ একটি একটি ভ্রম, দেহ ভ্রম তাই দেহের জন্মদাতা বা দেহের পালিকাদের সাথে সকল সম্বন্ধও ভ্রম, তখনই ধ্যান হয় প্রথম বারের মতন।
স্মরণ রাখবে এখানে যে, অনেক সময়েই মনঃসংযোগকে ধ্যান বলে দেয় অনেকে। তা সম্পূর্ণ ভাবে এক ভ্রান্ত ধারণা মাত্র। মনঃসংযোগ হলো কনো কিছুকে একাগ্রচিত্তে নিরীক্ষণ করার ভাব। তা সেই বস্তু বাহ্যিক অর্থাৎ স্থূলবস্তুও হতে পারে, আবার সূক্ষ্ম অর্থাৎ অভ্যান্তরিন বস্তুও হতে পারে। কিন্তু ধ্যানের কালে কনো নিরীক্ষণ করা থাকেনা, পরে থাকে কেবল প্রত্যক্ষ করা। এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য বোঝোতো? না বুঝলে বিজয়া তোমাদেরকে এই দুইয়ের অর্থাৎ নিরীক্ষণ ও প্রত্যক্ষ করা, এই দুইয়ের মধ্যে ভেদ বুঝিয়ে দেবে”।
জয়া দেখলেন যেন বিজয়া স্বেচ্ছায় নিজেকে মীনাক্ষীর সাথে গাঁটছড়াতে বেঁধে নিয়েছে। মীনাক্ষী কেবল বলল যে বিজয়া বলে দেবে, অমনি বিজয়া বলতে শুরু করে দিল। সে বলল, “ইন্দ্রিয়দ্বারা যা তোমরা করো তা হলো দেখা বা নিরীক্ষণ করা। স্বাদ নিরীক্ষণ করতে রসনার ব্যবহার করো, বস্তু দেখতে তোমরা আঁখির ব্যবহার করো, বস্তুকে ধারণ করতে ত্বকের ব্যবহার করো। শব্দ নিরীক্ষণ করতে কর্ণের ব্যবহার করো, ঘ্রাণ নিরীক্ষণ করতে নাসিকার ব্যবহার করো, আর কল্পনা নিরীক্ষণ করতে মনেন্দ্রিয়ের ব্যবহার করো।
আধুনিক যুগের নিম্নচেতনার মানুষরা যাকে বিজ্ঞান বলো, সেই বিজ্ঞান এই ছয় ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য পদার্থ সমূহতেই আবদ্ধ থাকে। অর্থাৎ এই ছয় ইন্দ্রিয় যা কিছু নিরীক্ষণ করে, তাতেই তোমাদের বিজ্ঞান আবদ্ধ। এর অতীতে যাত্রার সামর্থ্য তোমাদের দুর্বল বিজ্ঞানের সামর্থ্যের অতীত। হ্যাঁ হতে পারে যা খালি চোখে দেখা যায়না, তা দেখার জন্য অণুবীক্ষণ যন্ত্র বা দূরবীক্ষণ যন্ত্র ব্যবহার করে; হতে পারে যা সহজে শ্রবণ করা যায়না, তার জন্যও কনো যন্ত্র ব্যবহার করে, কিন্তু অবশেষে তাঁরা এই ছয় ইন্দ্রিয়ের কাছেই পরাধীন।
(হেসে) আর যে পরাধীন, তার বাকস্বাধীনতা কেমন থাকে, তা তো তোমরা ভালো করেই জানো। আর যার বাকস্বাধীনতাই সীমিত, সে কতটা বিশ্বাসযোগ্য, তা তোমরা নিজেরাই বিচার করে নিও। প্রত্যক্ষ করা, এই ছয় ইন্দ্রিয়ের কাছে পরাধীনতা নয়। বা সত্য বলতে গেলে, প্রত্যক্ষ করা কনো কিছুর প্রতি আবদ্ধ নয়ই। সে সম্পূর্ণ স্বাধীন।
কি হয় এই প্রত্যক্ষ করার কালে? প্রত্যক্ষ করার কালে থাকে অনুভূতি। শীতল বাতাসের অনুভূতি, জানো তো তোমরা? ত্বক পর্যন্ত তা সীমাবদ্ধ থাকেনা, তা আমাদের হৃদয়কেও কম্পিত করে দেয়। প্রকাণ্ড উষ্ণতার অনুভূতিও জানো তোমরা। তা আমাদের ত্বক ও ত্বক নিঃসৃত স্বেদকে অতিক্রম করে হৃদয়কে অবগুণ্ঠিত করে দেয়। এই যে তোমরা অতিকায় শীতলতাকে অনুভব করলে, অতিশয় উষ্ণতাকে অনুভব করলে, এটি দেখার বিষয় নয়, শ্রবণ করার বিষয়ও নয়, স্বাদ নেওয়ার বা ঘ্রাণ নেওয়ার বা ত্বক দ্বারা স্পর্শ করারও বিষয় নয়।
অথচ যিনি সেই শীতল হাওয়াকে অনুভব করেছেন, বা যিনি সেই উষ্ণতাকে অনুভব করেছেন, তাঁর কাছে চোখে দেখা বস্তুর থেকেও, কানে শোনা শব্দের থেকেও, ত্বক দ্বারা অনুভব করার থেকেও, সমস্ত ইন্দ্রিয়ের দ্বারা ধারণা করার থেকেও অধিক ভাস্মর, অধিক বাস্তব, অধিক প্রাকৃতিক। আরে এই সর্বস্বকিছুর অতীতে গিয়ে যা কিছু ভাস্মর ও প্রাকৃতিক বলে বোধ হয়, তাই হলো প্রত্যক্ষ করা”।
মীনাক্ষী হাস্যমুখে বললেন, “বুঝলে তো, প্রত্যক্ষ করা প্রকৃত অর্থে কি? প্রত্যক্ষ করার অর্থ পূর্ণভাবে অনুভব করা। কেবল দেখা নয়, তাঁকে ধারণ করে দেখা। ঠাকুর রামকৃষ্ণদেব বলতেন কাশির কথা শোনা একরকম, কাশির ছবি দেখা একরকম আবার কাশিতে যাওয়া অন্যরকম। আমি তোমাকে দেখলাম এটি একরকম, কিন্তু আমি তুমি হয়ে গেলাম, এটা কেমন? এটা হলো প্রত্যক্ষ করা।
ঈশ্বরকে, সত্যকে, ব্রহ্মকে, মা’কে ইন্দ্রিয়দ্বারা এমন দুর্বল ভাবে দেখা যায়না। তিনি সত্য, তাই তাঁকে পূর্ণ ভাবে প্রত্যক্ষ করতে হয়। অর্থাৎ তোমাকে তিনি হয়ে যেতে হবে। তবেই তিনি কেমন, তাঁর বিস্তার কি প্রকার, তাঁর অনন্ততা, তাঁর অচিন্ত্যতা, সমস্ত কিছুকে প্রত্যক্ষ করতে পারবে। তাই ঈশ্বরদর্শন সমস্ত কিছুর থেকে ভিন্ন। আর সেই কারণেই প্রভু ব্রহ্মসনাতন বলতেন ঈশ্বরদর্শন করতে হলে ঈশ্বর হতে হয়। একমাত্র ঈশ্বরই ঈশ্বরদর্শন করতে সক্ষম, এমন বলতেন তিনি।
এই কথার অর্থ হলো এই যে, ঈশ্বরকে নিরীক্ষণ করা যায়না, ঈশ্বরকে প্রত্যক্ষ করতে হয়। তোমাকে স্বয়ং ঈশ্বর হয়ে যেতে হবে, তবেই তুমি ঈশ্বরকে দর্শন করতে সক্ষম হবে। অর্থাৎ যখন তুমি স্বয়ং ঈশ্বর হয়ে উঠবে, তখনই তোমার ধমনী ধমনীতে, স্নায়ুতে স্নায়ুতে, শ্বাসে প্রশ্বাসে, চেতনার কণায় কণায় ঈশ্বরকে, মাতাকে সত্যকে প্রত্যক্ষ করতে পারবে, অন্যথা নয়।
আর ঈশ্বর কি করে হবে? যতপ্রকার সংস্কার আছে, যতপ্রকার সম্বন্ধ আছে, যত প্রকার ভ্রম আছে, যত প্রকার ভেদাভেদ যেমন ন্যায়-অন্যায়, ধর্ম-অধর্ম, নারী-পুরুষ, জ্ঞান-অজ্ঞান, ভক্তি-অভক্তি, সমস্ত কিছুর যখন ঊর্ধ্বে চলে যেতে পারবে, যখন প্রকৃতির সাথে একাত্ম হয়ে যেতে পারবে, এবং প্রকৃতির কাছে পূর্ণ সমর্পিত হয়ে যাবার কারণে প্রকৃতির সমস্ত সত্য তোমার কাছে স্বতঃই প্রকাশিত হয়ে উঠবে, তখনই ঈশ্বর হয়ে উঠবে। একই ভাবে যখন নিয়তির সমস্ত ক্রীড়া তোমার কাছে ভাস্মর হয়ে উঠবে, তখনই তুমি ঈশ্বর হয়ে ওঠার পথে যাত্রারত, আর তখন থেকেই তোমার ধ্যান হওয়া শুরু করবে, যা অন্তে সমাধি হয়ে, তোমাকে ঈশ্বর করে দিয়ে, ঈশ্বরকে তোমার কাছে প্রত্যক্ষ করে তুলে, তোমাকে ঈশ্বরময় করে, ঈশ্বরে বিলীন করে দেবে। এই হলো ধ্যানের অবস্থায় উন্নীত হবার প্রক্রিয়া”।
অরিত্রা প্রশ্ন করলেন, “কিন্তু এই যে একাকার হয়ে ওঠা, তা হবো কি করে?”
মীনাক্ষী মিষ্টমুখে বললেন, “যখন কনো কিছুকে সম্পূর্ণ ভাবে জেনে যাও, তখন স্বতঃই আমরা তার সাথে একাকার হয়ে যাই। যেমন ধরো তুমি। যখন আমি তোমাকে সম্পূর্ণ ভাবে জেনে যাবো, তখন স্বতঃই তোমার সমস্ত কিছু আমার কাছে জ্ঞাত, আর তাই স্বতঃই আমি তখন তুমি হয়ে গেছি। আমি তোমার মত করেই কথা বলবো, তোমার মত করেই ভাববো, তোমার মত করেই বিচার করবো, সমস্ত কিছু তোমার মত করেই করবো। আমার আমিত্ব বলে আর কিছু থাকবে না তখন”।
ভূমি বললেন, “কিন্তু কনো কিছুকে এমন ভাবে কি করে জানা সম্ভব যাতে তাঁর সাথে একাত্ম হয়ে যেতে পারা যায়। আমরা দেখছি তোমাকে দিদি। তুমি যেন প্রভু ব্রহ্মসনাতনের সাথে একাত্ম হয়ে গেছ। তোমার থেকে প্রভুর কথা শুনছি। শুনে মনে হচ্ছে যেন তিনি স্বয়ং ব্রহ্মময়ীর সাথে একাত্ম হয়ে গেছিলেন। কিন্তু কি করে হয়েছ তুমি এই একাকার? কি করে হয়েছিলেন তিনি একাকার?”
মীনাক্ষী মিষ্ট হাস্য হেসে বললেন, “আমিত্ব, আত্ম বা অহং, যেই নামেই ডাকো তারে, তার অস্তিত্বই এই জ্ঞান অর্জনে একমাত্র সংকট। তাঁর অস্তিত্বের কারণে সমস্ত জিনিস, সমস্ত বস্তু, সমস্ত মনুষ্য, জীব বা প্রক্রিয়া, কনো কিছুকেই তোমরা যেমন তা বিরাজমান তেমন করে নিরীক্ষণ করো না। তোমরা তার অবস্থানকে পরিবর্তিত করে দিয়ে, তাকে নিজের আত্মের সুবিধামত স্থিত করে, তা জানতে আগ্রহী।
অর্থাৎ, যদি কনো আমগাছ থেকে আম কেমন করে ঝোলে, তা জানতে হয়, আর তা জানার জন্য আমের নিচে দাঁড়িয়ে থেকে ঝুলন্ত আমকেই হাতে করে পালটে পালটে দেখে, তাহলে তো সে কনোদিনও জানতে পারবেনা যে আম কেমন করে ঝোলে। কুকুর কেমন ভাবে বিচার করে, তা জানার জন্য অদূরে দাঁড়িয়ে থেকে কুকুরকে নিরপেক্ষ ভাবে দেখতে হয়। কুকুরের কাছে যেই মুহূর্তে তুমি গেলে, সেই মুহূর্তে কুকুর আর কুকুরের মত নয়, তোমার সান্নিধ্যে আসার মত করে ব্যবহার করবে।
অর্থাৎ কনো জিনিস, সম্বন্ধ, বা কনো কিছু কেমন দেখতে, শিখতে ও জানতে হলে, তোমাকে নিজেকে তার থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখে, তাকে নিরীক্ষণ করতে হয়। যেই মুহূর্তে তুমি বালিকে হাতে নিয়ে দেখলে, বালিকে আর দেখতে পেলে না, বালি হাতে পরলে কেমন হয়, তা দেখতে পেলে তুমি তখন। তেমনই জীবনকে জীবনের স্থানে স্থাপিত রেখে, তাকে নিরীক্ষণ করতে হয়। কালকে কালের মত প্রবাহিত হতে দিয়ে তাকে নিরীক্ষণ করতে হয়।
কালকে যদি তুমি ধারণ করার প্রয়াস করে কালকে দেখো, তাহলে কালকে আর দেখতে পাবেনা, তোমার নিরিখে কাল কেমন বিক্রিয়া করে, তা দেখতে পাবে। ঠিক যেমন প্রকৃতির উপর হস্তক্ষেপ করলে, প্রকৃতিকে জানা যায়না, প্রকৃতি তোমার উপর কেমন বিক্রিয়া করে তা জানা যায়, আর তাই প্রকৃতির সাথে একাকার হওয়া যায়না। ঠিক তেমনই ভাবে, কনো কিছুর উপর হস্তক্ষেপ না করে যখন তাকে নিরীক্ষণ করবে, তখনই সেই বস্তু সম্বন্ধে পূর্ণ জ্ঞান অর্জন করা যায়।
আর তোমাদের আত্মবোধ এটি করা থেকেই তোমাদের প্রতিরোধ করে। সে সমস্ত কিছুতে হস্তক্ষেপ করতে, কর্তা হয়ে উঠতে বাধ্য করতে থাকে। আর তা প্রতিহত করার জন্যই কৃতান্ত, আর কৃতান্তিক ধর্ম। অর্থাৎ কৃতান্তিক ধর্মের মূল কথাই হলো আত্মের স্বভাব, অর্থাৎ কর্তা হয়ে থাকার, হস্তক্ষেপ করার স্বভাব থেকে মুক্ত হয়ে, নিরপেক্ষ দর্শক হবার স্বভাব ধারণ করে যথার্থ ভাবে প্রকৃতি ও নিয়তিকে জেনে, তাঁদের সাথে একাত্ম হয়ে ওঠা”।
