২০.২। দক্ষিণা পর্ব
মীনাক্ষী মৃদু হেসে বললেন, “দক্ষিণা এক ত্রিপাক্ষিক পদ্ধতি, কারণ সে নিজের সাথে ত্রিনিদান ধারণ করে চলে। ত্রিনিদানের অর্থ হলো তিনটি নিদান, আর এই তিনটি নিদান হলো শিষ্যের নিদান, গুরুর নিদান এবং ভৌতিক নিদান।
শিষ্য কি শিখলেন তার পরীক্ষাস্বরূপ হয় এই দক্ষিণা। অর্থাৎ শিষ্য নিজের অর্জিত শিক্ষার বাস্তবিক পরিচয় প্রদান করেন এই দক্ষিণার মাধ্যমে। গুরু এই দক্ষিণার মাধ্যমে জগতকর্ম সম্পন্ন করেন, অর্থাৎ জগতের সেবা করানো দক্ষিণার আরো একটি পক্ষ। এবং অন্তে, এই দক্ষিণার দ্বারা শিক্ষাপ্রদান করাই যার জীবনপ্রাণের ব্রত, সেই শিক্ষকের জীবিকাকে স্থিত করা হয়, যাতে তিনি শিক্ষা প্রদান করার ক্ষেত্রে কনো প্রকার ভৌতিক পিছুটানে আবদ্ধ না থাকেন।
কথা এই যে, শিক্ষা কনো বাণিজ্য নয়, আর শিক্ষাকে অর্থের বিনিময়ে প্রদান করা এবং অর্থের বিনিময়ে গ্রহণ করার অর্থ হলো এক আসুরিক প্রবৃত্তি। যেই সমাজ এই অভ্যাস স্থাপন করে ফেলেছে যে, অর্থের বিনিময়ে শিক্ষা প্রদান করা হবে বা শিক্ষা অর্জন করা হবে, সেই সমাজ সম্পূর্ণ ভাবে আসুরিক হয়ে উঠেছে, এবং সেই শিক্ষাও অসুরকুলকেই স্থাপিত করে চলেছে।
কিন্তু সেই অর্থে শিক্ষক যিনি হবেন, তাঁর জীবিকা কি ভাবে চলমান থাকবে? তাঁরও তো ভৌতিক প্রয়োজন আছে। হ্যাঁ, তিনি শিক্ষক, সত্য সর্বস্ব, তাই তাঁর নিত্য বা ভৌতিক প্রয়োজন অত্যন্ত স্বল্প। তাঁর কনো সখ আহ্লাদ থাকেনা। কেবলই তাঁর পরিবারের নিত্য আবশ্যকতা যেমন আহারের সামগ্রী ও নিদ্রার সামগ্রী, তা ছাড়া অন্য কনো কিছুর প্রয়োজন থাকেনা তাঁর। কিন্তু সেই প্রয়োজনও কি করে মিটবে, যদি তিনি অর্থ বা ধন উপার্জন না করেন?
অন্যদিকে শিক্ষক যদি ধন উপার্জন করতে যান, তার অর্থ শিক্ষাকে বাণিজ্যে রূপান্তর করা, যা করা মাত্রই অসুরকুলের রচনা শুরু হয়ে যাবে। তাহলে, এর নিদান কি? এর নিদান হলো দক্ষিণা। দক্ষিণা এক ছাত্র প্রদান করবেন তাঁর গুরুকে। দক্ষিণা এক অবিভাবক প্রদান করবেন তাঁর সন্তানের গুরুকে। ছাত্র গুরুকে দক্ষিণা প্রদান করবেন তাঁকে শিক্ষা প্রদান করার জন্য, এবং ছাত্রের পিতা দক্ষিণা প্রদান করবেন তাঁর সন্তানকে শিক্ষিত করার জন্য।
এর মধ্যে ছাত্র কি দক্ষিণা প্রদান করবেন, তার নির্ণয় গুরু করবেন, অর্থাৎ গুরু নির্দেশ দেবেন ছাত্র বা ছাত্রীকে কনো বিশেষ গুরুদক্ষিণা প্রদান করবেন, আর তা মূলত ধনবিমুখ এক দক্ষিণা হবে। তা কনো বিশেষ কর্ম হতে পারে, কনো প্রক্রিয়াতে স্থাপিত হওয়া হতে পারে, কনো প্রক্রিয়া বা পদ্ধতির নির্মাণ হতে পারে, ইত্যাদি ইত্যাদি।
অন্যদিকে শিষ্যের পিতা যেই দক্ষিণা প্রদান করবেন, তা বিভিন্ন প্রকার ধন হতে পারে। অর্থাৎ তা ভূধন হতে পারে, তা গোধন হতে পারে, বা তা মুদ্রারূপেও ধন হতে পারে। তবে কৃতান্তিক সমাজে, তা কনো কৃতান্তিকের হাতে প্রদান করা যাবেনা, কারণ কৃতান্তিক সমাজে অন্তর্গত হওয়ার পর থেকে, এক কৃতান্তিক কনো কারণে নিজের জীবিকা অর্জনের জন্য ধন ধারণ করবেন না।
ঠিক যেমন তোমরা কনো ধন ধারণ করো না, আর তোমাদের মাতা সর্বশ্রীও নিজের জন্য করেন না, কিন্তু কেবলমাত্র তোমাদের জন্য তিনি ধন ধারণ করেন, কৃতান্তিক সমাজ কৃতান্তিককে সেই নির্দেশই দেয়। এক কৃতান্তিক নিজের জীবিকা অর্জনের জন্য ধন ধারণ করছেন, এর অর্থ হলো তিনি কনো কৃতান্তিক সমাজে স্থিত নন। যদি তিনি কৃতান্তিক সমাজে স্থিত হয়েও নিজের হস্তে নিজের জীবিকার উদ্দেশ্যে প্রাপ্ত ধন ধারণ করেন, তাঁকে কৃতান্তিক সমাজ থেকে পূর্ণ ভাবে বহিষ্কার করাই একমাত্র বিধান হবে।
কৃতান্তিক সমাজে স্থিত হবার কালে, এক কৃতান্তিক কনো কারণে নিজের জীবিকার ধন নিজের কাছে সঞ্চিত রাখবেন না। অর্থাৎ অবিভাবক যখন তাঁর সামর্থ্য অনুসারে বিভিন্ন প্রকার ধন প্রদান করতে আগ্রহী হবেন, তখন তা তিনি প্রদান করবেন সেই কৃতান্তিককে, যিনি তাঁর সন্তানকে কৃতান্তিক ধর্মে শিক্ষিত করেছেন, সেই কৃতান্তিক যেই কৃতান্তিক সমাজের সদস্য, সেই সমাজের অধ্যক্ষের চলে যাবে।
অর্থাৎ ধর বিজয়া, তুমি কারুকে শিক্ষা প্রদান করলে। যাকে শিক্ষা প্রদান করলে, সে তোমাকে গুরুদক্ষিণা প্রদান করতে পারেন, যা কনো ভাবেই ধনসংক্রান্ত দক্ষিণা হবেনা, না ধন প্রদায়িনী আর না ধন স্বয়ং। তবে সেই দক্ষিণা তুমি তোমার শিষ্যের থেকে সরাসরি চাইবে এবং গ্রহণ করবে, কারণ সেই দক্ষিণা সমাজের কল্যাণ সাধন করবে, আর তোমার শিষ্যেরও উন্নতি করবে।
কিন্তু তোমার শিষ্যের অবিভাবক যেই দক্ষিণা প্রদান করবেন, তা তিনি তোমাকে দেবেন না, তা দেবেন তিনি মাতা সর্বশ্রীকে, কারণ তিনিই তোমাদের কৃতান্তিক সমাজের অধ্যক্ষ। সেই দক্ষিণা কি হবে, বা কেমন হবে, সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার একমাত্র দক্ষিণাপ্রদত্তার, আর সেখানে কৃতান্তিক সমাজের অধ্যক্ষ কনো রূপ হস্তক্ষেপ করবেন না।
স্মরণ রাখবে, দক্ষিণা যিনি প্রদান করবেন, তিনি তাঁর সামর্থ্য মতই প্রদান করবেন। তাই যার যেমন সামর্থ্য তিনি তেমনই দক্ষিণা প্রদান করবেন। আর এমনও হয়ে থাকে এই দক্ষিণা প্রদানের ক্ষেত্রে যে, যিনি দক্ষিণা প্রদান করলেন, তিনি একটি বারে দক্ষিণা প্রদান না করে, একাধিকবার দক্ষিণা প্রদান করেন। কেমন এই ব্যাপারটা? যিনি দক্ষিণা প্রদান করলেন তিনি দরিদ্র, তাই স্বল্পই ধনাদি প্রদান করলেন, কিন্তু পরবর্তী কালে তিনি ধনী হলেন, এবং পুনরায় ফিরে এসে অধিক ধন প্রদান করলেন। আবার এমনও হতে পারে যে, যিনি সেই দক্ষিণা প্রদান করলেন, প্রথমবার তিনি কেবলই কর্তব্যের খাতিরে দক্ষিণা প্রদান করলেন। কিন্তু পরবর্তী কালে তিনি প্রত্যক্ষ করলেন যে গুরুর কারণে তাঁর সন্তান অত্যন্ত বিশেষ হয়ে উঠেছেন। আর তাই তিনি পুনরায় কৃতান্তিক সমাজে এসে পুনরায় ধন প্রদান করলেন।
অর্থাৎ মধ্যা কথা এই যে, কৃতান্তিক কনো ধনের দক্ষিণা গ্রহণ করবেন না, কৃতান্তিক সমাজের অধ্যক্ষ তা গ্রহণ করবেন, এবং তা গ্রহণ করার কালে তিনি কনো প্রকার বিশেষ পরিমাণ ধনের দাবি করবেন না। যিনি শিক্ষা গ্রহণ করছেন বা যিনি শিক্ষা গ্রহণ করাচ্ছেন সেই অবিভাবকই নির্ধারণ করবেন কতটা ধন বা কি প্রকার ধন তিনি প্রদান করবেন কৃতান্তিক সমাজের অধ্যক্ষের কাছে, এবং তা তিনি একাধিকবারেও প্রদান করতে পারেন, তাতে কনো প্রকার বিধিনিষেধ নিয়েই।
এই অধ্যক্ষ অন্য কৃতান্তিকদের যখন যা প্রয়োজন সেই অনুসারে বস্তু বা সেবা প্রদান করবেন। অর্থাৎ যখন চিকিৎসার প্রয়োজন তাঁর বা তাঁর পরিবারের কারুর, বা যখন অন্য কনো ক্ষেত্রে তাঁর ধনের প্রয়োজন বা কনো বিশেষ সেবা বা পরিসেবার প্রয়োজন, অধ্যক্ষ তখন তা প্রদান করবেন।
এক কৃতান্তিক হলেন সমস্ত সমাজের অবিভাবক, আর তাই ঠিক যেমন এক অবিভাবককে সর্বদা কঠিন সংযমের মধ্যে থেকে সংগঠিত থাকতে হয়, তাঁর সন্তানের মধ্যে সুচরিত্রের বিকাশ ঘটানোর জন্য, এবং সন্তানকে সত্যকামী করে তোলার জন্য, তেমনই এক কৃতান্তিককেও সর্বদা কঠিন সংযমে স্থিত থাকতে হয়। এক কৃতান্তিকের কখনো কনো সখ আহ্লাদ থাকতে পারেনা। ইচ্ছা চিন্তা ও কল্পনার ঊর্ধ্বে স্থিত তিনি। যখন তিনি ইচ্ছা, চিন্তা ও কল্পনার ঊর্ধ্বে স্থিত থাকবেন, তখনই তাঁর শিষ্যরা সেই দিশায় চালিত হবেন, নচেৎ তারা স্বতঃই ইচ্ছা, চিন্তা ও কল্পনার সাগরে নিমজ্জিত হওয়া শুরু করবে।
তাই এক কৃতান্তিকের কাছে কখনোই ধন গচ্ছিত থাকবেনা, কারণ ধন থাকলেই, ধনের চরিত্র অনুসারেই ইচ্ছার জন্ম নেবে, চিন্তার জন্ম নেবে ও কল্পনার জন্ম নেবে, আর তা জন্ম নিলেই কৃতান্তিকও সেই চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনার পশ্চাৎধাবন শুরু করে দেবেন।
এক কৃতান্তিকের একটিই ভাবনা থাকবে, আর তা হলো সমাজে অধিক থেকে অধিক মানব যাতে সত্যকামী হয়ে ওঠেন, সত্যজ্ঞানী হয়ে ওঠেন, এবং সত্যপ্রেমী হয়ে ওঠেন। তাই সর্বদা তাঁর সমস্ত ক্রিয়ার মধ্যে একটিই ভাব থাকবে যাতে, সমাজের মধ্যে সত্যের প্রতি আকর্ষণ বৃদ্ধি হয়। আর তা যাতে জোর করে কারুর উপর চাপিয়ে না দিতে হয়, এবং স্বাভাবিক ভাবেই সমাজে স্থিত হতে পারে অন্ধবিশ্বাস থেকে মুক্ত হয়ে, তার জন্যই কৃতান্তিক ব্যস্ত থাকবেন।
কৃতান্তিক সমাজে কখনোই কনো প্রকার অরাজগতার সঞ্চার নিজের থেকে করবেন না। তবেই দেশের নৃপতি কৃতান্তিককে দেখে দেখে সেই অরাজগতাকে অরাজগতা রূপে চিহ্নিত করবেন, আর তবেই তিনি সমাজকে সেই অরাজগতা থেকে মুক্ত রাখবেন। সত্য বলতে, এক ধার্মিক যা আচরণ করেন, এক নৃপতি তাঁকে দেখে দেখেই সঠিক আচরণ কি হওয়া উচিত, তার নির্ধারণ করেন, আর কেবল মাত্র নৃপতিই নন, সমস্ত মানুষ তা নির্ধারণ করেন।
যদি ধার্মিক চোঙ দ্বারা শব্দপ্রচার করেন এবং প্রভাব বিস্তার না করে প্রভাব স্থাপন করেন, তবে সাধারণ মানুষ তথা নৃপতিও অনুরূপ আচরণ করবেন এবং রুচিকর বা অরুচিকর ধ্বনিকে সমাজের বাকি সকলের উপর জোর করে চাপিয়ে দিতে চাইবেন চোঙ ব্যবহার করে করে। অনুরূপ ভাবে, যদি এক ধার্মিক সত্য দর্শনের থেকে অধিক রীতিকে দর্শনবিমুখ হয়ে অক্ষরে অক্ষরে পালন করার দিকে মনযোগী হয়, তাহলে সম্পূর্ণ সমাজও সেই দিকেই প্রগতিশীল হবেন।
যদি ধার্মিক বিশেষ কিছু পোশাকাদিকে নিজেদের চিহ্নরূপে স্থাপিত করেন, তাহলে সমাজের অন্যস্তরের ব্যক্তিরাও অনুরূপ করবেন। অর্থাৎ যদি পোশাকাদির দ্বারা ধার্মিক নিজেকে ধার্মিক রূপে প্রকাশ করার প্রয়াস করেন, তাহলে সকলেই তেমন করবেন। ধনী নিজের গহনা প্রদর্শন করবেন, নটি নিজেদের দেহকাম প্রদর্শন করবেন, ব্যামবীর নিজের পেশি প্রদর্শন করবেন, আর দরিদ্র নিজের মলিনতা প্রদর্শন করবেন। অর্থাৎ সমস্ত কিছুকে ভৌতিক অর্থে প্রকাশিত করার প্রয়াস করবেন সকলে।
আর তোমরাও জানো যে যখনই ভৌতিক ভাবে কনো কিছুকে প্রকাশ করার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়, তখনই ভণ্ডামোর বিকাশ হয়। যিনি নটি নন, তিনিও নিজের দেহকাম প্রদর্শন করে নিজেকে নটি রূপে চিহ্নিত করার প্রবণতা প্রকাশ করবেন, যিনি ধনী নন তিনিও গহনা ধারণ করে নিজেকে ধনী রূপে প্রতিপন্ন করার প্রয়াস করবেন, এবং যিনি ধার্মিক নন তিনিও কিছু বিশেষ বস্ত্র ধারণ করে নিজেকে ধার্মিক রূপে প্রতিপন্ন করার জন্য ব্যকুল হয়ে উঠবেন।
যখন বাহ্যিক ভাবে কনো কিছু প্রকাশিত থাকেনা, তখনই সমাজ সাম্যতায় অবস্থান করে অর্থাৎ তখন আর কনো ভণ্ড জন্ম নেবার বা প্রকাশিত হবার সুযোগ লাভ করে না। অন্যথা কি হয়? যিনি ভণ্ড, তিনি জানেন, বেশ ভালো করেই জানেন যে তিনি এক ভণ্ড। কিন্তু তিনি এও জানেন যে, এক বিশেষ রূপ প্রসাধনী ধারণ করলে, আর তাঁকে কেউ ভণ্ড বলে চিহ্নিত করতে পারবেন না। যিনি নটি নন, তিনি ভালো করেই জানেন যে তিনি কনো নটি নন, কিন্তু তিনি এও জানেন যে কেবলই দেহকাম প্রদর্শন করলে, তাঁকে নটি মনে করবেন সকলে। আর এই ভাবে, যে যা নন, তা সহজেই প্রকাশ করতে সক্ষম হন, আর তা প্রকাশ করে করে সমাজকে বিভ্রান্ত করেন। কি ভাবে?
যিনি সত্য অর্থে নটি, তিনি কলাবিদ, তিনি কলার সাধনা করেন, তিনি একজন সাধিকা। তাঁর কর্মধারা, তাঁর চিন্তাধারা, তাঁর বিচারধারা, সমস্ত কিছুতেই থাকে উদারতা। ভেদভাব থেকে উন্মুক্ত ভাব সর্বক্ষণ প্রকাশিত থাকে। কিন্তু যিনি সত্য অর্থে নটি নন, তাঁর মধ্যে থাকে জাতির বৈষম্য, ধনের বৈষম্য, খ্যাতির বৈষম্য, নারীপুরুষের বৈষম্য, প্রতিভার বৈষম্য। এবার বিচার করো, তোমার সমাজে নটিকে একটি বিশেষ ধারার প্রসাধনীর কারণে নটি বলে সনাক্ত করা হয়। কি হবে তখন? যেই স্ত্রী নটি নন, তাকেও তখন সমাজ নটি বলবেন, আর তিনি তো বৈষম্যে পরিপূর্ণ, তিনি তো ভেদভাবে জরাজীর্ণ। আর সমাজ তাঁর থেকে কি লাভ করবে? বৈষম্যতার শিক্ষা লাভ করবে, ভেদভাব বা আরো অধিক নিকৃষ্টতার শিক্ষা লাভ করবে।
অন্যদিকে বিচার করো, তোমার সমাজে ধার্মিকদের বিশেষ পোশাকদ্বারা চিহ্নিত করা যেতে পারে। আর সেই সুবাদে অনেকেই ধার্মিকের বেশ ধারণ করে ধার্মিক সেজে বসে রয়েছেন। সমাজের সাধারণ মানুষ ধর্মের উচ্চভাবের বা দর্শনের কিছুই বোঝেন না। তাই তাঁরা সেই পোশাকধারি ধার্মিক, যিনি আদপে ধার্মিকই নন, তাঁর কাছে উপস্থিত হচ্ছেন। আর তিনি কি করছেন? কিছু নাট্য বা কিছু জাদু প্রদর্শন করে করে, প্রথমে সকল সাধারণ মানুষকে নিজের প্রতি আকৃষ্ট করে নিচ্ছেন। আর তা করার পর কি করছেন?
যতরাজ্যের ভেদভাব তার বীজ অর্পণ করছেন সকলের মধ্যে। জাতির বৈষম্য থেকে শুরু করে, বৈষম্যতা এমন ধারায় উন্নীত হয়ে যায় যে স্বয়ং প্রকৃতিরই অবমাননা করা শুরু হয়ে গিয়ে, তাঁরা বলতে শুরু করেন যে তৃণের প্রাণ নেই, তাই তৃণ ভোজন করলে প্রাণী হত্যা হয়না। অর্থাৎ বুঝতে পারছো? যদি পোশাকাদির দ্বারা সমস্ত কিছুকে চিহ্নিত করার প্রয়াস করো, তাহলে সাধারণ মানুষ আর ব্যক্তির দর্শনকে জানার প্রয়াসও করেনা, কেবলই বাহ্যিক রূপ দেখেই তাঁকে সাধু, নটি, নেতা, ধনী ইত্যাদি মেনে নেওয়া শুরু করে দেন।
তাই কৃতান্তিক এমন কনো পোশাকাদি ধারণ করবেন না। অর্থাৎ সাধারণ মানুষকে যদি বুঝতে হয় যে সম্মুখে মানুষটি কৃতান্তিক না কৃতান্তিক নন, তাহলে তাঁর দর্শনকে পরখ করতে হবে। অর্থাৎ এই ভাবে সাধারণ মানুষকে বাধ্য করা যেতে পারে যাতে তাঁরা দর্শনের বিচার করতেই থাকেন সর্বক্ষণ, কারণ তা না হলে তাঁরা কৃতান্তিকদের সনাক্তও করতে পারবেন না, আর তা না পারার কারণে স্বয়ং ঈশ্বরের আদেশকে না জেনেই অবহেলা করে নিজেদের জীবনকে নরক বানিয়ে ফেলবেন।
বুঝতে পারছো কি প্রসঙ্গে কথা বলছি এক্ষণে? একটি সময় ছিল যখন সাধারণ মানুষের কাছে সমস্ত কিছুকে সহজ করে দেবার প্রয়াস করা হতো। সেই প্রয়াসের কারণে সমস্ত কিছু সহজবোধ্য করে তোলা হয়েছিল। যাতে সাধুকে, ধনীকে, পণ্ডিতকে, নটিকে সহজেই মানুষ চিহ্নিত করতে পারে, সেই প্রয়াস করা হয়েছিল। কিন্তু এর পরিণাম কি হয়েছিল?
সাধারণ মানুষ সহজ ভাবেই সমস্ত কিছু বুঝতে পারেন, সেই সুবাদে বেশ কিছু অসাধু সাধু সেজে বসে থেকে সমাজকে অধঃপতনে প্রেরিত করেছেন, বেশ কিছু অনেতা নেতা সেজে বসে থেকে সমাজকে লুণ্ঠন করেছেন, বেশ কিছু অনটি নটি সেজে সমাজকে বিভ্রান্ত ও কামাতুর করে দিয়েছেন। আর এই সমস্ত কিছুর পরিণাম কি হয়েছে? মানব যোনিই আজ বিপন্ন হয়ে উঠেছে, অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলার মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে এই ক্ষণে মানব যোনি।
কেন? সমস্ত কিছু সহজলভ্য হবার কারণে, মানুষ বিচার করাই বন্ধ করে দিয়েছে। সাধুর পোশাকে কারুকে দেখলেই সে সাধু। বিচার করে, পরখ করে তাঁর দর্শনকে, তাঁর উদারতাকে, তাঁর বৈষম্যহীনতাকে, তাঁর প্রকৃতির প্রতি নিষ্ঠাকে, তাঁর যথার্থতার প্রতি সম্মানকে দর্শন করার প্রয়াস করাই ভুলে গেছে মানুষ। আর এর ফলে কি হয়েছে? মানুষের মধ্যে দর্শনের বিকাশই হতে পারেনি। মেধার পরিবর্তে কল্পনাকেই মেধা মেনে চলেছে আর তাই চেতনার বিকাশই হতে পারেনি।
চিন্তা ও ইচ্ছার বশবর্তী হয়ে, বিবেক ও বৈরাগ্যকেই অবহেলা করে গিয়েছে। বিরক্তিভাবকে বৈরাগ্য মেনে নিয়েছে, আত্মকে পরমাত্মকে পরমেশ্বর জ্ঞান করে নিয়েছে, এবং আত্মসর্বস্ব হয়ে গেছে। কেন দোষ দাও সাধারণ মানুষকে? যেই সম্প্রদায় আমিত্বের পূজা করে, যদি সেই সম্প্রদায়কে শ্রেষ্ঠত্বের স্থান দেওয়া হয়, তাহলে তো সমাজ আমিত্ব নিয়েই উলমালা থাকবে, এটিই তো স্বাভাবিক। আর তাই তো ঘটেছে। তাহলে সাধারণ মানুষের এতে অপরাধটা কি? কিন্তু বিনা অপরাধে, কেবল মাত্র সমস্ত কিছু সহজ করে দেওয়া হয়েছে তাদের কাছে, তাই তাঁরা মেধার জন্ম দিয়ে বিচার করার প্রয়াস করেননি বলে, তাঁরা আজ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবার দ্বারে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে।
বিচার করে দেখো, কিছু খল ও আত্মসর্বস্ব মানুষের প্রভাবের কারণে সম্যক মানবযোনি আজ অবলুপ্তির পথে, প্রকৃতির কোপের মুখে পতিত এই উন্নত যোনি। কিন্তু তার কারণ কি? সমস্ত কিছু সহজলভ্য করে রাখা হয়েছিল এঁদের সম্মুখে, আর তারা বিচারই করেন নি যে যা কিছুকে তাঁরা গ্রহণ করছেন, তা যথার্থ না অপদার্থ।
তাঁরা বিচারই করেন নি যে যাকে তিনি সাধু বলছেন, তিনি যথার্থই সাধু তো নাকি ছাইমাখা ভণ্ড সে! তাঁরা বিচারই করেন নি যে যাকে নটি বলছেন, তাঁরা নটি তো, নাকি অঙ্গে রং মাখা কামদেবী তিনি! তাঁরা বিচারই করেন নি যে যিনি নেতার পশাকে রয়েছেন, তিনি আদপে দেশপ্রেমী তো, নাকি ভণ্ড তপস্বী হয়ে দেশকে লুণ্ঠন করা অসুর তিনি! … আর এই সমস্ত বিচার না করার কারণে, না জন্ম নিয়েছে তাঁদের মেধা আর না সম্ভব হয়েছে তাঁদের চেতনার বিস্তার। ফল? বিনাশের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে সম্পূর্ণ যোনি।
তাই ভুলেও কনো কিছু আর সহজ করে দিও না। বিচার করে দেখো মাতা সর্বশ্রী তোমাদের জীবনকে সহজ করে দেন নি, বরং আরো আরো জটিল করে তুলেছিলেন। বিচার করে দেখো, মাতা সর্বাম্বা স্বয়ং নিজের জীবনকে সহজ করে দেননি, বরং সমানে আরো আরো জটিল করে তুলেছিলেন। সম্মুখে অবস্থা যতই আলোআঁধারে স্থাপিত থাকবে, ধুয়াসায় পরিপূর্ণ থাকবে, ততই আমরা বাধ্য হই বিচার করতে, মেধাকে জাগ্রত করতে।
বিচার করে দেখো মাতা সর্বশ্রী কি শিক্ষা দিয়েছেন তোমাদেরকে! তিনি শিখিয়েছেন যে প্রয়োজনই আমাদেরকে কর্মঠ করে, আমাদের অন্তরের প্রতিভাকে বিকশিত করে। প্রয়োজন বিনা না তো আমরা হামাগরি দিতে শিখেছি, না আমরা দুই পায়ে দাঁড়াতে শিখেছি, না আমরা কথা বলতে শিখেছি, না আমরা লিখতে শিখেছি, না আমরা কনো কিচ্ছু শিখি। প্রয়োজনই আমাদের দিয়ে সমস্ত কিছু করায়। তাই সমস্ত কিছু সহজ করে দিয়ে প্রয়োজনকেই নষ্ট করে দিও না।
যতদিন প্রয়োজন থাকবে বিচার করার, ততদিনই বিচার করার প্রয়াস থাকবে। তাই নিজেদেরকে কৃতান্তিকরূপে ঘোষণা না করে, কৃতান্তকে ঘোষণা করো, এবং সম্মুখের ব্যক্তিকে বাধ্য করো যাতে তিনি তোমাকে বিচার করেন, এবং তোমার অন্তরের কৃতান্তিককে স্বয়ং দর্শন করেন। তোমার নিজেকে কৃতান্তিক রূপে ঘোষণার ভরসায় যেন তিনি তোমাকে কৃতান্তিক না বলেন, যেন তিনি নিজে আবিষ্কার করেন যে তুমি কৃতান্তিক।
(মৃদু হেসে) বিচার করে দেখো, প্রথম দেখাতেই তুমি সেই ব্যক্তিকে মহাশিক্ষা প্রদান করে দিলে। কি ভাবে? তুমি নিজেকে কৃতান্তিক রূপে প্রচার করলেনা, কিন্তু সে বিচার করে তোমাকে কৃতান্তিক রূপে সনাক্ত করার কারণে তাঁর মেধা জাগ্রত হয়ে গেল। অর্থাৎ তুমি বিনা কনো প্রয়াসে তাঁর মেধাকে জাগ্রত করে তুলে, তাঁকে সত্যের উদ্দেশ্যে, মোক্ষের উদ্দেশ্যে, এবং চেতনাজাগরণের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করে দিলে”।
বিজয়া বিস্ময়ের সাথে বললেন, “তোমাকে কি বলবো মীনাক্ষী! কিছু বলতে গেলেই তুমি বলবে, যা কিছু তুমি হয়েছ, তা প্রভু ব্রহ্মসনাতনের জন্যই হয়েছ। কিন্তু সত্য বলছি মীনাক্ষী, আমি অত্যন্ত বিস্মিত, আর আমার বিশ্বাস যে আমাদের মধ্যে অনেকেই আমার মত বিস্মিত তোমাকে নিয়ে। একটি মানুষ কি করে সর্বক্ষণ সর্বকিছুর মধ্যে দিয়ে লোকহিতের কথা বিচার করতে পারে? সর্বভাবে তুমি লোকহিতেরই ভাব রাখো? কি ভাবে লোকের উন্নতি হবে, কিভাবে তাঁদের মেধার বিস্তার হবে, কি ভাবে তাঁদের অন্তরে চেতনার বিস্তার হবে! … কি ভাবে?”
মীনাক্ষী হেসে বললেন, “বিজয়া, প্রভু কি বলতেন জানো? তিনি বলতেন পিতামাতার প্রেম দেখেছ? ভালো করে নিরীক্ষণ করে দেখো তা। কি দেখবে জানো? দেখবে, পিতা সমস্ত কিছু সহ্য করতে পারেন কিন্তু তাঁর স্ত্রীর সম্বন্ধে কেউ ভুল ধারণা রাখুন, তা সহ্য করতে পারেননা। সমস্ত সম্ভব প্রয়াস করেন যাতে সেই ভুল ধারণার নাশ হয়। একই ভাবে মাতাও সমস্ত কিছু সহ্য করে নিতে পারেন কিন্তু তাঁর পতির সম্বন্ধে সন্তান ভুল ধারণা রাখুক, তা কিছুতেই সহ্য করতে পারতেন না।
এই কথা বলে তিনি বলতেন যে, প্রেম ও প্রেমিকের মধ্যে একটি অদ্ভুত বন্ধন থাকে, এক অলিখিত, এক অঘোষিত বন্ধন। প্রেমিক কিছুতেই চান না যে তাঁর প্রেম সম্বন্ধে কারুর ভ্রান্ত ধারণা থাকুক। এই কথা বলে তিনি বলতেন, সেই কারণে তিনি কৃতান্ত কথা বলেন, যাতে জগন্মাতার সমস্ত সন্তানের মধ্যে বিরাজ করা তাঁদের মাকে নিয়ে সমস্ত ভ্রান্ত ধারণার নাশ হয়।
শুনেছি তখন, কিন্তু তখন ঠিক বুঝিনি। এই দেহে যখন প্রভুর কৃপাতে মায়ের প্রতি প্রেম জন্মনিলো, তখন অনুভব করলাম প্রভুর কথাখানি। এক প্রেমিকের হৃদয়ে যখন তাঁর প্রেমের সন্তানরা তাঁর প্রেম সম্বন্ধে ধারণা করতে পারে না, যখন পিতা দেখেন যে তাঁর সন্তানরা তাঁদের মাতাকে লেশ মাত্রও চেনেন না, তখন তিনি আড়ালে ক্রন্দন করে ওঠেন। নিজেকেও অপরাধী মানা শুরু করেন তিনি এই বলে যে, কেমন বাপ আমি যে সন্তানদের কাছে তাঁদের মাকে চেনাতেই পারলাম না!
প্রভুর কৃপাতে আজ সেই প্রেম অনুভব করে, আমিও সেই একই যন্ত্রণাতে কাতর বিজয়া। সর্বক্ষণ মনে একটিই কথা চলে। কি করলে, মায়ের সমস্ত সন্তান মাকে সঠিক ভাবে চিনতে পারবে। না না আমাকে সন্ধান করতে হয়নি, কারণ প্রভু এর সন্ধান করে গেছেন। সন্ধান করে তিনি বলে গেছেন যে, চেতনার দ্বারাই মা’কে চেনা সম্ভব, আর চেতনার বিকাশ হয় মেধার বিকাশের কারণে, আর আত্ম কল্পনাকে মেধা সাজিয়ে রেখে দিয়ে, চিন্তাকে বিচার সাজিয়ে রেখে দিয়ে আর ইচ্ছাকে বিবেক সাজিয়ে রেখে দিয়ে, মেধাকে জন্মই নিতে দিচ্ছেনা, চেতনাকে জাগ্রতই হতে দিচ্ছেনা, আর সন্তানকে মাতা সম্বন্ধে জানতেও দিচ্ছেনা।
আর প্রভুর দেখানো সেই মার্গকে দেখে ও অনুভব করে, আজ আমি তাই সর্বভাবে প্রয়াস করি যাতে মেধার জন্ম হয়, বিচার করে মানুষ, বিবেক জাগে মানুষের, আর পুনরায় তাঁরা মাতাকে চিনতে ও জানতে শেখেন। হ্যাঁ এটা ঠিক যে, মাকে সঠিক করে চিনে গেলেই, মোক্ষকামী হয়ে ওঠে জীব। এটাও ঠিক যে মায়ের দর্শন পেয়ে গেলেই সমাধি হয়ে যায় জীবের। আর এটাও ঠিক যে মায়ের দর্শন লাভ করে, মায়ের সাথে একাত্ম হয়ে গেলে, জীব মোক্ষ লাভ করে, কারণ সে নিজের সমস্ত অসত্য তত্ত্বের বিসর্জন দিয়ে সত্যে অর্থাৎ ব্রহ্মে বা শূন্যে লীন হয়ে যায়।
কিন্তু বিশ্বাস করো, যতটা মানুষের প্রতি প্রেম ছিল প্রভুর কথাতে, তার থেকে অনেক অনেক অধিক প্রেম ছিল মাতার প্রতি। অর্থাৎ সন্তানরা যাতে মা’কে জানে, মায়ের পরিচয় ঠিক করে জানে, সেটিই ছিল তাঁর ভাবনা। হ্যাঁ, তাঁর এই ভাবনার কারণে জীব মোক্ষকামী হয়ে উঠে মোক্ষও লাভ করে ফেলতে পারেন। তাই অবশেষে তা হয়ে ওঠে জীবকল্যাণময় কর্ম। কিন্তু জীবকল্যাণ করা তাঁর মুখ্য উদ্দেশ্য হতো না। তাঁর মুখ্য উদ্দেশ্য হতো মাতার প্রকৃত পরিচয় স্থাপন করা। মায়ের সম্বন্ধে সন্তান ভ্রান্ত ধারণা রাখলে, হৃদয় ক্রন্দন করে উঠতো তাঁর।
না, তিনি তা বলতেন না, কেবলই ক্রন্দন করতেন। আজ সেই একই অনুভূতি লাভ করেছি আমি তাঁর কৃপায়। আর তাই আজ আমি অনুভব করতে পারছি যে সেদিন তিনি কেন ক্রন্দন করতেন। হ্যাঁ, তাঁর বা আমার এই প্রয়াসেরর কারণে জনহিত হয়ে যায়, কিন্তু জনহিতের জন্য আমি সর্বদা চিন্তিত থাকি, বা তিনি চিন্তিত থাকতেন, তা মিথ্যাচার হবে মানুষের কাছে।
হ্যাঁ আমাদের কথাতে তোমাদের হিত লুকিয়ে রয়েছে ঠিকই, কিন্তু মিথ্যা বলে তোমাদের চোখে আমরা শ্রেষ্ঠ সাজতে চাইনা যে আমরা সর্বদা তোমাদের হিত নিয়ে চিন্তিত থাকি। সর্বদা আমরা মায়ের সম্মান নিয়েই চিন্তিত থাকি, আর তার কারণে তোমাদের হিত হয়ে যায়। সর্বদা তোমরা আমাদের হৃদয়ে নিবাস করো, এই ভ্রান্ত ভাবনা রেখে তোমরা আমাদেরকে শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করো না”।
বিজয়া হেসে মীনাক্ষীর অঙ্গের বিভিন্নস্থানে অত্যন্ত স্নেহের হস্তস্পর্শ করতে করতে, অবিচল ভাবে মীনাক্ষীর নয়নের দিকে তাকিয়ে থেকে হেসে বললেন, “যথার্থ ভাবেই তোমার প্রভু আর তুমি শ্রেষ্ঠ মীনাক্ষী। যিনি নিজেকে শ্রেষ্ঠ বলে প্রতিপন্ন করেন, তিনি শ্রেষ্ঠ হননা। তোমরাই শ্রেষ্ঠ, কারণ তোমরা নিজেদেরকে শ্রেষ্ঠ বলতে কুণ্ঠিত। সত্যই শ্রেষ্ঠ তোমরা মীনাক্ষী, সেই কারণেই তো নিজেদেরকে শ্রেষ্ঠ বলতে কুণ্ঠিত তোমরা”।
জয়া বললেন, “একটি বিষয় নিয়ে আমার একটি দ্বন্ধ আছে মীনাক্ষী। আচ্ছা যদি দক্ষিণা শিক্ষার মূল্য হয়, তবে জন্মাদি, বা শ্রাদ্ধাদি বা বিবাহাদি বা এই পূজাদি কর্মের কারণে কেন দক্ষিণার প্রসঙ্গ রাখলে তুমি?”
মীনাক্ষী হাস্য সহকারে উত্তরে বললেন, “দিদি, দক্ষিণা হলো দীক্ষার মূল্য। দীক্ষার অর্থ হলো শিক্ষার্জনের জন্য মেধাকে প্রস্তুত করে, মেধাকে শিক্ষিত করার যুগ্মপ্রক্রিয়া। যেমন শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে, এই কর্ম করা হয়, তেমনই কৃতান্তিক জন্মের রীতিপালনের ক্ষেত্রে, শ্রাদ্ধের রীতির ক্ষেত্রে, বিবাহের রীতির ক্ষেত্রে এবং পূজার রীতি পালনের ক্ষেত্রে করে থাকেন। এই সমস্ত ক্ষেত্রে, তিনি উপস্থিত রীতি পালকের মধ্যে মেধার জন্মদান করে, সেই মেধাকে সত্যের দর্শন শিক্ষা প্রদান করেন।
অর্থাৎ এই সমস্ত কর্মই হলো দীক্ষাদান। যারা কৃতান্তিক ধর্মানুসারে শিশুর জন্মরীতি পালন করেছেন তারাও তাই দীক্ষিত; একই ভাবে যারা বিবাহের রীতি পালন করেছেন কৃতান্তিক ধর্মানুসারে তাঁরাও দীক্ষিত। ঠিক অনুরূপ ভাবে কৃতান্তিক ধর্মানুসারে যারা পূজাদি করেছেন, তাঁরাও দীক্ষিত, এবং যারা শ্রাদ্ধের রীতি পালন করেছেন তাঁরাও দীক্ষিত। আর তাই এই সমস্ত কিছু রীতির থেকে দক্ষিণার ধারা নির্মিত হয়।
আর বলা বাহুল্য যে, এই প্রতিটি দীক্ষা ও দক্ষিণার ক্ষেত্রে, একই ধারা সক্রিয় থাকবে, যা পূর্ণশিক্ষা প্রদানের ক্ষেত্রে পালিত হয়। দক্ষিণা হলো দীক্ষা দানের মূল্য, আর তা সেই রূপেই পালিত হবে”।
অরিত্রা বললেন, “বৈদিক ধর্মানুসারে, বীজমন্ত্র দান হলো দীক্ষা প্রদান। এর সাথে এই দীক্ষার ভেদ কি? অর্থাৎ কৃতান্তিক ধর্মের কথিত দীক্ষার ভেদ কি?”
মীনাক্ষী উত্তরে বললেন, “প্রাথমিক ভাবে, বৈদিকরা যাকে দীক্ষা বলতেন, তাই কৃতান্তিক ধর্মের দীক্ষা। তবে কালযাপনের সাথে সাথে বৈদিকরা সেই দীক্ষার মূল্য হারিয়ে ফেলে, যত্রতত্র বীজমন্ত্র বিলিয়ে বিলিয়ে, দীক্ষাব্যবস্থাকেই কলুষিত করে করে অসুরকুলের নির্মাণ করে ফিরেছেন। কৃতান্তিক তাই সেই ব্যাপারে সতর্ক, এই ভেদ মাত্র।
মধ্যা কথা এই যে, বীজ যেকোনো জমিতে অর্পণ করা যায়না। সেই জমিতে প্রথমে জল দিয়ে দিয়ে মৃত্তিকাকে নরম করতে হয়, অতঃপরে সেই ভূমিকে কর্ষণ করতে হয়, এবং অন্তে বীজ অর্পণ করতে হয়। তবেই একটি বীজ একটি বনস্পতির জন্ম দিতে সক্ষম হয়। একই ভাবে, একটি জীবের চেতনাকে প্রথমে জাগ্রত করতে হয়, মেধা বা জলতত্ত্ব প্রদান করে করে। অতঃপরে, সেই জাগ্রত চেতনাকে শিক্ষিত করতে হয়, অর্থাৎ কর্ষণ করতে হয় সত্যশিক্ষা প্রদান করে করে। অন্তে সেই কর্ষিত ক্ষেত্রভূমিতে বীজ অর্পণ করতে হয়। এই হলো সম্পূর্ণ ভাবে দীক্ষার পদ্ধতি।
এতেই দীক্ষা সম্পন্ন হয়। যত্রতত্র বীজ অর্পণ করলে, সেই ক্ষেত্র থেকে বনস্পতির জন্ম হতে পারেনা। বীজ নষ্ট হয়ে যায়, কিন্তু বীজ ধারণ করার অহংকারে অহংকারী হয়ে উঠে জীব অসুর হয়ে ওঠে। বৈদিকরা ঠিক তেমনই করেছেন। যাকে তাকে বীজ অর্পণ করেছেন তাঁরা। না মেধার বিকাশ করতেন সংগীতাদি রসালো সামগ্র্যর মাধ্যমে, না সেই রসালো ক্ষেত্রভূমিকে কর্ষণ করতেন অর্থাৎ তাতে প্রকৃতির, নিয়তির বা চেতনার শিক্ষা প্রদানই করতেন না, কিছু দেবতার নাম ও সঙ্কীর্তন রূপী রীতির পালন করিয়ে দিতেন কেবল। আর বীজ অর্পণ করে দিতেন।
আর তাদের পদ্ধতি যে সম্পূর্ণ ভাবে ভ্রান্ত ছিল, তার প্রমাণ হলো এই মানব যোনির অবলুপ্তির অবস্থা, এবং প্রভু ব্রহ্মসনাতনের ঘোষণা যে আর বৈদিক সভ্যতায় একটিও অবতার জন্ম নেবেনা, কারণ তা অবতারের জন্মলাভের জন্য সম্পূর্ণ ভাবে অযোগ্য হয়ে গেছে, সম্পূর্ণ ভাবে অপবিত্র হয়ে গেছে সম্পূর্ণ বৈদিক ধর্ম।
তাই যদি সত্য বিচার করো তবে, প্রাচীনকালে ঋষিরা যাকে দীক্ষাপদ্ধতি বলতেন, যেই পদ্ধতির পালন ঠাকুর শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ করেছিলেন তাঁর দ্বাদশ শিষ্যকে দীক্ষিত করতে, সেটিই হলো প্রকৃত দীক্ষা পদ্ধতি, এবং কৃতান্তিক তাকেই দীক্ষা পদ্ধতি বলেছে।
উদ্দেশ্য বোঝো অরিত্রা। সমস্ত কিছুই ভ্রম, সেই ভ্রমের মধ্যেই আমরা স্থিত। ঠিক যেমন নিজের বাড়ির বাইরে থেকে বাড়িকে কেমন দেখতে লাগে তা কনো দিনও না দেখে তার অনুমান করা যায়না, ঠিক তেমনই ভাবে আমরা যেই বাড়িতে থাকি তা হলো ভ্রম। সেই ভ্রম নামক বাড়ির বাইরে আমরা কখনো যাইনি, অর্থাৎ কখনোই আমাদের সমাধি হয়নি। আর তাই সেই বাড়িকে কেমন দেখতে তাই আমাদের জানা নেই। আমাদের বাড়ির নাম যে ভ্রম, তাও আমাদের জানা নেই। তাই আমাদের এই দীক্ষার প্রয়োজন। এই দীক্ষাই আমাদেরকে সমাধি পর্যন্ত নিয়ে যায়, আর তখনই আমরা এই ভ্রম-নামক বাড়িকে বাড়ির বাইরে থেকে দেখতে পাই, আর তখনই আমাদের সমস্ত ভ্রমের নাশ হয়”।
