২০। মহারীত অধ্যায়
জয়া এবার বললেন, “মীনাক্ষী, এবার মহারীত সম্বন্ধে তোমার থেকে জানতে আগ্রহ হচ্ছে আমাদের। পূজার রীতি সম্বন্ধে বিস্তারিত ভাবে বলো। পূজা করার অন্তরালে দর্শনের বিবরণ দাও, আর সেখান থেকে রীতির নির্মাণ করো। আমার স্থির বিশ্বাস জন্মেছে যে তোমার কথিত রীতিসমূহকে সম্মতি জানাতে এক না একদিন মাতা সর্বাম্বা স্বয়ং প্রকট হবেন। তুমি দেখে নিও। মিলিয়ে নিও আমার কথন।
তোমার দর্শন ব্যাখ্যা ভ্রান্তহীন, যেন সম্পূর্ণ ভাবে ত্রুটিহীন, এমনই বোধ হচ্ছে তা শ্রবণ করার কালে। তাই সেই দর্শনকে কেন্দ্র করে স্থির রীতিও ত্রুটিহীন। আর তার থেকেও বড় কথা, তোমার লোকশিক্ষা প্রদানের ধারা আমার কাছে অদ্ভুত লেগেছে। যথার্থ বলেছ তুমি, মানুষ বা যেকোনো জীব যখন কনো কিছুর প্রয়োজন জ্ঞান করে, তখনই কনো জিনিসকে গ্রহণ বা বর্জন করে।
তাই প্রকৃত ধর্মপ্রচার তাঁর কাছেই করা উচিত, যিনি ধর্মের আবশ্যকতা অনুভব করছেন। যিনি কারুকে জন্ম দেবার জন্য প্রফুল্লিত, কারুকে হারাবার জন্য শোকাহত, বা কারুর সাথে মিলনে অস্থির, তখনই তাঁর ধর্মের মার্গদর্শন প্রয়োজন। তাই প্রতিটি ধর্মই সেই সময়ে নিজেদের রীতিসমূহদের নিয়ে তাঁর সম্মুখে উপস্থিত হন। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই, প্রায় সমস্ত ধর্মই রীতির প্রতি অন্ধবিশ্বাস অর্পণ করতে বলেন অনুগামীদের এবং তাই, সেই রীতি অনুগামীদের কাছে এক মচ্ছবের কারণ হয়, বিশেষ করে তাঁদের কাছে অর্থের বাহুল্য থাকলে, আর তা থাকলে সেই রীতিই তাঁদের কাছে সমাজের বা ধর্মের থেকে চাপিয়ে দেওয়া অর্থব্যয়ের বোঝা হয়ে যায়।
তুমি কৃতান্তিক ধর্মের মধ্যে এক অনবদ্য পরিবর্তন আনলে তোমার নির্মিত রীতি দ্বারা, কারণ তোমার নির্মিত রীতি না তো অর্থের বোঝা চাপিয়ে দিতে উদ্যোগী আর না অন্ধবিশ্বাস অর্পণ করতে রাজি। যখন সকলের ধর্মের প্রয়োজন, ধর্মের থেকে মার্গদর্শনের প্রয়োজন, তখনই তুমি রীতি রাখছো তাঁদের সম্মুখে, আর সেই রীতির মধ্যে দর্শনজ্ঞান বিস্তার করাকেই সমস্ত কিছু রূপে অর্পণ করে, সকল অনুগামীর অন্ধবিশ্বাস হনন করে, তাঁদেরকে সার্বিক ভাবে উন্নত মানসিকতার গড়ে তুলে, তাঁদেরকে লক্ষ্যের উদ্দেশ্যে, জীবনমৃত্যুর থেকে মুক্তির উদ্দেশ্যে ধাবিত করতে উদ্যত।
জানি তুমি সত্য বলছো, না না তোমার প্রমাণ করার কনো প্রয়াজন নেই যে তোমার কথিত সমস্ত রীতি ও দর্শন মাতা সর্বাম্বার দ্বারা পরিচালিত, কারণ এতো নিখুঁত রীতি ও দর্শন তিনি ব্যতীত কেউই প্রদান করতে পারেন না। তবে একটি বিষয়ে তোমার, হ্যাঁ তোমার প্রশংসা না করে থাকতে পারছিনা, আর তা হলো তোমার লোককল্যাণ চিন্তা ও লোককল্যাণের জন্য ব্যকুলতা। লোককল্যাণকে তুমি এতটা গভীর ভাবে হৃদয় দ্বারা বাসনা করো যে, স্বয়ং মাতা সর্বাম্বা তোমার জিহ্বায় আসীন হয়ে তোমার মুখনিঃসৃত শব্দ দ্বারা রীতি ও দর্শনের বিস্তার করছেন।
কই তিনি তো আমাদের মধ্যে কারুর জিহ্বাতে বসলেন না! কারণ আমাদের মধ্যে তোমার ন্যায় এতটা নিশ্চল ভাবে লোকহিতের ভাবই নেই। সমস্ত মানবজাতিকে মোক্ষের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাবার না আছে সাহস আর ন আছে উদ্যম আমাদের মধ্যে। তা তোমার মধ্যে আছে বলেই তো, তোমার জিহ্বাকে তিনি বেছে নিয়েছেন এই কথার বিবরণ প্রদান করার জন্য। … তাই মীনাক্ষী, নির্দ্বিধায় আমাদেরকে পূজার রীতি ও দর্শন বলো। সেই কথা শুনতে যতটা আগ্রহী, ততটা তোমার সান্নিধ্য লাভ করে তৃপ্ত আমরা। তোমাকে আমাদের বড় আপন মনে হচ্ছে, মনে হচ্ছে যেন তুমি আমাদের অঙ্গজাত নয়ত আমরা তোমার অঙ্গজাত। কনো, কনো ভাবে তোমাকে পর মনে হচ্ছে না। তাই তুমি বলো প্রিয়ে, বলো মীনাক্ষী। অমৃত কথা শোনাও আমাদেরকে”।
২০.১। পূজ্যরীত পর্ব
মীনাক্ষী হাস্যপ্রদান করে বললেন, “পূজার কথা বলতে হলে, একটিই দর্শন সম্মুখে থাকে, আর তা হলো মাতা সর্বাম্বার দর্শন, ব্রহ্মময়ীর দর্শন। না না, পূজা মানে শুধুই তাঁর দর্শন করা ব্যক্তিসমূহদের অভিজ্ঞতার মার্গদর্শন নয়, পূজা মানে তাঁর দর্শনের অভিলাষ। এই একটিই পূজা করার কারণ, আর কিচ্ছু নয়। তাঁর দর্শন লাভ করার জন্যই পূজা, যাকে একবার দর্শন করে নিলে, হৃদয়ে মিলন ছাড়া অন্য কনো কিছুর ভাব জন্ম নিতেই পারেনা।
মা বলো বা মেয়ে, সখী বলো বা প্রেম, তিনি যে সমস্ত কিচ্ছু একাধারে। তাই তাঁকে দর্শন করা মাত্রই সন্তান হয়ে তাঁর বক্ষে আছরে পরার সাধ হয়, বিভোর হয়ে তাঁকে আলিঙ্গন করে বক্ষে ধারণ করার সাধ হয়, সখী জেনে তাঁকে প্রাণপণে আলিঙ্গন করে বলতে সাধ হয় যে, তোমার থেকে আর আলাদা হতে চাইনা সখী, আর প্রেমিকা হয়ে তাঁকে বলতে ইচ্ছা করে, তুমি প্রেমিক নয়, তুমি যে সাখ্যাত প্রেম, তুমি ছেড়ে চলে গেলে যে আমি প্রেমিক হারাবো না, প্রেমই হারিয়ে ফেলবো, তাই কৃপা করো, আমাকে আর দূরে রেখো না।
বলতে সাধ করে, তুমি যেই ভাবে থাকতে বলবে, সেই ভাবেই থাকবো, সন্তান হতে বললে সন্তান হবো, অবিভাবক হতে বললে অবিভাবক হবো, সখী হতে সখী হবো, প্রেমিক হতে বললে তাই হবো, শুধু ছেড়ে যেও না। কিন্তু বিড়ম্বনা এই যে এতো কিছু বলার সাধ থাকলেও, মুখ দিয়ে একটি শব্দও উচ্চারিত হয়না। কেবল অশ্রু এসে নয়নকে বিরক্ত করে। বার বার সাধ জাগে সেই অশ্রুকে বকাঝকা করতে যে কেন তাঁর আর আমার মাঝে চলে আসছিস বারবার! কেন তাঁকে ভালো করে নিরীক্ষণ করতে দিচ্ছিস না!
কিন্তু অশ্রুও যেন তর্ক জুরে দেয়, কেবল তুইই দেখবি তাঁকে, আমার কি তাঁকে দেখার সাধ ছিলনা! তুই তো নয়ন দিয়ে খুঁজেছিস তাঁকে, আমি যে তোর হৃদয় হয়ে তাঁকে অনুক্ষণ খুঁজে চলেছি! … বাকরোহিত হয়ে যাই। আপস করে নিতে বাধ্য হই অশ্রুর সাথে। সত্যই তো উনার সন্ধান করেছিই যে হৃদয়ের কারণে আর আজ সেই হৃদয় অশ্রু হয়ে বইছে, তাকে কি ভাবে প্রতিরোধ করি। কিন্তু অশ্রুর সাথে আপস করে নেবার কালে, মা’কে যে ঠিক করে দেখতেই পাইনা! যেন সম্মুখে থেকেও ঝাপ্সা তিনি!”
মীনাক্ষীর নয়ন অশ্রুতে পরিপূর্ণ, তাঁর অঙ্গ থরথর করে কাঁপছে। বিজয়া ভীত হয়ে উঠলো, বাঁধা দিতে গেল মীনাক্ষীকে, জয়া তাঁকে ধরে রেখে কাছে টেনে এনে বলল, “প্রেমের মধ্যে প্রবেশ করার প্রয়াসও করিস না বিজয়া, খড়কুটোর মত উড়ে যাবি। মীনাক্ষী এইমুহূর্তে প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে। পাগল হয়ে উঠছে ওর হৃদয়, ওর আরাধ্যের দর্শন পাবার জন্য, ওর জীবন যার কাছে সমর্পিত, তাঁর স্পর্শ পাবার জন্য। চুপচাপ বসে দেখ যা হচ্ছে”।
বিজয়া বসলেও, তাঁর হৃদয় নিজেকে মীনাক্ষীকে প্রাণের সখী করে ফেলেছে। সখির এই কম্পমান অবস্থা, এই অশ্রুতে স্নাত অবস্থা তাঁকেও অস্থির করে তুলল। অশ্রু তাঁর নয়নেও এসে গেল। দিদির বারণ, তাই বাঁধা দিতে পাচ্ছেনা। কিন্তু সখীর এমন করুন অবস্থা সে যে কিছুতেই সইতে পাচ্ছেনা।
মীনাক্ষী যেন সম্পূর্ণ অন্তর্মুখী। বাইরে কে কি বলছে, কে কি করছে, সেইসমস্ত কিছুর কনোরূপ খবর নেই তাঁর কাছে। তাঁর হৃদয় যেন ক্রমশ ব্রহ্মময়ীর শূন্যতায় বিলীন হয়ে যাচ্ছে। আর তাই তাঁর কণ্ঠস্বর সমানে নরম হয়ে যাচ্ছে, অশ্রুর প্রভাবে কম্পিত হয়ে যাচ্ছে, কোমল ও উষ্ণ হয়ে উঠছে, আর ক্রমে দুর্বল ও অস্ফুট হয়ে উঠতে থাকছে। কিন্তু তাঁর শব্দের ভাণ্ডার সমাপ্ত হবার নাম নিচ্ছে না।
মীনাক্ষী বলে চললেন, “পূজার অর্থই তো তাঁর দর্শনের অভিলাষে নিজের সমস্তটুকু অর্পণ করা। নিজের পরিশ্রমের প্রতিটি স্বেদকণা তাঁকে অর্পণ করে দেওয়া, নিজের প্রতিটি আহারের গ্রাস তাঁকে অর্পণ করে দেওয়া, নিজের প্রতিটি ভাবকে তাঁর কাছে অর্পণ করে দেওয়া, আর প্রাণদ্বারা, হৃদয়দ্বারা, সমস্ত ভূতদ্বারা, সমস্ত ভাবদ্বারা অনুক্ষণ বলে চলা, দর্শন দাও মা, দর্শন দাও। তোমার দর্শন বিনা যে এই জীবন কেবল নয়, সমস্ত জীবন ব্যর্থ। তোমার দর্শনেই তো পরমসুখ। তোমার দর্শন পাচ্ছিনা বলেই তো পরমসুখের সন্ধান করে চলেছি আমি। শুধু কি এই জন্মে, জন্মাজন্মান্তর ধরে কেবলই সেই পরমসুখ খুঁজে খুঁজে দেহের পর দেহ ধারণ করে করে জীবন বেঁচে চলেছি।
শুধুই তো তোমাকে দর্শন করবো বলে, কারণ তুমিই তো সেই পরমসুখ মা। মা, এবার তো দর্শন দাও। দেখো সমস্ত পরিশ্রম তোমার জন্য, সমস্ত স্বেদকণাতে তোমার নাম লেখা; দেখো তুমি সমস্ত ভাব তোমার, সমস্ত কিছুতে কেবল ও কেবল তুমি রয়েছ; দেখো না যেই ধন তুমি প্রদান করেছ জীবনমাধ্যমে, তার মধ্যে যা ব্যয় হয়নি, সমস্ত কিছু রেখেছি তোমার কাছে; দেখো না সমস্ত আহার যা করছি, সমস্ত তোমার দর্শনলাভের জন্য পরিশ্রম করা চেতনাকে প্রদান করছি। সমস্ত বিশ্রাম তোমার জন্য, সমস্ত উদ্যম তোমার জন্য, সমস্ত শ্বাস শুধু আর শুধু তোমার জন্য।
মা, বিশ্বাস করো মা, কিচ্ছু বলতে কিচ্ছু চাইনা তোমার থেকে। কিই বা চাইবো তোমার থেকে? তোমার থেকে কিছু চাইবার অর্থ যে তোমাকে না চাওয়া, কারণ যা কিছু চাওয়া যায় তোমার থেকে আর যা চাওয়া যায়না, সমস্ত কিছু মিলেই তো তুমি। তাই তোমার থেকে কিছু চাওয়ার অর্থ তো তোমার একটি অংশকে চেয়ে নেওয়া আর তোমাকে না চাওয়া। তাই কিচ্ছু চাইনা মা, শুধু দর্শন দাও। একটি বার, একটি বার আলিঙ্গন দাও মা। তোমার একটি স্পর্শ আমার কাছে যে সম্পূর্ণ জীবনকে স্বতঃই অহেতুক বলে দিয়ে, তোমার কাছে মিশে যেতে আগ্রহ প্রকাশে রত”।
এই অন্তিম শব্দগুলি প্রায় কেউই ঠিক করে শুনতে পারলো না, কারণ শূন্যে বিলীন হয়ে যাবার ঠিক পূর্বক্ষণের কথা ছিল সেগুলি। পরের মুহূর্তে ভাবসমাধি হয়ে গেল মীনাক্ষীর। যেন মৃত সে! শরীর এলে পরছিল। বিজয়া আর কারুর অনুমতির অপেক্ষা করলো না, ছুটে গিয়ে সে মীনাক্ষীর ভূমিতে পতিত হতে থাকা শরীরের ঠেস রূপে নিজের তনুকে অর্পণ করলো। জয়া একটু উচাটন হলো, কিন্তু সে দেখলো যেন মীনাক্ষী যেই শূন্যের দর্শন করছে এইক্ষণে নিজের সূক্ষ্মদেহ দ্বারা, তাঁকে স্পর্শ করে যেন বিজয়াও সেই শূন্যের আভাস পেতে থাকলো, আর তা পেয়ে পেয়ে বিজয়ারও নেত্র আনন্দসহযোগে বন্ধ হয়ে গেছে।
উপস্থিত সকলে সেই ভাবের খেলা দেখে নিজেদের জীবন ধন্য হয়ে গেছে, এই বোধ করতে থাকলেন। অনেক শুনেছেন তাঁরা সমাধির কথা, ভাবসমাধির কথা। কিন্তু আজ তা প্রত্যক্ষ করেনিলেন। যেন মানুষ থাকেননা তিনি যার সমাধি হয়। যেন ভগবতীতনু হয়ে ওঠেন তিনি। রৌদ্র এসে পড়তে থাকে মীনাক্ষীর আর বিজয়ার অঙ্গে। সেই দেখে শুদ্ধা উঠে দাঁড়িয়ে নিজের বস্ত্র ছড়িয়ে রৌদ্রকে আড়াল করতে থাকলেন। কিন্তু গ্রীষ্মের প্রখর রৌদ্র একটি শাড়ীর আঁচলে কি ভাবে বাঁধ মানে! তাই একে একে সকল তন্ত্রকন্যারা শুদ্ধার পিছনে দাঁড়িয়ে, রৌদ্রকে সম্পূর্ণ ভাবে আড়াল করে দিয়ে মীনাক্ষী ও বিজয়াকে তাপ থেকে মুক্ত করলেন।
এই অদ্ভুত প্রেম স্নেহ ও সখ্যতার সম্পর্ক দেখে, এবার জয়ার মধ্যেও উদ্দীপনা হওয়া শুরু করলো। না চাইতেও বিচার আসতে থাকলো তাঁর মধ্যে, নিশ্চিত ভাবে মাতা সর্বাম্বার প্রেমের বিস্তার, নাহলে এমন ভাবে একাকীত্ব স্থাপিত হতে পারে এতগুলি মানুষের মধ্যে। আর তা বিবচার করতে করতে, কখন যে তাঁরও ধ্যান হয়ে যায়, তা জয়া নিজেও জানতে পারেনা। তাই এবার বিজয়ার রক্ষার্থে, মল্লরাজ্যের কৃতান্তিক অনুগামী স্ত্রীরা নিজেদের আঁচল বিস্তার করে বিজয়াকে আচ্ছাদিত করতে থাকলো।
অভুতপুরনব দৃশ্য দেখছেন রোজ এবং তাঁর সঙ্গীরা, অরিত্রা ভূমি ও তাঁদের সঙ্গী। যেন তাঁদের অন্তর বলতে থাকলো, এ কোন দিব্যস্থানে এসে গেছেন তাঁরা! এখানে যেন সকলেই একাক দেবতা! এখানে যেন সকলেই ভগবৎতনু, প্রেমের সুত্রে সকলে বাঁধা। যেন এঁরা কেউ আলাদা আলাদা ব্যক্তিত্বই নয়, যেন সকলে মিলে একটিই প্রাণ তাঁরা। সাহস পেলেন কৃতান্তিক ধর্মের বিস্তার করার জন্য। তাঁদের অন্তর যেন বলে উঠলো, যদি এবারও ঠিক করে প্রচার না করতে পারি কৃতান্তিক ধর্মের, তাহলে এবার কেবল কৃতান্তের অপমান করা হবেনা, সাখ্যাত জগন্মাতার অপমান করা হবে, কারণ তা জগন্মাতার প্রাণপ্রিয় এই সন্তানদের এই অপার প্রেমানুভুতির অপমান করা হবে।
যেন রোজদের, অরিত্রাদের এই বোধ জাগরণের জন্যই এই লীলা ছিল মাতা সর্বাম্বার, কারণ ঠিক যখন রোজদের এই বোধ জন্ম নিয়ে নিলো, তখনই মীনাক্ষী সমাধি অবস্থা থেকে ক্রমে ইহজগতে ফিরে আসা শুরু করলো, আর তাঁর সঙ্গে সঙ্গে সকলেই।
ফিরে আসার পর মীনাক্ষীর কণ্ঠস্বর যেন আরো গম্ভীর, আরো নিবিষ্ট, আরো মধুর আর আরো নরম। প্রাণভরা আনন্দ তাঁর। যেন পরমসুখের স্পর্শ পেয়ে এসেছেন আর যেন আশ্বাসবাণী শুনে এসেছেন যে, শীঘ্রতা কর, এই সমস্ত পরমসুখপরিপূর্ণ ঘট তোরই, কাজ শেষ করে শীঘ্র আয়, পান কর এই পরমসুখ। সেই রকমই পূর্ণ আশ্বাস নিয়ে গদগদ হয়ে মীনাক্ষী বলতে থাকলো পুনরায়, যেন এতক্ষণও সে বলছিলই, কিন্তু কেবল কেউ শুনতে পাচ্ছিল না, আর কেউ যে শুনতে পাচ্ছিলনা, তার বোধ তাঁর নেই।
সে বলতে থাকলো, “তিনি তো আমাদের কাছে চেতনা বেশে অবস্থান করে সমস্ত কিছু গ্রহণ করেন। তিনি তো আমাদের আশেপাশে প্রকৃতি হয়ে বিরাজ করে আমাদেরকে সমস্ত কিছু প্রদান করেন, আর তিনি তো আমাদের চারিপাশে কালনিয়ন্তা নিয়তি বেশে বিরাজ করে, সমস্ত ভাবে আমাদেরকে তাঁর দর্শন পাবার জন্য যোগ্য করছেন। তিনি কি আর নিয়তি, প্রকৃতি বা চেতনারূপে আবদ্ধ! তিনি তো পরমশূন্য, অনন্তা, অসীমা, অব্যাক্ত, অচিন্ত্যা! তাঁর দর্শন কি অতো সহজে পাওয়া যায়! …
কিন্তু মা যে তিনি। যতক্ষণ না আমরা তাঁর সান্নিধ্য লাভ করে তাঁর কোলে ফিরে যাচ্ছি, মা হয়ে তিনি আমাদের নিয়ে নিশ্চিন্ত কি করে হতে পারেন! তাই তো আমাদের তাঁকে ঘিরে, তাঁর পূজাকে ঘিরে উৎসবে মাততে হয়, ঠিক যেমন চন্দননগর মাতা জগদ্ধাত্রীর পূজা নিয়ে উন্মাদবৎ হয়ে থাকে, তেমন করে। আর সেই উৎসবের মধ্যে দিয়ে আমাদের মাকে বলতে হয়, ‘মা তুমি চিন্তা করো না। দেখনা, আমরা ভালো আছি। ভালো খাচ্ছি, আনন্দে আছি, সকলে মিলে আনন্দ করছি। হ্যাঁ, সমস্ত কিছুর মধ্যেও তোমাকে স্মরণ করছি বারবার, কিন্তু তাও দেখো, ভালো আছি আমরা। তুমি চিন্তা করো না’।
সন্তান যেমন মাতাকে ছেড়ে বাইরে কাজে গেলে, শত অপ্রস্তুতির মধ্যে মাকে বলে, মা আমি ভালো আছি, তুমি চিন্তা করো না। জানে পুত্র যে এই বলার পরেও মা চিন্তা করবেন, মা যে তিনি, তাও সন্তান বলতেই থাকেন, মা তুমি চিন্তা করো না, তেমনই যে আমাদের উৎসব। আমরা যে এই উৎসবের মধ্যে দিয়ে আমাদের মাকে এই সান্ত্বনাই দিই, আর বলি দেখো মা, আমরা ভালো আছি, তুমি চিন্তা করো না”।
মীনাক্ষীকে সকলে মনোযোগ সহকারে দেখছিলেন। মাতা ব্রহ্মময়ী যেন মীনাক্ষীর নিজের জননী। হ্যাঁ সত্যই তো তিনি সকলের নিজের জননী, কিন্তু মীনাক্ষী যেন সেই মুখের কথাকে, দর্শনের কথাকে হৃদয়ে ধারণ করে উপনীত। তাঁর হৃদয় যেন পূর্ণভাবে জানে, মানে আর বিশ্বাস করে যে মাতা ব্রহ্মময়ীই তাঁর এক ও একমাত্র জননী।
মীনাক্ষী এবার একটু প্রকৃতিস্থ হয়েছে। কথা বলতে বলতে তাঁর গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। বিজয়ার দিকে তাকিয়ে আপন প্রাণকে বলার মত করে মীনাক্ষী বলল, “ও বিজয়া একটু জল খাইয়ে দে না!” বিজয়া তৎক্ষণাৎ উঠে জল আনতে যাচ্ছিল। পিছন থেকে এক মল্লারকন্যা বললেন, “দিদি, আমাদের কাছে জল আছে। এই নাও”। এই বলে একটি থলে বাড়িয়ে দিলে, বিজয়া জল প্রদান করতে থাকলো, আর মীনাক্ষী দুইকরকে স্থাপন করে সেই জল ধারণ করে পান করতে থাকলো। কি অদ্ভুত এই প্রেমের দৃশ্য।
মীনাক্ষী জলপান করে একটু স্থিত হয়ে বসতে, বিজয়া নিজের শাড়ীর আঁচল দিয়ে মীনাক্ষীকে ছোটো বাচ্চা মেয়ের মত করে মুখ পুঁছিয়ে দিল। মীনাক্ষীও যেন মায়ের শাসন শুনলো চুপটি করে। তারপর জয়া মীনাক্ষীর উদ্দেশ্যে বলল, “রীতি কি হবে মীনাক্ষী পূজার? মূর্তি কার হবে? কোন সময়ে পূজা অনুষ্ঠিত হবে? কি বিধিতে পূজা করা হবে? কে পূজা করবে? কি কি ভাবে পূজা করবে? আর উৎসবের কথা বললে তুমি, সেই উৎসবই বা কিরূপে পালিত হবে?”
মীনাক্ষী হেসে বললেন, “মায়ের তো অজস্ররূপ। প্রভু ব্রহ্মসনাতন বলতেন, মায়ের কি রূপের গুনতি করা যায়! তিনি যে অনন্তা, সহস্র সহস্র রূপ দ্বারাও তাঁকে সম্পূর্ণ ভাবে ব্যাখ্যা করা যায়না। যত অধিক রূপ নির্মাণ করবে, তত অধিক ভাবে মনে হবে যেন তাঁকে প্রকাশ করতেই পারলেনা। … ততই মনে হবে যেন তিনি অধরাই থেকে গেলেন। … তবে কৃতান্তে তাঁর বিশেষ কিছু রূপ পাই তাই না? মাতৃকারূপে তিনি সপ্তরূপা একত্রে। অতঃপরে তিনি মহামাতৃকা বেশে বহুরূপ ধারিণী, যার মধ্যে শ্রেষ্ঠরূপগুলি হলেন দেবী জজনাশী, দেবী বীরশ্রী, দেবী যক্ষেশ্বরী, দেবী মহাশ্বেতা, দেবী পরাশ্রী ও দেবী আদিশক্তি, এবং অন্তে তিনি পরামাতৃকা বেশ ধারণের কালে, দেবী শ্যামলী, দেবী গুহ্যা এবং সর্বশেষে তিনি মহামায়া ব্রহ্মময়ী মাতা সর্বাম্বা।
দিদি, মাতার আবাহন হয় দেবী মেধা রূপে, অর্থাৎ পূজা যিনি করছেন, আরাধনা যিনি করছেন, তিতি যতক্ষণ না নিজের আত্মচালিত সমস্ত কিছু অর্থাৎ মস্তিষ্ক এবং মস্তিষ্কপ্রসূত চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনাকে স্তব্ধ করে মেধাকে জাগ্রত করছেন, ততক্ষণ তিনি মাতার আরাধনা করতে সম্মতই নন। তাই কেন না, পূজার প্রথমদিনকে আমরা মেধার জাগরণের দিন বা উপস্থাপন রূপে স্থাপিত করি?
জয়াবিজয়া ও সকলে এতে আপ্লুত হলে, রোজ বললেন, “সর্বাম্বা কাণ্ডের প্রথম ৫টি অধ্যায় মেধার জাগরণের উদ্দেশ্যে নির্মিত। তাই কেন না, এই আবাহনের দিনে আমরা এই রীতি রাখি যে কৃতান্তিক পূজারি কৃতান্তের সর্বাম্বা কাণ্ডের প্রথম পাঁচটি অধ্যায় পাঠ করে শ্রবণ করাবেন, আর সকল আরাধনায় রতরা সেই পাঠ শ্রবণ করে পূজার সূচনা করবেন!”
জয়াবিজয়া আনন্দিত হয়ে বললেন, “অতি উত্তম প্রস্তাব। কি বলো মীনাক্ষী?”
মীনাক্ষীও গদগদ হয়ে বললেন, “খুব সুন্দর কথা। পরের দিন হবে আবাহন দিবস, যেখানে মহামাতৃকা অধ্যায় পাঠ করে শ্রবণ করাবেন কৃতান্তিক পূজারি, আর সকলে তা শ্রবণ করবেন। তৃতীয়দিবস হবে অবগাহন দিবস, অর্থাৎ যেদিন কৃতান্তের পরামাতৃকা অধ্যায় পাঠ করে শ্রবণ করাবেন কৃতান্তিক পূজারি, আর সকলে তা শ্রবণ করবেন। আর অন্তিম দিন হবে বিসর্জন দিবস, অর্থাৎ যেদিন মাতার মূর্তিকে নদীর জলে ভাসিয়ে, তাঁকে পুনরায় হৃদয়ে নিরাকার বেশে বিসর্জন স্বীকার করে ফিরে আসার আবাহন করা হবে।
এই উপস্থাপন, আবাহন, অবগাহন এবং বিসর্জন, এই চারদিন মিলে হবে মহোৎসব সকলের মধ্যে। উপস্থাপনের দিবসে অন্যকিছুর সময় হবেনা, কারণ পাঁচটি অধ্যায় পাঠ করা হবে প্রভাত থেকে। সেদিন কেবল সকলে মিলে দেবী মেধার অতিপ্রিয় অন্ন ও আলুসিদ্ধ আহার করবে একত্রিত হয়ে। এবং রাত্রি থেকে সকলে জেগে জেগে, যানবাহনকে সুসজ্জিত করা শুরু করবে, বিসর্জনের দিবসে মাতার মূর্তিকে সমস্ত নগরে ভ্রমণ করাবেন বলে।
চোখ বন্ধ করে আমি দেখতে পাচ্ছি দিদি, মায়ের আরাধনা হচ্ছে নগর জুরে। বিশাল বিশাল মায়ের মূর্তি, একটি নয় অনেক। প্রতিটিই ভিন্ন ভিন্ন সাজে, ভিন্ন ভিন্ন অস্থায়ী সুন্দর দেখতে মণ্ডপের আড়ালে স্থিত স্থায়ী নাটমন্দিরে অবস্থান করছেন স্বগরিমায়। ঢাক মাদল আরো অনেক বাধ্যের সাথে পূজা হচ্ছে, সঙ্গে চলছে কৃতান্তিকের ভাবে পরিপূর্ণ কণ্ঠস্বর যা সমানে কৃতান্ত পাঠ করে চলেছে। সকলে মিলে এই চারদিবস প্রভাতে কেবলই অন্ন ও আলুসিদ্ধ আহার করছে। সন্ধ্যা হতে সকলে নূতন নূতন বস্ত্র ধারণ করে করে, মণ্ডপে মণ্ডপে যাত্রা করছে মায়ের বিভিন্ন সাজ দেখতে, বিভিন্ন মণ্ডপ দেখতে, আর তাঁকে বিভিন্ন আলোক দ্বারা সজ্জিত করা হয়েছে, সেই আলোক দেখতে।
বস্ত্রশিল্পীরা সকলে এই উৎসবের দিকে তাকিয়ে থাকছেন, কারণ সকলে এই কালে নূতন নূতন বস্ত্র কিনছেন, একে অপরকে বস্ত্র উপহার করছেন, আর সকলে আনন্দ করে সেই বস্ত্র ধারণ করে মণ্ডপে মণ্ডপে যাচ্ছেন। আরো দেখছি দিদি, শিশু, যুবা, বৃদ্ধ, সকলের মুখে হাসি এই চারদিবস, কারণ সকলের কাছে নূতন বস্ত্র, সকলে মাকে যে সকলে মিলে স্মরণ করছেন এই চার দিন।
দেখছি দিদি, সকলে এই চার দিবসের জন্য সমস্ত কর্ম ফেলে এসেছেন, সমস্ত বিদ্যালয় এই চারদিবসের উৎসবের জন্য বন্ধ, সকল স্ত্রীরা এই চার দিবসের জন্য রন্ধন কাজ, রজকের কাজ বন্ধ রেখে কেবলই উৎসবে মেতেছেন। পূজা শুরু হবার একটি মাস আগে থেকে, যেই আলোক দ্বারা মাকে সাজানো হবে, মায়ের বিসর্জন শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে, তার নির্মাণ করা শুরু হয়ে গেছে। এক মাস আগে থেকে মায়ের মূর্তি নির্মাণ শুরু হয়ে গেছে মণ্ডপের নাটমন্দিরে। এক মাস আগে থেকে অস্থায়ী মণ্ডপ নির্মাণ করা শুরু হয়ে গেছে।
আরো দেখছি দিদি, পুরুষরা এই পূজার আয়োজন করার জন্য, সুন্দর মণ্ডপ করার জন্য, সুন্দর মূর্তি গড়ার জন্য, সুন্দর আলোকসজ্জা করার জন্য, আলাদা করে সারা বছর ধনরাশি উপার্জনের থেকে একটু একটু করে যেই ধন সরিয়ে রেখেছিল, তা বার করে দিচ্ছেন। কারুর কারুর স্বার্থপর স্ত্রী বা জননী বাঁধা দিচ্ছেন এই অর্থপ্রদানে, তো পুরুষটি বলছেন, ধন উপার্জনের কালে সংসার চালাতে স্ত্রীর হাতে মায়ের হাতে অর্থ তিনি দিচ্ছেন না! তাহলে যিনি তাঁর প্রকৃত জননী, জন্মজন্মের জননী, তাঁর জন্য তাঁকে সাজানোর জন্য, তাঁকে আনন্দ দেবার জন্য ১২ মাসের উপার্জনের একটি মাসের উপার্জন প্রদান করতে পারবেন না! তিনি উগ্র হয়ে, মায়ের প্রতি ভাবগ্রস্থ হয়ে বলছেন, ১২ মাসের ৮ মাসের উপার্জন মাবউকে দিচ্ছেন, ৩ মাসের উপার্জন সন্তানের জন্য জমাচ্ছেন, আর একটি মাসের উপার্জন জন্মজন্মান্তরের জননীর জন্য দিলেই অপরাধ!
আরো দেখছি দিদি, শিশুরা, বাড়ির মেয়েবউরা সকলে বারবার মণ্ডপে লুকিয়ে লুকিয়ে গিয়ে দেখে আসছে মণ্ডপের কাজ কতটা সম্পূর্ণ হয়েছে। শিশুদের গুরুমশায়ের প্রদান করা বিদ্যায় মন নেই, মন পরে আছে মায়ের মূর্তি কতটা নির্মিত হলো সেই দিকে। গুরুমশাইও তা দেখছেন, ছাত্রছাত্রীকে বকাঝকা করছেন, কিন্তু আনন্দও পাচ্ছেন যে, ছেলেমেয়েদের মন জন্মজন্মান্তরের জননীর দিকে কেন্দ্রীভূত রয়েছে, সেই দেখে।
উৎসবের সময়ে সন্ধ্যায়, যারা দরিদ্র তারা মেলা দিচ্ছেন, মেলায় বিভিন্ন খেলা দেখিয়ে শিশুও স্ত্রীদের আনন্দ দিচ্ছেন, বিভিন্ন প্রকার মিষ্টান্ন ও আমিষের ভোজ নির্মাণ করে করে, সন্ধ্যায় তা বিক্রয় করে সারা বছরের দারিদ্রতার অবসান ঘটাচ্ছেন। আর সমস্ত নগরের সকলে সন্ধ্যায় কেবলই তাঁদের হাতের রন্ধন আহার করছেন।
আমি দেখতে পাচ্ছি দিদি, কারুর কনো অভাব নেই। বস্ত্র নির্মাতা ও বিক্রেতাদের, মৃৎশিল্পীদের, মণ্ডপশিল্পীদের, আলোকশিল্পীদের, খাদ্য নির্মাতা ও বিক্রেতাদের, সকলের সকল অভাব এই চারদিবসের উৎসবে মিটে যাচ্ছে, আর সমাজের সর্বস্তরে ধনবণ্টন হয়ে যাচ্ছে। আরো দেখছি দিদি, দ্বিতীয়দিন অর্থাৎ আবাহনের দিন, তৃতীয়দিন অর্থাৎ অবগাহনের দিনে একই ভাবে সর্বত্র সকলে সকালে পূজা করে, সন্ধ্যায় ঘুরে ঘুরে মণ্ডপ দেখছেন, মেলায় ক্রীড়া দেখছেন, আর আহার করছেন।
আর আরো দেখছি দিদি, চতুর্থদিন অর্থাৎ বিসর্জনের দিনের প্রভাতে যারা আলোকসজ্জা নির্মাণ করতে পারেন নি, তাঁরা বিভিন্ন বাদ্যের সাহায্যে নাচতে নাচতে, অতীব যত্নে মায়ের মূর্তিকে নদীতটে নিয়ে গিয়ে বিসর্জন দিচ্ছেন, আর পরে আঁচল উত্তরীয়ের বস্ত্র দিয়ে মাকে একটি বছর দেখতে না পাবার বেদনায় ক্রন্দন করছেন আর চোখের জল মুছছেন।
কিন্তু তারপরেও তাঁরা উদ্যমী কারণ সন্ধ্যা থেকে আলোকসজ্জার সাহায্যে মায়ের মূর্তিদের পথে পথে ঘোরানো হবে। আবার উৎসব হবে, উৎসবের শেষ মুহূর্ত আরো অধিক রোমাঞ্চকর হয়ে উঠবে। পথঘাটে ঘুরন্ত আলোর যান ঘুরে ঘুরে সমস্ত শহরকে আলোকিত করে দেবে। সকলের আনন্দকে সহস্রগুণ বাড়িয়ে তুলবে। সঙ্গে থাকবে মাতার অতিসুন্দর মুখশ্রী, যাদেরকে মায়ের সকল সন্তানরা কাঁধে করে তুলে, জানে তুলে নিয়ে শহর ঘোরাবেন, আর সেই বৃদ্ধদেরও মায়ের মুখ দেখাবেন, যারা ভিড়ের কারণে মণ্ডপে মণ্ডপে যেতে পারেন নি।
ভাবের ঘনঘটা সমস্ত শহরজুরে থাকবে। সকলেই যেন সেই কালে ভক্ত, যারা ভক্ত নন, তাঁরাও ভক্ত। যারা ভক্ত নন, তাঁরাও মায়ের মুখ কাল থেকে আর দেখতে পাবেন না বলে, অন্তরে অন্তরে কাঁদবেন আর সকলে একটি বছর আবার অপেক্ষা করবেন, এই মহোৎসবের জন্য, আবার মায়ের মুখ দেখার জন্য, আবার কৃতান্তপাঠ শ্রবণ করার জন্য, আবার সকলে মিলে অন্ন আলুসিদ্ধ আহার করার জন্য, আবার মণ্ডপে মণ্ডপে ভ্রমণ করার জন্য, আবার মায়ের বিশাল মূর্তি কাঁধে তুলে নেবার জন্য, আবার নতুন বস্ত্র ধারণ করার জন্য, আবার সন্ধ্যায় নতুন নতুন খেলা দেখার জন্য, নতুন নতুন আমিষ ভোজ খাবার জন্য, মিষ্টান্ন ভোজনের জন্য।
স্ত্রীদের আনন্দ, আবার চারদিন ঘরের কাজ করতে না হবার জন্য, পুরুষদের আনন্দ আবার চারদিন কার্যালয়ে যেতে না হবার কারণে, ছাত্রছাত্রীদের আনন্দ আবার চারদিন বিদ্যালয়ে না যেতে হবার কারণে। মৃৎশিল্পী, মণ্ডপশিল্পী, আলোকশিল্পী, খাদ্য নির্মাতা ও বিক্রেতার, বস্ত্র নির্মাতা ও বিক্রেতার আনন্দ, তাঁদের কাছেও সমস্ত বছর নিজের পরিবার চালানোর ধন আসার কারণে। সকলের আনন্দ, কারণ জগন্মাতা যে এসেছেন সকলের হৃদয় থেকে, সকলের হৃদয়ের অন্দরে থাকা নিরাকার বেশ ত্যাগ করে, তিনি যে এসেছেন সকলের সম্মুখে সাকার বেশে। তাই সকলের আনন্দ।
আর সব থেকে অধিক আনন্দ কৃতান্তিকদের। তাঁদের মাকে নিয়ে উৎসব হচ্ছে। তাঁদের আনন্দের সীমা নেই। আনন্দে আত্মহারা হয়ে তাঁরা ভাবের আনন্দে ক্রন্দন করছেন আর মায়ের মূর্তিকে বেষ্টন করে করে, শিশুর মত নাচছেন, বা কেউ মায়ের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে তাকিয়ে প্রগলের মত বলে চলেছেন মায়ের উদ্দেশ্যে, ‘দেখা দাও মা, দেখা দাও। কোলে নাও মা, কোলে নাও’। … মহানন্দ দিদি, মহানন্দ”।
মীনাক্ষী যেন নিজের মধ্যে নিজে নেই। আনন্দে আত্মহারা সে। তাঁর আনন্দ যেন সকল মায়ের সন্তানদের আনন্দেই। সকল মায়ের সন্তান আনন্দ লাভ করবে, তাকে নিরীক্ষণ করছে সে আর সকলের আনন্দে যেন সে প্রগল হয়ে আত্মহারা। কি পবিত্র! এমন অদ্ভুত পবিত্র সে! মা আর মায়ের সন্তান, এই যেন তাঁর জগত। এই নিয়েই সে উলমালা। বিজয়া একটি কথা বলার অবস্থাতেই নেই। তাঁর মনপ্রান, দৃষ্টি ঘ্রাণ, স্পর্শসুখ সমস্ত কিছু যেন এখন মীনাক্ষী।
যেন বিরলকারুকে দেখছে সে, এমন ভাবে অপলক ভাবে বিজয়া মীনাক্ষীকে দেখে চলেছে। একা বিজয়া নয়, অনেকেরই ভাব সমরূপ। সেই দেখে জয়া মৃদু হেসে মনে মনে বললেন, “মায়ের প্রেমে পাগল ছেলেমেয়রা সব!” তারপর বললেন, “মীনাক্ষী, আরাধনার সম্পূর্ণ রূপ তো মুখের শব্দদিয়েই এঁকে দিলে তুমি। এবার দিনক্ষণের কথাও একটু বলো। কখন হবে এই চারদিবস ব্যাপী বাৎসরিক উৎসব, পূজা ও অনুষ্ঠান? কৃতান্ত কথা বলে তো মায়ের রূপ কেমন হবে বলেই দিলে, আহার, ভোগ, তাও কি হবে, বলে দিলে। বাকি রীতির কথাও তো বলো!”
মীনাক্ষী হেসে বললেন, “কি আর বলবো দিদি? মায়ের প্রিয় হলো সমস্ত প্রকার ফল। আপেল, নেস্পাতি, মুসম্বি, কমলা, নারিকেল, ডাবের পাতলা শাঁস, কুল, বেদানা, পেয়ারা, জাম, জামরুল, তরমুজ, আখ, লিচু, সমস্ত কিছুই প্রভু ব্রহ্মসনাতনের বড় প্রিয় ছিল। মাতা সর্বাম্বাকে তিনি সমস্ত আহার অর্পণ করতেন নিজের দেহের অভ্যন্তরে সেই সমস্ত ফলাদি প্রদান করে করে। তাই সেই সমস্ত ফলই ভোগে দেওয়া হোক ঘৃতদ্বারা মণ্ডিত অন্ন ও আলুসিদ্ধের সঙ্গে।
তাঁর পছন্দের পুষ্পের মধ্যে একটিই সর্বাধিক প্রিয় ছিল, রজনীগন্ধা। তাই প্রদান করা হোক পূজার পুষ্পরূপে, মায়ের গলে, হস্তে, সর্বত্র। আর তিনি দেশি আতর বড় পছন্দ করতেন। সেই আতর প্রদান করা হোক মায়ের উদ্দেশ্যে। আর তিনি মায়ের মুখশ্রীর যেই মূর্তি রাখতেন, তাকে নিজের হাতে বিভিন্ন ভাবে সাজাতেন, তাই সকলে নিজের নিজের মতন করে তাঁদের মায়ের মূর্তিকে সাজাবেন, আর সকলের মধ্য দিয়ে তাহলে প্রভুকে দেখতে পাবো”।
বিজয়ার যেন রীতিনীতি নিয়ে আর কনো ভাবনাই নেই। সে গদগদ হয়ে বলল, “আচ্ছা মীনাক্ষী, তুমি তো প্রভুকে তোমার পূর্বজন্মে দেখেছ। তাহলে তোমার এতো স্পষ্ট মনে আছে কি করে তাঁর কথা!”
মীনাক্ষী হেসে নিজের খেয়ালেই বললেন, “জানিনা। হয়তো প্রেম করতাম তাঁকে। হয়তো কেন, সত্যই তো তাঁকে প্রেম করতাম। বায়সী ছিলাম, তাই নিত্য গাছের আড়াল থেকে তাঁর উপর নজর রাখতাম। প্রায়শই কিছু আহার করতে ভুলে যেতাম, শিকার করতেও। আমার সঙ্গী আমার জন্য যা নিত্য আহার আনতো, তাই আহার করতাম আর দিবারাত্র প্রভুকে দেখতাম। ইচ্ছা হত, মানুষ হয়ে যাই, আর তাঁর সেবক হয়ে তাঁর কাছে বসে বসে, তাঁকে দিবারাত্র সেবা করি। … কিন্তু তিনি তো কারুর সেবা নেনই না।
জানো বিজয়া, কেউ যদি তাঁর চরণসেবা করতে যেত, দুইবার চরণ টিপে দিলেই নিদ্রা চলে যেতেন তিনি। কারুকে একটি বারের জন্যও চরণসেবা করতে দিতেন না। তাঁর পত্নী তা করতে আসলে, বা তাঁর সন্তান তা করতে আসলেও, তিনি তাঁদেরকে বলতেন মাথাটা একটু হাতবুলিয়ে দিয়ে, বা পৃষ্ঠদেশ। এইভাবে স্নেহ তো গ্রহণ করতেন, কিন্তু সেবা কিছুতেই গ্রহণ করতেন না। যদি কেউ অভিযোগ করতে আসতেন এই ব্যাপারে, তিনি বলতেন, সেবা মায়ের করো, আমি তো তাঁর সন্তান মাত্র। আমার সেবা করবে কেন। স্নেহ করতে হলে স্নেহ করো, তবে সেবা কেবল তাঁকে করো।
প্রেম জাগতো কেবল, হয়তো সেই কারণেই সমস্ত কিছু আজও আমার হৃদয়ের কাছে ভাস্মর হয়ে রয়েছে। আজও যেন প্রভুকে চোখের সম্মুখে দেখতে পাচ্ছি, যেন তাঁর মুখের হাসি, তাঁর নেত্রের নরম দৃষ্টি, মা বা মায়ের নাম শুনলেই তাঁর নেত্রে যেই জল আসতো তা, তাঁর অসামান্য মেধাকে, আর তাঁর বঙ্গমাতার প্রতি কৃতজ্ঞতাকে দেখতে পাই বিজয়া”।
জয়া এবার বিজয়ার উপর বিরক্ত হয়ে উঠে বললেন, “আহ! বিজয়া, ওকে পূজার দিনের কথা বলতে বলছি, সেই কথা বলতেই দিচ্ছিস না!”।
মীনাক্ষী বললেন, “মাতা জগদ্ধাত্রী স্বয়ং চন্দননগরে এমন উৎসবের সূচনা করিয়েছেন। সেই তিথিতেই হোক না এই উৎসব। … মা যখন নিজেই নিজের পূজার দিন ঘোষণা করেছেন, সেটিই ধার্য হোক!”
বিজয়া বললেন, “না, এটা ঠিক নয়। ওই উৎসব মাতা জগদ্ধাত্রীকে ঘিরে উৎসব। তাঁর আরাধ্যা, তাঁর স্বরূপ মাতা সর্বাম্বা। তাঁর আরাধনা আলাদা করে হবেনা?”
সায়নি বললেন, “মীনাক্ষী, তুমি বললে না, প্রভু ব্রহ্মসনাতনের রজনীগন্ধার মালা এবং কুল অত্যন্ত প্রিয় ছিল! … এই দুটিই শ্রেষ্ঠ ভাবে পাওয়া যায় পৌষমাসে, তাহলে এই উৎসব পৌষমাসের দ্বাদশী, ত্রয়োদশী, চতুর্দশী এবং আমাবস্যার দিন করা হলে ভালো হতো না? আমাবস্যার অন্ধকারকে বিনষ্ট করে যখন শহরসমূহ আলোকের জানে আলোকিত হয়ে উঠবে, সেটিই তো হবে মাতার প্রকৃত হৃদয়ে বিসর্জন। আমাবস্যা যে শূন্যতার চিহ্ন। সেই দিনই মাতার সাকাররূপ ত্যাগ করে নিরাকারস্বরূপে প্রত্যাবর্তন দর্শন অনুসারে আচরণ হবেনা!”
মীনাক্ষী হেসে বললেন, “যথার্থ বলেছ সায়নি। অতি সুন্দরও বলেছ। আমার খুব আনন্দ হচ্ছে জানো, তোমাদের সকলের মুখে এমন ভাবে দর্শনের কথা শুনতে পেরে, এতো আনন্দ হচ্ছেনা যে কি বলবো। … দিদি, জয়াদি, উচিত বলেছে সায়নি। তাই না? মাতা তো এতে কনো অভিমত দেবেনও না, তাই মাতা সর্বশ্রীর যদি এতে অনুমতি পেতাম, তাহলেই ষোলোআনা পূর্ণ হয়”।
বিজয়া জিজ্ঞাসু হয়ে বললেন, “কেন, মাতা এতে অনুমতি দেবেন না কেন?”
মীনাক্ষী হেসে বললেন, “তিনি সত্য বিজয়া। যার মন সত্যে গত হয়েছে, অর্থাৎ কৃতান্তিকদের কাছে তিনি তো নিত্য আরাধনার বিষয়। তাই তাঁকে নিয়ে তাঁর সন্তানরা কবে উৎসব পালন করবেন, সেই বিষয়ে তিনি কেন বলবেন? সে তো সম্পূর্ণ ভাবে তাঁর সন্তানদের স্বাধীনতা। ধর তুমি। তোমাকে আমরা আমাদের জীবনে লাভ করে অত্যন্ত আনন্দিত, আর তাই তোমাকে ঘিরে আমরা একটি উৎসব করতে চাই। তা এবার বলো, কবে কখন কিভাবে তোমাকে ঘিরে উৎসব করবো আমরা, তার অনুমতি কি তুমি দেবে! … তুমি তো বলবে, ওসব আবার কেন, তাই না!
কিন্তু মা সেই কথা বলতেও পারবে না, কারণ এই উৎসবকে ঘিরে তাঁর সমস্ত সন্তানের কাছে ধনবণ্টনেরও চিন্তা হচ্ছে, সকল সন্তানকে একসুত্রে স্থিত করার চিন্তা হচ্ছে, সকল সন্তানকে আনন্দদানের চিতা হচ্ছে। অর্থাৎ এই প্রশ্ন তাঁকে করার অর্থ, তাঁকে বিড়ম্বনার মধ্যে পতিত করে দেওয়া, তাই না? না তো তিনি এর বিরোধ করতে পারবেন, কারণ তাঁর সমস্ত সন্তানের স্বার্থ জুরে রয়েছে এর সাথে, আর না তিনি অনুমতি প্রদান করতে পারবেন, কারণ কোন মা আর চান যে তাঁর সন্তানরা তাঁকে মা রূপে পাবার জন্য কোন একটি দিন উৎসব করুন, আর বাকিদিনগুলি তাঁকে ভুলে থাকুন। তাই না!”
বিজয়া মীনাক্ষীর দুটি করকে নিজের করে স্থাপিত করে ব্যকুল হয়ে প্রশ্ন করেলন, “কি মাটি দিয়ে তৈরি তুমি মীনাক্ষী! কথা তো অত্যন্ত সহজ বলো তুমি, কিন্তু এতো গভীর অনুভূতি তুমি কি করে লাভ করো। তিনি জগন্মাতা। কিন্তু তোমার কাছে যেন তিনি জগন্মাতা ননই। তোমার কাছে তিনি যেন নিজের মাতা। কি করে মীনাক্ষী! … তোমার থেকে মায়ের কথা শোনার আগে আমাদের মনে হত আমরা খুব বড় ভক্ত। কিন্তু তোমাকে দেখার পর মনে হয়, আমরা ভক্তই রয়ে গেলাম, সন্তান হতে আর পারলাম না!”
মীনাক্ষী হেসে বললেন, “প্রতিদিন প্রভু ব্রহ্মসনাতনকে এমনই করতে দেখতাম, আর এমন দেখতে দেখতেই আমার পূর্বের প্রায় সম্পূর্ণ জীবন অতিবাহিত হয়েছে। রোজ দেখতাম, আর রোজ যেমন তুমি বললে, তেমনই নিজের মনে মনে বলতাম। তাই আমি যে এমন কিছু অভ্যাস করে লাভ করেছি, সেটা বলা সম্পূর্ণ ভাবে মিথ্যা বচন হবে। কিন্তু জানো সেই স্মৃতি নিজের কাছে রেখে যখন এই দেহ ধারণ করলাম, তখন আমি নিজের মধ্যে সেই সমস্ত ভাবকে প্রত্যক্ষ করলাম, যা যা আমি প্রভু ব্রহ্মসনাতনের মধ্যে প্রত্যক্ষ করতাম আর আপ্লুত হতাম।
পূর্ব জন্মে আমি প্রভুর হাতে স্থাপিত হয়ে প্রাণ ত্যাগ করেছিলাম। কে জানে, তার ফলে কিনা জানিনা, তাঁর যেই ভাব দেখে দেখে আপ্লুত হতাম পূর্বজন্মে, সেই সমস্ত ভাব আমার মধ্যে এই জন্মে এসে গেছে। কি করে এসেছে, কি কারণে এসেছে বা কি ভাবে এসেছে, সত্য বলছি বিজয়া, আমি না এসবের অনুসন্ধান করিনি। কে জানে কবে হয়তো আমার থেকে এই ভাব হারিয়ে যাবে। তাই যতদিন এই ভাব আমার মধ্যে বিরাজ করছে, মা’কে খুব খুব খুব ভালোবাসা দিয়ে যেতে চাই। চাইতাম তো সর্বক্ষণ, কিন্তু সামর্থ্য ছিলনা। আজ যখন প্রভু কৃপা করে কিছুদিনের জন্য হলেও সেই সামর্থ্য দিয়েছেন, শুধু শুধু সেই নিয়ে বিচার করে সময়ের অপব্যবহার কেন? তা না করে, মা’কে এই সুযোগে একটু বেশি বেশি করে ভালোবাসতে চাই”।
বিজয়া আনন্দিত হয়ে মীনাক্ষীকে অত্যন্ত বলের সাথে আলিঙ্গন করে রইলেন, যেন সে অত্যন্ত অধিক ভাবে মীনাক্ষীর প্রতি আকৃষ্ট। কিন্তু সেই আলিঙ্গন অনেকক্ষণ হতে পারলো না, কারণ অরিত্রা প্রশ্ন করলো, “আচ্ছা, সর্বসাধারণ হতে পারে, বছরে এই চারদিনই উৎসব করবেন মাতাকে নিয়ে, কিন্তু কৃতান্তিকরা তো নিত্য আরাধনা করতেই পারেন, মাতা সর্বাম্বার। তাই না?”
ভূমি বললেন, “করতে পারে না, করা কর্তব্য। কৃতান্তিকের তো জীবনই মাতাকে বেষ্টন করে। নিত্য আরাধনা না করে, কি ভাবে তাঁরা আনন্দে থাকতে পারবে? মায়ের আরাধনা করে তবেই তো তাঁরা আনন্দে থাকতে পারবে, তাই না!”
রোজ উত্তরে বললেন, “আমার একটি মত আছে এখানে। … মানে আমার কথা এই যে, যেই কাজ করতে পেরে খুব আনন্দ পাই আমরা, সেই কাজ না করতে পারলে, বেদনায় বুক ফেটে যায় আমাদের। আর এই বেদনাই আমার মনে হয় প্রেমের মূলস্বরূপ। … তাই যদি আমি ভুল না বলে থাকি, আমার মতে, কৃতান্তিকেরা মন্দির স্থাপন করে, নিত্য আরাধনা করবেন মাতা সর্বাম্বার, আর আরাধনা করার কালে যেমন বীজমন্ত্র পাঠ করে পূজা শুরু করবে আর সমাপ্ত করবে নিত্য, তেমনই প্রতিদিবস কৃতান্তের একটি করে অধ্যায় পাঠ করবে। অর্থাৎ কৃতান্তের যদি সম্পূর্ণ ভাবে ৬০টি অধ্যায় থাকে, তাহলে ৬০ দিবসে সেই পাঠ সম্পন্ন হবে।
আমার মত এই যে, পরের ৬০ দিবস তাঁরা আর পূজা করতে পারবেনা। আবার ৬১ তম দিন থেকে তাঁদের পাঠ ও পূজা শুরু হবে। অর্থাৎ এই ৬০ দিন তাঁরা নিত্য বিরহজ্বালায় কাতর হতে থাকবে, আর ব্যকুল হতে থাকবে মাতা সর্বাম্বার সান্নিধ্য লাভ করার জন্য। এটি কেমন হয়!”
মীনাক্ষী এই কথা শুনে দুই কদম পিছিয়ে গেলেন। রোজ সেটি দেখে বললেন, “না বোধহয় আমি ভুল কিছু বলে ফেলেছি। যদি মাতা সর্বাম্বার কাছে যেতে পারবেনা, এই কথা-তেই এমন হতাশা ছেয়ে যায় সকলের মধ্যে, তাহলে আরাধনা করতে না পারলে, কি ভয়ঙ্কর না হয়ে যাবে সেই বেদনা। হয়তো মা স্বয়ং সেই বেদনা সহ্য করতে পারবেন না! … ভেবে দেখো ভাইবোনেরা। তিনি তোমাদের ব্যাথা সহ্য করতে না পেরে, স্বয়ং চলে আসবেন!”
মীনাক্ষী এই কথা শুনে ক্রুদ্ধ হয়ে উঠে ধমক দিয়ে উঠলেন, “শান্ত হও রোজ। … যা মুখে আসছে, তাই বলে চলেছ! … মাকে বাধ্য করবো! মাকে বেদনা দেব! … এই কারণে আমরা তাঁর সন্তান!… মা তো সর্বক্ষণ আমাদের সঙ্গে রয়েছেন, আমাদের অন্তরে চেতনা হয়ে, আমাদের আশেপাশে প্রকৃতি হয়ে, আমাদেরকে সর্বক্ষণ সময়বেশে ঘিরে থেকে! … তোমার কি মনে হয়, মা আমাদের থেকে দূরে চলে গেছেন, আমাদেরকে ছেড়ে রেখে! … স্বার্থপর আমরা, তিনি নন। ছেড়ে তিনি যাননি আমাদেরকে। ছেড়ে আমরা এসেছি নিজের নিজের আত্মকে ধারণ করে করে।
তাই তাঁকে আনার কথা না ভেবে, নিজে তাঁর কাছে যাবার চিন্তা করো। নিজের বাড়ি ফেলে, নিজের মা ফেলে, বিদেশিনীর বেশে আমরা এখানে রয়েছি, তিনি নন। তাহলে তাঁকে পরিশ্রম করানোর চিন্তা কেন করছো রোজ? কেন তাঁকে বিরহজ্বালায় বেদনাগ্রস্ত করতে চাইছ?”
রোজ মাথা নিচু করে বললেন, “ক্ষমা দিদি, ক্ষমা। … সত্যই বলছি ক্ষমা। … ঠিকই বলেছে বিজয়াদি, মাকে মা মানতেই পারিনি আমরা, ভক্তই থেকে গেছি। মা মানলে, তাঁকে এমন বেদনা দেবার কথা ভাবতেই পারতাম না। … ছি! ধিক্কার দিতে ইচ্ছা হচ্ছে নিজেকে”।
বিজয়া মীনাক্ষীকে শান্ত করার জন্য বলল, “নে এই রীতিটি বেশ ভালো যে, কৃতান্তিকরা নিজেদের আশ্রমে নিত্য মায়ের বীজমন্ত্র পাঠ করে কৃতান্তের একটি করে অধ্যায় পাঠ করে বীজমন্ত্র পুনরায় পাঠ করে পূজার অন্ত করবেন সেই দিনের মত। আর এই ভাবে সমস্ত বছর চলতে থাকবে। … প্রভাতে ক্ষেতে কাজ, মাছধরা, নিত্য কর্ম। তারপর স্নানাদি করে, নিত্য পূজা করে, যে যার মত ধ্যান সমাধি করে, সন্ধ্যায় সকলে মিলে বসে, কৃতান্ত বিচার এবং কৃতান্তিক ধর্মের বিস্তার করার বিচার, এই যদি নিত্য জীবন হয় কৃতান্তিকদের অর্থাৎ সাধকদের, তাহলে বেশ হয়না”।
মীনাক্ষী হেসে বললেন, “বেশ হয়, তবে তাও সাধকদেরকে রীতিদ্বারা আবদ্ধ করার কনো মানে হয়না। যারা দর্শন সম্বন্ধে অনবগত, তাঁদের কাছে দর্শনকে পৌঁছে দেবার জন্যই রীতি। সাধক তো সম্পূর্ণ দর্শনের চর্চা নিত্য করছেন, তাঁর জন্য রীতি কেন? বরং তাঁকে সময়ের কাছে, প্রকৃতির কাছে ছেড়ে দেওয়া উচিত, যাতে সময় ও প্রকৃতি তাঁকে মার্গ প্রদান করতে থাকেন নিত্য, আর কৃতান্তিকের ধর্ম হলো নিজেকে অকর্তা জ্ঞান করে, সেই মার্গকে অনুধাবন করা এবং পালন করা”।
জয়া মীনাক্ষীর কাঁধে হাত রেখে বললেন, “একে বলে, যথার্থ কৃতান্তিক। মাতা শ্রী তোমাকে দেখলে কতই না খুশী হবে মীনাক্ষী”। মীনাক্ষী বললেন, “দিদি, আরো বেশ কিছু জিনিস বলার আছে পূজা সংক্রান্ত। আগেও সেই নিয়ে বলা হয়েছে, তাই অধিক ভাবে বলার তেমন কিছুই নেই। কিন্তু পুনরায় একবার বলতে চাই যে, মাতার মূর্তি হবে বিশালাকায়, এমন বিশাল যেন সকলের তাঁর সম্মুখে দণ্ডায়মান হয়ে বিস্ময় জন্ম নেয়, আর এই বিশ্বাস জন্ম নেয় যে, তিনি হলেন বিশাল, তিনি হলেন অনন্ত। আর কৃতান্তিকের কাজ হবে, তাঁর প্রকৃতসত্য অর্থাৎ তিনি যে নিরাকার, অনন্তা, অসীমা তা ব্যক্ত করা।
দ্বিতীয় কথা এই যে, কৃতান্তিক যেন কনো বিশেষ ধরনের পোশাক বা তিলককাঞ্চন না ধারণ করে। তাঁর সহজ সাধারণ পোশাক, যা প্রকৃতি প্রদান করবে কাল প্রদান করবে তাই আহার করা, আর যেই অবস্থাতে তাকে থাকতে দেবে, সেই অবস্থাতে সহর্ষ থাকার গুণ, এই হবে কৃতান্তিকের পরিচয়। অর্থাৎ তাঁর জ্ঞান, তাঁর দিব্যভাব, তাঁর সমর্পণ এই হবে তাঁর পরিচয় যে সে কৃতান্তিক, কনো পোশাক, পরিচ্ছদ, বিশেষত্ব নয়। তাঁরা নিজেরা রীতির ঊর্ধ্বে হবেন, এবং রীতির উদ্দেশ্য দর্শন প্রসার, এই যেন কৃতান্তিকের মূল ভাব হয় সমাজের প্রতি।
এছাড়া, নিত্যদিন তিনটি নির্দিষ্ট সময়ের মাতার বীজমন্ত্র পাঠের সঙ্গীত ৯বার পাঠ সকলকে শ্রবণ করানো যেতে পারে, তা ছাড়া নয়। নিত্য নিজেদের কণ্ঠস্বর শুনিয়ে শুনিয়ে সকলকে যেন প্রকৃতির শব্দ শ্রবণ করা থেকে প্রতিহত না করেন কৃতান্তিকরা। প্রয়োজন প্রকৃতির শব্দ শ্রবণের, কীর্তন শ্রবণের নয়। কীর্তন শ্রবণের বিষয় নয়, কীর্তন সাধনার বিষয়। আর তাই যিনি সাধনা করতে আগ্রহী, তিনি স্বয়ং কীর্তন করবেন। অর্থাৎ কীর্তন যেন সর্বজনে শ্রবণ না করানো হয়।
পূর্বে এমন অনেক ধর্ম অনেক কীর্তি করেছে যা দ্বারা সমাজের মানুষের উপর নিজেদের কথন, কীর্তন সারাদিবস শ্রবণের জন্য বাধ্য করেছে। ধর্মের অর্থ স্বতন্ত্রতা প্রদান, বন্ধন প্রদান নয়। তাই, কৃতান্ত কীর্তন কৃতান্তিকদের আশ্রমে যদি এক প্রহর চলেও, তা চলতে পারে, তবে কনো যন্ত্রাদি ব্যবহার করে সেই ধ্বনি যেন সমাজকে শুনতে বাধ্য না করা হয়। নিত্য নির্দিষ্ট সময় সূচিতে একটিই প্রহর সেই কীর্তন রাখা যেতে পারে। আর যার ইচ্ছা হবে, সে স্বয়ং এসে সেই কীর্তন অনুষ্ঠানে ভাগ নিতে পারেন।
কিন্তু না সমাজকে সেই কীর্তন শুনতে বাধ্য করা হবে চোং ইত্যাদি ব্যবহার করে, আর না একপ্রহরের অধিক সময় ধরে সেই কীর্তন আশ্রমে চলবে, কারণ কৃতান্তিকরা কনো একটি পথেই মাতার কাছে সমর্পিত হন না। যেমন তাঁরা কীর্তনকে মাধ্যম করতে পারেন, তেমন তাঁরা ধ্যানসমাধিকেও মাধ্যম করতে পারেন, আবার তেমনই তাঁরা জ্ঞানবিচারকেও মাধ্যম করতে পারেন। তাই যারা জ্ঞানবিচার করবেন, বা ধ্যানসমাধি করবেন, তাঁদের প্রয়োজন শান্তি, আর সেই শান্তি যেন চাররপহর ব্যাপী কীর্তন অনুষ্ঠান করে করে বিনষ্ট করা না হয়”।
বিজয়া বললেন, “যথার্থ যথার্থ, অত্যন্ত সঠিক কথা বলেছ মীনাক্ষী। এমন আচরণ করা কৃতান্তিককে কৃতান্তিক সভা থেকে বহিষ্কার করা হবে, বা অন্য প্রকার দণ্ড প্রদান করা যেতে পারে, এই বিধানও রাখা উচিত। তাই না?”
মীনাক্ষী মিষ্ট হেসে এবার বললেন, “ভিন্ন ভাব আস্তেই পারে, তাঁকে উচিত অনুচিতের পাঠ প্রদান করলেই হবে। দণ্ড দেবার আমরা কে? যদি দণ্ড আবশ্যক হয়, স্বয়ং প্রকৃতিই তাঁকে দণ্ড দিয়ে দেবেন। মা থাকতে ভাইবোন যদি দণ্ড দেয়, তাহলে হতেও পারে যে, মা তোমাকে এসে শাসন করে যাবেন দণ্ড দেবার জন্য। তাই মায়ের সন্তানকে মায়ের কাছেই রেখে দাও, দণ্ড দিতে হলে তিনি দেবেন। আমরা স্নেহ করবো আর উচিত অনুচিতের পাঠ প্রদান করব”।
জয়া বললেন, “একটি প্রশ্ন আমার কাছে এখনও অনুত্তর থেকে গেছে মীনাক্ষী। আমাকে একটি কথা বলো, কৃতান্তিক পূজারি জন্মের রীতি পালন করাবেন, শ্রাদ্ধের রীতিও পালন করাবেন, বিবাহ করাবেন, এমনকি এই উৎসবের পূজাও করাবেন। তাই তাঁর তো দক্ষিণা প্রাপ্য। সেই দক্ষিণা তাঁকে কি ভাবে দেওয়া হবে। সেই সংক্রান্ত কি কনো দর্শন হয়!”
