সর্বশ্রী কাণ্ড (কৃতান্ত তৃতীয় কাণ্ড)

বিজয়া বললেন, “মীনাক্ষী তুমি একটি অনুষ্ঠানের রীতি সম্বন্ধে এখনো বলোনি। সেই ব্যাপারে বিস্তারে বলো”।

মীনাক্ষী হেসে বললেন, “রীতি সম্বন্ধনিয় এখনও অনেক কথাই বলিনি বিজয়া। বিবাহরীতির কথা বলিনি যেমন, তেমন সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ যেই রীতি, সেই পূজার রীতি সম্বন্ধেও বলিনি। আর তার সাথে, কৃতান্তিক এই সমস্ত রীতির পালন করাবেন, তাঁদেরকে দেও দক্ষিণার কথাও এখনো বলিনি। তাই বলা এখনো অনেকই বাকি।

আসলে কি বলো তো বিজয়া, প্রথমে এই রীতি সম্বন্ধনিয় কথা বলতে ভয় হচ্ছিল। কি বলতে কি বলে ফেলবো, কতটাই বা আমার জ্ঞানবুদ্ধি! … কিন্তু কথা বলতে বলতে বুঝলাম যে, আমি কেবলই মাধ্যম মাত্র এই কথাগুলি বলার জন্য। নাহলে যা আমি তোমাদের বলছি, তার সম্বন্ধে আমার তো কনো পূর্ববোধ ছিল না! অর্থাৎ সমস্ত কথা মাতা সর্বাম্বারই, অর্থাৎ পরানিয়তি চেতনা রূপে স্থিত হয়ে, আমাকে মাধ্যম করে বলছেন। তাই এখন আর বলতে কুণ্ঠা নেই। বেশ তবে বিবাহের সম্বন্ধে কথাগুলি বলি।

বিবাহ কি, বিবাহ কেন আর বিবাহ কার মধ্যে কি ভাবে হওয়া উচিত, এগুলি বিবাহ বা মিলনরীতির পূর্বকথা, এবং এগুলির মধ্যেই নিশ্চয়ই থাকবে বিবাহরীতির দর্শন। তাই প্রথম বিবাহের দর্শন সম্বন্ধে বলা শুরু করি, তাহলে বিবাহরীতি আমাদের সামনে স্বতঃই প্রকাশিত হয়ে যাবে”।

এতো বলে, মীনাক্ষী বিবাহের দর্শন বলা শুরু করলেন। সে বলল, “বিবাহ হয় এক পুরুষ ও নারীর মধ্যে। কেন পুরুষ ও পুরুষের মধ্যে নয়, বা স্ত্রী ও স্ত্রীর মধ্যে নয়! কারণটা বিবাহের পরিণামে রয়েছে। বিবাহের অনেক পরিণাম, তার মধ্যে একটি অন্যতম পরিণাম হলো সন্তানলাভ, অর্থাৎ নূতন দেহলাভ, যার মাধ্যমে একটি আত্মবোধ ও একটি চেতনার সংগ্রামের পরবর্তী পৃষ্ঠার রচনা সম্ভব। আর এই সন্তানলাভ রূপ পরিণামকে প্রকৃতি সফলতা একমাত্র একটি পুরুষ ও একটি স্ত্রীর সঙ্গমদ্বারাই প্রদান করেন।

যেই কর্মের থেকে কর্মফল জন্ম নেয়, সেটিই যথার্থ কর্ম। আর তাই সহজ কথা যে পুরুষ ও পুরুষের সঙ্গম যদি হয়ও, বা স্ত্রী ও স্ত্রীর সঙ্গম যদি হয়ও, তা কেবলই কামবিলাসিতা, যাকে সমাজ সম্মতি দেওয়ার অর্থ, সমাজের মধ্যে ধ্বংসের বীজ স্থাপন করা। অর্থাৎ একমাত্র স্ত্রী ও পুরুষের বিবাহকেই মর্যাদা দেওয়া সম্ভব, অন্য সমূহ সঙ্গম অনৈতিক ও অপ্রাকৃতিক। অর্থাৎ তাদেরকে সমাজে দুর্নীতি রূপেই স্থাপন করা উচিত।

এবার কথা হলো যে কোন পুরুষ ও কোন স্ত্রীর মধ্যে এই বিবাহ হওয়া উচিত। তবে তারও আগে যা জানা প্রয়োজন তা এই যে, এই পুরুষ ও স্ত্রী, এই দুই ধারার উৎপত্তির কারণ কি। এক চেতনা ও আত্মের সংগ্রাম ছিল, কিন্তু তার থেকে এই পুরুষ ও স্ত্রী, দুই ধারার উৎপত্তি কি করে হলো? এই দুই ধারার রচনার অন্তরালে থাকা দর্শনকে যতক্ষণ না জানা সম্ভব হচ্ছে, ততক্ষণ এই দুই ধারার মিলনের দর্শনও অজানা থাকবে, আর তা যদি অজানা থাকে, তাহলে বিবাহরীতি সম্বন্ধে কিছুই উদ্ধার করা সম্ভব হবে না। তাই প্রথম আমাদের এই পুরুষ ও স্ত্রীর অস্তিত্বের অন্তরালে থাকা দর্শনকে জানতে হবে। প্রভু ব্রহ্মসনাতনের থেকে এই বিষয়ে আমি যা জেনেছি, তাকে তোমাদের সম্মুখে বললেই, আশা করি, এই দর্শন সম্পূর্ণ ভাবে ব্যক্ত করা সম্ভব হবে। তাই শ্রবণ করো মনদিয়ে।

সত্য কি? সত্য এই যে সত্য বলে সত্যতে কিচ্ছু নেই, অর্থাৎ একমাত্র অনন্ত শূন্যই সত্য। এই পরাশূন্য, যিনিই একমাত্র সত্য, তাঁকেই আমরা ব্রহ্ম বলি, এবং তিনিই নিজের অন্তরে চেতনাধারণ করে, মাতৃত্বপ্রেমের চেতনা ধারণ করে ব্রহ্মময়ী। তাই বুঝতেই পারছো, যতটা পরমশূন্য স্বয়ং ব্রহ্ম, ততটাই পরমশূন্য মাতা ব্রহ্মময়ীও, কারণ দুইয়ের মধ্যে কনো ভেদই সম্ভব নয়।

তবে ভেদ না থেকেও ভেদ থাকে, আর সেই ভেদ হলো নির্বিকারত্ব এবং মাতৃত্বের ভেদ। যেখানে ব্রহ্মের মধ্যে কনো প্রকার বিকার না থাকর কারণে তিনি সম্পূর্ণ ভাবে নির্বিকার, সেখানে ব্রহ্মময়ী মাতা মাতৃত্ব ধারণ করে সম্পূর্ণ নির্বিকারত্ব থেকে চ্যুত। আর এই মাতৃত্ব ধারণ করার ফলে তিনি নিরাকার অর্থাৎ ভৌতিক ভাবে লিঙ্গহীনা হয়েও লিঙ্গযুক্তা অর্থাৎ, তিনি নারীত্বের ধারিকা।

মাতৃত্ব অর্থাৎ জন্মদানের সামর্থ্য, মাতৃত্ব অর্থাৎ লালনের সামর্থ্য, এবং মাতৃত্ব অর্থাৎ নিজের সমস্ত কিছু লুটিয়ে সন্তানকে প্রেম করার সামর্থ্য। এই তিন সামর্থ্য নিরাকারা ব্রহ্মময়ীকেও নারীত্বে ভূষিত করে। অর্থাৎ, তিনি ভৌতিক অর্থে কনো লিঙ্গরূপ নন, না পুরুষ, না স্ত্রী, কারণ তাঁর তো কনো আকারই সম্ভব নয়, তিনি তো নিরাকারা, অনন্তা, পরাশূন্য, কিন্তু তা সত্ত্বেও কেবলই এই মাতৃত্বকে ধারণ করার কারণে, তিনি নারীত্বের ধারিকা।

সেই কারণেই যখন যখন নিয়তির প্রসঙ্গ ওঠে, অর্থাৎ যিনি কালকে নিয়ন্ত্রণ করেন, তাঁকে নারীরূপে ধারণা করি আমরা, যা প্রাচীন বৌদ্ধ কাল থেকে চলে আসছে, কারণ এই দর্শনের আবিষ্কার তাঁরাই প্রথম করেছিলেন। একই ভাবে, পরানিয়তি মাতা ব্রহ্মময়ী নিজেকে সৃষ্টির মধ্যে আরো অঙ্গাঙ্গী ভাবে স্থিত হতে পরাপ্রকৃতি বেশে আবির্ভূতা হন, যাকে কৃতান্তিক বলে মহামাতৃকা। সেই রূপকেও আমরা স্ত্রীবেশেই ধারণ করি, যাকে বৌদ্ধ ও তন্ত্র কালে কালে বিভিন্ন নাম প্রদান করেছে।

যেখানে নিয়তির চরমতম রূপকে বৌদ্ধরা ক্রিয়া শক্তি বলেছেন কেবল এবং তাঁর অব্যাক্ত অনন্ত রূপকে আকার প্রদান না করে ব্যক্ত করেছেন যে তিনিই অন্তিম আদি, আর তিনি সম্পূর্ণ ভাবে নিরাকার। তন্ত্র তাঁকেই মহাকালী নাম প্রদান করেছেন, তো কৃতান্ত তাঁকে মাতা গুহ্যা বলেছেন।

যেখানে পরাপ্রকৃতি শব্দের আদিই বৌদ্ধ দর্শন, সেখানে তন্ত্র তাঁকে পুনরায় ব্যক্ত করেছেন মাতা জগদ্ধাত্রী রূপে, আবার কৃতান্ত তাঁর সার্বিক রূপকে মহামাতৃকা বলেছেন। আবার তিনিই যখন প্রতিটি জীবের সাথে যুক্ত হয়ে নিজের মাতৃত্বপ্রেম প্রদান করে চলেছেন অনুক্ষণ, তাঁর নামকরণ তন্ত্র ব্যক্ত করেছে দেবী পার্বতী বেশে, তো কৃতান্ত তাঁর নাম দিয়েছে দেবী মেধা, যাকে পঞ্চভূতের সুপ্ত ও গুপ্ত পঞ্চমভূতও বলেছে কৃতান্ত।

আর এই সমস্ত কিছুকে একত্রে সংগঠিত করার কালে বৌদ্ধ তথা তন্ত্র যেখানে ব্রহ্মময়ী শব্দের উচ্চারণ করে, বারবার বলেছেন, তাঁর সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা করতে তাঁরা অপারগ, সেখানে কৃতান্তও একই কথা বললেও, বার বার  বলেছে, হ্যাঁ তাঁর সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা তো স্বয়ং তিনি নিজেও জানেন না, তবে একবার তাঁর দর্শন লাভ হয়ে যাবার পর, একবার তাঁর প্রেমকে প্রত্যক্ষ করে ফেলার পর, আর যে তাঁর ব্যাখ্যা ছাড়া সমস্ত কিছুই অহেতুক, অকারণ ও অযৌক্তিক, এমনই বোধ হয়, তাই ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ সম্ভব না হলেও, তাঁরই ব্যাখ্যা করবো আমি, কারণ তিনিই আমার মা, তিনিই আমার প্রেম, তিনিই আমার সর্বস্ব, তিনিই আমার আরাধ্যা, মাতা সর্বাম্বা।

অর্থাৎ, চেতনার কনো আকার না থাকলেও, নিরাকার হলেও, যেহেতু চেতনা নির্গুণত্ব ত্যাগ করে প্রেমপ্রদান কর্মে স্থিতা হয়ে আদিশক্তি, সেহেতু তাঁর লিঙ্গরূপ সূক্ষ্ম হলেও স্থিত, আর তা হলো এই যে তিনি জন্মদাত্রী নারী, তিনি প্রেমদাত্রী নারী, তিনি আত্মত্যাগী নারী।

অন্যদিকে, ব্রহ্মময়ী সম্পূর্ণ ব্রহ্মের সমস্ত গুণাবলি, অর্থাৎ নিরাকারত্ব, অনন্ততা, অচিন্ত্যতা, অব্যক্ততা, সমস্ত কিছু ধারণ করলেও যা ধারণ করেন না, তা হলো নির্বিকারত্ব। আর তাই সম্পূর্ণ শত শতাংশকে যদি ব্রহ্ম বলো, ব্রহ্মময়ীকে ৯৯ শতাংশের থেকে অধিক বলতে পারা যায়না সেই শত শতাংশের। আর এই বাকি ১ শতাংশই, যা ব্রহ্মময়ীর প্রকাশের পর ব্রহ্মের অবশিষ্ট অংশ বলতে পারো, তা হলো আত্ম, যে নিজেকে পরে বহুখণ্ডে বিভাজিত করে, নিজমূল স্বরূপকে পরমাত্ম রূপে স্থাপিত করেছে।

এই আত্ম বা পরমাত্মও এমন নয় যে সে সাকার, কারণ ব্রহ্ম স্বয়ং নিরাকার, তাই যা কিছু সরাসরি ভাবে ব্রহ্মজাত সেই সমস্ত কিছুই নিরাকার। কিন্তু না তো আত্ম অনন্ত, না অচিন্ত্য, না অব্যক্ত, আর না নির্বিকার। তাঁর অন্তও ব্রহ্মময়ী, তাঁর চিন্তনও ব্রহ্মময়ী কর্তৃক সম্ভব, তাঁর ব্যখ্যাও ব্রহ্মময়ী কর্তৃক সম্ভব, আর বিকার! সমস্ত বিকারের জন্মদাতা আত্ম স্বয়ং। তাঁর ঔরস ধারণ করে করেই ছায়াদেবী, অর্থাৎ চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনা, বিকারদের জনক অর্থাৎ ত্রিগুণের জন্ম দেন। কিন্তু নিরাকার হবার কারণে স্থূল বেশে তাঁরও, অর্থাৎ পরমাত্মেরও কনো লিঙ্গ নেই। তবে তাঁর প্রকৃতি সম্পূর্ণ ভাবে ব্রহ্মময়ীর বিপরীত।

যেখানে ব্রহ্মময়ী মাতৃত্বপ্রেম প্রদান করতে ব্যকুল, সেখানে পরমাত্ম সমস্ত কিছু লাভ করতে লোভী, সমস্ত কিছু হরণ করতে, হনন করতে সদাতৎপর। দান করা, বা দেওয়ার জন্য ব্যকুলতার কারণে যদি ব্রহ্মময়ী আদিনারী হয়ে ওঠেন, তাহলে বুঝতেই পারছো, গ্রহণ করার উন্মাদনার কারণে পরমাত্ম হলেন আদিপুরুষ, যদিও তাঁদের উভয়েরই কনো ভৌতিক গঠন নেই, কারণ যেখানে পরমাত্ম ব্রহ্মজাত, সেখানে ব্রহ্মময়ী স্বয়ং ব্রহ্ম, অর্থাৎ অজন্মা।

এই হলো আদিস্ত্রী ও আদিপুরুষের কথা। এবার তাঁদের প্রভাব স্থাপিত হচ্ছে ভৌতিকে। ভৌতিক অর্থাৎ চিন্তা, ইচ্ছা, কল্পনায় মণ্ডিত, ত্রিগুণে সম্মিলিত, পঞ্চভূতের বিস্তার, এঁদের অস্তিত্বের অন্তরালে যতটা পরমাত্মের আত্মবিভূতি বিস্তারের লালসা বর্তমান, ততটাই মাতা ব্রহ্মময়ীর মাতৃত্বসুখ প্রদানের ব্যকুলতা সম্মিলিত। তাই এমন বলা কখনোই সঠিক নয় যে ভৌতিক সম্পূর্ণ ভাবে পরমাত্মের বিস্তার।

যদি তা সত্য হতো, তাহলে শঙ্করের ব্যক্ত করা কথা, অর্থাৎ ভৌতিক জগত কেবলই কল্পনা, আসলে তা নাস্তি নাস্তি, তাই সত্য হতো। কিন্তু তা সর্বৈব ভাবে সত্য নয়; তাই মাতা ব্রহ্মময়ী নিজের ৩২ কলা অবতার, ঠাকুর রামকৃষ্ণ বেশে সেই কথার সংশোধন করে বললেন, ‘জগত অনিত্য, কিন্তু জগত মিথ্যা নয়’।

প্রভু ব্রহ্মসনাতন এই বিষয়ে বলতেন, ‘সত্যই তো সম্পূর্ণ ভাবে কল্পনা কি করে হতে পারে তা, যেখানে স্বয়ং মাতা ব্রহ্মময়ী তার কণায় কণায় স্থিত! … তিনি সত্য, পরমসত্যের সেই রূপ তিনি, যাকে প্রত্যক্ষ করা সম্ভব, এবং যার হাত ধরে অব্যক্ত পরমসত্যে নিমজ্জন সম্ভব। তাই তিনি যেখানে বর্তমান, তা মিথ্যা কি করে হতে পারে! হ্যাঁ, পরমাত্মের কল্পনার মধ্যেই সমস্ত কিছু স্থিত, তাই অবশ্যই তা অনিত্য, কিন্তু মাতার উপস্থিতি তাকে অসত্য হতে দেয়না’।

এবার আমি নিজে থেকে এই বিষয়ে আর কিচ্ছু বলতে সক্ষম নই, কারণ এই কথন এবার অতিসূক্ষ্ম দর্শনে উন্নীত হয়ে যাচ্ছে। তাই এবার প্রভু ব্রহ্মসনাতনের থেকে উদ্ধৃতি প্রদান করবো তোমাদেরকে। তিনি বলতেন, ‘এই অনিত্য ভৌতিক জগতে শুরু হয় অধিকারের সংগ্রাম। অধিকার কাদের উপর কায়েম হবে? ত্রিছায়াদেবী, ত্রিগুণ ও পঞ্চভূতদের উপর। সংখ্যায় তাঁরা কয়জন? ত্রিছায়াদেবীর তিনজন , ত্রিগুণের তিনজন, এবং পঞ্চভূতের পাঁচজন হলেও, স্থিত থাকে চারজনই, কারণ পঞ্চম অর্থাৎ মেধা থাকেন সুপ্ত, যা জাগ্রত তখনই হয় যখন সত্যের নেশা হৃদয়ে বাসা বাঁধে। তাহলে ভূতরা সংখ্যায় ৪। অর্থাৎ সর্বসাকুল্যে কতজনের উপর অধিকার স্থাপন করতে হয়? তিন ছায়া, তিন গুণ, এবং চার ভূত, অর্থাৎ ১০এর উপর’।

তিনি বলতেন, এই ১০এর উপর অধিকার স্থাপনের উপর নির্ভর করে ভৌতিক দেহ স্ত্রী হবে নাকি পুরুষ হবে। তিনি বলতেন, ‘অবতার দেহীরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুরুষদেহীই হন, কেন জানো? যখন তাঁরা জন্ম নেন ভৌতিক জগতে, তখন তাঁরা ছায়াদেবীদের প্রভাব থেকে মুক্ত থাকে, ত্রিগুণ সদাই আত্মের প্রতিনিধি, আর অন্যদিকে ভূতদের মধ্যে তখন কেবলই মানস অর্থাৎ মন এবং ধরা উপস্থিত থাকেন, যাদের উপর সর্বদাই ব্রহ্মময়ীর বিস্তার থাকে। তাই যাদের উপর প্রভাব খাটানো হবে, তাঁদের সংখ্যা ১০ থেকে কমে মাত্র ৫ হয়ে যায়, আর সেই পাঁচের উপর, আত্মের অধিকার স্থাপিত থাকে তিন অর্থাৎ ত্রিগুণের উপর, এবং ব্রহ্মময়ীর অধিকার স্থাপিত থাকে মাত্র দুইয়ের উপর অর্থাৎ মানস ও ধরার উপর’।

বিস্তারে বলার কালে তিনি এই বলতেন যে, ছায়ারা পরমাত্মের সাথেই যুক্ত থাকেন, কিন্তু সবসময়ে প্রথম থেকে যুক্ত থাকেন না আত্মের সাথে। যদি পূর্বের জন্মে সেই দেহী আত্ম ও চেতনা প্রকৃতির বীভৎসতা, বা প্রকৃতির স্নেহ সামান্যও অনুভব করে যান, তাহলে ছায়াদের উপর পরাচেতনার প্রভাব অধিক থাকে আত্মের তুলনায়, আর তাই তখন ছায়াদের সংখ্যা চারভূতের সাথে একত্রিত হয়ে মাতার প্রভাবকে ১০এর মধ্যে ৬ থেকে ৭ পর্যন্ত ব্যপ্ত করে দেয়, আর তখন স্ত্রীশরীর ধারণ করে জীব।

সাধারণত জীবকটির ছায়া মাতার রুদ্রতাকেই প্রত্যক্ষ করে মাতার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে থাকেন। সেই ক্ষেত্রে স্ত্রীরূপে জন্ম নিলেও, ভয়ার্ত ও সংযমী হয়ে থাকেন সেই স্ত্রী, এবং তাঁর অন্তরে স্থিত থাকে জমা ক্ষোভ তথা উগ্রতা, বিশেষ করে আত্মের প্রভাব নতুন দেহে যখন যখন অনুভূত হয় তাঁর, সেই উগ্রতার বৃদ্ধি পায়। অন্যভাবে, যারা মাতার স্নেহস্পর্শ লাভ করে ছায়াদের মাতার অধীনে স্থিত করে জন্ম দিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে হয় স্নহের ভাব অধিক থাকে, নয় থাকে বিড়ম্বনা। যতক্ষণ আত্মের প্রভাব ছায়াদের উপর পরে না, স্নেহের ভাব অধিক থাকে, আর যখন আত্মের প্রভাব স্থাপিত হয়, তখন তখন মাতার পক্ষ নেবার কারণে বিড়ম্বনার সঞ্চার হয় ছায়াদের মধ্যে, আর সেই বিড়ম্বনা স্ত্রী চরিত্রের মধ্যে এই কারণেই প্রায়শই প্রত্যক্ষ হয়ে ওঠে।

অন্যদিকে, যেই জীবের পূর্বজন্মতে প্রকৃতির প্রতি উদাসীনতাই স্থাপিত ছিল, তাঁর ছায়া ও ত্রিগুণ সম্পূর্ণ ভাবে আত্মের অনুচর হয়ে থাকেন, আর তাই ১০এর মধ্যে আত্মের প্রভাব স্থিত থাকে তিন ছায়া ও তিন গুণের উপর, আর তাই তাদের সংখ্যা হয় ৬, আর তাই তাঁরা পুরুষ দেহ লাভ করেন। যদি কনো কারণে এই প্রভাব ৫-৫ হয়ে যায় আত্ম ও মায়ের মধ্যে, তখন জন্ম নেয় ক্লীব।

এটি কেবলই দেহের সমীকরণ, অর্থাৎ যেই কারণে দেহ পুরুষ বা নারী হয়। কিন্তু এর আরো একটি সমীকরণ থাকে, আর তা হলো সূক্ষ্মদেহের সমীকরণ। আত্মের অনুচররা সহস্র সহস্র সূক্ষ্ম আবেগের জন্ম দেয়, আর তাই সূক্ষ্ম দেহে সর্বদাই প্রায় আত্মের প্রভাব অধিক থাকার কারণে, সূক্ষ্ম দেহ জীবের সাধারণত আত্মের প্রভাবেই বশীভূত থাকে এবং তাই পুরুষ হয়। আর সেই কারণে, অধিকাংশ জীব কেবল লাভ করতে ব্যাকুল থাকে, আগ্রাসী থাকে কিছু লাভ করতে, এবং অন্যে কেউ কনোকিছু লাভ করলে, তার প্রতি হয়ে ওঠেন ঈর্ষান্বিত।

এর অন্যথা হয় বণিকের ক্ষেত্রে এবং সাধকের ক্ষেত্রে। বণিক আত্ম বড়ই বিচিত্র হয়। সে এক সময়ে সমস্ত আবেগদের বন্দী করে রেখে দেয়, এবং তাদেরকে সময়ে সময়ে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করে, কিন্তু সে নিজের উপর সেই আবেগদের কনোরূপ ক্রিয়া করার অনুমতি প্রদান করেন না। অন্যদিকে মেধা তাঁদের মধ্যেও জন্ম নেয়না, তাই ভূতরা চার হয়েই পরে থাকে। অথচ তাঁরা মন ও ধরার উপর পরমাত্মের প্রভাব বিস্তার করে নেয়, এই চপলতা দ্বারা যে, ‘দেখো, আমি আবেগদের বন্দী করে রেখেছি’। তাই বণিকদের মধ্যে অনুপাত হয়ে ওঠে ৮ ও ২, যেখানে আত্মের প্রভাবে স্থিত থাকে সমস্ত ছায়া, সমস্ত গুণ ও দুই ভূত, মন ও ধরার উপর। আর বাকি দুই ভূত, অর্থাৎ শিখা বা অগ্নি ও বায়ু, দাস রূপে থেকে যায়।

তাই বণিক হন সর্বোত্তম ভাবে ভয়ানক পুরুষ, যাকে অসুর বলা হলেও ভুল বলা হবেনা, কারণ সে অত্যন্ত কঠোর, কুটিল এবং নিষ্ঠুর, ঠিক বৈদিকদের মতন। হ্যাঁ বলতেই পারো, বৈদিকদের মত, কারণ তাঁরাও একাকজন বণিকই।

এই সমস্ত কিছুর অন্যদিকে যারা স্থিত তাঁরা হলেন সাধু। আবেগদের নিত্য হত্যা করেন তাঁরা, কারণ মেধার জন্ম দিয়েছেন তাঁরা। মেধার জন্ম দেবার কারণে, বিচার, বিবেক ও বৈরাগ্যের প্রকাশও সম্ভব হতে থাকে তাঁদের মধ্যে, যদিও সকলের ক্ষেত্রে সকল কিছু জন্ম নেয়না। যদি সকল তিন ব্রহ্মগুণই জন্ম নিয়ে নেয়, তাহলে পঞ্চভাবেরও জন্ম অবিলম্বে হতে থাকে, আর যদি তা নয়, তাহলেও আংশিক ভাবসমূহের জন্ম হতে থাকে। তবে মধ্যা কথা এই যে, অনুপাতের ক্ষেত্রে, এঁরা দেখো আর ১০ সংখ্যায় ক্রীড়ারত নন। ছায়া তিন ও গুণ ৩ অর্থাৎ ৬ই থাকে, কিন্তু ভূত ও ভাব মিলে, তা ৫টি ভূত, ১ থেকে তিন মহাভাব, এবং ১ থেকে ৫টি পঞ্চভাবের বিস্তার হয়, অর্থাৎ যতকমই হোক, সেই সংখ্যা ৫ যোগ এক যোগ এক, অর্থাৎ ৭ হয়ই, আর সর্বোত্তম ভাবে, সেই সংখ্যা ৫ যোগ ৩ যোগ ৫ অর্থাৎ ১৩ হয়ে যায়।

আর এই কারণে সাধকদের হৃদয় হয় নারীর, আর যদি এই নারীত্বের কারণ ৬ আত্মের ও ৭ চেতনার হয়, তাহলে একপ্রকার, কিন্তু যদি অনুপাত ৬ আত্মের এবং ১২-১৩ চেতনার হয়ে যায়, তখন তা কেবল হৃদয়ে সীমাবদ্ধ থাকেনা, তা প্রভাবিত হয় দেহতেও। অবতারদের দেহের কোমলতা এর সব থেকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ। তবে কমবেশি সকল সাধকেরই তনু সামান্য হলেও কোমল হয়ে ওঠে।

এই হলো নারীপুরুষের দর্শনকথা, অর্থাৎ কি ভাবে স্থূল অর্থাৎ ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য দেহ এবং সূক্ষ্মদেহতে নারীপুরুষের প্রভাব বিস্তার হয়। সমস্ত দর্শন থেকে এটি তো স্পষ্ট হয়ে গেল, তাই না যে, দেহ নারীর হোক বা পুরুষের, চেতনা বিস্তার সীমিতই থাকে। আর এটিও পরিষ্কার হয়ে গেল যে, যখন থেকে সূক্ষ্মদেহে নারীত্ব প্রসারিত হওয়া শুরু করে, তখন থেকেই চেতনার উদ্বেগ হয়, অর্থাৎ চেতনার উদ্বেগ হওয়া শুরু করলেই, সূক্ষ্মদেহতে নারীত্বের ভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে, এবং তা যখন অত্যধিক ভাবে স্পষ্ট হয়ে যায়, তখন তা সূক্ষ্ম থেকে স্থূলদেহেও প্রকাশিত হওয়া শুরু করে।

যাই হোক, আমাদের বিচার্য বিষয় হলো নারীপুরুষের বিবাহ কেন হয়। তার জন্য নারী ও পুরুষকে জানা অত্যন্ত আবশ্যক ছিল। কেন এই দুই ধারার প্রকাশ, তা বোঝা গেল পূর্বোক্ত দর্শন থেকে। এবার কথা এই যে, বিবাহ কেন? মিলন কেন? সঙ্গম কেন? এর প্রথম কারণটি আমরা পূর্বেই বিচার করেছি যে, এঁদের সঙ্গম থেকে সন্তানের উৎপত্তি হয় অর্থাৎ আরো একটি নূতন দেহ প্রকাশিত হয়, যার মধ্য দিয়ে আত্ম ও চেতনার সংগ্রামের এক নূতন অধঃয়ের রচনা সম্ভব হয়।

কিন্তু নারীপুরুষের সঙ্গম থেকে সন্তানের উৎপত্তি হয়, তা তো আমরা তখন জানতে পেরেছি যখন তাঁদের সঙ্গম হয়েছে, অর্থাৎ সন্তান তো কর্মফল, আর তা আমরা তখন জেনেছি যখন কর্মটি সম্পন্ন হয়েছে অর্থাৎ সঙ্গম হয়েছে। কিন্তু এই সঙ্গম হলো কি করে? আর এই সঙ্গমকে প্রকৃতি অর্থাৎ ব্রহ্মময়ী কেন সম্মতি প্রদান করেন এবং তাঁকে কর্মফলে ভূষিত করেন?

হ্যাঁ, প্রকৃতি যা যা কর্মকে সম্মতি প্রদান করেন, সেই সেই কর্ম থেকে কর্মফল লব্ধ হয়। আর নারীপুরুষের সঙ্গম থেকে সন্তানের উৎপত্তি হয়, এর অর্থ এই যে প্রকৃতি এই কর্মকে সম্মতি প্রদান করেন। কিন্তু এখানে প্রশ্ন হলো এই যে, কেন এই সঙ্গমরূপ কর্মকে সম্মতি প্রদান করেন প্রকৃতি! উত্তর খুবই সহজ। যেহেতু এই সঙ্গমের ফলে, সন্তান অর্থাৎ দেহী উৎপন্ন হতে পারে এবং চেতনা আত্মের সংগ্রামকে পরিণতি প্রদান করা যেতে পারে, তাই এই সঙ্গম কৃত্যকে সম্মতি প্রদান করেন প্রকৃতি। কিন্তু এবার প্রশ্ন এই যে, সেই সঙ্গমকে সহমতি প্রদান করলে, তাঁরা সঙ্গম পর্যন্ত পৌছায় কি উপায়ে? কেনই বা তাঁরা একে অপরের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে সঙ্গমে লিপ্ত হন?

উত্তর হলো সাম্যতা। পঞ্চভূত, ত্রিগুণ এবং ছায়ারা সকলেই সাম্যতার সন্ধান করেন, কারণ একমাত্র সাম্যতাই তাঁদেরকে প্রগতি প্রদান করতে সক্ষম। আর এই সাম্যতার সন্ধানের কারণেই পুরুষ স্ত্রীতে আকৃষ্ট হন, এবং স্ত্রী পুরুষের প্রতি। কেন? পুরুষের মধ্যে আত্মবিস্তার অধিক, তাই সে তাঁর সন্ধান করেন যার মধ্যে আত্মবিস্তার স্বল্প, এবং তাঁকে নিজের প্রতি আকৃষ্ট করে, তাঁর আত্মভাবকে উন্নত করে তুলে আত্মকে সংগ্রামে জয়যুক্ত করতে চান। আর স্ত্রীর মধ্যে চেতনার বিস্তার অধিক, তাই সে তাঁর সন্ধান করেন যার মধ্যে চেতনাবিস্তার স্বল্প, এবং তাঁকে নিজের প্রতি আকৃষ্ট করে, তাঁর চেতনাভাবকে উন্নত করে তুলে চেতনাকে সংগ্রামে জয়যুক্ত করতে চান।

আর এই আকর্ষণের হস্তান্তর খুব স্বাভাবিক ভাবেই নারী পুরুষের মধ্যেই হয়। পুরুষ পুরুষের মধ্যে কি তা হয়না? হতে পারে, যখন কনো পুরুষের আত্মভাব অত্যধিক বিস্তারিত হয় এবং অন্যপুরুষের আত্মভাব তুলনামূলক ভাবে কম। স্ত্রী ও স্ত্রীর মধ্যেও হতে পারে, যখন কনো স্ত্রীর চেতনাভাব অত্যন্ত অধিক, এবং অন্য স্ত্রীর চেতনা তুলনামূলক কম। তবে সেটি সঙ্গম পর্যন্ত যেতে পারেনা, যদিনা কামরিপু দ্বারা তাঁরা দুইজনেই আক্রান্ত হয়। কেন?

কারণ যার আত্মভাব অধিক, সেই পুরুষ অন্যপুরুষকে নিজের অধীনস্থ করার প্রয়াস করবেন, আর পুরুষের স্বভাব অধীনস্থ না হওয়া। তবে যখন প্রথমপুরুষটি প্রচুর ভৌতিক সম্পত্তি, প্রতিষ্ঠা বা প্রতিভাধারি হন, তখন অন্য পুরুষ তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হন, তবে উদ্দেশ্য সঙ্গম হয়না, উদ্দেশ্য হয় অহংকারের মাধ্যম, অর্থাৎ প্রথমপুরুষের সান্নিধ্য লাভে দ্বিতীয়পুরুষ অহংকারভাব প্রকাশ করতে সক্ষম হন, সেই কারণেই হন।

অন্য দিকে দেখবে, কনো স্ত্রীর চেতনা যদি অধিক প্রকাশিত হয়, অন্য স্ত্রীরা তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হন, সেই প্রথম স্ত্রীর কাছে তাঁরা অনুগত থাকতেই পছন্দ করেন। একই গুনাগুণ পুরুষের মধ্যেও দেখতে পাবে, যদি সম্মুখের স্ত্রীর চেতনার বিকাশ অধিক হয়।

এই দুইটিই রাজনৈতিক নেতার বা নেত্রীর অনুসরণের ক্ষেত্রে দেখতে পাবে, কিন্তু অন্য দিকে দেখবে, নটনটি, অর্থাৎ অভিনেতাদের ক্ষেত্রে, স্ত্রীরা কনো অভিনেত্রীর অনুগামী প্রায় হননা বললেই চলে, কিন্তু পুরুষরা নারীপুরুষ, উভয় অভিনেতার প্রতি আকৃষ্ট থাকেন।

অর্থাৎ পুরুষ পুরুষের প্রতি আকৃষ্ট হলেও, তা সঙ্গমে লিপ্ত হবার অবস্থায় তাঁকে নিয়ে যায়না। একই ভাবে নারীর ও নারীর মধ্যে আকর্ষণ। পুরুষ পুরুষের প্রতি আকৃষ্ট হলে, অহংকারের বৃদ্ধি হতে থাকে, আর যদি সেই প্রথম পুরুষ যার প্রতি পরের পুরুষ আকৃষ্ট হয়েছেন, তিনি যদি সাধু হন, তাহলে সেই সাধুর সূক্ষ্মতার নারীত্বই অন্যপুরুষকে আকর্ষণ করে, তবে সেই দ্বিতীয় পুরুষের অন্তরেও আত্মভাব জমাট অবস্থা থেকে স্খলিত হয়েছে, সেই কারণেই সাধু পুরুষের সান্নিধ্য তাঁর কাছে প্রিয় হয়েছে, তা না হলে সাধুর থেকে সে ছিটকে চলে যাবে।

সেই কারণে দেখবে, প্রকৃত সাধুদের সান্নিধ্যে অত্যন্ত স্বল্প নারীপুরুষ থাকেন, কারণ চেতনার উন্নতির ফলে যেই তেজ উৎপন্ন হয়, সেই তেজ জমাট বেঁধে থাকা আত্মের পক্ষে সহন করা অসম্ভবপ্রায় হয়ে যায়। অন্যদিকে, নারীর নারীর প্রতি আকৃষ্ট হলে, সাধারণত দ্বিতীয় নারী প্রথম উন্নত চেতনার নারীর কাছে আশ্রয় লাভ করার কারণেই আকৃষ্ট হন, ঠিক যেমন তোমরা সকলে মাতা সর্বশ্রীর প্রতি আকৃষ্ট, তাঁর থেকে চেতনার আশ্রয় লাভ করতে।

তাই নারীনারীর, বা পুরুষপুরুষ এমনকি নারীপুরুষেরও সঙ্গমের জন্য যদি কনো নারীপুরুষ লালায়িত থাকে, এর অর্থ তাঁরা কামনা নামক রিপুর দ্বারা সম্পূর্ণ ভাবে বদ্ধ। একজন চেতনাজাগ্রত নারীপুরুষ সন্তানপ্রাপ্তির জন্য সঙ্গমআবদ্ধ হলেও, তাঁদের মধ্যে কেবল সন্তানলাভের প্রয়োজন ক্রিয়া করে বলেই তাঁরা এই সঙ্গমে আবদ্ধ হন, অন্যথা তাঁরা এই সঙ্গম পদ্ধতিকেই অপছন্দ করেন, কারণ সাময়িক কালের জন্য হলেও তা তাঁদের চেতনাকে অস্থির করে দেয়।

এই হলো বিবাহের অন্তরালে থাকা নির্দিষ্ট দর্শন। তবে এর সাথে আরো বেশ কিছু অনির্দিষ্ট দর্শনও আছে, যার উপর নির্ভর করে যে কোন কোন নারীপুরুষের বিবাহ হতে পারে, আর আরো থাকে এই দর্শন যে বিবাহের পর নারীপুরুষের যুগ্ম ভাবে করনীয় কি হয়, বা কর্তব্য কি হয়। এই কথাও আমি প্রভু ব্রহ্মসনাতনের থেকেই জেনেছি। তাই যা জেনেছি তাঁর থেকে, সেই কথা তোমাদের এখন বলছি আমি।

বিবাহের উদ্দেশ্য হলো, দুই আত্মচেতনার অসম জীবকে একত্রে স্থাপিত করে, তাঁদেরকে একে অপরের সাথে মিলিত হতে দেওয়া এবং আত্মের ও চেতনার, উভয়েরই সত্যতার সন্ধান করতে দেওয়া। অর্থাৎ স্বামীস্ত্রীর কর্তব্য হলো মিলিত ভাবে আত্মের ও চেতনার সত্যকে ধারণা করা, এবং নিজেদের জীবনদ্বারা সেই সত্যকে প্রত্যক্ষ করে করে তার সন্ধান করে, তাকে ধারণ করা।

অর্থাৎ পুরুষ ও নারী, উভয়কেই একে অপরের আত্মচেতনার অসমভাবকে নিরীক্ষণ করতে হয়, আর নিজের আত্মচেতনার অসম ভাবকে সেই অনুসারে নিয়ন্ত্রিত করতে হয়। তাই সেই নারীপুরুষেরই বিবাহ দেওয়া উচিত বা কর্তব্য সমাজের, যারা একে অপরের আত্মচেতনার অসমতার কাছে নিজের আত্মচেতনার অসমভাবকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রয়াস করবেন। সহজ ভাবে না বললে, সমাজে এই নিয়ে দ্বিধা উৎপন্ন হবে, তাই সহজ ভাবে এই কথার অর্থ এই যে, যেই পুরুষ ও স্ত্রী একে অপরের নিকটে আসলে নিজেদের মধ্যে বনিবনা করার জন্য উভয়েই কিছু না কিছু ত্যাগ করতে রাজি থাকেন, বিবাহ তাদেরই হওয়া সম্ভব।

অর্থাৎ, সাধারণদের ক্ষেত্রে, যাদের বিবাহ স্থির করার প্রয়াস করা হচ্ছে, তাদেরকে বেশ কিছুদিবস যোগাযোগে থাকতে দিতে হয়। বেশ কিছুদিন যোগাযোগে থাকলেই, তারা একে অন্যের সাথে মানিয়ে নেওয়ার জন্য কিছু না কিছু পরিবর্তন ধারণ করার প্রয়োজন অনুভব করবে। তেমন পরিস্থিতির উদয় হতে দিতে হয়। যখন সেই পরিস্থিতি সম্মুখে আসবে, তখন যদি দেখা যায় যে স্ত্রীটি পুরুষের জন্য এবং পুরুষটি স্ত্রীর জন্য কিছু পরিবর্তনকে নিজের জীবনে ধারণ করতে প্রস্তুত, তখনই সেই বিবাহদান উচিত।

তবে প্রভু ব্রহ্মসনাতন এই বিষয়ে অত্যন্ত উচিত একটি কথা বলতেন, যা অত্যন্ত সহজ কথাও। তিনি বলতেন, ‘সন্তান সকলে ব্রহ্মময়ী মাতা সর্বাম্বার। জনকজননীর কাছে দেখভালের জন্য দেন তিনি নিজের সন্তানকে। যখন সেই পিতামাতা আর মাতার দেওয়া সন্তানের দেখভাল স্বয়ং করতে সক্ষম হবেন না, এমন বোধ করবেন, তখন তিনি সন্তানের দেখাভাল করার জন্য বিবাহ দেন। তাই সন্তানের বিবাহ দেবার পূর্ণ অধিকার পিতামাতার। আর শুধু অধিকারই নয়, কর্তব্যও। সন্তানকে উচিত হাতে অর্পণ করা পিতামাতার কর্তব্য আর তাঁদের এই বিবাহদানের জন্য জবাবদিহিও করতে হয় জীবন দিয়ে’।

তিনি বলতেন, ‘যার যা কর্তব্য, সে তা পালন করলেও সেই পালন করার কর্মফল লাভ করতে হয়, আর না পালন করলেও তার কর্মফল লাভ করতে হয়। তাই সন্তান যদি নিজের থেকে কারুকে পছন্দ করে নেয়, আর তার সাথে বনিবনা না হবার জন্য বিবাহবিচ্ছেদ অনুষ্ঠিত করেন, পিতামাতা কর্মফল থেকে মুক্ত হয়ে যাননা। তাঁদেরকে সন্তানের দেখভালের ভার উচিত হস্তে অর্পণ না করার জন্য কর্মফল লাভ করতেই হয়’।

তাই তিনি সন্তানদের প্রায়শই বলতেন, ‘যেই কর্ম তাঁদেরকে করতেই দিলেনা, তার জন্য তাঁদেরকে কর্মফল ভোগ করাবে! তোমাদের পিতামাতা জীবনপাত করে তোমাদের দেখভাল করার এমন প্রতিদান দেবে! … এর থেকে ভালো তো তাঁরা নিজেরা তোমাদের অপাত্রে দান করে, সেই অপাত্র দান করার জন্য কর্মফল ভোগ করতেন’।

অর্থাৎ তিনি স্পষ্ট কথা বলতেন যে, কেউ নিজে নিজে কারুকে পছন্দ করে বিবাহ করলেও, বা পিতামাতা তার বিবাহ দিলেও, দুইক্ষেত্রেই পিতামাতাকে বিবাহের সাফল্যের বা বিফল হবার দায় গ্রহণ করতে হয়, এবং কর্মফল ভোগ করতে হয়। তাই তিনি সমস্ত সন্তানদের কাছে আবেদন করতেন যাতে অহেতুক তাঁরা তাঁদের জনকজননীকে কর্মফল প্রদান না করিয়ে, তাঁদেরকে কর্ম করিয়ে তার কর্মফল ভোগ করতে দিতে।

তবে পিতামাতার উচিত যে সন্তানকে হবু স্ত্রী বা স্বামীর সাথে ঈষৎ সময় মিশতে দিয়ে পর্যবেক্ষণ করা, যাতে স্বামীস্ত্রী উভয়েই একে অপরের সাথে মানিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন গ্রহণ করতে তৎপর থাকেন। এমন পর্যবেক্ষণ করে নিলে, সন্তানের বৈবাহিক জীবন সুখের হবে, এবং স্বামীস্ত্রী উভয়েরই জন্য পরমসুখের উদ্দেশ্যে এগিয়ে যাওয়া সহজতর হয়ে উঠবে।

এই হলো পাত্র বা পাত্রী চয়নের অন্তরালে থাকা মূল কথা, এবার আসি স্বামী ও স্ত্রী কর্তব্য আদির কথাতে। এই ব্যাপারে, বিস্তারিত ভাবে প্রভু বলে গেছেন কৃতান্তিকাতে, যেখানে তিনি স্পষ্ট ভাবে বলেছেন যে, স্বামী হলেন স্ত্রীর অন্তিম গুরু, যার পর তাঁকে স্বয়ংকে সন্তানের প্রথম গুরু হতে হয়, এবং স্ত্রী হলেন স্বামীর অনেক গুরু মধ্যে একটি বিশেষ গুরু, যাকেও এরপর সন্তানের গুরু হয়ে উঠতে হবে।

এছাড়াও প্রভু যা বলেছেন কৃতান্তিকাতে, সেই অনুসারে স্ত্রী হলেন স্বামীর কাছে দ্বিতীয় জননী, যিনি তাঁর দেহের ও মনের দেখভাল করেন, যত্ন করেন, এবং স্নেহ প্রদান করেন। একই ভাবে, স্বামীও স্ত্রীর কাছে দ্বিতীয় পিতা, যিনি তাঁর ঘরনির দেহের ও মনের দেখভাল করেন, যত্ন নেন এবং স্নেহ করেন। আর এই উভয় পক্ষ থেকে স্নেহ, যত্ন ও দায়িত্ব পালনের মাধ্যমেই একে অপরকে পরমসুখের সন্ধান করার জন্য স্বতন্ত্র ও উদগ্রীব করে তুলবেন স্বামী ও স্ত্রী।

তাই যদি এই সমস্ত দর্শনকে ধারণ করে বিবাহরীতির নির্মাণ করতে হয়, তাহলে প্রথমে একটি কৃতান্তিকের কর্তব্য হবে, বিবাহের বরকে তাঁর পুরুষ হবার অন্তরালে থাকা দর্শন, এবং বিবাহের কনেকে তাঁর স্ত্রী হবার অন্তরালে থাকা দর্শন ব্যক্ত করা। অতঃপরে, তাঁর কর্তব্য হবে, বরকনেকে সম্মুখে স্থিত রেখে, নিভৃতে দুইজনকে পতিপত্নির কর্তব্য, যেমনটা কৃতান্তিকাতে ব্যক্ত করেছেন প্রভু ব্রহ্মসনাতন, তেমন ভাবে ব্যক্ত করা, যাতে পতিপত্নি একে অপরের পরিপূরক হয়ে ওঠেন কায়মনবাক্যে।

এই কৃত্য প্রভাত থেকে সম্পন্ন করবেন এক কৃতান্তিক, যিনি শুদ্ধ সূতিবস্ত্রের ধুতি ও উত্তরীয় ধারণ করে একটি কুশের আসনে স্থিত হয়ে একটি নিভৃত কক্ষে বরকনেকে একত্রে স্থাপিত করে এই সমস্ত বার্তা প্রদান করবেন। এই আচারের কালে বর ও কনে উভয়ে ভিন্ন ভিন্ন কুশের আসনে স্থিত থাকবেন, যেখানে বরও সূতিবস্ত্রের ধুতি ও উত্তরীয় ধারণ করে থাকবেন, এবং কনে সূতিবস্ত্রের শাড়ী ধারণ করে থাকবেন, এবং তিনি একবস্ত্রে অবস্থান করবেন, অর্থাৎ শাড়ী ব্যতীত তাঁর অঙ্গে দ্বিতীয় কোনাও বস্ত্রখণ্ড বিরাজ করবেনা।

প্রভাত থেকে দ্বিপ্রহর পর্যন্ত এই রীতি পালন করার শেষে, বর ও কনে সন্ধ্যার রীতির জন্য শ্রেষ্ঠ ধুতি উত্তরীয় এবং দেহআবরণ সহ শাড়ী ধারণ করে, সুসজ্জিত হয়ে, কৃতান্তিকের কুশাসনের সম্মুখে এসে উপস্থিত হবেন, যেখানে বরের পিতা বা মাতা, এবং কন্যার পিতা বা মাতা বা উভয়ের পিতামাতা একত্রে উপবেশন করে পুত্রকে কন্যার হস্তে, এবং কন্যাকে পুত্রের হস্তে অর্পণ করে, কৃতান্তিকের উচ্চারিত শব্দকে অঞ্জলি রূপে বিবৃত করে, নিজেদের দায় অন্যের হাতে তুলে দেবেন, এবং বচন দেবেন যে নবদম্পতিকে যথাযথ সম্ভব সহায়িকা প্রদান করবেন তাঁরা তাঁদের দাম্পত্যকে পরিপক্ক করে তুলতে।

এই বচনের শেষে, কৃতান্তিক পরিবারের সদস্যদের সাহায্যে একটি পঞ্চভূত চক্রব্যূহ নির্মাণ করবেন, যেখানে অগ্নি থাকবে মধ্যে, তাকে ঘিরে থাকবে একটি মৃত্তিকার বেষ্টন এবং সেই বেষ্টনের মধ্যে থাকবে জল। পঞ্চভূতকে একত্রে আবাহন করবেন কৃতান্তিক এবং তাঁদেরকে মাতা সর্বাম্বার কাছে অর্পণ করে, এই চক্রব্যূহের মধ্যে বরকনেকে পরবেশ করাবেন কৃতান্তিক, এবং অগ্নি ও জলের মধ্যের মৃত্তিকার স্থান দিয়ে সপ্তপাক প্রদক্ষিণ করাবেন, এবং বরকনেকে প্রতি প্রদক্ষিণের পূর্বে মাতা সর্বাম্বার সপ্তকুণ্ডলিনী চক্র উন্মোচনের কথা বলবেন, এবং সেই চক্রে যাত্রাকেই স্বামীস্ত্রী নিজেদের দাম্পত্য জীবনের লক্ষ্য বলে গণ্য করলে, মৃত্তিকার উপর চরণ রেখে, জলের বৃত্তের মধ্যে অগ্নিকে বেষ্টন করে, দম্পতি উভয় মিলে সেই চক্রকে অতিক্রম করার লক্ষ্যরূপে গ্রহণ করে, প্রদক্ষিণ করবেন।

একটি এমন পাকে, পঞ্চভূতকে সাক্ষী রেখে নবদম্পতি যখন একে অপরকে সেই চক্র অতিক্রম করাবার জন্য প্রতিশ্রুতি দেন, অতঃপরে দ্বিতীয় চক্র অতিক্রম করার কথা কৃতান্তিক ব্যখ্যা করবেন এবং নবদম্পতি এই ভাবে সপ্তবার সপ্তপ্রদক্ষিণ করলে, এবার পতি পত্নীকে এবং পত্নী পতিকে মাল্যদান করে এই সপ্তচক্র অতিক্রম করার কালে একে অপরের সঙ্গে দান করবেন, এই প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন। আর তা সম্পন্ন হলে, একে অপরকে সিন্দূর প্রদান করেন কেশের সিঁথিতে, এবং প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন যে, এই সমস্ত যাত্রায় একে অপরের শক্তি হয়ে স্থিত থাকবেন, আর এই ভাবে বিবাহরীতি সম্পন্ন করবেন।

অতঃপরে, বরকনের প্রিয়জনরা বরকনেকে একত্রে নিয়ে হাসিউল্লাস, ঠাট্টাতামাসা, নৃত্যগীতি করে, সকলে মিলে রাত্রি যাপন করবেন, এবং ভোরের আলো আকাশে দেখার পূর্বে, বরকনেকে সকল বয়োজ্যেষ্ঠরা আশীর্বাদ প্রদান করে, তাঁদেরকে বরকনের পিতামাতার স্থির করা একটি স্থানে প্রেরণ করবেন বিহার করার জন্য, এবং দাম্পত্য জীবনের শুরু করার জন্য।

সেই ভ্রমণ থেকে প্রত্যাবর্তনের পর, বরের ও কনের অবিভাবকরা মিলিত ভাবে একটি ভোজের আয়োজন করে সকল আত্মীয়কুটুম্ব, সঙ্গীসাথি, এবং প্রতিবেশীদের মহাভোজ করাবেন এবং কৃতান্তিককে দক্ষিণা প্রদান করবেন”।

বিজয়া মীনাক্ষীর গা ঘেঁসে বসে বললেন, “তুমি বিয়ে করবে মীনাক্ষী? আমি তো করবো না, এমন স্থির করেছিলাম। তবে তোমার সমস্ত রীতি শুনে মনে ইচ্ছা জাগছে যেন বিবাহ করে নিই”। … সকলের হাস্য।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28