ভূমিকা
কিশোরী শ্রীমতী দিব্যশ্রীর উদ্দেশ্যে বলতে থাকলেন, “মাতা সর্বশ্রীর থেকে অনুমতি গ্রহণ করে, সকল কৃতান্তিকগণ, দুই দিকে বিভক্ত হয়ে গেলেন। একটি ভাগ গেলেন উত্তরে, দেবী জয়ার নেতৃত্বে, এবং অপর ভাগ গেলেন বিজয়ার নেতৃত্বে দক্ষিণে। বহু মাস চলে গেল। বহু বছর কেটে গেল, কিন্তু তাঁরা এমন কারুর সন্ধান পেলেন না, যার কথা মাতা সর্বশ্রী বলেছিলেন তাঁদেরকে।
প্রায় তিন বৎসর বিভিন্ন দিকে ভ্রমণ করার পর, যখন মাত্র ১০জন কৃতান্তিকই সন্ধান চালিয়ে গেলেন, যাদের মধ্যে অধিকাংশই তন্ত্রসন্তান এবং জয়াবিজয়া ছিলেন, তখন এক বিচিত্র সংবাদ লাভ করলেন তাঁরা মালদ রাজ্যের প্রত্যন্তর এক স্থান থেকে। সংবাদ প্রসারিত হতে থাকলো সকল মালদ রাজ্যের প্রজার মুখে মুখে। একটি অতি সুশ্রী দেখতে স্বল্পবয়স্কা যুবতী, নাম মীনাক্ষী। তাঁকে নিয়ে নাকি সেখানের প্রধান, অজিতেশ ভৌমিক অত্যন্ত বিরক্ত।
আর তাই তাঁকে তিনি এবার পরীক্ষণ করবেন, এমন নিশ্চয় করে নিয়েছেন। সেই স্ত্রী নাকি প্রকৃতির কথা শুনতে পান, প্রকৃতির প্রতিটি জীব তাঁর সাথে নাকি কথা বলেন, নিজেদের ভাব ব্যক্ত করেন। এই দাবি করে করে, সেই মেয়ে নাকি একাধিক বাড়ির গবাধিকে মুক্ত করে দিয়েছে। তাই তাঁর বিরুদ্ধে সকলে ঘোরতর অভিযোগ, আর তাই অজিতেশ ভৌমিক তাঁকে পরীক্ষণ করবেন, মহারাজ সুমিতকে সম্মুখে রেখে।
সেই পরীক্ষণ দেখতে নয়, সেই কন্যা মীনাক্ষীর প্রকৃতিপ্রেম দেখতে নয়, কাতারে কাতারে মানুষ এসে উপস্থিত হয়েছে আজ মালদ রাজ্যে, গঙ্গার তটে, এই মীনাক্ষীকে কি সাজা দেয় রাজা, তা দেখার জন্য। এমন কথা শুনে, জয়াবিজয়াও সকলকে সঙ্গে নিয়ে উপস্থিত হয়েছেন গঙ্গাতটে। কে এই মীনাক্ষী? কি তাঁর প্রতিভা, আর প্রজা বা রাজার আচরণ তাঁর প্রতি কি হয়, সেই সমস্ত কিছু দেখার জন্যই বিশেষ করে কৃতান্তিক সকলে উপস্থিত হলেন ভিড়ের মধ্যে।
যখন সকলে উপস্থিত হলেন গঙ্গা তটে, তখন দেখলেন, রাজা সুমিত পালকি করে এসে উপস্থিত হলেন সেই স্থানে। তাঁর সম্মুখে উপস্থিত হয়ে, তাঁর খাতিরযত্ন করতে দেখলেন একজনকে, সুন্দর বস্ত্র পরিধান করে। সেই ব্যক্তিকে দেখে, জয়াবিজয়াদের বুঝতে অসুবিধা হলো না যে, তিনিই হলেন অজিতেশ ভৌমিক। খানিক পরে দেখলেন, সেখানে একটি সুশীলা স্বল্পবয়সী মেয়েকে, হাতে নারিকেলের মোটা দড়ি বেঁধে, আর পায়েও সেই একই দড়ি দিয়ে বেঁধে নিয়ে আসা হলো।
কন্যাটির বয়স দেখে মনে হলো ১৬-১৭র থেকে অধিক কিছুতেই হবেনা। অঙ্গের রং ঠিক যেন ছারানো বাদামের মতন। কেশ এলোমেলো হয়ে আছে। তাও যতটুকু দেখা গেল মুখখানা, তাতে বেশ বোঝা যাচ্ছিল বেশ সুন্দরী মেয়েটা। সম্পূর্ণ পৃষ্ঠদেশব্যপ্ত তাঁর কেশ, পরনে একবস্ত্র শাড়ী, একটু মলিন, আর একটু ছেঁড়া ফাটা। শাড়ীর ছেঁড়া ফাটা স্থানগুলির দিকে তাকাতে, বেশ বোঝা গেল যে, সেই ছেঁড়া ফাটা সিপাহীদের কৃত্য নয়, কারণ ছেঁড়াগুলি বেশ পুরাতন।
অর্থাৎ মেয়েটি দরিদ্রই হবে, এমন জয়াদের ধারণা হয়। দরিদ্র ঘরে জন্ম নেওয়া কন্যা বেশে বলতেই হয় পরমা সুন্দরী মেয়েটা, কারণ দরিদ্ররা তো আর রূপের পরিচর্যা করেন না, করতেও পারেন না। কিন্তু দরিদ্র কি করে রইলেন রাজ্যে, সেই নিয়ে সংশয়ের শেষ রইলনা জয়াবিজয়ার মধ্যে, কারণ যেই অর্থনীতির স্থাপন করেছিলেন সম্রাট ছন্দ, তাতে তো দারিদ্রতা থাকার কথাই নয় প্রজার মধ্যে! তাহলে কি সেই শাসন স্থাপিত নেই আর! নাকি সেই শাসন ব্যবস্থার মধ্যে বৈদিক ইতরগুলি লুকিয়ে দারিদ্রতাকে অক্ষুণ্ণ রেখেছে!
