সর্বাম্বা কাণ্ড (কৃতান্ত প্রথম কাণ্ড)

শিখা, বেগবতী সহ সকলেই তাই তাই দেখতে থাকলো মোহিনীর রাজত্বে, যেমনটার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন মেধা। শিশুদের এমনই শিক্ষা প্রদান করলেন তাঁর নীতি যে, তাঁরা ও তাঁর পিতামাতা উভয়েই, ছাত্রজীবন সমাপ্ত হবার মুহূর্ত থেকেই, শিক্ষাকে ব্যবহার করে উপার্জনের খোঁজ করা শুরু করলেন। আসলে শিক্ষাকে উপার্জনের উদ্দেশ্যেই ধাবিত করা ছিল মোহিনীর উদ্দেশ্য, আর তাই তেমনটাই হলো।

সাধুগনও পুনরায় মেধার সাথে সাখ্যাত করতে এসে, সেই একই কথা নিয়ে স্বীকারোক্তি করে গেলেন যে, মেধা সঠিকই বলেছিলেন যে, প্রজার মধ্যে শিক্ষার বিস্তার করা এই জন্য হচ্ছেনা যে প্রজা শিক্ষিত ও উন্নতমনস্ক হোক। উন্নতমনস্ক তো তিনি, যিনি আত্মভাবে আবদ্ধ নন। উন্নতমনস্ক তো তিনি, যিনি সর্বদা সত্যের সন্ধান করেন, এবং সমাজ ও জাতি কতটা সেই সত্যের পথে ধাবিত, সেই বিচারে রত থাকেন।

মেধা যেমন বলেছিলেন যে, এই শিক্ষার বিস্তার উপার্জনের মধ্যে রকমারিতা ও চটক আনার প্রয়াস হবে, আর এই দুই দিয়ে সম্পূর্ণ জাতিকে আত্মকেন্দ্রিক করে তোলার প্রচেষ্টা হবে, সেটিই প্রত্যক্ষ হলো সময়ের সাথে সাথে।

সমাজের প্রতিটি স্তরে, ধনের আবশ্যকতার রচনা করেছেন মোহিনী, যাতে সকলকে ধন উপার্জন করতেই হয়। আর ধন উপার্জনের দিকে মনযোগী হওয়া মাত্রই সকলে আত্মসর্বস্ব হয়ে বিরাজ করবেন, যা ধনেরই প্রকৃতি। আর ক্রমে প্রজা দেখতে শুরু করলেন যে, অধিক ধন আনায়নের সর্বশ্রেষ্ঠ উপায় হলো শিক্ষালাভ, কারণ মোহিনীর প্রসারিত শিক্ষানীতিতে জ্ঞান প্রদান করা হয়না। উচিত প্রমাণ অজ্ঞানতা প্রদান করা হয়, আর প্রদান করা হয় সেই অজ্ঞানতা অর্থাৎ সুসজ্জিত ও সুপরিকল্পিত কল্পনা ও চিন্তার মাধ্যমে ইচ্ছার বিস্তার করার কৌশল।

আর এই কৌশলই সম্পূর্ণ ছায়াপুরে শ্রেষ্ঠ ধন উপার্জনের শ্রেষ্ঠ উপায়। মনগড়া আইন, আর সেই আইনে এমন ধারা করা আছে যাতে, দোষী সহজেই ছাড়া পেতে পারে ও নির্দোষ সাজা পায়। এমন করার কারণও একটিই, আর তা হলো এই যে দোষী তো মোহিনীর কর্ণধাররাই হবেন, যারা সাধারণ প্রজার থেকে ছলে বলে ধন হনন করবেন, যারা প্রজার মধ্যে রমণীয়দের আত্মসাৎ করবেন, নিজেদের অধিকার জ্ঞানে।

আর তাই, আইনে এমন স্থান থাকা আবশ্যক ছিল যাতে, সেই দোষীরা ছাড়া পায়, কারণ সেই দোষী যে মোহিনী ও তাঁর ভগিনী এবং অষ্টপাশদের মনোনীত ব্যক্তি হন, বা স্বয়ং তাঁরাই হন। তাই মনগড়া কর্মসংস্থানের প্রথমটিই হয়, সেই মনগড়া আইনের কর্ণধারদের নির্মাণ করা। এঁরা দোষীর পক্ষ থেকে এজলাসে স্থাপিত হন এবং তাঁকে নির্দোষ প্রমাণ করার প্রয়াস করেন, আর অন্যদিকে নির্দোষের পক্ষ থেকে আরো এক আইনজীবী স্থাপিত থাকেন, এবং নির্দোষকে দোষী প্রমাণের প্রয়াস করেন, কিন্তু মুখোস দুইজনেই বিপরীত ভাবের ধারণ করে থাকেন।

মনগড়া এই পেশাতেই শ্রেষ্ঠ সম্ভব ধনোপার্জন সম্ভব হয় প্রজার পক্ষে, তাই বিপুল সংখ্যক প্রজা সেই উদ্দেশ্যে ধাবিত হন। এঁর পরবর্তী অতি ধনোপার্জন করা প্রজাদের বলা হয় মহাকাশী। এঁরা মহাকাশের অভিযান বিষয়ক সমস্ত গবেষণার জন্য নাকি প্রখ্যাত। মনগড়া মহাকাশের তত্ত্বপরিবেশন করা আর সেই তত্ত্বের প্রমাণকে বিশিষ্ট গুপ্ত আলয়ে স্থাপিত হয়ে নির্মাণ করে পরিবেশন করে, মোহিনীর শাসনধারা শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করাই এঁদের কর্ম।

সমস্ত রাজস্ব আয় যা হয়, তাকে এই মহাকাশের নাট্যে ব্যয় করা হয়, এমনই দেখানো হয় প্রজাকে, তাই এই নাট্যমঞ্চ হলো সেই শ্রেষ্ঠ নাট্যমঞ্চ, যার কারণে মোহিনীর সরকার বিপুল ধন লুণ্ঠন করতে সক্ষম হয়। এই মহাকাশীরা সেই ধন লুণ্ঠনের সহায়ক, আর তাই তাঁরা বিপুল অর্থ উপার্জন করেন। তাই শিক্ষার সমাপ্তি করে, এই পেশাতে নিযুক্ত হতে লালায়িত থাকে মোহিনীর মনগড়া শিক্ষার্থী, আর তাঁদের অবিভাবকরা।

তবে একটিই বাঁধা এই উপার্জনের পদ্ধতিতে। এই পেশাতে যারা একবার যুক্ত হন, তাঁরা আর অন্য পেশাতে নিযুক্ত হতে পারেন না, এমনকি তাঁদেরকে যেই বিলাসবহুল আবাসন প্রদান করা হয়, তার থেকেও মুক্ত হতে পারেন না। এরও কারণ খুবই স্বাভাবিক। এই পেশাদাররা মোহিনীর মায়ার শ্রেষ্ঠ মিথ্যার সাথে পরিচিত, আর তার থেকেও বড় কথা, তাঁরা সেই মিথ্যাকে মিথ্যা বলেই জানেন। তাই, তাঁরা একবার সেই এজলাসে উপস্থিত হলে, মৃত্যু পর্যন্ত তাঁদের কনো মুক্তি নেই, তবে বিপুল পরিমাণ ধন উপার্জন সম্ভব সেই এজলাসে থেকে।

তাই ধনসর্বস্ব মোহিনীনির্মিত ছায়াপুর সমাজের প্রজাদের প্রধান আকর্ষণ থাকে এই পেশাতে নিযুক্ত হওয়া। তবে মজার বিষয় এই যে, পেশায় নিযুক্ত হবার পূর্বক্ষণ পর্যন্ত, এই পেশা যে শ্রেষ্ঠ মিথ্যাচারকে কেন্দ্র করে স্থাপিত, তা কাউর জানা থাকতো না, আর পেশায় যুক্ত হবার পর তা জেনেও, আর কারুকে বলার উপায় থাকতো না।  

এর পরবর্তী মনগড়া পেশার স্থান রূপে নির্মাণ যা নির্মাণ করেছিল মোহিনী, যেখানে বিপুল অর্থ উপার্জন করা সম্ভব প্রজার পক্ষে, তাতে মনগড়া ভাবের সাথে সাথে, সেবার ভাবকেও নিযুক্ত রেখেছিলেন মোহিনী। আর সেই পেশাদারের নাম বৈদ্য। যান্ত্রিক ও রাসায়নিক উপাদানই ছিল, এই উন্নতির পশ্চাতে থাকা মূল উপাদান। আর এই উপাদানের মাধ্যমে, কেবল যে প্রজাকে নীরোগ করা হতো, তাই নয়, প্রজাকে রুগীও করে দিতো এই উপাদানসমূহই।

এই যন্ত্রদের রশ্মি, এই রাসায়নিক বস্তু ও ধাতুদের দেহের সাথে বিক্রিয়াই রচনা করতে থাকলো একাধিক ব্যাধির, ও সেই ব্যধিরই নিরাময়ের উদ্দেশ্যে প্রস্তুত সমস্ত গবেষণা, আর সেই নিরাময়ের ধারা প্রজার কাছে বিক্রয় করে, মোহিনী বিপুল ভাবে প্রজার উপার্জিত ধন নিজের কাছে গচ্ছিত করতেন। অথচ প্রজা এটিই মেনে চলতেন যে, প্রজার সেবা করছেন এই বৈদ্যরা, আর এই বৈদ্যদের প্রযুক্তি ও রসায়নে পারদর্শী করে তোলা দেবী মোহিনীর সমস্ত যোজনা। কিন্তু বাস্তবে, এই পেশার মাধ্যমে প্রজার সর্বস্ব লুণ্ঠন করে চলতেন মোহিনী ও তাঁর বুদ্ধিদাতারা।

চতুর্থ পেশা, যার প্রতি প্রজারা লালায়িত থাকতেন, কারণ তাতে বিপুল অর্থোপার্জন সম্ভব ছিল বলে, তা ছিল যন্ত্রনির্মাতা। যেই যন্ত্র দ্রুত অট্টালিকা নির্মাণ করবে, যেই যন্ত্র নিত্যসামগ্রী উপস্থাপন করবে প্রজার ক্রয়ের জন্য, যেই যন্ত্র বৈদ্যের সাহায্য করবে, যেই যন্ত্র মোহিনীনির্মিত শিক্ষার প্রসার করবে, যেই যন্ত্র মোহিনীনির্মিত মহাকাশ অভিযানের নাট্যকে রূপদান করবে, সেই সমস্ত যন্ত্রের নির্মাতা হন এঁরা।

পঞ্চম পেশা হলো, রাসায়নিক বিশারদগন, যারা এই সমস্ত যন্ত্রের মধ্যে উপযুক্ত রসায়নকে স্থাপিত করে করে, বৈদ্যের কর্মকে, শিক্ষার কর্মকে, এবং ব্যবহারিক বস্তু নির্মাণের যন্ত্রকে বাস্তবায়িত করে, সেই পেশা।

ষষ্ঠম পেশা, যার প্রতি প্রজা আকৃষ্ট থাকতেন তা হলো এই সমস্ত যন্ত্রের কারিগররা, যারা এই সমস্ত যন্ত্র বিকল হয়ে গেলে ঠিক করতে পারেন, এবং এই সমস্ত যন্ত্রকে সঠিক ভাবে ব্যবহার করতে জানেন।

আর সপ্তম পেশা, যা প্রজাদের আকর্ষিত করতো, তা হলো এই সমস্ত কিছুকে নিয়ে বাণিজ্য করে, যেখানে এই সমস্ত উৎপাদন হয়, সেখান থেকে প্রজার কাছে কাছে যারা তা পৌঁছে দেন। তবে এই পেশার মধ্যে শ্রেষ্ঠ স্থানে অবস্থান করতেন তাঁরা যারা এই সমস্ত যন্ত্রদের ব্যবহার করে করে, প্রজার ব্যবহারের নিত্য সামগ্রী উপস্থাপন করতেন, অর্থাৎ রন্ধনের সামগ্রী, ত্বক পরিষ্কার করার সামগ্রী, রূপচর্চার সামগ্রী, ইত্যাদি ইত্যাদি।

এছাড়া অষ্টম যেই পেশার প্রতি প্রজা লালায়িত থাকতো, তা হলো এই সমস্ত মনগড়া শিক্ষার বিস্তার যারা করবেন, সেই শিক্ষকের পেশাতে।

এই আটটি পেশার অবকাশ রেখেছিলেন মোহিনীর সরকার প্রজাদের জন্য, যাদের মাধ্যমে প্রজা বিপুল অর্থ আয় করতে সক্ষম হয়। আর এই আটটি পেশাকেই এমন রেখেছিলেন মোহিনী সরকার যাতে কেবলই তাঁর প্রসার করা শিক্ষাব্যবস্থা থেকে শিক্ষিত ব্যক্তিই এই পেশাগুলিতে নিজেদের অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম হবেন।

সমস্ত প্রজার মধ্যে তাই শিক্ষা নিয়ে প্রতিযোগিতা লেগেই থাকতো, কারণ শ্রেষ্ঠ শিক্ষার্থীই এই পেশাগুলিতে নিজেদের নিযুক্ত করতে পারবেন, আর তা করতে পারলেই মোহিনীর সমাজের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব অর্থাৎ ধনবান ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠতে পারবেন। অর্থাৎ, প্রতিটি শিক্ষার্থীর মধ্যেই একটিই ভাব ক্রিয়া করতো যে, আমিই শ্রেষ্ঠ, কারণ শ্রেষ্ঠই শ্রেষ্ঠ পেশা লাভ করবে। আর ‘আমিই শ্রেষ্ঠ’ ভাব ক্রমশ সকল প্রজাকে আত্মসর্বস্ব করে তুলতে শুরু করলো।

নিজের স্বার্থের হিতাহিত ব্যতীত আর কিছু দেখতে পাওয়াই বন্ধ হয়ে গেল প্রজার। সর্বক্ষণ কেবলই অধিক অর্থ আয়ের চিন্তা এবং অধিক শ্রেয় বিলাসিতার মধ্যে জীবনযাপন করাই প্রজার লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠলো। আর সেই লক্ষ্যের ফলে, যারা এই পেশাসমূহতে নিযুক্ত হতে থাকলেন, তাঁরা বাকি মানুষদের মানুষ বলেই গণ্য করা বন্ধ করে দিলেন।

বনিক দশটি রজত মুদ্রায় যেই সামগ্রী লাভ করেছেন, তাকে ১০০ রজতমুদ্রায় বিক্রয় করতে থাকলেন প্রজার কাছে। সামগ্রী সরবরাহ করা বনিকদের আরো ১০ রজত মুদ্রা প্রদান করলেন, যারা এই সামগ্রী ক্রয় করা উচিত, এমন প্রচার করলেন তাঁদেরকে আরো ১০ মুদ্রা প্রদান করলেন। যাদের গবেষণাকে ভিত্তি করে এই সামগ্রী নির্মিত হলো, সেই রাসায়নিক বিশারদ ও যন্ত্রবিশারদদের প্রদান করলেন আরো ১০ মুদ্রা।

মোহিনী সরকারকে প্রদান করলেন ২০ মুদ্রা, আর বাকি সমস্ত নিজের কাছে রাখলেন। আর এমন নয় যে, কিছু কিছু সামগ্রী লাভ করেই প্রজার জীবন চলে যেত। সমস্ত কিছুই ক্রয় করতে হতো তাঁকে, অর্থাৎ আহারের অন্নও, সবজিও, ওষধিও, শিক্ষার সামগ্রীও, পরিধানের বস্ত্রও, রন্ধনের আসবাবও, অট্টালিকা নির্মাণের সামগ্রী বা সম্যক অট্টালিকাও, পরিধানের জুতাও, ও সাজসরঞ্জামের সামগ্রীও।

অর্থাৎ প্রজাকে বিপুল অর্থ উপার্জন করতে হতো, সমস্ত সামগ্রী লাভের জন্য, আর তাই আটটি পেশাতে নিযুক্ত থাকার জন্য প্রজা সদালালায়িত থাকতো, আর সেই লালসার উদ্দেশ্যে, সর্বক্ষণ নিজেকে শ্রেষ্ঠ প্রতিপন্ন করা, আর অন্যকে অজ্ঞ প্রমাণ করা, প্রজার স্বাভাবিক স্বভাব হয়ে ওঠে।

এক কথাতে প্রজা সম্পূর্ণ ভাবে পরাধীন হয়ে যায়, তবুও নিজেকে স্বতন্ত্র জ্ঞান করতে থাকে, যেই ক্ষণে তাঁর হস্তে ধন উপস্থিত থাকে, এমনই মোহিনীর মায়ার প্রভাব হয়। আর এই সমস্ত কিছুর মধ্যে দুর্বিপাকে পরে থাকেন তাঁরা যারা, এই আটটি পেশায় নিযুক্ত হতে পারেন না। হয় যেই বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন সেই আটটি পেশায় নিযুক্ত হবার শিক্ষা গ্রহণের জন্য, তার অনুপস্থিতির কারনে, নয় মনগড়া কল্পনাকে ধারণা করে, নিজেকে সেই কল্পনার মধ্যে আবিষ্ট করে নেওয়ার অক্ষমতার কারণে, এই দুইয়ের যেকোনো একটি কারণে, যে এই আট পেশায় নিজেকে নিযুক্ত করতে পারেনা, সে কেবলই সম্ভোগের পাত্র হয় সমস্ত মোহিনীসমাজের নিকটে।

আটটি পেশাতে নিযুক্ত সকলে মিলে তাঁদেরকে সম্ভোগ করে, লুণ্ঠন করে। এমন নয় যে, অন্যদের লুণ্ঠন করেন না এঁরা, কিন্তু এই আটটি পেশার একটি ব্যক্তি যেমন অন্য সকলকে লুণ্ঠন করেন, তেমন তিনি যখন এই আট পেশার অন্য কনো ব্যক্তির কাছে যান, তিনিও তাঁকে পরিবর্তে লুণ্ঠন করেন। কিন্তু এই মোহিনীসরকার ঘোষিত অশিক্ষিতরা, অর্থাৎ যারা এই আটটি পেশাতে নিযুক্ত নেই, তাঁরা সকলের লুণ্ঠনের সামগ্রী হন, কারণ তাঁদের পক্ষে কারুকে লুণ্ঠন করা সম্ভব হয়না।

তবে এমন ভাবার কনো কারণ নেই যে তিনি নিরীহ। মোহিনীসমাজে একটি প্রজাও নিরীহ ছিলেন না। সকলেই ছিলেন সুযোগসন্ধানী, লুণ্ঠনের সামান্য সুযোগ পেলেই তাঁরা লুণ্ঠন করতে নেমে পরতেন। কিন্তু এই আটটি পেশায় যারা নিযুক্ত ছিলেন না, তাঁদের কাছে লুণ্ঠনের ইচ্ছা থাকলেও, লুণ্ঠনের উপায় ছিলনা। তাই তাঁরা দাঁতেদাঁত চেপে, এই আটটি পেশায় নিযুক্তদের কাছে সামান্য অর্থের বিনিময়ে চাকরের কর্ম করতেন, এবং সুযোগের অপেক্ষা করতেন এবং লুণ্ঠনসামর্থ্য লাভের প্রয়াস করতে থাকতেন।

এই ছিল মোহিনী সরকারের মূলদণ্ড বা মেরুদণ্ড, অর্থাৎ মনগড়া শিক্ষার সাহায্যে মনগড়া পেশার নির্মাণ, এবং সমস্ত প্রজাকে আত্মসর্বস্ব করে তোলা, যাতে তারা আর কেউ জগন্মাতার কথা চিন্তা করার জন্য পবিত্র না থাকতে পারেন। কি করে থাকবেন? জগন্মাতার চিন্তা তো আত্মচিন্তাবিমুখ হয়েই করা যায়, আত্মচিন্তায় নিমগ্ন হয়ে কি আর জগতের মাতার চিন্তা করা যায়! আত্মজননীর চিন্তাই করা দায় হয়ে যায়, তারপর আবার জগন্মাতার চিন্তা!

যাইহোক, মোহিনী সরকার এই ভাবে, মাতা ব্রহ্মময়ীর পুনরাগমনকে স্তব্ধ করতে, এই বিশাল মনগড়া সাম্রাজ্যের নির্মাণ করেছিলেন। তবে এমন ভাবার কনো কারণ নেই যে, এই পেশাচক্রের নির্মাণেই মোহিনী সরকার শান্ত হয়েছে।

আসলে এই মনগড়া নির্মাণ তো আত্মসর্বস্ব করে তোলার ভিত। এই ভিতকে ভিত্তি করে যে প্রকৃত আমিত্বের ভাব প্রকাশ করা এখনো অনেক বাকি।

নারী পুরুষকে, ও পুরুষ নারীকে যাতে সর্বদা সম্ভোগের দৃষ্টিতে দেখে, তার দিকে বিশেষ নজর রেখেছিলেন মোহিনীর সরকার। একে অপরকে সম্ভোগের দৃষ্টি দিয়েই সর্বদা দেখে, তা নিশ্চয় করার জন্য, বিনোদন শিল্পকে সর্বদা কর্মরত রাখা হতো। তাই বিবাহ পর্যন্ত যেতোনা, তার পূর্ব থেকেই নারী পুরুষকে ও পুরুষ নারীকে সম্ভোগ করার মানসিকতা নিয়ে সদা রমণে লিপ্ত হতেন।

কিন্তু রমণের পথে বাঁধা হলো অন্তঃসত্ত্বা হয়ে ওঠা। তাকে বাঁধা মনে করে যাতে সকলে, তার জন্য পুরুষকে এটাই মোহিনী সরকার বোঝাতেন যে, সন্তানের পিতা হলেই দায় গ্রহণ করতে হবে, শুধু সন্তানের নয়, সন্তানের মাতারও। আর ভার গ্রহণ করা মানেই অধিক থেকে অধিক ধনোপার্জন আবশ্যক। আবার অন্যদিকে স্ত্রীদের বোঝানো হতো যে, পুরুষরা তাঁদেরকে নিজেদের পদতলে আবদ্ধ রাখতে চান, আর সন্তান হলো সেই উপায়, যার দ্বারা স্ত্রী, যতক্ষণ না সন্তান বড় হচ্ছে, ততক্ষণ পুরুষেরই দ্বারস্থ থাকবেন।

অর্থাৎ, সন্তান প্রাপ্তির থেকে পুরুষ ও স্ত্রীকে ততক্ষণ দূরে রাখতেন, যতক্ষণ না তাঁরা আর্থিক ভাবে সম্পন্ন হয়ে উঠছেন, অথচ তাঁরা একে অপরকে সর্বদা রমণের দৃষ্টিতেই দেখেন। এই দুই বিরূপ ভাবকে একত্রে সমাজে স্থাপিত করে, মোহিনী সরকার, নিরদের ব্যবহার অধিক করে তুলে, সেই নিরদের থেকে বাণিজ্য ও অর্থোপার্জন করতে থাকলেন বিপুল ভাবে।

এই নিরদের কারণে, স্ত্রীপুরুষ সর্বদা রমণে নিযুক্ত হতে পারেন, সন্তানপ্রাপ্তির চিন্তা ত্যাগ করে। আর তাই এঁর সুবাদে, স্ত্রীরা বহুবয়স পর্যন্ত অবিবাহিত থেকেও, সম্ভোগপ্রাপ্তি করতেই থাকলেন। যখন তাঁরা সন্তানলাভের নিশ্চয় করতেন, তখনই তাঁরা বিবাহের দিকে যেতেন। অন্যদিকে এতে পুরুষেরও সুবিধা হয়ে যায়। তাঁরাও উপার্জনকে সঠিক করে নেবার বিস্তর সময় লাভ করে।

কিন্তু এই সমস্ত কিছুর মধ্যে একটি দ্বিতীয় বাঁধাও মোহিনী সরকার প্রদান করে, আর তা হলো স্ত্রীদের বলতে থাকা যে পুরুষ তাঁদেরকে পুরুষনির্ভর করে রাখতে চায়, তাই তাদের উপার্জন করতে থাকা অত্যন্ত আবশ্যক। আর সেই উস্কানির কারণে, স্ত্রীরাও উপার্জনের পথে হামলে পরে। নিম্নস্তরের মানুষেরা নিরদ ব্যবহার করতে পারেনা, কারণ তাঁদের উপার্জন অত্যন্ত কম। তবে বিনোদনের থেকে প্রসারিত হওয়া সম্ভোগের বাসনা তো তাঁদের মধ্যেও বিস্তার পাচ্ছিল।

তাই তাঁদের স্তরে সন্তানের জন্মের হার অত্যন্ত অধিক হয়ে যায়, আর ফলে নারীপুরুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতেই থাকে ছায়াপুরে। আর যতই জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায়, ততই পুরুষদের অর্থ উপার্জনের পথে বাঁধা অধিক আসতে থাকে। এরই মধ্যে স্ত্রীরাও যখন উপার্জনের পথে হামলে পরেন, তখন সমাজে উপার্জন লাভের একটি হাহাকার বিস্তৃত হতেই থাকে।

এরই মধ্যে বিবাহ যখন নিজের স্থান করে নেয়, তখন কেবল পতির দেহভোগ করা, বা স্ত্রীর দেহভোগ করাই স্ত্রী ও পুরুষের লক্ষ্য আর থাকেনা। তাঁদের লক্ষ্য হয়ে যায়, পতির প্রভাবের কারণে অর্থোপার্জনের উপায় সন্ধান করা, আবার একই ব্যাপার পুরুষদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, যেখানে স্ত্রীর সামর্থ্যের থেকে অধিক স্ত্রীর পিতার সামর্থ্যের দিকে অধিক দৃষ্টি থাকতো পুরুষের।

অর্থোপার্জন ও দেহসম্ভোগ, এই মূল বিষয় হয়ে ওঠে সম্পূর্ণ সমাজে, আর তা পতিপত্নির সম্পর্কের মধ্যেও প্রকট হতে শুরু করে। কেবল মাত্র এই দুইয়ের প্রতি দৃষ্টি থাকার জন্য, পুরুষ ও স্ত্রী প্রায়শই পত্নীভিন্ন অন্য স্ত্রী, এবং পতিভিন্ন অন্য পুরুষের দিকে সদাই দৃষ্টি থাকতো স্বামীস্ত্রীর, এবং সেই কারণে পরকীয়া সমাজে অত্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করে।

অর্থোপার্জনকে নিশ্চিত করার জন্যও, স্ত্রীরা এহেন পরকীয়াতে যুক্ত হতেন প্রায়শই, আর পুরুষরা কেবলই দেহসম্ভোগের ইচ্ছার নিবারণের জন্য। আর তাই অধিকাংশ ক্ষেত্রেই, পতিপত্নির সম্পর্ক দাঁড়িয়েই থাকতো, এই বিশ্বাসে যে একে অপরকে সম্ভোগ প্রদান করবে, ও অর্থের প্রাচুর্য ধারণ করবে। তাই যখন যখন অর্থের প্রাচুর্যের পথে পুরুষ চলার কালে, স্ত্রী হতেন বাঁধা, বা স্ত্রীর অর্থোপার্জনের পথে পুরুষ হতেন বাঁধা, আর যখন যখন যখন স্ত্রীর সম্ভোগলাভের পথে বা স্বামীর সম্ভোগ লাভের পথে একে অপরে হতেন বাঁধা, তখন তখন বিবাহবিচ্ছেদ হতে শুরু করে।

কখনো কখনো পুত্রবধূর এহেন আচরণ তাঁর পুত্রের প্রতি, তা সহ্য করতে না পেরে, শ্বশুর ও শাশুড়িও পুত্রের স্ত্রীর প্রতি বিরূপ হতেন। আবার অন্যসময়ে, যখন স্ত্রীরা দেখতেন যে, তাঁর স্বামী বাঁধা হোক বা না হোক, স্বামীর পিতামাতা তাঁর সম্ভোগলাভ ও অর্থোপার্জনের পথে বাঁধা, তখন তিনিও বিরূপ হতে শুরু করতেন। আর সেই কারণেও বিবাহবিচ্ছেদ হতে শুরু করে। একই কাণ্ড পুরুষদের জীবনেও হতে থাকে।

আবার কখনো কখনো পুত্রবধূর অর্থোপার্জনের প্রতি দৃষ্টি না থাকার কারণে, বা পুত্রের শ্বশুর শাশুড়ি পুত্রকে অর্থদান না করলে, বা স্ত্রী যদি অর্থোপার্জনের থেকে অধিক সন্তানলাভে মনযোগী হন, সেই কারণেও পুত্রের পিতামাতা বিরক্ত হতেন, এবং সেই সেই বিরক্তি একাক ক্ষেত্রে এমন হয়ে যেত যে, তাঁরা পুত্রবধূকে অত্যাচারও করতেন।

অর্থাৎ মোহিনীর সরকার এমনই সমাজের নির্মাণ করেন যেখানে প্রতিটি ব্যক্তি অন্য ব্যক্তিকে সম্ভোগ ও অর্থলাভের দৃষ্টিতেই দেখতেন। যিনি সেই দৃষ্টির কারণে নিজের স্বার্থ চরিতার্থ হবে, এমন জ্ঞান করতেন, তিনি সঙ্গী হয়ে ওঠেন অপরের, আর যিনি সেই দৃষ্টির কারণে নিজের স্বার্থহানি হবে, এমন জ্ঞান করতেন, তিনি বিরোধী হয়ে উঠতেন অপরের।

সেই অপরজন নিজের স্বামী হতে পারে, স্ত্রী হতে পারে, স্বামীর পিতামাতা হতে পারে, আবার স্ত্রীর পিতামাতাও হতে পারে, আবার সম্পূর্ণ একজন অন্য ব্যক্তিত্বও হতে পারে। এক কথাতে, যিনি অর্থ ও দেহ প্রদান করবেন সম্ভোগের জন্য, তিনিই প্রিয়, আর যিনি তা করবেন না, তিনিই অপ্রিয়, এমনই সমাজের স্থাপনা করেন মোহিনী সরকার।

সমাজেও তাই, যেই পুরুষ আর্থিক ভাবে ধনী, তিনিই শ্রেষ্ঠ, আর যদি কনো এমন পুরুষ হন, যিনি অর্থোপার্জনের থেকে অন্য কিছুতে অধিক মনযোগী, সম্পূর্ণ সমাজের দৃষ্টিতে তিনি একজন অপদার্থ। স্ত্রীর ক্ষেত্রে, সমাজের দৃষ্টি এমন নয়। স্ত্রীর থেকে সমাজের লালসা সন্তান লাভের। তাই যেই স্ত্রী সন্তান প্রদান করেছেন, তিনিই সমাজের চোখে শ্রেষ্ঠ, আর অন্যরা অহেতুক স্ত্রী হয়ে জাত।

কিন্তু স্ত্রীরা নিজের দৃষ্টিতে শ্রেষ্ঠ তখনই যখন তাঁরা শ্রেষ্ঠ সামগ্রী হয়ে ওঠেন, সম্ভোগের জন্য, অর্থাৎ সম্পূর্ণ সমাজের সমস্ত পুরুষ তাঁদেরকে সম্ভোগের স্বপ্ন দেখলে, তখনই সেই স্ত্রী নিজেকে শ্রেষ্ঠ জ্ঞান করতেন। সত্য বলতে, স্ত্রী পুরুষের কনো ভিন্নতাই ছিলনা। তাঁদের একটিই উদ্দেশ্য ধন উপার্জন আর দেহসম্ভোগ।

তাই পতিপত্নির একের অপরের প্রতি বিশ্বাস, একে অপরের প্রতি নিষ্ঠা, একে অপরের প্রতি আস্থা, একে অপরের প্রতি যত্ন, সেই সমস্ত কিছুর সমাপ্তি হতে শুরু করেছিল। মোহিনীর সমাজে, স্বামী জানেনও না তাঁর স্ত্রী কি দেহকষ্টে বা মনকষ্টে ভুগছেন, আর একই ভাবে স্ত্রীও তা জানেন না স্বামীর ক্ষেত্রে। তাই তাঁর সমাজে সকলেই সকলকে নিজের কষ্টের কথা বলতে ব্যস্ত।

যিনিই তাঁর কষ্টের কথা শ্রবণ করেন, তিনিই তাঁর কাছে প্রিয়জন হয়ে যান, আর যিনি তা শ্রবণ করেন না, তিনি হয়ে যান অপ্রিয়। স্বামী স্ত্রীর ও স্ত্রী স্বামীর অন্তিম গুরু, যেই তত্ত্বকে মাতা ব্রহ্মময়ী সমাজে স্থাপিত করেছিলেন, এবং যেই তত্ত্বের মাধ্যমে স্ত্রীপুরুষের সম্বন্ধকে এক অন্যমাত্রার পবিত্রতা প্রদান করেছিলেন, সেই তত্ত্বকে মোহিনী সরকার সম্পূর্ণ ভাবে ধুলিস্যাত করে দিয়েছিলেন।

তাঁর সমাজে কেউ কারুর গুরু নয়, কেউ কারুর শিষ্য নয়, সকলের কাছে সকলে সুবিধা অর্জন করার মাধ্যম। সুবিধার অর্থ কি? অর্থ উপার্জন ও সম্ভোগ লাভ। সেই একই সম্বন্ধ স্বামীস্ত্রীর মধ্যেও, সন্তান ও জনকজননীর মধ্যে, বৈদ্য ও রোগীর মধ্যে, এমনকি শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীর মধ্যেও।

কেউ কারুর আদর্শ নন, সকলেই সকলের কাছে হয় সম্ভোগের পাত্র, নয় সম্ভোগ প্রদত্ত্বা বা সম্ভোগ লাভের সহায়ক। আর এমন নয় যে, এই দৃষ্টি কেবলই কিছু ব্যক্তি বা কিছু সম্বন্ধের মধ্যেই সীমিত। জনকজননী ও সন্তানের মধ্যেও একই ভাবের প্রকাশ।

সন্তানকে পিতামাতা জন্মের মুহূর্ত থেকেই অর্থোপার্জনের স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেন, এবং যাতে সন্তান অধিক অর্থ উপার্জন করতে সক্ষম হন, তার কারণে তাঁদেরকে প্রস্তুত করা শুরু করেন। সেই উদ্দেশ্যেই বিদ্যালয়ে প্রেরণ করেন সন্তানকে, সেই উদ্দেশ্যেই উচ্চবিদ্যালয়ে বা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রেরণ করেন। আর তাই সন্তান আহম্মক হলেন নাকি সম্ভোগসর্বস্ব হলেন, তাতে পিতামাতার কিচ্ছু এসে যায়না, সন্তান যদি অর্থ উপার্জনের প্রতি দৃষ্টিশীল না হন, তাহলেই পিতামাতা তাঁদের প্রতি বিরূপ হয়ে ওঠেন।

আর এই সমূহ বিষয় যে মোহিনী সরকারের নীতির প্রভাবে হচ্ছিল, তার বোধ তাঁদের ছিলনা, তা কনো ভাবেই নয়। কারণ এই সমস্ত কিছুর বিস্তার তো তাঁর সরকারই করছিল। আর তার বিস্তার করার জন্য, একটি নবম ও দশম ও একাদশ পেশাও বেঁছে নেন তাঁরা।

নবম পেশার মধ্যে স্থাপিত রাখেন নাট্যকে। সেই নাট্য সমূহ সমাজের মধ্যে, সমাজের মানুষের মধ্যে এই সম্ভোগ ও অর্থসর্বস্বতার বীজ বপন করার উদ্দেশ্যেই গঠিত। আর তাই যেই যেই নাট্যকার বা নটনটি এই কর্মে লিপ্ত হতেন, তাঁদের জন্য বিস্তর উপার্জনের ব্যবস্থা করেছিলেন মোহিনী সরকার, এবং এই বিশেষ কামউত্তেজক নাট্যকেই বিনোদন রূপে স্থাপিত করে, কলার বিস্তারকে বিনোদন জগত থেকে প্রতারিত করে দেয় মোহিনীসরকার।

দশম পেশা ছিল এক বিচিত্রপ্রকার কামউত্তেজক, উগ্রতাপ্রেরক ও সম্ভোগপ্রিয়তার জনক সঙ্গীতধারা। সেই সঙ্গীতধারার মাধ্যমে এই সম্ভোগমানসিকতারই বিস্তার যাতে সমাজের সর্বস্ব হতে পারে, তার নিশ্চয় করছিলেন মোহিনী সরকার। ক্রমে সমাজের কাছে এই নটনটি, এই চিত্রকর, এই বিচিত্র কলাবিদরা যখন জনপ্রিয় হয়ে উঠতে থাকলো, কারণ তাঁরা তাঁদেরকে অর্থোপার্জন তথা সম্ভোগের প্রতি দায়িত্ব নিয়ে দিশা প্রদান করছেন বলে, তখন এঁদেরকে অতিকায় সম্ভোগ ক্রিয়া, মাদকের নেশায় লিপ্ত করে, মোহিনী সরকার সম্পূর্ণ সমাজকে মাদকের নেশায় নিমজ্জিত করে, সেই মাদকের থেকে বিপুল অর্থ আয় করা শুরু করলেন।

শুধু এমনই নয়, এই নটনটিদের দিয়ে দেহপ্রদর্শন করিয়ে করিয়ে, যুবক ও যুবতী প্রজাদের সম্ভোগের প্রতি আকৃষ্ট করা শুরু করলেন, এবং এঁদেরকে বিভিন্ন সেই নাট্যেই লিপ্ত করলেন, যার মাধ্যমে প্রতিটি মানুষ একে অপরকে অর্থ ও সম্ভোগের দৃষ্টিতেই দেখতে থাকলেন।

আর একাদশতম পেশারূপে স্থাপন করলেন যাদেরকে তাঁরা হলেন প্রচারক। নাট্যে বা সঙ্গীতের মাধ্যমে যা প্রচার করা যায়, তার প্রচারকে যথার্থ জ্ঞান করেনা মোহিনী সরকার। তাই তাঁরা এক তৃতীয় মাধ্যমের রচনা করেন, যারা সর্বদা এই সম্ভোগের ও অর্থোপার্জনেরই আলোচনা করতে থাকেন।

বিভিন্ন সামাজিক স্তরে, এই সম্ভোগক্রিয়াকে কি ভাবে গ্রহণ করেছে প্রজা, আর কি ভাবে অনন্য উপায় নির্মাণ করে চলেছে প্রজা অর্থোপার্জনের, এই ছিল এই প্রচারকদের মূল প্রচারকর্ম। অর্থাৎ যেই সামান্য ভাবেও, সামান্য প্রজা মনে করছিলেন যে এই সম্ভোগের ভাব থেকে নিজেদের মুক্ত করবেন, বা এই অর্থোপার্জনের মোহ থেকে নিজেদের অপসারিত করবেন, তাঁদের উদ্দেশ্যে এই প্রচারকদের মাধ্যমে এই বার্তা দেওয়া হয় যে, তাঁদের সকল প্রয়াস ব্যর্থ।

তাঁদের এই বার্তা দেওয়া হয় যে সম্পূর্ণ সমাজ ইতিমধ্যেই ধনসর্বস্ব হয়ে গেছে, সম্ভোগ সর্বস্ব হয়ে গেছে।

শিখা ও বেগবতীর কপালে ভাঁজ তখন থেকে পড়তে শুরু করলো, যখন থেকে প্রজার মধ্যে নাট্য বা সঙ্গীত বা অন্যান্য কলা নিয়েও অর্থোপার্জনের ভাব প্রত্যক্ষ হয়ে উঠলো। বিচলিত হতে শুরু করলো তারা, আর বিচলিত হয়ে মধ্যরাতে, সকলের নজর এড়িয়ে, একদিন তাঁরা মেধার কাছে গিয়ে বললেন, “ভগিনী মেধা, এখনও কি আমাদের হাতের উপর হাত রেখে বসে থাকা উচিত!”

দেবী শিখা বললেন, “মেধা, তুই কনোদিনও বশীকরণের শিকার হসনি, জানি এই কৃতিত্ব তোরই। তোরই মধ্যে কনোপ্রকার দুর্বলতা ছিলনা, তাই তোকে কেউ কখনো বশীকরণ করতে পারে নি। কিন্তু আমরা বশ হয়েছিলাম। তাই আমরা জানি বশ হওয়ার অর্থ কি। আমরা জানি, বশ হয়ে গেলে, আর কনো প্রকার হুঁশ থাকেনা। ঠিক ভুলের জ্ঞান থাকেনা। ন্যায়কে অন্যায় মনে হয় আর অন্যায়কে ন্যায়।

আর তাই বলছি মেধা, আমাদের পিতা এবং তাঁর সমস্ত প্রজা এক্ষণে বশ হয়ে রয়েছে মোহিনীর ও মোহিনীসরকারের কাছে। তাই মোহিনীসরকার যা বলছে, সেটিই এঁদের কাছে অব্যর্থ। নাহলে একবার চিন্তা করে দেখ, যেই মহারাজা মানস সঙ্গীত, নাট্য, চিত্রাঙ্কন, ক্রীড়া, ইত্যাদি কলাকে মাতা ব্রহ্মময়ীর প্রদত্ত আশীর্বাদ জ্ঞানে, সর্বদা এই সমূহকে অর্থোপার্জনের নীতির থেকে মুক্ত রাখতেন, এখন তাঁদেরকেই অর্থোপার্জনের শীর্ষে স্থাপিত হবার প্রয়াস করতে দেখেও মোহিনীর গুণগান করতে পারেন! … না মেধা, অসম্ভব তা।

একমাত্র বশীকরণ হয়েছে বলেই তা সম্ভব হয়েছে। কি করে এর প্রতিকার সম্ভব, তা আমি জানি না, তবে এর প্রতিকার আবশ্যক, তা আমি বেশ বুঝতে পারছি। … মেধা, তুইও জানিস, তুই আমাদের কাছে ভগিনী কম, সন্তান অধিক। … তোর উপর আমাদের সম্পূর্ণ ভরসা আছে। বিচার করে দেখ, যখন আমরা দুইজন বশীকরণের শিকার হয়ে ছিলাম, তখন আমরা কারুর কথাকে গ্রাহ্য করিনি, শুনিও নি, পিতামাতার কথাকেও অমান্য করেছি, অপমানও করেছি তাঁদের। কিন্তু একটি বারের জন্যও তোকে অপমান করেছি!

না মেধা, আগেও বলেছি, আমরা মাতা ব্রহ্মময়ীকে দেখিনি, তাই তাঁর প্রতিবিম্বরূপে আমরা তোকেই দেখি। পবিত্রতার আধার তুই আমাদের কাছে। আদর্শ আমাদের কাছে। তোর প্রতি আস্থা চলে গেছে, এমন একটি মুহূর্তও আমাদের কাছে আসেনি। যখন আমরা চরম ভাবে আত্মপুত্রদের কাছে বশ, তখনও তোর প্রতি আস্থা যায়নি।

বেশকিছুবার আমাদের এমন বোধ হয়েছে, আমরা যা করছি, তা সঠিক করছি তো! সজ্ঞানে করছি তো!… বেগবতী আমাকে বলেছে, যদি কিছু ভুলও করে থাকি, মেধা আছে তো, সে ঠিক সময়ে আমাদের সামলে নেবে।

বোন, শিক্ষাকে বাণিজ্য করা হয়েছে, তা দেখেছি, ভয়ও পেয়েছি, কিন্তু চুপ থেকেছি। সমস্ত সমাজ অর্থের উপর আশ্রিত হয়ে গেছে, দেখেছি, ভীতও হয়েছি, কিন্তু আস্থা ছিল যে, সঙ্গীত, কলা, নাট্য, এঁরা তো আছে। এঁরা পবিত্র, স্বয়ং মাতার দান। এঁরা ঠিকই উদ্ধার করে নেবে সমস্ত কিছুকে একদিন। এঁরা এক না এক সময়ে সমস্ত কিছু ঠিক করে দেবে।

কিন্তু যখন এঁদেরকেও বশ করে নিলো মোহিনী, তখন আর কনো কিছুর উপর ভরসা পাচ্ছিনা মেধা। এবার কিছু করতে হবে আমাদেরকে। এবার যদি কিছু না করি, তাহলে আর মাতার আগমন কনোদিনও হবেনা, সেই ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত”।

মেধা সমস্ত কথা শুনে গম্ভীর হয়ে বললেন, “দিদি, করতে আমাদেরকে হতই, কিন্তু অপেক্ষায় ছিলাম ততদিন, যতদিন না মোহিনীকে ভগবান মানতে শুরু করে সমস্ত প্রজা। … এখন মোহিনী এঁদের কাছে মাতা ব্রহ্মময়ী। অর্থাৎ তিনি অজেয়। আর তাই এবার আমি রাজপুরে যাবো, আর মোহিনীকে সম্যক যুদ্ধের আবাহন করবো। মাতা ব্রহ্মময়ীর আশীর্বাদ থাকলে ও তাঁর ইচ্ছা হলে, নিশ্চিতই মোহিনীকে পরাভূত করবো আমি।

যদি তা না করতে পারি, তবে আমি রাজবন্দী হবো, এবং আমাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে। আর যদি তাতে সফল হই, দিদি, তোমাদের দুইজনকে আমার সাথে এসে সেই রাত্রিটা থাকতে হবে, কারণ সেই রাত্রের মধ্যেই আত্ম ধরাধামের সকলকে বন্দী করবেন, এবং কারাগারে নিক্ষেপ করবেন। তোমাদের দুইজনকে সুরক্ষিত থাকতে হবে”।

বেগবতী বললেন, “কিন্তু পিতামাতা, দাদুদিদা, সকল প্রজাদের এইভাবে একাকী ছেড়ে দিয়ে, আমরা পালিয়ে যাবো?”

মেধা মৃদু হেসে বললেন, “হ্যাঁ, ঠিক তাই। আমাদের সকলেই যদি কারাগারে চলে যাই, তাহলে যারা কারাগারে থাকবে, তাদেরকে উদ্ধার কে করবে? … আর দ্বিতীয় কথা এই যে, যতই তাঁরা কারাগারে দিনযাপন করবেন, ততই তাঁদের উপর করা বশীকরণ ক্ষীণ হতে শুরু করবে, আর ততই তাঁরা পুনরায় মুক্ত হতে শুরু করবেন।

আমাদের সুরক্ষিত থাকাও সহজ হবেনা। মাতার প্রতি বিশ্বাস ও ভরসা রাখা ছাড়া আমাদের কাছে আর কনো পথই খোলা নেই। তিনি চাইলে, তবেই আমাদেরকে তিনি সুরক্ষিত করবেন, আর না করলে, সমস্ত কিছু শেষ। বাকি তাঁর যা ইচ্ছা, তাই হবে। তবে হ্যাঁ, আমাদেরকে যে সেই কালে মুহুর্মুহু বিপদে পড়তে হবে, সেই ব্যপারে নিশ্চিত থাকতে পারো। তাই প্রস্তুত থেকো, সেই সময়ের জন্য”।

শিখা মেধার নিকটে এসে, তাঁর মস্তকে ও পৃষ্ঠে স্নেহের স্পর্শ রেখে বললেন, “তুই আমাদের সঙ্গে থাকলে, আমরা কনো কিছুকে ভয় পাইনা মেধা।… তবে কি বলতো, নিজেদের প্রতি একটি ঘৃণা কাজ করে আমাদের! … যতই বশীকরণ হোক আমাদের উপর, তা সম্ভব হয়েছে কারণ, আমরা দুর্বল ছিলাম বলেই। আর সেই বশীকরণের থেকে মোহিনীদের জন্মদাত্রী আমরাই। … এই ঘৃণ্য কাজের পর, মাতা কি আমাদের আর গ্রহণ করবেন?”

মেধা হেসে বললেন, “মা তিনি, সন্তান কি করেছে, কি ভেবেছে, তা তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। সন্তান এক্ষণে কি করছে, আর কি বিচার করছে, কতটা সমস্ত সন্তানের জন্য সে ভাবিত, তাই মাতার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। … দিদি, পিতার থেকে আমি যেটুকু মাতার ব্যাপারে জেনেছি, একটি বিষয়ে আমি নিশ্চিত। আমাদের মাতা পরমসত্য, কনো ভগবান নন তিনি, স্বয়ং ঈশ্বর। কিন্তু তাঁর কাছে ঈশ্বরত্বের থেকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ মাতৃত্ব।

ঈশ্বর হওয়াকে তিনি নিজের সহজাত স্বভাব জ্ঞান করেন, কিন্তু মাতা হতে পারাকে তিনি নিজের সৌভাগ্য মনে করেন। তাই দিদি, তিনি ঈশ্বরের থেকে অনেক অধিক মাতা। … তাঁকে ঈশ্বর জ্ঞান করবে, তো দেখবে, তিনি কি আমাকে গ্রহণ করবেন, তিনি নিশ্চয়ই আমাকে বর্জন করবেন, এই সমূহ ভাবের উদয় হবে। কিন্তু তাঁকে মাতা জ্ঞান করো, তিনি যে আমাদের কাছে আপনের থেকেও অধিক আপন। তাই দিদি, নিজের উপর ভরসা হারিয়ে ফেললেও ফেলো। তা থাকলেই বা কি হবে, কেবলই আত্মসর্বস্ব হবার ভাব জাগবে, অহম জাগবে। কিন্তু তাঁর প্রতি ভরসা কখনোই হারিও না।

বিচার করে দেখো দিদি, তিনি কেন চলে গেছিলেন? আমাদেরকে আমাদের অন্তরে বিরাজ করা অসত্যের সাথে সাখ্যাত করানোর জন্যই তিনি চলে গেছিলেন। যেই আমিত্ব নিয়ে আমরা সর্বদা ভাবিত, সেই আমিত্ব, সেই আত্মের প্রকৃতিকে আমাদের কাছে প্রত্যক্ষ করানোর জন্যই চলে গেছিলেন। আর আজ আমরা আত্মের প্রকৃতি দেখে দেখে বিরক্ত, তাই তাঁর আগমনের সময় ঘনিয়ে আসছে, কারণ এবার যে তাঁর অসত্যের পাঠ প্রদান সমাপ্ত হতে চলেছে, আর সত্যের পাঠ, সত্যের সামর্থ্যের সাথে আমাদের পরিচয় করানোর সময় আসন্ন হতে চলেছে।

দিদি, আমি রাজপুরে প্রস্থান করবো। তোমরা এখানেই থাকো। এই বৃক্ষতলে থাকো, সুরক্ষিত থাকবে তোমরা। … চিন্তা করো না, মাতার উপর ভরসা রাখো। যদি আমি প্রত্যাবর্তন করি, নিশ্চিত ভাবে জেনো যে, আজ রাত্রের মধ্যেই পিতাদের সকলকে বন্দী করা হবে। তাই স্নায়ুর উপর জোর স্থাপন করো”।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22