৩। ছায়াপুর অধ্যায়
যখন কারুর উপর বশীকরণ হয়, তখন তাঁর মনে হয় যে, তাঁকে যারা মোহগ্রস্ত বলছেন, বাস্তবে তাঁরাই মোহগ্রস্ত। মানসেরও এমনই মনে হলো, আর তাই সমস্ত কিছু দেখেও অদেখাই করতে থাকলো। দেখতে সে সমস্ত কিছুই পেল। যেমন যেমন শিখা তাঁকে বলেছিলেন, তেমন তেমনই হতে দেখলেন, অর্থাৎ অষ্টপাশের সাথে শিখা ও বেগবতীর কন্যাদের কামনার হস্তান্তর দেখলেন। যেমন যেমন বেগবতী বলেছিলেন যে, ক্রমশ সমস্ত রাজ্যকে গ্রাস করে নেবে, তেমনটাও দেখেলেন।
আবার যেমনটা শিখা বলেছিলেন যে ক্রমশ রাজ্যে প্রজা কম আর ষড়রিপু অষ্টপাশের সন্তানরাই অধিক বিরাজ করবে, তেমনটাই হতে দেখলেন। আচার অনুষ্ঠানকে ভক্তি বলা হতে থাকলো, ভেদভাবকে ধর্ম, স্বার্থপূর্তির ও ইচ্ছা চিন্তা কল্পনাকে চরিতার্থ করার কৌশল জানাই হয়ে উঠলো জ্ঞান, অবিশ্বাসই হয়ে উঠলো বিশ্বাস, আসক্তিই হয়ে উঠলো স্নেহ, আর কামনাই হয়ে উঠলো প্রেম। এই সমস্ত কিছু যে হবে, তা মানসের পুত্রীরা পূর্ব থেকেই বলে রেখেছিলেন, আর তাই তাই হলোও। কিন্তু মানস ও ধরা যে বশীকরণের শিকার।
তাঁরা তাই সমস্ত কিছু দেখেও কিছুই দেখতে পেলেন না। আর দেখতে না পাওয়ার ফল হলো, ছায়াপুরের নির্মাণ। ক্রমশ মোহিনী হয়ে উঠলো ধরাধামের একচ্ছত্র অধীশ্বর। মানসের বয়স হয়েছে, তাই তাঁকে সিংহাসন ছেড়ে দিতে বললে, তাঁর জননী সেই আদেশ দিচ্ছেন, এমন ধারণা করে, মানস সিংহাসন ত্যাগ করলেন। আর তখন থেকে বিস্তার কর্ম শুরু হলো ছায়াপুরের।
৩.১। অনীতি পর্ব
বিচিত্র এক রাজনীতির স্থাপনা করলেন মোহিনী, তাঁর সকল ভগিনীকে সঙ্গে নিয়ে, যার শুরু ও শেষ কোথায়, তা জানা বড়ই কঠিন মনে হতে থাকলো, কারণ তারা আপাদমস্তক যেন একই সূত্রের প্রকাশ, এমনই বোধ হতে থাকলো। শিশু থেকে মৃত্যুপথযাত্রী, কারুকেই ব্যতি রাখলেন না তাঁর নীতির অধীনে আবদ্ধ করতে। শুরু করলেন অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী থেকে, আর সমাপ্ত করলেন সেই অন্তঃসত্ত্বা হওয়া পর্যন্ত, প্রতিটি ধাপে।
শিশুকে গর্ভধারণ করার মুহূর্ত থেকে, শিশুকে গর্ভে ধারণ করার প্রয়াস পর্যন্ত, প্রতিটি ক্ষেত্রে কেবল ও কেবল নিজের অধীন স্থাপিত রাখলেন তিনি, যার অংশীদার করলেন নিজের ভগিনীদের, এবং তাঁরা যেই সমূহ পুরুষদের সাথে ওঠাবসা করতেন, অর্থাৎ অষ্টপাশদেরকে। আর অন্য সমূহ সকলে অযাচিত ও অজ্ঞাত ভাবেই, তাঁদের পাশে আবদ্ধ রইলেন।
মানস ও ধরা, এবং অন্যান্যদের প্রভাবে নিজেকে জগন্মাতা করে স্থাপিত রেখেইছিলেন মোহিনী, সঙ্গে সঙ্গে এও প্রচার শুরু করলেন যে, জগন্মাতা এবারে তাঁদের ছয় ভগিনীর মধ্য দিয়েই প্রকাশিতা, যার নিয়ন্ত্রণের ভার রয়েছে তাঁর অর্থাৎ মোহিনীর হাতে। আর বললেন, অষ্টপাশকে তিনিই সৃষ্ট করেছেন, যাতে তাঁর সমস্ত নিয়মের বিস্তার করা সম্ভব হয়।
এমন বলে, সমস্ত ছায়াপুরের প্রজাদের এমনই ধারণা প্রদান করে দিলেন যে, যে বা যারা মোহিনী ও তাঁর শাসক অর্থাৎ তাঁর বাকি ভগিনী ও অষ্টপাশের কথার অন্যথা করবেন, তিনি ভগবতীর কাছে দোষী হয়ে যাবেন। তাই সমস্ত প্রজা একপ্রকার নিজেকেই নিজেরা বাধ্য করলেন, মোহিনীর শাসন শুনতে, আর শুধু শুনতেই নয়, তাঁর প্রতিটি ভাষ্যকে ঈশ্বরীয় আদেশ রূপে মানতে।
আর সেই ভাষ্যের প্রথম বানী এই হয় যে, সদ্যজাত শিশু সম্পূর্ণ নির্বোধ। তাঁকে সঠিক শিক্ষা দিলে তবেই তিনি স্বতঃই জগন্মাতার শরণার্থী হবেন, আর তবেই তিনি শ্রেষ্ঠ প্রজা হয়ে উঠতে পারবেন। আর সেই শিক্ষা তাঁকে প্রদান করতে হলে, সেই শিশুর (মোহিনীর ভাষায় মেধা) অর্থাৎ কল্পনা শক্তিকে বিস্তৃত হতে হবে। তাই, অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী যেন অবশ্যই সেই সমস্ত আহার গ্রহণ করেন, যা অষ্টপাশের দ্বারা তাঁদেরকে প্রদান করা হবে।
প্রজা সেই শাসন মানতে বাধ্য, কারণ তাঁরা অন্তর থেকেই সেই নির্দেশকে ঈশ্বরীয় আদেশ জ্ঞান করেন। তাই মোহিনীদ্বারা প্রদত্ত, ও অষ্টপাশ দ্বারা বিতরণ করা আহারই গ্রহণ করা শুরু করলেন। সেই আহারের তালিকা এমনই করা হতো, যাতে করে, প্রতিটি গর্ভধারিণীর মধ্যে একত্রে, ত্রিআত্ম ভাবেরই বিস্তার হতে শুরু করে।
অর্থাৎ সাত্ত্বিক ভাব আনার জন্য মিষ্টান্ন, রাজসিক ভাব আনার জন্য তিক্ত ও মুখরোচক আহার, এবং তামসিক ভাব আনার জন্য ঝাল ও টক জাতিয় আহার প্রদান করা হলো। এতে করে, কনো একটি গুনের অধিক বিস্তার হবেনা, কিন্তু সকলের একত্রে বিস্তার হবে, আর তাই সকল আত্মভাব বিস্তারিত হয়ে আত্মচিন্তা, আত্মইচ্ছা ও আত্মকল্পনার ভাব একত্রে বিস্তার লাভ করে। এই আহার গ্রহণ করে করে, সমস্ত গর্ভধারিণী নিজেদের মধ্যে আত্মিক ভাব অর্থাৎ স্বার্থপরতার ভাব লাভ করতে থাকলেন, আর তাঁদের মাধ্যমে তাঁদের গর্ভে বেড়ে ওঠা শিশুরাও।
তবে এমন নয় যে, এই সমস্ত আহার, রাজপুর থেকে বিনামূল্যে প্রদান করা হয়। এমন নীতির স্থাপন করেন মোহিনী যে, বিনামূল্যে কনো কিছুই উপযোগী হয়না। প্রতিটি বস্তুর উৎপাদনে, উপস্থাপনে ও পরিবেশনে থাকে অনন্ত পরিশ্রম। যদি বিনামূল্যে তা গ্রহণ করা হয়, তবে সেই সমস্ত পরিশ্রমকে অপমান করা হয়, আর পরিশ্রমের অপমান মানে ভগবতীর অপমান। তাই সমস্ত কিছু যেন ক্রয় করেই প্রজা লাভ করে।
অর্থাৎ, এই আহার বিক্রয় করে, বিপুল আয় করতে থাকে মোহিনী ও তাঁর সমস্ত অনুরাগী ভগিনী ও পাশেরা, কারণ একটি গর্ভধারিণীর একদিনের আহার প্রস্তুত করতে সর্বসাকুল্যে ১০টি রজত মুদ্রা দিতে হলে, তাঁরা সেই থালকে ১০০টি রজত মুদ্রার বিনিময়ে বিক্রয় করেন।
মোহিনীনীতির তো এখান থেকে কেবল শুরু। শিশু জন্ম নেবার পর থেকে নূতন করে বশীকরণ পদ্ধতিকে স্থাপিত করা হয় সেই শিশুদের উপর। নিজের নির্মিত কাল্পনিক ব্রহ্মাণ্ড প্রদর্শন করার উদ্দেশ্যে একটি যন্ত্রের নির্মাণ করেছিলেন মোহিনীর সমস্ত দলবল, সেই যন্ত্রই ধরিয়ে দেওয়া হয় শিশুদের হাতে, ঠিক ভাবে যখন তারা কথা বলতেও শেখেনি তখন থেকে। সম্পূর্ণ কল্পনার আয়ত্ত বা ধারণা দুইই করতে পারেনা শিশুরা। তবে কাল্পনিক ব্রহ্মাণ্ড প্রদর্শনের সেই যন্ত্রই যে শ্রেষ্ঠ যন্ত্র, যাকে তাদের আয়ত্ত করতে হবে, সেই বোধ শিশুর মধ্যে প্রথম থেকেই এসে যায়, এই ধারার কারণে।
তবে এমন করার জন্য কনো নীতির উপস্থাপনা করতেই হয়নি মোহিনীদের। কেবলমাত্র সন্তানের পিতা ও মাতাকে সেই যন্ত্রের প্রতি আকৃষ্ট করে রাখতেন। এর ফলে, তাঁদের শাবকরা সর্বদাই দেখতেন, পিতামাতাকে সেই যন্ত্রের প্রতি আকৃষ্ট থাকতে। আর তাই স্বাভাবিক ভাবেই শিশুদের আকর্ষণের বিষয় হয়ে ওঠে, সেই যন্ত্রসমূহ।
নীতির বন্ধন এসে যায়, শাবকদের বিদ্যালয়ে প্রেরণ থেকে। বিদ্যালয়ে শাবকদের প্রেরণ করাতে পিতামাতার আগ্রহ নির্মাণ করাকে প্রথম প্রয়োজন রূপে চিহ্নিত করে মোহিনী। শাবক বিদ্যালয়ে প্রস্থান করলে, তাঁকে অধিক থেকে অধিক ভাবে কল্পনার পাঠ করানো যাবে, অধিক থেকে অধিক ভাবে তাঁর মধ্যে চিন্তার বীজ অর্পণ করা যাবে, আর অধিক থেকে অধিক উন্নত ইচ্ছার জন্ম দেওয়ার অবস্থায় তাঁদের উন্নীত করা যাবে।
আর যতই সেই সমূহ কর্ম সম্পন্ন ও সম্ভব হবে, ততই শিশুরা বয়োবৃদ্ধির সাথে সাথে আত্মসর্বস্ব হয়ে উঠবে, আর তাই আত্মের আধিপত্য স্থাপিত থাকবে। তাই বিদ্যালয়ে প্রেরণ শিশুদের জন্য আবশ্যক। তবে মোহিনী মায়ার বিস্তারক। নীতি নির্মাণ করে সমস্ত কিছু করাকে তিনি অপছন্দ করেন। তাই তিনি এমনই মায়া করলেন যাতে সন্তানের পিতামাতা স্বতঃই শাবককে বিদ্যালয়ে প্রেরণ করার জন্য প্রবল ভাবে উৎসাহী হন।
আর তা করতে, বিদ্যাকে বানিজ্যিকরন করে দিলেন মোহিনী। প্রতিটি ক্ষেত্রে অর্থের আবশ্যকতা, আর তাই উপার্জন পদ্ধতি আবশ্যক, আর উপার্জন পদ্ধতিতে যাত্রার জন্য, আবশ্যক করে দিলেন শিক্ষাকে। নিজের সাম্রাজ্যে, অধিক ধনবানকে সর্বোচ্চ সম্মান প্রদান করে করে, এবং সমস্ত ধনাকাঙ্ক্ষীদের উৎসাহ প্রদান করে করে, সমস্ত পিতামাতার কাছে স্বপ্ন করে দেন যে, তাঁদের সন্তান তাঁদেরকে বহু ধন ও সম্মান অর্জন করে, তাঁদের সমাজে মানকে বিস্তৃত করবে।
আর তাই প্রতিটি পিতামাতা, নিজেদের সন্তানকে বিদ্যালয়ে প্রেরণ করে, সেই ধনসম্মানের প্রতিযোগিতার দৌড়ে শাবকদের সামিল করতে তৎপর হয়ে পরেন। কিন্তু শুধু তৎপর করলেই তো মোহিনীর শান্তি নেই। সে চায়, তাঁর প্রতিটি প্রজা, ধন, সম্মান, আর ধনসম্মান লাভের উদ্দেশ্যে, চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনার দাশ হয়ে উঠুক আর আত্মসর্বস্ব হয়ে উঠুক।
যতই প্রজা আত্মসর্বস্ব হয়ে উঠবে, ততই তাঁরা নিজআত্মকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করার জন্য উপায়ের সন্ধান করবে। আর উপায় রূপে তাঁদের সম্মুখে রাখা হবে, একাধিক সামগ্রী, যাদেরকে তাদের ক্রয় করতে হবে, আর বাড়বে একে অপরের সাথে সেই সামগ্রী অধিক সঞ্চয়ের প্রতিযোগিতা। আর সেই প্রতিটি ক্রয়ের থেকে লাভ হবে বিপুল উপার্জন, যা প্রকৃতঅর্থে মোহিনী তথা সমস্ত রাজপুরের সদস্যদের অধিক থেকে অধিক ধনী করে তুলবে। আর যেই সমাজে ধনী হওয়াই লক্ষ্যবস্তু হয়, সেখান তো শ্রেষ্ঠ ধনীব্যক্তিই হলেন শাসক। তাই এই বিপুল ধন অধিকার করে করে, মোহিনী নিজেকে ও নিজের সমস্ত জ্ঞাতির হাতে সম্পূর্ণ জাতির শাসক করে দিতে সদাব্যস্ত।
তবে এমন ভাবার কনো কারণ নেই যে একাকী মোহিনী এই সমস্ত কিছুর চিন্তা করছেন। দেবী চিন্তা থাকতে এত চিন্তা করার পরার প্রয়োজন মোহিনীর হবেই বা কেন? অর্থাৎ, সমস্ত আত্মকুল এবার নিজেদের পৌত্র ও পৌত্রীদের মাধ্যমে সমস্ত জাতিকে নিজেদের অধীনে স্থাপিত করতে উদ্যত, আর সেই অধীনে স্থাপন করা উপায় হয় তাই, যা মোহিনীর মাধ্যমে রাজনীতি রূপে স্থাপিত হতে থাকে সম্পূর্ণ ছায়াপুরে।
আর এই সমস্ত কিছু সকলের দৃষ্টির অলক্ষ্যে চলতে থাকলে, এবং প্রজার এই সমস্ত কিছুর সামান্যও আন্দাজ না থাকার কারণে, কেবল মাত্র ধন ও সম্মান প্রাপ্তি করার শ্রেষ্ঠ উপায় সন্তানদের বিদ্যালয়ে প্রেরণ করা, এই ধারণা রেখে প্রতিটি পিতামাতা সন্তানকে বিদ্যালয়ে প্রেরণ করার জন্য অত্যন্ত ব্যকুল থাকা শুরু করেন।
আর তাই, মাত্র ৩ বৎসর বয়সের মধ্যে বিদ্যালয়ে প্রেরণ করে দেন শাবকদের, আর এটিই তো মোহিনী ও মোহিনীকে বুদ্ধিদাতা সমস্ত ছায়াদেবীদের এবং আত্মের পরিকল্পনা। এই শিশুকাল হলো সেই সময়, যেখানে প্রকৃতির মধ্যে খেলে বেড়ানোর ফলে, প্রতিটি শাবক প্রকৃতিকে তথা জগন্মাতা জগজ্জননী অর্থাৎ, তাঁদের প্রকৃত মাতার সম্বন্ধে জানতে পারেন।
সেই জ্ঞান লাভ করলেই, আর কল্পনার জগতে তাঁরা প্রবেশ করাতে উদ্যত হবেনা। আর সেই উদ্যোগ না থাকলে, না তাঁরা চিন্তা করতে শিখবেন, না তাঁরা ইচ্ছা প্রকট করতে চাইবেন আর না তাঁরা আত্মসর্বস্ব হয়ে উঠবেন। আর আত্মসর্বস্ব না হয়ে উঠলে, আত্মের প্রতিষ্ঠা কি করে লাভ হবে? তাই মোহিনী ও মোহিনীকে বুদ্ধিদাতাদের প্রদান উদ্দেশ্যই হয় যাতে শিশুরা প্রকৃতির মধ্যে খেলে বেড়াতে না পারে।
আর সেই কারণে শিশু অবস্থা থেকেই বিদ্যালয়ে প্রেরণ করার নীতি ধারণ করেন তাঁরা, আর মোহিনীর স্বভাব হলো মায়া বিস্তার করে কর্ম করানো, নীতি স্থাপন করে নয়। তাই পিতামাতাদেরকেই তিনি বাধ্য করতে থাকলেন শাবকদের ৩ বৎসর বয়সের মধ্যেই বিদ্যালয়ে প্রেরণ করার জন্য।
তবে বিদ্যালয়ে প্রেরণ করেই শান্তি নেই তাঁর, শাবকদের প্রথম থেকেই কল্পনার জগতে স্থাপিত করতে হবে। অজস্র ইচ্ছা ও চিন্তার মধ্যে তাঁদের স্থাপিত রাখতে হবে, তবেই না তাঁরা সেই ইচ্ছাদের পুড়ন করার উদ্দেশ্যে, অধিক ভাবে সেই বাণিজ্যিক বিদ্যার মধ্যে নিজেদেরকে লিপ্ত করবেন! তাই শুরু করলেন, প্রতিটি বিষয় যা বিদ্যার্থীদের পাঠ করানো হবে, তাদেরকে এমন ভাবে স্থাপিত করতে, যা শাবকদের চিন্তা ও কল্পনাকেই বিস্তৃত করে।
আর তাই অক্ষরজ্ঞান ও সংখ্যাজ্ঞান প্রদান করার পরে পরেই, প্রদান করা শুরু করলেন সেই ইতিহাসের পাঠ, যা অতীতের ঘটনা নয়, যা অতীতের ঘটনার বিকৃত রূপ। আর তার সাথে সাথে পাঠ প্রদান করতে শুরু করলেন সেই ভূমি বিজ্ঞানের, যা ভূমির বাস্তব বিজ্ঞানই নয়, যেই বিজ্ঞান শাবকদের কাল্পনিক করে তুলে, বহির মুখি করে তুলবে।
সেই মিথ্যা ইতিহাস ও মিথ্যা ভূমিবিজ্ঞানের পাঠ করিয়ে শিশুদের সামান্য ভাবে কল্পনার নেশা ধরিয়ে দিলে, সেই নেশাকে পূর্ণপ্রশস্তি প্রদানের উদ্দেশ্যে, এবার প্রদান করা শুরু করলেন, কল্পনার বিজ্ঞানের ভিত্তি। যতই তা কল্পনা হোক, সেই কল্পনাকে ব্যবহার করে, ছায়াপুরকে বাস্তবে যান্ত্রিক করে তুলতে হবে, এবং যান্ত্রিক করে, সমস্ত কিছুকে নিজদের নিয়ন্ত্রণে স্থাপিত রেখে, আত্মকে পরমেশ্বর রূপে ঘোষণা করতে হবে। তাই সেই কল্পশিক্ষার ভিত্তিতে কিছু সত্যতত্ত্বই রাখে।
তবে ভূমিতত্ত্বের কাল্পনিক প্রকাশের কারণে, সেই সত্যতত্ত্বও কল্পনার উদ্দেশ্যেই দিশা লাভ করে। আর এই ভাবে সম্পূর্ণভাবে, মোহিনী ও মোহিনীর মাধ্যমে সমস্ত ছায়াদেবীরা এবং ছায়াদেবীদের মাধ্যমে স্বয়ং আত্ম সম্পূর্ণ ভাবে ছায়াপুরের শিশুদের উপর শাসন স্থাপন করলেন”।
দেবী দিব্যশ্রী একাগ্রচিত্ত্বে সমস্ত কিছু শ্রবণ করতে থাকছিলেন। তাই এবার তিনি প্রশ্ন করলেন, “পিতা, আজ কৃতান্ত শ্রবণের উনিশতম দিবস। এতাবৎ আমি একটিও প্রশ্ন করিনি, কারণ আমার মনে হচ্ছিল, আপনি সমস্ত কিছু বিস্তারেই বলছেন। কিন্তু পিতা, আমি এই বিষয়ের, অর্থাৎ সেই মিথ্যা ইতিহাস, মিথ্যা ও কাল্পনিক ভূমিতত্ত্ব তথা সেই কাল্পনিক তত্ত্বের সাথে সত্যতত্ত্বকে কি ভাবে মিলিয়ে, কল্পনার জগত নির্মাণের প্রেরণা প্রদান করতেন ছায়াদেবীরা দেবী মোহিনীর মাধ্যমে, তা বিস্তারে জানতে চাই। … আমার চাওয়া কি ন্যায্য পিতা? যদি তা ন্যায্য হয়, তবে কি আমাকে সেই কথা বিস্তারে বলা যায়!”
ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “অবশ্যই ন্যায্য তোমার জিজ্ঞাসা। আর তাই আমি অবশ্যই তোমার চাওয়া পুড়ন করবো। ইতিহাসকে কি ভাবে বিকৃত করেছিলেন আত্ম ও তাঁর সেবকরা, ভূমিবিজ্ঞান নিয়ে কি রূপে মিথ্যাচার করেছিলেন, আর সেই মিথ্যাচারনের সাথে সত্যতত্ত্বকে মিলিয়ে কি ভাবে কল্পনার বিকাশকে নিশ্চয় করেছিলেন, তার বিবরণ তোমাকে এবার প্রেরণ করছি পুত্রী”।
ব্রহ্মসনাতন বলতে থাকলেন, “পুত্রী, যেই বিদ্যার প্রসার করেছিলেন আত্ম, তাকে বিদ্যা তো বলা যায় না। তাই তাকে অবিদ্যাই বললাম। সেই অবিদ্যার প্রথম পদক্ষেপই হয় মিথ্যা ইতিহাস ও মিথ্যা ভূমিতত্ত্ব প্রদান করা।
মিথ্যা ইতিহাস প্রদান করার কালে, যা কনো কালে ঘটেনি, তেমন কিছু অনর্গল বলা শুরু করলেন আত্মগোষ্ঠী, যেখানে অধিকাংশই রইল কল্পনা। সেখানে যত প্রকার দিব্যতার ভাব মাতা ব্রহ্মময়ীর প্রকাশিত ছিল, তাকে মানবীয় ভাব প্রকাশ করা হলো, আর সেই গল্পকেই ইতিহাস করে স্থাপিত করা হলো। যে যে যখন যখন আত্মের বিভূতিসঙ্গীত গেয়ে গেছেন, তাঁদেরকে মহাপুরুষ রূপে স্থাপিত করলেন, এবং তাঁদের অধিকাংশকেই শ্রেষ্ঠ বলে দাবি করতে, তাঁদের ঋষি নামাঙ্কিত করলেন।
সেখানেই সমস্ত কিছুর ইতি করলেন না, মাতা ব্রহ্মময়ীর যেই যেই প্রশস্তিগীতির গায়ক ছিলেন, তাঁদেরকে আত্মের সঙ্গীত গাইবার জন্য যেই যেই ভাবে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে, সেই সমস্ত কথাকে ইতিহাসের পাতা থেকে অপসারিত করলেন, আর যতপ্রকারে তাঁরা মাতার সঙ্গীত গেয়েছেন, সেই সকলকিছুর নথি জ্বালিয়ে দিয়ে, তা ইতিহাস থেকে নিশ্চিহ্ন করতে শুরু করলেন।
অন্যদিকে, যেই সকল পঞ্চবিংশতিতত্ত্ব মনোভূমিতেই বিরাজ করেন মাত্র, তাঁদেরকে মানবীয় রূপ প্রদান করে, তাঁদের সাথে সাখ্যাত করার কাল্পনিক কথাকে তাঁরা ইতিহাসের পাতায় স্থাপন করা শুরু করলেন, আর সেই সমস্ত কথার মাধ্যমে, এই ভাব প্রকাশ করতে শুরু করলেন সকল প্রজার কাছে যে, তাঁরা অত্যন্ত শ্রেষ্ঠ, তাঁরা স্বয়ং জগদম্বার অংশপ্রকাশ, তাই সকল তত্ত্ব তাঁদের সম্মুখে মানবীয় বেশে উপস্থিত হয়ে কথোপকথন ও কীর্তিকলাপে লিপ্ত হন।
যখন এই সমূহ কিছুর বাড়বাড়ন্ত চলছে সম্যক ছায়াপুরে, তখন বেশ কিছু জ্ঞানী সাধু গোপনে মহারাজ মানসের সাথে সাখ্যাত করতে এলেন, এবং বললেন, “মহারাজ মানস, এ আপনারা রাজ্যে কি হচ্ছে? এখানে যে মিথ্যা প্রচার হয়ে চলেছে অনুক্ষণ, যা ঘটেনি, তাকে ঘটেছে বলে দাবি করা হচ্ছে, আর যা ঘটেছে, তাকে ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে ফেলার প্রয়াস করা হচ্ছে। আপনি কিছু করছেন না কেন?”
মানস হেসে বললেন, “দেখুন মহাশয়রা, আপনারা সাধু, তাই ঠিক ঠিকই জানেন যে মোহিনীই হলেন মাতা ব্রহ্মময়ীর পরবর্তী প্রকাশ আর এবার তিনি সমস্ত চক্রান্ত থেকে মুক্ত থাকার জন্য, নিজেকে বহু গুরু অংশে ও লঘু অংশে অর্থাৎ মোহিনীর ভগিনী, ও পাশদের বেশে এসেছেন, যাতে করে আর কারুকে অংশগ্রহণ করতে না হয়, আর কেবল তিনি একাকীই সমস্ত কিছুকে গুছিয়ে নিতে পারেন।
সাধুগন আমার কর্ম ততক্ষণ ছিল, যতক্ষণ মাতার পুনরায় আবির্ভাব না হয়। তা যখন একবার হয়ে গেছে, তখন আমার আর কিই বা ভূমিকা। আমি এখন পূর্বের ন্যায়, পুনরায় মাতার লীলার দর্শক মাত্র। … তাই যদি কিছু বলারই হয় আপনাদের, তাহলে স্বয়ং মাতাকে, মানে আপনারা যাকে মোহিনী বলেন, তাঁকে গিয়ে বলুন”।
সাধুরা নিজেদের মধ্যে সেই কথা শুনে হতাশ হয়ে বলাবলি করতে শুরু করলেন, “মানস মাতার নিজের পুত্রসমান ছিলেন। তিনিই যদি মোহিনীর মায়াতে বদ্ধ হয়ে যান, তাহলে আর যে ছায়াপুরের কনো ভবিষ্যৎই অবশিষ্ট থাকেনা। এঁদেরই মধ্যে এক সাধু বললেন, “এমন হতাশ না হওয়াই উচিত আমাদের জন্য এই ক্ষণে। মাতা অবশ্যই আসবেন, মানসের হাত ধরে আসবেন না, তো তাঁর বংশের কারুর হাত ধরে আসবেন। … হে সাধুগন, মানসপুত্রী, মেধা রাজপুরের থেকে দূরে, ত্রিবৃক্ষতলে অবস্থান করেন। একবার তাঁর কাছে আমাদের কথা নিয়ে উপস্থিত হলে কেমন হয়?”
সকলে সম্মত হলে, রাত্রের অন্তিম প্রহরে, মেধার কাছে তাঁরা গোপনে উপস্থিত হলে, মেধা তাঁদের সমস্ত কথা শুনে বললেন, “সাধুগণ আপনারা বিচলিত না হয়ে, যা এক্ষণে করা আবশ্যক, তার দিকে মনোনিয়োগ করুন, এই আমার আর্জি। … ইতিহাসকে বিকৃত করার প্রয়াস চলছে, তত্ত্বদেরকে মানবীয় রূপ প্রদান করে, আত্মপ্রশস্তিকে গীত রূপে স্থাপিত করা হচ্ছে। তাই আপনাদের কর্ম, এর প্রতিবাদ না করে, এই ধারার মধ্যেই নিজেদেরকে স্থাপিত করে, তত্ত্বদেরকে মানবীয় প্রকাশে স্থাপিত রেখেই, মহাকাব্য নির্মাণ করা, যাতে তত্ত্বদের, আত্মের ও মাতার প্রকৃত ইতিহাসকে গুপ্ত ভাবে স্থাপিত করে রাখতে পারেন আপনারা”।
এক সাধু বললেন, “এ কি বলছেন দেবী? যা অন্যায়, তার প্রতিবাদ না করে, তার পক্ষে চলে যাওয়া, এ যে অন্যায়!”
মেধা মৃদু হেসে বললেন, “সাধুগন, আপনারা সাধু। সাধু হয়েও ন্যায় অন্যায়ের মধ্যে নিজেদের বন্দী করে রেখে দিয়ে, অন্যায়কে প্রশ্রয় দিয়ে যাবেন! বিচার করে দেখুন সাধুগণ, কার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবেন! কার কাছে প্ররতিবাদ করবেন? যেই রাক্ষসের কর্মই প্রকৃতির হত্যা করা, তার কাছেই আপনি হত্যা করার প্রতিবাদ করতে চলেছেন? সাধুগন, যেই পথে চলে লক্ষ্যপ্রাপ্তি সম্ভবই নয়, সেই পথে চলা কতটা যুক্তিযুক্ত, আপনারাই বলুন?
সকল সাধু মাথা নত করে থাকলে, মেধা পুনরায় বললেন, “সাধুগণ, কি করলেন, তার থেকেও অধিক গুরুত্বপূর্ণ হলো, কেন তা করলেন। প্রতিবাদ করে, ফল তো আপনারা কিছু পাবেনই না। কিন্তু আপনাদের চিন্তা বিষয় কি? কনো প্রতিবাদ হচ্ছেনা, এইটিই? যদি এইটিই হয়, তাহলে ক্ষমা করবেন আপনাদের বাঁধা দেবার জন্য, আপনারা প্রতিবাদ করতে পারেন। …
আর যদি চিন্তার বিষয় এই হয় যে, কাল মাতা জাত হলে, তিনি নিজেকে মাতা রূপে সনাক্ত করবেন কি করে, যেখানে ইতিহাসাদি গ্রন্থসমূহই এমন বিকৃত, তাহলে তার নিদান করুন, প্রতিবাদ নয়। সাধুগন, ব্যঘ্র হরিণের থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী। কিন্তু হরিণের সামর্থ্য তার গতি। সেই ক্ষিপ্রগতির হরিণ শিকার করতে, ব্যঘ্রকে ঘাসের পিছনে লুকাতে হয়, এবং হরিণের সাথে দূরত্ব কমাতে হয়।
মহাশয়রা, আপনারা যদি হরিণের সাথে দূরত্ব এমন ভাবে বাড়াতেই থাকেন, তাহলে যে হরিণকে কখনোই শিকার করে উঠতে পারবেন না। এবার আপনারাই বলুন, ব্যঘ্র যে নিজেকে আবৃত করে রাখে ঘাসের মধ্যে, তা কি অন্যায়! … নিজের পেটের দায়ে কিছু করা কখনো অন্যায় হয়না দেব! … বিচার করে দেখুন”।
সাধুগণ বিচার করে বললেন, “সঠিক বলেছেন দেবী, কিন্তু মার্গ কি হবে? আমাদের করনিয় কি হবে?”
দেবী মেধা মৃদু হেসে বললেন, “দেব, এই ইতিহাস হলো সেই ঘাস, আর আপনাদের জ্ঞান হলেন ব্যঘ্র। সেই ব্যঘ্রকে এই ঘাসের অন্তরালে লুকিয়ে দিন, মোহিনী যেই পোশাক নির্মাণ করেছে জ্ঞানীদের জন্য, সেই পোশাকই ধারণ করুন, এবং ঋষি হয়ে উঠুন। ঋষি হয়ে, সত্যরূপে যা তত্ত্বকথা, তাকেই মানবীয় রূপ প্রদান করে, পরিবেশন করুন। মোহিনী ও তাঁর সাথে যারা যুক্ত, তাঁরা দেখবেন, তাঁদের নির্মাণ করা উপায়ই কার্যকরী হচ্ছে, তাই অহমিকায় স্নান করবে, অথচ, আপনারা সেই উপায়ের মধ্যেই সত্যরূপে তত্ত্বকথাকে অঙ্কিত করে যাবেন।
সমাজে যা দেখছেন, অর্থাৎ আত্ম ত্রিছায়াদেবীর প্রভাবে এসে তিন প্রকারে ব্যবহার করে, ত্রিসন্তান ধারণ করেছেন, তাই বলুন কিন্তু ভুলেও আত্মের নিন্দা করবেন না। তাঁদেরকে দেবের আসনে স্থিত করুন, কিন্তু সেখানে স্থাপন করিয়ে দেখান যে, তাঁরা কতটা লাচার আর যখন যখন তাঁরা লাচার হয়ে যান, তখন তখন মাতার উদয় হয়, তাঁদের সুরক্ষিত করার জন্য। সাধুগণ, আত্মের প্রশস্তিগীতিও গাইলেন, আবার মাতার জাগরণের সূত্রও অঙ্কিত করে গেলেন।
দেব, মাতার জাগরণই উদ্দেশ্য, তাই সেই দিকেই মনোনিয়োগ করা উচিত হবে বলে আমার মনে হয়। অহেতুক প্রতিবাদের ফলে, এঁরা সতর্ক হয়ে যাবে, আর তাই এঁরা মাতার জাগরণের সমস্ত পথকে বন্ধ করা শুরু করে দেবেন। যদি মাতার জাগরণকে নিশ্চিত করতে চান, তাহলে এঁদের সাথে মিশে যান, আর মিশে গিয়ে, এঁদেরই ষড়যন্ত্রের মধ্যে স্থিত হয়ে, এঁদের সাথে ষড়যন্ত্র করুন। ন্যায় স্থাপনের জন্য করা সমস্ত অন্যায়ও স্বতঃই ন্যায় হয়ে যায় সাধুগন। নিজেদের কর্মের উদ্দেশ্য ন্যায়স্থাপন রাখুন। সময় যেই পথে চালিত হচ্ছে, সেই পথেই চলমান থাকুন, উদ্দেশ্য নিজেদের রাখুন, দেখবেন এক না এক সময়ে, সঠিক গন্তব্য স্থলে ঠিকই পৌঁছে যাবেন”।
এক সাধু সম্মুখে এসে বললেন, “দেবী, অত্যন্ত উপকৃত হলাম, আর সব থেকে বড় কথা, আপনি আমাদের হতাশা দূর করে দিলেন। … আমরা তো হতাশই হয়ে গেছিলাম যে, মাতা কার গর্ভে আসবেন! … সমস্ত স্ত্রীই যে মোহিনীর মায়াতে বদ্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু দেবী, আপনাকে এমন রূপে দেখে, আমরা নিশ্চিন্ত হলাম যে, মাতার পদার্পণের স্থান এখনো সমাপ্ত হয়নি। … তবে দেবী, একটি বিষয়ে আপনাকে বলতে আগ্রহী আমরা।
দেবী, এই সংগ্রাম একাকী আপনি কেন লড়ছেন! রাজা মানস, তাঁর ধর্মপত্নী দেবী ধরা, আপনার ভগিনীরা, সকলকে আপনি নিজের সাথে পেতে পারেন। কিন্তু তার জন্য যে তাঁদের মায়া থেকে মুক্ত হওয়া আবশ্যক। তাঁরা যে সম্পূর্ণ ভাবে মোহিনীর মায়াতে আবদ্ধ!”
মেধা হেসে বললেন, “সাধুগন, পিতা বলতেন, মাতা তখনই আবির্ভূতা হন, যখন তাঁর আবির্ভাব আবশ্যক হয়ে যায়, আর তিনি বলতেন যে মাতা ঈশ্বরী, তিনিই সত্য, কিন্তু তাঁর কাছে নিজের শ্রেষ্ঠ পরিচয় হলো যে তিনি মাতা। ঈশ্বরী সাজতে তিনি লালায়িত নন, মাতা হয়ে থাকতে তিনি অধিক পছন্দ করেন। মাতৃত্বই তাঁর নেশা। আর এক মাতার জন্য সাধুগণ, সন্তানের পীড়াই সর্বাধিক বেদনার বিষয়।
সাধুগণ, এখনো মোহিনী নিজের কর্ম সম্পন্ন করেনি, নিজের সম্পূর্ণ মায়ার বিস্তার করেনি। তাই এখন যদি তাঁর ভান হয় যে, রাজা মানস ও তাঁর পরিবার, ও তাঁর সাথে তাঁর প্রজারা তাঁর বিরোধ করতে চলেছেন, তাহলে তিনি তাঁদের বন্দী করবেন না, বরং নিজের মায়ার ধারাকে বদল করে, এঁদের পুনরায় বশীকরণ করবেন।
দেব, তাই এখন আবশ্যক, মোহিনীকে মায়ার বিস্তার করতে দেওয়া। যখন তাঁর সমস্ত মায়ার বিস্তার সম্পন্ন হয়ে যাবে, তখনই তাঁর সম্মুখে গিয়ে, সে যে মাতা নয়, তা প্রমাণ করে, রাজা মানস ও তাঁর সমস্ত পরিবার ও প্রজাকে তাঁর বিরোধী করে দেওয়া আবশ্যক হবে। … কারণ, তখন যদি ছায়াসাম্রাজ্যের কেউ বিরোধ করে, আর মায়ার পরিবর্তন সম্ভব হবেনা। আর তাই তখন তাঁরা রাজা মানস ও তাঁর সম্পূর্ণ পরিবার তথা প্রজাদের বন্দিনী করবেনই”।
এক সাধু বললেন, “আপনি নিজেরই পরিবারকে বন্দী অবস্থায় দেখতে চান!”
মেধা হেসে বললেন, “ওই যে বললাম দেব, ন্যায়ের উদ্দেশ্যে করা প্রতিটি কর্মই ন্যায়। … যখন মাতার সন্তান বেদনায় ছটফট করবেন, তখন যে মাতাকে আবির্ভূত হতেই হবে। … হ্যাঁ, আমি জানি যে আপনারা আমার এই কৃত্যকে বলবেন মাতার সাথে করা ছল। … সত্যই বলবেন আপনারা, আমিও মানি যে এই কৃত্য মাতার সাথে করা ছল। এই ছলরূপ কর্ম যে কর্মফল শূন্য যাবেনা, তাও আমি জানি। কিন্তু আমি প্রস্তুত দেব, এই কর্মফল ভোগ করার জন্য আমি প্রস্তুত।
কিন্তু এই কর্মের ফলস্বরূপ যে, আমাদের মাতাকে আমরা লাভ করবো! তাই কঠিন দণ্ড ভোগ করতে আমি রাজি, কিন্তু মাতার আবির্ভাব আমার কাছে অধিক কাম্য। হ্যাঁ, আপনারা সঠিক। মাতার আবির্ভাব সকলের জন্য খুব আবশ্যক। কিন্তু তিনি যেমন মাতা হতেই ভালো বাসেন, আমিও তেমন সন্তান হতেই ভালো বাসি। তিনি ছাড়া যে আমি অনাথ দেব। তাঁকে ছাড়া আমি জীবিত থাকতেই চাইনা।
তাই তাঁকে আবির্ভূতা করার জন্য যদি আমাকে দণ্ডও লাভ করতে হয়, আমি প্রস্তুত তা ভোগ করতে, কিন্তু তাঁর স্নেহচুম্বনের জন্য আমি লালায়িত। জন্ম থেকে পিতার কাছে, তাঁর কথা শুনে এসেছি, আর তাই ছোট থেকে, আমার একটিই স্বপ্ন, তাঁর সান্নিধ্য লাভ, তাঁর আলিঙ্গন, তাঁর আলিঙ্গনে আত্মহারা হয়ে যাবার ভাব। … স্বার্থপরের মত শোনাচ্ছি, আমি জানি, কিন্তু সত্য তো সত্যই নাথ। … আমি যে মাতার আলিঙ্গন লাভের জন্য স্বার্থপরই, এই যে সত্য।
তাই মাতার আবির্ভাব আমার কাছে আশা নয়, আমার কাছে কর্ম, আমার কাছে আমার জীবনের একমাত্র ব্রত। … তাই দেব, প্রতিবাদ আমি করবো, সঠিক সময়ে করবো, তবে মাতার আবির্ভাবকে নিশ্চিত করার জন্য করবো”।
সাধুগন বললেন, “বুঝে গেছি দেবী। আপনি আমাদের কাছে স্বার্থান্বেষী নন, আপনি যে সাখ্যাত ভক্তি হয়ে বিরাজ করছেন। নিজের সম্পূর্ণ জীবনকে, সমস্ত সুখচিন্তাকে, সর্বস্ব কিছুকে ত্যাগ করে বসে আছেন মাতার জন্য। … আপনার প্রত্যয় আমাদের নিশ্চিত করেছে যে, মাতা আসবেন, শীঘ্রই আসবেন। আর তাই, আপনি যেমন যেমন আমাদের করতে বললেন, আমরা তেমনই ভাবে, ব্যাঘ্র হয়ে ঘাসের অন্তরালে লুক্কায়িত হওয়া শুরু করবো।
এখন আমাদের প্রস্থানের অনুমতি প্রদান করুন। আর কৃপা করে, আপনার সাথে প্রায়শই সাখ্যাতেরও অনুমতি প্রদান করুন। … মাতা তো সশরীরে নেই এক্ষণে, তবে ওই যে বলে না, ভক্তই ভগবানের প্রতিবিম্ব, দেবী আপনার সাথে এই স্বল্পক্ষণের সাখ্যাত আমাদের কাছে সেই কথাকে সত্য রূপে প্রতিপন্ন করে দিয়েছে। আমরা আপনার নয়, মাতারই আবেশকে হৃদয়ে ধারণ করে প্রস্থান করছি এক্ষণে। তিনি যদি জগন্মাতা হন, দেবী, আপনি তাঁর জননী। ধন্য আপনার ভক্তি আর আপনার নিষ্ঠা”।
সাধুরা প্রস্থান করলে, দেবী মেধা পুনরায় বৃক্ষতলে উপস্থাপন করলেন। কিন্তু ক্রমশই এবার সেই সাধুদের নির্মিত ইতিহাসের পত্রিকা সম্মুখে আসতে থাকলো, যাদেরকে পুরাণ রূপে সকলে সনাক্ত করতে থাকলো। মোহিনীর মায়াও সেই মায়াকে ধরতে পারলো না, আর তাই সেই পুরাণসমূহই ইতিহাস রূপে স্থাপিত হতে শুরু করলো ছায়াপুরে।
তবে এমন ভাবার কনো কারণ নেই যে অবিদ্যা ছায়াপুর থেকে অপসারিত হলো। সাধুরা তত্ত্বের কথা জানতেন। তাই পুরাণের বেশে, মোহিনীর প্রসারিত ইতিহাসের মধ্যেই প্রকৃত তত্ত্বকথাকে আচ্ছাদিত করলেন সাধুরা। কিন্তু ভূমিতত্ত্ব যে তাঁরাও সঠিক করে জানতেন না। তাই মোহিনীর সেই মায়াকে আচ্ছাদিত করতে পারলেন না সাধুগন।
তাই ভূমিতত্ত্বের নামে মায়াপ্রসার চলতেই থাকলো মোহিনীর। মাধ্যম ছাড়া যেই তাপশক্তির প্রসার সম্ভবই নয়, মহাশূন্য মাধ্যম না হয়েও মাধ্যম হয়ে যায়, তাঁদের মিথ্যাতত্ত্বে। আর সেই তত্ত্বের অনুসারে, ধরিত্রী সূর্য থেকে তাপ লাভ করে। ধরিত্রীই নাকি সূর্যের চারিপাশে প্রদক্ষিণ করে করে তাপ সংগ্রহ করতে থাকে। আর সেই তাপ থেকেই নাকি বায়ুর রচনা আর ধরিত্রীতে তাপ ও পবনের লীলা।
এহেন কথাতে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন দেবী শিখা তথা বেগবতী। আর ক্ষিপ্ত হয়ে, প্রতিবাদ করার ইচ্ছা প্রকট করলে, দেবী বেগবতী বললেন, “দিদি, কিছু করার আগে, একবার আমাদের মেধার সাথে কথা বলে নেওয়া সঠিক হবে। যেই সংগ্রামে আমরা লিপ্ত হতে চাইছি, সেই সংগ্রামে মেধা বহু পূর্ব থেকেই লিপ্ত। তাই তাঁর সাথে একবার বিচার পরামর্শ না করে, অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করা সঠিক হবেনা”।
দেবী শিখা সম্মত হলে, রাত্রের অন্তিম প্রহরে, দেবী মেধার কাছে দেবী শিখা ও দেবী বেগবতী উপস্থিত হলে, দেবী শিখাকে দেখে মেধা আপ্লুত হয়ে আলিঙ্গন করে বললেন, “কতকাল পরে তোমাকে দেখলাম দিদি! … প্রশ্ন করে বিব্রত করবো না যে কেমন আছো, কারণ আমি জানি তোমরা ভালো নেই। ভালো থাকলে, তোমরা আমার কাছে আসতেই না”।
শিখা বললেন, “এমন কথা নয় মেধা। মাতাকে আমরা দেখিনি, কিন্তু তোকে দেখেছি আমরা। আমার কাছে তো তুইই শেষ আশা মাতার আবির্ভাবের হেতু। আমার কাছে তুইই মাতার প্রতিবিম্ব। মেধা, যাদের আমি গর্ভে ধারণ করেছি, সেই অসুরদের জন্ম দেবার জন্য আমি লজ্জিত। তুই আমাকে সতর্ক করেছিলিস, আত্মপুত্রদের সাথে মেলামেশার করার সময়ে, আমি শুনিনি তোর কথা। আর তার পরিণাম যখন আজকে দেখি, তোর সামনে এসে দাঁড়াতে লজ্জা লাগে আমার। কি করে তোর চোখে চোখ রাখি, তা আমার বোধগম্য হয়না, মনে হয় যেন, আমি চিরকালের জন্য তোর কাছে অপরাধী হয়ে গেছি!”
দেবী মেধা বললেন, “দিদি, হতে পারে তুমি ভুল করেছ, হতে পারে তুমি যা করেছ, তার জন্য তুমি নিজেই আজ লজ্জিত। কিন্তু তার কারণে কি এটি ভুল হয়ে যায় যে, আমি তোমার কাছে কন্যাসমা! … দিদি, পিতা আমাকে আশকারা দিতেন, তাই মাতা আমার প্রতি সামান্য বিরূপই থাকতেন। কিন্তু সেই কালে যে, তোমাকেই মায়ের আসনে স্থিতা করেছিলাম দিদি! …
বেগদিদি আমার কাছে এসেছিলেন, তিনি বলেছিলেন আমাকে যে তুমি আমার প্রতি রুষ্ট নও, আমার হৃদয় খানিক হালকা হয়েছিল, কিন্তু প্রাণ তোমাকে দেখার জন্য ছটফট করতো। … যাইহোক, সময় আমাদের কাছে কম, তাই এই সমূহ কথাতে কালকে বৃথা ব্যয় না করে, বলো দিদি, কিসে তুমি ব্যথিত? সূর্যের কারণে ধরিত্রী তাপ লাভ করে, এই কথাতে?”
দেবী শিখা আচম্বিত হয়ে বললেন, “তারমানে সর্বক্ষণ তুই মোহিনীর কীর্তির উপর নজর রাখছিস! … বেশ তাহলে বল, এর অর্থ কি? মাতা তাপ আমার থেকে লাভ করেন, আমি তাঁর অন্তরে স্থিতা হয়ে তাপ সঞ্চার করি, আর সেই থেকেই সমস্ত ধরিত্রীতে তাপের সরবরাহ, আর সেই তাপের প্রভাবে বেগবতীর আবির্ভাব, এমনকি তোরও। …
আচ্ছা তুইই বল, যদি সূর্য থেকেই তাপ পেত ধরিত্রী, তাহলে পাহারের চূড়ায় শীতলতা কেন? সেই শীতলতা তো সমুদ্রতট হতো, কারণ সূর্য থেকে সেই তো সব থেকে দূরে স্থিত! যদি সূর্য থেকেই সমস্ত তাপ পেত ধরিত্রী, তাহলে মধ্যধরিত্রীতে বরফ কেন? মোহিনী তো এমিন বলছে যে, ধরিত্রী উপর দিকে ব্যাকা, সূর্যের দিকে, তাহলে তো উত্তর ও দক্ষিণ মেরু ছাড়া কোথাও এককুচো বরফ থাকারই কথা নয়!”
বেগবতী এবার বললেন, “শুধু কি তাই! মোহিনী বলছে, বিপুল অর্থ খরচ করে মহাশূন্যে পারি দিয়ে অন্য গ্রহতে যাত্রা করছে নাকি ওরা! … যেই মহাশূন্যে একটি সামান্য বায়ুকণা থাকতে পারেনা, একটি সামান্য অগ্নিশিখা প্রজ্বলিত হয়না, একটি সামান্য ধাতুর দানা স্থাপিত থাকতে পারে না, মুহূর্তের মধ্যে সেই সমস্ত কিছু নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, সেখানে নাকি তাঁর ধাতু নির্মিত যন্ত্র যাত্রা করতে থাকে। … এই সমস্ত মিথ্যাপাঠ প্রদান করে করে, সমস্ত শিশুদের বিভ্রান্ত করতে চাইছে ও”।
শিখা প্রশ্ন করলেন, “কিন্তু কেন মেধা! … কি লাভ ওর এই সমস্ত কিছু করে?… মিথ্যার পর মিথ্যা! … বেগ দেখেও এসেছে, সেই স্থানকে, যেই স্থানে এই সমস্ত আকাশযান নিয়ে নাটক নির্মাণ করা হয়, আর তা সকলকে দূরদর্শনের মাধ্যমে দেখিয়ে প্রমাণ দেওয়া হয় যে তাঁরা মহাকাশে যাত্রা করছে। কিন্তু কেন এই সমস্ত কিছু? সেটাই আমার মাথায় ঢুকছে না মেধা!”
মেধা হেসে বললেন, “সমস্ত খতে ওরা প্রজার থেকে অর্থ নিচ্ছে, যদি এমন কিছু না দেখায় যেখানে বিপুল অর্থ খরচ হচ্ছে, তাহলে প্রজা যদি প্রশ্ন করে যে, এতো অর্থ কিসে খরচ হলো, তার উত্তর কি দেবে! … সেই উত্তর দেবার জন্য এই নাট্য। ব্যাপারটা বোঝো, মোহিনীদের অন্তরে লুণ্ঠনভাব থাকলেও, অত্যাচারের মাধ্যমে জোর করে সেই লুণ্ঠন করাতে বিশ্বাসী নয় তারা। কেন জানো?
কারণ অত্যাচারী সম্রাট হতে পারে, ভগবান নয়। ওর ভগবান সাজার লোভ জেগেছে। তাই অত্যাচার নয়, মোহে আচ্ছন্ন করছে সকল প্রজাকে। আমি, আমিত্ব, আমিই শ্রেষ্ঠ, আমিই সর্বোত্তম, আর তাই আমিই ভগবান, এই হলো মোহিনীদের ভাবধারা। তাই ওরা অত্যাচারী নয়, ওরা মিথ্যাচারী।
আর সেই কারণেই, সর্বস্তরের শিক্ষায়, তারা সেই কথাই বলে চলেছে। প্রমাণ করতে ব্যস্ত সে যে, সেই সর্বজ্ঞাতা। যা জানে সে, তা তো বলছেই, আর যা জানে না, সেই ক্ষেত্রে মনগড়া কল্পনাকে সাজিয়ে সাজিয়ে বলে চলেছে। ব্যাপারটা বোঝো, আর প্রত্যক্ষ করো দিদি, ওরা নিজেদের শাসন সর্বত্র স্থাপন করতে ইচ্ছুক, কিন্তু তা প্রজা কখন করতে দেবেন, যখন তাঁদেরকে ভগবান বা ভগবানতুল্য মানবেন, তাই না!
সেই কারণেই তো এমন দেখাতে ব্যস্ত তারা যে, সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডের উপর তাদের নিয়ন্ত্রণ স্থাপিত, তারাই সর্বেসর্বা এই ব্রহ্মাণ্ডের। তেমনটা দেখাতেই এই সমূহ মিথ্যা প্রচার, আর তারাও জানে যে সমস্ত কিছু মিথ্যা প্রচার, আর তাই সেই সমূহকে প্রমাণ করার জন্য, বেগবতী দিদি যা দেখেছে, সেই মহাকাশজানের নাট্যের বিবরণ। আর সেই সমূহকিছুকে সমস্ত শিশুদের পাঠ করিয়ে করিয়ে, আত্মবাখান করা, আর সেই আত্মবাখানের জন্য, প্রজা স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে নিজেরাই তাঁদের গুলাম হয়ে যাচ্ছে।
এখন উত্তেজিত হবার সময় নয় দিদি, সমস্ত কিছু দেখতে থাকো। অবিদ্যার স্থাপনের মাধ্যমে, কেবলই গুলাম নির্মাণ করা শুরু করেছে ওরা। যন্ত্রের নির্মাণ করেছে, আর সেই যন্ত্র দ্বারা এবার এরা প্রমাণ করবে যে, এঁরা মৃত্যুকে আটকাতে সক্ষম, জন্মকে সুরক্ষিত করতে ও নিয়ন্ত্রন করতে সক্ষম, আরো অনেক কিছু।
আর একবার তা প্রমাণ করা হয়ে গেলে, নিজেদেরকে ভগবানের আসনে স্থিত করে, এঁরা সকল প্রজাকে নির্দেশনা দিতে থাকবে, কি করা উচিত আর কি নয়। সম্পূর্ণ স্ত্রীজাতিকে এমন ভাবে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসবে তখন এঁরা, যেখানে এঁদের প্রযুক্তি ছাড়া স্ত্রীরা গর্ভবতী হতেই পারবেন না। এমন অবস্থায় নিয়ে আসবেন প্রজাকে যে, এঁদের প্রযুক্তি ছাড়া তাঁরা আহার পাচনই করতে সক্ষম থাকবে না। আর এই ভাবে, সমস্ত প্রজাকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসে, নিজেকে সর্বেসর্বা বলে ঘোষণা করবে।
এঁরা প্রজার মধ্যে ইতিমধ্যেই এই ভাবের বিস্তার করে দিয়েছে যে, স্ত্রীপুরুষ মিলে সঙ্গম করো, কিন্তু সেই সঙ্গমের থেকে কেবল সুখ লাভ হবে, সন্তান লাভ হবেনা। এই ভাবে তারা সমস্ত প্রজাকে সঙ্গমসুখের নেশায় আপ্লুত করা শুরু করেই দিয়েছে। এবার ক্রমশ, সমস্ত কিছুকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে স্থাপিত করবে তারা। সকল প্রজা তাঁদের দয়াদাক্ষিণ্যে জীবন যাপন করবে। আর তাই নিজেদেরকে তাঁরা ভগবান রূপে স্থাপন করবে”।
দেবী শিখা এবার উত্তেজিত হয়ে বললেন, “আর এই অন্যায় দেখেও, আমরা মুখ বন্ধ করে থাকবো? কিচ্ছু করবো না!”
মেধা হেসে বললেন, “দাঁড়াও দিদি, আগে নিজেদের ভগবান রূপে দাবি করতে দাও তাঁদেরকে। একবার তা দাবি করে নিলে, প্রজার চোখে সে হয়ে যাবে অজেয়। তখন তাঁকে সম্যক যুদ্ধে আবাহন করে, পরাস্ত করে দিলে কি হবে? তাঁর এতদিনের পরিশ্রম সমস্ত বৃথা চলে যাবার আশঙ্কা জন্ম নেবে তার মধ্যে। দিদি, তখন কিন্তু ওরা আমাদের পিতা, ও তাঁর সমস্ত পরিবার ও তাঁর প্রতি একনিষ্ঠ প্রজাদের বন্দী করার প্রয়াস করবে।
দিদি, আমাদের পিতা ও মাতা অত্যন্ত দায়িত্ববান। তাঁরা যখন দেখবেন যে তাঁদের কারণেই প্রজা বিভ্রান্ত হচ্ছিল, আর তাঁদের কারণেই প্রজা বন্দী হবার প্রয়াস করছে, তখন তাঁরা প্রজার হাত ছেড়ে দেবেন না। অন্তিম মুহূর্ত পর্যন্ত প্রয়াস করবেন যাতে অধিক থেকে অধিক প্রজাদের মুক্ত করা যায়, এঁদের বন্ধন থেকে। আর সেই মুক্ত করার প্রয়াসের ফলে, পিতা, জননী, সকলে এঁদের বন্দী হয়ে যেতে পারে। আমাদের তিন ভগিনীকে মুক্ত থাকতে হবে, কারণ যেই প্রজাদের পিতামাতা মুক্ত করবেন, তাঁদের সুরক্ষার ভার আমাদেরই।
তাই দিদি সেই দিনের জন্য প্রস্তুত থেকো। আবেগের ঘনঘটাতে সেদিন প্রবাহিত হয়ে যেও না। আমাদের মুক্ত থাকতেই হবে, আর প্রয়োজনে তোমাদের পুনরায় বিবাহ করতে হবে দিদি”।
বেগবতী ব্যথিত চিত্তে বললেন, “আত্মপুত্রদের সঙ্গমদাসী ছিলাম, এটা জেনেও, আমাদেরকে কে আবার বিবাহ করবে মেধা! কে আমাদের এই ঘৃণ্যসন্তানদের জন্ম দেওয়ার ক্লেশ থেকে মুক্ত করে, রত্নগর্ভা করবে আবার! … জননী হয়েছি আমরা, কিন্তু এমন সন্তানের জন্ম দিয়েছি যে, তাঁদের নাম উচ্চারণ করতেও আমাদের রুচিতে বাঁধে! … এমন হতভাগ্য জননীদের কে উদ্ধার করবে মেধা!”
মেধা এগিয়ে গিয়ে বেগবতীর স্কন্ধ আকর্ষণ করে আলিঙ্গনসুখ প্রদান করে বললেন, “আছে দিদি, তোমাদের দুইজনের অপেক্ষায় দুইজন রয়েছেন। সঠিক সময়ে, তাঁরা তোমাদের রক্ষাও করবেন, আর বিবাহও। তাঁরাই তোমাদেরকে রত্নগর্ভা করবেন, দেখে নিও। … দিনের আলো ফুটলো বলে। এবার তোমাদের প্রস্থান করা উচিত। যাও দিদিরা, আমরা কি পরিকল্পনা করে রেখেছি, তার ভানও যেন না থাকে মোহিনীদের কাছে”।
