সর্বাম্বা কাণ্ড (কৃতান্ত প্রথম কাণ্ড)

মোহিনী ও মদিনার ক্রমে বয়োবৃদ্ধি হতে থাকলো, আর সঙ্গে সঙ্গে লিপ্সা, ঈর্ষার, কামনার তথা  রাজ্ঞীর, ও তাঁদের গুঞ্জনে নিস্তব্ধপ্রায় ধরাধামের রাজপুর গুঞ্জনে ভরে উঠতে থাকলো। সব থেকে বড় কথা হলো, শিখা ও বেগবতীর এই ছয় কন্যার প্রভাব সমস্ত রাজপুরের সকল সদস্যের মধ্যে অত্যন্ত অধিক হতে দেখা গেল। মেধা কেবল রাজপুরের বাইরেই থাকেন, ত্রিবৃক্ষের নিম্নতলই তাঁর নিবাসের স্থান হয়ে উঠেছে।

ধরাধামের সকলে তাঁকে সাধ্যি নামই প্রদান করে, সাধ্যি মেধা নামেই তিনি পরিচিত। আর ক্রমে এমন হতে শুরু করে যে, ধরাধামের প্রজাসকল মহারাজ মানসের দরবারে আসা বন্ধ করে সাধ্যি মেধার কাছেই অধিক যান। এর কারণ অবশ্য যতটা না মেধা স্বয়ং, তার থেকেও অধিক মানস ও বাকি রাজপুরের সদস্যদের আচরণ।

ঈর্ষা, লিপ্সা, কামনা ও রাজ্ঞীর প্রভাব তো ছিলই। তারই সঙ্গে মদিনার প্রভাব রাজপুরের সকলের মধ্যে বিস্তার করেছিল, আর সর্বাধিক প্রভাব বিস্তার করেছিল মোহিনীর প্রভাব। মানস থেকে আরম্ভ করে, দেবী ধরা; চন্দ্রনাথ, সূর্যনাথ তথা চন্দ্রপ্রভা, এমনকি শিখা ও বেগবতী, সকলের উপর এই ছয় সন্তান যেন বশীকরণ মন্ত্র প্রদান করেছিলেন। না হলে, এমন ভাবে সকলে এঁদের কথাতে ওঠে আর বসে? 

মেধার এমন বাইরে থাকা নিয়ে প্রথমে মানস ও ধরার আপত্তি থাকলেও, পুত্রীর উপর জোর খাটাতে পারেন না তাঁরা। শিখা ও বেগবতী এতদিন কামান্ধ হয়ে ছিলেন। তাই তাঁদের আদরের ভগিনীর খবরও রাখতেন না। কিন্তু এখন সেই কামান্ধতা ত্যাগ হতে, তাঁদের আদরের ভগিনীর এমন দৈন্যদশা দেখে সদাভাবিত থাকতেন।

দেবী শিখা ও বেগবতী একবার মেধার কাছে উপস্থিতও হন তাঁকে রাজপুরে ফিরিয়ে আনতে। কিন্তু মেধার আচরণে, তাঁরা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে ফিরে আসেন। মেধা তাঁদেরকে বলেন, “দিদি, মোহিনী, মদিনা, এঁরা তোমাদের সন্তান। আমি কি করে বলতে পারি তোমাদের যে, তোমরা এঁদেরকে ত্যাগ করো! … কিন্তু, এঁরা থাকতে, আমি রাজপুরে নিবাস করতে পারিনা। এঁদের প্রভাবের কারণে, আমার দমবন্ধ হয়ে যায় রাজপুরে। সর্বদা যেন মনে হয়, মৃত্যু আমার চারিপাশে ঘোরাফেরা করছে।

বিশ্বাস হচ্ছেনা হয়তো, কিন্তু এঁরা যখন কিছু কথা বলে, তখন শব্দ নয়, চিলশকুনের কণ্ঠ শুনতে পাই আমি। কেন পাই, তা জানিনা, তবে পাই যে তা, সেই ব্যাপারে নিশ্চিত। তাঁদের অঙ্গ থেকে নিশ্চিত ভাবেই কনো দুর্গন্ধ নির্গত হয়না, কিন্তু তাঁদের উপস্থিতি মাত্রই আমি গলাপচা শবদেহের গন্ধ পাই। হয়তো আমার ভ্রম, কিন্তু এঁদের উপস্থিতির কারণে চারিপাশে মক্ষিকা দেখতে পাই, যেন সেই মক্ষিকারা ভিড় করে রয়েছে গলিত ও পচিত আহার গ্রহণ করার জন্য।

কেন এমন দেখি, শুনি বা অনুভব করি, তা বলতে পারবো না দিদি, তবে আমি অত্যন্ত অসংযত  বোধ করি, ওদের সংস্পর্শে আসলেই।  দিদি, ওরা তোমাদের সন্তান, তাই ওদেরকে কিছু বলা তো অন্যায়, তাদের প্রতি অন্যায়ের থেকেও অধিক অন্যায় তোমাদের সাথে, কারণ সন্তানকে কিছু বলার অর্থ তাঁদের মাতাদের আঘাত করা।

আর তা ছাড়াও, আমার তাঁদেরকে আঘাত করার কারণই বা কি হবে?  যাকিছু আমি দেখছি, শুনছি বা অনুভব করছি, তা যে বাস্তবে কিছুই নেই!  তাহলে দোষ যদি কারুর থেকে থাকে, সে তো আমার, তাই না দিদি! … তাই নিজেকেই এই সমস্ত কিছুর জন্য দণ্ড দিতে থাকি”।

শিখা প্রশ্ন করলেন, “কিন্তু মেধা, তুই তো তখন থেকে বাইরে, এই বৃক্ষতলে নিবাস করছিস, যখন আমরা মোহিনী বা মদিনাকে জন্মও দিইনি!”

মেধা উত্তরে বললেন, “হ্যাঁ দিদি, যবে থেকে তোমরা আত্মপুত্রদের  সাথে মেলামেশা আরম্ভ করেছ, তখন থেকেই আমার মধ্যে এমন পরিবর্তন আসা শুরু করেছে। নিশ্চিত ভাবে আমিই অসুস্থ দিদি, নিশ্চিত ভাবে আমার মধ্যেই কিছু একটি অসুস্থতার বিকাশ হচ্ছে। তাই আমি চাইনা যে আমার এই অসুস্থতার সাথে রাজপুরের কেউ জরিয়ে পরুক”।

শিখা ও বেগবতী রাজপুরে এসে, নিজেদের আদরের ভগিনীর শরীরস্বাস্থ্য নিয়ে চিন্তিত হয়েই মহারাজ মানসের সাথে এই বিষয়ে কথা বললেন। দেবী ধরা সেই কথা শুনে অত্যন্ত বিচলিত হয়ে উঠলেন। মানস বললেন, “তাহলে কি মেধার মধ্যে আসুরিক প্রবৃত্তির বিকাশ হচ্ছে!”

শিখা বললেন, “হতেই পারেনা পিতা, আমাদের ভগিনী অত্যন্ত পবিত্র। তাঁর সর্বাঙ্গ দিয়ে পবিত্রতার আশ্বাস প্রকাশিত হয়। তাঁর মধ্যে আসুরিকতার বিস্তার … না না, আপনি কিসের ভিত্তিতে এই কথা বলছেন?”

মানস গম্ভীর হয়ে বললেন, “আমার অনুমান নয়, আমি নিশ্চিত যে, মোহিনীর বেশে আমাদের জননী ফিরে এসেছেন। আর তাঁর বিস্তারের কারণে, মেধার মধ্যে এমন ভাবের সঞ্চার হচ্ছে। তাই আমার মনে হচ্ছে যে, ওর মধ্যে আসুরিকতার বিস্তার হচ্ছে”।

মোহিনীর ব্যাপারে এমন কথা শুনে চমকিত হয়ে গিয়ে দেবী শিখা বললেন, “কিন্তু পিতা,  আমি তো মোহিনীর জন্মদাত্রী। আমার নিজের মধ্যে তো কনো দিব্যতা আমি অনুভব করিনি তাকে জন্ম দেবার কালে!”

দেবী ধরা বললেন, “তোমাদের পিতার বিশ্বাস যে মাতা এবারে একাধারে আসেন নি, তিনি এবারে তোমাদের দুইজনের ছয় সন্তানের বেশে এসেছেন। হ্যাঁ তাদের মধ্যে মোহিনীর মধ্যে সর্বাধিক প্রকাশ তাঁর”।

বেগবতী বললেন, “কিন্তু পিতা, আপনার এমন ধারনার আধার কি?”

মানস বললেন, “পুত্রী, মাতার লীলা মাতাই জানেন। আমরা সর্বদাই ভ্রান্ত ও উদ্ভ্রান্ত হয়েছিলাম সেই ব্যাপারে। আমরা তো ভেবে যাচ্ছিলাম যে দেবী চিন্তা মাতার বিরোধী। কিন্তু মাতা যে কখনোই আমাদের ছেড়ে যাননি, তা আমি ভাবতেও পারিনি।

মোহিনীর প্রভাবে এসে জেনেছি যে দেবী চিন্তা হলেন মাতার বিচারধারা। তাঁর মধ্য দিয়েই মাতার বিচার ধারার প্রকাশ ঘটে এসেছে সর্বদা আর এখনো তাই হয়ে চলেছে। দেবী ইচ্ছার মাধ্যমে মাতারই ইচ্ছা ব্যক্ত হয়, আর দেবী কল্পনার মাধ্যমে মাতারই ভাববিস্তার হয়। সঙ্গে সঙ্গে মহারাজ আত্ম হলেন স্বয়ং মাতারই সত্ত্বা। অর্থাৎ মাতা দেহত্যাগ করেই ছিলেন, নিজের সমস্ত সত্ত্বাগুণ, তথা সমস্ত বিচার, ধারণা ও ইচ্ছার প্রকট করার জন্য। এই সমস্ত আমি মোহিনী ও তোমাদের অন্য সন্তানদের থেকে জেনেছি।

শুধু তাই নয়, আত্মপুত্ররা অন্য কেউ নন পুত্রীরা, তাঁরা যে মাতারই সত্ত্বার ত্রিগুণ, অর্থাৎ সমস্ত বিচার প্রবাহিত হয় প্রভাতের থেকে, সমস্ত বিবেকের ভাব প্রকাশিত হয় রজনীর থেকে  এবং তামস, তোমরা তো আমার থেকেও ভালো জানো, সে সম্পূর্ণ ভাবে বিরক্ত। অর্থাৎ বিরাগ সে, বৈরাগী সে।

পুত্রীরা, মাতার সমস্ত ভাব প্রবাহিত হচ্ছে তোমাদের সমস্ত সন্তানের মধ্যদিয়ে। খেয়াল করে দেখো পুত্রী, কেমন সর্বত্র মাতার ভাবের বিস্তার হয়ে চলেছে!… সকলে আচার বিচারের মাধ্যমে ভক্তি ধারণ করে কেমন মোহিনীর কাছে এসে উপস্থিত হয়, আর সকলে তাঁর গুণগ্রাহী কারণ সকলের কামনা পূর্তি হয়, আর তা মাতা করেন কি ভাবে? তোমাদের সন্তান কামনার মাধ্যমে।

তাঁর লীলাতেই সেই কামনা জাগে, সেই কামনার প্রতি আকর্ষণ জাগে, সেই আকর্ষণের উদ্দেশ্যে জাগে লোভের মাধ্যমে তীব্রতা। সেই আকর্ষণ যাতে অক্ষয় হয়, তা তিনি স্বয়ং দেখেন, কারণ এই  আকর্ষণ, এই ইচ্ছা, এই চিন্তা ও এই কল্পনার মাধ্যমেই তো তিনি সর্বস্ব কিছুর নির্মাণ করেছেন, সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডের নির্মাণ করে, আমাদের অর্থাৎ সমস্ত সন্তানদের ধারণ করে রেখেছেন!”

বেগবতী চিন্তিত হয়ে বললেন, “পিতা, খুব বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করছে যে আপনি সত্যই বলছেন, কিন্তু কেন জানিনা, মনের মধ্যে একটা খচখচ করছে! আমাদের ভগিনী মেধা কি এতটাই ভুল!”

দেবী ধরা বললেন, “দেখো পুত্রীরা, তোমার পিতার থেকে অধিক মাতাকে কেউ কনোদিনও জানেননি। তিনি যখন বলছেন যে, মোহিনীই মাতা; তিনি যখন বলছেন, মোহিনী সম্পূর্ণ ভাবে ধরাধামকে সুন্দর করতে এসেছেন; ভক্তি, বৈরাগ্য, অনুরাগ, প্রেম সমস্ত কিছু দিয়ে উন্নত করতে এসেছেন, সমস্ত কিছু ব্যবস্থিত করতে এসেছেন, তখন তিনি সঠিকই বলবেন, এই ব্যাপারে  আমার কনো সন্দেহ নেই”।

মানস পুনরায় বলেন, “সেই মোহিনীর আগমনের কাল থেকে মেধার মধ্যে এমন বিকৃতি দেখা দিচ্ছে মানে, মেধার মধ্যে আসুরিকতার উদয় হচ্ছে, কারণ মাতার জাগরণে কেউ যদি অশনি সংকেত দেখে থাকে, তা একমাত্র অসুর। কই আমার মধ্যে তো এমন ভাবের উদয় হচ্ছেনা, তোমার মাতার মধ্যে, তোমাদের দিদা, দাদু, কারুর মধ্যে তো হচ্ছেনা।

এমনকি আত্ম, তোমাদের তিন শ্বশ্রূমাতা, তোমাদের স্বামীদের মধ্যে, এমনকি তোমাদের মধ্যেও কি এমন কিছুর বিকাশ হচ্ছে! … না হচ্ছেনা, তাই আমি নিশ্চিত যে, মেধার মধ্যেই আসুরিকতার বিস্তার হচ্ছে। তবে চিন্তা করো না, মাতা আছেন, মাতা সমস্ত কিছু ঠিক করে দেবেন। … অসুরও মাতারই সন্তান, তাই এক না এক সময়ে, নিশ্চিত ভাবে, মাতা মেধাকেও সঠিক পথে নিয়ে আসবেন”।

দেবী শিখা ও দেবী বেগবতী সেখান থেকে প্রস্থান করলেন। নিজেদের কক্ষে প্রস্থান করে, তাঁরা দুইজনেই ভাবিত হয়ে স্থিত থাকলে, দেবী শিখা বললেন, “বেগবতী, তোরও মনে হয়, আমাদের মেধা অসুর! … ওর মধ্যে কি আসুরিক কনো স্বভাব দেখতে পাস তুই!”

বেগবতী চিন্তিত হয়ে বসে পরে বললেন, “না দিদি, মেধা আমাদের সদাই পবিত্র ছিল, আর আজও সে পবিত্র। দুষিত তো আমরা হয়েছিলাম, ওর মধ্যে তো কনো প্রকার দূষণের লেশমাত্রও আসেনি! ও কি করে অসুর হতে পারে! … কোথাও কনো ভুল হচ্ছেনা তো!”

দেবী শিখা বললেন, “কিন্তু মাতার সাথে আমাদের পিতা থেকেছেন। তাই তাঁর থেকে অধিক ভালো ভাবে কি কেউ মাতাকে চেনেন! তিনি যখন বলছেন যে আমাদের ছয় সন্তান, মাতারই ছয় ভাবের প্রকাশ, আর সেই ভাবকে একত্রিত করে রয়েছে আমাদের মোহিনী, তখন তা সঠিকই হবে।

আমাদের দিদা সদাই বলতেন মনে আছে বেগবতী! তিনি বলতেন, বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর। … মাতার উপর সন্দেহ করে, আমরা বেঠিকই করছি। যদি আমাদের বিশ্বাস সঠিক না হয়, তবে মাতাই তা ভঙ্গ করে দেবেন। তুই কি বলিস? … আমার মতে, পিতার পথেই আমাদের যাত্রা করা সঠিক হবে।

মোহিনী, তাঁর ভ্রাতাভগিনীদের নিয়ে, আচারবিচারের মাধ্যমে ভক্তির স্থাপন করছে, ভেদভাব এনে প্রেমের সঞ্চার করছে, দেবী চিন্তাদের মাধ্যমে বিচারের ও বিবেকের স্থাপনা করছে। এবার সে ধরাধামকে অজেয় রাজ্য নির্মাণ করতে উদ্যত। … এই সমস্ত কিছু দেখে তো আমার মনে হচ্ছে, পিতাই ঠিক বলছেন। মাতা এসেছেন নিজের রাজ্যকে সঠিক করে সুব্যবস্থিত করতে।

অসুর রাজ্যভাগের কথা বলে, কিন্তু আমাদের মোহিনী তো ধরাধাম আর ব্রহ্মাণ্ডপুরকে মেলানোর কথা বলছে। মাতার থেকে শুনেছি, দুই পুরকে মিলিয়ে ছায়াপুর নির্মাণের ইচ্ছা রয়েছে মোহিনীর। … এই ভাব আসুরিক কি করে হতে পারে। … না না, আমরা স্বয়ং মাতার উপর সন্দেহ করছি। আমাদের সংযত হয়ে যাওয়া উচিত। মাতাকে সন্দেহ নয়, বিশ্বাসের সাথে দেখা উচিত”।

সমস্ত কিছু শুনেও বেগবতী মানতে পারলো না যে, মেধা অসুর। … দিন চারেক নিজের দ্বন্ধ নিয়ে নিজেই উলমালা থেকে, অবশেষে সিদ্ধান্ত নিলেন যে, এই বিষয়ে একবার মেধার সাথে বার্তালাপ করা আবশ্যক। কিন্তু কখন যাবেন তিনি! মোহিনীর সমস্ত দিকে সর্বদা নজর থাকে। তার নজর এড়িয়েই যেতে হবে। … প্রভাতের পূর্বক্ষণে মোহিনী ও তাঁর সমস্ত ভগিনীরা নিদ্রা যান। সেটিই আদর্শ সময়কাল হবে।

এই বিচার করে, একদিন সমস্ত রাত্রি জেগে, মোহিনীর কক্ষের আলো নেভার অপেক্ষা করলেন দেবী বেগবতী। আলো বন্ধ হবার পরেও, কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে, নিজের চরণের মল খুলে, সমস্ত গহনা খুলে, অতঃপরে জানালা দিয়ে বাহির হয়ে, ত্রিবৃক্ষের নিম্নে প্রস্থান করলেন। মেধাকে দেখলেন ভূমিতে শায়িত হয়ে রয়েছেন, নিজেরই একটি হস্তকে উপাধান করে তিনি শুয়ে রয়েছেন।

সেই দেখে বেগবতীর নেত্রে অশ্রু এসে যায়। নিজের আদরের ভগিনীর এমন দশা দেখে, সে তাঁর কাছে গিয়ে, তাঁর মস্তককে নিজের ক্রোরে ধারণ করতে, মেধার নিদ্রাত্যাগ হয়, ও সে ধরমর করে উঠে পরে। বেগবতীর দিকে তাকিয়ে, মেধার একাধিক প্রশ্নবাণ উপস্থিত হলো, “কি ব্যাপার দিদি! … তুমি এখন এখানে! … তোমার নেত্রে অশ্রু কেন?”

বেগবতীর ইচ্ছা হচ্ছিল ক্রন্দনে ফেটে পরার। নিজেকে সংযত করে নিয়ে তিনি বললেন, “মেধা, তুই আমাদের থেকে অনেকটাই ছোট। কি জানিস তো, আমি আর শিখা তোকে ভগিনীর বেশে খুব একটা দেখিনি, বরং নিজেদের প্রথম সন্তানের দৃষ্টিতেই অধিক দেখেছি। … আর আমরাই, আত্মপুত্রদের প্রতি আকৃষ্ট হলাম, আর তাদের ও আমাদের প্রবল কামনার ফলে সন্তান লাভ করলাম, আর সেই সন্তানদের কারণে তুই এই বৃক্ষতলে, একাকী থাকিস… মেধা, মন মানে না, ইচ্ছা হয়, বুকে করে আগলে রেখে, চুপিসারে তোকে রাজপুরে নিয়ে চলে যাই।

গোপনে কোথাও রেখে দিই, যাতে কেউ তোর সন্ধান না পায়। লুকিয়ে লুকিয়ে আহার নিয়ে এসে, তোকে খাইয়ে দিই। … হতভাগ্য লাগে নিজেকে। … নিজের উপর নিজের ক্রোধ আসে, ঘৃণা জন্মায় নিজের প্রতি”।

মেধা মৃদুহেসে, বেগবতীর নেত্রের অশ্রু মুছিয়ে দিয়ে বললেন, “আমি জানি দিদি, তোমরা সকলে আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করো। তুমি দেখো, একদিন না একদিন, মাতা নিশ্চিতই আমাকে দিন দেবেন, তোমাদের এই স্নেহের প্রতিদান প্রদান করার। … তবে তুমি দুখী হয়েও না, আমি এই বৃক্ষতলে থাকি বলে। এখানে আমার কনো অসুবিধা নেই। এই ত্রিবৃক্ষ আমাকে আগলে রাখে। অপার স্নেহ করে তাঁরা আমাকে। আমার সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দেয় এঁরা। … আমার কাছে এঁরা সামান্য বৃক্ষ নয়, স্বয়ং মাতার আশীর্বাদ যেন!… কিন্তু এই সময়ে তুমি এখানে কেন? রাত্রে নিদ্রা যাও নি!”

দেবী বেগবতী মৃদু হেসে বললেন, “না, তোর কাছে আসবো বলে, রাত্রে নিদ্রা যাইনি। … আসলে মোহিনী আর ওর দলবল সর্বদা সকলের উপর নজর রাখে। সূর্যোদয়ের পূর্বের এই সময়টাতে সে ও তার সমস্ত দলবল বিশ্রাম করে। তাই এই সময়েই আমি তোর কাছে এলাম। আসলে গোপনে কিছু শলাপরামর্শ করার আছে মেধা।

কি করে বলি বা কোথা থেকে শুরু করি, বুঝে পাচ্ছিনা। … জানিস মেধা, তোকে স্বয়ং পিতা অসুর মনে করছেন। আর মাতাও তাতে সায় দিচ্ছেন। আমি বুঝে পাচ্ছিনা, তাঁরা কি তোর পবিত্রতা দেখতে পাচ্ছেনা!”

মেধা মৃদু হেসে বললেন, “আর এমন ভাবার কারণ!”

বেগবতী মাথা নামিয়ে বললেন, “আমার মনে হয়, মোহিনী কিছু মায়া করেছে সকলের উপর, নাহলে সকলে ওকে মাতা মনে করছে কেন? সকলে মনে করছে যেন, মোহিনী মাতারই পুনরাবির্ভাব। আর সেই আবির্ভাবকে তুই মান্যতা প্রদান করছিস না, তাই তোকে অসুর বলা হচ্ছে”।

মেধা একটু গম্ভীর হয়ে গিয়ে বললেন, “হ্যাঁ, মায়া তো করেইছে। তবে মোহিনী নয়, আমার অনুমান যে মোহিনী সেই মায়ার একটি বিস্তার মাত্র। মায়ার সঞ্চার অন্যত্র থেকে করা হচ্ছে। … এই বৃক্ষতলে বসে বসে আমি সমস্ত কিছু দেখতে পাই। … মোহিনীর প্রচার করা বিশ্বাসকেও, বৈরাগ্যকেও, বিচারকেও, ভক্তিকেও, স্নেহকেও আর সমস্ত কিছুকে। …

মাতা নিশ্চয়ই আমাদের মনস্কাম পুড়ন করবেন, এই হয়ে গেছে এখানের প্রজার বিশ্বাস। এটি বিশ্বাস কি করে হতে পারে! এতো চরম অবিশ্বাস যে, আমার মনস্কাম পুড়ন করলে তবেই মাতা আমার দিকে তাকালেন, নচেৎ নয়। এতো এই বিশ্বাস যে, আমি আমার ভালো মাতার থেকেও ভালো বুঝি! … আমার ভালো আমার থেকে ভালো মাতাও বোঝেন না! … একে কি বিশ্বাস বলে? বিশ্বাস তো এই যে, যা হচ্ছে তা মাতার ইচ্ছাতেই হচ্ছে, আর তা অবশ্যই আমার হিতের জন্য হচ্ছে। আমার যদি বোঝার সামর্থ্য থাকতো, তাহলে আমি ঠিকই বুঝতে পারতাম যে কি ভাবে আমার হিত হচ্ছে, কিন্তু তা নেই, তাই বুঝতে পারছিনা।

কিন্তু তেমনটা আর প্রজাদের ভাব নেই। আশা করি, মহারাজ মানস ও মহারানী ধরারও ভাবধারা আর তেমন নেই। তাঁরা সকলেই অবিশ্বাস, অর্থাৎ আমার মনস্কাম পুড়ন করলে, তবেই মাতা আমার দিকে তাকালেন, একেই বিশ্বাস মানছেন। তাই না!”

বেগবতী কিছুটা আশ্চর্য হয়েই বললেন, “আমিও এর থেকে ব্যতি নেই মেধা। আমার মধ্যেও এই একই বিকৃতি স্থান পেয়েছে। সত্যই তো, এতো বিশ্বাসই নয়, এতো অবিশ্বাস!”

মেধা পুনরায় বললেন, “সমস্ত কিছুই দেখছি দিদি, এই অবিশ্বাস মিশ্রিত বিশ্বাস নিয়ে, সমস্ত প্রজা মোহিনীর দ্বারের সম্মুখে অপেক্ষা করছে, তাঁকে বিভিন্ন প্রকার ভেট প্রদান করছে, যাতে তাঁদের মনস্কাম পূর্ণ হয়। সহস্র প্রকার আচার বিচার করছে। প্রকৃতি যেই আহার প্রদান করছে, তাকে বর্জন করছে, নিজের আচার বিচার অনুসারে আহারই নাকি শ্রেষ্ঠ আহার এমন জ্ঞান করছে।

পশুমাংস আহার বন্ধ করেছে, তাদের মাংস আহার করা নাকি অত্যাচার, আর উদ্ভিদদের চূড়ান্ত অত্যাচার করে চলেছে, গরুর নিজের বাছুরের জন্য প্রদান করা রক্তজল করা দুগ্ধকে তস্করি করে নিচ্ছে। প্রকৃতির দ্বারা প্রদত্ত আমাদেরকে মাংস হজম করার সামর্থ্যকে অবমাননা করে করে, প্রকৃতির অবমাননা করা; প্রকৃতি দ্বারা গরুকে নিজের বাছুরকে জীবিত রাখার দুগ্ধকে তস্করি করে করে, প্রকৃতির অপমান করা; আচার অনুষ্ঠানের নাম করে, প্রকৃতিকে অপমানকারীদের আরাধনা করাকে ভক্তি বলে আখ্যা দিয়েছে। এও দেখছি আমি দিদি”।

বেগবতী এবার অস্থির হয়ে উঠলেন, নিজেকে নিজের দোষী মনে হওয়া শুরু হলো তাঁর। মেধা বলতে থাকলেন, “সম্ভোগই কর্ম হয়ে উঠেছে রাজ্যে, আমি তাও দেখছি দিদি। স্ত্রী পুরুষকে, পুরুষ স্ত্রীকে সম্ভোগের দৃষ্টি দ্বারা দেখছে, যেই আহার গ্রহণ করছে তার প্রতি সম্ভোগের দৃষ্টি, যেই ইন্দ্রিয় আকর্ষণীয় বস্তুকে দেখছে, তার প্রতি সম্ভোগদৃষ্টি, সর্বত্র কেবলই সম্ভোগের দৃষ্টি দেখছি দিদি।

সকলেই সকলকে ব্যবহার করার প্রয়াস করছে, নিজের সম্ভোগসামগ্রী লাভের উদ্দেশ্যে, তাও দেখছি দিদি। সঙ্গে সঙ্গে এও দেখছি যে, সর্বক্ষণ কি ভাবে এই সম্ভোগসামগ্রী আমার কাছে অন্যের থেকে অধিক থাকে, সেই ইচ্ছার পূর্তি হেতু করে যাওয়া চিন্তাকে প্রজা বিচারবুদ্ধি বলছেন। আরো দেখছি দিদি যে, কি ভাবে, প্রজা নিজের আসক্তিকে প্রেম বলে আখ্যা দিচ্ছেন। …

কেবলই সুখলাভের, সুবিধালাভের চিন্তা, আর সেই চিন্তার কারণে সেই বস্তু বা ব্যক্তির প্রয়োজন, তাই তার প্রতি তীব্র আসক্তি জন্মাচ্ছে প্রজার, আর সেই আসক্তিকে, সেই মোহপূর্ণ আকর্ষণকে প্রেম বলে আখ্যা দিচ্ছে প্রজা। …

আরো দেখছি দিদি এই বৃক্ষতলে বসে বসে যে, এই সম্ভোগ উপযোগী বস্তু ও ব্যক্তিদের, নিজেদের আকর্ষণের ও আসক্তির বস্তু ও ব্যক্তিদের লাভ করে, কি ভাবে তাদেরকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখে, বশ করে রেখে, বাধ্য করা যেতে পারে যাতে, তারা আমার কামনাকে পূর্ণ করে, এই বিদ্যাকে সকল প্রজা জ্ঞান বলছেন।

আরো দেখছি দিদি যে, এই সমস্ত কিছু, অর্থাৎ যাকে এঁরা জ্ঞান বলছে, এঁরা প্রেম বলছে, এরা বিশ্বাস বলছে, সেই অজ্ঞানকে, সেই মোহকে, আর সেই অবিশ্বাসকে লাভ করার জন্য দেবী মোহিনীকে মাতা জ্ঞান করে, তাঁর কাছে ভিড় করছে সকলে, তাঁর জন্য উপোষ করছে, প্রকৃতির অবমাননা করছে, আর অন্যকে হীন মনে করছে, আর তাকেই ভক্তি বলে বলে, ভগবানকে সেই সমস্ত কিছু দেবার উৎস জ্ঞান করে, ভগবানকে কামনাপূর্তির যন্ত্র করে দিয়েছে প্রজা।

সমস্ত কিছুই দেখছি। দিদি, শীঘ্রই বড় কিছু হতে চলেছে।  … হয়তো, এক নতুন রাজ্য হতে চলেছে, যেখানে অবিশ্বাসকে বিশ্বাস বলা হবে, অভক্তিকে ভক্তি, অজ্ঞানকে জ্ঞান, আচার বিচারকে ধর্ম বলা হবে, আর ভগবানকে কামনাপূর্তির যন্ত্র। দিদি, আমার মনে হচ্ছে, এই সমস্ত একটি যোজনা। সমস্ত প্রজাকে মোহপাশে আবদ্ধ করার যোজনা, বাণিজ্যিক হীনমন্যতা জাগরণের যোজনা, একে অপরকে ব্যবহার করার ইচ্ছা করানোর যোজনা, সর্বদা নিজের দৈহিক সুখের চিন্তা করানোর যোজনা। আর এই সমস্ত কিছুর উদ্দেশ্য একটি রাজ্য স্থাপন, যেখানে এই সমস্ত কিছুর জন্য কর নেওয়া হবে, আর রাজা সেই কর নিয়ে নিয়ে এমন ধনাঢ্য হয়ে উঠবে যে, প্রজা তাঁকেই ভগবান মানতে শুরু করবে।

দিদি, আমার মনে হচ্ছে, আরো বড় কিছু হতে চলেছে। হয়তো, মোহিনী নিজেকে মাতা বলে স্থাপিত করতে চলেছে। … হয়তো সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডপুর ও ধরাধামকে একত্রিত করে একটি রাজ্য করে, সকল প্রজাকে চিরভৃত্য করে রাখতে চলেছে”।

বেগবতী প্রশ্ন করলেন, “এর অর্থ, তুই বলছিস, আসল অসুর আমাদের ছয় সন্তান!”

মেধা উত্তরে ঘাড় নেড়ে বললেন, “তুমিও জানো দিদি যে, তোমাদের গর্ভলাভ করার আগে, আত্মপুত্রদের ঔরসে ইন্দ্রিয়রা অষ্টসন্তান লাভ করেছে। … তারাও আছে এই তালিকায়। … আসল কথা এই যে, অসুর তোমাদের সন্তানরা এমনিই নন। তারা অসুর, তাঁদের পিতাদের জন্য। আর হয়তো সেই পিতারাও অসুর, তাঁদের পিতামাতার জন্য। আর হয়তো, মোহিনী বা তাঁর সমস্ত ভগিনীরা, আর সমস্ত ইন্দ্রিয়পুত্ররা সেই প্রধান অসুরেরই অনুচর মাত্র!

দিদি, আমার মন বলছে, এক মহাসংগ্রাম উপস্থিত হতে চলেছে। … আর সেই সংগ্রামের সূচনা হয়েছিল যখন থেকে তুমি ও শিখাদিদি আত্মপুত্রদের সঙ্গে যুক্ত হতে শুরু করেছিলে। আর তাই তখন থেকেই আমি চিলশকুনের কণ্ঠস্বর শুনছি, গলাপচা দেহের গন্ধ পাচ্ছি। … অর্থাৎ, এক মহামৃত্যু মিছিলের ইঙ্গিত”।

বেগবতী বললেন, “মেধা, এই কথা তুই সকলের সামনে এসে কেন বলছিস না!”

মেধা মৃদু হেসে বললেন, “সময় হলে নিশ্চয়ই বলবো দিদি। … এখনো সময় হয়নি। … যা হচ্ছে, তার ভিত্তিতে কি হতে চলেছে, তার অনুমান করছি মাত্র। যদি সেই অনুমান সত্য প্রমাণিত হয়, তবে অবশ্যই সকলের সম্মুখে গিয়ে একটিবার প্রয়াস তো করবোই যাতে সেই মৃত্যুমিছিলকে আটকানো যায়। … দিদি, তুমিও একবার পিতার কাছে এই সমস্ত কথা গোপনে, মানে মোহিনীর আড়ালে বলে দেখতে পারো। জানি কনো লাভ হবেনা, তাও একটিবার প্রয়াস করে দেখতে পারো, যদি তাঁর মোহভঙ্গ হয়”।

বেগবতী প্রত্যাবর্তন করলেন মেধার থেকে এবং সমস্ত কিছু প্রত্যক্ষ করতে শুরু করলেন।  মেধা সত্যই মেধাবী। রাজপুরের বাইরে অবস্থান  করেও সমস্ত কিছু সঠিক সঠিক  প্রত্যক্ষ  করেছেন, যা তাঁরা রাজপুরের অন্তরে নিবাস করেও প্রত্যক্ষ করতে পারেন নি। সমস্ত কিছু দেখে, বেগবতী নিশ্চয় করলেন যে, একবার অন্তিম প্রয়াস করে দেখবেন তিনি, মহারাজ মানসকে পৃথক ভাবে সেই সমস্ত কিছু প্রত্যক্ষ করিয়ে। তাই তিনি মানসের কাছে প্রস্থান করে বললেন, “পিতা, আপনার সাথে কিছু আলোচনা করার আছে, তবে অত্যন্ত গোপনে। গোপনীয়তা বজায় রাখতে, আমি আপনার কাছে রাত্রের অন্তিম প্রহরে আসবো। কৃপা করে আমার জন্য অপেক্ষা করবেন”।

বেগবতীর গতিবিধি দেখে মানস বুঝলেন যে বিষয় অত্যন্ত জটিল, তাই সম্মতি প্রদান করলেন। যেমন কথা দিয়েছিলেন, তেমনই ভাবে রাত্রের অন্তিম প্রহরে বেগবতী মানসের সম্মুখে উদিত হয়ে বললেন, “পিতা, যেমন আপনি ভাবছেন যে সমস্যা অত্যন্ত জটিল, তেমনটাই সত্য, তবে এমন হতে পারে যে, আপনার কাছে এই ব্যাপার অত্যন্ত লঘু। তাই, কৃপা করে সম্পূর্ণ কথাটি শুনে তবেই মীমাংসায় আসবেন”।

মানস প্রশ্ন করলেন, “কি ব্যাপার পুত্রী! তোমাকে এমন উচাটন দেখাচ্ছে কেন?”

উত্তরে বেগবতী মুচকি হেসে বললেন, “পিতা, আমি একাকীই যে উচাটন, তেমনটা নয়। দিদি, মানে আপনার জ্যেষ্ঠ কন্যা, শিখাও উচাটন। কিন্তু তিনি কিছুটা উদাসীনও, তবে আমি এখনও উদাসীন হইনি। তবে হতে পারে যে আপনার সাথে এই বার্তালাপ করার শেষে আমিও উদাসীন হয়ে যাবো। সমস্তই নির্ভর করছে, আপনার উপর। যাই হোক, আপনি আবার আমাকে প্রশ্ন করুন যে কি হয়েছে, তার আগেই আমি আপনার কাছে সমস্ত কথা খুলে বলতে চাইছি।

পিতা, একবার ধরাধামের প্রজার দিকে তাকিয়ে দেখেছেন? একবার তাকিয়ে দেখুন, যদি দেখেন তাহলে দেখবেন আর অবশ্যই প্রত্যক্ষ করবেন যে, যাকে আপনারা ভক্তি বলছেন, তা আসলে কি। যাকে আপনারা বিশ্বাস বলছেন, যাকে আপনারা স্নেহ বা প্রেম বলছেন, যাকে আপনারা  মমতা বলছেন, বা যাকে আপনারা বিচার বা বৈরাগ্য বলছেন, এমনকি যাকে আপনারা জ্ঞান বলছেন, তা আসলে কি, তা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাবে দেখা যাচ্ছে। আপনি কি তা দেখতে পাচ্ছেন?”

মানস এবার ভ্রুকুঞ্চিত করে প্রশ্ন করলেন, “কি বলতে চাইছো, একটু খুলে বলবে?”

দেবী বেগবতী, মানসের নিকটে উপস্থাপন করে, কথার গোপনীয়তাকে রক্ষা করতে, নরম কণ্ঠে বলতে থাকলেন, “এই সমস্ত কিছুকে আমিও দেখেছি, আর দিদিও, তবে আমাদের কাছে মেধার মত সত্যের মানদণ্ড ছিলনা, তাই আমরা সত্যের সাথে একে তুলনা করে দেখতে ব্যর্থ হচ্ছিলাম। কিন্তু সমস্ত কিছুর মধ্যেই যে জল মিশে রয়েছে, সমস্ত কিছুর মধ্যে ভেজালই অধিকমানে রয়েছে, তা আমি বা দিদিও পূর্ব থেকেই প্রত্যক্ষ করেছিলাম। দিদিকে উদাসীন দেখে, আমি মেধার কাছে গেছিলাম।

আমাদের সকলের মধ্যে সে সর্বাধিক বুদ্ধিমতী, আর কেবল বুদ্ধিমতীই নয়, তাঁর বুদ্ধি ভরসাযোগ্য, কারণ তাঁর বুদ্ধি আমাদের মতন কনো কিছুর অনুমান করেনা। যতক্ষণ না প্রত্যক্ষ করে, এবং সত্যের সাথে তুলনা করে, ততক্ষণ মেধা কনো কিছুর মীমাংসা স্থির করেনা। তাই মেধার মেধা আমার কাছে তো বটেই, আমাদের দুই ভগিনীর কাছেই অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য।

আপনি হয়তো, কনো কিছুর সাথে তুলনা করে, তাঁকে অসুর বলে দিচ্ছেন, বেশ বলুন, হয়তো আপনার কথন উচিত ও সত্যও, আমার থেকে আপনার অভিজ্ঞতা বহু অধিক। তাই আপনার বাক্যকে সন্দেহ করবো না। তবে, একটি বার সেই অসুরের কিছু তুলনা, যা সে আমার সম্মুখে রেখে আমার নেত্রকে বিস্ফারিত করে দিয়েছে, তা আপনার সামনে রাখতে চাই।

জানি, আপনিও মেধার বিচক্ষণতার সাথে পরিচিত। তাই, আমি না বললেও, আপনি বুঝতেই পারতেন যে এই সমস্ত বিচার তাঁরই। সেই কারণেও, মেধার উল্লেখ প্রথমে করলাম, আর তা ছাড়া, মেধা আমাকে বলেছে যে, আপনার উপর এই সমস্ত কথার কনোরূপ প্রভাব পরবেনা কারণ আপনি মেধাকে অসুর ভেবে নিয়েছেন। তার এই কথনও কতটা সত্য, তার প্রমাণ পাবার জন্যও, আমি আপনার সম্মুখে সম্পূর্ণ সত্য পূর্ব থেকে বললাম। এবার মেধা কি বলেছে, আমি তা বলছি। জানি আপনি অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের সাথে তা শুনবেন। তাও আমি বলবো।

পিতা, আপনার থেকেই শিখেছি যে, বিশ্বাসের মধ্যে কনো প্রকার অবিশ্বাস থাকলে, তা বিশ্বাসের পবিত্রতাকে বিনষ্ট করে দেয়। আচ্ছা আমাকে একটি কথা বলবেন, আমার বিশ্বাস যে, আমার মনস্কাম ভগবান অবশ্যই পুড়ন করবেন, এটি কি পবিত্র বিশ্বাস না অপবিত্রতা মিশ্রিত বিশ্বাস?”

মানস তাচ্ছিল্যের সাথে মুখবিকৃত করে বললেন, “এ নিশ্চয়ই ওই অসুরের কথা। … অবশ্যই সম্পূর্ণ পবিত্র বিশ্বাস”।

দেবী বেগবতী মৃদু হেসে বললেন, “ক্ষমা করবেন আমার ধৃষ্টতার জন্য, কিছু বছর আগে, আত্মপুত্ররা যেমন আমাকে আর দিদিকে বশ করে নিয়েছিলেন, তেমনই আজ আপনারও বশীকরণ হয়ে গেছে পিতা। বেশ কেন বলছি এমন কথা, সেটাও তো বলা আবশ্যক। আচ্ছা দেখুন তো একটিবার, আমার ঈশ্বর যদি আমার মনস্কাম পুড়ন না করেন, তাহলে আমি তাঁকে বিশ্বাস করিনা। এটিই কি আসছে, যেই উক্তি আগে করেছি, তাকে ঠিক উল্টে দেখলে! আসে কি, এই বক্তব্য?”

মানস উচাটন হয়ে বললেন, “এসব কি বলছো পুত্রী!”

দেবী বেগবতী হাস্য প্রদান করে বললেন, “বুঝতে কষ্ট হচ্ছে তাই না! বেশ আরো বলছি তাহলে। আচার অনুষ্ঠান না করলে, ঈশ্বর, যিনি আমার মা, তিনি আমার দিকে তাকাবেন না। … মাতা ব্রহ্মময়ী তো আপনার কাছে ঈশ্বর কম, মা অধিক ছিলেন, তাই না! তিনি সম্মতি দিতেন এই আচর অনুষ্ঠানের?”

মানস ভ্রুকুঞ্চিত করে তাকিয়ে থাকলে, বেগবতী পুনরায় বললেন, “এই আচার অনুষ্ঠানকে তিনি কখনো ভক্তি বলতেন! … প্রকৃতি তাঁর শ্রেষ্ঠ স্থুল প্রকাশ, আপনাকেই বলতে শুনেছি পিতা। তা এই প্রকৃতি আমাদের মনুষ্যদের যেমন তৃণাদি ভোজন করার ও হজম করার সামর্থ্য দিয়েছে, তেমনই মৎস্য, মাংস, এই সমস্তও ভোজন করার ও হজম করার সামর্থ্য দিয়েছে। সেই প্রকৃতির দেওয়া সামর্থ্যকে ধারণ করাকে অধর্ম বললে, প্রকৃতিকে সম্মান করা হলো নাকি অসম্মান?”

বিস্ফারিত নয়নে মানস বেগবতীর দিকে তাকিয়ে থাকলে, বেগবতী পুনরায় বললেন, “কারুকে আকর্ষণ করার প্রয়াসকে প্রেম বলতেন আপনার মাতা ব্রহ্মময়ী, নাকি কারুর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে, তাঁর কাছে নিজেকে সম্পূর্ণ ভাবে অর্পণ করাকে? কাকে স্নেহ বলতেন তিনি! কারুকে নিজের কথা, নিজের পছন্দ অপছন্দ মানতে বাধ্য করাকে, নাকি তাঁর পছন্দ ও অপছন্দকে মান্যতা প্রদান করাকে?

কাকে জ্ঞান আহরণকারী বলতেন তিনি? কি কি ভাবে আচার অনুষ্ঠান করলে, তিনি তৃপ্ত হবেন, সেই ধারাকে, নাকি তাঁকে জানার জন্য উদ্ভ্রান্ত থাকা ব্যক্তিকে? কাকে বৈরাগী বলতেন তিনি, যিনি আমার অমুক চাই এই আসক্তির বিরুদ্ধে, আমি অমুক কিছুতেই চাইনা এই ভাবকে, নাকি প্রকৃতি বা কাল আমার সম্মুখে যা আনবে, তাই আমার জন্য সঠিক এই ভাবকে?

কাকে বিচার বলতেন তিনি? নিরপেক্ষ ভাবে কনো বস্তুকে, কনো ঘটনাকে প্রত্যক্ষ করাকে, নাকি আমার উপর কোন ঘটনার কি প্রভাব পড়বে, সেই ধারার প্রত্যক্ষীকরণকে? কাকে তিনি করুণা প্রদান করা বলতেন, কিছু সামগ্রী প্রদান করাকে, নাকি সকলের সমস্ত কৃত্যে স্বতন্ত্রতা প্রদান করাকে? কাকে ধর্ম বলতেন তিনি, সকলের সকল ক্রিয়াধারাকে নিয়মে বাঁধাকে, নাকি সকলের সকল কৃত কর্মের মধ্যে স্পষ্ট ধারণা থাকাকে যে কেন সেই কর্ম তিনি করছেন? বলুন মহারাজ মানস, কি বলতেন আপনার আমার সকলের প্রাণের মাতা!

একটিবার কৃপা করে, মদিনা, মোহিনী, ঈর্ষা, লিপ্সা, কামনা বা রাজ্ঞী যা বলছে, তার নিরিখে বিচার না করে, আমাদের প্রিয় মাতা যা বলতেন, তার ভিত্তিতে বিচার করে দেখুন মহারাজ। অসুর আমাদের মেধা নয়, না কনোদিনও সে অসুর ছিল, আর না তাঁর মধ্যে কনো প্রকার আসুরিক প্রবৃত্তি কনোদিনও জন্ম নিয়েছে। অসুর আমাদের, হ্যাঁ আমার ও দিদির সন্তানরা। হ্যাঁ অসুর তাঁরা, কারণ যাদের বীর্যগুনে তাঁরা আবির্ভূত হয়েছে, সেই ত্রিআত্মপুত্র, যারা কামনার বশে আমাকে ও দিদিকে বশীকরণ করে রেখে দিয়েছিলেন, তাঁরা অসুর।

তাঁরা অসুর, কারণ তাঁদের জনক ও জননী অসুর। একবার বিচার করে দেখুন পিতা, কে কাকে মানছেন বা কাকে মানছেন না, তার মাধ্যমে কারুকে অসুর বলা যায়না। আপনার মাতা কি বলতেন, অসুর সম্বন্ধে? আমরা যখন ছোট ছিলাম, তখন মেধাকে উপমা করে, আমাদের কাছে বলতেন আপনি, বিলাসিতা অসুরের প্রাথমিক লক্ষণ। দেখো, মেধাকে, ওর মধ্যে লেশ মাত্র বিলাসিতার ভাব নেই। অত্যন্ত সাধারণ সে, অত্যন্ত সাবলীল সে। প্রকৃতি যা দিচ্ছে, সে তাতেই সন্তুষ্ট, সে তাতেই তৃপ্ত।

মনে পরছে, আপনি কি বলতেন? আপনি বলতেন যে, যখনই প্রকৃতি তোমার সম্মুখে, যেই গুণ, যেই চেতনা, যেই সুবিধা, যেই সামর্থ্য, যেই খাদ্য, যেই ভাব প্রদান করছেন, তার অতীতে গিয়ে, তুমি সমস্ত কিছুকে নিজের ইচ্ছা, চিন্তা ও কল্পনার নিরিখে নিয়ন্ত্রিত করতে যাবে, তখনই আসুরিক হয়ে ওঠা শুরু তোমাদের। … পিতা, আপনি আমাদেরকে বলতেন, আপনার মাতা, স্বয়ং জগন্মাতা ব্রহ্মময়ী এই শিক্ষা প্রদান করেছেন আপনাকে।

তা পিতা, আমাদের আদরের ভগিনী, যাকে আমি ও দিদি, ভগিনী কম ও সন্তান অধিক মেনেছি, যেই মেধার সামনে আপনি আমাদের দুই ভগিনীকে চূড়ান্ত অপমান করতেন, আমাদেরকেই সঠিক সংস্কার দেবার জন্য, কিন্তু তাও মেধার মধ্যে, তাঁর এই দুই দিদির প্রতি সামান্যও অসম্মান জন্ম নেয়নি, জননীর মত সে এখনো আমাদেরকে স্নেহ করে চলে। কনো কামনা নেই তাঁর স্নেহের মধ্যে, কনো চাওয়া, পাওয়া, চিন্তা, অছিলা, শর্ত, কিচ্ছু নেই তাঁর ভক্তির জন্য … পিতা, আপনার প্রিয় কন্যা, আজ আপনার কাছে অসুর হয়ে গেল!

যেই কন্যা সার্বিক ভাবে আপনার মাতার দেখানো মার্গ অনুসরণ করলো, আর আজ আপনি তাঁর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন, তাতেও সেই মার্গ অনুসরণ বন্ধ হয়নি, কারণ তাঁর রক্তে রক্তে সেই মার্গ স্থাপিত হয়ে গেছে, সেই কন্যা অসুর হয়ে গেল! আর তারা, যারা সেই সমস্ত আসুরিক গুণসম্পন্ন, যেই সমস্ত গুণকে আপনি আসুরিক বলতেন, তারা আপনার কাছে আপনার মাতা হয়ে গেল?

পিতা, আমি বা দিদি, দুইজনেই শৈশবে মার্গদর্শন না লাভ করে, কিছু আসুরিক মানসিকতা ধারণ করেছিলাম। আত্মের পুত্রদের পক্ষে তাই আমাদেরকে বশীকরণ করা সম্ভব হয়েছিল। অসংখ্যপ্রয়াসের পরেও তারা মেধাকে বশ করতে পারেনি, কারণ তাঁর মধ্যে যে সামান্যতমও আসুরিকভাব উপস্থিত ছিলনা। …

কিন্তু আপনি ও মাতা! … আপনারা তো পূর্ণ ভাবে পবিত্র! … পিতা, আমাদের উপর মাতা ব্রহ্মময়ীর এখনও কৃপা হয়নি। তাই তাঁকে আমরা এখনো প্রত্যক্ষ করতে পারিনি, কিন্তু পিতা, আমাদের নেত্রে, আপনি ও মাতা হলেন সম্যক জগতের শ্রেষ্ঠ পবিত্রতার ধারক। আপনি ও মাতা, আমার বা দিদির নয়, আমাদের প্রিয় ভগিনী, মেধার আদর্শ। তাঁর রোমে রোমে, আপনি ও মাতা বিরাজ করেন।

আপনারা কি করে, এই অসুরদের বশে এলেন পিতা! … এখনো সময় আছে মহারাজ, এখনো সময় আছে। সময় থাকতে, সঠিক ও বেঠিককে সনাক্ত করে নিন। …  আপনি এমনই ভাবে বশ হয়েছেন যে, আমি আর দিদি যেমন কাঠের পুতুল হয়েগেছিলাম, যেমন খুশী আমাদেরকে নাচানো হতো, তেমন হয়ে গেছেন।

আপনার মাতা কেমন, তা ভুলে গিয়েছেন মোহিনীর কারণে, মদিনার কারণে। … পিতা, কেবল কয়েকটি শব্দ উচ্চারণ করলেই, তিনি মাতা হয়ে যাননা, তিনি জ্ঞানী হয়ে যান না, তিনি ধার্মিক হয়ে যাননা। কেবল ভক্তি, স্নেহ, প্রেম, মমতা, বিচার, বৈরাগ্য শব্দগুলিই সে উচ্চারণ করছে। একবার বিচার করে দেখুন, সমস্ত শব্দের অন্তরে যেই পবিত্রতা থাকে, যেই স্বতন্ত্রতা থাকে, যেই সাবলীলতা থাকে, যেই ভেদভাব শূন্যতা থাকে, তাকি আছে?

কেবলই কেউ এই শব্দগুলি ব্যবহার করে, ইচ্ছা, চিন্তা ও কল্পনা অনুসারে, প্রকৃতিকে বিকৃত করতে থাকছে, আর আপনি তাদেরকে অসুর থেকে ঈশ্বর বানিয়ে দিচ্ছেন! … সময় থাকতে সঠিক পথে প্রত্যাবর্তন করুন, নাহলে সম্পূর্ণ ধরাধামের জন্য ভয়াবহ বিপদ ঘনিয়ে আসছে। ক্ষমা করবেন পিতা, কন্যা হয়ে পিতাকে উপদেশ দিলাম বলে, প্রজা হয়ে রাজাকে উপদেশ দিলাম বলে। বৈরাগী আমি নই, মদিনার মত সন্তানের জননী আমি, নিজেকে বৈরাগী বলতেই ঘৃণা করে। … তবে এক্ষণে বৈরাগ্যকেই ধারণ করলাম। তাই আপনার উত্তরের অপেক্ষা করবো না। আপনি আপনার সিদ্ধান্ত নিতে সম্পূর্ণ ভাবে স্বতন্ত্র”।

এতবলে বেগবতী উঠে চলে গেলে, মানস তাঁর দিকে হাত বারিয়ে বললেন, “পুত্রী, কি করে বোঝাবো তোমাকে! … তোমার সন্তানরা স্বয়ং ভগবতীর অংশ। আমি তোমাদের পিতা বলছি, তোমরা বিশ্বাস করছো না কেন?”

কিন্তু সেই কথা শোনার জন্য বেগবতী সেখানে উপস্থিত ছিলনা। তাই পরেরদিন প্রভাতে উঠেই মানস ধরমর করে শিখা ও বেগবতীর কক্ষে গেলেন। সেখানে উপস্থিত হয়ে বললেন, “শিখা, বেগবতী এখনো নিদ্রা ত্যাগ করেনি! … ও আমাকে গতকাল রাত্রে কিছু বলে, আমার উত্তর না শুনেই চলে এসেছে। আমার যে অকে কিছু বলার আছে!”

শিখা হেসে বললেন, “অদ্ভুত কাণ্ড দেখুন! … বেগবতী কাল রাত্রের শেষ প্রহরে আপনাকে কিছু বলতে গেলেন, কারণ মোহিনী বা মদিনা যদি জানতে পারে, তাঁর এই আলাপচারিতা, তাহলে তাকেও মেধার মত রাজপুরের বাইরে ফেলে দিয়ে আসবে। … সে তো বুঝলাম পিতা, কিন্তু আপনি তো তাঁর আদরের দাদু! … তাঁর মধ্যে স্বয়ং আপনার জননীকে দেখতে পান! … তা আপনারও কি সেই একই ভয়! আপনাকেও কি প্রাসাদের বাইরে ফেলে দেবে, যদি বিরোধ করেন তাঁর!”

এই বলে উচ্চৈঃস্বরে হেসে উঠলে, মহারাজ মানস বললেন, “শিখা, মোহিনী তোমার নিজের কন্যা, নিজের গর্ভজাত কন্যা! তাঁর সম্বন্ধে এমন কটুকথা তুমি উচ্চারণ করো কি করে?”

শিখা তির্যক হেসে বললেন, “দুর্ভাগ্য বশত ওই অধর্মী আমার গর্ভে জন্ম নিয়েছে ঠিকই। মাতা হবার কর্তব্য যা করার করে দিয়েছি। আর নয় পিতা। … কামাস্ত্র দ্বারা বশীকরণ করা হয়েছিল আমার আর আমার ভগিনী, বেগবতীর। … আর সেই বশীকরণ থেকেই এই সন্তান জাত হয়েছে। … তাও সন্তানজ্ঞানে বুকে আঁকরে ধরেছিলাম, কিন্তু এক মা কখনোই তাঁর কনো একটি সন্তানকে স্নেহচোখে দেখতে পারেনা, যখন সেই সন্তান সেই মায়ের অন্যসন্তানকে তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে দেখে।

মেধা আমাদের সন্তান। আর ওর জীবনকে নরক করে দিতে চাইছে মোহিনী। … এই মা তাঁর এই অপরাধ কনোদিনও ক্ষমা করবেনা। … আমার মেধার মত এত মনোবল নেই যে আমি বৃক্ষতলে দিনের পর দিন পরে থাকবো।  এত সাহস নেই আমার যে, আমি অসুরের আসুরিকতার প্রতিবাদ করবো। তবে হ্যাঁ, তা বলে, আমার সাধ্যি মেধার নামে একটি কুকথাও শুনবো না। ও আমাদের দুইজনের ভগিনী নয়, আমাদের কন্যা সে।

না সে আমাদের মা ছাড়া অন্য দৃষ্টিতে কনোদিন দেখেছে, না আমরা তাঁকে কন্যা ছাড়া অন্যদৃষ্টিতে কখনো দেখেছি। … পিতা, মেধার কাছে আমি যাইনি, বেগবতী গেছিল। তাই মেধা তাঁকে কি বলেছে আমি জানিনা। তবে আমি আপনাকে একটি কথা বলছি, নিজের থেকে। আত্মের পুত্রদের কাছে বশ হয়ে, তাদের কামনার দাশ হয়ে থাকা ব্যক্তি আমি। তাই আমার কথাকে মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করুন।

আপনি যাদেরকে বিশ্বাস করছেন, সেই ছয় সন্তান আমাদের গর্ভজাত সন্তান। তাই আমাদের থেকে অধিক একমাত্র ঈশ্বর ও ঈশ্বরের দূত জানেন তাঁদের ব্যাপারে। … সতর্ক করে দিচ্ছি পিতা, ধ্বংস করে দেবে সমস্ত কিছু, ওরা ছয় সন্তান নয়, ছয় রিপু ওরা, ষড়রিপু ওরা। … সমস্ত আবেগদের শিরোমণি ওরা। … আত্মপুত্রদের আরো আটটি পুত্র আছে, ইন্দ্রিয়দের গর্ভে বীর্যপাত করে করে, সেই সন্তানদের জন্ম দিয়েছিল ওই কামুকগুলো।

তাদেরকে অষ্টপাশ নামে আপনারাই ডাকেন। ষড়রিপু আর অষ্টপাশ এক হচ্ছে, একে অপরের সাথে মিলিত হয়ে একাধিক সন্তানের জন্ম দিতে চলেছে পিতা। বিশাল এক অসুরকুল স্থাপিত হতে চলেছে মহারাজ। … এই অসুরকুলের নাম হবে আবেগ। আর একবার এই আবেগদের জন্ম হয়ে গেলে, আপনার রাজ্যে আর কনো মানুষ বাস করতে পারবেনা, শুধুই অসুর নিবাস করবে। … তাই এখনও সময় আছে। সমস্ত কিছু ঠিক করে দিতে সক্ষম আপনি। করে দিন সমস্তকিছু সঠিক।

বেগবতী সারারাত্রি ঘুমায়নি। গতকাল আপনার সাথে কথা বলতে, আর তার পূর্বের দিন মেধার সাথে সে পুরো রাত জেগেছিল। ওকে এখন নিদ্রায় থাকতে দিন। আপনি এখন আসুন”।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22