২.২। সংক্রমণ পর্ব
মানসের মন্তব্য একদমই সঠিক ছিল, কারণ ইতিমধ্যেই শিখা ও বেগবতীর নজর প্রভাত, রজনী ও তামসের উপর পরেছে। সত্য বলতে আত্মপুত্ররা তো প্রস্তুতই ছিলেন, এই নজরের জন্য। মাসে মাসে যেই কয়দিন আত্ম বা তাঁর রানীরা পুত্রদের কাছে এসে থাকতেন, বা যেই শ্রাবণের উৎসবের কালে, পুত্ররা ব্রহ্মাণ্ডপুরে প্রত্যাবর্তন করতেন, সেই সময়ে এই সমস্ত কথাই তাদেরকে বলা ও বোঝানো হয়।
তারা যুবক হয়েছে, আর শিখা বেগবতীও যুবতী। তাঁদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়ে চলেছিল। শিখাকে সঙ্গে রাখা কনো ব্যাপারই ছিলনা তিন আত্মপুত্রের পক্ষে। তামস রন্ধনকর্মে বেশ পটু, আর তাই শিখাকে বশ করে নেওয়া তাঁর পক্ষে তেমন একটা বিশেষ কঠিন কাজ হতো না। আর সব থেকে বড় কথা এই যে, এই তিন ভ্রাতার মধ্যে এক পারস্পরিক সন্ধি সর্বদা থাকে।,
তাঁদেরকে সর্বদা শেখানো হয়েছে যে, যতক্ষণ তাঁরা একসাথে থাকবে, মিলে মিশে থাকবে, ততক্ষণ তাঁদেরকে পরাস্ত করা অসম্ভব। আর তাই কিছুতেই তাঁরা একে অপরের সঙ্গ ছাড়েনা। তাই, শিখা যখন সাত্ত্বিক, রাজসিক ও তামসিক, একই সঙ্গে তিন প্রকার ভোজনের স্বাদ পেতে থাকলো, তখন তাঁর মধ্যে বিশ্রাম চিন্তা পরিপক্ক হতে হতে, তা বিলাসিতার পর্যায় চলে গেল।
অন্যদিকে বেগবতী সর্বদাই সুরক্ষা নিয়ে চিন্তিত। আর প্রভাত, রজনী এবং তামসের থেকে শক্তিশালী পুরুষ তো সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডপুর কেন, সমগ্র ধরাধামেও নেই। মানসের বলও এই তিন আত্মপুত্রের কাছে অতিশয় হীন বলাই সঠিক হবে। তাই শিখার সাথে সাথে তালে তাল মিলিয়ে বেগবতীও ক্রমশ এই তিন আত্মপুত্রের প্রতি দুর্বল হওয়া শুরু করলো।
শিখা আর বেগবতী যতই বিলাসিতার প্রতি আকৃষ্ট হতে শুরু করলো আর নিজেদের অতিকায় সুরক্ষিত মনে করতে শুরু করলো, তাদের মধ্যে প্রবল সঙ্গম আকর্ষণ জন্ম নেয়। আর সেই সঙ্গম আকর্ষণের অগ্নিতে যখন তিন আত্মপুত্রও দুই রাজকন্যার লাবণ্য সম্ভোগের বাসনাতে ঘৃত সঞ্চার করা শুরু করলো, তখন দুই রাজকন্যার কাছে সঙ্গমসম্ভোগ এক নেশার ন্যায় আকর্ষণীয় হয়ে উঠলো।
নিত্য বললেও ভুল হবে, দিবারাত্র মিলিয়ে, প্রত্যহ চারবার করে, তাঁরা দুইজনে আত্মের তিনপুত্রের সঙ্গমসঙ্গিনী হয়ে যেতে থাকলেন। প্রথম দিকে দিবসে একটিবারই যেতেন তাঁরা। কিন্তু পরের দিকে নেশা সুতীব্র হয়ে উঠতে থাকলে, লুকিয়ে লুকিয়ে, দরজা দিয়ে না গিয়ে, জানালা দিয়ে দাসীদের সাহায্যে পলায়ন করে, সঙ্গমের অগ্নিতে নিজেদের তপ্ত করতে চলে যেতেন।
মানস ও ধরা গুপ্তচরদের সাহায্যেও সেই সংবাদ পেলেন না, কারণ আত্মপুত্ররা তাঁদেরকেও বশীকরণ করে রেখে দিয়েছিলেন। বশীকরণ করার একটিই উপায় তাঁদের কাছে উপস্থিত, আর তাই দিয়েই তাঁরা বশীকরণ করে থাকেন। আর এই বশীকরণ সামর্থ্যের বলেই পাঁচটি গুপ্তচর সেনানী, অর্থাৎ চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা ও ত্বক, সকলেই অন্তঃসত্ত্বা হয়ে গেলেন।
ধরাধামে, কেবল রাজবংশেই বিবাহের রীতি ছিল, তা ছাড়া, স্ত্রীরাই সন্তানের জন্ম দিতেন ও লালনপালন করতেন। তাই ইন্দ্রিয়রা গর্ভবতী হলে, কেউ তাঁদের প্রশ্নও করলেন না যে, কি ভাবে তাঁরা গর্ভবতী হলেন বা কার বীর্য ধারণ করে তাঁরা গর্ভবতী হলেন।
প্রশ্ন করলেই বা তাঁরা কি বলতেন? তাঁদের গর্ভে যেই সন্তানরা লালিত হচ্ছে, তাঁদের পিতা কে, তা তো তাঁরা নিজেরাও জানতেন না, কারণ তিন আত্মপুত্রের মিলিত বীর্যই যে তাঁদের গর্ভলাভের কারণ। তাঁদের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থা ক্রমশ প্রকট হলে, তাঁদের মধ্যে চক্ষু জন্ম দিলেন দুই যমজ পুত্র, ভয় ও লাজের। কর্ণ জন্ম দিলেন দুই যমজ পুত্রের, হিংসা ও দ্বেষের। নাসিকা জন্ম দিলেন ঘৃণা ও শঙ্কার। জিহ্বা জন্ম দিলেন কুলের ও ত্বক জন্ম দিলেন শীলের।
প্রতিটি পুত্রই অত্যন্ত বলশালী হয়, এবং তাঁদের চারিত্রিক গুণও বেশ বিচিত্র হয়। সকলেই এমন করে সম্মুখের ব্যক্তিকে নিজেদের দিকে আকর্ষণ করে সারাদিন সম্মুখে বসিয়ে রেখে দিতেন, আর সকলকে বাধ্য করতেন নিজেদের সমস্ত চাহিদা পুড়নের যে তাঁদেরকে একত্রিত করে সকলে অষ্টপাশ বলা শুরু করলেন। যেখানে ভয় সর্বদা নিজেকে ভয়ার্ত দেখিয়ে সম্মুখের সকলকে আবদ্ধ রাখতেন, সেখানে লজ্জা সকলের বিশেষ করে স্ত্রীদের স্তনদেশের বস্ত্র এমন ভাবে আকর্ষণ করতে থাকতেন যেন উঠে চলে যেতে গেলেই বক্ষের আস্তরণ অপসারিত হয়ে যাবে। ফলতই তাঁর কাছেই উপস্থিত থাকতে হয় স্ত্রীদের।
অন্যদিকে হিংসা ও দ্বেষের স্বভাব আরো বৈচিত্র্যপূর্ণ। এঁদের সম্মুখে যদি কলহ না করা হয়, তাহলে নরা ক্রন্দনে ফেটে পরে। মজার কথা এই যে, যখন এঁদের ক্রন্দন থামানোর জন্য কলহ করা হয়, তখন এমন সময়ে এঁরা হেসে ওঠে যে, কলহরতরা উত্তপ্ত হতে থাকে, আর তা হতে হতে এসময়ে এঁরা একে অপরকে আক্রমণই করে বসে।
অন্যদিকে, ঘৃণা সম্মুখের সকলকে ব্যাতিব্যাস্ত করে রাখে নিজের মলমূত্র দ্বারা। এবং শুধু মল্মুত্র ত্যাগ করেই সে শান্ত থাকেনা, এমনই অসহায় ভাবে করুন দৃষ্টিতে সম্মুখের ব্যক্তির দিকে এঁরা তাকায় যে, বাধ্য হয়েই তাঁদের মল্মুত্রকে পরিষ্কার করতে হয়। আর এঁদের জননীরা যমজ সন্তানের জন্ম দেবার কারণে এতটাই কাহিল থাকে যে অধিকতর সময়ে অন্য কারুকেই সেই কর্ম করতে হয়।
শঙ্কার ধারা হলো সবেতেই সে শঙ্কিত। সম্মুখে একটি গরু এলেও সে শঙ্কিত হয়ে চিলচিৎকার করে ক্রন্দন করে, আবার সম্মুখে একটি সারমেয় জীব এলেও আবার কখনো কখনো তো একটি অন্য মনুষ্য এলেও। কুলের ধারা অদ্ভুত ভাবে বিচিত্র। সে সকলের ক্রোরে যায়না, রাজঘরনার কেউ হলে, তবেই তাঁর কোলে যাবেন ইনি। তাই প্রায়শই সে দেবী চন্দ্রপ্রভা ও দেবী ধরার ক্রোড়েই থাকে। আর শীল দুরন্ত প্রকৃতির। শিশু হয়েও কি করে বোঝে সে, তার টের কেউ পায়না। কিন্তু সে যার যা গুরুত্বপূর্ণ সামগ্রী, তাকে লুকিয়ে রেখে দেন। সেই ব্যক্তি সমস্ত স্থানে তা খুঁজতে থাকে, আর শীল হামাগুড়ি দিয়ে সেই ব্যক্তির পিছনে গিয়ে, পা ছড়িয়ে বসে হাসতে থাকে।
এই শিশুরা ক্রমশ সমস্ত ধরাধামের সকলের আকর্ষণের বিষয় হতে থাকলো, কিন্তু এঁদের দেহগঠন দেখে, আর কেউ সন্দেহ করুক আর না করুক, দেবী শিখা ও দেবী বেগবতী সন্দেহ করে নিয়েছিলেন যে, এঁরা আত্মপুত্রদেরই সন্তান। এঁদের দীর্ঘ ও প্রস্থময় বপুই বলে দেয় যে, কাদের বীর্যে এঁদের জন্ম হয়েছে। তাই বিদ্বেষী হয়ে তাঁরা আত্মপুত্রদের কাছে একদিন গেলেন।
কামনায় জর্জরিত, সঙ্গমের নেশায় তাঁরা ঘর্মাক্ত হতে ব্যস্ত, কিন্তু বিদ্বেষে পরিপূর্ণ হয়ে ক্রোধিত। আকর্ষণ এখন অধিকারের দাবি করতে চাইছে। তাঁদের সঙ্গমসঙ্গীর সঙ্গলাভ করেছে অন্যকেউ, তাই ঈর্ষায় প্রজ্বলিত, অথচ তাঁরা নিজেরা কামান্ধ, তাই কামের লোভে জরাজীর্ণ। সমস্ত কিছু ভাব মিলে, যখন শিখা ও বেগবতী তিন আত্মপুত্রের সম্মুখে উপস্থিত হলেন, তখন শিখার সামনে পঞ্চব্যাঞ্জন প্রস্তুত করা রয়েছে।
আহার দেখে শিখা সমস্ত কিছু ভুলে গিয়ে আহার করতে বসলেন। আর এমনই মজে গেলেন সেই আহারে, যেন কামনা, ক্রোধ, লোভ, আকর্ষণ, ঈর্ষা সমস্তই তাঁর গর্ভে চলে গেল, আর সমস্ত মিলে শিখার কামাগ্নি দাবানলের আকার ধারণ করলো। অন্যদিকে, এমন যে কিছু ঘোটতে চলেছে, তার আন্দাজ আত্মপুত্ররা পূর্বেই করেছিলেন। আর তাই তাঁরা এক নাট্য প্রস্তুতই রেখেছিলেন।
সেই নাট্য অনুসারে, ব্রহ্মাণ্ডপুরের কিছু সেনা আক্রমণ করে বেগবতীকে। কিন্তু আত্মপুত্ররা অতি অনায়সে সেই প্রায় ৩০জনের সেনাকে পরাস্ত করে দিলে, বলের ব্যবহারের সময়ে ত্রিভ্রাতার মাসপেশীর দর্শন বেগবতীকে অত্যন্ত কামাতুর করে দিতে থাকলে, তাঁরও সমস্ত ক্রোধ, লোভ, ঈর্ষা মিলে মিশে এক প্রবল কামাগ্নির সঞ্চার করে।
আর তাই, ত্রিভ্রাতার উপর, শিখা ও বেগবতী একপ্রকার শিকারি সিংহের ন্যায় ঝাঁপিয়ে পরে, প্রবল কামালিঙ্গনে মত্ত হয়। সেই কামপর্ব এতটাই প্রবল হয়ে ওঠে যে, তিন দিবস, তিন রাত্রি হয়ে যায় শিখা ও বেগবতী গৃহে প্রত্যাবর্তন করেন না। অবশেষে যখন তাঁরা গৃহে প্রত্যাবর্তন করার জন্য উদ্যোগী হয়, তখন আর তাঁদের উঠে দাঁড়ানোর সামর্থ্যও নেই।
দেহে ব্যাথা নেই, না আছে বেদনা। প্রবল কামনার নেশায় তাঁদের চরণ টলমল। ত্রিভ্রাতা তাই তাঁদেরকে পুনরায় পঞ্চব্যঞ্জন আহার করিয়ে নিদ্রা পাঠালেন, ও অতঃপরে চতুর্থ দিনের প্রভাতে তাঁরা জানালা দিয়ে নিজেদের কক্ষে প্রবেশ করে শুয়ে রইলেন।
প্রভাতে যখন তাঁদের কক্ষে দেবী ধরা প্রবেশ করলেন, তখন দেখলেন, তাঁর দুই কন্যাই শুয়ে রয়েছেন। তাই তিনি তাঁর স্বামীকে, মাতা চন্দ্রপ্রভাকে, সকলকে ডাকলেন। সকলে উপস্থিত হলে হৈহট্টগোলে, শিখা ও বেগবতীর নিদ্রার ব্যঘাত ঘটে। তাঁরা বিছানায় উঠে বসলে, দেবী ধরা ব্যকুল হয়ে তাঁদেরকে প্রশ্ন করলেন, “এই কয়দিন কোথায় ছিলিস তোরা?”
শিখা মাথা নামিয়ে রাখলে, বেগবতী উত্তর দিতে যায়। কিন্তু সেই সময়েই শিখার প্রবল বমন আক্রমণ হলে, সে নিজের বমন মুক্ত করতে একপ্রকার দৌড়ে যায়। মজার কথা, সে উঠে গেলে, দেবী ধরা ও দেবী চন্দ্রপ্রভা ভয়ার্ত ও সন্দেহের নজরে তাঁর দিকে তাকালে, সাথে সাথেই বমন বেগ আসে দেবী বেগবতীর। তাই সেও নিজেকে মুক্ত করতে উঠে যায়।
এই দেখে, দেবী ধরা ও দেবী চন্দ্রপ্রভার আর বুঝতে পাকি থাকেনা, কি ঘটেছে এই কয়দিনে। সাধারণ প্রজা যা করে করে, রাজপরিবারও যদি এমন ভাবে অবৈধ মেলামেশা করে, তাহলে প্রজার কাছে মুখ দেখাবে কি করে! … স্নেহ জাগতেই পারে, মিলনও হতেই পারে। কিন্তু একবারের মিলনে তো আর অন্তঃসত্ত্বা হওয়া যায়না। অর্থাৎ এই মিলন পর্ব বহুদিনের, আর তা চলছিল সকলের চোখের আড়ালে। …
শিখা ও বেগবতী ভয়ে ভয়ে দেবী ধরার কাছে এসে বসলে, দেবী ধরা একপ্রকার শাসন করার মত করি প্রশ্ন করলেন, “কার বীর্য ধারণ করেছ তোমরা?”
শিখা মাথা নিচু করে বললেন, “মহারাজ আত্মের পুত্রদের”।
দেবী ধরা আরো তীব্রতা বারিয়ে প্রশ্ন করলেন, “তারা তো তিনজন, তুমি কি একাকী তিনজনের সাথে…” হতাশার আর বিরক্তির নিশ্বাস ছেড়ে মানসের দিকে তাকালেন দেবী ধরা।
মানস বললেন, “পূর্বেই বলেছিলাম, মেধার দিকে না তাকিয়ে, এই দুই মেয়ের দিকে তাকাও একটু। … বেগবতীকে প্রশ্ন করে দেখো, একই উত্তর পাবে”।
দেবী ধরা আচম্বিত হয়ে বেগবতীর দিকে তাকালে, বেগবতী সঙ্গে সঙ্গে মাথা নামিয়ে নিলেন। দেবী ধরা আর ধৈর্যের সীমা ধরে রাখতে পারলেন না। তিনি গর্জন করে উঠলেন, “তুমি কাদের বীর্য ধারণ করেছ, সেটা জানতে কি তপস্যায় বসতে হবে!”
বেগবতী একপ্রকার চমকে উঠেই বললেন, “একই, মহারাজের তিন পুত্র”।
ধরা হতাশ হয়ে বসে পরলেন। যেন জড়বস্তু হয়ে গেছেন তিনি। মুখ থমথমে। ক্রন্দন করে উঠবেন নাকি গর্জন করে উঠবেন, নাকি যুবতী কন্যাদেরকে হাতে ছড়ি নিয়ে শাসন করবেন, তা যেন তিনি নিজেও জানেন না, আর আশেপাশের কেউও বুঝতে পারছেন না।
দেবী চন্দ্রপ্রভা শান্ত হয়ে বললেন, “ঠিক আছে, এখন আর বকাঝকা করে কি হবে। … বাবা মানস, তুমি বরং মহারাজ আত্মকে খবর দাও। সে যেন এসে তাঁর পুত্রবধূদের বরণ করে যায়। তুমি নিজেই যাও সেখানে বাবা। এমন কথা লোক মারফত পাঠানো উচিত নয়, কন্যার পিতা তুমি। … তুমি নিজে যাও, আনন্দ সংবাদ দাও, তবে হ্যাঁ গোপনে দিও। বিবাহের আগে রাজপরিবারের কেউ অন্তঃসত্ত্বা হয়ে গেছে, বড়ই লজ্জার ব্যাপার তা। তাই সর্বসমক্ষে সেই কথা বলো না”।
খানিক থেমে দেবী চন্দ্রপ্রভা আবার বললেন, “আর হ্যাঁ মানস, তুমি তাঁকে বলো, এই ভরাপেটে আমরা আমাদের কন্যাকে ছাড়বো না। সন্তানের জন্ম দিয়েই তবে যাবে তারা”। যাও দিন থাকতে বেড়িয়ে পরো, তাহলে দিনের মধ্যেই ফিরে আসতে পারবে”।
ধরা মানসের দিকে তাকিয়ে বললেন, “”আপনার সাথে আমার কিছু কথা আছে”।
কক্ষ থেকে বাইরে নিয়ে গিয়ে, নিজেদের কক্ষে প্রবেশ করিয়ে দেবী ধরা বললেন, “আত্মের রক্ত আমাদের কন্যার দেহে বইছে। প্রথম অবস্থা, আপনি যদি বলেন, তাহলে বৈদ্য ডেকে, প্রথমেই এর প্রতিকার করা সম্ভব”।
মানস বললেন, “কি বলছেন দেবী। সঙ্গমে যেকেউ লিপ্ত হতেই পারে। কিন্তু সন্তানপ্রাপ্তি মাতার ইচ্ছা ব্যতীত সম্ভব নয়। আপনি তো এই সত্য জানেন। তা জেনেও এমন কথা বলছেন? … না না দেবী, এমন বিচার মনে আনাও সঠিক নয়। যখন গর্ভবতী হয়েছে, তখন যদি মায়ের ইচ্ছা হয়, তবে সেই সন্তানের জন্মও হবে”।
দেবী ধরা বিচলিত হয়ে বললেন, “তা বলে আত্মের রক্ত!”
মানস মৃদু হেসে বললেন, “যেমন জগন্মাতার ইচ্ছা। কে বলতে পারে, এই সমস্ত কিছুর মাধ্যমে তিনি নিজেরই পুনরাগমনের রাস্তা করছেন কিনা! … দেবী, দৈবাৎ কর্মে হস্তক্ষেপ ভয়ানক হতে পারে। হ্যাঁ, হতে পারে এতে আমাদের প্রাথমিক পরিনতি ভালো হবেনা। তবে আমাদের জগজ্জননীর উপর আস্থা রাখা উচিত। অনুমতি প্রদান করুন দেবী। আমাকে যাত্রা করতে হবে”।
কিছু সেবিকার হাতে সম্পদ, মিষ্টান্ন ও বাদামাদি নিয়ে, মানস রাজবেশে যাত্রা করলেন ব্রহ্মাণ্ডপুরের উদ্দেশ্যে। সেখানে উপস্থিত হয়ে মহারাজ আত্মের সাথে সাখ্যাত করলেন। মহারাজ আত্ম তাঁর খাতিরযত্ন করলে, নিভৃতে কিছু কথা বলতে চাইলেন।
নিভৃতে উপস্থিত হয়ে, মহারাজ আত্মকে মানস বললেন, “মহারাজ আত্ম, আমার দুই কন্যা আপনার তিন পুত্রের বীর্য ধারণ করে এখন গর্ভবতী। এই কথা আমাদের রাজমহলের সদস্য ব্যতীত, এখন আপনি জানলেন। প্রজাদের বিবাহ হয়না, কিন্তু তাদের সংযম শিক্ষা দেওয়া হয়, যাতে তারা সংযমিত জীবনযাপন করেন। কিন্তু একই গর্ভে, তিন পুরুষের একত্রিত বীর্য স্থাপিত হয়েছে, তাও রাজপুরের কন্যার মধ্যে, সেই কথা জানলে, তাঁদের মধ্যে সংযমের বাঁধ ভেঙে পড়বে। তাই একপ্রকার নিঃশব্দেই এসেছি, কন্যাদের বিবাহ প্রস্তাব নিয়ে”।
আত্ম হেসে বললেন, “বিবাহ প্রস্তাব, সে তো খুব ভালো কথা। আর যেহেতু অন্তঃসত্ত্বা হয়ে গেছে, তোমার কন্যারা মানস, সেহেতু আর তো অপেক্ষা করাও উচিত নয়। আমি শীঘ্রই আমার তিন রানীকে নিয়ে সেখানে উপস্থিত হয়ে, তোমার দুই কন্যার সাথে আমার তিন পুত্রের বিবাহ সম্পন্ন করবো। … তবে তোমার তো তিন কন্যা, তাই না মানস?”
মানস বুঝতে পারলেন, আত্মের ও আত্মের রানীদের পরিকল্পনাই ছিল, তাঁর তিন কন্যাকে গর্ভবতী করে বিবাহ করা। তবে তিনি এইক্ষণে কন্যা দায়গ্রস্ত। তাই সহজ ভাবেই বললেন, “মহারাজ, আমার কনিষ্ঠ কন্যা, মেধার মনচেতা অন্যকিছুর সন্ধান করে ফেরে। আর সে তাঁর দুই জ্যেষ্ঠ ভগিনীর থেকে অনেকটাই বয়সে ছোট। তাই, সে এই সমস্ত কিছুর মধ্যে নেই”।
আত্ম এমন ভাবেই হেসে উঠলেন যেন কিছু হয়ইনি। হেসে উঠে তিনি বললেন, “তা বেশ বেশ। কেউ না কেউ তো পিতামাতার উত্তম সংস্কার পাবেই, তাই না। … কনো চিন্তা করো না। আগামী সাপ্তহের মধ্যে, একটি ভালো দিনক্ষণ দেখে, আমরা সকলে উপস্থিত হচ্ছি তোমার কাছে। … আর হ্যাঁ, অবশ্যই যাত্রার দিন নিশ্চিত হবার পরে, দূত দিয়ে তোমার কাছে আমাদের আগমনের বার্তা প্রদান করে দেব। … কিন্তু এখন তো আমাদের মিষ্টিমুখ করা উচিত, কারণ তুমি আমি, উভয়েই দাদু হতে চলেছি”।
মানস এবার হেসে বললেন, “মিষ্টিমুখের জন্য ধরাধামের শ্রেষ্ঠ মিষ্টান্নব্যাঞ্জন এনেছি আপনাদের রাজপুরের সকলের জন্য, এমনকি সমস্ত প্রজার জন্যও। দয়া করে আপনারা সেই মিষ্টান্ন গ্রহণ করুন”।
আত্ম হেসে বললেন, “সেই মিষ্টান্ন তো অবশ্যই গ্রহণ করবো, আর মহা উৎসব করে, সমস্ত প্রজাকেও সেই মিষ্টান্ন বিতরণ করবো। … তবে আপাতত আমার রাজ্যের মিষ্টান্ন গ্রহণ করে, এই সন্ধির সম্বন্ধকে আগে এগিয়ে নিয়ে চলো মানস”।
মানস গদগদ হয়ে বললেন, “আরো একটি কথা মহারাজ। … বলছিলাম যে, রাজপুরের স্ত্রীরা বলছিলেন যে, যেহেতু গর্ভবতী হয়ে গেছে কন্যারা, এই অবস্থায়, তাঁদের এতটা দূরত্বে প্রেরণ না করাই সঠিক হবে। একবার বিবাহ হয়ে গিয়ে তাঁদের গর্ভধারণ সার্থক হয়ে সন্তানের জন্ম হয়ে গেলে, তারপর না হয়, নাতিপুতি সমেত পুত্রবধূদের নিয়ে আসবেন আপনার রাজ্যে। তা এটা কি করা সম্ভব হবে? মানে, আমি তো আমার দিক থেকে কথা বলে দিলাম। এবার আপনিও একটু দেখেবুঝে নিন। আপনিও তো এক মহারাজ। আপনাকেও তো আপনার প্রজাদের কিছু উত্তর দিতে হবে!”
আত্ম হেসে উঠে বললেন, “প্রজার ব্যাপারে এতো ভাবতে নেই মানস। রাজার সমস্ত কাজ প্রজার কাছে ভগবান কৃত্য হবে। তবেই না তারা সঠিক প্রজা হতে পারলেন। পূর্বের ধারণার এবার বদল হওয়া আবশ্যক মানস। কাহাতক সর্বক্ষণ রাজা রানীরা নিজেদের প্রমাণ করতে থাকবেন প্রজাদের কাছে। আমার রাজ্যে রাজা রানী বা রাজপুরের কেউ প্রজার কাছে কিচ্ছু বলতে কিচ্ছু প্রমাণ দেয়না। এখানে প্রজা রাজার কাছে প্রমাণ দেয় যে, তারা যোগ্য প্রজা।
তাই ওসব নিয়ে কিচ্ছু ভেবো না। আমি তোমাকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, আগামী ৬ বৎসর, আমার পুত্র ও পুত্রবধূ ও তাঁদের সন্তানরা তোমার রাজ্যেই থাকবে। … অতঃপরেই আমি তাঁদেরকে আমার রাজ্যে নিয়ে আসবো। আর এমন ভাবার কনো কারণ নেই যে, ৬ বৎসর পরে তারা এখানে চলে আসলে, তারা আর সেখানে যাবেনা। আমি কথা দিচ্ছি মানস। তার পরের ৬ বৎসর তারা এখানে থাকবে। কিন্তু তার পরবর্তী ৬ বৎসর, আবার তারা তোমার রাজ্যেই থাকবে।
মানস, যেমন তারা আমার নাতিপুতি, তেমন তো তারা তোমারও নাতিপুতি। তোমার তো কনো পুত্র নেই, অর্থাৎ এমন তো সম্ভব নয় যে, তোমার পুত্রের সন্তানরা তোমার রাজপুরে খেলে বেড়াবে। তাই তোমার কন্যার সন্তানরাই সেখানে থাকবে, আবার তারা এখানেও থাকবে। এখানে ৬ বৎসর, আর সেখানে ৬ বৎসর, এই ভাবে থাকবে।
আর হ্যাঁ, প্রজার কথা চিন্তা করো না। রাজার কাজ নয় যে সে প্রজার কথা চিন্তা করবে। প্রজার দায়িত্ব যে তারা রাজার কথা চিন্তা করবে। … আমি আমার রাজ্যে এই নিয়ম স্থাপিত করে রেখেছি। যত শীঘ্র সম্ভব, তুমি তোমার রাজ্যেই একই নিয়ম স্থাপিত করে দাও। দেখবে, প্রজা কি বলবে, প্রজা কি ভাববে, এই ধরনের প্রজার কাছে নিত্য পরীক্ষা দেবার দিন সমাপ্ত হয়ে যাবে”।
মিষ্টিমুখ করে, সকলকে নিজের রাজ্যে যাবার প্রতিশ্রুতি প্রদান করে, মানস নিজের রাজ্যে প্রত্যাবর্তনের জন্য প্রস্তুত হলেন। যখন প্রত্যাবর্তন করছিলেন, তখন দেখলেন সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডপুরের প্রজা তাঁকে দেখার জন্য সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। মানস ভাবলেন, ব্রহ্মাণ্ডপুরের প্রজার কাছে তিনি হলেন মাতা ব্রহ্মময়ীর হত্যাকারী রাজদ্রোহী। তাই মাথা নিচু করে ততদূর গেলেন, যতদূর মহারাজ আত্ম তাঁকে অভ্যর্থনা প্রদান করলেন।
অতঃপরে, তিনি প্রজার অঞ্চলে প্রবেশ করলেন, এবং প্রজার সাথে সাখ্যাত করার প্রয়াস করলেন। কিছু প্রবীণ প্রজা তাঁর সম্মুখে এসে বললেন, “মানস, তুমি এখানে কেন প্রবেশ করেছ। রাজা আত্মের গুপ্তচর সর্বত্র রয়েছে, রাজার কাছে খবর চলে যাবে। … তুমি তো চলে যাবে, অন্য রাজ্যের মহারাজের সাথে সাখ্যাত করেছি বলে, আমাদের উপর বেত্রাঘাত হবে তারপর। … আমাদের ঘরের স্ত্রীদের রাজা আত্মের সেনারা তুলে নিয়ে গিয়ে, তাদের গর্ভবতী করে দেবে। তুমি চলে যাও মানস। কৃপা করে চলে যাও”।
মানস করজোড়ে বললেন, “কিন্তু এমন দশা আপনাদের কি করে হলো। পূর্বে তো এমন ভাবে থাকতেন না আপনারা!”
অন্য এক প্রবীণ বিদ্রূপের হাসি হেসে বললেন, “ভেবো না। রাজা আত্মের পুত্রদের সাথে কন্যার বিবাহ দিচ্ছ তো। যখন তুমিও রাজার আত্মীয় হয়ে যাবে, তখন তুমিও মাতা ব্রহ্মময়ীর দেওয়া সংস্কার ভুলে যাবে, আর তুমিও এমনই হয়ে যাবে”।
মানস পুনরায় করজোড়ে বললেন, “আমি অন্য কিছুর জন্য আসিনি, ভ্রাতাগণ। … আমি এটুকু বলতে এসেছি যে, আপনারা আমাকে যে রাজদ্রোহী মনে করেন, আমি কিন্তু রাজদ্রোহী নই”।
এক বৃদ্ধা সম্মুখে এসে বললেন, “এতদিনে সেই কথা আমরাও বুঝে গেছি। … যেই ব্যক্তি রাজা হয়ে, মাতা ব্রহ্মময়ীর সমস্ত আদর্শকে নিজের রাজ্যের প্রজাদের মধ্যে স্থাপন করেছেন, তিনি তাঁর বিরোধী কি করে হতে পারে। … আমরা সমস্তই বুঝি। … কিন্তু এক্ষণে তুমি এখান থেকে এসো। … আর মাতার সময়কাল নেই, আর তাঁর পুত্র মানসের রাজ্যে আমরা বাস করি। … এখানে রাজাকে নয়, প্রজাকে প্রমাণ দিতে হয় যে, তাঁরা রাজার মান করে।
এখানে রাজা প্রজাকে মান্য করে না, দিবারাত্র শোষণ করে; করের বোঝা চাপিয়ে দেয়, সমস্ত কিছুতে কর, পথ চলতে গেলেও কর, আর শকটে উঠতে গেলেও কর। খাদ্য সামগ্রী ক্রয় করতে গেলেও কর, আবার অন্যের প্রস্তুত করা খাদ্য খেতে গেলেও কর। …
তারপর তো, নারীনির্যাতন, শিশুনির্যাতন আছেই। আর সঙ্গে আছে, মহারাজের গুণগান করার পালা। তাঁর গুণগান না করলেই, দণ্ড। তিনি যা আহার করেন, তা প্রকৃতির প্রতি অন্যায় করা হলেও, তাই গ্রহণ করতে হবে প্রজাকে, যদি না করে তা প্রজা, তাহলে নিজের সেনা দ্বারা গণপিটুনি প্রদান করে হত্যা করে রাজা। … তাই মানস, তুমি এখন এসো।
আর হ্যাঁ, অপরাধী তুমি নও আমাদের কাছে। আমরা অপরাধী তোমার কাছে। আর সেই অপরাধেরই সাজা ভোগ করছি আমরা আজ। … সেদিন যদি তোমাকে বিশ্বাস করতাম, তাহলে আজ আমরা এই দিন দেখতাম না। এমন স্বৈরাচারের সম্মুখীন হতাম না। … আমরা আমাদেরই কর্মের ফল ভোগ করছি মানস, তাই অভিযোগ করা আমাদের মানায় না। তুমি এসো, আর দেখো, যদি তোমার এই ভ্রাতাভগিনীদের উদ্ধার করা সম্ভব হয় তো”।
ভারাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে মানস প্রত্যাবর্তন করতে থাকলেন নিজের রাজ্যে। তাঁর ভ্রাতাভগিনীরা অত্যন্ত কষ্টে রয়েছে, আর তিনি মহানন্দে নিজের রানী ও কন্যাদের নিয়ে সুখে জীবনযাপন করছেন। … এ যে অন্যায়, কিছু করা উচিত। কিন্তু কি করবেন তিনি! রাজ্যের অবস্থা এখন এমন যে, রাজপুরের মানসম্মান সমস্ত কিছু রয়েছে মহারাজ আত্মের হাতে। একপ্রকার অলিখিত বন্দীদশায় রয়েছেন তিনিও।
ধরাধামে প্রত্যাবর্তন করে, মহারাজ আত্মের ঘোষণা ও প্রতিশ্রুতি শ্রবণ করালেন সকল রাজপুরের ব্যক্তিত্বদের। ৬ বৎসর করে, পুত্রীরা ও তাঁর সন্তানরা তাঁদের কাছেই থাকবে জেনে, সকলের আনন্দের সীমা নেই।
ক্রমে পরবর্তী সপ্তাহ এলো, রাজা আত্ম প্রতিশ্রুতি মতই, তাঁর সেনা ও তিন রানী নিয়ে প্রবেশ করলেন ধরাধামে, এবং সেখানের বিশেষ অতিথি হয়ে বিরাজ করে, পুত্রদের বিবাহ সম্পন্ন করলেন। মানসকন্যাদ্বয়কে পুত্রবধূরূপে গ্রহণ করলেন, আর বার বার আক্ষেপ প্রকাশ করলেন, মেধা তাঁর পুত্রবধূ হলেন না বলে।
ধুমধাম করে বিবাহ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হলে, রাজকন্যাদের ইচ্ছা অনুসারে, একটিই কক্ষে, তিন রাজপুত্র ও দুই রাজকন্যাকে থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন মহারাজ মানস। এবং তেমন করার পর থেকে, প্রায় কনো কাজেই বা কনো সময়েই, শিখা ও বেগবতীকে রাজপুরের অন্যস্থানে দেখা যেতো না, কারণ তাঁরা সদাই তাঁদের তিন স্বামীদের সাথে সঙ্গমে লিপ্ত থাকতেন।
অন্যদিকে, মহারানী ধরার চিন্তার বিষয় হয়ে ওঠে মেধা। তাঁর দুই ভগিনী আজ ভাবি মহারানীর জীবনযাপন করছেন, কিন্তু মেধা আজও কেবলই রাজকন্যা। তাঁর একটিই সঙ্গী, আর তা হলো তাঁর প্রশ্নের মালা। সেই সঙ্গীদের রাখার কনো স্থান নেই। তাই সেই সঙ্গীদের নিয়ে মেধা অধিকাংশ সময়, ত্রিবৃক্ষের কাছেই থাকেন।
প্রায়শই তিনি নিজের কক্ষে রাত্রি যাপন করেন না। সমস্ত রাত্রি এই তিন বৃক্ষের তলেই থাকেন। সেখানে থেকে হয় নিজের প্রশ্নের মালাতে আরো প্রশ্ন যুক্ত করে, সেই মালাকে বৃহত্তর করে চলেছেন, নয় কনো না কনো প্রশ্নের মালাকে ধারণ করে করে, সেই প্রশ্নের মালার উত্তর লাভ করে করে, তার প্রয়োজন সমাপ্ত করে চলেছেন।
এমন ধারায় জীবনযাপন করার জন্য ধরা তাঁর এই কন্যাকে নিয়ে অত্যন্ত বিচলিত থাকতে শুরু করেন। আর সেই বিচলিত ভাবের তাড়না করতে, ইন্দ্রিয়দের অষ্টসন্তান নিয়েই অধিকাংশ সময়ে মহারানী ধরা ব্যস্ত থাকেন।
ক্রমে সময় প্রবাহিত হতে থাকলে, শিখা ও বেগবতীর ভরামাস উপস্থিত হলো, এবং প্রসববেদনা ধারণ করে, তাঁরা একটি একটি করে দুটি কন্যার জন্মদান করলেন। দুই কন্যার ক্ষেত্রেই, ত্রিআত্মপুত্রের প্রায় সমান বীর্যগুণের প্রভাব প্রত্যক্ষ হয়ে ওঠে। শিখার কন্যার নাম রাখা হয় মদিনা, এবং অপরূপা দেখতে, বেগবতীর কন্যার নাম রাখা হয় মোহিনী।
এই দুই কন্যার একদিকে যখন বয়োবৃদ্ধি হতে থাকে, তখন শিখা ও বেগবতীর যেন কামনার ও লোভের নতুন করে উদ্বেগ ঘটে তাঁদের স্বামীদের প্রতি। তাই এই সন্তানদের নিয়ে মানস ও ধরাই উন্মত্ত রইলেন, কিন্তু শিখা ও বেগবতী উন্মত্ত রইলেন নিজেদের কামনাসঙ্গী আত্মপুত্রদের নিয়েই।
এঁদের মধ্যে মোহিনীর স্বভাবে ধরা, মানস সকলেই অত্যন্ত প্রভাবিত। সর্বাঙ্গসুন্দর দেহ, তারই মধ্যে বিচিত্র এঁর ভাবগতিক। যেন এক পবিত্রতার সদাসন্ধানী এই কন্যা। নাতনীদের দেখতে আত্মস্ত্রীরা প্রায়শই আসাযাওয়া করেন এখন ধরাধামে। আর মোহিনী দেবী চিন্তার প্রতি যেন একটু বেশীই আকৃষ্ট। তবে দেবী ইচ্ছা ও কল্পনার প্রতিও তাঁর আকর্ষণ কম নয়।
অন্যদিকে মদিনার আকর্ষণ অধিক ইচ্ছার প্রতি। কিন্তু দিবারাত্র সঙ্গমসুখের সাগরে নিহাররত দেবী শিখা ও বেগবতীর এই কন্যাদের আচরণের যেন সঠিক করে কনো ভানও নেই। দেখতে দেখতে, এই শিশুরা একটি বৎসরের হয়ে উঠলে, পুনরায় শিখা ও বেগবতী গর্ভবতী হলেন। কিন্তু গর্ভবতী হয়ে গেলেও যেন শিখার কামনার কনো অন্ত নেই। বেগবতীও কম যায়না। সে যে গর্ভবতী, সেই দিকে যেন তাঁর কনো হুঁশই নেই। অত্যন্ত লোভের সাথে, তিন স্বামীর বীর্যপান করার লোভে তিনি মত্ত।
আর তাই এবার তাঁদের থেকে যেই সন্তানরা জন্ম নিলেন, তাঁদের নামকরণ করা হয়, কামনা ও লিপ্সা। শিখার কন্যাসন্তানের নাম হয় কামনা, ও বেগবতীর সন্তানের নাম হয় লিপ্সা। এঁদের নামকরণ সত্যই যথার্থ কারণ, এঁদের সকলের আগমনের সাথে সাথে, রাজপুরের সকলের মধ্যে মোহ, মদ, কামনা ও লিপ্সার অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সাথে বিস্তার হতে থাকে।
সেই বিস্তার এমনই হয় যে, বৃদ্ধা দেবী চন্দ্রপ্রভা এই বৃদ্ধাবয়সেই তাঁর স্বামীর বীর্যপান করা শুরু করলেন, আর ধরা পুনরায় সঙ্গমে লিপ্ত হলেন মানসের সাথে। না চন্দ্রপ্রভা আর না ধরা, না চন্দ্রনাথ আর না মানস লক্ষ্য করলেন, কিন্তু এঁদের সকলের অলক্ষ্যেই, এঁরা এমন সঙ্গমে লিপ্ত হলেন, যেমন সঙ্গমে এঁরা এর পূর্বে কখনোই লিপ্ত হননি।
তাঁরা পূর্বেও সঙ্গমে লিপ্ত হয়েছেন, এবং সন্তানের জন্মও দিয়েছিলেন, কিন্তু সেইকালে তাঁদের সঙ্গমের মধ্যে ছিল নিজেকে সমর্পণের ভাব, কিন্তু এবারের সঙ্গমে প্রত্যক্ষ হয়ে ওঠে, একে অপরকে সম্ভোগ করার ভাব।
কেউ এইসবের দিকে নজর দেয়নি বলা ভুল হবে, কারণ একজনের নজরে সমস্ত কিছুই আসছিল। কেমন ভাবে তিনবৎসরের মোহিনীর প্রতি সকলে মোহগ্রস্ত হয়ে উঠছেন, তিন বৎসরের মদিনার প্রভাবে এসে সকলের মধ্যে আমিত্বের বিস্তার হচ্ছে, সদ্যজন্মা কামনার ফলে সকলের মধ্যে কেমন কামনার তীব্রতার আঁশটে গন্ধ বিচ্ছুরিত হচ্ছে, আর সদ্যজাত লিপ্সার জন্য, কেমন ভাবে সকলে যা তাঁদের নয়, তার উপর লোভভাবের বিস্তার করছে, সেই সমস্তই মেধার দৃষ্টিতে আসতে থাকলো।
তবে তিনি এই সমস্ত কিছুর প্রতিবাদ করলেন না। বরং এই সমস্ত কিছু তাঁর প্রশ্নমালাগুলিকে অত্যন্ত বিশাল করতে থাকলো। আর ক্রমে ক্রমে, এবার সে রাজপুরে থাকাই বন্ধ করে দিলেন। রাজপুরের বাতাবরণের গন্ধ আর তাঁর ভালোলাগতো না। সকলের অঙ্গ থেকে কেমন যেন এক অস্ফুট বীর্যের গন্ধ ভেসে আসতো, যাকে আতরের উগ্র গন্ধ দিয়ে সকলসময়ে চেপে রাখার প্রয়াস করা হতে থাকে। চারিদিকে কেবলই কামনা, মোহ, লোভ আর মদভাবের ছড়াছড়ি। তাই মেধা একসময়ে রাজপুরে প্রবেশ করাই বন্ধ করে দিলেন।
কিন্তু এবার মেধার এহেন আচরণে দেবী ধরা বিচলিত হলেন না, কারণ তিনি যে এখন নূতন ধারার সঙ্গম সুখে জর্জরিতা। কিন্তু বিস্তার পেল একটি অন্য ভাব। মেধার রাজপুর ত্যাগের কারণে এমন হলো কিনা, জানা সম্ভব নয়, তবে শিখা ও বেগবতীর মধ্যে এক পারস্পরিক ক্রোধ, সন্দেহ ও ঈর্ষাভাবের সঞ্চার হতে থাকলো।
সেই ঈর্ষাভাব ও ক্রোধভাবের সঞ্চারের ভিত্তি হলো আত্মের তিন পুত্র। যেই আত্মপুত্রের সাথেই শিখা রমণে লিপ্ত থাকে, তার প্রতিই ঈর্ষা জাগে বেগবতীর। আবার বেগবতীর সাথে যেই পুত্র সঙ্গমে লিপ্ত থাকে, তার প্রতি ক্রোধ জন্ম নিতে থাকে শিখার। আর উভয়েই সর্বক্ষণ তিন আত্মপুত্রকেই সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখতে থাকে। এই ভাব একসময়ে প্রবল হতে শুরু করলে, তা রাজপুরের প্রধান বিচার্যবিষয় হয়ে ওঠে। আর দেখতে দেখতে, দুই রাজকন্যা বিবাহবিচ্ছেদের দাবি করে বসে।
সেই বার্তা ব্রহ্মাণ্ডপুরেও প্রবাহিত হলে, মহারাজ আত্ম অত্যন্ত ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন, এবং ধরাধামকে আক্রমণ করার হুঙ্কার করে বসেন। দেবী চিন্তা তাঁর কাছে এসে বলেন, “একি মহারাজ, আপনি অশান্ত হয়ে উঠছেন কেন? … আপনার তো আনন্দিত হওয়া উচিত যে, আপনার পুত্ররা আপনার কাছে ফিরে আসতে চলেছে!”
আত্ম পুনরায় হুঙ্কার দিয়ে বলে উঠলেন, “কিন্তু এ যে আমাদের অপমান দেবী!”
দেবী কল্পনা এবার বক্রওষ্ঠে বললেন, “মহারাজ, সামান্য শান্ত হয়ে ভাবুন একটু। ব্রহ্মাণ্ডপুরের প্রজা তো আমাদের বশেই রয়েছে। কিন্তু যেই সন্তানদের আমাদের পুত্ররা জন্ম দেবার কারণে, ধরাধামের রাজপুর উচ্ছন্যে যাচ্ছে, এবং ধরাধাম দ্বিতীয় ব্রহ্মাণ্ডপুর হবার পথে চলেছে, আমাদের সন্তানরা যদি পুত্রবধূদের সঙ্গে নিয়ে প্রত্যাবর্তন করতো, তাহলে তো সেই সন্তানদেরও সঙ্গে নিয়ে আসতো। তাহলে কি আর ধরাধাম দ্বিতীয় ব্রহ্মাণ্ডপুর হতে পারতো?”
দেবী ইচ্ছা সম্মুখে এসে বললেন, “মহারাজ, এর থেকে বরং একটি কাজ করি আমরা। আপনি ও আমরা সকলে চলুন ধরাধামে যাই। সেখানে গিয়ে বলি যে, এই বিবাহ হয়েছিল আমাদের পুত্রদের ইচ্ছাতে আর মানসের কন্যাদের ইচ্ছাতেই। তাই যদি আমার পুত্ররা আর মানসের কন্যারাই এই বিবাহকে আর স্বীকৃতি না দিতে চায়, তাহলে আর কিই বা করা যেতে পারে। … তবে এই বিবাহের থেকে উৎপন্ন সন্তানদের উপর তো আমাদেরও অধিকার আছে।
মোহিনী আর লিপ্সা যেমন চিন্তা বলতে অজ্ঞান, মদিনা আর কামনা যেমন আমাতে অত্যন্ত আকৃষ্ট, আর আমাদের স্থির বিশ্বাস যে, আগামী সন্তানরা কল্পনার প্রতি অত্যন্ত আকৃষ্ট হবে। সেই শিশুদের আকর্ষণে কেন বাঁধা দেওয়া হবে? সেটা কতখানি ন্যায় হবে! … তাই আমরা যাতে সর্বক্ষণ সেখানে যেতে পারি, আর সন্তানদের পিতারা যাতে সন্তানদের কাছে প্রায়শই যেতে পারে, সেই অনুমতি নিয়ে আসি চলুন”।
দেবী চিন্তা বললেন, “মহারাজ, একটি কথা ভুললে চলবে না, মেধা কিন্তু এখনো আমাদের কব্জায় নেই। … যতদূর জেনেছি, মেধা অত্যন্ত বুদ্ধিমতী এবং প্রবল ভাবে বিচক্ষণ। … মহারাজ, আমাদের পুত্রদের রাজ্যে ফিরিয়ে এনে, তাদের বঝানো প্রয়োজন যে, মেধা যতক্ষণ তাঁদের প্রতি কামনায় আকৃষ্ট হচ্ছেনা, ততক্ষণ আমরা সম্পূর্ণ সুরক্ষিত নই। … আর দিদি যেমন বললেন যে, আমাদের নাতনীদের মুখ দেখার জন্য, আর সন্তানদের পিতাদের সন্তানদের সাথে সময় কাটানোর অনুমতি নিয়ে আসতে, সেটিই হবে সুযোগ, মেধাকে কামনার ফাঁদে ফেলার”।
দেবী কল্পনা বললেন, “আর মহারাজ চিন্তা করবেন না, যেই চার সন্তানের জন্ম দিয়েছে আমার সন্তানরা, আর তারা যেই পরিমাণ ধরাধামের রাজপরিবারকে আকর্ষণ করে রেখেছে, তার সাথে আমাদের সংসর্গ পেতে থাকলে, আমাদের নাতনীরা সম্পূর্ণ ধরাধামকে বশীকরণ করে নেবে। তখন আমরা সম্পূর্ণ ব্রহ্মাণ্ডপুর ও ধরাধাম মিলিয়ে একটিই রাজ্য করবো। অখণ্ড রাজ্য করবো”।
মহারাজ আত্ম শান্ত হয়েছেন, আর প্রফুল্লিতও। তাই তিনি বললেন, “সেই রাজ্যের নামকরণ আপনাদের নামে হবে। তার নাম হবে ছায়াপুর”।
যখন মহারাজ আত্ম ও তাঁর ত্রিরানী একত্রে বসে এমন সলাপরামর্শ করছেন, তখন এক রাজদূত এসে সমাচার দিলেন যে, দেবী শিখা ও দেবী বেগবতীর তৃতীয়বার প্রসববেদনার সঞ্চার হয়েছে। সেই শুনে দেবী কল্পনা বললেন, “মহারাজ, এর থেকে উচিত সময় আর সম্ভব নয়। … চলুন মহারাজ, আমরা ধরাধামে যাই, আর আমাদের পুত্রদের নিয়ে আসি, সঙ্গে ধরাধামকে দিয়ে আসি আমাদের তরফ থেকে শর্ত। এই শর্ত তাদের মানতেই হবে, নাহলে যে যুদ্ধ হবে, তা ধরাধামও জানে, … তাই চলুন মহারাজ”।
যতক্ষণে রাজা আত্ম সেখানে সস্ত্রীক পৌঁছালেন, ততক্ষণে দেবী শিখা রাজ্ঞীর ও দেবী বেগবতী ঈর্ষার জন্ম দিয়ে দিয়েছেন। তবে জন্ম দেবার পরে যখন কক্ষে সন্তানদের পিতা প্রবেশ করে সন্তানদের মুখদর্শন করেন, তখন শিখা ও বেগবতী তাঁদের পতিদের মুখদর্শনও করেন না।
এমনই সময়ে মহারাজ আত্ম ও তাঁর স্ত্রীরা সেখানে উপস্থিত হলে, শিখা ও বেগবতী তাঁদের সম্মান প্রদর্শন করেন। কক্ষে যখন মানস, চন্দ্রনাথ, সূর্যনাথ, ধরা ও চন্দ্রপ্রভাও উপস্থিত থাকেন আর সঙ্গে সঙ্গে ত্রিআত্মপুত্র, আত্ম স্বয়ং, এবং তাঁর স্ত্রীরা একত্রে বিরাজ করেন, তখন দেবী শিখা বললেন, “সমস্ত গুরুজনদের উদ্দেশ্যে বলছি, আমাদের স্বামীরা আমাদের বিশ্বাস ভেঙ্গেছেন। আপনার গুরুজন, কিই বা আর বলবো আপনাদেরকে! … যখন তাঁরা আমাদের কারুর একজনের সাথে সঙ্গমে আবদ্ধ, তখনও তাঁরা অন্যজনের প্রতি দৃষ্টি রেখে গেছেন। … তাই আমরা আর এই বৈবাহিক সম্বন্ধকে মানছিনা”।
দেবী চিন্তা উত্তরে হেসে বললেন, “সঠিক বলেছ পুত্রী, এহেন সম্পর্ক রাখা অত্যন্ত কঠিন। আর এ এমনই ব্যাপার যে, আমরা যে বলবো আমাদের পুত্রদের হয়ে ক্ষমা চাইছি, তাও সম্ভব নয়, কারণ আচরণের জন্য ক্ষমা চাওয়া যায়, কিন্তু স্বভাবের জন্য ক্ষমা চাওয়া নিরর্থক। তবে পুত্রী, মহারাজ মানস, দেবী ধরা, একটি অনুরোধ রাখতে চাই। … অনুরোধ এই যে, এই সমস্ত সন্তানরা তো আমাদেরই পুত্রের ঔরসে জাত। তাই অধিকার তো আমাদের থেকেই যায়। … সেই অধিকার থেকেই বলছি, যদি আমাদের এখানে এসে এসে, সন্তানদের সাথে সাখ্যাত করার অনুমতি প্রদান করেন! … আর শুধু আমাদেরই বা কেন! সন্তানদের পিতাদেরও!”
মানস বুঝলেন, এটি কনো অনুরোধ নয়, এটি একটি শর্ত। যদি এই শর্ত না মানেন তিনি, তাহলে ব্রহ্মাণ্ডপুর ধরাধামকে আক্রমণও করে দিতে পারে। আর তাছাড়া যেই অধিকারের কথা বলছেন, তাও তো ন্যায্য। তাঁরা তো কমই চাইছেন। যদি সমস্ত সন্তানদের নিয়ে চলে যেতে চাইতেন, তাও ন্যায্যই হতো। এমন ভাবনা ভেবে তিনি বললেন, “না না, সঠিকই বলছেন দেবী আপনি। … আসলে ওরা ছেলেমানুষ। … যৌবনের আবেশে বিবাহ করেছে, আবার যৌবনের আবেশে বিবাহবিচ্ছেদও করছে। … অভিজ্ঞতা জন্ম নিলে, তারা দেখবেন আবার একত্রিত হয়ে যাবে। … তাই ওদের ছেলেমানুষির মধ্যে আমরা আমাদের সম্পর্ককে তিক্ত করবো কেন? আপনি যেমনটা বললেন, তেমনটাই হবে। … আপনারা, নাতনীদের তিন ঠাকুমা, মহারাজ আত্ম অর্থাৎ নাতনীদের ঠাকুরদা, আর সন্তানদের পিতারা সদাই আসতে পারেন এখানে। এখানে এসে রাজঅতিথি হয়ে, আপনরা অনায়সেই সন্তানদের সাথে সময় কাটিয়ে যেতে পারেন। নিশ্চিন্তে থাকুন দেবী। এটা ধরাধামের মহারাজের থেকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি, যার সাক্ষী রইলেন ব্রহ্মাণ্ডপুরের এবং ধরাধামের সমস্ত রাজপরিবার”।
