সর্বাম্বা কাণ্ড (কৃতান্ত প্রথম কাণ্ড)

আত্ম ও তাঁর তিন রানী মিলে প্রভাত, রজনী ও তামসকে তিন মোক্ষম অস্ত্ররূপে প্রস্তুত করতে থাকলেন, যাতে তারা ৮ বৎসর বয়সে ধরাধামে শিক্ষালাভের উদ্দেশ্যে গিয়ে, সেই স্থানকে সম্পূর্ণ অধিকার করে আসতে পারে। ধীরে ধীরে, তিন ভ্রাতাকেই এমন করে তুললেন ত্রিছায়াদেবী যাতে, সর্বদা তাঁরা ছায়াদেবীদের নিয়ন্ত্রণে থাকেন, আর সাথে সাথে এমন করলেন যাতে, তাঁরা একে অপরের ছায়া হয়ে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে, শিশুকাল থেকেই, তাদের অন্তরে সঙ্গমের প্রতি আকর্ষণ জন্ম দিতে থাকলেন যাতে তারা ধরাধামকে নিজেদের দেহবলে, ও সঙ্গমসুখ প্রদানি শক্তির বলে বশীকরণ করতে সক্ষম হয় একদিন।

অন্যদিকে, যেমন মানস ও ধরা স্থির করেছিলেন, তেমনই করা শুরু করলেন তাঁরা। মেধাকে সংস্কার দিতে থাকলেন। আর সেই সংস্কারের প্রভাব শিখা ও বেগবতীকে প্রদান করতে থাকলেন।

কি প্রকার সংস্কার দিতে থাকলেন তাঁরা মেধাকে? প্রথমেই মেধার মধ্যে বহু প্রশ্ন স্থাপন করতে থাকলেন, আর সেই প্রশ্ন সমূহের উত্তর দিতে থাকলেন। দেহ নিয়ে প্রশ্ন, জীবন নিয়ে প্রশ্ন, রাজ্য নিয়ে প্রশ্ন, সম্বন্ধ নিয়ে প্রশ্ন, এমন বিবিধ বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করতে থাকলেন।

এমন নয় যে সেই প্রশ্ন একাকী মেধার মধ্যেই উত্থাপিত করলেন, সেই প্রশ্ন উত্থাপিত শিখা ও বেগবতীর সামনেও করা হতে থাকলো, কিন্তু তা প্রভাবিত অধিক করলো মেধাকেই। ক্রমশ মেধার মধ্যে প্রতিটি বিষয়ে প্রশ্ন আসা শুরু হয়, এবং সে বহু বহু প্রশ্ন করতে থাকে।

প্রথমদিকে সেই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর মানস ও ধরা প্রদান করতেন। সময়ে সময়ে চন্দ্রনাথ, সূর্যনাথ ও চন্দ্রপ্রভাও প্রদান করতেন। কিন্তু যতই মেধার বয়োবৃদ্ধি হতে থাকলো, ততই তার প্রশ্ন এমন হতে শুরু করলো যে, তার উত্তর আর চন্দ্রনাথরা দিতে ব্যর্থ হতে থাকলেন। মানস ও ধরা তখনও তাঁর প্রশ্নের উত্তর প্রদান করতেন। কিন্তু আরো বয়োবৃদ্ধি হতে থাকলে, মেধার প্রশ্নের তীক্ষ্ণতা এমন হতে শুরু করে যে, আর কারুর পক্ষে তাঁর প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সম্ভবপর হয়না।

দেবী ধরা একদিন এই বিষয়ে অনিশ্চিত হয়ে মানসকে প্রশ্ন করলেন, “নাথ, মেধার মধ্যে প্রশ্নের বীজ অঙ্কুরিত করতে সে এমন কেন হয়ে উঠছে ধীরে ধীরে যে, তার প্রশ্নের উত্তর দেওয়া আর কারুর পক্ষে সম্ভব হচ্ছেনা!… আমার কন্যা যে, এবার সকলের থেকে পৃথক পৃথক থাকা শুরু করেছে, কারণ কেউ তাঁর প্রশ্নের উত্তর প্রদান করছেনা। … এই কি অভিপ্রায় ছিল আমাদের, তাঁকে নিয়ে?”

মানস মৃদু হেসে বললেন, “চিন্তিত হবেন না দেবী, প্রশ্নের ধারাই এমন হয়, আর যেই সংস্কারের কথা আমরা বলেছিলাম, তা যে এই প্রশ্নই। প্রশ্ন হলো তাই যা উত্তর লাভের জন্য নিষ্ঠাবান করে তোলে এক ব্যক্তিকে। প্রশ্নই হলো তা যা এক ব্যক্তিকে একাগ্রচিত্ত করে তোলে উত্তর লাভের জন্য। এক কথায় বলতে গেলে, প্রশ্নই যে একটি ব্যক্তির চরিত্রের নির্মাণ করে।

দেবী, যার মধ্যে যত কম প্রশ্ন, তাঁর ততই অন্ধবিশ্বাসী হয়ে ওঠার সম্ভাবনা থাকে। আর একবার অন্ধবিশ্বাসী হয়ে উঠলে, সত্যকে অসত্য বলতে, আর অসত্যকে সত্য বলতে অধিক সময় লাগেনা। প্রশ্নই হলো সেই ধারা, যা ব্যক্তির মধ্যে সত্যকে পরখ করে নেবার প্রবণতা জাগায়। সহজে সে কনো কিছুকে সত্য বলে মানতে পারেনা, যতক্ষণ না তাঁর সমস্ত প্রশ্নের উত্তর প্রাপ্ত হচ্ছে সেখান থেকে।

হ্যাঁ দেবী, সত্য তাই, যেখানে উপস্থিত হলে আর কনো প্রশ্ন অবশিষ্ট থাকেনা। তাই প্রশ্নই হলো সেই সংস্কার, যা আমাদের সত্যে উপনীত করতে সক্ষম, এবং আমাদের জীবনকে জীবনের লক্ষ্যে স্থির রাখতে সক্ষম। খেয়াল করে দেখুন দেবী, মেধা ও আমাদের বাকি দুই কন্যার মধ্যে বিস্তর ভেদ রয়েছে। আমাদের বাকি দুই কন্যাকে কিছু বলে দিলে, তারা সেটিকেই সত্য বলে মেনে নেয়।

কেন মানছে সত্য বলে, তারা জানেও না তা। আসলেই তা সত্য কিনা, সেই বিষয়ে উচাটনও নয় তারা। এর ফলস্বরূপ, এঁদের মানসিকতা দেখুন দেবী। এঁদের জীবনের কনো উদ্দেশ্য নেই। এঁদের সেই নিয়ে কনো ভাবনাও নেই যে জীবনের উদ্দেশ্য নেই তাদের। কাল আমি বা আপনি তাদেরকে বলবো, তোমাকে বৈদ্য হতে হবে, সেই বৈদ্য হয়ে ওঠাই তখন থেকে তার জীবনের উদ্দেশ্য হয়ে উঠবে।

কিন্তু মেধার ক্ষেত্রে, তেমন নয়। তাকে তুমি বলো বৈদ্য হতে, সে সহস্র প্রশ্ন করবে তোমাকে। কেন বৈদ্য হবো, বৈদ্য তো কেবলই দেহের চিকিৎসা করে, চিকিৎসা তো আমাদের মানসিকতার প্রথম প্রয়োজন, ইত্যাদি ইত্যাদি, সহস্র প্রকার প্রশ্ন আসবে তার কাছে। হ্যাঁ, আপাতদৃষ্টিতে দেখে মনে হবে, শিখা বা বেগবতীই সঠিক, কারণ তারা জীবনের একটি ধারাপাতে চলবে, যেই ধারাপাতে আমি আপনি তাদেরকে চলতে বলবো, বা অন্য কেউ আমাদের স্থান গ্রহণ করে নিয়ে চলতে বলবে।

কিন্তু প্রকৃত অর্থে, জীবনের পথে চলছে মেধা। হ্যাঁ, তার প্রশ্নের উত্তর লাভ করে, জীবনের ধারণা প্রকট করতে, সময় লাগবে, কারণ সে বহুদূর যাবে, শিখা বা বেগবতীর মত সামান্য বৈদ্য, সেনা, প্রধান, বা শিল্পকার হয়ে থেকে যাবেনা। হ্যাঁ, শিখা ও বেগবতীর জীবনে অনিশ্চয়তা ততক্ষণ কম থাকবে, যতক্ষণ তারা যেই পথে চলছে, সেই পথে প্রতিদ্বন্ধি কম থাকবে। কিন্তু জীবনের অন্তে গিয়ে দেখবেন দেবী যে, যদি অনিশ্চয়তা কারুর কম থাকে, তা হলো মেধার।

এর কারণ কি? কারণ এই যে, মেধার প্রশ্ন আর উত্তর লাভের প্রয়াস, তাকে সহজে কনো কিছুতে পদার্পণ করতে দেবেনা। কিন্তু যখন সে সমস্ত উত্তর লাভ করে পদার্পণ করবে, তখন তার পদাঙ্ক অনুসরণ করার মত হবে। … তর্কের বিষয় নয়, আপনি নিজেই দেখুন না। শিখা বা বেগবতী যখন যখন কনো কিছুতে আটকে পরে, তখন তখন কার কাছে আসে তারা? তাঁদের ভগিনী মেধার কাছে।

কখন আটকে পরে তারা? যখন অন্ধবিশ্বাস করতে করতে, এমন ঘরে উপস্থিত হয় তারা, যেখানে এতই অন্ধকার যে পথ খুঁজেই পাওয়া যায়না, তখনই তাদের মধ্যে দ্বিধা জাগে যে ঠিক পথে এসেছি তো! … আর তখনই তারা মেধাকে স্মরণ করে। দেবী, আশা করি যেন সমস্ত কাল তারা এমন ভাবে মেধাকে স্মরণই করুক”।

ধরা বললেন, “আপনি কি অন্য কিছু আশঙ্কা করছেন?”

মানস গম্ভীর ভাবে ঘাড় নেড়ে বললেন, “হ্যাঁ দেবী করছি। … কিছুদিনের মধ্যেই আত্মের পুত্ররা এইরাজ্যে আসবে। এমন না হয় যে, শিখা ও বেগবতীর অন্ধবিশ্বাসের দুর্বলতাকে ব্যবহার করে, তাদেরকে অন্য কোথাও টেনে নিয়ে যাক। … আমাদের সন্তান তারা দেবী। যদি তাদেরকে কেউ টেনে নিয়ে যায়, সন্তানের রক্ষার জন্য আমাদেরকেও তাদের সাথে সাথে যেতে হবে। … এমন না হয়ে যায় যে, এমনই গহন অন্ধকারে নিয়ে চলে গেল তাদের যে, আমরা সকলেই সেই গহন অন্ধকারের মধ্যে আটকে পরি”।

কিশোরী মেধা সেখানে এসে উপস্থিত হয়ে বললেন, “আমি তো তখনও উপস্থিত থাকবো পিতা। আমি আপনাদেরকে টেনে আনবো সেই অন্ধকারের বাইরে!”

পিতার আদরের কন্যার মুখে আশ্চর্য কথা শুনে, পিতামাতা উভয়েই প্রফুল্লিত হলেন। মেধাকে ক্রোড়ে স্থাপন করে, মানস বললেন, “ঠিকই বলেছ পুত্রী, তোমারই সামর্থ্য আছে, আমাদেরকে উদ্ধার করার। তাই হয়ে থাকে সর্বক্ষণ। অন্ধবিশ্বাসীরা দেহসর্বস্ব হয়ে ওঠে সময়ে সময়ে। দেহের চিকিৎসা করাকেই শ্রেষ্ঠ কর্ম বলে থাকে আর ক্রমশ যান্ত্রিক হয়ে ওঠে। যা সম্ভব নয়, তাকেই সত্য মানতে শুরু করে, কল্পনাই সত্য হয়ে ওঠে। তখন তো সেই ব্যক্তি যিনি অন্ধবিশ্বাসী নন, তিনিই আমাদেরকে উদ্ধার করতে এগিয়ে আসেন।

কিন্তু পুত্রী, এগিয়ে আসলেই তো হলো না, আমাদেরকেও তো তাঁদেরকে বিশ্বাস করতে হয়। কিন্তু আমরা এতটাই অন্ধবিশ্বাসে মত্ত হয়ে যাই যে, তাঁদেরকে বিশ্বাসই করিনা। নিজেকেই শ্রেষ্ঠ মানতে থাকি, আর অন্ধবিশ্বাসকেই সত্য। কাহিনীকার নয়, কাহিনীকারের সৃষ্ট চরিত্রদের ভগবান মানতে শুরু করে দিই তখন। বিজ্ঞান নয়, বিজ্ঞানীকে সত্য মানতে শুরু করে দিই তখন। দর্শন নয়, দার্শনিককে সত্য মানা শুরু করে দিই। আর ক্রমশ এমন গহন অন্ধকারে লীন হয়ে যাই যে, সাখ্যাত জগন্মাতাও আমাদের উদ্ধার করতে পারেন না!”

কিশোরী মেধা মিষ্ট হেসে বললেন, “জগন্মাতা কে পিতা? আমাদের সকলের মাতা? কিন্তু তা কি করে হয়? (দেবী ধরাকে দেখিয়ে) ইনি আমার মাতা। দিদুন ইনার মাতা। কিন্তু দিদুন তো আমার মাতা নন! তাহলে একজন কি করে সকলের মাতা হতে পারেন! আমারও মাতা, আমার মাতারও মাতা, আমার দিদুনেরও মাতা!”

দেবী ধরা মেধার এই অদ্ভুত প্রশ্নবাণে টলমল হয়ে গেলেন। ফ্যালফ্যালে দৃষ্টি নিয়ে, মানসের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। অন্যদিকে মানস হেসে বললেন, “কথা তো তোমার সঠিক পুত্রী। এর উত্তর তো আমারও জানা নেই। তা তুমি আমাকে এর উত্তর দেবে? … উত্তর সন্ধান করো, দেখো নিশ্চয়ই উত্তর দিতে পারবে একদিন”। মেধা হেসে বললেন, “তাহলে আমি যাই উত্তর সন্ধান করতে?”

ধরা জিজ্ঞাসু হয়ে বললেন, “কে দেবে তোকে উত্তর? কার কাছে যাচ্ছিস?”

মেধা নৃত্য করার ভঙ্গিতে বললেন, “আমাকে উত্তর দেয় তারা… তিনজন তারা, তিনটি বৃক্ষ, একটি পলাশ, একটি নিম, ও একটি শিউলি।  এঁরা আমার সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দেয়। … আমি আসি মা…!”

আর পিছন ফিরে তাকালেন না মেধা। দেবী ধরা সন্দিহান চোখে তাকালেন মানসের দিকে, আর তা দেখে মানস হেসে বললেন, “ঘাবড়াবেন না দেবী। মেধা সঠিক পথে আছে। তাই মেধাকে নিয়ে চিন্তা করা কিচ্ছু নেই। ওর জিজ্ঞাসাই ওকে সঠিক পথে রাখবে, বা হতে পারে মাতাকে পুনরায় প্রকাশ করার মার্গ মেধাই খুঁজে বার করবে, যা আমরা করতে পারছিনা। মাতা হলেন সত্য, আর সত্যকে প্রশ্নের মাধ্যমেই খুঁজতে হয় দেবী। মেধার মধ্যে সেই প্রশ্ন জেগেছে, আর তাই সে নিশ্চয়ই সত্যে উপনীত হবার মার্গের সন্ধান করবেই এক নয় একদিন”।

দেবী ধরা এবার প্রশ্ন করলেন, “কিন্তু আপনি ওর প্রশ্নের উত্তর দেন না কেন? … ও তিনটি গাছকে উত্তরদাতা রূপে সাজিয়ে নিয়েছে, কেন? আপনি থাকতে তারা কেন?”

মানস উচাটন দেবী ধরাকে শান্ত করে বললেন, “শান্ত হন দেবী, এত উচাটন কেন হচ্ছেন? আমি আপনি ওর পিতামাতা অর্থাৎ ওর মার্গদর্শনের প্রণেতা, মার্গদর্শক নই। … আমাদের কর্তব্য, তাঁর মধ্যে মাতার মার্গদর্শনকে অনুভব করার সামর্থ্য জাগরণের, আমরা কখনোই ওর মার্গদর্শক নই। … মার্গদর্শক তো এক মাতা, কারণ সন্তান তো এক তাঁরই হয়, আমরা পিতামাতা তো তাঁরই সন্তানদের তাঁর মার্গদর্শন অনুধাবন করানোর প্রণেতা মাত্র, এই দায়িত্বই তো তিনি আমাদের সঁপেছেন ধরা।

তিনিই তো একমাত্র মাতা, প্রকৃতি তিনি, তাই প্রকৃতির তিন বৃক্ষকে গুরুরূপে ধারণ করে উপনীত হয়েছে মেধা, অর্থাৎ আমাদের কর্ম সম্পাদিত হয়েছে। আমাদের কর্ম ছিল, তাঁকে মাতার মার্গদর্শনের সম্মুখে রাখা, যা আমরা অন্য দুই কন্যার ক্ষেত্রে করতে সক্ষম হইনি, আর মাতারই কৃপাতে আমরা মেধার ক্ষেত্রে তা করতে সক্ষম হয়েছি।

দেবী, জনক আমি, আর আপনি জননী, আমরা কেউই জগজ্জননী নই। আমরা কেউই পরাপ্রকৃতি নই, আমরা কেউই কাল বা কালী নই। আমরা কেউই নিয়তি নই। আর নিজেদেরকে তেমন মনে করার কনো কারণ নেই। প্রশ্নের উত্তর যখন সত্য প্রদান করে, তখনই ব্যক্তি সত্যলাভ করে। আমি আপনি তো অসত্য, আজ আছি, কাল নেই। তাই আমরা যদি মেধার সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দিতে যাই, তাহলে যে তাকে অসত্যের অন্ধকারেই ঠেলে দেব! …

প্রকৃতি আমাদের থেকে অধিক সত্য, যদিও তাও অসত্য। কাল ও কালী প্রকৃতির থেকেও অধিক সত্য, তবুও তা অসত্য। আর নিয়তি হলেন সেই পরম সত্য, যার ভিত্তি হলেন স্বয়ং ব্রহ্ম। তাই মেধাকে উন্নত হতে দিন দেবী। আপনার আমার ন্যায় অসত্যের থেকে সে প্রকৃতিরূপ সত্যে নিজের বিশ্বাস অর্পণ করেছে। বয়োবৃদ্ধি হলে স্বয়ং মাতাই তাঁকে প্রকৃতির আঁচল ছাড়িয়ে, কালের আঁচলে স্থাপিত করে তার প্রশ্নের উত্তর দেবেন। আরো বয়োবৃদ্ধি হলে, মাতাই স্বয়ং নিয়তি হয়ে তাঁর প্রশ্নের উত্তর দেবেন। তবেই না মেধা সত্যে উপনীত হবে।

আর হ্যাঁ, আমার বিশ্বাস মেধার মুখ দিয়ে মাতাই এতক্ষণ আমাদেরকে বললেন যে, নির্ভীক হতে। যদি আত্মের পুত্রদের দ্বারা প্রকাশিত মায়ায় আমাদের দুই কন্যা, শিখা ও বেগবতী অন্ধবিশ্বাসী হয়েও যায়, আর আমরাও তাঁদের অনুসরণ করতে করতে অন্ধকার মায়ায় আবদ্ধ হয়েও যাই, মাতা বলে গেলেন মেধার মুখ দিয়ে, মেধা স্বয়ং আমাদের উদ্ধার করে আনবে”।

দেবী ধরার দিকে তাকিয়ে দেখলেন মানস যে, তাঁর নয়নে অশ্রুবারি। সেই দেখে বললেন, “এই অশ্রু কি দুশ্চিন্তার অশ্রু দেবী?”

ধরা মৃদু হেসে বললেন, “না নাথ, দুশ্চিন্তার নয়, একই সঙ্গে সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্যের সম্মুখীন হবার কারণে, এই অশ্রু”।

মানস ভ্রুকুঞ্চিত করে নিজের আননে জিজ্ঞাসা স্থাপন করলে, দেবী ধীরা বললেন, “নাথ, মাতার সান্নিধ্য তেমন ভাবে না পাওয়ার জন্য দুর্ভাগ্য, আর আপনার সান্নিধ্য পাবার জন্য সৌভাগ্য”।

মানস হেসে বললেন, “দেবী, আরো অধিক সৌভাগ্যবতী হবার প্রস্তুতি করে দিন, কারণ আমাদের কন্যা মেধা নিশ্চিত ভাবে মাতার সান্নিধ্য আমাদের পুনরায় প্রদান করবে, আমার বিশ্বাস তা”।

দেবী ধরা হেসে বললেন, “একটি কথা জানেন! মাতা হলেন সম্পূর্ণ ভাবে অপ্রত্যাশিত। যেখানে থেকে তাঁর প্রত্যাশা করবেন, তিনি সেখান থেকে উদিত হননা, বরং যেখান থেকে কনো প্রত্যাশা করতে পারবেন না, সেখান থেকেই তিনি উদিত হন। … তাই এমন ভেবে বসে থাকবেন না যে, মেধার থেকেই মাতার উদয় হবে। … শেষে দেখবেন, আমাদের দুই অন্য কন্যার থেকে তাঁর উদয় হয়ে গেল”।

মানস ও ধরা সেই কথাতে তৃপ্ত হতে থাকলেন। আর অন্যদিকে দেবী শিখা ও বেগবতী নিজেদের লীলারেখার বিস্তার করা শুরু করেছিলেন।

শিখা ও বেগবতীর কীর্তিকলাপ বড়ই বিচিত্র। একদিকে যখন মেধা নিজের প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বেড়াতে সদাব্যস্ত, অন্যদিকে শিখা ও বেগবতী সর্বক্ষণ নিজেদের প্রয়োজন নিয়েই ব্যস্ত থাকে। শিখা আহারপ্রেমী, আর সে সর্বক্ষণ বিভিন্ন প্রজার নিবাসে গিয়ে, বিভিন্ন আহারের সন্ধান করে ফেরে। বড়ই আলসে সে, যেখানে আহার করে, সেখানেই একটু একটু করে নিদ্রাও যায়। এক কথায় সম্পূর্ণ ভাবে অনিয়ন্ত্রিত সে।

অন্যদিকে বেগবতীর সর্বদা সুরক্ষার ভান লেগেই থাকে। কি করলে সে অধিক সুরক্ষিত থাকবে, এই তাঁর ভাবধারা। সর্বক্ষণ সে কারুকে না কারুকে সন্ধান করে ফেরে, যে তাকে অধিক সুরক্ষিত রাখবে বাকিদের থেকে। তবে তেমন কারুকে সে খুঁজে পায়না কখনোই।

তবে দুটি স্থানে, তাঁরা দুইজনেই শান্ত হয়ে যায়, প্রথম যখন তাঁরা তাঁদের মাতাপিতার সম্মুখীন হন, আর দ্বিতীয় যখন তাঁরা তাঁদের ভগিনী মেধার নিকটে থাকেন। দেবী ধরা শিখার এই আহারপ্রিয়তাকে পছন্দই করেন, আর তাই তাঁকে বহুপ্রকার ব্যঞ্জন রন্ধন করে দিতে থাকেন। শিখা তা গ্রহণ করে আর নিদ্রা যায় বা বিশ্রাম করে। শিখার এমন কীর্তিতে মানস তৃপ্ত নয়।

দেব ধরাকে তিনি একাধিকবার বলেওছেন, “দেবী, শিখার স্বভাব যদি এমন থাকে, তাহলে যেকেউ তাকে বশ করে নিতে সক্ষম। একটু প্রয়াস করুন যাতে, তাঁকে সংযত করে দেওয়া যায়”।

মেধার এতে আপত্তি আবার। তাঁর মতে তাঁর দিদি তাঁর অত্যন্ত প্রিয়। আহার করেন, বিশ্রাম করেন, কিন্তু তাতে অসুবিধা কি? তাই তিনি পিতার উদ্দেশ্যে বলেন, “পিতা, সীমিত না করে অসীম করে দিলে কেমন হয়! মানে যদি দিদির আহার নিদ্রা না কমিয়ে, তাকে অফুরন্ত করে দেওয়া হয়! তাহলে তো তাঁকে আহার করিয়ে কেউ তৃপ্ত করে দিতে পারবে না, আর তার ফলে তাঁকে কেউ বশও করতে পারবেনা!”

বিচিত্র এই কথাতে মানস অত্যন্ত প্রভাবিত হন, কিন্তু দেবী ধরার স্বভাব ভিন্ন। তাঁর এক কন্যা আহার নিদ্রা পছন্দ করেন, তো তাই শই। তেমনই বিচিত্রভাব তাঁর বেগবতীকে নিয়ে। বেগবতীর সর্বদা নিজেকে সুরক্ষিত থাকার প্রয়াসে, কারুকে না কারুকে সন্ধান করে ফেরাও মানসের কাছে অপছন্দের। এই বিষয়ে দেবী ধরার সাথে দীর্ঘ কথোপকথনও করেছেন তিনি, আর তাই এখন দেবী ধরাও সেই নিয়ে চিন্তিত।

মানসের দাবি যে, কাল যদি কেউ বলশালী রাজ্যে প্রবেশ করে, বেগবতী তো তাঁর প্রতি আসক্ত হয়ে যাবে! ধরার এই কথা যুক্তিযুক্ত লাগে, আর তাই মহারাজ মানসকে বলে, সর্বদা বেগবতীর চারিপাশে একটি সেনার টুকরি প্রস্তুত রেখে দেন।

শুধুই যে বেগবতীর জন্যই সেনা টুকরি থাকে, তাই নয়। এই দুই কন্যাকে নিয়ে দুশ্চিন্তার কারণে, মানস ও ধরা একাধিক সেনাটুকরি নির্মাণ করেছেন, এবং এঁদের সঙ্গে সঙ্গে সর্বদা সেই সেনাটুকরি বিচরণ করেন। বিভিন্ন  প্রকার আহার ব্যঞ্জন প্রদান করার জন্য, যকৃত নামক ক্ষমতাশালি সেনাটুকরির নির্মাণ করে তাকে দেবী শিখার সাথে সর্বক্ষণ যুক্ত করা হয়।

পিণ্ড নামক এক রাঁধুনির টুকরিও সঙ্গে থাকে সর্বদা তাঁর সাথে, যাতে শিখার আহ্লাদের রন্ধন করে দিতে পারেন তাঁরা। মজার কথা এই যে, শিখা আহার কম করে, আর আহার নষ্ট বেশি করে। এই ব্যাপারে প্রথম যিনি দৃষ্টিপাত করান মানসকে, তিনি হলেন দেবী মেধা। তিনি পিতাকে এসে বলেন, “আচ্ছা পিতা, দিদি যে এত আহার নষ্ট করে, আমাদের রাজ্যের অন্য জীবজন্তুকে সেই আহার প্রদান করা যেতেই পারে, তাই না! আমাদের রাজ্যে রয়েছে তারা, তাই আমাদেরই দায়িত্ব, তাদেরকে আহার প্রদান করা। তাই দিদির সেই পরিত্যক্ত আহার প্রদান করলেই তো হয়!”

ধরা শিশু মেধার অদ্ভুত দৃষ্টিভঙ্গিতে যেমন সর্বদা চমকিত হন, এই ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম নয়। মানসের সেই প্রস্তাব অসাধারণ লাগে আরে তাই, বৃক্ক নামে একটি সেনাটুকরির নির্মাণ করেন তিনি, যারা সর্বক্ষণ শিখার সাথে যুক্ত থাকেন, এবং যেই আহার সে পরিত্যাগ করে দেয়, সেই আহার সমূহকে এই বৃক্ক সেনা বিভিন্ন পশুদের আহার করানোর উদ্দেশ্যে গ্রহণ করে নিয়ে চলে যায়।

তবে এই যকৃত, পিণ্ড ও বৃক্ক সেনা, সর্বদা শিখার সাথে থাকলেও, শিখার সর্বাধিক আলাপ যেই সেনা টুকরির সাথে, তা হলো অগ্ন্যাশয়। প্রচণ্ড সামর্থ্যবান একটি সেনাটুকরি তা, আর তাতে আছে সুন্দরী সুন্দরী রমণীরা, যাদের দেখতে তো কমনীয়, কিন্তু অত্যন্ত ক্ষিপ্র যোদ্ধা তারা।

অন্যদিকে এতই ধরনের আহার করা শিখার সখ যে, তার আহারের সামগ্রী প্রদানের জন্য একটি টুকরি নির্মাণ করতে হয়েছে ধরাকে, যার নাম রেখেছেন তিনি হৃত্‌। এই হৃত্‌ টুকরি বিভিন্ন প্রকার আহারের সামগ্রী প্রদান করতে থাকে, অগ্ন্যাশয়কে, যকৃতকে ও পিণ্ডকে, আর সেই সামগ্রীর মাধ্যমে শিখার সম্মুখে বিভিন্ন প্রকার আহার প্রস্তুত হতে থাকে।

শিখার দুর্বল স্থান যদি কিছু থাকে, তা যেমন আহার আর বিশ্রাম, তেমন তা হলো মেধা। মেধা তাঁর কাছে অত্যন্ত বিশ্বাসের স্থান, স্নেহের স্থানও। মেধার চঞ্চল স্বভাব তাঁর কাছে আকর্ষণীয়, আর তার থেকেও অধিক আকর্ষণীয় এই চঞ্চল স্বভাবের অন্তরে থাকা একটি মিষ্ট ক্ষিপ্র স্বভাব। চঞ্চলতার অন্তরেও যেন এক অদ্ভুত স্থিরতা বিরাজ করে মেধার মধ্যে। আর তা যেমন শিখাকে আকর্ষণ করে, তেমন বেগবতীকেও।

ধরা মেধার এই ক্ষিপ্রতা, এবং সদাতৎপরতা নিয়ে চিন্তিত অধিক থাকেন, কারণ তাঁর কন্যার এই স্বভাবের কারণে, তাঁর কন্যা যেন বেপরোয়া। তবে মানস তাঁর কন্যার এই বেপরোয়া স্বভাবকে প্রত্যক্ষ করে আনন্দিতইই হন। তবে এই বেপরোয়া স্বভাব অনেক সময়ে, হৃত্‌, পিণ্ড, যকৃত, অগ্ন্যাশয়, তথা বৃক্কদেরও বিভ্রান্ত করে দেয়। দিশাহারা হয়ে পরেন তাঁরা মেধার সম্মুখে। আর সেই কারণে, শিখা মেধাকে সমঝে চলে, আর একপ্রকার তোষামোদই করতে থাকে, কারণ সে জানে যে যদি হৃত্‌, পিণ্ড, যকৃত, অগ্ন্যাশয় বিপর্যস্ত হয়, তবে তার আহারে বিঘ্ন ঘটবে।

অন্যদিকে বেগবতীও সদা তটস্থ থাকে মেধাকে নিয়ে। তাঁর সুরক্ষার জন্য যেই সেনাকে তৎপর রাখা হয়, তার নাম শ্বাসযন্ত্র। অত্যন্ত বলশালী এই সেনাটুকরি সর্বদা বেগবতীকে সুরক্ষা প্রদান করতে থাকে, তবে এখানেও মেধার তীক্ষ্ণ বুদ্ধি মাঝেমাঝেই সমস্ত কিছুকে বেগতিক করে দেয়। আর তাই, শিখা ও বেগবতী এই বিষয়ে তাঁদের মাতা, দেবী ধরার শরণাপন্ন হয়।

দেবী ধরা দেখেন যে, শ্বাসযন্ত্র, হৃত্‌, যকৃত, পিণ্ড, অগ্ন্যাশয়, বৃক্ক, এঁদের সকলকেই নির্মাণ করা হয়েছে, কিন্তু মেধা কাকে কখন আঘাত করবে, তা সম্বন্ধে সকলেই অনিশ্চিত। প্রথমদিকে মেধার আক্রমণকে তাঁরা সকলে হাল্কা নিতেন কারণ এক মেধা হলেন রাজকন্যা, আর দ্বিতীয় তিনি ছিলেন শিশু। কিন্তু যতই মেধার বয়স ১২ হতে থাকলো, ততই তাঁর আক্রমণ হতে থাকলো বিষাক্ত, আর তা সমস্ত সেনাটুকরিকে অত্যন্ত ভীত করতে থাকলো।

কখনো মেধা হৃত্‌দের কাছে আহারের সম্ভার যা থাকে, তার থেকে এক বিশাল অংশ নিয়ে গিয়ে, রাজ্যের সামান্য প্রজাদের আহার মিটিয়ে দেন, তো কখনো যকৃত, পিণ্ড ও অগ্ন্যাশয়ের নির্মাণ করা আহারকে নিয়েও তিনি তা করেন। কখনো কখনো আবার, শ্বাসযন্ত্রের সেনাকে প্রজার বিভিন্ন প্রয়োজনে প্রেরণ করে দেন। আর তখন বেগবতীর অবস্থা অসুরক্ষার চিন্তায় ভয়ার্ত হয়ে ওঠে।

এই সমস্ত কিছু দেখে, দেবী ধরা একটি বিশেষ সেনার নির্মাণ করেন, যার নাম দেন মস্তিষ্ক। এই মস্তিষ্ক সেনাটুকরি অত্যন্ত কৌশলী। তারা নিজেদের কৌশল বশে, সর্বক্ষণ বেগবতী ও শিখার সমস্ত প্রয়োজন দেখতে থাকেন, আর যাতে মেধা তাদেরকে বিরক্ত না করতে পারে, তার কারণে পঞ্চগুপ্তচর স্থাপিতও রেখে দিয়েছেন। এই গুপ্তচর সেনাদের দেবী ধরা নাম দিয়েছেন ইন্দ্রিয়, আর তারা সর্বক্ষণ মেধা কি ভাবে সমস্ত সেনাটুকরিকে বিভ্রান্ত করে শিখা ও বেগবতীর সেবা ছেড়ে প্রজার সেবা করাবার যোজনা করছেন, তার উপর নজর রাখেন আর মস্তিষ্ককে সেই ব্যাপারে সূচনা প্রদান করেন।

মেধাকে তাও যেন বশে রাখা সম্ভব হয়না। সে এই ইন্দ্রিয়দেরও ও এমনকি মস্তিষ্ককেও প্রজার কাজে ব্যবহার করে দেয়। দেবী ধরা এবার বিরক্ত হয়ে মানসকে এই ব্যাপারে বললে, মানসের কাছে মেধা এসে বললেন, “পিতা, মস্তিষ্ক আর ওর গুপ্তচররা অত্যন্ত ক্ষমতাশালী। শুধুই কি দিদিদের সেবা করাতে তাদেরকে সীমিত রাখা সঠিক হবে? … (দেবী ধরার উদ্দেশ্যে) মাতা, আপনরা রাজা ও রানী এই রাজ্যের। মস্তিষ্ক, তাদের গুপ্তচর, অন্য সমস্ত সেনাটুকরি, যেমন হৃত্‌, পিণ্ড, অগ্ন্যাশয়, যকৃত, বৃক্ক, শ্বাসযন্ত্র, সকলকে দিদিদের সাথে সাথে সমস্ত প্রজার দেখভাল করতে দেওয়া যায়না! … দিদিদের সাথে সাথে ওদেরও তা প্রয়োজন”।

দেবী ধরা যেন মহারানী পরে, আগে জননী, তাই প্রতিবাদী হয়ে বললেন, “মেধা, ওরা তোমার দিদি হয়, তুমি ওদের প্রতি এমন ঈর্ষা অনুভব করো কেন?”

মেধা উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন, “মাতা, ঈর্ষা নয়, আমি আমার দিদিদের নিয়েও চিন্তিত। … আচ্ছা পিতা (মানসের উদ্দেশ্যে) একটি কাজ করলে কেমন হয়! এই সমস্ত সেনাদের অধ্যক্ষ করে দেওয়া হোক আমার দুই দিদিদের। আর তাদেরকে এঁদের অধ্যক্ষ করে দিয়ে, এঁদের সকলকে সমস্ত প্রজার দেখভাল করার দায়িত্ব অর্পণ করে দেওয়া হোক। … এতে, এঁরা সকলে আমার দিদিদের সেবাও করতে পারবে, কারণ দিদিরা তাঁদের সেনানায়ক হবেন, আর এই সেনাটুকরিদের সাহায্যে, আমাদের প্রজারা, যারা সর্বক্ষণ আমাদের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন, তাদেরকে সেবাদানও করা যাবে!”

বরাবর যেমন হয়ে থাকেন, তেমনই ভাবে দেবী ধরা মেধার প্রখর বুদ্ধিকে প্রত্যক্ষ লক্ষ্য করে বিস্মিত হয়ে গেলেন, আর বরাবর যেমন মানস মেধার জন্য গর্ব বোধ করে থাকেন, তেমনই গর্ববোধ করলেন এবং তেমনটাই করলেন, যেমনটা মেধা চেয়েছিলেন। ক্রমশ শিখা ও বেগবতী সমস্ত সেনার সেনানায়ক হয়ে, রাজ্যের প্রজাদের সেবাদান করতে থাকলেন, আর সেই সেনাটুকরিরা প্রজার সাথে সাথে, তাঁদের সেনানায়ককেও সেবাদান করতে থাকলেন।

সমস্ত কিছু ঠিক হলেও, সমস্ত কিছুর নেপথ্যে একটি ভ্রান্তি হতেই থাকলো, আর তা হলো মেধার আচরণের প্রতি দেবী ধরার প্রথমদিকে অবহেলা দেখানো। কি ভ্রান্তি হলো? ভ্রান্তি এই হলো যে, যতদিন না শিখা ও বেগবতী সেনানায়ক হয়ে রাজ্যের কর্মভার সামাল দেওয়া শুরু করলেন মেধার বুদ্ধি অনুসারে, ততদিনে আত্মের তিন পুত্র, প্রভাত, রজনী ও তামস ধরাধামে শিক্ষাগ্রহণের জন্যে এসে, শিখা ও বেগবতীর উপর প্রভাব বিস্তার করা শুরু করে দিয়েছেন।

মেধা বহুদিন ধরেই এই সমস্ত কিছু বলার ও বোঝানোর প্রয়াস করে চলেছিলেন। যদি তখন তাঁকে অবহেলা না করে, তাঁর বুদ্ধি নিয়ে নিতো, তাহলে হয়তো প্রভাত, রজনী ও তামস এমন ভাবে প্রভাব বিস্তার করতে পারতো না শিখা ও বেগবতীর উপর। কিন্তু তা ইতিমধ্যে হয়ে গেছে, আর তাই এখন সেই বিষয়ে কেবলই পরিণতি দর্শনিয়, আর তা বিচার্য বিষয় নয়।

আত্মের তিন পুত্রের প্রভাব যতই শিখা ও বেগবতীর উপর বৃদ্ধি পেতে থাকলো, মেধার তিন বৃক্ষ, পলাশ, নিম ও শিউলির প্রতি আকর্ষণও তীব্র হতে থাকলো। বিশেষ করে, যখন থেকে তাঁর দুই দিদিকে সেনানায়ক করে দিয়ে প্রজাসেবায় নিয়জিত করা হয়েছে, তখন থেকে, মেধাও যেন অধিক থেকে অধিক সময় এই তিন বৃক্ষের প্রতি প্রদান করতে থাকলো।

তাঁর মত এমন বিচক্ষণ এক কন্যার এমন কীর্তি দেখে সকল প্রজাই ভাবান্বিত থাকতে শুরু করেন। তাঁরা রাজমাতা দেবী ধরাকে, মহারাজ মানসকে, এবং দুই সেনানায়ক, শিখা ও বেগবতীকে এই বিষয়ে বহুবার বলেছেন, এবং মস্তিষ্ক সেনাটুকরির পাঁচ ইন্দ্রিয় গুপ্তচরও একই সমাচার সকলকে দিতে থাকলেন।

দেবী মেধার যেন এই তিন বৃক্ষের প্রতি আকর্ষণ ক্রমাগত বেড়েই চলেছিল। কিন্তু কেন? দেবী ধরা সেই নিয়ে অত্যন্ত বিচলিত থাকেন, আর তাঁর দুই প্রিয়কন্যাও তাঁদের বিশ্বাসের আধার, তাঁদের একমাত্র ভগিনীকে নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন থাকেন। তবে মানসের স্থির বিশ্বাস যে, মেধা যা করছে, তার অন্তরালে নিশ্চিত ভাবে কনো না কনো দূরদৃষ্টি আছে।

দেবী ধরা উদ্বেগ নিয়ে তাঁর কাছে এসে বললেন, “মহারাজ, মেধা অত্যন্ত অবাধ্য। তাকে কিছু বললেও সে শোনেনা। এই তিন বৃক্ষ নিয়ে ওর কি আকর্ষণ আমি বুঝি না! আর কি ছোট আছে যে বৃক্ষ নিয়ে খেলা করবে সে! যুবতি হতে চলেছে, কিন্তু তাঁর অন্য কনো দিকে হুঁশ নেই, ওই তিন বৃক্ষ বাদে! কিছু করুন নাথ। আপনার এই কন্যা যদি কারুর কথা শোনে, তা কেবলই আপনার”।

মানস উত্তরে হাস্যছলেই বললেন, “দেবী, মেধার কনো দিকে ভ্রুক্ষেপ নেই, এই কথা কিন্তু সঠিক নয়। তাঁর বুদ্ধিকে আপনি দেরি করে গ্রহণ করলেও, যখন তা গ্রহণ করলেন তখন দেখলেন তো, আপনার আয়েশি, আলসে আর অসুরক্ষায় ভুগতে থাকা দুই কন্যার হিল্যে হয়ে গেল! আর শুধু তাই নয়, সমস্ত প্রজার হিল্যে করে দিল সে একাকী। … (পুনরায় স্নেহহাস্য হেসে) আর সেই কারণেই তো প্রজা এত খেয়াল রাখে তাঁর। সে যে প্রজার কাছে মানুষ।

আর সত্য বলতে কি মনে হয় জানেন আমার। শুধু প্রজার নয়, আমাদের মাতারও খুব প্রিয় সে। কে জানে, এই তিন বৃক্ষের সাথে মাতারই কনো সম্বন্ধ আছে কিনা! … হতেও তো পারে … আমি আরো একটা কথা ভাবছিলাম জানেন দেবী! … মাতা আমাকে তিনটি বীজের কথা বলেছিলেন, সেই তিন বীজের তো সন্ধান তো আমি আজ পর্যন্ত পেলাম না! … এই তিন বৃক্ষ সেই তিন বীজ নয়তো!”

দেবী ধরা সামান্য বিরক্ত হয়েই বললেন, “সকলের থেকে বেশি বিশ্বাস আপনার এই একটি কন্যার প্রতি। … আচ্ছা ঠিক আছে, যদি এই বৃক্ষের সাথে কনো সম্বন্ধ থেকে থাকে মাতার, তাহলে আমার মাতা অবশ্যই জানবেন। আসলে আমার মাতার সাথে মাতা ব্রহ্মময়ীর এক বিশেষ সম্বন্ধ আছে। … মাতার কাছে থেকেই জেনেছি যে, যখন চন্দ্রপুর বা সূর্যপুরের নির্মাণ হয়নি, তখন এই স্থান ছিল অত্যন্ত রুক্ষ। এখানে কিছু প্রজা থাকতেন, কিন্তু সেই প্রজাদের কাছে না মাতার পুত্র, চন্দ্রনাথের, না সূর্যনাথের আসার সময় হতো।

আসলে, এই মরুঅঞ্চলকে ভেদ করে আসার সাহসই হতো না তাঁদের। তাই মাতা যখনই তাঁদেরকে প্রশ্ন করতেন, এই রাজ্যের কথা, তাঁরা কনো না কনো ভাবে সেই কথাকে এড়িয়ে যেতেন। সেই কারণে, একবার মাতা স্বয়ং এসেছিলেন এখানে। … স্বয়ং মাতা আসছেন জেনে, সকলের মধ্যে হিল্লোল লেগে যায়, মাতাকে দেখার। আর তাই সকলে মাতাকে দেখতে ছোটেন। কিন্তু আমার মাতা, দেবী চন্দ্রপভা, মাতার আহারের চিন্তা করতে থাকেন।

অত্যন্ত গহন মরুঅঞ্চল পেরিয়ে তিনি আসছেন। তাই তাঁর শরীরস্বাস্থ্যের অবস্থা ভালো থাকবেনা। তাই আমার মাতা, মাতা ব্রহ্মময়ীর জন্য স্নানের, নিদ্রার, আহারের ও জলপানের ব্যবস্থা করতে ব্যস্ত থাকেন। কিন্তু সেখানে এক অদ্ভুত জিনিস তিনি দেখেন। … মাতা ব্রহ্মময়ী যেদিক থেকে আসবেন ভেবেছিলেন, অর্থাৎ আমরা যেই পর্বত পেরিয়ে এই রাজ্যে প্রবেশ করেছিলাম, সেই দিক দিয়ে তিনি আসছিলেনই না। তিনি আসছিলেন, দক্ষিণ দিক থেকে, সাগরের কিনারা ধরে।

আর আমার মাতা সেই সাগরের দিশাতেই যাচ্ছিলেন জলধারণ করে আনার জন্য। … সাগরের কিনারার পরে, অতিবিস্তীর্ণ নয় বালুচর আমাদের এই রাজ্যে প্রবেশ করার জন্য। আর সত্য বলতে, তখন নাকি আমাদের রাজ্য এই পর্বতের থেকে বহু দূরে স্থিত ছিল, মাঝে ছিল বিস্তীর্ণ মরুঅঞ্চল। তাই সেইদিকই সঠিক ছিল আমাদের রাজ্যে প্রবেশ করার। কিন্তু তাও সেইদিকে কেউ যেতনা, আর তার কারণ হলো সেখানের বালুচর অত্যন্ত ভয়াবহ।

স্থানে স্থানে ছিল এমন গুপ্ত চোরাবালি যে, কারুর সেখানে একবার চরণ পরে গেলে, আর তাকে বাঁচানো যেতোনা। মাত্র, ৯ জন ব্যক্তি অবশিষ্ট ছিলেন তখন রাজ্যে, এই চোরাবালির প্রকোপের কারণেই, আর তাদের মধ্যে একজন ছিলেন আমার মাতা। তাঁর নাম তখন ছিল মরুবক, কারণ তিনিই একমাত্র যিনি এই চোরাবালিদের মোকাবিলা করতে জানতেন। আর তাই তাঁরই ভার ছিল, এই সমস্ত বালি পেরিয়ে জল নিয়ে আসা। সমস্ত দিন উত্তপ্ত বালুর উপর দিয়ে তিনি হাঁটতেন, তাই তাঁর গাত্রবর্ণ ছিল তমসাচ্ছন্ন, আর তাই তাঁকে সকলে তমা বলে ডাকতেন।

সকলের মধ্যে সর্বাধিক সুন্দরী মুখশ্রী হলেও, তাঁর অঙ্গবর্ণ এমনই তাম্রতায় পরিপূর্ণ থাকতো যে এই ৯ জনের মধ্যে থাকা ৪টি পুরুষের একটিও তাঁর দিকে ফিরে তাকাতেন না। তাই তিনি নিঃসন্তান হয়েই কেবলই মরুবক হয়ে জীবন কাটাতেন।

তিনি যখন সেইদিন জল আনতে গেছিলেন, তখন মাতা ব্রহ্মময়ীকে আসতে দেখেন। আর তা দেখে, তিনি এগিয়ে যান, যাতে মাতা কনো চোরাবালির শিকার না হয়ে যান। … তবে নিকটে গিয়েই তিনি মাতাকে স্পর্শ করেন না, কারণ তাঁর অঙ্গবর্ণের জন্য, এখানের না ৪টি স্ত্রী, না ৪টি পুরুষ, কেউ তাঁকে স্পর্শ করতো না। …

মাতার লীলা অদ্ভুত। তিনি লীলাবশেই একটি চোরাবালির মধ্যে নিজের চরণের কনীনিকা অর্পণ করে দেন। আর তারফলে, সেই চোরাবালি মাতাকে নিজের দিকে আকর্ষণ করতে থাকে। আমার মাতা, নিজের অন্তর থেকে মাতা ব্রহ্মময়ীর প্রতি আকৃষ্ট। তাঁর নেত্রের সম্মুখে মাতার কিছু হয়ে যাবে, তিনি তা মানতে না পেরে, নিরুপায় হয়ে মাতাকে স্পর্শ করলেন, এবং প্রবল ও গভীর আলিঙ্গন দ্বারা, মাতাকে সেই চোরাবালির থেকে উদ্ধার করলেন।

আমার মাতা বলেছিলেন আমাকে, যখন তিনি মাতাকে নিয়ে এই মরুপ্রদেশে প্রবেশ করলেন, তখন মাতাকে কম, আর তাঁকে সকলে অধিক গভীর ভাবে তাকিয়ে দেখছিল। কারণটি হলো আমার মাতার গাত্রবর্ণ। আমার মাতা আর তাম্রবর্ণের ছিলেন না, তিনি তখন উজ্জ্বল প্রভার তরঙ্গ যেন। তাঁর অঙ্গ অঙ্গ থেকে চন্দ্রের আভা সমস্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পরছিল। তাই তাঁর নাম তখন থেকে চন্দ্রপ্রভা হয়। …

তিনিই আমাকে বলেছিলেন, এই মরুস্থানকে উদ্ধার করার জন্য মাতা তখন এখানে এসেছিলেন; তাঁকে অভিশাপমুক্ত করতে মাতা এসেছিলেন সেবার। মরুবক থেকে চন্দ্রপ্রভা হয়ে ওঠেন তিনি মাতার আলিঙ্গনের প্রভাবে। আর এই স্থান মরুভূমি থেকে হয়ে ওঠে চন্দ্রপুর, যেখানে আমার মাতাকেই এখানের দেবী করে সকলে স্থাপিত করেন। পূর্বে, এখানের পুরুষরা মাতাকে স্পর্শ করতে দিতেন না, কারণ মাতা ছিলেন তাম্রবর্না। আর পরে, মাতাকে তাঁরা স্পর্শ করতেন না, কারণ মাতা ছিলেন সকলের কাছে দেবী, এই মরুস্থানকে উদ্ধার করা দেবী।

তবে এই স্থানের নাম চন্দ্রপুর, আমার পিতার নামের কারণে নয়, আমার মাতার কারণে। প্রজাদের মধ্যেও আপনি দেখেছেন নাথ, তাঁরা আমার মাতাকে এখানের দেবী মানেন।… পরে, আমার পিতা এখানে আসলে, মাতার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে সঙ্গমে লিপ্ত হলে, মাতার গর্ভে আমি আসি। …

আমার মাতার থেকে শুনেছি, মাতা এখানে যেই কিছুদিন যাবত, আমার মাতার আশ্রয়ে ছিলেন, তখন এমন কিছু করেছিলেন, যার কারণে এই স্থান রুক্ষ মরু থেকে উর্বর চন্দ্রপুর হয়ে যায়। কিন্তু কি করেছিলেন মাতা, তা আমি কনোদিন প্রশ্ন করিনি। আসুন আমার সাথে নাথ, মাতার থেকে সেই কথা আজ আপনিও জানবেন আর আমিও”।

দেবী চন্দ্রপ্রভা তখন জানালা দিয়ে দক্ষিণ দিকে দেখছিলেন। কক্ষে মানস ও ধরা প্রবেশ করেছে, তিনি জানতেও পারেন নি। দেবী ধরা তাঁকে মাতা বলে সম্বোধন করতে, তিনি মিষ্ট হেসে ঘুরে দাঁড়ালেন। ধরা কিছু বলার আগেই, মানস বললেন, “মাতা, ধরার থেকে সমস্ত কথা জানলাম এই রাজ্যের ব্যাপারে। … এই রাজ্যের মরুদেশ হয়ে থাকা, তাতে মরুবকের অবস্থান। সেই মরুবকের জগন্মাতার প্রতি স্নেহ, তাঁকে উদ্ধারের জন্য ভেদাভেদের সংস্কার ত্যাগ করা, আর তাঁর স্পর্শের ফলে, সেই মরুবক চন্দ্রপ্রভা হয়ে উঠলেন। …

কিন্তু মাতা, ধরা যেটা আমাকে বলতে পারলো না, তা হলো মরুদেশ কি করে চন্দ্রপুর হয়ে উঠলো সেই কথা। আপনি কি সেই কথা আমাকে বলতে পারেন?”

দেবী চন্দ্রপ্রভা হেসে বললেন, “ভুলে যাওয়া তো সম্ভব নয় সেই ঘটনা, তবে হ্যাঁ, ধুলো জমে গেছিল সেই স্মৃতিতে। তোমাদের কন্যা, মেধা, সেই ধুলো ঝেরে দিলো পুনরায়। … তাই আজও সেই কথা ভাস্মর হয়ে রয়েছে আমার হৃদয়ে”।

দেবী ধরা বললেন, “মেধা! … মেধা আবার কি করলো?”

দেবী চন্দ্রপ্রভা হেসে বললেন, “ওই যে দেখ, দেখতে পাচ্ছ দক্ষিণের তিনটি পাশাপাশি বৃক্ষ, একটি পলাশ, পাশেরটি নিম ও তারপাশে শিউলি, মাতা এই তিন বৃক্ষরোপণ করেছিলেন এই স্থানে, এই মরুতে। আর এই তিন বৃক্ষ অদ্ভুত ভাবে এই মরুতেই বেড়ে উঠতে থাকলো, আর তা একদিন এই সম্পূর্ণ মরুঅঞ্চলকে উর্বর তৃণভূমি করে দিল। আশ্চর্যকর সামর্থ্য এই তিন বৃক্ষের! নাকি, যেমন এই মরুবক মাতার স্পর্শে চন্দ্রপ্রভা হয়ে গেল, তেমনই মাতার স্পর্শের কারণে এই তিন বৃক্ষ মরুঅঞ্চলে জেগে উঠলো, তা বলতে পারবো না।

তবে, মেধার এই তিন বৃক্ষের প্রতি আকর্ষণ আমাকে অত্যন্ত বিচলিত করে দেয়। সে তো জানেনা, এই বৃক্ষের পিছনে থাকা ইতিহাসকে। আজ এই চন্দ্রপুরে, বা সম্পূর্ণ ধরাধামে আমি ব্যতীত কেউ জানেনা, এই তিনবৃক্ষের ইতিহাস। আর আমি কারুকে বলিনি তা, আজ প্রথমবার তোমাদেরকে বললাম। কিন্তু প্রশ্ন এই জাগে মনে যে, মেধা তা জানলো কি করে? আর যদি নাই জানে, তবে এই তিন বৃক্ষের প্রতি তার আকর্ষণই বা এমন গহন কেন?”

মানস হেসে বললেন, “মাতা, আমার আর কনো প্রশ্ন নেই। আমার যা জানার ছিল, তা আমি জেনে গেছি। … আপনি বিশ্রাম নিন”।

কক্ষে ফিরে এলেন মানস ও ধরা। ধরা যেন নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছেন না! তাঁর তিন কন্যার মধ্যে, সর্বাধিক কম বিশ্বাস করেন তিনি মেধাকে, কারণ মেধা তাঁর বাকি দুই কন্যাকে অত্যন্ত বিরক্ত করে। যদিও তাঁর দুই কন্যার মেধার বিরুদ্ধে কনো অভিযোগ নেই, বরং স্নেহই প্রবল, তাও দুই সন্তানকে বিরক্ত করে বলে, মাতা ধরা মেধার প্রতি রুষ্টই থাকেন। সেই মেধারই কৃত্যের মধ্যে এমন দিব্যতা স্থাপিত রয়েছে!

অন্যদিকে মানস ভাবছিলেন অন্যকথা। এমনই সময়ে, দেবী ধরা প্রশ্ন করলেন, “নাথ, মেধাই কি মাতার পুনরাগমন?”

মানস মাথা নেড়ে বললেন, “না … তবে মাতার সাথে প্রবল যোগসূত্র তো তাঁর রয়েছে। … যাইহোক, আপনি মেধার দিকে এবার একটু তাকানো বন্ধ করুন। বুঝতে পারলেন তো যে, সে সাধারণ নয়। … এবার আপনার বাকি দুই কন্যার দিকে একটু তাকান। যুবতি হয়েছে তাঁরা, আর আমার কাছে যা সূচনা আছে সেই অনুসারে, তাঁরা আত্মের তিন পুত্রের সাথে অত্যন্ত গভীর ভাবে মেলামেশা করছে। তাই একটু সতর্ক হন। … যুদ্ধপরিস্থিতি আমাদের হাতের বাইরে চলে যাবে নয়তো। … শত্রু কিন্তু আমাদের সাথে বসবাস করছে, আমাদের ঘাড়ের উপর নিশ্বাস ফেলছে”।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22