সর্বাম্বা কাণ্ড (কৃতান্ত প্রথম কাণ্ড)

বিবাহের দিন স্থির হয়, মাঘীপূর্ণিমার দিবসে। সেই দিনটি রাজ্যাভিষেকের জন্যই উপযুক্ত। আর অনুষ্ঠানের দিন স্থির করা হলো, পয়লা ফাল্গুন। নির্বিঘ্নে বিবাহ অনুষ্ঠান, ধরাধাম রাজ্য স্থাপন, ও মানসকে সেই রাজ্যের রাজার পদে রাজ্যাভিষেক করার উপরান্তে, সমস্ত ধরাধামে ঘোষণা করা হলো মানস ও ধরার বিবাহসংবাদ ও নিমন্ত্রণ সূচি। বলা হলো যে, সেই দিন সমস্ত রাজ্যবাসিকে আরো দুটি উপহার দেওয়ার আছে, যা সেই দিবসেই, অনুষ্ঠানের প্রথম ঘটিকায় ঘোষণা করা হবে।

নিমন্ত্রণ পত্র চলে গেল ব্রহ্মাণ্ডপুরেও। মহামন্ত্রী, দেবী চিন্তা সেই পত্র পাঠ করতে থাকলেন –

আদরণীয় ব্রহ্মাণ্ডপুর রাজ্যের মহারাজা,

            আশা করি, মাতা ব্রহ্মময়ীর অভাবকে আপনারা সকলেই কাটিয়ে উঠেছেন। আমরাও সেই শোক কাটিয়ে উঠতে অত্যন্ত বিব্রত বোধ করছি। সেই বিব্রত ভাব থেকে মুক্ত হবার জন্যই, একটি শুভ অনুষ্ঠানের সূচনা করতে চলেছি, আপনাদের কৃপায়।

আমার ও দেবী চন্দ্রপ্রভার একমাত্র কন্যা, দেবী ধরার বিবাহ দান করেছি আমরা ইতিমধ্যেই। কাজেই সেই সুবাদে, এক আনন্দ অনুষ্ঠান ও ভোজপ্রীতির আয়োজন করেছি। মহারাজ, স্বস্ত্রিক আপনাকে একান্ত অনুগ্রহের সাথে সেই ভোজ অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রণ করে, অনুরোধ জ্ঞাপন করছি, যাতে আপনারা আমার কন্যাকে আশীর্বাদধন্য করেন।

আগামী পয়লা ফাল্গুন দ্বিপ্রহর থেকে সেই আনন্দ অনুষ্ঠানের সূচনা হবে আর তা ত্রিদিবস ব্যপি অনুষ্ঠিত হবে। তাই আপনাকে স্বস্ত্রিক নিমন্ত্রণ জানাই যাতে, আপনারা এই তিন দিবস আমাদের মধ্যে উপস্থিত থেকে, আমাদের আতিথেয়তা গ্রহণ করে, আমাদের রাজ্যে উপস্থিত থাকুন।

ইতি

কন্যার ভাগ্যবান পিতা, চন্দ্রনাথ

পত্রপাঠ সমাপ্ত হলে, দেবী ইচ্ছা ব্যকুল হয়ে বললেন, “এ কি? কন্যার নাম বললেন, আর কন্যার পাত্রের নাম বললেন না তো?”

দেবী কল্পনা বিরক্তির সাথে বলে উঠলেন, “তা জেনেই বা তুমি কি করবে দিদি? … দেবী চন্দ্রপ্রভাকে তুমি চিনতে? তেমনই ধরার স্বামীকেও আমরা কেউ চিনিনা। তাই নাম উল্লেখ করেনি। … যদি বিশেষ কেউ হতো, তাহলে কি ফলাও করে নাম উল্লেখ করতেন না!”

মহারাজ আত্ম গম্ভীর ভাবে বললেন, “আমরা তো আমাদের বিবাহের জন্য নিমন্ত্রণও করিনি ওদেরকে। করা উচিত ছিল। যাই হোক, আমাদের যেতে তো হবেই ওদের রাজ্যে, নিমন্ত্রণের মান রাখতে। তবে সম্পূর্ণ পরিবার সহ সেখানে যাবো না। … আমি দেবী কল্পনা অর্থাৎ সেনাপতিকে নিয়ে সেখানে চলে যাবো”।

মহামন্ত্রী, দেবী চিন্তা খানিক ভাবিত হয়ে বললেন, “সে না তাই যাবেন। কিন্তু মহারাজ, আমরা একটি বিষয় নিয়ে মাথাই ঘামাচ্ছিনা, আর তা হলো মানস। … মহারাজ, সম্পূর্ণ ব্রহ্মাণ্ডপুরে আমি তন্য তন্য করে খুঁজে দেখেছি, মানস কোথাও নেই। … এর অর্থ, নিশ্চিত ভাবেই মানস রাজ্যের বাইরে চলে গেছে, আর রাজ্যের বাইরে বলতে গেলে তো, নিকটবর্তী রাজ্য হলো সূর্যপুর আর চন্দ্রপুর। তা এমন নয়তো যে মানস এই দুই রাজ্যের কোথাও গা ঢাকা দিয়ে রয়েছে!”

দেবী কল্পনা বললেন, “দেখো দিদি, আমাদের কাছে সেই সেনাবল নেই যার ভরসায় আমরা আক্রমণ করতে পারি এই দুই রাজ্যকে, বা তার যেকোনো একটিকে, বিশেষ করে যখন আমরা জানি যে, তাঁদের রাজ্যে সামরিক শক্তি বেশ শক্তিশালী ও প্রতিভাবান। … কিন্তু এই নিমন্ত্রণের কারণে, আমরা তো সেখানে যেতেই পারি! … অর্থাৎ, আমার কথা এই যে, আমরা সেখানে বেশ কিছু আমাদের সেনা নিয়ে যাই।

যুদ্ধ করার জন্য তারা অক্ষম, কিন্তু রাজবন্দীকে পুনরায় বন্দি করার জন্য তো তারা প্রস্তুত। আর আশা করা যায় যে, মহারাজ চন্দ্রনাথ সেই কাজে বাঁধাও দেবেন না। তাই আমার প্রস্তাব এই যে, আমরা সকলে সেখানে যাই, আর আমাদের নিরস্ত্র সেনা সহ সেখানে গিয়ে তিনদিনের জন্য শিবির স্থাপন করি। এই তিনদিনের মধ্যে আমরা সেই দুই রাজ্যকে তন্যতন্য করে খুঁজে নেব, আর মানসকে খুঁজে বার করে নিয়ে চলে আসবো”।

মহারাজ আত্ম বললেন, “প্রস্তাব মন্দ নয়, কিন্তু তার জন্য সকলের যাওয়ার প্রয়োজন কি? … স্বয়ং সেনাপতি আমার সাথে যাচ্ছে।… সঙ্গে অর্ধেক আমাদের কাছে উপলব্ধ সেনা গেলেই তো হয়। … মহারানী আর মহামন্ত্রী এখানে বাকি অর্ধেক সেনার সাথে থাকলে, তা অধিক শ্রেয় হবে। … চন্দ্রপুর ও সূর্যপুর দুই শত্রুরাজ্য নয়, আর রাজা চন্দ্রনাথ এবং সূর্যনাথ দুইজনেই মাতা ব্রহ্মময়ীর অনুগত। তাই হতেও তো পারে যে, আমাদের সকলকে চন্দ্রপুরে তিনদিনের জন্য আটকে রেখে, মাতা ব্রহ্মময়ীর মৃত্যুর প্রতিবাদে, সূর্যপুর এসে ব্রহ্মাণ্ডপুরের দখল নিয়ে নিলো, কি মহামন্ত্রী, আপনি কি বলেন?”

দেবী চিন্তা বিচার করে বললেন, “উত্তম প্রস্তাব মহারাজ। … আর হ্যাঁ, সেনাপতি কল্পনার যোজনাও যেমন সঠিক, তেমন মহারাজের সন্দেহের তীরকেও অমান্য করা সঠিক হবেনা। তাই, মহারাজ ও সেনাপতি অর্ধেক সেনা নিয়ে যান সেখানে, এবং যোজনা মত, মানসের সন্ধান করে আসুক। অন্যদিকে আমরা অর্থাৎ মহারানী ও আমি অর্ধেক সেনা নিয়ে রাজ্যের সুরক্ষা নিশ্চয় করবো”।

যোজনা অনুসারে, দেবী কল্পনা ও মহারাজ আত্ম অর্ধেক সেনা নিয়ে যাত্রা করলেন চন্দ্রপুরে। সেখানে গেলে, তাদের জন্য যেই দুঃসংবাদকে সুসজ্জিত করে রাখা ছিল, তার সম্মুখীন তাদের একনা একদিন তো হতেই হতো। কিন্তু তা যে এত দ্রুত হয়ে যাবে, তা তারা তো ভাবতেই পারেন নি। যেন পুরো যোজনাই জলে পরে গেল!

তাঁদেরকে নিমন্ত্রণ করা যে একটি যোজনা, তা তো তাঁরা আন্দাজ করেছিলেন, কিন্তু সেই যোজনা যে এই রূপ, তা তাঁরা কনো ভাবেই আন্দাজ করতে পারেন নি। যখন তাঁরা চন্দ্রপুরে প্রবেশ করছেন, তখন তাঁরা শুনলেন, মহারাজ চন্দ্রনাথ কিছু একটি ঘোষণা করছেন। তাই মহারাজ আত্ম ও দেবী কল্পনা উভয়েই সতর্ক ভাবে সেই ঘোষণা শুনতে থাকলেন।

রাজা চন্দ্রনাথের ঘোষণা – আমার প্রিয় চন্দ্রপুরের প্রজারা ও তারই সাথে আমার ভ্রাতার প্রিয় সূর্যপুরের প্রজারা, সত্য বলতে, আপনারা কখনোই নিজেদের দুই রাজ্যের প্রজা মনে করেন নি, আমাদের দুই ভ্রাতার কারণেই আপনারা বাধ্য থাকতেন নিজেদের দুই রাজ্যের প্রজা মানার জন্য। তাই আমরা দুই ভ্রাতা একত্রে সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, আর আপনাদের দুই রাজ্যের প্রজা হয়ে পৃথক থাকতে হবেনা। দুই রাজ্য একত্রিত হয়ে আজ থেকে এক নতুন রাজ্য নির্মিত হলো।

এই কথাতে প্রজার উল্লাস সমস্ত ভূমি ও আকাশে গুঞ্জিত হলে, রাজা সূর্যনাথ এবার ঘোষণা করলেন – আমাদের প্রিয় প্রজারা, আমরা দুই ভ্রাতাই জানি, আপনাদের কাছে সর্বাধিক প্রিয় কে। তাই, আপনাদের সর্বাধিক প্রিয় যে, সেই দেবী ধরা, যিনি আপনাদের সকলের আপন কন্যা, তাঁর নামেই এই নতুন রাজ্য স্থাপিত হলো, আর তাই আজ থেকে এর নাম হলো ধরাধাম।

পূর্বের থেকেও অধিক উচ্চৈঃস্বরে প্রজার উল্লাস গুঞ্জিত হলে, আবার রাজা চন্দ্রনাথ সকলপ্রজাকে শান্ত করে বললেন – প্রজারা, এই চন্দ্রনাথ, আর এই সূর্যনাথ এবার বয়স্ক হয়েছে। আমাদের মধ্যে সাহস কম আর ভীতি অধিক ক্রিয়া করছে। তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, ধরাধামকে এক নতুন বিশ্বাসজনক ব্যক্তির হাতে তুলে দিতে। আর সেই বিশ্বাসজনক ব্যক্তি আর কে হতে পারে! যাকে আপনাদের সকলের বিশ্বাস, দেবী ধরা বিশ্বাস করেন, তার থেকে অধিক বিশ্বাসী ব্যক্তি কেই বা হতে পারেন, আর তাই আপনাদের ধরাকে মহারানী করে রেখে, তাঁর স্বামীকে ধরাধাম রাজ্যের মহারাজের পদে আমরা ইতিমধ্যেই রাজ্যাভিষেক করেছি।

রাজা সূর্যনাথ এবার বললেন – আর সেই বিশ্বাসী ব্যক্তি কে জানেন প্রজারা! তিনি হলেন সেই ব্যক্তি, যিনি মাতা ব্রহ্মময়ীর সর্বাধিক বিশ্বাসের পাত্র, যার নামকে মাতা ব্রহ্মময়ীকে হত্যা করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত করে, তাকে হত্যা করার চক্রান্ত করে, মাতা ব্রহ্মময়ীর নামকে সম্পূর্ণ ভাবে ধুলিস্যাত করার নিকৃষ্ট প্রয়াস করে হয়েছিল।

প্রজারা সকলে এবার মানসের নামে জয়ধ্বনি দিলে, বেশ কিছুক্ষণ সেই জয়ধ্বনি শ্রবণের পর, দেবী ধরার কণ্ঠস্বর পেলেন আত্ম ও কল্পনা। দেবী ধরা বললেন- আমার প্রিয়জনরা, মাতা ব্রহ্মময়ী আমাদের সকলের একমাত্র মাতা, আর তিনিই আমাদের স্নেহের ঘড়া। সেই স্নেহের ঘড়া থেকে আমরা স্নেহরূপ জল গড়িয়ে গড়িয়ে পান করতাম আর তৃপ্ত হয়ে জীবনযাপন করতাম। কিন্তু কারুর তা সহ্য হয়নি। কেউ চাইছিলেন যে আমাদের এই স্নেহপান করা সমাপ্ত হোক, আর শুরু হোক সংগ্রাম।

তবে তিনি কি চাইলেন, বা না চাইলেন, তাতে আমাদের কিছু এসে যায়না। আমাদের এসে যায়, আমাদের সেই স্নেহের ঘড়া কি চান, সেই কথাতে। সেই ঘড়া আমাকে নিজের দেহত্যাগের পূর্বে নিজের কাছে ডাকেন, আর সমস্ত বৃত্তান্ত বলেন যে, কিভাবে তাঁর হত্যা করা হবে। আর বলেন, কি ভাবে তাঁর প্রিয় পুত্র, মানসকে এই হত্যাকাণ্ডে ফাঁসিয়ে, মৃত্যু দেওয়ার প্রয়াস করা হবে।

তাঁর মৃত্যু নেই, তাও তিনি দেহত্যাগ করবেন, কারণ তিনি চান যে এতকাল যেই স্নেহদানের জন্য তিনি সংগ্রাম করেছেন, আর আমাদেরকে সংগ্রাম করতে হয়নি, এবার আমাদেরকে সেই স্নেহলাভের জন্য সংগ্রাম করতে হোক। তিনি আমাকে স্পষ্ট ভাবে বলেন যে, এবার আমাদেরকে সেই সংগ্রামই করতে হবে। এতকাল আমাদেরকে সেই স্নেহের ঘড়া থেকে স্নেহপান করা থেকে কেবল আমরা নিজেরাই আটকেছি, অন্য কেউ আমাদেরকে আটকান নি।

কিন্তু আমাদের এই নিজেকে নিজে আটকানোর ভাব থেকে জন্ম নিয়েছে, নিজেস্বতার বোধ, আমিত্বের বোধ, অহম বোধ। আর এবার সেই অহম বোধই আমাদেরকে সেই স্নেহপান করতে আটকাবে। তাই আমরা যদি সত্যই তাঁর স্নেহ পান করতে চাই, তাহলে আমাদেরকে এবার সংগ্রাম করতে হবে, সেই অহমবোধের সাথে সংগ্রাম করতে হবে।

আমাদের সেই সংগ্রামে সচেতনতা, একাগ্রতা ও নিমগ্নতা দেখেই, তিনি পুনরায় আবির্ভূত হবেন, আমাদের সেই স্নেহদানের জন্য। আর যখন তিনি পুনরায় আবির্ভূতা হবেন, তখন তিনি স্বয়ংই এই আমিত্বের, এই অহমের, এই আত্মভাবের নাশ করবেন। … অর্থাৎ আমার প্রিয়জনেরা, আমরা এবার যে সংগ্রামে যুক্ত হবো, তা অন্য কারুর সিদ্ধান্ত নয়, স্বয়ং আমাদের মাতার সিদ্ধান্ত।

আর মাতা, আমাকে এই সুবাদে আরো বলেন যে, আমাদের এই সংগ্রাম অসম্ভব হয়ে যাবে, যদি তাঁর প্রিয়পুত্র মানসের মার্গদর্শন আমাদের সাথে না থাকে। তাই তিনি এও বলেন যে, মানসই এই পথের প্রধান কাঁটা, তাই যারা তাঁর সমস্ত সন্তানকে এই সংগ্রাম থেকে দূরে রেখে, তাদের মন-মানসিকতাকে সম্পূর্ণ ভাবে বশীকরণ করার চিন্তা করছে, তারা মানসকে চক্রান্ত করে ফাঁসিয়ে, মৃত্যুদণ্ড দেবার প্রয়াস করবে। আর তাই আমার কর্তব্য হবে, তাঁকে উদ্ধার করা।

আমার প্রিয়জনেরা, মায়ের ইচ্ছা ও কৃপাতেই তাঁকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল, প্রথমে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড থেকে বাঁচানো সম্ভব হয়েছিল আর অতঃপরে তাঁকে চক্রান্তের কারাগার থেকে মুক্ত করাও সম্ভব হয়েছিল। আর এবার প্রয়োজন আমাদের সংগ্রামের শুভারম্ভের, আর তাই মায়ের প্রিয়সন্তান, যিনিই আমাদের এই যুদ্ধের মার্গদর্শক হবেন, তাঁকেই এই সংগ্রামের শীর্ষপদ প্রদান করতে উদ্যোগী আমি। তা প্রজারা, আপনারা সকলে এই সংগ্রামে ভাগ নেবেন তো?

প্রজাদের মধ্য থেকে বিভিন্ন হিল্লোল উঠতে থাকলো- এই সংগ্রাম আমাদের সকলের সংগ্রাম, আমরা শিরা উপশিরা হয়ে সঙ্গ দেব, আমরা ধমনী হয়ে সঙ্গ দেব, আমরা ধরাধামের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ হয়ে সঙ্গ দেব, আমরা যকৃত হবো, পিণ্ড হবো, উদর হবো, নাসিকা হবো, সমস্ত অঙ্গ হয়ে উঠবো এই সংগ্রামের। আমরা ধাতু হয়ে, জ্বারক হয়ে, বিজ্বারক হয়ে, অম্ল হয়ে, খার হয়ে এই যুদ্ধে অংশ নেব। আমরা উদ্ভিদ হয়ে, আপনার ও মহারাজ মানসের সুরক্ষা করবো, শত্রুর সূচনা দেব, শত্রুর থেকে মুক্তির মার্গ নির্ণয় করবো। আমরা পুনরায় মাতার স্নেহ লাভ করবো।

দেবী ধরা আবার বললেন – একটি অন্তিম ঘোষণা, কনো উদ্দেশ্যে নয়, এই সংগ্রামে মাতার প্রিয় মানসকে নয়, স্বয়ং মাতাকেই নিজের অঙ্গে অঙ্গে, নিজের অন্তরের কোনে কোনে, কণায় কণায় স্থাপন করে নিতে ব্যকুল ছিলাম, আর সেই ব্যাকুলতাতেই মানসকে আমি আপন করে ফেলেছি, আর সেও আমাকে। তাই সত্য বলতে মানস ব্যক্তিকে আমি আপন করে নিইনি, মানস আমার কাছে মাতার স্নেহের অন্তিম দীপক, যা আরো সহস্র দীপককে উজ্জীবিত করবে। অর্থাৎ মাতার স্নেহকে আপন করে নিয়েছি, বা বলতে পারেন, না আপন করে থাকতে পারিনি।

তাঁর অঙ্গে অঙ্গে মাতা বিরাজ করেন, তাঁর নিশ্বাসে প্রশ্বাসে মাতা বিরাজ করেন, তাঁর প্রতি বীর্যকণাতে মাতার উর্জা স্থাপিত। তাই আমি না চাইতেও যে তিনি আমার আপনের থেকেও অধিক আপন। আর তাই থাকতে পারিনি, তাঁকে আপন না করে। আর সাথে সাথে আমি ধন্যও হয়ে গেছি যখন মাতার স্নেহ স্বয়ং আমাকে আপন করে নেন, অর্থাৎ মানস আমাকে আপন করে নেন। … আর তাই আজ তিনি আমার স্বামী, আর আপনাদের রাজা।

প্রজাদের মধ্যে পুনরায় সোরগোল উঠলো – ধন্য আমাদের মহারানী, ধন্য তাঁর মাতার প্রতি স্নেহ, ধন্য তাঁর আমাদের প্রতি স্নেহ। তিনি সত্যই আমাদের মহারানী, তাই তো আমাদেরকে মাতার স্নেহ ফিরিয়ে দেবার জন্য, তিনি স্বয়ং এই সংগ্রামে অগ্রণীভূমিকা গ্রহণ করে নিয়েছেন। … পুনর্বার সোরগোল উঠলো – আমরা মহারাজের থেকে কিছু শুনতে চাই, হ্যাঁ শুনতে চাই।

তাই এবার মানসের কণ্ঠস্বর পেলেন আত্ম ও কল্পনা – আজ আপনাদের মাতার স্নেহপানের প্রতি নিষ্ঠা দেখে, আমি সত্যই বাক্যহারা। নতুন করে তাদের কাছে আর কি বলবো, যারা মাতার স্নেহ লাভের জন্য স্বয়ংই ব্যকুল। কেবল একটিই কথা বলবো, আমি মানস, কনো কালেই শক্তিশালী ছিলাম না। প্রয়োজনই পরেনি শক্তিশালী হবার, কারণ সর্বদা মায়ের ছত্রছায়ায় থাকতাম। তিনি থাকতে, কেই বা আঁচ প্রদান করতে পারে কারুকে।

হয়তো নয়, সত্যই অত্যন্ত নিষ্ক্রিয় ছিলাম। মাতা স্বয়ং আমাকে কাছে ডেকে বলেছিলেন, তাঁর মৃত্যু হলে, চন্দ্রপুর আমাকে উদ্ধার করে নিয়ে যাবে, আর আমাকে নতুন করে সংগ্রাম করতে হবে, তাঁকে ফিরিয়ে আনার জন্য। কিন্তু আমি এতটাই অপদার্থ যে, মাতা এই কথা বলার পরেও, তাঁর সুরক্ষা করার প্রয়াসও করিনি।

হ্যাঁ জানি, সমস্তই তাঁর লীলা, তাই, তাই হতো যা হয়েছে। কিন্তু যদি আমি প্রয়াস অন্তত করতাম তাঁর সুরক্ষার জন্য, তাহলে এতটা অসহায় আর হতাশ লাগতো না। আজ আমার নিজেকে অপরাধী মনে হয়। হত্যাকারী আমি অবশ্যই নই, আমার প্রাণপ্রিয় মাতার হত্যা করার কথা স্বপ্নেও ভাবা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। যাকে ছাড়া একপাও চলার সামর্থ্য নেই আমার, তাঁকে ছাড়া থাকার কথা ভাবাও আমার পক্ষে অসম্ভব। কিন্তু হত্যাকারী না হয়েও আমি হত্যাকারী, কারণ আমি কনো রকম প্রয়াস করিনি মাকে সুরক্ষিত করার।

আপনারা কেন মা-হারা হলেন, আমি জানিনা, এত বোধ আমার নেই। তবে এটুকু বুঝতে পারছি যে, আমার মা-হারা হবার দোষী আমি স্বয়ং। আমার অকর্মণ্যতাই আমাকে এই দণ্ড প্রদান করেছে। চক্রান্তের শিকার আমি হয়েছি, হওয়াই উচিত ছিল। আমার নিজের প্রতিবাদ করার ইচ্ছাও জাগেনি তখন, কারণ আমি আত্মগ্লানিতে ভুগছিলাম। নিজের প্রাণপ্রিয় মায়ের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াতে আমি অংশই নিতে পারলাম না।

না না, আমার সাথে কনো অন্যায় হয়নি, কারণ আমার অকর্মণ্যতার দণ্ড ছিল সেই সমস্ত কিছু। … নিজেকে তো আমি নিজে ক্ষমাও করতে পারছিলাম না। প্রচণ্ড বেদনা হচ্ছিল আর চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলতে ইচ্ছা হচ্ছিল, মা, তুমি ফিরে আসবে না আসবেনা, সে তো সম্পূর্ণ তোমার ইচ্ছা। সকলের নিষ্ঠাতে তুমি তুষ্ট হলে, অবশ্যই তুমি ফিরবে। কিন্তু এবারও কি আমি কনো উদ্যোগ নেবো না? এবারও কি আমি সেই একই প্রকার অকর্মণ্যই থেকে যাবো!

কিন্তু আমার অন্তর আরো এক কথা বলছিল। সে বলছিল, আর সেই সুযোগ তুমি পাবি না। তোর অকর্মণ্যতাই তোকে চক্রান্তে ফাঁসিয়ে, তোর মৃত্যু নিশ্চিত করবে। … হতাশ ছিলাম, নিজের কাছে নিজেই অপরাধী ছিলাম, নিজেকে নিজেরই হত্যা করতে সাধ করছিল, নিজেকে নিজেরই অবিশ্বাস করার প্রয়াস আসছিল। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে উপস্থিত হলেন দেবী ধরা।

চন্দ্রপুর থেকে কেউ আসবেন, তা তো মা বলেই রেখেছিলেন আমাকে। তাই, তখনও আমার নিজেকে অপরাধী গণ্য করা স্তব্ধ হয়নি। কিন্তু পথ চলতে চলতে, অনুভব করলাম, দেবী ধরার বিশ্বাসকে। তিনি আমাকে মানস মানছেন না, তিনি আমাকে মাতার আস্থা মানছেন, মাতাকে ফিরে পাবার অন্তিম আশার দীপক মানছেন। … বিশ্বাস ফিরে এলো আমার মধ্যে।

মনে হলো, আরেকবার নিজেকে বিশ্বাস করাই যায়। যখন স্বয়ং দেবী ধরা আমাকে বিশ্বাস করছেন, যখন স্বয়ং মা আমার উপর বিশ্বাস রেখে, আমাকে রক্ষা করার কথা বলেছেন। তখন তো নিজের উপর বিশ্বাস আরো একবার করা যেতেই পারে। … পুনরায় তাকিয়েছি দেবী ধরার দিকে, জানার চেষ্টা করেছি যে, তিনি কি এই বিশ্বাস জোর করে করছেন আমাকে, নাকি স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে এই বিশ্বাস করছেন।

দেখেছি যে, তাঁর বিশ্বাসের মধ্যে লেশমাত্রও অবিশ্বাস নেই। … ফিরে পেয়েছি নিজেকে, আঁকরে ধরার প্রয়াস করেছি তাঁকে যিনি আমাকে বিশ্বাস করছেন বলে আমার মনে হচ্ছিল। প্রশ্ন ছিল মনে, উত্তরও পেলাম, আর উত্তর রূপে পেলাম বিশ্বাস নয়, প্রবল বিশ্বাস। দেবী ধরার পর্বতপ্রমাণ বিশ্বাস তাঁকে আমার কাছে সমর্পণ করে দিল। … বিশ্বাস ফিরে পেয়েছি, সত্য বলতে নবজীবন দিয়েছেন আমাকে দেবী ধরা। …

মাতা বলতেন, স্ত্রী কখনোই কামিনী নয়, স্ত্রী হলেন দ্বিতীয় জননী, যিনি পুরুষকে দ্বিতীয়বার জন্ম দেন, তাঁর নিজের উপর বিশ্বাস ও ভরসার জন্ম দেন। কতটা যে সঠিক বলতেন তিনি, তা কখনোই বুঝতাম না, যদি আপনাদের প্রিয়তমা দেবী ধরাকে জীবনে লাভ না করতাম। হ্যাঁ, তিনি আমাকে দ্বিতীয়বার জন্ম দিয়েছেন।

না কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে, তাঁর এই অপার স্নেহকে নিয়ে বাণিজ্য করবো না। আমাকে উদ্ধার করা থেকে আমাকে রাজা করার পদ্ধতিতে, তিনি যেই ভাবে আমাকে সুরক্ষিত করার সমস্ত সম্ভব প্রয়াস করেছেন, তাতে আমি আমার মাতাকেই দেখতে পেয়েছি। আমি সঙ্গমকে ভয় পেতাম। সঙ্গমের মধ্যে এক উগ্রতা থাকে, তাকে আমি বিশেষ ভাবে ভয় পেতাম। তখন আমায় মা বলতেন, সঙ্গম হলো স্ত্রীরূপ মাতার পতিরূপ সন্তানকে দেওয়া সুরক্ষার অঙ্গিকার।

তিনি বলতেন, সঙ্গম ততটাই পবিত্র ক্রিয়া, যতটা সন্তানকে স্তনপান করানো। তাই, উগ্রতা সঙ্গমে থাকলে, তা সঙ্গমকে অপবিত্র করে দেয়। সঙ্গম মানে, সুরক্ষাদান, মাতা সন্তানকে সুরক্ষার বচন দেন সঙ্গমের মাধ্যমে। … মিথ্যা বলবো না, দেবী ধরার থেকে আমি সেই সুরক্ষার বচনই লাভ করেছি। না উগ্রতা নয়, বলতে কনো দ্বিধা নেই, আমার মাতা, আপনাদের সকলের মাতার থেকে যেই অপার স্নেহ লাভ করেছি, সেই সুরক্ষারই আভাস পেয়েছি দেবী ধরার সেই আলিঙ্গনের মধ্যে। আর তাই নিজেকে অর্পণ করেছি সেদিনই তাঁর কাছে।

আপনারা অত্যন্ত ভাগ্যবান যে, দেবী ধরা আপনাদের প্রিয় কন্যা। আমি আপনাদের থেকেও অধিক ভাগ্যবান যে, তিনি আমার দেবী। তাই তাঁর প্রদত্ত্ব সুরক্ষাবচনের পরিবর্তে আপনাদের এই মহারাজ মানস বচন দিচ্ছে যে, প্রাণ থাকতে, আপনাদের মহারানীর, ও তাঁর সমস্ত প্রিয়তম প্রজাদেরকে কনো ভাবে অসুরক্ষিত হতে দেবনা।

হ্যাঁ, আমরা অনেক আয়েস করে নিয়েছি, কারণ আমরা নিশ্চিন্ত ছিলাম যে আমাদের মাতা উপস্থিত থাকতে, আমাদের কনো সংগ্রামে লিপ্ত হতেই হবেনা। তাই হয়তো আমরা একটু কঠোর পরিশ্রম করবো। আপনাদের সকলকে বিভিন্ন সেনা খণ্ডে বিভক্ত করবো, কারুকে যকৃত করবো, তো কারুকে হৃদপিণ্ড, আবার কারুকে শুধুই পিণ্ড। সেই প্রতিটি খণ্ডকে আমি স্বয়ংই উত্তপ্ত করবো, পীড়া দেব, কারণ তাদেরকে কঠিন হতে হবে সংগ্রামের উদ্দেশ্যে।

যেকোনো প্রকার ঝড় আসতে পারে তাদের উপর, তাই তারা সদাই যেন সেই ঝড়ের জন্য প্রস্তুত থাকে, ও ঝড়কে অপসারণ করার সামর্থ্য রাখে, তাই কঠিন হওয়া আবশ্যক। সেই উদ্দেশ্যে, আমি স্বয়ং আপনাদেরকে হয়তো পীড়া প্রদান করবো, বেদনা প্রদান করবো। কিন্তু বিশ্বাস রাখুন, সেই সমস্ত কিছু আপনাদেরকে অটুট করে রাখার জন্যই করবো।

হতে পারে, আমি আপনাদের স্বয়ং নিজে হাতে করেই বিষ প্রদান করবো, হ্যাঁ বিষ বলেই তা প্রদান করবো। তবে নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন, সেই বিষে আপনারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না, বরং শত্রুর দেওয়া বিষের থেকে সুরক্ষিত হয়ে উঠবেন। এই সামান্য পীড়া আমাকে আপনাদের প্রদান করতেই হবে। যেই বিশ্বাস আপনারা আমাকে করেছেন, স্বয়ং দেবী ধরা আমাকে করেছেন, তার মান আমাকে রাখতেই হবে। যেই বিশ্বাস স্বয়ং জগজ্জননী ব্রহ্মময়ী মা করেছেন এই অধমকে, তাঁর মান আমাকে রাখতেই হবে”।

মানস থামলেন। প্রজার মধ্যে আনন্দ উল্লাস শ্রবণ করা গেল। প্রজা উৎকণ্ঠার সাথে চিৎকার করে উঠলেন- সমস্ত পরিস্থিতিতে আপনার সাথে আছি মহারাজ। আপনাকে আমরা বিশ্বাস করি। মাতার স্নেহ আমরা ফিরে পাবই। নিজেদের দুর্বলতাকে আমরা অপসারণ করে, মাতাকে ফিরিয়ে আনবোই। মাতা চান আমরা সবল হই। আমরা সবল হবই মহারাজ।

ঘোষণার অন্ত হলো, উৎসবের সূচনা হলো, আর আত্ম সমস্ত কথা শুনে যেন সামান্য টলে গেল। কল্পনা মহারাজ আত্মের স্কন্ধ আকর্ষণ করে উৎকণ্ঠার সাথে বলে উঠলেন – নিজেকে সামলান মহারাজ। … সংগ্রাম আমরাও করবো। যোজনা আমরাও করবো। আমরাই জিতবো।

ধরাধামে, আত্ম ও তাঁর পত্নীকে আতিথেয়তা প্রদর্শন করা হলো। যেই মানসের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করেছিল স্বয়ং আত্ম, আজ তাঁর কাছেই উপস্থিত হয়ে, আত্মকে বিবাহের জন্য সম্বর্ধনা দিতে হলো, মহারাজ হবার জন্য দিতে হলো তাঁকে নজরানা।

ত্রিদিবস চন্দ্রপুরে স্থাপিত হয়ে যেই মানসকে বন্দী করার যোজনা করা হয়েছিল, ত্রিদিবস ধরাধামে স্থাপিত থেকে, সেই মানসেরই আতিতেয়থা স্বীকার করতে হলো। আর এতে আত্ম সম্পূর্ণ ভাবে ভেঙে পরলে, দেবী কল্পনা তাঁর স্কন্ধে হাত রেখে বললেন, “দুশ্চিন্তা করবেন না মহারাজ। … আমরা এতক্ষণ পরিস্থিতি কি দাঁড়িয়েছে, তা না জেনেই যোজনা করছিলাম। তাই আমাদের যোজনা ছিল ভিত্তিহীন। তবে এবার আমরা পরিস্থিতি কি, তা জানি। তাই আমাদের যোজনা হবে যথার্থ ও ঘাতক”।

আত্ম বিরক্তির সাথে বললেন, “কিন্তু দেবী কল্পনা আপনি বুঝতে পারছেন! অর্ধেক সেনা আমাদের সাথে ছিল। যা যা আমরা শুনেছি, সমস্ত কিছু তারাও শুনেছে। অর্থাৎ সম্যক ব্রহ্মাণ্ডপুর আজ জেনে গেছে যে কে তাঁদের মাতা ব্রহ্মময়ীর হত্যা করেছিল, আর কে আসল অপরাধী। সকলে মানসিক ভাবে মানসের পক্ষে চলে গেল। আমাদের বল কি পরে রইল? কাকে আর আমরা সেনা বানাবো?”

দেবী কল্পনা বিকৃত ওষ্ঠে ঈষৎ হেসে বললেন, “মহারাজ আপনি ভুলে যাচ্ছেন যে, আপনার তিন রানী, আর তাদের থেকে আপনি তিনটি মহাবলবান পুত্র পেতে চলেছেন। … আমার কথা ভালো করে শ্রবণ করুন মহারাজ। ধরাধামের সাথে আমাদের সন্ধি করতে হবে। এখানে মানস ও ধরা, বিভিন্ন সেনা টুকরি নির্মাণ করবে, তা তো বুঝতেই পারছেন। … এঁদের সাথে সন্ধি থাকলে, আমাদের পুত্ররা এই সেনার সাথে মিশে গিয়ে, একদিন এই সেনার থেকেই নিজেদের প্রকাণ্ড শক্তিশালী সেনার নির্মাণ করে নেবে।

আর যেদিন তা করে নেবে, সেদিন আমরা ধরা, মানস ও সম্পূর্ণ ধরাধামের উপর কব্জা করে নেব। … বিশ্বাস রাখুন আমার যোজনাতে মহারাজ। আপনিই হবেন অখণ্ড ব্রহ্মাণ্ডের অধিপতি। মহারাজও নয়, আপনাকে এই অখণ্ড ভূমির অধীশ্বর, পরমেশ্বর করে দেব আমরা। … আর আমার পুত্ররা হবে আপনার শ্রেষ্ঠ তিন সেনাপতি। আর তখন আমরা তিন ভগিনী হয়ে উঠবো আপনার তিন মুখ্যমন্ত্রী ও একই সঙ্গে আপনার ঐকান্তিক ভক্ত।

আমার যোজনা অনুসারে চলুন মহারাজ, সন্ধি করুন এই ধরাধামের সাথে, যাতে আমাদের সন্তানদের এখানে এই যুদ্ধটুকরিতে প্রেরণ করতে পারি, যুদ্ধ শেখার জন্য। আর যুদ্ধ শেখার নাম করে, তারা অবশ্যই সমস্ত ধরাধাম ও ব্রহ্মাণ্ডপুর সমেত, স্বয়ং ধরা আর মানসকেও বশ করে নেবে। … মহারাজ, মানসকে হত্যা করা আমাদের প্রাথমিক যোজনা ছিল, কিন্তু বেশ বুঝতে পারছেন যে স্বয়ং ব্রহ্মময়ী তার রক্ষক, তাই তার ক্ষতি করা সম্ভব নয়, কিন্তু তাকে বশ করা তো সম্ভব! … কি বলেন”।

মহারাজ আত্ম, পুনরায় সুদৃঢ় হয়ে বসে খলহাস্য হেসে বললেন, “তাহলে দেরি কেন, চলো রানী, ধরা আর মানসের সাথে আলাপটা একটু গভীর করে আসা যাক। বোঝানো যাক তাদেরকে যে, তাদের সংগ্রামে আমরাও যুক্ত। … আমরা আমাদের মধ্যে মানসিক বিকারের জন্য বিভ্রান্ত, আর তাই আমরাও এই সংগ্রামে সামিল হয়ে, আমাদের নিজেদের মানসিক বিভ্রান্তিকে অপসারিত করে, তাঁদের মত করেই, মাতা ব্রহ্মময়ীকে পুনরায় আবাহন করতে চাই। … কি উচিত হবে এই ধারায় বার্তা করা?”

দেবী কল্পনা হাস্যপ্রদান করে বললেন, “উচিত নয় মহারাজ, যথোচিত”।

যোজনা অনুসারেই আত্ম ও দেবী কল্পনা এবার গেলেন মানস ও ধরার নিকটে। মানসও জানেন, দেবী ধরাও জানেন, তাঁরা কাদের সাথে কথা বলছেন। তাঁরা জানেন যে যারা তাঁদের সম্মুখে উপস্থিত, তাঁরা মাতা ব্রহ্মময়ীর হত্যাকারী, কিন্তু এও জানেন যে তাঁরা অতিথি। তাই নম্র ভাবে কথা বললেও, সন্তর্পণে কথা বলা শুরু করলেন।

প্রথম কথা আত্মই বললেন, “মহারাজ মানস, আমি ও আমার ঘরনি, দেবী কল্পনা, উভয়েই আপনাদের ঘোষণা শ্রবণ করেছি। আমরা অত্যন্ত উৎফুল্লও আপনাদের ঘোষণা শ্রবণ করে, আর সাথে সাথে চিন্তিতও। … ভ্রাতা মানস, তোমাদের ঘোষণা শ্রবণ করার আমার এমন মনে হয়েছে যে, এই মানসিক বিকৃতি, যা এককালে রাজা চন্দ্রনাথ ও রাজা সূর্যনাথের ছিল, সেই একই মানসিক বিকৃতি আমার ও আমার পত্নীদের মধ্যেও এসেছে।

মাতা ব্রহ্মময়ী বলতেন, একবার মানসিক বিকৃতি এসে গেলে, তার থেকে মুক্ত হওয়া খুবই কঠিন, বা একপ্রকার অসম্ভবই। … তাই আমি ভাবছিলাম, কেন না আমার সন্তানদের তোমাদের কাছে প্রেরণ করি! আমরা মানসিক বিকৃতির শিকার, তাঁরা তো নয়, তাঁরা তো নিষ্পাপ। তা কেননা, তাঁদেরকে তাঁদের কাছে প্রেরণ করি যারা মানসিক ভাবে বিকৃত নয়, যেমন তুমি ও তোমার ঘরনি।

আমি নিশ্চিত, তোমাদের তত্বাবিধানে থাকলে, তাঁদের মধ্যে মানসিক বিকৃতি আসা অসম্ভব। … তাই এমন নিশ্চয় করার ইচ্ছা হচ্ছে আমার। আমার পত্নী, দেবী কল্পনারও একই মানসিকতা। তবে তোমার ও তোমার ঘরনির স্বীকৃতি আবশ্যক এই ক্ষেত্রে”।

মানস দেখলেন, আত্মের মধ্যে এই মানসিক বিকৃতি, যার শিকার সে নিজে এবং তাঁর ঘরনিরাও, তার থেকে মুক্তি লাভের যথাযথ ইচ্ছা ও ব্যকুলতা রয়েছে। তাই তিনি স্বহাস্যে ও সাগ্রহে বললেন, “নিশ্চয় ভ্রাতা আত্ম। কেন নয়। আপনারা নিশ্চিন্তে থাকুন, আর আপনাদের সন্তানদের যখন ৮ বৎসর বয়স হবে, তখন আপনি বা আপনার রানীদের কারুর সাথে এখানে এনে রেখে যাবেন তাঁদেরকে। মাতা ব্রহ্মময়ীর ইচ্ছায় উচিত শিক্ষা ও মার্গদর্শন প্রদান করে, তাঁদেরকে আপনার রাজত্বে পুনরায় প্রেরণ করবো।

মাঝে আপনারা, অর্থাৎ সন্তানদের পিতামাতা এখানে এসে বছরে দুই-তিনদিন আমাদের রাজ্যের অতিথি হয়ে থেকে, সন্তানদের সঙ্গও লাভ করবেন। আর তাছাড়াও, ব্রহ্মাণ্ডপুরের মহোৎসব অনুষ্ঠিত হয় শ্রাবণমাসে, সেই কালে তাঁদেরকে সেখানে প্রেরণ করবো, প্রতিবছর। আসলে তাঁরা ব্রহ্মাণ্ডপুরের রাজপুত্র, তাই প্রজারও তো রাজপুত্রদের সাথে সময় কাটানো আবশ্যক। তাই না! তাই, সেই সময়টা তাঁদেরকে আপনার রাজ্যে ফিরে যেতে দেব। উৎসবের শেষে তারা পুনরায় চলে আসবে। আপনার সম্মতি আছে, এই প্রস্তাবে?”

মহারাজ আত্ম হাস্যমুখে বললেন, “সন্তানের কল্যাণ সাধনে, কোন পিতার অমত থাকবে? অবশ্যই সহমত আছে”।

বিভিন্ন আচার, খাদ্যাদি গ্রহণ করে, মহারাজ আত্ম ও দেবী কল্পনা, নিজেদের যোজনা সম্পন্ন করে প্রত্যাবর্তন করলেন নিজেদের রাজ্যে, তো দেবী ধরা তাঁর স্বামীর কাছে এসে বললেন, “নাথ, আপনি মানস ও কল্পনার যোজনাতে পদার্পণ করলেন কেন? এই পদার্পণ যে পদস্খলনের সমান মহারাজ!”

মানস হেসে বললেন, “মাতাকে আবাহন করার উদ্দেশ্যেই এই পদার্পণ দেবী। হ্যাঁ, আমি জানি, এতে আমাদের বিস্তর ক্ষতিসাধন হবে, তবে এই ক্ষতিসাধনই মাতাকে আবাহন করা হবে”।

দেবী ধরা জিজ্ঞাসু হয়ে বললেন, “নাথ, আমি রাজনীতি জানি, অন্য কিছু তেমন ভাবে জানিনা। রাজনীতি অনুসারে, আপনার কৃত্যের অর্থ এই দাঁড়ায় যে, আপনি শত্রুকে নিজের কক্ষে এনে বসবাস করতে অনুমতি দিলেন। অর্থাৎ যেকোনো মুহূর্তে আপনার শত্রু, আপনাকে অধিগ্রহণ করে নিতে পারে। … কিন্তু আপনি যেই কথা বললেন, অর্থাৎ মাতার আবাহন, সত্য বলতে মহারাজ, মাতা আমার কাছে একটি স্বপ্ন মাত্রই।

হ্যাঁ নাথ, আমি তাঁর ব্যাপারে কতটাই বা জানি। শুধু যেটুকু জানি, তাতেই আমি তাঁর কাছে সমর্পিত। তাঁর সাথে বার দুই তিনেকই সাখ্যাত হয়েছে আমার, আর তাতেই এমন মনে হয়েছে যে, তাঁর গন্ধে মেতে থাকি, তাঁর কোলেই শুয়ে থাকি। তাঁর সম্মুখে দাঁড়ালে, রাজনীতি ভুলে যেতাম আমি, কারণ রাজনীতির কনো প্রয়োজনই পরতো না! … আপনি জানেন না নাথ, তাঁর সম্মুখে যখন প্রথমবার গেছিলাম, তখন কেবলই তাঁর চরণবন্দনা করার কালে তাঁকে স্পর্শ করেছিলাম।

জানেন, তাঁকে ওই সামান্য স্পর্শ করার অনুভূতি আমাকে এতটাই ব্যকুল করে দেয় যে, আমি দ্বিতীয়বার তাঁর সাথে সাখ্যাত করার জন্য ব্যকুল হয়ে উঠি। দ্বিতীয়বার যখন সাখ্যাত করি তাঁর সাথে, তখন তাঁর হস্তকে একটু ভয়েভয়েই স্পর্শ করি। যদি তিনি কিছু বলেন। কিন্তু যখন স্পর্শ করলাম, তিনি স্নেহ বশে, আমার অঙ্গে নিজের অতিকোমল করস্পর্শ করতে, আমি যেন নির্জীব হয়ে, তাঁর চিরতরের গুলাম হয়ে গেলাম অন্তরে অন্তরে।

তার পরে, যেই দুইতিন বার সাখ্যাত হয়েছে, আর মনে দ্বন্ধ ছিলনা। আমি নিশ্চিত হয়ে গেছিলাম যে, তিনি মা। সন্তান যেমন মায়ের কাছে সমস্ত কিছু আবদার করতে পারে, তাঁর রক্তদ্বারা সিঞ্চিত স্তনদুগ্ধও আবদার করতে পারে, তেমনই আমি তাঁর কাছে যা কিছু আবদার করতে পারি। আমার আবদার ছিল, তাঁর স্পর্শ। তৃতীয়বারের সাখ্যাতে, তাঁর আলিঙ্গন লাভ করেছিলাম। কতক্ষণ তাঁকে আলিঙ্গন করেছিলাম আমি জানি না, তবে সেদিন গৃহে প্রত্যাবর্তন করতে অত্যন্ত রাত্রি হয়ে যায়, যাতে পিতা প্রথমে বকাবকি করেন, কিন্তু পরে যখন জানেন যে মাতা ব্রহ্মময়ীর সাথে ছিলাম, তখন পিতা হয়েও পুত্রীর কাছে ক্ষমা চান।

নাথ, মাতার স্মৃতি আমার কাছে, তাঁর অতিমধুর কণ্ঠস্বর, আর অতিমধুর স্পর্শ। বারেবারে এই দুই লাভ করতে ছুটে যেতাম তাঁর কাছে। কিচ্ছু আর চাওয়ার থাকতো না, কিচ্ছু আর পাওয়ার ছিলনা। তাঁর স্পর্শলাভই যেন শ্রেষ্ঠ পাওয়াছিল, তাঁর মধুর কণ্ঠস্বরই যেন শ্রেষ্ঠ উপহার ছিল। … কিন্তু এই দুইয়ের আবেশে আটকে গিয়ে, যেই কয়দিন তাঁর সাথে সাখ্যাত করেছিলাম, সেই কয়দিনে বহু কিছুর শিক্ষা গ্রহণ করতে পারতাম, কিন্তু সেই দিকে মনই যায়নি।

জানেন নাথ, সেই পাহারের চূড়ায়, যখন আপনি আমাকে স্নেহের বসে স্পর্শ করেছিলেন, নিকটে এসে, আপনার নিশ্বাসে আমাকে স্নান করাতে শুরু করেছিলেন, আপনার প্রতিটি স্পন্দনে, প্রতিটি স্পর্শে মাতাকে অনুভব করেছিলাম। … যৌনতা! না নাথ, যৌনবোধও আমার মধ্যে জাগেনি, জেগেছিল তো শুধু সমর্পণের ব্যকুলতা। অন্তর ক্রন্দন করছিল আমার। আর মাতাকে স্পর্শ করতে পারবো না, আর সেই ক্রন্দনকে যেন মাতাই থামাচ্ছিলেন, আপনার মাধ্যমে স্পর্শ করে করে। তাই যৌনসঙ্গমে নয়, তৃপ্তির ভাবে উন্মত্ত হয়ে উঠি, যখন যখন আপনি আমাকে স্পর্শ করেন।

তাই তো নাথ, যখন যখন আপনি আমাকে স্পর্শ করেন, আমি আপনার সাথে সঙ্গমে লিপ্ত হয়ে উঠি। না কনো যৌনভাবও থাকেনা অন্তরে, অন্তরে থাকে কেবলই নিজের মাতাকে লাভ করার প্রবল আনন্দ। এই স্পর্শসুখ যে আমার কাছে নেশার ন্যায় উপস্থিত। আমি জানি, আপনিও এমন কিছু অনুমান করেছিলেন যে আপনার স্পর্শেই আমি কাতর, আমি উন্মত্ত। আমি জানি, আপনিও জানন যে, আপনার স্পর্শ লাভ মাত্রই, আমি বিভোর হয়ে যাই, আর সমস্ত সুদবুধ হারিয়ে ফেলি। আর তাই আপনিও সংযত হয়ে গেছেন, আমাকে স্পর্শ করা থেকে”।

মানস বললেন, “সত্য কথা দেবী। আপনার মধ্যে কি ভাব ক্রিয়া করে, তা তো আমার জানা ছিলনা, কিন্তু আমি দেখেছি, আপনাকে স্পর্শ করা মাত্রই, আপনি কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। আপনার মধ্যে মিলনব্যকুলতা জন্ম নেয়। … আর তা দেখে আমার মনে হয়েছে যে, আমার স্পর্শই আপনার উপর করা যৌননিগ্রহ। তাই ঈষৎ বিরত থাকি সেই স্পর্শ দান করতে। … আসলে দেবী, আপনি যখন যখন সঙ্গমে লিপ্ত হয়ে যান আমার সাথে, আমার মধ্যে এক অপরাধবোধ কাজ করে যে, আমি বোধহয় আপনার দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছি। … কিন্তু দেবী, আমি যে আপনাকে স্নেহ করি, আপনি আমার কাছে কনো পণ্যদ্রব্য নন যে, আপনাকে ব্যবহার করবো। তাই …”

ধরা হেসে বললেন, “জানি নাথ। … এইটিই তো সেই শিক্ষা, যা দিবারাত্র আপনি মাতার সাথে থেকে লাভ করেছেন। … নাহলে এক স্ত্রী এক পুরুষকে নির্বিচারে যৌনসুখ প্রদান করতে প্রস্তুত থাকলেও, এক পুরুষ কি করে সেই সুখ গ্রহণ করাকে এমন ভাবতে পারেন যে, সেই স্ত্রীর দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছেন। … এর অর্থ এই যে, সেই পুরুষ সুখের মোহে অন্ধ নন, যতই সুখলাভের সম্ভাবনা থাকুক তাঁর কাছে, স্নেহই তাঁর কাছে সর্বোত্তম ভাব। …

আমি এও জানি যে, আত্মকে আপনি যেই প্রতিশ্রুতি দিলেন, তাও মাতার সাথে যুক্ত। কিন্তু কিভাবে তা যুক্ত, তা আমার ধারনার অতীত। আসলে নাথ, মাতার ব্যাপারে আমি যা কিছু জানি, তা যে কেবলই এই স্পর্শসুখ। তাই আমাকে সেই গুহ্য কথা বলুন, যা আপনার আত্মকে দেওয়া প্রতিশ্রুতির অন্তরালে রয়েছে”।

মানস হেসে বললেন, “ধরা, তিনি মা। আর মায়ের স্বভাব এই যে, মা কখনোই সন্তানের সুখের দিনে সঙ্গ দেন না, কিন্তু সন্তানের বেদনার দিনে তিনি সঙ্গ দেওয়া থেকে সামান্য ভাবেও বিরত থাকতে পারেন না। দেবী, আমাদের উদ্দেশ্য আমাদের মাকে ফিরে পাওয়া। যেই বিকৃতি একাধিক ব্যক্তিত্বের মধ্যে স্থান পেয়েছে, তাকে আমি আপনি বা আমাদের ন্যায় অনেকে মিলেও, অক্লান্ত পরিশ্রম করেও, দূর করতে পারবো না, যদি না সেই অক্লান্ত পরিশ্রম তাঁর মার্গদর্শন অনুসারে হয়।

তাই ধরা, যা প্রয়োজন, তা হলো আমাদের মায়ের পুনরাবির্ভাব। যা প্রয়োজন, তা হলো তাঁর মার্গদর্শন। তবেই আমাদের অক্লান্ত পরিশ্রম সার্থক হবে সমস্ত বিকৃতির নাশ করতে, আর পুনরায় তাঁকে সার্বিক ভাবে স্থাপন করতে। … অর্থাৎ, সুখকে নিশ্চয় করে রাখার প্রয়াস অনর্থক দেবী। প্রয়োজন বিপদের। প্রয়োজন আশঙ্কার। যখন সন্তানের গহন বিপদ, স্খলনের আশঙ্কা, তখনই মাতা আবির্ভূতা হন। মা যে তিনি, তাই সন্তানের এমন বিপদ দেখেও কি করে তিনি দূরে দাঁড়িয়ে থাকেন?

আমি জানি ধরা, আত্মের এই প্রস্তাবের অন্তরে ছিল কেবলই খল ও ছল। সে নিজের সন্তানদের আমাদের এই রাজ্যে প্রবেশ করাতে চায়। আর এও জানি যে, পূর্বে তাঁরা পুত্রসন্তান চাইছিলেন, কিন্তু এক্ষণে দেবী কল্পনা কন্যাসন্তানের ইচ্ছা রাখছেন। কেন? কারণ তিনি চাইছেন যে, তাঁর কন্যারা এই রাজ্যে থেকে, এখানের একাধিক সেনানায়কের থেকে বীর্য গ্রহণ করে, সন্তান লাভ করবে, ও ব্রহ্মাণ্ডপুরকে শক্তিশালী সন্তান প্রদান করবে।

আর এও জানি যে, তাদের যোজনা অনুসারে, একসময়ে তাঁরা তাঁদের এই সন্তানদের দিয়ে সম্যক ধরাধামকে অধিকারে আনার প্রয়াস করবে। কিছুটা বশীকরণও করবে, তবে যিনি বশীকরণ করেন, তিনি বশীকরণ করে শান্ত কোথায় থাকতে পারেন? তাই বশীকরণ করার শেষে, সম্যক ভাবে এই ধরাধামকে অধিকারে এনে, ব্রহ্মাণ্ডপুরকে একটিই মাত্র অখণ্ড রাজ্য করে, তার শাসক রূপে আত্ম স্থিত হবে।

দেবী, এই কথা আত্মও জানে, দেবী কল্পনারাও জানেন, আর আমিও জানি, আর আমার থেকে আপনিও জানলেন। কিন্তু এই সমস্ত কিছুর অন্তরালে যে মাতার লীলা রয়েছে, তার প্রমাণ কি জানেন? তার প্রমাণ হলো, আত্ম এই যোজনার প্রসার করার প্রস্তাব ব্যক্ত করলো। … দেবী, আমাদের মধ্যে হাজারো মানসিক বিকৃতি থাকতে পারে, আর সেই সমস্ত মানসিক বিকৃতির জনক জননী আমরাই, যাতে মাতার কনো প্রকার হাত নেই।

কিন্তু এটি যে সত্যের মাত্র একটি দিক। অন্য বিশালাকায় দিকটি এই যে, আমার বিকৃতি আমার অন্তরেই বিরাজ করে, আমার বাইরে তার কনো অস্তিত্বও নেই। বাইরে যা কিছু আমি ব্যক্ত করতে সক্ষম, তা কেবলই মাতার ইচ্ছাবশতই সম্ভব।

আসলে দেবী, আমি যে আমি, সেটিই একটি বিকৃতি আমার। প্রকৃত অর্থে, না মাতা ব্যতীত কিছু ছিল, না আছে, আর না থাকা সম্ভব। কারণ তিনি ব্রহ্মাণ্ড নন, তিনি ব্রহ্ম। অর্থাৎ এক ও একমাত্র তিনিই সত্য। আমার এই ভাবা যে, আমি আমিই, মাতা নই, এটিই আমাদের মানসিক বিকৃতি। আর সেই বিকৃতি থেকে আমরা বহু প্রকার যোজনা করে থাকি অন্তরে। চিন্তা করে, কল্পনা করে, ইচ্ছা করে, আমরা আমাদের আত্মভাবকে সত্য মনে করতে থাকি।

কিন্তু দেবী সত্য মনে করা আর সত্য হওয়ার মধ্যে যে বিস্তর ব্যবধান! সত্য তো এই যে, মাতা ব্যতীত কিছুই নেই। তাই এই প্রকৃতি, যার মাধ্যমে আমার শব্দ আমার মুখ থেকে বাইরে নির্গত হচ্ছে, তোমার প্রকৃতি যার মাধ্যমে তুমি আমার কথিত কথা শুনতে পাচ্ছ, এই সময় বা কাল, যার ছত্রছায়ায় আমি কথা বলতে সক্ষম আর তুমি শুনতে সক্ষম, সেই সমস্তই আমাদের মাতা।

তাই দেবী, আমার মানসিক বিকৃতি থেকে আমি যা কিছু চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনা করে নিয়ে যোজনা নির্মাণ করতে স্বতন্ত্র, কিন্তু আমার মুখ দিয়ে কি কথা উচ্চারিত হবে, আর তুমি আমার মুখে দিয়ে উচ্চারিত কোন কথা, কোন সময়কালে শ্রবণ করবে, তাতে আমাদের মানসিক বিকৃতির, আমাদের আত্মের, আমাদের চিন্তার, আমাদের ইচ্ছার, আমাদের কল্পনার বিন্দুবিসর্গ হাত নেই।

তা যে কেবলই মাতার ইচ্ছা। আসলে দেবী, আমার মানসিক বিকৃতিতেই আমার স্বতন্ত্রতা, কিন্তু আমার নিজের যে এই চিন্তা, ইচ্ছা আর কল্পনা করা ছাড়া কনো কিছু করার কনো সামর্থ্য নেই। যদি কিছু শব্দের উচ্চারণ করতে হয়, সেখানে তো উর্জ্জার প্রয়োজন, সেই উর্জ্জার আবির্ভাব কোথা থেকে হবে? সেখানে তো মেধারও প্রয়োজন, সেই মেধাই বা কোথা থেকে উৎপন্ন হবে? সেই সামর্থ্য তো আমার নেই। সেই উর্জ্জা উৎপাদনের, সেই মেধা উৎপাদনের সামর্থ্য আমার কাছে কোথায়?

নেই দেবী। তাই আত্ম বা কল্পনা, যাই অন্তরে ভেবে থাকুক, যাই যোজনা করে থাকুক, যেই শব্দ আমাদের কাছে তাঁরা উপস্থাপন করেছে, তা এই কারণেই করতে পেরেছে কারণ স্বয়ং আমাদের মাতার, স্বয়ং প্রকৃতির সম্মতি ছিল সেই শব্দউচ্চারণের। সেই কারণেই তো তিনি সেই শব্দ উচ্চারণের উর্জা প্রদান করলেন, সেই শব্দ সাজিয়ে বলার মেধা লাভ করলেন উনারা।

আর শুধু তাই নয়, সেই শব্দ আমার জন্য মাতার প্রদত্ত আদেশ। তাই তো সেই শব্দকে মাতা আমার অন্তরে উর্জা ও মেধা সঞ্চার করিয়ে শ্রবণ ও ধারণ করালেন। … আর রইল কথা, সুখনাশের! দেবী সুখনাশ না হলে যে মাতা আসবেনই না সম্মুখে। সন্তানের সুখের ভাগ মাতা কিছুতেই নেন না, কিন্তু বেদনার ভাগ নিতে তিনি ছাড়েন না। অর্থাৎ তিনিই সুখনাশের যোজনা করছেন, আর তাঁর আগমনের পথ নির্মাণ করছেন”।

খানিক থেমে, মানস পুনরায় বললেন, “একি দেবী তুমি কাঁদছ?”

দেবী ধরা হাস্যমুখে, নিজের অশ্রু মুছে বললেন, “না নাথ, এ বেদনার অশ্রু নয়। আসলে আমি উত্তর পেলাম মাতার থেকে যে, কেন আপনার স্পর্শ মাত্রই আমি তাঁকে লাভ করি, আর সঙ্গমে লিপ্ত হয়ে যাই। … আসলে আপনি যে সম্পূর্ণ ভাবে তাঁতে বিভোর। আপনার কাছে যে তিনি সর্বক্ষণ প্রত্যক্ষ। সমস্ত শব্দে, সমস্ত মেধায়, সমস্ত যোজনায়, সমস্ত সময়কালে, সম্যক প্রকৃতিতে তিনি যে আপনার কাছে ভাস্মর। তাই আপনার মধ্যে তাঁর স্পর্শসুখ লাভ করবোনা তো কার মধ্যে তা লাভ করবো!

নাথ আজ আমি বুঝতে পারছি যে, পিতাকে ও কাকাকে যে চন্দ্রপুর ও সূর্যপুরের একত্রীকরণ করে ধরাধামের নির্মাণ করার চেতনা দিয়েছিলেন, তিনি কে? আজ বুঝতে পারছি, আপনার সুরক্ষার চিন্তা করিয়ে, আপনাকে এই ধরাধামের মহারাজ করার নিশ্চয় যে নিয়েছিলাম আমি, তা কার চেতনায়। … আসলে নাথ, আপনার সুরক্ষার প্রয়োজন, সেটি আমার মানসিক বিকৃতি, আর আমার এই মানসিক বিকৃতিকে ব্যবহার করে, আমাদের মাতা, যিনি স্বয়ং পরাচেতনা, তিনি আপনাকে এই ধরাধামের রাজা করলেন।

কারণ তিনি জানেন যে, যদি কেউ তাঁকে সম্যক ভাবে জানেন, চেনেন ও বিশ্বাস করেন, তা একমাত্র আপনি। … বেশ অনুভব করছি নাথ, আমার অন্তরের মানসিক বিকৃতিটিই কেবল আমার, আমার উচ্চারিত শব্দ নয়, আমার উচ্চারিত শব্দের অন্তরে থাকা মেধা নয়। আসলে আমরা যে যোজনা করি, বা যোজনা করতে পারি, এটিই আমাদের মানসিক বিকৃতি।

প্রকৃত যোজনা যে আমাদের মাতা অনুক্ষণ করে চলেছেন। তবে তাঁর যোজনা যে অত্যন্ত গুহ্য, সেই গুহ্যযোজনাকে জানার জন্য যে, তাঁর কাছে সম্পূর্ণ ভাবে সমর্পণ করতে হয়, আমার মত কেবল দেহসমর্পণ করলে তা অনুভব করা যায়না। আপনার ন্যায় সম্পূর্ণ সমর্পণ করলে তবেই সেই গুহ্যযোজনার ভান করা যায়”।

বেশ কিছু বছর কেটে গেল এই আনন্দ উৎসবের পর। আর এই কিছু বৎসরের মধ্যে, আত্মের তরফেও, আর মানসের তরফেও, দুই তরফেই, একাধিক বীজ অর্পণ হতে থাকলো, যা মানসের কথানুসারে মাতারই যোজনার বিস্তার।

মানসের বীজের থেকে ধরার গর্ভে জন্ম নিলো দুই কন্যাসন্তান, শিখা ও বেগবতী। আর অন্যদিকে, আত্মের বীজে তাঁর তিন রানির গর্ভে, তিন পুত্রসন্তান জন্ম নিলো। দেবী ইচ্ছার গর্ভ থেকে জন্ম নিলো প্রভাত; দেবী চিন্তার গর্ভ থেকে জন্ম নিলো রজনী; ও দেবী কল্পনার গর্ভ থেকে জন্ম নিলো তামস। প্রথমেই বলেছিলাম, এই তিন স্ত্রীর কামুকী স্বভাব আসলে এক নাট্য মাত্র, এমন বলার কারণ এবার প্রকৃষ্ট হলো, কারণ এই একটি একটি করে সন্তান জন্ম দেবার পর থেকে, আত্ম আর কনো প্রকার সঙ্গমসুখ লাভই করলো না তাঁর পত্নীদের থেকে।

অর্থাৎ কেবল মাত্র সন্তান লাভের জন্যই, এই তিন ছায়াদেবীর কামুকী স্বভাবের নাট্য উপস্থিত ছিল। ছায়াদেবীদের এই তিন পুত্রের স্বভাবও অত্যন্ত বিচিত্র হতে থাকে, যতই তারা জন্মমুহূর্ত থেকে অষ্টম বয়সী হতে থাকলো, কিন্তু একটি বৈচিত্র্য সকলের মধ্যে একই ছিল, আর তা হলো মাতৃভক্তি। যে যার মাতার কথনকে দৈববানী বলেই মেনে নিতো। আর তিনজনেই, তাঁদের পিতার প্রতি থাকতো অনুগত।

ত্রিছায়াদেবী নিজেদের নাট্য বন্ধ করতেই, কামুক আত্মের সঙ্গমসুখ লাভ করা বন্ধ হয়ে গেল। তবে অহম সর্বস্ব আত্ম, এতে বেদনায় কাতর হবার ব্যক্তিত্ব নয়। বরং সে এবার এই সুখলাভ না করতে পেরে ক্ষিপ্র হয়ে উঠতে শুরু করে। সঙ্গমসুখ লাভের জন্য, যেই সামান্য নমনীয়তা তার মধ্যে উপস্থিত ছিল, তাও চলে যায়। আর তা চলে যেতে, এবার আসা শুরু হয় নির্দেশাবলী। সঙ্গমসুখ যেন তাঁর কাছে এক জীবনযাপনের নেশা ছিল, তা চলে যেতে এক নতুন নেশার উদ্বেগ ঘটে।

আর সেই নেশা হলো নির্দেশাবলী প্রদানের নেশা। সর্বক্ষণ সে নিজের তিনরানীকে নির্দেশ দিয়ে চলেছে, আর একই প্রকার নির্দেশ থাকে তার সন্তানদের জন্য। তবে এতে স্ত্রী বা সন্তানদের কনো প্রকার অসুবিধা হয়না, কারণ ব্যক্তির মানসিকতা অনুসারে আসে তাঁর নির্দেশ, আর ব্যক্তির মানসিকতা সেই নির্দেশ পালনে সম্মত বা অসম্মত হয়।

যেখানে আত্মের মানসিকতা ছিল সর্বত্র নিজের অধিকার স্থাপন, সেখানে তাঁর স্ত্রী ও সন্তানদেরও সমান মানসিকতা ছিল। পার্থক্য এই যে, আত্মের স্ত্রীরা মানেন যে, এক আত্মের কারণেই তাঁরা প্রতিষ্ঠা পেতে সক্ষম, আর তাই আত্মের প্রতিষ্ঠাকেই সম্মুখে রাখেন তাঁরা, আর আত্মের প্রতিষ্ঠাকে সম্মুখে রেখে, নিজেদের একচ্ছত্র স্থাপনের অভিলাষকে অনায়সে বিস্তৃত করতে থাকেন। সেই বিস্তারের প্রধান উদ্যোক্তা হয়ে ওঠেন, তাঁদের সন্তানরা, অর্থাৎ প্রভাত, রজনী ও তামস।

আর অন্যদিকে আত্মের কেবলই নিজের প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন। তাঁকে প্রতিষ্ঠা প্রদান করার জন্য, যে যা কামনা রাখে, তাকে তিনি তাই দিতে সর্বদা তৎপর। তাঁর স্ত্রীসন্তান সর্বদা তাঁরই প্রতিষ্ঠার জন্য কর্মরত, তাই সমস্ত প্রকার সুখসুবিধা তাঁদের জন্য নিশ্চয় করতে থাকেন আত্ম।

অন্যদিকে, মানস তাঁর পত্নীর প্রতি অত্যন্ত তৃপ্ত থাকেন, তাঁকে দুইদুইটি ফুটফুটে কন্যাসন্তান প্রদান করার জন্য। শিখা জন্ম নেবার আনন্দে, মানস ও ধরার অন্তরঙ্গতা হ্রাস পায়না, উপরন্তু তা অধিক হয়ে যায়, আর তাই তাঁদের দ্বিতীয় সন্তান, বেগবতী হয়। বেগবতী ও শিখাকে লাভ করে, প্রফুল্লমণ্ডিত মানসের প্রফুল্লতাকে আঙ্গিক ভাবে অনুভব করে, দেবী ধরা তৃতীয়বার গর্ভবতী হন, আর তৃতীয় কন্যা সন্তানের জন্ম দেন, যার নাম রাখেন মেধা।

এই তিন সন্তান জন্ম দেবার পর, ধরার দেহ অত্যন্ত দুর্বল হয়ে গেলে, মানস নিজমনে প্রতিজ্ঞা করেন, এবং ধরাকেও বলেন, “দেবী, এবার আমাদের সংযত হওয়া উচিত। আপনার শরীর যেই ভাবে ভেঙে পরেছে, তা নিশ্চিত ভাবে মাতার নির্দেশ যে, আর অধিক সন্তানের জন্ম দিতে আপনি আর সক্ষম নন। … তাই দেবী, আমার একান্ত অনুরোধ, এবার আমাদের সংযত হওয়া উচিত। … সন্তান অবশ্যই মাতাপিতা উভয়ের কাছে প্রিয় হয়, আর আমার বিশ্বাস, আমি আপনি ও আমাদের তিন সন্তান মিলে, পুনরায় মাতাকে ধারণ করবো।

কিন্তু দেবী, তা কনোভাবেই সম্ভব নয়, যদি না আপনি আমাদের সঙ্গে থাকেন। আমি খুব উদ্বিগ্ন, আপনি বুঝতে পারছেন কিনা জানি না। মেধার জন্ম দেবার কালে, আপনার স্বাস্থ্য এমন অবস্থায় এসে পৌঁছেছিল যে, পিতা চন্দ্রনাথ, তাত সূর্যনাথ, মাতা চন্দ্রপ্রভা, এঁরা সকলেই মানতে শুরু করেছিল যে আপনাকে তাঁরা হারিয়ে ফেলবেন। দেবী, আমি অত্যন্ত তৃপ্ত ও আনন্দিত যে আপনি আমাকে ও নিজেকে তিনতিনটি দিব্যকন্যাসন্তান উপহার দিয়েছেন। কিন্তু ধরা, আপনার থেকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ কেউ নয়।

মাতা ব্রহ্মময়ী আমার জীবন হলে, আপনি আমার জীবিত থাকার কারণ। মাতাকে হারিয়ে আমি অনাথ হয়েছিলাম যখন, আমার অনাথভাবকে ঘুচিয়ে ছিলেন আপনি। ধরা, তোমাকে হারাবার কথা হলেই, নিজেকে পুনরায় অনাথ মানতে বাধ্য হই আমি। হয়তো স্বার্থপরের মতই শোনাচ্ছি, কিন্তু তাই তো তাই, দেবী আমি পুনরায় অনাথ হতে চাইনা। … তাই কৃপা করুন, আর কৃপা করে, আর আমার সম্মুখে সঙ্গমের বার্তা নিয়ে আসা বন্ধ করুন।

দেবী, স্ত্রী সব অবস্থাতেই মাতা, জন্মদাত্রী রূপেও, অর্ধাঙ্গিনী রূপেও, আর কন্যা রূপেও। একাক মাতার একাক প্রকার স্নেহদান, একাক প্রকার শাসন, একাক প্রকার সুরক্ষাচিন্তা। জন্মদাত্রী, অর্ধাঙ্গিনী তথা কন্যা, তিনজনেই পুরুষের দেহসুরক্ষার চিন্তা করেনই, সঙ্গে সঙ্গে পুরুষের আত্মিক শান্তির চিন্তাও করতে থাকেন। … তাই, নিজেকে এমন ভাববেন না যে, আপনি কেবলই আমার সঙ্গিনী, আপনি আমার দ্বিতীয় মাতা। আর সন্তান মাতার আবাহন কখনো ফেলতে পারেনা।

তাই দেবী, যদি আপনি সঙ্গমের বার্তা নিয়ে আমার সম্মুখে আসেন, সে যে আমার কাছে মাতৃআদেশ, তাকে প্রত্যাখ্যান করার সামর্থ্য আমার নেই। … কিন্তু তাতে যে এই সন্তান মাতৃহারা হবে। তাই কৃপা করুন আমার উপর”।

দেবী ধরা ঈষৎ স্নেহের হাসি হেসে, মানসের দুই কপোলে, নিজের দুই করস্থাপন করে বললেন, “নাথ, সন্তানের জন্ম দেওয়া স্ত্রীর কাছে অত্যন্ত গর্বের, তাই আমিও গর্ববোধ করেছি সন্তানদের ভূমিষ্ঠ করতে পেরে, তবে আমি নিঃসন্তান সত্যই কখনো ছিলাম না, যখন থেকে আপনাকে জীবনে লাভ করেছি। … জানিনা আমি, অন্য পুরুষদের কাছে তাঁর স্ত্রীরা কিরকম, কিন্তু নাথ, আপনার থেকে যেই আপনভাব লাভ করেছি আমি, তা আমাকে সর্বক্ষণ এই জানান দেয় যে, আমি তিন কন্যার নই, আমি এক পুত্র ও তিন কন্যার মাতা, আর নাথ, আমার সমস্ত সন্তানের মধ্যে আপনি সর্বাধিক প্রিয়।

এই সন্তানকে যখন এই মা বক্ষে ধারণ করে, তখন আরো আরো নিকটে লাভ করতে চায় তাঁকে, আর নিকটস্থ করতে করতে, আমি এইসত্য ভুলেই যাই যে, ইনি আমার সন্তান নয় স্বামী। ইনাকে স্নেহ প্রদান করতে হলে স্তনদান করতে হয়না, সঙ্গমে লিপ্ত হতে হয়। … তাই নাথ, আমি জানি আর আমি এও জানি যে আপনিও জানেন। আমি জানি যে, আপনার কাছেও আমার থেকে লব্ধ সঙ্গমসুখ সঙ্গমানন্দ নয়, বরং তার মাধ্যমে আপনি আপনার মাতার সান্নিধ্য লাভ করে তৃপ্ত হন। আর আমিও এও জানি যে, আপনিও জানেন যে, আমিও সঙ্গমানন্দে ভাসি না, বরং স্নেহের বশে সমস্ত সীমাত্যাগ করে ফেলি।

কিন্তু হ্যাঁ, একসময়ে সন্তানকে স্তনদান বন্ধ করতে হয়, সন্তানকে জীবনের পরবর্তী অধ্যায়ে নিয়ে যাবার জন্য। তাই নাথ, আপনি সঠিক বলছেন, এবার আমাদের এই সঙ্গমবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া বন্ধ করা উচিত, কারণ আমাদের জীবনে পরবর্তী অধ্যায় এসে উপস্থিত, আমাদের সন্তানদের রূপে। এবার আমাদের তাঁদের আদর্শ নির্মাণ করা উচিত। … আর আমার মনে হচ্ছে, ইতিমধ্যেই আমরা কিছু বিলম্ব করে ফেলেছি, শিখা ও বেগবতীর ক্ষেত্রে। তারা দুজন ৬ ও ৪ বছরের হয়ে গেছে, কিন্তু আমরা তো সঙ্গমে মেতে থাকার কারণে, তাদেরকে সংস্কার দিতেই ভুলে গেলাম!”

মানস ধরার স্কন্ধে হাত রেখে বললেন, “ধরা, দুঃখ করবেন না। যা হয়, তা মাতার ইচ্ছাতেই হয়। আর তাই কি হতে চলেছে, আমরা তার ধারণাও করতে পারিনা। … এই দেখুন না, আমরা তো ধারণা করেছিলাম যে আত্মের পত্নীরা কন্যাসন্তানের চিন্তা করছে, কিন্তু বাস্তব তা নয়। … এবার গণিত দেখুন দেবী, আত্মের তিন পুত্র, আর তার যোজনা সেই পুত্রদের এই রাজ্যে প্রেরণ করে, এই রাজ্যকে অধিকারে আনা। … অন্যদিকে আমাদেরও তিন কন্যা, কিন্তু তাদের মধ্যে একজনকে সংস্কার দেবার সময় আমাদের কাছে আছে, আর বাকি দুইয়ের ক্ষেত্রে প্রাথমিক সংস্কার আমরা দিতেই পারলাম না।

এর থেকে একটি ইঙ্গিত আমি পাচ্ছি দেবী, আর তা হলো আমাদের দুই কন্যা, শিখা ও বেগবতী, সংস্কারের অভাবে আত্মের তিনপুত্রকে কামনা না করে বসে। … আমি পিতা হয়ে, আর আপনি মাতা হয়ে, অবশ্যই চাইবেন না যে, আমাদের প্রিয় মাতার হত্যাকারীর লহু আমাদের কন্যার দেহে প্রবাহিত হোক, কিন্তু ভবিতব্যকে কে আটকাতে পারে!”

দেবী ধরা এবার উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন, “শাসন করে কি তা আটকানো যায়না!”

মানস মাথা নেড়ে বললেন, “না দেবী, ভবিতব্য সাখ্যাত নিয়তি, সাখ্যাত আমাদের মাতা। তাঁর সন্তান হয়ে, তাঁর কর্মে আমরা কি করে বাঁধা দিতে পারি? কেমন সন্তান আমরা তাহলে তাঁর?”

ধরা পুনরায় উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন, “কিন্তু এমন তিনি কেন চাইবেন?”

মানস গম্ভীর হয়ে বললেন, “নিশ্চিত হয়ে তো বলা সম্ভব নয় যে মাতা কি চাইছেন, তবে আমার একটা অনুমান ভিত্তিক ধারণা রয়েছে যে, এবারে মাতা এই বিকৃতমানসিকতা, যা আপনার পিতা ও তাত থেকে শুরু হয়েছিল, এবং আত্মতে গিয়ে তা ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছে, তাকে সেঁকর থেকে উপরে ফেলতে চাইছেন। হয়তো সেই কারণে, তিনি বৃক্ষকে তার শ্রেষ্ঠ অবস্থায় উন্নীত করতে চাইছেন। হয়তো সেই জন্য তিনি চাইছেন, সেই বিষবৃক্ষ সম্পূর্ণ ভাবে নিজেকে মেলে ধরুক, যাতে তাঁর তাঁকে সম্পূর্ণ ভাবে উৎখাত করা সম্ভব হয়”।

দেবী ধরা চিন্তিত হয়ে বললেন, “সেই জন্যই কি আত্মের তিন পুত্র, আর আমাদের দুই কন্যাকে আমরা সংস্কার দিলামই না! … অর্থাৎ, আপনার অনুমান যদি সত্য হয়, সেই ক্ষেত্রে শিখা ও বেগবতী…! নাথ, পিতামাতা হয়ে কি আমরা কিছুই করতে পারিনা!”

মানস বললেন, “পারি দেবী… অবশ্যই পারি। … ভবিতব্য যা, তা তো হবেই, তার উপর পিতামাতারও কনো নিয়ন্ত্রণ থাকেনা। কিন্তু একটি কাজ আমরা করতে পারি, আর তা হলো দেরি হয়ে গেলেও, সামান্য সংস্কারদানের প্রয়াস আমরা করতেই পারি শিখা আর বেগবতীকে। … আমরা এমন করতে পারি যে, মেধাকে সম্যক সংস্কার প্রদান করলাম, আর সেই সংস্কারের স্পর্শ শিখা আর বেগবতীকেও দিতে থাকলাম”।

দেবী ধরা সম্মতির ভঙ্গিতে বললেন, “এতে শিখা আর বেগবতীর কাছে এটি নিশ্চিত হয়ে যাবে যে, তাঁদের ভগিনী, মেধা সঠিক পথেই চলছে। তাই তারা যদি ভুল পথে যায়ও, তবুও এক না এক সময়ে সঠিক পথে তাদের প্রত্যাবর্তন করার অবকাশ থেকে যাবে”।

এই কথাতে মানস সায় তো দিলেন, কিন্তু একটু আনমনা থাকার কারণে, দেবী ধরা পুনরায় প্রশ্ন করলেন, “নাথ, আপনি কি আরো অন্যকিছু …!”

মানস অন্যদিকে তাকিয়েই উত্তর দিলেন, “মাতা আমাকে একটি কথা বলেছিলেন। তিন গুপ্ত বীজের কথা। বলেছিলেন, সেই তিন গুপ্ত বীজের মাধ্যমেই তিনি পুনরায় ফিরবেন। কিন্তু সেই তিন গুপ্তবীজের কনো ঠিকানা পাচ্ছিনা দেবী। আত্মের সন্তানও তিন, আমাদেরও তিন সন্তান। সর্বত্রই সেই তিন। তাহলে কোন তিনবীজ গুপ্ত আর কোন তিন বীজ স্পষ্ট! … নাকি, অন্য স্থানে আরো তিন বীজ গুপ্ত রয়েছে!”

দেবী ধরা মানসের স্কন্ধে হাত রেখে বললেন, “চিন্তা করবেন না মহারাজ। চিন্তা করার অর্থই হলো, আত্মের পত্নী চিন্তাকে আমাদের মনের কথা বলে দেওয়া। … আমি বিভিন্ন সূত্রধরেই কথাটা বলছি নাথ। আমি দেখেছি, অনেক ভাবে পরীক্ষানিরীক্ষা করে দেখেছি। আত্মের কনো গুপ্তচরের প্রয়োজনই নেই। আমরা যা কিছু ইচ্ছা করি, দেবী ইচ্ছা তা জেনে যান; আমরা যা কিছু চিন্তা করি, দেবী চিন্তা তা জেনে যান, আর যা কিছু কল্পনা করি, দেবী কল্পনা তা জেনে যান। তাই, এই তিনের ফাঁদে যতটা না পরা যায়, ততই ভালো।

আর নাথ, গুপ্ত বীজের কথা সম্বন্ধে এই বলবো, মাতাই সেই বীজকে গুপ্ত রেখেছেন, আর মাতাই তাদেরকে প্রকৃষ্ট করবেন। … আমরা কেবলই আমাদের ভূমিকা পালন করতে পারি, তাই সেই কর্মই আমরা বরং নিষ্ঠা সহকারে করি!”

মানস বললেন, “সঠিক কথা দেবী। … চলুন আমরা মেধাকে যথার্থ সংস্কার প্রদান করি, আর শিখা, বেগবতীকে যতটা সম্ভব ততটা। বাকি তাই হবে, যা মা চাইবেন”।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22