সর্বাম্বা কাণ্ড (কৃতান্ত প্রথম কাণ্ড)

কারাগারে মধ্যরাত্রে যখন মানস একাকী বসে বসে ক্রন্দন করছিলেন, তখন এক নারীমূর্তি তাঁর কারাগৃহের সম্মুখে এলেন। চুপিসারে, কারাগারের তালাতে একটি জ্বারক পদার্থ দিয়ে, কারাগারের তালা ভঙ্গ করে, মানসের নিকটে এসে বললেন, “চলুন দেব, আমার সাথে চলুন”।

মানসের নেত্র ক্রন্দনের জন্য রক্তচক্ষু। সে সেই স্ত্রীর দিকে তাকিয়েও কিছু ঠাওর করতে পারলো না। আর তাছাড়া সেই স্ত্রীর মুখমণ্ডল কাপড়ে ঢাকা, তাই এমনিও কিছু দেখতে পেলেন না। কেবল সেই স্ত্রীর অসামান্য মধুর কণ্ঠস্বর শুনতে পেলো মানস।

কিছু বলতে গেলে, সেই স্ত্রী, মানসের মুখকে নিজের কোমল করতলদ্বারা চেপে ধরে বললেন, “নাথ, এখানে কথা বলবেন না, প্রহরীরা জেগে যাবে। … পথে যেতে যেতে, সমস্ত কথা হবে। আমি চন্দ্রপুরের রানী, আমার নাম ধরা। মাতা ব্রহ্মময়ী আপনাকে আমার কথা বলে রেখেছিলেন। স্মরণ আছে? এখন আমার সাথে আসুন”।

মানস আর কথা বাড়ালেন না কারণ, মাতা ব্রহ্মময়ীর নির্দেশের অবহেলা তিনি করবেন না। তাই চুপিসারে দেবী ধরার পশ্চাতে পশ্চাতে যেতে থাকলেন। আজ সমস্ত প্রহরীরাও ব্যথিত, কারণ সকলেই তাঁদের মাতাকে হারিয়েছেন। আর তাই সকলেই ক্রন্দন করতে করতে প্রায় নিদ্রায় রত। তাই মানসের পলায়ন অতি সহজ হয়ে যায়।

প্রাসাদ পেরিয়ে, উত্তরের বনের মধ্যে প্রবেশ করে, বেশ কিছুদূর যাত্রা করে, দেবী ধরা মশাল জ্বালালেন দুটি, আর বললেন, “নাথ, আর মহাশূন্যপুরের প্রজারা আমাদের দেখতে পাবেন না। আমরা বনের মধ্যে গাঢাকা দিয়ে দিয়েছি। … তবে নাথ, রাত হয়েছে। আর কাল প্রভাতে আত্মের রাজ্যাভিষেক। তাই সকলে নিদ্রা ত্যাগ করে উঠে পড়বে। আর রাত্রি বেলায় আমরা এতদূর এসে ক্লান্ত বলে, আমরাও ঘুমিয়ে পড়তে পারি।

তাই যাতে, আপনার সন্ধান করতে করতে, মহাশূন্যপুরের প্রজারা আমাদের কাছে না আসতে পারে, আমাদের আরো গহন বনে যেতে হবে। খানিক গিয়ে, আমরা বিশ্রাম নেব রাত্রিটা, তারপর প্রভাতে আমাদের রাজ্যে প্রত্যাবর্তন করবো। সেখানে আমার পিতা, চন্দ্রনাথ আমার অপেক্ষা করছেন”।  এত বলে, বনের পথ ধরে, টিলার চূড়ায় চলে গেলেন মানস ও ধরা, সেখান থেকে মানস দেখতে পেলেন চন্দ্রপুরকে।

দেবী ধরা এবার বললেন, “নাথ, আমাদের এবার সামান্য নিচের দিকে যেতে হবে। সামান্য নিচের দিকে গেলে, আর মহাশূন্যপুরের সেনা আমাদেরকে দেখতে পাবেনা। … আসলে রাত্রি হয়েছে, তাই মশাল জ্বালিয়ে রাখতেই হবে, নাহলে বন্যপশুরা আমাদের আক্রমণ করবে। কিন্তু আমরা যদি এই চূড়ায় অবস্থান করি, তাহলে সম্যক মহাশূন্যপুর আমাদের মশালের আলো দেখতে পাবে, আর তাই আমাদেরকেও সহজে সনাক্ত করে নিতে পারবে। তাই সামান্য নিচে গিয়ে, মহাশূন্যপুরের থেকে সম্পূর্ণ আড়ালে চলে এসে, আমরা রাত্রিটা মশাল জ্বেলে বিশ্রাম করি আসুন”।

সামান্য নিচে নেমে গিয়ে, মশাল স্থাপন করে, চারিপাশে অগ্নির বেষ্টন করে রেখে, দেবী ধরা বসলে, এবার মানস দেবী ধরার মুখশ্রী দেখতে পেলেন। মশালের আলোতে যেটুকু দেখতে পেলেন, তাতে তাঁকে অপরিসীম সুন্দরী মনে হচ্ছিল না, তবে লাবণ্যময়ী তিনি বটেই।

তবে, মানসের এখন সেই সমস্ত কিছুর বিচার করার কনো ইচ্ছা নেই। তাঁর মন বড়ই ব্যকুল। চুপি সারে খানিক বসে রইল সে, আর নিজের অজান্তেই রোদন করতে থাকলো। দেবী ধরার সেই দিকে দৃষ্টি যেতে, সম্মুখে এসে বসলেন, এবং সান্ত্বনার হস্ত রাখলেন মানসের পৃষ্ঠে। মানস এবার কান্নায় ভেঙে পরে বলতে থাকলেন বিলাপের সুরে, “নিজের মায়ের শেষ কৃত্যও করতে পারলাম না! … এমনই হতভাগা আমি!”

দেবী ধরা সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, “যার মৃত্যুই সম্ভব নয়, তাঁর অন্তিম ক্রিয়া! … স্নায়ুর উপর জোর রাখুন নাথ, আমাদের মাতা কোথাও যাননি। কেবল প্রত্যক্ষ থেকে পরোক্ষে চলে গেছেন তিনি। … আমার পিতা, চন্দ্রনাথ তাঁর ঐকান্তিক সেবক ছিলেন, যখন তিনি নবীন ছিলেন। নাথ, তখন আপনি বা আমি, কেউই জন্ম নিইনি। জানেন আমার পিতা কি বলেন? তিনি বলেন, যেমনটা অবস্থায় তিনি মাতাকে সমস্ত জীবন দেখেছেন, তেমনই অবস্থায় আমরাও তাঁকে দেখে এসেছি।

এর অর্থ বুঝতে পারছেন নাথ? এর অর্থ এই যে, আমাদের মাতা কালনির্ভর নয়, তাঁর মধ্যে জ্বরা, ব্যধি, কিচ্ছু নেই। তাঁর জন্ম নেই, তাঁর মৃত্যুও নেই। তাই আপনি বৃথাই ভেবে চলেছেন যে, মাতা চলে গেছেন। তিনি কোথাও যাননি, তিনি সমস্ত কিছুই দেখছেন। এতকাল প্রত্যক্ষ ভাবে দেখেছেন, আর এখন পরোক্ষ ভাবে। আমাকে তিনি দিন সাতেক আগে ডেকে পাঠিয়েছিলেন, তখনই সমস্ত কিছু বলেছিলেন।

তিনি বলেছিলেন যে, আত্ম আমারই পিতার ন্যায় এক নয়ারাজ্য কামনা করছে। যেই পথ সে গ্রহণ করতে চলেছে, তার প্রয়োজন ছিলনা। সে নিজে এসে যদি তাঁকে এই নয়ারাজ্যের কথা বলতেন, ঠিক যেমন ভাবে আমার পিতাকে তিনি নয়ারাজ্য প্রদান করেছিলেন, আত্মকেও করতেন। তবে, তিন কামুকী কন্যার খপ্পরে পরে, আত্ম নাকি নয়ারাজ্যের কামনাকে সামনে না রেখে, মহাশূন্যকেই ব্রহ্মাণ্ডপুর করে দিতে ইচ্ছুক।

এই কথা বলে, মাতা আমাকে আজকের দিনে মহাশূন্যেই ছদ্মবেশে থাকার নিবেদন করেন। তিনি বলেন যে, ওই তিন কামুকী, আত্মকে দিয়ে বিষ প্রেরণ করবেন, তাঁকে হত্যা করার জন্য। সকলকে স্বতন্ত্রতা দিয়েছেন তিনি, তাই আত্মকেও দেবেন, আর তাই তিনি বিষগ্রহণ করে, যেই দেহকে আমরা মাতা বলে ডাকি, সেই দেহ ত্যাগ করবেন উনি।

তবে তিনি আরো বলেন যে, তাঁর দেহত্যাগেই তিন কামুকী থেমে থাকবে না। তাঁর অবর্তমানে রাজার আসনে স্থিত হওয়ার কথা আপনার, অর্থাৎ মানসের। কিন্তু আত্মকে সেই সিংহাসন প্রদান করার জন্য, মানসকে মৃত্যুদণ্ড দেবার প্রয়াস করবে। তাই তিনি আমাকে দায়িত্ব অর্পণ করেন যে, সঠিক সময়ে মানসকে এই মৃত্যুদণ্ড থেকে মুক্ত করতে হবে। এরপর মানসকে, ওরা কারারুদ্ধ করবে, এবং পুনরায় মৃত্যুদণ্ড দিতে চাইবে। আমাকে তিনি নির্দেশ দেন যাতে, আমি সেই অন্তরায়, আপনাকে কারাগৃহ থেকে মুক্ত করে আমার সাথে চন্দ্রপুরে নিয়ে চলে যাই।

এবার বলুন নাথ, আপনিই বলুন নাথ। কি মনে হয় আপনার! মাতা চলে গেছেন? না নাথ, মাতা কোথাও যাননি, আত্ম আর তিন কামুকী একটি চক্রান্তের রচনা করেছে। সেই চক্রান্তের পিছনে একটি উদ্দেশ্য আছে, একটি কামনা আছে। নিজের সন্তানের কামনাকে মাতা কি করে অদেখা করতে পারেন! তাই তিনি সেই কামনাকে পূর্ণ করতে দিয়েছেন, আর তাকে পূর্ণ করার জন্য, তিনি নিজেই এক লীলা করলেন।

নাথ, বিশ্বাস করুন আমার। আমার পিতা সর্বক্ষণ বলেন, কামনা আমাদের, কিন্তু সেই কামনা পূর্ণ করার জন্য লীলা করেন মাতা। সেই কামনা পূর্ণ করার জন্য নিজের ধমনীকেই তিনি কেটে বাদ দিয়ে দিতে পারেন, এমনই মা তিনি। তাই নাথ, বিশ্বাস করুন আমার, আত্মের কামনাকে পূর্ণ করতে লীলা করেছেন আমাদের মাতা। … এই লীলা তাঁরই, তাই তিনি সমস্ত কিছু জানেন যে, কে কি করবে, বা কখন করবে, বা কি করে করবে।

তাই, তিনি জানেন যে, আপনাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করার প্রয়াস হবে এই লীলার মাঝে। সেই কারণে আপনার সুরক্ষাহেতু আমাকে সেখানে আবাহন করেন। … তাই নাথ, এমন বিচার ত্যাগ করুন যে মাতা চলে গেছেন। সমস্ত কিছুই তাঁর। তিনি কোথায় যাবেন সমস্ত কিছু ছেড়ে? … এই মহাশূন্যপুরও তাঁর, আর এই চন্দ্রপুরও তাঁর, আর যেই ব্রহ্মাণ্ডপুর হবে, তাও তাঁর”।

মানস কিছুটা শান্ত হলেন, সেই কথাতে। তিনি বললেন, “মায়ের মুখে চন্দ্রপুরের অনেক নাম শুনেছি। বোধহয় আমি বেশ কয়েকবার মহারাজ চন্দ্রনাথকে দেখেওছি মায়ের কাছে আসতে। মায়ের মুখে শুনেছি যে মহাশূন্যপুর তখন নির্মিত হয়, যখন সূর্যপুর আর চন্দ্রপুর নির্মিত হয়, তার আগে পর্যন্ত এই রাজ্যের নাম ছিল ব্রহ্মপুর, আর তার একচ্ছত্র মাতা ও মহারানী ছিলেন মাতা ব্রহ্মময়ী”।

দেবী ধরা মাথা নিচু করে বললেন, “সঠিক কথা নাথ। আমার পিতা হলেন চন্দ্রনাথ, ও আমার কাকা হলেন সূর্যনাথ। চন্দ্রনাথ মাতার অত্যন্ত প্রিয় ছিলেন, যেমনটা আপনি। সূর্যনাথ মাতার অত্যন্ত গভীর ভাবে স্নেহ কামনা করতেন। কিন্তু আপনি তো জানেনই, মাতা কারুকে অধিক বা কারুকে কম স্নেহ করতে পারেন না। সকলকে সমান স্নেহ করাই তাঁর গুণ। আমার কাকা সূর্যনাথ তাতে বেদনাগ্রস্ত থাকেন, কারণ তাঁর বিশেষ স্নেহ কামনা ছিল।

আর এই বেদনার বশে, তিনি মানতে শুরু করলেন যে, চন্দ্রনাথ, মানে আমার পিতার কারণে তিন বিশেষ স্নেহ লাভ করছেন না। আর সেখান থেকে শুরু হয়, আমার পিতা ও আমার কাকার মধ্যে সংগ্রাম। আমার কাকা, সূর্যনাথ সর্বক্ষণ দেখানোর চেষ্টা করতেন মাতাকে যে, তাঁর প্রতিভার কারণেই, চন্দ্রনাথ উন্নত। তাই তাঁরই অধিক স্নেহ পাওয়া উচিত।

অন্যদিকে, মাতার কাছে অপ্রিয় হয়ে যাবার আশঙ্কায়, আমার পিতা, চন্দ্রনাথ এবার সূর্যনাথের উপর কর্তৃত্ব স্থাপনের প্রয়াস করে, এবং এক বিক্ষিপ্ত প্রজাসংখ্যাকে নিজের পক্ষে করে নেন, যারা সূর্যনাথকে অমান্য করেন। … এই বিস্তর ভেদাভেদ একদিন সম্যক ব্রহ্মপুরের প্রজাকে ভেদভাবের শিকার করে তুলবে, এমন আশঙ্কা করে, একদিন মাতা সূর্যনাথ ও চন্দ্রনাথ, উভয়কেই নিজের কক্ষে ডাকেন।

উভয়ে সেখানে উপস্থিত হলে, মাতা বলেন, “সূর্যনাথ, চন্দ্রনাথ, তোমাদের দুইজনেরই মনস্কাম পুড়ন হোক, কিন্তু সেই মন্সকাম পূর্ণ হতে গেলে, আমার সমস্ত প্রজার মধ্যে ভেদভাবের বীজ অর্পণ, এ কতটা যুক্তিযুক্ত, তোমরাই বল?”

মাতার এহেন কথাতে, সূর্যনাথ ও চন্দ্রনাথ, উভয়েই লজ্জিত হয়ে মাথা নিচু করলে, মাতা পুনরায় বললেন, “সূর্য, তোমার কিছু অনুচর রয়েছে। তাঁদেরকে নিয়ে তুমি সূর্যপুর স্থাপন করো। তোমাকে আমি ব্রহ্মপুরের পূর্বস্থল প্রদান করলাম। আর চন্দ্রনাথ, তোমার অনুচরদের নিয়ে, তুমিও এক রাজ্যের স্থাপন দক্ষিণে, যার নাম তোমার নামেই হোক, চন্দ্রপুর।

আর হ্যাঁ সূর্য, তোমার ইচ্ছা ছিল এই না, যে, তোমার জ্যেষ্ঠভ্রাতা তোমাতে নির্ভরশীল থাকুক, বেশ তাই হোক। তোমার রাজ্য বিশাল হবে, তবে তোমার প্রজাসংখ্যা কম, তাই তোমার প্রজারা তোমার রাজ্যে ফসল ফলাতে পারবেনা। চন্দ্রের রাজ্য তুলনামূলক ভাবে ক্ষুদ্র। তাঁর রাজ্যে প্রজারা নিবাস করার পর, আর ক্ষেত করার স্থান পাবেনা। তাই তাঁর প্রজারা তোমার রাজ্যে গিয়ে খেতকর্ম  করবে, আর এতে তোমরা দুজনেই দুজনের উপর নির্ভরশীল থাকবে।

অর্থাৎ, চন্দ্র তোমার রাজ্যের কারণে খেতকর্ম করে, আহার উৎপাদন করতে পারবে, আর তুমি ও তোমার প্রজাও চন্দ্রের প্রস্তুত করা আহারই গ্রহণ করে, জীবিত থাকবে, তাই তুমিও চন্দ্রের উপর নির্ভরশীল থাকবে”।

এমন কথা শুনে, আমার পিতা মাতার চরণে পতিত হয়ে বললেন, “ভুল হয়ে গেছে মা। … আমার তোমাকে সমস্ত কথা বলা উচিত ছিল। তা না করে, আমি স্বয়ংই সমস্ত কিছুকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনার প্রয়াস করেছি। … ভুল হয়ে গেছে মা। … ক্ষমা করে দাও”।

মাতা ব্রহ্মময়ী হেসে বললেন, “পুত্র, আমি তো তোমাদের দুইজনের উপরই রুষ্ট নই। … তাহলে ক্ষমাপ্রার্থনা কেন? … তোমরা একটি মনোভাব ধারণ করেছ, আর সেই মনোভাবের কারণে বৈষম্য উপস্থিত হয়েছে। এখন এই মনোভাব চলে যাবেনা, আমি ক্ষমা করলেও যাবেনা। … তাই সেই মনোভাবকে প্রকাশ্যে আনো। … তা প্রকাশ্যে এসে গেলে, তোমরা স্বয়ংই অনুভব করবে যে, তোমাদের সেই মনোভাব তোমাদেরকেই দংশন করছে, আর তখন তোমরা স্বয়ংই সেই মনোভাবকে ত্যাগ করার প্রয়াস করবে।

পুত্র, না আমি কোথাও যাচ্ছি, আর না তোমরা কোথাও যাচ্ছ। যখন তোমাদের মধ্যে যেই বৈষম্যভাব উপস্থিত হয়েছে, তার বিনাশ হয়ে যাবে, তখন স্বতঃই তোমরা পুনরায় এই রাজ্যকে ব্রহ্মপুরে পরিণত করে দেবে। … এক্ষণে তোমরা প্রস্থান করো। … আর হ্যাঁ, যখন যখন এই মাতার কথা স্মরণ আসবে, তখন তখন চলে আসবে এঁর কাছে”।

এবার সূর্যনাথ মাতার চরণে পতিত হয়ে বললেন, “কিন্তু মা, না আমি, আর না আমার ভ্রাতা, কনো কারণেই আপনার থেকে পৃথক হতে চাইনি। … মাতা আপনিই আমাদের সংসার, আপনিই আমাদের সমস্ত কিছু। আপনাকে ছাড়া, আমরা যে অনাথ! শুধু আমি বা আমার ভ্রাতা নন, সকলেই আপনাকে ছাড়া অনাথ!”

মাতা হেসে বললেন, “তাই কি? যদি তাই হতো, তাহলে অন্যের থেকে অধিক স্নেহ লাভের প্রয়াস কেন সূর্য? তোমার এহেন কর্ম অন্যরা অনাথ হয়ে যেত না!… তাই সূর্য, যা তুমি মুখে বলছো, আর যা তুমি অন্তরে মানছো, দুইয়ের মধ্যে অন্তর আছে। সেই অন্তর যখন ঘুচবে, দেখবে, তখন তোমরা দুইজনেই এই রাজ্যেই পুনরায় ফিরে আসবে। তখন আর এই রাজ্য সূর্যপুরও হবেনা, চন্দ্রপুরও হবেনা, ব্রহ্মাণ্ডপুরও হবেনা, আর মহাশূন্যপুরও হবেনা, তখন এটি হবে মহাসত্যের পীঠস্থান, কৃতান্তপুর, যেখানে কনো কর্তা থাকবে না, না আমি আর না তোমরা।

তাই সেই পরিণতিকে বাস্তবায়িত করতে হলে, আজ তোমরা যা মানছো, সেই পথেই তোমাদের চলতে হবে। তবেই তোমাদের মনোভাবকে, ও মনোভাবের কারণে যেই অন্ধকার তোমরা নিজেদের অজান্তেই বিস্তার করছো, তাকে প্রত্যক্ষ করবে। আর যখন তা প্রত্যক্ষ করবে, তখন স্বতঃই এই অন্ধকারকে নিরাময় করার প্রয়াস করে, একে কৃতান্তপুর গড়ে তুলবে। … তাই এক্ষণে তোমাদের প্রস্থান করতে হবে”।

হে নাথ, এই ছিল মহাশূন্যপুরের ইতিহাস। আমার কাকার রাজ্য হলো সূর্যপুর, আর আমার পিতার রাজ্য হলো চন্দ্রপুর। প্রজা দুই রাজ্য মিলেই থাকে, আর দিবারাত্র আমার পিতা ও আমার কাকা নিজেদের কর্মের ফল ভোগ করে করে, ব্যথিত ও চিন্তিত। তাঁদের মধ্যে আর ভেদভাব নেই, না আছে তাঁদের প্রজাদের মধ্যে ভেদভাব। তাঁরা দুইজন মিলে মাতার কাছে প্রায়সই যেতেন। আমার জন্ম হয় যখন, তখন আমার পিতা ও আমার কাকা মিলিত ভাবেই মাতার কাছে যান, আমার মুখদর্শন করানোর উদ্দেশ্যে।

মাতা আমার মুখ দেখে বলেন, “তোমাদের মনোভাবের বদল হয়েছে। এবার তোমরা কৃতান্তপুরের নির্মাণের হেতু প্রস্তুত হচ্ছ। তোমরা দিবারাত্র সেই কৃতান্তপুরের স্বপ্ন দেখছো আর এই কন্যা (আমাকে দেখিয়ে) তোমাদের সেই স্বপ্নকেই পূর্ণ করতে এসেছে। … তবে, এই রাজ্যে যেই ভেদভাবের বীজ তোমরা স্থাপন করেছিলে, তার থেকে আরো এক ভেদভাবের রচনা হয়েছে। আর এবারের ভেদভাব অত্যন্ত বিষাক্ত।

তাই, সেই বিষাক্ত ভেদভাবকে নাশ করে, কৃতান্তপুর করতে হলে, তোমাদেরকে সংগ্রাম করতে হবে, ভয়ানক সংগ্রাম। এই সংগ্রামে তোমরা অনেক কিছু হারাবে, প্রয়োজনে আমাকেও। কিন্তু চিন্তা করো না, তোমাদের এই কন্যা, আর আমার প্রিয়পুত্র মানস মিলে, পুনরায় আমাকে আবাহন করে নিজেদের কাছে নিয়ে এসে, মহাসংগ্রামকে বাস্তবায়িত করে, কৃতান্তপুর নির্মাণ করবে।… যাও এখন সেই সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হওয়া শুরু করো।

তোমার এই কন্যাকে আমি সঠিক সময়ে ডেকে নেব। কৃতান্তপুর নির্মাণের জন্য তাঁর ভূমিকা অশেষ। তাই তাঁকে তো আমাকে ডাকতেই হবে। … এক্ষণে যাও, আর সেই মহাসংগ্রামের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করো, আর আমার থেকে আহ্বানের অপেক্ষা করো”।

অর্থাৎ বুঝতে পারছেন নাথ? সমস্তই তাঁর লীলা। হ্যাঁ, হীনমন্যতা আমাদের, আর তার কারণেই তাঁর স্থাপিত লীলা, যাতে আমরা সমস্ত হীনমন্যতা থেকে মুক্ত হয়ে এক কর্তাশূন্য রাজ্য, বা কৃতান্তপুর স্থাপন করি। তবে যা কিছু হচ্ছে, তা তাঁর সম্মতিতেই হতে পারছে, কারণ আমরা যে সত্যই অকর্তা, আমাদের কিছু করার ক্ষমতাই নেই। যা করেন তিনিই করেন, আমরা কেবলই তাঁকে সেই কর্ম করতে বাধ্য করি, নিজেদের হীনমন্যতার কারণে”।

মানস এবার সংযত, এবার সে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যে কৃতান্তপুর স্থাপন করবেনই। তাই এবার তিনি বিলাপ ত্যাগ করলেন। মাতা কোথাও যাননি, এবার তিনি নিশ্চিত। তিনি কেবলই সমস্ত হীনমন্যতার নাশ করার জন্য লীলাতে রত। সেই লীলাতেই তিনি ছিলেন প্রত্যক্ষ, আর সেই লীলাতেই তিনি আজ সুপ্ত। আবার সেই লীলাতেই তিনি কাল পুনরায় প্রত্যক্ষ হয়ে উঠবেন।

সেই সমস্ত কিছুতে দৃঢ়নিশ্চয় রেখে, এবার মানস প্রশ্ন করলেন, “আর তিন কামুকীর ব্যাপারে কি বলেছিলেন মা? কিছু কি বলেছিলেন? এই তিন কামুকীই সর্বনাশা, তাই না?”

দেবী ধরা বললেন, “হ্যাঁ সর্বনাশ তো বটেই, তবে এঁদের অস্তিত্বের ব্যাপারে মা আমাকে অনেক কথাই বলেছেন। এঁদের ব্যাপারে, মা এই বলেছেন যে, এঁরা অন্য কেউ নন, যেই ভেদভাবের বীজ স্থাপিত হয়েছিল, আমার পিতা ও কাকার দ্বারা, সেই ভেদভাবের কারণে, মাতার উপর যা প্রভাব পরেছে, সেই প্রভাব থেকেই এঁদের সৃষ্টি।

এঁদের সম্বন্ধে এই বলেছেন মাতা যে, এঁদের রচনা তো সূর্যনাথ, চন্দ্রনাথ ও আত্মের কারণে হয়েছে, কিন্তু এঁদের নাশ করার সামর্থ্য এক তাঁরই আছে, আর তা তখনই সম্ভব যখন এঁরা মাতার সম্মুখে প্রত্যক্ষ হবেন, তার পূর্বে নয়। তবে তিনি এও বলেন যে, যতদিন না তা হচ্ছে, ততদিনে এই তিন কামুকী, সম্পূর্ণ ব্রহ্মপুরে, অর্থাৎ চন্দ্রপুর, সূর্যপুর ও ব্রহ্মাণ্ডপুরে ভয়ানক তাণ্ডবলীলা করে ফিরবে। …

তিনি এও বলেন যে, আত্মকে সঙ্গে নিয়ে, এঁরা এমন তাণ্ডব করবে যে, সেই তাণ্ডব থামাতে, তাঁকে পুনরায় আগত হতেই হবে। তবে তাঁর পুনরায় আগমনের পূর্বে, তিনি নিজের সমস্ত গুনাগুণকে স্থাপন করেই পুনরাগমন করবেন। কি ভাবে তা করবেন, তা আমাদের এক্ষণে বোধগম্য হবেনা, যেমন যেমন তাঁর লীলা চলতে থাকবে, তেমন তেমন অনুভূত হবে”।

মানস এই শেষ কথা শুনেছিলেন রাত্রে। তারপর নিদ্রার কোলে ঢলে পরেছিলেন। পরদিন সকালে যখন নেত্র খুললেন, তখন চক্ষুতে কিছু দেখার আগে, শঙ্খধ্বনিই প্রথম কর্ণকুহরে পৌঁছল। রাজ্যাভিষেকের শঙ্খনিনাদ। আর সম্মুখে দেখলেন, একটি ফুলের মত কন্যা শুয়ে রয়েছেন। নিকটে গিয়ে দেখলেন, দেবী ধরাকে। অপরিসীম সুন্দরী তিনি নন, তবে উজ্জ্বলমৃত্তিকা বর্ণের এক অতিমিষ্ট কন্যা তিনি।

শিশুর মতই সরল তাঁর দেহাকৃতি যা স্নেহলাভের জন্যই যেন প্রস্তুত। … মানসের অন্তর সেই কন্যার প্রতি যেমন ধন্যবাদ জ্ঞাপন করতে থাকলো, তেমনই এই কন্যার সান্নিধ্য লাভ করতে পারার জন্য মাতাকে ধন্যবাদও দিতে থাকলো।

অন্যদিকে, বারংবার শঙ্খনিনাদ মানসের দৃষ্টিকে বারংবার বিক্ষিপ্ত করলে, নিজের অসামান্য প্রতিভার জোরে, তিনি টিলার চূড়ায় নিজেকে স্থাপিত করে, যেমন সম্যক দৃশ্যকে প্রত্যক্ষ করলেন, তেমন সেখানে হয়ে চলা সমস্ত বার্তালাপকে শ্রবণও করলেন।

তা দেখতে মানস এতটাই মশগুল রইলেন যে, কখন নিদ্রা ত্যাগ করে তাঁর পাশে দেবী ধরা এসে দাঁড়িয়েছেন, তা তিনি জানতেই পারেন নি। দেবী ধরা পাশে এসে, তাঁকে স্পর্শ করতে, প্রথমটা চমকে উঠলেন তিনি, অতঃপরে অনুভব করলেন যেন দেবী ধরার স্পর্শ তাঁর কাছে অত্যন্ত আপনজনের স্পর্শ। যেমন আপনজনের স্পর্শে কনো প্রকার কামনা থাকেনা, থাকে কেবলই স্নেহের ভাব, তেমনই দেবী ধরার স্পর্শ।

মানস আর মনোনিয়োগ করতে পারলো না রাজ্যাভিষেকে, ফিরে তাকালেন দেবী ধরার দিকে। প্রভাতের রৌদ্রে, দেবী ধরাকে অদ্ভুত দেখতে লাগছে, যেন তাঁর মুখশ্রীর মধ্যে অদ্ভুত প্রাণসঞ্চার রয়েছে। যেন তাঁর দেহলাবণ্যের কণায় কণায় রয়েছে সেই প্রাণের হিল্লোল।

মাঝে কতকিছু যে হয়ে গেল, তা মানস যেন জানতেও পারলো না। দেবী ধরা প্রশ্ন করতে থাকলেন, “কি দেখছেন নাথ!” একাধিকবার সেই প্রশ্ন করলেন তিনি, কিন্তু মানস যেন নিজেকে হারিয়েই ফেলেছিলেন। তাই কখন যে দেবী ধরাকে নিজের বপুতে স্থাপন করলেন, আর কখন যে মানস ধরা উভয়েই নির্বস্ত্র হয়ে গিয়ে, স্নেহময় সঙ্গমে লিপ্ত হয়ে গেছিলেন, ধরার সেই বিষয়ে সচেতনতা থাকলেও, মানসের সেই সচেতনতা ছিলনা। ধরাও জানতেন যে, মানস নিজের মধ্যে নিজে নেই। স্নেহের আবেশে তিনি আবদ্ধ।

ধরা বেশই বুঝতে পারেন যে, তাঁর প্রতি মানসের স্নেহ, ধন্যবাদ, কৃতজ্ঞতা সমস্ত কিছু একাকার হয়ে, সঙ্গমসুখ রূপে তা পরিণত হয়ে চলেছে। পবিত্র এই সঙ্গমভাব, তাই দেবী ধরা সেই সঙ্গমে বাঁধা দিলেন না, বরং নিজেও মানসের সেই স্নেহবন্ধনে বন্দি হয়ে গেলেন। দীর্ঘসঙ্গমের পর যখন মানস নিজের স্নেহবীর্য ধরার গর্ভে স্থাপন করে দিলেন, তখন উত্তেজনার মুহূর্তের শেষে, নিজেকে ও দেবী ধরাকে বিবস্ত্র ও ঘর্মাক্ত অবস্থায় দেখে, চমকে উঠলেন, এবং তৎপর হয়ে উঠতে চাইলেন দেবী ধরাকে বস্ত্র দ্বারা আচ্ছাদিত করতে।

মানসের সেই প্রয়াসকে দেবী ধরা প্রত্যাখ্যত করে, মানসকে নিজের তনুর অতিনিকটে আঁকরে  ধরেলেন ধরা। এবার মানসের নয়, ধরার স্নেহপাশে আবদ্ধ হলেন মানস। আবারও মিলনপর্বের সমাপ্তিতে, ধরা ও মানস, দুইজনেই যেন সজ্ঞানে ফিরে এলেন অজ্ঞান অবস্থা থেকে। মানস লজ্জিত নিজের কর্মে। কিন্তু ধরা নয়।

ধরা স্নেহের আবেশে কিছু বলতে যাবেন, মানস বলে উঠলেন, “এমন করে কি সঠিক করলাম আমি! … এই সমস্ত কিছু আমার দোষ”।

দেবী ধরা তৃপ্ত ও ঘর্মাক্ত দেহে, স্নেহের হাস্য হেসে, মানসের মস্তিষ্কে স্নেহের স্পর্শ প্রদান করে বললেন, “একা আপনিই নাথ!… আপনার আবাহনে আমিও যে সমান ভাবে সারা দিয়েছি, আর যখন আপনি আর আবাহন করেন নি, তখন আমি আপনাকে আবাহন করেছি। … তাই একা আপনি নন, এই অপকর্মে, আমি ও আপনি উভয়েই সমান ভাবে যুক্ত”।

মানস বললেন, “কিন্তু দেবী, আপনাকে আমি এখনও স্নেহই করি। … এমন নয় যে, কেবলমাত্র সম্ভোগের আবেশে এসে আপনার প্রতি দুর্বল হয়েছিলাম। … তাই দেবী, আমি আপনার পিতার কাছে গিয়ে, আপনাকে বিবাহ করতে চাইব। … যেই সন্তান আমার বীর্যের ফলে আপনার গর্ভে স্থাপিত হয়েছে, আমি তারও দায়িত্ব নিতে চাই, আর সেই সন্তানের মাতারও। …

এই কর্ম আমি করতে চাই। নাহলে যে আমি নিজের কাছে নিজেই নীচ হয়ে যাবো, মনে হবে যেন নিজের সম্ভোগবাসনার কারণে আমি কনো স্ত্রীর স্নেহকে দুর্ব্যবহার করেছি। … না না, এমন করলে যে আমার মাতার কাছে আমি মুখ দেখাতেও পারবো না। … আর শুধু তাই নয়, এ তো আপনার সাথেও অবিচার হবে! … আপনি পবিত্র, আপনার সঙ্গমভাবে কনো কামুকীকতা তো ছিল না, ছিল কেবলই স্নেহভাব। না না, আপনার এমন পবিত্র স্নেহভাবকে আমি কিছুতেই কালিমামণ্ডিত হতে দিতে পারিনা”।

দেবী ধরা হেসে বললেন, “আর এই বিষয়ে কথা বলবেন না নাথ। আমরা শীঘ্রই আমার পিতার কাছে গিয়ে, আমাদের বিবাহপ্রস্তাব রাখবো। … আর এই বিষয়ে খেদোক্তি করবেন না। আপনার আলিঙ্গনে যেই পরিমাণ শুদ্ধতা ছিল, আমি তা অনুভব করেছি, আর এও অনুভব করেছি যে, আপনি আমাকে ও আমার লাবণ্যকে সম্ভোগের উদ্দেশ্যে নয়, আমার প্রতি স্নেহের বশেই আমার সাথে মিলনে আবদ্ধ হচ্ছেন। তাই তো নির্ভয়ে, নিঃসঙ্কোচে, নিঃসন্দেহে আপনার সাথে সঙ্গমে লিপ্ত হয়েছি নাথ। … আমার আপনার প্রতি পূর্বেও পূর্ণভরসা ছিল, আর এক্ষণেও আছে। তাই আর গ্লানি করবেন না, এবার আপনার গ্লানি আমাকেও গ্লানিতে তরান্বিত করছে”।

এমন কথা বললে, মানস নির্বস্ত্র দেবী ধরার স্নেহময় বদনকে দেখে, স্নেহের বশেই তাকে বারংবার চুম্বন করলে, দেবী ধরা পুনরায় উষ্ণতাপূর্ণ আলিঙ্গনে মানসকে তৃতীয়বার সঙ্গমে আবদ্ধ করে নিলেন। তৃতীয় সঙ্গমের পর, যখন মানস ও ধরা পুনরায় দেহচেতনায় ফিরে এলেন, তখন দেখলেন দ্বিপ্রহর হয়ে গেছে। তাই উভয়েই তৎপর হয়ে উঠলেন, সন্ধ্যার পূর্বে, চন্দ্রপুর রাজ্যে প্রবেশের উদ্দেশ্যে।

পথে চলতে চলতে, ধরা ও মানস, সম্যক ভাবে পতিপত্নির মতই আপনজন হয়ে উঠলেন। আর দেবী ধরা প্রশ্ন করলেন, “নাথ, পাহারের টিলায় দাঁড়িয়ে, কি দেখছিলেন? কিছু যেন শুনছিলেন আপনি!”

মানস মৃদু হেসে বললেন, “আমার মাতার দেওয়া সামর্থ্য অনুসারে, আমি বহুদুরের দৃশ্য দেখতেও পাই, আর সেখানের সমস্ত শব্দ শুনতেও পাই। … তাই রাজ্যাভিষেক দেখছিলাম আর শুনছিলাম। … দেখলাম আর শুনলাম যে, ওরা আমার সন্ধান করে ব্যর্থ হয়। আর অতঃপরে রাজ্যাভিষেকে ব্যস্ত হন। সেখানে রাজ্যের নাম মহাশূন্যপুর থেকে পালটে রাখা হলো ব্রহ্মাণ্ডপুর। আত্ম হলো মহারাজ, আর দেবী ইচ্ছা হলেন উনার মহারানী।

রাজমঞ্চেই বিবাহ করলেন দেবী ইচ্ছা, চিন্তা ও কল্পনাকে। আর ঘোষণা করলেন, দেবী ইচ্ছাকে মহারানীরূপে, চিন্তাকে মহামন্ত্রী রূপে, আর কল্পনাকে সেনাপতি রূপে।… দেবী ধরা, … সেনাপতি দেবী কল্পনাকে মহারাজ আত্ম দায়িত্ব অর্পণ করলেন যাতে, তিনি আমার সন্ধান করেন।… অবশ্যই তিনি চন্দ্রপুরেও আসবেন”।

দেবী ধরা মৃদু হেসে বললেন, “যখন তিনি চন্দ্রপুরে এসে পৌছবেন, ততদিনে তিনি নিশ্চিত ভাবে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে যাবেন। … তাই সেই বিষয়েও আমাদের সতর্ক থাকতে হবে”।

মানস প্রশ্ন করলেন, “কিন্তু কি ভাবে? এক অন্তঃসত্ত্বা নারীকে আটকে রাখা যে অন্যায় হবে … আর…”

ধরা উত্তরে বললেন, “রাজ্যে প্রবেশ করতে দেওয়া যাবেনা। … গোলকধাঁধায় স্থাপিত করে, যখন তাঁর সন্তানজন্ম দেবার সময় হবে, তখন তাঁর সন্তানের জন্ম দেওয়াবে চন্দ্রপুরই। আর সন্তান হবার পর, স্ত্রী যে স্বামীর কাছে গিয়ে সেই সন্তানের মুখদর্শন করিয়ে, সেই সন্তানকে ঈষৎ চলমান না করা পর্যন্ত সেনাপতির দায়িত্ব নেবেন না। … তাই বেশ কিছু বৎসর সময় পেয়ে যাবো আমরা নাথ”।

মানস তৃপ্ত হলেন, ধরার রাজনীতি তথা জীবনধারার জ্ঞানের প্রভা দেখে। এবং তাঁর হাতে হাত রেখে পৌঁছালেন চন্দ্রপুরে, রাজা চন্দ্রনাথের সম্মুখে।

রাজা চন্দ্রনাথ নিজের কন্যাকে সুরক্ষিত দেখে আনন্দিত হয়ে তাঁকে আলিঙ্গন করলেন। মানসকে দেখেও আপ্লুত হয়ে আলিঙ্গন করলে, মানস করজোড়ে রাজা চন্দ্রনাথের সম্মুখে দণ্ডায়মান থেকে বললেন, “মহারাজ, আপনি মান্যতা দিলে, আমরা একটি শুভসূচনা করে ফেলেছি, আপনার থেকে মত ও আশীর্বাদ না নিয়েই, আর মান্যতা না দিলে, সেই একই কর্ম একটি অপকর্ম রূপেই চিহ্নিত করা সঠিক হবে”।

মহারাজ চন্দ্রনাথ হাস্যমুখে বললেন, “এমন কি কাজ মানস? আমার মত তুমিও মাতা ব্রহ্মময়ীর প্রিয়ভাজন। তবে আমার থেকে তুমি শ্রেয়, কারণ আমার মধ্যে ভেদভাবের বীজ অঙ্কুরিত হয়েছিল, কিন্তু তোমার মধ্যে তা হয়নি। তাই, এমন কি কাজ করেছ তুমি, যা আমার মান্যতার উপর নির্ভর করছে, তা শুভ না অশুভ?”

উপস্থিত সকলের মধ্যে, দেবী চন্দ্রপ্রভা উপস্থিত হলে, দেবী ধরা তাঁকে প্রণাম করলেন, আর অতঃপরে মানসও দেবী চন্দ্রপ্রভা দেবী ধরার জন্মদাত্রী মাতা জেনে, তাঁকে প্রণাম করলেন। এমনই সময়ে সেখানে উপস্থিত হলেন, সূর্যনাথ এবং বললেন, “না ভ্রাতা, যেই ভেদভাবের কথা আপনি বললেন, তা আপনার কারণে নয়, আমার কারণে উৎপন্ন হয়েছিল। … তবে আত্ম যেই কর্ম করেছে, তার কল্পনাও করা আমার বা আপনার পক্ষে সম্ভব ছিলনা।

হ্যাঁ হতে পারে, আমরা ভিন্ন মত রাখতাম, কিন্তু তার জন্য মাতা ব্রহ্মময়ী আমাদের কাছে মাতা ভিন্ন অন্য কিছু ছিলেন না। মাতৃহত্যার প্রয়াস করা, এ যে অকল্পনীয়। মহাশূন্যপুর, ওহ, এখন তো তার নাম হয়ে গেছে ব্রহ্মাণ্ডপুর অত্যন্ত বিষাক্ত হস্তে স্থাপিত হয়েছে, যেখানে এক ও একমাত্র মাহাত্মকাঙ্খাই অবস্থান করছে”।

দেবী ধরা, তাঁর খুল্যতাত, সূর্যনাথকে প্রণাম করলে, মানসও তাঁকে প্রণাম করলো। অতঃপরে সূর্যনাথ বললেন, “তুমিই মানস না! … দিবারাত্র যে ব্রহ্মময়ী মাতার সেবাতে নিজেকে নিয়জিত রাখতো?”

মানস মাথা নিচু করে বললেন, “সেই সুযোগও তাঁরই দান হে মান্যবর। … আমার অবদান বলে কিছু নেই। আর সেবা! তাঁর সেবা কে-ই বা করতে সক্ষম! তিনিই তো সর্বক্ষণ সর্বজনের সেবা করে চলেছেন। আমরা কেবল লোকদেখানি সেবা করে থাকি, বাস্তবে তা নাট্য ব্যতীত কিছুই নয়। তাই আমাকে কনো শ্রেয় দিয়ে, তাঁর প্রকাণ্ড প্রেমকে নিচু করে দেবেন না মান্যবর। তাঁর নিকটে থাকতে পারা, এই সর্বাধিক বড় বরদান”।

চন্দ্রনাথ পুনরায় মানসের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করলেন, “হ্যাঁ মানস, তুমি কি একটা কর্মের কথা বলছিলে!”

মানস একটি দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বললেন, “মহারাজ, হতে পারে, মাতা ব্রহ্মময়ীর নির্দেশ ও যোজনা অনুসারেই দেবী ধরা সমস্ত ক্রিয়া করেছেন, কিন্তু তাঁর স্নেহভাব তাঁর নিজের সম্পদ, আর সেই স্নেহভাব, এই অধম মানসকে দুর্বিপাক থেকে উদ্ধার করে এনেছে কেবল নয়, তাঁকে শান্তও করেছে। মাতৃহারা হবার বেদনা সহজে ভোলবার নয়, কিন্তু দেবী ধরার স্নেহ, প্রীতি ও সরলভাব, তাঁকে আমার কাছে আপন করে তুলে, সেই মহাবেদনার থেকেও আমাকে মুক্ত করেছে।

মহারাজ, এমন কঠিন অবস্থায়, এমন সহজ সমাধান লাভ করে, আমি নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারাই। আর দেবী ধরাও আমাকে এমন বিপন্ন অবস্থায় দেখে, স্নেহবসে, আমার দুর্বলতাকে আশকারা প্রদান করেন। তাই, যেই কর্মে পিতামাতার আশীর্বাদ অবশ্যই কাম্য, সেই কর্মে আমরা উভয়েই লিপ্ত হয়েছি, আপনাদের অনুমতি ও আশীর্বাদ বিনাই। …

মহারাজ, যদি আমি দণ্ডলাভের কর্ম করে থাকি, তাহলে আমাকে দণ্ড প্রদান করতে পারেন। আমার কর্তব্য সেই দণ্ডকে মাথা পেতে স্বীকার করা। কিন্তু একটিই অনুরোধ, দেবী ধরাকে এই দণ্ড থেকে মুক্ত রাখুন, কারণ তিনি কেবলই এক অসহায়কে সহায় প্রদান করার জন্য, নিজেকে আমার কাছে সঁপেছেন, যা হয়তো যেকোনো হৃদয়বান ব্যক্তির জন্য স্বাভাবিক”।

দেবী ধরা প্রতিবাদী হয়ে উঠে বললেন, “না পিতা, যদি অপরাধ হয়… যদি কেন, অবশ্যই অপরাধ এটি, কারণ বিনা পিতামাতার আশীর্বাদে এমন ক্রিয়ায় লিপ্ত হওয়ার অর্থ, তাঁদের অবজ্ঞা করা, তাই অবশ্যই অপরাধ এটি। কিন্তু পিতা, সেই অপরাধে দোষী একাকী নাথ (মানসের দিকে অঙ্গুলি দেখিয়ে) নন। …

হ্যাঁ, আমাদের প্রথম সঙ্গমে, তাই তাই হয়েছে, যা যা নাথ বললেন। কিন্তু আমাদের একবার নয়, তিনতিন বার মিলন হয়েছে। দ্বিতীয়বার মিলনের উদ্যোক্তা আমি স্বয়ং ছিলাম, কারণ নাথকে অন্তর থেকে আমি আমার প্রিয়জন ও আপনতমজন বলে স্বীকার করে ফেলেছিলাম। আর তৃতীয়বার সঙ্গমের কালে, আমরা উভয়েই সম্মত ছিলাম, এবং শারীরিক ভাবে সচেতনও ছিলাম। সেই সঙ্গমের হেতু, আমাদের উভয়ই উভয়কে আপনজন বলে স্বীকৃতি প্রদান ছিল।

তাই পিতা, যদি অপরাধী কেউ হয়, তবে নাথ একাকী অপরাধী নন, তাঁর অপরাধে আমি সমান ভাবে অংশীদার, কারণ তিনি আমার অর্ধাঙ্গ, আর সেই স্বীকার আমার অন্তরে স্থিত চেতনা ইতিমধ্যেই করে নিয়েছে”।

সূর্যনাথ সম্মুখে এসে বললেন, “এতটা অকুতোভয় কেন হলে তোমরা পুত্রী? … তোমাদের কি বিশেষ কনো যোজনা আছে, তোমাদের সঙ্গমকে ভিত্তি রেখে?”

দেবী ধরা বললেন, “কাকা, উদ্দেশ্য আমার ও নাথের একটিই, আর তা হলো আমাদের মাতাকে পুনরায় ফিরে পাওয়া, আর তাঁকে সম্যক প্রজাকুলের কাছে পুনরায় প্রকাশিত করে, তাঁদেরকে তাঁদের মা ফিরিয়ে দেওয়া। তবে কাকা, আমাদের সঙ্গমের অন্তরালে এমন কনো অভিসন্ধি ছিলনা। আমাদের সঙ্গমের একটিই উদ্দেশ্য ছিল আর তা হলো, পরস্পর পরস্পরকে আপন করে নেওয়া।

না আমরা কামাতুর ভাবে মিলিত হয়েছি, আর না উদ্দেশ্যপ্রনেদিত ভাবে। উপরন্তু আমরা মিলিত হয়েছি, একে অপরকে আপন করে নেবার অঙ্গিকার থেকে। সেই কারণে, আমাদের মিলনের কালে, উভয়ের কারুর মধ্যেই, না তো কনো প্রকার উত্তেজনা ছিল, আর না ছিল কনো প্রকার অছিলা। … আমরা স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে, একে অপরকে কেবলই আপন করে নিতে, এবং কেবল দেহ নয়, সম্পূর্ণ ভাবে নিজেকে অন্যের কাছে সমর্পিত করতেই, সহজাত ভাবে সঙ্গমে লিপ্ত হয়েছি”।

চন্দ্রনাথ এইসমস্ত কথা শুনে, নিজের রাজাসনে বিরাজ করে, কিছু বিচার করতে থাকলে, সূর্যনাথ বললেন, “কি এমন বিচার করছো ভ্রাতা? একটি কথা তো স্পষ্ট বুঝতেই পারছো যে, এঁদের সঙ্গমের মধ্যে কনো প্রকার আকর্ষণ বা অশুদ্ধতা ক্রিয়া করেনি। সম্পূর্ণ শুদ্ধ মিলন ছিল, যেখানে একটিই ভাব উপস্থিত ছিল, একে অপরকে নিকট করে নিয়ে, নিজের সম্পূর্ণ ভার অন্যজনকে অর্পণ করা। তাহলে বিচার কেমন ধারার ভ্রাতা?”

রাজা চন্দ্রনাথ বললেন, “বিচার করার আছে সূর্য, বিচার করার আছে। … স্মরণ করে দেখো, আমরা কেন ভিন্ন রাজ্য চেয়েছিলাম! এই কারণেই না যে, মিলনের একটি ধারা থাকা উচিত। যার সাথে যার মিলন হচ্ছে, তাঁদের উভয়ের মধ্যে সম্বন্ধের সাথে সাথে সামাজিক মানের মিল থাকাও আবশ্যক, না হলে স্বামীস্ত্রীর মধ্যে খোঁটাখুঁটি লেগেই থাকে, এই বিষয়ে, আর বহু ধারার বিশ্রী ভাবের সঞ্চার হতে থাকে। …

তা এবার বলো, আমার কন্যা রাজকুমারী, কিন্তু মানস এখন কি? একজন পলাতক?… হ্যাঁ আমরা জানি সে হত্যা করেনি, আর করতে পারেও না। কিন্তু তার সুরক্ষাকবচ কি? আজ আমি আমার পুত্রীর সাথে তার বিবাহ দিলাম, কিন্তু কাল যদি ব্রহ্মাণ্ডপুরের সেনা এসে তাঁকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে চলে যায়!”

সূর্যনাথ মাথা নাড়িয়ে বললেন, “তোমার কথাতে যুক্তি তো আছে ভ্রাতা। … তা একটি কাজ করা যায়। … আসলে এবার সময় এসে গেছে, মাতাও বলেছিলেন ধরাকে, আর আমরাও অনুভব করছি, আত্মের এমন কুকীর্তি দেখে যে, আমাদের পুনরায় মিলিত হওয়া উচিত, নাহলে মাতা ব্রহ্মময়ীর স্নেহময় সুন্দর রাজ্য বিষপ্রভাবে বিশ্রী হিয়ে যেতে অধিক সময় লাগবেনা। তা কেন না, আমি মানসকে আমার পুত্রের স্বীকৃত প্রদান করে, সূর্যপুরের রাজা ঘোষণা করি।

সত্য বলতে, যদি চক্রান্ত না করা হতো, তাহলে তো মাতা ব্রহ্মময়ীর অভাবে, মহাশূন্যপুরের রাজাসনে মানসই উপনীত হতো। তা সে সূর্যপুরের রাজা হয়ে উঠুক, আর রাজকন্যাকে বিবাহ করুক। এতে করে, সূর্যপুর আর চন্দ্রপুর এক হয়ে যাবে, এবং এই দুই মিলে ধরাধাম হয়ে উঠবে, যেই ধরাধামের মহারাজ হবে মানস, আর মহারানী হবে ধরা”।

দেবী চন্দ্রপ্রভা বললেন, “হ্যাঁ মহারাজ, এতো অতি উত্তম প্রস্তাব। মানসও তখন মহারাজ হয়ে গেলে, সেই পাষণ্ডরা তাঁকে আর গ্রেপ্তার করতে পারবেনা। … তাই মানসও সুরক্ষিত হয়ে যাবে, আর ধরা ও মানসের পবিত্রমিলনকে পবিত্রতার মর্যাদাও দেওয়া যাবে”।

রাজা চন্দ্রনাথ হেসে বললেন, “এর অর্থ, তোমরা বলতে চাইছ যে, আমার বয়স হয়েছে, আর তাই রাজাসন ত্যাগ করাই উচিত হবে! … না ঠিকই বলেছ। আমার সত্যই বয়স হয়েছে, স্নায়ুর উপর জোর কমে যাওয়ার জন্য, সহজ ব্যাপারেও এখন দুর্বল বা উত্তেজিত হয়ে যাই। রাজসিংহাসন কনো যুবককে কামনা করছে। …

আর তা ছাড়াও, ব্রহ্মাণ্ডপুর যে আগামীদিনে মহাসঙ্কট সৃষ্টি করবে, সে তো বোঝাই যাচ্ছে। আর আমি যদি সেই সঙ্কটের কালে, রাজা হয়ে থাকি, তাহলে হয়তো, প্রজার ভাগ্য ওই নরাধমদের হাতেই ছেড়ে দিতে বাধ্য হবো, আমার বার্ধক্যের কারণে। তাই আমার এবার সরে যাওয়াটাই সঠিক হবে”।

সূর্যনাথ বললেন, “ভ্রাতা, কেবল আপনিই নন, আমিও সরে যাবো এবার রাজকার্য থেকে। সম্মুখে উপস্থিত সংগ্রামের সম্মুখীন হবার সাহস বা বয়স, দুইই আমাদের আর নেই। … তাই সেই ভার এবার মানস আর ধরার কাছেই অর্পণ করা সঠিক হবে”।

দেবী চন্দ্রপ্রভা সামান্য উত্তেজিত হয়েই বললেন, “তাহলে মহারাজ, মহাধুমধাম করে এই বিবাহ অনুষ্ঠিত করা হউক। আমাদের দুই রাজ্যের প্রজারাও বহুদিনব্যাপী এক উৎসবের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। তাই তাদেরকে এই উৎসব উপহার স্বরূপ দেওয়া হোক!”

রাজা চন্দ্রনাথ বললেন, “কিন্তু ধুমধাম করে এই বিবাহ অনুষ্ঠান সম্পন্ন করলে, সেই সংবাদ তো ব্রহ্মাণ্ডপুরেও যাবে। সেখানে সেই বার্তা পৌঁছালে, তারাও নিশ্চয়ই জেনে যাবে, মানস এখানে আছে। তাহলে কি তারা আমাদের ধরাধামকে আক্রমণ করবে না! তারা কি চুপ বসে থাকবে!”

দেবী ধরা এবার মুখ খুললেন, “পিতা, চুপ করেই তাদেরকে বসে থাকতে হবে, কারণ ব্রহ্মাণ্ডপূরে যে কনো সেনাই নেই। … যোদ্ধা আছে, আত্ম, ইচ্ছা, চিন্তা ও কল্পনা বিশেষ যোদ্ধা, কিন্তু মাতা ব্রহ্মময়ীর আমলে যে সেনা থাকতো তা কেবলই রাজ্যচালনার জন্য, যারা সঠিক করে অস্ত্রধারণ করতেও জানেনা। আর তারা জানে যে, আমাদের রাজ্যে যুদ্ধের জন্য সেনা প্রস্তুত থাকে। তাই ভুলেও এখন আক্রমণ করবেনা তারা, যতক্ষণ না তারা সেনা নির্মাণ করছে। … তাই আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন”।

দেবী চন্দ্রপ্রভা বললেন, “তাহলে তো অতি সহজ সুযোগ আমাদের কাছে যে, আমরা মানসকে রাজা করে ঘোষণা করে দেব, যাতে তাঁকে গ্রেপ্তারের অছিলাতে ওই শয়তানরা এই রাজ্যে প্রবেশ না করতে পারে।… আর যুদ্ধ করতে তারা এখনই প্রবেশ করবেনা। … কি বলেন মহারাজ”।

মহারাজ চন্দ্রনাথ বললেন, “তাহলে অনুষ্ঠানের সূচনা করা হোক। বিবাহের দিনেই ধরাধামের ঘোষণা হবে, আর মানসের রাজ্যাভিষেক হবে। … আর হ্যাঁ, ব্রহ্মাণ্ডপুরে নিমন্ত্রণ পত্র অবশ্যই প্রেরণ করতে হবে আমাদেরকে”।

দেবী ধরা বললেন, “পিতা রাজনীতি বলে, শত্রুর কাছে কনো চালকে চলমান অবস্থায় রাখতে নেই, তার সামনে সেই চালই রাখতে হয়, যা সম্যক ভাবে পরিপক্ক। তাই পিতা, রাজ্যগঠন, বিবাহ ও রাজ্যাভিষেক পূর্বেই করে নেওয়া উচিত আমাদের। অতঃপরে ভোজঅনুষ্ঠান রেখে, উৎসবেতে সকলকে নিমন্ত্রণ করা যাবে।

আমার কথার তাৎপর্য এই যে, যখন ব্রহ্মাণ্ডপুর থেকে এইরাজ্যে নিমন্ত্রিত হয়ে প্রবেশ করবেন, তখন যেন তাঁরা নিজেদের সম্মুখে, তাঁদের রাজ্যের রাজদণ্ডের অধিকারী, সামান্য মানসকে না দেখে। উপরন্তু, তাঁরা যেন মহারাজ মানসকে দেখেন, অর্থাৎ তাঁদের হাতপা বাঁধা থাকবে”।

চন্দ্রনাথ ও সূর্যনাথ তাঁদের পুত্রীর দূরদৃষ্টি ও রাজনৈতিক জ্ঞান দেখে চমকিত হয়ে বললেন, “আমাদের পুত্রীর রাজনৈতিক জ্ঞান বেশ বিকশিত হয়েছে, তা তো আমরা জানতাম না!”

দেবী চন্দ্রপ্রভা হেসে বললেন, “আসলে যাকে আপনরা রাজনৈতিক জ্ঞান বলছেন, তা যে আসলে স্বামীর সুরক্ষাকবচের নির্মাণ। এতদিন সেই স্বামী ছিল না, যার সুরক্ষাকবচের চিন্তা, তাঁর স্ত্রী করবেন। আজ তিনি আছেন, তাই স্ত্রী তাঁর সুরক্ষার চিন্তা করছেন”। সেই কথাতে সকলের হাস্য, ও বিবাহের দিনক্ষণ দেখা শুরু করলেন সকলে।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22