৭.৩। মহাবাণী পর্ব
সর্বাম্বা হাস্যমুখে বললেন, “বেশ তো পুত্র মানস, প্রশ্ন করো। আমি তোমার সমস্ত প্রশ্নের উত্তর প্রদান করবো। রাখো তোমার জিজ্ঞাসা আমার সকাশে। আমি তোমার প্রশ্নসমূহের উত্তর প্রদান করতে তৎপর। প্রশ্নের উত্তর লাভ করে কি হবে, কি পাবে, কি হারাবে, সেই নিয়ে চিন্তা করে সময় নষ্ট করো না। লীন হবে না হবেনা, সেই ইচ্ছা করেও নিজের উর্জ্জাক্ষয় করো না। আর লীন হলে কি পাবে আর কি হারাবে, সেই কল্পনা করে, নিজের অন্তরে আত্মের জন্ম দিওনা। নির্বিচারে প্রশ্ন করো, যা কিছু তুমি জানতে চাও, প্রশ্ন করো পুত্র”।
ইতস্তত করে হলেও, মানস প্রশ্ন করার প্রস্তুতি নিতে কুণ্ঠিত হলে, মাতা সর্বাম্বা, মানসের হাত ধরে, তাঁকে নিজের ক্রোরের কাছে নিয়ে এলেন, এবং দুই হাতে তাঁর পাঁজর ধরে, তাঁকে নিজের ক্রোড়ে স্থাপিত করে, বললেন, “কুণ্ঠা কিসের পুত্র। বলো কি প্রশ্ন তোমার?”
মানসের সমস্ত কুণ্ঠার নাশ হলো, সে এখন মাতার ক্রোড়ে স্থিত, শুধুই সন্তান সে। তাই মাতাকে সমস্ত ধরনের প্রশ্ন করতে পারেন তিনি। তাই তিনি প্রশ্ন করলেন, “আচ্ছা মা, ভক্তি কি? ভক্তি কি কনো ভাব নয়? তাহলে তোমার পঞ্চভাবের মধ্যে ভক্তি নেই কেন?”
মাতা সর্বাম্বা সহাস্যে বললেন, “বাবা, ভক্তি কনো স্বতন্ত্র ভাব নয়, বরং তা হলো তিন ভাবের মিশ্রণ, আর সেই তিন ভাব হলো, বিশ্বাস, স্নেহ ও মমতা। এই তিন ভাবের মিশ্রণেই ভক্তির জন্ম হয়। আর তাই, ভক্তি স্বতন্ত্র কনো ভাব নয়। যেমন যেমন এই তিন ভাবের তারতম্য হয়, তেমন তেমন ভক্তিরও তারতম্য হয়ে থাকে। আর সেই কারণে দুই ভক্তের ভক্তির ভাব ভিন্ন হয়ে থাকে।
যার মধ্যে মমতার ভাব প্রধান থাকে, ও স্নেহের ভাব তথা বিশ্বাস মমতার পশ্চাতে থাকে, তার মধ্যে যেই ভক্তি স্থান পায়, তা মাতৃত্ব বা পিতৃত্বের রূপ ধারণ করে নেয়। আবার যার মধ্যে স্নেহের ভাব প্রধান থাকে আর স্নেহের ভাবকে অনুসরণ করে মমতা ও বিশ্বাস, তার মধ্যে সন্তান ভাব ও সখ্যতার ভাব প্রস্ফুটিত হয়। একই ভাবে যার মধ্যে বিশ্বাস হয়ে থাকে প্রধান ভাব আর তাকে অনুসরণ করে স্নেহ ও মমতা, তার মধ্যে ঈশ্বরীয় ভাবের প্রকাশ হয়, এবং তার ভক্তি প্রেমের দিকে পরিণত হতে শুরু করে দেয়।
পুত্র ভক্তিতে দুইয়ের অস্তিত্ব থাকে, অর্থাৎ তা হলো দ্বৈত ভাব, যেখানে আমি থাকি ও ভক্তও থাকেন। কিন্তু যতই তা প্রেমের দিকে অগ্রসর হয়, ততই দ্বৈততা হ্রাস পেতে থাকে আর অদ্বৈততার প্রসার হতে থাকে, অর্থাৎ সেখানে একাকী আমি থাকে আর আমার সন্তনা নিজেকে না সন্ধান করতে পারে আর না সন্ধান করতে আগ্রহী হয়। বিশ্বাস যখন অতিমাত্রায় অবস্থান করে, আর সেই বিশ্বাসকে জ্ঞান বল প্রদান করে, তখন আমার সেই সন্তানের মধ্যে জন্ম নেওয়া শুরু করে সমর্পণ ভাব, আর সেই সমর্পণ তাঁকে ক্রমশ আমার মধ্যে লীন হবার মানসিকতা প্রদান করতে থাকে। তাই সে ভক্ত থেকে প্রেমী হয়ে উঠতে থাকে, সমর্পণ ভাবকে গ্রহণ করে”।
মানস প্রশ্ন করলেন, “এই জ্ঞান কি? তোমাকে জানাই তো জ্ঞান, তাই না? কিন্তু সেই জ্ঞানের উদয় হয় কি ভাবে, যেই জ্ঞান বিশ্বাসকে প্রগাঢ় করে তুলে, তোমার সন্তানের মধ্যে সমর্পণ ভাবের সঞ্চার করে?”
মাতা ব্রহ্মময়ী হাস্যবদনে বললেন, “জিজ্ঞাসা থেকে জ্ঞানের সঞ্চার হয়, তবে এই জিজ্ঞাসা বলো, আর অন্য সমূহ ভাবই বলো, তাদের উদয় হতে হয় মহাভাবদের থেকে, অর্থাৎ বিচার, বিবেক ও বৈরাগ্য থেকে, তবেই তারা যথার্থ ভাব হয়, অন্যথা তা ভাব নয়, তা আত্মের বিস্তারিত আবেগ হয়েই থাকে, আর তার থেকে জ্ঞান নয়, জ্ঞানের অহংকার জন্ম নেয়; ভক্তি নয়, ভক্তির অভিমান জন্ম নেয়; প্রেম নয় ঢংএর জন্ম হয়।
জানোই তো ভালো করে যে, বিচারকে চিন্তার দ্বারা আচ্ছাদিত করে রেখে, বিবেককে ইচ্ছার দ্বারা আবদ্ধ করে রেখে, আর মেধাকে অজন্মা রেখে কল্পনার বিস্তার করে করে, আত্ম আবেগসমূহদের সম্মুখে রেখে দেয়। তাই জ্ঞানী বা ভক্ত বা প্রেমী, যাকেই এমন নামকরণ করবে, তার পূর্বে অবশ্যই পরখ করে নেওয়া উচিত যে, তাঁর মধ্যে চিন্তা, ইচ্ছা বা কল্পনা বিরাজ করছে না করছে না।
পুত্র, আমার যেই সন্তানের মধ্যে দেখবে চিন্তা বিরাজ করছে, নিজেকে নিয়ে চিন্তা, নিজেকে মহান বলার প্রবণতা, নিজেকে শ্রেষ্ঠ বা উন্নত রূপে পরিবেশনের প্রবণতা থাকবে, আর নিজের জীবন, নিজের জীবনের ভবিষ্যৎ ইত্যাদি নিয়ে সে চিন্তিত, নিজের জাতি, নিজের সম্প্রদায় নিয়ে চিন্তিত, নিজের লিঙ্গ নিয়ে চিন্তিত, আমার সেই সন্তান যতই ধর্মগ্রন্থের বুলি আওরাগ, নিশ্চিত ভাবে জেনে রেখো যে, সে অজ্ঞানী, কারণ তার মধ্যে আত্মভাব স্পষ্টভাবে অবস্থান করছে।
পুত্র, বিচার, বিবেক ও বৈরাগ্যরূপ তিন মহাভাবের থেকে যখন উৎপন্ন ভাবদের দ্বারা জ্ঞান আহরণ করা হয়, তা হয় শুদ্ধ জ্ঞান, আর তা হলো প্রকৃতি থেকে লব্ধ জ্ঞান, তা হলো জীবন থেকে লব্ধ জ্ঞান, আর সেই জ্ঞানের কারণে আত্ম লীন হয়, তাই চিন্তামুক্ত হয় জীব। তাঁর তখন জাতির চিন্তা থাকেনা, গোষ্ঠীর চিন্তা থাকেনা, অধিকার স্থাপনের চিন্তা থাকেনা, বিকাশের চিন্তা থাকেনা, বিস্তারের চিন্তা থাকেনা, আর নিজজীবনের চিন্তা তো যৎসামান্যও থাকেনা।
তাই পুত্র, ধর্মের বা ধর্মগ্রন্থের বুলি মুখে বললেই জ্ঞানী হয়ে যায়না, জ্ঞানীর লক্ষণ হলো চিন্তামুক্তি। যার মধ্যে দেখবে নিজের জীবনের, নিজের পরিবারের, নিজের সম্প্রদায়ের, নিজের নামযশের, নিজের পরিবারের বা নিজের জাতি-সম্প্রদায় কনো কিছুর মান সম্মানের, সুখ-দুঃখের, বিস্তার-সঙ্কুচনের চিন্তা নেই, অথচ তিনি প্রকৃতির থেকে লব্ধ শিক্ষার কথা বলছেন, জীবন থেকে লবন্ধ শিক্ষার কথা বলছেন, জেনে রেখো যে তিনিই প্রকৃত জ্ঞানী।
একই ভাবে, ঈশ্বরের দরবারে গেলেই কেউ ভক্ত হয়ে যায়না। যদি তাঁর মধ্যে লেশ মাত্রও নিজজীবনকে নিয়ে ইচ্ছা অবশিষ্ট থাকে, নিজ পরিবারকে নিয়ে ইচ্ছা অবশিষ্ট থাকে, নিজের জাতি-সম্প্রদায় নিয়ে ইচ্ছা অবশিষ্ট থাকে, জেনে রেখো, সে ভক্ত নয়, সে আত্মের দূত রূপে ভক্ত সেজে অবস্থান করছে, যাতে অধিক থেকে অধিক জীবকে আত্মের গুলামে পরিণত করা যায়।
আর প্রেমী! প্রেমী মানে সে, যে নিজেকে ভুলে গেছে। যে আমাকে ছাড়া কিছু দেখতেও পায়না, আর দেখতেও চায়না। অর্থাৎ যে সমস্ত জীব, সমস্ত অজীব, সমস্ত কিছুর মধ্যে আমাকেই দেখে, নিজের অস্তিত্বকেও স্বীকার করে দেয়, সেই প্রেমী। আর তাই প্রেমীর অভিনয় করা আত্ম বা আত্মের কনো দূতের পক্ষেও সম্ভব নয়।
পুত্র, শুদ্ধ জ্ঞানী, শুদ্ধ ভক্ত বা শুদ্ধ প্রেমী, সকলে স্পষ্ট ভাবে জানে যে, আমি আমার সন্তানের উদ্ধার করার জন্য অবতার তো নিই, আমার সন্তানের উদ্ধারের উদ্দেশ্যে গুণধারণ করি, আমার সন্তানকে মার্গদর্শন করার জন্য সমস্ত জীবের অন্তরে চেতনা বেশে বিরাজ করে, তাদের মাধ্যমে প্রকৃতি ও কাল বেশে অধিষ্ঠান করি, কিন্তু কখনোই আমি সাকার নই, কনো ভাবেই আমি সসীম নই। সসীমের মধ্যে আমি প্রকাশিত তো হই, কিন্তু সসীম আমকি কখনোই নই। আমি সর্বদাই নিরাকার, আর সর্বদাই অসীম।
পুত্র, সমর্পিত প্রাণ কখনোই কনো পোশাকপরিচ্ছদ, কনো তিলককাঞ্চন, কনো বিশেষ প্রকার গহনা ইত্যাদি দ্বারা নিজেকে সুসজ্জিত করেন না। তিনি শুধুই সাধারণ থাকেন। তাঁর অঙ্গ কোমল হয়ে যায়, তাই সে কঠিন বস্ত্র বা রাজকীয় বস্ত্র ধারণ করতে পারেনা, তাই সে সামান্য বস্ত্রে ধারণ করে। কিন্তু নিজেকে তিলকাঞ্চনে সুসজ্জিত করাতে, তসর বা গরদের বস্ত্র ধারণ করাতে, বা কনো প্রকার মালা বা ইত্যাদি ধারণ করে রাখাতে মনযোগীই হতে পারেনা, কারণ সেই মনোযোগ যে সে আমাকে অর্পণ করে দিয়েছে। তাই নিজের দিকে মনোযোগ দেবে কি করে সে? নিজের বেশভূষা, আভুসন, বস্ত্রাদি, অলংকার ইত্যাদিতে সে নিজেকে অর্পণ করবে কি করে?
সে আমাকে ধারণ করে বসে আছে; সরলকে ধারণ করে বসে আছে, নির্বিশেষকে ধারণ করে বসে রয়েছে, তাই সে বিশেষ হবে কি করে? সে যে অতি নির্বিশেষ, অতি সাধারণ। এতটাই সাধারণ হয় সে যে, তাঁকে দেখে বোঝার উপায় থাকেনা যে সে জ্ঞানী, ভক্ত বা প্রেমী। তাঁর সাথে যখন আলাপ করবে, তখন তা প্রত্যক্ষ হবে, তবে তখনই তা প্রত্যক্ষ হবে যখন সে তোমার কাছে নিজেকে উন্মেলন করবে।
যদি দেখে সে যে তোমার মধ্যে আত্মভাব অতিকায়, তখন তোমার সম্মুখে কেবলই স্থবির হয়ে অবস্থান করে মিটিমিটি হাসবে। যদি দেখে যে তোমার আত্মবোধ পক্ব হয়নি, তাহলে তোমাকে মুহুর্মুহু অপমান করতে পারে, তাও মধুর ভাবে। তবে তোমার মধ্যে যদি আত্মবোধ অতিকায় দেখে সে, তার মুখের ভাষা সুমিষ্ট হয়না, এবং প্রায়শই সে গালমন্দ করতে থাকবে। এবং যদি তোমার আত্মবোধ তাকে ও তাঁর অন্তরে থাকা আমাকে পীড়া দেয়, তাহলে সে তোমাকে প্রহরণও করতে পারে।
তাই পুত্র, শুদ্ধ জ্ঞানী, শুদ্ধ ভক্ত বা শুদ্ধ প্রেমীকে সাধারণের পক্ষে চিহ্নিত করা অত্যন্ত কঠিন, কারণ সাধারণরা আত্মের প্রভাবে স্থিত আর সেই শুদ্ধ ব্যক্তি আত্মের প্রভাব থেকে মুক্ত। হ্যাঁ, তাঁকে প্রগল বা উন্মাদ লাগতে পারে, যদি অনেকক্ষণ সময় কাটাও তার সাথে। যদি এমন লাগে, তাহলে পরখ করে নিও। হয় সে তোমার থেকেও অধিক আত্মকে ধারণ করে অতিকায় বিলাসিতা প্রিয়, আর নয় সে আত্মকে ত্যাগ দিয়ে সে বিলাসিতাশূন্য, স্বভাবে, জীবনে এবং ভাষ্যে।
যদি তাকে বিলাসিতা প্রিয়রূপে চিহ্নিত করো, অর্থাৎ সে নিজের আত্মকে তুষ্ট করতে মত্ত, তাহলে জেনে রেখো যে, সে আত্মের বিশেষ দূত, আর যদি দেখো যে সে নিজের আত্মকে বা কনো আত্মকেই তুষ্ট করতে উদ্যত নয়, কেবল সত্যকে জানতে ও সত্যতে নিজেকে উদ্ভাসিত করতে উদ্যত, জানবে সে আমাকে ধারণ করেছে বা ধারণ করার পথে উদ্যত”।
মানস প্রশ্ন করলেন, “আচ্ছা মা, কি করে তোমার কনো সন্তানকে দেখে বুঝবো যে সে তোমাকে ধারণ করেছে না করেনি! তোমার দর্শন পেয়েছে না পাইনি, তাই বা বুঝবো কি করে? কার কথা মানবো, কার কথা মানবো না? কার কথা শুনবো, কার কথা শুনবো না?”
মাতা মিষ্ট হেসে বললেন, “আমাকে যে দর্শন করেছে, যদি সে ঈশ্বরকটি অর্থাৎ অবতার হন, তবেই তাঁর সাথে সাখ্যাত করতে পারবে তুমি, নচেৎ সে মোক্ষ লাভ করে গেছে, অর্থাৎ তাঁর সাথে তুমি আর সাখ্যাত করতে পারবেনা। আর যিনি আমাকে দর্শন করেও স্থিত, অর্থাৎ যিনি অবতার, তিনি অত্যন্ত কোমলাঙ্গী হবেন। পুরুষ বেশে থাকলে, তাঁকে চিহ্নিত করা সহজ হয়, কারণ স্ত্রীরা এমনিই কোমলাঙ্গী হন। তবে স্ত্রী হন বা পুরুষ হন, তাঁর অঙ্গে সাধারণ ভাবে, অর্থাৎ কনো আতর ব্যবহার না করলে, কনো রূপ গন্ধ থাকেনা। আর দ্বিতীয়ত, তাঁর অঙ্গে লোমাবলি অত্যন্ত ক্ষীণ থাকে, অর্থাৎ তাঁর তনুতে দেখবে লোমাবলির রেখা তো তাঁর উঠেছে, কারণ আমার দর্শন সেই বয়সে সে লাভ করেনি, যেই বয়সে তাঁর লোমাবলির রেখা উন্নত হতে শুরু করেছিল।
কিন্তু আমার নিকটে আসতে থাকার কারণে আমার ভাবের প্রভাবে, আমার উর্জ্জার প্রভাবে, তাঁর সমস্ত লোমাবলি মাঝপথেই প্রগতি লাভ করা বন্ধ করে দিয়েছে। এটি একটি সহজ চিহ্ন, আমার অবতারদের চিহ্নিত করার বাহ্যিক ভাবে দেখে। তা ছাড়া, তাঁরা অত্যন্ত সাধারণ ভাবেই বিরাজ করেন, তাই আভুসনাদি বা অঙ্গের তিলক বা মালা তাঁর থাকেনা, তাই তাঁকে সেই ভাবে চিহ্নিত করা যায়না। তবে হ্যাঁ, তাঁর সাথে কথা বললে, তাঁর থেকে সম্যক ব্রহ্মাণ্ড সম্বন্ধে জানতে পারবে।
তাঁর কথন তোমাকে এই বলবে যে, এই ভৌতিক জগতে যা কিছু দেখো, যা কিছুকে মান্যতা প্রদান করে থাকো, তা বাস্তবে সত্যের ঠিক বিপরীত, কারণ এই ভৌতিক জগত সম্পূর্ণ ভাবে অসত্য। সে আরো বলতে থাকবে তোমাকে যে, এখানে সমস্ত মান্যতা সত্যের বিপরীত, সমস্ত ধারণা যা সর্বজনে মান্যতা প্রদান করে তা সত্যের বিপরীত, যাকে মেধা বা বুদ্ধি বলা হয়ে থাকে, তা আসলে কল্পনা, যাকে বিবেকের কথন বলা হয়ে থাকে, তা আসলে ইচ্ছা আর যাকে সর্বজনে চেতনা বলে থাকে, তা আসলে অচেতন অবস্থা।
তাই তাঁর কথন শুনে এমন বোধ হবে যে, হয় সেই ব্যক্তি সম্পূর্ণ ভাবে উদ্ভ্রান্ত, নয় তুমি সম্পূর্ণ ভাবে উদ্ভ্রান্ত। যখন এই বোধ জন্ম নেবে, কারুর প্রতি, জানবে হয় সে আমার দিকে অগ্রসর হয়েছে, নয় আমার কাছে উপস্থিত হয়ে আমার দর্শন লাভ করে, সমাধির অভিজ্ঞতা ইতিমধ্যেই অর্জন করে বসে আছে। সেই ব্যক্তির মধ্যে অদ্ভুত সঙ্গীতের সুর বিরাজ করবে, এবং কলা বিষয়ে তাঁর ধারণা অত্যন্ত গভীর হবে, কারণ তাঁর চক্র ইতিমধ্যেই জাগ্রত।
তাঁর মধ্যে আত্মহীনতা, এবং সমস্ত কিছু আমারই কারণে সে লাভ করেছে, আমিই তাঁর সৃজিতা, আমিই তাঁর পালিতা, আমিই তাঁকে প্রেমপ্রদত্তা, আমিই তাঁর গুরু, আমিই তাঁর সর্বস্বকিছু, এই বোধ তাঁর মধ্যে সর্বক্ষণ বিরাজ করবে, আর সে ঘোর ঘোর ভাবে আত্ম অর্থাৎ আমিত্বের বিরোধী হবে, এই ভাব তোমাকে বলে দেবে যে সে সাখ্যাত আমার অবতার”।
মানস পুনরায় প্রশ্ন করলেন, “তোমাকে সম্পূর্ণ ভাবে জানা কি করে সম্ভব মা? অসত্যকেও কি জানতে হয়, তোমাকে সার্বিক ভাবে জানতে? আধ্যাত্ম কি মা? আধ্যাত্মিক জ্ঞানের অধিকার কার আছে, আর কার নেই? কি প্রয়োজন আধ্যাত্মিক জ্ঞান আহরণের জন্য?”
মাতা সর্বাম্বা স্নেহের শুরু বললেন, “পুত্র, আমাকে সম্পূর্ণ ভাবে আমি স্বয়ংও জানিনা। আমার সন্তানরা যেমন যেমন ভাবে আমাকে জানে ও চেনে, আমিও তাঁদের মধ্যে থেকে নিজেকে তেমন ভাবে চিনি ও জানি। তবে হ্যাঁ, এই ভৌতিক জগতে অর্থাৎ সসীমতার মধ্যে বিরাজ করে আমাকে যদি জানতে হয়, তাহলে অবশ্যই অসত্যকেও জানতে হয়, প্রকৃতি ও কালকে জানার সাথে সাথে।
কালকে জানা যায় নিজের জীবনের প্রগতিকে প্রত্যক্ষ করে, অর্থাৎ আমি কি ভাবে তাঁর জীবনকে পরিচালিত করেছি, তা যখন আমার কনো সন্তান প্রত্যক্ষ করে, তখন তার কাছে কালের জ্ঞান উপস্থিত হয়। সেই অবস্থায় সে আমাকে জানতে পারেনা, বরং সে অসত্যকেই সঠিক করে জানতে থাকে। আবার সম্পূর্ণ জগতের সমস্ত মানুষ, সমস্ত জীবের বর্তমান ও অতীতের মানসিকতাকে প্রত্যক্ষ করে এবং তাকে মিলিয়ে মিলিয়ে সে জানতে ও চিনতে পারে প্রকৃতিকে, আর তা পারলে অসত্যের সম্বন্ধে সম্পূর্ণ ধারনা জন্ম নেয় তার।
পুত্র, তুমি যার মধ্যে স্থিত, তাকে তুমি কখনোই দেখতে পাবেনা, বরং তার বাহ্যে যা উপস্থিত, তাকে প্রত্যক্ষ করতে পারবে। তাই যতক্ষণ কেউ আমার মধ্যে স্থিত হয়ে, আমাকে জানাই জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য জ্ঞান করে, তখন সে আমাকে লাভ করে, কিন্তু আমাকে সঠিক করে জানতে পারেনা, বরং সে জানে অসত্য জগতকে, কারণ সে আমার মধ্যে স্থিত থাকার কারণে আমার বাহ্যে যেই অসত্য জগত স্থিত, যার মধ্যে আমি সুপ্ত ভাবে থাকলেও, প্রত্যক্ষ ভাবে থাকি না, তাকেই দেখে আর তাকেই জানে। আর তা হলো সম্পূর্ণ জ্ঞানের অর্ধেক।
যখন সে আমার মধ্যে সম্পূর্ণ ভাবে সমর্পিত হয়ে গিয়ে, আমার সাথে মিলিত হয়ে যায়, তখন আমি তাঁকে আমার থেকে মুক্ত করে, বাহ্যে স্থিত করি এবং অসত্যের সাথে মিলিত করি। মিলিত সে আর হতে পারেনা অসত্যের সাথে। যে একবার অমৃতের স্বাদ পেয়ে গেছে, তাকে আর বিষ প্রদান করলে, সে গ্রহণ করেনা। তাই সে আর অসত্যে লিপ্ত হয়না, কিন্তু অসত্যে স্থিত থাকার কারণে, সে এবার আমাকে প্রত্যক্ষ করতে পারে, যা এতকাল সে করতে পারছিল না, আর তাই সে এবার বাকি জ্ঞান অর্থাৎ আমাকে জানা শুরু করে।
অর্থাৎ পুত্র, প্রথমে আমার মধ্যে লীন হয়ে শুদ্ধ হয়ে নিতে হয়। যে একবার শুদ্ধ হয়ে গেছে আমাকে স্পর্শ করে, আমার ক্রোড়ে মাথা রেখে ঘুমিয়ে, অর্থাৎ সমাধি লাভ করে, তাকে আর কনো অপবিত্রতা স্পর্শ করতে পারেনা। তখন তাকে আমি আমার ক্রোড় থেকে মুক্ত করি কিছুকালের জন্য, যাতে সে এবার আমাকে প্রত্যক্ষ করতে পারে আর আমাকে জানতে পারে।
অর্থাৎ কথা এই পুত্র যে, আমাকে আমি স্বয়ংও জানিনা। তাই আমার কনো সন্তান আমাকে জানতেও পারেনা, যতক্ষণ না সে আমাকে স্পর্শ করে এবং আমার ক্রোড়ে এসে বসে, অর্থাৎ সমাধি লাভ করে। সমাধি লাভ করায় জীবকটি মোক্ষলাভ করে আমাতেই লীন হয়ে যায়। আর যারা আমাতে লীন হয়নি, তাদেরকে আমার কাছে আবাহন করার জন্য ঈশ্বরকটিরা আমার থেকে মুক্ত হয়ে আমাকে প্রত্যক্ষ করতে পারে তারপর, তাই আমাকে প্রত্যক্ষ করে, আমি কেমন সেই কথা জগতে বলে, যেমন এই কৃতান্ত বলছে।
সেই জ্ঞানকে ধরে ধরেই, সমস্ত জীবকটি আমার কাছে এসে উপস্থিত হয়। অর্থাৎ অবতাররা যেই পথ প্রদর্শন করে দেন সকল জীবকটির জন্য, সেই পথকে অনুধাবন করা, আর সেই পথকেই অনুসরণ করাই জীবের ধর্ম, আর কর্তব্য। যখন আমি দেখি যে জীব সেই ধর্ম পালন করতে পারছেনা, তখন আমি তাদেরকে পুনরায় সেই অবতারের কথন বুঝিয়ে দিতে সচেষ্ট হই, আর তাতেও না হলে, পরবর্তী অবতারকে আবাহন করি।
ঠিক যেমন ব্যাসের ব্যখ্যা দেওয়া কৃষ্ণকথাকে অনুধাবন করতে পারেনি জীব, তাই আমি চৈতন্য বেশে অবতীর্ণ হয়েছিলাম, আর যখন তাতেও জীব নিজের কর্তব্য বুঝতে পারলো না, তখন রামকৃষ্ণ বেশে অবতীর্ণ হয়ে, ব্রহ্মসনাতনের আবির্ভাবকে আবাহন করি”।
মানস বললেন, “এর অর্থ মা, কৃতান্ত হলো জীবকটির জন্য নির্মিত মার্গ, যেই মার্গকে ধারণ করে জীবকটি তোমার কাছে অর্থাৎ সত্যের কাছে উপস্থিত হতে পারবে? … তাহলে মা, আমাকে কৃতান্তের সার কথার বিবরণ প্রদান করো, যাতে সমস্ত জীবের কাছে সেই মার্গ স্পষ্ট হয়ে ওঠে”।
মাতা সর্বাম্বা হাস্যবদনে বললেন, “বেশ পুত্র, আমি তোমাকে কৃতান্তের সার কথা বলছি, যা হবে আগামী দিনে জীবকটির জন্য মার্গদর্শন, অর্থাৎ সকল সাধক, যারা মোক্ষকামী হয়ে জীবনমৃত্যুর বন্ধন থেকে চিরমুক্তি পেতে আগ্রহী ও যারা আমার ক্রোড় লাভ করতে উদগ্রীব, তাদের জন্য মার্গ। পুত্র, এর আগেও আমি মার্গ প্রদান করেছি, মহাভারত রূপে, রামায়ণ রূপে, যেখানে আমি আমার কাছে পৌঁছানর মার্গ বলেছি সমস্ত জীবকটিকে।
কিন্তু তাকে ভৌতিক কথা বলে আর্যরা গণ্য করিয়ে, আমার সন্তানদের আমার কাছ থেকে সরিয়ে রেখেছে। তাই তার ফলস্বরূপ, আমি আমার একটি সন্তানকেও আমার ক্রোড়ে লাভ করিনি। সেই সমস্তই আমার অবতারদের সম্পূর্ণ ভাবে ব্রহ্মাণ্ডকে জেনে তার সারকথার বিবরণ ছিল। আর তাই ব্রহ্মসনাতনও যখন একই ভাবে সম্পূর্ণ ভাবে ব্রহ্মাণ্ডকে জেনে, আহারের ন্যায় তা গ্রহণ করে, হজম করে উদ্গিরনের ন্যায় কৃতান্ত প্রদান করে, তখন সে সিদ্ধান্ত নেয় যে, যাতে এই কথাকেও আর্যরা ভৌতিক কথা রূপে স্থাপিত করে রেখে, আমার সন্তানদের আমার থেকে দূরে রাখতে না পারে।
আর সেই কারণে, এখানে যেই যেই চরিত্রকে সে স্থাপন করেছে সম্পূর্ণ ভাবে আমার কাছে আমার সন্তানদের পৌঁছে দেবার মার্গের বিবরণ করার কালে, তাদেরকে তিনি পরোক্ষভাবে স্থাপন না করে, প্রত্যক্ষ ভাবেই তাদেরকে সম্মুখে রেখেছেন। আর কনো রূপ ছন্দ ব্যবহার না করে, সম্যক গদ্যরূপেই তা স্থাপনা করেছেন। অর্থাৎ তিনি ছায়াদের ছায়াই বলেছেন, কনো ভিন্ন নাম না প্রদান করে, আর চিন্তাকে চিন্তা, ইচ্ছাকে ইচ্ছা ও কল্পনাকে কল্পনাই বলেছেন।
একই ভাবে, রাবণ বা দুর্যোধন, এমন কনো নামকরন না করে, সরাসরি আত্মকে আত্মই বলেছেন তিনি, মনকে অর্থাৎ তোমাকে মানসই বলেছেন, ধরাকে ধরাই বলেছেন, অগ্নিকে শিখা বলেছেন, পবনকে বেগবতী বলেছেন। এমনকি তিনি মেধাকেও মেধাই বলেছেন, আর মহাভাবদের মহাভাবই ভবলেছেন, এবং বিচার, বিবেক ও বৈরাগ্যের পৃথক নামকরণ করেননি। একই ভাবে পঞ্চভাবদেরও তাঁদেরই নামে রেখেছেন, আর রিপুপাশদেরকেও তাদেরই নামে অবিহিত করেছেন, যেমন মোহকে মোহিনী, মদকে মদিনা, ক্রোধকে রাজ্ঞী ইত্যাদি।
এমন করার একটিই উদ্দেশ্য। আর কনো লুকিয়ে রাখার প্রয়োজন নেই। ব্রহ্মদিবসকে আত্মের বিস্তারের জন্য তাকে কালপ্রদান করবো, এই আমার তাকে দেওয়া প্রতিজ্ঞা ছিল, তাই আমি তার বিস্তারকালে যাতে আমার সন্তনাদের হারিয়ে যেতে না পারে, সেই কারণে পূর্বের অবতারদের হাত ধরে মহাভারত ও রামায়ণের রচনা করে মার্গ প্রদান করেছিলাম। অর্থাৎ তাদেরকে লুক্কায়িত রাখতে আমি বাধ্য ছিলাম, কারণ আমি আত্মের কাছে অঙ্গিকার বদ্ধ ছিলাম যে, ব্রহ্মদিবসে আমি তার থেকে অধিকার কেড়ে নেবনা, তার কর্মে প্রত্যক্ষ ভাবে বাঁধা দেবনা।
কিন্তু তাও রামায়ণ, মহাভারত, মার্কণ্ড মহাপুরাণ, এবং অদ্বৈত বেদান্তের মত কীর্তি আমাকে করতে হয়েছিল, যাতে ব্রহ্মদিবসের অবসান কালে, এবং ব্রহ্মরাত্রির উদয়ের কালের সঙ্গমক্ষণে ব্রহ্মসনাতন, অর্থাৎ মার্কণ্ডের রচিত পূর্ণশূন্য রূপ, দশমহাবিদ্যার শ্রেষ্ঠ ও অন্তিমতম বিদ্যা, মহাকালী তাঁর সপ্তমে প্রকাশিত হতে পারেন। আর এখন ব্রহ্মসন্তান নিজের স্বরূপকে ধারণ করে ফেলেছে, সে গুহ্যাকে ধারণ করে আজ মহাকালী, সর্বাম্বাকে ধারণ করে আজ ব্রহ্মময়ী। আর তার থেকেও বড় কথা, ব্রহ্মদিবসের অন্ত হয়ে গেছে, ব্রহ্মরজনীর সূত্রপাতের শুরু করলো ব্রহ্মসন্তান স্বয়ং কৃতান্ত প্রদান করে।
তাই, আর কনো লুকোচুরির প্রয়োজন নেই। কাজেই, ব্রহ্মসনাতন প্রকাশ্যে ঘোষণা করে দিলেন যে, রামায়ণ বা মহাভারতও অদ্বৈত বেদান্ত ও মার্কণ্ড মহাপুরাণের ন্যায় কনো ভৌতিক কথার বিবরণ নয়। রামায়ণ সাখ্যাত আমার ১২ কলার অবতার, বাল্মীকির অন্তরে আমার বিস্তার কথা, যেখানে বিবেক রূপে রাম স্থিত আর চেতনা রূপে সীতা। আর মহাভারত হলো আমার ১৬ কলা অবতার, ব্যাসের অন্তরে আমার বিস্তার কথা, যেখানে দ্রৌপদী ছিল আমার চেতনা প্রকাশ, আর কৃষ্ণ ছিল বিবেক।
ব্রহ্মসনাতন যে শ্রেষ্ঠ মহাবিদ্যা, আমার ভৌতিক জগতে সর্বোত্তম সম্ভব কলাপ্রকাশ, মহাকালী, যে সম্পূর্ণ ৯৬ কলা ধারণ করে অবস্থান করছে। তাই কেবল রামায়ণ ও মহাভারতের সত্য বলেই সে ক্ষান্ত কি করে হতে পারে! কি করে কেবল মার্কণ্ডের সত্য বলেই ক্ষান্ত হতে পারে! সেই সমূহ সত্য তো সে কৃতান্তিকাতে ব্যক্ত করে দিয়েছে, আর তাছাড়া যেই মহামার্গ নির্মাণ করে সে ব্রহ্মরজনীর শুভারম্ভ করলো, তা হলো কৃতান্ত, অর্থাৎ কর্তাভাবের অন্ত করা, বা আত্মের বিনাশ করার মন্ত্র।
আর তাই সে কনো প্রকার লুকোচুরি না করে, সরাসরি আমার সন্তান্তের অন্তরে যা যা অবস্থান করে, যা যা প্রত্যক্ষ থাকে, আর যা যা পরোক্ষ ও সুপ্ত থাকে, যখন যখন তা জাগ্রত হয়, আর তা জাগ্রত হলে, কি কি, কি কি ভাবে হয়, তার পূর্ণ বিবরণ প্রদান করেছেন যেখানে, তারই নাম হলো কৃতান্ত। ব্রহ্মরজনীর শুভারম্ভ করে গেলেন ব্রহ্মসন্তান, তাই সে আর আত্মের কনো গুণকেই রেখে গেলেন না, না রেখেগেলেন সত্ত্বগুনের ন্যায় বিভীষণকে আর না রেখে গেলেন তম ও সত্ত্বগুনের ন্যায় বিদুর ও ধৃতরাষ্ট্রকে। পূর্ণ ভাবে সকলকিছুর নাশ করবেন বলেই তিনি মহাকালী, আর তাই তিনি নিজের আত্মকে সম্পূর্ণ ভাবে হত্যা করলেন।
৯৬ কলার অবতার তিনি, তাই তিনি আত্মের পূর্ণ বিনাশ করেও দেহীরূপে স্থিত রয়েছেন। ১২ কলা বা ১৬ কলা বা ৩২ কলার অবতার হলেও, পূর্ণ ভাবে আত্মের বিনাশের পর তাঁরা তাঁদের দেহরাখতে পারতেন না। কিন্তু ব্রহ্মসনাতন, ওই যে বললাম, আমার ভৌতিক ভাবে প্রকাশিত করা সম্ভব এমন সর্বোত্তম প্রকাশ, ৯৬ কলার অবতার, পূর্ণশূন্যবেশে সে মহাকালী।
মার্কণ্ড তাঁর কথা পূর্বেই বলে গেছিলেন, যেখানে তিনি ব্যক্ত করে গেছিলেন যে, কনো না কনো রূপে সমস্ত মহাবিদ্যার সাথে আত্ম বিরাজ করবে, কিন্তু কালী বেশে যখন আমি স্থিতা হবো, তখন আত্ম শবরূপে বিনা অন্য কনো ভাবে স্থিতা থাকতে পারবেনা। আর তাই আজ দেখো, আত্ম আমার চরণতোলে শব রূপে স্থিত। আর সাখ্যাত মহাকালী রূপে, পূর্ণশূন্যকায়া ব্রহ্মরূপে স্থিত ব্রহ্মসনাতন, তাই সে আজ নিঃসঙ্গ, এটিই তো মহাকালীর বিশেষত্ব।
পুত্র মানস, তুমি প্রশ্ন করছিলে না আমাকে, কেন তুমি আমার মধ্যে লীন হলেনা! কারণ পুত্র, তোমাকে এখন অবস্থান করতে হবে। ব্রহ্মসনাতন নিজের আত্মকে হত্যা করে দিয়েছে, তাই তোমাকেই তাঁর মধ্যে নিবাস করতে হবে, যতক্ষণ না তিনি তাঁর সম্পূর্ণ লীলা সম্পন্ন করে আমার মধ্যে লীন হচ্ছেন ততক্ষণ। সেই জন্যই পুত্র, আমার পূর্ণ মূর্তিতে তুমি থাকবে আমার কটিভূষণ হয়ে, আর অন্যরূপে, আমার ক্রোড়ে তুমি অবস্থান করবে, তবেই ব্রহ্মময়ীর সর্বাম্বার রূপ সম্পন্ন হবে।
এই সামান্য প্রারম্ভিক কথা বলে, এবার আমি কৃতান্ত মাধ্যমে ব্রহ্মসনাতন সমস্ত জীবকটিকে যেই মার্গ প্রদান করলেন, তার বিবরণ প্রদান করছি তোমাকে। পুত্র, ব্রহ্মসনাতন স্পষ্ট করে আমার ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছেন যে, আমি হলাম সেই অনন্তা, সেই অসীমা, যার কনোব্যাখ্যা সম্ভব নয়, যার কনো চিন্তন সম্ভব নয়, অর্থাৎ আমাকে স্পষ্ট ভাবে ব্যখ্যা করে বলেছেন যে আমি সেই একমাত্র অস্তিত্ব, সেই পরমশূন্য, যার কনো গুণ নেই, যার কনো বিকার নেই, যার কনো আকার নেই।
আর তাই আমি একাকী, আর সেই একাকীত্ব-এর নাশ করার কারণে, আমি মাতৃত্ব ধারণের প্রয়াসে তোমার অর্থাৎ মানসের রচনা করি। তবে মানসের রচনা সম্ভব নয়, কারণ আমি ছাড়া কনো কিছুর অস্তিত্বই সম্ভব নয়। তাই মানসকে এক অলৌকিক বোধ প্রদান করতে হয়, যেই বোধের কারণে মানস নিজেকে আমার থেকে ভিন্ন এক অস্তিত্বরূপে বোধ করতে সক্ষম হবে, আর সেই বোধ হলো আত্ম। এই আত্মবোধই তোমাকে আমার থেকে একটি ভিন্ন অস্তিত্ব এই ভান প্রদান করে। অর্থাৎ আমার থেকে আত্ম ও মানস এইদুইয়ের রচনা হলো, এমনই কথাকে স্পষ্ট ভাবে ব্যক্ত করেছেন ব্রহ্মসনাতন।
কিন্তু ওই যে বললাম, আমি বিনা দ্বিতীয় কনো অস্তিত্ব সম্ভবই নয়, তাই ব্রহ্মসনাতন দেখিয়েছেন যে, আত্মবোধ উপস্থিত করার জন্য আমি চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনার সঞ্চার করি, যারা আমি নই, আমার ছায়া মাত্র। আর দেখিয়েছেন তিনি যে, তোমাকে সম্পূর্ণ ভাবে একটি পৃথক অস্তিত্ব বোধ করানোর জন্য, কেবল আত্মবোধই যথেষ্ট ছিল না, প্রয়োজন ছিল তোমার একটি নিজস্ব ব্রহ্মাণ্ড, আর সেই ব্রহ্মাণ্ড ধারণের জন্য, আমি প্রকাশ করি আমার কায়ার রূপ, অর্থাৎ ধরাকে।
সমস্ত কিছু সঠিক সঠিক চললে তো কনো অবতারের প্রয়োজনই পরতো না, আর প্রয়োজন পরতো না কনো মার্গদর্শনের। কিন্তু তার প্রয়োজন পরলো। কেন? কারণ আত্মবোধ তোমার মধ্যে ভিন্ন ভাবে বিস্তার করলো। তুমি আত্মকে ধারণ করার আগেই, আত্ম তোমাকে ধারণ করে ফেলল, আর তাই যেই আত্মের রচনা করা হয়েছিল তোমাকে এক পৃথক অস্তিত্ব প্রদান করে, তোমাকে আমার সন্তানরূপে আমার মাতৃত্বকে সম্ভোগ করতে দেবে বলে, সে নিজেকে এক ভিন্ন অস্তিত্ব জ্ঞান করে নিয়ে, তোমার অস্তিত্বকেই দাশ রূপে পরিগণিত করা শুরু করে দিল।
তা করার জন্য, তোমার অস্তিত্বের বোধ যে তোমাকে করাতো, সেই ধরাকে আত্মসাৎ করতে হতো। তাই আত্ম যেমন ছায়াদেরকে নিজের সাথে যুগ্ম করে নিয়েছিল, তেমন তোমার অর্ধাঙ্গ, অর্থাৎ ধরাকেও নিজের সাথে যুক্ত করে নেওয়া শুরু করলো। ধরাকে অধিকার করে নেবার জন্য, সে এক পরমাত্ম থেকে অজস্র আত্ম হয়ে উঠলো, আর তোমার অর্ধাঙ্গকে সে তোমার থেকে হনন করে নেবার প্রয়াস করছিল, তাই তুমিও সেই একই সংখ্যক রূপ ধারণ করলে, আর তাই ধরা, যে তোমার অর্ধাঙ্গ, সেও বাধ্য হলো সহস্র রূপ ধারণে।
চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনা, অর্থাৎ ছায়াদের ধারণ করে, আর তোমার অধিকারে স্থাপিত না হয়ে, আত্ম হয়ে উঠলো ভয়ঙ্কর শক্তিশালী ও মহাকাঙ্খি। তাই তুমি আত্মের সাথে পেরে উঠলে না। অধিকাংশ নয়, প্রায় সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডতেই তোমার অর্ধাঙ্গ বা শরীর আত্মকেই তুমি জ্ঞানে, তাঁকে স্বামী রূপে স্বীকার করে আত্মের দাসী হয়ে থেকে যেতে শুরু করলো। আর তাই আমাকেও বাধ্য করলো মার্গদর্শনের জন্য, অবতার গ্রহণের জন্য।
আমিও তাই সময়ে সময়ে অবতার গ্রহণ করে করে, আমার সমস্ত সন্তানদের মার্গদর্শন করতে থাকলাম যে, যাকে তারা মন বলছে, সে মন নয়, সে যে আত্ম, সে যে অহম। কিন্তু ব্রহ্মসনাতন আমার পূর্ণ অবতার, তাই সে সেই কথা শুনতে পেয়েছিল। কিন্তু আমার সন্তানরা তা শুনতেও পায়না, আর বুঝতেও পায়না। আর আত্ম নিজের অধিকারে স্থাপিত করে রাখা আমার সন্তানদের মাধ্যমে, যাদেরকে পূর্বে ব্রাহ্মণ বলতে, আর বর্তমানে বিজ্ঞানী বলো, তাদের মাধ্যমে আমার সন্তানদের সত্য জানতে ও বুঝতেও দেয়না, বরং তারা অসত্যকে সত্য বলে স্থাপনা করে আমার সন্তানদের হৃদয়ে।
তাই আমার পূর্ণ সম্ভব অবতার ব্রহ্মসনাতন এক অনবদ্য মার্গের রচনা করলো। প্রতিটি ব্রহ্মাণ্ডের কাছে, আমার প্রতিটি মানসের কাছে, অর্থাৎ আমার প্রতিটি সন্তানের কাছে, আমি প্রকৃতি বেশে অবস্থান করে করে, তাঁদের সেবা করার প্রয়াস করি, আর আমার এই প্রয়াসকেই কাজে লগিয়ে, আত্ম সকল সন্তানদের এই দেখায় যে প্রকৃতি তার দাস। কিন্তু ব্রহ্মসনাতন এখানে এক কীর্তি করলো। সে এই ব্রহ্মরজনীর কালে সকল জীবের মধ্যে এই সূত্রের রচনা করে দিল যে, সকলে আমাকে শিশুকালে তো প্রত্যক্ষ করবে, কিন্তু আমি তারপর আত্মের ধারা সম্পূর্ণ ভাবে ঢেকে যাবো।
এই বীজকে সে সকল ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে অর্পণ করে দিয়েছে পুত্র। অর্থাৎ এই ব্রহ্মরজনীতে আমার যত সন্তান ব্রহ্মাণ্ডের রচনা করে, তার মধ্যে বিরাজ করবে, অর্থাৎ যত মানস দেহ ধরবে, সকলের ক্ষেত্রে এমনই হবে। আর এমন হলে কি হবে? এমন হলে, মানসকে আত্ম ও ছায়ারা নিগ্রহ করার প্রয়াস করবে, আর তাই ধরা আত্মকে আর মানসকে পৃথক পৃথক ভাবে প্রত্যক্ষ করতে সক্ষম হবে। কেন? আমি সকলের সম্মুখে প্রকৃতি বেশে অবস্থান করলে, ধরার দৃষ্টি আমাতেই নিবদ্ধ থাকে, আর তার ফলেই আত্ম তাঁকে ছলনার শিকার করে নিতে পারে।
তাই ব্রহ্মসনাতন নিজের ব্রহ্মাণ্ডে আমাকে অবলুপ্ত করে দিলো প্রথমেই, এবং সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডে এমন করে, এই ধারারই বীজ অর্পণ করে দিলেন। আর এর ফলে, আর কনো ব্রহ্মাণ্ড, যারা ব্রহ্মরজনীতে জন্ম নেবে, তারা আমাকে জন্মের কিছুকালের পর থেকে প্রত্যক্ষ করতে পারবে না। আর এর ফলে, আত্মও আমাকে তার দাসী রূপে, অর্থাৎ ত্রিগুণের পত্নী, ত্রিদেবী করে দেখাতে সক্ষম হবেনা, আর ধরাও মানসকে মানস বলে চিহ্নিত করে নিতে পারবে, এবং আত্মকে মানস বলে গণ্য করবে না।
এমন করার কারণ কি পুত্র? ব্রহ্মসনাতন এমন কৃত্য করলেন কেন? এমন করার কারণও তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, কৃতান্তের পরবর্তী অধ্যায়সমূহে। সেখানে তিনি দেখিয়েছেন এবং স্পষ্ট ভাবে বলেওছেন, আত্ম ধরার সাথে ছলনা করেই এই উদ্দেশ্যে যে মেধা যাতে জন্ম নিতে না পারে। মানস ও ধরার বিবাহ হলে, তাঁদের মধ্যে প্রভু ও দাসীর সম্পর্ক থাকেনা, আর তাই মেধার জন্ম হতে পারে।
পুত্র, মেধার ব্যাপারে না তুমি আর না ধরা পরিচিত, কারণ এর আগে কনো ব্রহ্মাণ্ডেই তা স্বাভাবিক ভাবে জন্ম নিতো না, তোমাদের পুত্রী হয়ে। তাই ধরা প্রথমদিকে মেধার প্রতি অসন্তুষ্টই থাকতো, আর মেধা তাঁর দুশ্চিন্তার কারণ হয়। তবে শিখা অর্থাৎ অগ্নি ও বায়ু অর্থাৎ বেগবতী, এঁরা মেধার জলতত্ত্বের প্রতি আকৃষ্ট। তাই তাঁরা মেধাকে নিজের কন্যার ন্যায় স্নেহ করে থাকে।
কিন্তু তা করলেও, মেধাই যে প্রকৃত অর্থে চেতনা, তার ধারণা কারুরই নেই, আর তাই মেধার কথনকে মান্যতা কেউই দেয়না। তার কথাকে মান্যতা না দেবার কারণেই, আত্মের ত্রিগুণের কাছে বশ্যতা স্বীকার করে ফেলে শিখা অর্থাৎ অগ্নি ও বায়ু। আহারের লোভ, এবং প্রাণের মোহ এঁদের দুজনের চিত্ত হনন করে নেয়, আর তাদেরকে কাজে লাগিয়ে আত্মের ত্রিগুণ এঁদেরকে বশ করে, এঁদের মধ্যে নিজেদের বীজ স্থাপন করে রিপুপাশদের জন্ম দেয়, যারাই সমস্ত আবেগদের জন্ম দিয়ে আত্মের বৃহৎ সাম্রাজ্য গঠন করে।
কিন্তু মেধার যেকালে জন্ম হয়ে গেছে, সেকালে আবেগরা যে সর্বেসর্বা হতে পারবে না! তাই মেধার হস্তক্ষেপে, আবেগসমূহরা ভয়ানক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলো। আর অন্যদিকে, আমার ত্রিগুণ, যা সুপ্তই থাকে সমস্ত জীবের মধ্যে, তাকে জাগ্রত করার জন্য যেই অনন্ত ভাব লাগে, যেই অসীম ধৈর্য লাগে, যেই অব্যক্ত প্রেম ও স্নেহ লাগে, তা যে প্রদান করার সামর্থ্য কেবল ও কেবলই মেধারই থাকে, কারণ মেধা যে স্বয়ং আমি, সে’ই যে চেতনা, তাঁর মধ্যেই যে পরাচেতনার প্রকাশ হতে থাকে তিলতিল করে।
তাই এক দিকে যখন আবেগরা মাথা চারা দিয়ে উঠলো, তখন মেধা থাকার কারণে, শিখা অর্থাৎ অগ্নি ও বেগবতী অর্থাৎ বায়ুও যথার্থ ভাবে বুঝে গেল আবেগরা আত্মবোধকে স্থাপন করে সঙ্কীর্ণতার বিস্তার করছে। তাই মেধার সঙ্গ দিতে থাকলে, মেধা সমস্ত মোহকে দূর করে, সুপ্ত মহাভাবদের জাগ্রত করা শুরু করে। সুপ্ত মহাভাবরা মেধার সান্নিধ্য লাভ করে, মেধার ছাপ শিখা ও বেগবতীর মধ্যেও প্রত্যক্ষ করে, মহভাবদের সাথে একাত্ম হতে থাকলো।
আর তাই মহাভাবরা সুপ্ত অবস্থা থেকে প্রত্যক্ষ হয়ে উঠলো, যা আমার এক সন্তানকে আমার প্রতি পূর্ণ ভাবে আকৃষ্ট করে। এই মহাভাব, অর্থাৎ বিচার, বিবেক ও বৈরাগ্যের সাথে মেধার মিলিত রূপ, এঁদের জাগরণেই সাধকের রচনা হয়। আত্মও সেই তত্ত্ব সম্বন্ধে পরিচিত, তাই সে সর্বদাই প্রয়াস করে যাতে এই মহাভাবরা প্রত্যক্ষ না হতে পারে, আর সেই কারণেই সে মেধার জন্মকে প্রতিবন্ধকতা প্রদান করতে সচেষ্ট থাকে, যার কারণেই সে ধরাকে বশ করার প্রয়াস করে।
মহাভাবরা জাগ্রত হয়ে গেলে, আর আত্ম চিন্তাকে বিচার বলে চালিয়ে যেতে পারেনা, আর ইচ্ছাকে বিবেকের বিস্তার বলে ছলনা করতে পারেনা, আর কল্পনাকেও মেধা বা বুদ্ধি বলে চালিয়ে নিয়ে যেতে পারেনা, যা সে আমার সমস্ত সন্তানের মধ্যে স্থাপিত রেখে, সকলকে বশ করে রেখে, আত্মের বিস্তার করে থাকে, এবং আত্মকে ঈশ্বর বলে প্রচার করাতে থাকে।
মহাভাবদের সাথে মিলনের সাথে সাথে প্রকাশ্যে আসতে থাকে পঞ্চদিব্যভাব, অর্থাৎ জ্ঞানের কারণ জিজ্ঞাসা, ভক্তির কারণ অর্থাৎ বিশ্বাস, স্নেহ ও মমতা, এবং প্রেমের উৎস অর্থাৎ সমর্পণ। আর তারা প্রকাশ্যে আসতেই সমস্ত আত্মের সমীকরণ বিনষ্ট হওয়া শুরু হয়ে যায়। পরিস্থিতি প্রতিকুল, তাই মানস তোমাকে ও ধরাকে ও তোমাদের সকল অনুগামীদের বন্দী করে রেখে দিয়েছিল আত্ম। আর অন্যদিকে মেধাকে বন্দী করার জন্য ত্রিগুণকে প্রেরণ করেছিল।
কিন্তু মেধা যে সাখ্যাত চেতনা, আর তারই সাথে তিন চেতনার ভাব অর্থাৎ মহাভাব মিলিত হলে, জাগ্রত হয় সূক্ষ্মশরীর আমার সন্তানদের মধ্যে। আর তাই এঁরা সকলে মিলে স্থান গ্রহণ করে পিঙ্গলাতে, আর সেখানে ত্রিগুণ প্রবেশ করতেই পারেনা। তাই পঞ্চভাব অবশ্যই মানস ও ধরাদের উদ্ধার করবে, এবং তাঁদের নিয়ে পিঙ্গলাতে যাত্রা করবে, এই চিন্তা করে, আত্ম যোজনা করে রাখে যে, পঞ্চভাব এসে মানস ও ধরাদের উদ্ধার করলে, তারা যেই পথে পলায়ন করবে, সেই পথ ধরে তারাও পৌঁছে যাবে পিঙ্গলাতে।
কিন্তু ইরাপিঙ্গলাতে কনো অস্ত্র বা আসুরিক বল নিয়ে প্রবেশ সম্ভব নয়, তাই আত্ম সেই সুরঙ্গকে লক্ষ্য করলেও, সশস্ত্র ভাবে প্রবেশ করতে পারেনা। আর ত্রিগুণ তো নিরস্ত্র ভাবেও প্রবেশ করতে ব্যর্থ হয়। আত্ম ও ছায়া পিঙ্গলাতে প্রবেশ করলে, আমার জন্ম হয়। অর্থাৎ মেধার যাত্রা সমাপ্ত হয়, কারণ চেতনা চরম অবস্থা পর্যন্ত উন্নত হয়ে গেছে, আর শুরু হয় প্রকৃতির যাত্রা, অর্থাৎ আমার সন্তানের আমার দিকে অগ্রসর হবার দ্বিতীয় চরণের। আর তাই মেধা নিজের অস্তিত্ব ত্যাগ করে, প্রেম অর্থাৎ আমি রূপে প্রকাশিত হয়, অর্থাৎ সমর্পণের গন্তব্য অর্থাৎ প্রেমের জন্ম হয়।
কিন্তু মেধার মৃত্যুতে সকলে ব্যথিত, আর আত্ম ও ছায়া সেই কথা জানতে পেরে, আর আমাকেও প্রকৃতির পথে যাত্রারতরূপে সনাক্ত করে নিয়ে, প্রয়াস করে যাতে, সকলে আমাকে ত্যাগ করে। করেও একপ্রকার তা, কিন্তু দিব্য পঞ্চভাব আমাকে ত্যাগ করে না, কারণ আমাকে ছাড়া যে তারা নিজেদের অস্তিত্ব রাখাতেই অনিচ্ছুক। তাই আমি তাঁদের কারণে, আত্মপ্রকাশ করলাম মাতৃকারূপের, অর্থাৎ আমি ব্যক্ত করে দিলাম যে মেধা যেই পরাচেতনার পথে যাত্রা করছিল, আমি সেই পরাচেতনার পূর্ণ অবস্থা, আর আমার যাত্রা পরাপ্রকৃতির পথে শুরু হয়েছে।
এই সত্য সম্মুখে আসতে, ছায়ারা, যারা আমার ছায়া, আর আমার কায়ার তেজকে সহ্যও করতে পারেনা, তারা সেখান থেকে পলায়ন করলে, আত্মের আমাকে একঘরে করার যোজনা ব্যর্থ হয়। আর তাই এবার সে অন্তিম যোজনা করে, তবে সে যোজনা করা কে হয়! সে নিজেকে সর্বেসর্বা মানলেও, আমার ইচ্ছা ছাড়া একটি গাছের পাতাও নড়ে না, কারণ আমিই একমাত্র অস্তিত্ব। তাই আত্ম যোজনা করলো একপ্রকার, কিন্তু সেই যোজনা প্রকৃত অর্থে আমাকে আমার প্রকৃতি স্বরূপে উন্নীত করার জন্যই অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
তাই আমি প্রথমে সমস্ত পূর্বসংস্কারের থেকে আত্মের ছলনাকে ধারণ করে, মূলাধার অতিক্রম করলাম। অতঃপরে অতিক্রম করলাম ভুত পিশাচদের অন্ধবিশ্বাসকে, যা সম্ভব হতো না যদি না আত্ম পূর্বসংস্কার রূপে যা স্থাপন করে রেখেছিল তাদের মধ্যে তা ধারণ না করতাম। ভুতপিশাচদের মুক্ত করে আমি অতিক্রম করলাম স্বাধিষ্ঠান। ভূতপিশাচ ও পূর্বসংস্কারের থেকে মুক্ত করতেই, যক্ষ যারা আমার অপেক্ষায় বসেছিল, তারা সম্মুখে এলো। মা ছাড়া আর অন্য কনো ব্যখ্যা নেই তাঁদের কাছে আমার। তাই আমি তাঁদের কাছে স্তনপ্রদায়িনী নগ্ন মাতা।
তাঁদের ধারণ করার সাথে সাথে মনিপুর দ্বার উন্মোচিত হলো, আর আমি আমার প্রকৃতি স্বরূপের পথে তৃতীয় ধাপ অতিক্রম করলাম। কিন্তু এরপরে ছিল তিনটি এমন ধাপ যেই ধাপ অতিক্রম করা তখনই সম্ভব যখন আত্মের ত্রিগুণ আমার প্রতি সন্তুষ্ট হবে। পুত্র, আত্মের রচয়িতা আমিই, আর তার রচনার কালে আমি তাকে তিন গুণ প্রদান করেছিলাম, যাদের দ্বারা সে ছায়ার তিন ভাবকে ধারণ করতে পারবে। আর তাই তাদেরকে আমি যদি তুষ্ট না করি, তাহলে আমি কখনোই আত্মের সম্মুখে উপস্থিত হতে পারবো না, আর তাঁর অসুরত্বের নাশ করতে পারবো না।
এটিই সত্য, আর এই সত্য শ্রেষ্ঠ থেকে শ্রেষ্ঠ সাধকদের কাছেও অজানা। তাই আমি এই তিনগুণকে তৃপ্ত করার জন্য বরদান প্রদান করলাম যে তারা স্বয়ং পরাপ্রকৃতিকে নিজেদের বশে রাখতে পারবে, যেই প্রয়াস তারা সর্বদাই করে এসেছে, আর যেই প্রয়াস করার জন্য অতীতে তারা ত্রিদেবের রূপ ধারণ করে অবস্থান করতো। আমার থেকে বরদান লাভ করে, তারা ভাবলো আমি তাদের বশে অবস্থান করলাম, আর তাই তারা তৃপ্ত হলো আর আমার সম্মুখে আমার সম্পূর্ণ প্রকৃতিতত্ত্ব, অর্থাৎ মহাশ্বেতা, শ্রী ও আদিশক্তি উন্মোচিত হলো।
এঁদেরকে লাভ করে আমি আমার প্রকৃতি স্বরূপকে সম্পূর্ণ ভাবে লাভ করে মহামাতৃকা হয়ে উঠলাম, আর এঁদেরকে লাভ করার কারণে আমার সম্মুখে আমার সন্তান আর আমার মধ্যে যেই সাত খিলেনের ব্যবধান, সেই সাত চক্রের ছয়টি অতিক্রম করে আমি পরাপ্রকৃতি রূপ ধারণ করলাম। আত্ম মনে করলো, সে আমাকে বশ করে ফেলেছে, কারণ তার তিনগুণ আমার পরাপ্রকৃতিকে বশ করে রাখার যোজনাতে সফল হয়েছে। কিন্তু সে জানে না যে আমি পরাচেতনা ও পরাপ্রকৃতিতেই সীমাবদ্ধ নই।
আমি স্বয়ং ব্রহ্ম, আমি পরব্রহ্মময়ী, আমি সকলের জননী ও জনক, সর্বাম্বা; আমি স্বয়ং সেই কাল-নিয়ন্তা নিয়তি, যাকে আত্ম সর্বদা ত্রিগুণ দ্বারা বশ করতে চেয়েছে, কিন্তু কখনোই তা করতে সক্ষম হয়নি। সে জানতো না, তাই সে আমার সন্তানদের সমস্ত ভাবদের উপর আঘাত করে, আর আমাকেও উন্নত করে দেয় সেই পরানিয়তি রূপ ধারণ করার জন্য। আমাকে তারা উত্তেজিত করে দেয় মহাকালী মহাগুহ্যা রূপ ধারণ করার জন্য।
সন্তান তারাও আমার, কারণ আমি সর্বাম্বা। তাই সরাসরি মহাগুহ্যা না হয়ে, সরাসরি পরমাশূন্য রূপ, পরব্রহ্মময়ী রূপ ধারণ না করে, মধ্যে শ্যামলী রূপ ধারণ করি। কিন্তু আত্ম সে, অহংকারের স্রোত সে, অহং ব্যতীত কিছুই জানে না সে। তাই আমি যে শ্যামলীরূপ ধারণ করে তাদেরকে সতর্ক করলাম, তা তারা অনুমানও করতে পারলো না। সরাসরি আমার সন্তানদের উপর প্রহার করার ভুল করে বসলো, আর আমি! আমি যে অস্ত্র ধারণই করি আমার সন্তানদের সুরক্ষা দেব বলে।
তাই আর কনো বিকল্প রইলনা। আমি পরমারূপ ধারণ করলাম; হয়ে গেলাম পরমশূন্যস্বরূপা মহাগুহ্যা। পূর্ণ রূপে শূন্য আমি, পূর্ণ রূপে নিরাকার আমি, পূর্ণ রূপে অসীমা, অব্যাক্তা পরামাতৃকা রূপ ধারণ করতে, তাদের আর কারুর অস্তিত্ব থাকতেই পারেনা। নিজের থেকে আত্মকে মুক্ত করে, আমি হয়েছিলাম সুশীলা প্রকৃতি। কিন্তু একবার যখন আমাই মহাকালী মহাগুহ্যা রূপে প্রত্যাবর্তন করলাম, আর কি করে আমি ছাড়া অন্য কিছুর অস্তিত্ব থাকতেও পারে!
তাই থাকলো না কারুর অস্তিত্ব। আত্মের সমস্ত পরিবারকেই কেবল নয়, সাখ্যাত আত্মকেও বিনষ্ট করে বিলীন করে দিলাম আমি। আর শুধু তাই নয়, আমি আমার পরিবার অর্থাৎ পঞ্চভাব, মহাভাব ওর চমস্ত ভূতদেরও ধারণ করলাম। করতে তো হতই, কারণ আমি যে মহাশূন্য আমার গুহ্যা রূপে। আমি যে পূর্ণ, আমি যে একমাত্র অস্তিত্ব। তাই সকলকে হনন করে একাকী অবস্থান করলাম। সমস্ত কিছুকে আমার মধ্যে লীন করে নিয়ে, একাকী অবস্থান করলাম ব্রহ্মময়ী সর্বাম্বা বেশে।
পুত্র, যা কিছু তুমি দেখলে ব্রহ্মসনাতনের অন্তরে স্থিত হয়ে, এই সমস্তই তাঁর অন্তরে আমাকে প্রকাশ করা, আর এখনে তুমি যে একাকী আমার সাথে অবস্থান করছো, আর কনো কিছুর অস্তিত্ব নেই, এই অবস্থাকে বলা হয় সমাধি। অর্থাৎ ব্রহ্মসনাতন এই মুহূর্তে পূর্ণসমাধিতে স্থিত। এরপরমুহূর্তে আমি তোমাকে আমার মধ্যে একমুহূর্তের জন্য লীন করে নেব, তোমাকে সম্পূর্ণতার স্বাদ প্রদানের জন্য, ব্রহ্মের সাখ্যাতকার করানোর জন্য। সেই সময়ে ব্রহ্মসনাতন অবস্থান করবে নির্বিকল্প সমাধিতে।
পুত্র, সেই অবস্থায় যখন কনো জীবকটি অবস্থান করে, তখন সে আর জীবনমৃত্যুর চক্রে প্রত্যাবর্তন করেনা। সে তাঁর জননীকে লাভ করে, তাঁর মধ্যে, আমার মধ্যে পূর্ণভাবে চিরকালের জন্য নিজের আত্মকে বিলীন করে, নিজের সর্বস্বকে বিলীন করে নিজেকেও বিলীন করে দেয়, আর সেই অবস্থাকে তোমরা বলো নির্বাণ। পুত্র, ব্রহ্মসনাতন আমার পূর্ণ ৯৬ কলার অবতার, আর তাই তোমাকে আমি আমার মধ্যে লীন থাকা অবস্থার থেকে মুক্ত করবো।
তোমাকে মুক্ত হয়ে আমার যা কিছু আমার যাত্রার থেকে দেখলে, জীবের পরমলক্ষ্যের ব্যাপারে, তা ব্রহ্মসনাতনের মানসকন্যা দিব্যশ্রীকে ব্যাখ্যা প্রদান করবে। তোমাকে আমি সেই কারণেই আমার থেকে মুক্ত করবো। তোমার সমস্ত আনুসঙ্গিক কর্ম, যা কিছু আমি তোমাকে দিয়ে করাবো, তা সমাপ্ত হলে, আমি তোমাকে পূর্ণভাবে আমার মধ্যে লীন করে নেব, আর ব্রহ্মসনাতনের অবতারলীলার সমাপ্তি ঘোষণা করবো। একে বলা হয় মহাসমাধি।
পুত্র, এমন ভুলেও ভেবো না যে, কেবলই ব্রহ্মসনাতনের ক্ষেত্রে আমি সর্বস্ব নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছি। (মৃদু হেসে) আত্ম তো কল্পনা ব্যতীত কিছুই করতে সক্ষম নয়। করি আমিই কেবল। একটি বৃক্ষের পাতার আন্দোলন থেকে আরম্ভ করে সমস্ত ক্ষুদ্র থেকে বৃহৎ কর্ম আমিই সম্পাদিত করি। কেন করি? যেই ভ্রমের মধ্যে আমার সমস্ত সন্তান, সমস্ত জীবের মানস পতিত, সেই ভ্রম থেকে মুক্ত করতেই আমি প্রকৃতি হয়ে সমস্ত জীবের মধ্যে অবস্থান করে, সমস্ত ক্রিয়া করি।
আত্ম চিন্তা করে, ইচ্ছা করে, কল্পনা করে, আর সমস্ত ধরাকে অধিকার করে, আমার সমস্ত সন্তানদের অর্থাৎ সমস্ত জীবের মনকে অধিকার করে অবস্থান করে। আমি চাইলে, এক নিমেষের মধ্যে সমস্ত আত্মের নাশ করতে পারি, যেমন ব্রহ্মসনাতনের মধ্যে করলাম, কিন্তু তেমন করলে আমার সন্তানরা, সমস্ত মনরা বারংবার ব্রহ্মাণ্ড হারাবে, আর ব্রহ্মাণ্ড গঠন করবে আত্মের প্রভাবে এসে।
অর্থাৎ আমার সন্তানদের আমি কখনোই ফিরে পাবো না। সেই কারণে, আমি আত্মের ততক্ষণ নাশ করিনা, যতক্ষণ না আমার সন্তান, অর্থাৎ কনো জীবের মন সম্পূর্ণ ভাবে নিজের সমস্ত রিপু, পাশ, আবেগ, ত্রিগুণ, ছায়াদের নাশ করার সংকল্প গ্রহণ করে, আর নিজের সমস্ত ভাব, সমস্ত ভূতদের আমার মধ্যে লীন করে দিতে উদ্যত হয়।
কারণ তখনই যে আমি আমার সন্তানকে সম্পূর্ণ ভাবে লাভ করবো, নিজের ক্রোড়ে তাঁকে তুলে নিয়ে, তাঁর মুখচুম্বন করে নিজের মধ্যে লীন করে নিয়ে, তাঁকে নির্বাণ প্রদান করবো। কিন্তু তা সম্ভব নয় যতক্ষণ আমার সন্তানরা মুক্ত হবার জন্য প্রস্তুত হয়। তাই আমি সুপ্ত হয়ে অবস্থান করতেই থাকি সকল জীবের মধ্যে, সকল ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে, আর সম্মুখে রেখে দিই তিন ভাবপিতাকে, অর্থাৎ মহাভাবদের।
যেই মানস ধরাকে গ্রহণ করে, তাঁকে বিবাহ করে, মেধার জন্ম দিতে পারে, সেই মানসের পুত্রী, মেধাই এই সুপ্ত মহাভাবদের প্রকাশ্যে আনতে সক্ষম হয়, আর আমাকে সুপ্ত অবস্থা থেকে প্রত্যক্ষ করে তুলতে সক্ষম হয়। পুত্র, যাতে প্রতিটি মানস সেই কর্মেই মনযোগী হয়, প্রতিটি ধরা সেই কর্মেই মনযোগী হয়, সেই উদ্দেশ্যেই আমি প্রকৃতি হয়ে, সকলকে মার্গদর্শন প্রদান করি।
আর আজ ব্রহ্মসনাতনের অন্তরে আমি সম্যক ভাবে প্রকাশিত হতে পেরে, তোমায় সম্পূর্ণ কথা বলে দিলাম। ব্রহ্মসনাতন সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে সেই বীজস্থাপন করেছে যাতে সকল ব্রহ্মাণ্ডের, সকল মনুষ্যের মধ্যে মানস ও ধরার স্বাভাবিক মিলন হয়, আর মেধার জন্ম সম্ভব হয়। তবুও পুত্র, আত্ম অতি ধূর্ত। সে এতেও চুপ করে বসে থাকবেনা। সে এই মিলনেও বাঁধা প্রদানের প্রয়াস করবে। মানসের রূপ ধারণ করে ধরাকে অর্থাৎ মানুষের দেহকে আত্মকেন্দ্রিক করে তুলতে সচেষ্ট হবে।
সেই কারণেই আমি তোমাকে এতগুলি কথা বললাম, যা তুমি ব্রহ্মসন্মাতনের মানসপুত্রীকে ব্যক্ত করলে, সে তাকে কৃতান্ত রূপে লিপিবদ্ধ করবে, আর আমি বিভিন্ন ব্রহ্মাণ্ডে স্থিত হয়ে, এই কৃতান্তকে আমার সমস্ত সন্তনের কাছে মার্গদর্শন রূপে স্থাপিত করে যাবো, যাতে তারা সকলে জানতে পারে যে কার পর কি হলে, আমার সাথে সাখ্যাত হয়। সম্পূর্ণ যাত্রার মানচিত্র দেওয়া রইল কৃতান্তের এই কাণ্ডে, যাতে প্রতিটি মানস ও ধরা নিজে নিজে উপলব্ধি করতে পারে যে, তারা আমার সাথে সঙ্গমের পথে হাঁটছে নাকি আত্মের পথে চালিত হচ্ছে। তবে যাত্রার এখানেই শেষ নয়। এই যাত্রার একটি আর দীর্ঘতম দিক আছে, যাও তুমি সিগ্রুই জানবে”।
মানস উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন, “মা, অবতার আমরা কাকে বলবো? ব্রহ্মসনাতনকে নাকি তোমাকে?”
মাতা সর্বাম্বা হেসে বললেন, “পুত্র, আত্মকে ত্যাগ করে অবতাররা, সম্পূর্ণ রূপে। যদি আত্মই অনুপস্থিত থাকে, তবে তারা নিজেকে অবতার বলবেন কি করে? তারা তো আমাকেই অবতার বলবেন। আমার পূর্বের অবতাররা গৌরিকে অবতার বলেছে, মার্কণ্ড নিজেকে অবতার বলেনি; বাল্মীকি সীতাকে অবতার বলেছে, নিজেকে নয়; ব্যাস দ্রৌপদীকে অবতার বলেছে নিজেকে নয়। …
পুত্র, আসল কথা এই যে, আমাকে লাভ করার পর, সমস্ত কিছুর উৎস আমার থেকেই, তা জানার পর, আমিই একমাত্র সত্য তা জানার পর, তাঁরা সকলেই নিজের নিজের গুণকীর্তন করতে লজ্জা পায়। তাই হয় আমাকে অবতার বলে, নয় আমার মহাভাবদের। কিন্তু পুত্র, জগত আমাকে অবতার মানে না, কারণ সত্য অর্থে আমি অবতার নইও।
অবতার তো সে, যে অবতরণ করে। আমি অবতরণ করিনা, কারণ এমন কনো স্থানই সম্ভব নয়, যেখানে আমি উপস্থিত নই। অবতার প্রকৃত অর্থে মার্কণ্ড, গৌতম সিদ্ধার্থ, মহম্মদ, ঈশা, বাল্মীকি, ব্যাস, শঙ্কর, চৈতন্য, রামকৃষ্ণ আর ব্রহ্মসনাতন। মার্কণ্ডের লিপিবদ্ধ দশমহাবিদ্যা এঁরা সকলে, যার অন্তিম অবস্থা, মহাশূন্য অবস্থা, পূর্ণ ব্রহ্ম অবস্থান অর্থাৎ মহাকালী অবস্থা হলো ব্রহ্মসনাতন স্বয়ং। আমি তাঁরই অন্তরে স্থিতা পরমসত্য, সর্বাম্বা।
পুত্র, আমি কেবল তাঁর অন্তরেই অবস্থান করিনা, আমি আমার সকল সন্তানের সাথে অবস্থান করি, আমার সকল সন্তানদের ব্রহ্মাণ্ডে, তাঁদের চেতনা হয়ে, তাঁদের প্রকৃতি হয়ে বিরাজ করি। … তাই পুত্র, অবতার তাঁরাই, আর আমি তাঁদের সকলের মা। মা হয়ে বিরাজ করাতেই আমার আনন্দ। মা হবার জন্যই তো সমস্ত কিছুর সূচনা করেছিলাম আমি”।
মানস প্রশ্ন করলেন, “মা, তুমি বললে, সর্বক্ষণ তুমি তোমার সমস্ত সন্তানকে আত্মের বশবর্তী না হয়ে থেকে আমার অর্থাৎ মানসের বশবর্তী করতে সচেষ্ট থাকো প্রকৃতি ও চেতনা বেশে। মা, কৃপা করে তোমার সমস্ত সন্তানদের এই কথা বলে দাও যে, তারা কার বশবর্তী হয়ে আছে, তা কি করে অনুভব করবেন। এই কথা বলার কারণ এই মা যে, অধিকাংশ তোমার সন্তানরা জানেনও না যে তারা কার বশবর্তী হয়ে আছে”।
সর্ব্বাম্বা হাস্যমুখে বললেন, “সঠিক কথা বলেছ পুত্র, অধিকাংশ আমার সন্তানরা জানেও না যে, তারা কার বশবর্তী হয়ে রয়েছে, আত্মের না মানসের। তাই পুত্র তাদেরও তা জেনে রাখা আবশ্যক। যতক্ষণ তাঁরা কনো কিছুকে আত্মের অর্থাৎ নিজের সুবিধা অনুসারে দেখার বা দেখাবোর প্রয়াস করে চলেছে, তারা আত্মের অধীনে স্থিত এবং তারা সম্পূর্ণ ভাবে আসুরিক, এবং আমি তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়েও, বিচ্ছিন্ন থাকি। অর্থাৎ আমার উপস্থিতির ভানও তারা করতে পারেনা।
তারা কনো কিছুকেই নিরপেক্ষ দৃষ্টিদ্বারা দেখতে সক্ষম নন, অর্থাৎ যা যেমন, তাকে সেই ভাবে দেখতে সক্ষম নয়। সর্বক্ষণ তারা সমস্ত কিছুর উপর দৃষ্টি এইভাবে রাখে যে তা তাঁর আত্মকে কি ভাবে প্রভাবিত করছে। অর্থাৎ যদি কনো কিছু তাঁর আত্মকে আঘাত করে, তাঁর আত্মের সুখকে আঘাত করে, তাঁর সম্মান, তাঁর শ্রেষ্ঠত্বকে আঘাত করে, তাহলে তা ভয়ঙ্কর, তা অতিকায়, তা অসুর, তার সাথে নিযুক্ত থাকা পাপ হয়ে যায়।
কিন্তু যে মানসের প্রতি আশ্রিত, সে এই ভৌতিক জগতেও নিরপেক্ষ থাকতে সক্ষম। তাঁর কাছে আমার জাতি, আমার জীবন, আমার সম্প্রদায় বা আমার যোনি বলে আলাদা করে কিছু থাকেনা। পুত্র, এই ধারার সন্তান আমার অতিশয় কম। আজ থেকে প্রায় ৫ শত শাল পূর্বে, দার্শনিক রূপ গোষ্ঠী এমন হতো, আর আজ থেকে প্রায় ২ শত বৎসর পূর্বে, যখন বিজ্ঞানের সদ্যসদ্য জাগরণ হচ্ছিল, তখন বিজ্ঞানীরা এমন ছিলেন। বঙ্গদেশে, প্রায় এক শত বৎসরের ঊর্ধ্বের সময়কাল ব্যাপী সাহিত্যিকগণ এই ধারার ছিলেন, কিন্তু বর্তমানে, তা প্রায় অবলুপ্ত, আর এর অবলুপ্তিই মনুষ্য জাতিকে নিশ্চিহ্ন হবার দিকে সুতীব্র বেগে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে”।
মানস বললেন, “মানে মা, যদি জ্ঞানী না হতে পারে, তবে মনুষ্যকে নিশ্চিহ্ন হতে হবে!”
সর্বম্বা বিকৃত ওষ্ঠে বললেন, “জ্ঞানী? পুত্র, এই বাহ্য ভৌতিক জগত একটি ভ্রম ব্যতীত কিছুই নয়। ভৌতিক জগতকেই যে সর্বস্ব কিছু জ্ঞান করে থাকে, তারা কখনোই জ্ঞানী হতে পারেনা, কারণ তারা ভ্রমের মধ্যেই নিবাস করে। পুত্র, যেখানে জ্ঞান অবস্থান করে, সেখানে ধারণার কনো স্থান থাকেনা। ধারণা বলে কনো শব্দের উচ্চারণও হতে পারেনা। যেমন ঈশ্বরবাদ, বা আধ্যাত্ম অর্থাৎ আত্মের প্রকৃত সত্য অধ্যায়নের ক্ষেত্রে কনো ধারণার স্থান নেই।
আমার ধারণা এইরূপ, আমার ধারণা সেই রূপ, আধ্যাত্মের জগতে, সত্যের জগতে, তা এক হাস্যকর শব্দচয়ন মাত্র। সেখানে হয় জ্ঞান নয় অজ্ঞান বিরাজ করে। হয় আমি জানি আত্মকে নয় আমি জানিনা। হয় আমি জানি চেতনাকে, নয় আমি জানিনা। হয় আমি জানি প্রকৃতিকে, নিয়তিকে, নয় আমি জানিনা। ধারণার কনো স্থান নেই সেখানে। আর যেখানে ধারণার স্থান থাকে, সেখানে জ্ঞানের অস্তিত্ব থাকে না। কেবলমাত্র অজ্ঞানতাই বিরাজ করে সেখানে, কেবলমাত্র অসত্যই বিরাজ করে সেখানে, যেমন এই ভৌতিক জগত।
এই ভৌতিক জগতে তাই কনো জ্ঞান অবস্থান করেনা। যদি এই ভৌতিক জগতে স্থিত হয়ে সত্য জ্ঞানের দিশায় উন্নীত হতে হয়, তবে নিরপেক্ষ ধারণার প্রয়োজন। একমাত্র নিরপেক্ষ ধারণা রাখলে, তবেই সত্যের দ্বার তাঁর জন্য উন্মোচিত হয়, নয়তো সেই দ্বার তাঁর জন্য চিরকাল বন্ধই থাকে। পুত্র, এই ভৌতিক জগতের কনোপ্রকার সত্যতা নেই। এখানে কারুর নজরে যা ন্যায়, তা অন্যের নজরে অন্যায়। কারুর ধারণা অনুসারে যা পাপ, তা অন্যের ধারণা অনুসারে পুণ্য। কারুর ধারণা অনুসারে যা ধর্ম, অন্যের ধারণা অনুসারে তা অধর্ম।
আর এতে কনো ত্রুটি নেই, কারণ এই ভৌতিক জগত একটি মায়া মাত্র, আত্মের বিস্তৃত এক মায়া। সম্পূর্ণ ভাবে তা অনিত্য, সম্পূর্ণ ভাবে তা অসত্য, এই ভৌতিক জগতে কিচ্ছু বলতে কিচ্ছু সত্য নয়। অথচ সমস্ত কিছুর মধ্যেও আমার সন্তানরা অবস্থান করে, আর তারা সত্য। আর তাই এই ভৌতিক জগতের বিচারে কনো প্রকার জ্ঞান নেই, এখানে জ্ঞানের কনো অস্তিত্বও নেই। এই ভৌতিক জগতে যিনি অক্ষরজ্ঞানও রাখেন না, তিনিও অজ্ঞানী, আর যিনি এই ভৌতিক জগতকে জেনে ফেলেছেন বা জানতে থাকেন বলে নিজেকে বিজ্ঞানী বলে দাবি করেন, তিনিও অজ্ঞানীই।
কি বিজ্ঞানী, কি দার্শনিক, কি সাহিত্যিক, কি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, কি পশুবিদ, কি চিকিৎসক, কি যান্ত্রিক, কি অযান্ত্রিক, কি পণ্ডিত, কি ছাত্র, কি শিক্ষক, সকলেই এখানে অজ্ঞানী, আর সকলেই এই ভৌতিক জগত, এই ভৌতিক জীবন সম্বন্ধে কিছু না কিছু ধারণা রাখছেন। পুত্র, স্পষ্ট কথা এই যে, যেখানে জ্ঞান বিরাজ করে, সেখানে ধারণা বিরাজ করেনা। তাই যতক্ষণ কারুকে এমন বলতে শুনবে, আমার ধারণা এই যে বা আমার মনে হয়, বা আমার মন বলছে, বা আমার মত এই যে, সেখানেই জানবে জ্ঞানের কনো অস্তিত্বও নেই।
জ্ঞান মানে স্পষ্টতা, স্পষ্টতা মানে প্রত্যক্ষকরন। যিনি প্রত্যক্ষ করেছেন, তাঁর কাছেই সমস্ত কিছু স্পষ্ট, বাকি সকলের কাছেই সমস্ত কিছু ছায়া ছায়া। যিনি সাগরের লহর দেখেছেন, তাঁর কাছেই সাগরের লহর স্পষ্ট, বাকি সকলের কাছে, সাগরের লহর একটি ছায়ারূপে ধারণা মাত্র। কিন্তু পুত্র, এই ভৌতিক জগতে সত্য বলে কিচ্ছু নেই, আর যা আছে তা হলো আমার সন্তানরা, আর তারা অতি সুপ্ত। তাই এখানে ধারণা বিরাজ করে, জ্ঞান নয়। যে বা যারা ভৌতিক জগত নিয়ে চর্চায় মেতে থাকে, তারা সকলেই অজ্ঞানী।
একমাত্র সেই মনুষ্যই জ্ঞানের দিকে অগ্রসর হন এই ভৌতিক জগতে স্থিত হয়ে, যিনি এই ভৌতিক জগতকে নিরপেক্ষ দৃষ্টি দ্বারা নিরীক্ষণ করেন। না, এমন ভেবো না যে, যিনি ভৌতিক জগতকে নিরপেক্ষ দৃষ্টি দ্বারা নিরীক্ষণ করছেন, তিনি জ্ঞানী। ভৌতিক জগত নিয়ে যে যাই ধারণা রাখুক না কেন, কনো ধারণা রাখা ব্যক্তিত্ব কখনো জ্ঞানী হতে পারেনা। জ্ঞানী একমাত্র সে, যে সত্যকে প্রত্যক্ষ করেছে। যে আমাকে প্রত্যক্ষ করেছে, সে সর্বজ্ঞানী, যে আমার আংশিক রূপপ্রকাশকে প্রত্যক্ষ করেছে, সে জ্ঞানার্জনের পথে যাত্রা রত।
মনুষ্য যোনি সেই সত্যের জগতে পারি দেবার সামর্থ্য তো রাখে, কিন্তু সেই জগতে পারি দেবার জন্য, তাকে নিরপেক্ষ হতে হয়। এই ভৌতিক জগতকে ধারণা করার কালে যদি সে নিরপেক্ষ না হতে পারে, তাহলে সে সত্য জগতে কখনোই উপস্থিত হতে পারেনা। আর যদি মনুষ্য নিরপেক্ষতা ধারণ করতে নাই পারে, তাহলে এই যোনির অস্তিত্ব এক মহাঅভিশাপ ব্যতীত কিছুই নয়।
তাই পুত্র, যদি মনুষ্য পুনরায় নিরপেক্ষ হবার সাধনা শীঘ্রই শুরু না করে, তবে এই যোনির নাশ হওয়া আর কিছু শতকের অবধি। পুত্র, মার্গ বহু হতে পারে এই যোনির নিশ্চিহ্নতার। তা প্রলয় হতে পারে, আবার খরা হতে পারে, কিন্তু কারণ তাদের নিরপেক্ষতা না ধারণ করাই হবে। পুত্র, আত্মই কনো যোনিকে ভূমিষ্ঠ করে আর লুপ্ত করে, কিন্তু সে স্বয়ং কিই বা করতে সক্ষম! কিচ্ছু না। প্রকৃতি আমি, আর তাই আমিই সিদ্ধান্ত নেব, কোন যোনি থাকবে, আর কোন যোনি নিশ্চিহ্ন হবে।
তাই পুত্র, আর কিছু শতকের অবধি রয়েছে মনুষ্য যোনির হাতে। যদি তারা নিরপেক্ষ হতে না পারে, তাহলে আত্মের কনো সামর্থ্য নেই মনুষ্য যোনিকে এই বাহ্যব্রহ্মাণ্ডে অস্তিত্বে রাখার, কারণ আমি তাকে বাধ্য করবো এই যোনিকে বিনষ্ট করে দেবার জন্য। কেন করবো? কারণ মনুষ্য যোনি যদি নিরপেক্ষ হতেই না পারে, তাহলে এই যোনি আমার সমস্ত সন্তানের ভক্ষক ছাড়া অন্য কিছুই নয়, আর আমি আমার সন্তানের শত্রুকে অস্তিত্বের থাকতে দেব না”।
মানস চিন্তিত হয়ে বললেন, “মা, মনুষ্য জাতিকে প্রেম প্রদানের জন্যই তো তুমি যুগে যুগে অবতার বেশে আসো, আর তুমি সেই যোনির নাশের কথা বলছো?”
মাতা সর্বাম্বা হুংকার দিয়ে বললেন, “কে বলেছে তোমাকে এমন অসত্য বচন যে আমি মনুষ্য যোনিকে প্রেম প্রদান করার জন্য অবতার গ্রহণ করি? … আমি কেবল মাত্র আমার সমস্ত সন্তানদের প্রেম করি। আমার সন্তান প্রতিটি জীবের মধ্যে থাকা, সমস্ত অণুতে বিরাজ করা আমার মানসরা, আমার ধরারা, অর্থাৎ আমি আমার সমস্ত সন্তানরূপ দেহীদের সেবা করি, তাদের মোহনাশ করি, আর তাদের অন্তরে বিরাজ করা আমার সন্তান, আমার মানসদের আমার বক্ষে ধারণ করতে অবতার গ্রহণ করি।
পুত্র, তুমি তো স্বয়ং ব্রহ্মসনাতনের মানস, তা তাকেই একবার প্রশ্ন করে দেখো না! সে তো পূর্ণ অবতার, সে তো সাখ্যাত মহাশূন্য, মহাকালী। একবার তাকে প্রশ্ন করে দেখো। জানো সে কি উত্তর দেবে তোমায়? সে রুদ্র রূপ ধারণ করে বলবে, এই মনুষ্যযোনিতে অবস্থান করা সমস্ত মাতার সন্তানদের, সমস্ত মানসদের মার্গভ্রষ্টতার কারণে তাকে তার মাতা, অর্থাৎ আমার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অবতার গ্রহণ করতে হয়েছে। বার বার করতে হয়েছে, আর বার বার করতে হচ্ছে।
তুমি তো তাঁরই মানস, তুমি তো ভালো করেই জানো, তাঁর গতিবিধি। জানো না! … কি দেখেছ তাঁকে? কনোদিনও জ্ঞান অর্জনের জন্য তাঁকে দৌড়াতে দেখেছ? কনোদিনও নিজেকে ভক্ত উপাধি প্রদান করার জন্য তাঁকে দৌড়াতে দেখেছ? কনোদিনও তাঁকে প্রেমী হয়ে ওঠার জন্য, প্রেমী উপাধি লাভের জন্য কিচ্ছু বলতে কিচ্ছু করতে দেখেছ?
না পুত্র, সে কনোদিনও কনো কিচ্ছু করেনি, কনো কিচ্ছু করার প্রয়াসও করেনি। কেবল ও কেবলমাত্র আমাকেই সে চেয়ে এসেছে। আমি তাঁর মা, আমি তাঁর একমাত্র অস্তিত্বের কারণ, আমি তাঁর সর্বস্ব। মনুষ্যের আধারে বিরাজ করা সমস্ত মার্গভ্রষ্ট মানস, অর্থাৎ আমার সন্তানদের মার্গ প্রদান করার জন্য, সে আমার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছিল, আর যবে থেকে সে আমার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছিল, তবে থেকে সে কেবল ও কেবল আমারই সন্ধান করে এসছে।
পুত্র, যতটা ব্যাকুল সে ছিল আমার সাথে পুনরায় মিলিত হতে, ততটাই ব্যকুল আমিও ছিলাম পুনরায় তার সাথে মিলিত হতে, আর ততটাই ব্যকুল আমি আমার সমস্ত সন্তানের সাথে মিলনের জন্য সর্বদা থাকি। আর তাই আমার কাছে যেই যেই সন্তান সমস্ত উপাধি ত্যাগ করে, সমস্ত কিছু ত্যাগ করে, কেবল মাত্র আমিই তাঁর ধ্যানজ্ঞান হয়ে আমার দিকে দৌড়ে আসে, আমি ঠিক সেই ভাবেই তাঁর সম্মুখে জ্ঞান, ভক্তি, প্রেম আর এঁদের উৎস ভাবদের, এদের উৎস বিচার, বিবেক ও বৈরাগ্য প্রদান করে থাকি।
তাই তুমি ব্রহ্মসনাতনকে কখনো প্রশ্ন করে দেখো। কখনো তাকে জ্ঞানী, তাকে প্রেমী, তাকে ভক্ত বলার প্রয়াসও করো। সে মহাকালী। তাই তাঁর মধ্যে কনো রংঢং কিচ্ছু নেই। সরাসরি রুদ্রবেশ ধারণ করে সে তোমাকে কি বলবে জানো? সে বলবে, আমি না তো প্রেমের মাথামুণ্ডু কিছু বুঝি, আর না জ্ঞানের, আর না ভক্তির। আমি একটিই কথা জানি যে তোমাদের মার্গদর্শনের জন্য আমাকে আমার মায়ের থেকে আর আমার মা’কে আমার থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হয়েছিল, আর আমি পুনরায় আমার মাকে ফিরে পেতে পাগলের মত হন্যে হয়ে ছুটেছি।
সে রুদ্র হয়ে বলবে, আর কতদিন মার্গভ্রষ্ট হয়ে বিরাজ করবে? আত্মের থেকে মনুষ্যযোনি এনে দিয়েছে তোমাদের জন্য মা। তারপরেও সর্বক্ষণ আমি, আমি করে করে, আর কতকাল মায়ের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকবে? আর কতবার আমাকে মায়ের থেকে, আর মাকে আমার থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হবে, তোমাদের মার্গ প্রদান করার জন্য? তোমাদের মায়ের ক্রোড়ে ফিরিয়ে দিতে?
অর্থাৎ পুত্র, মনুষ্যকে প্রেম দিতেও আমি অবতার নিই না, আর তোমাদের প্রেম দেবার জন্যও আমাকে অবতার নিতে হয়না, কারণ প্রকৃতি বেশে আমি সমানেই তোমাদের প্রেম প্রদান করতে থাকি। মার্গদর্শন প্রদানের জন্য আমাকে তোমাদের কাছে অবতার হয়ে আসতে হয়, আর তাই আমার কনো সন্তানকে আমার থেকে বিচ্ছিন্ন করে মহাবেদনা সহ্য করতে হয়, তাকে ও আমাকে।
আমার প্রতিটি অবতার এই বেদনাই সহ্য করে, আর আমিও সেই একই বেদনা সহ্য করি আমার সন্তানকে আমার থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় দেখে। আমি তো তাও আমার সন্তানকে দেখতে পাই, প্রকৃতি বেশে তার সেবা করতে পারি। কিন্তু সে মা হারা হয়ে প্রগলের ন্যায় সর্বদিকে ছুটে ছুটে যায়। তারা কনো উপাধির ধাত ধারে না। না জ্ঞানী হতে চায়, না ভক্ত আর না প্রেমী। আমাকে লাভ করা, আমাকে ফিরে পাওয়াই তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য হয়।
হ্যাঁ অন্য অবতাররা তাও সামান্য উপাধি স্বীকার করে নেয়, আমার সকল সন্তানের স্বার্থে, কিন্তু ব্রহ্মসনাতন! সে তো রুদ্র মহাকালী। সে তো আমার সন্তান ছাড়া অন্য কনো উপাধিতেও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তার অন্য কনো উপাধিও পছন্দ নয়, কেবল আমার সন্তান এই উপাধি ছাড়া। উন্মত্তের মত সর্বদিকে ছুটে ছুটে সে তার মায়ের সন্ধান করেছে। আত্মের দূতরা তাঁকে ভয় দেখানোর প্রয়াস করেছে যে, ত্রিগুণের আমি নাকি পত্নী, তারা নাকি রুষ্ট হবেন, তার এমন উন্মত্ততা দেখে।
সে উগ্রস্বরে বলেছে, তিনি আমার মা, আর আমি তাঁর সন্তান। এই দুইয়ের মাঝে যে আসার প্রয়াস করবে, হয় তাকে নাশ হতে হবে, নয় সে স্বয়ং নাশ হয়ে যাবে। যেমন বলেছে, তেমন করেওছে সে। ত্রিগুণ কেবল নয়, স্বয়ং আত্মকেও বিনষ্ট করে দিয়েছে রুদ্র মহাকালী গুহ্যা বেশে, আর আমার সাথে সে আজ মিলিত। আমিও তাঁর জন্য হাপিত্যেশ করে বসেছিলাম, সেই দেখা মাত্র, সে নিজেকে আমার কাছে সম্পূর্ণ রূপে নিবেদন করে দিয়েছে, আর আমি আমার সমস্ত সন্তানদের জন্য একই ভাবে হাপিত্যেশ করে বসে থাকি, সেই দেখে সে নিজেকে আমার সমস্ত সন্তানদের জন্য উৎসর্গ করে দিয়েছে।
পুত্র, একবার তাঁকে প্রশ্ন করে দেখতে পারো। তুমি তাঁরই মানস। হ্যাঁ সে রুদ্র, তাই যখন প্রশ্ন করবে, তখন শব্দচয়নে সাবধান থাকবে, ঘনাক্ষরেও তাঁকে তার মায়ের থেকে বিচ্ছিন্ন হবার ভান প্রদান করবে না, তাহলে আমিও তোমাকে রক্ষা করতে পারবো না। শব্দচয়নে সাবধানী হয়ে, তাকে প্রশ্ন করে দেখো, সে তাই তাই বলবে, যা আমি এক্ষণে বললাম। রুদ্র ও অশ্রুসিক্ত হয়ে সে বলবে, কি লাভ মনুষ্য যোনির, যদি এই যোনি লাভ করে, সকল মানস নিরপেক্ষতা ধারণ না করে, নিজের জননীর কাছে প্রত্যাবর্তনই না করতে পারে!
সে রুদ্র ও অশ্রুতে কাতর হয়ে হুংকার দিয়ে বলে উঠবে, আর কতকাল সকল মানস এমন ভাবে মার্গভ্রষ্ট হয়ে ঘুরে বেড়াবে, আর আত্ম আত্ম করে আত্মের পূজা করে বেড়াবে বলতে পারো! আর কতকাল তাঁদেরকে মার্গপ্রদানের জন্য মা’কে সন্তানের থেকে বিচ্ছিন্নতা সহ্য করতে হবে, বলতে পারো! আর কতকাল এই অবতার বেশে তোমাদের মার্গদর্শনের জন্য এসে এসে, মায়ের থেকে বিচ্ছিন্নতার বেদনা সহ্য করতে হবে, বলতে পারো!
তাঁর থেকেই জেনে নিতে পারো, মনুষ্যযোনি সম্বন্ধে সে কি ভাবে। উত্তরে সে এই একটি কথাই বলবে, “মনুষ্য হোক বা অন্য কনো যোনি, তাদের নিয়ে কি করবে, তা আত্মের চিন্তা, আমার মায়ের চিন্তা নয়। আমার মায়ের চিন্তা তাঁর সন্তানদের নিয়ে, সকল জীবের অন্তরে বিরাজ করা আত্মের মায়ায় বদ্ধ মানসদের নিয়ে। সেই মানসকে বক্ষে ফিরে পেতেই তাঁর সমস্ত প্রকৃতিরূপ ধারণ, সমস্ত ধরার সেবা করা। জ্ঞান, ভক্তি, প্রেমের প্রসার করা। বিচার, বিবেক ও বৈরাগ্যের বিস্তার করা।
সে বলবে, মানুষ কেন, মানুষের ন্যায় সহস্র শ্রেষ্ঠ যোনিও যদি আমার মা’কে তাঁর সন্তান ফিরিয়ে দিতে না পারে, তবে আত্মকে সেই যোনির নাশ করতে হবে। পরমাত্মের এক বার নয়, প্রতিবার মুণ্ডচ্ছেদ করতে থাকবো আমি, বারবার অবতার ধারণ করে, যতক্ষণ না সে সেই যোনির নাশ করবে, যেই যোনিতে স্থিত হয়ে, মানসসমূহ তাঁদের মা’র কাছে প্রত্যাবর্তন না করবে। মহাকালী সে, তাই তার মান সম্মান, ইত্যাদি কনো কিচ্ছুর বোধ নেই। তাই সে স্পষ্ট ভাবে উচ্চকণ্ঠে স্পষ্ট কথা বলে দেবে। তাকেই একবার প্রশ্ন করে নিতে পারো তো পুত্র!”
মানস মাথা নত করে বললেন, “মা, তাঁকে যেই গুহ্যারূপে আমি দেখেছি, তারপর আমার তো তাঁর সম্মুখে স্থিত হতেও ভয় লাগে। তাঁর সেই রূপ দেখে, তাঁর উগ্রতা দেখে তো স্বয়ং আত্ম ও ত্রিগুণও নিজবস্ত্রে পস্রাব করে ফেলেছিল, তা আমি তাঁর সম্মুখে কোন ছাড়! … তাঁর বীভৎসতা দর্শন করে স্বয়ং ছায়ারাও মূর্ছা গেছিল, তো আমি তাঁর সম্মুখে কি ভাবে দণ্ডায়মানও থাকবো। জানি তিনি জননী, তিনি করুণাময়ী। জানি তিনি যতই উগ্র হন, তাঁর হৃদয়ে কেবলও কেবল বাৎসল্য বিরাজ করে।
জানি তাঁর সমস্ত বীভৎসতা তাঁর মাতাকে তাঁর থেকে বিচ্ছিন্ন করার প্রয়াসের উত্তর, তাঁর মাতার সমস্ত সন্তানকে তাঁর থেকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্রের উত্তর। তাও মা, তাঁর সম্মুখে উপস্থিত হতেও ভয় করে। মা, আগে আমি তোমার উপাসনা করে, তোমাকে সর্বজনে স্থাপিত করে দিই, তাহলে হয়তো তিনি আমার প্রতি ক্রুদ্ধ না হয়ে স্নেহের সাথে সংলাপে নিযুক্ত হবেন”।
মাতা সর্বাম্বা মানসকে ভূমিতে স্থাপন করে সিংহাসন ত্যাগ করে উঠে দাঁড়িয়ে অট্টহাস্যে হাস্যমান হতে থাকলেন। সেই হাসি অতি বীভৎস অথচ অতি মধুর। অতি ভয়ঙ্কর কিন্তু অতি নির্মল। দীর্ঘক্ষণ এমন হাসার পর, গম্ভীর অতিগম্ভীর স্বরে বললেন, “মানস, আমি উপাসনার পাত্র নই, আমি বরদান প্রদানের বস্তু নই। আমি সাধনার পাত্র, আমি প্রাপ্ত করার পাত্র। আমি স্বয়ং শ্রেষ্ঠ বর। আমাকে লাভ করা মাত্রই জীব জীবনমৃত্যুর চক্র থেকে পূর্ণ ভাবে মুক্ত হয়ে যায়, নির্বাণ লাভ করে, যাকে তোমরা বলো মোক্ষলাভ করে।
আমাকে লাভ করলেই মোক্ষ, আর যৎসামান্য আত্মবোধ থাকলেও, আমাকে প্রত্যক্ষ করা যায়না, আমাকে লাভ করা যায়না। যৎসামান্য ইচ্ছা, চিন্তা বা কল্পনা অবশিষ্ট থাকলেও আমাকে লাভ করা যায়না। তাই আমার উপাসনার প্রয়াসও করো না। তাতে কেবল আমার সন্তানরা বিভ্রান্তই হবে, মার্গ লাভ করবে না। আমার সাধনার মার্গ বিস্তার করো। এটিই আমার সাধনা হবে। যে বা যারা, যেই যেই সন্তান আমার, কৃতান্ত ধারণ করে কৃতান্তিক হয়ে উঠতে পারবে, সে স্বতঃই সমস্ত আত্মের ত্যাগ করে, সমস্ত ছায়ার ত্যাগ করে, আমার দর্শন লাভ করে, সমাধিস্থ হয়ে মোক্ষ লাভ করবে অর্থাৎ আমার মধ্যে লীন হয়ে, নিজের মায়ের কাছে প্রত্যাবর্তন করবে। যদি এমন কৃত্য করতে পারো, তাহলে ব্রহ্মসনাতন তোমাকে সন্তানজ্ঞানে নিজের মধ্যে লীন করে তোমাকেও নির্বাণ প্রদান করবেন, নচেৎ নয়।
আমাকে লাভ করতে গেলে সাধনা করতে হয় পুত্র, আমার আরাধনা করা অহেতুক। আমাকে ঘিরে আমার সন্তানরা উৎসব করবে, আমার সন্তানরা আমার সম্মুখে এসে নিজেদের হরষ প্রকাশ করবে, আমাকে নিজেদের মধ্যে লাভ করে প্রফুল্লতা ব্যক্ত করবে, তাতেই আমি আনন্দিত হই। মা আমি, সন্তানের আনন্দতেই আমি আনন্দিত। আমার সন্তানদের তাই উৎসব প্রদান করো, সমস্ত ভেদভাব থেকে মুক্ত হয়ে, তাঁরা তাঁদের মাতার সুবিশাল মূর্তি নির্মাণ করে, তাঁকে নিজেদের স্কন্ধে স্থাপন করে উল্লসিত হয়ে, আমার উপস্থিতির জন্য হরষিত হতে থাকবে সন্তানরা। এতে আমার সন্তানও আনন্দিত হবে, আর আমিও।
আমার থেকে কনো কিছু কামনা করা, মুর্খামিই নয়, মহামুর্খামি। আমার যেই সন্তানের জন্য যা আবশ্যক, তা আমার কাছে সন্তানকে চাইতে হয়না। আমি মা, আর আমি আমার সন্তানের খেয়াল রাখতে জানি। তারপরেও যা কিছু চায় তারা, তা কেবলই এই প্রমাণ করা যে তারা আমাকে মা মনেই করেনা, তারা আমাকে তাঁদের আত্মের দাস মনে করে, আর তাই আত্মের চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনা আমার উপর আরোপ করে। হ্যাঁ আমার কাছে যে যা চায়, আমি তা পুড়ন অবশ্যই করি, কিন্তু স্মরণ রেখো পুত্র, যখনই আমি কারুর কনো ভৌতিক ইচ্ছা পুড়ন করি, তৎক্ষণাৎ আমি তাকে ত্যাগও দিই।
আর সে কনো কিছু করেই তাঁর মায়ের সান্নিধ্য বা তাঁর মায়ের উপস্থিতিকে ধারণ করতে পারেনা। আর তাই সে সমস্ত জীবন আমার কল্পনা করে আমার উপাসনা করতে থাকে মহামূর্খের মত। বিশ্ব তাঁদেরকে ভক্ত বলতে পারে, আমি বা আমার সন্তানরা তাদেরকে অভক্তও বলিনা, পামর ভণ্ড বলে থাকি। হ্যাঁ আমি তাদের ইচ্ছাকে এমন চরমে উন্নীত করে দিই যে, তাদের ইচ্ছাই একদিন তাদেরকে সম্পূর্ণ ভাবে নষ্টচরিত্রের করে দেয়।
এটিই সত্য পুত্র, যেই সন্তান আমার স্ত্রীবেশে অবস্থান করে আমার কাছে সমানে কিছু না কিছু চাইতে থাকে, আমি তাঁর সমস্ত ইচ্ছা তো পুড়ন করি, আর তা পুড়ন ততক্ষণ করতে থাকি যতক্ষণ না সে তাঁর সমস্ত মানইজ্জত হারিয়ে, হয় শ্লীলতা হারায় নয় ব্যাস্যা হয়ে বিরাজ করে। আর একই ভাবে যখন কনো পুরুষ দেহধারি আমার সন্তান এমন করে, তাকেও দুশ্চরিত্র কামদাস করে তুলি, তার ইচ্ছা পুড়ন করে করে। আত্মের অনুচর, ব্রাহ্মণগোষ্ঠী এঁদেরকে এই ইচ্ছার দাস করে তুলেছে, আর সেই কারণেই আজকে যেখানে যেখানে ব্রাহ্মন্যবাদ উপস্থিত, তা ধর্মের নাম করেই হোক, বা বিজ্ঞানের নাম করেই হোক, সেখানে সেখানে দেখবে, নষ্ট চরিত্রের পুরুষ ও স্ত্রী পরিপূর্ণ।
তাই যদি ব্রহ্মসনাতনের প্রেম আশা করে থাকো, তাহলে প্রথম ব্রাহ্মন্যবাদের নাশ করো। সমস্ত বেশে ছড়িয়ে থাকা আত্মের চর এই ব্রাহ্মন্যবাদীরা। কনো দেশে তারা ধর্মের নামে ভণ্ডামি করে করে মিথ্যাচার করে সমস্ত মনুষ্যকে লুণ্ঠন করে এবং তাঁদেরকে আত্মের দাশ করে রেখে দেয়, আবার কনো কনো দেশে, মহাকাশবিজ্ঞানের নাম করে করে মনুষ্যকে সর্বহারা করে এবং অন্ধবিশ্বাসের বিস্তার করে করে তাদেরকে আত্মের দাস করে রেখে দেয়।
যদি এই ব্রাহ্মন্যবাদকে বিনষ্ট করতে পারো, তবে অবশ্যই ব্রহ্মসনাতনের প্রিয়পাত্র হবে তুমি। এরপরেও যদি কিছু করতে চাও, তাহলে আমার থেকে নিজেদের আত্মের ইচ্ছা, নিজের সুখশান্তির ইচ্ছা পূর্তি করার মনোভাবের নাশ করো। যদি তা করতে সক্ষম হও, তাহলেই একমাত্র মনুষ্য সমাজথেকে বেশ্যাবৃত্তি ও দুরাচরিত্র কামনার নাশ হবে, স্ত্রীপুরুষ একে অপরকে সম্মান করবে। যদি না করো এমন, তাহলে সম্পূর্ণ মানবসমাজকে আমি কামনার দাস করে, পরমাত্মকে বাধ্য করবো এই যোনির সমূল বিনাশ করার জন্য। সেই বীজ ব্রহ্মসনাতন ইতিমধ্যেই সমাজে স্থাপন করে দিয়েছে।
আগামী ৫ শত বছরের মধ্যে যদি আমার কাছে যারা এসে নিজেদের ইচ্ছা ব্যক্ত করে বরদান কামনা করে, তাদেরকে ভক্ত বলা বন্ধ করে, তাদেরকে অসুর বলে সমাজ চিহ্নিত করে সমাজ থেকে বিতাড়িত না করে, তাহলে ব্রহ্মসনাতন যেই বীজ বপন করে গেছে, তাতে পরমাত্মের কাছে মনুষ্যযোনিকে নিষ্ঠুর ভাবে বিনাশ করে দেওয়া ছাড়া আর কনো পথই খলা থাকবেনা।
তাই পুত্র, যদি ব্রহ্মসনাতনের প্রিয়পাত্র হতে চাও, তাহলে আমাকে সাধনার পাত্র করে তলো। আমার সন্তানরা যেমন ব্রহ্মসনাতনের জন্মভিটার মানুষরা আমাকে ঘিরে উৎসবে মেতে ওঠে, আমাকে কেবল তাঁদের সঙ্গে লাভ করার আনন্দে আর আমার থেকে কিচ্ছু বলতে কিচ্ছু কামনা না রেখে, আমার সান্নিধ্যই শ্রেষ্ঠ লাভ বলে গণ্য করে, তেমন ভাবের বিস্তার করতে পারো, তবেই ব্রহ্মসনাতনের প্রিয়পাত্র হতে পারবে।
যদি সমূহ মানবজাতির একাংশকেও সমস্ত ইচ্ছা, চিন্তা ও কল্পনার থেকে মুক্ত করে, ভেদভাব মুক্ত করে নিরপেক্ষ দৃষ্টিসম্পন্ন করতে পারো, তবেই মানবজাতি রক্ষা পাবে, তবেই ব্রহ্মসনাতনের প্রিয়পাত্র হয়ে তুমি বিরাজ করবে, আর তার মধ্যে চিরতরে লীন হয়ে যাবে। যদি আমাকে বরদান প্রদানের পাত্র এই ভাবনা থেকে মুক্ত করে, আমার সন্তানদের একাংশের কাছেও আমাকে তাঁদের লক্ষ্য করে তুলতে পারো, তাদের সাধনা করে তুলতে পারো, তবেই মনুষ্যজাতির রক্ষণ সম্ভব, নচেৎ এই যোনির নাশের বীজ ব্রহ্মসনাতন বপন করে রেখে দিয়েছে।
তা শীঘ্রই ফলিভুত হবে। ঠিক যেমন পূর্ব উন্নত যোনির বিনাশের কালে পরমাত্ম নিজেকে লাচার পেয়েছিল, তেমনই এবারেও লাচার হয়ে যাবে সে মনুষ্যের নাশ করতে”।
মানস বললেন, “কিন্তু মা, তোমার এত কথার পরেও যে, আমি নিজেকে নিরুপায় পাচ্ছি। কি ভাবে এই সমস্ত কিছু করবো আমি! আমি তো তা বুঝেই পাচ্ছিনা। আমাকে মার্গ প্রদান করো মা!”
মাতা সর্বাম্বা হেসে বললেন, “বেশ পুত্র, আমি তোমার জন্য, তোমার অন্তরে এই সম্পূর্ণ মার্গ অঙ্কন করার জন্য, পুনরায় লীলা করা শুরু করছি। তবে এই লীলা সর্বাম্বার লীলা হবেনা, হবে জগদ্ধাত্রেয় লীলা। আর এই জগদ্ধাত্রেয় লীলার উপরান্তে, তুমি তোমার এই দেহকে আর ধরে রাখতে পারবেনা, তবে লীনও হতে পারবেনা আমার মধ্যে। তাই তোমাকে পুনরায় একটি দেহ ধারণ করে, তোমাকে সেই কর্ম করতে হবে, যেই কর্মের মার্গ আমি তোমাকে প্রদান করলাম এতক্ষণ”।
মানস গদগদচিত্তে বললেন “যথা আজ্ঞা মা, তবে আমার কিছু জ্ঞাতব্য প্রশ্ন আছে। যদি অনুমতি দাও, তাহলে সেই প্রশ্নসমূহকে তোমার সম্মুখে রেখে, তোমার থেকে তার উত্তর আশা করি”।
মাতা সর্বাম্বা হেসে প্রশ্ন করার অনুমতি প্রদান করলে, মানস প্রশ্ন করলেন, “আচ্ছা মা, এর পূর্বেও, ব্রহ্মকথা অর্থাৎ শূন্যের কথা বলেছে বৌদ্ধ গ্রন্থ সমূহ, আত্ম ও পরমাত্মের সম্বন্ধে বিস্তারে বলেছে বেদ, সমাধি সম্বন্ধে বৌদ্ধ গ্রন্থও বলেছে আবার অদ্বৈত বেদনাতও বলেছে আর প্রকৃতি সম্বন্ধে মার্কণ্ড মহাপুরাণ বলেছে, যাকে ব্যাসাদি জয়াদি গ্রন্থে ব্যক্ত করেছে। তার পরেও তুমি পূর্ণ দেহ ধারণ করে এসেছ, আর কৃতান্ত কথা বলছো। এর অর্থ কি ধারণ করবো মা! তবে কি পূর্বের এই সমস্ত গ্রন্থসমূহ ভ্রান্ত কথা বলেছে, আর তাই তোমাকে সঠিক কথা বলতে আসতে হলো আবার করে!”
মাতা সর্বাম্বা হেসে বললেন, “না পুত্র, কেউই ভ্রান্ত কিছু বলেনি, তবে একাকজন একাক বিষয়ে বলেছে। আর তাই যখন তাদের গ্রন্থকেই সার্বিক ভাবে সত্য মেনে নেওয়া হচ্ছে, তখন বিস্তার পাচ্ছে ভ্রমের। কেমন দেখো। যেখানে বেদ পরমাত্মের বিজ্ঞান বলেছে, সেখানে পরমাত্মকেই তারা ভগবানের আসন প্রদান করেছেন। এবার তারা দাবি করছে যে পরমাত্ম ব্রহ্মাণ্ডের নির্মাতা। তাদের দাবির মধ্যে কনো ত্রুটি নেই, কারণ বাস্তবেই ব্রহ্মাণ্ডের রচয়িতা হলেন পরমাত্ম।
কিন্তু পাঠক কি করছেন? পাঠক পরমাত্ম ব্রহ্মাণ্ডের রচয়িতা, এই তথ্যকে ভুলে যাচ্ছেন এবং ভগবান ব্রহ্মাণ্ডের রচয়িতা মেনে চলছে। এরফলে কি হচ্ছে যখন তারা অদ্বৈত বেদান্ততে গিয়ে উপস্থিত হচ্ছে, তখন সেখানে গিয়ে ব্রহ্ম হচ্ছেন ভগবান, আর পাঠকরা এবার মানা শুরু করছে যে ব্রহ্মই ব্রহ্মাণ্ডের রচয়িতা। আর এই ভাবে সমস্ত মানুষ নিজেকেই নিজে ভ্রমিত করে যাচ্ছেন।
এই ভ্রমের কারণ হলো, কনো কিছুরই স্পষ্ট ধারণা নেই মানুষের। ধারণা নেই বলেই, যা সীমিত, যা অন্তময়, যার ব্যাখ্যা ত্রিগুণের মাধ্যমেই করা সম্ভব, সেই পরমাত্মকে ভগবান আখ্যা দিতে সক্ষম হচ্ছেন মানুষ। ধারণা নেই বলেই তারা ব্রহ্মব্যাখ্যা দিতে উঁচিয়ে থাকছেন, যেকালে ব্রহ্মের ব্যখ্যা সম্ভবই নয়। আর ধারণা নেই বলেই, পরমাত্মের সঙ্গিনী রূপে পরমাত্মের চিরশত্রু প্রকৃতিকে দেখাচ্ছেন, আবার ধারণা নেই বলেই বৃক্ষ তরুর দেহআকৃতিকে প্রকৃতি মেনে চলছে তারা।
কৃতান্ত প্রদান করার প্রয়োজন ঠিক এই কারণেই ছিল। যে যা তাকে সেইরূপে পরিচিত করানোর জন্যই কৃতান্ত। আত্ম মানে আমিত্ব, তাকে আমিত্ব বলেই স্থাপনা করার জন্য কৃতান্ত। ব্রহ্ম মানে শূন্য, আর তাকে শূন্য ও অব্যাক্ত বলে স্থাপনা করার জন্যই কৃতান্ত। প্রকৃতি কখনোই বাহ্য আকৃতি নয়, তা বলার জন্যই কৃতান্ত। প্রকৃতি মানেই পরমাত্মের চিরশত্রু, তা বলার জন্যই কৃতান্ত।
কৃতান্ত একটিই ভূমিকা পালন করেছে পুত্র, আর তা হলো যথার্থ ব্যাখ্যা। সত্যের পথে যাত্রারত পথিক প্রায়শই এই সমূহ শব্দদের নিয়ে গুলিয়ে ফেলে মার্গ হারিয়ে ফেলেন। তাই তাদেরকে তাদের হারিয়ে যাওয়া মার্গ ফিরিয়ে দেওয়ার জন্যই কৃতান্ত”।
মানস আবার প্রশ্ন করলেন, “আচ্ছা মা, ব্রহ্ম কেন অব্যক্ত? ব্রহ্মের ব্যখ্যা কি সত্যই দেওয়া সম্ভব নয়? যদি না হয়, তবে কেন নয়? কেন তার ব্যখ্যা দেওয়া সম্ভব নয়?”
মাতা সর্বাম্বা হেসে বললেন, “ব্রহ্ম মানে যিনি একমাত্র অস্তিত্ব। যিনি ছাড়া অন্য আর কিছুর অস্তিত্বও নেই। সেই একমাত্র সত্যের সম্মুখে ধরে নাও তুমি দাঁড়িয়ে আছো। এবার বলো, যার সম্মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছ, তিনি কি সত্য? তিনি কি ব্রহ্ম?”
মানস চিন্তন করে বলল, “না, কি করে তিনি ব্রহ্ম হতে পারেন! তিনি তো অনন্ত, অসীম। আমি সম্মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছি, এর অর্থ তো আমি তাঁর সীমা হয়ে স্থিত। অর্থাৎ তিনি ব্রহ্ম হতে পারেন না, কারণ ব্রহ্মবেশে তিনি তো ততক্ষণ অসম্পূর্ণ, যতক্ষণ আমি তাঁর সম্মুখে স্থিত”।
মাতা পুনরায় হেসে বললেন, “আর যখন তুমি তোমার অস্তিত্ব ত্যাগ করে, তাঁর মধ্যে লীন হয়ে গেলে তখন?”
মানস চিন্তন করে বলল, “তখন তিনি সম্পন্ন, তখন তিনিই একমাত্র অস্তিত্ব, পরব্রহ্ম তিনি”।
মাতা মিষ্ট হেসে বললেন, “কিন্তু যখন তুমি তাতে লীন হয়ে গিয়ে তাকে পরিপূর্ণ করে দিয়ে তাকে প্রত্যক্ষ করছো, তখন কি তাঁর ব্যখ্যা দেবার অবস্থায় তুমি থাকছো?”
মানস মাথা নেড়ে বললেন, “বুঝলাম মা, … কেন ব্রহ্ম অব্যক্ত। যতক্ষণ আমি থাকে, ততক্ষণ ব্রহ্ম অসম্পূর্ণ, আর যখন তিনি পূর্ণ, তখন তো আমিই নেই। তাই তাঁর ব্যখ্যা দেওয়াই সম্ভব নয়। বুঝেছি মা, আমরা যখন আত্মকেই ভগবান বলে দাবি করি, তখন এই দাবিও করি যে ভগবান ব্রহ্মাণ্ডের নির্মাতা, আর এই কথা বলার কালে আমরা কনো ত্রুটি করিনা কারণ সত্যই চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনাকে সঙ্গে নিয়ে আত্ম নির্মাণ করেছে আমাদের ব্রহ্মাণ্ড। কিন্তু যখন ব্রহ্মকে সেই ভগবানের আসন প্রদান করি আর বলি যে ভগবান এই ব্রহ্মাণ্ডের নির্মাতা, তখন আমরা পূর্ণ ভাবে অসত্য বলে থাকি, কারণ ব্রহ্ম মানে অব্যক্ত, শূন্য। না তো তাঁর প্রয়োজন আছে এই ব্রহ্মাণ্ডের আর না তিনি নির্মাণ করেন এই ব্রহ্মাণ্ডের।
কিন্তু মা, এই ক্ষেত্রে আমার আরো একটি প্রশ্ন জাগছে। মা, আত্ম হলেন একটি জীবের আমিত্ব বোধ, আর পরমাত্ম হলেন সমস্ত কিছুর আমিত্ব বোধের সমষ্টি, আর সেই সমস্ত আমিত্ব বোধ মিলে নির্মাণ করেছে এই ব্রহ্মাণ্ড, আর এই ব্রহ্মাণ্ড নির্মাণের পর থেকে সকল, জীবের অন্তরে ব্রহ্মের সুত্ররূপে বিরাজমান মেধাকে সত্য থেকে ভ্রমিত করে রাখে আত্ম।
সত্য বলতে, এটিই আত্মের করা, পরমাত্মের করা শ্রেষ্ঠ ভ্রান্তি। না সে মেধাকে হরণ করার প্রয়াস করতো, আর না তোমার সাথে সে শত্রুতার শুরু করতো। কিন্তু ভ্রান্ত যে, সে তো ভ্রান্তি করবেই, তাই সে তাই করলো, যা তার করা উচিত ছিলনা। সে তোমার অংশ, মেধাকে হরণ করার প্রয়াস করলো। আর এর ফলে সে তোমাকে শত্রু করেই সম্মুখে পেল। আর তুমি সেই মেধা থেকে চেতনা ও প্রকৃতি রূপ ধারণ করে স্বয়ং নিয়তি হয়ে উঠে আত্মের নাশ করে, নিজের সন্তানকে নিজের কাছে টেনে নাও, যদিও সে তখন আর তোমার সন্তান থাকেনা, কারণ সে আর মেধা থাকেনা। মেধা থেকে চেতনা হয়ে প্রকৃতি ও নিয়তি হয়ে সে তখন সাখ্যাত তুমি হয়ে গেছ।
কিন্তু এখানে আমার কাছে আরো এক দ্বন্ধ রয়েছে। মেধা ও চেতনার পার্থক্য তো আমি বুঝতে পারছি, মেধা হলো তা যা সুপ্ত, অর্থাৎ যা আমাদেরকে কেবল নিজেকে সুরক্ষিত করার ভান প্রদান করে। আর চেতনা মেধার সেই রূপান্তর যার কারণে আমরা প্রকৃতির বার্তা, আমরা নিয়তির বার্তা শ্রবণ করতে পারি, ও আমরা নিজেদেরকে সত্যকামী করা শুরু করি, আত্ম থেকে মুক্ত হয়ে। আর সেই কারণেই, মানে আত্মের বন্ধন থেকে আমরা মুক্ত হতে সচেষ্ট হয়েই চেতনাকে ধারণ করি, সেই কারণেই আত্মের সাথে চেতনার এই অনন্ত সংগ্রাম।
কিন্তু যা আমাকে বিরক্ত করছে, তা এই যে চেতনা, পরাচেতনা, প্রকৃতি ও পরাপ্রকৃতির মধ্যে সম্বন্ধ কি? এই রূপান্তরের অর্থ কি? এ কি ব্যাপ্তি না সঙ্কুচন? চেতনা, প্রকৃতি, নিয়তি, সমস্ত কিছুর মধ্যে কেমন যেন পথ হারিয়ে ফেলছি মা। মার্গদর্শন করো মা কৃপা করে”।
মাতা সর্বাম্বা হেসে বললেন, “সঠিক বলেছ মানস তুমি মেধার সংজ্ঞা, এও সঠিক বলেছ যে মেধা ও চেতনার মধ্যে ভেদ কি। পুত্র, পরাচেতনার অর্থ হলো, পূর্ণ চেতনা। মেধা ততক্ষণ মেধাই থাকে যতক্ষণ সে তোমার সুরক্ষার ভান করছে। যখন সে তোমার সুরক্ষার কারণ তোমার অসত্যকে সত্য মানার প্রবণতা মেনে, তোমার ধারণাকে সত্যমুখি করতে উদ্যত হয়, তখন সে আর মেধা থাকেনা, তখন সে চেতনা হয়ে ওঠে। আর যখন সেই পথে মেধা সম্পূর্ণ ভাবে নিজের অস্তিত্বের সত্যকে জেনে যায়, তখন সে পরাচেতনা অর্থাৎ পূর্ণ চেতনা হয়ে ওঠে।
এবার প্রশ্ন এই যে প্রকৃতি তাহলে কি? তোমাকে যে তোমার অস্তিত্বের কারণ, ও শূন্য থেকে ভৌতিক অবস্থায় তোমার অস্তিত্বের পদ্ধতি বলে, সে হলো তোমার অন্তরে স্থিত পরাচেতনা। এবার প্রশ্ন এই যে, প্রকৃতি তাহলে কে বা কি? (মিষ্ট হেসে) পুত্র, প্রকৃতি হলেন অনেকের চেতনার সমষ্টি। শুধু তোমার মেধা যখন মেধা-অবস্থা ত্যাগ করে সত্যের সন্ধানী, তখন তা চেতনা।
তোমার চেতনা যখন পূর্ণ ভাবে তোমার অস্তিত্বের সত্যকে ব্যক্ত করতে সক্ষম, তখন তিনি পরাচেতনা। এবার যখন তোমার চেতনা অন্য সমস্ত অস্তিত্বের সত্যকে তুলে ধরতে সচেষ্ট হয়, তখন উপস্থিত সমস্ত জীব-অজীবের চেতনা সঙ্ঘবদ্ধ হয় আর সেই সঙ্ঘবদ্ধ চেতনাকে প্রকৃতি নাম দাও। অর্থাৎ তুমি একটি জঙ্গলে প্রবেশ করলে। সেখানে বহু প্রাণী-উদ্ভিদ বর্তমান। কিন্তু তারা প্রকৃতি নয়। যখন তাদের অন্তরের চেতনারা একত্রিত হয়, আর তোমার চেতনা সেই একত্রিত চেতনার থেকে সত্য ধারণা করতে উৎসাহী হয়, তখন তোমার কাছে সেই চেতনার সমষ্টি প্রকৃতি হয়ে ওঠে।
কিন্তু শুধুই প্রকৃতি, পরাপ্রকৃতি নয়। তাহলে পরাপ্রকৃতি কি বা কে? যখন সমস্ত সম্ভাব্য চেতনা একত্রিত হয়ে উঠে সত্যের বিবরণ দেওয়া শুরু করে, তখন যিনি সম্মুখে থাকেন তিনি আর প্রকৃতি নন, তিনি হলেন পরাপ্রকৃতি। আর পরানিয়তি বা পরামাতৃকা কে? সম্যক পরাপ্রকৃতি মিলে যেই যেই ভাবে, যেই যেই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পরমাত্ম থেকে সমস্ত মেধাকে উদ্ধার করার প্রয়াস করছেন, সেই কর্মকে আমি যেই বেশে, আর যেই ভাবে করি, তাকে তোমরা বলো নিয়তি, তবে হ্যাঁ, আমার সেই পূর্ণ ব্রহ্মময়ী বেশের ও ক্রিয়ার ধারণা কেবল তিনিই করতে সক্ষম, যিনি স্বয়ং পরাপ্রকৃতিকে ধারণ করে উপস্থাপন করছেন, যেমন ব্রহ্মসনাতন”।
মানস আনন্দিত চিত্তে বললেন, “ধন্যবাদ মা। আর কিছু না। মাতৃত্ব প্রদানের ব্যাকুকতা থেকে মেধাকে তুমি প্রকাশ করেছিলে, যে তোমার সন্তানও আবার তুমি স্বয়ংও। আর তাকে প্রকাশ্যে আনার কারণেই আমাদের পঞ্চভূতদের ও আত্ম রচনা হয়, যে নিজেকেই অস্তিত্ব এবং ভগবান মানা শুরু করে। আর এই বোধ থেকে সে মেধাকে অধিকার করে নেবার প্রয়াস করে। আর যেই মুহূর্ত থেকে সে তা করে, সেই মুহূর্ত থেকে, শুরু হয়ে যায় মেধা আর আত্মের সংগ্রাম।
আর কিছু আলাদা করে জানার নেই মা। শুধু পরানিয়তির লীলাকে প্রত্যক্ষ করতে চাই আরো। তার অনুমতি কামনা করি মা”।
মাতা সর্বাম্বা হেসে বললেন, “তথাস্তু। এক্ষণে আমি তো কেবল আমার স্বরূপের আভাসই প্রদান করেছি। এবার তার বিস্তার ও ব্যপ্তির লীলা অবশিষ্ট। তাই সেই বিস্তার ও ব্যাপ্তির লীলা দেখতে থাকো পুত্র”।
