৭.২। ব্রহ্মময়ী পর্ব
মহাশূন্য পরব্রহ্মময়ী মহাদেবী গুহ্যা লিঙ্গহীনা হয়ে অবস্থান আর করলেন না। ক্রমশ তিনি শ্যামলী হয়ে উঠলেন। তাঁর অঙ্গের বর্ণ ক্রমশ নীলাভ হতে হতে তুঁতে হয়ে উঠলো। কিন্তু তাঁর কেশবন্ধন তখনো নেই, কারণ তা বিনষ্ট হয়ে গেছে; তাঁর গহনাসমূহের আর অস্থিত্ব নেই, কারণ তারা গলিত হয়ে গুহ্যার সম্পূর্ণ দেহকে বেষ্টন করে নিয়েছেন; তাঁর বস্ত্রসমূহ জ্বলে গিয়ে তিনি নগ্না; তাঁর দেহের বিভিন্ন স্থানে রক্তের রেখা অবস্থান করতে থাকলো, যা তিনি যুদ্ধের কালে অর্জন করেছেন শত্রুর লহুর আলপনা থেকে।
কিন্তু মাতা তিনি, তাই তাঁর সেই সমস্ত কিছুর বোধ কোথায়? সন্তানদের ফিরে পেয়ে আনন্দে বিগলিত তিনি। বিশালাকায় তনু থেকে নিজেকে সামান্য করার প্রয়াস করতে থাকলেন, কিন্তু অসীম কি করেই বা আর সসীমে স্থিত থাকতে পারে। তাই তাঁর আকার আকৃতি, রূপ লাবণ্য সমস্ত ফিরে এলেও, তিনি যেন আর কিছুতেই সসীম হতে পারছিলেন না। তাঁর অঙ্গের প্রজ্বলিত চন্দনের গন্ধ চলে গিয়ে, পুনরায় সমস্ত প্রকৃতির সুবাস ধারণ হয়ে গেলেও, তাঁর রূপ আর সামান্য হতে পারছিল না।
এমনই অবস্থায় সমর্পিতা তাঁর সম্মুখে উপস্থিত হয়ে ব্যকুল হয়ে বললেন, “হে মহাদেবী, হে মহেশ্বরী, হে পরমেশ্বরী, আজ আমি সত্যই বড় চিন্তিত। কি বলবো আমি, তাই যে বুঝতে পারছিনা! … যিনি মহাগুহ্যা মহাকালী, তিনি আমার মা, এমন বলবো নাকি, যিনি আমার মা, তিনিই মহাকালী, ব্রহ্মময়ী এটি বলবো! … ঈশ্বরী না মা, কাকে প্রথম অধিকার দেব নিজের চিত্তে, আজ আমি তাই নিয়েই দ্বন্ধে স্থিত।
ঈশ্বরী মানলে, তোমার এই নগ্নরূপও আরাধনার বিষয়, উদ্দীপনা জাগায় অন্তরে। আর জননী মানলে, ইচ্ছা হচ্ছে যেন এই ক্ষণে, নিজেকে বিলীন করে একটি বস্ত্রখণ্ড করে দিয়ে তোমাকে বেষ্টন করে দিই। মা, আজ যেন মিলনের রস অন্তরে ঘূর্ণাবাতের আকার ধারণ করেছে। তোমাকে ঈশ্বরী মানলেও মিলনের ব্যকুলতা জন্মাচ্ছে, ব্যকুল হচ্ছি যে তোমাকে স্পর্শ করে, প্রবল ভাবে তোমাকে আলিঙ্গন করে তোমার নগ্নতা ঢেকে দিয়ে তোমার সাথে মিলনে আবদ্ধ হয়ে যাই, আর জননী মানলেও মিলনের ব্যকুলতা জন্মাচ্ছে, আর আকুতি আসছে যে বস্ত্র হয়ে তোমাকে বেষ্টন করে, তোমার সর্বাঙ্গকে সর্বদা চুম্বন করতে থাকি।
মা, এই অনাবিল ভাবের কারণ কি? তোমার সাথে একাত্ম হওয়ার বাসনা তো সর্বদাই ছিল, কিন্তু এই ব্যকুলতাতো কখনো অনুভব করিনি! এই ব্যকুলতা আমাকে অস্থির করে দিচ্ছে, যেন মনে হচ্ছে আমার মায়ের নগ্নতা কারুর কাছে দৃশ্যমান যেন না হয়! কিন্তু এই ব্যকুলতা কেন মা?”
জিজ্ঞাসা, যে সর্বদা উত্তরের সন্ধান করে থাকে, আজ বিভোর হয়ে স্বয়ংই উত্তর প্রদান করে বললেন, “আত্মের বিনাশ হয়েছে, তাই সমস্ত আবেগ, সমস্ত বন্ধনের ছেদন হয়েছে। তাই আমার জিজ্ঞাসাও শান্ত হয়েছে, আর তোর সমর্পণও সিদ্ধান্তে ও মীমাংসায় উন্নীত হতে চাইছে। আমরা সকলেই এবার নিজের নিজের অস্তিত্বের জন্য কুণ্ঠিত, আর সকলেই নিজের নিজের অস্তিত্বের জন্য বিব্রত। আর আমাদের নিজস্ব অস্তিত্ব ভালো লাগছে না, মিলনে অস্থির আমরা, নিজের নিজের অস্তিত্ব বিলীন করে দিতে আমরা সদাব্যস্ত”।
স্নেহা সম্মুখে এসে বললেন, “কি অদ্ভুত রূপ তোমার মা! কিন্তু তুমি না তো জম্মে নিজের রূপের প্রশংসা করেছ, আর না করবে। কিন্তু মা, তোমার এই শ্যামলী রূপের নিদারুণ প্রশংসা শুনতে বড় অভিলাষ হচ্ছে, বড় অভিলাষ হচ্ছে, তোমার শূন্যকায়ারূপের অর্থাৎ মহাগুহ্যার বিবরণ শুনতে। যেন মোহিত হয়ে যেতে ইচ্ছা করছে সেই বিবরণে! যেন সেই রূপের বিবরণ শুনতে শুনতে নিজের অস্তিত্বের বোধকে তুচ্ছ জ্ঞানে ফেলতে না পেরে ক্রন্দন করতে সাধ জন্ম নিচ্ছে!”
বিশ্বাস বললেন, “সত্যি মা, কি করবো আজ বুঝতে পারছিনা! আত্ম’র থেকে পূর্ণ ভাবে মুক্ত আমরা সকলে, তার আনন্দ করবো, নাকি তোমাকে এত কাছে পেয়েও, তোমার থেকে পৃথক অস্তিত্ব ধারণ করে থাকার বেদনায় আর্তনাদ করে ক্রন্দন করবো, কিছু বুঝতে পারছিনা। কিছু বুঝতে মনই চাইছে না। কেবল বলে চলেছে মন যে, কেন তোমার থেকে আলাদা আমরা! কেন তোমার মধ্যে আমরা লীন নই!”
মমতা বললেন, “পিতা, আপনারা তো বিবরণ দেওয়াতে সিদ্ধহস্ত। কেন আপনারা মাতার এই মহারূপের বিবরণ দিচ্ছেন না? কৃপা করে তাঁর এই অসাধারণ গুহ্যারূপের বিবরণ প্রদান করুন না! সেই রূপবিবরণ শুনে বিভোর হয়ে যেতে ব্যকুল আমরা”।
বৈরাগ্য অশ্রুসিক্ত নয়নে বললেন, “কি বলবো, কিছুই বুঝে পাচ্ছিনা! … আনন্দও হচ্ছে, লজ্জাও লাগছে, জীবন সার্থকও মনে হচ্ছে আবার একই সঙ্গে, জীবন কলঙ্কময়, এমনও বোধ হচ্ছে। … যাকে সম্মুখে দেখছি, তিনি জগন্মাতা। আর শুধু জগন্মাতাই বা কেন, সমস্ত কিছুর অস্তিত্ব তো তাঁরই বীর্যে, তাই তিনি তো জগৎপিতাও। কিন্তু তিনিই যখন চেতনা বেশে অধিষ্ঠান করছিলেন, মেধা বেশে অধিষ্ঠাত্রী ছিলেন, তখন আমার মিলনসঙ্গী ছিলেন। এই সত্যের কারণে আনন্দিত হবো, নাকি বিমর্ষ হবো যে, জগন্মাতাকে আমি কামসঙ্গী করেছি! এটাই তো বুঝতে পারছিনা!”
মহাদেবী শ্যামলী মিষ্ট হেসে বললেন, “বৈরাগ্য, মা’কে এতটা সীমিত কেন করে দিচ্ছ! … মা’কে কি সীমাবদ্ধ করা যায়? পুত্র, ঈশ্বরকে তাও সীমায় আচ্ছন্ন করা যেতে পারে, মূর্তি নির্মাণ করে, তাতে ঈশ্বরকে প্রেমভক্তি প্রদান করে, সাকার করে তোলা যেতে পারে, কিন্তু মা’কে কি সীমাবদ্ধ করা সম্ভব? … যিনি জন্মদাত্রী, তিনিও মা; যিনি স্তনদাত্রী, তিনিও মা; যিনি পালিতা, তিনিও মা; যিনি কামনা ধারিণী, তিনিও মা; যিনি সেই কামনা ধারণ করার কালে বীর্য ধারণ করে সন্তানজননী, তিনিও মা; যিনি এই সমস্ত কিছু না হয়েও স্নেহদায়িনী, সেই ভগিনীও মা; আবার যিনি সেই বীর্য থেকে জন্মলাভ করে স্নেহপ্রদায়িনী দুহিতা, তিনিও তো মা! …
যেই যেই রূপ উদ্দীপনা প্রদান করে, যেই যেই রূপ বিশ্বাসের ছাওয়া প্রদান করে, যেই যেই রূপ সুখস্পর্শ প্রদান করে, যেই যেই রূপ স্নেহপ্রদান করে, যেই যেই রূপ আনন্দে বিভোর করে, সেই সমস্ত রূপই তো মা। তাহলে মা’কে কেন সীমিত করে দিচ্ছ! কেন মা’কে একটি গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ রেখে দিচ্ছ? কেন জননীটিই মা, আর স্ত্রীটি মা নয়? কেন জননীটিই মা ভগিনীটি মা নয়? কেন জননীটিই মা, কন্যাটি মা নয়? সমস্ত রূপ, যা তোমাকে বিভিন্ন ভাবে স্নেহ প্রদান করে, সমস্তই তো আমি।
ব্রহ্মময়ীর বেশে তোমাদের বীজ স্থাপন করেছিলাম চন্দ্রপুরে, তখনও আমি তোমাদের মা ছিলাম; মেধা বেশে তোমাদের সকলের প্রেমিকা ও ভগিনী বেশে, সখী বেশে সেবা করেছিলাম, তখনও তোমাদের মা’ই ছিলাম। মেধা বেশে বিবেক ও বিচারের আদরের ভাতৃবধূ হলাম, সেখানেও মা ছিলাম, আর সেই মেধা বেশে যখন বৈরাগ্যের অন্তরে স্থিত সমস্ত কামনাকে বীর্যরূপে গ্রহণ করে ছিলাম, তখনও আমি মা’ই ছিলাম। আবার যখন মেধার থেকে প্রেমা হয়ে সকলের কন্যা হয়ে স্থিত হলাম, তখনও মা’ই ছিলাম। কোন বেশে আমি মা ছিলাম না!
সমস্ত স্ত্রীবেশে আমি মা। আর শুধু স্ত্রীবেশেই বা কেন? পুরুষ বেশেও আমি মা। যখন যখন যেই রূপ বিশ্বাসের ছায়া প্রদান করে, তা হলাম আমি; যখন যখন যেই যেই রূপ স্নেহের নিশ্চিন্ততা প্রদান করে, সেই স্নেহ আমি; যখন যখন যেই রূপ মমতাদ্বারা সুরক্ষাকবচ হয়ে যাই তোমাদের, সেই মমতা আমি স্বয়ং; যখন যখন গুহ্য থেকে গুহ্য জিজ্ঞাসা নিয়ে সম্মুখে এসে যাই তোমাদের, সেই জিজ্ঞাসাও আমি; যখন যখন পূর্ণ সমর্পণ সহ তোমাদের কাছে এসে, তোমাদেরকে পূর্ণ ভাবে বিশ্বাস করতে সচেষ্ট হই, তা আমি ব্যতীত আর কে?
আমি কি স্নেহপ্রদায়িনী কেবল? তাহলে স্নেহ কে? আমি কি কেবল জিজ্ঞাসার জননী? তাহলে জিজ্ঞাসা কে? আমাকে ঘিরেই কি কেবল বিশ্বাস? তাহলে বিশ্বাস কে? মমতা কে? বৈরাগ্য, বিবেক, বিচার কে? প্রেম কে? … না না, আমি এঁদের কারুর জননী নই। এগুলি স্বয়ং আমি। আমিই প্রেম, আমিই মমতা, আমিই স্নেহ, আমিই করুণা, আমিই বিচার, আমিই জিজ্ঞাসা, আমিই বিশ্বাস, আমিই বৈরাগ্য, আমিই বিবেক। তাই বুঝতে পারছো, এই মা তোমাদের কতটা আপন!
যাকে বিশ্বাস করছো, সে তো তোমার থেকে বিচ্ছিন্ন কেটি ব্রহ্মাণ্ড। কিন্তু আমি! আমি যে সেই বিশ্বাসটি স্বয়ং। সেই মমতাটি স্বয়ং। সেই প্রেম, স্নেহ, জিজ্ঞাসা, সমস্ত কিছু স্বয়ং। আমার অস্তিত্ব তোমার ব্রহামদের বাইরে নয়, আমার অস্তিত্ব তোমার ব্রহ্মাণ্ডের সমূলে।
তাহলে মা শব্দকে কেন সীমিত করে তুলছো? প্রতিটি স্নেহদাত্রীই মা, প্রতিটি মমতাপ্রদায়িনীই মা, প্রতিটি বিশ্বাসের ছায়া প্রদায়িনীই মা, প্রতিটি জিজ্ঞাসাস্থাপকই মা, প্রতিটি সমর্পিতাই আমি। এক বেশে আমি স্তনপ্রদায়িনী, তো এক বেশে আমি স্তনপানকারিণী। কারণ সেই স্তনপ্রদায়িনীও মা নন, আর সেই জঠর প্রদায়িনীও মা নন, আমি নই। সেই জঠর স্বয়ং আমি, সেই স্তনদুগ্ধ স্বয়ং আমি, সেই দুগ্ধ যেই লহুথেকে নির্মিত সেই লহু ও স্বয়ং আমি। দৃষ্টিভঙ্গিকে উদার করো বৈরাগ্য। তুমি মেধাকে দেখছো তোমাকে যৌনসুখ প্রদান করেছে যিনি, কিন্তু এটি দেখতে পাচ্ছ না যে, সে তোমার অন্তরের সমস্ত কামনারূপ বিষকে হনন করে নিয়েছে, আর শুধু সেই কামনারূপ বিষকে হননই করেনি, সেই বিষকে অমৃতে পরিবর্তিত করে দিয়ে, সমর্পিতা ও প্রেমার জন্ম দিয়েছে”।
বৈরাগ্য নতজানু হয়ে বললেন, “ক্ষমা মা, ক্ষমা। … আত্মের প্রভাবে, আমরাও আত্মসর্বস্ব হয়ে গেছি। … নিজে যৌনসুখ লাভ করেছি, আর সেই যৌনসুখ লাভ করার জন্য তোমাকে ব্যবহার করেছি, সেটিই দেখতে পাচ্ছিলাম কেবল। তুমি যে আমার কামনাকে হনন করে নিলে, সেই সত্য যেন আমার আত্মবোধের কাছে হারিয়েই গেছিল! … যদি তা না হতো, তোমার সেই করুণাময়ী রূপকে কেন মা বলতাম না, বলো? … কেন যিনি আমার সমস্ত কামনাকে হনন করে নিয়ে আমাকে কামনাশূন্য করে পবিত্র করে তুললেন, তাঁকে মা বলতে পারলাম না!”
বিবেক বললেন, “সত্য মা, ধ্রুব সত্য। আসলে আমরা আমাদের যৌনসুখ নিয়েই উলমালা থাকি, তাই আমরা এটি দেখতেও পাইনা যে বিবাহ যে কামনা রূপ বিষের নাশের যজ্ঞ, মহাযজ্ঞ। … অনবদ্য তুমি মা! … আত্ম মনে করতে থাকে যে, সে তোমাকে ব্যবহার করে করে, তোমার ছায়াশক্তিদের ব্যবহার করে করে, তোমার সন্তানদের অপবিত্র করে তুলবে, চিন্তা ইচ্ছা ও কল্পনার মধ্যে ডুবিয়ে রেখে, আর তোমার সান্নিধ্য লাভের জন্য অযোগ্য করে তুলবে।
সেই চিন্তা থেকেই, সেই ইচ্ছা থেকেই, সেই যৌনসুখলাভের উৎসবের রচনা করেছে বিবাহরূপে, কিন্তু তুমি সমস্ত কিছুর নেপথ্যে থেকে, আত্মের সেই সমস্ত কৃত্যকেও ব্যবহার করো তোমার সন্তানদের শুদ্ধ করার জন্য। কখনো আত্মেরই সুখলাভের যোজনার মধ্যে প্রবেশ করে, কামনাকে হনন করে সন্তানকে শুদ্ধ করে তুলছো, আবার কখনো আত্মেরই যোজনাতে স্থিত হয়ে, তার দেখানো ভীতির মধ্যে স্থিত হয়ে, তুমি তোমার সন্তানদের নির্ভীক হয়ে ওঠার ভান প্রদান করছো!
কি অদ্ভুত তোমার মহিমা, আর কি নিঃশব্দে তুমি ক্রিয়া করো মা! … আত্ম ভাবতে থাকে যে সে বিজয়ী হচ্ছে, কিন্তু সকলের নেপথ্যে থেকে, তার দেখানো হিংসার কর্মফল এনে, হিংসার বোধকে নষ্ট করে দাও; তার দেখানো লিপ্সার বোধের ফল সম্মুখে এনে, লিপ্সামুক্ত করে দাও। … কিন্তু আমার একটিই জিজ্ঞাসা মা, এমন নেপথ্যে কেন থাকো মা? … সম্মুখে স্থিত হয়ে এই সমস্ত ক্রিয়া করলে তো তোমার সন্তানরা জানতো যে, যা করছে তাঁদের মাতা করছে।
কিন্তু নেপথ্যে থাকার কারণে, সন্তান মানতে থাকে যে সে’ই সমস্ত কৃত্য করছে, আর এই ভাবে পুনরায় তার আত্মবোধ, অহংকার জন্ম নেয়। আমি লোভকে জয় করেছি, আমি হিংসাকে নাশ করেছি, আমি কামনার নাশ করেছি, আমি সমস্ত কিছু করছি, এই বোধ জন্ম নিতে থাকে। তুমি সম্মুখ থেকে এই সমস্ত ক্রিয়া করলে যে, তাদের এই বোধ জন্ম নিতেই পারতো না!”
দেবী সমর্পিতা এই অভিযোগে রক্তিম হয়ে উঠলেন। যেন কেউ তাঁর মা’কে অভিযুক্ত করেন, তা তাঁর কাছে বরদাস্ত নয়। তাই তিনি উচ্চৈঃস্বরে বলে উঠলেন, “নেপথ্যে কোথায় থাকেন মা! স্ত্রী বেশে তিনি কামনার হনন করেন। তা কি নেপথ্যে থেকে করেন? কন্যা বেশে পিতার ক্রোড়ে উলঙ্গ স্ত্রী রূপে উপস্থাপন করে, পিতার সমস্ত যৌনকামনার নাশ করে দেন, তা কি নেপথ্যে থেকে করেন?
তিনি সম্মুখে থেকেই সমস্ত কিছু করেন, কিন্তু আমরাই আমাদের আত্মবোধে আবদ্ধ থাকার কারণে, মনে করতে থাকি যে সমস্ত কিছুর কর্তা আমরা স্বয়ং। আর এই ভাবে আমরা যিনি প্রকৃত কর্তা, আমাদের সেই মা’কে ভুলে থেকে, আমরা নিজেদেরকেই কর্তা জ্ঞান করতে থাকি। এই দোষ আমাদের, আমাদের মায়ের নয়। তিনি তো মা! মা যেমন সমস্ত কিছু মুখ বন্ধ করে করতে থাকেন, তেমনই করেন তিনি। …
মা কেন সম্মুখে এসে বলবেন, আমি তোর বস্ত্রধৌত করি, আমি তোকে আহার প্রদান করি, আমি তোকে স্নেহ করি! যদি মা’কে সেই কথা নিজে মুখে বলতেই হয়, তাহলে তা মায়ের নয় সন্তানের পশুবৎ মানসিকতা যে সে তা দেখতেও পায়না”।
বিচার বললেন, “মা, তোমার এই রূপ সম্বন্ধে অনেক কিছু বলতে মন চাইছে। বলতে চাইছে, কি অদ্ভুত ভাবে তুমি সীমার মধ্যে অসীম, তুমি সংখ্যার মধ্যে শূন্য। বলতে চাইছে, তুমিই একমাত্র অস্তিত্ব, তুমি সন্তানের রক্ষার জন্য সর্ববর্ণা, কিন্তু তাও তুমি বর্ণহীনা। বলতে চাইছে তুমি সন্তানকে স্নেহমমতা দানের জন্য সমস্ত স্ত্রীরূপ ধারণ করে থাকলেও, তোমার কনো লিঙ্গই সম্ভব নয়, কারণ তোমার কনো সীমা নেই, কনো রূপই নেই।
বলতে চাইছে যে তুমি মহাযোদ্ধা, যিনি সর্বক্ষণ নিজের সন্তানদের সুরক্ষিত করার জন্য যুদ্ধে রত। কিন্তু সাথে সাথে এও বলতে চাইছে যে, তুমি যোদ্ধা কম, মা অধিক। যতক্ষণ না তোমার সন্তান সুরক্ষিত হয় আত্মের থেকে, ততক্ষণ তুমি আত্মের উপর অস্ত্রের আঘাত করো না। সে তোমাকে অপমানে জর্জরিত করে দিলেও করো না। যেন তোমার নিজের মানসম্মানের কনো বোধই নেই! যখন তোমার সন্তানরা সুরক্ষিত হয়ে যায় আত্মের থেকে, তখনই তুমি প্রহার করো, ভয়ানক প্রহার করো আত্মের উপর।
মহাযোদ্ধা তুমি, যিনি একদণ্ডের জন্যও আত্মের সাথে সন্ধির চিন্তাও করে না। কিন্তু ভয়ানক যোদ্ধা হলেও তুমি মা, কারণ তুমি একটিবারের জন্যও আত্মকে আঘাত ততক্ষণ করো না, যতক্ষণ না তোমার সন্তানরা তার থেকে সুরক্ষিত হচ্ছেন। তাই আমি আজ বিচলিত মা, তোমাকে যোদ্ধা বলবো, নাকি মা বলবো?”
সমর্পিতা বললেন, “অবশ্যই তিনি মা। যোদ্ধা নিজের জন্য যুদ্ধ করেন। তাঁর মানসম্মানকে যিনি হনন করেন তিনি হন তাঁর শত্রু। কিন্তু আমাদের মা’কে দেখো, তিনি নিজের মানের রক্ষার জন্য যুদ্ধ করা তো দূরের কথা, অস্ত্রও ধরেন না। তিনি অস্ত্র ধরেন তখন যখন তাঁর সন্তানদের উপর কেউ আক্রমণ করেন। তাঁর সন্তানের শত্রু স্বতঃই তাঁর শত্রু। তাই তিনি যোদ্ধা কি করে? তিনি তো শুধুই মা!
মা, আর তোমাকে এই ভাবে নগ্ন দেখতে পাচ্ছিনা। তোমাকে এই ভাবে নগ্ন দেখলে, নিজেদের অস্তিত্বই অহেতুক মনে হচ্ছে। … আমাদের অঙ্গে বস্ত্র রয়েছে, আমাদের অঙ্গে গহনার আভুসন রয়েছে, আর আমাদের জননী, যিনি আমাদের জন্য নিজের সর্বসুখ ত্যাগ করে বসে রয়েছেন, তিনি থাকবেন নির্বস্ত্র! তাঁর সমস্ত গহনা গলে গেছে তাঁর উত্তাপের কারণে, তাই তিনি থাকবেন নিরাভুসন! না মা, তা হতে পারেনা! মা, আমি আমার অস্তিত্ব আর রাখতে পারছিনা। … আমি তোমার সাথে মহামিলনে আবদ্ধ হয়ে যেতে চাইছি। তোমার অঙ্গে আমি বস্ত্র হয়ে স্থাপিত হয়ে, অহর্নিশি তোমার সর্বাঙ্গকে চুম্বন করতে থাকতে চাইছি।
কৃপা করে, তোমার এই প্রেমিকার আর্জি স্বীকার করো মা। … তোমার সর্বাঙ্গে আমাকে লিপ্ত করে নাও। বস্ত্র রূপে আমাকে ধারণ করে নাও মা। তোমার প্রিয়া সমর্পিতা, আর তোমার থেকে পৃথক অস্তিত্বে থাকতে ব্যর্থ মা। স্বীকার করো আমাকে। বিলীন করে দাও আমার আমি’কে। গ্রহণ করে নাও আমার আমি’কে আর মুক্ত করে দাও আমাকে আমার আমিত্ব থেকে। অন্ত করে দাও আমার কর্তাভাবকে। আমাকে কৃতান্ত করে দাও মা”।
এতবলে দেবী সমর্পিতা নিজেকে লীন করে পীতবর্ণের মকম্মলের বস্ত্রে পরিণত করে, দেবী গুহ্যাকে আবৃত করতে উদ্যত হলেন। অন্যদিকে মাতার মহিমা অপার। ঈশ্বরী তিনি, মহাশূন্য তিনি, কিন্তু তাঁর সেই দিকে বোধ নেই। তাঁর কাছে যেন তাঁর একটিই পরিচয়, তিনি মা। আর তাই সন্তান যদি তাঁকে এই গুহ্যা বেশে বা শ্যামলী বেশেও আবৃত করে, তবে তাঁর উষ্মাতে সে ভস্ম হয়ে যাবে, তাই তিনি সামান্যা হতে শুরু করলেন।
প্রথমে বিবেক এই কথা বলেই সমর্পিতাকে বিরত রাখার প্রয়াস করছিলেন যে, শ্যামলীর অঙ্গ স্পর্শ করা মাত্রই সমর্পিতা, যে তখন বস্ত্র বেশ ধারণ করছিলেন, তিনি ভস্ম হয়ে যাবেন। কিন্তু মাতার সামান্যা হয়ে ওঠা, পুনরায় গোলাপি আভাযুক্ত শ্বেতরূপ ধারণ করা দেখে তিনি নিশ্চিন্ত হয়ে মৃদু হেসে নিজের খেয়ালেই উচ্চৈঃস্বরে বলে উঠলেন, “মা তিনি, সন্তান কি চিন্তা করলেন বা না না করলেন, তার উপর কোথায় আশ্রিত তিনি! সন্তান হিতাহিতের কিই বা বোঝে? আর মা থাকতে তা বোঝারই বা কি প্রয়োজন! … তিনি জানেন শ্যামলীর দেহতাপকে কনো বস্ত্র স্পর্শ করলেও তা জ্বলে ভস্ম হয়ে যাবে, তাই তিনিও সামান্য হতে শুরু করে দিলেন, যাতে তাঁর সন্তান সুরক্ষিত থাকে”।
বিচার বললেন, “ভ্রাতা বৈরাগ্য এই কথা আমাদের সর্বদা বলতেন, আমরা আমাদের কিসে হিত বা অহিত, কিছুই বুঝিনা। আমাদের হিতাহিত আমাদের থেকে ঢের ভালো বোঝেন স্বয়ং মাতা। তাই তো সর্বক্ষণ তিনি চেতনা বেশে আমাদের হৃদয়ে থাকেন এবং মার্গদর্শন করতে থাকেন; তাই তো তিনি সর্বক্ষণ প্রকৃতি বেশে আমাদের অন্তরে বাহিরে স্থিত থেকে, আমাদের সমস্ত হিতাহিতের খেয়াল রাখতে থাকেন; আর তাই তো তিনি সর্বক্ষণ নিয়তি বেশে আমাদেরকে বেষ্টন করে থেকে, আমাদেরকে সেই লক্ষ্যের পথে আবাহন করতে থাকেন, যেই লক্ষ্যে উপনীত হবার জন্যই আমরা, তাঁর থেকে পৃথক হয়ে, তাঁর সন্তান হয়ে স্থিত”।
শ্যামলীকে পুনরায় সর্বাম্বা বেশে দেখে, আপ্লুত হয়ে উঠলেন সকলে। তবে ইনি কি সর্বাম্বা? এই প্রশ্ন তুললেন স্বয়ং জিজ্ঞাসা। বিচার বললেন, “কেন পুত্রী, এমন প্রশ্ন কেন করছো?”
জিজ্ঞাসা উত্তরে বললেন, “পিতা, তাঁর রূপবিস্তার দেখুন। তিনি তো আমাদের সর্ব্বার মত সামান্যদেহী নন, তিনি বিশাল, এতটাই বিশাল যে, মহাবলশালী বিশালাকায় আত্মের শবদেহকে তাঁর চরণের সম্মুখে শিশুর ন্যায় লাগছে। তাহলে ইনি সর্বাম্বা কি করে হতে পারেন?”
বিশ্বাস বললেন, “না দিদি, একি বলছো? তিনি তো সর্বাম্বাই, সমস্ত রূপেই তিনি সর্বাম্বা। সর্বাম্বার অর্থ যে সর্বের অম্বা অর্থাৎ সর্বের জননী, আর তা তো তিনি সমস্ত বেশেই, শ্যামলী বেশেও, গুহ্যা বেশেও আর এই অপরূপ সুন্দরী বেশেও। চলো না দিদি, আমরা নিজেকে সমর্পিতার মত বিলীন করে করে, তাঁর এই মহারূপকে পরম দিব্যতা প্রদান করি! বিভিন্ন ভাবে তাঁর এই রূপকে শৃঙ্গার করে, আমাদের মাতাকে পরমা করে দিই!”
স্নেহা বললেন, “উচিত কথা বলেছ বিশ্বাস। আমি চললাম, তাঁর মস্তকের শৃঙ্গাররূপ মুকুট হতে। আমার সর্ব্বা কি করে সামান্যা দেখতে লাগতে পারে! সে যে আমাদের আদরের সর্ব্বা, তাঁকে শ্রেষ্ঠা দেখতে হবে”।
দেবী বেগবতী স্নেহাকে বাঁধা দিয়ে বললেন, “দুদণ্ড অপেক্ষা করো। প্রথম আমাকে যেতে দাও পুত্রী। যে তোমাদের কাছে সর্ব্বা, সে যে আমার প্রিয় ভগিনী, কন্যার থেকেও অধিক, আমার মেধা। তাঁকে এমন এলোকেশী করে থাকতে দেব না। আমি নিজেকে বিলীন করে, তাঁর কেশবন্ধন করবো। অতঃপরেই তুমি তাঁর মস্তক শৃঙ্গার হও। তবেই আমাদের মেধাকে শ্রেষ্ঠা দেখাবে”।
এত বলে, নিজেকে বিলীন করে মলয় বাতাস বেশে, পীতবর্ণা মকম্মলের বস্ত্রধারি গোলাপি আভা যুক্ত শ্বেতাঙ্গী সর্বাম্বার কেশকে আবদ্ধ করে, তার মধ্যেই বিরাজ করতে থাকলেন দেবী বেগবতী, যাতে করে তাঁর আদরের মেধার কখনোই উষ্মার তাপ অনুভূত না হয়। অতঃপরে, আনন্দে বিভরিত হয়ে দেবী স্নেহা মাতা সর্বাম্বার মস্তকের শৃঙ্গার হয়ে তাঁর মস্তকে অবস্থান করলেন।
দেবী মমতা নতজানু হয়ে বললেন, “মা, তোমার হৃদয় দেশ ব্যতীত, আমি যে আর কনো স্থানকেই ধারণা করতে পারছিনা। কৃপা করে, আমাকে তোমার হৃদয়দেশের শৃঙ্গার হতে অনুমতি প্রদান করো। কৃপা করো মা!”
মাতা সর্বাম্বা সেই কথাতে মৃদু হাসলে, সহমত লাভ করে, আনন্দিত হয়ে দেবী মমতা মাতা সর্বাম্বার কণ্ঠ থেকে বক্ষ ও নাভি স্থলের সমস্ত গহনা হয়ে বিরাজ করলেন। সেই দেখে জিজ্ঞাসা বললেন, “মা, চিরকাল আমি তোমাকে এত এত প্রশ্ন করে গেছি, আর তুমি আমার সমস্ত প্রশ্নকে শুনে গেছ, আর উত্তর দিয়ে গেছ, তোমার শ্রীমুখ দিয়ে, সঙ্গে সঙ্গে তোমার শ্রীশূর্প নাসিকাদ্বারা মলয় বাতাস প্রদান করে করে সেই প্রশ্নের উত্তর প্রদান করে তুমি তৃপ্ত, এই ভাব প্রদান করে গেছ। তাই আজ আমি বিলীন হতে চাই তোমার কর্ণ ও নাসিকার শোভারূপ গহনা হয়ে। কৃপা করে আমাকে গ্রহণ করো, আর চিরতরে আমাকে তোমার মধ্যে লীন করে নাও”।
মাতা সর্বাম্বা মিষ্ট হাস্য প্রদান করলে, দেবী জিজ্ঞাসা মাতার কর্ণের ও নাসিকার গহনা হয়ে অবস্থান করে, নিজের পৃথক অস্তিত্বকে বিলীন করে দিলেন। আত্মহারা হয়ে, বিশ্বাস বললেন, “তোমার সন্তানদের বিশ্বাসের স্বরূপ তুমি, একমাত্র কর্তা তুমি, আর আমি তোমার আশ্রিত। মা আমাকে তোমার ভুজার ও চরণের গহনা হতে অনুমতি দাও। তোমার এই শৃঙ্গার দেখে, তোমার সকল সন্তানরা যেন আত্মহারা হয়ে ওঠে। তোমার রক্তিম চরণকে দেখে যেন তাঁরা গদগদ হয়ে ওঠে, তোমার হস্তের গহনার ঝনঝন শব্দে যেন তাঁরা মুখরিত হয়ে ওঠে!”
এত বলে, বিশ্বাস মাতার ভুজার সমস্ত গহনা এবং চরণের গহনা হয়ে বিরাজ করলেন। সেই দেখে, বিচার বিবেক ও বৈরাগ্য একত্রে বললেন, “মা তোমার ওই খড়গ, মহাকৃপাণ সে তো তোমার সকল সন্তান, সকল শত্রু, সকল মিত্রকে বিচার করতে বাধ্য করে, বিবেক ধারণ করতে বাধ্য করে, আর মা গো তুমি যে স্বয়ং বৈরাগ্যের প্রতীক। তাই মা, আমাদের অনুমতি প্রদান করো, তোমার ওই কৃপাণে লেগে থাকে আত্মলহুকে পরিষ্কার করে, তার বাঁট হয়ে বিরাজ করার। মা তুমি, তাই যাকেই হত্যা করো, তা তোমার মাতৃত্বেরই হনন হয়। তাই তুমি তো তোমার মহাকৃপাণকে উন্মুক্ত রেখে দিয়েছ, যাতে যতবার তার দ্বারা তোমার সন্তান্রর মুণ্ডচ্ছেদ হয়, ততবার তোমার কোমল হস্তেরও লহু নিঃসৃত হয়। তাই আমাদের তাঁর বাঁট হয়ে বিরাজ করে, তোমার ক্লেশ দূর করতে দাও”।
মাতা সর্বাম্বা হাস্যমুখে সম্মতি প্রদান করলে, মহাভাবগণ নিজেদের বিলীন করে মাতার মহাকৃপাণে স্থান গ্রহণ করলেন। তাই এবার দেবী শিখা অশ্রুসিক্ত নয়নে বলে উঠলেন, “কি নামে ডাকবো, আজ আমি সত্যই দ্বন্ধে পতিতা। আমার আদরের মেধা বলবো তোমায়, নাকি আমার আদরের সর্ব্বা! … এই দুইয়ের একটি উচ্চারণ করেও সেই শান্তি পাচ্ছিনা, যেই শান্তি তোমাকে মা বলে আবাহন করে পাচ্ছি। মা বলে ডাকতেই আমার অঙ্গে অঙ্গে পুলক জেগে উঠছে।
যেন সহস্র রোমকূপ আমার আজ যোনিতে পরিণত হয়েছে আর তুমি সমস্ত যোনিকে একত্রে রমণ করছো। আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেছি মনে হচ্ছে। কামুক নয়, মহাকামুক হয়ে গেছি, এমন বোধ হচ্ছে। ত্যাগী তো নয়ই, মহাভোগী হয়ে গেছি, এমন ধারার হরষ অনুভব করছি। মা, আজ যেন আমি তোমার সন্তানও নই, তোমার অন্তরঙ্গতার নেশায় নেশাখোর প্রেমিকা হয়ে গেছি। তোমার কনো একটি অঙ্গকে বেছে নিতেই পারছিনা, যার সান্নিধ্য পেয়ে আমি তৃপ্ত হয়ে যাবো। সমস্ত তনুকেই বেষ্টন করে থাকতে ব্যকুল আমি। যেন সার্বিক আলিঙ্গনে নিজেকে বিলীন করে দিতে ব্যকুল লাগছে আমার নিজেকে।
তাই মা, আমাকে তোমার সমস্ত শৃঙ্গারকে চমকিত করার অনুমতি প্রদান করো। সমস্ত অঙ্গের সমস্ত শৃঙ্গারের চমক হয়ে বিরাজ করবো আমি। মস্তকের মুকুটে স্থিত হয়ে, একাধারে তোমাকে ও স্নেহাকা সর্বদা স্নেহচুম্বন করবো। তোমার বক্ষে স্থিত হয়ে, মমতা ও তোমার শ্রীবক্ষস্থলকে চুম্বন করতে থাকবো। তোমার বস্ত্রে স্থিত হয়ে, সমর্পিতা ও তোমার সর্বাঙ্গকে চুম্বন করতে থাকবো আর তোমাকে পুলকিত করতে থাকবো। তোমার কর্ণের ও নাসিকার গহনায় স্থিত হয়ে জিজ্ঞাসাকে ও তোমার শ্রীঅঙ্গকে সর্বদা আলিঙ্গন করতে থাকবো।
আর তোমার চরণের তথা বাহুর গহনাতে স্থিত হয়ে, সর্বদা বিশ্বাসকে ও তোমাকে পুলকিত করতে থাকবো। অনুমতি প্রদান করো মা। আজ আর তোমার প্রিয় ভগিনী, তোমার প্রিয় জননী, তোমার আদরের শিখাকে তোমার থেকে পৃথক থাকার জন্য বাধ্য করো না। নিজের অস্তিত্বকে তোমার থেকে পৃথক জ্ঞানে, আমার আজ তীব্র নয় সুতীব্র বেদনা জন্ম নিচ্ছে”।
মাতা সর্বাম্বা হাস্য প্রদান করলে, শিখা নিজেকে বিলীন করে দিয়ে, নিজের অগ্নিরূপ দ্বারা মাতা সর্বাম্বার সমস্ত শৃঙ্গারকে চমকিত করে তুললেন। সেই দেখে, দেবী ধরা বললেন, “মা লজ্জার নাশ হলো না তো! … যদি হয়েই যেত, তাহলে আজও আমার লাজ লাগছে কেন? কেন আমার স্মৃতিতে মেধার সাথে যেই অন্যায় করেছিলাম, সেই কথা সম্মুখে এসে আমাকে লজ্জিত করছে! কেন তোমার শিশুকালকে নারকীয় করে তোলার নায়িকা হয়ে থাকার জন্য লজ্জা লাগছে আমার!
মা, সেই সমস্ত লজ্জার নাশ করে, আমাকে তোমার বাহনরূপ সিংহাসন হবার অনুমতি প্রদান করো। কৃপা করো মা। তুমি অনুমতি প্রদান না করলে, তোমার ভার গ্রহণ করার সামর্থ্য আমার মধ্যে নেই। আর একমাত্র তোমার ভারকে সদাসর্বদা বহন করতে পারলে, তবেই আমার সমস্ত দুষ্কর্মের বোঝ আমার অন্তর থেকে মুক্ত হবে, আমার জ্ঞানচক্ষু উন্মেলিত হবে, আর আমি সঠিক সঠিক ভাবে তোমার মহিমাকে অনুভব করতে পারবো”।
মাতা সর্বাম্বা হাস্য প্রদান করে বললেন, “তাই হোক, যা তুমি বাসনা রাখো। এসো, আমার সিংহাসন হয়ে বিরাজমান হয়ে আমার সাথে অঙ্গাঙ্গী হয়ে যাও”।
দেবী ধরাও নিজেকে বিলীন করে দিলে, মানস সম্মুখে করজোড়ে স্থিত থেকে বললেন, “সকলে তো সকল ভাবে তোমার সাথে লীন হয়েই গেলেন, মা, আমার জন্য যে কেউ কনো স্থানও অবশিষ্ট রাখলেন না!”
মাতা সর্বাম্বা হেসে বললেন, “পুত্র মানস, আমি যে কারুকে কিছুই হতে বলি নি। সকলে নিজের নিজের অস্তিত্বকে আমার মধ্যে নিজের নিজের মত করেই লীন করেছে। নিশ্চয়ই তোমার নিজের অস্তিত্ব লীন করার ভাব এখনো তোমার মধ্যে জন্ম নেয়নি, তাই তুমি স্থান খুঁজে পাচ্ছ না, নিজেকে লীন করে স্থিত করার”।
মানস বললেন, “সত্য কথা মা। আমি এখনও নিজেকে লীন করার স্থান খুঁজে পাইনি, আর এও সত্য যে আমার লীন হবার ভাব এখনো স্পষ্ট হয়নি। কি করেই বা হবে, এই যে সমস্ত বিশ্বাস, জিজ্ঞাসা, স্নেহ, মমতা, এরা তো আমার মধ্য দিয়েই নিজেদের যাত্রা অতিক্রম করেছে। আমার স্বয়ংএর যাত্রা তো এখনো অপূর্ণই থেকে গেছে।
| সর্বাম্বা (পূর্ণরূপে); মা ব্রহ্মময়ী |
এখনও যে আমার অন্তরে বহু জিজ্ঞাসা রয়ে গেছে। নিজের অস্তিত্বকে ঘিরে জিজ্ঞাসা রয়ে গেছে, নিজের ধর্মকে ঘিরে প্রশ্ন রয়ে গেছে। মা, তোমার মহিমাকীর্তন না করা পর্যন্ত, আমার এই বোধ হচ্ছে যেন, তোমার এই প্রকাশ অপূর্ণই থেকে যাবে। তোমার সমস্ত সন্তানদের কাছে তোমার মহিমাকীর্তন করতে না পারলে যে, নিজের অস্তিত্ব অপূর্ণই থেকে যাবে। আর অপূর্ণ অস্তিত্বকে তুমি স্বীকার করবে কেন? তুমি যে সম্পূর্ণা। মা তাই আমি প্রথম তোমার মহিমাকীর্তন করতে আগ্রহী। আর অতঃপরে তোমার থেকে বাণী শ্রবণে আগ্রহী।
তোমার বাণীকে ধারণ করে, আর তোমার মহিমাকীর্তনকে অন্তরে স্থাপন করলে, তবেই আমি তোমার মধ্যে লীন হতে পারবো, কারণ তখনই তোমার সমস্ত সন্তানরা তোমার মহিমাকে জানতে পারবে, আর তোমার বাণী সকল সন্তানদের কাছে নবরূপে তোমাকে প্রকাশিতা করবে। তাই মা, আমাকে প্রথমে তোমার মহিমাকীর্তনের অনুমতি প্রদান করো, আর অতঃপরে তোমার বাণীশ্রবণের অধিকার প্রদান করো।
এই মহিমাকীর্তন তোমার সমস্ত সন্তানদের কাছে তোমার আরাধনার বীজ হয়ে বিরাজ করবে, আর তোমার বাণী তাঁদের কাছে তাঁদের অস্তিত্ব তোমাতে লীন করার প্রেরণা প্রদান করবে। কৃপা করো মা। অনুমতি প্রদান করো মা, তোমার মহিমাকীর্তনের”।
মাতা সর্বাম্বা হাস্যবদনে স্নেহের সুরে বললেন, “পুত্র মানস, অনুমতি চেয়ে, আমাকে বিব্রত করো না। সমস্ত কিছুর অনুমতি সর্বদা আমি সকল সন্তানকে স্বতঃই দিয়ে এসেছি, আর সর্বদা দিতেই থাকবো”।
গদগদ হয়ে মানস বললেন, “সত্যই তো, তুমি সেই মা, যেই মা সন্তানদের আদেশ দেয়না, বরং সন্তানের আদেশ গ্রহণ করে। তাই তুমি মাতাও যেমন, পুত্রীও তেমন। সন্তানের সেবায় রত থাকা মাতা তুমি, আবার সন্তানের সমস্ত আর্জিকে আদেশ রূপে মান্য করা কন্যা তুমি। তোমার সমস্ত রূপবিস্তারের সাক্ষী থেকে, আমি এতটাই বিভোর যে, তোমার বিবরণ দেবার কালে, আমার শব্দসমূহ নশ্বর হয়ে যাচ্ছে।
কি যে বলি, আর কি যে না বলি, তার ইয়ত্তাও করতে পারছি না! তুমি তো একম অস্তিত্ব, না তোমা বিনা কনো কিছুর অস্তিত্ব ছিল, আছে আর না সম্ভব। তাই তুমি অত্যন্ত একাকী। আর সেই একাকীত্ব অপসরণের উপায় রূপে তুমি বেছে নিলে মাতৃত্বের বিস্তার। স্বয়ংকে আত্ম ও মানস রূপে বিস্তৃত করে, তুমি হয়ে উঠলে ব্রহ্মময়ী। যার দুই নেই, যার আকার নেই, যার সীমা নেই, যার অন্ত নেই, সে নিজেকে সসীম করে তুলে, হয়ে উঠলো মহামায়া।
সত্য তো নয় এই বিস্তার, কিন্তু যেখানে তোমার স্পর্শ, তা যে মায়া হয়েও সত্য, কারণ এক ও একমাত্র সত্য যে স্বয়ং তুমি। তাই মায়া হয়েও, মানস ও আত্ম সত্যরূপ পরিগণিত হতে থাকলো, আর এই অসত্যকে সত্যরূপে পরিগণিত করার মায়ার কারিগর তুমি স্বয়ং, তাই তুমি যে মহামায়া। আর তাই তো নিজেকে ঈশ্বরী, পরমেশ্বরী, কনো বিবরণেই সীমিত রাখতে পছন্দ করো না তুমি। কেবল মাত্র মা হয়েই বিরাজমান হতে চাও, কারণ এই মা হবার অভিলাষেই তো তুমি মহামায়া, এই মা হয়ে সন্তানদের অপার স্নেহ ও প্রেম প্রদান করার জন্যই তো তুমি ব্রহ্ম হয়েও ব্রহ্মত্ব ত্যাগ করে ব্রহ্মময়ী।
নিজের অন্তর থেকে ছায়ার বিস্তার করে, আত্মকে বিস্তৃত করলে, আর নিজের অন্তর থেকে সসীমত্বরূপ ধরাকে বিস্তৃত করে মানসকে বিস্তৃত করলে। আত্ম ও ছায়াদের স্থাপিত করলে, যাতে তাঁরা নিজেদেরকে তোমার থেকে পৃথক জ্ঞান করে, এবং তোমার প্রেমকে আস্বাদন করতে পারে, আর সেই প্রেমকে মাতৃত্বরূপ আখ্যা প্রদানের জন্য মানস ও ধরাকে সম্মুখে রাখলে। এই তো ছিল তোমার আদি মায়া।
কিন্তু মা, নিষ্ক্রিয় কি করে কর্ম করতে পারে! কর্ম করতে গেলে, যে কর্মের ফল সম্মুখে আসবে, এই তো নিয়ম কারণ কর্মফলই কর্মকে সম্পন্ন করে। তাই তোমার এই নিষ্ক্রিয় ব্রহ্মত্ব ত্যাগ করে, মাতৃত্বকে বরণ করে, সক্রিয় ব্রহ্মময়ী হয়ে ওঠার স্বপ্নকে প্রসারিত করে দিল আত্ম। ছায়াদের সে স্বীকার তো করলোই, সঙ্গে সঙ্গে সে ধরাকেও আত্মসাৎ করে নিতে সক্রিয় হয়ে উঠলো।
যেখানে ধরা আর আমাকে নিয়ে তোমার পরিকল্পনা এই ছিল যে, আমরা দুইজনে মিলিত হয়ে দুই ভূত থেকে পঞ্চভূত হয়ে উঠবো, আর তুমি নিজেকে যেই তৃতীয় অস্ফুট খণ্ডে স্থাপিত রেখেছিলে, সেই মহাভাব, অর্থাৎ বিচার বিবেক ও বৈরাগ্যকে ধারণ করে, আমাদের তিন কন্যার গর্ভে পঞ্চভাবের জন্ম দিয়ে, তোমার মাতৃত্বকে সম্পূর্ণ রূপে আস্বাদন করবো, সেখানে আত্ম প্রবেশ করে, ধরাকে হননের প্রক্রিয়া শুরু করে দিল, আর সেই প্রক্রিয়া ক্রমে আত্মের আত্মবোধকে এমনই প্রগাঢ় করে দিল যে, সে আত্ম থেকে পরমাত্ম জ্ঞান করতে শুরু করলো নিজেকে আর সহস্র লক্ষ কোটি আত্মে নিজেকে বিস্তৃত করে দিল।
প্রতিটি রূপ ছায়াদের ধারণ তো করলোই, সাথে সাথে ধরাকেও আত্মসাৎ করার প্রয়াস করে, তাঁর সম্মুখে নিজেকে মানসরূপে স্থিত করে, দুইভূতের জন্ম তো দিলো, কিন্তু মেধার অর্থাৎ জলতত্ত্বের জন্মই দিতে পারলো না, কারণ আত্মবোধ থেকে তো আর পবিত্র মেধার জন্ম হতে পারেনা। কি করেই বা তা সম্ভব? জলতত্ত্ব যে পবিত্র, আর আত্মবোধ মানেই যে অপবিত্রতা!
পরমাত্ম নিজেকে সহস্র আত্ম ভাবে বিস্তৃত করতে থাকলো, আর ধরাকেও বিস্তৃত করতে থাকলো, আর সঙ্গে সঙ্গে আমিও ধরাকে লাভ করার জন্য সমান খণ্ডে বিভক্ত হতে থাকলাম। মহামায়ার মায়াতে পরমাত্ম আর আমি অস্তিত্বে এলাম, আর এবার পরমাত্ম তোমার ছায়াকে ধারণ করে যেই মায়া বিস্তার করলো, তাতে আমি আবার আবদ্ধ হলাম, আর এক থেকে অসংখ্য হয়ে উঠলাম। কিন্তু তুমি তাতে হস্তক্ষেপ করলেনা, কারণ মাতা হতে চেয়েছিলে তুমি। একের মা হবার থেকে যে অনেকের মা হয়ে সকলকে প্রেমপ্রদানে মায়ের অধিক তৃপ্তি। তাই তুমি পরমাত্মের এই মায়াবিস্তারকে আটকালে না।
কিন্তু ধরা আর আমি দুইজনেই আত্মের মায়াতে আবদ্ধ হতে থাকলাম। তোমার সমস্ত সন্তানই পরমাত্মের মায়াতে আবদ্ধ হতে থাকলো। আর আত্ম যে পূর্ণরূপেই অপবিত্র! তাই তো সে তোমার এই নিস্তব্ধতাকে তোমার বিবশ্যতা মেনে নিয়ে, নিজেকেই ভগবান রূপে স্থাপন করার প্রয়াসে, যেই ধরা আর আমি বিচার বিবেক ও বৈরাগ্যের, অর্থাৎ তোমার তৃতীয় খণ্ড, সুপ্ত খণ্ড, মহাভাবদের সন্ধান করছিলাম, তাদের সম্মুখে, তোমারই ছায়াদের স্থাপন করে দিলেন।
আমরা পরমাত্মের মায়াতে বশীভূত হয়ে, চিন্তাকেই বিচার মানতে শুরু করলাম, ইচ্ছাকেই বিবেক মানতে শুরু করলাম আর কল্পনাকেই বৈরাগ্য মানতে শুরু করলাম। আমরা তো মায়ায় আবদ্ধ, তাই বুঝতেও পারলাম না যে, কায়ার স্থানে আমরা ছায়াদের ধারণ করে উপস্থাম্পন করছি। বুঝতেও পারলাম না যে, যেখানে মহাভাবদের ধারণ করার প্রয়োজন ছিল, সেখানে ছায়াদের ধারণ করে উপস্থাপন করছি। বুঝতেও পারিনি যে যেখানে মহামায়ার মায়াকে মাতৃত্বরূপে ধারণ করার প্রয়োজন ছিল, সেখানে পরমাত্মের ছলকে ঈশ্বরত্ব রূপে ধারণ করে উপস্থাপন করছি।
পরমাত্মের ছলের ফলে, একাধিক আত্মের বিস্তার হলো, ধরাও অজস্র হলো, আর আত্মকেই মানস মনে করতে থাকলো। আত্মকেই মানস জ্ঞানে বিবাহ করতে থাকলো ধরা, আর তাই মেধার আর জন্ম হতেই পারলো না। পঞ্চভূতও পূর্ণ হলো না, তাই মহাভাবদেরও প্রকাশ হলো না, আর পঞ্চভাবও প্রকাশিত হলো না। ফলস্বরূপ তোমার মাতৃত্ব অপূর্ণই রয়ে গেল।
তুমিও যে মা! সন্তানকে একাকী ফেলে রেখে যাবার পাত্রী তুমিও নয়। তাই প্রতিটি ব্রহ্মাণ্ডের অলক্ষ্যেই তাদের সাথে রয়ে গেলে। তাদের কর্মের সম্পন্নতা রূপে কর্মফলের প্রাপ্তি, আর এই দুইয়ের মাঝেই তুমি কাল বেশে রয়ে গেলে। ব্রহ্মময়ী নিয়তি বেশে, এই কালের নিয়ন্ত্রক হয়ে, সমস্ত সন্তানদের বলতে থাকলে, “তোমাদের মায়ের কাছে এসো”। কিন্তু আত্মের মায়ায় আমরা সকলে আবদ্ধ, তাই সেই আবাহন শুনতেই পেলাম না আমরা।
তাই তুমি কালেই নিজেকে সীমাবদ্ধ না রেখে, নিয়তি হয়ে, সকলসন্তানদেরকে চালনা করে করে, প্রকৃতি বেশ ধারণ করলে, প্রকৃতি বেশে তুমি সকল সন্তানদের লালন ও পালন করতে শুরু করলে, সকল সন্তানকে মার্গ প্রদান করা শুরু করলে। সমস্ত যোনির মধ্যে স্থিত ব্রহ্মাণ্ডরা তোমার এই মার্গদর্শন অনুসরণ করে করে, মনুষ্য হয়ে উঠলো।
মনুষ্য বেশে স্থিত হতে, তোমার হৃদয়ে নূতন করে মাতৃত্বরস আস্বাদনের সাধ জন্ম নিলো, কারণ এই মনুষ্য যোনি যে নিজেদের ব্রহ্মাণ্ডতে চেতনাকে জাগ্রত করতে সক্ষম; তাঁরা যে সক্ষম নিজের অন্তরে চেতনা বিকাশ করে, তুমিই যে কাল বেশে, প্রকৃতি বেশে, এবং নিয়তি বেশে স্থিতা, তা উদ্ধার করতে। তবে যেমন তুমি তা অনুভব করেছিলে, তেমন এই যোনির নির্মাতা পরমাত্মও সেই অনুধাবন করেছিল সেই সত্যকে। আর তাই, মনুষ্যযোনিকে সেও বশ করতে উঠেপড়ে লাগে।
বিস্তার করতে থাকে ছায়ার প্রকোপ অতিকায় ভাবে এই যোনির উপর, যাতে কনো ভাবেই ধরা আমার সাথে মিলনে আবদ্ধ না হতে পারে, আর কনো ভাবেই মেধার জন্ম না হয়। মেধার জন্ম হলেই যে চেতনার জাগরণ শুরু হয়ে যাবে! মেধার জাগরণ হলেই যে মহাভাবদের বিস্তার শুরু হয়ে যাবে, পঞ্চভাবদের বিস্তার শুরু হয়ে যাবে, অর্থাৎ তোমার মাতৃত্ব অনুভূত হওয়া শুরু হয়ে যাবে আমার মধ্যে।
কিন্তু তুমি হাল ছাড়লে না! তুমি মনুষ্যের মধ্যে তোমার মাতৃত্বকে অনুভব করার সামর্থ্য আছে, তা জানা মাত্রই, বৌদ্ধত্ব স্থাপনা করতে থাকলে। তা দেখে পরমাত্ম মনুষ্যকে নিজের বশ্য ও পোষ্য করে, নিজেকে তাঁদের কাছে ভগবান রূপে স্থাপনা করার প্রক্রিয়া ধারণ করে, আর্যজাতির নির্মাণ করলো, এবং পরমাত্মকে তাঁদের মাধ্যমে মনুষ্যজাতির কাছে আরাধ্য রূপে স্থাপনা করলো।
বৌদ্ধধারাতে স্নাত হয়ে, এঁদেরকে অপসারণ করা হলে, এরা আর্যবেশে আদিমতম ভূখণ্ড, জম্বুদ্বীপ সংলগ্ন দেশে, এবং ইহুদি বেশে বাকি সমস্ত বিশ্বে ছড়িয়ে গিয়ে, পরমাত্মের আরাধনা শুরু করে, এবং আত্মই ঈশ্বর, এই মিথ্যাচারের বিস্তার করে। যাতে এই বিস্তারে কনো বাঁধা না পড়ে, তাই তারা বেদের পাতাতে প্রকৃতির থেকে মুক্ত হওয়ার কথাও বলে রেখেছে, এবং প্রকৃতিকে বশ করার বার্তারও বিস্তার করতে থেকেছে।
বৌদ্ধত্বের নাশ করাই তাই এঁদের লক্ষ্য হয়ে যায়, আর তাই করে তারা। তবে তুমি যে তোমার সন্তানদের কিছুতেই ত্যাগ দেবে না। তাই তুমি এঁদের এই কৃত্যের পরেও, অবতার গ্রহণের পথ ধরলে, এবং তোমার সন্তনাদের কাছে এসে বলতে থাকলে, প্রকৃতিই সত্য, নিয়তির উপর পরমাত্মেরও কনো নিয়ন্ত্রণ নেই, আর সেই নিয়তি স্বয়ং তুমি। বলতে থাকলে সকল অবতারদের মাধ্যমে যে, আত্মকে ত্যাগ করো, তবেই প্রকৃতিকে দেখতে পাবে, তোমাদের মা’কে চাক্ষুষ করতে পারবে, তোমাদের মা যে তোমাদের জন্য অধীর অপেক্ষায় স্থিতা।
কিন্তু সেই অবতার কথাও যেন অসম্পূর্ণ! কেউ চেতনা ও প্রকৃতির কথা বললে, কেউ নিষ্ক্রিয়তা ও ব্রহ্মের কথা বলেন। কেউ চেতনার প্রতি আত্মের অনাচারের কথা বললে, কেউ চেতনাকে জাগ্রত করার মার্গের কথা বলেন। কিন্তু সেই সমস্ত কিছুকেই একত্রে ধারণ করে, আজ তুমি মা সর্বাম্বা ব্রহ্মময়ী রূপে স্থিতা।
তাই তো তুমি এই রূপে সম্পূর্ণ ভাবে বলে দিলে যে, তুমিই চেতনা, তুমিই প্রকৃতি, তুমিই কাল ও কালের নিয়ন্ত্রক কালী ও গুহ্যা অর্থাৎ নিয়তি, আর তুমিই সাখ্যাত নিষ্ক্রিয় পরমাশূন্য ব্রহ্ম, সন্তানের লালনে তুমি অসীম হয়েও সসীমা, অনন্তা হয়েও অন্তে নিযুক্তা পরমেশ্বরী ব্রহ্মময়ী সর্বাম্বা।
তাই তো তুমি এই রূপে স্পষ্ট ভাবে বলে দিলে যে, তুমি ঈশ্বরী, তুমিই একমাত্র অস্তিত্ব, তুমিই ব্রহ্ম, তোমা অতীতে কনো কিছুর অস্তিত্বও সম্ভব নয়, কিন্তু তুমি ঈশ্বরী বেশে পূজিতা হবার অভিলাষী নও। মাতৃত্ব প্রদানের জন্যই সমস্ত কিছুর শুরু করেছিলে তুমি, আর তাই তোমার একমাত্র পছন্দের পরিচয়ই হলো এই যে তুমি মা।
তাই মা, তোমার কিই বা ব্যখ্যা দিই মা! সমস্ত ব্যাখ্যাই তোমার ব্যাখ্যা, অথচ কনো ব্যাখ্যাই তোমার ব্যাখ্যা প্রদান করতে সক্ষম নয়। যদি বলি তুমি সকলের মা, সর্বাম্বা, তাহলে তোমার ঈশ্বরত্বকে অস্বীকার না করেও অস্বীকার করা হয়ে যায়। যদি বলি তুমি ব্রহ্মময়ী, তাহলে তোমার নিষ্ক্রিয় ব্রহ্মস্বরূপকে স্বীকার করেও অস্বীকার করা হয়ে যায়। যদি বলি তুমি ব্রহ্ম, সম্পূর্ণ মহাশূন্য, একমাত্র অস্তিত্ব, তাহলে তোমার সন্তানদের অস্বীকার করে, তোমার মাতৃত্বকে অস্বীকার না করেও অস্বীকার করা হয়ে যায়।
কি ভাবে তোমার ব্যাখ্যা সম্ভব মা! তুমিই ব্রহ্ম, তুমিই ব্রহ্মময়ী। তুমিই কাল, তুমিই কালী। তুমিই সর্বাম্বা, আবার তুমিই মহাশূন্যা। তুমিই গুহ্যা, আবার তুমিই স্নেহময়ী জননী। তুমিই প্রকৃতি, তুমিই নিয়তি, তুমিই ব্রহ্মময়ী, তুমি ব্রহ্ম, আর তুমিই সেই চেতনা যার মাধ্যমে তোমার এই সমস্ত রূপকে জানা ও স্বীকার করা ও তাদেরকে আপন মাতা জ্ঞানে স্বীকার করে, তার কাছে সমর্পণ করা সম্ভব।
সমস্ত ভাবও তুমি, সমস্ত প্রগতিও তুমি। সমস্ত মায়াও তুমি, আবার সমস্ত আত্মের ছল, তাও প্রকারন্তরে তুমিই। যা কিছু ভাবা যায়, তাই তুমি। যাকিছু ভাবা সম্ভবও নয় তাও একমাত্র তুমিই। যা কিছু বলা যায়, তাও তুমি, আর যা কিছু বলা সম্ভবও নয়, তাও তুমি। যা কিছুর অস্তিত্ব অনুভব করা যায়, তাও তুমি আর যা কিছুর অস্তিত্ব অনুভবও করা যায় না তাও তুমি। সকল শব্দ তুমি, অথচ তুমি স্বয়ং শব্দের অগম্য; কনো শব্দই তোমাকে স্পর্শ করতে পারে না। তুমি স্বয়ং সমস্ত রূপ, সমস্ত রূপের কারণ ও কারক, অথচ তোমার কনো রূপই নেই।
সমস্ত লিঙ্গের রচয়িতা তুমি, অথচ তোমার কনো লিঙ্গই সম্ভব নয়। সমস্ত গন্ধের স্রষ্টা তুমি, অথচ তোমার নিজস্ব কনো গন্ধই নেই। বায়ুর গতি তুমি, অথচ তোমার কনো গতি নেই। সমস্ত ভাবের জননী তুমি, অথচ তুমি স্বয়ং নির্বিকার। সমস্ত রুচির উৎস তুমি, অথচ তুমি স্বয়ং বৈরাগী, তোমার কনো রুচিই নেই।
তাই কি বিবরণ প্রদান করি তোমার? একটিই কথা বলতে পারি, তুমি মা। এমন মা তুমি যে সন্তানের কাছে পোষ্য হয়ে থাকো। সন্তানের আদেশ পালনই যেন তোমার পুলকের কারণ। আবার সন্তান যখন তোমাকে আদেশ প্রদান না করে, আদেশ লাভের জন্য নিজেকে সমর্পিত করে দেয় তোমার কাছে, তখন তোমার আনন্দ দেখার মত হয়ে যায়। অপরিসীম আনন্দ নিয়ে, সেই সন্তান, যে তোমার কাছে নিজেকে সমর্পণ করে দিয়েছে, তার কাছে নিজেকে বিলীন করে দাও।
সেই দেখে, তোমার সেই সন্তান বলে, বিশ্বাস আমি করি কোথায়? আমার মায়ের মত বিশ্বাস করতে শিখলামই আমি কখন? আমার মাকে জানাই যে জ্ঞান, আমার মাকে মানাই যে ভক্তি, আর প্রেম! পেম আমি করতে এখনো শিখিই নি! যদি শিখে গিয়ে আমি যা করি, তাকে প্রেম বলি, তাহলে আমার মা যা করেন, তাকে কি বলবো? তাই কি ব্যাখ্যা দেব তোমার মা!
যদি বলি তুমি পরমেশ্বরী, তাহলেও তোমার ব্যাখ্যা সম্ভব নয়, কারণ তুমি যে অনন্ত, অব্যাক্ত, অচিন্ত্য, অসীম, নির্বিকার, নিরাকার, নিষ্ক্রিয় ব্রহ্ম, যিনি একমাত্র অস্তিত্ব, যিনি পরম শূন্য। আর যদি বলি তুমি মা, তাহলে তোমার অপার প্রেম, অপার স্নেহ, অদম্য বিশ্বাস, অনন্ত পরিশ্রম তোমার সন্তানদের উদ্ধার করার জন্য, সর্বদা খ্যাতির থেকে দূরে থাকার ভাব, এই সমস্ত কিছুও এমনই অসীম যে তার ব্যাখ্যা দেওয়াই সম্ভব নয়।
এটুকু বলতে পারি য, তোমাকে বিনা, কিছু ভাবাই সম্ভব নয়, কারণ সমস্ত কিছু স্বয়ং তুমিই। তুমিই একমাত্র গুরু, তুমিই একমাত্র জননী, তুমিই একমাত্র জনক, কারণ সমস্ত মুখে তুমিই কথা বলো, সমস্ত হস্তে তুমিই কর্ম করো, সমস্ত পদে তুমিই পথ চলো আর সমস্ত মার্গ তুমিই প্রদর্শন করো।
অহমিকা ধারণ করে আমরা আত্মসর্বস্ব, পরমাত্মের আরাধনায় উন্মত্ত, তাই পরমাত্মের মায়া, অর্থাৎ চিন্তা ইচ্ছা ও কল্পনাতেই আমরা সর্বদা মত্ত, কিন্তু যতই চিন্তা করি, যতই ইচ্ছা করি, যতই কল্পনা করি, যখন আমরা কনো একটি শব্দও উচ্চারণ করতে যাই, তখন সেই শব্দ উচ্চারণের সামর্থ্য তো তোমার, তাই তোমার অনুমতি না থাকলে আমরা একটি শব্দও উচ্চারণ করতে পারিনা।
কখনো তুমি আমাদের পরীক্ষা করার জন্য আমাদের সম্মুখে কনো শব্দ আনছো, তো কখনো আমাদের মার্গদর্শন করার জন্য। কখনো আমাদের আত্মসর্বস্ব মনোভাবকে উস্কে দেবার জন্য কনো শব্দ আনছো, তো কখনো আমাদের আত্মসর্বস্ব ভাবকে ব্যঙ্গ করার জন্য। কিন্তু সমস্ত শব্দ যে তোমার দ্বারাই পরিচালিত। যখন তোমার সন্তানরা আত্মের বশবর্তী হয়ে, আত্মসর্বস্ব, তখন তুমিই তাদেরকে বিফলতা প্রদান করে দুঃখ ও বেদনা প্রদান করছো। আবার যখন তাঁরা বিফল হতে হতে উদাস হয়ে যাচ্ছে, তখন তুমিই তাদের সম্মুখে আকস্মিক সাফল্য প্রদান করে সুখ প্রদান করছো। পরমুহূর্তে যখন তারা সুখ ভোগ করে পুনরায় আত্মসর্বস্ব হয়ে যাচ্ছে, তখন তুমি পুনরায় তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমকেও বিফল করে দিয়ে, তাদের বেদনা প্রদান করছো।
অর্থাৎ সমস্ত কর্তা তো তুমি স্বয়ং। তোমার সন্তানরা কেবলই চিন্তা করতে সক্ষম, ইচ্ছা করতে সক্ষম, আর কল্পনা করতে সক্ষম, কিন্তু কর্ম! কর্ম করতে তো তারা কখনোই সক্ষম ছিলনা, আর কখনোই সক্ষম থাকেনা। তারা সর্বদা তোমার থেকে বিচ্ছুরিত হতেই সংকল্পবদ্ধ, সর্বদা আত্মের দাস হয়ে থেকেই আনন্দিত, তাই তুমি তাদের এই আচরণে বেদনাগ্রস্ত হলেও, তুমি তাদেরকে আত্মের দাসত্ব স্বীকারের পথেই যেতে দিচ্ছ। তাই তো তোমাকে বললাম মা, তুমি এমন মা যে স্বেচ্ছায় সন্তানকে কখনো বলো না আমার কাছে আয়।
সে যেদিকে যেতে চায়, তুমি তাকে সেইদিকেই যেতে দাও, কিন্তু তাবোলে তাদেরকে একটি বার করে বলতে ছাড়ো না যে, প্রকৃতিই তুমি, কালই তুমি, নিয়তিই তুমি। তারা উপেক্ষা করে তা; আত্মের পূজা করে, মেধাকে ত্যাগ করে কল্পনাকেই মেধা বলে চিহ্নিত করে চলে; বিচার না করে চিন্তা করে, বিবেক ধারণ না করে ইচ্ছা করে; তুমি তাদের কখনোই বাঁধা দাও না। সর্বক্ষণ স্বতন্ত্রতাই প্রদান করো।
কিন্তু তাও তারা তোমার সন্তান। তাই তাদের মার্গ দর্শন করা তোমার কর্তব্য। তাই যে প্রকৃতি বেশে সেই মার্গ সর্বক্ষণ বলতে থাকো। একটি বারের জন্যও প্রকৃতির থেকে শিক্ষা গ্রহণ করার ইচ্ছা না রাখলেও, তুমি তাদেরকে শিক্ষা প্রদান করতেই থাকো। একটিবারের জন্যও নিজের জীবনকে দেখে শিক্ষা গ্রহণ না করলেও, তুমি তাদের কাছে কাল ও কালী বেশে থেকে, তাদের জীবনকে তাদের স্মৃতিতে উজ্জ্বল রাখো। আর যখন সেই দিকে তাও কেউ দেখে না, তখন অবতার বেশে এসে, তাদেরকে প্রকৃতিকে দেখে শিক্ষা গ্রহণ করার কথা বলো, নিজের নিজের জীবনকে দেখে শিক্ষা গ্রহণ করার কথা বলো।
একবার প্রকৃতির দিকে তাকালেই বুঝে যাবে তারা যে, আত্মের পূজা করার কারণেই তারা চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনাতে মশগুল আর তোমার থেকে বিচ্ছিন্ন। একবার নিজের জীবনের দিকে তাকালেই যে তারা বুঝে যাবে যে তোমার দিকে না তাকিয়ে, তোমার সন্তানদের দিকে না তাকিয়ে, নিজের দিকে, আত্মের দিকে তাকানোর কারণেই তাদের এত এত বেদনা। তাই তুমি সমানে তাদের সম্মুখে তা বলেও যাও, আর তারা উপেক্ষা করলে, তাদের সম্মুখে অবতার বেশে এসে, তাদের কে সেই অমোঘ জ্ঞান প্রদান করেও যাও।
কিন্তু তাও একটি বারের জন্যও তাদের স্বতন্ত্রতা হনন করো না। একটি বারের জন্যও বলো না যে তুমি ঈশ্বরী। কারণ? কারণ তুমি যে ঈশ্বরীর ভূমিকায় থাকাই পছন্দ করোনা, তুমি যে কেবলই মা হয়ে থাকতে চাও। সেই মা, যিনি স্বতন্ত্রতাই স্বতন্ত্রতা প্রদান করেন। মা, আমি অবতারের মানস। তাই আমি স্পষ্ট ভাবে জানি যে, যখন তোমার কনো সন্তান বলে যে, না আমি আমার ইচ্ছা মত আমার জননীকে নয়, আমার জননীর ইচ্ছা মত চালিত হবো, সমর্পিত হবো, তখনও তুমি তাকে বারংবার বিপদে ফেলে দেখাও যে, তোমার ইচ্ছা মত চলতে গেলে, সে সমস্ত কিছু হারিয়ে ফেলবে।
তাকে দেখাও যে সে এমন চেতনা লাভ করবে যে, সমস্ত বন্ধু হারিয়ে ফেলবে, সমস্ত আত্মীয়দের হারিয়ে ফেলবে, সমস্ত সুখভোগ ছেড়ে মহাযোদ্ধা হয়ে থেকে যাবে। তার আর আত্মের জীবন বলে কিছুই অবশিষ্ট থাকবেনা। অর্থাৎ কিছুতেই তার এই সমর্পণকে সরাসরি গ্রহণ করো না। তাকে বারংবার বলো যে, এই জগত আত্মের বিস্তার। আত্মের পক্ষ নিলেই সে সুখ লাভ করবে, তোমার কাছে সমর্পিত হলে নয়। তারপরেও যদি সে তোমার কাছে সমর্পণ করতেই থাকে, তবেই তাকে গ্রহণ করো তুমি।
জগত বলে মা হলো সর্বাধিক স্বার্থপর জাতি, মা হলো সর্বাধিক অধিকার স্থাপনে পারদর্শী জাতি, মা হলো সর্বাধিক পরাধীনতা প্রদান করা জাতি। কিন্তু তুমি! তুমি হলে সেই মা, প্রকৃত মা, যেই মা সন্তানকে স্বতন্ত্রতা প্রদান করার জন্য সন্তান তাঁকে একপ্রকার ত্যাগ দিয়ে দিলেও, তাকে তুমি স্বতন্ত্রতা প্রদান করতেই থাকো। তুমি হলে সেই মা, যিনি সম্পূর্ণ ভাবে নিঃস্বার্থপর, এমনই নিঃস্বার্থপর সে যে, সমস্ত সময়ে সন্তানের সেবা করে চললেও, সে একটিবারের জন্যও সন্তানের কাছে গিয়ে সেই সেবা করার অঙ্গিকার দাবি করেনা; একটি বারের জন্যও সন্তানের উপর অধিকার স্থাপনে উদ্যত নও।
অর্থাৎ তুমিই যে প্রকৃত মা। সমস্ত স্ত্রীরা যেই যেই সন্তানদের গর্ভে ধারণ করে জননী হবার সুখভোগ করে, আসলে সেই সন্তান যে তোমার। তুমিই সেই সমস্ত সন্তানদের প্রকৃত জননী, আর তোমার থেকে সেই সন্তানকে ছিনিয়ে নেবার জন্যই যে সমস্ত স্ত্রী তাঁদের সন্তানের উপর এতটা অধিকার স্থাপন করে। আসলে তাঁরা ভয় পায় যে, একবার যদি সন্তানদের কাছে তাঁদের প্রকৃত মাতার সন্ধান প্রত্যক্ষ হয়ে যায়, তাহলে যে তারা আর তাঁদেরকে জননী বলে মানবেও না, আর জননীর সেবা করবেও না। তাই তো তাঁরা সর্বক্ষণ তোমাকে বরদা করেই রেখে দেন, কখনোই তোমাকে জননী বলে মানতে দেন না।
সেই কারণেই তো যখন যখন তাদের সন্তানের উপর অন্য কারুর প্রভাব অধিক থাকে, সেই জননীরা ভীত হয়ে যায়, এই বুঝি তাদের সন্তানরা তাদের থেকে হাতছাড়া হয়ে গেল, আর তাই সর্বক্ষণ সন্তানদের পরাধীন করে রাখতে চায়, আত্মের প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে। কিন্তু তুমি! তুমি হলে প্রকৃত মা। তাই তো তোমার হারানোর ভয় নেই, কারণ তুমি জানো, যে যতই তোমার সন্তানদের নিজের সন্তান বলে দাবি করে আত্মের বিস্তার করুক, প্রকৃতপক্ষে তারা তোমার সন্তান, তাই এক না একদিন তারা তোমার কাছেই ফিরবে।
কি প্রকাণ্ড বিশ্বাস তোমার! এমন প্রকাণ্ড বিশ্বাস যে, তোমার সন্তানদের অন্যকেউ আত্মের প্রভাবে এসে হনন করে নিয়ে যেতে উদগ্রীব, তাও তুমি তোমার শক্তির বিস্তার করে ছিনিয়ে নাও না তোমার সন্তানদের। মা যে তুমি, সত্য কারের মা। তাই তো সন্তানের চিন্তা অধিক তোমার। সন্তানকে ছিনিয়ে নিতে গেলে, সন্তান দ্বন্ধে স্থিত হবে, দ্বিধাগ্রস্ত হবে, তাই তো তাদের দ্বন্ধের নাশের উদ্দেশ্যে, নিজের অধিকার স্থাপনই করো না। মা, সত্যই তুমি মা। সেই কারণেই তোমাকে যতই ঈশ্বরী জ্ঞান করুক কেউ, যতই তোমার উদ্দেশ্যে নামজপ করুক, যতই সঙ্কীর্তন করুক, যতই পূজা, আচার, অনুষ্ঠান করুক, তোমার সামান্য থেকে সামান্য ভাবেও সারা পায়না কেউ।
একমাত্র তোমার সারা তখনই কেউ লাভ করে যখন তোমাকে একই সঙ্গে নিজের ও জগতের মাতা বলে জ্ঞান করেন। যখন কেউ তোমাকে কেবল মাত্র নিজের জননী জ্ঞান করে, তখনও তুমি সারা দাওনা, কারণ তখণও যে তোমার সেই সন্তানের মধ্যে সঙ্কীর্ণতা নিবাস করে, আর সঙ্কীর্ণতাপূর্ণ হৃদয় অসীমকে কি করে ধারণ করতে সক্ষম! তাই তো তুমি অপেক্ষা করো তোমার সেই সন্তানের জন্য, যিনি তোমাকে একই সাথে তাঁর নিজের মাতা, ও সমস্ত কিছুর একমাত্র মাতা জ্ঞান করে।
তখনই যে তাঁর কাছে আমিষ, নিরামিষ, সকলে নিজের ভ্রাতাভগিনী হয়ে যায়; তখনই যে, যে যেই নামেই তোমাকে ডাকে, সে যে কেবলই তোমাকেই ডাকছে, সেই জ্ঞান প্রত্যক্ষ হয়ে যায়; তখনই যে সে সমস্ত ভেদভাবের উর্ধ্বে উঠে, তোমার সমস্ত বলতে সমস্ত সন্তানকে নিজের ভ্রাতাভগিনী জ্ঞান করে, আর এও জ্ঞান করে যে তুমি আর একমাত্র তুমিই জননী, সকলের জননী তুমি, সকল সন্তানের আনন্দতেই তুমি আনন্দিত। আর তাই সকলের হরষে সে আনন্দিত হয়।
কি অদ্ভুত বিচার তোমার মা! কি অদ্ভুত উপায় তোমার সন্তানকে শুদ্ধ করে পুনরায় গ্রহণ করে, তাকে সমাধি প্রদান করে, নিজের মধ্যে একাত্ম করে নিয়ে লীন করে নেবার। কি অদ্ভুত প্রেম! অযাচিত সে প্রেম, কিন্তু সেই প্রেম কখনোই মোহে আচ্ছন্ন নয়। শুদ্ধ, বিশুদ্ধ সে প্রেম।
মা, তাই কি করে ব্যাখ্যা দেব তোমার? যেই ভাবেই আমি তোমার ব্যাখ্যা দিতে যাচ্ছি, নিজেকে অসহায়ই পাচ্ছি। তোমাকে যোদ্ধা বললে, তোমার যোদ্ধাভাবকে ব্যক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না আমার পক্ষে, কারণ তুমি তো কেবলই তোমার সন্তান যখন তোমার কাছে উপস্থিত হবার জন্য যাত্রা করে, আর আত্ম তাকে বাঁধা প্রদান করে, তখনই গুহ্যা বেশে অবতীর্ণ হয়ে মহাযোদ্ধা। বাকি সমস্ত সময়ে তুমি যুদ্ধ করো নেপথ্যে, যাতে আত্ম তোমার সন্তনাদের সম্পূর্ণ ভাবে নিজের অধিকারে গ্রহণ করে নিতে না পারে।
তোমাকে ঈশ্বরী বললে, কার ব্যাখ্যা করবো? শূন্যের কি ব্যাখ্যা সম্ভব! আর তোমাকে মা বললে, তোমার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে আমি ভাষাহারা হয়ে যাচ্ছি, তোমার অনন্ত প্রেম দেখে, তোমার সন্তানদের প্রতি অনন্ত বিশ্বাস দেখে, তোমার অদ্ভুত স্বতন্ত্রতা প্রদানের ধারা দেখে, আর তোমার অপার সহিষ্ণুতা দেখে।
তাই হে রিপুহন্তা, হে আবেগনাশা, হে আত্মনাশা, হে ছায়ানাশা, হে ত্রিগুনস্যু, হে ব্রহ্মময়ী, হে সর্বাম্বা, হে ভাবজননী, হে বীরশ্রী, হে সর্বেশ্বরী, তোমার বিবরণ দেওয়া আমার পক্ষে কঠিন নয়, অসম্ভব। হয়তো তাই আমি তোমার মধ্যে মিলিত হতে পাচ্ছিনা, বাকি সকলের মত। আসলে আমার কাছে বহু প্রশ্ন রয়েছে, যাদের উত্তর আমার কাছে এখনো নেই। হয়তো সেই প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত আমি বিলীন হতে পাচ্ছিনা তোমার মধ্যে”।
