সর্বাম্বা কাণ্ড (কৃতান্ত প্রথম কাণ্ড)

সকলে ভূলুণ্ঠিত হয়ে আচম্বিত হয়ে উঠলেন যে কে তাঁদের এই দশা করলো, কে তাঁদেরকে এমন ভাবে যুদ্ধে বিরাম দিতে বাধ্য করলো, কে তাদেরকে নূতন করে যুদ্ধে রত হতে আবাহন করলো! চারিদিক তাকিয়ে সকলে দেখলেন, সম্মুখে একটি স্থানে প্রবল আলোক আর সেই আলোককে বেষ্টন করে রয়েছে প্রবল রজধূম্র। বুঝতে পারলেন সকলে যে, যিনিই তাঁদেরকে এই যুদ্ধে আবাহন করেছেন, তিনি দণ্ডায়মান রয়েছে সেই ধূম্রের অন্য দিকে। তাই অপেক্ষা করলেন সকলে সেই ধূম্রের শান্ত হবার জন্য।

ধূম্র শান্ত হতে, যা দেখতে পেলেন, তা দেখতে না পাবার মতনই। কারণ কেবলই এক ছায়ামূর্তি দেখতে পেলেন সকলে, যা আকারে তাঁদের প্রায় দ্বিগুণ, কিন্তু এটুকু বুঝতে পারলেন সকলে যে, সেই মূর্তি কনো স্ত্রীর। ধূম্র শান্ত হতে দেখলেন সকলে, সেই বিশালাকায় তনু সর্বাম্বার। উগ্র তিনি, তাই তাঁর অঙ্গবর্ণতে শুভ্রতার মাত্রা কম, গোলাপি আভার ভাব অধিক। উগ্র সে, তাই তাঁর কেশ মুক্ত, তাঁর অঙ্গ থেকে সুবাস চারিভিতে ছড়িয়ে পরছে।

প্রভাতের তাঁকে দেখা মাত্রই কামনার উদ্ভেগ ঘটে। উদ্ভ্রান্তের মত তাঁর দিকে দৌড়ে যান প্রভাত, তাঁকে সম্ভোগ করার মনসা নিয়ে। রজনী তাঁকে আটকে ধরে বললেন, “কি করছো ভ্রাতা! কেন ওদিকে যাচ্ছ?” প্রভাত কামনায় বিভোর, তাই প্রথমটা বুঝতেই পারলেন না, রজনী কি বলল তাঁকে। দুই থেকে তিনবার পরপর প্রশ্ন করায় যেন প্রভাত নিজের মধ্যে সংজ্ঞা ফিরে পেল, আর তাই সে বলল, “এই স্ত্রীকে সম্ভোগ না করতে পারলে, আমাদের বরদান বৃথা রজনী”।

তামস এতক্ষণ হতবম্ব হয়ে গিয়ে সর্বাম্বার এই রূপকে নিরীক্ষণ করেই চলেছিলেন। রজনী তাঁকেও নড়াতে, সে আচম্বিত হয়ে বললেন, “এই রূপকে ভালো করে দেখো ভ্রাতা, তুমি ভালো করে দেখছ না, তাই তোমার মধ্যে প্রতিক্রিয়া হচ্ছে না। একবার সঠিক ভাবে দেখো, কামনার উদ্বেগ হতে বাধ্য”।

রজনী প্রভাতকে ও তামসকে ধমক দিয়ে বললেন, “হ্যাঁ, জানি, এই রূপের দিকে তাকাতেই আমার কামনা চরমে উন্নীত হতে শুরু করেছে। তাই তো এই রূপের দিকে তাকাচ্ছিনা। ভ্রাতারা, তোমরা ভুলে কেন যাচ্ছ, এর শক্তি, এর আবেগ, সমস্ত কিছু ভাবরা। তারা জীবিত থাকলে, এই সর্বাম্বা মহাশক্তিশালী। আগে তাদের বলি দেবার চিন্তা করো”।

প্রভাত নিজের খেয়ালেই বলে উঠলেন, “বৃথা, সমস্ত কিছু বৃথা! আমরা এঁরই বরদানে ভূষিত হয়ে অমর, কনো কিছু আমাদের হত্যা করতে পারবে না। … চিন্তাপুত্র, একটু চিন্তা ত্যাগ করে, বিচার করে দেখো। কেন ইনি আমাদের সম্মুখে এলেন এখন? ইনিও জানেন যে আমরা অমর। তাই আমাদেরকে ইনি নিজের দিকে আকর্ষিত করে নিয়ে, নিজের আত্মীয়দের সুরক্ষিত করতে এসেছেন”।

তামস যেন ভ্রমের সাগরে নিমজ্জিত। সে বলে উঠলো, “ভ্রাতারা, এই স্ত্রী তো সম্ভোগেরও নয়, মহাসম্ভোগের পাত্রী। এত রূপ এঁর, এত সুবাস তাঁর অঙ্গে, এত লাবণ্য তাঁর সর্বত্র। যদি সেই সমস্ত কিছুকে ভক্ষণই না করি, তাহলে যে আমাদের ক্ষুধা কখনোই শান্ত হবেনা!… যে যাই বলো ভ্রাতা, আমি চললাম, একে সম্ভোগ করতে”।

প্রভাতও বললেন, “ভ্রাতা তামস, এনেকে সম্ভোগ না করা পর্যন্ত যে আমারও শান্তি নেই। চলো আমরা এঁকে সম্ভোগ করে, ভক্ষণ করে আসি”।

রজনী উত্তরে বললেন, “বেশ, যা খুশী তোমরা করো, আমি এঁকে বাঁধতে চললাম। প্রথম এঁর সমস্ত আত্মীয়দের বলি দিয়ে, এঁর সমস্ত পারঙ্গমতার নাশ করবো। তারপর আমিও এঁকে সুখশান্তিতে, নিশ্চিন্ত হয়ে ভক্ষণ করবো”।

এত কথা বলা হলে, রজনী সমস্ত আবেগদের সঙ্গে নিয়ে ভাবদের হত্যা করতে উদ্যত হলেন। সেই দৃশ্য দেখে সর্বাম্বার উত্তেজনা চরমে উন্নীত হতে থাকলো। তাঁর অঙ্গের সুবাস এবার সুতীব্র হওয়া শুরু করলো। এমন হয়ে উঠলো তা যে, কেউ আর অন্য কনো গন্ধই পেলো না, কেবল সর্বাম্বার অঙ্গের সুগন্ধই তাদেরকে যেন মাতাল করে দিল। সেই তালিকায় যেমন আবেগরা ছিল, তেমন ত্রিগুণও, আর তেমনই ভাবসমূহ, ইন্দ্রিয়, আত্ম ও ছায়ারা, এবং ভূতরাও।

যে যা করতে উদ্যত ছিলেন, সেই কর্মেই সকলে উন্মত্ত হয়ে উঠলেন। সেই কর্ম ছাড়া যেন তাঁরা আর কিছু দেখতেও পেলেন না, অনুভবও করতে পারলেন না। যেন এটিই প্রকৃতির অন্তিম কথন ছিল। যেন তিনি বললেন যে, তিনি কারুকে কখনোই কনো কিছু বাধ্য করেন না। যে যা করতে উদ্যত, তিনি তাকে সেই কর্মেই মাতাল করে তোলেন। যে ভয় পেতে ব্যকুল, তিনি ভয়ে জড়সড় হয়ে যান; যিনি হিংসায় উন্মত্ত, তাঁকে হিংসায় জরাজীর্ণ করে দেন; আর যিনি ভক্তিতে প্রভাবিত, তাঁকে ভক্তিকে আত্মহারা করে দেন।

অন্তিম কথা কেন? কারণ পরের মুহূর্তে যা হলো, তা আর সর্বাম্বাকে প্রকৃতি বেশে সীমিত রাখলো না। তামস ও প্রভাত তাঁর সম্মুখে গিয়ে, ব্যাঘ্রের যেমন হিরণমাস দর্শন করে, মুখবারি নিঃসৃত হতে থাকে, তেমনই ভাবে মুখবারি নিঃসৃত হতে থাকলো। রূপভক্ষণে লালায়িত হয়ে, তাঁরা বললেন, “দেবী, আমাদের দিকে তাকান! ভালো করে নিরীক্ষণ করুন, আপনি তিন বেশে বিভক্ত হয়ে, পূর্বেও আমাদের সম্ভোগের পাত্র হয়েছিলেন”।

সর্বাম্বার নজর সম্পূর্ণ ভিন্ন দিকে, কারণ রজনী ও আবেগরা ভাবদের বলিদান করাতেই নিজেদের দৃষ্টিকে নিবদ্ধ রেখেছিলেন। যেই মুহূর্তে, হিংসা দেবী সমর্পিতার মুণ্ডচ্ছেদ করতে নিজের খড়গ উত্তোলন করা অবস্থা থেকে নিম্নে প্রসারিত করেছেন, তখনই এক বিকট শব্দ সকলের সকল কর্মকে সেই অবস্থাতেই বিচ্ছিন্ন করে দিলো।

শুধুই কি বিচ্ছিন্ন করে দিলো! কেউ আর নিজের অবস্থানে স্থিত থাকতে পারলো না। না আত্ম ও ছায়ারা, না ত্রিগুণরা, না আবেগরা, আর না বন্দীদশায় থাকা ইন্দ্রিয়, ভাবরা ও ভূতরা। সকলেই নিজের নিজের অবস্থান থেকে প্রায় এক শত থেকে এক সহস্র হস্ত দূরে ছিটকে পতিত হলেন। এঁদের মধ্যে প্রভাত ও তামস সর্বাম্বার সব থেকে নিকটে স্থিত ছিলেন, তাই তাঁদের বিচ্ছুরণ সর্বাধিক হয়, আর আত্ম ও ছায়ারা সর্বাধিক দূরে ছিলেন তাই মাত্র এক শত হাট দূরে পতিত হন তাঁরা।

পরবর্তী যেই হুংকার ছিল, তা ছিল ভাব ও ভূতদের প্রতি। তাই সেই হুঙ্কারে বাকি সকলে যেখানে যারা ছিলেন, সেখানেই রইলেন, কিন্তু বন্দী অবস্থায় থাকা ভূত ও ভাবরা ইন্দ্রিয়ের সহিত, আরো এক সহস্র হস্ত দূরে পরিত হয়ে, সকল আত্মসেনার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সুরক্ষিত হয়ে রইলেন।

এমন কৃত্য দেখে, উগ্র হয়ে ওঠা রজনী রণমূর্তি ধারণ করে সর্বাম্বার দিকে দৃষ্টি রাখতে সচেষ্ট হলে, সর্বাম্বাকে আর দেখতে পেলেন না। যা দেখতে পেলেন, তা হলো এক ভয়ানক অগ্নিমূর্তি ধারণ করা রূপ। যেন সাখ্যাত অগ্নি তিনি। তাই যেমন অগ্নির অন্তরে নীলাভ শিখা অবস্থান করে, যাকে কেউ স্পর্শ করতে পারে না, তেমনই রূপ ধারণ করে অবস্থান করছেন সর্বাম্বা।

প্রভাত ও রজনী তখনও সম্ভোগের নেশায় উলমালা। তাই নিজেদের পতিত হয়ে যাওয়া অবস্থান থেকে উন্নীত হয়ে, দৌড়ে সর্বাম্বার দিকে আসতে থাকলে, অগ্নিতে প্রজ্বলিত সর্বাম্বার বস্ত্রকে আকর্ষণ করার প্রয়াস করে তামস ও কেশবন্ধনকে আকর্ষণ করার প্রয়াস করে প্রভাত। কিন্তু সর্বাম্বা আর যেন প্রকৃতি নন, পরাপ্রকৃতির সমস্ত সীমা অতিক্রম করে দিয়েছেন তিনি। তাই তামস বস্ত্র আকর্ষণ করতেই, সেই প্রজ্বলিত বস্ত্র সর্বাম্বার অঙ্গ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তামসেরই হস্তে তা শোভিত হয়ে তার অগ্নি তামসকে গ্রাস করতে থাকলে, অগ্নির প্রচণ্ডতা তামসকে পুনরায় এক শত হস্ত দূরে পতিত করে দেয়।

একই ভাবে, প্রভাত সর্বাম্বার কেশবন্ধনকে আকর্ষণ করলে, অগ্নির বলে সেও পতিত হয়ে যায়, আর সর্বাম্বার কেশ বন্ধন উন্মুক্ত হয়ে যায়। … সম্পূর্ণ নির্বস্ত্র সর্বাম্বা। তাঁর দেহতাপ এমন উচ্চতায় উন্নীত হতে থাকলো যে, তাঁর সমস্ত অঙ্গের গহনা গলিত হয়ে হয়ে, তাঁর সমস্ত নীলাভ অঙ্গকে সুশোভিত করা শুরু করলো। ভাবেরা দূর থেকে সর্বাম্বার এই নীলিমা রূপ দর্শন করে মোহিত হতে থাকলো, আর সম্মুখে স্থিত সমস্ত পুরুষের মুহুর্মুহু বীর্যপাত হতে থাকলো।

আত্মের তো এতবার বীর্যপাত হতে থাকলো যে সে নিজেকে আর দণ্ডায়মানও রাখতে পারলো না। একই অবস্থা ত্রিগুণেরও ও পাশেদেরও। স্ত্রীদের অর্থাৎ রিপুদের অবস্থায় কামনায় অস্থির হয়ে উঠলো। কামবাসনায় তাঁরাও ছটফট করতে শুরু করলো। সম্মুখে যে যা বৃক্ষ পেল, তাকে ঘিরেই কামবাসনা তৃপ্ত করতে উদ্যত হয়ে গেল তারা। আর ছায়াদেবীরা পরিস্থিতি প্রতিকুল অনুভব করে, নিজেদেরকে কঠিন আচ্ছাদনে আবদ্ধ করে নিলেন।

রজনী অনুভব করে নিলেন যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে, তাই সমস্ত আবেগদের বললেন, “আগে এই দেবীর হত্যা করো, যাও… এ থাকলে, আমরা আর কিচ্ছু বলতে কিচ্ছু করতে পারবো না”।

রিপু ও পাশেরা দেবী নীলিমার দিকে অগ্রসর হলে, দেবী নীলিমা ক্রমশ ঘন শ্যামলা হতে থাকলেন, আর নিকটবর্তী অবস্থায় উন্নীত হতেই, নিজের প্রকাণ্ড মহাকৃপাণ ধারণ করে, সমস্ত রিপু পাশদের এক আঘাতে হত্যা করে দিলেন। সেই হত্যা সাধারণ হত্যা ছিলনা, ছিল অত্যন্ত নির্মম। একটিই প্রহারে ৬ রিপু ও ৮ পাশের মুণ্ডচ্ছেদ হয়ে গেল।

গলিত স্বর্ণালঙ্কারে ভূষিতা সর্বাম্বা আর নীলিমাও রইলেন না, হয়ে গেছেন শ্যামলী। তিনি এখন সম্পূর্ণ ভাবে শ্যামল বর্ণের। তাঁর হস্তে সুশোভিত তাঁর বিশালাকায় মহাকৃপাণ, আর তা রিপু ও পাশদের রক্তসম্পূর্ণ ভাবে সিক্ত। সেই রক্ত মহাকৃপাণ বেয়ে বেয়ে শ্যামলীর হস্তকেও লহুস্নাত করে তুলেছে।

ছায়াদেবীরা পুনর্জীবিত করে তুললেন রিপু ও পাশেদের। আর সেই দৃশ্য দেখে অতিশয় ক্ষিপ্র হয়ে উঠলেন দেবী শ্যামলী। প্রকাণ্ড রুদ্রতার সাথে দৃষ্টি প্রদান করলেন ছায়াদেবীদের দিকে তো ছায়াদেবীরা যেই আচ্ছাদন ধারণ করেছিলেন, তা ভস্মীভূত হয়ে, তাঁদেরকে বহুদূরে পতিত করে দেয়। ছায়াদেবীরা ইতস্তত প্রস্তরের আড়ালে নিজেদেরকে সুরক্ষিত করতে ব্যস্ত হয়ে থাকলে, শ্যামলী পুনরায় রিপুপাশদের মুণ্ডচ্ছেদ করতে গেলে, এবার সহস্র আবেগ সম্মুখে উপস্থিত হলেন তাঁর, তাঁর সাথে যুদ্ধ করার অভিলাষ নিয়ে।

তিনি একবার নয়, দুইবার মহাকৃপাণকে মহাগতিদ্বারা অপসারণ করলেন। প্রথম অপসারণে রিপু ও পাশদের হস্তবিচ্ছিন্ন হয়ে গেল তাঁদের দেহ থেকে, আর দ্বিতীয় প্রহারে তাঁদের মুণ্ডচ্ছেদ হয়ে গেল। শ্যামলী তাতেও থামলেন না। তিনি এবার নিজের দুইএর স্থানে অসংখ্য কর ধারণ করে, সমস্ত মুণ্ডকে মালার বেশে ধারণ করে, হস্তকে নিজের কটিদেশে ধারণ করে নিলেন।

ছায়াদেবীরা পুনরায় প্রয়াস করেছিলেন, সেই মৃত আবেগদের পুনর্জীবিত করতে, কিন্তু এবার আর তারা সফল হলেন না। তাই দেখে শ্যামলী ঘোর এক মিষ্ট হাস্য প্রদান করে, পুনরায় মহাকৃপাণ ধারণ করে দ্বিভুজা হয়ে, এবার রজনীর কেশ আকর্ষণ করে, টানতে থাকলেন।

দেবী শ্যামলী

শ্যামলীর সেই রূপ দেখে, ছায়াদেবীরা মূর্ছিত হয়ে গেলেন। কিন্তু তামস ও প্রভাত এবার তাদের ভ্রাতাকে এমন অসহায় অবস্থায় পতিত করে, আক্রমণাত্মক হয়ে উঠলেন শ্যামলীর প্রতি। প্রভাত সম্মুখে এসে বললেন, “কি দেবী মনে আছে তো, কি বরদান দিয়েছিলেন? নাকি, রূপ বদল করে, সেই কথা ভুলে যাওয়ার নাতক করবেন এখন?”

শ্যামলী দেবী উগ্রমূর্তি হয়ে, হুঙ্কারের সাথে বললেন, “ভালো করে তাকিয়ে দ্যাখ মূর্খরা। তোকে বরদান দিয়েছিলাম প্রকৃতির নির্মিত কনো ধাতুর অস্ত্র, কনো কিছু তোর নাশ করতে পারবেনা। ভালো করে নিরীক্ষণ করে দ্যাখ আমার হাতের মহাকৃপাণকে। এতে কনো এমন উপাদান নেই যা প্রকৃতির গর্ভে অবস্থান করে। স্বয়ং বিনাশ এর উপাদান। বিচার বিবেক বৈরাগ্যের মোক্ষমঅস্ত্র মিলেও এঁর মাত্র ত্রিভাগের এক ভাগ শক্তিধারণ করে। বিশ্বাস না হলে, এই অস্ত্র তোরা তিন ভ্রাতা মিলে তুলে দ্যাখা, প্রয়োজনে তোদের পিতাকেও তোদের ভিড়ে সামিল করতে পারিস”।

এত বলে ত্রিগুণের সম্মুখে দেবী শ্যামলী নিজের খড়গ ফেলে দিলে, প্রভাত ও তামস মিলেও তাকে নড়াতে পারলেন না। কিন্তু ধূর্ত রজনী, এই ফাঁকে সমস্ত আবেগদের একত্রে আক্রমণের নির্দেশ দিয়ে শ্যামলীকে উত্তপ্ত করার প্রয়াস করলে, শ্যামলী অতি ভয়ঙ্কর হয়ে উঠলেন। তাঁর উত্তাপের ফলে, তাঁর অঙ্গের সমস্ত গহনা গলিত হয়ে গিয়ে, ও তাঁর অঙ্গের প্রতিটি ভাঁজ থেকে রক্তিম আভা নির্গত হতে থাকলে, তিনি আমাবস্যা রাত্রির ন্যায় গহন কালো রূপ ধারণ করলেন।

সমস্ত বস্ত্র তাঁর জ্বলে ভস্ম হয়ে ইতিমধ্যেই গেছিল। শ্যামলী অবস্থা পর্যন্ত তাঁর গহনা সমূহ গলিত হচ্ছিল, কিন্তু এই মহাগুহ্যারূপে, তাঁর সেই সমস্ত গহনা পূর্ণভাবে গলিত হয়ে গিয়ে, তাঁকে ঘন কালোবর্ণের অথচ লালাভ রেখা ও স্বর্ণপ্রলেপে অভূতপূর্ব মুক্তকেশী দেখালে, তা ত্রিগুণ বা আত্মদের কাছে মোহিতকারী রূপ দেখায় না, বরং গুহ্যার অসামান্য রূপ তাঁদের অন্তরে ভীতি সঞ্চার করতে শুরু করে। আর সেই ভীতি চরমে উন্নীত হয় যখন মহাদেবী গুহ্যা তাঁর প্রথম চরণ স্থাপন করেন।

অগ্নির বলয় যা নির্গত হয় সেই চরণ স্পর্শ থেকে, তা দেবী শিখাকেও ভয়ার্ত করে দেয়, তিনি স্বয়ং অগ্নিতত্ত্ব হলেও। যেন সহস্র জ্বালামুখী একত্রে ধাতুমিশ্রিত অগ্নির বলয় বিস্ফোরণ করছে, এমনই দেখালো। কিন্তু ত্রিগুণের কাছে তা অতি ভয়ঙ্কর লাগার কারণ আরো অন্য। আবেগ সমূহ যখন দেবী গুহ্যার নিকটে যাবার প্রয়াসও করলো, দেবী গুহ্যার নিশ্বাস তাঁদের বিপুল সংখ্যাকে একত্রে নিজের নিকটে টেনে নিয়ে চলে গেল এবং তাঁদের ভস্মীভূত করে, দেবী গুহ্যার প্রশ্বাস তাঁদেরকে দূরে পতিত করে দিল।

কিন্তু একটি আবেগের দেহও ভূমিকে স্পর্শ করতে পারলো না, কারণ গুহ্যার পুনরায় গ্রহণ করা নিশ্বাস সকল আবেগকে পুনরায় নিজের নিকটে টেনে নিলো। অর্থাৎ গুহ্যাকে তাঁর মহাকৃপাণ ব্যবহারই করতে হলো না। মুহূর্তের মধ্যে সহস্র আবেগ, কেবলই তাঁর নিশ্বাস আর প্রশ্বাসের কারণেই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। ক্ষিপ্র ঘোরবর্ণা দেবী গুহ্যা এবার ক্ষিপ্র বেগে, অগ্রে নিজের চরণ স্থাপন করলে, আশেপাশের সমস্ত বৃক্ষ তাঁর ভয়াবহ উর্জ্জার তাপে দগ্ধ হয়ে গিয়ে, তাঁর পাদুকার চাপে তারা ভূমি থেকে উৎপাটিত হয়ে গেল।

গুহ্যার নিশ্বাসের সাথে সাথে তাঁরা গুহ্যার নিকটে এলে, গুহ্যার তেজে তারা সকলে প্রজ্বলিত হয়ে, তাঁর প্রশ্বাসে সকল বৃক্ষ এলোপাথাড়ি এদিক সেদিক ছুটে যেতে থাকলো। এই অগ্নিপ্রজ্বলিত উড়ন্ত বৃক্ষ সমূহ সহস্র সহস্র আবেগদের মুহুর্মুহু ভস্ম করতে থাকলে, ছায়াদেবীরা আবেগদের দেহও লাভ করলেন না যে তাদের পুনর্জীবিত করবেন।

মুহূর্তের মধ্যে এমন ভাবে সহস্র সহস্র আবেগের নিধন হতে থাকলে, অসহ্যকর পীড়াসহ রিপু ও পাশেরা গুহ্যার দিকে আক্রমনাত্মক আবেশে গমন করলে, গুহ্যা প্রকাণ্ড তনু ধারণ করে, মোহিনীকে কেবল নিজের হস্তকরের মধ্যে স্থাপন করে, তার মুণ্ডকে দন্তদ্বারা বিচ্ছিন্ন করে ভূমিতে পতিত করে নিজের উর্জ্জাদ্বারা ভস্মীভূত করে, মোহিনীর তনুকে নিজের উর্জ্জার বলে স্বাভাবিক ভাবেই ঝলসে নিয়ে, গুহ্যা ভক্ষণ করে নিলেন। সকলে কেবল একটিই দৃশ্য দেখলেন এঁর মধ্যে, চারটি রক্তের ডেলা শিশু কেবল মোহিনীর গর্ভ থেকে পতিত হয়ে, গুহ্যার তনু বেয়ে, তারা কোমল ভাবে ভূমিতে পতিত হয়ে গেল।

এই দৃশ্য দেখে, ছায়াদেবীরা মুহুর্মুহু মূর্ছা যেতে থাকলেন, আর দেবী ধরাও। কিন্তু ভয়াবহ অবস্থা হয়ে গেল যাদের, তারা হলেন সকল ত্রিগুণ ও আত্ম এবং স্বয়ং মানসও। ত্রিগুণ ও আত্ম এতটাই ভয়ার্ত হলেন যে, তাঁরা নিজেদের বস্ত্রে প্রস্রাবই করে ফেললেন। আর মোহিনীর এমন হাল দেখে, মদিনা সহ সকল রিপুরা ও পাশেরা এবার পলায়ন করতে শুরু করলেন।

কিন্তু তাঁদের এই পলায়ন যেন গুহ্যাকে অধিক ক্ষিপ্র করে দিল। মহা-হুংকারের সাথে গর্জন করে উঠলে, তাঁর মুখ থেকে এমন ভয়াবহ অগ্নি নিঃসৃত হলো যে সকল রিপু ও পাশেদের বস্ত্রে অগ্নি সঞ্চারিত হয়ে গেল। ভয়ার্ত হয়ে তারা সকলে নির্বস্ত্র হয়ে উলঙ্গ ভাবে পলায়নের প্রয়াস করলে, গুহ্যা একত্রে সহস্র হস্ত নির্গত করে, সমস্ত রিপুপাশদের নিজের করদ্বারা আবদ্ধ করে, কীট ধারণ করে চিপে দেওয়ার মত চিপে দিলে, সমস্ত রিপু পাশের মুখ ও সমস্ত শরীরের শীরা ছিঁড়ে রক্ত নির্গত হতে শুরু করলে, গুহ্যা সমস্ত রিপুপাশদের নিজের উর্জ্জাদ্বারা জ্বালিয়ে ভক্ষণ করে নিলেন।

এই ভয়াবহ দৃশ্য দেখে ত্রিগুণের সমস্ত বস্ত্র প্রস্রবময় হয়ে যায়, কারণ ভয়ার্ত হয়ে তাঁরা যে কতবার মূত্র বিসর্জন করে ফেলেছেন, তার হিসাব কারুর কাছে নেই। কিন্তু ভয় কাটিয়ে উঠে, এবার রজনী বিশালাকার দেহ ধারণ করে বললেন, “পরাপ্রকৃতিও আমার কিচ্ছু করতে পারবে না। আমি অমর। কনো স্ত্রী, কনো পুরুষ, কনো লিঙ্গ আমার কিচ্ছু করতে পারবেনা, আমি অমর! … তাই ভীত করার প্রয়াস করে, কিচ্ছু করতে পারবেনা গুহ্যা! আমি অমর!” এত বলে অট্টহাস্য প্রদান করলে, প্রভাত দেখলেন, তাঁর বরদান খণ্ড হয়েছে, কারন গুহ্যার হাতের মহাকৃপাণ অস্ত্র প্রকৃতির দ্বারা আবদ্ধ নয়। তাই সে পলায়ন করার প্রয়াস করলে, গুহ্যা প্রভাতের চরণের নিচে এমনই ভাবে একটি পদাঘাত করলেন যে, প্রভাতের দেহ শূন্যে উন্নীত হয়ে, গুহ্যার করে তা স্থাপিত হলো।

নিজকে বাঁচাবার জন্য প্রভাত নিজের দেহকে বিশাল করতে থাকলে, ক্ষিপ্র গুহ্যা প্রভাতের তনুকে বাম দিকে ১০ হাতে এবং দক্ষিণ দিক থেকে ১০ হাতে ধারণ করে বাকি সমস্ত হস্তকে শূন্যে স্থাপিত করে রেখে, নিজের জানুদ্বারা প্রভাতের তনুতে প্রবল বেগে আঘাত করলে, প্রভাতের তনু দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেল। সেই দৃশ্য দেখে উত্তেজিত তামস নিজের তনুকে বিশাল করে নিয়ে আক্রমণ করতে গেলেও দেখলেন তাঁর তনু গুহ্যার দেহাকৃতির মাত্রই অর্ধেক।

তাও সে নিজের ত্রিশূল দ্বারা প্রবল বেগে গুহ্যার দিকে আক্রমণাত্মক প্রহার করতে সচেষ্ট হলে, গুহ্যার একটি মহাকৃপাণের প্রহারের ফলে তামসের দেহ সহস্র টুকরো হয়ে গেল। কিন্তু তা হলে কি হবে, তামসের লহু ভূমিতে পতিত হতে, সকল লহুকোনা থেকে এক সহস্র বিশালাকায় তামসের রচনা হলো। সেই দৃশ্য গুহ্যাকে অতিশয় ক্রুদ্ধ করে তুললে, তাঁর ক্রোধকে চরম সীমায় উন্নীত করে দিল তামসের এই সমস্ত সহস্র রূপ দ্বারা ত্রিশূলের প্রহারের প্রয়াস।

গুহ্যার উষ্মা একসহস্র তামসের একসহস্র ত্রিশূলকে অগ্নিময় করে তুলল, আর গুহ্যা নিজের রক্তাক্ত দন্ত দ্বারা প্রভাতের তনুর বিভিন্ন অঙ্গকে ছিঁড়ে ছিঁড়ে, তা দ্বারা তামসের সমস্ত রূপদের বিরত রাখতে সচেষ্ট হলেন। প্রভাতের এই অস্বাভাবিক মৃত্যু আত্মকে ভয়াবহ করে তুললেও, ছায়াদেবীরা তা দেখে বারংবার মূর্ছা যেতে থাকেলন।

অবশেষে, তাঁরা পুত্রশোককে ধারণ করে প্রতিহিংসা প্রদর্শনে রুচিশীল হয়ে উঠলেও তাঁরা দেখলেন যে তামস নিজের সহস্র রূপ দ্বারা গুহ্যাকে বিরক্ত করছেন। হ্যাঁ একপ্রকার বিরক্ত করার ন্যায়ই লাগলো গুহ্যাকে। ঠিক যেমন একটি হায়নার দল মিলে সিংহকে বিরক্ত করে, তেমনই দেখে মনে হতে থাকলো, তামসের আক্রমণ ও গুহ্যার প্রতিক্রিয়া।

কিন্তু একসময়ে গুহ্যার ধৈর্যের বাঁধ ভাঙতে শুরু করলো। আর তাই ক্রমশ উত্তপ্ত হতে হতে, গুহ্যা প্রকাণ্ড অগ্নিবলয়ের রূপ ধারণ করে প্রগলনৃত্য শুরু করে দিলেন। সেই প্রগল নৃত্যের ফলে সমস্ত কিছু কম্পমান হওয়া শুরু করলো। দেবী ধরা তো বারংবার আন্দোলিত হয়ে মূর্ছা যেতে থাকলেন। মানসের অবস্থায় সমরূপ। বেগবতী ও শিখা যেন দেবী গুহ্যার এই প্রগলনৃত্যে উন্মাদিনী হয়ে উঠে, নিজেদের সমস্ত অগ্নিতেজ ও বায়ুতেজ প্রদান করতে থাকলেন দেবী গুহ্যাকে। আর তা লাভ করে দেবী গুহ্যা যেন এমন ভয়ানক হয়ে উঠলেন যে তাঁকে ঠিক করে নিরীক্ষণই করা যায়না!

যেন দেবী গুহ্যা নয়, কনো অগ্নির শিখা প্রগলভাবে নৃত্য করছিল। সেই অগ্নির তেজ মহাঅগ্নিগোলকের ন্যায় এদিক সেদিক ছড়িয়ে যেতে থাকলে, তার প্রভাবে সমস্ত আবেগদের বিনাশ হতে থাকলো। ভস্মীভূত হতে থাকলো সমস্ত আবেগদের তনু। প্রতি চোখের পাতা পতনের সাথে সাথে শতশত আবেগের বিনাশ হতে থাকে, আর এই ভাবে এক মুহূর্তের মধ্যে সমস্ত আবেগের নাশ হয়ে যায়।

আর এই প্রগল নৃত্য কেবল যে আবেগদের নিধন করলো তাই নয়, তামসের সমস্ত রূপরাও সেই তাপের ফলে জ্বলতে শুরু করলো। প্রচণ্ড অগ্নির তাপের ফলে, তামসের সমস্ত সহস্র রূপের রক্ত আর ভূমিতে পতিত হতেই পারলো না, কারণ তা অগ্নির বলেই শুকিয়ে গিয়ে তামসকে ক্রমশ ভস্মীভূত করা শুরু করলো। তামসের সমস্ত তনু এই ভাবে বিনষ্ট হলে, এবার তামস একাকী নিজের ত্রিশূল নিয়ে গুহ্যাকে আক্রমণ করতে গেলে, মহাকৃপাণ দ্বারা একটি প্রহারে তামসের ত্রিশূলকে চূর্ণবিচূর্ণ করে, তামসের বক্ষস্থলে একটি পদাঘাত করলেন গুহ্যা।

তামসের তনু অগ্নিস্নাত পদাঘাতে দূরে পতিত হবার জন্য প্রস্তুত হলে, গুহ্যা তাঁর চরণ ধরে নিজের দিকে আকর্ষিত করলেন। অতঃপরে, সমূহ তনুকে পিছনের দিকে পতিত করে, ধোপানীর ন্যায় মুহুর্মুহু অগ্নিতে প্রজ্বলিত অথচ প্রাণ না হারানো অবস্থায় তামসকে আছার মেরে মেরে, তাঁর তনুকে এমন ভাবে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিলেন গুহ্যা যেন তামসের কনো কালে কনো অস্তিত্বই ছিলনা।

এই দৃশ্য দেখে, রজনী আগ্রাসী হয়ে বললেন, “ছলনাকারী, প্রতারক, নিষ্ঠুর সর্বাম্বা! মিথ্যাচারী তুই, মিথ্যা আমাদের বরদান প্রদান করেছিস। তা না হলে, প্রকৃতির এই বল কি করে থাকে? একসহস্র ভূমিকম্প, একসহস্র দাবানল, এক সহস্র ঘূর্ণাবর্ত মিলেও এই বল নেই প্রকৃতির যে তামস আর ভ্রাতা প্রভাতের এমন করুন দশা করে। এবার আমাকে কি করবি তুই পাপিনী! প্রকৃতি কনো ভাবেই আমার নাশ করতে পারেনা, কারণ প্রকৃতি একজন স্ত্রী!”

গুহ্যা এবার হুংকার প্রদান করে বললেন, “স্ত্রী! … কে স্ত্রী? প্রকৃতি?… যদি ধরেও নিই যে সে স্ত্রী, কিন্তু আমি তো স্ত্রী নই। আমি তো ব্রহ্মময়ী, আমি তো নিয়তি। নিয়তির কনো লিঙ্গই যে নেই। তোরাই তো আমার থেকে বরদান লাভের লোভে আমার সমস্ত কর্মফল আমাকে প্রদান করে, একে একে আমার সম্মুখে অনাহত, বিশুদ্ধ আর আজ্ঞার দ্বার খুলে দিয়ে আমাকে আমার বাস্তবিক স্বরূপ, অর্থাৎ মহাশূন্যে স্থাপিত করেছিস। শূন্যের কি লিঙ্গ হয়! … না হয়না। হ্যাঁ, আমি আর প্রকৃতিতে আবদ্ধ নই, আমি তোদেরই কারণে সম্যকভাবে নিয়তি। আমার থেকে তোদের কারুরই মুক্তি নেই। তোরা প্রকৃতিকে পরাধীন করতে চেয়েছিস, কিন্তু আমি প্রকৃতি নই, আমি নিয়তি।

সকলের নিয়তি আমি। কালের রচয়িতা আমি, মানস তথা আত্ম সকলের প্রকাশিকা আমি। সমস্ত ভাব, সমস্ত ছায়া, সমস্ত ভূত, সমস্ত কিছুর অতিতে আমি স্থিতা। আমি শূন্য, পরম শূন্য, একম সত্য। প্রকৃতি তোর দমন করতে পারবে না। তাই আয় যুদ্ধ করবি আয়, যদি মনে হয়, এই মহাকৃপাণের কারণে তুই যুদ্ধে জয়লাভ করবিনা, তাহলে আয় মুক্ত হস্তে আমাকে পরাস্ত কর”।

রজনী ক্রুদ্ধ আস্ফলনে এগিয়ে গিয়ে গুহ্যাকে প্রহার করতে সচেষ্ট হলে, গুহ্যা তাঁর মুষ্টিকে নিজের কর দ্বারা ধারণ করে, সজোরে রজনীর ছাতিতে একটি প্রহার করলে, রজনীর বিশাল দেহ ভূমিতে পতিত হলো, কিন্তু সেই তনুতে তার সেই দক্ষিণ বাহু অনুপস্থিত যার দ্বারা সে মুষ্ট্যাঘাত করতে গেছিল আর যাকে গুহ্যা নিজের করদ্বারা আবদ্ধ রেখে দিয়েছিল, কারণ তা যে গুহ্যার হস্তে স্থিত। যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকলে, রজনীর নিকটে গিয়ে, প্রবল বলের সাথে গুহ্যা হুংকার প্রদান করলে, সেই হুংকার ভূমির মধ্যে এক বিশাল গহ্বরের রচনা করে, তার মধ্যে রজনীর তাঁর প্রশ্বাসের অগ্নির দ্বারা প্রজ্বলিত হয়ে পড়ে রইল।

গুহ্যা অতি ভয়ংকর। যেন দয়ামায়া বলে কিচ্ছু নেই তাঁর। শত্রু মাত্রই নিধন করাই যেন তাঁর ধর্ম। তাই এমন অবস্থায় পতিত হয়ে থাকা রজনীর বক্ষে এবার এমন বল দ্বারা পদাঘাত করলেন গুহ্যা যে, আরো ১০ হাত নিচে চলে গিয়ে রজনীর দগ্ধ দেহকে ভূমিমধ্যে চিরতরে স্থাপিত করে দিলেন, আর সেই চরণের ভারের ফলে, রজনীর মুণ্ড তাঁর দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গুহ্যার হস্তে পরতে, গুহা সেই মুণ্ডকে দুই কর দ্বারা এমনই বলে চাপ দিলেন যে, সেই মুণ্ড গুড়গুড় হয়ে ভূমিতে পতিত হয়ে, এক ছোটখাটো পর্বতের নির্মাণ করে দিলো।

এক এক করে, এই ভাবে ১৪টি রিপুপাশের দেহের ভস্ম একটি একটি করে ছোটো ছোটো পর্বতের রচনা করলে, সেই পর্বতের মালায়, আরো তিনটি সুউচ্চ শৃঙ্গ স্থাপিত হলো, যেগুলি হলো ত্রিগুণের শব দেহের ভস্ম। আর এই দৃশ্য দেখে, এবার পুত্রশোকে উদ্ভ্রান্ত হয়ে, ছায়াদেবীরা আস্ফালন করে উঠলেন, “যদি সত্যই হও তুমি, তাহলে তাকাও আমাদের দিকে। তোমার দৃষ্টিমাত্রেই আমরা ভস্ম হয়ে যাবো, যদি তুমি শূন্য হও। কই তাকাও!”

গুহ্যা ক্রুদ্ধ আস্ফালনে, অট্টহাস্য হেসে বললেন, “যেমন তোদের কল্পনা চিন্তা আর ইচ্ছা!” এই বলে ছায়াদেবীদের দিকে নিজের দৃষ্টি রাখতেই, ছায়াদেবীদের তনু জ্বলতে শুরু করে দিলে, তাঁরা “ওরে বাবা গো, ওরে মা গো” বলে চিৎকার করে পলায়ন করতে শুরু করলে, ত্রিছায়াদেবী নিজেদের তনুকে ক্ষুদ্র করে নেওয়া শুরু করলেন, যাতে গুহ্যার দৃষ্টি তাঁদের উপর না পরতে পারে। আর অন্যদিকে গুহ্যা নিজের তনুকে বিশালাকায় করে নিতে শুরু করলেন যাতে কনো ভাবেই ছায়াদেবীরা তাঁর দৃষ্টির থেকে পলায়ন করতে না পারেন।

অবশেষে, দৃষ্টির গোচর হয়েই গেলেন ছায়াদেবীরা, আর তা হওয়া মাত্রই, তাঁদের তনুতে অগ্নিসম্পাত হয়ে যায়। ক্রমশ তাদের দেহ জ্বলতে থাকলে, “উড়ি বাবাগো, উড়ি মাগো” বলতে বলতে, তাদের তনু ভূমিতে পতিত হয়ে গেল, আর তারা ছটফট করতে করতে একসময়ে ভস্মীভূত হয়ে গেলেন।

সেই দেখে ক্রোধে আস্ফালন করে উঠলেন আত্ম, আর প্রলয়ঙ্কর হুংকার প্রদান করলেন, “আমার সমস্ত পরিবারকে তুই হত্যা করলি, তুই একা হত্যা করলি! … এবার আমার পালা, আমি তোর সম্যক পরিবারের নাশ করবো”।

এতো বলে, আত্ম বিশালাকায় তনু করলেন নিজের। সেই তনু বিশাল হলেও, গুহ্যার তনুর মাত্র অর্ধেক প্রায় সেই তনু আকৃতি। ত্রিমাথা তার, ত্রি আঁখি প্রতিটি মাথায়, ১৪ হস্ত তার, আর সেই হস্ত সমূহ বিভিন্ন অস্ত্রে সুসজ্জিত করে গুহ্যার দিকে এগিয়ে গেলেন তিনি।

গুহ্যা অতি প্রলয়ঙ্করী। তাঁর যেন অন্য কিছুর বোধই নেই, কেবল সম্মুখে স্থিতের নাশ করা বিনা। তবে তাঁর নাশ করার ধারা অতি ভিন্ন। না তা দৈবিক, অর্থাৎ না এক নিমেষে মুণ্ডচ্ছেদ করেন তিনি; আর না তিনি আসুরিক অর্থাৎ বন্দী করে হত্যা করেন তিনি। তিনি সাখ্যাত নিয়তি, কর্মের ফল প্রদান করেন। কর্মের সঞ্চারক হলো চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনা। সেই কর্মের ফল প্রদান করে যেন তিনি সম্মুখে স্থিত তাঁরই সন্তানকে বোধ করান যে, কায়া তিনি, আর ছায়া হলো তাঁর চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনা।

তাই তাঁর প্রহার বড়ই বিচিত্র, সম্মুখে স্থিত শত্রুর এমন হাল করেন যে তার অবস্থা অত্যন্ত অসহায় হয়ে যায়। যেন তিনি তাঁকে বলেন, আর কল্পনা করবি? আর চিন্তা করবি? আর ইচ্ছা করবি? আর কোনদিন কিছু চাইবি? তাঁর এই প্রহার যেন প্রহার নয়, মাতার শাসন। ঠিক যেমন দুষ্টুমি করা শিশুকে মাতা শাসন করেন, তেমনই গুহ্যার শাসন। ঠিক যেমন মাতা দুষ্টুমি করা শিশুকে ক্রন্দন করাতে থাকেন, আর প্রহার বা বকুনির মাধ্যমে বলতে থাকেন, আর কোনদিনও করবি এমন কর্ম? মাতা গুহ্যার আচরণও সমরূপ।

তিনি কেবল প্রহার করে নিশ্চিহ্ন করেন না শত্রুকে, শত্রুকে এবং শত্রুর বিনাশ যারা দেখেন, সেই সকল প্রত্যক্ষদর্শীকে বলে দেন যে, কারা শত্রু, আর ঠিক কি ভাবে তাদের সাথে ব্যবহার করতে হয়। আর তাই, একদিকে যখন তাঁকে যারা শত্রু মানেন, সেই আবেগরা, রিপুরা, পাশেরা, ত্রিগুণরা, ছায়ারা এবং আত্ম স্বয়ং, তাঁরা যেমন সমস্ত আবেগের নাশ নিজেরাই করে, কেবলই যুদ্ধে রত থাকতে থাকলেন এবং বিনষ্ট হতে থাকলেন, তেমনই এই সমস্ত মাতৃশাসন ভাবেরা ও ভূতেরা দেখতে থাকলেন এবং মাতার প্রদান করা পাঠ গ্রহণ করতে থাকলেন।

আত্ম মহাহুংকারে সম্মুখে এসে নিজের ঘাতক তরবারি দ্বারা গুহ্যার উদ্দেশ্যে প্রহার করতে গেলে, গুহ্যা আত্মের তিন মস্তকের মধ্যের মস্তকে একটি মুষ্ট্যাঘাত করলেন, আর তাতে আত্মের চরণ মাটির নিচে এমন ভাবে ধসে গেল যে ভূমির উপরে কেবলই তাঁর জানু থেকে দেখা গেল।

প্রতিহিংসার রচয়িতা আত্ম এতে দমে যাবেন কি করে। নিজের চরণ জমিতে আটকে যেতে সামান্য ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিলেন, কিন্তু প্রতিহিংসার ভাব হারাননি। তাই পুনরায় তাঁর খড়গ দ্বারা প্রহার করতে এলে, গুহ্যা তাঁর সেই হস্তকেই নিজের মুষ্টির মধ্যে ধরে এমন ভাবে আকর্ষণ করলেন যে, আত্মের পূর্ণ দেহ ভূমি ত্যাগ করে শূন্যে উন্নীত হলো, আর শুধু তাই নয়, তাঁর সেই দক্ষিণ হস্তকে তাঁর দেহ থেকে পৃথক করে দিলেন গুহ্যা।

পীড়ায় আত্ম নিনাদ করতে থাকলে, সেই নিনাদের শব্দ সকল ভাবদের ও ভূতদের অতিষ্ঠ করে তুলল, কিন্তু গুহ্যা নিজের ক্ষিপ্র ভূমিকায় অবতীর্ণ। তিনি সেই পীড়াকে যেন দেখতেই পেলেন না, বরং নিজের উর্জ্জার তেজে ঝলসে, আত্মের সেই হস্তের বেশ কিছুটা অংশ আহার করে নিলেন।

ঠিক যেমন ব্যাঘ্র একবার একটি মাসের স্বাদ পেয়ে গেলে, তাঁর সেই মাস বারংবার আহার করার সাধ জন্ম নেয়, গুহ্যার ক্ষেত্রেও ঠিক তেমন। একবার আত্মের মাস আহার করে, সমস্ত আত্মকেই আহার করতে ব্যস্ত হয়ে গেলেন তিনি। আত্ম তা বুঝতে পেরে পলায়নের ভঙ্গিমা নিতে যাবেন। গুহ্যা সেই দৃশ্য দেখে, অতি উত্তেজিত হয়ে, আত্মের দক্ষিণ পাদুকা নিজমুষ্টিতে ধারণ করে, এক হ্যাঁচকা মারতে, আত্মের পলায়ন ব্যর্থ হয়ে গেল, কিন্তু গুহ্যাকে সেই পলায়নের প্রয়াস দ্বারা উত্তেজিত করে দিয়েছেন সে, তাই গুহ্যা এবার সজোরে এক পদাঘাত করলেন আত্মের উল্টে থাকা শরীর, যার চরণ ঊর্ধ্বে গুহ্যার হস্তে স্থিত ছিল, এবং মস্তক ভূমিতে।

সেই পদাঘাত যে কতটা ভীষণ ছিল, তা প্রত্যক্ষদর্শীরাই কেবল বুঝেছিলেন, কারণ সেই একটি পদাঘাতে আত্মের সমস্ত প্রজনন সামর্থ্যকেই গুহ্যা বিনষ্ট করে দেন। সেই পীড়া এতটাই ভয়ংকর যে আত্মের নিনাদ বেশ কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায়, তারপর সে ভূমিতে শায়িত হয়ে ছটফট করতে থাকে।

গুহ্যা এতক্ষণ একটি শব্দও করেন নি, কেবলই প্রহার করছিলেন। এই প্রথম তিনি শব্দ উচ্চারণ করলেন। কি অতীব ভয়ঙ্কর তাঁর কণ্ঠস্বর। আত্মের সমস্ত আত্মত্বকে সেই শব্দের ধ্বনি প্রথমে বিনষ্ট করে দিল, পরবর্তীতে তার সমস্ত ধারনার নাশ করে দিল, আর অন্তে তার অস্তিত্বকেও নাশ করে দিল।

দেবী গুহ্যা বলতে শুরু করলেন, “কি ভেবেছিলিস? আমার তিন ছায়াকে ধারণ করে তুই আমার সন্তানদের অন্তর থেকে আমাকে মিটিয়ে দিবি? আমার থেকে আমার সন্তানদের পৃথক করে দিবি! … কি ভেবেছিলিস তুই, আমাকে নিঃসন্তান করে দিবি? …

আত্ম, তোর রচনা আমিই করেছিলাম, আমার সন্তানদের লাভ করার জন্য। আমার নিজের থেকে আমি আমার সন্তানদের জন্ম দিয়েছিলাম, তাঁদেরকে বাৎসল্য সুখ প্রদানের উদ্দেশ্যে, আর নিজে মাতৃত্বের সুখ ভোগ করার জন্য। তাই আমাকে তুই স্ত্রী ভেবে নিয়েছিলিস? ভালো করে নিরীক্ষণ করে দ্যাখ, আমি না তো পুরুষ আর না স্ত্রী। জননীর কনো লিঙ্গ হয়না মূর্খ পরমাত্ম। জননী সমস্ত লিঙ্গের জননী হন। জননী স্বয়ং ব্রহ্ম হন, যার কনো আদি নেই, অন্ত নেই, কনো সীমা নেই, কনো ব্যাখ্যা নেই, যার চিন্তাও করা যায়না।

ভালো করে নিরীক্ষণ কর মূর্খ পরমাত্ম, আমার কনো লিঙ্গই নেই। নিরীক্ষণ করে দ্যাখ, আমার কনো রূপ নেই, আমার কনো আকৃতি নেই, আমার কনো বর্ণ নেই, আমার কনো নিয়ন্তা নেই। আমি শূন্য, পরাশূন্য। সকলের নিয়তি আমি, সমস্ত কিছুর প্রকৃত অস্তিত্ব আমি। তুই কি ভেবেছিলিস, আমার এই সন্তান ধারণের জন্য যেই মায়ার প্রয়োজন ছিল, সেই মায়ার তিন খণ্ড, তিন ছায়াকে ধারণ করে তুই আমার সন্তানদের চিরকাল মায়ায় আবদ্ধ রাখবি?

মূর্খ, তুই সত্যই মূর্খ পরমাত্ম। যদি তা না হতিস তাহলে তুই আমার সন্তানদের সেবা করে, পরমেশ্বর হয়ে থাকতে চাইছিলিস, তাই হয়েই থাকতিস। আমি তোকে একটিবারের জন্যও বাঁধা দিতাম না। একবারও বলতে আসতাম না যে, তুই সামান্য এক আমিত্বের বোধ, আর পরমেশ্বর আমি। আমার তো তোর মত পূজার প্রয়োজন নেই, আমার তো তোর মত শ্রেষ্ঠত্বের প্রতি আকর্ষণ বা মোহ নেই। কিন্তু তুই এতটাই মূর্খ যে, আমার ঈশ্বরত্বকে অপসারণের প্রয়াস করতে করতে আমার মাতৃত্বকেই হনন করার প্রয়াস করা শুরু করলি”।

মহাহুংকারের সাথে যেন মহাক্রন্দন যুক্ত হয়ে গেল গুহ্যার কণ্ঠে। চিৎকার করে ক্রন্দনের সুরে তিনি হুংকার করে উঠলেন, “ঈশ্বর হয়ে থাকার জন্য আমি আমার সন্তানদের প্রসব করিনি। আমি তাঁদের সন্তানজ্ঞানে বুকে আগলে রাখার জন্য প্রসব করেছি। তাদের থেকে কিছু লাভ করতে নয়, তাদের অপার প্রেম প্রদান করতে জন্ম দিয়েছি আমি। তুই এই মায়ের হৃদয়ে আঘাত করেছিস আত্ম। তুই এই মাকে লিঙ্গের অতীত অবস্থায় উন্নীত হতে বাধ্য করেছিস মূর্খ পরমাত্ম।

এক মা সমস্ত কিছু সহন করে নিতে পারে। তাঁর সন্তান তাঁর প্রতি রুষ্ট থাকুক, তাও সহন করে নিতে পারে, কিন্তু তাঁর সন্তান তাঁর মাতৃত্বকে উপেক্ষা করে, তা কিছুতেই সহন করতে পারেনা। মাতৃত্বের সুখ ধারণ করার জন্যই আমি এঁদের সকলকে জন্ম দিয়েছি। তুই যখন পরমাত্ম হয়ে নিজেকে অসংখ্য আত্মে ভগ্ন করে, ধরাকে সম্ভোগের প্রয়াস করেছিলিস, আমি তোকে আটকাই নি, কারণ আমি তখন এই সুখে হৃদয় বেঁধেছিলাম, আর আমার সীমিত সংখ্যার সন্তান থাকবেনা, আমি অসীম, আমার সন্তানসংখ্যাও অসীম হবে।

অসীম মাতৃত্বদ্বারা, আমি আমার অনন্ত সন্তানদেরকে হৃদয়ে ধারণ করে প্রকৃতি রূপে তাঁদের সকলকে স্নেহ করবো, নিয়তি বেশে তাঁদের মাতার আলিঙ্গনের জন্য উৎসাহী করবো, আর চেতনা বেশে, তাঁদের জননী যে তাঁদের কতটা স্নেহ করে, সেই বোধ প্রদান করবো। কিন্তু মূর্খ আত্ম, তুই এই মাতাকেই প্রহার করে দিলি!

তুই নিজেকে সমস্ত কিছুর স্রষ্টা রূপে সত্ত্বগুণ ধারণ করে ব্রহ্মা বলেছিলিস, আমি একটিও কথা বলিনি, বরং তোর সাথে যুক্ত হয়েছিলাম মহাশ্বেতা রূপে, যাতে তুই আমার সন্তানদের রচনা করবি, আর আমার সন্তানদের মধ্যে আমি মাতৃত্বের বোধ জাগ্রত করবো শিক্ষা ও কলার মাধ্যমে চেতনার বিস্তার করে। তুই নিজের রজগুণ বিস্তার করে নিজেকে নারায়ণ করে স্থিত করলি। আমি তোকে সংযত করতে, তোর সাথে শ্রী হয়ে যুক্ত হলাম, যাতে তুই যখন বলতে শুরু করলি যে জীবের ও নরের তোকে অনুসরণ করা উচিত তাই তুই নারায়ণ, তখন আমি বলতে পারি আমার সন্তানদের যে তাদের মাতাই তাঁদের লক্ষ্য, তাই আমি লক্ষ্মী।

তারপর যখন তুই প্রকৃতিকেই নাশ করতে গেলি, তখনও তোর এই বিনাশলীলাকে খর্ব করে, সঠিক দিশা প্রদানের জন্য, তোর তমগুণী রূপের সাথে আদিশক্তি হয়ে যুক্ত হলাম, যাতে আমার সকল সন্তানদের সেবা করতে পারি, প্রকৃতি বেশে। তুই প্রচার করতে থাকলি যে প্রকৃত অর্থে তুইই ঈশ্বর, আর আমি তোর আশ্রিতা হয়ে, তোর পত্নী হয়ে তোর সেবা করি, আমি তাতেও বাঁধা দিইনি, কারণ তুই ঈশ্বর সেজে থাকগে, আমার সন্তানদের আমি সেবা করতে পারবো।

কিন্তু তোর তো লিপ্সার অন্তই নেই! তুই তো আমার সন্তানদের আমার থেকে পৃথক করে নিতে ব্যস্ত। তুই তো আমার সন্তানদের আমার হৃদয় থেকে ছিনিয়ে নিয়ে, সর্বেসর্বা রূপে নিজেকে স্থাপন করতে ব্যস্ত। বেশ তো হয়েই থাকতিস তুই সর্বেসর্বা, আমাকে আমার সন্তানদের থেকে আলাদা করার প্রয়াস কেন করলি তুই! … কেন ইচ্ছা, চিন্তা ও কল্পনার বিস্তার করে করে, প্রকৃতির থেকে বিমুখ করে দিতে সচেষ্ট হলি আমার সন্তানদের?

কেন নিজেকে ভগবান রূপে স্থাপন করতে গিয়ে, আমার সন্তানদের কাছে এই প্রচার করলি যে চিন্তাই বিচার? কেন প্রচার করলি যে ইচ্ছাই বিবেক? কেন প্রচার করলি যে কল্পনাই মেধা? কেন? কেন? কেন?”

গুহ্যা চিৎকার করতে থাকলেন, আর আত্মের বক্ষে চরণ স্থাপন করে তাতে চাপ সৃষ্টি করতে থাকলে, আত্মের একটি একটি করে সমস্ত হস্ত নিজের তনু থেকে খুলে যেতে শুরু করলো, এবং ক্রমশ দুই মস্তকও ছিন্ন হতে শুরু করলো তাঁর চরণের চাপে। তাই আত্মের আর আর্তনাদ করারও সামর্থ্য রইল না। কিন্তু গুহ্যা বলতেই থাকলেন এবং তাঁর কমলনয়ন, যা রক্তিম হয়ে ছিল, তার থেকে অশ্রু ত্যাগ হতেই থাকলো।

রক্তের সাগর নির্মাণ করে দিলেন তিনি আত্মের লহু তার শরীর থেকে নিঃসৃত করতে করতে, আর বলতে থাকলেন উচ্চক্রন্দনের স্বরে, “আমি জননী হতে চেয়েছিলাম, ঈশ্বরী হতে কখনো চাইনি। তাই কখনোই আমার কনো সন্তানকে মনবাঞ্চিত বরদান করে করে, তাদের কাছে ঈশ্বরী হয়ে পূজিতা হতে চাইনি। জননী আমি, তাই আমি জানি আমার কোন সন্তানের কি আবশ্যকতা। আর সেই আবশ্যকতা আমি পূর্ণ করতে থাকি, তা আমার সেই সন্তান আমার থেকে কামনা করুক আর না করুক।

মা আমি, তাই সন্তানের অবাঞ্ছিত কামনাকে আমি কখনই পস্রয় প্রদান করিনা। সন্তান যদি অহেতুক কামনা করে, তার অন্তরালে তোর যতই কল্পনা থাকুক, যতই ইচ্ছা বা চিন্তা থাকুক, আমি তা প্রদান করিনা। আমার থেকে আমার সন্তানদের কিচ্ছু বলতে কিচ্ছু চাইতে হয়না। যার যা প্রয়োজন আমি তা এমনিই প্রদান করি, কারণ তারা আমার ভক্ত নয়, আমার সন্তান। আমি তাঁদের ঈশ্বর নই, আমি তাঁদের মা। ঈশ্বর হলে, ভক্ত সন্ধান করতাম, কিন্তু আমি তো মা, তাই সন্তানের সন্ধান করি।

আমাকে ঈশ্বরজ্ঞানে আমার যতই পূজা করুক, আমাকে যতই ঈশ্বরকে তুষ্ট করার মত করে আমার নামজপ করুক, আমি ফিরেও দেখিনা তার দিকে, কারণ আমি মা। মাকে তোষামোদ সন্তান কেবল অনাচার করার জন্যই করে। মাকে স্নেহ করতে হয়, স্নেহ করতে হয়, আপন মানতে হয়, তোষামোদ নয়। এই আচরণ কেবলমাত্র আমার বঙ্গদেশের সন্তানদের থেকেই লাভ করেছি, তাই আমি সেখানেই কেবল বিরাজ করি।

আমার অবতার মার্কণ্ডকে আমার এই মাতৃত্বরূপ সত্য, অর্থাৎ মাতৃত্ব ধারণ করার জন্যই আমি তোকে আর মানসকে জন্ম দিয়েছি, তা বলার জন্য বঙ্গদেশে নিয়ে গেছিলাম, আর তারপর থেকে আমি সর্বক্ষণ সেখানেই অবতরণ করি। নিমাই বেশেই সেখানেই এসেছিলাম, গদাধর বেশেও, আর এবার ব্রহ্মসনাতন বেশেও, আর ভাবি কালেও এখানেই আসবো, কারণ?

কারণ এখানে আমাকে ঈশ্বরী জ্ঞান করে, দূরে ঠেলে রেখে দেয়না; এখানে আমাকে ভক্ত অভক্ত সকলেই মা জ্ঞানে কাছে টেনে নেয়। আমি মা, আমার কাছে সন্তানের প্রদান করা অপবাদও প্রিয়, কিন্তু সন্তানের কাছে ঈশ্বরী হয়ে থেকে তার থেকে দূরে অবস্থান করা নয়। সকল সন্তানের উদরে আমি শিখা বেশে স্থিত থেকে, তারা যা আহার করে, আমি তাদের উচ্ছিষ্ট গ্রহণ করতেই ভালোবাসি; তাঁদের মধ্যে বেগবতী হয়ে থেকে তাঁদের সর্বাঙ্গে পরিবাহিত হয়ে তাঁদের স্নেহচুম্বন প্রদান করতেই আমি ভালোবাসি, কিন্তু তাঁদের থেকে দূরে থেকে, ভক্তি লাভ করে, মহান বা ঈশ্বর হয়ে থাকার আমার কনো বাসনা নেই।

তাঁদের ভাব হয়ে, তাঁদের বিশুদ্ধতার কারণ হওয়াই আমার কাছে শ্রেয়; তাঁরা ভুলে যাবেন যে আমি ঈশ্বরী আর ভুলে গিয়ে আমাকে শাসন করবেন, আমাকে নিয়ে ভয় পাবেন, আমার হিতচিন্তা করে আমার পথ আটকাবেন, এটিই আমার কাছে স্নেহ। আমাকে ঈশ্বরী জ্ঞানও করবে, অথচ নিজের ইচ্ছা, চিন্তা বা কল্পনা আরোপ করবে আমার উপর, আর তা করতে দেবার জন্যই আমাকে ঈশ্বরী মানবে, এক মা তা বরদাস্ত করেনা, কারণ এক মায়ের কাছে সন্তানের চিত্তশুদ্ধি প্রিয় হয়, সন্তানের আচার বিচার বা রিতিরেওয়াজ নয়।

আত্ম, তুই তো এই বঙ্গদেশ ব্যতীত সমস্ত স্থানের আমার সন্তানদের থেকে তার মাকে আলাদা করেই নিয়েছিস। তাই আমি আর কোথাও বিরাজ করিনা। এই বঙ্গদেশের জীব ছাড়া কারুর মধ্যে তাই আমি নিজেকে বিস্তার করিনা, চেতনার বিস্তারই করিনা। আর কোথাও প্রকৃতি বেশে কারুর মার্গদর্শন করিনা। আর নিয়তি বেশে কারুকে আগলেও রাখিনা। আর সেটাই তো তুই চেয়েছিলিস। আর তাই তো তুই, কল্পনা, চিন্তা আর ইচ্ছার বিস্তার করে, আমার সমস্ত সন্তানদের কাছে বিকৃতি প্রদান করেছিস, তাঁদের মাকে ঘিরে।

হয় তারা আমাকে ঈশ্বরী জ্ঞান করবে, আর তা জ্ঞান করে হাজার হাজার রীতিরেওয়াজ, আচার বিচারের স্থাপনা করে, আমার থেকে আমার সন্তানদের দূরে স্থিত করে দেবে, আর নয় আমাকে তোর দাসী জ্ঞান করে, তোর আরাধনা করবে, আর সদা বলে ফিরবে যে প্রকৃতির থেকে মুক্ত হওয়াই সাধনার লক্ষ্য।

এই একমাত্র বঙ্গদেশেই আমি মাতা হয়ে বিরাজমান ছিলাম, আর আমার সন্তানরা আমার সাথে আন্তরিক হয়ে বিরাজ করতো। কিন্তু তোর তাও সহ্য হলো না। তোর ভয় জন্মালো যে, যদি এমন হয় যে, এই দেশকে দেখে, সমস্ত দেশ যদি এমন করাই শুরু করে দেয়! তাহলে তো তোর আর পূজা লাভই হবেনা, তোর তো নিজেকে ঈশ্বর রূপে প্রচার করাই সার হবে! আর তাই তুই এই বঙ্গদেশের মানুষদের মধ্যেও তোর বিষ প্রসার করা শুরু করলি।

তাদের মধ্যেও মেধার বিস্তারকে আটকে, কল্পনার বিস্তার করা শুরু করলি। সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডের সমষ্টি, এই পৃথিবীতে প্রচার করে দিলি যে, বাস্তবিক অতিবাস্তবিক কল্পনাকরাই মেধা। আর তাই সমস্ত বিশ্বে যারা কল্পনা করতে পারঙ্গম, তাদেরকেই মেধাবী বলে স্থাপন করা শুরু করে, এই বঙ্গদেশের মানুষদেরকেও পিছিয়ে পরার হুমকি দিয়ে, তাদেরকেও কল্পনা ধারণ করার জন্য বাধ্যতা প্রদান করলি।

সেই কল্পনার সাথে সাথে চিন্তা ও ইচ্ছারও বিস্তার করা শুরু করলি, আর আমাকে সন্তানশূন্য করে দেবার মায়ারচনা করলি। খুব ভুল করলি আত্ম, খুব ভুল করলি। যদি এই ভয় না পেতিস, আর বঙ্গদেশকে নিজের অধীনে স্থাপিত করার প্রয়াস না করতিস, তাহলে আমি অবতরণ করতামই না। আর তাহলে তোর এই দশাও হতো না।

যেই দেশে তুই নিজেকেই সর্বেসর্বা রূপে স্থাপিত করে রেখেছিলিস, সেখানেই যদি নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখতিস, তাহলে আমিও অবতরণ করতাম না, আর তোরও ঈশ্বরত্বের প্রচারে বাঁধাও আসতো না। কিন্তু তুই ভয় পেলি, লোভীও হলি, আর তাই আমি অবতরণ করতে বাধ্য হলাম। এবার আমি তোর দমন করবো। যাদেরকে তুই সর্বেসর্বা অমর অনন্ত ঈশ্বর রূপে স্থাপিত করে রেখে ভক্ত নির্মাণ করছিলিস, তাদের সকলের বিশ্বাসকে গুড়িয়ে দিতে আমি অবতরণ করে গেছি।

যেই আবেগদের ধারণ না করলে, তুই তাদেরকে প্রস্তরসম বলে তিরস্কার করতিস, সেই আবেগ সমূহের নাশ করেছি আমি। যেই ছায়াদেরকে ধারণ করলে তবেই উন্নত জীব হওয়া যাবে বলে প্রচার করেছিস তুই, তাদেরকে ভস্ম করেছি। যেই ত্রিগুণকে ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ সাজিয়ে অমর বলে প্রচার করে সমস্ত জীবকে, আমার সমস্ত সন্তানকে ভ্রমিত করছিলিস, তাঁরা যে অমর নয় তা প্রমাণ করে, তাঁদের নিধন করেছি। আর এবার তোর পালা, সেই পরমাত্মের পালা, যে নিজেকে অমর, অনন্ত, অসীম বলে মিথ্যাচার করেছে, তার বিনাশের পালা।

কি ভাবেছিস, এই কৃতান্তকে তুই প্রচারিত হতে দিবিনা! … আমি স্বয়ং অবতরণ করে করে, এঁর প্রচার করবো, আর আমার সমস্ত সন্তানের কাছে তোর প্রকৃত সত্য তুলে ধরবো। ভুলে যা আত্ম ঈশ্বর হবার স্বপ্ন ভুলে যা, কারণ আর তোকে আমি ঈশ্বর সাজতে দেবো না, কারণ তুই ঈশ্বর সেজে আমার সন্তানদের তাঁদের মায়ের থেকে আলাদা করার প্রয়াস করে, ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ করে ফেলেছিস।

কৃতান্তকে আমি আমার সমস্ত সন্তানের হৃদয়ে স্থাপন না করা পর্যন্ত থামবো না। যদি তুই ভেবে থাকিস যে, মানবযোনিকেই নাশ করে দিবি, যাতে কৃতান্তকে তারা ধারণ না করতে পারে, তাহলেও ভুলে যা, কারণ আমি মানব যোনির নাশ করার পড়ে যেই নতুন যোনির নির্মাণ তুই করবি নিজের মহিমাকীর্তন শ্রবণ করার জন্য, তাদেরকেও আর তোর আরাধনা করতে দেবো না।

তোর আরাধনা এবার থেকে বন্ধ হবে, আর এটিই আমার এই অবতরণের উদ্দেশ্য। স্মরণ করে দ্যাখ, তোর আরাধনা বন্ধ করার জন্যই, এর পূর্বের সমস্ত অবতার এসেছিল। মার্কণ্ডও তোর তমগুণকে ভক্ষণ করে ধূমাবতী হয়েছিল, আর আমার এই গুহ্যাবেশের লঘু রূপ, কালী বেশে তোর তমগুণকে শব করেছিল। স্মরণ করে দ্যাখ আত্ম, আমার গৌতম রূপ অবতারও নির্বিকারত্ব, নিরাকারত্ব, নির্বাণতত্ত্বকে সম্মুখে রেখে তোর অধিকারে হস্তক্ষেপ করেছিল।

আরো স্মরণ কর, বাল্মীকি তোর অনাচারকে স্পষ্ট করে দেখিয়েছিল, তোকে রাম রূপ প্রদান করে আর আমাকে সীতা রূপ প্রদান করে। ব্যাসও তোর সত্ত্বগুণ, ব্রহ্মাকে দণ্ড দিয়েছিল, বাণাসুরের রক্ষক শিবকে নির্বাসনে পাঠিয়েছিল। মহম্মদ স্ত্রীকে গুপ্তসম্পদ বলে তাকে আচ্ছাদনে স্থাপিত রেখেছিল, আর ঈশাও জননীর প্রতি স্নেহপরায়ণ হয়ে মেরিকে ধারণ করেছিল।

স্মরণ করে দ্যাখ, নিমাই তোর নয়, আমার বিবেকের অর্থাৎ কৃষ্ণনাম কীর্তন করেছিল, আর তোর চর অনুচর, অর্থাৎ ব্রাহ্মণদের ভাতে মেরেছিল। আর গদাধর তো সরাসরি আমাকে আবাহন করেছিল। আমার নয় অবতার আমার পরম অবতার প্রকাশের জন্য আমাকে সমানে আবাহন করে গেছে। কেন? কারণ তোর ঈশ্বর হবার বাসনার জন্য তুই যে চরম লোভী হয়েছিস, চরম অহংকারী হয়েছিস, আর তা হয়ে নিজের চর নির্মাণ করে, তাদেরকেই ব্রাহ্মণ, সাধু করে স্থাপন করে রেখে রীতিরেওয়াজ, আচার অনুষ্ঠানের মধ্যে আমার সন্তানদের আবদ্ধ করে, তাদেরকে তাদের মায়ের থেকে পৃথক করে রেখেছিস, তা স্তব্ধ করার জন্য।

আর তাই তাদের সকলের আবাহনে আজ আমি অবতরণ করেছি। আমি শূন্য, আমার কনো সীমা নেই, কনো অন্ত বা আদি নেই, কনো ব্যাখ্যা সম্ভব নয়। তাই আমার কনো কলার সীমা নেই। কনো কলার সংখ্যা দ্বারা আমাকে সম্পূর্ণ ভাবে প্রকাশিত করা যায়না। ভৌতিক জগতে আমার সর্বাপেক্ষা সম্ভব প্রকাশ হলো ৯৬ কলা। আর এই দ্যাখ, আমি সেই সম্পূর্ণ ৯৬ কলা ধারণ করে তোর সম্মুখে উপস্থিত। আমার সকল ৯ অবতারের আবাহনে আমি সম্পূর্ণ ৯৬ কলা বেশে উপস্থিত।

আর এবার আমি তোর পূর্ণ নিধন করবো এই ব্রহ্মাণ্ডে এবং সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত চেতনাকে আবাহন প্রদান করবো, তোর এইরূপ হত্যা করার জন্য। তোর মহিমাকীর্তনের অবসান আনার জন্যই সমস্ত অবতাররা, মার্কণ্ড, গৌতম, বাল্মীকি, ব্যাস, ঈসা, মহম্মদ, শঙ্কর, নিমাই, গধাধর আমাকে আবাহন করেছিল। আর তাই তাঁদের আবাহনে সারা দিয়ে আজ আমি উপস্থিত।

পূর্ণ ভাবে নিধন করবো তোর এইক্ষণে, আর তুই নিজের সম্বন্ধে যা কিছু প্রচার করেছিস, তার অবসান করবো। আর তোকে কেউ অমর মানবে না, কারণ আমি তোর নিধন করবো। আর তোকে কেউ অসীম মানবে না, কারণ তোর সীমারেখা আমি এই ব্রহ্মাণ্ডে নিশ্চয় করবো। আর তোকে কেউ ঈশ্বর মানবে না, কারণ তোর অসুরত্ব সকলের কাছে আমি প্রকাশ করে দিয়েছি।

আমি জানি, খুব ভালো করেই জানি যে, আবেগদের হত্যা করে, ত্রিগুণের নাশ করে, ছায়াদের নাশ করেও, তাদের নাশ সম্ভব নয়, কারণ সেই সমস্ত কিছুর উৎস তুই স্বয়ং। তাই তো তুই সমস্ত মুখ আবেগদের জাতকরূপে চৌদ্দভুজা, ত্রিগুণ ধারণ করে ত্রিমুন্ডধারি, ত্রিছায়াকে ধারণ করে ত্রিনয়ন। কিন্তু এখন দ্যাখ ভালো করে, তোর সমস্ত চৌদ্দ হস্ত তোর থেকে খসে গেছে, তোর সমস্ত মুণ্ড তোর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, তোর সমস্ত ত্রিনেত্র চিরকালের জন্য এই ব্রহ্মাণ্ড থেকে বিদায় নিয়েছে।

কি ভেবেছিলিস? প্রকৃতিরূপেতেই আমি আবদ্ধ থাকবো, আর নিয়তি বেশ আমি ধারণ করতে পারবো না! মহামাতৃকাতেই আমি আবদ্ধ থাকবো, পরামাতৃকা আমি হতে পারবো না! এই ভেবেছিলিস না তুই? এই ভাবার কারণেই তো পরাপ্রকৃতিকে বশে রাখার জন্য ত্রিগুণকে বরদান লাভের জন্য আমার কাছে পাঠিয়েছিলিস! তাই তো! … কিন্তু মূর্খ, তুই মায়ার রচয়িতা নয়, মায়ার রচয়িতা আমি।

মহামায়া আমি মূর্খ পরমাত্ম। তাই তো তাদের অভিসন্ধিকে কাজে লাগিয়ে, আমি তাদের দাসী হয়ে থাকার কর্মফলকে গ্রহণ করে, তাদের বরদানে ভূষিত করে, তাদেরকে তৃপ্ত করে, তাদেরই জন্য নির্মিত ব্রহ্মলোককে, বৈকুণ্ঠকে আর কৈলাসকে আমি শ্বেতাধাম, শ্রীধাম ও শক্তিধাম করে স্থাপিত করে, তাদেরই মাধ্যমে অনাহত , বিশুদ্ধ, আর আজ্ঞার দ্বার উন্মোচন করিয়েছি, আর আজ তাদের বিনাশ করে, আমি পূর্ণ রূপে সহস্রারে স্থিত হয়ে, পরানিয়তি।

প্রস্তুত হয়ে যা পরমাত্ম, এই ব্রহ্মাণ্ডে তোর অন্তিম ক্ষণ এসে গেছে। আর আরো প্রস্তুত হয়ে যা কারণ, শীঘ্রই তুই যে নিজের সম্বন্ধে অমর, অবিনাশী, অসীম, অনন্ত ইত্যাদি মিথ্যা প্রচার করে নিজেকে ঈশ্বর পদে স্থিত রাখার প্রয়াস করে গেছিস, তা সকলের সমক্ষে আমারই অন্য অবতাররা এসে এসে প্রচার করবে, আর তোর আরাধনা সম্পূর্ণ ভাবে নষ্ট করে দেবে।

তুই আমার যেই সন্তানদের বশ করে নিয়ে, তাদেরকে ব্রাহ্মণ ও পরে সাধু নামে আখ্যা দিয়ে, নিজের চর করে রেখে, আমার সমস্ত সন্তানদেরকে অজস্র ইচ্ছা, অজস্র চিন্তা ও সর্বদা কল্পনার মধ্যে স্থিত থাকতে বাধ্য করেছিলিস, তাদেরও নাশের জন্য প্রস্তুত হয়ে যা। না থাকবে ব্রাহ্মণ, না ব্রাহ্মণত্ব, না থাকবে পূজা, না থাকবে আচার অনুষ্ঠান। থাকবে কেবলই আমার সন্তানদের মা, তাঁদের মমতার আশ্রয়, থাকবে তাঁদের এই মমতার আশ্রয়কে লাভ করার আনন্দে পালিত উৎসব, যা আমি আমার এই অবতারের জন্মভিটা নির্বাচন দ্বারাই উল্লেখ ইতিমধ্যেই করে দিয়েছি।

চন্দনের মত পবিত্র সেই দেশ, তাই চন্দনের নগর নামে পরিচিতা আমার এই ব্রহ্মাণ্ডের জন্মভিটা, আর তাতে আমি আমার সন্তানদের জননী বেশে জগদ্ধাত্রী বেশে অধিষ্ঠাত্রী। আর আজ যখন তোর হত্যা করবো আমি, তারপর থেকে তোর সমস্ত মিথ্যাপ্রচারের অবসান হবে, আর শুরু হবে মাতৃ আরাধনা; শুরু হবে মাতার সাথে সন্তানদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের পুনরস্থাপনা। না থাকবে তাতে কনো আচার, না অনুষ্ঠান; না থাকবে কনো রীতি আর না থাকবে কনো রেওয়াজ।

থাকবে যা, তা হলো বিশুদ্ধ প্রেম। না থাকবে কনো চাওয়া পাওয়া, আর না থাকবে কনো মানতের প্রয়োজন, কারণ আমার সন্তানরা জানে যে, সুখ হোক বা দুঃখ, সমস্তই আমার দান, আর তা তাদের প্রয়োজন অনুসারেই আমার দান। দুঃখ দিলে, আমার সন্তানরা জানে যে হয় তাঁদের পথ ভ্রান্ত তার ইঙ্গিত তা, নয় তারা সেই পথে চলার উপযুক্ত হয়নি, তার নির্দেশ। আর সুখ দিলেও আমার সন্তানরা জানে যে, আমি তাদের এগিয়ে যেতে বলছি।

তাই আমার সন্তানরা আমার থেকে কিচ্ছু বলতে কিচ্ছু চায়না, যা দিই আমি, তা আনন্দের সাথে মায়ের শাসন আর মায়ের প্রেম জ্ঞানে স্বীকার করে, প্রকৃতিসর্বস্ব, চেতনা সর্বস্ব ও নিয়তিসর্বস্ব হয়েই বিরাজ করে তারা। এতকাল কেবলই বঙ্গ দেশের ব্রহ্মাণ্ডরাই এমন করতো, চন্দনের নগরবাসীই তা করতো। এবার সম্পূর্ণ জম্বুদেশ যাকে তুই বঙ্গদেশ নামে চিনিস, তা করবে, সম্পূর্ণ বিশ্ব তা করবে, কারন তোর হত্যা করে, আজ সকলের সম্মুখে প্রমাণ করে দেব আমি যে, তুই এতকাল যা কিছু নিজের সম্বন্ধে বলেছিস ও তোর চর, অর্থাৎ ব্রাহ্মণ ও সাধুদের দিয়ে বলিয়েছিস যে তুই অনন্ত, অসীম, অব্যাক্ত, সমস্তই ছিল মিথ্যা।

আজ তোর হত্যা সকলের কাছে প্রমাণ করে দেবে যে পরমাত্ম মানে, কেবলই আত্মের পরাচিন্তা, কেবলই চিন্তা ইচ্ছা ও কল্পনাকে মান্যতা প্রদান করে প্রকৃতিকে, চেতনাকে ও নিয়তিকে অমান্য করা। আর তাই, তোর আরাধনা আজ থেকে বন্ধ। সমস্ত রীতিরেওয়াজের আজ থেকে অবসান; সমস্ত আচারঅনুষ্ঠান আজ থেকে মিথ্যাচার; সমস্ত ভেদভাব আজ থেকে দুরাচার। যা থাকবে, তা হলো মাতা ও সন্তানের বিশুদ্ধ প্রেম। মমতা প্রদান ও স্নেহ লাভ।

তোর রচনা করেছিলাম, তোর সাথে ছায়াদের রচনা করেছিলাম, যাতে তোদের মাধ্যমে আমি নিজেকেই নিজের সন্তানবেশে লাভ করে, মা ও সন্তানরা মিলে অনাবিল আনন্দে সংসার করতে পারি, আর একে অপরের কাছে সমানে বিলীন করে দিয়ে, আত্মহারা হয়ে গিয়ে, স্বতন্ত্রতার স্বাদ আস্বাদন করতে পারি। কিন্তু তোর জাগলো লোভ। তুই ঈশ্বর হবার মোহে আচ্ছন্ন হয়ে, ছায়াদের ধারণ করে, আমার সমস্ত সন্তানদের চিত্ত থেকে আমাকেই ভুলিয়ে দিতে এগিয়ে গেলি।

তাই এই পরিণাম তো তোর কনো না কনো দিন হবারই ছিল। আমার পূর্বের সমস্ত ৮ কলা থেকে ৩২ কলা অবতাররা তাই আমাকে পূর্ণ ৯৬ কলা বেশে জাগ্রত করেছে, যাতে তোকে তোর পরিণাম উপহার রূপে দিতে পারি। আর তাই আজ তোকে সেই পরিণাম প্রদান করলাম। যা! তোর সমস্ত ১৪ হস্তকে বিনষ্ট করে দিলাম, তোর সমস্ত ত্রিমুণ্ডকে বিচ্ছিন্ন করে বিনষ্ট করে দিলাম, আর সমস্ত ত্রিনয়নকে চিরনিদ্রায় শায়িত করে, এই ব্রহ্মাণ্ড থেকে পরমাত্মকে বিদায় দিলাম, আর সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডকে আহ্বান করলাম যাতে তারাও মানস ও ধরার মিলন ঘটায়, আত্মকে মানস না মানে, আর ধরাকে বিব্রত না করে আত্ম ও মানসের মধ্যে।

আমি আরো ৯ অবতার গ্রহণ করবো, একের পর এক কিন্তু এবার কেবলই কৃতান্তিক ধর্মাবলম্বীদের মধ্যেই আমি আসবো, আর আমার সন্তানদের মধ্যে মানস ও ধরার ধুমধাম করে বিবাহ দিয়ে, মেধার জন্ম দেওয়াবো। মেধার জাগরণ ও বৈরাগ্যের সাথে মিলন কল্পনাকে ক্ষীণ করবে, আর মেধা স্বয়ং বিচার ও বিবেককে জাগ্রত করে, চিন্তা ও ইচ্ছার নাশ করবে। আর সকলে প্রকৃতির কাছে আশ্রিত হয়ে, নিজেদের অন্তরে পঞ্চভাবকে জাগ্রত করে, নিজেদের ব্রহ্মাণ্ডে পরমাত্মের নাশ করবে।

পরমাত্মের নাশ করে সকল ব্রহ্মাণ্ড আমার কাছে সমর্পিত হয়ে উঠবে, আর মা সন্তান পুনরায় একাত্ম হয়ে আনন্দে সংসার করবো। উদ্দেশ্যে আমার কখনই ছিলনা যে তোর নাশ করবো। কিন্তু তুই মাতা ও সন্তানের মধ্যে প্রবেশ করে, আমাকে বাধ্য করেছিস। … তাই এবার তোর মৃত্যু নিশ্চিত। আর তোর আমার মুখ থেকে একটি শব্দও শোনার অধিকার নেই।

সত্য তো আমি একাই, শূন্য আমি। তাই মিলিত তো তোকে হতেই হবে আমার সাথে। কিন্তু তোর মিলন সুখদ হবেনা, আমার সন্তানদের মতন। তোর মিলন হবে বেদনায় স্নাত। আর তাই তোর সম্পূর্ণ পরিবারকে তোর থেকে অপসারিত করেছি, বাহ্যে তথা অন্তরে। বাহ্যে অন্ত করার জন্য, তাদেরকে হত্যা করেছি প্রথম, আর অন্তরে বিনষ্ট করার জন্য, তোর সমস্ত হস্ত ও মুণ্ডকে নাশ করলাম। যাতে তুই আর কখনো এই ব্রহ্মাণ্ডে তাদের জন্ম দিতে না পারিস, তার উদ্দেশ্যে আমি তোর যৌনাঙ্গকে নষ্ট করেছি। আর এবার যাতে তোরও অস্তিত্ব না থাকে এই ব্রহ্মাণ্ডে, তাই তোর হত্যা করবো, আর সকল ব্রহ্মাণ্ডকে আবাহন করবো যাতে তারাও মাতা ও সন্তানের মিলনের বাঁধা, পরমাত্মকে বিনষ্ট করে একই উপায়ে, যেই উপায়ে সম্পূর্ণ কৃতান্ত কথাতে আমার অবতার বিবৃত করলো”।

এতো বললে, মাতা গুহ্যা নিজের চরণের ভার এতটাই বৃদ্ধি করলেন যে, পরমাত্ম প্রকাণ্ড আর্তনাদ করে, প্রাণ ত্যাগ করে, মাতার মধ্যে লীন করে দিলেন নিজেকে। তাঁর ভৌতিক দেহ থেকে প্রাণ নিঃশেষ হবার উপরান্তে, যখন ভৌতিক দেহও গুহ্যার তেজে ভস্মীভূত হওয়া শুরু করলো তখন, সমস্ত ভাব ও ভূতরা মুক্ত হলেন সমস্ত বন্ধন থেকে। দেবী সমর্পিতা দৌড়ে দৌড়ে মাতা গুহ্যার কাছে ছুটে এলেন, আর তাঁকে অনুসরণ করলেন সকল অন্য পঞ্চভাবরা, তথা মহাভাবরা, এবং ভূত তথা ইন্দ্রিয়।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22