১। চক্রান্ত অধ্যায়
দিব্যশ্রীকে যেমন ব্রহ্মসনাতন বলেছিলেন, সেই ভাবেই বীজমন্ত্র জপ করে, শান্ত মনে উপস্থাপন করলে, ব্রহ্মসনাতন বললেন, “পুত্রী, আমি সেই আদিকাল থেকেই বিবরণ প্রদান শুরু করছি তোমার কাছে। রাজ্যের নাম মহাশূন্য। সিংহাসনে স্থাপিত একম ও অদ্বিতীয়ম, মহারানী ব্রহ্মময়ী। সমস্ত প্রজাই তাঁর সন্তান। আর তাঁর বিশেষত্বই এই যে, তাঁর নিজের সন্তান সকলেই। তাঁর সাথে দিবারাত্র যিনি লেপটে থাকেন, তাঁর নাম মানস।
আর সর্বক্ষণ যিনি এই রাজ্যের সকলের মাতারূপ মহারানীর থেকে সত্ত্বা ছিনিয়ে নিতে চান, তিনি হলেন আত্ম। কিন্তু এমন ভাবার কনো কারণ নেই যে, এঁরা দুইজনেই হলেন দেবী ব্রহ্মময়ীর সন্তান। আসল কথা এই যে, কেউ তাঁর স্বামীকে কখনো দেখেননি। জন্ম হয়ে নেত্র উন্মোচনের সময়কাল থেকে তাঁরা যাকে দেখে আসছেন, তিনি হলেন দেবী ব্রহ্মময়ী। কর্মগুনে তিনি মহারানী হলেও, তাঁকে সকলে মা নামেই ডাকেন, কারণ সেই নাম অনুসারেই তাঁকে মানেন। তাই কেউই জানেন না যে, তাঁর কনো গর্ভজাত সন্তান আছেন নাকি সকলেই একই প্রকার।
তবে সেটা জানার প্রয়োজনও পরেনা কারুর জন্য, কারণ এক তাঁকে মাতা জেনেই সকলে তৃপ্ত। সমস্ত রাজ্যে কনো ভেদভাব নেই, সকলেই সকলের ভ্রাতা ও ভগিনী, কারণ সকলের মাতা তো দেবী ব্রহ্মময়ীই। আর দেবী ব্রহ্মময়ীও কখনোই প্রায় রাজপোশাকে থাকেনা, কারণ তাঁর যে মহারানী হবার থেকে মাতা হয়ে থাকাই অতি প্রিয়। কিন্তু এই সমস্ত কিছুর মধ্যে একজনের অত্যন্ত আপত্তি, আর তিনি হলেন আত্ম। তাঁর কথা অনুসারে, দেবী ব্রহ্মময়ীর এই সমস্ত আচরণ আসলে ছলনা। আর তাঁর এই মন্ত্রণাতে যারা সম্পূর্ণ একমত, তাঁরা হলেন এই মহাশূন্য রাজ্যের তিন সর্বাধিক কামুকী স্ত্রী।
তবে এই কামুকী ভাব তাদের আসল রূপ নয়, এই রূপের পশ্চাতে একটিই কারণ, আর তা হলো আত্ম। কিন্তু এই সমস্ত কিছু যে এক মহাকাণ্ডের রচনা করতে চলেছিল মহাশূন্য নগরীতে, তা কারই বা জানা ছিল? কারই বা জানা ছিল যে, এই তিন কামুকী, দেবী কল্পনা, দেবী ইচ্ছা ও দেবী চিন্তা মহাশূন্যনগরীর মধ্যেই আরো এক রাজ্য স্থাপন করে দেবেন? জানা ছিল, আর সেই জ্ঞান ছিল দেবী ব্রহ্মময়ীর। আর তা জানা ছিল বলেই একদিন তিনি মানসকে নিজের কাছে ডেকে পাঠালেন।
১.১। কারানিক্ষেপ পর্ব
মানস মহারানী ব্রহ্মময়ীর কক্ষে উপস্থিত হলে, দেবী ব্রহ্মময়ী তাঁর উদ্দেশ্যে বললেন, “পুত্র মানস, দরজাটা বন্ধ করে দাও, আর প্রহরীকে বলে রাখো যাতে তুমি যতক্ষণ না দরজা খুলবে, ততক্ষণ অন্য কেউ আর এই কক্ষে প্রবেশ করতে পারবে না”।
নির্দেশ মত মানস কর্ম করার কালে একটু বিস্মিতই হলেন, কারণ মাতা ব্রহ্মময়ী এমন গোপনীয়তা সাধারণত ধারণ করেন না। আর সাথে সাথে নিশ্চিতও হলেন যে কিছু এক অত্যন্ত গোপন কথা তিনি বলতে চলেছেন। তাই প্রহরীকে নির্দেশ দিয়ে, দরজা বন্ধ করে, মহারানীর নিকটে গেলে, ব্রহ্মময়ী বললেন, “পুত্র মানস, এখন তোমাকে যেই যেই কথা বলবো, সেই কথা শ্রবণ করার কালে, তোমার মধ্যে ক্রোধ জাগ্রত হতে পারে। তবে কনো প্রকার উত্তেজনা যদি নিজের মধ্যে রাখো, তাহলে যেই কর্মের কথা তোমাকে বলবো, তা তুমি করতে সক্ষম হবেনা। তাই সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় হয়ে, মনোযোগ সহকারে আমার কথা শ্রবণ করো”।
মহারানী, দেবী ব্রহ্মময়ী বলতে শুরু করলেন, “পুত্র, আমার রাজ্যে, কিছু ব্যক্তি রয়েছেন, যারা আমার উপস্থিতি ও আমার তোমাদের সাথে থাকা সদ্ভাবকে পছন্দ করছে না। তারা আজ রাত্রে আমাকে বিষ প্রয়োগ করার প্রয়াস করবে। আমি যদি তাদের এই অপছন্দের ভাবকে আঘাত করি, তাহলে যেই চক্রান্তের বিষ আমাকে প্রদান করার প্রয়াস করবে তারা, সেই একই বিষ তারা আমার সমস্ত সন্তানের মধ্যে ঘুলে দেবে। তাই আমাকে তাদের দেওয়া এই বিষ পান করতে হবে।
তবে স্মরণ রেখো পুত্র, আমার কনো নাশ নেই। তাই বিষপান করে এই দেহত্যাগ করে দিলেও, আমার নাশ হবেনা। যেই উদ্দেশ্যে আমি এই বিষ পান করবো, অর্থাৎ আমার সন্তানদের যাতে এই বিষপ্রয়োগ না করা হয়, সেই উদ্দেশ্য যদি পূর্তি না হয়, অর্থাৎ আমার নাশ করার পর যদি এঁরা আমার সন্তানদের সেই বিষপ্রয়োগ করেই, তাহলে আমি আমার সন্তানদের রক্ষা করতে অবশ্যই পুনরায় প্রকট হবো।
তবে আমার এই পুনরায় প্রকট হবার কর্মকাণ্ডে তোমার হস্তক্ষেপ আবশ্যক পুত্র। আর সেই সূত্রেই তোমাকে এখন আবাহন করা। পুত্র, যদি দেখো যে এই রাজ্যের পরিস্থিতি তেমনই হচ্ছে, যেমনটা হোক আমি চাইনা, অর্থাৎ আমার প্রজার মধ্যে বিষ ঘোলা হচ্ছে, নিশ্চিত ভাবে জেনে রেখো যে, তোমাকে কারাবন্দী করা হবে। তবে এমন হলে বিচলিত হবেনা। আমি চন্দ্রপুরে আমার এক অনুগত সন্তানকে এই সূচনা দিয়ে রেখেছি ইতিমধ্যেই।
যদি তোমাকে কারাবন্দী করা হয়, তাহলে নির্বিঘ্নে কারাগারে যাত্রা করবে। চন্দ্রপুর তোমাকে রক্ষা করবে, এবং কারাগার থেকে মুক্ত করবে। অতঃপরে জানবে যে, যা কিছু প্রস্তাব তোমার কাছে উপস্থিত হবে, তা আমারই প্রদত্ত নির্দেশ তোমার উদ্দেশ্যে। আর এও জানবে যে, সেই সমস্ত নির্দেশ আমার সন্তানদের পুনরায় সদানন্দ প্রদান করার উদ্দেশ্যেই হবে।
পুত্র মানস, আমি আমার তিন অত্যন্ত বিশেষ গুণাবলিকে বীজরূপে তিন পৃথক পৃথক গোপন স্থানে বপন করে রেখেছি, যদি আমার সন্তানদের উপর কখনো বিঘ্ন উৎপন্ন হয়, তাদের সুরক্ষা দানের উদ্দেশ্যে। আর তোমাকে যেই নির্দেশ দেওয়া হবে চন্দ্রপুরে যাত্রার পর থেকে, তা সেই তিন বীজকে উদ্ধার করার উদ্দেশ্যেই। জেনে রেখো যে, সেই তিন বীজ পুনরায় আমার সন্তানদের সদানন্দ প্রদান করবে। তাই নিশ্চিন্ত হয়ে সেই পথে চলতে থেকো।
আর হ্যাঁ, আমার প্রস্থানে ব্যথিত হয়েও না, কারণ আমি পুনরায় আসবো। আমি মা, আর মা তাঁর সন্তানদের থেকে দূরে অধিককাল থাকতে পারেনা। তাই আমি আবার আসবো”।
মানস একটু গম্ভীর হয়ে জিজ্ঞাসু বেশে বললেন, “মা, একটি প্রশ্ন করতে পারি? … যদি সমস্তকিছুকে পূর্ববৎ করাই উদ্দেশ্য হয়, তবে মধ্যখানের এই অরাজগতাকে প্রশ্রয় দেবার কারণ কি হেতুতে? প্রথমেই সেই অরাজগতাকে স্তব্ধ করে দিলেই তো সমস্ত সমস্যার সমাধান হয়ে যায়, তাই নয় কি?”
মাতা ব্রহ্মময়ী হেসে বললেন, “পুত্র, আমি সদাসর্বদা স্বতন্ত্রতার কথা বলে এসেছি। আর আজ যদি আমার কিছু সন্তান এমন ধারণা রাখে যে আমার থেকে মুক্ত হওয়াই স্বতন্ত্রতা, তাহলে আমি তাদের এই ধারণাকে কি করে রোধ করতে পারি? যদি করি, তাহলে তো এই বার্তা প্রদান করা হবে যে, যেই স্বতন্ত্রতার কথা আমি এতকাল বলতাম, তা নিছকই ভণ্ডামি ছিল, তাই না! … তাই সেই স্বতন্ত্রতা আমি প্রদান করবো।
আর সেই স্বতন্ত্রতার যদি অপচয় হয়, তখন সেই স্বতন্ত্রতাকে রোধও করবো, আর তখন এই বার্তা প্রদান করবো যে, আমার সমস্ত সন্তান সদাই স্বতন্ত্র। কিন্তু যদি কেউ এই স্বতন্ত্রতাকে কবচ করে আমার বাকি সন্তানদের পরাধীন করতে উদ্যত হয়, আমি প্রস্তুত আমার সেই সন্তানদের বিনাশ করতে, আর বাকি সন্তানদের স্বতন্ত্রতা নিশ্চয় করতে।
পুত্র, মা কেবল স্নেহপ্রদত্তা বলেই মা নন। মা তিনি, যিনি সন্তানকে স্বতন্ত্রতার পবিত্রভাবের সাথে পরিচয় করান। আবার মা তিনি, যিনি সন্তানকে পরাধীনতা থেকে রক্ষা করেন। পুত্র, তিনিই মা, যিনি সন্তানকে এই বার্তা দিতে পারেন যে, তোমরা স্বতন্ত্র ছিলে আর থাকবে, আর যদি তোমাদের স্বতন্ত্রতা কেউ হনন করতে চায়, তাহলে এই মা আছে ও থাকবে, তোমাদের সেই স্বতন্ত্রতা ফিরিয়ে দিতে।
পুত্র, মা হলো বিশ্বাসের স্থান, আস্থার স্থান, অত্যন্ত স্নেহের বন্ধন তা, এমন বন্ধন যা পরাধীনতা নয়, স্বতন্ত্রতা প্রদান করে। পুত্র, এতকাল আমার সন্তানদের মধ্যে কখনোই এই স্বতন্ত্রতাকে কবচ করে অনাচার স্থাপনের ইচ্ছা জাগেনি। তাই এই মাকেও, প্রমাণ করতে হয়নি যে, মা কি, বা মা কেন। কিন্তু আজ যখন সেই বিরূপ মানসিকতা আমার সন্তানদের মধ্যে উপস্থিত হয়েই গেছে, তখন আমার কর্তব্য এই যে, আমি আমার সন্তানদের আবার নতুন করে মাতৃত্বের পাঠ প্রদান করি। আর তা করতেই এই লীলা।
হ্যাঁ এই লীলাতে থাকবে সংগ্রাম, থাকবে কষ্টভোগ, থাকবে আরো অনেক কিছু। তবে চিন্তা করো না পুত্র, এই সমস্ত কিছু আমার সন্তানদের দেখানোর যে এক মা কেন মা হন, কি কি গুণ তাঁকে মা করে তোলে, তা আমার সন্তানদের দেখানো আবশ্যক হয়ে গেছে। যদি তা না হতো, যদি আমার সন্তানদের অন্তরে মা কি হন, আর কেন হন, তা প্রত্যক্ষই থাকতো, তাহলে এই বিদ্রোহের ভাব উৎপন্ন হতো না। সেই ভাব উৎপন্ন হয়েছে, এর অর্থ মায়ের গুণাবলি সম্বন্ধে আমার সন্তানরা অচেতন হয়ে উঠছে। তাই এই লীলা, যাতে তাঁরা পুনরায় সচেতন হয়ে ওঠে, ও বিদ্রোহী না হয়ে, এই মায়ের বক্ষে সদানন্দে স্থাপিত থাকে”।
মানস সমস্ত কথার শেষে, তাঁর পরমযতনের মাতাকে প্রাণভরে আলিঙ্গন করে, সেই কক্ষ থেকে প্রস্থান করলেন। অন্যদিকে কামুকীর অভিনয়ে সদারত মহাশূন্যনগরীর তিন সুন্দরী, যাদের কামুক ভাবের প্রতি আত্ম অত্যন্ত গহন ভাবে আকৃষ্ট, তাঁরা আত্মকে ডেকে পাঠালেন নিজেদের কক্ষে।
আত্ম সদাই লালায়িত থাকে এই তিন সুন্দরীর সঙ্ঘলাভে। তাই এই আহ্বান তাঁর কাছে অত্যন্ত আকর্ষণের বিষয় হয়। আর সেই হেতু, বিনা কনো প্রকার সংকোচে, তিন কামুকীর কক্ষে যাত্রা করলেন আত্ম।
গদগদ ও কামনায় আদ্যপান্ত লিপ্ত হয়ে আত্ম প্রবেশ করলে, কামুকীরা নিজেদের কামনাপ্রসারণকারী প্রসাধনের অন্তরালে নিজেদের কামুকী রূপকে অর্ধেক ঢেকে, ও অর্ধেক আত্মকে উত্তেজনায় বশীভূত রাখার জন্য উন্মুক্ত করে, বললেন, “আরে আত্ম! … এসো এসো। তোমারই অপেক্ষাতে বসে ছিলাম আমরা”।
আত্ম গদগদ হয়ে বললেন, “কি আদেশ দেবীরা! আপনারাও জানেন, আপনাদের সমস্ত আদেশের পালন করতে আমি সদা তৎপর। তাই শীঘ্র আপনাদের আদেশ প্রদান করুন আমাকে”।
কনিষ্ঠ ও সর্বাঙ্গসুন্দরীরূপে নিজেকে প্রদর্শনকারী কামুকী, দেবী কল্পনা ছলবশে হেসে উঠে বললেন, “এত তাড়া কিসের আত্ম। … আজ তো তোমাকে তোমার প্রেমের পুরস্কার দিতেই ডেকেছি আমরা!”
আত্ম আরো অধিক গদগদ হয়ে উঠে বললেন, “পুরস্কার! … কি পুরস্কার!”
জ্যেষ্ঠ কামুকী, দেবী ইচ্ছা কাম্যময় হাস্য প্রদান করে বললেন, “কেন, যেই পুরস্কার তুমি সদা কামনা করে থাকো, সেই পুরস্কারই প্রদান করতে ডেকেছি তোমাকে। … বিবাহ করবে আমাদের তিন ভগিনীকে? আমরা তোমার প্রেমে আপ্লুত, আর তাই তোমার সাথে সঙ্গমে লিপ্ত হতে উন্মত্ত। বলো আমাদের তিন ভগিনীকে একত্রে স্বীকার করবে? একত্রে স্বীকার করে, আমাদের সাথে সঙ্গমসুখে মজবে?”
আত্ম কিছু বুঝতেই পারছিলেন না, তিনি বাস্তবে রয়েছেন, নাকি স্বপ্নে অবস্থান করছেন? … এমনই সময়ে, সর্বাধিক কামুকী স্ত্রী, দেবী চিন্তা আত্মের দেহের অত্যন্ত নিকটে উপস্থিত হয়ে, আত্মের দেহকে স্পর্শ না করে, সম্পূর্ণ ভাবে স্পর্শের ধারণা প্রদান করতে থাকলেন, নিজের কামুকী দেহগন্ধকে আত্মের অত্যন্ত স্পর্শনীয় দূরত্বে স্থাপন করে, আর বললেন, “কি এতো ভাবছো আত্ম? … আমাদেরকে কি তুমি চাও না!”
দেবী চিন্তার উর্জার সম্পূর্ণ আভাস লাভ করে, কামনায় অস্থির হয়ে উঠতে থাকলো আত্ম। কিন্তু সেই অস্থিরতাকে এবার উত্তেজনায় পরিবর্তিত করে দিতে শুরু করলেন দেবী কল্পনা। তিনি নিজের কামুকীপনাকে স্পর্শ করার প্রলোভন দিলেন না, সরাসরি আত্মকে পশ্চাৎ থেকে স্পর্শ ও কামুকভাবে আলিঙ্গন করে, নিজের সর্পের ন্যায় হস্তদ্বারা আত্মের দীর্ঘায়ু বপুকে সর্পগতির ভাব প্রদান করে, আত্মের কর্ণের কাছে নিজের কামুক নিশ্বাস ত্যাগ করে করে, আত্মকে সম্পূর্ণভাবে প্রায় বশীভূত করে দিয়ে বললেন, “শুধু সঙ্গম নয়, রাজসুখও দেব, এই আমাদের ইচ্ছা”।
কামনায় অস্থির আত্ম এবার আর নিজের বীর্যকে সম্বরণ করতে পারছিলেন না। এমনই সময়ে দেবী ইচ্ছাও দক্ষিণ পার্শ্ব থেকে আবিষ্ট হয়ে, আত্মের কটিদেশে নিজের কামনাময় হস্তকে সর্পের ন্যায় ক্রীড়া করাতে থাকলে, আত্ম কামনার বশে শব্দ উচ্চারণ করতেও ব্যর্থ হয়ে বলতে থাকলেন, “কি … কি.. কি … ক ক … করতে হবে আমাকে!”
দেবী চিন্তা এবার নিজের তনুকে আত্মের উপর সম্পূর্ণ ভাবে অর্পণ করে দিয়ে কমনীয় হাস্য পরিবেশন করে বললেন, “কিছুই নয়, আমাদের সম্ভোগ করতে হবে, আর সম্ভোগ করতে দিতে হবে”।
আত্ম আর কনো শব্দ উচ্চারণ করতে পারলেন না, আর চেষ্টাও করলেন না। দীর্ঘক্ষণ তিন কামুকীর সাথে সঙ্গমলীলায় আবদ্ধ থেকে, অবশেষে যখন তৃপ্ত হয়ে, নিজের বিশাল ঘর্মাক্ত দেহকে ত্রিকামুকীর দেহের উপর আলস্যে পরিপূরণ হয়ে অর্পণ করে দিলেন, তখন দেবী চিন্তা বললেন, “কি আত্ম! তোমার স্বপ্ন কি এই একদিনের সঙ্গমেই পূর্ণ হয়ে গেল! নাকি নিত্য এই সঙ্গমলীলার কামনা রইল!”
দেবী কল্পনা এক অদ্ভুত চালে, বিরক্তি প্রকাশ করে বললেন, “কি যে বলো দিদি! এই কঠিন বিস্তরায় সঙ্গম সুখকর কি করে হয়! … এই আত্ম, আমাদেরকে রাজসিক বিছানায় নিয়ে চলো। কথা দিচ্ছি, আরো অধিকক্ষণ ধরে সঙ্গম অমৃত তোমাকে সেবন করাবো”।
দেবী ইচ্ছা বললেন, “এই প্রস্তাবটি কিন্তু সঠিক দিয়েছিস কল্পনা, কিন্তু আত্ম কি পারবে এই প্রস্তাব গ্রহণ করতে?”
দেবী কল্পনা আবারও একপ্রকার আদুরে কামনার ঢঙে বললেন, “না পারলে, এই শেষ সঙ্গম। আমি এই কঠিন বিছানায় আর সঙ্গমে লিপ্ত হবো না, আমার কটিদেশে ব্যাথা করছে!” দেবী চিন্তাও একই সুরে বললেন, “আমারও… কি গো আত্ম! দেবেনা আমাদের রাজবিছানা!”
আত্ম কামনায় অস্থির, বারংবার এই তিন কামুকীর থেকে সঙ্গমসুরা লাভে লালায়িত। তাই ব্যকুল হয়ে বললেন, “আমি কি করে রাজবিছানা আনবো? সে তো মাতা ব্রহ্মময়ীর কাছেই কেবল আছে?”
দেবী ইচ্ছা এবার নিজেকে বস্ত্রে আবৃত করতে করতে বললেন, “মা তিনি! সন্তানের সুখের জন্য দেহত্যাগ করে, নিজের বিছানাকে তাঁর সন্তানের সুখের জন্য প্রদান করতে পারবেন না!”
দেবী চিন্তা বললেন, “আত্ম, যাও তাঁকে বিষ দিয়ে এসো। তাঁর অবর্তমানে, আমরা নই, তুমি হবে এই নগরীর রাজা। আর শূন্য নয়, মহাশূন্যনগরী নাম শুনতে শুনতে কান পচে গেছে। এবার এর এক নতুন নাম হবে, আর তার রাজা হবে তুমি, আর তোমার রানী হবো আমরা। আর তার সাথে, তোমার জন্য থাকবে, নরম রাজবিছানায় নিত্যসঙ্গমসুরা, আমাদের তিনজনের তরফ থেকে”।
কল্পনা আত্মকে চিন্তিত দেখে, নিজেকে বস্ত্রে আবৃত করতে করতে বললেন, “ভেবে দেখো আত্ম। রাজা হয়ে, চিরতরের জন্য আমাদের তিনজনকে লাভ করবে, নাকি তোমার সঙ্গম আনন্দলাভের এখানেই ইতি করবে! … আচ্ছা দিদি, কি নাম হবে আমাদের এই নতুন রাজ্যের? … আমাদের আদরের দেবী ব্রহ্মময়ীর নামেই রাখবো ভাবছি এই রাজ্যের নাম। রাজ্যের নাম হবে ব্রহ্মাণ্ডনগরী। … কি মহারাজ আত্ম, পছন্দ নাম?”
আত্ম এবার নিজেকে বস্ত্রে আবৃত করতে করতে বললেন, “সকলে সমান, সকলে সন্তান, এই কথা শুনতে শুনতে আমিও হাঁপিয়ে উঠেছি। আমিও নিষ্কৃতি চাই এই শাসনের থেকে। এই শাসনের থেকে তো অপশাসন ঢের ভালো। এ কি প্রকার শাসন, যেখানে কনো শাসনই নেই, শুধুই সন্তানসুখ। … রাজসিংহাসনের নরম রেশমি কাপড়ের আবেশ। রাজবিছানার নমনীয়তা, আমাদের ব্রহ্মময়ী তো এই সমস্ত কিছু গ্রহণই করেন না। সন্তানরা যেই ভাবে শক্ত বিছনায় শুচ্ছে, উনিও তেমনই করছেন। মূর্খ। … আমি প্রস্তুত ও তৎপর আপনাদের প্রস্তাব অনুসারে কর্ম করতে। কিন্তু আমি বিষ কোথায় পাবো?”
দেবী ইচ্ছা হাস্য প্রদান করে, নিজেদের কক্ষের এক গোপন স্থান থেকে একটি ওষধির শিশি নির্গত করে আত্মের হাতে দিয়ে বললেন, “এই হলো সেই বিষ”।
দেবী কল্পনা, কক্ষের অন্যস্থান থেকে একটি পায়েসের বাটি নিয়ে এসে সম্মুখে রাখলে, দেবী চিন্তা, দেবী ইচ্ছার হাত থেকে বিষের শিশি নিয়ে, পর্যাপ্ত পরিমাণ বিষ মিশিয়ে দিলেন পায়েসের বাটিতে আর বললেন, “যাও আত্ম, মহারানী ব্রহ্মময়ীকে এই বিষ প্রদান করে, তাঁর সিংহাসন গ্রহণ করে, আমাদেরকে তোমার রানী করো। তারপর সেই রাজবিছানাকে আরামদায়ক করে তোলার ভার আমাদের”।
আত্ম সেই বিষমিশ্রিত পায়েসের পাত্র নিয়ে, সরাসরি দেবী ব্রহ্মময়ীর উদ্দেশ্যে চলে গেলেন।
সরাসরি দেবী ব্রহ্মময়ীর কক্ষের সম্মুখে পায়েসের বাটি হাতে দণ্ডায়মান হয়ে বিশালাকায় বপুধারি আত্ম বললেন, “মহারানী, অন্দরে প্রবেশের অনুমতি কামনা করে এই আত্ম”।
দেবী ব্রহ্মসনাতনী হাস্যমুখে বললেন, “এসো আত্ম, তোমারই অপেক্ষা করছিলাম”।
আত্ম পায়েসের বাটি হাতে প্রবেশ করলে, দেবী ব্রহ্মময়ী তাঁর দিকে না দেখেই বললেন, “আমার মৃত্যু সম্ভব নয় আত্ম। তাই তোমার যেই প্রয়াস এই পায়েসের বাটির মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে, তা বৃথা। তবে তোমার অন্তরের কথা আমি জানি। তাই আমি মহাশূন্যনগরী ত্যাগ করে আজকে রাত্রেই চলে যাবো।
তুমি এই রাজ্যে রাজত্ব বিস্তার করতে চাও, ভেদ নির্মাণ করতে চাও আমার সন্তানদের মধ্যে। বেশ আমি বাঁধা দেবনা। কারুর স্বতন্ত্রতাতে আমি আজ পর্যন্ত বাঁধা দিইনি, তাই তোমার ক্ষেত্রেও দেবনা। তবে তোমাকে বিশেষ কিছু কথা বলার আছে।
পুত্র অহম, তুমি এক মানসিকতা ধারণ করে রেখেছ, যার বাস্তবায়ন করে তুমি দেখে নিতে পারো, তা সঠিক না বেঠিক। যাদের থেকে সাহস অর্জন করে, এই কথা তুমি আমাকে বলতে এসেছ, তাদের থেকে সাবধান থেকো। আমি জানি আত্ম, তোমার অন্তরে এই মহাশূন্যনগরীকে পরিবর্তিত করে ব্রহ্মাণ্ডনগরী করে তোলার ভাবনায় যারা তোমাকে সাহস জুগিয়ে এখানে পাঠিয়েছে, তোমার হাতে বিষাক্ত পায়েস ধরিয়ে, তাদের তোমাকে এখানে আসার প্রেরণা দেবার আগে থেকেই তোমার মধ্যে এই একই প্রেরণা আছে।
সেই কারণেই আমি তোমাকে অনুমতি দিলাম, একে ব্রহ্মাণ্ডনগরী গড়ে তোলার। তবে স্মরণ রেখো, আমার মৃত্যু নেই। তাই, যদি আমি দেখি যে, তুমি তোমার মন্তব্যে নাকাব হয়েও জোর করে নিজের সিংহাসন বাঁচিয়ে রেখেছ, আমি অবশ্যই তা তোমার থেকে ছিনিয়ে নিয়ে, তোমাকে মৃত্যু দেব। তাই, সতর্ক থেকো।
আরো একটা কথা, যাদের কথাতে তুমি আজ এখানে এসেছ, যাদের কথা শুনে তোমার মনে হয়েছে যে, তারা তো তোমারই ইচ্ছার কথা বলছে, তাদের ফাঁদে পা দিও না। আত্ম, তুমি একটি পরিকল্পনা করেছ, ব্রহ্মাণ্ডরাজ্যের ব্যাপারে, কিন্তু যাদের প্ররোচনায় তুমি আজ এখানে এসেছ, তাদের কনো পরিকল্পনা নেই। তাদের একটিই উদ্দেশ্যে সত্ত্বা ধারণ, কর্তৃত্ব স্থাপন ও সম্ভোগ। তাই, যদি তাঁদের দ্বারা পরিচালিত হও, তাহলে অবশ্যই তুমি নিজেকে এমন স্তরে নিয়ে যাবে, যেখানে আমি তোমাকে উৎখাত করে, পুনরায় মহাশূন্যনগরী স্থাপন করতে বাধ্য হবো।
আর কিছু বলবো না। বাকি সমস্ত কিছু তুমি স্বয়ংই বুঝে নিতে সক্ষম। দাও, বিষযুক্ত পায়েসের পাত্র দাও। আমি সেবন করবো। আমার শরীর তোমাদের চোখের সামনে মৃত পরে থাকবে, তবে পুনরায় বলছি আমার মৃত্যু অসম্ভব, কারণ আমি মা। সন্তানের কল্যাণই এক মায়ের ধ্যান, জ্ঞান, স্বপ্ন, সমস্ত কিছু। তাই এমন ভাবার কনো কারণ নেই, যে আমি মৃত। যদি তুমি নিজের অধিকারে নিজে থেকে, আমার সন্তানদের সুখদ জীবন প্রদান করতে পারো, আমি কথা দিচ্ছি, আর কনো দিনও ফিরবো না। তবে তা যদি না হয়, তাহলে আমি এক্ষেত্রেও কথা দিচ্ছি, আমি অবশ্যই ফিরবো।
তবে আত্ম, পুত্র, যদি আমাকে দ্বিতীয়বার ফিরতে হয়, তা তোমার জন্য কনো ভাবেই সুখদ হবেনা, কারণ তখন আর আমি শুধুই মা হয়ে ফিরবো না, তখন আমার অন্য রূপ দেখতে পাবে তুমি ও তোমরা, এক নয় অজস্র রূপ দেখতে পাবে। আর সেই একটি রূপও তখন তোমাদের জন্য সুখকর হবেনা। তাই, প্রয়াস করো যেন, আমাকে আর ফিরতে না হয়”।
এত বলে, আত্মের হাত থেকে বিষের পাত্র গ্রহণ করে, বিষপান করলেন দেবী ব্রহ্মময়ী। আত্ম সেই কক্ষ থেকে চলে গেলেন সরাসরি রাজাসনের সম্মুখে। আর দেবী ব্রহ্মময়ীর নিষ্প্রাণ দেহ, তাঁর ধ্যানাসনেই স্থিত থেকে গেল।
রাত্রে আহার প্রদান করতে এসে, মানস দেখলেন, দেবী ব্রহ্মময়ীর পদ্মপুষ্পের মত সুন্দর দেহখানা অচেতন হয়ে ভূমিতে শায়িত। তাঁর মুখ থেকে শুভ্র ফেনা নির্গত হয়ে রয়েছে। ভয়ার্ত হয়ে উঠে, মানস উচ্চৈঃস্বরে চিৎকার করে উঠলে, সেখানে এক এক করে, বহু মহাশূন্যনগরীর প্রজারা একত্রিত হলেন।
বেশ কিছুক্ষণ পরে, সেখানে উপস্থিত হলেন দেবী ইচ্ছা, চিন্তা ও কল্পনা আর তাদের আগমনের সামান্য পরেই, তাদেরই নির্দেশ মত আত্ম এলেন সেই স্থানে। নির্দেশ মত কেন? কারণ আত্মের সাথে ত্রিকলঙ্কিনীর পূর্বেই আলাপ হয়েছে।
আত্ম বিচলিত হয়ে তাঁদের কাছে গেছিলেন। সেখানে উপস্থিত হয়ে বললেন, “দেবী ইচ্ছা, আমার মনে একটি দ্বন্ধ দেখা দিয়েছে। যদি সেই দ্বন্ধ অহেতুক হয়, তবে তার নিবারণ করুন এক্ষণে, আর যদি তা অহেতুক না হয়, যদি যৌক্তিক হয় তা, তবে এই সমস্যার সমাধান কি হবে?”
দেবী কল্পনা সম্মুখে এসে কামুকী ভাবে বললেন, “তুমি কি তা করেছ আত্ম, যা তোমাকে করতে বলা হয়েছিল?”
আত্ম মাথা নাড়িয়ে বললেন, “হ্যাঁ হয়ে গেছে সেই কাজ করা। এতক্ষণে নিশ্চিত দেবী ব্রহ্মময়ী মৃত্যু লাভ করে গেছেন”।
দেবী ইচ্ছা বিকৃত ভাবে বললেন, “দেবী ব্রহ্মময়ী! বাবা, সম্মান তো উতলে পরছে! … তা তোমার দেবী ব্রহ্মময়ী কি কিছু বুঝতে পারলেন? সকলে তো তাঁকে দেবী বলে!”
আত্ম মাথা নিচু করে বললেন, “তিনি সমস্তই জানেন। আপনাদের সাথে আমার কি কথা হয়েছে, আমার মনের মধ্যে কি চলেছে। আর আমি যে আপনাদের নির্দেশে বিষের পাত্র নিয়ে উপস্থিত হয়েছি তাঁর কাছে, সমস্তই তাঁর জানা। তিনি জেনেশুনেই বিষপান করেছেন, আমাকে স্বতন্ত্রতা প্রদান করার জন্য”।
দেবী কল্পনা বিরক্তির সাথে বলে উঠলেন, “যত সব ন্যাকামি।… ওষ্ঠ বিকৃত করে, সবই জানেন। … সব যদি জানেনই, তাহলে বিষ পান করলেন কেন?”
দেবী চিন্তা বললেন, “সেসব কথাতে কনো কাজ নেই। … তাহলে মহারাজ আত্ম, এবার তোমার রাজ্যাভিষেকের সময় আসন্ন। তুমি হবে ব্রহ্মাণ্ডনগরীর রাজাধিরাজ। … তা মহারাজের দ্বন্ধ কি? সেই দ্বন্ধের সমাধান করতে, মহামন্ত্রী দেবী চিন্তা তৎপর। আদেশ করুন মহারাজ”।
দেবী ইচ্ছা গর্জন করে উঠলেন, “ও অমনি নিজেকে মহামন্ত্রী ঘোষণা করে দিলি! … আমি বড় না!”
দেবী চিন্তা, দেবী ইচ্ছার নিকট গিয়ে, কামুকীয় ভাবে তাঁকে নিজের দেহের কাছে আকর্ষণ করে বললেন, “দিদি তো তুমি আমাদের। তাই তো তুমি হলে মহারানী। আর তাই তো আমি হলাম মহামন্ত্রী। আর আমাদের আদরের ভগিনী, যে এক মহাযোদ্ধা, সে হবে সেনাপতি। … কি! কেমন বললাম!”
দেবী ইচ্ছা হেসে বললেন, “তুই তো আমার গর্ব!”
দেবী চিন্তা এবার আত্মের দিকে তাকিয়ে বললেন, “দেখুন মহারাজ, মহারানীর সমস্যার সমাধান করে দিয়েছে আপনার মহামন্ত্রী। আদেশ করুন, যাতে মহারাজের সমস্যারও সমাধান করতে পারি”।
আত্ম বললেন, “দেবী ব্রহ্মময়ী দেহত্যাগ করলেন। বেশ, একটি কাজ তো হয়ে গেল। কিন্তু বিচার করে দেখুন, তাঁর অবর্তমানে, যিনি রাজা হবেন, তিনি তো মানস। প্রজা তাঁকেই রাজা মানবে, তাই নয় কি?”
দেবী চিন্তা হেসে বললেন, “একজন অপরাধী, … না না না … রাজ্যের শ্রেষ্ঠ অপরাধীকে প্রজা রাজার আসনে বসতে দেবে? নাকি কারাগারে প্রেরণ করবে?”
আত্ম বিস্মিত হয়ে বললেন, “এর অর্থ কি?”
দেবী চিন্তা পুনরায় হেসে বললেন, “শুনুন মহারাজ, হৈহট্টগোল শুরু হয়ে গেছে, মানে প্রজা জেনে গেছে। এবার আমরা তিন ভগিনী যাবো, আমরা সেখানে পৌঁছানোর বেশ কিছুক্ষণ পরে আপনি যাবেন সেখানে, ঠিক আছে। … বাকি সেখানে গিয়েই সমস্ত কিছু দেখতে আর প্রত্যক্ষ করতে পারবেন। দেখবেন, আপনার মহামন্ত্রীর কূটনৈতিক চাল কেমন হয়। নিজেই পরখ করে নেবেন। … এখন চলো দিদি। … বোন চল্”।
এই বলে সেখান থেকে প্রস্থান করতে গেলে, দেবী কল্পনার হস্ত আকর্ষণ করে আত্ম তাঁকে নিজের বিশাল বপুর মধ্যে স্থাপিত করে বললেন, “দেবী ব্রহ্মময়ী বেঁচে থাকতে আপনারা কেউ তাঁর কাছে যেতেন না, আর আজ যে তাঁর মৃত্যুর পরে এমন ভাবে ঘটা করে যাচ্ছেন! … এও কি কনো কূটনীতির চাল!”
দেবী কল্পনা হেসে বললেন, “মহারাজ, আমি নিশ্চিত, দেবী ব্রহ্মময়ী আপনাকে দেহত্যাগের পূর্বে বলেছেন, তাঁর মৃত্যু সম্ভব নয়, তিনি আবারও ফিরবেন। … তাই না?”
আত্ম সেই কথা শুনে চমকিত হয়ে উঠলে, দেবী কল্পনা পুনরায় বললেন, “আজ আমি আপনাকে বলছি, আমাদের তিন ভগিনীর দেহনাশ সম্ভবই নয়। তবে তা সম্ভব, আর যে তা সম্ভব করতে পারতো, তাঁর নাম দেবী ব্রহ্মময়ী। তবে কি ভাবে করতে পারতো! … মহারাজ, দেওয়ালেরও কান আছে। তাই আপনাকে সেই কথা বলতে পারলাম না”।
এত বলে সেখান থেকে দেবী কল্পনাও প্রস্থান করলেন। আর যখন তিন ভগিনী দেবী ব্রহ্মময়ীর মৃতদেহের নিকটে পৌঁছালেন, তখন দেবী চিন্তা সেই মৃতশরীরের কাছে বসে, দেবী ব্রহ্মময়ীর নাড়ি ধরে বললেন, “ইনাকে তো বিষ দেওয়া হয়েছে? কে দেখেছে ইনাকে প্রথমবার?”
যখন এমন প্রশ্ন করলেন, তখনই সেখানে আত্ম উপস্থিত হয়েছিলেন। তিনি দেখলেন, একত্রিত প্রজার মধ্যে প্রথম সারি থেকে কেউ বললেন, “মানস তাঁকে প্রথম দেখেছিলেন”।
দেবী চিন্তা গম্ভীর হয়ে বলে উঠলেন, “মানস তাঁকে প্রথম দেখেন নি, মানসই তাঁকে অন্তিমবার দেখেছেন। হ্যাঁ, জীবিত অবস্থায় তিনিই প্রথমবার দেখেছেন দেবী ব্রহ্মময়ীকে। এই বিষ কিছুক্ষণ আগেই দেওয়া হয়েছে, অর্থাৎ মানসই দেবী ব্রহ্মময়ীকে বিষ দিয়ে হত্যা করেছে”।
দেবী কল্পনা উচ্চৈঃস্বরে বলে উঠলেন, “ছি ছি মানস! তোমাকে নিজের সন্তানের থেকেও অধিক স্নেহ করতেন উনি। আর তুমি কিনা সিংহাসনের লোভে, তাঁকে হত্যা করে দিলে!”
দেবী ইচ্ছা এবার হুঙ্কার দিয়ে বলে উঠলেন, “এই হত্যাকারীর সাথে কি করা উচিত! তোমরাই বলো প্রজাগন”।
সকলে একই সাথে বলে উঠলেন, “মৃত্যুদণ্ড, মৃত্যুদণ্ড”।
সেই ভিড়ের থেকেই একটি কণ্ঠস্বর বলে উঠলেন, “দেবী, অবশ্যই হত্যাকারী রূপে উনাকেই সর্বপ্রথম সনাক্ত করা যেতে পারে। তবে কারুকে মৃত্যুদণ্ড দেবার পূর্বে, তাঁকে দোষী বলে সাব্যস্ত তো করতে হয়, কেবলই অনুমানের ভিত্তিতে এই কাজ কি করা উচিত?… তাই তাঁকে কারাগারে নিক্ষেপ করে, তাঁর বিরুদ্ধে বিচারসভা বসানোই, সঠিক হবে। অন্তত মাতা ব্রহ্মময়ী তো তেমনই করতেন”।
সেই অজ্ঞাত ব্যক্তির কণ্ঠস্বর সকলে শুনতে পেলেন, কিন্তু পশ্চাতে ঘুরে, সেই বক্তাকে চিহ্নিত কেউ করতে পারলেন না। কিন্তু তাঁর কথা অত্যন্ত যৌক্তিক। তাই সমস্ত প্রজা সেই অজ্ঞাত ও অদেখা প্রজার কথাকেই মান্যতা প্রদান করলেন। তাই দেবী ইচ্ছা এবকার সেনাকে ডেকে মানসকে কারাগৃহে নিক্ষেপ করলেন।
মানসকে কারাগৃহে নিক্ষেপ করার পর, দেবী চিন্তা সকল প্রজার উদ্দেশ্যে বললেন, “প্রজারা, রাজসিংহাসনকে রিক্ত করে রাখার অর্থ, শত্রুকে আক্রমণের জন্য নিমন্ত্রণ দেওয়া। … হ্যাঁ, দেবী ব্রহ্মময়ীকে সকলে মান্য করতেন, তাই এই রাজ্যকে আক্রমণ করতেন না। তবে তাঁর রাজ্যের উর্বরতার প্রতি সকলেরই নিশ্চিত ভাবে চোখ ছিল। তাই রাজসিংহাসনকে রিক্ত রাখার তো কোন ও অর্থই হয়না।
এবার প্রশ্ন এই রাজসিংহাসনে কে উপনীত হবেন? মানস ছিলেন দেবী ব্রহ্মময়ীর সর্বাধিক নিকটতম ব্যক্তি। দেবীর অবর্তমানে অবশ্যই সিংহাসন তাঁরই হতো, কিন্তু মানসের তো তর সইলনা, সেই সময়ের জন্য। তার আগেই সে সিংহাসন ছিনিয়ে নেবার প্রয়াস করে বসলো। এমত অবস্থায়, মাতা ব্রহ্মময়ীর দ্বিতীয়প্রিয়তম সন্তান ছিলেন আত্ম। তাই আত্মকেই সেই সিংহাসন প্রদান করা উচিত, আপনারা কি বলেন?”
কিছু প্রজা চুপ থাকলেন, অধিক প্রজা তাঁদের মাতার দেহত্যাগে এমনই বেদনাদায়ক অবস্থা হয়, যে তারা কথা বলতেও পারেনা। কিছু প্রজা বলে উঠলেন, “সেটিই সঠিক। সেটিই সঠিক”।
দেবী চিন্তা তাই বললেন, “বেশ আজ রাত্রে মাতা ব্রহ্মময়ীর শবদেহকে দহন করার পরে, কাল প্রভাতের প্রথম ঘটিকায়, সকলে রাজদরবারে উপস্থিত থাকবেন। … আত্মকে মহারাজের পদে উপস্থাপন করে, দ্বিপ্রহরে মহারাজ সমস্ত কর্মভার সামলে, প্রথম কর্মরূপে, মানসের বিচার করে, তাঁর মৃত্যুদণ্ড নিশ্চয় করবেন”।
আত্ম অবাক দৃষ্টিতে দেবী চিন্তাকে দেখতে থাকলেন আর ভাবতে থাকলেন, এমন অসম্ভব কূটনীতিজ্ঞ থাকলে তো, দেবী ব্রহ্মময়ী, যেমন তিনি কথা দিয়েছেন, তেমন ভাবে পুনরায় ফিরে এলেও, আমার রাজত্ব ছিনিয়ে নিতে পারবেন না!”
একদিকে যখন তিনি এমন ভাবছিলেন, অন্যদিকে সেনারা মানসকে বন্দি করে কারাগারে নিক্ষেপ করলেন।
