৬.৩। পরাপ্রকৃতি পর্ব
মাতা সর্বাম্বা এমন বলে, এক প্রকাণ্ড রূপ ধারণ করলেন, যার মধ্যে সাতটি রূপ আবিষ্ট। একদম বামদিক থেকে দক্ষিণ দিক পর্যন্ত, তাঁর রূপপ্রকাশ হয়, জজনাশী থেকে অন্নদা। সাতটি তনুর মিশ্রণে প্রকাশিত সেই বিশালাকায় তনুকে দর্শন করে দেবী সমর্পিতা নতজানু হয়ে বললেন, “মাতা, তুমি মাতৃকাবেশে, বামী হয়ে অবস্থান করছিলে, অর্থাৎ দক্ষিণ দিক থেকে বাম দিকে তোমার রূপবিস্তারকে সজ্জিত রেখেছিলে। কিন্তু এই রূপে, তুমি দক্ষিণামুখি, কারণ তুমি বামদিক থেকে দক্ষিণ দিকে নিজের রূপবিস্তারকে প্রসারিত রেখেছ”।
দেবী শিখা সম্মুখে স্থিতা হয়ে বললেন, “চেতনা থেকে পরাচেতনা হবার রূপবিস্তার যদি তোমার মাতৃকা রূপ হয়, তাহলে এই রূপ হলো তোমার মহামাতৃকা রূপ বিস্তার, যেখানে তুমি সপ্ত কদমে পরাপ্রকৃতি বেশ ধারণ করলে। কিন্তু মা, তোমার এই বিচিত্র সপ্ততনু ধারণ করা, এবং অষ্টাদশ হস্ত বিশিষ্টা মহামাতৃকা রূপ, একদিকে অতি মনোরম আবার অন্যদিকে অতিব নিদারুণ রূপে ভয়ঙ্কর। … হে পরাপ্রকৃতি, তোমার এই মহাবিস্তার রূপ যে আমার কাছে অবোধ্য!”
দেবী বেগবতী এবার সম্মুখে স্থিতা হয়ে বললেন, “হ্যাঁ বিশ্বজননী, তোমার রূপের অন্তর্নিহিত অর্থ আমার কাছেও দুর্বোধ্য লাগছে। সপ্তরূপ তোমার না বুঝলাম, জজনাশী, বীরশ্রী, যক্ষেশ্বরী, লিলাশ্রী, মহাশ্বেতা, সর্বশ্রী ও অন্নদা, এই সাত রূপের সম্বলিত ভাব। কিন্তু মা, যদি তাই হয়, তাহলে তো তোমাকে চৌদ্দহস্ত বিশিষ্টা দেখানো উচিত। তা না হয়ে তুমি কেন অষ্টাদশ ভুজাবিশিষ্টা?”
মাতা মহামাতৃকা হেসে বললেন, “তোমাদের মূল সংশয় আমার এই রূপ নিয়ে তো নয়! এই রূপের বিবরণ তো এখানে উপস্থিত বিচার, বিবেক ও বৈরাগ্য আছে। তাঁরাই করে দেবে। কিন্তু তোমাদের মূল সংশয় তো এই নিয়ে যে, আমি এমন বরদান কেন দিলাম, ত্রিগুণকে যার বলে তারা ভয়ানক শক্তিশালী হয়ে গেল! এই তো? বেশ আমি তোমাদের এর গুহ্য কথা বলি আগে, তাহলে তোমাদের আমার হিতাহিত নিয়ে দুশ্চিন্তা শান্ত হবে। তারপরে না হয়, বিচারদের থেকে আমার এই অষ্টাদশভুজার ও সপ্তরূপের সত্য জেনে নেবে।
আমার প্রিয় পিতা ও মাতারা, তোমরা আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করো আমি জানি। যতই মুখে জগজ্জননী বলো আমাকে, অন্তরে কেবলই আমি তোমাদের সাধের কন্যা। আর তাই এই কন্যাকে নিয়ে তোমাদের সংশয়ের সীমা নেই। কিন্তু মাতা, এই বরদান প্রদান করা আবশ্যক ছিল আমার জন্য, নাহলে যে আমি এই রূপে স্থিতাই হতে পারছিলাম না!
হ্যাঁ মা, এই রূপ হলো পরাপ্রকৃতির রূপ, যাকে তোমরা নামকরণ করেছ মহামাতৃকা। জানি আমি, তোমরা ভাবছো, আমি তো রজনীকে এই বরদান পরদান করেছি যে, সম্যক প্রকৃতি তাঁর অধীনে থাকবে, তাহলে এই রূপ পর্যন্ত পৌঁছে কি লাভ হলো? মাতা, আমার যাত্রা সমাপ্ত হয়ে যাইনি। আমার যাত্রার সম্বন্ধে আপনাদেরকে আপনাদের পিতা কি বলেছিলেন? আমি তিনটি কদম রাখি।
এই রূপে স্থিতা হয়ে, আমি আমার দ্বিতীয় কদম স্থাপন সম্পন্ন করলাম, কিন্তু এখনো যে আমার তৃতীয় কদম স্থাপন বাকি রয়ে গেছে মা! … কিন্তু মা, সেই অবস্থা পর্যন্ত উন্নীত হতে গেলে, আগে যে এই অবস্থায় উন্নীত হতে হতো। আর এই অবস্থায় উন্নীত হবার জন্য যে, ত্রিগুণের তৃপ্তি অনিবার্য ছিল। তাঁদের তৃপ্তির কারণেই এই তিন লোকের নির্মাণ করেছিলাম এককালে। তাই যতক্ষণ না তাঁরা তৃপ্ত হচ্ছে, ততক্ষণ যে আমার কর্মপাশ সমাপ্ত হচ্ছেনা।
তাই দেখলে না, যতক্ষণ না প্রভাত অর্থাৎ সত্ত্বগুণ তৃপ্ত হলো ততক্ষণ অনাহত উন্মোচিতই হলো না, যাই সে তৃপ্ত হয়ে গেল, তাই অনাহত আপনাআপনিই উন্মোচিত হলো। একই ভাবে রজনী বা রজগুণ তৃপ্ত হতেই উন্মোচিত হলো বিশুদ্ধ আর তামস বা তমগুণ তৃপ্ত হতেই উন্মোচিত হলো আজ্ঞা। ভালো করে আমার এই সপ্তরূপা রূপকে প্রত্যক্ষ করো মা। দেখো, আমার দক্ষিণতম তিনরূপকে। মহাশ্বেতা, সর্বশ্রী, আর অন্নদা। এই তিনরূপ যে ত্রিগুণকে তৃপ্ত করার জন্যই বিভাজিত হয়েছিল আমার থেকে। আজ আমার কর্মপাশের নাশ হতে, সেই তিনরূপকে আমি একত্রিত করে মহামাতৃকা।
আর আমার ত্রিগুণের প্রতি কনো দায় রইল না। আর রইল কথা, ত্রিগুণকে দেওয়া বরদান নিয়ে সংশয়! মা, ত্রিগুণের কাছে আমি যে এই পরাপ্রকৃতি পর্যন্তই সীমিত। এর পরবর্তী ধারা যে তাঁদের জানাও নেই। তাই আমার বরদান লাভ করে তাঁরা ভাবছে যে, তাঁরা অমর হয়ে গেছে। নিশ্চিত ভাবে, তাঁদের এই বরদান লাভের জন্য আত্ম ও ছায়ারা মোহোৎসবেও মেতেছে। আর নিশ্চয়ই তাঁরা পরবর্তী যোজনার কথাও ভাবছে, আমাদের আক্রমণের জন্য, কারণ তাঁদের মতানুসারে, তাঁরা এখন আমার থেকেও অধিক বলশালী, আমাকেও জয় করে নিতে পারে। …
মা, আমি কিন্তু আর কনো পাশে আবদ্ধ নেই। এতক্ষণ ছিলাম ত্রিগুণের প্রতি, কারণ তাঁদেরকে আমিই এককালে ভগবানের মান্যতা প্রদান করে, তাঁদের আরাধনা করেছিলাম। তাই তাঁদেরকে সেবা করে, তাঁদেরকে আমার যেই রূপ পর্যন্ত তাঁরা জানে বা চেনে, সেই রূপ পর্যন্ত তাঁদের অধীনে থাকার প্রতিশ্রুতি অর্থাৎ বরদান দিয়ে দিয়েছি। এবার আর আমি তাঁদের কাছে কনো কর্মপাশে আবদ্ধ নেই। আমার পরবর্তী যাত্রাপথের সম্মুখে তাঁরা যদি উপস্থিত হয়, তাঁদের নাশ কেউ আটকাতে পারবেনা।
কেন? কারণ তাঁদের অভয়দান তো এই প্রকৃতি পর্যন্তই, তার পরে নয়। বুঝতে পারছো তো মা, যদি না তাঁদের সেবা করে, তাঁদেরকে তৃপ্ত করতাম, তাহলে এই অবস্থায় উন্নীতই হতে পারতাম না, আর এই অবস্থায় উন্নীত না হতে পারলে, পরবর্তী অর্থাৎ তৃতীয় কদম বা অন্তিম কদম রাখার জন্য উদ্যমীই হতে পারতাম না। তাই তাঁদের সেবা করলাম, আজ্ঞা পেরিয়ে, সহস্রার পর্যন্ত উন্নীত হয়েছি। এবার এঁর পারে যাবার কাল আসন্ন। তাঁরা ভাবলো, প্রকৃতির উপর তাঁরা অধিকার স্থাপন করে নিয়েছে। কিন্তু আমি যে এবারে প্রকৃতি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকতে অবতরণ করিনি মা”।
সমর্পিতা আনন্দের সাথে বলে উঠলেন, “ধন্য তোমার লীলা মা। সত্যই তুমি লীলাবতী। যেমন সরল তুমি, তোমার প্রতি নিষ্ঠাবান, তোমাতে নিবেদিত সন্তানদের প্রতি; যেমন তাঁদের কাছে তুমি নিজেকে ঈশ্বরী মানতেই নারাজ, কেবলই মা হয়ে তাঁদের কাছে বিরাজমান; তেমনই জটিল তুমি তাঁদের কাছে, যারা তোমাকে শত্রু জ্ঞান করে। … তাঁরা সামান্যও বুঝতে পারেনা যে তাঁদের সাথে লীলা হয়েছে। তাঁরা তোমার করা গদগদ সেবাটা দেখতে পায়, আর তোমার এমন বরদান দেওয়া যা তাঁদের স্মৃতিতে যা তোমার সর্বোচ্চ প্রকাশ, তার বলকেও অতিক্রম করে যায়, তা দেখতে পায়। কিন্তু তোমার সমস্ত কিছুর অন্তরালে যেই লীলা রয়েছে, তা তাঁদের বোধগম্যও হয়না।
আসলে তুমি যে সকলের চেতনা হয়ে বিরাজমান, সকলের প্রকৃতি তুমি স্বয়ং। কেউ দেখলেন তাঁর দেওয়া পুরস্কার কেউ চুরি করে নিয়েছে, কিন্তু সে এটি বুঝতে পারেনা যে, সেই চোরটির অন্তরেও তুমিই চেতনা হয়ে বিরাজমান, আর তুমিই তাঁকে সেই পুরস্কার চুরি করার নির্দেশ দিয়েছিলে, এটা বোঝাতে যে তুমি সেই পুরস্কারদাতার উপর রুষ্ট। অদ্ভুত তোমার লীলা মা। … এবার যে তোমার এই মহামাতৃকা রূপের সম্পূর্ণ বিবরণ জানার সাধ জাগছে মা!”
মাতা মহামাতৃকা মৃদু হেসে বললেন, “বেশ তো, মহাভাবরা সেই বিবরণ তোমাদের প্রদান করবে”।
বিচার সেই কথা শুনে সম্মুখে এসে বললেন, “মাতার বাম দিকে, তাঁর পরাপ্রকৃতি হয়ে ওঠার প্রথম পদক্ষেপকে দেখো সকলে। তিনি মাতা জজনাশী, পুনঃ পুনঃ জন্মের সমস্ত সংস্কার যা আমাদের সমস্ত ভূতদের মধ্যে চিন্তার উদয় করে, ভীতির উদয় করে, উদ্বিগ্নতার উদয় করে, উচাটন রেখে, সর্বদা তাঁদেরকে আত্মের কাছে বন্দী করে রেখে দেয়, তাঁর বিনাশ কর্ত্রী তিনি। সমস্ত পূর্বজন্মের থেকে আত্মের প্রকৃতি জেনে, তাঁদেরকে আত্মসাৎ করে নিয়ে, মুক্ত পত্রিকা তিনি, তাই তাঁর সতেজ কিশালয়ের মত অঙ্গবর্ণকে প্রত্যক্ষ করো। মাতা অতীতকে অনুধাবন করতে এখানে ত্রিনয়না, এবং সেই অতীতকে নিয়মাবদ্ধ করে বিচার ও বিশ্লেষণ করার জন্য, দ্বিভুজা, যার একটিতে তিনি ধারণ করে রয়েছেন কলম, আর অন্যটিতে ধারণ করে আছেন পৃষ্ঠা।
পরবর্তী প্রকৃতিপ্রকাশকে প্রত্যক্ষ করো জজনাশীর দক্ষিণ দিকে। দেবী সেখানে সমস্ত ভুতপ্রেত ও পিশাচদের পুনরায় যোনিতে প্রেরণ করছেন। সেই কর্ম করতে, তিনি কখনো ভুতদের ভীত করছেন আবার কখনো তাঁদেরকে স্নেহের সাথে বোধোদয় করাচ্ছেন। তাই তিনি তাঁর তিন হস্তে অরিনাশী, নিপাশ ও ত্রিমার ধারণ করে রয়েছেন, আবার তিন হস্তে অভয় মুদ্রা ধারণ করে রাখছেন। ত্রি অস্ত্র কেন? আর ত্রিমুদ্রাই বা কেন?
ভুতদের জন্য একটি মুদ্রা ও অরিনাশি, যা ভুতদের সমস্ত অরিবন্ধন থেকে মুক্ত করছে, তাঁদের বিচার করাচ্ছে, এবং তাই সেই নিপাশ তিনি বিচারের অর্থাৎ আমার হস্তে প্রদান করছেন। আর ভিন্ন মুদ্রা কারণ ভুতদের বোধ প্রদান করা, আর অন্য প্রেত তথা পিশাচদের বোধ প্রদান করা এক নয়। পরবর্তীতে মাতা নিপাশ ধারণ করে প্রেতদেরকে তাঁদের উপর যেই পাশপ্রভাব স্থাপিত হয়ে তাঁদেরকে এমন প্রেত করে রেখে দিয়ে, নবযোনি ধারণ করা থেকে অবরোধ সৃষ্টি করছে, তাঁর নাশ করেন। অজস্র ইচ্ছার মধ্যে আবদ্ধ রেখে, ভুতদেরকে পিশাচের দিকে উন্নত করতে, তাঁরা প্রেত হয়ে ওঠে। তাই তাঁদের নাশের জন্য মাতা নিপাশ ধারণ করে বিবেকের উদ্ভব করেন, আর তাই সেই অস্ত্র বিবেককে প্রদান করেন।
আর অন্তে, প্রেতরা ত্রিগুণের প্রভাবে পিশাচ হয়ে উঠে যোনিসমূহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। তাই মাতা ত্রিমার ধারণ করে, অভয় মুদ্রা ধারণ করে পিসাচদেরকে পুনরায় যোনিসমূহতে প্রত্যাবর্তন করিয়ে, তাঁদেরকে জীবনের পথে উৎসাহিত করেন, এবং জীবনমৃত্যুর থেকে মুক্ত হয়ে ওঠার জন্য পুনরায় আহ্বান করেন। মাতা অত্যন্ত গুপ্ত ও সুপ্ত ভাবে এই ক্রিয়া সম্পন্ন করেন। তাই তাঁর অঙ্গবর্ণ ধুসর। দিব্যদৃষ্টি প্রদান করেন ভুত, প্রেত ও পিশাচদের, তাই তাঁর তৃতীয় নেত্র থেকে রশ্মি বিচ্ছুরিত, আর তিনি ষড়ভুজা।
আরো দক্ষিণদিকে আসলে, মাতা বাৎসল্যপূর্ণ যক্ষেশ্বরী, কোমলাঙ্গী, উন্নতস্তনারূপে সন্তানকে দুগ্ধপ্রদায়িনী সুশীলা ও অর্ধনগ্না। ঠিক যেমন উর্বর মৃত্তিকা আমাদেরকে সৃজন করে, তেমনই ভূমিকায় মাতা আসীনা, তাই তিনি মৃত্তিকাবর্ণা, আর সাথে সাথে তাঁর দুই বাহু, তাতে তিনি শিশুর সেবা করার জন্য তালপত্রের পাখা ধারণ করে আছেন, ও শিশুকে শয়ন করানোর জন্য কাঁথা ধারণ করে রয়েছেন। মাতা এখানে অত্যন্ত সামান্যা, তাই তিনি ত্রিনয়না নন, দ্বিনয়না”।
বিবেক গদগদ হয়ে বললেন, “পরাপ্রকৃতির ব্যাখ্যা করার অনুমতি প্রদান করেই, তিনি আমাদেরকে ধন্য করে দিয়েছেন। কিশালয়ের বর্ণে শোভিতা জজনাশীর দক্ষিণে মহামাতৃকার দ্বিতীয়রূপ প্রকাশ, বিশিষ্টা স্থিতা, যিনি ধূম্রবর্ণা ও ষড়ভুজা, আর তাঁর দক্ষিণে স্থিতা মৃত্তিকাবর্ণা দ্বিভুজা অতিসামান্যা কোমলাঙ্গী যক্ষেশ্বরী। তার ঠিক দক্ষিণে দেখো পরিপক্ক ও দক্ষতার সাথে লীলাপ্রসারী লিলাশ্রীকে।
একাধারে তিনি ত্রিগুণের সাথে লীলায় রত, আর তাঁদের থেকে ত্রিদ্বার অর্থাৎ অনাহত, বিশুদ্ধ ও আজ্ঞার উন্মোচন করাচ্ছেন। লীলা রচয়িতা মাতা তাই এখানে রূপশ্রী, আর তাই তিনি মৃদুহরিদ্রাবর্ণা, সঙ্গে তাঁর ত্রিনয়ন, কারণ তিনি ত্রিগুণ, যারা তাঁকে শত্রু মানে, এবং তাঁর উপর অধিকার স্থাপনে রত, তাঁদের অভিসন্ধিকে প্রত্যক্ষ করে, তাঁদেরই সাথে লীলা করে, তাঁদের থেকে নিজের যাত্রার পরবর্তী তিনটি পদক্ষেপকে নিশ্চয় করে নেন। আর তিনি দ্বিভুজা, যাতে তিনি ধারণ করে রয়েছেন তামসকে দেওয়া অন্ন, এবং প্রভাতকে প্রদান করা সঙ্গীতের অনুরাগ মুদ্রা।
লিলাশ্রীর দক্ষিণে দেখো, মাতা কলাশ্রী রূপে স্থিতা শুভ্রাবর্ণা মহাশ্বেতা। শুভ্রতার প্রসারক, সমস্ত বর্ণের উৎস তিনি, সমস্ত ভাবের উৎস তিনি, স্বরের দেবী, সরস্বতীরূপে বীনা ও চিত্রাঙ্কনের তুলিকা ধারণ করে, মহাশ্বেতা বেশে স্থিতা। তিনি ওঁকারেশ্বরী, কারণ তাঁর থেকে সমস্ত নাদের রচনা; তিনি মহাশ্বেতা কারণ তাঁর থেকে সমস্ত প্রকৃতির বর্ণের রচনা; তিনি কলাবতী, কারণ তাঁর থেকে সমস্ত কলার রচনা; নৃত্যভঙ্গিমায় তাঁর ঊর্ধ্বাঙ্গ স্থাপিত, কারণ তিনি নৃত্যকলারও রচয়িতা।
আরো দক্ষিণে, তাঁর প্রকৃতিস্বরূপের আরো এক মহাপ্রকাশ স্থাপিত, যিনি তাঁর দুই হস্তেই বরদারূপে স্থিতা, অর্থাৎ তিনি সমস্ত কিছুই প্রদান করছেন, প্রকৃতিকে ফুলে ও ফলে পরিপূর্ণ করে রসাল করে তুলে রসবতী। কমলের ন্যায় তাঁর আঁখি, কমলের ন্যায় তাঁর অঙ্গবর্ণ, কমলের ন্যায় তাঁর পবিত্রতা, কমলের ন্যায় তাঁর মাধুর্য, কমলিনী তিনি; কমলাবতী, পবিত্রানী এই মহাদেবী প্রকৃতিস্বরূপা আমাদের অন্তরে পবিত্রতার বীজ স্থাপিত করে, পবিত্র হয়ে ওঠাকেই আমাদের লক্ষরূপে স্থাপিতা, লক্ষ্মী ও মহালক্ষ্মী। সন্তানপ্রসবিনী ইনি, ইনারই সন্তানকে সমস্ত যোনির সমস্ত জীব নিজসন্তানজ্ঞান করে, তাঁদের নিজেদের ভূতদ্বারা দেহপ্রপদান করে পালন করেন, তাই ইনি মাতৃকাশক্তি প্রদায়িনী, মহামাতৃকার এক বিশেষ ও ষষ্ঠরূপ প্রকাশ, সমস্ত শ্রীর অধীশ্বরী, সর্বশ্রী, যিনি সর্বদা সেবা করতে থাকেন, যিনি সর্বদা স্নেহ প্রদান করতেই থাকেন।
আর এই সমস্ত কিছুর অন্তরালে অবস্থান করছে, প্রকৃতির সুপ্ত শক্তি। এই সমস্ত কলাগুণকে, মাতৃত্বকে, স্নেহভাবকে, উদ্ধারভাবকে, মুক্তভাবকে, পবিত্রতাকে এবং প্রকৃতিবিস্তারকে সুমধুর ভাবে চালিত করে নিয়ে যাবার জন্য প্রয়োজন যেই বিপুল শক্তির, সেই শক্তির উৎস বাহ্যিক কনো কিছু নয়, বরং স্বয়ং প্রকৃতি নিজের অন্তরেই সেই শক্তির রচনা করে, সেই শক্তির দ্বারা এই সমস্ত কৃত্য করেন। সেই কারণেই তো তিনি পরাপ্রকৃতি, যিনি সর্বেসর্বা, যার অন্য কারুর আবশ্যকতা নেই, স্বয়ংই রচয়িতা, সেই রচনার সামগ্রীও তিনি স্বয়ংই, আর সেই রচনার বৈচিত্র্যপ্রদায়িনীও তিনি স্বয়ং। তিনি নিজের অন্তরে যেই শক্তির সঞ্চার করে, তাঁর নিজের মহামাতৃকা পরাপ্রকৃতি রূপেকে সৃজন করেন, সেই অন্নদাকে দেখো অন্তিম দক্ষিণে।
ত্রিনয়না তিনি কারণ সর্বকালের দর্শক তিনি, দ্বিভুজায় বজ্ররূপে দেবী বেগবতীকে ধারণ করে আছেন এবং দেবী শিখাকে ধারণ করে রয়েছেন অগ্নিধারিকারূপে, এবং সমস্ত প্রকৃতিকে পুষ্টি প্রদান করছেন তিনি। শক্তির উৎস তিনি, তাই আদিশক্তি তিনি; সমস্ত শক্তির বিস্তার তিনি তাই লালাভ হরিদ্রাবর্ণা তিনি, অথচ এই সমস্ত কর্ম তিনি অতিস্নেহ ও অতি বাৎসল্যপূর্ণ ভাবে করে থাকেন, তাই তাঁর মুখে স্নেহমাখা হাস্য।
যেখানে মহাশ্বেতা শুভ্র বর্ণ বস্ত্র পরিহিতা, দেবী সর্বশ্রী কমলাবর্ণের বস্ত্র পরিহিতা, সেখানে অন্নদা রক্তবর্ণা রাজসী বস্ত্র ধারণ করেছেন কেবল তাই নয়, তাঁর শক্তি তাঁর সমস্ত সাত মাতৃকা রূপে প্রসারিত হয়েছে। তাই তাঁর রক্তবর্ণ সমস্ত সপ্তমাতৃকার বস্ত্রে, অঙ্গবর্ণে প্রকাশিত হয়ে, সকলের ললাটে সিন্দূররেখার রচনা করেছে, সকলের বস্ত্রে লালাভা প্রসার করেছে”।
বৈরাগ্য অতিভাব ধারণ করে বললেন, “শব্দ নেই দেবীর বিবরণ করার, তাও এই কথা বলার সামর্থ্য নেই যে আমার শব্দ নেই তাঁর ব্যাখ্যা করার, কারণ তিনি স্বয়ং সেই শব্দের উৎস, সেই শব্দকে কলাবেশে স্থাপিতা, সেই শব্দকে পবিত্রতার লহরিকায় স্নাতকারী, সেই সমস্ত কলা ও পবিত্রতাকে শক্তিপ্রদায়িনী। তাই আজ আমি অপারগ তাঁর বিবরণ প্রদান করতে, কিন্তু সেই অপারঙ্গমতা অর্থহীন, কারণ সমস্ত কিছু যা প্রয়োজন সেই বিবরণ প্রদানের, তা দেবী মহামাতৃকা স্বয়ং প্রদান করেছেন তাঁর সপ্তরক্তাভাসিক্ত অঙ্গরূপদ্বারা, এবং অষ্টাদশভুজাকর্তৃক প্রকৃতিসৃজনা রূপদ্বারা।
তবুও তাঁর রূপের কিই বা ব্যাখ্যা করি? সমস্ত কিছু যা চিন্তা করা যেতে পারে, সমস্ত কিছু যার কল্পনা করা যেতে পারে, সমস্ত কিছু যাকে প্রত্যক্ষ করা যেতে পারে, সমস্ত কিছু যার বিবরণ দেওয়া যেতে পারে, তার উৎস তিনি, অথচ তাঁর স্বয়ংএর কনো উৎস নেই। শূন্যহতে প্রকাশিতা তিনি, তাই শূন্যাস্থিতা। তাই তাঁর চরণযুগল ভূমিতে স্থিতা নয়, শূন্যে স্থিতা। তাঁর বাহুসকল অতিমনোরম, অতিকোমল, স্নেহপ্রদায়িনী, মমতাপ্রসারিণী, কিন্তু তাঁর স্কন্ধ যে বিশ্বাসপ্রদায়িনী তাই অতিবলশালী।
তিনিই সমস্ত জিজ্ঞাসার জন্মদাত্রী, তাই কলা, সঙ্গীত ও জিজ্ঞাসা পরিপূর্ণা তাঁর অঙ্গস্থাপনের ভঙ্গিমা ললিতপূর্ণা, মহালাবণ্যযুক্তা দেবী যে মহালাবণী। আবার তিনি তাঁর সন্তানদের প্রতি পূর্ণসমর্পিতা, তাই তাঁর অঙ্গভঙ্গিমা ঈষৎ সম্মুখে তির্যক বেশে আন্দুলিত। আসলে তিনি যে সমর্পণভাবের জন্মদাত্রী। তিনি যে সকল পঞ্চভাবেরই জন্মদাত্রী, সকল ভাবের জননী তিনি, ভাবাম্বা তিনি।
না আছে তাঁর আদি, না আছে তাঁর অন্ত, না তাঁর চিন্তা করা সম্ভব, না তাঁর ব্যাখ্যা করা সম্ভব, কি ভাবে তাঁর বিবরণ প্রদান করি? তিনি যে অনাদি, অনন্তা, অচিন্ত্যা, অব্যাক্তা … পরাপ্রকৃতি তিনি, সমস্ত প্রকৃতির রচয়িতা, সমস্ত যোনির একমাত্র জননী তিনি। তাঁরই সন্তানরূপ চেতনাদের ধারণ করে, সকল যোনির সকল জীব অবস্থান করছে। সকলে যোনির সকল শিশুর দেহ তারা লাভ করেন পিতামাতার পঞ্চভূতের থেকে, যাও মাতারই প্রকাশ। আবার সকল সেই সদ্যজাত সন্তানের মূলতত্ত্ব অর্থাৎ চেতনা স্বয়ং মাতার সন্তান। তাই তিনি যে মহামাতৃকা, সকলের একমাত্র জননী।
পিতামাতা যে সকলের পালক ও পালিকা, কিন্তু জননী যে এক ও একমাত্র ইনি, মহামাতৃকা। সমস্ত সুরের, সমস্ত ছন্দের, সমস্ত শব্দের, সমস্ত নাদের, সমস্ত কলার, সমস্ত বর্ণের, এমনকি সেই সমস্ত বর্ণ ও সুরের মালিকা নির্মাণের প্রেরণা ও কলাশিক্ষা প্রদত্তা ইনিই, তাই ইনি যে একমাত্র গুরু। সর্ব মেধার শক্তি, সর্ব ভাবের শক্তি, ভক্তির তেজ, জ্ঞানের উষ্মা, পবিত্রতার ধৈর্য, সমস্ত কিছুর উৎস তিনিই। তাই এক কোথায় বলতে গেলে, একমাত্র জননী, সর্বজননীই নন কেবল তিনি, সর্ব কিছুর উৎস, সর্বেশ্বরীই নন কেবল তিনি, তিনিই সমস্ত অস্তিত্বের মূলকারণ অর্থাৎ মহাকারণ তিনি, আবার সমস্ত অস্তিত্বও স্বয়ং তিনিই, তাই একমাস্থিত্বা তিনি।
তাই তাঁর কি বিবরণ প্রদান করি? কি ভাবে প্রদান করি? কোথা থেকে তাঁর বিবরণ প্রদান শুরু করি, আর কোথা পর্যন্ত সেই বিবরণ প্রদান করতে থাকি! যা কিছুই বলি, যা কিছুই না বলি, সমস্তই যে তিনি। যা কিছু বিচার করি, যার বিচারও করা সম্ভব নয়, সমস্তই তিনি। যাকিছুর বিশ্লেষণ করি বিবেক দ্বারা সমস্ত কিছুই তিনি। আরো সত্য এই যে, স্বয়ং বিচার, বিবেক ও বৈরাগ্যের জন্মদাত্রীই তো স্বয়ং তিনি। তাই তিনি ভাবেশ্বরী, সকল ভাবের জননী, আর শুধু জননীও নয়, জনকও একাধারে তিনিই।
তিনিই জনক, তিনিই জননী, তিনিই সন্তান, আবার তিনিই এই সমস্ত জন্মদানের প্রক্রিয়াও। তাই কি ব্যখ্যা দিই তাঁর? পরাপ্রকৃতি তিনি। মহামাতৃকা তিনি। আত্ম যা কিছু ক্রিয়া করার ভান করে, তা ইনাকে নিয়েই করে। হ্যাঁ তিনি মাতা, যতটা আমাদের মাতা, ততটা আত্মেরও মাতা। তাই যেমন আমাদের ক্রিয়ার উপর তিনি হস্তক্ষেপ করেন না, তেমন আত্মের ক্রিয়ার উপরও হস্তক্ষেপ করেন না। আর তাই, আমরাও আমাদের বিচার, বিশ্লেষণ ও মেধা অনুসারে, আর আত্মও নিজের চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনা অনুসারে তাঁর বিস্তারকে অবলোকন করতে থাকি। হ্যাঁ, বলা যেতে পারে, এইটুকুই আমাদের সামর্থ্য আর এইটুকুই আমাদের স্বতন্ত্রতা”।
দেবী সমর্পিতা সম্মুখে এসে এবার বললেন, “কেন মা! এই সামর্থ্যটাও কেন দিয়েছ আমাদের? এই টুকু স্বতন্ত্রতাও কেন দিয়েছ আমাদের? হতে পারে, সেই স্বতন্ত্রতা লাভের আকাঙ্ক্ষা আত্মের ছিল, সেই সামর্থ্যলাভের লিপ্সা আত্মের ছিল। কিন্তু আমাদের তো তা নেই মা! এই সামান্য সামর্থ্য আর সামান্য স্বতন্ত্রতার কারণে, আমরা তোমার কাছে থেকেও, তোমার অঙ্গের সাথে নিজেদের অঙ্গ লেপটে রেখেও, তোমাকে নিত্যঅঙ্গে ধারণ করেও, ধারণ করতে অক্ষম! তোমার সঙ্গে যুক্ত হয়েও তোমার থেকে বিচ্ছিন্ন।
কেন মা! এই বিচ্ছিন্নতা কেন প্রদান করে রেখেছ? কেন এই সামান্য বিচ্ছিন্নতাকে নাশ করে আমাদেরকে তোমার অবিচ্ছিন্ন অঙ্গ করে নিচ্ছনা? কেন আমাদের এই পৃথক অস্তিত্ব রেখেছ? কেন আমাদেরকে তোমার মধ্যে আত্মসাৎ করে নিচ্ছ না! কেন আঁখি দ্বারা তোমাকে দেখতে হচ্ছে? কেন নাসিকা দ্বারা তোমার ঘ্রাণ নিতে হচ্ছে? কেন রসনা দ্বারা তোমার স্বাদ নিতে হচ্ছে? কেন অঙ্গত্বক দ্বারা তোমার স্নেহের অনুভব করতে হচ্ছে? কেন কর্ণদ্বারা তোমার কথা শুনতে হচ্ছে? কেন তোমার মধ্যে আমরা লীন নই?”
মাতা মহামাতৃকা সপ্তমুখে হাস্য প্রদান করে, সমর্পিতাকে দুই বাহু দ্বারা আকর্ষিত করে, শূন্যে স্থিতা নিজের বিশালাকায় দেহের একটি পদের উরুকে ভঙ্গ করে, সেই উরুতে সমর্পিতাকে স্থাপিত করে, তাঁকে স্নেহপ্রদান করতে করতে বললেন, “জানি মা, তোমরা সেই উদ্দেশ্যেই ধাবিত। তবে জেনে রাখো, আমিও সেই উদ্দেশ্যেই ধাবিতা। এই বিচ্ছেদ আমারই অনুষ্ঠিত, আর তার উদ্দেশ্যেই ছিল, বিচ্ছেদের উপরান্তে পুনর্মিলনের আনন্দে উদ্ভাসিত হওয়া। কিন্তু এই বিচ্ছেদ আর পুনর্মিলনের অন্তরায়কে অতিকায় করে দিয়েছে পরমাত্ম, যাকে তোমরা এই ব্রহ্মাণ্ডে আত্ম বলো।
এই আত্মেরও রচনা আমিই করেছিলাম, যাকে ধারণ করেই এই বিচ্ছেদ অনুষ্ঠিত হওয়া সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু সেই পরমাত্ম যে এই পুনর্মিলনকে এতটাই বিশ্রী ভাবে বাঁধা প্রদান করবে, আর সেই পরমাত্ম যে নিজেকে ঈশ্বর প্রমাণে ব্যস্ত হয়ে গিয়ে আমার সমস্ত অঙ্গজাতদের নিজের অধীনে স্থিত করতে উদগ্রীব হয়ে উঠবে, তার ধারণা আমার থাকলেও, আমার সন্তানরা যে তার দ্বারা এতটা প্রভাবিত হয়ে উঠবে, তার ধারণা আমি করতে ব্যর্থ ছিলাম।
সমস্তই আমার কর্মের ফল। একমঅস্তিত্ব আমি, তাই একাকীত্বের শিকার আমি। আর সেই একাকীত্বের নাশ করতেই, আমার সন্তানদের সাথে এই বিচ্ছেদলীলায় মেতে উঠেছিলাম, যে তাঁরা আমার থেকে বিচ্ছিন্ন হবে, পুনরায় মিলিত হবে, আর আমরা উভয়েই এই মিলনের অভিপ্রায়ে ব্যকুল হয়ে প্রেমে আবদ্ধ থাকবো। হ্যাঁ, এই অবধি আমি চেয়েছিয়াম, কারণ এই অবধিই আমাদের উভয়ের মধ্যে প্রেমের সঞ্চার করতো। কিন্তু সেই অবধি যে এতদীর্ঘকালের অপেক্ষা হয়ে যাবে, তার ধারণা আমি কি করেই বা করতাম! আত্মের বন্ধন যে আমার সন্তানদের এই ভাবে আকর্ষণ করবে, আর আমার থেকে আমার সন্তানদের ছিনিয়ে নেবার প্রয়াস করবে সে, তা কি করেই বা জানতাম আমি! এখন যে কেবলই অপেক্ষা।
কবে পরমাত্মের বন্ধনে আবদ্ধ থাকতে থাকতে, আমার সন্তানরা নিজেদেরকে তাঁর বন্দি অনুভব করবে, কবে তার ঈশ্বর হয়ে ওঠার মহাত্মাকাঙ্ক্ষাকে আমার সন্তানরা অনুধাবন করে তার থেকে মুক্ত হতে পারবে, আর কবে তার তিন শিকল, যা দ্বারা সে আমার সমস্ত সন্তানদের বন্দী করে রাখে, সেই চিন্তা ইচ্ছা ও কল্পনার নাশ করার আবশ্যকতা অনুভব করবে আমার সন্তানরা, তার অপেক্ষায় দীর্ঘকালের বিলম্ব রচনা হয়েছে আমার সাথে আমার সন্তানদের মিলনের।
জানি, পরমাত্মই এই মিলনের পথে, এই মিলনকালের সমাধির পথে, এই পূর্ণমিলন অর্থাৎ নির্বিকল্প সমাধির পথে একমাত্র বাঁধা, কিন্তু তাও আমি এই সমস্ত কিছুর দায় এড়িয়ে যেতে পারিনা, কারণ এই পরমাত্মের রচয়িতাও তো সেই আমিই, আর এই রচনা আমার অজ্ঞাতে হয়নি, বিচ্ছেদের পর মিলনের প্রেমাকর্ষণের ফলে তার রচনা, কিন্তু এই প্রেমের কারণে জন্ম হলেও, সে যে প্রেমবিরোধী ও মহাত্মাকাঙ্খী হবে, তার ধারণা আমারও ছিলনা।
কিন্তু ধারণা ছিলনা বলে দায় এড়িয়ে যেতে কি করে পারি! আমার সন্তানরা যে আবদ্ধ তার পাশে! আমি আমার সন্তানদের ত্যাগ কি করে দিতে পারি! … তাই যে বারংবার অবতরণ করি, অধিক অধিক কলা ধারণ করে অবতরণ করি আর বলতে থাকি সকল সন্তানদের, “এই পরমাত্ম আমি নই, আমি তোমাদের মাতা, একাধারে তোমাদের জনক ও জননী, এই পরমাত্মের বিস্তৃত পরদার আড়ালে স্থিতা। এসো আমার কাছে এসো, আমি যে অধীর আগ্রহে বসে আছে তোমাদের সাথে মিলনের জন্য”।
এই দায় যে আমি এড়িয়ে যেতে পারিনা যে, যেই পরমাত্মের কারণে তোমরা আমার থেকে এতদীর্ঘকালব্যাপী বিচ্ছিন্ন হয়ে রয়েছ, সেই পরমাত্মের রচয়িতা আমি স্বয়ং। যতই তোমরা এই পরমাত্মকেই সর্বেসর্বা ধারণ করে, তার মিথ্যা দাবি যে সে অনন্ত, বা অসীম, তাকে ধারণ করে অবস্থান করো, কিন্তু সে যে আছে, তা যে আমার কারণেই। তাই আমি সেই দায় কি করে এড়িয়ে যেতে পারি! সেই কারণেই যে দিবারাত্র, আমার সন্তানরা যখন চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনার পাশে আবদ্ধ হয়ে, আমাকে গালমন্দ করে, আমাকে তাঁদের সমস্ত অপূর্ণ ইচ্ছার জন্য দায়ই করে, সমস্ত দুশ্চিন্তার কারণ বলে দোষী সাব্যস্ত করে, সমস্ত কল্পনা নিষ্ফলা হবার জন্য অপরাধী করে, তা মুখ বুঝে সহ্য করি আমি।
আসলে আমি যে সেই দায় এড়িয়ে যেতে পারিনা! এই দায় এড়িয়ে যেতে পারিনা যে, পরমাত্ম, চিন্তা, ইচ্ছা বা কল্পনা যে অস্তিত্বে এসেছে, তা হয়েছেই আমার কারণে। যদি আমি আমার একাকীত্বের কারণে বিমর্ষ না হতাম, তাহলে একাকীত্ব দূর করার জন্য আমার সন্তানদের আমার থেকে বিচ্ছিন্ন করারও চিন্তা করতাম না, আর যদি সেই চিন্তা না করতাম, তাহলে পরমাত্মের, চিন্তার, ইচ্ছার বা কল্পনার জন্মও সম্ভব হতো না। যদি এঁদের জন্ম না হতো আর আমার সন্তানরা আমার থেকে বিচ্ছিন্ন না হতো, তাহলে আমার সন্তানরা পরমাত্মের প্রভাবেও আসতো না, আমিত্বের পাশেও ফাঁসত না, আর চিন্তা ইচ্ছা কল্পনার ফাঁদেও উপস্থিত থাকতো না। তাই আমি তাঁদের দোষারোপকে মিথ্যা বা অহেতুক কি করে বলতে পারি!
হ্যাঁ, তাঁদের কল্পনা করার দোষী আমি না হলেও, তাদের ইচ্ছার বশবর্তী হওয়ার দোষী আমি না হলেও, তাদের চিন্তার অধীনে স্থিত হবার দোষী না হলেও, তাদের পরমাত্মকে ভগবান মানার দোষী আমি না হলেও, আমি দোষী, কারণ যাদের দাসত্ব তারা স্বীকার করে আছে, তাদের অস্তিত্বই সম্ভব হয়েছে আমার কারণে। আর সেই কারণেই আমি সর্বদা তাদেরকে অবতার বেশে এসে উদ্ধারের মার্গ বলতে থাকি।
একের পর এক ধর্মের নির্মাণ করেছি, যার মধ্যে স্থিত হয়ে আমি অবতরণ করে আমার সন্তানদের মার্গ প্রদর্শন করবো। একটি একটি করে ধর্মকে আত্ম কলুষিত করেছে ভেদভাব, বিলাস তথা আত্মচিন্তনে মত্ত করে, আমি ঘোষণা করেছি যে আর সেই ধর্মে আমি অবতরণ করবো না, এবার অবতরণ করলে নূতন ধর্মে অবস্থান করবো। গৌতম বুদ্ধ হয়ে এসে ঘোষণা করেছিলাম যে আর বুদ্ধধর্মে আমি অবতরণ করবো না। মহম্মদ হয়ে এসে ঘোষণা করেছিলাম, আর ইসলামে নয়। আর এবার এই বৈদিক ধর্মে উপস্থিত হয়ে বললাম, আর বৈদিক ধর্মে আমার কনো অবতারের পায়ের চিহ্ন পরবেনা। এবার যদি আমার অবতারের পায়ের চিহ্ন পরে, তা পর্বে কৃতান্তিক ধর্মের মধ্যে।
তাই পুত্রী, তুমি যেই বেদনায় বেদনাগ্রস্ত যে আমার থেকে এই সামান্য ভেদে তোমরা পীড়িত, সেই একই বেদনায় আমি স্বয়ংও আর্ত ও পীড়িত, আর তাই আমি সদাই ব্যস্ত সেই ভেদের নাশ করতে; পরমাত্ম সহ সমস্ত চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনার নাশ করে, আমার সন্তানদের আমার মধ্যে বিলীন করে মহামিলনে স্থিত করতে, মোক্ষে স্থিত করতে, নির্বাণে স্থিত করতে।
পুত্রী, এই ব্রহ্মাণ্ডে আমি মেধাবেশে প্রকৃষ্ট হতে সক্ষম হয়ে, সম্পূর্ণ চেতনার অধিকারিণী হয়েছি মাতৃকা বেশে; সম্পূর্ণ প্রকৃতিতত্ত্বকে ধারণ করতে সক্ষম হয়ে মহামাতৃকা হয়েছি, আর তোমাদের সকলকে স্থাপিত করতে সক্ষম হয়েছি। আমি কথা দিচ্ছি পুত্রী, অন্তত এই ব্রহ্মাণ্ডে আমি অবশ্যই তোমাদেরকে মহামিলনে স্থিত করবো, আর সকল ব্রহ্মাণ্ডদের, আমার সকল সন্তানদের আহ্বান করতে সক্ষম হবো যে, এই দেখো, যেই পরমাত্মের অধীনে তোমরা স্থিত, যেই আমিত্বে তোমরা ভূষিত, যেই চিন্তা-ইচ্ছা-কল্পনারূপ ছায়াকে তোমরা আশ্রয় করে অবস্থান করছো, তাদের নাশই তোমাদেরকে তোমাদের মাতার সাথে মিলিত করবে।
ঈষৎ ধৈর্য ধর পুত্রী, তোমাদের ন্যায় আমিও ব্যাকুল এই মিলনের জন্য। আর শুধু ব্যাকুল নয়, আমি সর্বদা প্রয়াসরত, আর এই ব্রহ্মাণ্ডে আমি সেই প্রয়াসের অন্তিম পর্যায়তে উপস্থিতও হয়েছি। তাই ঈষৎ ধৈর্য ধরো, আমি নিশ্চিত যে, এই ব্রহ্মাণ্ডে আমি আমার লক্ষ্যে উপনীত হয়ে সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডকে লক্ষ্যে উপনীত হবার আহ্বান জানাতে সক্ষম হবো”।
দেবী মমতা স্নেহের সুরে বললেন, “মা, তুমি সময় নাও। ব্যকুল থেকো না। আমরা তোমার উপর পূর্ণ ভাবে ভরসা করি। তুমি নিশ্চয়ই তোমার লক্ষ্যপূর্তি করবে। তুমি নিশ্চিন্তে তা করো। নির্বিঘ্নে তা করো। আমরা সর্বদা তোমার সঙ্গে আছি, আর সর্বদা উদগ্রীবও আছি, তোমার সাথে পূর্ণ মিলনের জন্য”।
মাতা মহামাতৃকা এবার সামান্য হলে, বিচার প্রশ্ন করলেন, “পুত্রী, তুমি যে বলছিলে, ত্রিগুণ বিশেষ বরদানে ভূষিত হয়েছিল একটি যোজনার অংশ রূপে, আর সেই বরদান লাভ করে, পুনরায় তারা কনো যোজনা করতে সক্রিয়, সেই যোজনার কথা আমাদের বলো। আমরা সেই যোজনার উত্তর দিতে প্রস্তুত হতে চাই”।
সর্বাম্বা হেসে বললেন, “আমি প্রস্তুত তাত”।
বৈরাগ্য বললেন, “না পুত্রী, তাঁদের উত্তর এবার আমরা দেব। পূর্বে, তারা অনেক কিছু করেছে। তোমার অপমান হতে দিয়েছে যার জন্য তোমাকে পাতালে প্রবেশ করতে হয়েছে; তোমার থেকে বিচারকে পৃথক করে তাঁকে দক্ষিণে প্রেরণ করে দিয়েছে; তোমার থেকে বিবেককে পৃথক করার জন্য, তাঁর মুণ্ডচ্ছেদ করেছে, এমনকি একাধিক রূপ ধারণ করে, কখনো রম্ভার পুত্রের বেশে, কখনো তারকা বেশে, কখনো শুম্ভনিশুম্ভ বেহসে তোমার পবিত্রতাকে বারংবার প্রশ্নচিহ্নে ভূষিত করেছে। এবার আমাদের উত্তর দেবার পালা”।
সর্বাম্বা হেসে বললেন, “পিতা, যা যা বললেন আপনি, তার সমস্ত কিছু আমার সাথেই যুক্ত। আসলে ত্রিগুণ সর্বদাই আমার বিস্তারকে আটকাতে চেয়েছে, কারণ তারা জানে যে আমার বিস্তার হলে তারা আর নিজেদেরকে ভগবান রূপে আমার সকল সন্তানদের সম্মুখে স্থাপন করতে পারবেনা। তাই উত্তর তো এবার আমার দেবার পালা। তবে হ্যাঁ, যখন তোমরা যুদ্ধ করবে নিশ্চয় করেছ, নিশ্চয়ই করবে তা।
হ্যাঁ, যোজনার অন্তর্গত হয়েই ত্রিগুণ সুষুম্নাতে প্রবেশ করেছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল আমার থেকে বরদান লাভ করা, যাতে করে তারা পরাপ্রকৃতির সামনা করতে পারে। তা তারা লাভ করেছে। অর্থাৎ, তাঁদের প্রাথমিক যোজনাতে তারা সফল। এবার পরবর্তী যোজনার চিন্তা করা শুরু করেছে তারা, যেখানে তারা একত্রে সমস্ত আবেগসেনা নিয়ে আক্রমণ করবে। তাই যুদ্ধে তোমাদের সকলকেই অবতারিত হতে হবে।
এই যুদ্ধ যে তোমাদের অস্তিত্বের যুদ্ধ, তোমাদের আমার সাথে একাত্ম হবার যুদ্ধ। এই যুদ্ধ যে তারা করবে, তোমাদের আমাতে মিলিত না হতে দেবার জন্য, আর তোমাদের সকলকে এই যুদ্ধ করতে হবে, আমার সাথে তোমরা মিলিত হতে ব্যাকুল, তা আমার কাছে প্রমাণ করার জন্য। তোমরাও জানো, আমি যেই বরদানে ত্রিগুণকে ভূষিত করেছি, তাতে করে, তোমাদের পক্ষে তাদের নাশ করা সম্ভব নয়। এমনকি আমার এই মহামাতৃকা রূপ একত্রিত ভাবেও তাদেরকে পরাস্ত করতে সক্ষম নয়।
তাই পরাজয় নিশ্চিত তোমাদের। কিন্তু পরাজয় নিশ্চিত জেনেও তোমাদের যুদ্ধ করতে হবে, কারণ তোমাদের যুদ্ধই আমার কাছে এটি নিশ্চিত করবে যে তোমরা আত্মের থেকে মুক্ত হয়ে আমাতে লীন হতে দৃঢ়। তাই যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হও। সকল পঞ্চভূত তোমাদের সেনাপতিত্ব করার জন্য আমি দেবী ধরা বিশ্বস্ত ইন্দ্রিয়কে সেনাপতি রূপে নিযুক্ত করলাম। পিতা বিশ্বাসের নেতৃত্বে যুদ্ধ করবে সমস্ত পঞ্চভাব, আর সকলের নেতৃত্ব করবে মহাভাব। জয় হোক বা পরাজয়, যুদ্ধের প্রতি তোমাদের নিষ্ঠা, একাগ্রতা আর নিয়জিত ভাবই আমাকে আমার পরবর্তী কদম ধারণে বাধ্য করবে”।
ইন্দ্রিয় সম্মুখে এসে বললেন, “সর্ব্বা, যেমন দেবী শিখা ও দেবী বেগবতী লজ্জিত অনুভব করেন কারণ তাঁরা রিপুদের জন্ম দিয়েছেন, তেমনই আমিও লজ্জিত অনুভব করি পাশেদের জন্ম দেওয়ার জন্য। আজ আমাদের তুমি সুযোগ দিলে, এই ব্রহ্মাণ্ডকে তাদের জন্ম দিয়ে যেই ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিলাম আমরা, সেই ভুল সংশোধন করার সুযোগ প্রদান করলে। নাশ করবো আমরা আমাদের জাত সমস্ত সন্তানের। প্রমাণ করবো মাতা কেবল জন্মই দেন না, কুসন্তানের নাশও করতে তৎপর তাঁরা, তবেই তাঁরা মাতা”।
মানসও হুংকার ছেড়ে বললেন, “বিশাল আবেগ সেনা তাদের। আর আমরা মাত্রই চতুর্বিংশতি তত্ত্ব। কিন্তু কনো দ্বন্ধ নেই আমাদের মধ্যে, কারণ আমরা পরাজিত হবার স্পর্ধাও দেখাতে পারবো না, আর তার কারণ এই জয় আমাদের গৌরবের জন্য প্রয়োজন নয়, এই জয় আমাদের প্রয়োজন নিজেদের আলয়ে প্রত্যাবর্তনের উদ্দেশ্যে। তাই এই যুদ্ধে পরাজয়ের কথা চিন্তা করাও আমাদের জন্য বিলাসিতা। সেই বিপুল সেনার নাশ আমরা কি ভাবে করবো আমি জানি না, তবে নাশ আমাদের করতেই হবে”।
বেগবতী হুংকার ছেড়ে বললেন, “সংখ্যার চিন্তা করবেন না পিতা, মাতা মহামাতৃকার আশীর্বাদে আমি আর দিদি ভয়াবহ হয়ে উঠবো, সেই সংখ্যাকে তুচ্ছ প্রমাণ করতে। কিন্তু প্রশ্ন অন্য, প্রশ্ন ছায়দেবীরা। তাঁদের নাশ কি ভাবে সম্ভব, সে তো আমরা জানিও না! তাঁদের, আত্মের ও এখন সর্বাম্বার বরদানে ভূষিত ত্রিগুণ, এঁদের নাশ কি রূপে সম্ভব, তা আমার বোধগম্যই হচ্ছেনা”।
দেবী ধরা বললেন, “আমার নিজের সামর্থ্য নেই কিছু করারই। কিন্তু পুত্রী, তুমি ও তোমার দিদি আমার উপর প্রভাব বিস্তার করলে, আমি তা সহন করে তোমাদের আক্রমণকে অতিশয় রূপ প্রদান করার সামর্থ্য আমার আছে। পরাপ্রকৃতি আমাকে এই সহনশক্তি প্রদান করেছেন”।
দেবী মমতা বললেন, “হ্যাঁ পুত্রী, মাতা তো সঠিকই বলেছেন, ছায়াদেবীরাই সর্বাধিক চিন্তার বিষয়। তাঁরা তো সম্যক যুদ্ধে অবতরণই করেন না। আর পশ্চাৎ থেকে তাঁরা যে কি ভাবে প্রভাব বিস্তার করবেন, তা কারুর পক্ষেই জানা সম্ভব নয়!”
দেবী সমর্পিতা বললেন, “সমস্যা ভীষণ থেকে ভীষণতম হয়ে উঠলেও, এটা আমাদের ভুলে গেলে চলবে না দিদি যে, প্রথম সমাধানের নির্মাণ হয়, অতঃপরে সমস্যার অবতরণ হয়। তাই কনো কারণেই আমরা আশাহত হয়ে যাবো না। সমস্ত সময়ে আমরা নিশ্চিত থাকবো যে, সমস্যা জঘন্যতম হয়ে গেলেও, সমাধান তার নিশ্চিত ভাবে আছে”।
বিশ্বাস বললেন, “হ্যাঁ, হতে পারে, আমাদের প্রজ্বলিত হতে হবে, দাহিত হতে হবে, দগ্ধ ও খণ্ডিতও হয়ে যেতে হবে, কিন্তু যতক্ষণ আমরা উঠে দণ্ডায়মান হতে পারবো, ততক্ষণ আমরা যুদ্ধ করবো। রণক্ষেত্র ছেড়ে আমরা পলায়ন করবো না। কনো কারণে নয়”।
দেবী জিজ্ঞাসা বললেন, “কিন্তু তারা কি যোজনা করছেন, সেটা জানতে পারলে আমাদের পক্ষে ভালো হতো তাই না?”
দেবী ইন্দ্রিয় সম্মুখে এসে বললেন, “আমি গুপ্তচর হয়ে যাচ্ছি তাদের কাছে, সমাচার নিয়ে আসছি”।
দেবী স্নেহা বললেন, “না, তার থেকেও ভালো বিকল্প আছে আমাদের কাছে। মূলাধারের অন্তরেই তাঁরা সকলে রয়েছে। তাই মূলাধার সমস্ত কিছুর সাক্ষী। কেন না আমরা মূলাধারের থেকেই তাদের যোজনা জেনে নিই!”
বিশ্বাস বললেন, “প্রস্তাব বড়ই উত্তম। কিন্তু সর্ব্বা, তোমার আদেশ ছাড়া যে, মূলাধার উপস্থিত হবেনা!”
সর্বাম্বা মৃদুহেসে বললেন, “মূলাধার!”
দেবীর নির্দেশ শ্রবণ করা মাত্রই সম্মুখে উপস্থিত হলেন মূলাধার। দেবী সর্বাম্বা তাঁর উদ্দেশ্যে বললেন, “মূলাধার, তোমার থেকে এঁরা সকলে আত্মের যুদ্ধযোজনা জানতে উৎসাহী, আর সঙ্গে সঙ্গে এঁদেরকে আত্মের সেনাবলের বিবরণও প্রদান করো”।
মূলাধার মাথা নত করে বললেন, “তার আর প্রয়োজন পর্বে না মাতা, কারণ আত্ম স্বয়ং এখানে আসছে, শান্তি প্রস্তাবের নামে আত্মবাখান গীত পরিবেশন করতে। তাই সেই গীতের মধ্যে দিয়ে আপনার সকল আত্মীয়রা আত্মের সকল সেনার সম্বন্ধে সকল কিছু জেনে যাবে। … মাতা, আমার জন্য আদেশ কি? আত্মকে কি আসতে দেবো, নাকি তার জন্য দ্বার বন্ধ করে দেব?”
সর্বাম্বা হেসে বললেন, “আসতে দাও তাকে, প্রদর্শন করতে দাও তাঁর প্রকৃত রূপ। তুমিও তাঁকে আটকিও না, আর সকল দ্বারকে আমার তরফ থেকে বলে দিও যে, তারাও যাতে আত্মকে না আটকায়”।
মূলাধার চলে যাবার বেশ কিছুক্ষণ অবধির শেষে, একটি ভয়ানক কম্পন অনুভূত হতে থাকলো সুষুম্নাতে। মহাভাবরা তাতে বিচলিত হয়ে আক্রমণাত্মক হতে প্রয়াস করলে, সর্বাম্বা মৃদু হেসে, নিজের দক্ষিণ চরণের তর্জনীকে সুষুম্নার ভূমিতে স্থাপিত করলেন, আর তাতে কম্পন সম্পূর্ণ ভাবে স্তব্ধ হয়ে গেলে, সকলে আচম্বিত হলেন। সর্বাম্বা মৃদু হেসে বললেন, “আত্ম নিজের সম্পূর্ণ রূপ, অর্থাৎ পরমাত্ম বেশ নিয়ে আসছে, তাই এই কম্পন”।
আজ্ঞার দ্বারে এসে আত্ম প্রবেশ করতে গিয়ে বাঁধা পেলে, সর্বাম্বা হেসে উঠে বললেন, “তির্যক ভাবে প্রবেশ করো আত্ম, অতোগুলি বাহু, সকলে তোমার আদেশ মানছে না। তাই দ্বারে আটকে যাচ্ছ”।
আত্ম শ্লাঘা নিয়ে প্রথমে বেশ কয়েকবার সরাসরি প্রবেশের প্রয়াস করে, ব্যর্থ হলে, ক্রুদ্ধ নয়নে সর্বাম্বার দিকে তাকিয়ে, তির্যক ভাবেই প্রবেশ করলেন। সকলে আত্মের এই বীভৎসরূপকে দেখে, একটু হলেও ভয়ার্ত হলেন। চতুর্দশ বাহু তার, তাদের মধ্যে ১০ বাহুতে ঘাতক বাণ স্থাপিত, একটি বাহুতে এক প্রকাণ্ড ধনুশ, দুটি বাহুতে ঢাল এবং একটি বাহুতে তার বিখ্যাত চিৎহন্তা তরবারি।
তিনটি মস্তক, প্রতিটি মস্তকে ভিন্ন মুকুট, আর প্রতিটি মুখমণ্ডলে তিনটি করে আঁখি, যাদের তৃতীয়টিও ললাটের মাঝে স্থিত, কিন্তু ঠিক সেই ভাবে, যেই ভাবে প্রথম দুটি স্থিত, অর্থাৎ বাম থেকে দক্ষিণে বিস্তৃত। ক্ষিপ্রতার সঙ্গে সম্মুখে এলেন সর্বাম্বার, আর সেই রূপ সম্মুখে রেখে, হুংকার ও অহংকারের সাথে বললেন, “তুমি কে, তা তো তোমার নিজেরও জানা নেই। তোমার ব্যপ্তি কি, তা তো তোমার নিজেরও জানা নেই, তবে আমি জানি আমার ব্যপ্তি কি। আমি পরমাত্ম, ব্রহ্মময়ীর অঙ্গজাত, কিন্তু তাঁর থেকেও অধিক শক্তিশালী, কারণ আমি প্রভাবশালী।
সর্বাম্বা, কি? এই নামেই তো তোমাকে সকলে ডাকে? বেশ, তোমার সন্তুষ্টির জন্য আমিও না হয় তোমাকে সেই নামেই ভূষিত করলাম। কিন্তু দেখো আমার সম্পূর্ণ ব্যাপ্তিকে। আমি পরমাত্ম, সকলের আত্ম বোধ আমি, সকলের অস্তিত্বের বোধ। তোমার নয়, কারণ তোমার তো অস্তিত্বের বোধ তোমার নিজেরই নেই। সমস্ত ব্রহ্মাণ্ড আমার অধীনে স্থিত, সমস্ত কর্মকাণ্ড আমার দ্ব্বারাই অনুপ্রাণিত। … সর্বাম্বা, তুমি শুনেছি পরাপ্রকৃতি, সমস্ত প্রকৃতির আদি, রচয়িতা, জননী। তবে শুনে রাখো, সেই সমস্ত প্রকৃতির অণুর মধ্যে আমিও ততটাই স্থিত, যতটা তুমি, কারণ আমিই তাদের সকলের আত্মবোধ।
আমিই সে, যার কারণে সমস্ত প্রকৃতি তোমার হলেও, তাদের কেউ তোমার নয়, কারণ তারা সকলে আমার কাছে বশীভূত। চাইলে তুমিও বশ করতে পারতে তাদেরকে, কিন্তু তুমি তো আবার স্বতন্ত্রতা প্রদানে বিশ্বাসী, তাই না! … মা তুমি, ‘মা হয়ে সন্তানকে বন্দী কি করে করতে পারি আমি’ … (অট্টহাস্য) যত রাজ্যের ঢং। সর্বাম্বা, নিজের অধিকার স্থাপনের জন্য, সকলের স্বতন্ত্রতাকে হনন করে নিতে হয়। যে স্বেচ্ছায় তোমার কাছে বশীভূত তাকে ব্যতিরেখে সমস্ত কিছুকে নিজের অধিকারে স্থিত করে নিতে হয়।
যে স্বেচ্ছায় তোমার আরাধনা করছে, তাকে ব্যতিরেখে সকলকে তোমার আরাধনা করতে বাধ্য করতে হয়। কিন্তু তুমি তো ভাবে মশগুল, সমস্ত ভাবের জ্বালায় তুমি তো মা…! (অট্টহাস্য) তাই তো যে স্বেচ্ছায় তোমার বশীকরণ চাইছে, তাকেই তুমি বশ করো, বাকিদের মুক্ত রাখো। সে তোমার অভিরুচি। কিন্তু জেনে রাখো, তারা সকলে আমার বশ, আমিই তাদের ভগবান।
জানি সামর্থ্য তোমার অসীম, প্রকৃতি তুমি। কিন্তু কি জানো তো, বড়ই ভোলা তুমি, নাহলে আমার পুত্রদের, ত্রিগুণদের তোমার উপরেই অধিকার স্থাপনের বরদান তুমি স্বয়ং দিতে? সত্যই তুমি মূর্খা। … পূর্বেও তারা তোমার উপর অধিকার স্থাপন করে রেখেছিল, আর এবারও তুমি তাদেরকে অধিকার স্থাপনের অধিকার স্বয়ং দিয়ে দিলে। (অট্টহাস্য)।
শুনে রাখো এবার, তোমার দেওয়া অধিকার লাভ করে, আমার পুত্ররা, জগতকে জগতের মায়ের থেকে যারা ছায়া প্রদান করে, সেই চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনা অর্থাৎ ছায়াদেবীদের পুত্ররা, এবার তোমার সমূল বিনাশ কামনা করে যুদ্ধ করতে উদ্যত। তাই এই ছায়াপতি, ত্রিগুনেশ্বর পরমাত্ম, যে এককালে মানসের ভ্রাতা ছিল, সেই মানসেরই পরিবারকে বিলুপ্ত হবার থেকে বাঁচাবার জন্য, তাঁদের কাছে শান্তিদূত হয়ে উপস্থিত।
আমার এই আগমনকে সতর্কবার্তা রূপে গ্রহণ করলে, তবেই তোমার হিত সর্বাম্বা, নয়তো আমার এই বিশাল রূপ একাকীই তোমার সমস্ত পরিবারের নাশ করে দিতে সক্ষম। তার সঙ্গে ছায়াদেবীরা আছে, তোমারই বরদানে অমর হয়ে যাওয়া ত্রিগুণরা আছে, আর আছে বিপুল আবেগসেনা, যা তোমাকে ও তোমার এই খুদ্র পরিবারের এই ব্রহ্মাণ্ড থেকে নামওনিশান মিটিয়ে দেবে”।
সর্বাম্বা ঈষৎ হাস্য প্রদান করলেন, আর বললেন, “তোমরা এখন সকলে কুশল তো?”… পরমাত্ম এই অবস্থায় এমন প্রশ্নে বিচলিত হয়ে উঠে, শ্লাঘা ধারণ করে বলতে গেলেন কিছু, কিন্তু তাঁর কণ্ঠদ্বারা একটি শব্দকণা তো দূরের কথা, একটি ধ্বনিও নির্গত হলো না। উত্তেজিত পরমাত্ম বহু কসরত করেও যখন একটি সামান্য ধ্বনি উচ্চারণ করতে পারলেন না, তখন নিজের কণ্ঠেই কিছু সমস্যা হয়েছে, এমন কল্পনা করে, নিজের কণ্ঠকে দুই বাহু দ্বারা আবদ্ধ করতে সচেষ্ট হলেন, কিন্তু সেখানেও বিপদ।
নিজের তনুর একটি অঙ্গকেও নড়াতে পারলো না সে। এই সমস্ত কিছুর কারণে তাঁর অত্যন্ত ক্রোধ জন্মনিলে, ক্রোধিত দৃষ্টি সর্বাম্বার উপর স্থাপনের প্রয়াস করলেন, কিন্তু আঁখির পাতাকে ঊর্ধ্বে তুলতেই পারলেন না! … ক্রোধে, নিজের দন্তসারিযুগলে জোর লাগাতে প্রয়াস করলেন, কিন্তু দুই দন্তসারিকে একদণ্ডও নড়াতে পারলেন না। সম্পূর্ণ জঙ্গম পাথর হয়ে গেলে, পরমাত্ম প্রচণ্ড বলপ্রয়োগের প্রয়াস করে করে ঘর্মাক্ত হয়ে দুর্গন্ধ প্রসার করতে সচেষ্ট হলেও, ঘর্মের বিন্দু তার দেহের কোষ থেকে মুক্ত হতেই পারলো না।
অসম্ভব পীড়ায় জড়সড় হয়ে উঠলে, সর্বাম্বা পুনরায় মৃদু হাসলেন, আর তারপর আত্ম আবার সমস্ত কিছু করতে শুরু করে দিলেন। তাঁর কণ্ঠ থেকে ধ্বনি উচ্চারিত হলো, তার হস্ত চালিত হলো, তার ঘর্ম প্লাবিত হলো। সর্বাম্বা পুনরায় হাসলে, কড়মড়িয়ে থাকা দন্তসারিকে পরমাত্ম সঠিক করতেই পারলেন না, ঘর্মের প্রকাশিত বিন্দুদের নিম্নে প্রেরণ করতেই পারলেন না, উদ্যত হস্তকে নিম্নে নামাতেও পারলেন না, মুদ্রিত কটিদেশকে সঠিক করতেই পারলেন না।
সেই দেখে পুনরায় সর্বাম্বা মৃদু হাসলেন, আর এবার বললেন, “বুঝতে পারলে আত্ম, কেন আমি স্বতন্ত্রতা প্রদান করি! আমি যদি স্বতন্ত্রতা প্রদান না করতাম, তাহলে স্বয়ং তোমার ও তোমার বশীভূত সকল জীব বা ব্রহ্মাণ্ডের কেবলই তোমার ছায়া, অর্থাৎ চিন্তা, ইচ্ছা বা কল্পনা করারই সামর্থ্য থাকে, বাকি কনো সামর্থ্য অবশিষ্ট থাকেনা। সমস্ত ধ্বনি আমি, সমস্ত বল আমি, সমস্ত সম্পদ আমি, সমস্ত প্রকৃতি আমিই, সমস্ত অস্তিত্ব আমিই। সমস্ত সক্রিয়তা আমিই আত্ম।
তুমি তাকে এসে বিনাশের বাণী শোনাচ্ছ? তুমি যতটা বলেছিলে, ততটাতেই দেখালাম তোমায় যে, তোমার নিয়ন্ত্রণে কিচ্ছু বলতে কিচ্ছু নেই, কনো কালেই ছিলনা, আর কনো কালেই থাকবে না। কি ভাবছো এবার? কনো কিছু বশে নেই তো কি হয়েছে? সর্বাম্বা তো সমস্ত কিছুকে স্বতন্ত্রতা প্রদান করবে, আর ছায়া তো তোমার সঙ্গী, তাদের দিয়ে তুমি যাকে যা খুশী ভাবাতে পারো! … (অট্টহাস্যে সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডকে কম্পিত করে দিলেন সর্বাম্বা আর বললেন) শোনো মূর্খ, যেই স্বতন্ত্রতা প্রদানের কথা তুমি বললে, সেই স্বতন্ত্রতা যদি হনন করি, তবে তোমার ছায়ারাও আমারই দাস হতে বাধ্য হবে।
তুমিও জানো, আমিও জানি, সমস্ত কিছুকে আমার বশে রাখলে, আমার সন্তানদের নাভিশ্বাস উঠবে, তাই আমি তাদের স্বতন্ত্রতা প্রদান করে রাখি, আর তুমি তোমার ছায়াশক্তির প্রভাবে, তাদের প্রদত্ত এই স্বতন্ত্রতাকে কাজে লাগিয়ে তাদেরকে বশ করো। কিন্তু যা তুমি জানোনা, তা শুনে গিয়ে যুদ্ধের প্রস্তুতি নাও। সন্তান হিতের জন্য যেমন এই মা, স্বতন্ত্রতা প্রদান করতেও পারে, সন্তান হিতের জন্যই এই মা স্বতন্ত্রতা হননও করতে পারে।
স্বতন্ত্রতা হনন করলে, কি হয়, তার সামান্য নিদর্শনই তোমায় এক্ষণে প্রদর্শন করলাম। সেই সামান্য প্রদর্শনীতে তুমি দেখলে, তুমি ইচ্ছা করতে পারছো দন্তসারিকে অপসারণের, হস্ত অপসারণের, ধ্বনি উচ্চারণের; চিন্তা করতে পারছো যে সেই সকল কাজে তুমি ব্যর্থ; তাই কল্পনার বলে ক্রুদ্ধও হতে পারছো, ঘর্ম ত্যাগেরও ইচ্ছা প্রকাশ করছো, কিন্তু তার একটিও হচ্ছে না। আত্ম, সম্পূর্ণ স্বতন্ত্রতা হনন করে নিতে বাধ্য করো না আমাকে। তাহলে এই ছায়াদেরকেও সঙ্গে পাবেনা। সেই স্বতন্ত্রতাও হনন করে নেব”।
আত্ম হুংকার দিয়ে কিছু বলতে গেলে, আবার জঙ্গম হয়ে গেলেন। এবার সকলে হাস্য প্রদান করলেন আত্মের এই দুর্দশার প্রতি। আর সর্বাম্বা এবার দক্ষিণ চরণকে ভূমিতে স্থাপন করলে, আত্মের সম্যক চতুর্দশ বাহুর, তিনমুণ্ডর দেহ ছিটকে আজ্ঞা, বিশুদ্ধ তথা অনাহত দ্বারের বাইরে পতিত হয়ে গেলে, আত্ম উঠে দাঁড়ালেন, সামান্য দ্বিভুজা অবস্থা নিয়ে, আর হুংকার দিয়ে বললেন, “আমার পুত্ররা বরদান লাভ করেছে, তারা তোর এই ঔদ্ধত্যকে চূর্ণবিচূর্ণ করে, যথাযথ উত্তর প্রদান করবে। শীঘ্রই আসছি সর্বাম্বা, তোর সমস্ত পরিবারই তোর বল, তাদের নাশ করে, তোর সম্যক বিনাশ না করেছি, তো আমার নামও পরমাত্ম নয়। …
শুনে রাখ সর্বাম্বা, আমি সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডের ভগবান, আমি আর্যপূজিত একচ্ছত্র ভগবান। চেতনা তুই, প্রকৃতি তুই, সমস্ত কিছুর নাশ করে দেব। আমাকে কেউ দমন করতে পারবে না। নিজেকে কি নিয়তি জ্ঞান করছিস মুর্খা? এক যদি তুই স্বয়ং নিয়তি হতিস, তাহলেই আমাকে রোধ করতে পারতিস। আমি শীঘ্রই আসছি, তোর সমস্ত পরিবারের নাশ করে, তোর কোমল দেহকে সম্ভোগ করে, তোর নাশ করবো”।
সর্বাম্বার আত্মকে দেখানো প্রভাবে, সকলেই প্রভাবিত হলো। আত্মের বীভৎস রূপ দেখে সাহস যখন সকলের ক্ষীণ হয়ে গেছিল, সেই সাহস ফিরে এলো সর্বাম্বার প্রভাব বিস্তারে। তাই সকলে উদ্যমী হতে থাকলো, কিন্তু ইতিমধ্যেই আত্ম যেই অপমান আজ্ঞার দ্বারে গ্রহণ করে গেছিলেন, সেই অপমানের বদলা নিতে আক্রমণ করে দিয়েছেন।
প্রতিউত্তর দিতে তৎপর মহাভাবরা উদ্যত হলে, শিখা ও বেগবতী উদ্যত হয়ে বললেন, “দাঁড়ান নাথ। মহাস্ত্রদের সম্মুখীন হবার আগে, আবেগদের সম্মুখীন হতে হবে তাদের জননীর। রিপুসমূহের গর্ভজাত এঁরা সকলে, কিন্তু রিপুদের গর্ভধারিণী এই শিখা আর বেগবতী আজ এঁদেরকে দেখাবে যে কেন তাঁরা তাঁদের মহাশক্তিশালী রিপুদের জননী।
এই বলে, সর্বাম্বার দিকে তাকালে, সর্বাম্বা মিষ্ট হেসে তাঁদের অগ্রসর হবার অনুমতি প্রদান করলে, শিখা মহাউদ্যম ধারণ করে ক্ষিপ্র বেগে সম্মুখে এগিয়ে গেলেন, আর তাঁর পশ্চাৎধাবন করলেন বেগবতী। আজ্ঞার দ্বারসম্মুখ থেকে রণক্ষেত্রে প্রবেশ করে, ভয়ানক আস্ফালনের সাথে সাথে শিখা ধারণ করলেন এক বিশালাকায় অগ্নিরূপ। আর তাঁর সেই অগ্নিরূপকে প্রসারিত করার উদ্দেশ্যে, বেগবতী ধারণ করলে পবনধারা রূপ।
ক্রমশ সেই অগ্নির বিস্তার হতে শুরু করলো, এবং পবন সেই অগ্নিকে বিস্তারে সাহায্য করতে থাকলো। যখন বিস্তর আবেগ সেই অগ্নির বেষ্টনে চলে এসে, আক্রমণে উদ্যত হলো, তখন শিখাও অত্যন্ত ক্রুদ্ধ আস্ফলনে উন্নত হলেন, আর বেগবতী প্রবল বেগ প্রদান করতে আর ধরা সেই সমস্ত উত্তাপ সহন করতে, সমস্ত আবেগসেনাকে শিখা আত্মসাৎ করে, ভস্মে পরিণত করা শুরু করলো।
একের পর এক আবেগদের প্রচণ্ডতা বৃদ্ধি পায়, আর শিখা বেগবতীও দুর্দান্ত হয়ে উঠে, সমস্ত আবেগদের বিনাশ করতে থাকে। ক্রমশ এমনই ভয়াবহ হয়ে ওঠে পরিস্থিতি যে, ষড়রিপু নিজেদের একটিও সন্তানকে আর দেখতে পায়না, সমস্ত আবেগ শিখা ও বেগবতীর প্রকোপের শিকার হবার জন্য তাঁদের বেষ্টনে আবদ্ধ হয়ে যায়। সেই দেখে প্রচণ্ডতা ধারণ করে রিপুরা অগ্রসর হতে গেলে, তাদের পতিরা, অর্থাৎ পাশেরা সম্মুখে এসে বললেন, “না দেবীরা, আমরাই এঁদের নাশ করে আসছি”।
এত বলে, হিংসার নেতৃত্বে, প্রবল আঘাত হানতে ব্যস্ত হলে, দেবী ধরা নিজের কন্যাদের সুরক্ষার জন্য, স্বয়ং সম্মুখে এসে বললেন, “পুত্রীরা, আমাকে দগ্ধ করো। উত্তপ্ত করো, আমি সহন করে নেব। কুণ্ঠা না করে, তাপ প্রদান করো, আর বেগবতী প্রবল ঘূর্ণন প্রদান করো”।
যেমন দেবী ধরা বললেন, তেমনই করলে, প্রকাণ্ড ঘূর্ণাবাত ও আগ্নেয় উৎপাত, সমস্ত আবেগদের হত্যা ও ভস্মীভূত করে, পাশদেরকেও সম্মুখে অগ্রসর হতে দিলেন না। সেই দেখে, ক্রুদ্ধ আস্ফালন সহ মদিনা ও রাজ্ঞী প্রবল আঘাত এনে ধরাকে আঘাত করতে গেলে, মানস নিজের পত্নীর সুরক্ষার জন্য প্রবল বেগে আঘাত করলেন মদিনা ও রাজ্ঞীকে।
এমন দৃশ্য দেখে, মোহিনী মানসকে নিজের মোহপাশকে ব্যবহার করে ও ভয়, লজ্জা, কুল, শীল পাশদের ব্যবহার করে, তথা লিপ্সা ও কামিনীর প্রভাবে, মোহাচ্ছন্ন করে, মানসকে বন্দী করে নিলে, রাজ্ঞী, হিংসা ও মদিনা একত্রে মানসকে তিনটুকরো করে নাশ করতে উদ্যত হলে, প্রবল বেগে স্নেহা এসে, নিজের তরবারি দ্বারা, একত্রে রাজ্ঞী, হিংসা ও মদিনার মুণ্ডচ্ছেদ করে দিলেন।
নিজের প্রিয়ভগিনী মদিনার শবদেহকে এই ভাবে পড়ে থাকতে দেখে, গর্ভবতী মোহিনী প্রকাণ্ড উদ্যন্ড হয়ে উঠে, স্নেহকে পিছন থেকে হত্যা করতে গেলে, সমর্পিতা এসে, একটি মুষ্ট্যাঘাত করলেন মোহিনীর উদরে। উদর ধরে দুই কদম পশ্চাতে যেতে, সমর্পিতা পুনরায় দুটি মুষ্ট্যাঘাতে মোহিনীর স্কন্ধের হার ভেঙে, তৃতীয় মুষ্ট্যাঘাতে মোহিনীর ছাতির অস্থি ভেঙে দিলেন।
বিশ্বাস এসে মানসকে মুক্ত করতে, সমস্ত পঞ্চভাব একত্রে এবং সমস্ত চতুর্ভূত একত্রে এবার রিপুপাশদের আক্রমণ করে, সকল রিপুপাশের হত্যা করে দিলে, মহাক্রোধের সাথে রণক্ষেত্রে প্রবেশ করলেন ত্রিগুণ। প্রকাণ্ড গতিশীল তাঁদের আক্রমণে, পঞ্চভাবও বিপর্যস্ত হয়ে উঠতে শুরু করলে, রণক্ষেত্রে প্রবেশ করলেন মহাভাবরা।
শুরু হলো মহাযুদ্ধের। বিচারের অরিনাশীর সাথে প্রভাতের ব্রহ্মাস্ত্রের যুদ্ধ; বিবেকের নিপাশের সাথে যুদ্ধ শুরু হলো রজনীর নারায়ণাস্ত্রের; এবং বৈরাগ্যের ত্রিমারের সাথে যুদ্ধ শুরু হলো তামসের ত্রিশূলের। ব্রহ্মাস্ত্র কনো সাধারণ অস্ত্র নয়, তা যেন সাখ্যাত সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডের চিন্তাযুক্ত মায়াশ্রেষ্ঠ অস্ত্র। তাই অরিনাশীর সম্মুখীন সহজ প্রতিদ্বন্ধির সাথে হয়নি। একই ভাবে, নারায়ণাস্ত্রও সামান্য অস্ত্র নয়, সমস্ত ইচ্ছার সমষ্টি তা, তাই সমস্ত ইচ্ছার পাশকে কেটে কেটেও সমাপ্ত করতে পারছিল না বিবেকের নিপাশ।
বৈরাগ্যের ত্রিশূল তো সমস্ত কল্পনার অধিকারী কালদণ্ড। কালদণ্ড তো বৈরাগ্যের ত্রিমারও। সমস্ত কল্পনার প্রসারক যদি ত্রিশূল হয়, সমস্ত কল্পনার বিনাশী তাহলে ত্রিমার। কিন্তু সর্বাম্বার বরদানও যে যুক্ত রয়েছে ত্রিশূলের সাথে, নারায়ণাস্ত্রের সাথে আর ব্রহ্মাস্ত্রের সাথে। তাই অরিনাশীর প্রচণ্ডতা, নিপাশের ক্ষিপ্রতা আর ত্রিমারের প্রবল বলও যেন অকেজ হয়ে যাচ্ছিল ত্রিগুণের সম্মুখে।
যুদ্ধ চলেছিল বহুক্ষণ। মহাভাবদের সহায়তা করতে পঞ্চভাব ও চতুর্ভূতও আগত হচ্ছিলেন, কিন্তু সেই ক্ষণে, ছায়াদেবীদের ক্রিয়া, সমস্ত যুদ্ধের সমীকরণকেই পরিণত করে রেখে দেয়। তাঁরা ষড়রিপু ও অষ্টপাশকে পুনরায় জীবিত করে দিলে, তাঁরা পুনরায় আক্রমণ করলেন পঞ্চভাবকে, এবং ভূতদের। যুদ্ধ পুনরায় যেন নূতন করে শুরু হলো, কিন্তু এবার রিপু ও পাশেদের সাথে যুক্ত ছিল ছায়াদেবীদের শক্তি। তাই তাঁদের প্রচণ্ডতার সম্মুখে ক্রমশ নির্বল হয়ে পরছিলেন সমস্ত ভূত ও ভাব।
দীর্ঘ সংগ্রামের পরেও, কনো পক্ষ কনো পক্ষকে পরাভূত না করতে পারলে, আত্ম রণক্ষেত্রে প্রবেশ করে, নিজের চিৎহন্তার ব্যবহার করে, সমস্ত ভাবের, সমস্ত ভূতের চেতনা হনন করে নিলেন। আর মুহূর্তের মধ্যে ছায়াদেবীরা সমস্ত চিৎশক্তিদের ছায়াপাশে আবদ্ধ করে নিলেন।
এই কৃত্যের পর, মহানন্দে সকলে উদ্যম নৃত্য করতে শুরু করে দিলে, আত্ম আবাহন করলেন সর্বাম্বার, “কই পরাপ্রকৃতি? কোথায় গেলে মাতৃকা? মহামাতৃকা? তোমার সন্তানদের তো এবার আমি হত্যা করতে চলেছি। … মহাধুমধাম করে তাদের বলি দিতে চলেছি। কই দেখবে এসো?”
ত্রিগুণ বললেন, “পিতা, মৃত্যু দেবার আগে, প্রথম তো এঁদের চেতনা ফিরিয়ে দিন। … মৃত্যুকে সাখ্যাতকার করতে দিন এঁদের!”
আত্ম হুংকার দিয়ে বললেন, “সঠিক বলেছ” … এই বলে, চিৎহন্তার প্রভাবে সকলের চেতনা ফিরিয়ে দিলে, সকলে নিজেদের এমন বন্দীদশাতে দেখে, প্রবল ভাবের সাথে বলে উঠলেন, “মা! … রক্ষা করো মা!”
অট্টহাস্য হেসে ত্রিগুণ বলে উঠলেন, “হ্যাঁ, আমরাও তো এটাই চাই যে, তোরা সর্বাম্বাকে ডাক। ডাক ডাক, আরো ভালো করে ডাক। হত্যা করবো না তারে। বড় কাজের মেয়ে সে। পূর্বেও আমরা তাঁকে সম্ভোগ করেছি আলাদা আলাদা রূপে। এবার সে একবেশে এসে অতিশয় রমণীয়। তাই তাকে প্রথমে সম্ভোগ করবো, তারপর পিতার দাসী করে রেখে দেব”।
অট্টহাস্য প্রদান করে তামস বললেন, “সঠিক বলেছ ভ্রাতা, তাকে সম্ভোগের আনন্দই আলাদা। মেধা বেশে সে আমাদের থেকে বেঁচে গেছে, আর সে বাঁচবে না। … আর সত্য বলতে সেও চায় আমাদের সম্ভোগের পাত্রী হতে, নাহলে তাকে পরাভূত করার বরদান সে নিজেই দেবে কেন?”
প্রভাতও অট্টহাস্য হেসে বললেন, “কই, তোদের (ঢং করে) মা, তোদের ডাকে সারা দিলেন না!”
রজনী ব্যাঙ্গের হাস্য হেসে বললেন, “বুঝলে না ভ্রাতা! সন্তানদের সামনে সম্ভোগের পাত্রী হতে লজ্জা লাগছে তাঁর। তাই তিন চান, আগে এঁদের সকলের বলি হোক, অতঃপরে সে আমাদের সম্ভোগের পাত্রী হবে”।
তামস বললেন, “প্রথম অধিকার কিন্তু আমার তাঁর উপর। … পূর্বে আমাকে অন্তিম সুযোগ দেওয়া হয়েছিল”।
প্রভাত ব্যাঙ্গাত্মক ভাবে বললেন, “কিন্তু সম্ভোগ তো তুমিই সর্বাধিক করেছিলে তাকে। তাই এবার প্রথম অধিকার আমার। খেয়াল করে দেখো তামস, ব্যাস বলে গেছিলেন, তাকে দেখা মাত্রই আমার বীর্যস্খলন হয়েছিল। বুঝতে পারছো, তার প্রতি আমার কামনা কি প্রবল। আমি জ্যেষ্ঠ দেখো। এবার তো আমি জ্যেষ্ঠ, তুমিই বলো! তাই প্রথম অধিকার এবার আমার হওয়া উচিত”।
রজনী অট্টহাস্য হেসে বললেন, “হ্যাঁ হ্যাঁ, তুমিই প্রথম সম্ভোগ করো। মেধাকে দেখেছিলাম, স্বেদযুক্ত হলে, তার রূপগন্ধ যেন অধিক মনমাতানো হয়ে যায়। তাই তুমি তাঁকে স্বেদস্নাত করবে, আর আমরা তাঁর রসপান করবো”।
তামস বললেন, “কিন্তু এদের বলি না চরালে, সে সম্মুখে এসে সম্ভোগের পাত্রী হতে লজ্জা পাচ্ছে। তাই ভ্রাতারা, প্রথম এদেরকে বলি দাও”।
এতো বলে, সকলে নিজের নিজের খড়গ নিয়ে, একাক জন একাকজনের পাশে এসে দাঁড়িয়ে উদ্যত হলেন বলি চড়াতে। রীতিমত উৎসবের মত করে, সকলে একই সময়ে নিজের খড়গ দ্বারা মুণ্ডচ্ছেদ করবেন বলে, তামস বৈরাগ্যের পাশে, রজনী বিবেকের পাশে, প্রভাত বিচারের পাশে, মোহিনী সমর্পিতার পাশে, মদিনা স্নেহার পাশে, রাজ্ঞী বিশ্বাসের পাশে, কামিনী জিজ্ঞাসার পাশে, মাৎসর্য মমতার পাশে, এবং পাশেরা ভূতদের পাশে এসে দাঁড়ালেন, এবং আত্মের নির্দেশের অপেক্ষা করলেন।
সকলে প্রস্তুত হয়ে স্থিত হলে, আত্ম সকলকে একত্রে খড়গ দ্বারা বলি চড়াতে আবাহন করলেন। সকলে নিজের নিজের খড়গকে নিজেদের পৃষ্ঠদেশের নিকটে নিয়ে এসে বল ধারণ করে, তাদেরকে নিম্নে বলের সাথে নিয়ে এসে মুণ্ডচ্ছেদ করতে উদ্যত হলে, এক প্রকাণ্ড হুংকার, এক প্রকাণ্ড ধূম্র, এক প্রকাণ্ড অগ্নি, এক প্রকাণ্ড কম্পনে, সকলে এমনকি আত্ম ও ছায়াদেবীরাও ভূপতিত হলেন।
