৬.২। শক্তিসঞ্চয় পর্ব
সুষুম্নায় প্রবেশ করার আগে প্রভাত সকলের উদ্দেশ্যে বললেন, “পিতা কি বললেন, একবার স্মরণ করে নাও। সর্বাম্বা সহজে বরদান দেবে না, বিবশ হলে, তবেই বরদান দেবে। … চিন্তা করেছ এই কথার উপর?”
চিন্তাপুত্র, রজনী হাস্য প্রদান করে বললেন, “ভ্রাতা, আমরা বৃহৎ দেহ ধারণ করে প্রবেশ করে চলুন সুষুম্নাতে। বৃহৎ দেহের ফলে নিশ্চিত ভাবে সুষুম্নাতে অতিতাপ ও অতি কম্পন প্রসারিত হবে। আর সেই কম্পন ও উষ্মার উৎস সন্ধান করতে নিশ্চিত ভাবে মহাভাবরা আমাদের কাছে আসবে। আমরা তখন ওদের সামনে সামান্য হয়ে গেলেও, ওরা মেনেই নেবে যে আমাদের কারণেই সেই উষ্মা বা কম্পন অনুভূত হয়েছে, আর তাই তাঁরা আমাদেরকে বন্দী করবে, বা আহতও করবে”।
তামস গর্জন করে উঠলেন, আর আমরা তখন তাদেরকে আমাদের পায়ের তলায় পতিত করে দেব। ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে দেব বিবেকের গলা, আমি আগেও এই কর্ম করেছি, আবারও করবো। বিচারকেও আমি নির্বাসিত করবো, সর্বাম্বার থেকে। এই কর্মও আগে আমি করেছি, আবারও করবো”।
রজনী মাথা নেড়ে বলে উঠলেন, “ভ্রাতা, সেই সময়ের হিসাবমিকাশ অন্য ছিল, এখন তা অন্য। কল্পনা করে, এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়, কারণ যার সাথে আমরা যুদ্ধ করতে নেমেছি, সে কনো কল্পনা নয়, আর সে কনো কল্পনার মধ্যে স্থিতও নয়। সে স্বয়ং সত্য, সে স্বয়ং যথার্থ”
তামস গর্জন করে উঠলো, “কি হিসাবমিকাশ পালটেছে, একটু খুলে বলো দেখি ভ্রাতা! তুমি সমস্ত ব্যাপারে অধিক চিন্তা করো! চিন্তাপুত্র কিনা!”
রজনী গম্ভীর হয়ে বললেন, “তামস, সেই কালে সর্বাম্বা ছিলনা, তাঁর বিদ্যা, শ্রী ও শক্তি আলাদা আলাদা রূপে অবস্থান করতো। আর তাই তাঁদেরকে মায়াতে আবদ্ধ করা সহজ ছিল। তাঁদেরকে অতি সহজেই কল্পনার মধ্যে স্থিত করে রাখতাম আমরা যে, তাঁরা নয়, আমরাই ভগবান, আর তাঁরা আমাদের সেবায়িত থেকে নিজেদের উদ্ধার করছে। চিন্তা করো সামান্য তামস, এবারে আমাদের উপরই সমস্ত ভার ছেড়ে দেওয়া হয়নি, স্বয়ং আমাদের উৎস, আমাদের পিতা, পরমাত্ম উপস্থিত। স্বয়ং আমাদের জন্মদাত্রী, ছায়াদেবীরা অবস্থানরত। কেন এই ব্যতিক্রম!
কারণ, তিনিও ত্রিদেবী রূপে নন, একাধারে ৯৬ কলা অবতারের চেতনা, প্রকৃতি হয়ে সর্বাম্বা রূপে স্থিতা। তাই তাঁকে বশ করে নেওয়া অত সহজ হবেনা। পূর্বে তা সহজ হয়েছিল, আর তাই তুমি সহজেই বিচারকে দক্ষিণে প্রেরণ করে দিয়েছিলে। কিন্তু স্মরণ করে দেখো, বিবেকের মুণ্ডচ্ছেদ করে তখনও কি তুমি স্বস্তি পেয়েছিলে! তোমার থেকেই দ্বিতীয় মুণ্ড ধারণ করিয়ে, তাঁকে গজানন করে, প্রথমপূজ্য করে রেখে দিয়েছিল। এখন তো তাঁরা আদিশক্তির পুত্রও নন, তাঁরা স্বয়ং সর্বাম্বার পিতা ও তাত হয়ে বিরাজমান। তাঁদের উপর জয়লাভ পাওয়া অসম্ভব”।
প্রভাত বললেন, “তাহলে তোমার কি অভিমত চিন্তাপুত্র! কি যোজনা করেছ তুমি?”
রজনী বিকৃত ওষ্ঠে বিকৃত এক হাস্য প্রদান করে বললেন, “কিছুই না ভ্রাতা, মহাভাবরা এলে, আমরা তাঁদের কাছে প্রহৃত হবো। আহত হয়ে, আহত অবস্থায় ন্যায়বিচার চেয়ে সর্বাম্বার কাছে গুহার লাগাবো। সর্বাম্বা বাধ্য হবে, আমাদের প্রতি ন্যায় করতে, আর ন্যায় করার অর্থই হলো আমাদেরকে বরদানে ভূষিত করা। … ভ্রাতা, কেবল নিজেদের বরদানের চিন্তাটা করে রাখো তোমরা। বাকি আমি করে দেব”।
তামস গর্জন করে উঠলো, “শেষে বিচার বিবেকের হাতে প্রহৃত হতে হবে!”
রজনী বিদ্রূপের হাস্য হেসে বললেন, “কর্মের কর্মফল, আর কি! এককালে তাঁদের উপর নিজের অধিকার ফলিয়েছিলে, আজ তাঁদের কাছেই প্রহরণ স্বীকার করতে হবে”।
প্রভাত বললেন, “যোজনা তোমার যথার্থ রজনী। সেই অনুসারেই কর্ম করি চলো”।
এমন সিদ্ধান্ত নিলে, সকলে বৃহৎ আকৃতির দেহ ধারণ করে সুষুম্নাতে প্রবেশ করলে, প্রবল কম্পন ও উষ্মা প্রতিফলিত হলো। আর অন্য দিকে, যক্ষরা সর্বাম্বার মধ্যে লীন হতে, মনিপুরের দ্বার উন্মোচিত হলো। সকলে দেখলেন, অদ্ভুত দিব্যতায় পরিপূর্ণ সেই স্থান। মনিপুর দেহরূপ ধারণ করে এসে সর্বাম্বার সম্মুখে নতমস্তক হয়ে দণ্ডায়মান থেকে বললেন, “মাতা, আপনার ধামে, আপনাকে স্বাগত। আমি মনিপুর, আর আপনার সম্মুখে শ্বেতলোক, যাকে তপলোকও বলা হয়”।
দেবী প্রেমা প্রশ্ন করলেন, “আচ্ছা মনিপুর, পরিবার একটি একটি করে কক্ষতে আমরা প্রবেশ করছি, সেখানে একটা না একটা কিছু হচ্ছে, আর দ্বিতীয় দ্বার খুলে যাচ্ছে। সংস্কাররা গেল তো মূলাধারের দ্বার খুলে গেল; ভুতরা গেল তো স্বাধিষ্ঠানের দ্বার খুলে গেল; যক্ষরা গেল, তো মনিপুর উন্মোচিত হলো। আচ্ছা আমাকে একটি কথা বলো, এই যে শ্বেতলোক, এর উন্মোচন কি ভাবে হয়?”
মনিপুর বললেন, “মাতা, সেই দ্বারে আপনার যেই সেবক অবস্থান করছেন, তাঁর নাম অনাহত। তবে সেই দ্বার উন্মোচিত হওয়ার উপায় ভিন্ন। সেখানে পূর্ব থেকে কেউ অপেক্ষা করেনা। সত্ত্বগুণ তৃপ্ত হয়ে গেলে, সেই দ্বার উন্মোচিত হয়। পরবর্তী লোকের নাম সর্বশ্রী, সেখান থেকে মুক্ত হবার দ্বারের নাম বিশুদ্ধ, আর তা সম্ভব হলে, রজগুণের তৃপ্তির উপর। সেই দ্বার দিয়ে প্রবেশ করলে, আসে বেদশ্রী লোক, আর তার উপরান্তে যেই দ্বার থাকে, তা উন্মোচিত হয় আজ্ঞাদ্বারের কারণে, আর তা উন্মোচিত হয়, তমগুণ তৃপ্ত হলে”।
সর্বাম্বা প্রশ্ন করলেন, “তারপরে কি আছে সুষুম্নাতে মনিপুর?”
মনিপুর বললেন, “মাতা, তারপর যা আছে, তা কেবলই শ্রবণ করা কথা। জানা নেই যে, যা জানি, তা সত্য না মিথ্যা। সেই লোকের নাম মাতৃলোক, আপনার সপরিবারে অধিষ্ঠানের স্থান। তবে সেই স্থানের পরেও একটি দ্বার আছে, সেই দ্বার উন্মোচিত হলে কি হয় আমার জানা নেই, তবে শুনেছি যে সেই দ্বার উন্মোচিত তখনই হয়, যখন লেশমাত্রও অহমিকা থাকেনা, অর্থাৎ আত্মের মৃত্যুর পশ্চাতেই, সেই দ্বার উন্মোচিত হয়”।
দেবী জিজ্ঞাসা বললেন, “আমার কি কনো প্রশ্নের উত্তর দেবেন আপনি, হে মনিপুর?”
মনিপুর হেসে বললেন, “স্বয়ং জগন্মাতার মাতা আপনারা। আমার কি সাধ্যি যে, আপনাদের উপেক্ষা করি! যদি আমার উত্তর জানা থাকে, তাহলে নিশ্চয়ই প্রশ্নের উত্তর প্রদান করবো মাতা। আদেশ করুন”।
দেবী জিজ্ঞাসা প্রশ্ন করলেন, “আচ্ছা, এই রহস্যটা কি? একজন একজন করে মুক্ত হচ্ছে, আর আমরা সম্মুখে এগোতে পারছি! কেন এমনি এগোতে পারছি না!”
মনিপুর হেসে বললেন, “মাতা, আত্মের থেকে জাত এই সমস্ত কিছু, যাদের কারণে মাতা নিজের নিয়তিতত্ত্ব, প্রকৃতিতত্ত্ব তথা চেতনাতত্ত্ব সম্বন্ধে ভ্রমিত হয়ে রয়েছেন। আত্ম এই সমস্ত কিছুকে দিয়ে মাতাকে ভ্রমিত করে রাখার প্রয়াস করেন। তাই দেবী, একটি একটি করে সেই ভ্রমের নাশ হলে, একটু একটু করে সম্মুখে এগিয়ে যেতে পারেন আপনারা।
কামাগ্নি, মোহ, লোভাদি আবেগ সমূহ হলো প্রথম ভ্রম, যাদেরকে স্বীকার করার জন্য, চেতনাকে ধারণ করা সম্ভব হচ্ছিল না। তাদেরকে বর্জন করার সাথে সাথে, মাতা নিজের চেতনা ফিরে পেলেন। দ্বিতীয় বাঁধা ছিল পূর্ব জন্মের সংস্কার। তাদেরকে গ্রহণ করে, মান্যতা প্রদান করে চলা উচিত, এই বোধ আত্ম প্রদান করে, আর সেই বোধের কারণে মূলাধার উন্মোচিত হয়না। তাদের থেকে সারকথা জেনে নিয়ে, আত্ম তাদেরকে ব্যবহার করে চেতনার যাত্রাকে অবরোধ প্রদান করে, তা উপলব্ধি করে নিয়ে, তাদেরকে আত্মসাৎ করে সমাপ্ত করে দিলে, বাঁধার নাশ হয়, তাই মূলাধার উন্মোচিত হয়।
ভুতপ্রেত পিশাচাদি হবার পশ্চাতে কারণ এই যে, সন্তানরা পিতৃপুরুষের তর্পণ করেনি। এই অপপ্রচার আত্ম করে, আর এই অপপ্রচারের কারণে, মৃত্যুপশ্চাতে জীব ভুলে যান যে, তাঁরা স্বেচ্ছায় দেহধারণ ও দেহত্যাগ করেন, আর সেই সম্বন্ধে ভ্রমিত হয়ে থাকার কারণে, পুত্রদের তর্পণের অপেক্ষা করতে থাকে, আর সেই তর্পণ করতে দেখলেও, তার থেকে কিচ্ছুই লাভ করতে পারেনা, কারণ তর্পণকারীরা পঞ্চভূতদেহ ধারণ করে থাকেন, আর ভুতরা তা করেন না। তাই পঞ্চভূতের কনো সামগ্রীই তাঁরা গ্রহণ করতে পারেন না, আর ভুত তো ভুতই থেকে যান এবং আত্মের দাস হয়ে থাকেন।
এঁদের মুক্তি তখন সম্ভব হয়, যখন এঁদের অস্তিত্বের সত্যতার বোধ হয়, এবং তর্পণ বা পিণ্ডদান এক আত্মের নিজের ভগবানত্ব বিস্তারের এক কৌশল মাত্র সেই কথা সেই ভুতদেরকে ও স্বয়ংকে বোঝানো সম্ভব হয়। এর পরের বাঁধা হয়, বিশালাকায় দেহ। বিশালাকায় দেহ বিভীষিকার কারণ, এমন প্রচার আত্ম করে রাখে, আর সেই প্রচারকে সঠিক প্রমাণ করার জন্য, যক্ষদের স্থাপিত করে রাখেন তিনি। তবে এই যক্ষরা বরাবরই মাতার প্রতি নিষ্ঠাবান, আর তারা কনো প্রকার কনো ক্ষতি সাধন করেনা। দেহের গঠনের কারণে কনো প্রকার ভীতি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, এই সত্য অনুভব করে নিতে পারলে, মনিপুর উন্মোচিত হয়ে যায়।
আর দেবী, পরের তিন দ্বারে, সত্ত্ব, রজ ও তমের তৃপ্তির প্রয়োজন পরার কারণ মাতা স্বয়ং। মাতা একসময়ে এঁদেরকে দেবত্ব প্রদান করে, এঁদের নামে তিনটি লোক প্রদান করে দিয়েছিলেন। তাই এটি তাঁরই কর্মের কর্মফল যে, তাঁকে এই তিনগুণদের সন্তুষ্ট করতে হয়, তবেই এই তিন দ্বার উন্মোচিত হয়। আর অন্তে আত্মের সার্বিক দমনও তাঁকেই করতে হয়, কারণ আত্মের জন্মও তাঁরই কর্ম, আর তাই তাঁকেই সেই কর্মেরফল গ্রহণ করে, আত্মের বিনাশ নিশ্চয় করতে হয়”।
মনিপুর এই ভাবে সমস্ত বিবরণ দেবার কালেই, মুহুর্মুহু সম্পূর্ণ সুষুম্না কম্পিত হতে শুরু করলে, মহাভাবরা চঞ্চল হয়ে উঠে বললেন, “তোমরা এখানেই স্থিত থাকো। আমরা দেখে আসছি। মনে হচ্ছে নূতন কিছু বিপদের আগমন ঘটেছে”।
এমন বলে, মহাভাবরা প্রস্থান করলে, সর্বাম্বা নিজের অতিসুন্দর ওষ্ঠের কোনে একটি মৃদু হাস্য রেখে মনিপুরের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে, মনিপুর হেসে বললেন, “সকলেই তাঁর সন্তান। তাই কারুকেই তিনি বিনা দোষে দণ্ড দেন না, আবার কারুকে তিনি সুযোগ দিতেও পিছুপা হননা। যাকে দণ্ড দেবার হয়, তাকে দণ্ড গ্রহণ করার জন্য দণ্ডের উপযুক্ত কর্ম করারও সুযোগ তিনিই দেন। সুযোগ তো তিনি দেন, যাতে সে নিজের উদ্ধার করতে পারে। কিন্তু যে দণ্ডের পাত্র, সে যে সেই সুযোগকে নিজের পতনেরই কারণ বানিয়ে নেয়।
কিন্তু তা বলে মাতা, তাঁকে সুযোগ দিতে পিছুপা হননা। মা তিনি, তাই মাতার লীলা অব্যাহতই থাকে সর্বক্ষণ। আমার কথার অর্থ এই যে, দেবী জিজ্ঞাসা, মাতার লীলা দেখতে থাকুন। সমস্তই তাঁর লীলা, গড়াও আবার ভাঙাও। অনন্ত তিনি, তাই একম অস্তিত্ব। আর এই ভাঙাগড়ার ক্রিয়া দ্বারা তিনি নিজের একাকীত্বকে নিবারণ করেন। তাই তাঁর লীলা দেখতে থাকুন, আনন্দ গ্রহণ করুন। সমস্ত কিছুতেই আনন্দ লাভ করবেন। গড়াতেও, আর ভাঙাতেও, কারণ আপনারা তাঁর সম্মুখে দণ্ডায়মান, যিনি একাই কর্তা। সত্য অর্থে কর্তা তিনিই, আর বাকি সকলে ভ্রমবশতই কর্তা। সেই ভ্রম দূর হলে কৃতান্ত হয়, আর যার সেই ভ্রম দূর হয় এবং মাতাকে একমাত্র কর্তা রূপে জ্ঞান করেন, তিনি হয়ে যান কৃতান্তিক”।
এত বলে, মনিপুর দ্বারে স্থিত হয়ে, নিজের কর্তব্যে রত হলে, সকলে সেই শ্বেতলোকের পবিত্রতাকে প্রত্যক্ষ করে আনন্দিত ও প্রফুল্লিত হতে শুরু করলেন। এমনই সময়ে, এক ত্রিস্বর কণ্ঠধ্বনি সকলের ধ্যানকে সেই ধ্বনির উৎসের দিকে অপসারিত করে নিয়ে গেল, আর সেই স্বর মুহুর্মুহু যেন প্রাণভয়ে ডাকতে থাকলেন, “মাতা! … মাতা সর্বাম্বা! আমাদের রক্ষা করুন!”
দেবী প্রেমা সেই শব্দ শ্রবণ করে, সেই শব্দের উৎসের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। সেই দেখে পঞ্চভাবও তাঁদের পুত্রীর সুরক্ষার ভাব রেখে, তাঁর পশ্চাতে পশ্চাতে সেখানে যাত্রা করলেন। যাত্রা করে, সকলে স্বাধিষ্ঠান দ্বারের অন্যদিকে প্রবেশ করলে দেখলেন, আত্মের তিন পুত্র ভূমিতে শায়িত রয়েছে, আর অন্য দিকে শিখা ও বেগবতীর কন্যারা শায়িত হয়ে রয়েছেন রক্তাক্ত অবস্থায়।
সম্মুখে সকলে দেখলেন, বিবেক নিপাশ ধারণ করে ত্রিগুণের নাশ করতে উদ্যত। সেই দেখে সর্বাম্বা একপ্রকার ক্রুদ্ধ হুঙ্কারই গর্জন করে উঠলেন, “বিবেক! কি করেছে এঁরা, যার কারণে তুমি এঁদের হত্যা করতে উদ্যত!”
সর্বাম্বার আস্ফালন এতটাই তীব্র ছিল যে, তাঁর আস্ফালনে পঞ্চভাব থেকে মহাভাব, যে যেখানে দণ্ডায়মান ছিলেন, সে সে ভূপতিত হলেন। বিবেক চমকিত হলেন, দেবীর আগমনের কারণে। নিজেকে সামান্য সামলে নিয়ে তিনি বললেন, “সর্ব্বা, আমাদের বিরক্ত করার জন্য এঁরা বিশালাকায় দেহ ধারণ করে কম্পন সৃষ্টি করছিল এই সুষুম্নাতে”।
সর্বাম্বা পুনরায় ক্রুদ্ধ আবেশে বললেন, “বিরক্ত করার জন্য, শাসন করতে হয়, হত্যা নয়। এই একই কথা, পূর্বে আমি তামসকেও বলেছিলাম, যখন সে কামদেবকে ভস্ম করেছিল, আর বিনায়কের শীর ছিন্ন করেছিল। কিন্তু কথাটা, কেবলই কর্তব্যের ত্রুটি নয়। না তখন তামস কর্তব্যের ত্রুটির কারণে সেই সমস্ত কিছু করেছিল, আর না তোমরা তা করছো। আসল কথা এই যে, তোমরা একে অপরের বৈরী, আর তাই যখন যখন একে অপরের সম্মুখে আসো, তখন তখন রণমূর্তি ধারণ করো, এবং কি তোমাদের কর্তব্য তা ভুলে যাওয়ার ভান করে, নিজেদের বৈরীতার প্রকাশ করে বীরত্ব প্রদর্শন করো”।
বিবেক মাতার শাসনে অভিমানী হয়েছেন যেন, এমন ভাবে বললেন, “কিন্তু কনো কারণ নেই, শুধুই বিরক্ত করার জন্য, এঁরা বিশাল আকার ধারণ করেছিল”।
সর্বাম্বা বললেন, “হতেই পারে যে তোমার অনুমান সত্য। কিন্তু তুমিই বলো তাত, সেই কর্মের দণ্ড কি মৃত্যু! মৃত্যু কি লঘু কর্মের গুরু দণ্ড হয়ে যায় না! … তাত, আপনারা মহাভাব, সকলের আদর্শ আপনারা। আপনারাই যদি এমন অকর্তব্য করেন, তবে সকলে আপনাদের দেখে দেখে কি শিখবে! … শত্রু হতেই পারে কেউ আপনার, আপনাদের, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, শত্রুকে দেখা মাত্র তাঁর নিধন করবো। এ কেমন আগ্রাসী মনোভাব!
অপকর্ম করা হলে, অবশ্যই শাসন করবে, দণ্ড দেবে, কিন্তু যতটা অপকর্ম হয়েছে, ততটাই তো দণ্ড দেবে! যেই অপকর্ম ঘটিতই হয়নি, কেবল মাত্র অনুমানভিত্তিক সেই কর্মের দণ্ড কি দেওয়া যেতে পারে! … যদি তা করো তাহলে তো তা স্বৈরাচার। তাই নয় কি? সেটা রাজা দিক বা ঈশ্বর, সেটা যে সকল সময়েই স্বৈরাচার!
বিচার করে দেখো, মাতার থেকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য, তামস পূর্বে, বিচারকে দক্ষিণে প্রেরণ করে দিয়েছিল, বিবেকের মুণ্ডচ্ছেদ করে দিয়েছিল। সে স্বৈরাচারী ছিল, কিন্তু তা বলে তোমরাও স্বৈরাচারীই হবে! … বিচার করে দেখো, এ তো স্বৈরাচারও নয়, এতো প্রতিহিংসা! মহাভাবদের কি স্বৈরাচার শোভা পায়!”
বিবেক বললেন, “ক্ষমা … ক্ষমা দেবী। দিবারাত্র বেগবতীর আক্ষেপ শ্রবণ করি, কি ভাবে মায়ায় আবদ্ধ করে, তাঁদেরকে নিজেদের যৌনতার দাস করে রেখেছিলেন এই ত্রিগুণ। তাই হয়তো, সামান্যতম অপকর্মে লিপ্ত দেখে, এঁদের উপর প্রচণ্ড হয়ে উঠেছিলাম। কারণ যাই হোক, অন্যায় করেছি আমরা”।
সর্বাম্বা বোঝানোর মত করে বললেন, “অপরাধে লিপ্ত হলে, অবশ্যই দণ্ডের ভূমিকায় উত্তীর্ণ হতে তোমরা। কিন্তু বিরক্ত করা, অপমান করা ইত্যাদি কখনোই সেই অপরাধ নয়, যার কারণে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যেতে পারে। পূর্বে, তামস নিজেকে ভগবানের আসনে স্থিত রেখে, সেই একই অপরাধ করে নিজের পথ পরিষ্কার করতে গেছিল। কিন্তু সে তো আত্মগুণ। তাঁর স্বভাবই আসুরিক। তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ কেন? কেন ভুলে গেলে তোমরা যে, এই রিপুরা, তোমাদের স্ত্রীদেরই সন্তান, অর্থাৎ তোমাদের সন্তানসম।
হ্যাঁ যদি এঁরা অপরাধের ভূমিকায় উত্তীর্ণ হয়, যদি এঁরা নিজে থেকে আমাদের শত্রু রূপে চিহ্নিত করে আক্রমণ করে, আমি কথা দিচ্ছি, আমি স্বয়ং এঁদের নিদারুণ মৃত্যু উপহার দেব। কিন্তু তার পূর্বে কেন? তার পূর্বক্ষণ পর্যন্ত এঁরা আমাদের আত্মীয়। … বিরত হও, আর রিপু পাশদের শুশ্রূষা করো। সন্তানজ্ঞানে, তাঁদেরকে সুস্থ করে তলো”।
এক মুহূর্তের জন্য ত্রিগুণ দেবীর এমন করুণা, এবং এমন সুবিচার দেখে ভ্রমিত হয়ে গেছিলেন। যেন ইচ্ছা হয়েছিল, শত্রুতার নাশ করে, দেবীর চরণে পতিত হতে। কিন্তু পরমুহূর্তে তাঁদের আত্মভাব জাগ্রত হয়, আর তা জাগ্রত হতেই, পুনরায় তাচ্ছিল্যের ভাব জাগ্রত হয় দেবীর প্রতি। আর তারা নিজেদের যোজনাতে প্রত্যাবর্তন করলে, রজনী বললেন, “দেবী, কেবল আঘাত করা থেকে বিরত রাখলে আর শুশ্রূষা করলেই কি ন্যায় বিচার হয়ে গেল আপনার! … আমাদের প্রতি যেই অন্যায় করা হয়েছে, তার কি হবে!”
দেবী সর্বাম্বা মৃদু হেসে বললেন, “বিরক্ত করার প্রয়াস করেছ তোমরা, তা তোমরাও জানো, আর কি উদ্দেশ্যে তা করেছ, তা আমিও জানি তোমরা তো জানোই। যুদ্ধ না করে, প্রহৃত কেন হয়েছ, তাও আমি জানি। তবে তোমাদের যোজনাতে তোমাদের সাফল্যই প্রদান করবো আমি। বরদান কামনা করো না! বেশ বরদান প্রদান করবো। তবে বিরক্ত করার মানসিকতা নিয়েই সমস্ত করেছিলে, তাই কিছু তো তোমাদেরকেও করতে হবে। তবেই সেই কৃত্যের ভিত্তিতে তোমাদের মনবাঞ্ছিত বরদান প্রদান করবো আমি”।
প্রভাত বললেন, “সঠিক কথা দেবী। সরাসরি আপনার কাছে এসে বরদানের কামনাও তো করতে পারতাম আমরা। কিন্তু তা করিনি, আপনাকে অন্য ভাবে নিজেদের কাছে আকৃষ্ট করার প্রয়াস করেছি। তাই অবশ্যই বরদান লাভের জন্য আমাদের কিছু করা উচিত। আদেশ করুন দেবী, কি করতে হবে বলুন। কি কর্ম করলে, আপনি আমাদেরকে বরদানে ভূষিত করবেন, তা ব্যক্ত করুন”।
দেবী সর্বাম্বা হেসে বললেন, “তোমার ভ্রাতারা জখম হয়েছেন প্রভাত। তাই তাঁদেরকে সুস্থ হতে সময় দাও। তুমি আমার সাথে এসো। আমি তোমাকে তোমার কর্ম দেখিয়ে দিয়ে, তোমার কর্মের কর্মফল স্বরূপ বরদান প্রদান করবো। … তুমি তোমার বরদান লাভ করে প্রত্যাবর্তন করে, এক এক করে তোমার ভ্রাতাদের প্রেরণ করবে বরং”।
এত বললে, প্রভাত যাত্রা করার জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠলে, রজনী অন্তরে অন্তরে চিন্তিত হয়ে উঠলেন, একাকী ভ্রাতাকে নিয়ে গিয়ে, তাঁর নিধন না করে দেন সর্বাম্বা! … কিন্তু সম্মুখে সেই সংশয়কে স্থাপনের দুঃসাহস করলেন না তিনি। কিন্তু সর্বাম্বা যে অন্তর্যামী। এক ক্রুদ্ধ দৃষ্টি প্রদান করলেন রজনীর দিকে, আর বললেন, “মা আমি, কারুর নিধন ততক্ষণ চাইনা, যতক্ষণ না সে আমার অন্য সন্তানদের শত্রু হয়ে ওঠে। … যদি চাইতাম, এক্ষণে সকলের নিধন করতাম”।
রজনী বুঝে গেলেন, তাঁর অন্তরের কথা সর্বাম্বা পড়ে নিয়েছেন। তাই মাথা নত করে রইলেন। অন্যদিকে সর্বাম্বা রিপুদের দিকে এগিয়ে গিয়ে মোহিনীর সম্মুখে স্থিত হলেন, আর বললেন, “মোহিনী! … তুমি তোমার সমস্ত ভ্রাতা-ভগিনীর মধ্যে অধিক বাস্তবসম্মত। তাই তোমাকেই সতর্ক করছি। পূর্বে, তুমি ছিলে দেবী মেধার ভগিনী-সন্তান, অর্থাৎ তাঁর সন্তানসমা। তাই, দণ্ড দিলেও মৃত্যুদণ্ড দেয়নি তোমাকে মেধা।
কিন্তু আজ তুমি আমার মাতার ভগিনীর কন্যা, অর্থাৎ আমার জ্যেষ্ঠ ভগিনী তুমি। তাই এরপরে কনো অপকর্মে যুক্ত হবার আগে বিচার করে নিও। এবার কিন্তু সন্তানসম বলে তুমি ছাড় পাবেনা। সতর্ক থেকো, আর তোমার ভ্রাতা-ভগিনীদেরকেও সতর্ক করে দিও”।
মোহিনী, মদিনা সকলে স্তব্ধ হয়ে থাকলে, প্রভাতের দিকে তাকিয়ে সর্বাম্বা বললেন, “এসো প্রভাত। আমার সাথে এসো”। … পুনরায় বিচার বিবেকদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “যেই নিষ্ঠার সাথে আক্রমণ করেছিলেন এঁদেরকে, সেই নিষ্ঠার সাথেই দয়া করে সেবা করে সুস্থ করে দিন এঁদেরকে পিতা ও তাত”।
বৈরাগ্য বললেন, “আমরা শীঘ্রই এঁদেরকে সুস্থ করে তুলে তোমার কাছে যাচ্ছি পুত্রী। তুমি প্রভাতকে তোমার সাথে নিয়ে গিয়ে তোমার কর্মকে অগ্রসর করো”।
প্রভাতকে সঙ্গে নিয়ে সর্বাম্বা এবার শ্বেতাধামে উপস্থিত হলে, প্রভাতকে দেখে, দেবী শিখা ও দেবী বেগবতী সংযত হয়ে গেলে, সর্বাম্বা সেই দিশায় দেখে, হাস্য মুখে প্রভাতের উদ্দেশ্যে বললেন, “বলো প্রভাত, আমি কি করতে পারি তোমার উদ্দেশ্যে! কি করলে, তুমি সন্তুষ্ট হবে!… কনো সঙ্গীত পরিবেশন করি!”
প্রভাত সঙ্গীতের নাম শুনে ইতস্তত হয়ে উঠলে, সর্বাম্বা হেসে বললেন, “কেন স্মরণ তো তোমার থাকার কথা, তাই না! … আমাকে তোমার কাছে রেখে, দিবারাত্র আমাকে সঙ্গীতের চর্চা করাতে, আর সঙ্গীতের তানে তানে তুমি অহমের বিস্তার করার জন্য একের পর এক আত্মবিস্তারের রচনা করতে! স্মরণ আছে না! তখন তুমি নিজেকে ভগবান ব্রহ্মা বলতে, আর আমাকে শ্বেতা।… কি স্মরণ আছে তো! … তা আবারও সঙ্গীতের রচনা করি!”
প্রভাত আরো ইতস্তত হয়ে উঠলেন। তিনি মনে মনে জানেন যে, ব্রহ্মময়ীকে বশ করে রেখে, কি ভাবে তাঁরা নিজেদের অধীনে স্থিত রেখেছিলেন। এমন না হয় যে, এবারে সেই দাসত্বের বিবর্তন হয়ে, তাঁকেই দেবীর দাস হয়ে থাকতে হয়। তাই মাথা নিচু করে, চুপ করে থাকলেন। দেবী সর্বাম্বা প্রভাতের সংশয়কে প্রত্যক্ষ করে, বক্র ওষ্ঠে মিষ্ট হাস্য প্রদান করে, বিচিত্র সঙ্গীতের অবতারণা করলেন।
সেই সঙ্গীতের খেয়ালে, এমনই ভাবে খাদে প্রবেশ করলেন তিনি যে, সম্পূর্ণ সুষুম্নাই কেবল নয়, সম্পূর্ণ ব্রহ্মাণ্ড মোহিত হয়ে উঠতে শুরু করলো, আর তার থেকে উৎপত্তি হলো এক অদ্ভুত নাদ, যা সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডে মুহুর্মুহু বেষ্টন করতে থাকলো। সেই ওঁকার শুনে, প্রভাত ভাবস্থ হলে অনাহতের দ্বার উন্মোচিত হয়, আর অনাহত দেবী সর্বাম্বার সম্মুখে এসে উপস্থিত হয়ে বললেন, “প্রণাম মাতা, আমার জন্য কি আদেশ!”
দেবী সর্বাম্বা তাঁর সদাহাস্যময় মুখমণ্ডলে স্নেহের হাস্য ধারণ করে বললেন, “পুত্র, তোমার দ্বার খুলে রেখো। অবারিত দ্বার করে রেখো। নিঃসংশয় থেকো, মাতার দ্বার সন্তানের জন্য সর্বক্ষণ উন্মুক্তই থাকবে। মাতার নির্বিঘ্ন ও নিরবিচ্ছিন্ন থাকার অধিকার থাকেনা। তাই আমিও নিজেকে সেই অধিকার দেবনা”।
অনাহত প্রস্থান করলে, প্রভাতের দিকে তাকিয়ে স্নেহহাস্য হেসে বললেন, “তোমার সংশয় অহেতুক ছিল প্রভাত। আমি মা, সত্য অর্থে মা। সন্তানের বিস্তার চাই, সন্তানের স্ফীতি চাই। সন্তানকে উন্নতির মার্গ দেখাই। সন্তানকে স্নেহ করি, নিজের আঁচলে বন্দী করিনা। … সন্তানকে যদি মাতার দাস হতে হয়, সর্বাধিক পীড়া মাতারই হয়, কারণ দাস যে চরণ থেকে উন্নতই হয়না, আর মাতার যদি কিছু খাঁখাঁ করে, তা হলো তাঁর হৃদয়। অর্থাৎ দাস হলে যে, মায়ের হৃদয় সেই অপূর্ণই থাকে। তাই মা দাস চাননা, সন্তানকে হৃদয়ে ধারণ করে, তাঁকে আঁকড়ে ধরে প্রেম দিতে চান।
তুমি মুক্ত প্রভাত, এবার তুমি তোমার কাঙ্ক্ষিত বরদান কামনা করতে পারো। প্রতিশ্রুতি অনুসারে তা অবশ্যই প্রদান করবো। তবে তার আগে তোমাকে সতর্ক করে দিতে চাই। জানো তোমরা, পূর্ব অভিজ্ঞতা আছে তোমাদের, কারণ তোমরা অনেককেই এমন অখণ্ড বরদান প্রদান করেছ, কিন্তু আমি তার নাশ করেছি পূর্বেও। তাই অখণ্ডতার দ্বন্ধে নিজেকে রেখো না। … বলো কি বরদান কামনা করো!”
প্রভাত সঙ্গীতের ভাবে বেশ কিছুক্ষণ অপ্রস্তুত হয়ে গেছিলেন। তাই প্রকৃতিস্থ হতে একটু সময় নিয়ে বললেন, “দেবী, আমাকে এই বরদান প্রদান করুন যে, যার লিঙ্গকে ব্যখ্যা করা যায়, সে কখনোই আমাকে হত্যা করতে পারবেনা। আমাকে সে-ই হত্যা করতে পারবে, যার লিঙ্গকে ব্যাখ্যাই করা যায়না। … বাকি সকলের উপর আমার একচ্ছত্র অধিকার স্থাপিত থাকবে”।
সর্বাম্বা হাস্যবদনে বললেন, “তথাস্তু। … নিজের বরদানের সৎ ভাবে ব্যবহার করো তাকে অখণ্ড রাখতে। সর্বহিতই বরদানের উচিত মার্গ। যখনই তার থেকে স্খলিত হবে, তোমার বরদান শীর্ণ ও জীর্ণ হয়ে উঠবে। যাও প্রত্যাবর্তন করে, তোমার যেকোনো একটি ভ্রাতাকে প্রেরণ করো”।
বরদানে ভূষিত হয়ে, অহমিকায় চূর হয়ে, নিজের বাকি ভ্রাতাদেরকেও বলবান করে তুলে পুনরায় হারিয়ে যাওয়া ব্রহ্মাণ্ডকে নিজেদের শাসনের অধীনে আনতে ব্যস্ত হয়ে, প্রভাত প্রত্যাবর্তন করলেন সেখানে যেখানে তাঁর ভ্রাতারা অপেক্ষা করছিলেন।
সেখানে প্রত্যাবর্তন করে দেখলেন, শুশ্রূষা করার শেষে, ইতিমধ্যেই মহাভাবরা সেখান থেকে প্রস্থান করেছে। অরিনাশী, নিপাশ ও ত্রিমারের আঘাত বিপুল। তাই সুস্থ হয়েও নিদ্রায় রত সমস্ত রিপু ও পাশেরা। তামস আহার ও নিদ্রা প্রিয়। তাই সে নিদ্রাতেই রত, আর বহুকাল ব্যাপী ছল করা ধ্যানমুদ্রাতেই সে নিদ্রারত। রজনী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে পায়চারি করছেন, আর প্রভাতের জন্য দুশ্চিন্তা করছেন। সেই দেখে, প্রভাত হাস্যমুখে রজনীর দিকে অগ্রসর হয়ে বললেন, “ভ্রাতা, আমি এসে গেছি। জানি তুমি দুশ্চিন্তা করছো যে, আমাকে একাকী পেয়ে সর্বাম্বা আমাকে হত্যা না করে দেয়। কিন্তু বাস্তব এই যে, সে অত্যন্ত নির্বোধ।
সে আমাকে একাকী পেয়ে কি করলো জানো? সে আমার সেবা করতে, আমাকে সঙ্গীত শ্রবণ করালো। মূর্খা, মহা মূর্খা সে, আমরা বা আমাদের পিতা বৃথাই এই মূর্খার জন্য চিন্তিত থাকি। আমাদের কাছে যখন কেউ বরদান কামনা করতো, আমরা সেই বরদান তাঁকে প্রদান করার জন্য, তাকে দিয়ে আমাদের সেবা করাতাম, আমাদের নামের প্রসার করাতাম, তবেই বরদান দিতাম। কিন্তু এই দেবী তো এতই মূর্খা যে, সে আমাদেরকে সেবা করে, আমাদেরই বরদান প্রদান করে”।
রজনী সংশয় প্রকাশ করে বললেন, “যথার্থই বরদান প্রদান করেছে তো! আমার তো সন্দেহ আছে যে বরদানের নামে মিথ্যাচার করে, তোমাকে বোকা বানিয়ে ফিরিয়ে দিয়েছে!”
তামস নেত্র উন্মোচন করে বললেন, “যথার্থ বলেছে ভ্রাতা। একবার পরীক্ষা করে নেওয়া উচিত। তা না হলে, আমাদেরকেও একই ভাবে বোকা বানাতে পারে সে। কি বরদান কামনা করেছ তুমি? কি বরদান লাভ করেছ?”
প্রভাত সংশয়ের সাথেই বলল, “এই বরদান যে, আমাকে কনো লিঙ্গের জীব হত্যা করতে পারবেনা”।
তামস নিজের ত্রিশূলে শান দিচ্ছিল, সংকল্প গ্রহণ করছিল যে এই ত্রিশূলের তিন ফলাতে বিচার, বিবেক আর বৈরাগ্যের শবদেহ টাঙিয়ে রেখে পিতাকে দেখাবে। সেই ত্রিশূল নিয়েই, সরাসরি প্রভাতের উদরে তা প্রবেশ করাতে গেল, কিন্তু ত্রিশূল প্রবেশ করলো না। তাই দেখে, মোহিনীকে তাঁর অসি দ্বারা মোক্ষম আঘাত করতে বলল। সেই অসির হাতল থেকে তরবারি খুলে চলে গেল। একাধিকবার কখনো পুরুষ দ্বারা, কখনো স্ত্রীদ্বারা আঘাত করার প্রয়াস করলে, সমস্ত প্রয়াস ব্যর্থ হয়ে যায়।
আর প্রতিবার একটি একটি প্রয়াস ব্যর্থ হয়, প্রতিবার প্রভাত আস্ফালনসূচক অট্টহাস্য প্রদান করতে থাকে। অবশেষে ত্রিগুণ একত্রে ও রিপুপাশ সমস্তই অট্টহাস প্রদান করতে থাকে। রজনী উচ্চৈঃস্বরে বলে উঠলেন, “সঠিকই বলেছ ভ্রাতা, মূর্খা নয়, মহামূর্খা সে। নিজের মৃত্যুকেই নিশ্চিত করেছে সে তোমাকে এই বরদান প্রদান করে, তাও আবার তোমার সেবা করে তোমাকে বরদান প্রদান করেছে”।
তামস বলে উঠলেন, “না না ভ্রাতা রজনী, আমি উনাকে চিনি। উনি এত সহজ নন, যতটা সহজ উনি নিজেকে দেখান। সরলতম দেখায় তাঁকে, সম্পূর্ণ ভোলা মনে হয়, কিন্তু তাঁর প্রতিটি কর্মের পিছনে একটি উদ্দেশ্য থাকে, যার ধারণাও আমরা করতে সক্ষম হইনা। স্মরণ নেই মহিষাসুরকে কি ভাবে দমন করেছিল সে? আমাদের অস্ত্রে নিহত হতে চাই বলে, আমাদের সমস্ত অস্ত্র ধারণ করে নিয়ে, আমাদের প্রস্তুত করা শ্রেষ্ঠ অস্ত্র, মহিষাসুরকে বিনষ্ট করে দিয়েছিল। দেখে ওকে মনে হয়, সে বড়ই সরল, কিন্তু বাস্তবে তা নয়। বাস্তবে সে, বড়ই কুটিল। নিশ্চয়ই তোমাকে বরদান দেবার পিছনে অন্য কনো ব্যাপার আছে!”
রজনী বললেন, “আর কি ব্যাপার থাকতে পারে তামস? আর যদি কিছু ব্যাপার থাকেও, স্ত্রী পুরুষ কেউ কনো লিঙ্গ ভ্রাতা প্রভাতের নাশ করতে পারবেনা। এর অর্থ কি? এর অর্থ, মহাভাব ছাড়ো, পঞ্চভাব ছাড়ো, স্বয়ং সর্বাম্বাও ভ্রাতার কিচ্ছু বলতে কিচ্ছু করতে পারবেনা। … বুঝতে পারছো? যদি কিছু করিয়েও নেয়, তারপরেও তো ভ্রাতাকে অমরত্বই দান করেছেন তিনি। প্রমাণ তো হাতেনাতেই পেলে!”
তামস বললেন, “এতদিন এখানে বিরাজ করছি আমরা, আর আমাদের থেকেও আগে পিতা ও মাতারা বিরাজ করছেন। তাঁরা কেউ কনোদিনও সর্বাম্বার সঙ্গীতের কথা বলেছে? … তাহলে আজ আকস্মিক সঙ্গীত কেন? সঙ্গীতের প্রভাবকে একবার স্মরণ করো ভ্রাতা, আমরা সমস্ত সেই সঙ্গীতের কারণে তটস্থ হয়ে গেছিলাম!”
রজনী এবার প্রশ্ন সূচক হয়ে বললেন, “কি বলতে চাইছ বলোতো তামস! তোমার অন্তরে কনো এক সংশয় চলছে। কি সে সংশয়?”
তামস বললেন, “ভ্রাতা, আমি যেটুকু চিনি তাঁকে, তাতে আমি এই জানি যে, সে অকারণে কনো কিচ্ছু করেনা। কিছু না কিছু তো উদ্দেশ্যে আছে, এমন বরদান দেবার জন্য। অমরত্বের বরদান দেবার জন্য, সে আমাদের ডেকে ডেকে নিয়ে গিয়ে সেবা করছে, এটা আমার মানতে কষ্ট হচ্ছে। এমন হতে পারে যে, প্রত্যক্ষ ভাবে, আমরা যা কিছু দেখছি, তাতে আমাদেরই লাভ রয়েছে, কিন্তু পরোক্ষ ভাবে এমন কিছু হচ্ছে, যা আমরা দেখতেও পাচ্ছিনা”।
প্রভাত বললেন, “কল্পনা পুত্র, তামসের মতি কল্পনাতে আচ্ছন্ন হয়ে গেছে রজনী। তুমি নির্বিঘ্নে যাও, সেবা গ্রহণ করো, আর বরদান ধারণ করে নিয়ে চলে এসে অমর হয়ে যাও। আমার মত তুমিও অমরত্বের বরদান লাভ করলে, তবে যদি তামসের মতিভ্রম বিনষ্ট হয়”।
কথা না বাড়িয়ে, রজনী এবার ঊর্ধ্বে গমন করলে, এক একে লোক পেরিয়ে, সে উপস্থিত হলো সর্বশ্রী ধামে। সেখানে উপস্থিত হতে, সর্বাম্বা তাঁকে সাগ্রহে অন্দরে প্রবেশ করিয়ে, ক্ষীরের সাগরের মধ্যে নিজের কুণ্ডলিনী দ্বারা বিছানা স্থাপন করে, রজনীকে বিশ্রাম নিতে বলেন। এই খাতিরদারিতে রজনী একটু ঘাবড়েই যায়। কিন্তু যখন তাঁর চরণের সম্মুখে বসে, স্বয়ং সর্বাম্বা তাঁর চরণ সেবা করতে শুরু করে, তিনি ক্রমশ নিদ্রায় চলে যান।
কতক্ষণ তিনি নিদ্রায় রত ছিলেন, তিনি জানেনও না। কিন্তু যখন নিদ্রা ত্যাগ করলেন, তখন সর্বাম্বাকে দেখলেন যে তিনি তখনও তাঁর চরণ সেবা করে চলেছেন। কি হয়েছে, কেন হচ্ছে, সমস্ত কিছু স্বেচ্ছায় ভুলে গেলেন রজনী, আর গদগদ হয়ে গেলেন, দেবীর নিজের হাতে সেবা লাভ করে। আর যেই মুহূর্তে তিনি গদগদ হয়ে গেলেন, অমনি সম্মুখের বিশুদ্ধদ্বার উন্মোচিত হয়ে যায়।
আর সর্বাম্বা রজনীর উদ্দেশ্যে হাস্যমুখে বললেন, “কি বরদান কামনা করেন আপনি, আদেশ করুন নাথ!”
রজনী স্মরণ করার প্রয়াস করলেন যে কি বরদান তিনি কামনা করবেন, তা ঠিক করে এসেছেন। কিছুক্ষণ সেই উদ্দেশ্যে সময় ব্যয় করতে, তিনি বললেন, “দেবী আমাকে এই বরদান প্রদান করুন যাতে, সমস্ত চেতনা, সমস্ত প্রকৃতি আমার অধীনে স্থিত থাকে। আমি স্বয়ং চেতনা ও প্রকৃতির স্বামী হয়ে, সকলকে আমার ইচ্ছামত কর্মভার প্রদান করতে চাই, আর সেই তালিকায় স্বয়ং প্রকৃতি ও চেতনাও থাকবে”।
সর্বাম্বা হাস্যমুখে বললেন, “তথাস্তু, আজ এই ক্ষণ থেকে, স্বয়ং প্রকৃতি ও চেতনা আপনার দাস হলো। এই অখণ্ড বরদান প্রদান করলাম আপনাকে”।
রজনী আনন্দে গদগদ হলেও, সংশয়ে আবদ্ধ থাকলেন যে, এমন একটি বরদান তাঁকে বিনা তপস্যাতেই প্রদান করা হলো! নিজের ভ্রাতাদের কাছে প্রত্যাবর্তন করে সমস্ত কিছু ব্যক্ত করলে, প্রভাত বললেন, “কি বলেছিলাম না, তোমার সেবা করে, তোমাকে বরদান প্রদান করবে সে! বিশ্বাস হলো?”
রজনী বললেন, “না ভ্রাতা, আমার এখনও বিশ্বাস হচ্ছেনা। এমন একটি বরদানের অর্থ জানো তো তুমি? স্বয়ং প্রকৃতি ও চেতনা আমার দাস হয়ে যাওয়া মানে, স্বয়ং সর্বাম্বাও আমার দাস হয়ে গেল। এবার আমি সমস্ত কিছুর অধিপতি হয়ে উঠলাম। বুঝতে পারছো ভ্রাতা! কি অমোঘ বরদান এটি! এমন বরদান কেউ কেন প্রদান করবে, যাতে সে স্বয়ং আমার দাস হয়ে যায়! … আমারও তো সেই একই সংশয় হচ্ছে, যা তামসের হচ্ছিল। নিশ্চয়ই পরোক্ষে এমন কিছু হচ্ছে, যা আমরা প্রত্যক্ষ করতে পারছি না”।
তামস বললেন, “ভ্রাতা, সে সমস্ত পরের কথা। আগে তো পরখ করে দেখো, সেই বরদান আদপে বরদান নাকি, তা এক নাট্য!”
রজনী তামসের কথাতে সম্মত হয়ে, আশেপাশে সমস্ত কিছুকে আদেশ দিলেন, “আমার ভ্রাতা ও আমাদের উপর এক সহস্র ধরনের ফুলের বর্ষা করো”। এমন বলার সাথে সাথে, সমস্ত প্রকার ফুল তাঁদের উপর বর্ষণ হলে, আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওঠে সমস্ত ভ্রাতা। তামস বলে উঠলেন, “ভ্রাতা, তুমি তো মায়াপতি হয়ে গেছ! তোমার নির্দেশে সেই সমস্ত কিছু হবে, যার ধারণাও কেউ করতে পারবেনা। … একটি কাজ করো না! … একবার বিচারের সেই অসি, কি নাম যেন? অরিনাশী, হ্যাঁ ওইটিকে একবার তোমার হাতে চলে আসতে বলে, ফিরিয়ে দাও”।
রজনী তেমনই করলে, মুহূর্তের মধ্যে তাঁর হাতে অরিনাশী উপস্থিত হলে, তাকে ফিরিয়ে দিতে রজনী প্রশ্ন করলেন, “এমন বিচিত্র ধরনের কাজ করতে বললে কেন তুমি তামস?”
তামস অট্টহাস্য হেসে বললেন, “ভ্রাতা একবার চিন্তা করে দেখো, রণক্ষেত্রে আমাদের উপর কনো কেউ যখন কনো কিছু অস্ত্র দ্বারা প্রহার করতে যাবে, সেই অস্ত্র তোমার হাতে চলে আসবে! ..” এই বলে পুনরায় অট্টহাস্য প্রদান করলে, এবার সকল ভ্রাতা একত্রে অট্টহাস্য প্রদান করে বললেন, “সমস্ত কিছুর নিয়ন্তা তুমি, একমাত্র তুমি রজনী”।
রজনী বললেন, “তামস, এবার তোমার পালা, যাও সমস্ত চিন্তা কল্পনাকে পরের জন্য রেখে দিয়ে, আগে গিয়ে বরদান লাভ করে এসো। আমরা সমস্ত শক্তির অধিকারী হবো। ভ্রাতা সঠিকই বলেছেন, সর্বাম্বা সত্যই মূর্খা, নাহলে কেউ এমন বরদান প্রদান করে যা তাঁকেই পরাস্ত করে দেবে!”
হাসতে হাসতে, তামস বিদায় নিয়ে সর্বাম্বার সন্ধান করতে করতে বিশুদ্ধ পার করে, হিমশীতল শক্তিলোকে প্রবেশ করতে, তামস দেখলেন, সর্বাম্বা তাঁর জন্য দ্বারে এসে অপেক্ষা করছেন। তামস একটু হতবাক হলেও, সর্বাম্বা তাঁকে অসম্ভব সুস্বাদু আহার প্রদান করলে, মহাতৃপ্তিতে মহাভোজ গ্রহণ করালে, তিনি অসম্ভব সুন্দর একটি নিদ্রাতে রত হলেন। নিদ্রার সমাপ্তির শেষে, তিনি সেই তৃপ্তি লাভ করলেন, যা আজ পর্যন্ত কখনো লাভ করেননি। অতিতৃপ্ত হলেন তামস, আর যেন তার তৃপ্তির উপরই নির্ভরশীল ছিল, আজ্ঞার দ্বার। আজ্ঞার দ্বার উন্মোচিত হতেই, সর্বাম্বা হাস্যমুখে বললেন, “নাথ, আপনিও বরদানের কামনা রেখেছিলেন। আজ্ঞা করুন”।
তামস অনেককে পূর্বে বরদানস্বরূপ নিজের দাস করেছেন, কিন্তু এমন ভাবে কখনো কারুকে বরদান প্রদান করেন নি। তাই একটি হতচকিত হয়ে গিয়েই বললেন, “দেবী, যদি বরদান দিতেই চান, তাহলে এই বরদান প্রদান করুন যাতে, আমার প্রতিটি লহুবিন্দু যখন যখন ভূমিতে পতিত হবে, তা আরো একটি আমিতে পরিণত হবে। আর যতক্ষণ আমি সংখ্যায় একের অধিক থাকবো, ততক্ষণ আমার নাশ সম্ভবই হবেনা”।
সর্বাম্বা হাস্যমুখে বললেন, “যথাজ্ঞা নাথ, তাই হোক যা আপনি এক্ষণে বললেন”।
তামস হতবম্বই হতে থাকলেন সমানে, আর সেই হতবাক চিত্ত নিয়েই, প্রত্যাবর্তন করলেন ভ্রাতাদের কাছে, এবং তিন ভ্রাতা, একত্রে এবার উল্লাসে ফেটে পরলেন যে, তাঁরা অক্ষয় হয়ে গেছেন, অমর হয়ে গেছেন। এক প্রকার উল্লাস করতে করতেই, তাঁরা সকলে আত্মের কাছে উপস্থিত হয়ে, সমস্ত কথা ব্যক্ত করলে, আত্মও যে সামান্য হতবাক হলেন না, তেমন নয়।
তিনি ভেবেছিলেন যে কনো না কনো বাহানা করে, তপস্যা করে, তাঁর পুত্ররা বরদান ঠিকই ধারণ করে আসবেন। কিন্তু বিনা তপস্যায়, এই ভাবে আপ্যায়ন লাভ করে বরদান লাভ করবে, তা তো তিনি ভাবতেও পারেন নি। চিন্তা তিনিও যে একদম করেন নি যে, এমন আপ্যায়ন করে বরদান দেবার কারণ, তাও আবার এমন তাঁরই বিনাশসম্ভব বরদান দেবার কারণ কি হতে পারে। কিন্তু চিন্তা করেও কনো উত্তর না পেলে, চিন্তা করা বন্ধ করে উৎসবে পুত্রদের নিয়ে সামিল হলেন।
একাধিক স্ত্রীসম্ভোগে লিপ্ত হলেন সকলে, আর স্ত্রীরা পুরুষ সম্ভোগে। সুরা তথা বিভিন প্রকার মদ্য ধারণ করে, সকলে মাদকে মদ্যপ হয়ে যাওয়া পর্যন্ত আকণ্ঠ হলেন। তিন দিবস ব্যাপী, এমন ভাবেই উল্লাস করে, সকলে নিদ্রা গেলেন।
অন্যদিকে, সর্বাম্বার এমন আচরণে, পঞ্চভাব তথা মহাভাবরাও চমকিত। এমন অদ্ভুত বিচিত্র বরদান কামনা করা হলো যাতে, তাঁরা সর্বাম্বার উপর অধিকার স্থাপনে সক্ষম হয়, আর সর্বাম্বা তাই প্রদান করে গেলেন, তাও তাদের থেকে কনো তপস্যা গ্রহণ না করেই। সকলে নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা করতে থাকলেন, এই বিষয়েই। আর সকলে অন্তে এই সিদ্ধান্তেই উপনীত হলেন যে, সর্বাম্বার লীলা সর্বাম্বাই জানে। কি যে চলছে তাঁর অন্তরে, একমাত্র সে-ই তা জানে, আর কারুর পক্ষে তা উদ্ধার করা সম্ভবই নয়।
কিন্তু পঞ্চভাব এই বলে ক্ষান্ত হতে পারলেন না। তাঁদের রীতিমত দুশ্চিন্তা হতে থাকলো সর্বাম্বাকে নিয়ে। তাই অবশেষে তাঁরা সকলে সর্বাম্বার সম্মুখে উপস্থিত হলেন, তাঁকে এই বিষয়ে প্রশ্ন করার জন্য।
দেবী স্নেহার প্রশ্ন, “পুত্রী, তুমি ভালো করেই জানো যে, ত্রিগুণের এই বরদান গ্রহণের প্রয়াস তোমারই অহিত করার জন্য। তাও তুমি এঁদেরকে বরদান প্রদান করেই চলেছ। এর অন্তরালে তোমার কি লীলা অবস্থান করছে পুত্রী?”
সর্বাম্বা হেসে বললেন, “কর্ম ও কর্মফলের বিজ্ঞান কাজ করছে এখানে মেজমা। যদি আমিই কর্ম কর্মফলের বিজ্ঞান থেকে মুক্ত দেখাই, তাহলে আমার সন্তানরা তা কি করে গ্রহণ করবে? কর্মের ফল যে কর্মকে সম্পন্ন ও সমাপ্ত করে, সেই সত্য কি করে আমার সন্তানরা জানবে যতক্ষণ না সাগ্রহে কর্মফলের বিজ্ঞানকে জেনে না যাবে! মেজমা, কর্মের ফলই যে কর্মকে যথার্থ করে তোলে, এবং আগামী কর্মের মার্গদর্শন প্রদান করে।
কিন্তু আমার সমস্ত সন্তান কর্মের ফল থেকে পলায়নে সদাব্যস্ত থাকে। তাঁদের জননী হয়ে যদি আমিও একই ভাব দেখাই আর দেখাই যে আমি কর্ম ও কর্মের ফল থেকে মুক্ত, তাহলে তারা তো তাঁদের এই পলায়নে উৎসাহ লাভ করবে! মেজমা, কর্ম একটি ধারণা মাত্র, বাস্তব নয়। বাস্তবে কর্ম করা সম্ভবই নয়, কারণ বাস্তবে কনো সাকারত্বই নেই, কেবলই নিরাকারত্ব বিরাজমান, আর যেখানে নিরাকারত্ব, সেখানে কর্ম কি করে থাকতে পারে।
অর্থাৎ কর্ম একটি ভাবনা মাত্র, যার মধ্যে দিয়ে ব্রহ্মাণ্ড অর্থাৎ জীবের অন্তরে বিরাজমান আত্মের ভাব অর্থাৎ চিন্তা, ইচ্ছা, কল্পনা এবং আমার ভাব, অর্থাৎ বিচার, বিবেক ও মেধার প্রকাশ হয়। জীব আত্মের প্রভাবে থাকার কারণে, স্বাভাবিক ভাবেই আত্মের প্রতি আকৃষ্ট এবং তাই চিন্তাশীল, ইচ্ছার দাস এবং কল্পনার কাছে ধরাশায়ী। আর তাই অধিকাংশ কর্মের ভাবনা তাঁরা এই চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনাকে কেন্দ্র করেই করে থাকে। আর কর্মফল তাঁদেরকে তাঁদের এই চয়নের পরিণাম রূপে অনাবিল বেদনার সম্মুখীন করে।
কিন্তু জীব সেই বেদনা থেকে বাঁচতে, পুনরায় কনো ভাবনার দ্বারস্থ হয়, আর আরো এক কর্ম করে, কর্মের ফল থেকে বাঁচার প্রবণতা দেখায়। কিন্তু কর্মরূপ ভাবনার নিষ্পত্তিই যে কর্মফল লাভের সাথে সাথে হয়। তাই পূর্বের কর্মের সমাপ্তি কখনোই ঘটেনা। উপরন্তু একের স্থানে দুটি কর্মের মিলিত কর্মফল প্রস্তুত হয়, এবং তা জটিলতোর হয়ে ওঠে। সেই জটিল কর্মের ফল থেকে মুক্ত হবার ইচ্ছা নিয়ে, জীব পুনরায় কনো কর্মের ভাবনাকে সামনে রাখে, আর এই ভাবে কর্মের ফল দুটির স্থানে তিনটি কর্মের হয়ে যায়।
আর একই ভাবে, জীব একের পর এক কর্ম করতে থাকে, এবং সেই কর্মের ফলস্বরূপ যেই বেদনার সম্মুখীন হতে হয় তাঁদেরকে, তার থেকে বাঁচার জন্য আরো একটি কর্মের ভাবনা রাখে। এমন চলতে চলতে একটি সময় আসন্ন হয় যখন সেই কর্মের ফলের বোঝা এমনই ভারি হয়ে যায় যে, সম্পূর্ণ একটি ব্রহ্মাণ্ডের আয়ুকাল, অর্থাৎ জীবের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্তই তাঁকে বিকলঙ্গতা প্রদান করে। কখনো তা সমস্ত মানসম্মানকে ধুলায় মিশিয়ে দিতে শ্লীলতাহানি রূপে সামনে আসে, কখনো তা ধনলুণ্ঠন রূপে সামনে এসে সর্বহারা করে দেয় জীবকে।
কিন্তু জীব এই বিশ্রী কর্মফলকে কর্মফল রূপে জানতেও পারেনা আর মানতেও পারেনা, উপরন্তু ভাবতে থাকে যে, কেউ অন্তরালে থাকা অদৃষ্ট তাঁদেরকে এমন দুর্দশা প্রদান করেছে, তাঁদের প্রতি অন্যায় করছে, বা ইত্যাদি ইত্যাদি। প্রকৃত সত্য তো এই যে, তাঁরা চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনাকে আঁকড়ে ধরে একাধিক কর্মভাবনা রেখে রেখে, সেই কর্মের ফল থেকে নিজেদেরকে সদা সুরক্ষিত করার প্রয়াস করতে করতে, এমন অবস্থায় কর্মফলকে নিয়ে চলে গেছে যে, তা তাঁদের একটি সম্পূর্ণ ব্রহ্মাণ্ডকালকেই বিকলঙ্গতা প্রদান করেছে, নয়তো তাঁদের শ্লীলতাহানি করে, তাঁদের মান সম্মানকে ধুলায় মিশিয়ে দিয়েছে, নয়তো তাঁদেরকে অনাথ করে দিয়েছে বা সর্বহারা করে দিয়েছে।
কিন্তু যদি সঠিক সময়ে তাঁরা কর্মের ফলকে স্বীকার করে নিতো, তাহলে এই দিন তাঁদেরকে দেখতেই হতো না। কিন্তু সেই কর্মের স্মৃতি তাদের থাকেনা, কারণ ব্রহ্মাণ্ডের পরিবর্তন হওয়ার সাথে সাথে, তাঁদের মধ্যে এই জটিলতা সৃষ্টি করে, আমার বিরুদ্ধে তাঁদেরকে চালিত করার জন্য, আত্ম সমস্ত পূর্বস্মৃতিকে লুপ্ত করে দেয়। তাই তাঁরা জানতেও পারেনা যে তাঁদের এই পরিণতির কারণ অন্য কেউ নয়, কনো অদৃষ্টও নয়, কেবল ও কেবল তাঁদের নিজেদের কৃতকর্ম, যাদের থেকে উৎপন্ন হওয়া কর্মের ফলকে তাঁরা গ্রহণ না করে করে, তাদেরকে এইরূপে সম্মুখে উপস্থিত করেছে।
যদি সঠিক সময়ে কর্মের ফলকে স্বীকার করে নিতো তারা, তাহলে তাদের কর্মের ফলই তাদেরকে বলে দিতো যে তাঁরা চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনার আশ্রয় করে, মহাভ্রান্তি করেছে। তাঁদের উচিত ছিল বিচারকে গ্রহণ করা, চিন্তাকে নয়; তাঁদের উচিত ছিল বিবেককে গ্রহণ করা ইচ্ছাকে নয়; তাঁদের উচিত ছিল মেধাকে গ্রহণ করা কল্পনাকে নয়; তাঁদের উচিত ছিল আত্মকে ভুলে থেকে সকল ব্রহ্মাণ্ডকে আপন জ্ঞান করে, সকলের উদ্ধারের চিন্তা করা, আত্মের প্রসিদ্ধির কথা নয়।
যদি কর্মের ফলকে সঠিক সময়ে ধারণ করে নিতো সে, তাহলে সে বুঝে যেত যে, কর্ম সে কখনোই করেনি, আর কনোদিনও করবে না। যা করেছে সে, তা হলো চিন্তা, ইচ্ছা আর কল্পনা, আর যা করার কর্তব্য ছিল তার, তা ছিল বিচার, বিশ্লেষণ, আরোহণ ও সমর্পণ। তাই সেই পাঠ প্রদান করতে, আমি স্বয়ং কর্মের ফলকে সাগ্রহে স্বীকার করলাম। মাকে দেখে দেখে সন্তান শেখে। তাই তাঁদের সকলের মা কর্মফলকে সাগ্রহে স্বীকার করে, প্রভাতকে সঙ্গীত শ্রবণ করালো, রজনীর পদসেবা করলো, আর তামসকে অন্ন প্রদান করলো।
এই কর্ম আমি পূর্বে করে রেখেছিলাম, তখন আমার বোধ ছিল না যে, আমি মাতা হয়ে সেবা করছি, তখন আমি আত্মের দ্বারা ভ্রমবিস্তারে ভ্রমিত ছিলাম যে, আমি এঁদের ঘরণী হয়ে, এঁদের দাসী হয়ে এদের সেবা করছি, আর এঁরা ভগবান সেজে আমার থেকে সেবা গ্রহণ করছি। আর আজ সজ্ঞানে আমি তাঁদের সেবা করলাম, তাঁদের জননী হয়ে তাদের সেবা করলাম। এটিই আমার কৃত কর্মের ভাবনার ফল, আর তা আমি সাগ্রহে স্বীকার করলাম”।
দেবী জিজ্ঞাসা প্রশ্ন করলেন, “কিন্তু মা, তুই এঁদেরকে যেই বরদান প্রদান করলি, তার কি হবে? প্রভাতের নিধন যার কনো লিঙ্গ আছে, সে করতে পারবেনা। রজনীর নিধন তাঁর কাছেই সম্ভব যার অনুমতি বিনা কনো ব্রহ্মাণ্ড একচুলও নড়তে পারেনা। তামস তো নিজের থেকে অসংখ্য তামস রচনা করতে পারবে! এরা সকলে তো অক্ষয় হয়ে গেল!”
মাতা সর্বাম্বা হেসে বললেন, “বরদান একটি কর্ম বড়মা, একটি ভাবনা, একটি চিন্তা যে আমি অক্ষয় হয়ে গেলাম, একটি কল্পনা যে আমি অজেয়, আর একটি ইচ্ছা যে আমার নাশ অসম্ভব। আমিত্ব বেষ্টিত সমস্ত ভাবনাই যে স্বপ্নবৎ, আর স্বপ্নের নিয়তিই যে ভঙ্গ হওয়া, তাই না! … তাহলে চিন্তিত কেন তোমরা? … ত্রিগুণ স্বপ্নে আবিষ্ট যে, তাঁদের নাশ অসম্ভব হয়ে গেল, কিন্তু তোমরা তো জানো যে, স্বপ্ন সমাপ্ত স্বপ্নভঙ্গতেই সম্ভব। তাই তাঁদেরও একদিন না একদিন স্বপ্ন ভঙ্গ হবেই”।
দেবী সমর্পিতা প্রশ্ন করলেন, “কিন্তু পুত্রী, এই সমস্ত কিছুর অন্তরে নিয়ত তোমার লীলাকে প্রত্যক্ষ করতে চাই আমরা। পুত্রী, যদি কনো ক্রিয়ার অন্তরে নিয়ত তত্ত্বকে অনুধাবন করে তা দর্শন করা হয়, তবেই তা লীলা বা মহিমা হয়, নয়তো তা চমৎকার হয়েই সম্মুখে স্থিত থাকে। … তাই পুত্রী, আমাদেরকে এই সমস্ত কিছুর অন্তরে স্থিত তোমার লীলার কথা বলো। কি দেখাতে চাও তুমি তোমার সমস্ত সন্তানদের?”
সর্বাম্বা হেসে বললেন, “ত্রিগুণের প্রকৃত অস্তিত্ব আত্মসহিত সংযুক্ত, তা দেখাতে চাই, যাতে সকল সন্তানরা আত্মকেন্দ্রিক হওয়া বন্ধ করে, নিজেদেরকে জগতকল্যাণে নিযুক্ত করা শুরু করে। আর অন্যথা, ত্রিগুণের বাস্তবিক প্রবৃত্তি সম্বন্ধে কেউ তো জানেই না। সকলে মেনে বসে আছে যে তাঁরা অসুরদের বরদানে ভূষিত করেন বাধ্য হয়ে। কিন্তু বাস্তব তো এই যে, সেই বরদান তাঁরা প্রদান করেন না, তাঁরা সেই বরদান স্বয়ং সম্ভোগ করেন, এবং সমস্ত আসুরিক চরিত্রের রচয়িতা স্বয়ং তাঁরাই।
তাই আমি আমার সমস্ত সন্তানদের, এঁদের প্রকৃত চরিত্র প্রদর্শন করতে চাই, যাতে তাঁদের মধ্যে এঁদের নিয়ে আর কনো সংশয় না থাকে, যাতে যেই মায়াতে সকল আমার সন্তানরা আবদ্ধ, সেই মায়ার নাশ হয়, এবং সকলে কল্পনাকে ত্যাগ দিয়ে মেধাকে গ্রহণ করে, চিন্তাকে ত্যাগ দিয়ে বিচারকে গ্রহণ করে, আর ইচ্ছাকে ত্যাগ দিয়ে বিশ্লেষণকে গ্রহণ করে, অর্থাৎ বিবেককে গ্রহণ করে।
ছোটমা, কর্মের ফল স্বীকার করলে, আপেক্ষিক ক্ষতি অবশ্যই হয়। মান হানি হয়, অসম্মানিত হতে হয়, কিন্তু এই সমস্ত কিছুর শেষে লব্ধ হয় যথার্থতা। আমিও আমার সন্তানদের তাই দেখাতে চাই যে, দেখো তোমাদের মা, নিজের কর্মের ফল নিজে স্বেচ্ছায় গ্রহণ করে, তাই হয়ে উঠলেন যা সম্বন্ধে তিনি ভুলেই গেছিলেন। তাই, তোমরাও তোমাদের কর্মের ফল থেকে পালিয়ে না গিয়ে, তাকে স্বীকার করো। তবেই, যথার্থ ভাবে নিজেদের স্বরূপের সম্মুখীন হতে পারবে, না হলে, চিরটাকাল নিজেদেরকে আত্ম আত্ম জ্ঞান করতে থাকবে, আর আত্মের দাস হয়েই বন্দী হয়েই থেকে যাবে”।
বিশ্বাস প্রশ্ন করলেন, “কিন্তু মা, আমার কাছে একটি ব্যাপার পরিষ্কার নয়। জীবনের সম্মুখে দুটি গাঁট, একটি আত্মের গাঁট, আর একটি তোমার গাঁট। কেউ কেন আত্মের গাঁটকে উপেক্ষা করে, তোমার গাঁটকে স্বীকার করতে পারেনা! … কেন সকলে, এমনকি যারা তোমার কাছে সমর্পণও করেন, তাঁরাও তোমাকে গ্রহণ করার পূর্বে, আত্মকে গ্রহণ করে? এর অন্তরে থাকা রহস্য কি?”
সর্বাম্বা হাস্য প্রদান করে বললেন, “পিতা, সঠিক বলেছ তুমি, সৃষ্টিতে দুটিই গাঁট আছে, একটি আমার গাঁট, আর একটি আত্মের গাঁট। এই দুই গাঁটের যেকোনো একটিতে সকল জীব আবদ্ধ থাকে, আর অধিকাংশ আত্মের গাঁটেই আবদ্ধ থাকে। আর এর একটিই মূল কারণ, আর তা হলো আত্ম জীবের হৃদয়ের সকাশে আমাকে আচ্ছন্ন করে অবস্থান করে। আর তাই জীব আমার গাঁটকে দেখতেও পায়না, ঠিক যেমন বাদলের আড়ালে থাকা সূর্যকে কেউ দেখতে পায়না।
তবে জীব যখন নূতন ব্রহ্মাণ্ড রচনা করে তাতে সদ্যসদ্য অবস্থান করা শুরু করে, তখন আমার গাঁটই প্রত্যক্ষ হয় তাঁর কাছে। আত্মের গাঁট তখন নূতন করে নিজেকে গুছিয়ে নেওয়া শুরু করে, তাই তাঁর সম্মুখে আসতে সময় লাগে। সদ্যজন্মা শিশু তাই পবিত্র হয়, তাঁর মধ্যে আত্মবোধ প্রখর থাকেনা, তারা আবেগ ঘনও হয়না, রিপু বা পাশে আবদ্ধও থাকেনা, আর সঙ্গে সঙ্গে তারা কেউই চিন্তা, ইচ্ছা বা কল্পনার মধ্যে আবদ্ধও থাকেনা।
কিন্তু আত্ম ক্রমশ নিজকে গুছিয়ে নিয়ে, সমস্ত আবেগ, সমস্ত চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনাকে সঙ্গে নিয়ে সম্মুখে এসে উপস্থিত হয় সেই শিশু যখন শৈশব ত্যাগ করে কৈশোরের পথে যাত্রা করে। হ্যাঁ, আশেপাশের সমস্ত জীব অর্থাৎ স্থাপিত ব্রহ্মাণ্ডরাও তাঁদেরকে আত্মকে গ্রহণ করার জন্য অনুপ্রেরণা প্রদান করতে থাকে। তাই অন্তরে বাইরে সেই আকর্ষণ তাঁকে ক্রমশ আত্মকেন্দ্রিক করা শুরু করে দেয়।
ক্রমশ সে নিজেকে নিয়ে নিজে উলমালা হতে শুরু করে। নিজের ভালো থাকা, নিজের ভালো লাগা, নিজের ইচ্ছা, নিজের ইচ্ছা, নিজের জীবনকে কি মর্যাদা প্রদান করতে চায়, সকল ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে নিজেকে শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করতে চায়, ইত্যাদি ইত্যাদি। আসলে পিতা, শিশু যখন কৈশোরের পথে যাত্রা করা শুরু করে, তখন সে চিন্তা করবে না বিচার করবে, সেই দ্বন্ধে থাকে; ইচ্ছা করবে না বিশ্লেষণ করবে, সেই দ্বন্ধে থাকে; কল্পনা করবে না পারিপার্শ্বিক জগতকে প্রত্যক্ষ করে ধারণ করবে, সেই দ্বন্ধে থাকে।
আর ঠিক এই সময়েই, আত্মের শ্লাঘাতে পরিপূর্ণ, সেই ব্রহ্মাণ্ডের আশেপাশে বিরাজ করা সমস্ত ব্রহ্মাণ্ড তাঁকে প্রেরণা প্রদান করা শুরু করে যাতে, সেই বিচার আর চিন্তার মধ্যে চিন্তাকেই বেছে নেয়। কারণ রূপে তাঁর সম্মুখে এই তত্ত্ব প্রদর্শন করে যে, বিচার করার কালে স্বয়ং-এর কনো স্থান থাকেনা। সে যদি স্বয়ংএর চিন্তা না করে, তাহলে তাঁর চিন্তা কে করবে। এমন ভাবধারাকে ধারণ করে, সেই কিশোর বা কিশোরী বিচারকে ত্যাগ করে চিন্তাকেই গ্রহণ করে।
একই ভাবে, বিবেক তাঁর সম্মুখে যেই বিশ্লেষণ স্থাপন করে, সেখানে তাঁর নিজের অস্তিত্ব থাকেনা। আত্মদাস সমস্ত ব্রহ্মাণ্ড তাঁকে প্রেরণা প্রদান করে বলে যে, তোমার ইচ্ছাই তোমাকে অগ্রসর করবে। জগতের বিশ্লেষণ করে কি হবে, তাতে তুমি কি করে সুখী হবে! তুমি ইচ্ছা করবে, আর সেই ইচ্ছা পুড়ন হবে, তবেই না সুখলাভ। তাই শিশু কিশোর হবার কালে, বিবেকের পরিত্যাগ করে ইচ্ছাকে গ্রহণ করে।
একই ভাবে, মেধা শিশুকে বিচার ও বিশ্লেষণ দুইকেই ধারণ করতে শেখায়, আর শেখায় যে সুখ বা দুঃখ দুইই আসে চিন্তা ও ইচ্ছার কারণে। ইচ্ছা পুড়ন হলেই সুখ, আর পুড়ন না হলেই দুঃখ। চিন্তা ইচ্ছাকে পূর্ণ করতে পারলেই সুখ, আর না করতে পারলেই বেদনা। তাই আত্মগ্রস্ত ব্রহ্মাণ্ডরা প্রেরণা দিতে থাকে সেই কিশোর ও কিশোরীকে যাতে সে চিন্তা বা ইচ্ছাকেই গ্রহণ করে, সেই চিন্তা ও ইচ্ছাদ্বারা নিজের ব্রহ্মাণ্ডকে নিজেই সাজানোর প্রয়াস করে কল্পনা করে, এবং মেধাকে অস্বীকার করে, যা তাঁদেরকে সুখদুঃখের থেকে মুক্ত করে দিতে চায়।
এত বলে প্রেরণা প্রদান করেই ক্ষান্ত হয়না আত্ম। সে নিজের দিকে সেই ব্রহ্মাণ্ডকে আকৃষ্ট করে রাখার জন্য তাঁর সম্মুখে অঢেল প্রশংসা এনে স্থাপন করে। অজ্ঞানতাকে জ্ঞানরূপে ধারণ করলেই, জ্ঞানী হবার প্রশংসা প্রদান করে। অন্য ব্রহ্মাণ্ডদের প্রতি দ্বেষ ভাবাপন্ন হয়ে, তাদেরকে পরাস্ত, পর্যুদস্ত ও পরাভূত করলেই প্রশংসা এনে দেয়। আর সেই প্রশংসার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে, আরো আরো ভাবে সেই প্রশংসা অর্জন করার জন্য প্রায় সমস্ত ব্রহ্মাণ্ড সেই উদ্দেশ্যে ধাবিত হয়। আর ক্রমশ তারা এই ভাবে আত্মের দাস হয়ে উঠে, আত্মের গাঁটে নিজেদের আবদ্ধ করে ফেলে।
পিতা, অতি মুষ্টিমেয় জীব থাকেন, যারা এই প্রশংসা অর্জনে খুশী হতে পারেন না। তাঁদের কাছে এমন বোধ হয় যে, যা ধারণ করলাম তা তো জ্ঞানই নয়, যদি জ্ঞান হতো তাহলে তো আমাদের জননীকে, অর্থাৎ আমাকে প্রত্যক্ষ করতে পারতাম। কই তা তো পারলাম না! তাহিলে জ্ঞানী হবার শ্রেয় কেন দেওয়া হচ্ছে আমাকে! … যদি প্রতিহিংসা, প্রতিদ্বন্ধিতা বা পরাস্ত ও পরাভূত করাই কাম্য হতো, তাহলে তো শান্তি লাভ করতাম। আমি অশান্ত হয়ে রইলাম কেন? কেন একটি জয়লাভ আমাকে এই বোধ করাচ্ছে যে আমার বহুতর জয়লাভ করা বাকি! … তাহলে কি এই সমস্ত প্রশংসা ভুয়ো? সমস্তই আমাকে উৎসাহ প্রদান করার জন্য?
কে এই উৎসাহ প্রদান করছে? কে আমাকে আমার মাতার থেকে অপসারিত করার প্রয়াস করছে? কে আমাকে সত্য থেকে অপসারিত করে কল্পনার মধ্যে স্থাপিত করার প্রয়াস করছে? কে আমাকে অসত্যের মধ্যে স্নান করাতে চাইছে? যেই চাক, আমি সেই কর্মের শ্রেয় গ্রহণ করতে পারবো না, যা আমি করি নি। জ্ঞান আমি অর্জনই করিনি, তাহলে জ্ঞানীই বা হলাম কি করে, আর যদি জ্ঞান অর্জন নাই করে থাকি, তাহলে কৃতি ছাত্রই বা হলাম কি করে!
যদি শান্তিই না পাই, তাহলে সুকর্ম করেছি, এই মান্যতা গ্রহণ অপযশকে স্বীকার করার সমান। যশ না লাভ করতে পারি তাও ভালো, কিন্তু অপযশ হলাহল সম। আমি তা বর্জন করলাম। পিতা, যার মধ্যে এই চেতনা জাগ্রত হয়, সে আসলে আত্মের বিরোধিতা করে, আত্মের সাথে সংঘাতে লিপ্ত হয়ে ওঠে, অর্থাৎ যেই গাঁট তাঁকে এতকাল আকর্ষণ করার প্রয়াস করেছিল, যেই গাঁট সকলকে নিজের দিকে আকর্ষণ করে রেখে দিয়েছে, সেই গাঁটকে উপেক্ষা করে। যেই গাঁট আমার উপর আচ্ছাদন রূপে স্থিত থেকে, আমাকে আমার সমস্ত সম্নতানের কাছে অদৃশ্য ও অদৃষ্ট করে রেখে দিয়েছিল, সেই গাঁটকে, সেই পর্দাকে পরিত্যাগ করার আবাহন হয় সেটি।
এমন ভুলেও ভাববেন না যে আত্ম এত সহজে তাঁকে মুক্ত করে দেয়। এতকাল অহেতুক প্রশংসা প্রদান করে, তাঁকে উত্তেজিত ও ধনাত্মক ভাবে আকর্ষণ করার প্রয়াস করেছে। এবার শুরু হয় ঋণাত্মক আকর্ষণ পর্ব। অহেতুক প্রশংসা লাভ করেছে সে এতদিন, অজ্ঞানী থেকেও জ্ঞানী হবার প্রশংসা লাভ করেছে, অজ্ঞানী হবার পাঠ্য গ্রহণ করেও কৃতি ছাত্র হবার প্রশংসা লাভ করেছে। অপরকে আপন না করে, বিদ্বেষ প্রদর্শন করে, তাঁর সাথে প্রতিদ্বন্ধিতা করেও প্রশংসা লাভ করেছে।
এবার ঠিক বিপরীত ভাবে, তাকে অহেতুক অসম্মানের সম্মুখীন করা শুরু করে আত্ম। অহেতুক অন্য ব্রহ্মাণ্ডরা তাঁকে গালমন্দ করা শুরু করে, আর এই বোঝাতে থাকে যে, যদি সে অজ্ঞানতাকেই জ্ঞান রূপে স্বীকার না করে, তবে তাঁর জীবন এমনই হয়ে উঠবে যে সকলে তাঁকে গালমন্দ করতে থাকবে। কনো কর্ম না করলেও, কনো কিচ্ছু না করলেও তাঁকে গালমন্দ করা হয়। প্রতিদ্বন্ধিতা থেকে মুক্ত থাকার জন্য গালমন্দ করা হয় তাকে, কারুর প্রতি দ্বেষ না থাকার জন্য গালমন্দ করা হয়।
আমিষ-নিরামিষে ভেদ না করার জন্য গাল দেওয়া হয়। ব্রাহ্মণ-অব্রাহ্মণে ভেদ না করার জন্য গাল দেওয়া হয়। ধনি ও নির্ধনের মধ্যে ভেদ না করার জন্য গাল দাওয়া হয়। পুরুষ ও স্ত্রীর মধ্যে ভেদ না করার জন্য গাল দাওয়া হয়। স্ত্রীকে মাতৃত্বের জন্য সম্মান প্রদর্শন করলে, তাঁকে প্রহসনের পাত্র করে দেওয়া হয়। ইত্যাদি এইরূপ বিভিন্ন ভাবে, যা যা ভাব রাখলে আত্মের শ্লাঘা থেকে মুক্ত হয়ে যায় ব্রহ্মাণ্ড, সেই সমস্ত ক্রিয়ার মধ্যে আবিষ্ট হলে, আত্মগ্রস্ত সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডরা হয় তাঁকে গাল দেয়, নয় তাঁকে নিয়ে প্রহসন করে, কিছু কিছু সময়ে তাঁর প্রহরণের ব্যবস্থাও করে।
যেই গুটিকতক ব্রহ্মাণ্ড বা জীব, আত্মের গাঁটকে ত্যাগ করতে সচেষ্ট হয়, তাঁদের মধ্যেও বেশ কিছু জীব, আত্মের এই ঋণাত্মক শ্লাঘার কারণে ব্যতিব্যাস্ত হয়ে, পুনরায় আত্মের গাঁটকেই স্বীকার করে নেয়। যারা তখনও আত্মের গাঁটকে স্বীকার করেনা, চিন্তা, ইচ্ছা বা কল্পনার ধাত ধারে না, অকারণে নিন্দা স্বীকার করে নিলেও , অকারণে প্রশংসা স্বীকারে অনীহাগ্রস্তই থাকে, তাঁরা এবার আমার গাঁটকে দেখতে পায়, যা এতকাল আত্মের গাঁটের আচ্ছাদনে আচ্ছাদিত ছিল।
আমার গাঁটে থাকে বিচার, বিবেক অর্থাৎ বিশ্লেষণ, বৈরাগ্য অর্থাৎ মেধার পরিপূরক, এবং সমস্ত ভাব। সেই সমস্ত গাঁটকে সেই জীব গ্রহণ করে হয়ে ওঠেন সাধু, আর সে আত্মত্যাগী হয়ে, সমস্ত স্বপ্ন ত্যাগ করে, বাস্তবে অর্থাৎ আমার কাছে প্রত্যাবর্তন করা শুরু করে”।
দেবী মমতা প্রশ্ন করলেন, “আচ্ছা সর্ব্বা, এই যে সমস্ত ত্রিগুণ এমন বরদান কামনা করে, তা গ্রহণ করলো তোর থেকে, এর কারণ কি? এর উদ্দেশ্য কি? এই সমস্ত কি কনো যোজনার অন্তর্গত?”
সর্বাম্বা হেসে বললেন, “বলতে পারো এই সমস্ত কিছুই তাঁদের একটি যোজনার অন্তর্গত, আবার বলতে পারো যে তাঁরা যোজনার নির্মাণ করার জন্যই এই বরদান ধারণ করলো। তবে আমাকে যদি নিরপেক্ষ ভাবে এই সম্বন্ধে বলতে বলো, তাহলে আমি একটিই কথা বলবো তোমাদেরকে সেজমা। তা হলো এই যে, তারা সকলেই আমার যোজনা অনুসারে সমস্ত ক্রিয়া করলো।
বিচার করে দেখো, আমাদের আজ্ঞার দ্বার খুলতে হতো, আর তা সম্ভব তখনই হতো যখন আমি আমার কর্মফল গ্রহণ করে ত্রিগুণের সেবা করতাম। আর তাই মহাশ্বেতা হয়ে প্রভাতকে সঙ্গীত দ্বারা সেবা করে, অনাহতদ্বার উন্মোচিত করালাম; সর্বশ্রী হয়ে রজনীর পদসেবা করে, তাঁকে তৃপ্ত করে, বিশুদ্ধ দ্বার উন্মোচন করালাম; আর অন্নদান করে, তামসকে তৃপ্ত করে, তাঁকে দিয়ে আজ্ঞার দ্বার খুলিয়ে অন্নদা হলাম”।
