সর্বাম্বা কাণ্ড (কৃতান্ত প্রথম কাণ্ড)

সর্বাম্বার দেওয়া শিক্ষাকে ধারণ করে, পিঙ্গলার মধ্যে এক নূতন ব্রহ্মপুর জেগে উঠতে শুরু করলে, আত্মের কাছে ত্রিছায়াদেবী উপস্থিত হয়ে প্রশ্ন করলেন, “নাথ, এবার তো আপনার সর্বাম্বার সামনে যাওয়া উচিত লোকেশ বেশে। সুষুম্নার মধ্যে এবার তো প্রবেশ করবেন, তাই না!”

আত্ম হুংকারমিশ্রিত হাস্য হেসে বললেন, “না দেবী, যোজনার পরিবর্তন আবশ্যক হয়ে গেছে। গুরুপত্নী রূপে দেবী রুচির, ও শিষ্যারূপে দেবী স্ফীতি ও বিচিত্রার তেমন জমেনি। আপনারা আপনাদের উদ্দেশ্যে সফল হননি। এর অর্থ, সেই যোজনাতে আমরা সাফল্য পাবো না”।

দেবী চিন্তা বললেন, “তাহলে এখন কি করা উচিত আমাদের?”

আত্ম বললেন, “অনেক গুলি গণিত আমার মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে দেবী। প্রথম তো সর্বাম্বার নিজেকে পরাচেতনা রূপে জেনে যাওয়া। এর ফলে তো সে আমাকে দেখা মাত্রই চিনে যাবে, যেই ভেকই আমি ধরি না কেন। দ্বিতীয় হলো সর্বাম্বার সাথে ঘনিষ্ঠতা অত্যধিক ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, ভাবসমূহদের। সেটিকে প্রেমার দুর্বলতাই বলা যেতে পারে। আর তৃতীয়, আমার পুত্রদেরকে এখানে প্রবেশ করানো। এর তো কনো একটি মার্গ হবে”।

দেবী কল্পনা বললেন, “কিন্তু পুত্ররা তো প্রবেশ করতেই পারলো না এখানে!”

আত্ম বললেন, “সে তো ঊর্ধ্বমার্গ ধরে তারা প্রবেশে ব্যর্থ হয়েছে, নিম্নমার্গ দিয়ে!”

দেবী কল্পনা বললেন, “নাথ, যখন মেধাকে নিয়ে মহাভাবরা এই পিঙ্গলাতে প্রবেশ করেছিলেন, তখন তো নিম্নমার্গ দিয়েই প্রবেশ করেছিলেন তাঁরা। আমাদের পুত্ররা তো হাজার প্রয়াস করেও তখন নিম্নমার্গ দিয়ে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়নি!”

আত্ম উত্তরে মাথা নেড়ে বললেন, “সঠিক কথা। সেই কথা আমারও স্মরণ আছে দেবী। কিন্তু সুষুম্নার দ্বার খোলা হয়ে গেলে, তখন যে গণিতটা পালটে যাবেনা, তা নিশ্চয় করে বলা সম্ভব!”

দেবী কল্পনা প্রশ্ন করলেন, “মহারাজ, আপনি ঠিক কি করতে চাইছেন, আমাদের একটু খোলসা করে বলবেন। আমরা দ্বন্ধেও রয়েছি, আর চিন্তিতও। সর্বাম্বার জাগরণ, এ আমাদের অস্তিত্বের উপর প্রশ্নচিহ্ন দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। আমরা নিশ্চিত যে, আপনি কনো না কনো উপায় করেছেন, কিন্তু সেটি ঠিক কি? লোকেশ হয়ে সামনেও যাবেন না বলছেন, আবার সুষুম্নার খোলার কথাও বলছেন, কি যোজনা করেছেন আপনি?”

আত্ম মুচকি হেসে বললেন, “দেবী, একবার আমি আমার পুত্র, পৌত্র ও পৌত্রীদের সাথে সাখ্যাত করতে পিঙ্গলার বাইরে যাবো, এমনই স্থির করেছি। আর আশা করছি যে, ফিরে এসে, আমি সুষুম্নার দ্বার উন্মুক্তই পাবো। তাই সেখান দিয়ে প্রবেশও অনায়সেই করতে পারবো”।

দেবী ইচ্ছা উৎকণ্ঠার সাথে বলে উঠলেন, “কিন্তু কি করে?”

আত্ম বিদ্রূপের হাস্য হেসে বললেন, “আমি এখানে না থাকাকালীন কিছু রাক্ষস মানসের প্রজাদের উত্তপ্ত করবে। হ্যাঁ কিছুকে অবশ্যই মহাভাবরা হত্যা করবে, কিন্তু সর্বাম্বার উদ্যোগে, সেই রাক্ষসদের উৎসস্থল জানার চেষ্টা হবেই আর সেই উৎসস্থল বলা হবে সুষুম্নার অন্তরে। তাই সর্বাম্বা অবশ্যই সুষুম্নার দ্বার খুলে, তাতে প্রবেশ করবে”।

দেবী চিন্তা বললেন, “আর আপনি পরে এসে উন্মুক্ত সুষুম্নাতে প্রবেশ করে যাবেন। কিন্তু মহারাজ, যদি সর্বাম্বা আপনার পূর্বেই, সেই সমস্ত ধন ও শক্তি, যা সুষুম্নার অন্তরে স্থিত, তা ধারণ করে নেয় তো!”

আত্ম হেসে বললেন, “সর্বাম্বার প্রতি স্নেহের টানের কারণে, পঞ্চভাব আর মহাভাব বা পঞ্চভূতরা, কেউই সর্বাম্বাকে একাকী ছাড়বেনা। সর্বাম্বা একটু একটু করে প্রবেশ করবে সুষুম্নাতে, আর আমি তাঁর আপনজনদের ভয়ার্ত ও বিরক্ত করতে থাকবো, বিবিধ শক্তিশালী দানবদের দিয়ে, আর সর্বাম্বা যখন সেই শক্তিশালীদের নিধনে নিযুক্ত হবে, তখন আমি সেখানের সমস্ত সম্পদ ও শক্তি ধারণ করে নেব। …

আর যখন সর্বাম্বা সুষুম্নার সমস্ত দ্বার উন্মোচিত করে দেবে, তখন আমার পুত্রদের, পৌত্র ও পৌত্রীদের ডেকে এনে, সুষুম্নার মধ্যেই তারা সর্বাম্বার পরিবারকে নষ্ট করে দেবে, আর আমি সমস্ত শক্তি ধারণ করে নিয়ে, সর্বশক্তিমান হয়ে সর্বাম্বাকেও বিনষ্ট করে দেব। দেবীরা, আমার বিশ্বাস যে, সুষুম্নার দ্বার খুললেই নিম্নদেশ থেকে আমার পুত্র, পৌত্র ও পৌত্রী, সকলে প্রবেশ করতে পারবে। তাই তো আমি বাইরে যাচ্ছি, তাদেরকে সেই বার্তা প্রদান করতে”।

ছায়াদেবীরা সন্তুষ্ট হলেন, আত্মের যোজনাতে। তাই আত্মও নিজের যোজনা মত কাজ করতে, নিজের থেকে কিছু হিংস্র রাক্ষসকে নির্মাণ করে, তাদেরকে যোজনা বুঝিয়ে, পিঙ্গলার বাইরে, নিজের পুত্র, পৌত্র ও পৌত্রীদের সাথে সাখ্যাত করতে চলে গেলেন। সেখানে গিয়ে তাদের সমস্ত কথা বুঝিয়ে বলে আসলে, তাঁরা সমস্ত অস্ত্রশস্ত্র দ্বারা সুসজ্জিত হয়ে, চন্দ্রপুরের দক্ষিণের সাগরের যেই স্থান দিয়ে মহাভাবরা মেধা, শিখা ও বেগবতীকে নিয়ে প্রবেশ করেছিলেন, সেই স্থানে উপস্থিত হওয়া শুরু করলেন, আর আত্ম প্রত্যাবর্তন করলেন পিঙ্গলাতে।

এরই মধ্যে, যেই যোজনা স্থির করে গেছিলেন আত্ম, তেমন ভাবেই তাঁর নিজের থেকে উদ্ভূত রাক্ষসগণ কৃত্য করেছিল, তবে আত্ম’র পরিকল্পনার মধ্যে যে মহাভাবদের কলুষিত করাও ছিল তা হলো না। রাক্ষসরা যখন সমস্ত মানসের প্রজাদের আক্রমণ করে, তখন মহাভাবরা সেই আক্রমণের উত্তর দিতে, অস্ত্র ধারণও করেছিল। বিচার ধারণ করেছিল তাঁর মহাতরবারি, যার নাম অরিনাশী, যেই খড়গ একবার নির্গত হলে, শত্রুর নাশ না করে তা পুনরায় নিজস্থানে প্রত্যাবর্তন করতো না।

বিবেক ধারণ করেছিল তাঁর প্রচণ্ড শক্তিশালী নিপাশ অস্ত্র, যা সমস্ত প্রকার পাশের নাশ করতে সক্ষম। আর বৈরাগ্য ধারণ করেছিল তাঁর প্রচণ্ড ত্রিগুণ বিনাশী, ত্রিমার অস্ত্র। কিন্তু তা প্রয়োগের ঠিক পূর্বে, সেখানে এসে সর্বাম্বা উপস্থিত হয়ে বলেন, “কি করতে চলেছ তোমরা! আত্ম চায়, তোমরা বিনাদ্বন্ধে কারুকে হত্যা করে কলুষিত হও। কারণ একবার তা করে ফেললে, তারা আমার উপর লাঞ্ছন স্থাপন করতে পারবে যে, আমি নিরীহের হত্যাকারীকে সমর্থন করি, আর তোমাদেরকে আমার রক্ষাকবচ থেকে মুক্ত করে, আত্ম তোমাদের হত্যা করতে চায়। … তাঁর চক্রান্তে পদস্খলন করে, কেন নিজেদেরকে বিচ্ছিন্ন  করতে চলেছ?”

বৈরাগ্য বললেন, “তাহলে আমাদের কি করনীয় পুত্রী? এই রাক্ষসরা যে আমাদের প্রজাদের বিরক্ত করতেই এখানে এসেছে”। উচাটন হয়ে মানস ভীত ও সন্ত্রস্ত হয়ে বললেন, “আত্ম এখানে কি করে প্রবেশ করলো?”

সর্বাম্বা হাস্যমুখে উত্তর দিলেন, “সেদিনকেই, যেদিনকে আমার মাতাপিতারা আপনাদের উদ্ধার করতে গিয়েছিলেন। মাতামহ, আমার মাতাপিতাদের আপনাদের নির্বিঘ্নে উদ্ধার করতেই দিয়েছিলেন আত্ম, যাতে সে তাঁদের প্রত্যাবর্তনের পথকে দেখতে পায়। আর তার পরে পরেই, তিনি তাঁর তিন পত্নীদের নিয়ে এখানে প্রবেশ করেন। হয়তো আপনারা খেয়াল করেন নি, কিন্তু স্মরণ করে একবার দেখুন, যেই তিন দেবী এসেছিলেন আমাকে আপনাদের থেকে অপসারিত করতে, তাঁরা আমাকে দেখামাত্রই, কি ভাবে প্রতিক্রিয়া প্রদান করেছিলেন। কিছু কি স্মরণ আছে, সেই একই ভাবে কারা কাকে দেখে প্রতিক্রিয়া দিতেন?”

মানস স্মৃতিচারণ করে বললেন, “হ্যাঁ, ছায়াদেবীরা মাতাকে, মানে দেবী ব্রহ্মময়ীকে দেখে ঠিক একই ভাবে প্রতিক্রিয়া দিতেন। … এর অর্থ, সেই তিন স্ত্রী ছায়াদেবী ছিলেন! … আর এঁরা সকলে… পুত্রী, এখানে কে কে আছে? আত্মের পুত্ররা, পৌত্ররা আর পৌত্রীরাও কি আছে?”

সর্বাম্বা মাথা নেড়ে বললেন, “না, কেবল আত্ম আর আত্মের পত্নীরা আছেন আপাতত”।

ধরা বলে উঠলেন, “তাহলে তো তাঁদের এখনি আক্রমণ করে, বিনাশ করা যেতে পারে। সমস্ত কিছুর সমাধান হয়ে যাবে তাহলে!”

সর্বাম্বা উত্তরে হেসে বললেন, “না মাতামহী, সমস্ত সমস্যার সমাধান হবেনা এতে। আত্মের পুত্ররা তখনও বেঁচে থাকবে, আর তার থেকেও বড় কথা, সেই পুত্ররা আত্মের বিভিন্ন বিশ্বস্তদের কাছে, আত্মের সাথে করা ষড়যন্ত্রের বাখান করে করে, তাঁকে ভগবান করে দেবে। … তাই আমাদের অপেক্ষা করতে হবে, আর আত্মের সমস্ত বিশ্বস্তদের প্রথমে তার থেকে পৃথক করে দিতে হবে। সমস্ত আত্মপরিবারকে এখানে টেনে এনে, তাঁদের সমূলে উৎপাটিত করতে হবে। তবে তার জন্য, আত্মের যোজনা জানতে হবে আমাদের। তাই, এঁদেরকে বন্দী করো, এঁরা সেই যোজনার কথা বলবে”।

মানস বললেন, “কিন্তু এরা যোজনার কথা বলবে কেন?”

সর্বাম্বা হেসে বললেন, “যোজনার দুটি প্রান্ত থাকে মাতামহ, একটি সেই প্রান্ত যেই প্রান্ত থেকে যোজনা করা হয়েছে, আর দ্বিতীয়টি সেই প্রান্ত যেই প্রান্তের উদ্দেশ্যে যোজনা করা হয়েছে। সেই দ্বিতীয় প্রান্ত আমি মাতামহ, আর তাই এঁরা এসেছে, আত্মের নির্দেশ অনুসারে, যাতে সেই দ্বিতীয়প্রান্তকে টেনে আনা যায় সেই যোজনার মধ্যে। এঁদেরকে বন্দী করলে, এঁরা সেই যোজনার মধ্যে প্রবেশের দ্বার বলে দেবে। তারপর আমি সেখানে যাবো”।

দেবী জিজ্ঞাসা উচাটন হয়ে বলে উঠলেন, “না পুত্রী, তুমি একাকী সেখানে যাবেনা। … আমরা সকল মাতা ও তোমার পিতা তোমার সাথে যাবো। আত্ম অতি ভয়ানক, একাকী তোমাকে তাঁর মুখে আমরা ঠেলে দিতে পারবো না”।

বৈরাগ্য বললেন, “পুত্রী, আমরা তিন মহাভাব সর্ব্বার সাথে যাবো। তোমরা সেখানে গেলে, আত্ম সর্ব্বাকে বারংবার বিপদে ফেলতে পারবে”।

দেবী সমর্পিতা বললেন, “বিপদে ফেললে, সর্ব্বা আর আপনারা আমাদের ঠিকই রক্ষা করবেন পিতা। কিন্তু এখানে একাকী থাকলে, সর্ব্বার জন্য দুশ্চিন্তা করে করেই আমরা শেষ হয়ে যাবো। সর্ব্বা, আমাদের উপর কৃপা করো”।

প্রেমা হেসে বললেন, “তোমরা আমার মা, তোমরা আমাকে আদেশ দেবে। আর আমি সেই আদেশের পালন করবো। এতে কনো দ্বন্ধ নেই। যখন তোমরা আদেশ দিয়েছ, তোমাদের নিয়ে যাবার, তখন নিশ্চিত থাকো, যেখানে গেলে যোজনার মধ্যে অংশগ্রহণ করা যাবে, সেখানে আমার সাথে সাথে তোমরাও যাবে। আপাতত চলো, যাদেরকে আত্ম পাঠিয়েছে, তাদের সাথে আলাপ করে আসি। অস্ত্র ত্যাগ করো। এখনো অস্ত্রের প্রয়োজন আসেনি, বিশ্বাস করো আমায় পিতারা। আমার সাথে চলো, অসীম আনন্দ হবে, দেখো”।

সর্বাম্বার কথাতে সকলে অস্ত্র ত্যাগ করলে, সর্বাম্বার সাথে আত্মের প্রেরিত দূতদের উদ্দেশ্যে গেলে, প্রথমেই তাঁরা একটু সন্ত্রস্ত হয়ে উঠলেন। অতঃপরে তাঁরা দেখলেন, সর্বাম্বার একটি পশ্য বিল্লিকা দেবী সর্ব্বার পথে এসে, দেবী প্রেমার দিকে দুই বাহু তুলে, দণ্ডায়মান রইলে, সর্ব্বাম্বা নতজানু হয়ে, তাঁকে আলিঙ্গন প্রদান করলে, সেই বিল্লিকা, নিজের তনুকে দেবীর সর্বাঙ্গে ঘর্ষণ করিয়ে, তাঁকে মুক্ত করে পথের অন্য দিকে চলে গেল। সেই দেখে আত্মের দূতরা বলাবলি করে উঠলেন, “এই রে! বিড়াল পথ কেটেছে, এবার তো এঁদের বিপদ কেউ আটকাতে পারবেনা!”

এঁদেরই মধ্যে একজন বলে উঠলেন, “এই তোমরা কি শুদ্ধ বস্ত্রে আছো? নাহলে দেখো আমাদের ছোবে না, আমরা অপবিত্র হয়ে যাবো!”

সর্বাম্বা সেই কথাতে হেসে খুন হয়ে গিয়ে বললেন, “ওরে এই হতভাগা, নিজের খোলটা একবার দেখ ভালো করে, এতে তো মূত্র বিষ্ঠার বন্যা বয়ে যাচ্ছে! তোদের বাহ্যিক বস্ত্রের শুদ্ধতা নিয়ে চিন্তা, নিজেরা যেই বস্ত্র ধারণ করে রয়েছিস, সেই শরীরের দিকে তো একবার তাকিয়ে দ্যাখ!”

সেই কথাতে সকলে হেসে লুটোপুটি খেলে, সকলে নিজের নিজের তনুর দিকে লজ্জায় তাকালে দেখলেন, তাঁদের সকলের তনু বিষ্ঠা, মূত্র, ও পুঁজে পরিপূর্ণ। নিজেদের এমন গলিত ও অশুদ্ধ তনু দেখে, নিজেরাই ঘৃণা অনুভব করে, একে অপরের থেকে পৃথক করে নিতে শুরু করলেন একে অপরকে। এই পৃথকইকরনের কৃত্য অত্যন্ত হাস্য জনক পতিত হতে থাকলো সর্বাম্বা ও সকলের কাছে।

বহুদূর প্রসারিত হলো, এই ঘৃণার পাঠ। সকলে সকলকে হাজারো কথা বলতে থাকলো। কেউ বলল, “তুই কি গাড়ু নিয়ে মলত্যাগ করতে যাসনি, তাহলে এতো বিষ্ঠা এলো কি করে তোর মধ্যে”। তো অন্য একজন বলল, “এত বলেছি, এত শাকসবজী আহার করিস না! দেখেছিস কত মলমূত্র জমেছে। ছুবিনা আমাকে। যা এখান থেকে নোংরা কোথাকার!”

সেই কথা নিয়ে বিস্তীর্ণ তর্ক হতে থাকলে, তাঁদের মধ্যে একজন দেবী সর্বাম্বার কাছে প্রশ্ন করলেন, “আচ্ছা দেবী, আপনিই বলুন, শাকাহারে অধিক পাচন সম্যসা হয়, না মাসাহারে!”

দেবী সর্বাম্বা হেসে বললেন, “শরীরের ধর্মই অশুদ্ধ হওয়া। তা তুমি যাই আহার করো, অশুদ্ধ তো তোমাদের তনু হতেই থাকে। হ্যাঁ, শাকাহারের পাচন সমস্যা বিস্তর। মনুষ্যের খাদ্যপ্রণালি তাদেরকে চিহ্নিত করতে অধিক সময় নিয়ে নেয়”।

আত্মের দূতদের মধ্যে অন্য একজন প্রশ্ন করলেন, “আচ্ছা দেবী, আপনিই বলুন, মাসাহারে হিংসা আসবে না! যাদের মাস গ্রহণ করবো আমরা, তারা সকলেই তো হিংস্র! গরু, ছাগল, সকলেই তো হিংস্রতার সাথে তৃণদের কেপন উৎপাটন করে আহার করে! … অন্যদিকে দেখুন তরুরা মৃত্তিকার জল সিঞ্চন করেই জীবন কাটিয়ে দেয়!”

সর্বাম্বা হেসে বললেন, “যেই হিংসা, গরু ছাগল করে তৃণদের উৎপাটন করে, যখন তোমরা সেই তৃণ আহার করছো, সেই হিংসা তো তোমরাও করছো!” এই বলে সর্বাম্বা ও সকলে হাস্যপ্রদান করলে, সর্বাম্বা পুনরায় বললেন, “আচ্ছা, একবার জলসিঞ্চন করে দেখাও দেখি, কতটা অহিংস হয়ে তা করতে পারো তোমরা, আমি দেখতে চাই”।

আত্মের দূতরা সকলে তৎপরতার সাথে জলসিঞ্চন করতে গেলে, সকলে দন্তমুখ খিঁচিয়ে সেই কাজ করার পরিশ্রম করতে থাকলে, সর্বাম্বা পুনরায় হেসে বললেন, “কি গো! অহিংসা ধারণ হলো না! এতেও তো হিংসাই প্রয়োগ করছো দেখছি!”

কথাটি সঠিক, তাই সকলে চুপ করে মাথা নত করে থাকলে, সর্বাম্বা হেসে বললেন, “শোনো, প্রকৃতির ধারাই এমন যে, তনু রাখলে তবেই সত্যের সন্ধান সম্ভব হবে, আহার গ্রহণ করলে তবেই তনু রাখা সম্ভব হবে, আর হিংসার দ্বারাই আহার গ্রহণ করতে হবে যাতে এই হিংসা বলে দেয় সকলকে যে সকল তনুই নশ্বর, আর তাদের অস্তিত্ব কেবলই সত্য ধারণের জন্য। … তাই, শাকসবজি শ্রেষ্ঠ আহার না মাসমৎস্য শ্রেষ্ঠ আহার, তা অহেতুক তর্ক, কারণ যেই আহারই গ্রহণ করতে যাও, হিংসা তোমাদের প্রয়োগ করতেই হবে।

হিংসা বিনা, একজনের অস্তিত্বকে নাশ করা যায় না, আর একজনের অস্তিত্বকে নাশ না করলে, তুমি আহার করতেই পারবেনা। তাই, তরু আহার করো, বা মাস, অস্তিত্ব কারুর না কারুর নাশ করতেই হবে তোমাদেরকে, অর্থাৎ হিংসা ধারণ করতেই হবে। তরু আহার করলে, তরুরা যেমন অচল, জঙ্গম, তেমন জঙ্গমতা লাভ করবে নিজেদের মধ্যে, এবং আলস্য ধারণ করে, কুটিল ও জটিল, যেমন তোমরা হয়েছ, তেমন চরিত্র ধারণ করে সত্যের থেকে চিরকাল দূরেই থাকবে, আর মাসমৎস্য ধারণ করলে, তাদের মত চঞ্চলতা ধারণ করবে, কর্মতৎপর হয়ে উঠবে, আর সত্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা করা শুরু করতে পারবে”।

সেই সমস্ত কথা শুনে, অন্য একজন সংশয় নিয়েই বললেন, “তাহলে কি দেবী, আমরা সমস্ত কিছু ভ্রান্ত ধারণা নিয়েই বসে রয়েছি!”

সর্বাম্বা স্নেহহাস্য প্রদান করে বললেন, “প্রথম কথা, তোমরা বাস্তবে কোথায়? তোমরা তো পূর্বসংস্কার মাত্র, আর সেই সংস্কার ধারণ করেছ কার থেকে? দেবী চিন্তার থেকে। বাস্তব কে? বিচার করো! … চিন্তা বাস্তব নাকি প্রকৃতি! যদি প্রকৃতি বাস্তব হয়, তবে চিন্তার থেকে ধারণা লাভ করার প্রয়াস করেছ কেন? কেন প্রকৃতির থেকে ধারণা লাভের প্রয়াস করো নি! … যদি করতে, তাহলে তোমরা থাকতেই না।

তোমাদের থাকার প্রয়োজনই পরতো না, কারণ যেই সমস্ত কিছু ধারণ করে রাখার জন্য তোমাদের অস্তিত্ব, সেই সমস্ত কিছু তো প্রকৃতিতেই উপস্থিত, তাহলে তোমাদের প্রয়োজন কেন পড়বে? তোমাদের প্রয়োজন পরেই, দেবী চিন্তার দ্বারা উপস্থিত করা সমস্ত চিন্তাকে পূর্বসংস্কার রূপে ধারণ করে রাখার জন্য। বাস্তবসম্মত ধারণা তো প্রকৃতিতেই সঞ্চিত আছে, তার জন্য পূর্বসংস্কার ধারণ করে রাখার আবশ্যকতা কোথায়?”

সর্বাম্বার সেই কথা শুনে একজন প্রথমে, অতঃপরে সকলে বললেন, “দেবী, আপনি তো জন্ম জন্মের নাশী, সমস্ত পূর্ব সংস্কারের বিনাশী। স্বয়ং প্রকৃতি। স্বয়ং প্রকৃতি না হলে, এমন কথা কেউ কি করে বলতে পারে! … দেবী আমাদের মুক্ত করুন। আমরা ভয়াবহ নয়। দেবী চিন্তা আমাদের বিবিধ ব্যাপার নিয়ে সংশয়ে রেখে দেন। এমন করা উচিত নয়, এমন করতেই হবে, ইত্যাদি হাজারও ভাবনার সমষ্টি আমরা।

তাই তো আমরা সর্বক্ষণ দাঁতমুখ খিঁচিয়ে থাকি আর বলতে থাকি- এই এটা করিস না, ওটা করলি কেন? … আর আমাদের এই দাঁতখিঁচিয়ে থাকা স্বভাবের জন্য আমাদেরকে সকলে রাক্ষস মনে করে। দেবী, আমাদের উদ্ধার করুন, আমাদের নাশ করুন, আমরা অসত্য, আপনি সত্য, সত্যের স্পর্শে অসত্যের মুহূর্তের মধ্যে নাশ হয়ে যায়। আমাদেরকে স্পর্শ করে, আমাদের নাশ করে দিন”।

সর্বাম্বা হেসে বললেন, “তোমরা তো সংখ্যাতে বিপুল, সকলকে পৃথক পৃথক করে স্পর্শ করতে গেলে অনেক সময় লেগে যাবে। এক কাজ করো তোমরা। তোমরা সকলে আমার উদরে স্থান গ্রহণ করো। সকলে তখন আমাকে স্পর্শ করে নিতে পারবে”।

সকলে সর্বাম্বার কথাতে সহমত হলে, সর্বাম্বা হেসে বললেন, “দাঁড়াও, এত তাড়াতাড়ি কিসের? তোমাদেরকে আত্ম আমার কাছে কোথায় নিয়ে যাবার জন্য প্রেরণ করেছিল, সেটাতো বললেই না!”

পূর্বজন্ম সংস্কাররা একত্রে উত্তর দিতে শুরু করলে, সর্বাম্বা হেসে উঠে বললেন, “দাঁড়াও দাঁড়াও। সকলে একসাথে বললে, আমি শুনবো কি করে? যেকোনো একজন বলো”। … সেই কথাতে একজনই বললেন, “আপনি আমাদের উদ্ধারিনী, তাই আমাদের মাতঃ, তাই হে মাতঃ, আত্ম চায় আপনি সুষুম্নার অন্দরে প্রবেশ করুন ও সেখানে পথ নির্মাণ করুন। তাই আমাদেরকে তিনি বলেছিলেন যাতে আমরা আপনাকে এসে বলি যে, আমরা সুষুম্নার অন্তর থেকে এসেছি, সেখানে কনো এক ভয়ানক রাক্ষস বাস করে, সে-ই আমাদের পাঠিয়েছে, সকলের নাশ করতে। আর আপনি সেই রাক্ষসকে নাশ করে সকলকে সুরক্ষিত করতে সুষুম্নাতে প্রবেশ করেন”।

সর্বাম্বা হাস্যপ্রদান করে, এবার নিজের তনুকে বৃহৎ আকৃতির করলে, আত্ম যে ইরার নিম্নে নিজের পত্নীদের কাছে প্রত্যাবর্তন করছিলেন, দেবী চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনাও স্বস্বস্থানে স্থিত হয়ে দেবীকে দেখতে পেলেন। দেবী সর্বাম্বা এবার নিজের মুখগহ্বর উন্মোচিত করলে, সকল পূর্বজন্মের সংস্কার তাঁর মুখগহ্বরে প্রবেশ করতে শুরু করলেন। যখন সকলে প্রবেশ করে গেলেন অন্তরে, তখন দেবী একটি বিশালাকায় উদ্গিরনের ধ্বনি ত্যাগ করে, সমস্ত পূর্বজন্ম সংস্কারকে বায়ুতে বিলীন করে দিলে, তাঁর শ্রীঅঙ্গ আলোড়িত হয়ে উঠলো।

কিন্তু সেই উদ্গিরনের শব্দ আত্মকে যেন কিছু মুহূর্তের জন্য বধির করে দিল, আর দেবী চিন্তা নিজের সমস্ত সঞ্চিত পূর্বজন্মসংস্কারকে হারিয়ে দুর্বল হয়ে ভূমিতে পতিত হয়ে গেলেন। দেবী সর্বাম্বা নিজের সেই বিশালাকায় রূপকে সম্বরণ করে সামান্য হবার পূর্বে, যখনও তাঁর মধ্যে সেই আলোড়ন প্রস্ফুটিত ছিল, সেই অবস্থায় দেবী সমর্পিতা মাতার চরণে পতিত হয়ে বলে উঠলেন, “হ্যাঁ দেবী তুমি অদ্ভুত! … তুমি অত্যন্ত অদ্ভুত! কল্পনার মধ্যে আমরা সকলে স্থিতা হয়ে মিথ্যা হলেও অস্তিত্ব, আর তুমি স্বয়ং শূন্য, অর্থাৎ তুমি সর্বব্যাপী হলেও, তোমার কনো অস্তিত্বই নেই। কিন্তু তোমার লীলা তুমিই দেখো মা!

আমাদেরকে অনুভব করালে যে আমাদের সমস্ত সামর্থ্য আমাদের নিজের ধারণ করা নয়, তোমার দ্বারা তা প্রদত্ত, অর্থাৎ আমাদেরকে তুমি শূন্যতার, ও ব্রহ্মের অনুভব করালে, অসীমত্বের অনুভব করালে, অথচ আমাদের সকাশে তুমি নিজেকে একমাত্র অস্তিত্ব করে রেখে দিলে, অর্থাৎ তুমি স্বয়ং অসীম হয়েও সসীম হয়ে থেকে, এমই আমরা সসীমদের তুমি অসীমত্বের অনুভব করালে। … মা কি চূড়ান্ত নিঃস্বার্থপর হলে কেউ এমন করতে পারে! … একমাত্র জননীই এমন করতে পারে।

মা, তাই তোমাকে আজ কন্যা নয়, কন্যাপ্রিয়া বলতে ইচ্ছা করছে। … কন্যা তুমি নও, কন্যার বেশে থাকা জননী তুমি। তাই তুমি কন্যার কাছে অতি প্রিয়া, তুমি কন্যাপ্রিয়া”। দেবী স্নেহা সম্মুখে এসে বললেন, “মাতা, এখনে তুমি আমাদের কন্যা নও, জগন্মাতা রূপে স্থিতা। এখনি তোমার এই রূপকে সম্বরণ করো না মা। আমাদের যে বড় সাধ, আমাদের একমাত্র জননীকে দেখতে থাকা। তাই তোমাকে একটু অপলক দৃষ্টিতে দেখতে দাও মা”।

বিশ্বাস সম্মুখে এসে বললেন, “জন্ম জন্ম বিনাশী, আমাদের সর্বাম্বার এই পরাপ্রকৃতিরূপের নাম কি হবে?” বিচার সম্মুখে এসে বললেন, “দেবী জজনাশী। যিনি জন্ম জন্মের চিন্তানির্মিত সংস্কারের বিনাশী। ভাবিকালে, যেমন মাতার সমস্ত পরাচেতনারূপের আরাধনা করা হবে, তেমনই মাতার পরাপ্রকৃতি রূপেরও আরাধনা করে, সাধক নিজেকে প্রকৃতির কাছে সমর্পিত করবেন। সেই আরাধনার প্রথম দিবসের আরাধনাই হবে, দেবী জজনাশীর, যেখানে সাধক সংকল্প নেবেন, নিজের সমস্ত পূর্বজন্মের সংস্কারকে ত্যাগ করার”।

দেবী মমতা এবার সম্মুখে এসে বললেন, “বেশ, তা না হবে, কিন্তু তোমরা একটি কথা ভুলে যাচ্ছ কেন? মা আমাদের দিব্যতা পছন্দ করেন না, আরাধনা নয়, প্রেমবিলাসী তিনি। তাঁকে তোমরা এই ভাবে, দেবীত্বে অবস্থান করতে দিয়ে পীড়া প্রদান করছো কেন? তাঁকে তাঁর প্রিয় কন্যারূপে আসতে দাও না! … তোমাদের সকলের আহার হয়ে গেছে, আমার মেয়েটা তো আহারও করেনি। রাক্ষসের বেশে, এই পূর্বসংস্কাররা আসতে, সে আহার ত্যাগ করেই উঠে চলে এসেছে। … তাঁকে আহার তো করতে দাও!”

দেবী মমতার কথাতে সহমত হয়ে, দেবী জিজ্ঞাসা মাতার আহারের থাল, আর সমর্পিতা মাতার জলপানের পাত্র সম্মুখে নিয়ে এসে বললেন, “আয় মা, অনেক হয়েছে, এবার আহার করবি আয়”।

মাতা সর্বাম্বা যেন এই আহ্বানেরই অপেক্ষা করছিলেন। মুহূর্তের মধ্যে সমস্ত দেবীত্বের আবেশ ত্যাগ করে, সম্মুখে এসে বললেন, “বড় ক্ষুধা লেগেছে। … আহার করিয়ে দাও না মা!” সেই আহবানে গদগদ হয়ে, সকলে তাঁদের প্রিয়কন্যা, প্রেমাকে নিজেদের হাতে আহার করাতে থাকলে, বৈরাগ্য দেবীর অসীমলীলাকে দেখে আপ্লুত হতে থাকলেন, আর সেই সঙ্গে সঙ্গে সকল ভূত ও মহাভাবও।

আহার করতে করতে, দেবী সর্বাম্বা বললেন, “মা, আহার করে, স্নান করে, সুষুম্নার উদ্দেশ্যে রওনা দেব আমি”।

সেই শুনে দেবী স্নেহা আতঙ্কিত হয়ে বললেন, “আত্ম সেখানে তোর জন্য জাল বিছিয়ে রেখেছে, আর সেখানে তুই যাবি! না না কনো প্রয়োজন নেই!” … সেই কথা শুনে, বিবেক বললেন, “পুত্রী, সেখানে আমরা সকলেই যাত্রা করবো। তুমি তো আগেই সর্ব্বার থেকে সেই প্রতিশ্রুতি নিয়ে রেখেছ”।

জিজ্ঞাসা বললেন, “না তাত, আত্ম তো চায়ই, সেখানে যাতে সর্ব্বা যায়। না না নিশ্চয়ই সেখানে বড় বিপদ আছে। কনো প্রয়োজন নেই, প্রেমার ওখানে যাবার!”

বিচার বললেন, “আমার কথা শোনো পুত্রী, সর্ব্বা নিজের সম্যক সত্যের সন্ধান করে চলেছে, আর একমাত্র সেখানে গেলেই, তা লাভ করা সম্ভব হবে। আর দ্বিতীয়কথা এই যে, সুষুম্নাতে আত্ম স্বয়ংই কনোদিন প্রবেশ করেনি, সর্ব্বা প্রবেশ করার পূর্বে সেখানে প্রবেশ করাই সম্ভব নয়। তাহলে সে আগে থাকতে কি করে সেখানে জাল বিছিয়ে রাখবে। তাই অনুমতি দিয়ে দাও পুত্রী”।

সমর্পিতা অভিমান করে বললেন, “আমাদের অনুমতিতে কি এসে যায়! যা ইচ্ছা হয় করুক!”

দেবী প্রেমা হাস্য মুখে সমর্পিতার কাছে এগিয়ে গিয়ে বললেন, “ছোটমা! … তোমরা তো জানো, তোমাদের অনুমতি বিনা, আমি এক পাও চলবো না! তাহলে এমন কেন বলছো? … আচ্ছা ঠিক আছে, তোমাদের যখন ইচ্ছা নেই, তখন যাবো না সেখানে”।

বৈরাগ্য এবার উচাটন হয়ে বললেন, “পুত্রী সমর্পিতা, তোমার কি তোমার আরাধ্যার প্রতি লেশ মাত্রও বিশ্বাস নেই! … তাঁর অহিত করার সামর্থ্য কার আছে! … নাকি মাতৃত্বের অহংকার তোমাদের এই সত্য ভুলিয়ে দিয়েছে যে, যার উপর তোমরা নিজেদের মাতৃত্বের অধিকার স্থাপন করছো, তিনি তোমাদের আরাধ্যা! … পুত্রী, ভক্তের কঠিন পরীক্ষা হয়, জানো তো! … তাকে নিজের আত্মীয়তা সর্বদা বজায় রাখতে হয়, কিন্তু একদণ্ডের জন্যও ভুলতে পারেনা সে যে, যাকে তিনি নিজের সন্তান, মাতা, সখী জ্ঞান করছেন, তিনি প্রকৃত অর্থে তাঁর আরাধ্যা”।

বিবেকও যোগদান দিয়ে বললেন, “হ্যাঁ পুত্রী, ভক্তকে সর্বক্ষণ নিজের আরাধ্যার প্রদীপ হৃদয়ে জাগ্রত রাখতে হয় যে তাঁর যা কিছু সামর্থ্য, সমস্ত তাঁর আরাধ্যার থেকেই লব্ধ। দুঃখও তিনিই দেন, বলার জন্য যে হয় যেই পথে আমি চলছি, সেই পথ ভ্রান্ত নয় সেই পথে চলার মানসিকতা ভ্রান্ত, সেই মানসিকতার মধ্যে স্বার্থচিন্তা মিশ্রিত আছে। আর সুখও তিনিই দেন, এটি বলার জন্য যেই পথে আমি চলছি, সেই পথে চলার মানসিকতা প্রস্তুত আছে আমার, তাই যেন বিনা চিন্তায় অগ্রে এগিয়ে যাই। … কিন্তু এই সমস্ত কিছুর পরেও, তাঁর এই সমস্ত বিচারকে অন্তরে আবদ্ধ রেখে, বাহ্যে কেবলই আত্মীয়তা ধারণ করে রাখতে হয়, কারণ তাঁর আরাধ্যার দেবীত্ব নয়, আত্মীয়তা প্রিয়। তাই পুত্রী, আত্মীয়তাকে নিজের ভক্তির উপর অধিক গুরুত্ব প্রদান করো না”।

বিবেক ও বৈরাগ্যের এই কথাতে সমস্ত প্রেমার মাতারা ও পিতা সম্মত হলে, সকলে প্রস্তুত হলেন সুষুম্নাতে যাত্রা করার জন্য। তাই সকলে মিলে সর্ব্বাকে সাজিয়ে গুছিয়ে, নিজেদের সঙ্গে করে নিয়ে গেলেন সুষুম্নার দ্বারে। ইরার দ্বারে অবস্থান করতেন দেবী চিন্তা ইচ্ছা ও কল্পনা। সর্বাম্বার সুষুম্নার দ্বারে উপস্থিতি তাঁরা বেশ ভালোই বুঝতে পারলেন, কারণ সর্বাম্বাকে দেখা মাত্রই, তাঁদের অন্তরে জ্বলন শুরু হয়ে যায়। তাই পশ্চাতে ঘুরে যান তাঁরা সেই জ্বলন থেকে মুক্তির উদ্দেশ্যে, আর সঙ্গে সঙ্গে আনন্দিতও হন এই ভেবে যে তাঁদের স্বামীর যোজনা সফল হয়েছে।

দেবী সর্বাম্বা সুষুম্নার দ্বারে উপস্থিত হলে, সকলে দেখলেন, সুষুম্নার দ্বার মূলাধার বেশে, তাঁদের সকলের প্রিয় সর্বাম্বার সম্মুখে দেহধারণ করে এসে প্রণাম জানিয়ে বললেন, “মাতা, আপনার জন্য দীর্ঘকাল অপেক্ষা করেছি। আপনি এসে গেছেন!”

সর্বাম্বা এদিক সেদিক তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, “আমাকে বলছেন মহাশয়?”

সেই দেহী হতবাক হয়ে বললেন, “মাতা, আমাকে চিনতে পারছেন না! আর এই পুরকে! এ যে আপনার নিজের পুর মাতা! ঈশ্বরীয় পুর, আর আমি মূলাধার, আপনার প্রথম দ্বারপাল। আমার জন্য কি আদেশ মাতা?”

দেবী সর্বাম্বা নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, “আদেশ! … বেশ আদেশ এই যে, এই দ্বার দ্বারা ততক্ষণ সকলকে প্রবেশ অধিকার দিও, যতক্ষণ না আমি আমার নিজস্ব আসনে স্থিত হয়ে না যাই”।

মূলাধার মাথা নত করে বললেন, “যথা আজ্ঞা মাতা”।

এরপর সকলে দেখলেন, যেই দ্বারকে কেউ উন্মোচন করতে পারতেন না, সেই মূলাধারের দ্বার নিজহতেই সরে দাঁড়ালেন। আর সকলে তাঁর মধ্য দিয়ে প্রবেশ করলেন, অথচ মূলাধার বন্ধ হলো না। অন্তরে, রক্তাভ আলোকে সকলে এগিয়ে যেতে থাকলেও, অন্তরের আবহাওয়া কারুরই তেমন ভালো লাগলো না। না আছে তাতে দিব্যতা, আর না আছে কনো বিভিন্নতা। যা আছে, তা হলো প্রকাণ্ড উষ্মা। সেই উষ্মাতে দেবী ধরা প্রায় মূর্ছাই যেতে থাকলেন।

দেবী বেগবতী শ্বাস গ্রহণে অসহিষ্ণু হয়ে পরলেন, দেবী শিখার আহারের প্রয়োজনে উদরযন্ত্রণা করতে থাকলো। মানস সকলকে নিয়ে বিচলিত হতে থাকলেন। মহাভাবরাও এই আবহাওয়াতে অতিশয় পীড়িত হতে থাকলেন, আর পঞ্চভাবরা বিচলিত হয়ে বলে উঠলেন, “সর্ব্বা, আর এগিয়ে কাজ নেই, চলো ফিরে চলো। … এই স্থান ভালো নয়, বলে ছিলাম আমরা, আত্ম নিশ্চয়ই কিছু করে রেখেছে এখানে। পিতারা বললেন, না আত্ম এখানে তুমি প্রবেশ করার আগে প্রবেশও করতে সক্ষম নয়। সে প্রবেশ না করলে, এমন রক্তাভ কেন এই স্থান! এমন উষ্মা কেন?”

সর্বাম্বা কিছুই বুঝতে পারছিলেন না। তাই তিনি মূলাধারকে সম্মুখে প্রকাশিত হতে আদেশ দিলেন। মূলাধার তাঁর একটি নির্দেশেই সেখানে উপস্থিত হতে, দেবী প্রেমা প্রশ্ন করলেন, “আচ্ছা মূলাধার, এখানে তো কেউ প্রবেশ করতে পারেনা, আমরা কেন পারলাম!”

মূলাধার মাথা নত করেই উত্তর দিলেন, “মাতা, যতক্ষণ না জীব, পূর্ব জন্মের সংস্কারদের নাশ করেন, ততক্ষণ বায়ুর বলদ্বারা, বীর্যবলদ্বারা এই দ্বার উন্মোচন করতে পারলেও, তাঁরা এই দ্বার দ্বারা প্রবেশ করার পূর্বেই, দ্বার বন্ধ হয়ে যায়, অর্থাৎ তাঁরা প্রবেশ করতে পারেন না। এঁরা সকলে তো আপনারই অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, আর আপনি স্বয়ং এই সম্পূর্ণ পুরের অধীশ্বরী। … আর তাই আপনি নিশ্চিত ভাবেই জানেন যে, এই দ্বার তখনই উন্মোচিত হয়, যখন পূর্ব জন্মের সমস্ত সংস্কারকে ত্যাগ করা যায়। তাই তো আপনি সমস্ত পূর্বজন্ম সংস্কারকে আত্মসাৎ করে, তাদের আহার করে উদ্গিরন করে, প্রবেশ করলেন এখানে”।

সর্বাম্বা প্রশ্ন করলেন, “আত্ম কি এখানে আগে এসেছিল?”

মূলাধার উত্তরে বললেন, “না মাতা, আত্ম স্বয়ং তো এখানে প্রবেশ করতে পারে না, তবে হ্যাঁ, সমস্ত পূর্বজন্ম আত্মেরই হয়, আর সেই পূর্বজন্মরা নিজেদের সংস্কারদের ধারণ করে, এখানেই অবস্থান করে, আর প্রতিটি ব্রহ্মাণ্ডে আত্মের নবপ্রকাশকে নির্দেশ দিতে থাকে সংস্কার অনুসারে। তাঁদের হিংসা, তাঁদের ঈর্ষা, তাঁদের লিপ্সা, তাঁদের কামনার জন্য দেখুন না, এই স্থান কেমন রক্তাভ আর কেমন উত্তপ্ত। এই আপনি এসে গেছেন, এবার এখানে কিছুদিন যাই নিবাস করবেন আপনি, অমনি পূর্বের মত সুন্দর, শান্ত ও শীতল হয়ে যাবে”।

দেবী জিজ্ঞাসা প্রদশ্ন করলেন, “তুমি আত্মেরই লোক নয়তো? … আমাদের সমস্ত বানিয়ে বানিয়ে এঁর মধ্যে প্রবেশ করে, আমাদের সর্ব্বাকে বন্দী করার চেষ্টা করছো না তো!”

মূলাধার এই কথাতে হতচকিত হয়ে গিয়ে বললেন, “না দেবী! মাতাকে বন্দী করে, এমন কার সামর্থ্য! … এক আপনারাই তাঁকে বন্দী করতে পারেন, আপনাদের শুদ্ধ স্নেহ ও মমতাদ্বারা, বিশ্বাসদ্বারা, জিজ্ঞাসাদ্বারা ও সমর্পণ দ্বারা। দেখুন না দেবী, সমস্ত পূর্বজন্মের ভিত্তি, অর্থাৎ সংস্কারের নাশ হয়ে গেছে, তাই কেমন রিক্ত হয়ে রয়েছে এই স্থান। এই কিছুক্ষণ পূর্ব পর্যন্ত, অজস্র পূর্বজন্ম সংস্কার, যাদেরকে আপনারা পিতৃ বা পিতৃপুরুষ বলেন, তাঁরা এখানে অবস্থান করে, সর্বক্ষণ কূটকাঁচালি করে চলেছিল”।

প্রেমা মুচকি হেসে বললেন, “আচ্ছা, তুমি এখন এসো। যদি আবার কনো দ্বন্ধ জাগে, আমার ডাকবো”।

মূলাধার মাথা নিচু করে আনন্দের সাথে বললেন, “আপনার সেবায় সর্বক্ষণ উপস্থিত মাতা। আপনি যখন খুশী, যতবার খুশী ডাকবেন, আমি সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত হবো”।

বিচার এগিয়ে এসে এবার পঞ্চভাবের উদ্দেশ্যে বললেন, “কি এবার শান্তি হলো তো! … সর্বক্ষণ সর্ব্বাকে বন্দী করে রাখার চিন্তা!”

দেবী মমতা বললেন, “বন্দী করে রাখি আমরা! … হ্যাঁ রে সর্ব্বা, আমরা তোকে বন্দী করে রাখি!”

সর্বাম্বা হেসে বললেন, “না সেজমা, … তোমরা না থাকলে তো আমার থাকতেই মন চায়না। যদি বন্দীই হয়, তাহলে আমি যে স্বেচ্ছায় তোমাদের বন্দী”।

দেবী স্নেহা বলে উঠলেন, “একদাম মা মেয়ের মধ্যে প্রবেশের চেষ্টা করবেনা। মায়েদের আর মাতামহীর চিকিৎসা করুন। উনারা অসুস্থ হয়ে গেছেন”।

তাঁদের সুস্থ করে তুললেন, নিজের কবিরজি বিদ্যাদ্বারা বৈরাগ্য, কিন্তু বাস্তবে তাঁরা সুস্থ হলেন, সর্বাম্বার স্পর্শে। ধরা ও মানস তা উদ্ধার করতে না পারলেও, শিখা ও বেগবতী তা যথার্থ ভাবে অনুভব করেছেন, তাই তাঁরা প্রেমিককে বেষ্টন করার মত করে, সর্বাম্বাকে মুহুর্মুহু বেষ্টন করতে থাকলেন, পারলে যেন ওষ্ঠচুম্বন করে দেন তাঁরা। হয়তো নিজেদের উপর সমস্ত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিলেন তাঁরা। কিন্তু আচম্বিক কিছু ঘটনা, তাঁদেরকে বিচ্যুত করলো, তাঁদের প্রেমজ্ঞাপনে।

প্রকৃত ব্যাপার এই হয় যে, সুষুম্নার দ্বার উন্মোচিত দেখেই, আত্ম পিঙ্গলা, ইরা ও মূলাধার একাধারে ব্রহ্মাণ্ডের যেই স্থান উন্মোচিত হয়, সেখানে নির্গত হয়ে, তাঁর সশস্ত্র পুত্র, পৌত্রী ও পৌত্রদের প্রবেশ করালেন। তাঁদের পদার্পণে যেই কম্পন অনুভূত হলো, তাতেই শিখা-বেগবতীর প্রেমজ্ঞাপনের নিবৃত্তি ঘটে। কিন্তু সেই ক্ষণেই আত্ম নিজের অন্তরে ভূত, পিশাচদের জাগ্রত করে দিলে, তাঁরা মূলাধারের অন্তর্বর্তী দ্বার ভেদ করে, মূলাধারে প্রবেশ করলেন।

তাঁদের প্রবেশের পথ দেখে, সর্বাম্বা মূলাধার থেকে পরবর্তী সুষুম্না কক্ষে উপস্থিত হবার দ্বার সহজেই চিহ্নিত করতে পারলেন। কিন্তু তাঁদের দর্শনমাত্র, আর পিশাচদের অঙ্গ থেকে নির্গত হওয়া দুর্গন্ধ সুস্থ হয়ে ওঠা সমস্ত ভূতদের পুনরায় অসুস্থ নয়, এবার তাঁদের মূর্ছাই প্রদান করে দিল। ভুতদের উপস্থিতিতে, পঞ্চভাবরাও ভয়ার্ত হন, বিশেষত পিশাচদের বিশ্রী গলিত দেহী রূপ দেখে। আর মহাভাবরা নিজেদের অস্ত্র মুক্ত করে বিপুলসংখ্যায় থাকা সেই ভূতদের ও পিশাচদের হত্যা করতে গেলে, সর্বাম্বা তাঁদেরকে প্রতিরোধ করে বললেন, “দাঁড়ান পিতাগণ, এঁদের বক্তব্য কি, তা তো আগে শুনতে দিন”।

বিচার বললেন, “সর্ব্বা, আত্মের প্রেরিত এঁরা। আত্মেরই দূত। শত্রুর প্রতি কনো প্রকার দুর্বলতা দেখাতে নেই, এই যুদ্ধের নিয়ম। এঁরা সংখ্যায় প্রচুর, আমাদের অনুমতি প্রদান করো, এঁদের হত্যা করা আবশ্যক”।

সর্বাম্বা মুচকি হেসে বললেন, “তাত, যুদ্ধ কি কেবলই অস্ত্রের মাধ্যমেই করা যায়! শব্দ, বাণী, আর আমার মাতারা, এমনকি আপনারাও কি অস্ত্র নন!”

এতবলে, দেবী সর্বাম্বা অষ্টভুজা রূপ ধারণ করলে, ভূতদেরও সংজ্ঞা ফিরে আসে, আর তাই সকলে দেখলেন, মাতার সেই রূপের দক্ষিণ দিকের তিনটি হস্তে, অরিনাশী, নিপাশ ও ত্রিমার শোভিত, আর বাকি পাঞ্চটি হস্তের একটিতে স্নেহ প্রদায়নি বরহস্ত, একটিতে মমতাপ্রদায়নি মাতৃকা মুদ্রা, একটিতে বজ্র ধারণ করে বিশ্বাস ধারিকা তিনি, একটিতে জিজ্ঞাসা মুদ্রা শোভিত, এবং একটিতে সমর্পণের মুদ্রা ধারণ করে রয়েছেন তিনি।

সকলে নতজানু হয়ে তাঁর কাছে উপনীত হলে, বিচার বিবাক ও বৈরাগ্য নতমস্তক হয়ে বললেন, “ক্ষমা দেবী, ক্ষমা। আমরা ভ্রমিত হয়েছিলাম এই তত্ত্ব থেকে যে, আপনিই আদিযোদ্ধা, আপনি সর্বদাই যুদ্ধে রত, নিজের সমস্ত সন্তানদের উদ্ধারের উদ্দেশ্যে। পঞ্চভাব ও মহাভাব আপনার যুদ্ধের অস্ত্র সমূহ, আর এই সমস্ত অস্ত্র মিলে, আপনি ধারণ করেন মহাকৃপাণ, যার দিব্যতার ব্যখ্যা দেওয়াও সম্ভব নয়, কারণ একমুহূর্তে তা নিজব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত মায়ার নাশ করে দেয়, এমনকি সম্মুখে স্থিত ব্রহ্মাণ্ডের মায়াকেও আপনার নেত্রের কাছে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে দেয়। প্রণাম হে দেবী অনন্তযোদ্ধা, প্রণাম লহ হে দেবী অষ্টভুজা”।

দেবী সমর্পিতা গদগদ হয়ে বললেন, “যোদ্ধা তো সকলেই মা। সকলেই নিজের আত্মকে স্থাপিত করার জন্য যুদ্ধে রত। কিন্তু যিনি নিজের আত্ম স্থাপনের জন্য নয়, সন্তানের উদ্ধারের জন্য যুদ্ধ করে ফেরেন সর্বদা, তিনিই তো মা, তিনিই তো জগজ্জননী। তাই তুমি কেবল অনন্তযোদ্ধা নও, তুমি হলে মাতা বীরশ্রী। তোমার যোদ্ধাভাবও সন্তানের হৃদয়ে প্রেম জাগরিত করে, তাই তুমি প্রেমোন্মদা”।

মাতার এই রূপ দেখে পিশাচ ও ভুতরাও নতজানু হয়েছিলেন। নতজানু হয়েই তাঁরা বললেন, “মাতা তুমি। মাতা হয়ে এমন অন্যায় কি করে করলে তুমি! … নিজের পূর্বজ সম্মানের স্থান হন, বর্তমান অতীতের উপরেই দণ্ডায়মান থাকে। তাঁদের আহার রূপে গ্রহণ করে নিলে! এ কেমন অধর্ম দেবী? তুমি করলেই তা ধর্ম, আর আমরা করলেই তা অধর্ম!”

মাতা বীরশ্রী মৃদু হেসে বললেন, “কে এমন কথা শিখিয়েছে তোমাদের যে, অতীতের আহার করা অধর্ম! নিশ্চয়ই তোমাদের প্রিয় আত্ম!… নিজেদের দ্বন্ধ দূর করো পিশাচেরা, ভুতেরা, নাহলে কখনোই আত্মের থেকে মুক্ত হতে পারবে না। কেন এমন পিশাচ তনু পেলে তোমরা! আর ভুতেরা, তোমরাও তো সেই একই পথে চলছো! … এখনও নবদেহ না ধারণ করলে, তোমরাও তো পিশাচ হয়ে যাবে!”

পিশাচেরা বললেন, “আমরা কেন দেহ নিইনি, তার দোষও কি আমাদের! আমাদের সন্তানরা আমাদের পিণ্ডদান করেনি বলেই, আমাদের এই দশা। আর এই ভুতদেরও তেমনই অবস্থা হতে চলেছে”।

মাতা বীরশ্রী পুনরায় হাসলেন, আর এবার অট্টহাসে খুন হলেন। দেবী বহুকষ্টে নিজের হাসি থামিয়ে বললেন, “আত্মের প্রদান করা মিথ্যাচারকে যতদিন জ্ঞান মানবে, ততদিন এমনই ভাবে দিনের পর দিন পিশাচ হতে থাকবে, আর ভূত হয়ে, পিশাচ হয়েই পরে থাকবে। … দয়াও জন্মাচ্ছেনা তোমাদের প্রতি। মিথ্যাকেই যারা সত্য মেনে বসে থাকে, সেই অন্ধবিশ্বাসীদের উপর কি করে দয়া আসবে! … বৈরাগ্যই সঠিক ছিল, তোমাদের হত্যাই তোমাদের অজ্ঞানতা স্বীকারের কর্মফল”।

পিশাচরা এবার ক্রন্দনে ফেটে পরে বললেন, “স্বয়ং দয়াময়ীও আমাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে! … এতটাই মূর্খ আমরা! … দেবী, জননী আপনি, জগজ্জননী আপনি। জগন্মাতা কি কেবল ভাবদের জননী, আমাদের জননী নন! … মাতা, জানিনা আমরা, আপনি কাকে অজ্ঞানতা বলছেন! … আত্মও তো আপনার থেকেই জাত, তাও সে অজ্ঞান কেন মাতা! … আর সে অজ্ঞানতার বিস্তার কি করে করেছে! … মাতা, আগে আমাদের দ্বন্ধ দূর করুন, অতঃপরে আমাদের অন্তরের অন্ধবিশ্বাস সমাপ্ত হলে, আপনার শ্রীমুখ থেকে জ্ঞানের অভয়বাণী শ্রবণ করে তৃপ্ত হবো আমরা মা। দয়া করো মা। করুণাময়ী আমাদের থেকে এমন ভাবে মুখ ফিরিয়ে নিও না”।

মাতা বীরশ্রী হেসে বললেন, “মুখ ফিরিয়ে নেব বলে তো সম্মুখে এসে উদিত হইনি পুত্ররা, আত্মের কথা যখন প্রশ্ন করলে, তাহলে বলি শোনো, আত্ম অজ্ঞানী নয়, তবে সে অজ্ঞানতাকে পছন্দ করে, আর তাই অজ্ঞানতাই ধারণ করে থাকে, আর অজ্ঞানতারই বিস্তার করে। জ্ঞান ধারণ করলেই যে, তাঁর আত্মভাবের নাশ হবে, আর অজ্ঞানতা অর্থাৎ অন্ধত্ব ধারণ করলেই যে তাঁর আত্মবোধের বিস্তার হবে, আর সে সত্যের প্রতি নয়, নিজের বিস্তারের প্রতি আকৃষ্ট। তাই সে সর্বদা অজ্ঞানতাই ধারণ করে থাকে।

আর কি ভাবে সে অজ্ঞানতার বিস্তার করে! শোনো তবে আমি তোমাদের এক অবতার গাঁথার সার বলি, আর সেই সারকে কি ভাবে আত্ম অজ্ঞানতার রঙে চুবিয়ে পরিবেশন করে, তোমাদেরকে নিজের দাস করে রেখে দেয়, তাও বলছি শ্রবণ করো। জানো নিশ্চয়ই তোমরা যে, আমিই পূর্বে একবার ১৬ কলা প্রকাশে স্থাপিত ছিলাম, ঠিক যেমন এখন পূর্ণ ৯৬ কলাতে উপস্থিত আমি, সেই রূপে আমার বাহ্যিক নাম ছিল দ্বৈপায়ন। তোমরা তাঁকে ব্যাস বলে চেন।

আমার সেই ১৬ কলা অবতার, ব্যাস, নিজের জীবনী লিখেছিলেন, যার নাম দিয়েছিলেন মহাভারত। সেখানে, সমস্ত সময়ে অধর্ম করে যেতে দেখিয়েছেন সমস্ত আত্মসাক্রেদদের, আর অন্তে এসে, ব্যাস দেখিয়েছেন যে, তাঁর বিবেক এই সমস্ত আত্মসাক্রেদদের কর্মফল প্রদান করছেন, তাঁদেরই করা অধর্মকে সম্মুখে রেখে। অর্থাৎ তাঁদের ধর্মাধর্ম সংক্রান্ত সমস্ত তত্ত্ব যে ভিত্তিহীন ও অনর্থক, তাই তাঁদের কাছে প্রমাণ করছেন তিনি, এঁদের সম্মুখে এঁদেরই করা অধর্মকে রেখে।

স্বয়ং আত্মশ্লাঘা অর্থাৎ ভীষ্মকে তাঁরই অন্ধত্ব, যাকে সে ধর্ম বলে, তাকেই শিখণ্ডী করে, তাঁর দমন করে। মোহকে অর্থাৎ দ্রোণকে, যে বরাবর নিজের মোহকেই ধর্ম বলে আখ্যা দিয়ে এসে, নিজের পুত্রকে ব্রাহ্মণধারা থেকে ক্ষত্রিয়ধারাতে পদস্খলিত করেছিল, সেই পুত্রের মোহে আবদ্ধ করে, তাঁর হত্যা করে। প্রতিহিংসা, অর্থাৎ কর্ণ, যে সমস্ত জীবন নিজেই নিজের প্রতিহংসার অগ্নিতে জ্বলে, সর্বক্ষণ দাবি করে গেছে যে সকলে তাঁর সাথে অধর্ম করছে, তাঁকে প্রতিহিংসার দ্বারাই, যুদ্ধবিরত অবস্থায় হত্যা করে, তাঁর অন্ধত্বস্থাপিত ধর্মাধর্মের বিশ্বাসে আঘাত হানে। অবশেষে, ক্রোধকে, অর্থাৎ দুর্যোধনকে, যে সর্বদা নিজের ক্রোধকে শান্ত করাই ধর্ম বলে স্থাপন করে গেছে সকলের কাছে, আর ক্রোধকে শান্ত করার জন্য যা কিছু করা হয়, তাকেই ধর্ম বলে স্থাপন করার প্রয়াস করে গেছে, তার ক্রোধকেই তাঁর সম্মুখে অতৃপ্ত করে রেখে, তাঁকে অর্ধমৃত করে রেখেছে ব্যাস।

তোমাদের তাহলে মহাভারতের সত্য বিবৃত করি শোনো। মহাভারত, এই নামকরণ ব্যাসের নয়, বরং এই আর্যদের, যারা আত্মের অর্থাৎ পরমাত্মের আরাধনা করে। এঁর প্রথম নাম, অর্থাৎ ব্যাস প্রদত্ত নাম ছিল জয়া, যাতে মাত্র ৬০ হাজার শ্লোক ছিল। পুত্ররা, তাতে ব্যাস আর্যদের দ্বারা ঘোষিত দেবদেবীর নাম উপস্থিত থাকলে, তা ছিল একমাত্র তিনি, যিনি আর্যদের দেবতাও নন, বুদ্ধদের দ্বারা স্থাপিত দেব, দেই আদিশক্তি।

ব্যাস তাঁর নামের উল্লেখ করেন কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ প্রারম্ভের পূর্বদিবসের দিনে, যেদিন কৃষ্ণার্জুন মিলে আদিশক্তির আরাধনা করে, পরাপ্রকৃতির থেকে অনুমতি গ্রহণ করেন এই যুদ্ধে রত হবার। পুত্র, তা ছাড়া, সম্পূর্ণ জয়ার ৬০ হাজার স্লোকে একটি বারও আর্যদের একটি দেবেরও নামের উল্লেখ নেই। না রজগুণ অর্থাৎ নারায়ণের নামের উল্লেখ আছে, না সত্ত্বগুণ অর্থাৎ ব্রহ্মদেবের নাম উচ্চারিত আছে, আর না তমগুণ অর্থাৎ শিবের নামের উল্লেখ আছে।

সর্বক্ষেত্রে বলা হয়েছে পরমেশ্বরের অবতার, পরমেশ্বরের আশীর্বাদ, এবং যাদের নামের উল্লেখ আছে, তাঁরা হলেন এই আর্যদের নাম প্রদান করা দেবতাসমূহ, কারণ কুন্তি যেই দেবদের আবাহন করেন, তাঁদেরকে আবাহন করেনই দুর্বাসার প্রভাবে, যিনি একজন আর্য বৈদিক।  

এছাড়া জয়াতে একটিও দেবতার নাম পাবেনা। গান্ধারীকে একশত পুত্রের বরদান কে দিয়েছেন? পরমেশ্বর, সেখানেও শিবের নাম নেই। কৃষ্ণ কার অবতার? পরমেশ্বর। সেখানেও নারায়ণের নাম নেই। এর কারণও অতি স্পষ্ট। আমার কনো অবতারই পরমাত্ম বা আত্ম অর্থাৎ অহং-এর পূজারি নন। তাঁরা সকলেই সত্যের অর্থাৎ ব্রহ্মের এবং তাঁরই স্থূলে প্রকাশ আত্মের থেকে সত্যকে উদ্ধারের জন্য অর্থাৎ প্রকৃতির ও নিয়িতির আরাধনা করেছেন। আর ব্যাস আমার ১৬ কলা অবতার। আর দ্বিতীয়কথা, ব্যাস ও বাল্মীকি, আমার দুই অবতারের জন্মস্থানই হলো আর্যপ্রদেশ, অর্থাৎ বৈদিক ছেত্রের বাইরে। বাল্মীকির জন্ম কেওঞ্ঝার অঞ্চলে এবং ব্যাসের জন্ম রাওকেলা অঞ্চল, যেই দুটিই তৎকালীন গৌড়দেশ, অর্থাৎ উৎকলের অন্তর্ভুক্ত, অর্থাৎ বৈদিক ছেত্রের সাথে তাঁর কেউ যুক্ত নন।

বাল্মীকিও একই ভাবে দেখিয়েছিলেন যে বৈদিক দেবতারা সকলে আসুরিকতাকে বাহবা দেন। সেই দেখিয়েই রাবণের পৃষ্ঠপোষকরূপে শিবকে দেখান, আর তিনিও রামকে পরমেশ্বরের অবতার বলেছেন, নারায়ণের নয়। এতো বৈদিক অর্থাৎ আর্য, অর্থাৎ আত্মের অনুচরদের কৃত্য যে সেই সমস্ত গ্রন্থে নারায়ণ, শিব ইত্যাদিদের নাম প্রবেশ করিয়েছিলেন।

মার্কণ্ডের মহাপুরাণে সেই নামসমূহ রেখেই দিয়েছিলেন মার্কণ্ড এবং এঁদেরকে কখনো ভ্রমিত দেখিয়েছেন মধুকৈটভের ক্ষেত্রে, তো কখনো গ্রস্ত দেখিয়েছেন হয়গ্রিভের ক্ষেত্রে, আবার কখনো নশ্বর দেখিয়েছেন যেমন হলাহলপান করা শিব, আবার কখনো ইতস্তত দেখিয়েছেন যেমন লক্ষ্মীর সাগরপ্রবেশের পরে নারায়ণ, আবার অন্তে অহংকে শব হতে হয় দেখিয়েছেন, মহাকালী পর্বে। তাই সেখানে কনো ভাবে বৈদিকরা ত্রিদেবদের সুখ্যাতি করার স্থান পায়নি বলে, তাকে জ্বালিয়ে বিনষ্ট করে দিয়েছিল।

যদিও অতি কৌশলে ব্যাস সেই কথাকে উদ্ধার করে, কিছুটা দেবী পুরাণে রেখেছেন, কিছুটা শিব পুরাণে, কিছুটা বিষ্ণুপুরাণে তো বাকি অংশকে স্কন্ধপুরাণ ও মার্কণ্ড পুরাণে ছড়িয়ে দিয়ে আর্যদের বোধ থেকে তা সুরক্ষিত রেখে দিয়েছিলেন।

আর ব্যাসের জয়া! … তাতে সরাসরি বৈদিক দেব অর্থাৎ আত্মের নিন্দা নেই বলে, তাঁর জয়ার ৬০ হাজার শ্লোকের সাথে আরো ৪০ হাজার শ্লোক যুক্ত করেছে আর্যরা এবং তাতে নারায়ণ, শিব ও ব্রহ্মার নাম প্রবেশ করিয়ে করিয়ে, তাকে বৈদিক গ্রন্থ রূপে, আত্মের পূজায় ব্যবহৃত গ্রন্থ রূপে প্রদর্শন করেছেন।

এই তো আত্মের বিরচিত পূর্বজন্মের সংস্কার। বলেনি সে নিজের কেচ্ছাকেলেঙ্কারি! তারপরেও তাঁর বায়খা দেওয়া পূর্বজন্মের সংস্কার নিয়ে তোমাদের এত মাথা ব্যাথা তাহলে কেন? মৃত্যুর সময়কালে কি হয় তোমরা জানো তো? নাকি সেখানেও আত্ম তোমাদের নিজের কাল্পনিক মিথ্যা কথা শুনিয়ে যায় সর্বক্ষণ, আর তোমরা তাই বিশ্বাস করতে থাকো?”

পিশাচরা বললেন, “জানিনা দেবী, আর যা জানি সমস্ত কিছু ভুল জানি, মিথ্যাকেই সত্য বলে মানি। কৃপা করে আমাদের সত্য ব্যাখ্যা করুন। মৃত্যুর পরে কি হয়? কেন আমরা ভূত পিশাচ হয়ে দেহ না লাভ করে যুগের পর যুগ অবস্থান করছি?”

মাতা বীরশ্রী বললেন, “ওই যে, তোমাদেরকে তোমাদের অতি প্রিয় আত্ম বলে দিয়েছে, তোমাদের পুত্ররা তোমাদের পিণ্ডদান করলে, তবে তোমরা মুক্ত হবে, সেই থেকে তোমাদের মধ্যে এক নূতন ধারার আসক্তি প্রবেশ করিয়ে নিশ্চয় করে রেখেছে যে তোমরা যেন আসক্ত থাকোই, আর কিছুতেই আসক্তি থেকে মুক্ত না হতে পারো। …

মৃত্যুর কালে কি হয়? তোমাদের আত্মবোধ তোমাদের চেতনাকে আশ্রয় করে, চেতনাবিস্তারক পঞ্চভূতের সূক্ষ্মরূপদের মধ্যে লুকিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করে, নিজের নির্মাণ করা ব্রহ্মাণ্ড অর্থাৎ তোমাদের জড়জগত ত্যাগ করে চলে আসে। আত্ম খুব ভালো করে জানে যে সে যথার্থ কনো কালেই ছিলনা, যথার্থ বরাবরই চেতনা, যাকে মহম্মদ বলেছিল রুহ। … তাই সে তস্করের মত নিজেকে চেতনার বিস্তার অর্থাৎ ভূতদের সূক্ষ্মরূপের সাথে মিলিত হয়ে যায় দেহত্যাগের কালে।

আর বাকি ভূতবিস্তারের কি হয়? তা পুনরায় প্রকৃতিতে পুষ্টি হয়ে মিশে যায়, আর প্রকৃতির এই প্রকরান্তরকে কিছু জীব প্রত্যক্ষও করতে সক্ষম, যেমন সারমেয়। প্রকৃতিতে যখন প্রকৃতির উপাদান সমূহ ফিরে যায়, তখন তাঁরা সেই পুনর্মিলনকে অনুভব করতে সক্ষম। আর জ্ঞানী ব্যক্তিও অনুভব করতে পারেন কারুর মৃত্যু। তবে তার কারণ প্রকৃতিতে ভূতদের মিলন নয়। তার কারণ আত্ম নিজের ব্রহ্মাণ্ডের নাশ করে যখন, তখন সমস্ত আবেগ ও আবেগদের নিয়ন্ত্রক ত্রিগুণ তথা রিপুপাশদের নাশ হয়ে যায়, আর তাই চেতনা ভারমুক্ত হয়ে যায়, বন্ধনমুক্ত হয়ে যায় বিস্তর ভাবে। আর জ্ঞানী ব্যক্তি চেতনার এই ভারমুক্ত হওয়াকে অনুভব করে বুঝতে পারেন যে তাঁর নিকটবর্তী স্থানে অবস্থান করা কনো এক জীবের প্রাণনাশ হচ্ছে।

এবার বুঝতে পারছো, কেন আত্ম এতটা পূর্বজন্মের সংস্কার নিয়ে চিন্তিত থাকে, আর তোমাদেরকে সেই নিয়ে চিন্তিত রেখে, নিজের চিন্তার অবসান করে? এখনো বুঝতে পারছো না? মৃত্যুর কালে আত্মের সমস্ত বিস্তৃত ব্রহ্মাণ্ড অর্থাৎ সমস্ত কিছু নিয়ে তাঁর ধারণা, আর সেই ধারণাকে আঁকড়ে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় আবেগসমূহকেও হারিয়ে ফেলে। আর সেই আবেগসমূহের স্মৃতিকে সে লুকিয়ে রাখে পূর্বজন্মের সংস্কার নামক একটি খামে, আর তাকে লুকিয়ে রাখে মানস অর্থাৎ মন বা আকাশ নামক ভূতের মধ্যে। আর যাতে তোমরা সেই খামকে কখনো না হারাও, আর কখনো না ফেলে দাও, তাই তোমাদেরকে সে সর্বদা সেই খাম অর্থাৎ পূর্বজন্মের সংস্কারকে ধারণ করে রেখে দিতে বলে।

তবে তোমাদের পুত্রদের থেকে লাভ করা পিণ্ডের মিথ্যাচারন কেন করে সে? কারণ পুত্রের মধ্যেও সেই খামের প্রতি আসক্তি রেখে দিতে চায় সে, যাতে তাঁর পুত্ররা তাঁদের পিতাদের সেই খামকে সুরক্ষিত রাখার কথা বারবার বলতে থাকে। আর বারংবার পূর্বজন্মের সংস্কার, এই শব্দ শুনে শুনে, তোমরা সেই শব্দকে এতটাই গুরুত্বপূর্ব অনুভব করো যে সেই খামটি নিজেদের মনে যথাযথ ভাবে আঁকড়ে ধরে রাখো, আর যাতে তোমার আর তোমাদের পুত্রদের এই আসক্তিময় মেলবন্ধনের মাধ্যমে আত্ম পুনরায় সেই পরিবারেই ফিরেতে পারে,ম যেই পরিবার থেকে তাঁকে নিজের ব্রহ্মাণ্ডকে অপসারিত করতে হয়েছে। এই হলো তার খেলা।

পুত্ররা, এই ভাবে যখন আত্ম ব্রহ্মাণ্ডের লয় করে, তস্করের মত চেতনার ভূতদের সাথে পলায়ন করে, তখন সমস্ত সময়ে তাঁর প্রয়াস হয় কিছু আসক্তিকে সঙ্গে নিয়ে যাবার, যাতে সে পুনরায় সেখানে ফিরতে পারে, যেখান থেকে সে প্রত্যাবর্তন করছে। তাই সে পুত্রের প্রতি, স্বামীর প্রতি, স্ত্রীরপ্রতি, পরিবারের প্রতি, নিজের খ্যাতির প্রতি আসক্তি নিয়ে দেহত্যাগ করে, আর তাকেই পূর্বজন্মের সংস্কার রূপে ধারণ করে আর তাই তোমরা ভাবতে থাকো কি? যতক্ষণ না সেই সমস্ত কিছুকে পুনরায় পাচ্ছি, ততক্ষণ দেহ ধারণ করবো না।

কি হয় তার ফলে? সেই পরিবারে, সেই অবস্থাতে কেউ অন্তঃসত্ত্বাই হয়না যেই কালে, তখন তোমরা দেহই ধারণ করো না। আর যখন দেহধারণ না করার বিচার আসে তোমাদের মধ্যে, ততক্ষণে তো তোমাদের যেই সীমিত সূক্ষ্ম ভূত নিয়ে দেহত্যাগ করেছিলে, তাদের মধ্যে বিক্রয়া না হবার কারণে তারা পচে যেতে শুরু করে, আর তাই তোমরাও সেই গলা পচা ভূতদের ধারণ করে পিশাচ হয়ে বিরাজ করো।

এবার আমাকে বলো এর সাথে তোমাদের পূর্বসংস্কারের কি সম্বন্ধ? কোন ভাবে তোমাদের পূর্বসংস্কার তোমাদের উপকার সাধন করে? এই পূর্বসংস্কার নামক আসক্তিময় খামকে বহন না করলে, তোমরা অনায়সে অন্য দেহ ধারণ করতে পারতে, আর তখন তোমাদের ভূত হয়ে, পিশাচ হয়ে এই ভাবে ঘুরে বেরাতে হতোই না, বরং যথার্থ জীবনের জ্ঞান ধারণ করে, মুক্তির পথে এগিয়ে যেতে। আত্ম নিজের বিভিন্ন প্ররোচনা দ্বারা সর্বভাবে তোমাদেরকে নূতন নূতন আসক্তির খোলসে আবদ্ধ করে, আর সেই আসক্তি তোমাদের পিশাচ হয়ে থাকার জন্য প্রেরণা প্রদান করে। তোমরা দেখবে, তোমাদের এই আসক্তির পরিণাম কি? দেখ তাহলে”।

এই বলে দেবী বিরশ্রী নিজের গর্ভকে সকলের জন্য দৃশ্যমান করে দিলেন। যা দেখলেন সকলে সেই উদ্দেশ্যে দেবী বলতে থাকলেন, “এই দেখ বাম দিকে যাদেরকে দেখছো, তারা এক্ষণে মানুষ হয়ে অবস্থান করছে। কারা তারা? তাদের অধিকাংশই অন্য যোনি থেকে মানুষ হয়েছে, আর তা হওয়া অতি সহজ হয়ে গেছে এখন, কারণ মানুষ যোনি অবলুপ্তির দ্বারে দাঁড়িয়ে রয়েছে, আত্মের এমন সমস্ত কীর্তির জন্য আর তাতে তোমাদের অর্থাৎ মনুষ্যদের সায় থাকার জন্য। … আর যারা এককালে মানুষ হয়ে জন্ম গ্রহণ করেছিল, তাদের অবস্থান দেখো আমার গর্ভের নিন্মের দিকে। তাদের অধিকাংশই আত্মের বিস্তার করা আসক্তি ধারণ করে ভুত পিশাচ হয়ে বিরাজ করছে।

কেউ পরিবারের প্রতি আসক্তি ধারণ করে রয়েছে, তো কেউ পেশার প্রতি; কেউ সম্পত্তির প্রতি তো কেউ অধিকারের প্রতি; কেউ যন্ত্রের প্রতি, তো কেউ ক্ষমতার প্রতি। আর সেই সমস্ত আসক্তিকে কি নাম দিয়েছে তারা? পূর্বজন্মের সংস্কার। তা এই পূর্ব জন্মের সংস্কার কি তাঁদের উপরকার করলো না অপকার? ভালো করে দেখো পুত্র, এখন যারা মানুষ হয়ে অবস্থান করছে, তাদেরকেও আত্ম সেই প্রকারই করার চিন্তা করে আসক্তি প্রদান করতেই থাকছে, অর্থাৎ তাদেরও ভবিষ্যৎ সেই ভুত আর পিশাচ”।

গর্ভ দৃশ্য এবার মাতা অবলুপ্ত করে বললেন, “কি বুঝলে পুত্ররা! … বুঝলে তো? যেই পূর্বসংস্কারকে দেব বলে গণ্য করছো তোমরা আত্মের খপ্পরে এসে, তাদেরকে দেব ধারণা করার ফলে, আজ মনুষ্য যোনি অবলুপ্তির দ্বারে এসে অবস্থান করছে। তবুও সেই আত্মের কথাতে তোমরা বিশ্বাস করে, এই সমস্ত কিছুকে মান্যতা দিয়ে আসছো, যাদের বাস্তবে কনো অস্তিত্বই নেই!

এই পূর্বসংস্কার নিয়ে তোমাদের আত্ম কি করে তোমরা জানো? জানো নিশ্চয়ই, সেই সমস্ত কিছুই তো পূর্বসংস্কার রূপে সঞ্চিত রেখেছিল সে। … সে ধর্মকে অধর্ম রূপে স্থাপন করতে, আর অধর্মকে ধর্মরূপে স্থাপন করার উদ্দেশ্যে, ব্যাসের ক্রোধ, মোহ, প্রতিহিংসা, আত্মশ্লাঘা, যাদের নাশ করে ব্যাস,  নিজেকে আমার ১৬ কলা অবতার রূপে জেনেছিল, তা মুছে দিয়ে, এঁদেরকে ঐতিহাসিক চরিত্র বানিয়ে দিয়ে, ব্যাসের বিবেক যেই পঞ্চভূতদের শিখণ্ডী করে, নিজের সমস্ত আত্মবোধের নাশ করেছিল, তাঁদেরকে অধর্মী করে দেয়, আর অধর্মী আত্মগুণদের ধার্মিক।

বুঝতে পারছো এবার, পূর্বজন্মের সংস্কারে কি সঞ্চিত রাখে আত্ম, আর কেনই বা তাঁদেরকে সুরক্ষিত রাখতে চায়, আর তোমাদের মন্ত্রণা দেয় যে, তর্পণ করে, পিণ্ড দিয়ে, এঁদেরকে স্বর্গারোহণ করাতে? উত্তর পেয়েছ তোমাদের অন্ধত্বের! … সে স্বয়ং এই পিতৃ অর্থাৎ পূর্বজন্মের সংস্কার নিয়ে স্বর্গ অর্থাৎ এই সুষুম্নার ঊর্ধ্বলোকে গমন করতে ব্যর্থ, আর তাই তোমাদের এই কথা বলে বলে, জনমত গঠন করতে চায় যে, জনমতের দাবি যে, তাঁকে সুষুম্নার ঊর্ধ্বলোকে এই সমস্ত পিতৃদের নিয়ে গমন করতে দেওয়া হোক।

এই সমস্ত পিতৃ, অর্থাৎ পূর্বজন্মসংস্কারের মধ্যে সে সমস্ত পূর্ব-পূর্ব জন্মের কূটভাবনা, অর্থাৎ অধর্মকে ধর্ম রূপে সাজিয়ে রাখার, ধর্মকে অধর্ম রূপে প্রতিস্থাপিত করার ফন্দি সঞ্চিত করে রেখে দেয়, আর তাই সেগুলিকে সঞ্চিত রাখতে চায়, যাতে প্রতিবার ব্রহ্মাণ্ড গঠন করে, তাদেরকে পুনরায় ধারণ করে, পূর্বের সমস্ত কুটিলতা, অন্ধত্ব সমস্ত কিছু ধারণ করতে পারে, আর নিজের আধিপত্য বিস্তার করে, নিজেকে ভগবান রূপে স্থাপিত করতে পারে। বেশ, আমার কথা বিশ্বাস হচ্ছে না তো! তোমাদের পুত্ররা তোমাদেরকে যেই আহার প্রদান করে, তিলকাঞ্চন বেশে, তোমরা তার একটি দানাও আজ পর্যন্ত আহার করতে পেরেছ কি?”

ভুত পিশাচরা একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে মাতা বীরশ্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন, “না মাতা, একটি দানাও কখনো ভক্ষণ করতে পারিনি”।

মাতা বিরক্তিসুলভ হাস্য প্রদান করে বললেন, “তাহলে তোমরা যে বলছো, তোমাদের পুত্ররা তর্পণ করেনি বলে, তোমাদের পিণ্ডদান করেনি বলে, তোমরা ভুত হয়ে রয়ে গেছ, তোমরা পিশাচ হয়ে গেছ, এর ভিত্তি কি? নিরর্থক, অন্ধত্বপূর্ণ কথা ছাড়া তা কি, তোমরাই বলো আমাকে”।

ভুতরা এবার বললেন, “তাহলে কি মাতা, আমরা এই অন্ধত্বে আবদ্ধ থেকে, পুত্ররা পিণ্ড দিচ্ছেনা, তাই মুক্ত হচ্ছি না; এই ভ্রমে থেকে, আমরা নিজেদেরকে নিজেরাই বন্দী করে রেখে দিয়েছি!”

পিশাচরা বললেন, “আর এমন করে, আমরা সমানে আত্মের বলবৃদ্ধি করছি! … আমরা চিন্তা করছি, কল্পনা করছি, আর ইচ্ছা করছি, আর আমাদের চিন্তা, ইচ্ছা আর কল্পনা ধারণ করে করে, পঞ্চভূত আত্মের কাছে দাস হয়ে থাকছে, আর আত্মের বলবৃদ্ধি হচ্ছে, আর এর ফলে মেধা জাগ্রত হচ্ছে না! বিচারের স্থানে আত্ম চিন্তাকে স্থাপিত করে রেখে দিয়েছে, বিবেকের স্থানে ইচ্ছাকে, আর মেধার স্থানে, মানে তোমার স্থানে কল্পনাকে! আর এই ভাবে তোমার প্রকাশকে আটকে রাখছে! তোমার সন্তানদের তুমি যাতে উদ্ধার করে নিয়ে যেতে না পারো, আর তোমার অংশসমূহ, অর্থাৎ ভূতরা যাতে চিরকাল আত্মের দাস হয়ে থাকে, সেই প্রয়াস করে চলেছে!”

মাতা হেসে বললেন, “দেখলে, অজ্ঞানতার পর্দা অপসারিত হলে, আমাকে আর কিছু বলতেই হলো না, তোমরা স্বয়ং সমস্ত কিছু প্রত্যক্ষ করে নিলে!”

সমস্ত সত্য জেনে, ভুতরা বললেন, “মা, আমাদের এই ভ্রান্তির থেকে মুক্তি দাও। না আমরা মৃত্যুর সত্য জানি, আর না আমরা জীবনের সত্য জানি। আত্ম স্বয়ং ভ্রম, আর সে কেবল ভ্রমেরই বিস্তার করে, আর আমরা সেই ভ্রমকে স্বীকার করে করে, আজ পূর্ণ ভাবে আমাদের চেতনাকে ভ্রমিত করে, তোমার থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে তুলেছি, নিজের প্রকৃত মায়ের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছি। দেহ সর্বস্ব হয়ে, দেহকে যেই জননী আকার দেয় আর তাতে আসক্ত হয়ে থাকে, তাকেই জননী জ্ঞান করে আজ আমরা পূর্ণ ভাবে ভ্রমিত, আর তোমার থেক বিচ্যুত।

যেই পূর্বসংস্কারকে আমাদেরও আহার করে নিয়ে অবুভব করা উচিত ছিল যে, তাদের দ্বারা আত্ম আমাদেরকে নিজের অধীনে বন্দী করে রেখে দিয়েছে, তাদেরকেই আরাধনা করে করে, নিজেদের ভ্রমে আবদ্ধ করে রেখে দিয়েছি। আর নয় মা, এবার আমরা এই সমস্ত অজ্ঞানতা থেকে মুক্তি চাই। মানবযোনির সামর্থ্য আছে এই অজ্ঞানতা থেকে চিরতরে মুক্ত হবার। আর আত্মের অধীনে থাকলে তা কখনোই সম্ভব হবেনা। মা, এই জ্ঞান ধারণ করে আর আত্মকে বলশালী করে এই যোনির নাশ করতে চাইনা। এবার আমরা দেহ গ্রহণ করতে চাই। এবার আমরা সত্যে উপনীত হতে চাই।

 আমাদের অনুমতি প্রদান করো। অতীতকে ধারণ করেই বর্তমানে স্থিত হতে হয়। তুমি তো অতীতের নাশ করো নি, অতীতকে আহার রূপে গ্রহণ করে নিয়ে, অতীতের মধ্যে আত্ম যেই সমস্ত অন্ধত্ব স্থাপিত রেখেছিল, তা সম্পূর্ণ ভাবে জেনে নিয়েছ। তাই তুমি তো সত্যই যথার্থ সম্মান দিলে অতীতের। অতীতের থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে নেওয়াই যে অতীতকে যথাযথ সম্মান প্রদান করা। অতীতকে বিনা বিচারে, তা কেবলই অতীত বলে গ্রহণ করে নেওয়াই তো অন্ধত্ব।

অতীত যদি অমৃতই হতো, তাহলে তো আমরা মুক্তই হয়ে যেতাম এতকালে। অর্থাৎ অতীত বা পূর্বসংস্কার, বা পিতৃ তো শুভ নয়, অশুভ; যথার্থ নয়, অন্ধত্ব। আর তা উপলব্ধি করে নেওয়াই যে অতীতকে যথার্থ মর্যাদা প্রদান, আর তুমি তো তাই করেছ! আমরা অন্ধ ছিলাম তাই ভ্রমিত হয়েছিলাম, আত্মের কথনে। ঠিক যেমন করে সে মহাভারতের কথাকে বিক্রিত করে ধর্মকে অধর্ম আর অধর্মকে ধর্ম করেছে, তেমনই ভাবে, আমাদেরক তোমার কীর্তি নিয়েও ভ্রমিত করেছিল। অতীতকে তুমি অস্বীকার তো করো নি, তুমি তো তাকে যথাযোগ্য সম্মান প্রদান করেছ, তাদের বিচার করেছ, তাদের থেকে আত্মের প্রসারিত অসত্যের নির্যাশকে পর্যবেক্ষণ করে নিয়ে, সত্যকে ধারণ করে তুমি মাতা বীরশ্রী।

ক্ষমা মাতা, তোমাকে অবিশ্বাস করার জন্য ক্ষমা। তোমার মাতৃত্বকে জিজ্ঞাসাচিহ্ন প্রদান করার জন্য ক্ষমা। মূলাধারের দ্বার উন্মোচিত আছে। আমাদের অনুমতি প্রদান করো। আমরা পুনর্জন্ম গ্রহণ করে সত্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা করার জন্য উদগ্রীব এবার। শীঘ্রই আমরা তোমার সাথে, তোমার অনুচর হয়ে সাখ্যাত করবো মা”।

মাতা বীরশ্রী মৃদু হেসে বললেন, “তথাস্তু”।

ভুতেরা সকলে ব্রহ্মাণ্ডের পশ্চাৎদেশ থেকে মুক্ত হয়ে বিদায় নিলে, দেবী চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনা একাধারে অতিশয় দুর্বল হয়ে ভূমিতে দণ্ডায়মান অবস্থা থেকে পতিত হলেন। অন্যদিকে, পিশাচরা বললেন, “মাতা, ভুতদের তো সম্ভাবনা ছিল, তাঁরা তো মুক্ত হয়ে গিয়ে, পুনর্বার ব্রহ্মাণ্ড ধারণ করবে, কিন্তু আমরা! … আমরা তো অভিশপ্ত! আমাদের কি কনো গতি নেই!”

মাতা বীরশ্রী হেসে বললেন, “মা থাকতে সন্তানকে মুক্ত হতে চিন্তিত হতে হবে! তা কি কখনো হয় বাবারা! … পঞ্চভূতের চতুর্ভূত এখানে উপস্থিত, আমার প্রদত্ত শক্তি মেধাকেও এঁদের সাথে যুক্ত করে পঞ্চভূত প্রতিষ্ঠা করে, তোমাদেরকে পুনরায় দেহধারণের উপযোগী করবে। আর এই নাও পুত্ররা, মহাভাবের বীজ নিয়ে যাও, এই বীজ তোমাদের মেধাকে জাগ্রত করতে ও পঞ্চভাবধারণ করতে সহায়তা করবে”।

পিশাচরা একত্রে বললেন, “জয় মা বীরশ্রীর জয়। জয় জগজ্জননী ব্রহ্মময়ীর জয়। আশীর্বাদ করো মা যাতে, নবব্রহ্মাণ্ডে আমরা পিতৃদের থেকে সমস্ত আত্মের শ্লাঘাকে উদ্ধার করে, তাঁদের থেকে মুক্ত হতে পারি। আর কখনো পিতৃকে তৃপ্ত করতে যাবো না মা। বুঝে গেছি, মুক্ত আমরা স্বভাবতই। আত্মের কথনে ভ্রমিত হয়ে, আমরা নিজেরাই নিজেদের বন্দী করে দিই। এই ভ্রান্তি আর করবো না মা। প্রকৃতিই আমাদের একমাত্র আরাধনা হবে, চেতনাই আমাদের একমাত্র প্রেরণা হবে এবার থেকে”।

মাতা বীরশ্রী করুণামাখা নয়নে হেসে বললেন, “তথাস্তু, তোমাদের সাথে আমার শীঘ্রই সাখ্যাত হবে সন্তানরা। তোমরা ১৫ জন পুনরায় তন্ত্রসিদ্ধদের সন্তান হয়ে, ১৫টি তন্ত্রসন্তান হয়ে জন্ম নেবে। আমি তোমাদেরকে অন্যবেশে আমার স্তনদুগ্ধ প্রদান করে উর্বর করে, আমার পরবর্তী লীলাতে তোমাদেরকে নিয়োজিত করে তোমাদের মুক্তির মার্গ প্রদর্শন করবো, আর তোমাদের মাধ্যমে জগতকেও সেই মুক্তিমার্গ প্রদর্শন করবো”।

পিশাচগণ সকলে ভুতদের পথ ধরেই নির্গত হয়ে সেই ব্রহ্মাণ্ড থেকে মুক্ত হলে, সমস্ত পূর্বজন্ম, সমস্ত পূর্বসংস্কার থেকে সেই ব্রহ্মাণ্ড মুক্ত হয়ে যায়। দেবী সমর্পিতা অতঃপরে মাতা বীরশ্রীর কাছে নতমস্তক হয়ে বলে অশ্রুসিক্ত নয়নে বললেন, “আর কত রূপ আছে তোমার মা! … তোমার প্রতিটি রূপই যে, এই ভাব জন্ম দেয় হৃদে যে তোমাকে কাছে পেয়েও পাইনি। এই ভাব জাগায় যে, তুমি অসীম হয়ে সসীমে স্থিতা হয়ে আমাদের সকল সসীমকে অসীমতার ভান করাতে ব্যস্ত।

মাগো, এ যেন কনো এক নেশা মা, যেন অসীমতার নেশা, যেন অনন্তের নেশা। যেন দিবারাত্র অনন্তকে অসীমকে দেখছি, আর তাঁর গুণে মুগ্ধ হয়ে, সাধ করছি যেন তাঁর প্রশংসায় দিবারাত্র যাপন করি। সসীম কি করে অসীমের বিবরণ দিতে পারে! প্রশংসা করেও বা কি করে ক্ষান্ত হতে পারে! কি করে তাঁর প্রশংসা সমাপ্ত করতে পারে! তাই সর্বদাই যেন ব্যর্থ, আর এই ব্যর্থতাই যেন আমাদের প্রফুল্লতার কারণ।

এই ব্যর্থতাই যেন ক্রমশ অধিক অধিক ভাবে আমাদেরকে তোমার কাছে বিলীন করে দিচ্ছে, সত্য বলতে যার লেশ মাত্রও আমাদের দ্বারা কৃত নয়, আবার তোমাকে শ্রেয় দিতে গেলে, তুমিও বলো, এ তোমারও কৃত্য নয়। সত্য বচন, এ যে অসীমতার কৃত্য, কিন্তু মা, এই অসীমতাই যে তুমি। তাহলে তুমিই বলো, এই কৃত্য কি করে তোমার না হয়ে অন্য কারুর হয়! তুমি ছাড়া আর কে আছে যে তাঁর কৃত্য বলে কিছু থাকবে!

আত্ম আছে, কিন্তু আত্ম তো কেবলই চিন্তা, ইচ্ছা আর কল্পনা করতে সক্ষম। অন্য আর কিছু করতে সক্ষম সে! … না মা, সে কেবলই চিন্তা ইচ্ছা ও কল্পনা করে করে, ভ্রমের রচনা করে, আর সেই ভ্রমের পাঁকে সমস্ত ভূতদের স্থাপিত করে, তাঁদের দ্বারা কর্ম করায়, তাঁদেরকে নিজের ভ্রমের পথে চালনা করে। তাহলে তুমিই বলো মা, আর কার কৃত্য করার সামর্থ্য আছে, তোমার বিনা!”

দেবী মমতা আপ্লুত হয়ে বললেন, “মা, অসীম তুমি, নিরাকারা তুমি। … তোমার তো কনো রূপই সম্ভব নয়। কিন্তু আমরা যে অজ্ঞান, তোমারই গুণসমূহ হয়েও, তোমার থেকে বিচ্যুত, তাই অজ্ঞান, আর তাই সাকারবকার ব্যতীত কিছু বুঝিই না। আর তাই অনন্তা, নিরাকারা, অসীমা আমাদের সর্ব্বা, সর্বক্ষণ তত্ত্বধারণ করে, বিভিন্ন রূপের অবতারণা করে থাকে আমাদের কাছে, যাতে আমরা তাঁর নিরাকরত্বকে, তাঁর অনন্ততত্ত্বকে, তাঁর অসীমত্বকে অনুধাবন করে, তাঁর কাছে সদাসদার জন্য লীন হয়ে যাই।

মা, তোমার এই রূপের দ্বারা তুমি কি তত্ত্ব আমাদের প্রদান করলে, আমাদের বলে দাও মা। তত্ত্বের বিস্তারের কারণেই তো তোমার এই রূপধারণ, নাহলে অসীম কি করে সসীমে প্রকাশিত হয়! অসীমের যে তত্ত্বও অসীম, তাই সমস্ত তত্ত্ব তো একটি রূপপ্রকাশে প্রকাশ করা সম্ভবও নয়। তাই মা, তোমার এই রূপের ভেদ আমাদের বলে দাও। বলে দাও মা বীরশ্রী!”

দেবী স্নেহা বললেন, “হ্যাঁ, এই হরিদ্রাবর্ণা বীরশ্রী দেবী, তুমি আমাদের শুভ্রসতেজ সর্বাম্বা বেশে সদা স্থিতা, যার অঙ্গবর্ণ যখন তাঁর মধ্যে উত্তেজনার সৃষ্টি হয় তখন ভোরের আলোকের ন্যায় গোলাপি হয়ে ওঠে, তারই অন্তরে কি তত্ত্ব স্থিত? আর তোমার এই অষ্টভুজা, উন্নীত স্কন্ধধারি, রণসজ্জে সজ্জিত অথচ স্নেহমহী হাস্যলাবণ্য যুক্তা রূপেরই বা কি তত্ত্ব? কেন তুমি এতে দ্বিপ্রহরের ন্যায় হরিদ্রাবর্ণা! তোমার এই হরিদ্রাবর্ণ যেন ঠিক আমাদের মাতা, দেবী মেধার মত। কেন এই বিশেষত্ব মা!”

দেবী বীরশ্রী হাস্যবদনে বললেন, “মেজমা, সেজমা, এই ব্রহ্মাণ্ডের রচয়িতা যে আমি নই, আত্ম, আর আত্ম যে ঠিক আমার বিপরীত চিত্র। আমি জ্ঞান, তো আত্ম অজ্ঞান; আমি প্রেম, তো আত্ম মোহ; আমি স্নেহ, তো আত্ম দ্বেষ; আমি নিঃস্বার্থ, আত্ম স্বার্থ; আমি যথার্থ তো আত্ম ভ্রম। তাই সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডে সমস্ত কিছু যে আমার বিপরীত। আমি যে শূন্য, মহাশূন্য। না আছে আমার কনো সীমা, না অন্ত, না আকার আর না বিকার। না আমাকে চিন্তা করা সম্ভব, আর না আমার বিবরণ দেওয়া সম্ভব।

আমিই সেই ব্রহ্ম, যার কনো দুই নেই; আমি অদ্বৈত। এই অদ্বৈততা যে আমার স্বরূপ, তাও আমার পীড়ার কারণ, কারণ অদ্বৈত হবার কারণে আমি নিঃসঙ্গ। আর তাই তো আমি শূন্যতার নিশিঅবস্থা নাশ করে, ভোরের রচয়িতা ব্রহ্মময়ী। তোমাদের কন্যা, সর্বাম্বা যে পূর্ণরূপে ব্রহ্মময়ী হবার জন্যই অবতারিতা। তাই তো সে সেই ভোরের আলোকের ন্যায় বর্ণধারণ করে অবস্থান করে। ব্রহ্মময়ীর ন্যায়ই শীতল সে, শান্ত সে, প্রেমে উন্মত্ত সে, নিঃসঙ্গতার থেকে মুক্ত হতে ব্যকুল সে, তাই অতি উন্মাদিনী সে নিজের সমস্ত সন্তানদের নিজের বক্ষে ফিরে পেতে।

আর তাঁরই পূর্ব অবস্থা হলো তোমাদের জননী, দেবী মেধা। ভ্রম থেকে সত্যে যাত্রার প্রথম চরণ হলো পরাচেতনা হয়ে ওঠা, মাতৃকা হয়ে ওঠা। মেধা যে সেই পথেরই যাত্রী ছিল। তাই তাঁর অঙ্গবর্ণ পিত। পিত বর্ণ তনু থেকে সে জীবনযাত্রা শুরু করে, ক্রমশ শুভ্র হয়ে ওঠে, অর্থাৎ চেতনার তুঙ্গে যাত্রা করে, আর অতঃপরে সে তোমাদের কন্যা বেশে সর্বাম্বা হয়ে প্রকাশ্যে আসে, যে শুভ্রতা ধারণ করেই অধিষ্ঠিতা, আর ক্রমশ গোলাপি বর্ণের হয়ে চলেছে, অর্থাৎ সে তাঁর যাত্রা পরাচেতনা থেকে শুরু করে পরাপ্রকৃতির পথে যাত্রাশীল।

যতই সে পরাপ্রকৃতির সম্পূর্ণ রূপ ধারণ করে নেবে অর্থাৎ মহামাতৃকা হয়ে উঠবে, এবং অতঃপরে পরানিয়তির পথে, অর্থাৎ ব্রহ্মময়ীর পথে যাত্রা করবে, ততই তাঁর অঙ্গবর্ণ পূর্ণ রূপে গোলাপি হয়ে উঠবে, আর তোমাদের মনোহরা হয়ে বিরাজ করবে। মেজমা, সেজমা, আত্মের এই ব্রহ্মাণ্ডে, তোমরা দিবালোককেই দিব্য মনে করো, আর নিশিকে আসুরিক। কিন্তু বাস্তব তো ঠিক তার বিপরীত!

যেখানে নিশি হলো ব্রহ্মরূপের প্রকাশিতা, শূন্যতার পরিচয়দাত্রী, সেখানে সূর্যালোক সেই শূন্যতাকে আচ্ছাদিত করে ভ্রমের রচনা করে। যেই ব্রহ্মাণ্ড বাস্তবে এক কল্পনামাত্র, সূর্যালোক সেই ব্রহ্মাণ্ডকেই সত্য রূপে তোমাদের সম্মুখে স্থাপিত করে। তাই যারা সেই ভ্রমে আবদ্ধ, তাঁরা যাত্রা করে সূর্যোদয়ের জন্য আশাবাদী হয়ে। কিন্তু আমি যে জ্ঞান মা! জ্ঞান কি করে ভ্রমিত হতে পারে! তাই আমি যাত্রা করি দ্বিপ্রহর থেকে নিশি পর্যন্ত, তবে তোমাদের গতিপথে নয়, তোমাদের বিপরীত স্রোতই আমার যাত্রাপথ।

আমি তোমাদের ঠিক বিপরীত পথে যাত্রা করি। আর তাই আমার প্রথম প্রকাশ মেধা, যিনি পিতবর্ণা আর তাঁর থেকে আমি ক্রমশ ভোরের দিকে অগ্রসর হই। মা, এই জগত যে সম্পূর্ণ বিপরীত। আমার ৩২ কলা অবতার, মার্কণ্ডও তা জানতো, তাই তো সে তন্ত্রের অবতারণা করে, যেখানে সমস্ত কিছুই বিপরীতধারায় অভ্যাস করা হয়। স্রোতের বিপরীতে চলা ইলিশই তাঁদের কাছে আহারের মধ্যে ঈশ, অর্থাৎ ঈশ্বর, কারণ সে যে স্রোতের বিপরীতে চলে।

আমার কাছে উপনীত হতে গেলে যে, স্রোতের সাথে চললে কখনই উপস্থিত হতে পারবে না। জগতের স্রোত, সে তো আত্মের নির্মিত। আত্ম যেদিকে সকলে অগ্রসর হতে বলে, তাই তো জনজীবনের স্রোত। সেই স্রোতে যাত্রা করলে, আত্মকে লাভ করা যাবে, আত্ম’র কাছে নিজেকে নিবেদন করা যাবে, না সেই পথে আমার কাছে পৌঁছাবে, আর না আমার কাছে নিবেদন সম্ভব হবে।

পুত্রী, এই বীরশ্রীও হলো, এই পরাপ্রকৃতির পথে যাত্রার, এই মহামাতৃকার পথে যাত্রার দ্বিপ্রহর, আর তাই বীরশ্রী হরিদ্রাবর্ণা। আমার এই মহামাতৃকার পথে দ্বিতীয় চরণস্থাপন সমাপ্ত হয়েছে, এবার আমি তৃতীয় চরণ স্থাপনের পথে যাত্রা করবো, তাই আমার তিন ভুজাতে অস্ত্র সজ্জিত। অষ্টচরণে আমি এই যাত্রা সমাপ্ত করে, মহামাতৃকা থেকে পরামাতৃকার পথে যাত্রা করা শুরু করবো। তাই আমি দশভুজা”।

বৈরাগ্য বললেন, “মাতা, আত্ম নিজের পুত্র, পৌত্র ও পৌত্রীদের প্রবেশ করিয়েছে এই ব্রহ্মাণ্ডের এই গুহ্য সূক্ষ্মলোকে। এবার তারা ক্রমশ সুষুম্নার মধ্যে প্রবেশ করবে। তারা সশস্ত্র, তারা হীনমানসিকতা যুক্ত। এখনও কি তাঁদের প্রতিরোধ করবো না!”

মাতা বীরশ্রী হেসে বললেন, “পিতা বৈরাগ্য, যোদ্ধা শত্রুনিধনে তৎপর অবশ্যই থাকে, কিন্তু শত্রু যতক্ষণ না নিজেকে শত্রুরূপে আত্মপরিচয় প্রদান করে আত্মপ্রত্যয়ে ভূষিত হচ্ছে, তাঁকে শত্রুরূপে চিহ্নিত করবে কি করে? অপরাধের বাঞ্ছা কি কারুকে অপরাধী করে? না পিতা, অপরাধ আগে তাঁরা করুক। এখনও পর্যন্ত, তাঁরা আমার দুই প্রিয়মাতাতুল্যা, ভূতার যোনিপূরক কামাগ্নিপ্রজ্বলনকারী, ও তাঁদের সন্তানাদি। তাই এখন তো তাঁরা আমাদের শত্রু নন, সম্বন্ধী। যখন তাঁরা সম্বন্ধ ত্যাগ করে, শত্রুতার আসনে স্থিত হবে, তখন তাঁদের সাথে আমরা যুদ্ধে অবশ্যই রত হবো।

পিতা, সময়ের পূর্বে কনো কর্মই সঠিক নয়। জননী পোয়াতি না হলে, তাঁর কি প্রসবযন্ত্রণা জাগে! আর যখন তাঁর প্রসবযন্ত্রণা জাগেনি, তখন কি তিনি সন্তানের জন্ম দিতে পারেন! … তা জন্ম দিতে গেলে, মৃতসন্তানের জন্ম দেন তিনি। তাই সঠিক সময়ের জন্য ধৈর্য ধরো। আর সঠিক সময় এসে গেলে, একদণ্ডও অপেক্ষা করতে নেই। একবার প্রসব যন্ত্রণা জেগে গেলে, আর অপেক্ষা করা যায়না, অপেক্ষা করলেই জননীর মৃত্যু নিশ্চিত হয়ে যায়। তাই নিজেদের প্রস্তুতি সচল রেখো, যাতে সময় আসন্ন হলে, আর একদণ্ডও অপেক্ষা না করতে হয়”।

আত্ম ত্রিছায়ার সেবাশুশ্রূষা করে তাঁদের সুস্থ করে তুললেও, তাঁর মুখ ভারই থাকে। পুত্ররাও উচাটন হয়ে উঠলেন, কারণ তারা তাঁদের মাতাদের কখনো এমন অবস্থায় দেখেন নি। তাই তাঁরা আত্মকে প্রশ্ন করলেন, “পিতা, মাতাদের এমন অবস্থা কি করে হলো? আমরা প্রবেশ করতে পারলাম এখানে, আর মাতারা অসুস্থ হয়ে গেলেন! এই দুইয়ের কি কনো সংযোগ আছে?”

আত্ম গম্ভীর হয়েই বললেন, “না পুত্র, এই দুইকে সংযুক্ত করা উচিত হবেনা, কারণ তোমাদের মাতাদের স্বাস্থ্যের হানির কারণ অন্য কিছু। তাঁরা হলেন জীবের চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনা। আর জীব নিজের পূর্বজন্মের সংস্কারদের প্রভাবে এসেই চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনাতে মত্ত থাকে। যতই তারা মত্ত হয়ে যান, চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনাতে, ততই তোমাদের মাতারা সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হয়ে ওঠেন। কিন্তু সর্বাম্বা এই জীবের ক্ষেত্রে, এই ব্রহ্মাণ্ডে, পূর্বজন্মের সংস্কারদের বিনাশ করে দিয়েছে।

সাথে সাথে, সেই পূর্বজন্মের সংস্কারের রক্ষক, ভুতপ্রেতদেরকেও অপসারিত করে দিয়েছে এই ব্রহ্মাণ্ড থেকে। অর্থাৎ এই ব্রহ্মাণ্ড চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনা থেকে মুক্ত হবার পথে যাত্রা করে দিয়েছে। তাই তোমাদের মাতারা এমন দুর্বল হয়ে পরেছেন, কারণ তাঁদের শক্তিক্ষয় হয়েছে”।

প্রভাত বিমর্ষ হয়ে প্রশ্ন করলেন, “তবে এঁর নিদান কি পিতা! মাতাদের এইভাবে দুর্বল রূপে যে আর দেখা যায়না! … কি করা যেতে পারে?”

তামস ক্ষিপ্র হয়ে বললেন, “তাহলে কি আমরা সর্বাম্বাকে আক্রমণ করে, ওর হত্যা করবো! পিতা আপনি কেবল আদেশ প্রদান করুন। আপনি বললে, আমরা ওর হত্যা করবো, আর বললে, ওর কেশ আকর্ষণ করে, ঘসটাতে ঘসটাতে আপনার সম্মুখে উপস্থিত করবো ওকে”।

রজনী বিরক্ত হয়ে বললেন, “যা পারছো বলে যাচ্ছ ভ্রাতা। একবার বিচার করে দেখো। মেধার পূর্ণসংস্করণ হলো সর্বাম্বা। সামান্য মেধাকে আমরা স্পর্শও করতে পারিনি। আর তারই পূর্ণসংস্করণকে আমরা হত্যা করে দেব, বন্দী করে নিয়ে আসবো, এতো ভ্রাতা মিথ্যা ও বৃথা আস্ফালন ব্যতীত কিছুই নয়!”

আত্ম গম্ভীর হয়ে বললেন, “রজনী সত্য বলছে পুত্র। এই অবস্থায় তোমরা সর্বাম্বার কিচ্ছু করতে পারবেনা। বরং এক কাজ করা যেতে পারে, যা তোমাদের সেই বল প্রদান করে দেবে, যা তোমাদেরকে সর্বাম্বাকে পরাস্ত করার উপযুক্ত করে তুলবে”।

প্রভাত বললেন, “বলুন পিতা, কি করা কর্তব্য আমাদের”।

আত্ম পুনরায় গভীর হয়েই বললেন। সর্বাম্বা নির্লোভ। তাই যা আমি জেনেছি ভুতদের থেকে, সেই অনুসারে সে সুষুম্নার কনো কক্ষ থেকে কনো কিছুই ধারণ না করে, সম্মুখে এগিয়ে যাচ্ছে। তাই তোমরা সকলে, অর্থাৎ তোমাদের পুত্র ও কন্যাদের নিয়ে, সেই স্থানে যাও ও সুষুম্নার থেকে সমস্ত শক্তির সঞ্চয় করো”।

রজনী উচাটন হয়ে প্রশ্ন করলেন, “আর যদি সর্বাম্বা বা মহাভাবরা আমাদের এঁরই মধ্যে আক্রমণ করে দেয়!”

আত্ম মাথা নেড়ে বললেন, “তা তারা করার সুযোগ পাবেনা। পূর্বজন্মের সংস্কাররা বিনষ্ট হতেই, তাদের থেকে যারা পুষ্টি লাভ করতো, সেই ভুত, প্রেত আর পিশাচরা সর্বাম্বার উপর চড়াও হয়েছিল। এখন এঁরা বিনষ্ট হলো, তাই এঁদের থেকে যারা শক্তি সঞ্চয় করতো, সেই যক্ষরা জেগে উঠবে। বিশালাকায় সেই দৈত্যরা সর্বাম্বাদের এমন ভাবে বেষ্টন করে ফেলবে যে, অন্যত্র কি হচ্ছে, তার সন্ধানও পাবেনা তারা”।

রজনী প্রশ্ন করলেন, “আর যেমন করে পূর্বজন্মের সংস্কারদের নিধন করেছে সর্বাম্বা, যেমন করে ভুত প্রেত ও পিশাচদের অপসারিত করেছে, যক্ষদেরকেও যদি তেমনই ভাবে অপদস্ত করে দেয় সর্বাম্বা! তখন? তখন কি, যেই ধন আমরা সুষুম্না থেকে উদ্ধার করবো, তা আমাদেরকে সেই সামর্থ্য দেবে যে, সর্বাম্বার সম্মুখীন হতে পারবো?”

আত্ম বিচলিত না হয়ে, পূর্ণসচেতনতায় বললেন, “না, তোমরা তখন এক ক্রিয়া করবে। তোমরা সর্বাম্বাকে প্রসন্ন করে, তারই থেকে এমন বরদান প্রার্থনা করবে, যা তোমাদের অক্ষয় করে দেবে। অর্থাৎ তোমাদের নিধন অসম্ভব হয়ে যাবে, এমন বরদান কামনা করবে”।

প্রভাত বললেন, “পিতা, আমার মনে হয়, এই কর্মেই মনযোগী হয়ে থাকা অধিক সঠিক হবে। চিন্তা করে দেখুন পিতা, একবার যদি সর্বাম্বা দেখে যে আমরা সমস্ত সুষুম্নার ধন আত্মসাৎ করছি, তাহলে কি আমাদের প্রতি আর সে কখনো প্রসন্ন হবে! সে আমাদের উপর ক্রোধিতই থাকবে। আর যখন সেই ধন আমাদের সুরক্ষা প্রদান করতে ব্যর্থই, তখন সেই ধনের দিকে এক্ষণে না তাকিয়ে, অক্ষয় হয়ে ওঠাতেই মনযোগী হয়ে থাকা সঠিক হবে”।

রজনী সমর্থন জানিয়ে বললেন, “হ্যাঁ পিতা, ভ্রাতা সঠিক বলছেন। একবার অক্ষয় হয়ে উঠলে, আমাদের আর কারুকে নিয়ে কনো দুশ্চিন্তা থাকবে না। না পঞ্চভাবদের থেকে, না মহাভাবদের থেকে আর না সর্বাম্বার থেকে, কারুর থেকে আমাদের আর কনো দুশ্চিন্তা অবশিষ্ট থাকবেনা। তাই আমারও মনে হয় যে, ধনের দিকে না তাকিয়ে, আমরা বরং শক্তিলাভের দিকে তাকাই। সর্বাম্বাই সেই শক্তিপ্রদত্তা। তাই সুষুম্নাতে পৌঁছে বরং আমরা, তাঁকেই তুষ্ট করার প্রয়াস করি, আর তাঁর থেকেই শক্তিলাভ করি”।

প্রভাত উচাটন হয়ে বললেন, “কিন্তু ভ্রাতা, কি ভাবে যে তাকে প্রসন্ন করা যেতে পারে, সেই ধারণাই তো আমাদের নেই। সে কিসের কারণে প্রসন্ন হয়! কার প্রতি সে প্রসন্ন থাকে? কি ভাবে তাঁরা তাকে প্রসন্ন করেন! … কিছু কি জানো সেই ব্যাপারে!”

রজনী বললেন, “মাতৃত্বই তাঁকে প্রসন্ন করে, এমন শুনেছি এখান থেকে মুক্ত হওয়া ভুত আর পিশাচদের মুখ থেকে। অর্থাৎ সন্তান বেশ ধারণ করে থাকতে হবে, তবেই সে প্রসন্ন হবে। আর সন্তান বেশ ধারণ করার সুবিধাও আছে। সন্তান অবাধ্য হলে, সন্তান দুষ্টুমি করলে, সন্তান অবুঝের ন্যায় ব্যবহার করলেও, মা সেই ব্যবহারে অসন্তুষ্ট হননা, বরং তাকে বাৎসল্য জ্ঞান করে, তাকে আশকারা দেন। তাই আমরা অহেতুক ক্ষমালাভও পেতে থাকবো, আর ক্ষমা না করা হলে, দাবিও করতে পারবো সন্তানের বেশ ধরে যে, সন্তান দুষ্টুমি করেছে বলে, মা তাঁকে দণ্ড দেবে! এ কেমন বিচার!”

আত্ম রজনীর কূটবুদ্ধির প্রশংসা করলেন অন্তরে অন্তরে, আর তাঁর নেতৃত্বেই তিনপুত্রকে, ৬ পৌত্রীকে ও ৮ পৌত্রকে সুষুম্নায় গমন করার নির্দেশ দিলেন।

অন্যদিকে, ভুত ও পিশাচরা মুক্ত হতেই, সুষুম্নার দ্বিতীয় দ্বার সর্বাম্বাদের সম্মুখে উন্মোচিত হলো। স্বাধিষ্ঠান সম্মুখে এসে নতমস্তক হয়ে হাস্যমুখে বললেন, “আমাকে চিনতে পারছেন মা! আমি স্বাধিষ্ঠান। আপনার স্নেহের দাস। আমার আরো একটি পরিচয় আছে। আমি সুষুম্নার দ্বিতীয়দ্বারের রক্ষক। ভুত ও পিশাচরা অপসারিত হতে, আমি মুক্ত হলাম তাঁদের থেকে, আর তাই আপনার সেবায় পুনরায় উপস্থিত হতে পারলাম”।

সর্বাম্বা বিশালাকায় সেই স্বাধিষ্ঠানকে দেখে আপ্লুত হয়ে বললেন, “পুত্র, আমরা কি এবার সকলে এই দ্বার দিয়ে প্রবেশ করতে পারবো!”

স্বাধিষ্ঠান হাস্যমুখে বললেন, “মা, এ তো আপনারই রাজপুর, আপনি প্রবেশ করতে পারবেন না এখানে! … এই সম্পূর্ণ সুষুম্নাই যে আপনার নির্মিত। যাতে করে আত্ম আপনার সন্তানদের সার্বিক ভাবে আত্মসাৎ করে নিয়ে তাঁদের আজীবন বন্দী করে দিতে না পারে, তার কারণেই যে আপনি এই পুরের নির্মাণ করেছিলেন, আপনার মায়াবলে। আপনার অনপুস্থিতে ভুতপ্রেত পিশাচ, পিতৃ, এঁরা সকলে অধিকার করে থাকে এই স্থান। দেখুন না, আপনি যেমন যেমন এই পুরের অভ্যন্তরে যাত্রা করছেন, তেমন তেমন তাঁরাও অপসারিত হচ্ছে”।

মাতা সর্বাম্বা হাস্যমুখে শিশুবালিকার ন্যায় প্রশ্ন করলেন, “আর কে কে আছে এই পুরে?”

স্বাধিষ্ঠান হেসে উত্তরে বললেন, “মাতা, যক্ষরা আছেন। তাঁরা ভুতদের আশ্রয়দাতা ছিলেন। ভুতরা অপসারিত হয়েছে, তাই তারা নিশ্চয়ই আপনাদের উপর চড়াও হওয়া শুরু করবে। আমার দ্বার দিয়ে প্রবেশ করলে, তাঁদের সাখ্যাত নিশ্চয়ই পাবেন মাতা। তাঁরা স্বয়ংই আপনাদের আক্রমণের চিন্তা করছে নিশ্চয়। হে মহাভাবগণ, এঁদের থেকে সুরক্ষিত থাকবেন। এঁরা বিশালাকায় দৈত্য। মহাশক্তিশালী, প্রচণ্ড জেদি। এঁদের সম্মুখে উগ্রতা ধারণ করলে, এঁরা ভয়ানক ক্ষতিসাধন করতে সক্ষম ও তৎপরও।

জানি মাতা থাকতে, চিন্তার কিচ্ছু নেই। তবে আমার কর্তব্য আপনাদের সতর্ক করে দেওয়া। এমন যেন না হয় যে, আপনাদের উগ্রতার কারণে, মাতাকে এমন কিছুর মধ্যে জরিয়ে যেতে হয়, যার কারণে, মাতার মাতৃত্বকেই প্রশ্ন করা হয়”।

এমন সতর্কবাণী ধারণ করে সর্বাম্বার সাথে সকল ভূত ও সকল ভাব স্বাধিষ্ঠানের অন্তরে প্রবেশ করলেন। এই কক্ষ অতি মনোরম না হলেও, মূলাধারের ন্যায় অতি উষ্ণ তা নয়। এক আলোক ধারা যেন অনেক দূর থেকে তাঁদের কাছে এসে পৌঁছচ্ছিল। সেই আলোক আত্মের দীপ্তির থেকে ভিন্ন। আত্মের দীপ্তির ন্যায় উগ্রতা নেই এতে, যেন এক অপরিসীম স্নিগ্ধতা রয়েছে আলোকে। তবে সেই আলোকের উৎস তাঁদের অবস্থানের থেকে অনেকটাই দূরে স্থিত। তাই সেই আলোকের উৎসের নিকটে গেলে, কি অনুভূতি হবে, তা সম্বন্ধে এখনই কারুর কনো ধারণা নেই।

সেই স্থানে একটি বিশুদ্ধ জলধারা লাভ করে, সকলে স্নান করে নিজেদের শুদ্ধ করলেন। সকলের স্নানের শেষে যখন সর্বাম্বা স্নান করছিলেন, তখন যেন সমস্ত লোক কম্পিত হতে শুরু করলো, কারুর পদচাপে। মুহুর্মুহু কম্পিত হতে শুরু করলো, সমস্ত লোক। তাই মহাভাবরা নিজেদের অসি নির্গত করে নিলেন, বিরূপ পরিস্থিতির সম্মুখীন হবার জন্য। দেবী শিখা ও দেবী বেগবতী নিজেদের অগ্নিতেজ ও বায়ুতেজকে একত্রিত করা শুরু করলেন। আর পঞ্চভাব, তাঁদের পুত্রীর জন্য হন্যে হয়ে, সর্বাম্বার স্নানের স্থানের দিকে দৌড়ে গেলেন।

সেখানে গিয়ে দেখলেন, সর্বাম্বা নিজের মনে স্নান করছেন। যেন সমস্ত কম্পনাদির দিকে তাঁর কনো ধ্যানই নেই। অপরূপ সুন্দর তাঁদের কন্যার নগ্ন শুভ্রতায় অলঙ্কৃত গোলাপি তনু দেখে, তাঁর মাতারা আপ্লুত হয়ে নিজেদের মধ্যে বলাবলি করলেন, “মাতৃরূপে সুসজ্জিত আমাদের সর্ব্বা। দেখেছ, তাঁর মাতৃস্তনকে। সদা যেন নিজের সমস্ত সন্তানদের ক্ষুধানিবারণে রত। তাঁর দীর্ঘবাহুকে তো দেখো, যেন সমস্ত সন্তানকে একত্রিত করে, আলিঙ্গন প্রদান করে, তাঁদেরকে নিজের বক্ষে আবদ্ধ করে নিতে উদ্যত”।

দেবী মমতার এহেন বাক্যে প্রভাবিত হয়ে, দেবী স্নেহা বললেন, “অঙ্গের বর্ণের শুভ্রতা ও গোলাপি আভাকে লক্ষ্য করে বললেন, “একবার ওর অঙ্গের শোভাকে তো দেখো! পবিত্রতার ঝর্ণাধারা যেন ওর তন, ওর স্পর্শ, ওর রূপের আভা। তাঁর তনুর একটি স্পর্শলাভ যেন বাহির থেকে অন্তর পর্যন্ত শিহরন প্রদান করে সমস্ত কিছুকে অতি অতি পবিত্র করে তোলে”।

দেবী জিজ্ঞাসা হাস্যমুখে বললেন, “কুঞ্চিত অথচ অতি সুসৃজিত কেশবিন্যাসকে তো দেখো, আর সঙ্গে সঙ্গে সেই কেশবিন্যাস তাঁর অতি মনোরম, অতি মলায়ম, এবং অতি শুভ্র পৃষ্ঠদেশকে কেমন আচ্ছাদিত করে রেখে দিয়েছে, তা ও দেখো! যেন মনে হয় সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডের সত্য ধারণ করে রয়েছে নিজের পৃষ্ঠে আর তাকে আত্মের থেকে লুকিয়ে রেখেছে কেশ দ্বারা আচ্ছাদন প্রদান করে”।

দেবী সমর্পিতা ভাবগ্রস্ত হাস্য হেসে বললেন, “যেমন দিব্য তাঁর স্বভাব, তেমনই দিব্য তাঁর রূপ। … তবে আমাদের এখান থেকে প্রস্থান করা উচিত। সর্ব্বা ঐকান্তিক হয়ে স্নান করছে। জগন্মাতা সে। তাঁর প্রতিটি ক্রিয়াতেই থেকে জগতকল্যাণের লীলা। তাই তাঁর কর্মে বাঁধা প্রদান করতে নেই”।

দেবী জিজ্ঞাসা উচাটন হয়ে বললেন, “কিন্তু সমর্পিতা, এই কম্পন বলছে যে সেই দৈত্যাকায় যক্ষরা এদিকেই আসছে। তাঁরা আমাদের সর্ব্বার এমন দিব্যসৌন্দর্যকে দিব্যতা দ্বারা নয়, কামনাদ্বারা যদি দর্শন করে! … আমাদের সর্ব্বার রক্ষা করা উচিত, তাই নয় কি?”

দেবী সমর্পিতা একটি মিষ্ট হাস্য প্রদান করে বললেন, “অতি স্খলিত যার চরিত্র, যে সম্পূর্ণ স্ত্রীজাতিকেই কামনার দৃষ্টিতে দেখে, সেও তাঁর জননীর নগ্ন তনু দর্শন করে নিজের বাৎসল্যরই স্মরণ করে। … ভুলে যেও না দিদি, সর্ব্বা আমাদের কেবল কন্যা নয়, সে জগদম্বা। সকলের জননী সে। যে যতই দুশ্চরিত্র হোক না কেন, সর্ব্বার সম্মুখে এসে, সে তাঁর কামনা হারিয়ে ফেলবে। মাতার ১২ কলা অবতার, বাল্মীকিও তো তেমনই দেখিয়েছিলেন। যেই বেদবতিকে দেখে রাবণ কামাগ্নিতে জ্বলে উঠেছিল, সেই বেদবতিকেই যখন অশোকবনে সীতা মাতার বেশে দেখলেন, তখন তাঁর কামনা নয়, সম্ভ্রম সম্মুখে এসে গেল”।

আরো হয়তো কিছু বাক্যালাপ করতেন সকলে, কিন্তু এক তীব্র কোলাহল ও মুহুর্মুহু কম্পন পঞ্চভাবকে সচেত করে দিলে, তাঁরা স্নানছেত্র ত্যাগ করে সেখানে চলে গেলেন, যেখানে তাঁর পিতারা ছিলেন। সেখানে গিয়ে দেখলেন, বিশালাকায় দৈত্যদের পথ আগলে দাঁড়িয়ে রয়েছেন, তাঁর পিতারা ও মাতামহ মাতামহী ও মাতারা। বিশ্বাস তাঁদেরকে বোঝানোর প্রয়াস করছেন, কিন্তু ব্যর্থ হচ্ছেন। কি যে হচ্ছে, তা বুঝতে না পেরে, এগিয়ে গিয়ে দেখলেন, বিশ্বাস সকলকে বোঝানোর প্রয়াস করছেন কিছু, আর না মহাভাবরা আর না ভূতরা তাঁর কথা শুনছেন, আর না যক্ষরা।

যক্ষরা জেদ ধরেছেন, তাঁরা এক্ষণে মাতার সাথে দেখা করবেন, আর মহাভাব ও ভূতরা জেদ ধরেছেন, এখন তাঁরা মাতার সম্মুখে যেতে দেবেন না। বিশ্বাস একবার মহাভাব আর ভূতদের কাছে ছুটে যাচ্ছে, তাদের বোঝাতে যে, মাতার সাথেই দেখা করতে চাইছে এঁরা, এঁদের কেন আটকাচ্ছেন। আর পরমুহূর্তে যক্ষদের বোঝাতে সচেষ্ট হচ্ছেন যে, মাতার স্নান হয়ে গেলেই, তিনি তাদের সাথে কথা বলবেন। কিন্তু কেউ তাঁর কথা শুনছেন না।

এমনই ক্ষণে যক্ষরা উত্তেজিত হয়ে গিয়ে বললেন, “তোমরা মাতারই ভাব, মাতারই ভূত, তারপরেও মাতাকে নিজেদেরই সম্পত্তি জ্ঞান করে, তাঁর অন্য সন্তানদের তাঁর কাছে যেতে দাওনি। … এর ফল তোমরা ভোগ করবেই”। … অতি উগ্র হয়ে তাঁরা বললেন, “তোমরা যেই ভাবে মাতাকে নিজেদের কাছে বন্দী করে রাখার প্রয়াস করেছ, ঠিক একই ভাবে, যারা মাতাকে বন্দী করার প্রয়াস করে, তারা একদিন তোমাদের মাতাকে তোমাদের থেকে ছিনিয়ে নেবে। মাতাকে বশ করা সম্ভব নয়, কিন্তু আমাদের এই অভিশাপের কারণে, মাতা স্বেচ্ছায় তাদের বশ হবেন, আর তাঁদের এমন এমন বরদানে ভূষিত করবে যে, তোমাদের সকলকে বিনাশ করার অবস্থায় তাঁরা উন্নত হবে।

তোমাদের ক্ষতি হলে, মাতারই ক্ষতি। তাই তোমাদের ক্ষতি হোক, এই অভিশাপ তো দেবো না, তবে হ্যাঁ, তোমাদেরকে ভয়ার্ত করে দেবে তারা, আর তোমাদের মধ্যে প্রাণনাশের ভয় প্রবেশ করবে। মাতা তোমাদের নিশ্চিত ভাবেই রক্ষা করবেন, তবে সেই সমস্ত অধ্যায় তোমাদের এই শিক্ষা দিয়ে যাবে যে, মাতা তোমাদের উপর নির্ভরশীল নন, তোমরা মাতার উপর নির্ভরশীল। তোমরা মাতার অঙ্গ, তা তোমরা ভুলে গেছ, আর তাই তোমরা মাতার উপর নিজেদের অধিকার স্থাপন করে চলেছ। … আমরা যদি একনিষ্ঠ ভাবে, অন্তরমনে মাতাকেই স্থাপন করে থাকি, তাহলে আমাদের এই অভিশাপ অবশ্যই ফলিভুত হবে”।

এত বললে, পঞ্চভাবের সেই কথা স্মরণ এসে যায়, যেই কথা স্বাধিষ্ঠান তাঁদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন। কিন্তু কনো কিচ্ছু বুঝে করবার পূর্বেই, যক্ষরা এবার সকল ভাবদের, সকল ভূতদের ধাক্কা মেরে পথ থেকে অপসারিত করে, সেই স্থানে চলে গেলেন, যেখানে মাতা সর্বাম্বা নগ্ন হয়ে স্নান করছিলেন।

সেখানে প্রবেশ করলে, সকলে ভয়ার্ত হয়ে গেলেন। নগ্নদেহে সর্বাম্বা অতিশয় সুন্দরী। যক্ষরা তাঁর সেই রূপ দেখে কামনায় উদ্ভাসিত হলে, কি হবে, সেই ভেবে। তাই তাঁরাও ভূমি থেকে উঠে ধরমরিয়ে সর্বাম্বার স্নানকক্ষের উদ্দেশ্যে ছুটে গেলেন।

সেখানে যেতে দেখলেন, যক্ষরা মাতার উদ্দেশ্যে বললেন, “মাতা, আমরা যক্ষরা এসেছি তোমার কাছে। আমরা জানতাম, তুমি একদিন না একদিন তো এখানে আসবেই। জানতাম যে, অতিব পরিশ্রান্ত হয়ে তমি আসবে, তাই এই জলধারাকে যতটা সম্ভব স্বচ্ছ রেখেছি, যাতে তা তোমার পবিত্রতার শৃঙ্গার করতে পারে। … আমরা জানতাম যে, এক না একদিন ভুত প্রেত ও পিশাচদের ভ্রম থেকে মুক্ত করে, তুমি এই পুরে প্রবেশ করবেই। আত্মের সমর্থক আমরা কনো কালেই ছিলাম না মা। তুমি তো সর্বজ্ঞাতা, তোমাকে আর নতুন করে কি বলবো!

আত্মের বিরোধ করার সামর্থ্য আমাদের নেই। তাই যদি আত্মের বিরোধ করতাম, তাহলে সে আমাদেরকে এখানে থেকে চলে যেতে বাধ্য করতো। তাই তো ভুতদের আশ্রয়দাতার ভেক ধরে, আমরা এখানে অবস্থান করছিলাম, তোমার অপেক্ষা করছিলাম। মাতা, তুমি তো জানো, দিবারাত্র আমরা এই ভাবধারাই হৃদয়ে স্থাপিত রেখেছিলাম যে, যেই মায়াবী শক্তি তুমি আমাদের দিয়েছ, সেই সমস্ত মায়াবী শক্তিধারণ করে, একদিন তোমার মধ্যে প্রবেশ করে, তোমার হৃদয়ের নিকটে স্থাপিত হবো। মা, আমাদের উদ্ধার করো”।

মাতা সর্বাম্বা এবার তাঁর নগ্নতনুতেই বিপরীতদিশাতে ঘুরে গেলে, তাঁর অসম্ভব সুন্দর তনুর ঊর্ধ্বাংশ ভূত ও মহাভাবরা দেখে, এই ভয়ে যে তাঁদের কামনা না জাগ্রত হয়ে যায়, মাথা নত করে নিলেন। কিন্তু যক্ষরা তা করলেন না। তাঁরা বললেন, “মাতা, এ কেমন লীলা তোমার! … এই নগ্নতা ধারণ করে, তুমি আমাদের দ্বারা মহাভাব ও ভূতদের অবিশপ্ত করালে কেন মা!”

সর্বাম্বা, নিজের নগ্নতাকে বস্ত্রদ্বারা আবৃত করতে করতেই বললেন, “পুত্র, মহাভাবরা ও ভূতরা আমার অঙ্গ, তাঁদের সকলকে ধারণ করেই, আমি পূর্ণব্রহ্মময়ী। কিন্তু তাঁদের মধ্যে যে অশুদ্ধি নিবাস করছে। পুত্রের মাতার প্রতি কামনা জন্মায় না, জন্মায় স্নেহ। মাতার স্তনদেশে কামনার উদ্দেশ্যে তাকানো সন্তানের ভাব নয়, সন্তানের কাছে যে সেই স্থান আহার লাভের ক্ষেত্র। আসলে, তাঁরা মুখে আমাকে মাতা বলে, কিন্তু অন্তরে অন্তরে আমাকে স্ত্রী জ্ঞান করে। তাঁদের এই বোধ নেই যে আমার কনো লিঙ্গই সম্ভব নয়, কারণ আমি নিরাকারা।

তাঁদের মধ্যে আমাকে নিয়ে এখনো সংশয় আছে, এখনো তাঁরা জগন্মাতার অর্থ বোঝেনি। তাই তাদেরকে শুদ্ধ তো আমাকে করতেই হতো। … পুত্ররা, আমিও তোমাদের জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। আর অপেক্ষা করছিলাম, কতক্ষণে তোমরা মহাভাব ও ভূতদের শুদ্ধতার উদ্দেশ্যে শ্রাপিত করে, আমার কাছে আসবে, তার জন্য। … এসো পুত্ররা, এসো যক্ষকন্যারা, তোমাদের মাতার হৃদয় তোমাদের অপেক্ষা করছে”।

জলসিক্ত অপরূপা সর্বাম্বা নিজ তনুকে বিশালাকায় করে নিলেন, যাতে তাঁর সকল যক্ষপুত্র ও যক্ষকন্যারা তাঁকে বেষ্টন করতে পারেন। শিশুর মত আনন্দের সাথে, মাতার কাছে সমস্ত যক্ষ পুরুষ ও স্ত্রীরা ছুটে গিয়ে মাতাকে আগলে ধরলেন। মাতা সকলের তনুকে আঁকড়ে ধরে, কারুর মস্তকে স্নেহের হস্ত রাখলেন, তো কারুর পৃষ্ঠে স্নেহের হস্ত আন্দুলিত করলেন। ক্রমশ মাতার প্রেমে, সকল যক্ষরা তাঁর সাথে আবিষ্ট হলে, নিজেদের তাঁরা মাতা থেকে অভিন্ন বোধ করতে থাকলেন, আর অবশেষে, মাতার মধ্যে লীন হয়ে গেলেন একেএকে।

মাতা তাঁদের সকলকে ধারণ করে, জলসিক্ত বস্ত্রে, নিজের মাতৃত্বের সমস্ত চিহ্নকে নিজের তনুতে প্রস্ফুটিত করে, সর্বকনিষ্ঠ এক যক্ষশিশুকে নিজের ক্রোড়ে ধারণ করে অবস্থান করলে, তিনি চতুর্ভুজা মহাতেজা যাক্ষায়িনী বেশ ধারণ করলেন। তাঁর অঙ্গ স্বর্ণের ন্যায় চমক প্রদান করতে থাকলো, তাঁর চার হস্তে, শিশু সেবার উদ্দেশ্যে, চার সামগ্রী শোভিত হতে থাকলো। দক্ষিণ দিকের উপরের হস্তে শোভিত পেল, তালপাতার পাখা সন্তানকে বাতাস করার জন্য। দক্ষিণ দিকের নিম্ন হস্তে শোভিত পেলো হাতে বুনন করা কাঁথা, সন্তানকে শয়ন করার জন্য। বাম হস্তদ্বয়ের ঊর্ধ্বহস্তে শোভিত পেল বরাভয় মুদ্রা, এবং নিম্ন হস্তে শোভিত পেল, নির্ভয়তা প্রদানের মুদ্রা।

মাতার এই অভূত পূর্বরূপ দেখে বিশ্বাস নতজানু হয়ে বসে বললেন, “কি অপরূপ মনোলোভা রূপ প্রদান করলে মা তুমি! … তুমি যে জগজ্জননী! সমস্ত সন্তান তোমারই সন্তান, আর তাই তোমার নগ্নপ্রায় তনু সন্তানের প্রসূতির চিহ্ন, সন্তানকে স্তনদান করে তাঁকে জীবনদানের চিহ্ন। তোমার হস্তচারও সেই একই কথা বলে যে, তুমি সর্বদা তোমার সন্তানের সেবা করাতেই ব্রতী থাকো। কি অপরূপ মনোলোভা রূপ তোমার! … সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডের হৃদয়ে তোমার ক্রোড়ে স্থিত হয়ে তোমার বাৎসল্য লাভের বাসনা জন্ম নেবে, তোমার এই রূপ দর্শন করে, তাই তোমার এই রূপকে আমি বাৎসল্যপ্রিয়া এই নামেই অঙ্কিত করলাম”।

দেবী স্নেহা অশ্রুসিক্ত নয়নে গদগদ হয়ে বললেন, “হে দেবী বাৎসল্যপ্রিয়া, প্রণাম গ্রহণ করো হে দেবী যক্ষেশ্বরী। … তুমি আজিবতকাল যক্ষদের অধীশ্বরী হয়েই চিহ্নিত থাকবে”। … দেবী সমর্পিতা নতজানু হয়ে বললেন, “শুধু যক্ষের কেন, মা আমাদের সকলের অম্বা, সকলের জননী। তাই তো আমরা তাঁর নাম দিয়েছিলাম, সর্বাম্বা। মা আমাদের সর্বজননী। যা কিছু ভাবা যায়, যা কিছু ভাবাও যায়না, সকলের জননী তুমি, সর্বমাতা”।

যক্ষরা মাতার মধ্যে লীন হবার পরে, ত্রিছায়াদেবী পুনরায় অসুস্থ হয়ে পরলেন। সেই দেখে, সুষুম্নাতে যাত্রারত আত্মপুত্ররা প্রত্যাবর্তন করলেন তাঁদের মাতাদের কাছে। সেই দেখে, আত্ম হুংকার ছেড়ে বলে উঠলেন, “যেমন যেমন সর্বাম্বা বাঁধামুক্ত করতে থাকবে সমস্ত কিছুকে, তেমন তেমন তোমাদের মাতারা দুর্বল হয়ে পরবেন। আমি এখানে আছি, তাঁদের দেখাশুনা করার জন্য। তোমরা যা করতে সক্ষম, তাই করতে যাও। এদিকে দৃষ্টিপাত করে সময় নষ্ট করো না।

সেই সময়ে বরং সর্বাম্বার দুর্বলতার সন্ধান করো, আর তাকে তোমাদের মায়াপাশে আবদ্ধ করে, তাঁর থেকে অমরত্বের বরদান গ্রহণ করো। স্মরণ রাখবে, তিনি সরাসরি অমরত্বের বরদান দেবেন না। আর এও স্মরণ রাখবে যে, সহজে তিনি বরদানই প্রদান করবেন না। তাঁকে যদি বিবশ করে দিতে পারো, তবেই তিনি বরদান দেবেন, নচেৎ নয়”।

আত্মের থেকে সেই কথা শুনে, মাতার অসুস্থতার কারণ যেই সর্বাম্বা, তার প্রতি প্রতিহিংসা ধারণ করে, আস্ফালন করতে করতে তিন অহমপুত্র সুষুম্নাতে প্রবেশ করলেন, তাঁদের সমস্ত পুত্র ও পুত্রীদের সঙ্গে নিয়ে।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22