সর্বাম্বা কাণ্ড (কৃতান্ত প্রথম কাণ্ড)

সর্বাম্বার প্রতি সকলের সমস্ত মনোভাব পরিবর্তিত হয়ে গেল, এই একটি ঘটনার মাধ্যমে। সকলের মুখে জগন্মাতার দিব্যতার চর্চা হতে থাকলো। কেবল ভূতদের মধ্যেই তা সীমিত রইল না, ভাবদের মধ্যেও তা সীমিত রইল না, তা প্রবাহিত হলো সকলের মধ্যে, এমনকি আত্মদের কাছেও তা চর্চার বিষয় হয়ে গেল। দেবী রুচি অর্থাৎ ইচ্ছা এবং চিন্তা, কল্পনা সমস্ত কথা আত্মকে এসে বলতে, আত্ম প্রথমত ভীত হয়ে উঠলো, এই ভেবে যে মাতাকে এই পরাচেতনা পর্যন্ত যাত্রাই করতে দেওয়া ঠিক হয়নি।

আগে যদি সে জানতো যে মেধার রূপের আড়ালে, মাতা অবতীর্ণা হয়ে পরাচেতনার যাত্রা করছেন, তাহলে অঙ্কুর অবস্থাতেই মেধার হত্যা করতো। দেবী চিন্তা সেই কথা শুনে হাস্যপ্রদান করে বললেন, “সত্য বলতে মহারাজ, আমরা কিচ্ছু করতে পারতাম না। মেধাকে স্পর্শ করার সামর্থ্যও আমাদের ছিলনা, কনো কালেই ছিলনা। আসল কথা এই যে, পবিত্রতা এক মহাকবচ, যাকে ভঙ্গ করা তো পরের কথা, যাকে স্পর্শ করার সামর্থ্যও আমার আপনার কারুর মধ্যে নেই”।

আত্ম চিন্তিত হয়েই বললেন, “এখনো সমস্ত কিছু সমাপ্ত হয়নি দেবী। মাতাকে পূর্ণতা প্রাপ্ত করতে তিন কদম স্থাপন করতে হয়, প্রথম পদক্ষেপ সম্পূর্ণ চেতনাকে ধারণ করতে, দ্বিতীয় কদম সম্পূর্ণ প্রকৃতিকে ধারণ করতে, আর তৃতীয় কদম সম্পূর্ণ নিয়তিকে ধারণ করতে। এই তিন পদক্ষেপেই মাতা ব্রহ্মময়ী হয়ে ওঠেন। এখনো পর্যন্ত মাতা একটিই পদক্ষেপ রেখেছেন, আমরা এখনো মাতাকে দুটি পদক্ষেপ নেওয়া থেকে আটকাতে পারি”।

দেবী চিন্তা বললেন, “নাথ, এই তিন কদমের উপযোগিতা কি? এই তিন কদম কেনই বা আর কি ভাবেই বা মাতাকে সম্পূর্ণা করে তোলে? এই বিষয়ে আমাদের জানা আবশ্যক। আমরা কেনই বা মাতার সম্মুখে দাঁড়ালেই, এমন ভস্মীভূত হয়ে যাবার ভান করি! এর নিদান কি প্রভু?”

দেবী ইচ্ছা ও দেবী কল্পনাও সম্মুখে এসে বললেন, “হ্যাঁ নাথ, এর উত্তর আমাদের জন্য খুব আবশ্যক। যেখানে আমরা সকলকিছুকে গ্রাস করে নিতে সক্ষম, সকলকে নিজেদের অধীনে করে নিতে সক্ষম, সেখানে মাতার রূপের দিকে আমরা সঠিক করে তাকাতেও পারিনা। এমন কেন? কি এমন হয়ে যায়, সেই তিন কদমে, যার কারণে আমরা ত্রিদেবী এমন লাচার হয়ে যাই?”

আত্ম পূর্ণ অহম ধারণ করে, নিজের মত করে ব্যক্ত করার উদ্দেশ্য নিয়ে বলা শুরু করলেন, “দেবীরা, এর জন্য জগন্মাতাকে জানা আবশ্যক। তিনি কেন মাতা না হয়েও মাতা, তা জানা আবশ্যক। তিনি কেন একমাত্র মাতা, তাও জানা আবশ্যক। আর তার সাথে সাথে, আমাদের ভূমিকাও জানা আবশ্যক।

দেবী, আমরা কি? আমরা একটি ধারণা। আত্মবোধ আমরা। আমি একটি ভিন্ন অস্তিত্ব, এই ধারণা। নিজের আত্মের প্রতিষ্ঠার ইচ্ছা, নিজের আত্মের বিস্তারের চিন্তা, আর নিজের আত্মের সুখসমৃদ্ধির কল্পনা, এই তিন নিয়েই আত্ম অস্তিত্বের ভান, আর সেই ভানই আমরা দেবী। হ্যাঁ, আমাদের রচয়িতা সেই ব্রহ্মময়ী মাতাই। তিনি অনন্ত, অসীম, আর অব্যক্ত। সেই অসীমতা এক আনন্দ, আর এক পীড়াও। আনন্দও একমাত্র অস্তিত্ব হবার কারণে, আর বেদনাও একমাত্র অস্তিত্ব হবার কারণেই।

একমাত্র অস্তিত্ব, তাই না আছে কনো প্রতিদ্বন্ধী, না আছে কনো প্রতিযোগী, না আছে কনো বিবাদ, আর না আছে কনো দ্বন্ধ। কিন্তু দুই নেই, তাই যে কনো স্নেহদানও নেই, কনো বিশ্বাস অর্পণও নেই, কনো ভাবও নেই। ব্রহ্মময়ী এই ভাব লাভ করার জন্যই আমার রচনা করেছিলেন। কিন্তু আমি কি আর ভাবের ধাত ধারি! … আমি প্রকাশ্যে আসার সাথে সাথে, স্বয়ং মাতারই অস্তিত্ব মুছে দিয়ে, আমিই একমাত্র সত্য, এই বার্তা প্রদান করা শুরু করে দিই।

এই বার্তা প্রদান করেই ক্ষান্ত হইনা আমি। আমি জানি যে, আমার এই ধারণাকে মাতা কিছুতেই মান্যতা দেবেন না। তাই আমি মাতাকেই টুকরো টুকরো করে দিই। তাঁকেই তিন খণ্ডে বিভক্ত করে দিই, পঞ্চভূত, পঞ্চভাব ও মহাভাব। এই পঞ্চভূতদের সম্মুখে আসতে দিলেও, এঁদের মধ্যে মেধাকে আমি কখনোই সহন করতে পারিনা। তাঁর মধ্যে এতোটাই অধিক পবিত্রতা যে আমার ভয় করে যে, এই পবিত্রতার বিস্তার হলে, মাতা না আবির্ভূতা হয়ে যান। আর অন্যদিকে এও দেখি যে, এই পঞ্চভাব হলো সেই ভাব যা পূর্ণরূপে মাতাকে প্রকাশিত করে দিতে সক্ষম আর এই সমস্ত ভাব মেধার হাত ধরেই আসতে সক্ষম। তাই প্রথম আমি মেধাকে প্রতিস্থাপন করি, দেবী কল্পনা, তোমাকে দিয়ে। আর তারপরেও, বাকি ভূতদের বিচার ও বিবেকদের সম্বন্ধে স্মৃতি থাকে, তাই তাদেরকেও প্রতিস্থাপন করি দেবী চিন্তা ও দেবী ইচ্ছা, তোমাদের দিয়ে।

সত্য বলতে, আমি তোমাদের মাধ্যমেই, মাতার মধ্যে এই তিনরূপ ভেদের রচনা করি, যা বাস্তবে কনো ভেদই নয়, কেবলই এক মায়া। আর দেবী, মাতার এই তিন কদম, এই তিনের ভেদকে বিলীন করার উদ্দেশ্যেই। ভূতদের উন্নীত করা হলো মাতার প্রথম পদক্ষেপ, যেই পদক্ষেপের মাধ্যমে মাতা চেতনাকে চরমে উন্নত করে নেন। এই পদক্ষেপের কালেই মাতা পঞ্চভূতকে প্রকাশ্যে আনেন আর পরবর্তী পদক্ষেপের কালে, এই পঞ্চভূতকে শ্রেষ্ঠতার মানে নিয়ে যান, এবং তখন তিনি পরাপ্রকৃতি হয়ে ওঠেন।

আর অন্তিম পদক্ষেপের কালে, তিনি মহাভাব, অর্থাৎ বিচার, বিবেক আর বৈরাগ্যকে শ্রেষ্ঠত্বে ভূষিত করে, পরানিয়তি হয়ে যান। আর একবার তা হয়ে গেলে, মাতা নিজের অসীমতার ভান করে নেন, আর তখন আর তাঁর মধ্যে আমি বা অন্যের ভেদ থাকেনা। একাত্মতা এসে যায়, অসীমতা ফিরে আসে, আর আমার নাশ হয়ে যায়। আমার যখন নাশ হয়, তখন উৎপন্ন হয় অসম্ভব ভাবের লহর, যেই লহর ক্রমশ আমার সমস্ত অস্থিকে চুরমার করে দেয় দেবী।

বুঝতে পারছেন আমি কি বলছি! মাতাই আমাকে নির্মাণ করেছেন, আর কেন নির্মাণ করেছেন? কারণ আমার সমস্ত অস্থি ভেঙে আমার নাশ করবেন বলে। হ্যাঁ দেবী, আমার নাশ করবেন বলেই মাতা আমার রচনা করেছেন। আমাকে পীড়া দেবেন বলেই, মাতা আমার নির্মাণ করেছেন। এবার আপনারাই বলুন, সেই পীড়া আমি কেন গ্রহণ করবো! সেই পীড়া গ্রহণ করবো না বলেই আমি সমানে মাতাকে সেই অবস্থায় উন্নীত হওয়া থেকে আটকাই। এবার আপনারাই বলুন, আমি কি কিছু ভুল করি!”

দেবী কল্পনা প্রশ্ন করলেন, “কিন্তু নাথ, আপনি কি তাহিলে মেধার সত্য জানতেন? যদি জানতেন, তাহলে তাঁকে আটকালেন না কেন? আর আমাদের এই দহনের কারণই বা কি? মহারাজ, সমস্ত কিছুর মধ্যে যেন আরো অনেক কিছু জানার রয়েছে, আমাদের সম্পূর্ণটা বলুন কৃপা করে”।

পূর্ণ অহম ধারণ করে আত্ম বললেন, “না দেবী, মেধার সত্য আমার কাছেও অজানা ছিল, তবে মেধার পবিত্রতা সম্বন্ধে আমি জানতাম, আর তাই মেধা যে মাতার আগমনের কারণ হতে পারে, সেই আশঙ্কা সর্বদাই, সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডেই আমার থাকে। আর তাই মেধাকে আমি সর্বদা আচ্ছাদিত করে রাখতে সচেষ্ট থাকি। একই ভাবে বিবেক ও বিচারকেও। তবে অন্য ব্রহ্মাণ্ডে, এত সহজে মেধার বিকাশ হতে পারেনা, কারণটা আমি আপনাদের আগেও বলেছি। অন্য ব্রহ্মাণ্ডে, ধরা আমার প্রেমিকা হয়ে থাকে, আর তাই মানস ধরার সাথে অবৈধ সম্পর্ক স্থাপনের কারণে চক্ষুশূল হয়ে থাকে, আর এর ফলে, ধরা আর মানসের সঙ্গম সেই পর্যায় উপস্থিতই হয়না, যাতে করে শিখা আর বেগবতীর পর মেধারও জন্ম সম্ভব হয়।

দেবী এই ব্রহ্মাণ্ডে যা হলো, সেই বার্তাকে লুক্কায়িত রাখতেই হবে সকলের থেকে, কারণ এই তথ্য যদি সকলে জেনে যায়, তাহলে সকলেই নিজের মানসের সাথে ধরার বৈধ বিবাহ স্থাপন করবে, আর সকলের মধ্যেই মেধার জন্ম সম্ভব হয়ে উঠবে। আর মেধার জন্ম হলে, সে যে এক না এক সময়ে মহাভাবদের জাগিয়ে তুলে, পঞ্চভাবদের জন্ম নিশ্চিত করবে, এতো আপনাদের কাছেও পরিষ্কার, আর আমার কাছেও।

অর্থাৎ মধ্যা কথা, মেধার জন্মকেই প্রতিরোধ করতে হবে আমাকে, যা আমি সাধারণত করেই থাকি, কিন্তু আমারও ধারণা ছিলনা যে, মেধার জন্ম হলে ঠিক কি কি হয়। তবে এবার তা ধারণা হয়ে গেল, আর তাই আমি আরো অধিক সতর্ক থাকবো, যাতে মেধার জন্ম না হতে পারে। আর রইল কথা, মাতার তিন পদক্ষেপ ও তোমাদের মাতার রূপ দেখা মাত্রই দহনের অনুভব, সেই কথা আমি তোমাদের যথাসম্ভব বিস্তারে বলছি দেবী।

মাতা তিনখণ্ডে বিভাজক আমি। আমি তোমাদেরই সাহায্যে, মাতাকে তিনখণ্ডে বিভক্ত করে, তাঁর একত্রীকরণকে অসম্ভব করে রেখে দিই। কেন তা করি, তা তোমাদের পূর্বেই বলেছি, এবার কি ভাবে তা করি, তা তোমাদের বলছি শ্রবণ করো। দেবীরা, আপনাদের জন্ম মাতারই থেকে, বা বলতে পারেন, মাতার ভাবেরই ছায়া আপনারা তিনজনে।

মাতার মধ্যে যেই স্নেহ ও মমতা ও জিজ্ঞাসার ভাব জন্ম নেয়, এবং তিনি স্বয়ং স্বয়ংকে প্রেমে উদ্ভাসিত করে, নিজের একাকীত্বকে দূর করতে চান, তার থেকেই দেবী সাধ বা বাসনার সূত্রপাত। আর সেই সাধের অন্তরে থাকা সুপ্ত ভাবই আপনি অর্থাৎ দেবী ইচ্ছা। মাতার মধ্যে সেই ভাবে বিভোর হয়ে থাকার যেই বাসনা, সেই বাসনাকে তৃপ্ত করার অভিলাষ থেকে জন্ম নেয় সেই অভিলাষকে পরিপূর্ণ করার যোজনা, আর সেই যোজনারই মধ্যে থাকা সুপ্ত ভাব হলেন দেবী আপনি, অর্থাৎ চিন্তা।

আর মাতা দিবারাত্র সেই ভাবে নিমগ্ন থেকে, প্রেমে নিমগ্ন থাকতে যেই ভাবের রচনা করেন, তারই মধ্যে সুপ্ত ভাব হলেন দেবী আপনি, অর্থাৎ কল্পনা। আমি মাতারই এই তিন সুপ্তভাব, যাদেরকে মাতা গ্রহণ করেন না, কিন্তু যাদের উপর ভিত্তি করে, মাতা নিজের অন্তরে সমস্ত ভাবের জন্মদেন, তাঁদেরকে হনন করি। কেন মাতা তা গ্রহণ করেন না? মাতা পবিত্র, মাতা নিজেকেই নিজের সন্তানরূপে বণ্টন করে, মাতৃত্ব প্রদান ও মাতৃত্ব লাভে আনন্দিত।

কিন্তু তিনি যে অদ্বিতীয়া, তিনি যে শূন্য, ব্রহ্ম স্বয়ং, তাই তাঁর যে দুই হয়না। সেই দ্বৈতকরনের কারণেই, মাতা সন্তানলাভের ইচ্ছাকে ধারণ করে, কিন্তু সন্তান লাভ করে ফেলার পর, সেই ইচ্ছা মাতার কনো কাজে লাগেনা, কারণ সেই ইচ্ছা সত্যকে অসত্যে পরিণত করে দেয়, অদ্বৈতকে দ্বৈতে পরিণত করে দেয়, অসীমকে সসীমে পরিণত করে দেয়, তাই তা কলুষিতভাব, আর মাতা তাই সেই কলুষতাকে সম্পূর্ণ ভাবে ত্যাগ করে দেন।

ত্যাগ করেন তিনি ইচ্ছাকে, আর গ্রহণ করে নেন বিবেককে। এই বিবেকের সাথে তিনি নিজের পবনের ন্যায় মমতার ভাব, অর্থাৎ চঞ্চলতা, গতি ও ব্যপ্ততাকে মিশ্রিত করে নিজের অন্তরে স্নেহ ও মমতাকে আশ্রয় দেন, আর ইচ্ছাকে ত্যাগ করে দেন। কেন? কারণ বিবেক পবিত্র ও মাতৃত্বপূর্ণ স্নেহ ও মমতাকে ধারণ করে, যা লাভের বা সম্ভোগের ভাব নয়, বরং তা দানের ভাব। আর ইচ্ছা এরপরে ক্রমাগত ভোগের ভাব বিস্তার করতে শুরু করে, অর্থাৎ সে এবার আর দান করতে চায়না, এবার সে কিছু লাভ করতে চায়। আর আমি মাতার সেই পরিত্যক্ত সামর্থ্যকে গ্রহণ করে নিই।

সমান ভাবে, মাতা নিজের সন্তানদের লাভ করার পরে, তাঁদেরকে নিজের মাতৃত্ব দ্বারা তৃপ্ত করার চিন্তা স্থাপন করেন, কিন্তু সেই চিন্তা স্থাপন করে তিনি ক্ষান্ত থাকেন না। সেই চিন্তাকে তিনি যুক্তি ও তর্ক দ্বারা উদ্ভাসিত করে, বিচারে নিমগ্ন করেন, আর অবশেষে বিচারকে নিজের অন্তরে রেখে, চিন্তাকে দূর করে দেন। কেন? একই কারণ দেবী, বিচার শুদ্ধ জিজ্ঞাসাকে ও বিশ্বাসকে জন্ম দেয়, মাতার উর্জ্জা অর্থাৎ অগ্নির সাথে মিলিত হয়ে। অর্থাৎ বিচার মাতাকে দাতার স্থানে রাখেন, যেই স্থানেই তিনি থাকতে পছন্দ করেন, আর বাকি চিন্তা মাতাকে বিরক্ত করে, কারণ তারা মাতার মধ্যে কি লাভ করলাম, সেই ভাবের উচাটনতা প্রদান করে, যা মাতার সম্পূর্ণ ভাবে অপছন্দ। আর আমি তাই মাতার এই বর্জিত সামর্থ্যকে গ্রহণ করি।

একই ভাবে, মাতা প্রেম ও সমর্পণ ধারণ করেন নিজের সন্তানদের প্রতি, আর তা করার জন্য, তিনি গ্রহণ করেন কল্পনার ভাব। কিন্তু কল্পনাকে তিনি গ্রহণ করেন না, কারণ কল্পনা তো কেবলই লাভ করতে চায় কিছু না কিছু, আর মাতা তো প্রদান করতে চান, দিতে চান, কিছু না কিছু। তাই মাতা সমর্পণ ও প্রেম গ্রহণ করার জন্য কল্পনার সার অর্থাৎ বৈরাগ্যকে গ্রহণ করে, তাঁকে নিজের পবিত্রতা, অর্থাৎ মেধার সাথে মিলিত করেন, আর কল্পনাকে ত্যাগ করে দেন। আর তাই আমিও কল্পনাকে উঠিয়ে নিই।

অর্থাৎ ছায়াদেবীরা, আপনারা সকলেই মাতারই বর্জন করা সামর্থ্য। বিচার ও নিজের উর্জ্জার মাধ্যমে, মাতা জিজ্ঞাসা ও বিশ্বাসকে অর্জন করার জন্য, দেবী চিন্তা আপনাকে প্রকট করেন, কিন্তু বিচারকে ও বিচার ও উর্জ্জার মিলন থেকে জিজ্ঞাসা ও বিশ্বাসকে অর্জন করার পর, আপনাকে বর্জন করে দেন। বিবেক ও নিজের চঞ্চলতার মাধ্যমে মাতা প্রকট করেন স্নেহ ও মমতা, আর অতঃপরে দেবী ইচ্ছা, আপনাকে মাতা প্রকট করেন, অতঃপরে স্নেহ ও মমতাকে নিজের কাছে ধারণ করে, আপনাকে বর্জন করেন তিনি। আর বৈরাগ্য ও নিজের পবিত্রতাকে মিলিত করে, মাতা সমর্পণ ও প্রেম লাভ করেন, এবং তা সঞ্চিত রাখেন নিজের কাছে নিজের সন্তানদের তা প্রদান করার জন্য, আর অতঃপরে দেবী কল্পনা, আপনাকে তিনি বর্জন করেন।

আর আমি আত্ম, আপনাদের তিনজনকেই তুলে আনি নিজের কাছে। মাতা জিজ্ঞাসা ও বিশ্বাসের মাধ্যমে নিজের চেতনাকে অর্থাৎ তিনি যে জগজ্জননী, সেই বোধকে জাগ্রত করেন, আর সেটিই তাঁর প্রথম পদক্ষেপ, অর্থাৎ পরাচেতনা হয়ে ওঠা। এরপর মাতা স্নেহ ও মমতাকে ধারণ করে এই বোধ ধারণ করেন যে তিনি হলেন পরাপ্রকৃতি, অর্থাৎ তিনিই সমস্ত ব্রহ্মাণ্ড, যাকে আমি নির্মাণ করি, তার মূল উপাদান। আর অন্তিম পদক্ষেপে, মাতা পূর্ণ ভাবে সমর্পণ ও প্রেমকে ধারণ করে পরানিয়তি ব্রহ্মময়ী হয়ে ওঠেন, অর্থাৎ তখন তাঁর সম্পূর্ণ বোধ জেগে যায় যে তিনিই একমাত্র অস্তিত্ব, অর্থাৎ তিনি হলেন নিষ্ক্রিয় ব্রহ্ম।

দেবীরা, এই অধচেতনা অবস্থা থেকে, পরাচেতনা হয়ে ওঠা, পরাপ্রকৃতি হয়ে ওঠা, এবং পরানিয়তি হয়ে ওঠার মধ্যে, মাতা নিজেকে নিজে অধিক অধিক ভাবে অনুভব করেন। অর্থাৎ এই যে, তিনিই নিজের সন্তান বেশে অবস্থানরত, আর সেই অবস্থানরত সন্তানরা মাতার সাথে মিলিত হবার আনন্দ ভোগ করতে থাকেন, আর সেই আনন্দবোধ মহানন্দ হয়ে ওঠে, যখন তিনি নিজেকেই পরাপ্রকৃতি বেশে অনুধাবন করেন আর তা পরমানন্দ হয়ে ওঠে যখন তিনি নিজেকেই নিজে পরানিয়তি ব্রহ্মময়ী অর্থাৎ নিষ্ক্রিয় ব্রহ্মের সক্রিয় অবস্থা রূপে গণ্য করতে শুরু করেন।

আর সেই বোধ একবার জন্ম নিয়ে নিলে, আমার আর কনো অস্তিত্বই থাকবেনা। তাই আমি তাঁরই বর্জিত তিন সামর্থ্যকে ধারণ করে, তাঁর এই ব্রহ্মময়ী হয়ে ওঠার পথে বাঁধার রচনা করি। তাঁর চারটি ভূত, অর্থাৎ মন মানে মানস, ধরা মানে দেহ, শিখা মানে অগ্নি বা উর্জ্জা, আর বেগবতী মানে চঞ্চলতা বা প্রাণ প্রকাশ্যেই থাকে, আর আমি তাঁদের সম্মুখে, বিবেকের স্থানে রেখে দিই ইচ্ছাকে আর তাঁদের ক্রমশ কলুষিত করা শুরু করে দিই, যাতে তাঁরা মাতাকে প্রকাশিত করার পবিত্রতাই না ধারণ করে থাকতে পারে।

ইচ্ছার কারণে, তাঁদের সমস্ত চেতনা হয়ে যায় আত্মসর্বস্ব, নিজের সুখ, নিজের প্রতিষ্ঠা, নিজের প্রয়োজন, নিজের মান সম্মান, নিজের অপমান, এই সমস্ত ছাড়া তাদেরকে আর কিছু দেখতেই দিই না আমি, বিবেকের স্থানে ইচ্ছাকে স্থাপিত রেখে, আর এর ফলে তারা সমানে কলুষিত হতেই থাকে। সেই কর্ম যাতে সুসম্পন্ন হয়, তার কারণে আমার ঔরসে দেবী ইচ্ছা প্রভাত অর্থাৎ সত্ত্বগুণকে ধারণ করেন।

বিচারকে তাঁদের সকাশে প্রতিস্থাপিত করে রেখে দিই দেবী চিন্তাকে, যাতে করে তাঁরা কেবল নিজের স্থাপত্য, নিজের স্থায়িত্ব, নিজের গুরুত্ব, নিজের বিশেষত্ব, নিজের নামযশ ইত্যাদি নিয়েই উলমালা থেকে মাতার ভাব অর্থাৎ দেবার ভাব থেকে অপসারিত হয়ে লাভ করার ভাবে স্থাপিত থেকে সমানে নিজেদেরকে মাতাকে ধারণ করার অবস্থা থেকে কলুষিত করতে থাকে। এই কর্মে, সহায়তা প্রদানের উদ্দেশ্যে, আমি দেবী চিন্তার গর্ভে রজনী অর্থাৎ রজগুণকে প্রদান করে, তাঁকে তাঁর কর্মে যোগদান প্রদান করে থাকি।

আর মেধা যাতে জন্ম নিতেই না পারে, মেধার অনুপস্থিতি যাতে জানতেই না পারে এই চার ভূত, সেই কারণে, আমি দেবী কল্পনাকে ও তাঁর গর্ভে আমার ঔরসরূপে তামসকে প্রদান করে থাকি। তাঁর প্রভাবে, এই চারভূত ভুলেই থাকে যে তাঁরা মেধা শূন্য, আর কল্পনাশক্তিকেই মেধা জ্ঞান করে, সমাজে যার কল্পনাশক্তি অধিক, তাঁকে মেধাবী বলে খ্যাতনামা করতে থাকেন।

মেধা জাগ্রত না হতে পারলে, মাতার প্রথম পদক্ষেপ অর্থাৎ পরাচেতনার পথে উত্থানই অসম্ভব হয়ে যায়, আর তাই মাতা আর প্রকাশিতা হতে পারেন না, আর এই চার ভূত আমার ও আপনাদের দাশ হয়ে অহংকারের অর্থাৎ আত্মের বা আমিত্বের জীবনযাপন করেন। মাতা জাগতেও পারেন না, আর তাই এঁরাও মাতার সাথে মিলিত হতে পারেন না, আর এর ফলে, মাতার সাথে একাত্ম হয়ে, এই জীবনযাত্রার সমাপ্তিও করতে সক্ষম হননা, অর্থাৎ মুক্তিও পাননা।

দেবীরা, আপনারা মাতারই বর্জিত সামর্থ্য, তাই আপনাদের এত সামর্থ্য, কিন্তু তাও আপনারা যখন থেকে মাতা পরাচেতনা হয়ে অবস্থান করেন, তখন থেকে তাঁর সম্মুখে স্থাপিতই হতে পারেন না। আপনারা তাঁর বর্জিত সম্পদ, তাই আপনারা মাতার সকাশে প্রকাশ্যে এলেই ভস্মীভূত হয়ে যাবেন। তাই মাতার উপস্থিতি আপনাদেরকে দহনের অনুভূতি প্রদান করতে থাকে।

দেবীরা, আপনারা আচ্ছাদন ধারণ করুন, যাতে মাতার সরাসরি দৃষ্টি আপনাদের উপর না পরতে পারে। তাহলেই আপনারা সুরক্ষিত থাকতে পারবেন। আর চিন্তা করবেন না, মানস ও ধরা এখনও চিন্তা, ইচ্ছা আর কল্পনা প্রখর ভাবে করছে। বাকিরা এখন সর্বাম্বার দ্বারা স্থাপিত উন্নত রাজ্যলাভ করে, আবার করে চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনার দ্বারস্থ হবে। সর্বাম্বা অবশ্যই সুষুম্নাতে প্রবেশ করবে, আমি তাঁর কাছে সাধু লোকেশ সেজে গিয়ে, তাঁকে মার্গদর্শন করে সুষুম্নার পথে নিয়ে যাবো।

আর সেখানে, আমার বিশ্বাস অনেক অনেক মহাধন আছে, যা লাভ করে সকলে এতটাই আমাদের পৌত্র ও পৌত্রীতে মজে উঠবে, অর্থাৎ রিপুপাশ বা আবেগে মজে উঠবে যে, পুনরায় তাঁরা সকলে চিন্তা ইচ্ছা ও কল্পনা করতে শুরু করবে, আর তা করলেই, আপনারা শক্তিশালী হয়ে উঠবেন আর সেই শক্তির বলে, আমরা ব্রহ্মময়ীর সমস্ত অংশ, অর্থাৎ ভূত, পঞ্চভাব ও মহাভাবদের বশীভূত করে রেখে দেব।

তারা বশীভূত থাকলে, সর্বাম্বা আর পরাপ্রকৃতিও হতে পারবে না, আর ব্রহ্মময়ীও। অর্থাৎ আমি আমার রাজত্ব বিস্তারকে অক্ষয় করেই রেখে দেব। … তাই চিন্তা করবেন না। কেবল নিজেদেরকে আচ্ছাদিত করার চিন্তা করুন। আমি নজর রাখছি ওদের উপর। ওরা সর্বাম্বার থেকে নবধারার রাজ্য লাভ করতে চাইছে। সেই রাজ্যের মোহে একবার ওরা সকলে গ্রসিত হয়ে উঠলেই এই লোকেশ সেখানে যাবে, আর সর্বাম্বাসহ সকলকে নিয়ে সুষুম্নাতে প্রবেশ করবে।

সেখানে প্রবেশ করে, অসম্ভব শক্তি সঞ্চয় করে, সকলকে সেখানেই বন্দী করে আমি একচ্ছত্র অখণ্ড রাজা হয়ে প্রত্যাবর্তন করবো। তখন আর আমাকে কেউ রাজা বলবে না, বাকি ব্রহ্মাণ্ডরা যেমন আমাকেই ঈশ্বর বলে, আমাকেই ভগবান বলে, এই ব্রহ্মাণ্ডও তখন তেমনই বলবে আমাকে”।

অন্যদিকে, তাঁদের আরাধ্যাকে লাভ করে, প্রফুল্লিত চিত্তে, পঞ্চভাব দেবী প্রেমার কাছে নিবেদিত প্রাণ হয়ে বললেন, “কি অদ্ভুত কৃত্য তোমার মা! আত্ম তোমার উপস্থিতি জানতেও পারলো না, অথচ তুমি তোমার প্রথম পদক্ষেপ রেখে দিলে!” দেবী জিজ্ঞাসা বললেন, “কিন্তু মা, আমাদের একটি প্রশ্ন আছে, আর তা এই যে, এমন করার প্রয়োজন কি ছিল? কেন এত গোপনীয়তা? আত্ম তোমার কিই বা করতে পারতো যে, তার থেকে এমন গোপনীয়তা ধারণ করলে?”

দেবী প্রেমা হেসে বললেন, “গোপনীয়তা আমার আত্মের থেকে নয় বড়মা। এই যে তুমি এক্ষণে আমাকে দেবী বলে সম্বোধিত করলে, এই সম্বোধনের থেকে বাঁচতে আমার এই গোপনীয়তা। বড়মা, এই দেবীত্ব বা তার ভাব আমার বড়ই অপ্রিয়। ব্রহ্মময়ীর বেশ ত্যাগও আমি এই একই কারণে করেছিলাম। আমি যে দেবী হয়ে বিরাজ করতেই চাইনা! আমি যে কারুর মা হয়ে, তো কারুর মেয়ে হয়ে বিরাজ করাতেই রুচি রাখি। … আত্মীয়তার কারণেই এই অসীম অনন্ত ব্রহ্ম, যিনি সম্পূর্ণ ভাবে নিষ্ক্রিয় ও নির্গুণ, তিনি স্বগুণ হলেন, তিনি সক্রিয় হয়ে ব্রহ্মময়ী হলেন। আর সেই আত্মীয়তার স্থানে যদি দেবীত্ব প্রাপ্ত হয়, তাহলে সেই ব্রহ্মময়ী কেমন করে তৃপ্ত হতে পারে বলো তো!”

মানস প্রথমে আমাকে মা-ই জ্ঞান করতো। কিন্তু আত্মের খপ্পরে পরে, সেও আমাকে দেবী মানতে শুরু করে দিলো। তাঁর আগে, চন্দ্রনাথ ও সূর্যনাথ আমাকে নিজেদের মা বলেই মানতো। কিন্তু দেবী চন্দ্রপ্রভাকে যেই দিন আপন করে নিলাম, সেই দিন থেকে, তারাও আমাকে মাতৃত্বের ভাব থেকে ত্যাগ করে দিয়ে, দেবীত্ব প্রদান করা শুরু করে দিল। তাই তাঁদেরকেও আমি ত্যাগ দিয়েছিলাম। আর যখন মানস, যে আমাকে মা মানতো না, নিজের মা বলেই জানতো, তার চোখেও আমি মা না হয়ে দেবী হয়ে গেলাম, সেদিন ব্রহ্মময়ী দেহ আমার কাছে জঞ্জাল মনে হয়েছিল।

মনে হয়েছিল যে, না আর কেবল মা হয়ে আসবো না। মাকে দেবী মনে করতেই পারে, মেয়েকে তো দেবী মানবেনা। কিন্তু দেখো আজ তোমরা সকলেও সেই একই ভাবে, মেয়েকেও দেবী করে দিচ্ছ! কেন বড়মা! দেবী কেন? তোমাদের কন্যা হয়ে কি আমি তোমাদের কনো কথার অবাধ্য হয়েছি, তোমাদেরকে কনো ভাবে অসম্মান করেছি!”

নেত্রে সকলের অশ্রু, মানসও আত্মশ্লাঘাতে লজ্জিত। দেবী সমর্পিতা কম্পিত ভাবে, কম্পিত স্বরে প্রেমার কাছে গিয়ে, তাঁকে প্রাণপণে আলিঙ্গন করে ডুকরে কেঁদে উঠলেন আর বললেন, “না মা! না… ক্ষমা মা ক্ষমা। … দোষ আমাদের মা, তুমি কি চাও, তা একটিবারও বোঝার প্রয়াস করিনি। জঘন্য ভাবে আমরা স্বার্থপর মা। তাই তো আমরা কেবল এই ভেবে গেছি যে, দেবী আমাদের রক্ষক, দেবী থাকলে আর কিছুর থেকে ভয় নেই।

একটিবারের জন্যও এই খেয়াল এলো না যে, কেন সেই অনন্তা, কেন সেই অসীমা, কেন সেই নির্গুণা, কেন সেই নির্বিকারা, কেন সেই নিরাকারা, কেন সেই নিষ্ক্রিয়া সসীমা হয়ে উঠলো, গুণসম্পন্না হয়ে উঠলো, সবিকারা হয়ে উঠলো। লজ্জা লাগছে মা, যেই প্রেম লাভের জন্য, আর যেই প্রেম দেবার জন্য তুই আকুপাকু করিস, আমরা … ছি! কেমন আপন তোর!”

প্রেমাও অশ্রুসিক্ত। তাঁর শুভ্রতার আচ্ছাদনে থাকা গোলাপি মুখশ্রী আজ শুভ্রতা ত্যাগ করে পূর্ণভাবে গোলাপ যেন। অশ্রুপূর্ণ হয়ে দেবী প্রেমা বললেন, “ছোটোমা! … জানো, যখন নিশ্চিত করি যে, এবার আর মা বেশে নয়, মেয়ে বেশে আসবো, তখন নিজেকে ত্রিখণ্ডে খণ্ডিত করে নিয়েছিলাম। মানস আর ধরাকে একটি খণ্ড করে নিয়ে, তাঁদের মাধ্যমে শিখা, বেগবতী ও মেধা হয়ে, নিজের বিস্তার, অস্তিত্ব, উর্জা, চঞ্চলতা আর পবিত্রতাকে এঁদের সকলের মধ্যে সঞ্চিত রেখে, নিজের প্রথম ভাগের নির্মাণ করি।

সেই খণ্ডে নিজের কনো প্রতিভা বা বৈশিষ্ট্য আলাদা করে রাখিই না। জানি ভালো করে যে মেধার পবিত্রতা দেখে, আত্ম তাঁকে লুকিয়ে রাখার প্রয়াস করবে, তাই কেবল নিজেকে তাঁর মধ্যে স্থাপিত রেখে দিই। এর পরবর্তী খণ্ডে আমি আমার তিন বৈশিষ্ট্য রেখে দিই, আমার বিচারসামর্থ্য, আমার বিবেক আর আমার বৈরাগ্য। দেবী চন্দ্রপ্রভার মাধ্যমে এঁদেরকেও সুপ্ত করে রেখে দিই। জানি যে আমার প্রথম খণ্ড এঁদেরকে লাভ না করে আমার সন্ধান করে ফিরবে। আর সেই সন্ধানের কারণে, তাঁরা আমাকে আপন করে নেবে।

আর তোমাদেরকে তৃতীয় খণ্ডে রাখি আর সম্পূর্ণ ভাবে লুক্কায়িত রাখি, যাতে তোমাদের সন্ধান করতে করতে, আমার সকল খণ্ড আমাকে অতি আপন করে নেয়, আমাকে পরমাত্মীয় করে নেয়। আর আমি তোমাদের সকলের সাথে আনন্দের হাট বসাতে পারি।

কিন্তু দেখো, তোমাদের সকলের মধ্যে সেই আমাকে দেবী মানার যে কি ঝোঁক, আমি বুঝি না! … আমি দেবী নই, আমি কনো দেবী নই। আমি পূজা চাই না, আমি অর্চনা চাইনা, আমি তোমাদের অতি আপন, তোমাদের নিজেদের মা, নিজেদের কন্যা, নিজেদের ভগিনী, নিজেদের সখী। কেন তোমরা তা বুঝেও বুঝছো না! দেবত্ব’র আকাঙ্ক্ষা আত্মের, আমার নয়। আমার একটিই আকাঙ্ক্ষা, আর তা হলো পরমাত্মীয়তার।

সেই পরমাত্মীয়তার পরমসুখ লাভের জন্যই আমি চন্দ্রনাথ, সূর্যনাথের ও চন্দ্রপ্রভার জন্ম দিয়েছিলাম। তাঁরা আমাকে মা জ্ঞানে জরিয়ে ধরবে, আর আমিও তাঁদেরকে সন্তানভাবে আমার হৃদয়ে লাগিয়ে রাখবো। কিন্তু যখন তাঁরাও আমাকে দেবী মানলো, তখন সেই একই পরমাত্মীয়তা লাভের জন্যই আমি আত্ম আর মানসের জন্ম দিয়েছিলাম, আর চন্দ্রপ্রভার গর্ভে ধরাকে জন্ম দিই। মা বলে তাঁরা আমাকে আঁকড়ে ধরবে, আর সন্তানজ্ঞানে আমি তাঁদের কাছে নিজেকে লুটিয়ে দেব।

কিন্তু আত্ম নিজেকে নিয়েই নিজে উলমালা হয়ে উঠলো আর নিজেকে ভগবান রূপে স্থাপিত করতে ব্যস্ত হয়ে গেল, আর মানস ধরা আমাকে দেবীত্ব প্রদানে ব্যস্ত হয়ে গেল। ক্রমশ দেখলাম, আত্ম নিজেকে ভগবান রূপে স্থাপন করার জন্য, আমাকেই ঈর্ষা করতে শুরু করলো, কারণ মানস আর ধরা আমাকে দেবী মানছে। তাই আমি ব্রহ্মময়ী তনু ত্যাগ করলাম। আত্মীয়তার বন্ধনকে আরো বিস্তৃত করতে শুরু করে নিজেকে তিন খণ্ডে বিভক্ত করে নিলাম, ভূত, পঞ্চভাব ও মহাভাব।

কিন্তু এঁরই মধ্যে আত্মের ভগবান রূপে নিজেকে স্থাপন করার নেশা সপ্তমে উন্নীত হয়েছিল। মেধা যাতে প্রকাশিত না হয়, তার কারণে সে ধরার সাথে প্রেমের ছলনার রচনা করে, আর মানস ও ধরার মিলনকে মানসের অপরাধ বলে চিহ্নিত করা শুরু করেছিল, সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডে। আর তাই এই ব্রহ্মাণ্ডে, আমি নূতন লীলা শুরু করলাম। ধরাকে ডেকে পাঠালাম আর বললাম যে মানসের উপর অপরাধ দেওয়া হবে, যেখান থেকে তাকে মানসের উদ্ধার করতে হবে।

সেই উদ্ধার কর্ম যাতে করতে হয়, তারজন্য আত্মের শ্লাঘাকে আমারই পরিত্যক্ত সামর্থ্য, অর্থাৎ ইচ্ছা, চিন্তা আর কল্পনাদ্বারা প্রেরণা প্রদান করে, উন্নত করলাম, যার কারণে সে আমাকে বিষ প্রদান করলো, আর সেই বিষ প্রয়োগের অভিযোগ মানসের উপর চাপানোর প্রয়াস করলো। ধরাকে যেমন বলা ছিল, তেমন ভাবে সে মানসের উদ্ধার করলে, ধরা আর আত্মের সাখ্যাতই হতে দিলাম না এই ব্রহ্মাণ্ডে, আর তার ফলে মানসের উপর কনো প্রকার পরস্ত্রী হননের লাঞ্ছন লাগতে পারলো না, আর তার ফলে মেধা মানস ও ধরার কনিষ্ঠ কন্যা হয়ে হন্ম নিতে পারলো।

নাহলে প্রতিটি ব্রহ্মাণ্ডে, আত্ম মানসকে এমন অভিযোগে সিক্ত করে, ধরাকে নিজের মোহজালে ফাঁসিয়ে, মেধার জন্ম হবার পূর্বেই, ধরাকে মানসের থেকে ছিনিয়ে নিয়ে চলে আসে। আর তাই মেধার জন্মই হতে পারেনা। আর মেধার জন্ম না হলে, মহাভাবরা প্রকাশ্যে আসতে পারেনা, আর তোমরা অর্থাৎ পঞ্চভাবরাও প্রকাশ্যে আসতে পারেনা।

আত্ম প্রতিটি ব্রহ্মাণ্ডেই চিন্তাকে দিয়ে বিচারকে, ইচ্ছাকে দিয়ে বিবেককে, আর কল্পনা দিয়ে মেধাকে ঢেকে রাখে, আর মানস, ধরা, শিখা আর বেগবতীকে মেধা, বিচার বা বিবেকের প্রয়োজন অনুভব করা থেকেই রুদ্ধ করে। তাই আমি এই ব্রহ্মাণ্ডে, এমন লীলা করলাম, যাতে মেধা প্রকাশিত হতে পারে। মেধার জন্মের পরপরই আত্মের টনক নড়ে যায়, আর সে কৌশল করা শুরু করে যাতে, শিখা, বেগবতী, মানস ও ধরা মেধাকে ত্যাগ দেয়।

প্রতিটি ব্রহ্মাণ্ডেই সে এমন করে, তাই তাঁর জন্য এই কর্ম কঠিন হয়না। যেমন প্রতিটি ব্রহ্মাণ্ডে, ইচ্ছা, চিন্তা ও কল্পনার থেকে সত্ত্ব, রজ ও তম লাভ করে, তাদের দিয়ে শিখা ও বেগবতীকে বশ করে রেখে, শিখার উর্জার মাধ্যমে মদ, ক্রোধ ও ঈর্ষার জন্ম দেওয়ায়, যেমন বেগবতীর চঞ্চলতার মাধ্যমে মোহ, লিপ্সা ও কামনার জন্ম দেওয়ায়, আর ইন্দ্রিয়দের বশ করে রেখে সমস্ত পাশের জন্ম দেওয়ায়, এখানেও সে তেমনই করে। কিন্তু মেধার উপস্থিতিই তাঁর পথে বাঁধা হলো।

মেধার উপস্থিতির কারণে, শিখা ও বেগবতীর উপর করা মায়ার প্রভাব দীর্ঘায়ু হতে পারলো না, আর তারা অনায়সে মেধার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে, ষড়রিপুর থেকে মুক্ত হয়ে যায়। আর মেধা প্রচণ্ড হয়ে মোহের দমন করে, এবং স্নেহশিলা হয়ে মহাভাবদের জাগ্রতও করে, এবং তাঁদের থেকে পঞ্চভাব, অর্থাৎ তোমাদেরকেও প্রকাশ্যে আনে। এরপরেও আত্ম থেমে নেই, তবে সে এক্ষণে কি করছে জানলে তোমরা ভীত হয়ে যাবে, তাই তোমাদেরকে সেই কথা বলবো না”।

দেবী স্নেহা প্রশ্ন করলেন, “কিন্তু প্রেমা, এই সমস্ত কিছুর শুরু হলো কি করে? আত্ম প্রকাশ্যে আসতে পারলো কি তোমারই আত্মীয়তার সন্ধান করার ফলে! যদি তাই হয়, তবুও সে এতটা শক্তিশালী কি করে?”

দেবী সর্বাম্বা হাস্যমুখে বললেন, “হ্যাঁ মেজমা, আত্ম আমারই কারণে প্রকাশিত হয়। আত্মীয়তার সন্ধানে যখন নিজের থেকে সূর্যনাথ ও চন্দ্রনাথকে প্রকাশিত করেও, তাঁরা আত্মীয়তার থেকে দূরে পতিত হয়ে আমাকে দেবীত্ব প্রদান করতে উদ্যত হয়, তখন আমি আত্ম ও মানসের জন্ম দিই, যাতে আত্ম ও মানস এই দুই ভ্রাতা মিলে আমাকে আকর্ষণ করে, আমি তাঁদের অহরহ দিবারাত্র প্রেম প্রদান করতে পারি।

যখন দেখি যে, আত্মের স্বভাব কলুষিত, আর সে সর্বদা নিজের প্রতিষ্ঠা, নিজের বিস্তার, আর নিজেকে নিয়েই উলমালা, তখন মানসকে সঙ্গ দেবার জন্য, আমি চন্দ্রপ্রভার জন্ম দিই। চন্দ্রপ্রভা আর চন্দ্রনাথের বিবাহ হলে, তাঁদের থেকে ধরার জন্ম হয়। কিন্তু এখানে শুরু হয় আত্মের কামানুরাগ, আর মানসের সাথে প্রতিস্পর্ধার ভাব। এই প্রতিস্পর্ধার কারণে, সে নিজেকে সহস্র লক্ষ কোটি খণ্ডে বিভক্ত করে নেয়, আর ধরাকেও সহস্র লক্ষ কোটি খণ্ডে বিভাজন করে আত্মসাৎ করা শুরু করে।

মানসও ধরাকে লাভ করার মনসা নিয়ে, নিজেকে সহস্র লক্ষ কোটি খণ্ডে বিভাজিত করে, এবং এর ফলে, আমাকেও এঁদের সকলের সাথে নিযুক্ত হয়ে যেতে হয়। এরা তো আমারই প্রকাশ, তাই আমি এঁদের একজনকেও ত্যাগ দিতে পারিনা। আমার বিভাজন সম্ভব নয়। তাই আমি স্বয়ংই এই সকল মানস, সকল ধরা আর সকল আত্মের সাথে যুক্ত হয়ে যাই। আর এই প্রতিটি আত্ম, মানস ও ধরার সমষ্টি, যাতে আমি মিশে রইলাম, তারা একাকটি ব্রহ্মাণ্ড হয়ে স্থাপিত রইল, যাদেরকে তোমরা বলে থাকো জীব।

চন্দ্রনাথ একটিই রয়ে গেল, সূর্যনাথও একটি রয়ে গেল, আর চন্দ্রপ্রভা, ও তাঁর সমস্ত অঙ্গজাত সখী অর্থাৎ নক্ষত্ররাজিও একই রয়ে গেল। কিন্তু সহস্র লক্ষ কোটি ধরা, আত্ম আর মানস হয়ে গিয়ে, আমার সহস্র লক্ষ কোটি সন্তান হয়ে রইল তাঁরা”।

দেবী মমতা বললেন, “কিন্তু সর্ব্বা, আত্মের এই বল এলো কি করে? এত বলশালী হলো কি করে সে!”

দেবী প্রেমা মৃদু হেসে বললেন, “সেজমা, আত্মীয়তা প্রদান ও লাভের উদ্দেশ্যে, আমি আমার মধ্যে ত্রিভাবের রচনা করেছিলাম, যাদেরকে তোমরা বলো মহাভাব, অর্থাৎ তোমাদের পিতা। এঁদের মধ্যে বিচারের জন্ম দেবার কালে, আমি চিন্তা প্রকাশ করেছিলাম নিজেকে জানার, আর নিজের সত্যকে বিশ্বাস করার। বিচারের জন্ম হলে, আমি সেই চিন্তা পরিত্যাগ করি, কিন্তু আত্ম আমার সেই পরিত্যক্ত চিন্তাকে সংগ্রহ করে নিজের কাছে রেখে দেয়।

একই ভাবে, বিচার লাভ করার পর, যাতে আমি আমার স্নেহ ও মমতাকে লুটিয়ে দিতে পারি, তার জন্য বিবেকের জন্ম দেবার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলাম। বিবেকের জন্মের পর, সেই ইচ্ছা ত্যাগ করি আমি, কিন্তু আত্ম সেই ইচ্ছাকে নিজের কাছে সংগ্রহ করে রেখে দেয়।  আর অন্তে, আমি যাতে কনো সন্তানের প্রতি কনো প্রকার পক্ষপাত করে ফেলি, তাহলে আমার সন্তানরা ব্যথিত হবে, এই কল্পনার উত্থাপন করলে, বৈরাগ্যের জন্ম হয়, যে সুখদুঃখ, আসক্তিবিরক্তি, জ্ঞানঅজ্ঞান, সমস্ত কিছুর থেকে মুক্ত। তাঁর জন্মের পর কল্পনাকে আমি পরিত্যাগ করি, কিন্তু আত্ম তাঁকেও নিজের কাছে সংগ্রহ করে রেখে দেয়।

এই তিন আমার পরিত্যক্ত সামর্থ্যকে গ্রহণ করে নিয়ে, আত্ম এতটা বলশালী। সত্য বলতে, আমি এঁদেরকে পরিত্যক্ত করার পর, এঁদের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে এঁদের ভস্ম করতে যাবার পূর্বেই আত্ম এঁদেরকে হনন করে নিজের কাছে রেখে দেওয়া শুরু করে, আর নিজেরই মত, এঁদেরকে সহস্র লক্ষ কোটি রূপে বিভাজিত করে গ্রহণ করে নেয়। তাই আজও আমার দৃষ্টি এই তিন ছায়াদেবীদের সন্ধান করে ফেরে, তাঁদের ভস্ম করে দেবার জন্য। আর তা তাঁরা ও আত্মও জানে, তাই আমার সম্মুখে আসেনা, আসলেও অবগুণ্ঠন ধারণ করেই আসে”।

বিশ্বাস বললেন, “আচ্ছা, এই হলো রহস্য, আর এরই কারণে, এত জীব অর্থাৎ এত ব্রহ্মাণ্ড, আর প্রতি ব্রহ্মাণ্ডেই আমাদের মাতামহ আমাদের মাতামহীকে লাভ করতে তৎপর, আর আত্ম আমাদের মাতামহীকে আকৃষ্ট করে রেখে দিয়েছে। কিন্তু সর্ব্বা, এই ব্রহ্মাণ্ডে এই ভেদ হলো কেন? মানে, এই ব্রহ্মাণ্ডেই কেন আত্ম আমাদের মাতামহীকে নিজের অধীনে লাভ করলো না! এই ব্রহ্মাণ্ডেই কেন আমাদের মাতা প্রকাশিতা হতে পারলেন?”

প্রেমা উত্তরে হেসে বললেন, “পিতা, সমস্ত পঞ্চভূত, সমস্ত মহাভাব আর সমস্ত পঞ্চভাব মিলেই আমার পূর্ণ প্রকাশ। এঁরা সকলেই আমার সন্তান, আর আমি এঁদের সকলের আপনতমজন। তাই এঁদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে বিলাস করাই আমার এই নির্মাণের উপলক্ষ আর তাই আমি সর্বদা সেই উপলক্ষপথেই ধাবিত। কিন্তু আমার ভূতরা, আমার ভাবরা আমার এই উপলক্ষ সম্বন্ধে অনবগত, আর তাই এঁদেরকে আমি সময়ে সময়ে অবগত করতে চেয়ে, সকল ব্রহ্মাণ্ডেই সুপ্ত মেধা হয়ে অপেক্ষা করি, আর সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডকে সেই পথে চালনা করতে থাকি, যেই পথে চললে, তাঁরা মেধাকে জাগ্রত করবে।

তা করার জন্য, আমি এই সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডদের মাঝে প্রকৃতি হয়ে অবস্থান করি ও তাঁদের অন্তরে বিরাজ করা আমি, অর্থাৎ তাঁদের অন্তরে বিরাজ করা প্রকৃতিকে আবাহন করি। তা করার জন্য, আমি এই সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডদের কর্মকে নিয়ন্ত্রণ করি, আর সেই কর্মের থেকে তাঁদের সম্মুখে সময় বেশে অবতীর্ণ হয়ে, তাঁদের মার্গদর্শন করি। কিন্তু তা সত্ত্বেও, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই, ব্রহ্মাণ্ড সকল প্রকৃতির দেখানো মার্গে চলতে অনীহা দেখায়, বিশেষত চতুর্ভূতের আত্মের মায়াতে মজে থাকার কারণেই তা হয়ে থাকে।

সেই কারণে, আমি সময়ে সময়ে কনো একটি ব্রহ্মাণ্ডের সম্পূর্ণ অধিকার গ্রহণ করে নিই। এমন নয় যে সেই অধিকার গ্রহণ করে নিলে, আত্ম অনায়সে আমার শাসন মেনে নেয়। সে সংগ্রাম করে আর আমার সাথে রণে মেতে ওঠে, আর আমিও। এই অবতার ব্রহ্মাণ্ডের মাধ্যমে আমি সকল অন্য ব্রহ্মাণ্ডদের এই সংগ্রামের চিত্র দেখাই আর তাঁদেরকেও এই অনুরূপ সংগ্রামের জন্য আবাহন করি। সেই আবাহন গ্রহণ করে, অনেক ব্রহ্মাণ্ড সংগ্রাম করা শুরু করে, আমার দেখানো মার্গ অনুসরণ করে করে। কিন্তু যখন সেই প্রয়াসও সম্পূর্ণ ভাবে বন্ধ হয়ে যায়, তখন পুনরায় তাঁদের সেই সংগ্রামে অবতীর্ণ করার আবাহন জানিয়ে, আমি পুনরায় কনো ব্রহ্মাণ্ড অধিকার করি অর্থাৎ অবতার গ্রহণ করি।

এই ব্রহ্মাণ্ডে, মেধার জন্ম সহজ ভাবেই হয়, কারণ এই ব্রহ্মাণ্ড এক অবতার ব্রহ্মাণ্ড। তবে যেই উপায় আমি এখানে দেখালাম, অর্থাৎ মানস ও ধরার বিবাহদান, সেই পদ্ধতি গ্রহণ করে, চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনার থেকে মুক্ত থাকতে পারলে, অন্য সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডও মেধার জন্ম দিতে সক্ষম হবে। যতদিন সেই ধারাকে মান্যতা প্রদান করে, সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে সেই পথে চলার প্রয়াস জাগ্রত থাকবে, ততদিন আমি নিশ্চিন্ত। যাই তা বন্ধ হয়ে যাবে, আর এমন অবস্থায় চলে যাবে যে, তা আর সম্ভবই নয়, সেই অবধি পর্যন্ত অপেক্ষা করে, আমি পুনরায় আংশিক বা পূর্ণ অবতার গ্রহণ করবো।

পিতা, এই ব্রহ্মাণ্ডরা আমার সন্তান নয়, এই ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে বিরাজমান পঞ্চভূত, পঞ্চভাব ও মহাভাব আমার সন্তান। আর আমি আমার সন্তানদের সাথে মিলনের জন্য প্রয়াস করতেই থাকবো, যতই আত্ম বাঁধা প্রদান করুক। যদি আমার সন্তানরা তাঁদের মাতার সঙ্গ দেয়, তাহলে তাঁরাও আর আমিও সফল হবো আত্মকে পরাস্ত করে পুনরায় মিলিত হতে। আর তা না হলে, সেই ব্রহ্মাণ্ড নষ্ট হবে, আর সেই ব্রহ্মাদের উপাদানরাই আত্মের নির্মিত অন্য আরেকটি ব্রহ্মাণ্ডে স্থান গ্রহণ করবে, তখন আবারও আমি প্রয়াস করবো আমার সন্তানদের সাথে মিলনের”।

বৈরাগ্য হুঙ্কার দিয়ে বললেন, “আত্ম আসলে মূর্খ। সে জানে, যেই ব্রহ্মাণ্ডে স্বয়ং ব্রহ্মময়ী চেতনার যাত্রা সমাপ্ত করে ফেলেছে, আর প্রকৃতির পথে যাত্রা শুরু করে দিয়েছে, সেখানে সে কিচ্ছু করতে পারবেনা, তাঁর মায়া কনো কাজে সফল হবেনা, তারপরেও সে জয়লাভের প্রয়াস করেই যাবে। … আসক্তি, প্রকাণ্ড আসক্তি ভগবান হয়ে সেজে থেকে ভক্ত নির্মাণ করে, তাদের থেকে পূজা লাভ করার। বিরক্তি, প্রবল বিরক্তি সন্তান হয়ে মাতৃপ্রেম লাভ করতে”।

বিচার দৃঢ় হয়ে বললেন, “আমরা সকলে তোমার সাথে পুত্রী, আত্মকে সর্বহারা করবো আমরা, আর সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডের কাছে নিদর্শন সৃষ্টি করে, তাঁদের আবাহন করবো, এই একই প্রকার সংগ্রামে যাতে তাঁরাও লিপ্ত হয়, আর আত্মের শ্লাঘা থেকে মুক্ত হয়ে, যেন তোমার সাথে পরমাত্মীয়তাতে লিপ্ত হয়ে পরমানন্দ ভোগ করে”।

বিবেক বললেন, “শুধু তাই নয়, পুত্রী, আমাদেরকে এক মহারাজ্য স্থাপন করতে হবে, যা দেখে আত্ম ভয়ার্ত হবে, কারণ এই রাজ্যই সকল অন্য ব্রহ্মাণ্ডদের আকর্ষিত করবে এই ব্রহ্মাণ্ডের দিকে। তাই পুত্রী, এক আদর্শ ব্রহ্মাণ্ডরাজ্যের বিবরণ প্রদান করো আমাদেরকে। আমার এই বচনকে আবদার নয়, পুত্রী, একে রণকৌশল জ্ঞান করো। এই রণকৌশল আত্মকে বাধ্য করবে আমাদের সাথে যুদ্ধে রত হতে, কারণ তা না হলে এই আদর্শ রাজ্য সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডকে নিজের দিকে আকর্ষিত করে নেবে”।

সর্বম্বা হাস্যমুখে বললেন, “দেখো, আত্মের বিস্তারিত সমাজে সকল ব্রহ্মাণ্ড নিবাস করছে। তা উপেক্ষা করে, তোমরা শান্ত থাকতে পারবেনা। আর শান্ত না থাকতে পারা মাত্রই, চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনা তোমাদেরকে নিজেদের গ্রাস করে নেবে। তাই প্রথম যা প্রয়োজন, তা হলো আত্মের দ্বারা প্রদান করা এই বন্ধনকে মান্যতা প্রদান করা। স্মরণ রেখো, সেই বন্ধনকে স্বীকৃতি প্রদান করছো না তোমরা, বা সহমত পোষণ করে, স্বীকার করে নিচ্ছ না। কিন্তু সেই বন্ধনকে গুরুত্ব প্রদান করছো, তাকে অতিক্রম করার জন্য।

এটিই প্রথম প্রয়োজন হয়, যেকোনো পাশ থেকে মুক্ত হবার জন্য। প্রথম সেই পাশে যে আমি আবদ্ধ রয়েছি, তাকে স্বীকার করতে হয়, তবেই সেই পাশ থেকে মুক্ত হবার উপায় সন্ধান সম্ভব হয়। যদি আমি প্রথমেই বলে দিই যে, আমি কনো পাশে আবদ্ধ নই, তাহলে যেই পাশে আমি আবদ্ধ রয়েছি, তাকে অস্বীকার করার কারণে, সেই পাশে আবদ্ধই থেকে যাই আমরা, অথচ সেই পাশকে মান্যতা প্রদান করিনা।

যদি কিছু ভুল করে থাকি, তাহলে প্রথম স্বীকার করতে হয় যে আমি ভুল করেছি, তবেই সেই ভুলকে ফিরে দেখা সম্ভব হয়, আর সেই ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে, নিশ্চিত করা সম্ভব হয় যে আর কখনো সেই ভুল হবেনা। ঠিক তেমনই, আত্মের যেই বন্ধনকে তোমরা ইতিমধ্যেই স্বীকার করে উপনীত, প্রথম এই সত্যতাকে স্বীকৃতি দাও যে, তোমরা সেই বন্ধনকে স্বীকার করেছো। তবেই সেই বন্ধন থেকে মুক্তির মার্গ লাভ করতে পারবে।

সেই বন্ধনের চারটি খোঁট বা চারটি স্তম্ভ, সুরক্ষা, অর্থনীতি, শিক্ষানিতি ও সংস্কৃতি। বিচার করে দেখো, মোহিনী যেই শাসনব্যবস্থার স্থাপন করে সকলকে বশ করেছিল, তা এই চারটি বিষয়ের উপরই স্থাপিত ছিল। সে সকলকে প্রেরণা প্রদান করেছিল নিজের দেহ, নিজের সম্মান, ও নিজের প্রতিষ্ঠাকে সুরক্ষিত করে নেবার জন্য। আর যখন সকলে তাঁর শাসন মেনে, নিজের দেহ, নিজের সম্মান ও নিজের প্রতিষ্ঠাকে সুরক্ষিত করে নেবার দিকে অগ্রসর হয়েছিল, ফল কি হয়েছিল? সকলে আত্মকেন্দ্রিক হয়ে গেছিল, অর্থাৎ আত্মের বন্ধনকে স্বীকার করে নিয়েছিলে।

এবার বিচার করো যে, সেই বন্ধনের থেকে মুক্ত হবার উপায় কি? উপায় সেই সুরক্ষাই, তবে যেই যেই ব্যাপারকে সুরক্ষিত করতে চেয়েছিলে, ঠিক তার বিপরীত। যেই পথ ধরে কনো স্থানে প্রবেশ করো, তার ঠিক বিপরীত পথই তো তোমাদেরকে সেই পথের থেকে মুক্ত করে! কি তাই তো? এখানেও ঠিক তেমন। অর্থাৎ তোমাদেরকে নিজের দেহের সুরক্ষাচিন্তা থেকে মুক্ত হতে হবে, নিজের সম্মানের  সুরক্ষা চিন্তা থেকে মুক্ত হতে হবে, আর অবশেষে নিজের প্রতিষ্ঠা চিন্তা থেকে মুক্ত হতে হবে। কি ভাবে? দুই ভাবে সুরক্ষিত থাকা যায় একটি নদীর উপর দিয়ে নৌকায় যাত্রা করার সময়ে, একটি নিজের সুরক্ষা চিন্তার মাধ্যমে, অন্যটি নৌকার সুরক্ষার চিন্তার মাধ্যমে। যদি নিজের সুরক্ষা চিন্তা থেকে মুক্ত হতে হয়, তবে নৌকার সুরক্ষা চিন্তা নিয়ে বিচারশীল হয়ে ওঠো।

অর্থাৎ কথা এই যে, যদি নৌকা সুরক্ষিত থাকে, তাহলে আমিও সুরক্ষিতই থাকবো, এবং একই সাথে আমার সমস্ত সহযাত্রীও সুরক্ষিত থাকবে। তাই নৌকার চিন্তা, অর্থাৎ আমরা যেই সাম্রাজ্য স্থাপন করে উপস্থিত, সেই সাম্রাজ্যের সুরক্ষার বিচার করবো আমরা। কি কি ভাবে এই সাম্রাজ্যের দেহকে, সাম্রাজ্যের সম্মানকে ও সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাকে সুরক্ষিত রাখা যায়, কলুষিত হওয়া থেকে রুদ্ধ করা যায় এবং তার সম্মান, প্রতিষ্ঠাকে আরো উন্নত করা যায়, সেই বিষয়ে বিচার।

এখানেও আরেকটি বিষয় ভাবার, আর তা হলো সেই সম্মান ও প্রতিষ্ঠার বিস্তারের মাধ্যম কি হবে, সেই বিষয়ের বিচার। সাধারণ ভাবেই তোমরা দেখে থাকবে যে, যখনই উন্নতির বিচার আসে আমাদের মধ্যে, তখনই আমরা পার্শ্ববর্তী ও অন্যান্য সকল সাম্রাজ্যকে দেখতে থাকি, আর তাদের অনুকরণ করতে থাকি। তারা যদি ব্যবিচার করে করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে থাকে, তাহলে আমরাও ব্যবিচার শুরু করে দিই। তারা যদি কনো একটি পেশাতে মনোনিয়োগ করে করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে থাকে, তাহলে আমরাও সেই একই পেশার মধ্যে নিজেদের নিয়জিত করার প্রয়াস করি। আবার যদি তারা নিজেদেরকে কনো মিথ্যাচারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করে থাকে, আমরা সেই পথেই যাই।

স্মরণ রেখো সকলে, অধিকাংশ ব্রহ্মাণ্ডই আত্মের কবলে স্থিতা, আর তোমাদের এই ব্রহ্মাণ্ড সেই সকল ব্রহ্মাণ্ডদের মার্গদর্শনের হেতুই প্রকৃষ্ট হয়েছ। তাই কনো অন্য ব্রহ্মাণ্ড দেখো না। নিজের ব্রহ্মাণ্ডের প্রতিষ্ঠা নিজের ধারাতেই করো। প্রতিটি ব্রহ্মাণ্ড নিজের নিজের ধরায় অর্থনীতির প্রসার করতে সক্ষম। কেউ যদি সমস্ত বিদ্যানদের কুক্ষিগত করে নিয়ে বাণিজ্য করে করে নিজের অর্থনীতির স্ফীতি আনে, কেউ যদি মহাকাশে যাত্রার মিথ্যা নাট্য করে অর্থ উপার্জন করে অর্থনীতির স্ফীতি আনে, সেই কাজ আমাকেও করতে হবে, এর কনো নিশ্চয়তা আছে কি?

না, আমার সামর্থ্য শিক্ষা অর্জনে ও শিক্ষা দানে, তো আমি শিক্ষাদানের মাধ্যমে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত ও সুরক্ষিতও করবো, আর সেই শিক্ষাদানের মাধ্যমে নিজের অর্থনীতির স্ফীতিও ঘটাবো। তাই সুরক্ষার থেকে যেই দ্বিতীয় স্তম্ভের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ আবশ্যক, তা হলো অর্থনীতি।  সাধক প্রায়শই এই ভ্রান্তি করে থাকে যে,  আত্ম আমাকে যেই আর্থিক বা সামাজিক সুরক্ষার কবলে রেখেছে, তাকে আমি মানিনা। কিন্তু তুমি না মানলে কি হবে, যেখানে তুমি বাস করছো, সেখানের বাকি ব্রহ্মাণ্ডরা তো তা মানে। অর্থাৎ যেই ক্ষণে তুমি বলবে যে, আমি তা মানিনা, অমনি সকলে মিলে তোমাকে ছিঁড়ে খাবে। সেই সুযোগ কেন দেবে, সেই সুযোগ কেন দিয়ে নিজের অশান্তি নিজে ডেকে এনে, নিজেকে বিবাদী হতে বাধ্য করবে?

গৃহে থাকলে, আহার ও বিশ্রাম সহজে লব্ধ হয়, অর্থাৎ তোমার উর্জ্জা সচল থাকে, দেবী শিখা শান্তিতে থাকেন। দেবী শিখা শান্ত থাকার অর্থ, তিনি দেবী বেগবতীকে উত্তপ্ত ও কুণ্ঠিত করবেন না, অর্থাৎ দেবী বেগবতীও শান্ত থাকবেন। কিন্তু যেই ক্ষণে তুমি বিবাদী হলে, তাঁরা দুইজন উচাটন হয়ে উঠবেন, আর তাঁদের উচাটনতার কারণে তোমার অন্তরে মানস ও তোমার বাহ্যিক ধরা অশান্ত হয়ে উঠে, তোমার সমস্ত ভূতদের চঞ্চল করে দেবে। চঞ্চল ভূতদের  নিয়ে তোমরা আমাতে মনোনিয়োগ করবে কি উপায়ে?

পারবেই না মনোনিয়োগ করতে। তাই নিজের অর্থনীতিকে সুরক্ষিত করো, নিজের সামাজিক অবস্থানকে সুরক্ষিত করো। কিন্তু স্মরণ রেখো, সেই সমস্ত সুরক্ষিত করা তোমার লক্ষ্য নয়, বরং নিজেকে লক্ষ্যের যাত্রার জন্য মুক্ত ও শান্ত থাকার জন্য, এই দুই সুরক্ষা আবশ্যক। অর্থাৎ সাধক নিজের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুরক্ষার বিষয়ে বিচার করবেন, এবং ক্রিয়াও করবেন, কিন্তু সেই সমস্ত কিছু আমার  কাছে যাত্রা করাতে কনো প্রকার বাঁধা না আসে, তা নিশ্চয় করার জন্যই করবেন।

একবার বিচার করে দেখো, যিনি  তাঁর পরিবারকে চালানোর জন্য যেই যৎসামান্য উপার্জন আবশ্যক, তা দিনের ৮ থেকে ১০ ঘণ্টার মধ্যে সমাপ্ত করে দেন, আর তা করার পর, সমস্ত অর্থ ও সমাজচিন্তা থেকে মুক্ত হয়ে যান, তাঁকে কি মুক্ত হওয়া থেকে কেউ আটকান? না, কেউ আটকান না। কেন? কারণ তিনি তাঁর পরিবারের প্রতি কর্তব্য করে দিয়েছেন, তাঁর পরিবার তাঁর আহারাদির ব্যবস্থা করছেন, কারণ তাঁরাও নিজেদেরকে সুরক্ষিত অনুভব করছেন।

অর্থাৎ বুঝতে পারছো, সামাজিক সুরক্ষা ও অর্থনীতির পিছনে তাদেরকে সর্বস্ব জ্ঞান করে দৌড়লে, আত্মের বশ্যতা স্বীকার করে নিলে তোমরা।  যদি তাদেরকে সম্পূর্ণ ভাবে অস্বীকার করে দাও, তাহলে তোমাদের ভূতসমূহ বিমর্ষ ও চঞ্চল হয়ে গিয়ে তোমাদের আমার কাছে যাত্রাকে সম্পূর্ণ ভাবে স্তব্ধ করে দেব। আর যদি আত্মের বশ্যতার মধ্যে স্থিত তোমরা, এই সত্যতাকে মান্যতা প্রদান করে, যত শীঘ্র সম্ভব সেই সমস্ত সুরক্ষার দায় সমাপ্ত করে নিতে সচেষ্ট হও, তাহলে না আত্ম তোমাদের উপর নিজের বিষদন্ত স্থাপন করতে পারবে, আর না তোমাদের  ভূতরা তোমাদের সাথে বিদ্রোহ করবে, অর্থাৎ তোমরা সহজেই আমার কাছে উপস্থিত হবার যাত্রা করতে পারবে, দিনের পরিত্যক্ত ১৪ থেকে ১৬ ঘণ্টার মধ্যে।

এমন ভাবার কনো কারণ নেই যে, এই দুই পদক্ষেপে, তোমরা আত্মের থেকে সুরক্ষিত হয়ে গেলে, কারণ আত্মের প্রচণ্ড দুই আঘাত তো এখনো তোমরা সামলাওই নি। আত্ম সর্বসাকুল্যে চারটি আঘাত হানে, মোহিনীর শাসনের মধ্যেই তোমরা তা প্রত্যক্ষ করেছ। এঁদের মধ্যে দুটি প্রত্যক্ষ আর দুটি সুপ্ত। প্রত্যক্ষ যেই দুই আঘাত, তাদের কথা তোমরা এখন জানলে, অর্থাৎ সুরক্ষা ও অর্থনীতি। এবার পরে রইল, সুপ্ত দুই আঘাত।

স্মরণ করে দেখো মোহিনীর আগ্রাসনকে। সে কাকে শিক্ষা বলতো, আর কাকে সংস্কৃতি বলতো? যা কিছু তোমাদের অর্থনীতিকে সুরক্ষিত করে, তাকেই সে শিক্ষা বলতো, আর সেই অর্থনীতির সুরক্ষার দৌড়ে দৌড়নোর কালে, তোমাদের মধ্যে যেই ক্লান্তি ফুটে উঠতো, সেই ক্লান্তিদুরকরনের এবং সেই ক্লান্তির থেকে মুক্ত হয়ে কামনা ও বাসনার প্রতি পুনরায় তোমাদের উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে প্রস্তুতকারক কলাই তোমাদের কাছে সংস্কৃতি রূপে স্থাপিত করেছিল সে। কি তাই তো?

বিচার করে দেখো, যখন তুমি অর্থ উপার্জনের পদ্ধতি জানাকে শিক্ষার উপাধি দিচ্ছ, তখন কেবল নিজেকে নয়, স্বয়ং শিক্ষাকেও আত্মের দাসত্ব বরণে বাধ্য করছো। আর যখন তোমরা কামনা ও বাসনাকে উজ্জীবিত করার কলাকে সংস্কৃতির উপাধি প্রদান করছো, তখন সেই সম্পূর্ণ কলাবিভাগকেই তোমরা আত্মের দাস করে দিচ্ছ। এই শিক্ষা আর সংস্কৃতি তোমাদের সমস্ত বন্ধন থেকে মুক্ত করে নিয়ে যেতে সক্ষম। তোমাদের সুরক্ষার জন্য ও অর্থের জন্য পরিশ্রমকে এই শিক্ষা অর্জন ও কলার প্রতি নিষ্ঠা সহজেই ৮-১০ ঘণ্টার মধ্যে সীমিত করে দিতে সক্ষম। কিন্তু যখন তোমরা সেই শিক্ষাকেও এই অর্থনীতি এবং কলাকেও  কামনা-বাসনার সাথে সংযুক্ত করে নিচ্ছ, তখন তোমরা স্বয়ংই অর্থের ও সুরক্ষার প্রতি দাসত্বকে সম্পূর্ণ দিবসব্যাপী অনুষ্ঠিত হতে দিয়ে, সম্পূর্ণ দিন ও সম্পূর্ণ জীবনকে আত্মের কাছে সমর্পিত করে দিচ্ছ।

তাই যা প্রয়োজন, তা হলো শিক্ষা ও কলাকে শুদ্ধভাবে স্থাপিত করা ও শুদ্ধ ভাবে গ্রহণ করা।  শুদ্ধ শিক্ষা অর্থাৎ, যেই শিক্ষার সাথে অর্থের কনো সজগ নেই, এবং সুরক্ষার কনো সংযোগ নেই। কেবলই জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে লব্ধ ও প্রসারিত শিক্ষা। যেই শিক্ষার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডদের জানা, যেই শিক্ষার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডদের সমষ্টিগত স্বভাবকে জানা, আর যেই শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডদের আত্ম কি ভাবে নিজের বশে রাখে, আর সেই বশ্যতা থেকে ব্রহ্মাণ্ডদের কিভাবে উদ্ধার করা যেতে পারে তা জানা, তাই হলো শুদ্ধ শিক্ষা।

যখনই যার মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করা সম্ভব, তাকে শিক্ষার আখ্যা প্রদান করবে, যখনই যার মাধ্যমে আত্মের বৈভবের কাছে দাসত্ব অর্থাৎ আত্মতৃপ্তি ও আত্মসুরক্ষার বিষয়কে শিক্ষা বলা শুরু করবে, তখনই তোমাদের শিক্ষা তোমাদেরকে আত্মের দাশ করে তুলবে, এবং আমার থেকে অর্থাৎ সত্যের থেকে সম্পূর্ণ ভাবে বিচ্ছিন্ন করে তুলবে। যতক্ষণ শিক্ষা কেবলই ব্রহ্মাণ্ডদের গঠন, ব্রহ্মাণ্ডদের পরিকাঠামো, ব্রহ্মাণ্ডদের উপর আত্মের প্রভাব, এবং ব্রহ্মাণ্ডদেরকে আত্মের প্রভাব অর্থাৎ আমিত্ব থেকে মুক্তি প্রদানের প্রতি নিষ্ঠাবান হবে, ততক্ষণই সেই শিক্ষা তোমাদের জ্ঞানের উদ্দেশ্যে ধাবিত করবে। যেই মুহূর্ত হতে, আত্মকে সমৃদ্ধ করা, অর্থাৎ মান, সম্মান, অর্থ, যশ, প্রতিষ্ঠালাভের উপায়কে শিক্ষা বলা শুরু করবে, সেই মুহূর্ত হতে শিক্ষার মাধ্যমে অজ্ঞানতাই বরণ  করবে তোমরা।

অর্থাৎ শিক্ষা মানেই জ্ঞানের বিস্তারক, এ হলো এক অন্ধবিশ্বাস মাত্র। যতক্ষণ শিক্ষা আত্মবিমুখ, জগন্মুখী, এবং চৈতন্যমুখী, ততক্ষণই তা জ্ঞানপ্রদত্তা, আর যেই মুহূর্ত হতে শিক্ষা নামযশ  ধন ও প্রতিষ্ঠামুখী, সেই মুহূর্ত হতে সেই শিক্ষাই অজ্ঞানতার বীজ হয়ে যায়। আর বিচার করে দেখো, মোহিনী তোমাদেরকে ঠিক সেই বীজই প্রদান করেছিল, আর তোমাদের অন্তরে আত্মের বৃক্ষরোপণ করেছিল।

তোমরা ভেবে চলেছিলে যে তোমাদের শিক্ষিত করা হচ্ছে, আর সেই শিক্ষা গ্রহণ করে তোমরা জ্ঞানী হচ্ছ, কিন্তু বাস্তবে তোমাদের অজ্ঞানী করার জন্যই সেই শিক্ষা দেওয়া হচ্ছিল, কারণ সেই শিক্ষার মধ্যে কনো প্রকার জ্ঞান তো ছিলই না, ছিল কেবলই আত্মকে নিজেদের মধ্যে বিস্তার করার প্রশিক্ষণ, অর্থাৎ সেই শিক্ষাকে ব্যবহার করে অর্থ উপার্জনের প্রেরণা, সেই শিক্ষাকে ব্যবহার করে মানসম্মান এবং প্রতিষ্ঠা উপার্জনই উদ্দেশ্য হয়।

তাই যাকে তাকে শিক্ষা উপাধি দেওয়া বন্ধ করো। পুস্তক পাঠ করাই শিক্ষালাভ নয়, পুস্তক যদি জ্ঞান অর্থাৎ আত্মমুক্তি বা আমিত্ব থেকে মুক্ত করে, তা হলো জ্ঞান উত্তেজক, আর পুস্তক যদি আমিত্বে ভূষিত করে, তা হলো অজ্ঞানতার বিস্তারক। আর কেবল পুস্তকই নয়, শিক্ষাব্যবস্থাও এই একি ভাবে জ্ঞানপ্রসারক ও অজ্ঞানতাবিস্তারক হয়।

যেমন মোহিনীর শিক্ষাব্যবস্থাই এমন ছিল যেখানে শিক্ষা লাভ করলে উপার্জনের উপায় নিশ্চিত ছিল, অর্থাৎ শিক্ষা হয়ে গেল সেই শাসনে বাণিজ্যিক উপাদান। যখন এমন ভাবেই শাসনব্যবস্থা শিক্ষাকে বাণিজ্যিক ভাবে মুল্যঙ্কন করা শুরু করে, তখন সেই লেখকরা পুস্তক লেখা শুরু করেন, যারা আত্মের দাসত্বের নেশায় নেশাগ্রস্ত। আর তখন পুস্তক অজ্ঞানতার বিস্তারক হয়ে ওঠে।  তাই শাসনকে এমন রাখো যাতে, শিক্ষার অর্থই হয় আত্মচিন্তাবিমুখতা ও আত্মপ্রতিষ্ঠাহীনতা, তবেই শিক্ষা হবে জ্ঞান প্রদতা, নয়তো তা হয়ে যাবে অজ্ঞানতার বীজদাতা।

আর সংস্কৃতির অর্থ কখনোই বিনোদন নয়, সংস্কৃতি এক মহাভাব রচয়িতা, যা আমার সাথে তোমাদের সম্পর্ক স্থাপন করে ও সম্পর্ক দৃঢ় করে। নাট্য হবে অজ্ঞানতার প্রকৃতরূপ প্রদর্শনকারি; সঙ্গীত হবে ভাবঘন, যা তোমাদের সকলকে দিব্যতার আভাস প্রদানকারী; নৃত্য হবে যেখানে আমি তোমাদের কাছে ও তোমরা আমার কাছে সমর্পণ করবে ভাবঘন হয়ে, চিত্র তাই যা তোমাদের আমার প্রতি তীব্র আকর্ষণ, আর অজ্ঞানতার বিস্তারের প্রতি তীব্র বিকর্ষণ শোভিত করবে। তবেই তা কলা, তবেই তা সংস্কৃতি, নচেৎ তা অপসংস্কৃতি। যেই সংস্কৃতি কেবলই আত্মকে বিনোদন প্রদান করে, তা সংস্কৃতি কি করে হতে পারে? সে তো বিলাসিতার সূচক হয়, সে তো বাসনার বীজ হয়, সে তো কামনার অঙ্কুর হয়!

না তো সেই কলা আমি গ্রহণ করি, আর না সেই কলার প্রদর্শনকারী বা পাঠনকারীকে আমি গ্রহণ করি। আমি কেবলই সেই কলাকে গ্রহণ করি, যা ভাবঘন হয়, যা তোমাদের আত্মভাব থেকে বিস্মিত করে তোলে, যা তোমাদেরকে আমার কাছে সমর্পিত করে তোলে। যখন তোমরা সেই ভাবে প্লাবিত হয়ে সঙ্গীতের গহন রাগিণীর গহন খাদে নিজেদের পতিত করে দেবে, যখন তোমরা সঙ্গীতের অতিদ্রুত তালে নিজেদের নিমজ্জিত করে আত্মসম্বন্ধে  বিস্মরণ ধারণ করবে, যখন তোমরা নাট্যে নিজের আমিত্বকে ভুলে গিয়ে, যেই চরিত্রে অভিনয় করছো তাতে নিমজ্জিত হবে, যখন তোমরা চিত্রাঙ্কনের কালে কেবলই অজ্ঞানতার বীভৎসতা আর জ্ঞানের সৌম্যতা প্রদর্শন করতে উলমালা থাকবে, যখন তোমরা নৃত্যে সঙ্গীতের গহন ভাবকে নিজেদের অঙ্গে স্থাপিত করে জ্ঞানভাবের প্রতি লাস্যময় ও অজ্ঞানভাবের প্রতি তাণ্ডবময় হয়ে উঠবে, সেই সংস্কৃতিকেই আমি গ্রহণ করি, অন্য কিছুকে নয়।

এই হলো চার ধারা, যা তোমরা নিজেদের চরিত্রে অর্পণ করে, আমাকে লাভ করতে পারো, আমার সাথে ঘনিষ্ঠ হতে পারো। আর হ্যাঁ, যেই কথা তাত বিবেক বললেন, যার দ্বারা অন্য সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডকে নিজেদের প্রতি আকৃষ্ট করে, সত্যশিক্ষা প্রদান সম্ভব, তা হলো এই চারস্তম্ভ”।

দীর্ঘক্ষণ সর্বাম্বা সমস্ত কথা বললে, তিনি ক্লান্ত হলেন, আর অন্য সকলে তৃপ্ত হলেন। আর তাই তাঁর চার মাতাদের সাথে একত্রে তিনি বৃক্ষতলে বসে থেকে রসালাপ করছিলেন। কখনো সঙ্গীতে নিজে ডুবছিলেন আর নিজের মাতাদের ডোবাচ্ছিলেন, তো কখনো তাঁর মাতারা তাঁকে সঙ্গীতের গহন খাদে স্থাপিত রেখে নিজেদের আরাধ্যার প্রেমে নিজেদের অবগাহন করাচ্ছিলেন। আবার কখনো কনো মাতা নাট্য করে, ভঙ্গিমা করে, নিজেদের কন্যা তথা আরাধ্যাকে রসে সিক্ত করছিলেন, তো কখনো সেই একই কৃত্য নৃত্যের মাধ্যমে কনো মাতা করছিলেন।

এমনই সময়ে মানস সেখানে উপস্থিত হলে, প্রেমা তাঁর মাতা সকলের উদ্দেশ্যে বললেন, “মাতারা, মাতামহ মানস এসেছেন, কিছু গহন কথা বলতে। আপনাদের সম্মুখে সেই কথা বলতে তাঁর সরম হবে। তাই তাঁকে একাকীই আমার কাছে যদি খানিকক্ষণ থাকতে দেন”। … মানস বললেন, “না সর্ব্বা, আর লজ্জা নয়। আমি জানি, আমার দ্বন্ধের উত্তর তুমি অবশ্যই দেবে, আর তা হবে গহন জ্ঞানের বাণী, আর সেই বাণী সকলের জন্য উৎসেচক। তাই সকলেই শুনুক আমি যেই দ্বন্ধ ব্যক্ত করতে এসেছি, আর সকলে তোমার অমৃত বাণীও শুনুক”।

দেবী সর্বাম্বা হেসে বললেন, “বেশ, তাই হোক মাতামহ। …  বলুন, আপনার দ্বন্ধ নিজমুখে ব্যক্ত করুন”।

মানস বললেন, “পুত্রী বললেও, অন্তর থেকে মা বলতেও সরম আসছে দেবী। তাই দেবীই বলেই সম্বন্ধন করছি, মার্জনা করবেন, কারণ আমি জানি, আমার এই দেবী বলে সম্বন্ধন করার কারণে, আপনি যথার্থই ব্যথিত হচ্ছেন। দেবী, আপনি যেই চতুর্স্তম্ভের ব্যাখ্যা প্রদান করেলন, সেই জ্ঞান আমি ধারণ করতে ব্যর্থ হলাম কেন? কেন আমি তা ধারণই করতে পারলাম না!”

মাতা সর্বাম্বা হাস্যমুখে বললেন, “মানস, কেবল জ্ঞান নয়, যেকোনো কিছু ধারণ করতে যা আবশ্যক, তা হলো প্রয়োজনীয়তার বোধ। যেখানে প্রয়োজনীয়তার বোধ নেই, সেখানে কনো কিছুই ধারণ হয়না। পুত্র, শিশু নিজের অবস্থান ত্যাগ করে কোথাও যাবার প্রয়োজনেই হামাগুড়ি দেয়; আবার যখন তার মধ্যে এই প্রয়োজন জাগ্রত হয় যে সে তার দুই করে কিছু ধারণ করবে, তখনই সে দুই চরণে দণ্ডায়মান থাকার প্রয়াস করে। …

তাই পুত্র, ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর জিনিস আমরা ধারণ তখনই করতে পারি, যখন আমাদের মধ্যে তা ধারণ করার বোধ জাগ্রত হয়। জ্ঞান তো বহুতর ব্যপ্ত জিনিস। তা ধারণ করার জন্য প্রয়োজনীয়তার বোধ তো আবশ্যক। তোমার মধ্যে তা ধারণ করার প্রয়োজনীয়তার বোধ নেই, তাই তুমি তা ধারণ করতে পারছো না”।

দেবী ধরা পিছন থেকে আগিয়ে এসে প্রশ্ন করলেন, “কিন্তু মা, কি ভাবে এই প্রয়োজনীয়তার বোধ জাগ্রত করা সম্ভব? তোমার বাণীকে ধারণ করতে না পেরে, আমার যে নিজের কাছেই নিজে লজ্জায় মুখ দেখাতে পাচ্ছিনা!”

মাতা সর্বাম্বা হাস্যমুখে বললেন, “পুত্রী ধরা, আত্ম হলো অজ্ঞানতার দ্বিতীয় নাম। অজ্ঞানতাই আত্মের বিস্তারক সামর্থ্য, তাই অজ্ঞানতার বিস্তারই আত্মের একমাত্র রুচি। আত্মের বিস্তারের জন্য জ্ঞান নয়, অজ্ঞানতার প্রয়োজন। তাই যিনি আত্মের দ্বারা প্রভাবিত, তাঁর কাছে জ্ঞান অপ্রয়োজনীয়, এবং যদি বিস্তৃত কাল তাঁকে সেই সমস্ত জ্ঞান প্রদান করো, হয় সে তোমার সাথে বিবাদে যুক্ত হবে, নয় তোমার কথা শুনেও শুনবেনা, আর তা না হলে, তোমাকে কথা বলা থেকেই প্রতিহত করার প্রয়াস করবে।

কিন্তু সেই তাঁরই সম্মুখে যখন কিসে তাঁর সুরক্ষা নিশ্চয় করা সম্ভব হবে, কিসে তাঁর বিস্তার সম্ভব হবে, বা কিসে তাঁর প্রতিষ্ঠা স্থাপিত হবে, সেই কথা বলো, তখন সে যথার্থ ভাবেই তোমার কথনকে ধারণ করবে, কারণ সেই সমস্ত অজ্ঞানতা বিস্তারক কথাবার্তা তো আত্মের প্রিয়”।

মানস বললেন, “দেবী, একথা অনস্বীকার্য যে, আমরা বহুকাল আত্মের দ্বারা প্রভাবিত। না না, তাঁর কারাগারে স্থাপিত হবার কারণে নয়, তাঁর কারাগারে স্থাপিত হবার বহুপূর্ব থেকেই আমরা তাঁর দ্বারা প্রভাবিত। তাই আপনার এই কথাসমূহকে আমরা সঠিক ভাবে ধারণ করতে পারছি যে, আত্মের দ্বারা প্রভাবিত থাকলে, অজ্ঞানমূলক কথা অর্থাৎ প্রতিষ্ঠাজাতীয়, সুরক্ষাজাতীয় বা সুখজাতীয় শব্দ বড় প্রিয় হয়, আর জ্ঞান উন্মেলক শব্দ, যেমন আপনি চতুর্স্তম্ভ নিয়ে বললেন, তা ধারণই করা যায়না। কিন্তু দেবী, এর থেকে মুক্ত হবার কি উপায়! … আত্মের কবল থেকে আমরা কি ভাবে মুক্ত হতে পারি!”

দেবী সর্বাম্বা হেসে বললেন, “সেবার মাধ্যমে। দিবারাত্র যদি নিজকে ব্যতি রেখে, সকলের সেবার চিন্তা করতে থাকো, তাহলে আত্মচিন্তা থেকে মুক্ত হতে শুরু করবে। নিজের আহার, বিশ্রাম, বিলাসিতা সমস্ত কিছু ভুলে যখন দিবারাত্রি নিজের সমস্ত কিছু অর্পণ করে, কার কি ভাবে সেবা করলে, সে অজ্ঞানতা থেকে মুক্ত হতে পারে, আসক্তি থেকে মুক্ত হতে পারে, সেই বিচার করতে থাকবে আর সেই কর্মে নিজেকে নিযুক্ত রাখবে, তখন আত্মবোধ তোমাদের থেকে লঘু হতে শুরু করবে, আর তা একসময়ের পর যখন তোমাদের অন্তরের নিঃস্বার্থতাকে পরিপক্ক করে দেবে, তখন ঠিক যেমন পক্ক বাদামের থেকে তার খোসা খুলে পরে যায়, তেমনই ভাবে আত্ম খুলে পরে যাবে”।

মানস বললেন, “কিন্তু দেবী! সেবা করতে গেলেও যে, আত্মবোধ যেতেই চায়না! সর্বক্ষণ নিজের চিন্তা চলতেই থাকে অন্তরে। আমি সেবা করছি, এই খ্যাতি লাভ করতে ইচ্ছা হতে থাকে তখন অন্তরে, আর এই চিন্তা আর ইচ্ছাকে ঘিরে হাজারো কল্পনার জন্ম হতে থাকে। … এর থেকে কি মুক্তি হবে না!”

দেবী সর্বাম্বা হেসে বললেন, “দুদণ্ড পামুড়ে বসতে পারবে তবে তো এই সমস্ত চিন্তা ইচ্ছা আর কল্পনা করে করে আত্মকে শক্তিশালী করবে, তাই না! … তাহলে সেই দুদণ্ড সময়টিও দিওনা, সর্বক্ষণ নাওয়াখাওয়া সমস্ত উচ্ছন্যে পাঠিয়ে কার কি ভাবে সেবা করলে তাঁর আসক্তির নাশ হয়, তাঁর আবশ্যকতা পূর্ণ হয়, আর তাঁর অজ্ঞানতার নাশ হয়, তার বিচার করো, আর সেই অনুসারে ক্রিয়া করো। … তখন আর চিন্তা, ইচ্ছা বা কল্পনা প্রসারলাভের সুযোগও পাবেনা, আর এই তিনের থেকেই আত্ম শক্তিলাভ করে। তাই এঁরা দুর্বল হয়ে গেলে, আত্মও দুর্বল হয়ে যাবে”।

মানস সেই কথাতে সন্তুষ্ট হয়ে সেবার জন্য তৎপর হওয়া শুরু করলেও, দেবী ধরা তখনও তৃপ্ত হননি। তিনি প্রশ্ন করলেন, “কিন্তু মা, জ্ঞান ধারণ! … সেবা করতে করতে যদি নিজেকে সার্বিক ভাবে নিয়জিত করে দেওয়া হয়, তখন জ্ঞানধারণ হবেই বা কি করে, আর জ্ঞানধারণ করার সময়ই বা লাভ হবে কি ভাবে? এতে কি জ্ঞান ধারণের প্রয়োজন রচিত হবে?”

মাতা সর্বাম্বা হেসে বললেন, “যতক্ষণ সম্মুখে স্থিত ব্যক্তির আসক্তি দূর করার উপায় খুঁজে পাবে, সম্মুখে ব্যক্তির অজ্ঞানতার নাশ করার উপায় খুঁজে পাবে, ততক্ষণ জ্ঞানলাভের প্রয়োজন জাগবে না তোমাদের হৃদয়ে। কিন্তু যখনই তাঁদের অজ্ঞানতা দূর করার উপায় খুঁজে পাবেনা, যখনই তাঁদের আসক্তি দূর করার উপায় খুঁজে পাবেনা, তখনই প্রয়োজন বোধ করবে জ্ঞানের।

এই দেখো না, কারুর তনুতে সামান্য ব্যাথা লেগেছে, বা বৃহত্তর ব্যাথা বা চোট লেগেছে, তখন সামান্য ভেষজ দ্বারা চিক্তিসা করে সেবা করতে পারবে। যখন ব্যাথা তাঁদের মনে, বা হৃদয়ে কন্দরে, তখন কি তা পারবে? যখন তাঁদের প্রয়োজন অর্থের, সম্মানের, বা বস্ত্র বা আহারের, তখন তো তা তাঁদের সেবা করতে পারবে। কিন্তু যখন তাঁদের প্রয়োজন অসম্মানলাভ করার উত্তরের, তখন কি তাঁদের সেবা করতে পারবে! যখন তাঁদের প্রয়োজন লাঞ্ছিত হবার উত্তরের, তখন কি সেই উত্তর দিতে পারবে?

কিন্তু যখন তাঁদের সেবা করাই তোমাদের কাছে পরমধর্ম ও কর্ম হয়ে উঠবে, তখন তাঁদের এই প্রয়োজন সমূহকে না মেটাতে পারলে, তোমরা শান্তিও পাবেনা। আর তখনই সেই শান্তির সন্ধানের উদ্দেশ্যে তোমরা জ্ঞানের জন্য হাঁকপাঁক করবে। আর তখনই জ্ঞান ধারণ করতে সক্ষম হবে। তাই সেবাতে মনোনিয়োগ করে, আত্মকে দুর্বল করো, আর সেবাসর্বস্ব হয়ে ওঠো। যখন তেমন হয়ে যাবে, তখন জ্ঞানের আবশ্যকতা, প্রয়োজনীয়তার জন্য নিজেরাই হন্যে হয়ে উঠবে”।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22