৫.২। মিলন পর্ব
একদিকে যখন আত্ম তাঁর পত্নীদের সঙ্গে নিয়ে ইরার দ্বারে অবস্থান শুরু করলেন, তখন অন্যদিকে মানসদের আগমনে পিঙ্গলাতে এক অন্য প্রকার অনন্য উৎসব চলতে থাকে। পিতামাতার সাথে সন্তানদের মিলনের উৎসব ছিল তা, মাতামহ ও মাতামহীর সাথে প্রথম সাখ্যাতের উৎসব ছিল তা। আর সাথে সাথে, মানস আর ধরার কৃতজ্ঞতা ব্যক্ত করার উৎসব ছিল তা।
মেধা, শিখা ও বেগবতীকে আলিঙ্গন প্রদান করে, মানস ও ধরা অতিতৃপ্ত। তার থেকেও অধিক তৃপ্ত হলেন জামাতাদের আলিঙ্গন করে। আর সর্বাধিক প্রফুল্লিত হলেন পঞ্চভাবের সাথে আলাপ করে। তবে মেধার কাছে উপস্থিত হয়ে মানস ও ধরা, ও সকলেই ইতস্তত করতে থাকলেন।
মেধাই সকলের কাছে এগিয়ে গিয়ে আনন্দ উৎসবে সকলকে মাতিয়ে রাখলে, কুণ্ঠিত মানস ও ধরার কাছে এগিয়ে গিয়ে বললেন, “মাতা, পিতা, আপনাদের এমন কুণ্ঠিত দেখাচ্ছে কেন!”
দেবী ধরা নেত্রের অশ্রু ধরে রাখতে না পেরে, মেধাকে প্রথমবার অন্তর থেকে কন্যাস্নেহ প্রদান করতে করতে বললেন, “কি সম্মান তোর প্রাপ্য ছিল, আর কি সম্মান তোকে প্রদান করলাম পুত্রী! … যেখানে তোকে আমাদের সন্তান করে লাভ করে নিজেদেরকে ধন্য মনে করা উচিত ছিল, সেখানে তোর বিরূপ আচরণের কারণে, আমরা তোকে সমানে ভুল বুঝে এলাম। এর কি ক্ষমা সম্ভব মা!”
মেধা তাঁর ইতস্তত জননীকে আলিঙ্গন করে, পরবর্তীতে তাঁর কপোল ধারণ করে বললেন, “মা, যা কিছু হয়, তার নিয়ন্তা আমরা কোথায় থাকি! কর্ম বা কর্মফল, উভয়কেই আমরা নিয়ন্ত্রণ করার প্রয়াস করে থাকি, কিন্তু যতই তাদের নিয়ন্ত্রণের প্রয়াস করি, ততই তারা আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যই বহন করে আনে। হ্যাঁ, একটি জিনিসের উপর আমরা নিয়ন্ত্রণ স্থাপনের প্রয়াস করিনা, আর সেটি করতে পারলেই, আমাদের উদ্ধার হয়, আর তা হলো কর্ম ও কর্মফলের চক্রব্যূহ থেকে লব্ধ শিক্ষা।
তাই মা, কি কর্ম করা হয়েছে, বা সেই কর্মের কি ফল লাভ করেছি, তা তো গুরুত্বপূর্ণই নয়, গুরুত্বপূর্ণ এই যে সেই কর্ম সমূহ থেকে কি শিক্ষা লাভ করেছি আমরা, আর সেই শিক্ষা আমাদের কি ভাবে উন্নীত করেছে। এটুকু বলতে পারি মা, যে যা কিছু কর্মফল আমি ভোগ করেছি, ব্রহ্মময়ীর অত্যন্ত করুণা যে, সেই সমূহ ফলের থেকে যথার্থ শিক্ষা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি, আর সেই শিক্ষার ফলেই আমরা সকলে পুনরায় একাত্ম, সেই শিক্ষার ফলেই, আমার আর দিদিদের নাথেরা সুপ্ত থেকে প্রকাশ্যে আবির্ভূত, আর সেই মহাভাবের থেকে পঞ্চভাবের জন্ম হয়েছে।
সব মিলিয়ে, সেই শিক্ষা যে অর্জন করতে পেরেছি, তার ফলে আজ পুনরায় মাতা ব্রহ্মময়ীর আগমনের আবহাওয়া উপস্থিত। তাই, এঁর থেকে অধিক আনন্দের কি হতে পারে মা! … প্রচণ্ড পরিমাণ বেদনা ও পীড়া সহন করার পর যখন সুস্থ স্বাভাবিক সন্তান প্রসব করে কনো জননী, তখন তাঁর মধ্যে লেশ মাত্রও দ্বেষ থাকেনা তাঁর ভোগ করা পীড়ার জন্য। তেমনই মা, আজ যে আমরা সকলে পুনরায় মিলিত আর মাতা ব্রহ্মময়ীর পুনরাগমনের পরিস্থিতি পুনরায় প্রকাশিত, সেই বোধ আমার সমস্ত পীড়াকে হনন করে নিয়েছে।
মা, পিতা, মুক্তির জন্য প্রস্তুত হন, তিনি আসছেন মুক্ত করতে সকলকে, নিশ্চিত হন যে, তিনি কারুকে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ রাখেন না, কারণ তিনি জননী। জননীর স্বভাবই এমন। জননী কখনোই সন্তানকে এই বোধ করান না যে, তিনি সন্তানকে জন্ম দিয়ে সন্তানের উদ্ধার করেছেন। উল্টে তিনি সন্তানকে এই বোধ করান যে, সন্তান জন্ম নিয়ে, জননীর জীবনকে ধন্য করে দিয়েছে। এই কারণেই তো পিতা জন্মদাতা হবার পরেও, মাতা সন্তানের কাছে এতটা প্রিয় হন।
পিতা সন্তানকে কৃতজ্ঞ হতে শেখান, আর মাতা সন্তানের প্রতি কৃতজ্ঞতা ব্যক্ত করে সন্তানকে উৎফুল্লতা প্রদান করেন। … তেমনই মা, ব্রহ্মময়ী আপনাদেরকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করতে চাইবেন, আর তাই তিনি আপনাদেরকে নিশ্চিত ভাবে কনো যুদ্ধে রত করবেন, এক মহাসংগ্রামে রত করবেন, আর আপনাদের সকলকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেই মুক্তি দেবেন আপনাদেরকে।
যেই কর্মের ফল ভোগ করেছি, তা আমাকে মাতার এমন অদ্ভুত সরলতার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে মা! তিনি সত্যই অদ্ভুত। পূজা লাভে তাঁর কনো রুচি নেই, স্নেহ লাভের ভাব কেমন, তা তিনি স্বল্পই জানেন, কারণ তাঁকে স্নেহ করা এক দুরূহ প্রয়াস। কিন্তু স্নেহ দান করতে তিনি সর্বদা ব্যস্ত। সন্তানরা সকল কর্মফলের পীড়ার কারণ তাঁকে দেখিয়ে দিয়ে, দোষারোপ করতে থাকেন সর্বদা তাঁকে।
কর্ম আমাদের, কর্মফলের নিয়ন্তাও আমরা, আর ভোক্তাও আমরা। তা জেনেও, তিনি অনায়সে সমস্ত অভিযোগ গ্রহণ করে নেন। কিন্তু পরিবর্তে কি দেন তিনি! … সমস্ত কৃতিত্ব সাধককে দিয়ে দেন, যেন তিনি নিষ্কর্মা। এটিই তাঁর স্বভাব, তিনি প্রশংসা করতে ভালো বাসেন, প্রশংসা অর্জন করতে নয়। তাই তো তিনি জননী। জননীরও তো তেমনই স্বভাব। তিনি সন্তানের প্রশংসা শুনতে চান, নিজের নয়। তাই মা, প্রস্তুত থেকো, তোমরা যাতে প্রশংসিত হও, সেই পরিস্থিতি তিনি নিশ্চিত ভাবে নির্মাণ করবেন, আর তোমাদের প্রশংসার পাত্রও নিশ্চিত ভাবে তিনি করবেন”।
মানস উদ্বেলিত হয়ে বললেন, “এমন কেন বলছো পুত্রী! কেন আমরা, কেন তুমি যেই আমরা শব্দের উচ্চারণ করছো, তাতে তুমি নেই! তুমি কি আমাদের কর্মের দণ্ড প্রদান করে, আমাদেরকে ত্যাগ দিয়ে চলে যাবে, এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছ!”
মেধা হেসে বললেন, “কি বলছেন পিতা, দণ্ড! কেন? আমি তো আপনাদের সকলের প্রতি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ। আপনারা যা কিছু করেছেন, তার কারণে আজ মহাভাব সকলে জাগ্রত, পঞ্চভাব সমূহ আজ প্রকাশিত, আর মাতার আগমনের পূর্ণ প্রস্তুতি সম্পন্ন। এরপরেও আপনাদের দণ্ডদানের প্রশ্নই বা আসছে কেন! … তবে পিতা, যেটুকু আমি মাতা ব্রহ্মময়ীকে জেনেছি বা চিনেছি, আমার মুক্তির সময় আসন্ন। কি ভাবে তা হবে, বা কখন তা হবে, সেই বিচার করা বাতুলতা হবে, কারণ মাতার লীলা বিচারণীয় কখনই নয়। তবে আমার শিক্ষা বলছে, আমার মুক্তি অত্যন্ত সন্নিকটে।
তাই হয়তো, আপনাদের সেই কৃতজ্ঞতা হস্তান্তরের পর্বে, আমি উপস্থিত থাকবো না। সেই কারণে, আপনাদেরকে বলে গেলাম, আপনাদের সম্মুখে কি আসতে চলেছে। আপনারা নিশ্চিন্তে থাকুন পিতা, আমার নাশ হচ্ছে না, মুক্তি হচ্ছে। নশ্বর তো আমরা সকলে প্রথম থেকেই ছিলাম, আমার সময় হয়ে এসেছে যে আমি নশ্বরতা থেকে মুক্ত হবো, আর ঈশ্বরের মধ্যে চিরতরে বিলীন হবো”।
মেধা রন্ধন সমাপ্ত করে, সকলের হরষের কারণ হয়ে, স্নানে যাবার পূর্বে, এই কথন বলে স্নানে চলে গেলেন। সকলে অধির ভাবে অপেক্ষায় রইলেন, মেধার হাতের রন্ধন গ্রহণ করবেন বলে, কিন্তু মানস আজ ব্যথিত। কারুর প্রতি নয়, নিজের প্রতিই ব্যথিত। ধরাকে তিনি বললেন, “নিজের কর্মের কারণেই আমরা হতভাগ্য হই। মেধাকে হৃদয়ে আঁকড়ে ধরে রাখতে সাধ হচ্ছে, আর মেধার যাবার সময় উপস্থিত হয়ে গেছে। দেবী, দৈবকর্মে বাঁধা প্রদান না তো সম্ভব আর না করা উচিত। কিন্তু কি করে বোঝাবো মেধাকে যে আমরা তাঁর সামনে আসলেই, নিজেদের অপরাধীর বেশে দেখতে পাই, আর তাই আমরা তাঁকে অপার স্নেহ দিতে চাই, যা দেবার সময়কাল সমস্ত জীবন ছিল, কিন্তু আমাদেরই মন্দ বিচারের কারণে, আমরা তা দিই নি!”
দেবী ধরা বললেন, “কর্ম যখন করেছি, কর্মফল তো লাভ করতেই হবে নাথ। তাই মেধা যা শিক্ষা দিলো আমাদের, তাকেই ধারণ করা উচিত। কর্মফল নিয়ে বিমর্ষ না হয়ে গিয়ে, কর্মফলের থেকে লব্ধ শিক্ষাকে গ্রহণ করা উচিত আমাদের। নাথ, মেধার কথা সঠিক, আমারও এমন মনে হয়। যেই জ্ঞান অর্জনের পথে আমরা সবে পা-বাড়িয়েছি, মেধা সেই জ্ঞান সম্পূর্ণ ভাবে প্রায় অর্জন করে নিয়েছে। ওর নিষ্ঠা, একাগ্রতা, আর ব্রহ্মময়ীর প্রতি সমর্পণ ওকে সেই জ্ঞান অনায়সে দিয়ে গেছে, আর আমরা অতিরিক্ত চিন্তা করে করে, সেই জ্ঞান লাভ করার সুবিধা পেয়েও, তা লাভ করিনি। তাই মেধার কথাতে আমি সহমত যে ওর মুক্তির ক্ষণ আসন্ন।
নাথ, মানুন বা না মানুন, মেধার উপলব্ধি ও ব্যক্তিত্ব আমাদের থেকে অনেক অনেক উন্নত। গর্বও হচ্ছে তাঁর জননী হবার জন্য, আবার ভয়ও হচ্ছে কারণ তাঁর ব্যক্তিত্ব ঈশ্বরত্বকে ছুঁতে শুরু করে দিয়েছে, তাই শীঘ্রই সে ঈশ্বরের অধিক আপন হয়ে যাবে, আর আমাদেরকে ত্যাগ দিয়ে সে চলে যাবে। কিন্তু নাথ, এটিই তো আমাদের সকলের লক্ষ্য, তাই না! … মা হয়ে, সন্তানকে পরমার্থ লাভের পথে কি ভাবে বাঁধা দিই!”
মানস বললেন, “সেখানেই তো ধর্মসঙ্কটে পরে রয়েছি দেবী! একদিকে সন্তানের পরমার্থ লাভ, আর অন্যদিকে তাঁর প্রতি করা অপরাধের বোঝা। এই দুইয়ের মধ্যে বড় অসহায় পিতা মনে হচ্ছে নিজেকে! পিতা হবার অযোগ্য মনে হচ্ছে নিজেকে; ধিক্কার আসছে নিজের প্রতি”।
পাশ থেকে বিবেক হেসে বললেন, “রাজা মানস, আমি আপনার জামাতা, অর্থাৎ পুত্রসমান। পুত্রের এহেন কথা বলা শোভা পায়না, কারণ উপদেশ মূলক কথা পিতামাতা সন্তানকে বলেন, সন্তান পিতামাতাকে নয়। তাও একটি কথা বলতে বাধ্য হচ্ছি আমি, কারণ এই কথা না বললে, মেধার প্রতি আমরা সকলে অধিক অপরাধী হয়ে যাবো। রাজা, মেধা কাল মুক্তি পেলে, কাল চলে যাবে, কিন্তু আজ তো সে আমাদের মধ্যেই আছে, তাই না! কেন না আজ আমরা তাঁকে আমাদের স্নেহ দ্বারা সদা স্নান করাতে থাকি! … কেন না, তাঁর মুক্তিলাভের কালে, যেমন মাতার প্রতি তাঁর সম্পূর্ণ সমর্পণ থাকবে, সাথে সাথে আমাদের প্রতিও তাঁর হৃদয়ে স্নেহকে অঙ্কন করে দিই!… এটুকু তো আমরা করতেই পারি, তাই না!
আমার কথার অর্থ এই মহারাজ যে, কাল কি হবে তা না ভেবে, আজ আমরা যদি মেধাকে আমাদের সবটুকু দিয়ে স্নেহ প্রদান করে বলি যে, আমরা অত্যন্ত কৃতজ্ঞ সেই সমস্ত কিছুর জন্য, যা সে আমাদের জন্য করেছে! … পিতা, মেধার প্রতি আমরা মহাভাব অর্থাৎ তিন ভ্রাতা তো কৃতজ্ঞ বটেই। আমাদের তো সে নবজন্ম দিয়েছে, অপার স্নেহ দিয়েছে, অকুণ্ঠিত প্রেম প্রদান করেছে। আপনার দ্বিতীয় কন্যা আমার স্ত্রী, আর তাঁর কাছে মেধা কন্যাসম। তাই মেধা আমার কাছেও কন্যাসম হওয়া উচিত। কিন্তু পিতা, কি করে তাঁকে কন্যাসম ভাববো আমরা মহাভাব, অর্থাৎ তিন ভ্রাতা!
আমাদের কাছে যে সে আমাদের মাতা, আমাদের জননী, আমাদের প্রাণ দিয়েছেন, অপার স্নেহদ্বারা সিঞ্চন করে গেছেন দিনের পর দিন, হৃদয় ভরে আলিঙ্গন প্রদান করেছেন আমাদের সকলকে, ঠিক যেমন মাতা তাঁর সন্তানদের করেন। তাই মেধার প্রতি আমাদের ভাব অত্যন্ত বিচিত্র। সে আমাদের কাছে একাধারে মাতা, কন্যা, ভগিনী ও প্রেমিকা।
হ্যাঁ মহারাজ, সে আমাদের ভ্রাতা মনে করে, তাই সে আমাদের কাছে ভগিনী। তাঁর আচরণ আমাদের প্রতি মাতা সমান, তাই তিনি আমাদের জননী। আমাদের পত্নীরা তাঁকে নিজের কন্যা ব্যতীত কিছুই ভাবতে পারেন না, তাই সে আমাদের তনয়া। আর এই সমস্ত কিছুর থেকেও গুহ্য কথা এই যে, আমরা আমদের পত্নীদের সেই গুনই প্রত্যক্ষ করি, যা আমাদের মেধার মধ্যে প্রকাশিত। অর্থাৎ, মিলন আমাদের আপনার অন্য দুই কন্যার সাথে হয়নি, মিলন তো মেধার সাথেই আমাদের হয়েছে, কারণ তাঁর গুনকে প্রত্যক্ষ করেই যে, আমরা আমাদের পত্নীদের প্রতি আকর্ষিত হয়েছি, আর সন্তানের জন্ম দিয়েছি।
আর ফলস্বরূপ দেখুন নাথ, আমাদের সকল সন্তান মেধাকেই নিজেদের জননী জ্ঞান করে। মহাভাব, পঞ্চভাব, এমনকি শিখা ও বেগবতীর কাছেও, সকলের কাছে সকলের অজ্ঞাতে মেধা আমাদের জননী ও প্রেমিকা, একাধারে। নাথ, কাল কি হবে আমরা কেউ জানিনা, হতেই পারে মেধা মুক্ত হয়ে যাবে, কারণ মুক্তি লাভের সমস্ত গুনাগুণ তাঁর মধ্যে অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু আজ তো সে আমাদের সম্মুখে আছে। কেন না আজ থেকে তাঁর মুক্তির সময় পর্যন্ত, সে আমাদের যেই অপার স্নেহ প্রদান করেছে, সেই স্নেহই তাঁকে প্রদান করে, তাঁর প্রতি আমরা কতটা কৃতজ্ঞ, তা ব্যক্ত করি!”
ধরা বিবেকের কপোল স্পর্শ করে বললেন, “সত্যই তোমরা ব্রহ্মময়ীর সন্তান। তা না হলে, এমন কঠিন কথা এমন অকপটে কেউ বলতে পারে! … সঠিক বলেছে আমাদের জামাতা, নাথ আমাদের উচিত এখন মেধাকে নিজেদের হৃদয় উজাড় করে স্নেহ প্রদান করা, চিন্তিত থাকা নয়”।
মেধাকে স্নেহদানে ব্যকুল প্রায় সকলেই। শিখা ও বেগবতী তো সর্বক্ষণ মেধারই চিন্তা করে ফেরেন। মেধার রন্ধনের পর, সে স্নান করতে গেলে, তাঁরা হেঁসেলে প্রবেশ করে, পরিবেশনের ব্যবস্থা করা শুরু করলে, বিচার প্রশ্ন করলেন, “আপনারা হেঁসেলে কি করছেন!” উত্তরে শিখা বলেন, “মেয়েটা স্নানে গেছে, ফিরে এসে আবার হেঁসেলে ঢুকবে! স্নান করে এসে, পূজা সমাপ্ত করেই যাতে আহারে বসতে পারে, তার কারণেই আমরা হেঁসেলে”।
ছেলে মেয়েরাও তাঁদের জননীর হাতে হাতে কাজ করতে থাকলেন, যাতে তাঁদের মেধামায়ের সুবিধা হয়। মেধা সকলের তাঁর প্রতি স্নেহ দেখে আপ্লূত হয়ে আহার গ্রহণ করে, সকলে পাত পরিষ্কার করে, জলাশয়ে নিজেকে ধৌত করতে গেলে, বৈরাগ্য তাঁকে পিছন থেকে জরিয়ে ধরেন।
মেধা হেসে তৃপ্ত হয়ে বললেন, “কি হলো নাথ, আপনাকে অতিশয় আনন্দিত দেখাচ্ছে যে আজ!”
বৈরাগ্য হেসে বললেন, “গর্বের শেষ নেই আমার দেবী। আমার থেকে অধিক গৌরবময় আর কেউ নেই আজকে। আপনাকে ঘরণী রূপে লাভ করে, আমি যে কি পরিমাণ আপ্লুত, তা বলে বোঝাতে পারবো না”। মেধারও স্বামীর আলিঙ্গনে অঙ্গে অঙ্গে পুলক জাগতে শুরু করে। তাঁর যে পুলক জাগ্রত হচ্ছে, তা বৈরাগ্যের অনুভব করতে অসুবিধা হয়না, কারণ মেধার অন্তরে পুলক জাগলেই, তাঁর স্বেদ থেকে যোনিরস থেকে, ও স্তনদেশ থেকে অতিসুগন্ধি পুষ্পের সুগন্ধ ব্যপ্ত হতে থাকে।
মেধার এই পুলকিত পুষ্পমধু যা তাঁরই উদ্দেশ্যে স্খলিত বলে ধারণা বৈরাগ্যের, তা তিনি পান করতে থাকলে, মেধাকে অতিকায় ভাবে মর্দনে নিযুক্ত করে তুললেন বৈরাগ্য। সমর্পিতার জন্মপূর্বেও মিলন হয়েছে বৈরাগ্যের সাথে মেধার, কিন্তু সেই মিলনে মেধা একপ্রকার ছিল। কিন্তু আজ যেন মেধা পূর্ণরূপে সমর্পিতা। বৈরাগ্য তা লক্ষ্য করছেন, কিন্তু পরমুহূর্তেই মেধার অঙ্গরস ও রসসুগন্ধে বারংবার যেন অতিচেতন হয়ে যাচ্ছেন।
দীর্ঘমেয়াদি হলো তাঁদের মিলন অভিযান। অবশেষে যখন বৈরাগ্য তৃপ্ত হয়ে মেধার অনাবৃত তনুর লাবণ্যকে আচ্ছাদিত করার প্রয়াস করলেন, মেধা যেন কোথায় হারিয়ে ছিল, সে সেই হারিয়ে যাওয়া স্থান থেকে ফিরে এলো। নিজেকে ও বৈরাগ্যকে নগ্ন রূপে দেখে, তিনি বুঝলেন, তিনি এতক্ষণ মিলনে আবদ্ধ ছিলেন। প্রথমে আচম্বিতই হলেন, অতঃপরে মিষ্ট হাস্য প্রদান করলেন।
বৈরাগ্যের দৃষ্টির বাইরে ছিল না মেধার এই আচম্বিত হওয়ার ক্ষণিকের ভাব। তাই প্রশ্ন করলেন, “কি হলো দেবী, আপনি যেন সজ্ঞানে মিলনে আবদ্ধ ছিলেন না, এমন মনে হলো!”
মেধা মাথা নিচু করে বললেন, “ক্ষমা করবেন নাথ, দৈহিক ভাবে হয়তো আপনার সাথেই মিলনে আবদ্ধ ছিলাম, কিন্তু আন্তরিক ভাবে আমি মিলনে আবদ্ধ ছিলাম ব্রহ্মময়ী মাতার সাথে। কি হয়েছে জানি না নাথ, আজকাল প্রায়শই তাঁতে হারিয়ে যেতে প্রাণ চায়, আর প্রায়শই তাঁতে ডুবে যাই। পরমাত্মের গহন অলৌকিক আলোক ভেদ করে, মহাশূন্যের মহাগহন অন্তরিক্ষে বিলীন হয়ে যাই, আর অনাবিল আনন্দে ক্রমাগত অবগাহন করতেই থাকি।
সেই অবগাহনে না আছে মৃত্যু ভয়, আর না আছে কিছু হারিয়ে ফেলার চিন্তা। না আছে কনো প্রকার কল্পনা আর না আছে কনো প্রকার কামনা। না আছে কনো রূপ, আর না আছে কনো বর্ণ। না শব্দ আর না গন্ধ। কিন্তু যেন এই কিচ্ছু না থাকাই সমস্ত কিছু একত্রে থাকার থেকেও অধিক প্রিয় হয়ে যায় আমার কাছে। আমি আমার আমিকে আর খুঁজে পাইনা সেই শূন্যরূপের কাছে, কিন্তু তাতেই যেন আমার আনন্দ। নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলে যে এমন আনন্দ হতে পারে, তেমন কথা কখনো শুনি নি নাথ, কিন্তু বাস্তবেই তেমন আনন্দ হতে থাকে।
তেমনই আনন্দে ডুবে ছিলাম, আর তেমন আনন্দে ডুবে থাকাকালীনই আপনার সাথে আমার দেহ মিলনে আবদ্ধ হয়ে গেছিল। তাই হ্যাঁ, সঠিকই বলেছেন, সজ্ঞানে মিলনে আবদ্ধ ছিলাম না আমি। আর সত্য বলতে আপনার সাথে মিলনে আমি আবদ্ধও ছিলাম না। মিলনে অবশ্যই আবদ্ধ ছিলাম আমি, তবে তা মাতার সাথে, আমার আরাধ্যার সাথে, আমার সর্বস্বের সাথে”।
বৈরাগ্য আর কিচ্ছু বললেন না, কিন্তু হৃদয়ের অন্তরে এক অসম্ভব বেদনা অনুভব করলেন, আর মেধাকে প্রাণপণে জরিয়ে ধরলেন। মেধা ঘাবড়ে গিয়ে বললেন, “কি ব্যাপার নাথ, আপনি কি কনো কারণে ভীত!”
বৈরাগ্য ম্লান একটি হাস্য প্রদান করে বললেন, “ভীতও, আনন্দিতও। মেধা, তুমি যা বললে, তার অর্থ তুমি হয়তো জানো না। তোমার কথার অর্থ হলো সমাধি, মাতার সাথে মিলন। অর্থাৎ তোমার দেহের প্রয়োজন সমাপ্ত হয়েছে। জানিনা আর মাতা কতদিন তোমার দেহকে রাখতে দেবেন। তাই ভীত, আমার প্রাণ যাতে বসে, তাঁকে হারিয়ে ফেলার জন্য ভীত। আর আনন্দিত কেন! অতিগৌরব অনুভব হচ্ছে প্রিয়ে। আমার প্রাণপ্রিয়ে, আমার আদরের, অতিআদরের মেধা পরমার্থ লাভ করতে চলেছে। এঁর থেকে অধিক গৌরব আর কিসে হতে পারে।
বড় দ্বন্ধে রয়েছি মেধা। তোমাকে হারিয়ে ফেলার পীড়া হৃদপিণ্ডকে ক্রিয়া করা থেকেই রোধ করছে, আবার তুমি চলে গেলে, আমার জননীর কাছে যাবে, তাই অতীব এক আনন্দের হিল্লোল হৃদয়কে ভাসিয়ে দিতে চাইছে। সব মিলিয়ে মনে হচ্ছে যেন, তোমাকে আলিঙ্গন করেই থাকি, ততক্ষণ আলিঙ্গন করে থাকি, যতক্ষণ তুমি এই তনুতে বিরাজমান থাকবে। অন্তিম ক্ষণ পর্যন্ত তোমাকে হ্রদয়ে আবিষ্ট করে রেখে দিই, এই সাধ হচ্ছে।
হ্যাঁ দেবী, তেমন করলে, সকলে আমার নিন্দা করবে, বলবে স্ত্রীর কাছে বশ হয়ে গেছে, মেরুদণ্ড হারিয়ে ফেলেছে। সমস্ত কিছু শুনতে রাজি আমি, এমনই মন হচ্ছে, কিন্তু তোমার সঙ্গ একটি মুহূর্তও ত্যাগ করতে ইচ্ছা হচ্ছেনা”।
এমন ঘটনা বেশ কিছুদিন যাবত হতে থাকলো, মেধা প্রায়শই মাতার সাথে মিলনে রত হলো, আর বৈরাগ্য প্রতিবারই মেধার অঙ্গসুগন্ধের জেরে বিবশ হয়ে, মেধার সাথে মিলনে আবদ্ধ হয়ে, তাঁর গর্ভে নিজের বীর্য স্থাপিত করলেন। আর এমন চলতে চলতে, মেধা পুনরায় অন্তঃসত্ত্বা হয়ে গেলে, সকলে আপ্লুত হয়ে উঠলেন।
শিখা আপ্লুত হয়ে বেগবতীকে বললেন, “পূর্বে যখন মেধা অন্তঃসত্ত্বা হয়েছিল, তখন আমরাও অন্তঃসত্ত্বা ছিলাম, তাই তাঁর সেবা করতে পারিনি। এবারে মন উঠিয়ে সেবা করবো। তাই করলেন সকলে। জননী দেবী ধরা, ভগিনীরা দেবী শিখা ও বেগবতী, এমনকি কন্যারাও, অর্থাৎ জিজ্ঞাসা, স্নেহা, মমতা তথা সমর্পিতা, সকলেই মন উঠিয়ে তাঁদের আদরের মেধাকে সেবা করলেন। আর সেই সেবার কারণেই হয়তো, মাত্র ছয়মাসের মধ্যে মেধা সদ্যজাতের জন্মদিলেন।
সদ্যজাত শিশুকন্যার দিব্যতাতে সকলে বিভোর। যেন তাঁর কারণে সম্পূর্ণ স্থানে এক অদ্ভুত আলোক বিচ্ছুরিত হচ্ছে। এক অসীম, অস্পষ্ট হয়েও স্পষ্ট দিব্যতা যেন চারিভিতে ছড়িয়ে পরেছে। সেই দিব্যতাতে স্নান করে, পঞ্চভাব তাঁদের ঠিক করা নাম দিলেন সেই শিশুকে, সর্বাম্বা।
অন্যদিকে সকলে, বৈরাগ্য ও মেধার মধ্যে প্রবল প্রেমের দেখা পেয়েছিলেন এই শিশুকে জন্ম দেবার কালে। তাই এই শিশুর নামকরণ করলেন প্রেমা। দীর্ঘক্ষণ সকলে তাঁদের প্রেমা ও সর্বাম্বার সাথে সময় কাটালে, দেবী শিখা বললেন, “সন্তানকে পেয়ে আমরা তাঁর জননীকে ভুলেই গেছি। মেধা, এই দ্যাখ, তোর মেয়ে, সাখ্যাত যেন জগজ্জননী, জগতকে উদ্ধার করতে এসেছেন”।
মেধার থেকে কনো উত্তর না পেয়ে, মেধার কাছে প্রেমাকে নিয়ে গিয়ে, দেবী শিখা বললেন, “গৌরি, এই দ্যাখ, তোর মেয়েকে দ্যাখ ভালো করে! আমরাই তো তাঁকে নিয়ে উলমালা, তোকে তো তাঁর মুখদর্শন করতেও দিলাম না। … মেধার কাছে গিয়ে, শিখা হতবম্ব হয়ে গিয়ে, এক প্রকার চাপা ক্রন্দনের স্বরে বলে উঠলেন, “মেধা… গৌরি! … মেধা!”
তাঁর আর্তনাদ শুনে সকলে সেই দিকে এগিয়ে গেলে, সকলে আবিষ্কার করলেন, মেধা এই সদ্যজাত সন্তানের জন্ম দেবার কালেই দেহত্যাগ করেছেন। সেই দেখে, শিখা ভূমিতে পতিত হয়ে গেলে, বৈরাগ্য যেন তিন কদম পিছিয়ে গেল, যেন তাঁর পায়ের তলার মাটিই তিনফুট সরে গেল।
মানস বিচার ও বিবেক, যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন, সেখানেই বসে পরলেন। বেগবতীর যেন হৃদস্পন্দনই বন্ধ হয়ে যাবার যোগার হয়। আর শিখার যেন বিশ্বাসই হয়না যে মেধা আর তাঁর দেহে নেই। বারংবার মেধার দেহকে নেড়েচেরে দেখে তাঁকে জাগাবার প্রয়াস করতে থাকলেন।
দেবী ধরা বাকশূন্য, তবে তিনি অনুধাবন করলেন, পঞ্চভাব তাঁদের জননীকে হারিয়ে অনাথ হয়ে যাবার ভান করছে, তাই তাঁদেরকে আঁকড়ে ধরে উদাস নয়নে কেঁদে ফেললেন। শিখা অনেক পরে আর্তনাদ করে উঠলেন, “কেন গৌরি! কেন আমরা নই, কেন তুই! সারাজীবন আমাদের সকলকে একত্রিত রাখার প্রয়াস করে, আজ যখন সেই কাজে তুই সফল, তখন সামান্য সুখও তোর সহ্য হলো না! … সুখের সাথে তোর এতো বৈরী কেন মেধা! … কেন সামান্যও সুখ তুই গ্রহণ করলি না! কেন সমস্ত সুখ আমাদের জন্য দিয়ে গেলি। … হে জগজ্জননী, এ তোমার কেমন বিচার মা! … সদাসর্বদা যেই মেয়ে তোমার জন্য ভেবে গেল, তাঁকেই তুমি সুখ দিলে না! আর যারা তোমার কথা ভাবার অছিলা করে নিজেদের চিন্তা করে গেল, তাদেরকে তুমি সুখ ভগের জন্য রেখে দিলে! কেন মা, কেন?”
বেগবতী শিখাকে শান্ত করতে তাঁর নিকটে গেলে, শিখা এবার বেগবতীকে আঁকড়ে ধরে হাউহাউ করে কেঁদে উঠলেন। বেগবতীও আর্তনাদ করে উঠলেন, “মা রয়ে গেল, আর মেয়ে চলে গেল! … দিদি, আমরা যে আমাদের মেধাকে কনোদিন মেয়ের থেকে অন্য চোখে দেখিনি, তারপরেও আমরা নিজের চিন্তা করেছি মেয়ের চিন্তা না করে, এই দণ্ড আমাদের জন্য দিদি, এই দণ্ড আমাদের জন্য। মা হয়ে এমন স্বার্থপর কি করে হোত্রে পারলাম আমরা!”
সমর্পিতা নিজের জননীকে হারিয়ে পিতার কাছে যাবার প্রয়াস করলেন, কিন্তু তাঁর পিতা যেন বেদনায় পাথর হয়ে গেছে। বারংবার ডেকেও সারা দিলেন না বৈরাগ্য। যেন তিনি আবার বৃক্ষরূপে প্রত্যাবর্তন করেছেন। তাই দেখে সমর্পিতা ছুটে গেলেন তাঁর ভগিনীর পানে, সদ্যজাত সর্বাম্বা, আর জন্মের পরেই সে মাতৃহারা। সমর্পিতা তাঁকে জরিয়ে ধরলেন নিজের কমল কিশোরীবক্ষে আর বলে উঠলেন, “মা নেই তো কি হয়েছে, দিদি তো আছে না! … আমার মা, কনো দিন কনো সন্তানকে নিজের ভিন্ন অন্য কিছু ভাবেন নি। তাঁর কন্যা হয়ে, তাঁরই কন্যাকে অনাথ কি করে মনে করতে দিই!”
জিজ্ঞাসা, স্নেহা, মমতা সকলে সর্বাম্বাকে আঁকড়ে ধরলেন, আর বলে উঠলেন, “মেধা মা, আমাদের সকলের মা ছিলেন। তাই আজ থেকে আমরা সকলে তোর মা সর্ব্বা। তুই অনাথ কিছুতেই নয়”। বিশ্বাস সম্মুখে এসে সর্ব্বাকে ক্রোড়ে নিয়ে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে কেঁদে উঠে বললেন, “একমাত্র ছেলে, তাই মেধামায়ের স্নেহ যেন অধিকই পেয়েছি আমি। তাঁর স্নেহ ব্যর্থ যেতে দেব না সর্ব্বা। আজ আমি বচন দিচ্ছি তোকে, আমি আজীবন ব্রহ্মচারী থেকে, একমাত্র একটি পরিচয় নিয়েই বাঁচবো, আমি আমার সর্ব্বার পিতা”।
সকলে যখন এই ভাবে বিলাপে রত থাকলেন, তখন অন্যদিকে সর্বাম্বার জন্মের কারণে এক অতিদিব্য আলোক যেন দেবী চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনাকে ঝলসে দিতে থাকলো। সেই আলোকে তাঁদের পীড়া হওয়া শুরু করলে, তাঁরা সেই আলোকের সন্ধান করতে করতে উপস্থিত হলেন সর্বাম্বার জন্মস্থানের নিকে।
সেখানে উপস্থিত হয়ে সর্বাম্বার জন্ম ও মেধার মৃত্যু দেখে, আর সর্বাম্বার দিকে ঠিক করে তাঁরা তাকাতেও পারছেন না, তা দেখে, অতিশয় ভাবিত হয়ে আত্মের কাছে প্রত্যাবর্তন করে বললেন, “নাথ, ব্রহ্মময়ী জন্ম নিয়ে নিয়েছে, কিন্তু জন্মের কালে সে তাঁর জননী, মানে মেধার প্রাণ হরণ করে নিয়েছে। … নাথ, সেই শিশুর নাম রাখা হয়েছে সর্বাম্বা। আর বিশ্বাস করুন নাথ, আমরা সর্বাম্বার নিকটে যাওয়া তো দূরের কথা, আমরা সর্বাম্বার দিকে ঠিক করে তাকাতেও পাচ্ছিনা। যেন মনে হচ্ছে আমরা ঝলসে যাবো”।
আত্ম গম্ভীর হয়ে বললেন, “এই একই অনুভূতি আপনাদের ব্রহ্মময়ী মাতার ক্ষেত্রেও হতো। তাই না! আর তাই আপনারা উনার সম্মুখে যেতে চাইতেন না!”
দেবী চিন্তা ভাবিত হয়ে বললেন, “সেই কারণেই তো নাথ এত দৃঢ় ভাবে বলছি যে, সেই শিশু সর্বাম্বাই”।
আত্ম গম্ভীর হয়ে বললেন, “কিছুদিন আপনারা অপেক্ষা করুন, আর পঞ্চভাবদের নিজেদের প্রতি আকর্ষিত করুন। স্ফীতা আর বিচিত্রা, তোমরা তাঁদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে, তাঁদেরকে তোমাদের গুরুমাতা, অর্থাৎ দেবী রুচির কাছে নিয়ে আসবে। আর দেবী ইচ্ছা, অর্থাৎ দেবী রুচি, আপনি এই ভাবদের সাথে একদিন যাবেন পিঙ্গলাতে মানসদের কাছে। অবশ্যই মায়াবী ছদ্মবেশ ধারণ করে যাবেন যাতে কেউ আপনাদের চিনতে না পারে।
আর সেখানে গিয়ে, সর্বাম্বাকে দেখা মাত্রই আপনাদের মধ্যে যেই ভস্ম হয়ে যাবার ভাব প্রকট হবে, তাকেই সম্মুখে রেখে, দেবী রুচি আপনি তাঁদের সকলকে বিধান দেবেন যাতে, এই শিশুকে তাঁরা বর্জন করেন, কারণ এই শিশু অত্যন্ত অপবিত্র। তাঁর অপবিত্রতার তেজ আপনাদেরকেও বেদনা প্রদান করছে, আর সেই অপবিত্রতাই তাঁর মাতার প্রাণ হরণ করে নিয়েছে”।
আত্ম পুনরায় বলে উঠলেন, “একবার যদি এঁরা ব্রহ্মময়ীকে ত্যাগ করে দেয়, আমাদের সমস্যার সমাধান হয়ে গেল। আর যদি তা না করে, তারপরেও যাতে আমাদের কাছে রাস্তা খলা থাকে, তাই আমি আপনাদের সাথে যাবো না। আমি তারপরে উপস্থিত হয়ে, সর্বাম্বাকে নিয়ে সুষুম্নার পথ উন্মোচনে নির্গত হতে পারবো, আর সেখান থেকে সমস্ত শক্তি সঞ্চয় করে নিয়ে, আমি ও আপনারা অজেয় হয়ে উঠবো। তারপর আর ব্রহ্মময়ী আমার কিচ্ছু করতে পারবেনা”।
এমন যোজনা করেই, ত্রিছায়া, অর্থাৎ চিন্তা ইচ্ছা ও কল্পনা ক্রিয়াশীল হওয়া শুরু করলেন। সর্বাম্বা একপ্রকার সকলের কাছে চক্ষুশূলই রইলেন, কারণ সে তাঁদের প্রিয় মেধার প্রাণ হনন করে নিয়েছে। কিন্তু পঞ্চভাবের চক্ষুর মণি হয়ে রইলেন তিনি, আর তাঁদের কাছেই বেড়ে উঠলেন। মাতা নেই, তাই স্তনদান সম্ভব নয়। তাই সমর্পিতা নিজের রক্ত নিষ্কাসিত করতো, আর বিশ্বাস সেই রক্তের সাথে একাধিক পুষ্টিসম্পন্ন বৃক্ষরস মিশ্রিত করে, তাকে দুগ্ধে পরিবর্তিত করতো। আর সেই দুগ্ধকে পান করাতো সর্বাম্বার জননীরা।
সমর্পিতা যাতে রক্তপ্রদান করতে করতে দুর্বল না হয়ে যায়। সেই উদ্দেশ্যে, জিজ্ঞাসা, স্নেহা ও মমতা সিদ্ধান্ত নেয় যে, একাকদিন একাকজন রক্ত প্রদান করবে, আর তেমন ভাবে চলতে থাকলে, চার মাতার রক্তের সাথে বিশ্বাসের পরিশ্রম মিশ্রিত দুগ্ধপান করে করে সর্বাম্বা বড় হতে থাকলেন। তাই সর্বাম্বার প্রেমা ছাড়াও আরো একটি নাম হলো লহুসিক্তা।
শিখার খুব ইচ্ছা হতো, প্রেমাকে আঁকড়ে ধরতে, কারণ মেধারই প্রতিরূপ সে, কিন্তু মনের মধ্যে একটি কুণ্ঠা কাজ করতো, তাই ইচ্ছা করেও তা সম্পন্ন করতে পারতো না। বেগবতীও লুকিয়ে লুকিয়ে তাঁদের সন্তানদের প্রেমার প্রতি অপার স্নেহকে দেখতো। নিজের সন্তানদের সেই নিষ্ঠার জন্য তারিফ করলেও, প্রেমার প্রতি তাঁর ক্রোধ উঠে আসতো এই ভেবে যে সেই কন্যা তাঁর আদরের গৌরির প্রাণহর্তা।
বৈরাগ্য সম্পূর্ণ ভাবে বিরক্ত হয়ে উঠে, গভীর সাধনায় রত হয়েছে। আর বিচার বিবেক সর্বদা তাঁদের ভ্রাতার প্রাণরক্ষা নিয়েই ব্যস্ত। এরই মধ্যে সর্বাম্বা শৈশব ত্যাগ করে কিশোরী হয়ে উঠলে, একদিন পিঙ্গলা ছেড়ে, সুষুম্নার দ্বারে এসে সুষুম্নার দ্বার দেশের দিকে অবাকদৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখতে থাকলে, তা দেবী কল্পনা দেখেন। কিন্তু সর্বাম্বার নিকটে যাবার সাহস না দেখিয়ে, অপেক্ষায় থাকেন যে, কনো না কনো পঞ্চভাব তো নিশ্চয়ই আসবেন, সর্বাম্বার সন্ধানে, তখন তাঁর সাথে আলাপ করবেন তিনি।
যেমন পরিকল্পনা তেমনই সমস্ত কিছু হলো। দেবী জিজ্ঞাসা সর্বাম্বার সন্ধানে সেদিকেই এলেন, যেদিকে দেবী কল্পনা মানে, বিচিত্রা অপেক্ষা করছিলেন। নূতন একজনকে দেখে, দেবী জিজ্ঞাসা অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন, “আপনাকে তো আগে কখনো এখানে দেখিনি দেবী! আপনার পরিচয়!”
দেবী বিচিত্রা বললেন, “আমি বিচিত্রা, এক সাধিকা। আমার গুরু হলেন সিদ্ধপুরুষ লোকেশ, ও গুরুমাতা, দেবী রুচি। তাঁদেরই চরণতলে, আমি বিচিত্রা, ও আরো এক শিষ্যা, দেবী স্ফীতি বেড়ে উঠেছি। … দেবী আপনি কি কনো শিশু কন্যাকে খুঁজছেন!”
দেবী জিজ্ঞাসা হাস্যপ্রদান করে বললেন, “শিশু আর নেই সে। কিশোরী হয়ে গেছে। আমাদের কন্যা। বড় কৌতূহল তাঁর বিভিন্ন বিষয়ে, আর সেই কৌতূহলের কারণেই এদিক সেদিক চলে যায়। এদিকে কি সে এসেছিল দেবী!”
বিচিত্রা বললেন, “হ্যাঁ দেবী, ওই দিকে গেছে সে। কি যেন একটি বস্তুর সন্ধান করতে করতে এগিয়ে গেল। সেই দিকে বিচিত্র সমস্ত ভৌতিক কীর্তি হতে থাকে। ছোটো বাচ্চা দেখে, আমি তাকে আটকাবার জন্য ডাকলাম, কিন্তু সে আমার কথা কানেই তুলল না। সরাসরি এগিয়ে গেল”।
দেবী জিজ্ঞাসা এই কথা শুনে একটু চঞ্চল হয়ে উঠলেন, আর বললেন, “আমি আসছি এক্ষণে দেবী। আগে আমার কন্যাটিকে নিয়ে আসি সেখান থেকে”।
এই বলে দেবী জিজ্ঞাসা ধরমরিয়ে এগিয়ে গেলে, সুষুম্নার দ্বারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সর্বাম্বাকে দেখে জিজ্ঞাসা ধমক দিয়ে উঠলো, “কারুকে কিছু না বলে এখানে চলে এসেছ কেন সর্ব্বা!”
মনোযোগ সহকারে কিছু দেখতে থাকা সর্বাম্বা সেই ধমকে চমকে উঠলে, জিজ্ঞাসা তাঁর কাছে এগিয়ে গেলেন, তো সর্বাম্বা দেখালেন, “এই দেখো মা, এখান থেকে এমন আলোক বিচ্ছুরিত হচ্ছে। এই আলোকের উৎস কি মা?”
এই আলোকের সাথে জিজ্ঞাসারও প্রথমবার আলাপ, তাই চমকিত তিনিও হলেন, কিন্তু দেবী বিচিত্রা যে ভৌতিক কাণ্ডের কথা বলেছেন, সেই কথা স্মরণ করে, তিনি পূর্ব থেকেই ভয়ার্ত ছিলেন। তাই কনো কথা না বাড়িয়ে সর্বাম্বাকে এক প্রকার জোর করেই কোলে তুলে নিয়ে বলতে থাকলেন, “এই সমস্ত ভৌতিক ব্যাপার, এসবে মাথা ঘামাতে নেই, বুঝেছ প্রেমা! … সকলে তোমার জন্য কত চিন্তা করছে, তুমি কারুকে কিছু না বলে একা একা এখানে চলে এসেছ!”
দেবী সর্বাম্বা যেই আলোকের সামনে গেছিল, সেই কথা দেবী জিজ্ঞাসা সকলকে বললেন, আর এও বললেন যে তাঁর সাথে দেবী বিচিত্রার সাখ্যাত হয়েছিল, যিনি কনো সাধিকা, আর তিনি বলেছেন যে সেই আলোকের স্থানে ভৌতিক কিছু ঘটিত হয়, যা শিশুকন্যাদের আকর্ষণ করে, এবং তাঁদেরকে ভক্ষণ করে নেয়।
সেই শুনে, দেবী স্নেহাও বললেন, “আমার সাথে দেবী বিচিত্রার নয়, দেবী স্ফীতার সাখ্যাত হয়েছে। অনেকবার হয়েছে। তিনিও এই কথা আমাকে বলেছেন”।
দেবী সমর্পিতা বললেন, “মাতা শিখা ও বেগবতীর সাথে দেবী রুচির আলাপ হয়েছে। তিনি হলেন গুরুপত্নী, আর তাঁর নাকি বিশেষ সামর্থ্য আছে, শিশুদের ভাগ্য ও শিশুদের সাথে যুক্ত সকলের ভাগ্য নির্ণয় করতে। সেই কথা সকলকে তাঁরা বলেছেন, তাই তাঁরা দেবী রুচিকে একদিন এখানে নিমন্ত্রণ জানাতে চাইছেন, আমাদের প্রেমাকে দেখাবেন। প্রেমাকে নিয়ে তাঁদের সকলের অনেক সংশয়। সেই সংশয় দূর করার জন্য মাতা শিখা অতি ব্যকুল”।
দেবী মমতা বললেন, “হ্যাঁ, শিখামাতা খুব প্রয়াস করছেন যাতে, আমাদের সর্বাম্বার প্রতি সকলের যেই অবহেলা তা দূর হয়। তাঁর ধারণা, মেধামায়ের প্রতিচ্ছবি হলেন আমাদের সর্ব্বা, আর ঠিক যেমন মেধামাকে অবহেলার গ্রাস হতে হয়েছে, তাঁর কন্যাকেওই ঠিক একই প্রকার অবহেলা সহ্য করতে হচ্ছে। তাই তিনি সেই অবহেলার অবগুণ্ঠনকে সরানোর জন্য উঠেপড়ে লেগে রয়েছেন। কিন্তু সর্ব্বাকে এবার আমরা চোখে চোখে রাখবো। একা একা তাঁকে খেলতে দেওয়া যাবেনা। একা একা খেললেই, ওর মন চলে যায়, ওই আলোকিত দ্বারের দিকে, আর বিপদ বলে আসেনা। … না না, আমি সব সময়ে চোখে চোখে রাখবো সর্ব্বাকে”।
বিশ্বাস ঘর্মাক্ত হয়ে এদিক সেদিক সর্ব্বার সন্ধান করে ব্যর্থ হয়ে ব্যকুল হয়ে উপস্থিত হয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে একপ্রকার ক্রন্দনের স্বরেই বললেন, “সর্ব্বাকে কোথাও দেখতে পাচ্ছিনা, দিদি! … কোথায় গেল আমার সর্ব্বা!”
উত্তর সর্ব্বা স্বয়ংই দিলেন। পিতাকে দেখে, পিতার দুলালী দুই বাহু তুলে পিতার দিকে ছুটে এসে বললেন, “আমি এখানে পিতা!” বিশ্বাস তাঁকে নিজের ক্রোড়ে তুলে নিয়ে, একাধিকবার তাঁর শ্রীমুখ ও শ্রীঅঙ্গ চুম্বন করতে করতে বলতে থাকলেন, “কোথায় চলে গেছিলে মা! … তোমার পিতা যে দুশ্চিন্তায় মূর্ছা যেতে বসেছিল!”
প্রশ্নের উত্তর দিলেন দেবী সমর্পিতা। ওই দক্ষিণ দিকে একটি আলোকিত দরজা আছে, শুনেছি সেখানে ভূতুরে কাণ্ড হয়, ছোটো বাচ্চাদের আকর্ষণ করে, আর সেখানে কনো পাপাত্মার বাস আছে, সে তাঁদেরকে ভক্ষণ করে নেয়। সেখানেই গিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল সর্ব্বা”।
বিশ্বাস হেসে বললেন, “আমার সর্ব্বাকে কে আহার করবে! … কার এতো ক্ষমতা! … সর্ব্বা এক মুষ্ট্যাঘাতে তাঁর প্রাণ নিয়ে নেবে না! … আচ্ছা শোনো সকলে, এখানে কনো এক গুরু অনেকদিন যাবত নিবাস করেন, লোকেশ তাঁর নাম। তাঁর পত্নী, দেবী রুচি আর তাঁদের দুই শিষ্যা, দেবী স্ফীতা আর বিচিত্রা কালকে এখানে আসবেন। তাঁরা সর্বাম্বার ভাগ্য বিচার করবেন। শিখামাতার প্রয়াস, যাতে সর্ব্বাকে সকলে গ্রহণ করে। আমাদেরও সঙ্গ দেওয়া উচিত শিখামায়ের। কি বলো তোমরা!”
মমতা বললেন, “আমাদের সন্তানের কল্যাণ সাধিত হলে, আমরা অবশ্যই সেই কর্মে রাজি। … আমরা সকলে উপস্থিত থাকবো, সর্বাম্বাকে নিয়ে”।
সমস্ত কথার মধ্যে সমর্পিতা বললেন, “অনেক দিন ধরে আছেন, তো এখনই আলাপ করলেন কেন! … এতদিন কেন করলেন না! … কে জানে দিদি, আমার মন না কু ডাকছে। শিখামা সর্ব্বার হিত চাইছে, এতে কনো সন্দেহ নেই। মায়ের অঙ্গজাত সন্তানের অবহেলা করে যখন দিদিমা ধরা, দাদু মানস, বা অন্যরা সর্ব্বাকে অহেতুক বকাঝকা করে, তখন শিখামাকে আমি আড়ালে চোখের জল মুছতে দেখেছি। কিন্তু ওই রুচি, স্ফীতা আর বিচিত্রার আকস্মিক উপস্থিতি আমাকে কেমন যেন ভাবাচ্ছে।
কই, আমরা এখানে এতকাল থাকছি, আমরা তো জানিনা যে ছোটো বাচ্চাদের আকর্ষণ করে আর ভক্ষণ করে কেউ! … আমরাও তো ছোটো ছিলাম, এখানেই বড় হয়েছি আমরা। কই আমাদের তো আকর্ষণ করেনি! … আর সেই কথা এই দুইদিন হয়েছে এসেছে এখানে, সে জেনে গেল! … আচ্ছা দিদি, এমন নয় তো যে, এই ভৌতিক ভক্ষণ, এসব এঁদেরই সাজানো কথা, যা দিয়ে সর্ব্বাকে আমাদের থেকে ছিনিয়ে নিতে চাইছে এঁরা!”
দেবী স্নেহা বললেন, “সে তো যা কিছুই হতে পারে! … আমাদের সর্ব্বা, রূপে অদ্বিতিয়ম। অঙ্গবর্ণ তাঁর শ্বেতগোলাপি, শ্রীঅঙ্গ তাঁর অতি কোমল, মুখলাবণ্য তাঁর পানপাতার ন্যায়। মেধামা তো উত্তেজনায় সুগন্ধ বিস্তার করতো, সর্ব্বা আমাদের সর্বক্ষণ সেই সুগন্ধ বিস্তার করে। আঁখি তাঁর অতিমনোরম তামরসের কুঁড়ির ন্যায়। ওষ্ঠ তাঁর লালিমায় পরিপূর্ণ। রূপ দেখে তাঁর নিশ্চিত ভাবে মনে হয় যে, যখন সে যুবতি হবে, তখন প্রতিটি পুরুষকে নিজের প্রতি আকর্ষণ করতে সক্ষম।
আর অন্যদিকে, আত্মের আবেশে বেশ কিছু ভণ্ড সাধক নির্মিত হয়েছে, যারা সাধনার নাম করে বামাচার করে, আর সুন্দরী স্ত্রীদের সম্ভোগ করে ফেরে সাধনার নাম করে। হতে পারে যে, সর্ব্বার এমন রূপ দেখে, এঁদের গুরু লোকেশ আকর্ষিত হয়েছে, আর তাই তাঁরা সর্ব্বাকে আমাদের থেকে ছিনিয়ে, বামাচারী লোকেশের কাছে নিয়ে যেতে চাইছে!”
দেবী মমতা ক্রুদ্ধ আবেশে বললেন, “এক নয়, চার চারটি মা সর্ব্বার, দেখি কোন বামাচারীর এত সাহস আমাদের সর্ব্বাকে আমাদের থেকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়!”
জিজ্ঞাসা বললেন, “শিখা মায়ের অনন্য প্রয়াসকে ব্যর্থ যেতে দেওয়া যাবেনা। আমরা সর্ব্বাকে নিয়ে যাবো কাল রুচির সামনে, তারপর যা হবে দেখা যাবে। মেধামা আছেন, সমস্ত কিছু দেখছেন। তাঁর কন্যাকে তিনি এভাবে কনো বামাচারীর কাছে সঁপে দেবেন না। কিছু না কিছু অবশ্যই হবে। চিন্তা করো না। আমরা চার মাতা আছি, বিশ্বাস রয়েছে সর্ব্বার পিতা হয়ে। আমরা যতক্ষণ না সঁপে দেব, ততক্ষণ কনো বামাচারী তাঁকে হনন করে নিয়ে যেতে পারবেনা। আর আমরা কিছুতেই আমাদের কন্যাকে সঁপে দেব না। তাই নিশ্চিত হয়েই কালকে আমরা সর্ব্বাকে নিয়ে যাবো”।
পরের দিবসে, যখন চার মাতার হাত ধরে সর্ব্বা দেবী রুচিদের সম্মুখে গেলেন, ততক্ষণে সকলে দেখলেন যে, দেবী রুচি সকলের সাথে গহন আলাপে রত। সকলে দেবী রুচির প্রতিভার প্রতি আকর্ষিত। সঙ্গে সঙ্গে দেবী স্ফীতা আর বিচিত্রারও।
পরিস্থিতি যেকোনো প্রান্তে উপস্থিত হতে পারে জেনেই, সেখানে প্রবেশ করতে, সর্ব্বার দিকে চোখ গেল একত্রে দেবী রুচি, দেবী স্ফীতা আর দেবী বিচিত্রার। আর চোখ পরা মাত্রই, তাঁদের মুখ পানসে হয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে মাথা নিচু করে ফেলল তাঁরা।
দেবী রুচি উচ্চৈঃস্বরে বলে উঠলেন, “কে এই কন্যা! … এ যে মাতৃগ্রাসা! … এ যে সর্বগ্রাসা! … একে দূর করো সম্মুখ থেকে, নাহলে এ সমস্ত কিছু গ্রাস করে নেবে! … দূর করো একে!”
সেই কথা শুনে দেবী ধরা বলে উঠলেন, “আমি জানতাম, প্রথম দিন থেকেই জানতাম। নাহলে জন্ম নিয়েই নিজের এমন পবিত্রশ্রেষ্ঠা জননীর প্রাণ হনন করে নেয় কেউ!… সর্ব্বাকে আমাদের সমাজ থেকে বহিষ্কার করা হোক; মহারাজ আপনি বিধান দিন এই ব্যাপারে। নিশ্চিত করুন যাতে এই রাক্ষসী আর কারুর প্রাণ না হনন করতে পারে। নাহলে, এই লহুসিক্তা আমাদের সকলের লহু শোষণ করে নেবে”।
রাজা মানস মুখ খুলতে গেলে, দেবী মমতা হুঙ্কার ছেড়ে বললেন, “প্রাণ নিলে নিক, কিন্তু আমাদের কন্যা সে। যেখানে আমাদের কন্যা যাবে, আমরাও সেখানে যাবো। … যদি বিধান দিতে চান সর্ব্বার নিষ্কাসনের, তাহলে প্রস্তুত থাকুন, আমরা সকলেই এখান থেকে নিষ্কাসনে যাবো”।
মানস ও ধরা উত্তেজিত হয়ে বলে উঠলেন, “কি বলছো পুত্রী! তোমরা যুবতি হয়েছ, তোমরা বিবাহ করো। তোমরা অনেক সুস্থ ও সুন্দর শিশুর জন্ম দিতে পারবে, তাঁদের জননী হবে। এই কন্যা তোমাদের কন্যা নয়, ভগিনী। আর ভগিনীর প্রতি আসক্তি শোভা পায়না!”
বিশ্বাস সম্মুখে এসে বললেন, “ক্ষমা করবেন, আমার বাচালতার জন্য, কিন্তু এই একই বিচার আপনি পূর্বেও দিয়েছিলেন আপনার কন্যারা যখন দেবী মেধার কাছে নিত্য যেতেন, স্মরণ আছে আপনার! … আমি আমার মাতার থেকেই সেই কথা জেনেছি। … এই চার দেবী, নিজেদের লহু দ্বারা তাঁদের প্রিয়তমা ভগিনীর সিঞ্চন করেছেন। আমরা সকলে মাতা মেধার স্তন পান করে, তাঁর রক্তশোষণ করে, তাঁকে দুর্বল করেছি, যার কারণে তিনি সন্তান জন্ম দেবার ধকল নিতে না পেরে দেহত্যাগ করেছিলেন। তাই লহুর মান এই দেবীরা লহুদ্বারা রেখেছেন। তাঁরা সকলে নিজেদের লহু দ্বারা, সেই মায়ের সন্তানকে আপন সন্তানজ্ঞানে ধারণ করেছে। … আর আপনি একজন মাতা হয়ে, তাঁদের মাতৃত্বকেই প্রশ্ন চিহ্ন প্রদান করছেন!”
মানস এবার উচ্চৈঃস্বরে বলে উঠলেন, “ধৃষ্টতার সমস্ত সীমা অতিক্রম করে দিয়েছ বিশ্বাস তুমি। তুমি তোমার দিদিমার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন করছো, এত দূর তোমার স্পর্ধা! প্রেমা তাঁর মাতার প্রাণ হরণ করেছে, আমাদের কন্যার প্রাণ হরণ করেছে। তুমি যার বিরুদ্ধে অঙ্গুলি নির্দেশ করলে, সেই দেবী ধরাকে কন্যাহারা করেছে। যেই মাতৃত্বের হানির অভিযোগ তুললে তুমি বিশ্বাস দেবী ধরার বিরুদ্ধে, তাঁর মাতৃত্বকে হনন করেছে প্রেমা, মেধার মৃত্যু ঘটিয়ে”।
বিশ্বাসও এবার ক্রুদ্ধা আবেশে হুঙ্কার ছেড়ে বলে উঠলেন, “বেশ কিছুদিন আত্মের কারাগারে তাঁর সান্নিধ্যে থেকে তো, আপনাদের মধ্যেই আত্মের ন্যায় প্রতিহিংসার ভাব প্রত্যক্ষ হয়েছে, তেমনই পতিত হচ্ছে। দেবী ধরার মাতৃত্বের হনন হয়েছে, তাই প্রতিহিংসা স্বরূপ তিনি এবার জিজ্ঞাসা, স্নেহা, মমতা ও সমর্পিতার মাতৃত্বকে হনন করার দিকে আগ্রহী হয়ে গেলেন! এ কার সূচক রাজা মানস! … এতো সেই প্রতিহিংসারই সূচক। অমান্য করতে পারেন তা!”
দেবী ধরা এবার প্রচণ্ড হয়ে উঠলেন, “বিশ্বাস! সমস্ত সীমার অতিক্রম করেছ তুমি! স্ত্রী সম্মুখে থাকতে, তাঁর স্বামীর অপমান করো কোন সাহসে তুমি! … এত দূর তোমার স্পর্ধা!”
বিশ্বাস এক বিক্রিত হাস্য হেসে বললেন, “স্পর্ধা তো আপনারা দেখিয়েছেন দেবী ধরা! অহংকারে চূর হয়ে না থাকলে, যাকে জগন্মাতার বপন করা তিন বৃক্ষ আশ্রয় প্রদান করছে, তাঁকে অস্বীকার করে, রাজপুরের বাইরে রাখেন কেউ! … আজ বুঝতে পারছি, কেন যখন আমরা সকলে আপনাদের কারাগৃহ থেকে উদ্ধারের চিন্তা করছিলাম, তখন মেধামা একটি কথাও বলেন নি। … আপনারা তাঁর পিতামাতা, তাই আপনাদের উদ্ধার করা হোক, তিনিও চাইতেন, কিন্তু আপনারা যে অহংকারে অন্ধ, তা তিনিও জানতেন।
তাই না সম্মতি দিয়েছিলেন, আর না অসম্মতি। বরং আমাদের শিখিয়েছিলেন, সময় ও প্রকৃতির মান রাখতে। যদি সময় ও প্রকৃতি আপনাদের উদ্ধারে বাঁধা প্রদান করে, তবে না উদ্ধার করেই চলে আসতে। আজ উপলব্ধি করতে পারছি, তিনি কেন এমন কথা বলেছিলেন। আসলে তিনি আপনাদের অহংকারময় স্বরূপ বেশ ভালো করেই জানতেন”।
মানস এবার উত্তেজিত হয়ে উঠে নিজের কৃপাণ নির্গত করে উদ্ধত ও উচ্চৈঃস্বরে বলে উঠলেন, “এত বড় অভিযোগ! এই সমস্ত কিছু হচ্ছে, এই কুপ্রভাব বিস্তারিনি, সর্বগ্রাসী প্রেমার জন্য। আজ সে সেখানেই যাবে, যেখানে মেধাকে সে প্রেরণ করেছে। আর সে জীবিতই থাকবে না, আর তোমরাও আমাদের উপর এমন অভিযোগ স্থাপন করবেনা”।
এমন বলে মানস দ্রুতপদে সর্বাম্বার উপর কৃপাণ প্রয়োগ করতে গেলে, সর্ব্বার চার মাতা ও বিশ্বাস প্রাণপণে দৌড়ে যায় সর্ব্বার রক্ষা করতে। কিন্তু তাঁরা মানসের গতির কাছে পরাস্ত হলেন, কারণ মানস তাঁদের বহুপূর্বে সর্ব্বার নিকট পৌঁছে তাঁর উপর কৃপাণ আঘাত হেনে দিলেন। কিন্তু এরপর যা কিছু হলো, তা সকলের ধারনার অতীত ছিল। সকলে দেখলেন, মানস যতটা গতিসম্পন্ন হয়ে সর্ব্বার দিকে অগ্রসর হয়েছিলেন, তাঁর তিনগুন গতিতে সে পিছনের দিকে পতিত হয়ে, যেখান থেকে কৃপাণ হাতে দৌড়ে গেছিলেন, সেখানেই এসে পতিত হয়ে গেলেন।
আর সকলে দেখলেন, এক গহন আলোকের সাগর তাঁদের চারিপাশে সাতটি মহারূপ ধারণ করে অবস্থান করছে। রুচি, স্ফীতা ও বিচিত্রা সেই দিকে তাকাতেও পারলেন না। সত্য বলতে তাঁরা সেই স্থানেই বসে থাকতে পারছিলেন না, যেন কনো ভয়ানক তেজ তাঁদেরকে ভস্মীভূত করে দিচ্ছে, এমনই বোধ হলো তাঁদের। তাই যখন সকলে সেই অদ্ভুত আলোকের দিকে তাকিয়ে ছিলেন, সেই ফাঁকে সকলে অলক্ষ্যে তিন ছায়াদেবী আচ্ছাদনের মধ্যে পলায়ন করলেন।
অন্যদিকে প্রকাশিত হলো, মহাসপ্ত রূপ, যার চারিপাশ থেকে বিচ্ছুরিত হচ্ছিল সাত প্রকার রঙ, যা মুহূর্তের মধ্যে একত্রিত হয়ে শুভ্রতার বেশ ধারণ করে সকলের চোখ ধাধিয়ে দিচ্ছিল, আবার মুহূর্তের মধ্যে তা বিচ্ছিন্ন হয়ে সাতটি রঙ ধারণ করছিল। অদ্ভুত সেই দৃশ্য দেখে, দেবী সমর্পিতা করজোড়ে নতজানু হয়ে বললেন, “মা, দর্শন দাও মা! … তোমার তত্ত্ব আমরা কিচ্ছু বলতে কিচ্ছু জানিনা। তুমি আলোক না আধার, তুমি সাকার না নিরাকার, তুমি সসীম না অসীম, তার কিচ্ছু বলতে কিচ্ছ জানিনা আমরা। তাই আমাদেরকে তা জানিয়ে দাও মা!”
এবার একে একে দেবী জিজ্ঞাসা, স্নেহা, মমতা ও বিশ্বাস একই ভাবে উপবেশন করলে, সেই দিব্যরূপ দিব্যবালকন্যার স্বরে বললেন, “মেধাকে আমি হনন করিনি, কারণ আমি স্বয়ং মেধা। … মেধাকে দেখবি মানস! … মেধাকে দেখবি ধরা! … দেখ তাহলে, মেধার সপ্তরূপ”।
এই বলে সপ্তরূপ সম্মুখে প্রকাশিত করলেন সেই মহালোক, এবং প্রতিটি রূপ নিজের বিবরণ প্রদান করতে থাকলেন সকলের সম্মুখে।
বামপার্শ্বের প্রথম রূপ বললেন, “আমি হলাম অচ্যুতনন্দিনী। মনে পরে মানস, মনে পরে ধরা! মেধাকে তোরা অচ্ছুত করে, রাজপুর থেকে বহিষ্কার করে দিয়েছিলিস!… আর স্মরণ করে দেখ, কেউ মেধাকে স্পর্শও করতে পারেনি। আমি হলাম সেই অচ্যুতনন্দিনী, যাকে স্পর্শ করাও যায়না। সমস্ত কিছুর শুরু আমার থেকে, তাই আমার বর্ণ রক্তিম লাল, আর তাই আমি রক্তিমা”।
পরবর্তী দেবী বললেন, “আমায় দেখে চিনতে পারছিস ধরা! আমি মোহতারিণী। যেই মোহিনীর পাশে তোরা সকলে আবদ্ধ ছিলিস, সেই পাশের খণ্ডন করে, আমি শান্তির স্থাপনা করেছিলাম। স্মরণ আসছে কিছু! … দ্যাখ তাহলে আমার রূপকে। মোহিনী আমার পদতলে মেরুদণ্ড ভেঙে শায়িত। মোহের নাশক আমি মোহতারিণী। শান্তির বিস্তারক আমি, তাই আমার বর্ণ কমলা, আর তাই আমি কমলিকা”।
পরবর্তী দেবী দিব্যকণ্ঠে বলে উঠলেন, “আমাকে প্রত্যক্ষ কর মানস, দ্যাখ ভালো করে নিরীক্ষণ করে। কি দেখছিস! তুই, ধরা, শিখা আর বেগবতী, চার ভূত আমাকে বেষ্টন করে আমার আরাধনা করছে। আমি ভুতেশ্বরী, যিনি ভূতদের দেবী। স্মরণ পরছে, যখন তোদের মোহ থেকে উদ্ধার করেছিল মেধা, তখন তাঁকে তোরা সকলে এইভাবেই আরাধনা করে, নিজেদের ঈশ্বরী জ্ঞান করেছিলিস! … আমি শিখার প্রিয়া, তাই শিখার দেওয়া নাম, গৌরিবেশ অর্থাৎ হরিদ্রা বেশ ধারণ করে স্থিতা। আমি তাই শিখাপ্রিয়া, গৌরি, হরিদ্রাণী”।
চতুর্থ দেবী হুঙ্কার ছেড়ে বললেন, “বৈরাগ্য! এখনো কি বিরক্ত হয়ে স্থিতা থাকবে, নাকি তোমার প্রিয়াকে দেখতে আসবে!”… বৈরাগ্য ধ্যান থেকে উন্নীত হয়ে সম্মুখে এসে উপস্থিত হয়ে সমস্ত দিব্যতাকে দর্শন করতে থাকলে, দেবী বললেন, “আমাকে দেখো বৈরাগ্য, আমি ত্রিতরুসখী, যাকে প্রাণসখীরূপে মান্যতা দিতে তোমরা তিনজন। তরুর প্রাকৃতিক বর্ণে তাই আমি শোভিত, আর তাই আমি পত্রিকার রঙে রাঙা, সবুজবর্ণের”।
পঞ্চম দেবী বললেন, “আমাকে তো নিশ্চয়ই স্মরণ আছে তোমার বৈরাগ্য। আমি তোমার গন্ধে সুশোভিত, তোমার ঘরণী, তোমার প্রিয়া, তোমার প্রতি সমর্পিতা, বৈরাগ্য পত্নী, বৈরাগী। আত্ম বৈরাগ্যকে বিরক্তি নাম প্রদান করে, সকলের কাছে বৈরাগ্যকে অজ্ঞাত করে তুলেছিল। তাই আমি বৈরাগ্যের প্রেমিকা হয়ে, বৈরাগ্যের আসক্তি বিরক্তি উভয়ত্যাগী বৈচিত্র্যকে সম্মুখে রাখতে তাঁর ঘরণী হয়েছিলাম। তাই আমি অজ্ঞাত বৈরাগ্যের অজ্ঞাতপরিচয়ের বর্ণ ধারণ করে নীলিমা। কি বৈরাগ্য, তুমি আমার সেই পরিশ্রমকে ব্যর্থ করে, আত্মের কথাকেই সর্বসম্মত করতে ব্যস্ত যে! বৈরাগ্য মানে বিরক্তি! … বৈরাগ্য মানে সমর্পণ, প্রকৃতির কাছে সমর্পণ, আমি তোমার ঘরণী হয়ে তা প্রমাণ করতে যেই পরিশ্রম করলাম, তাকে তুমি ব্যর্থ করে দিতে এতটা ব্যস্ত!”
বৈরাগ্য নেত্রপূর্ণ অশ্রু ধারণ করে জোরহস্তে বলে উঠলেন, “ক্ষমা দেবী! ক্ষমা! … যেই দেবী আমার অস্তিত্বকে সার্থক করে দিয়েছিলেন, তাঁকে না দেখতে পেয়ে, আমি বিব্রত হয়ে গেছিলাম। কেউ জানুক আর না জানুক, আমি তো তাঁর সাথে মিলনে আবদ্ধ হয়েছিলাম। আমি তো স্পষ্ট রূপেই জানতাম যে, আমার মেধা অক্ষয়। আমি তো স্পষ্ট ভাবেই জানতাম, আমার মেধা আসলে স্বয়ং চেতনা। নিজের মধ্যে চেতনার বিকাশ করে করে, তিনি পরাচেতনা বেশে আবির্ভূতা হচ্ছেন। তা জেনেও, আমি অজ্ঞাত হয়ে গেছিলাম, আবেগে তাড়িত হয়ে গেছিলাম।
ক্ষমা দেবী ক্ষমা! … আমি তো স্পষ্ট ভাবেই জানতাম যে, আত্ম মেধার ব্যাপারে কিচ্ছু জানেনা, তাই ভেবে যাচ্ছে সে যে মেধা পঞ্চভূতের একটি ভূত। আসলে সে যে মেধাতে বরাবরই ভীত, আর তাই মেধাকে উল্লঙ্ঘন করাতেই সর্বদা ব্যস্ত আর তাই দেবী কল্পনাকেই মেধারূপে স্থাপিত করে রাখেন, আর স্বয়ংও মেধার বাস্তবিকতা সম্বন্ধে অজ্ঞাতই থেকে যান। কিন্তু আমার কাছে এতো সত্যরূপেই উদ্ভাসিত যে, মেধা হলেন স্বয়ং ব্রহ্মময়ীর চেতনার জাগরণের ধারা। ক্রমশ কল্পনাকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন তিনি এই মেধা বেশে, আর ক্রমশ আত্মকে তাঁর প্রিয়পত্নী কল্পনার থেকে অপসারিত করতে করতে, তিনি পরাচেতনা হয়ে ওঠেন।
তা জেনেও আমি আবেগে তাড়িত হয়ে, ভ্রমিত হয়ে গেছিলাম দেবী। সমস্ত কিছু জেনেও অজ্ঞানী হয়ে গেছিলাম যে, মেধা স্বয়ং ব্রহ্মময়ী, তাই তো সে এতটা পবিত্র। জেনেও অজ্ঞানী হয়ে গেছিলাম যে, আত্মের সম্মুখে দণ্ডায়মান থেকে, তাঁর অজান্তে নিজের চেতনাকে জাগ্রত করার দ্বিতীয় নামই হলো মেধা। দেবী, ব্রহ্মময়ী যে অক্ষয়, তাই মেধাও যে অক্ষয়। চেতনা জাগরণের সমস্ত অধ্যায় অতিক্রান্ত হয়েছে, আর তাই এবার প্রকৃতি জাগরণের অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে, আর অতঃপরে নিয়তির জাগরণের সূচনা হয়ে, সাখ্যাত ব্রহ্মময়ীর প্রকাশ প্রত্যক্ষ হতে চলেছে।
তাই তো মেধা নিজের অবস্থান বদলে নিয়ে, সর্বাম্বা হয়ে স্থিতা হলেন। মেধাই যে সর্বাম্বা, তাই জেনেও আমি অজ্ঞানী হয়ে গেছিলাম, মেধার প্রতি তীব্র আসক্তির কারণে। … ক্ষমা দেবী ক্ষমা। ইনারা তো আপনার বাস্তবতা জানেন না, তাই অজ্ঞানী হয়েছেন। আমি তো সমস্ত কিছু জেনেও অজ্ঞানী হয়ে গেছিলাম, আসক্তির কারণে! … দণ্ডের পাত্র আমি। আমার মেধা আমার প্রাণসখী হয়ে বিরাজ করতেন, আমার প্রেয়সী হয়ে বিরাজ করতেন, আমার জননী হয়ে বিরাজ করতেন। তিনিই যে এবার আমার কন্যা হয়ে, আমার পিতৃত্ব লাভে রুচিশীল ছিলেন, তা জেনেও আমি অজ্ঞানী হয়ে, তাঁর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলাম।
ছি ছি দেবী, নিজের উপর ধিক্কার জন্ম নিচ্ছে। নিজের আরাধ্যার প্রতি অবমাননা করলাম আমি! … আমার আরাধ্যা মেধা বেশে সকলের সম্মুখে উপস্থিত থেকে, নিজের চেতনাকে রক্তিমা থেকে বৈশাখী করে তুললেন, আর চেতনার যাত্রা সমাপ্ত করে, পরাচেতনা রূপে সর্বাম্বা রূপে জন্ম নিয়ে, পরাপ্রকৃতি ও পরানিয়তি হবার পথে যাত্রা শুরু করলেন। আর আমি তা জেনেও, … ছি ছি”।
দেবী হাস্য মুখে বললেন, “বেশ তবে, দণ্ড চাও যখন দণ্ডই দিলাম। আমার অন্তিম দুই রূপের বিবরণ তুমি স্বয়ং প্রদান করো বৈরাগ্য”।
বৈরাগ্য ক্রন্দন করে উঠে বললেন, “এতো করুণা কেন মা! … এত করুণা কেন! … এ কি প্রকার দণ্ড! … আনন্দের উৎফুল্লতার প্রফুল্লতার কারণ প্রদান করে, এ কি প্রকার দণ্ডদান! … তোমার অন্তিম দুই রূপের বিবরণ প্রদান করা দণ্ড কি করে হতে পারে! তা তো অতিসৌভাগ্য। বেশ, তোমার আদেশ অবশ্যই পালন করবো মা।
মাতার, সকলের প্রিয় মেধার, স্বয়ং ব্রহ্মময়ীর পরাচেতনা হবার যাত্রাপথের ষষ্ঠরূপ হলেন দেবী ভাবমাতা। একাধারে তিনি সকল পঞ্চভাবের জননী। না কেবল পালিতা মাতা নন, জন্মদাত্রী জননীও। দেবী শিখা জানেন, তিনি তাঁর প্রাণপ্রিয়া মেধার জিজ্ঞাসাকে ধারণ করেই বিশ্বাসকে ধারণ করেই, আমার ভ্রাতা বিচারের প্রেমলাভ করে, জিজ্ঞাসা ও বিশ্বাসের জননী। দেবী বেগবতীও জানেন যে, তিনিও তাঁর কন্যাসমা মেধার স্নেহ ও মমতা কে ধারণ করেই বিবেকের প্রেম লাভ করেছিলেন আর তাই স্নেহা ও মমতা প্রকৃত অর্থে মেধার সন্তান। আর সমর্পিতা! আমার ভাবই সমর্পণ, তা প্রমাণ করতে, তুমি স্বয়ং সমর্পিতাকে নিজের গর্ভে ধারণ করে, ভাবমাতা।
যেমন এই সত্য দেবী শিখা ও দেবী বেগবতীও জানেন, তেমন বিচার ও বিবেকও জানে। আর তাঁদের এই সমূহতে কনো আপত্তি নেই, কারণ মেধা যে আমাদের সকলের কাছে অত্যন্ত প্রিয়া। হবেনাই বা কেন! তিনি যে স্বয়ং মাতার পরাচেতনার যাত্রাপথের সারথি। … তাই তাঁদের সমূহ সন্তানরা, অর্থাৎ পঞ্চভাবও জানেন যে, মেধাই তাঁদের প্রকৃত জননী। তাই তাঁরা মেধাকেই নিজেদের প্রাণপ্রিয়া জননীবেশে আঁকড়ে ধরে থাকতেন, আর তাই দেখে, ভগিনীপ্রিয়া দেবী শিখা ও বেগবতী অত্যন্ত তৃপ্ত হতেন।
মমতা ও উদারতার অদ্ভুত মিশ্রিত রূপ হলো মেধা, আর মেধার এই ভাবমাতা রূপ। তাই তো তিনি তুঁতে বর্ণের, মিলনের বর্ণ এই তুঁতে, আনন্দ ও হরষের বর্ণ এই তুঁতে। আর তাই দেবী ভাবমাতা যে স্বয়ং আনন্দমূর্তি।
আর অন্তিমরূপ সম্বন্ধে কি আর বলা যেতে পারে! চেতনার সারথি নিজের যাত্রাপথের সমাপ্ত করে, পরাচেতনা হয়ে উঠে, পরাপ্রকৃতি ও পরানিয়তি হয়ে ওঠার মার্গে অবতীর্ণা, আর তাই তিনি মেধার খোল ছেড়ে হয়ে উঠলেন সর্বাম্বা, যিনি স্বয়ং হলেন শ্রেষ্ঠ ভাব, একমঅস্তিত্বতার ভাব, প্রেম। তাই মেধার সপ্তম ও অন্তিম রূপ হলো প্রেমাম্বা, অর্থাৎ যিনি প্রেমের জন্মদাত্রী জননী।
তবে এখানে সমাপ্তি কোথায়! এতো শুরু কেবল। জীবের অন্তরে মেধা সুপ্ত থাকে, কারণ জীব চিন্তা ইচ্ছা ও কল্পনার কবলে স্থিত থাকেন। যখন তিনি চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনার কবল থেকে মুক্ত হবার প্রয়াস করেন, তাঁর অন্তরে জাগ্রত হয় মেধা, আর সেই মেধা অন্য কেউ নন, স্বয়ং ব্রহ্মময়ী জননী, যিনি প্রাথমিক যাত্রা অর্থাৎ চেতনার জাগরণ শুরু করেন এই মেধার হাত ধরেই।
যখন তাঁর সম্পূর্ণ চেতনার যাত্রা সম্পন্ন হয়ে যায়, তখন তিনি চেতনা জাগরণের খোল, অর্থাৎ মেধার খোল ত্যাগ করে, হয়ে ওঠেন সর্বাম্বা। আর তখন থেকে তাঁর যেই যাত্রা শুরু হয়, তা হলো পরাপ্রকৃতি হবার যাত্রা। আত্ম সর্বপ্রকার প্রয়াস করে যাতে ব্রহ্মময়ী প্রকাশিতা না হন, আর তাঁর রাজত্ব অব্যাহত থাকে। তাই যে, মাতা স্বয়ং মেধার বেশে অবতরণ করে সেই যাত্রা আত্মের সম্মুখে স্থিত হয়েই শুরু করে দেন, যার হদিশ আত্ম লাভই করেনা।
জীব মাত্রই একটি একটি ব্রহ্মাণ্ড, আর প্রতিটি ব্রহ্মাণ্ডে মাতা বিরাজ করেন মেধা বেশে। প্রতিটি ব্রহ্মাণ্ডে আত্ম প্রয়াস করে রাজত্ব বিস্তারের আর তাই মেধার বিস্তারকে তিনি আবদ্ধ করার প্রয়াসে চিন্তা ইচ্ছা ও কল্পনার বিস্তার করেন, কারণ তিনি জানেন যে এদের বিস্তার হলে জীবের মধ্যে মেধার বিস্তার হওয়া অসম্ভব। কারণ একটিই, আর সেই কারণ এই যে, মেধা স্বয়ং ব্রহ্মময়ীর তিন কদমের প্রথম কদম।
ব্রহ্মময়ীর বিস্তারের তিনটি কদম, পরাচেতনা, পরাপ্রকৃতি ও পরানিয়তি। মেধা হলো মাতার সেই পরাচেতনা যাত্রার পদক্ষেপ। মাতার দ্বিতীয় পদক্ষেপের নাম আদিশক্তি, যেই বেশে এখন সর্বাম্বা অবস্থান করছে। আর যাত্রার শুরুও করে দিয়েছে, তাঁর প্রথম রূপ অর্থাৎ ভাবকন্যা বেশে। আত্ম সতর্ক হয়ে যাও, তোমার কাল কেবল জন্মই নেন নি, তিনি তাঁর প্রথম পদক্ষেপও রেখে দিয়েছেন, এবং দ্বিতীয় পদক্ষেপ স্থাপনের জন্য চরণ উত্তলিতও করে ফেলেছেন”।
দেবী ধরা এবার করজোড়ে নতজানু হয়ে বসে বললেন, “মা! … আমার জন্য কি দণ্ড সঠিক, আমি ভেবেও ভাবতে পারছিনা! … তুমি যখন মেধা বেশে ছোটো ছিলে, আমি তখনও তোমার বিরোধ করেছি, যখন বড় হয়ে মোহিনীর প্রতিবাদ করলে, তখনও বিরোধ করেছি, আর আজ যখন তুমি নবরূপে প্রকাশিতা, তখনও বিরোধই করলাম। মা, আমি তো নিজের কাছেই নিজে ঘৃণ্য হয়ে গেলাম! …
যিনি মেধা তিনিই সর্বাম্বা, তাই ঠিক যেমন ফল এলে ফুলকে ঝরে যেতে হয়, তেমনই সর্বাম্বা আসতে মেধাকে ঝরে যেতে হলো, আমি স্বয়ং ধরা হয়েও, এই সত্য উদ্ধার করতে পারলাম না! মা, আমার জন্য দণ্ড নিশ্চয় করো! কৃপা করো মা, আমাকে দণ্ড প্রদান করো”।
মানসও করজোড়ে স্থাপিত হয়ে বললেন, “হ্যাঁ মা, এতকাল তোমার সান্নিধ্য লাভের অহংকারই আমার কাল হলো। তুমি আমার সম্মুখে উপস্থিত থাকা অবস্থাতেও আমি তোমার আভাসও লাভ করলাম না। আমার জন্য দণ্ড নির্ধারণ করো”।
সপ্তরূপ একত্রিত হয়ে, মাতৃকা রূপ ধারণ করে বললেন, “বেশ, তোমাদের দণ্ড আমি প্রদান করছি। মানস তুমি আজ থেকে আর রাজা মানসের উপাধির অধিকারী রইলে না, আর ধরা, তুমিও রানী ধরা রইলে না। তোমরা সাধরন মানস ও ধরা হয়েই থাকবে এখন থেকে। আর বিশ্বাস হবে রাজা। আর আমার চার মাতা হবেন, তাঁর রানী”।
বিশ্বাস করজোড়ে বললেন, “মা, এই অধমকে কেন রাজার উপাধি প্রদান করছো! শ্রেষ্ঠ রাজ্যস্থাপন করো তুমি এই রাজ্যের মহারানী হয়ে, এটিই সঠিক হবে, তাই না!”
চতুর্ভাবও করজোড়ে বললেন, “হ্যাঁ মা, সেটিই সঠিক হবে। তুমি রানী হয়ে বিরাজ করো, আর আমাদের নির্দেশ দাও, সেই অনুসারে রাজ্য স্থাপিত হবে”।
মাতা মাতৃকা হাস্য প্রদান করে বললেন, “আমি রানী বেশে স্থিতা তো থাকবো না, কারণ আমার যাত্রা সম্মুখে রয়েছে। তবে হ্যাঁ, তোমরা আমার মাতাপিতা, তাই তোমাদের আদেশ আমার কাছে শিরোধার্য। তাই যতক্ষণ না যাত্রাপথে পারি দিচ্ছি, ততক্ষণ আমি তোমাদেরকে রাজ্যস্থাপনের পাঠ প্রদান করবো, আজ এক্ষণে। সেই অনুসারে তোমরা রাজ্যস্থাপন করো, আর প্রজাপালন করো। ততক্ষণে আমি যাত্রাপথে নির্গত হবো”।
