৫। চিদারাজ্য অধ্যায়
যখন সমর্পিতা ও তাঁর ভগিনী ভ্রাতাদের বয়স ১২, তখন তাঁদের মধ্যে বিস্তৃত হতে শুরু করলো, তাঁদের মাতামহ ও মাতামহী ও সমস্ত আপনজনদের সান্নিধ্য লাভ করার ব্যকুলতা। আর তাই তাঁরা একদিন আহারের সময়ে, সমর্পিতার মাধ্যমে কথা পারলেন তাঁদের পিতামাতার কাছে। সমর্পিতা বললেন, “পিতা, আপনি বলেন, এই গুপ্ত পথ ছায়াপুরের কারাগৃহ পর্যন্ত যাত্রা করে। তা আমাদের কারাগৃহের তালা ভাঙার শিক্ষা প্রদান করুন কৃপা করে। আমরা পাঁচ ভ্রাতাভগিনী একত্রে যাত্রা করে, আমাদের মাতামহ, মাতামহী ও সকল আপনজনদের এখানে নিয়ে এসে রাখতে চাই”।
৫.১। স্খলন পর্ব
দীর্ঘ দুই বৎসর সমস্ত কিছুর শিক্ষা প্রদান করলেন তিন ভ্রাতা তাঁদের পঞ্চসন্তানদের। অতঃপরে তিন মাতা ও তিন পিতার আশীর্বাদ গ্রহণ করে, তাঁরা পিঙ্গলার পথ ধরে যাত্রা করলেন ছায়াপুরের উদ্দেশ্যে। পথে তাঁদের জন্য থাকলো বিচিত্র অভিজ্ঞতা ও আরো কিছু ঘটনা, যা তাঁদেরও দৃষ্টির অগোচরেই রয়ে গেল।
ছায়াপুরে যাত্রার কালে, দেবী সমর্পিতা, দেবী ভক্তি ও সকলে বৈরাগ্যের, বিবেকের, বিচারের ও দেবী শিখা তথা বেগবতীর চরণবন্দনা করলে, সকলে তাঁদেরকে তাঁদের কর্মে সফল হবার আশীর্বাদ প্রদান করলেন। অন্তে তাঁরা উপস্থিত হলেন দেবী মেধার কাছে, মেধা তাঁদের চরণস্পর্শ করতে না দিয়ে, তাঁদের সকলকে আলিঙ্গন প্রদান করলেন, আর বললেন, “যেই কর্মের উদ্দেশ্যে তোমরা যাত্রা করছো, স্মরণ রাখবে, এই কর্মের প্রতিটি অধ্যায় মাতা ব্রহ্মময়ীর দ্বারা নিশ্চিত করা। তাই ভুলেও কনো প্রকার চিন্তা বা কল্পনার আশ্রয় নেবেনা, এবং ভুলেও কখনো কনো প্রকার ইচ্ছা ধারণ করবে না।
স্মরণ রাখবে, ইচ্ছা, চিন্তা ও কল্পনা তোমাদের নয়, আত্মের শক্তি, আর তাই যখন যখন এঁদের দ্বারা তোমরা নিজেদের প্রভাবিত করবে, তখন তখন তোমরা নিজেদেরকে আত্মের বশ্যতা স্বীকার করার জন্য উৎসাহিত করবে। মাতার কাছে সমর্পিত থাকো, আত্মের কাছে নয়। … যেই পথ ধরে তোমরা যাত্রা করবে, ও প্রত্যাবর্তনও করবে, সেই পথের সন্ধান আত্ম ও আত্মের সন্তানরা বহুকালব্যাপী করছেন। তাই খুবই স্বাভাবিক যে, তোমাদেরকে তাঁরা অনুসরণ করবে, এবং আমাদের কাছে তাঁরা উপস্থিত হতে চাইবে।
তবে পুত্রীরা, কনো কিছুতে ঘাবড়াবে না, আর কনো কিছুকে নিজের বশে রাখার প্রয়াসও করবেনা। জানবে, তোমার পিতাদের এবং তোমাদের উত্থান এই ইঙ্গিত দেয় যে, মাতার আগমন অতিশীঘ্র হবে। অর্থাৎ যা কিছু হচ্ছে, তা মাতার নির্দেশিকা মেনেই হচ্ছে। তাই আগামীদিনেও যা হবে, তা মাতার নির্দেশিকা মেনেই হবে। স্মরণ রাখবে, তোমাদের লেশ মাত্রও চিন্তা, ইচ্ছা বা কল্পনা, বা সমস্ত ঘটনাবলিকে নিজেদের বশে রাখার সামান্য প্রয়াস, মাতার আগমনের পথে বাঁধা হতে পারে।
তাই যা হচ্ছে, বা যা হবে, তা নিরীক্ষণ করে, কি বিপদ আসতে চলেছে, তার চিন্তা করার প্রয়াসও করবে না। স্মরণ রাখবে, যদি কনো বিপদ আসে, তাও মাতারই লীলা। কেমন ভাবে? সেই বিপদ আসা অত্যন্ত স্বাভাবিক ও যে কেউ এই পথে যখন যখন চলবে, তখন তখন সেই বিপদ আসবে, তাই মাতা সেই বিপদকে আনায়ন করবেন সকলের শিক্ষার উদ্দেশ্যে।
পুত্রীরা, চিন্তাকে ভুলেও বিচার রূপে গণ্য করবে না। স্মরণ রাখবে, বিচারে আমিত্ব বা আমি’র কনো অস্তিত্ব থাকেনা; যা থাকে, তা হলো বাস্তবের বোধ। আর চিন্তার আগা থেকে মাথা পর্যন্ত কেবলই আমিত্ব থাকে, আমার সুখ, আমার বিপদ, আমার পরিবারের বিপদ, ইত্যাদি ইত্যাদি। এই কথা স্মরণ রেখে, নিজেদের মধ্যে উদিত হওয়া সমস্ত চিন্তার নাশ করবে।
একই ভাবে, কখনোই ইচ্ছাসমূহকে বিবেকের বার্তা এমন জ্ঞান করবে না। বিবেক তোমাদের কারুর পিতা, কারুর তাত, আর তোমরা ভালো করেই জানো যে, বিবেক কখনোই ইচ্ছার প্রকাশ করেনা, বিবেক প্রয়োজনের স্থাপনা করে, আর সেই প্রয়োজনের মধ্যেও আমিত্বের কনো স্থান থাকেনা। অর্থাৎ বিবেক তোমাদের জগতকল্যাণের জন্য কি আবশ্যক, সেই প্রসঙ্গেই কথা বলেন, ইচ্ছা প্রকট করেন না।
আর সঙ্গে সঙ্গে স্মরণ রাখবে, বিরক্তি কখনোই বৈরাগ্য নয়, বৈরাগ্য হলো আসক্তি ও বিরক্তি উভয়ের থেকে মুক্ত হওয়ার মহাভাব। কেন মহাভাব? কারণ এই ভাবে যখন কনো জীব উন্নত হন, তখন তাঁর কাছে, কনো কিছুই শুভ হয়না, আর কনো কিছুই অশুভ হয়না। যা কিছু স্বাভাবিক ভাবে তাঁর সাথে ঘটমান হয়, তাই তাঁর কাছে শুভ, কারণ তার থেকে তিনি নিজের অন্তরে বিরাজ করা অজ্ঞানতার সন্ধান পান, ও তা দূর করে, তিনি মাতার সম্মুখীন হবার যোগ্য হয়ে ওঠেন।
এই তিন কথা সদা স্মরণ রাখবে। যদি কারুকে বিপন্ন অবস্থাতে দেখো, জানবে তাঁকে মাতা তোমার সম্মুখে উপস্থিত করেছেন, কারণ তাঁর প্রতি তোমার কর্তব্য রয়েছে। তাই তাঁকে সহায়তা অবশ্যই করবে। এমন হতেই পারে যে, তোমার শত্রুও সেই বেশে তোমার সামনে আসবেন, তোমার সাথে ছল করার জন্য। যদি সহজাত ভাবে তা উপলব্ধি করতে পারো, জানবে মাতাই তা সনাক্ত করে দিলেন তোমাদের কাছে, আর যদি তাঁদের সনাক্ত করতে না পারো, জানবে মাতাই তাঁদেরকে সনাক্ত করতে দেননি তোমাদের কাছে। অর্থাৎ নিজেরা কনো প্রকার চিন্তা করবেনা, কনো প্রকার কল্পনা বা ইচ্ছা রাখবে না। তবেই মাতা তোমাদেরকে মার্গ প্রদান করতে সক্ষম হবেন। চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনা, এই তিন মাতার মার্গদর্শনকে আচ্ছাদিত করে দেয়। যাও পুত্রীরা, নিশ্চিত করো যে মাতার উদ্দেশ্য পুড়ন হোক। তোমাদের উদ্দেশ্যের কনো মূল্য নেই, যদি তা মাতার উদ্দেশ্যের থেকে ভিন্ন হয়। তাই মাতার উদ্দেশ্যকে পূর্তি করো, আর তা তখনই করতে সক্ষম হবে, যখন যেমন যেমন বললাম, তেমন তেমন করবে”।
দেবী জিজ্ঞাসা প্রশ্ন করলেন, “কিন্তু, এমন কেন বললেন আপনি যে, আমাদের উদ্দেশ্যের কনো মূল্য নেই, যদি তা মাতার উদ্দেশ্যের থেকে ভিন্ন হয়? সকলে আমাদের আশীর্বাদ করলেন যাতে আমরা আমাদের উদ্দেশ্যে সফল হই, আর আপনি ঠিক তার বিপরীত বললেন! কেন মাসিমনি! … প্রতিবাদ করছি না আমি এই প্রশ্ন করে। বরাবর দেখেছি, আমার মাতা, বেগমাসি, পিতা, বিবেকমশাই, বৈরাগ্যমশাই সকলে আপনার কথাকে আলাদা প্রাধান্য দেন। অর্থাৎ নিশ্চিত ভাবে, আপনার এই কথাতেও কিছু গুঢ় অর্থ নিহিত আছে। আমি সেই গুঢ় অর্থ জানতে আগ্রহী মাসিমনি। …
এছাড়াও আমার আর এক জিজ্ঞাসা আছে, আর তা এই যে, আপনি সদাই বলেন, স্নেহ ও মমতা এক যুগলবন্দী, মমতা হলো এক বিশেষ ধরনের স্নেহ, কিন্তু সেই নিয়ম কি আমার আর আমার ভ্রাতা, বিশ্বাসের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়? আমি জিজ্ঞাসা, আর আমার ভ্রাতা বিশ্বাস, আমাদের সম্বন্ধই বা কি? … মাসিমনি, এই প্রশ্ন আমি বহুকাল করতে চেয়েছি, কিন্তু এই প্রশ্ন করার ক্ষেত্রে দ্বন্ধ ক্রিয়া করে আমার মধ্যে, যদি এই প্রশ্ন আমার পিতামাতার পারস্পরিক প্রীতির উপর প্রশ্ন চিহ্ন স্থাপণ করে! কিন্তু মাসিমনি, যেই কর্মে আমরা যাচ্ছি, সেই কর্মে সম্পূর্ণ মনোযোগ আবশ্যক, আর মনের অন্তরে যদি কনো জিজ্ঞাসা অতৃপ্ত হয়ে নিবাস করে, তাহলে মনোযোগ অর্পণ করা দুরূহ হয়ে ওঠে। তাই …!”
মেধা হাস্যমুখে জিজ্ঞাসার মস্তকে স্নেহের হাত রেখে বললেন, “বেশ পুত্রী, আমি তোমাদের সকলের জন্মের মধ্যে থাকা গুহ্য বিজ্ঞানকে তোমাদের সকলের সম্মুখে আজ রাখছি। তাহলে তোমাদের কারুর মধ্যেই কনো প্রকার দ্বন্ধ উপস্থিত থাকবেনা, আর তোমরা সকলেই মাতার উদ্দেশ্য পূর্তির উদ্দেশ্যে মনোনিয়োগ করতে সক্ষম হবে।
বেশ শোনো তাহলে, জিজ্ঞাসা, তুমি হলে তোমাদের ভ্রাতাভগিনীদের মধ্যে সর্বজ্যেষ্ঠ। কেন জানো? কারণ জিজ্ঞাসার থেকেই সমস্ত উন্নত ভাবের রচনা হয়। আর তোমার কনিষ্ঠ ভ্রাতা হলো বিশ্বাস। কেন? কারণ জিজ্ঞাসা যখন আত্মমুক্ত হয়, তখনই বিশ্বাসের মধ্যে থেকে অন্ধত্বের নাশ হয়, অন্ধবিশ্বাসের সমাপ্তি হয়, এবং বিশ্বাস শুদ্ধ হয়। আর এই জিজ্ঞাসা এবং অন্ধবিশ্বাস মুক্ত পরিশুদ্ধ বিশ্বাসের জন্ম কার থেকে হয়? চিন্তামুক্ত অর্থাৎ আত্মভাব মুক্ত বিচারের থেকে হয়, আর তাই বিচার তোমাদের পিতা। আর বিচার সেই সামর্থ্য লাভ করে কি করে? উর্জার থেকেই সেই সামর্থ্য লাভ। জীবের অন্তরে যেই উর্জা স্থিত, তার থেকেই বিচার নিজের সামর্থ্য লাভ করে, এবং জিজ্ঞাসা তথা অন্ধত্বমুক্ত বিশ্বাসের জন্ম দিতে সক্ষম হয়। এই উর্জা কে? তোমাদের মাতা, আমার জ্যেষ্ঠা, দেবী শিখা।
পুত্রী, ব্যক্তি যতক্ষণ না সঠিক ভাবে মাস, মৎস্য, ফল ও সবজীর সামঞ্জস্যপূর্ণ আহার গ্রহণ করেন, ততক্ষণ সেই উর্জা লাভ করেনা, আর তাই ততক্ষণ বিচারও জিজ্ঞাসা ও শুদ্ধ বিশ্বাসের জন্ম দিতে পারেনা। এবার প্রশ্ন এই যে, কেবল সবজী বা ফলাহার কেন নয়? কেন মাস ও মৎস্য? পুত্রী, মাতা নন, আত্মই সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডের নির্মাতা, তবে মাতার সহমত না থাকলে, তাঁর পক্ষে কনো কিছু নির্মাণ করা সম্ভবই নয়। মাতার সহমত আত্ম সহজাত ভাবে লাভ করেনা, তাই মাতার চেতনাকে আত্ম আবদ্ধ করে, তবেই ব্রহ্মাণ্ড নির্মাণ করতে সক্ষম হয়।
তবে আত্মের পক্ষে মাতার চেতনাকে বশ করা অসম্ভব, কারণ আত্ম মাতারই এক প্রকাশ, যা বিশিষ্ট কনো প্রকাশ না হলেও, সে স্বয়ং স্বয়ংকে বিশেষ জ্ঞান করার জন্যই সে আত্ম। তাই আত্ম মাতার চেতনাকে তাঁর বিশেষত্ব প্রকাশে বাঁধা না হতে দেবার জন্য বশ করার প্রয়াসের ফলে, সেই চেতনাকে পঞ্চভাগে, ত্রিগুনে এবং পঞ্চভাবে বিভক্ত করেন। পুত্রী, সেই পঞ্চভাগ হলাম, আমরা তোমার মাতা ও তোমার দুই মাসিমনি, এবং তোমাদের মাতামহ তথা মাতামহী। সেই ত্রিগুণ হলেন তোমার পিতা ও তোমার মশাইরা, অর্থাৎ বিচার, বিবেক ও বৈরাগ্য। এবং পঞ্চভাব হলে তোমরা পাঁচ ভাইবোন।
এই আমরা যতক্ষণ না একত্রিত হবে, একাত্ম হবে, ততক্ষণ মাতা নিজের পূর্ণ চেতনাস্বরূপে প্রত্যাবর্তন করবেন না। আর একবার মাতা সেই চেতনাস্বরূপে প্রত্যাবর্তন করে গেলে, আত্মের আর কনো নিয়ন্ত্রন থাকেনা সেই ব্রহ্মাণ্ডের উপর। সেই সত্য আত্মও জানেন, আর তাই সেই সর্বদাই আমাদের পঞ্চভাগের মধ্যে বিভাজনের প্রয়াস করে গেছে, আর আজও সেই একই প্রয়াসের কারণে, তোমাদের মাতামহ ও মাতামহীকে কারারুদ্ধ করে রেখে দিয়েছে।
কেবল তাই নয়, আত্ম একাধিক ভেদভাবের রচনা করে, মিথ্যা অপপ্রচার চালিয়ে প্রকৃতি আমাদের অন্তরে যেই যেই প্রকারে উর্জাকে নিয়ন্ত্রণ করে, তাতে বাঁধা প্রদান করতে থাকে। এমন প্রচার করতে থাকে আত্ম যে, মাস যেই পশুদের থেকে গ্রহণ করা হয়, আর মৎস্য, এঁদের হত্যা করা ঘৃণ্য কর্ম, কারণ সেই কর্মে এঁদেরকে পীড়া প্রদান করা হয়। অজ্ঞানতার বিস্তারই আত্মের মূল কর্ম, আর তা ছাড়াও সে জানে যে, যতই ব্রহ্মাণ্ডের নির্মাতা সে স্বয়ং হোক, কিন্তু সেই ব্রহ্মাণ্ডসমূহদের স্বয়ং মাতা ব্রহ্মময়ী নির্দেশনা করেন প্রকৃতি ও কাল বেশে। তাই যেনতেন প্রকারে ব্রহ্মাণ্ডদের প্রকৃতিবিরোধী করে তুলতে সে আগ্রহী।
প্রকৃতির হস্তক্ষেপের কারণেই, আত্ম বাধ্য হয়েছে একাধিক যোনি নির্মাণে, আর সেই যোনিসমূহদেরকে মাতা সর্বক্ষণ বলতে থাকেন যে তাঁদের এই ব্রহ্মাণ্ড অর্থাৎ পঞ্চভূত দেহ হলো নশ্বর, অনিশ্চিত ও ত্রাসের কারণ। আর তা বোঝাতে তিনিই, এই খাদ্যখাদকের সম্পর্ক নির্মাণ করে রেখেছেন, যাতে সেই নশ্বরতা, সেই অনিশ্চয়তা এবং ত্রাসকে সর্বদা সকল ব্রহ্মাণ্ড অর্থাৎ সকল জীব প্রত্যক্ষ করতে পারে।
সেই ব্রহ্মাণ্ড যেমন এক মনুষ্য, তেমনই এক ছাগ বা গো, আর তেমনই এক ফলের বৃক্ষ বা শাকসবজীর বৃক্ষ। তাই বেদনা সকলকে ভোগ করতে হয়, যখন তাঁদেরকে আহার করা হয়, তা মাস হোক, মৎস্য হোক, ফল হোক বা সবজীকন্দ হোক। কিন্তু অজ্ঞানতার বিস্তারক আত্ম, এই জ্ঞানকে আচ্ছাদিত করে রাখার আপ্রাণ প্রয়াস করে, আর মাসের উৎস পশু ও মৎস্যদের পীড়া হয়, এবং সবজী বা ফলদের পীড়া হয়না, এমন মিথ্যাচারন করতে থাকে সে সকল সময়ে।
শুধুই কি প্রকৃতির থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া, এই কি আত্মের এই ভেদভাব স্থাপনের উদ্দেশ্যে? না পুত্রী, সমস্ত যোনির মধ্যে শ্রেষ্ঠ যোনি হলো মনুষ্য যোনি, কারণ এই যোনির ব্রহ্মাণ্ডের এমন সামর্থ্য আছে যে মাতার চেতনাকে সে পুনরায় সমষ্টিগত করে, মাতাকে পুনরায় প্রকাশিত করে, আত্মের নাশ করে, চেতনাকে মুক্ত করে মাতার মধ্যে লীন হতে সক্ষম। যাতে এই যোনি তা করতে সক্ষম হয়, তার জন্য, মাতার লীলারবশে স্বয়ং আত্মই এঁদেরকে উভভোজী করতে বাধ্য হয়েছে। কেন মাতা এই প্রেরণা দিলেন?
কারণ বহু এমন পুষ্টিগুন লাগে উর্জাকে সেই তেজে জাগ্রত করতে, যার কারণে বিচারের উৎপত্তি হয়, যা মাস ও মৎস্য থেকে লব্ধ হয়, আবার এমন অনেক পুষ্টি লাগে উর্জাকে সেই তেজে জাগ্রত করতে, যার কারণে বিচারের উৎপত্তি সম্ভব হয়, যা ফল ও সবজী থেকে লব্ধ হয়। তাই মনুষ্যকে উভভোজী করার জন্য মাতা প্রেরণা প্রদান করেন, আর আত্ম তাঁর লীলাবশে সেই যোনির, সেই ব্রহ্মাণ্ডের নির্মাণ করে ফেলেন।
পুত্রী, যেমন অজ্ঞানতা চেতনাকে আবৃত করে রেখে দেয়, তেমনই ভেদভাব বিচার, বিবেক ও বৈরাগ্যকে আচ্ছাদিত করে রেখে দেয়, আর বিচার, বিবেক বৈরাগ্য যদি আবৃত থাকে, তাহলে তোমাদের জন্ম অসম্ভব, আর তোমাদের জন্ম না হলে, মাতার চেতনারূপে পুনরায় আবির্ভাব অসম্ভব। তাই, যেনতেনপ্রকারে আত্ম ভেদভাবের রচনা করে, বিচার, বিবেক ও বৈরাগ্যকে প্রকাশ্যে আসতে দেয়না, আর একই সঙ্গে, এই ভেদভাব দ্বারা, বহু মনুষ্যব্রহ্মাণ্ডকে অসুরত্ব প্রদান করে, তাঁদেরকে মনুষ্যসমাজের চালকের আসনে স্থিত করে, তোমার মাতা, দেবী শিখা অর্থাৎ উর্জাকে সেই অবস্থায় উন্নীত হতেই দেয়না, যাতে তিনি তোমাদের জন্ম দিতে পারেন।
আত্ম, নিজের তিনগুন অর্থাৎ সত্ত্ব, রজ ও তম, যারাই আত্মের পুত্ররূপে স্থিত এই ব্রহ্মাণ্ডে, অর্থাৎ প্রভাত, রজনী ও তামস, তাঁদেরকে দিয়ে তোমার মাতার মধ্যে এই সমস্ত ভেদভাব রচনা করার প্রয়াস করেন, এবং তা রচিত হলে, তাঁর থেকে একাধিক আবেগের জন্ম হয়, যাদের থেকে আহারের প্রতি আসক্তি ও বিরক্তি, বিশ্রাম বা নিদ্রার প্রতি আসক্তি, এবং মৈথুন বা বিলাসিতার প্রতি আসক্তির জন্ম দেবার প্রয়াস করে।
একই ভাবে, তোমাদের মাসিমনি বেগবতীর মধ্যেও ভীতির সঞ্চার করে আত্ম নিজের তিনগুন দ্বারা, এবং তাঁর মধ্যেও ভেদ্ভাবের রচনা করার প্রয়াস করে। এই ভেদ্ভাবের রচনা সম্পন্ন হলে, তোমাদের পিতারা, অর্থাৎ বিচার, বিবেক ও বৈরাগ্যের আবির্ভাব অসম্ভব হয়ে যায়, আর তাঁদের আবির্ভাব সম্ভব না হলে, তোমাদের প্রকাশ অসম্ভব হয়ে যায়। আর এর ফলে মাতার চেতনারূপের পূর্ণ প্রকাশ অসম্ভব হয়েই থেকে যায়, কারণ চেতনার সমস্ত বিস্তারই প্রকাশিত হতে পারেনা।
এই সত্য যাতে কেউ জানতে না পারে, তার কারণে আত্ম এমন প্রচুর মনুষ্য ব্রহ্মাণ্ডকে অধিকার করে, তাঁদেরকে অসুরত্ব প্রদান করে করে, তাঁদেরকে সমাজপতি বা কখনো গুরুর আসনে স্থিত রেখে, চিন্তাকেই বিচার বলে প্রচার করে আহারের ভেদভাব ও সুরক্ষিত হবার ভেদভাবকে স্থায়ী করে; ইচ্ছাকেই বিবেক বলে স্থাপিত করে রেখে বিশ্রামের প্রতি আসক্তি ও বিবিধ বিলাসিতার প্রতি আসক্তিকেই বিবেকের জাগরণ রূপে প্রচার করে; এবং কল্পনাকেই মেধা অর্থাৎ তোমাদের মাসিমনি করে স্থাপিত করে, কল্পনার বিস্তার করাকেই মেধার উত্থান বলে প্রসার করে।
পুত্রী, বিবেক তাই যা প্রাণবায়ুকে সর্বজনের প্রতি স্নেহের দৃষ্টি প্রদান করায়, এবং সমস্ত ভয় থেকে মুক্ত করে, তাঁর অন্তরে মমতার বিস্তার করায়। তাই, তোমাদের মশাই বিবেক ও তোমাদের মাসিমনি বেগবতীর কন্যারা হলেন স্নেহা ও মমতা। আর বৈরাগ্য হলেন কল্পনামুক্তির ভাব অর্থাৎ সমস্ত কল্পনা থেকে মুক্ত হয়ে, যা সমক্ষে উপস্থিত, তাকেই গ্রহণ করার ভাব। তাই তোমাদের মশাই বৈরাগ্য আমাকে অর্থাৎ মেধাকে জাগ্রত করে, তাঁকে মাতার প্রতি পূর্ণ সমর্পণ প্রদান করেন, আর সেই হেতু, সমর্পিতা তোমাদের কনিষ্ঠা ভগিনী।
পুত্রী, এই হলো আত্মের সমস্ত প্রয়াস। তাঁর সমস্ত প্রয়াসই হলো, মাতার তিন গুন, পঞ্চভাগ ও পঞ্চভাবকে একত্রিত হতে না দেওয়া, কারণ তখনই সে সুরক্ষিত থাকে অর্থাৎ চেতনার পুনরায় প্রকাশিত হওয়াকে অবরুদ্ধ করতে সক্ষম হয় সে। আর আত্মের এই প্রয়াসকে বিফল করার জন্যই, তোমাদের সকলের জন্ম।
পুত্রী, এবার তোমার প্রথম প্রশ্নের উত্তর প্রদান করি তোমাকে। পুত্রী, যখন তোমরা তোমাদের উদ্দেশ্যে সফলতার কথা বলো, তাও তোমাদের উদ্দেশ্য নয়, আবার যখন আমি বললাম, মাতার উদ্দেশ্যে তোমরা সফল হও, তাও তোমাদের উদ্দেশ্য নয়। যাকে তোমরা তোমাদের উদ্দেশ্য বললে, তা তোমাদের অন্তর থেকে আত্মের ধ্বনি উচ্চারিত করলো, অর্থাৎ তা তোমাদের অন্তরে প্রকাশিত থাকা আত্মের উদ্দেশ্য। তাই কি করে তাতে আমি সম্মতি প্রদান করতে পারি পুত্রী? তুমি বলবে, তোমাদের উদ্দেশ্যে, আত্মের উদ্দেশ্য কি করে অবস্থান করতে পারে!
পুত্রী, এই ব্রহ্মাণ্ডের নির্মাতা আত্ম স্বয়ং, আর তাই এই ব্রহ্মাণ্ডের প্রতিটি কণায় কণায় আত্মের বিস্তার ও প্রভাব অবস্থান করে। তাই যখন যখন, যে যে ‘আমার’ এই শব্দও উচ্চারণ করে, তখন তখন তিনি আত্মের প্রভাবে প্রভাবিত। যতক্ষণ কেউ প্রকৃতির মার্গদর্শন অনুসরণ করার কথা, বা সময়ের দ্বারা চালিত থাকার কথা বলে, ততক্ষণই সে আত্মমুক্ত থাকে, আর আত্মমুক্ত মানেই তিনি মাতার অনুগামী। তাই পুত্রী, আত্মের নয় মাতার অনুগামী হও। মাতা যেই মার্গ প্রদর্শন করবেন, সেই মার্গই শ্রেষ্ঠ মার্গ। সেই মার্গে চলে, যদি তোমরা যাকে নিজেদের উদ্দেশ্যে জ্ঞান করছো, তাতে ব্যর্থও হও, তাও শ্রেয়। আর যদি তোমরা যাকে উদ্দেশ্য জ্ঞান করছো, সেই পথে চলতে গিয়ে প্রকৃতির ও সময়ের অবমাননা করতে হয়, তবে সেই উদ্দেশ্য লাভ আসুরকিতা লাভের সমান হয় পুত্রী”।
মেধার এই সমস্ত কথাকে কেবলই জিজ্ঞাসা বা তাঁর ভ্রাতাভগিনীরাই শুনলেন না, বৈরাগ্য সহ সকল ভ্রাতারাও শুনলেন, আর শিখা বেগবতীও শুনলেন, আর সকলেই মেধার কথা শুনে উপলব্ধি করলেন যে, মেধা সত্যই মাতাসর্বস্ব। মাতা তাঁর ধ্যানে, জ্ঞানে, আচরণে, কথনে, সর্বস্ব। বরাবরই মাতার প্রতি মেধা আকৃষ্ট ছিল, যত দিন যাচ্ছে, যেন তা আকর্ষণ নয়, সমর্পণ হয়ে উঠছে।
জিজ্ঞাসা সহ সকলে মেধাকে আলিঙ্গন প্রদান করলেন এবার। মেধাও সকলকে আলিঙ্গন করে, সকলের কপোলে ও ললাটে একাধিকবার চুম্বন করে, বিদায় দিলেন। সক্কলে জানেন, মেধা একা সমর্পিতার জননী নয়, সে সকল পঞ্চভাবের জননী। সমস্ত পঞ্চভাব সর্বাধিক বিশ্বাস করেন, এবং সর্বাধিক আদেশ লাভ করতে চায় মেধার। তাঁদের ধারনা যে সঠিক, তার প্রমাণ সকলে চাক্ষুষ করলেন, মেধা ও পঞ্চভাবদের এই ভাব আদানপ্রদানের ঘটনাকে কেন্দ্র করে।
পথ চলতে শুরু করলেন সমস্ত চিদাভাব। প্রথমের দিকে, সেই পথ অতি মনোরম হলেও, যতই আগে এগোতে থাকলেন তাঁরা, ততই উত্তাপ ক্রমশ বাড়তে থাকলো। সেই দেখে, স্নেহা বললেন, “দিদি! আমরা কি পাপের ছায়াপুরের দিকে যাত্রা করছি, সেই জন্য আবহাওয়া এমন উত্তপ্ত হয়ে উঠছে, নাকি আমাদের পথের ধারাই এই রূপ?”
জিজ্ঞাসা জ্যেষ্ঠা, তাই তিনিই উত্তর দিলেন ভগিনীর কথনে, “স্নেহা, এককালে এই ছায়াপুর আমাদের সকলের মাতা, পরমেশ্বরী ব্রহ্মময়ীর অবস্থানক্ষেত্র হতো। তাহলে কিসের ভিত্তিতে বলা যেতে পারে যে, আমরা পাপের রাজত্বে যাচ্ছি, তাই এই উত্তাপ! এ নিশ্চিতই এই পথের ধারা হবে”।
সমর্পিতা বললেন, “পিতা আমাকে বলেছেন, দুটি পথ আছে ছায়াপুরে প্রবেশের, একটি মাতা ব্রহ্মময়ীর কক্ষে সরাসরি গিয়ে ওঠে, আর অন্যটি কারাগৃহের ঠিক সম্মুখে। … মাতা ব্রহ্মময়ীর কক্ষের অন্তরে যেই পথ ওঠে, সেই পথে চলতে গেলে, আমাদের বাম দিকে যেতে হতো। তার নাম ইরা। সেই পথের শুরুতে নাকি এমনই উত্তাপ থাকে, আর যতই মাতার কক্ষের নিকটে যাওয়া হয়, ততই নাকি শীতলতা। অর্থাৎ এই পিঙ্গলা পথের ঠিক বিপরীত গতিবিধি তার”।
মমতা বললেন, “এই দুই পথ ভিন্নও আরো একটি পথ আছে, যেই পথে নাকি আমরা কেউ একাকী যাত্রা করতেই সক্ষম নই, কেবল ও কেবল মাত্র মাতা ব্রহ্মময়ীই সেই পথে যাত্রা করতে সক্ষম। কিন্তু সেই পথের মূলাধারে কনো প্রান্তই দেখতে পাইনি কনো কালে”।
দেবী জিজ্ঞাসা এবার ক্রীড়ার ছলে বললেন, “তাহলে সেই পথ নেই-ই। হয়তো সমস্তটাই একটা ধারণা!”
বিশ্বাস বললেন, “দিদি! তুমিও না! … যা প্রত্যক্ষ করা যায়নি, তাকে এমনই উড়িয়ে দাও! … এমনও তো হতে পারে যে, আমরা তা প্রত্যক্ষ করিনি, কারণ আমরা তা প্রত্যক্ষ করার সামর্থ্যই ধারণ করিনি! বলছে মমতা যে, সেই পথে একাকী মাতা ব্রহ্মময়ীই কেবল চলতে পারেন, তাই হতেও তো পারে যে সেই পথ প্রাথমিক ভাবে কেবল মাত্র পরমেশ্বরীই দেখতে পান, অন্য কেউ নন!”
জিজ্ঞাসা এবার সমর্পিতাকে প্রশ্ন করলেন, “সমর, বৈরাগ্যমশাই তোকে সেই পথের ব্যাপারে কিছু বলেন নি!”
সমর্পিতা উৎফুল্ল হয়ে জিজ্ঞাসার দিকে এগিয়ে গিয়ে বললেন, “বলেছেন তো! … পিতা বলেছেন যে, সেই পথ তখনই জাগ্রত হয়, যখন ইরা আর পিঙ্গলার তাপ সমানুপাতি হয়ে যায়। যতক্ষণ না তা সমানুপাতি হয়, ততক্ষণ সেই পথ সুপ্তই থাকে”।
বিশ্বাস প্রশ্ন করলেন, “আর এই তাপ সমানুপাতি হয় কি করে?”
সমর্পিতা উত্তরে বললেন, “পিতা বলেন, আমরা সকলে প্রকৃত অর্থে আমাদের মাতামহ ও মাতামহী অর্থাৎ মানসধরার পরিবারের সদস্য। আর তাঁদেরই ধারাপাত হলো এই দুই নাড়ি, ইরা ও পিঙ্গলা, যেখানে ইরা হলো মাতা ধরার পাথেয়, যেই পথ ধরে তিনি মাতামহ মানসকে আত্মের থেকে একবার উদ্ধার করতেও গেছিলেন, আর আমরা যেই পথে এক্ষণে চলছি, তা হলো মাতামহ মানসের পাথেয়, যা আমাদের কাছে এইমুহূর্তে উন্মোচিত, কারণ আমরা আমার মাতা, দেবী মেধার অনুগামী, যিনি তাঁর পিতা অর্থাৎ মাতামহ মানসের প্রিয়কন্যা ছিলেন।
সমস্ত পরিবারের মধ্যে, একতা থেকেও, এক অনৈক্য বরাবরই বিরাজ করেছে। মাতা ধরা তাঁর দুই কন্যা, অর্থাৎ দেবী শিখা ও দেবী বেগবতী, আমার দুই মাসিমনির প্রতি সদাই বিরূপ থাকতেন। আর সাথে সাথে, আমার মাতা, দেবী মেধার পারদর্শীতাকে তিনি সর্বদাই ভয় পেতেন, এই ভেবে যে এই পারদর্শীতা সমস্ত পরিবারকে আত্মের প্রকোপে না সামিল করে দেয়। আর এই তারতম্যের কারণেই ইরা ও পিঙ্গলার মধ্যে সামঞ্জস্য নেই, আর তাই সুষুম্না পথ, অর্থাৎ মাতা ব্রহ্মময়ীর পথ অদৃশ্য হয়েই অবস্থান করছে।
পিতা বলেন যে, তিন আশা রাখেন যে, কারাগারে থেকে দেবী মানসী অর্থাৎ আমাদের মাতামহী ধরা ও মাতামহ মানস, উভয়েই এবার তৎপর তাঁদের সম্পূর্ণ পরিবারকে একত্রিত ভাবে গ্রহণ করতে। যদি তা সম্পন্ন হয়, তবে নিশ্চিত ভাবেই ইরা পিঙ্গলার মধ্যে সামঞ্জস্য নির্মিত হবে, আর সুষুম্না পথ প্রত্যক্ষ হয়ে উঠবে”।
স্নেহা বললেন, “এর অর্থ, যখনই আমাদের সম্পূর্ণ পরিবার একত্রিত হয়ে যাবে, যথার্থ অর্থে, অর্থাৎ সকলে সকলকে ভরসা করবে, আর সকলে সকলকে বিশ্বাস করবে যে, সকলে মিলে নিশ্চিতই আত্মকে একদিন পরাস্ত করে, মাতা ব্রহ্মময়ীর জাগরণের কারণ হবে, সেদিনই সুষুম্নাকাণ্ড জাগ্রত হবে। … এর মানে তো এই দাঁড়ায় যে, আমাদের সম্পূর্ণ পরিবার আত্ম থেকে মুক্ত হতে ব্যকুল নয় বলেই, এই পথ জাগ্রত নয়। তাই না?”
দেবী জিজ্ঞাসা প্রশ্ন করলেন, “এর অর্থ কি এই যে, এই পথই আত্মের থেকে মুক্তির উপায়! … আমরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ নই, আত্মের থেকে মুক্তি পেতে, তাই এই পথও আমাদের সামনে প্রত্যক্ষ নয়!”
বিশ্বাস বললেন, “দেখলে দিদি, প্রথমেই তুমি কেমন সমস্ত কথাকে উড়িয়ে দিয়েছিলে! একবার বিচার করে তো দেখে নাও, একবার জানার প্রয়াস করে তো দেখে নাও। যদি জানার পর, সেই জ্ঞাত কথার মধ্যে যুক্তি বা সত্যতা না পাও, তবে তা প্রত্যাখ্যান করো। তার পূর্বে কেন এই বর্জন!”
দেবী জিজ্ঞাসা হেসে বললেন, “ঠিক বলেছিস ভাই। … অপগুণে ভরা আমি। কবে যে শুদ্ধ হবো। শুদ্ধ না হলে হয়তো মাতা ব্রহ্মময়ী সকলকে স্বীকার করলেও, আমাকে স্বীকার করবেন না!”
দেবী মমতা আগে এগিয়ে এসে বললেন, “ওকি কথা দিদি! … এখনই কি বলল সমর, শুনলে না! … আমরা সকলে সকলের বল। একে অপরের বল। সকলেরই কিছু না কিছু দুর্বলতা আছে আমাদের, কিন্তু যখন আমরা যখন সকলে সকলের সাথে একাত্ম, তখন একে অপরের বল হয়ে উঠে, আমাদের সমস্ত নির্বলতা, সমস্ত দুর্বলতাকে জয় করে নেব, আর তখনই সুষুম্না দেখা দেবে। … বুঝতে পারছো না এই কথার অর্থ! যতক্ষণ না আমরা একে অপরকে নিজের থেকেও অধিক আপনজ্ঞানে আঁকড়ে ধরবো, ততক্ষণ না সুষুম্না জাগবে, আর না সুষুম্নার পথে চলার সামর্থ্য যার আছে, অর্থাৎ মাতা ব্রহ্মময়ী জাগবেন। … অর্থাৎ যদি তুমি তাঁর সান্নিধ্য লাভে ব্যর্থ হও, তবে আমরা সকলেই সেই একই ব্যর্থতার কারণ ও উপভোক্তা হবো”।
বিশ্বাস এগিয়ে এসে বললেন, “দিদি, আমার কথা তোমাকে আঘাত করলে আমাকে ক্ষমা করো। … তুমি আমার দিদি, আমার মাতা সমান। হ্যাঁ, আদরের ভাই, তাই একটু বাচাল আমি। কিন্তু তা বলে, নিজের দিদিকে স্নেহ করিনা, তা কখনোই নয়”। জিজ্ঞাসাকে সকলে বেষ্টন করে, একত্রে বললেন, “দিদি, আমাদের মেধামা আমাদের শিখিয়েছেন, আমরা কেউ আলাদা নই, সকলে মিলে এক। তাই তোমার কিছু দুর্বলতা থাকবে, আমাদের কিছু কিছু থাকবে, কিন্তু যখন আমরা একাত্ম, তখন আমরা সম্পূর্ণ ভাবে সবল, আমাদের কনো দুর্বলতা নেই”।
জিজ্ঞাসা সকলে ভ্রাতাভগিনীকে বেষ্টন করে বললেন, “জানো ভগিনীরা, জানিস ভাই, যখন তোদের সকলকে এমন ভাবে একসঙ্গে আলিঙ্গন করি, তখন মনে হয় মেধামাকে আলিঙ্গন করে রয়েছি। জানিনা, মাতা ব্রহ্মময়ীকে আলিঙ্গন করায় কি সুখ লাভ হয়, তবে মেধামাকে আলিঙ্গন করলে মনে হয়, স্বয়ং ব্রহ্মময়ী মাতাকেই আলিঙ্গন করে রয়েছি। তাঁর পবিত্রতা তাঁর সান্নিধ্যের প্রতিটি পলকে পলকে অনুভব হয়, তাই না!”
সকলে ভাবঘন হলে, মমতা বললেন, “আমার মাতা বলেন, আমি আর স্নেহাকে তাঁর শরীর জন্ম দিলেও, সেই জন্মের ভার এক ও একমাত্র মেধামায়েরই। মেধামায়ের স্নেহ ও মমতাই, আমাদের পিতা, মহাশয় বিবেককে আমাদের মাতার প্রতি আকৃষ্ট করে, আর তার ফলেই আমরা জন্ম লাভ করি”।
বিশ্বাস বললেন, “আমাদের মাতাও একই কথা বলেন। তিনি সর্বদা আমাকে বলেন, ‘আমাকে অবজ্ঞা করলেও কনো ক্ষতি নেই, কিন্তু তোমাদের মেধামার অবজ্ঞা কখনো করবেনা। এক ব্রহ্মময়ী মাতা আমাদের সকলের মাতা, আর মেধামায়ের কারণেই আমরা সকলে জন্ম লাভ করেছি। তাই আমাদের প্রকৃত জননী হলেন মেধামা”।
স্নেহা ভাবের খেয়ালেই বললেন, “শুনে ভালো লাগে যে, জননী হয়েও, তাঁরা জননী হবার অধিকার স্বেচ্ছায় ত্যাগ করে দেন। এর থেকেই বোঝা যায়, তাঁরা তাঁদের ভগিনীকে ঠিক কতটা স্নেহ করেন। … কিন্তু আমাদের মেধামা! … তিনিও তো সত্য অর্থেই, আমাদের সকলকে একই চোখে দেখেন”।
জিজ্ঞাসা হেসে বললেন, “আমি করেছি কিনা জানিনা, তবে আমি আমার ভাই বিশ্বাসকে, আর তোদের দুই বোনকেও দেখেছি। যখন তোদের জননীরা কাজে ব্যস্ত থাকতেন, তখন তোদেরকে মেধামা স্তনদান করতেন। আর এও দেখেছি যে, যখনই তোদের জননীরা তোদের স্তনদান করতেন, তখন তোরা কিছু না কিছু করে, হয় বমন করে, নয় বিষ্ঠাত্যাগ করে, তাঁদেরকে ধৌত কর্মে ব্যস্ত করে দিতিস, আর মেধামায়ের স্তন পান করতিস। সত্যই করতিস কিনা জানিনা, তবে আমার তো দেখে মনে হতো, এই সমস্ত তোরা সকলে সখে করতিস, কারণ তোরা মেধামায়ের স্তনপান করতে ব্যকুল থাকতিস। কই, তাঁর স্তন পান করার সময়ে তো, তোরা কনোপ্রকার বিরক্ত করতিস না!”
বিশ্বাস আনন্দের সাথে বলে উঠলেন, “মানে, আমরা সকলে মেধামায়ের স্তনপান করেই বড় হয়েছি দিদি! … তাহলে তো তিনি আমাদের সকলের মা!”
স্নেহা হেসে বললেন, “খাতায় কলমে কি লেখা জানিনা, তবে মেধামায়ের কাছে গেলেই মনে হয়ে, আমার আর কনো চিন্তার কনো প্রয়োজনই নেই, না আছে কনো ইচ্ছার প্রয়োজন”।
জিজ্ঞাসা বললেন, “আমাদের কথা তো ছেড়েই দে, আমাদের জননী ও জনকদেরও যে একই হাল।… হ্যাঁ রে সমর, বৈরাগ্যমশাই কি বলেন এই ব্যাপারে!”
সমর্পিতা হেসে বললেন, “পিতা বলেন, আমার মাতার মমতা এমনই হয়ে গেছে যে সাখ্যাত ব্রহ্মময়ী মাতাও তাঁর স্তন পানে লালায়িত, তাঁর শাসনে আবদ্ধ হতে লালায়িত, তাঁর অঙ্গঘ্রাণে লিপ্ত থাকতে লালায়িত। তিনি তো বলেন, আমরা সমস্ত পরিবার একত্রিত না হলে, মাতা ব্রহ্মময়ী আসতে পারবেন না। আর সঙ্গে সঙ্গে এও বলেন, দেখছিস না কেমন ভাবে মাতা সমস্ত কিছু একত্রিত করছেন! তোর জননীকে রত্নগর্ভা করবে বলেই তো, তাঁর এই আয়োজন”।
বিশ্বাস উৎফুল্ল হয়ে বললেন, “এর অর্থ, স্বয়ং মাতা আমাদের আদরের ভগিনী হবেন। … এই দিদি, কি বলবো তাঁকে! মাতা নাকি ভগিনী!”
মমতা বললেন, “তিনি তো সবার মাতা, তাই তাঁর নাম রাখবো সর্বাম্বা। কেমন হবে দিদি! নাম ধরে ডাকবো, তাই ভগিনী, অথচ নামের মধ্যেই মাতা শব্দ আছে, তাই মা ডাকাও হয়ে যাবে!”
জিজ্ঞাসা উৎফুল্লতায় বাক্যহারা হয়ে গেলেন সমস্ত কথাতে। অন্য কিছুই তাঁর মুখ থেকে নির্গত হলো না। শুধু তিনি বলে উঠলেন, সম্পূর্ণভাবে নিমগ্ন হয়ে গিয়ে, নেত্র বন্ধ করে উচ্চারণ করলেন, “সর্বাম্বা! … আহা … খাসা নামখানা রেখেছিস। … আমাদের সকলের আরাধ্যা। আমাদের আদরের ভগিনী, সর্বাম্বা”।
সকলে একে একে, আর একত্রে উচ্চারণ করলেন সর্বাম্বা নাম, আর নিজেদের অন্তরে এক অনাবিল আনন্দের স্পন্দন অনুভব করে তৃপ্ত হলেন। কিন্তু এই সমস্ত কিছুর মধ্যে সমর্পিতার যেন কনো ধ্যান নেই। অন্যদিকে তাকিয়ে রয়েছে সে। জিজ্ঞাসা তাঁর স্কন্ধ ধরে আকর্ষণ করে, নিজের দিকে ঘোরাতে ঘোরাতে বললেন, “এই সমর! তোর কি আনন্দ হয়…! কি রে, তুই কাঁদছিস কেন?”
সমর্পিতা এক নেত্র অশ্রু নিয়ে, হাস্যমুখে সম্পূর্ণ ভাবস্থ হয়ে বললেন, “আমার জননী কবে সেই সৌভাগ্য লাভ করবে দিদি!… পিতার থেকে শুনেছি, রাজকন্যা হয়েও তিনি সর্বদা রাজপুরের বাইরে বাইরেই থেকেছেন, দিবারাত্র মাতা ব্রহ্মময়ীর জন্য ক্রন্দন করেন তিনি। আমি নিজেও দেখেছি তাঁকে ক্রন্দন করতে। পাছে আমি এমন মনে না করি যে আমাকে সন্তান করে লাভ করে তিনি অখুশি, তাই আমি কাছে গেলেই তিনি নেত্রের অশ্রু মুছে ফেলেন। … আমার জননী কবে তাঁকে লাভ করবে! … আমার জননীর থেকে অধিক কেউ তাঁকে এতটা নিকট ভাবে লাভ করার অধিকারীই নন”।
বিশ্বাস ভগিনীকে সামান্য বিরক্ত করার জন্য হাস্যছলে বললেন, “কিন্তু সমর, সে তোর জননীর গর্ভে এলে, তোর গর্ভধারিণী যদি তোকে ভুলে যায়!”
সমর্পিতা হেসে বললেন, “আমার জননী! তোমাদের মেধামা! … পারলে যিনি সমস্ত সন্তানকেই নিজের সন্তান জ্ঞান করে নেন, তাঁর কথা বলছো দাদাভাই! … তা গেলে গেলেন, সাখ্যাত মাতা সর্বাম্বার স্নেহ লাভ করার পর আর কিই বা লাভ করার বাসনা পরে থাকে দাদা! … যিনি তাঁতে মজে আছেন, সেই মেধামায়ের প্রেমেই আমরা অন্ধ, তাহলে যার প্রেমে তিনি মজে থাকেন, তাঁর প্রেম কেমন হবে! … আমার মাতা বলেন, তিনি তো প্রেম করতে জানেনই না। প্রেম তো মাতা ব্রহ্মময়ী করেন”।
জিজ্ঞাসা এবার প্রশ্ন করলেন, “সেই সমস্ত কিছুতো হলো, কিন্তু একটা জিনিস আমাকে কেউ বল্, কারাগৃহের সম্মুখে তো চলে যাবো, কিন্তু কারাগৃহের দ্বার খুলবো কি করে?”
বিশ্বাস বললেন, “মেধামা বলেছে আমাকে, আত্ম স্বয়ং আমাদের সাহায্য করবে”।
জিজ্ঞাসা সকলের জিজ্ঞাসাকে একত্রিত করে প্রশ্ন করলেন, “কিন্তু কেন?”
বিশ্বাস বললেন, “কারণ আত্ম এই পিঙ্গলা পথের দ্বার জানতে আগ্রহী। আমরা প্রবেশ করে গেছি, সেই সংবাদ তো সে পাবেই। কিন্তু সে আমাদের সাথে যুদ্ধ করবেনা, বরং সাহায্য করবে, কারণ আমরা মাতামহ ও মাতামহীদের উদ্ধার করে, এই পিঙ্গলা পথেই প্রত্যাবর্তন করবো, আর সেই পথকে আত্ম দেখতে চান, এবং এখানে এসে মাতা ব্রহ্মময়ীর আগমনকে আটকাতে চান। তাই তিনি সাহায্য করবেন, কারণ আমাদের সাহায্য করলে, তবেই তিনি এই পথের আর এই মূলাধারের সন্ধান লাভ করবেন, অন্যথা নয়”।
জিজ্ঞাসা এবার উচাটন হয়ে প্রশ্ন করলেন, “কিন্তু আত্ম এখানে এসে গেলে, আমাদের সর্বাম্বার জন্মকে রোধ করার প্রয়াস তো করবেই, তাই না! তাহলে তাঁর এখানে আগমনকে আটকানো উচিত আমাদের। কি তাই না!”
সমর্পিতা হেসে বললেন, “দিদি, আমাদের সম্পূর্ণ পরিবার একত্রিত হলে, সর্ব্বা জন্ম নেবে। আত্ম এখানে থাকুক বা না থাকুক, তাঁর আমাদের জননীর জন্মের উপর না কনোকালে কনো অধিকার ছিল, আর না থাকবে। যদি অধিকার থাকতোই, তাহলে আমাদের পরিবারকে বিচ্ছিন্ন করে দেবার প্রয়াস তিনি করতেন না। তাঁর সেই প্রয়াসই বলে দেয় যে, তাঁর এই বিষয়ে কনো কিছু নিয়ন্ত্রণে নেই, আর তাই তিনি সমস্ত কিছুকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য ব্যকুল প্রয়াস করেন”।
মমতা বললেন, “সঠিক বলেছে সমর, আবারও প্রয়াস করবেন তিনি, কিন্তু এবার আমাদের লক্ষ্য আত্ম নয়, এবার আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত আমাদের পরিবার। আমাদের পরিবারকে একত্রিত করতে পারলেই সাফল্য নিশ্চিত। আর আত্মের দিকে আমরা ধ্যান দিলে, আমরা আবার বিফল হবো, যেমন আগে হয়েছেন মাতামহ ও মাতামহী, আর আমাদের জনকজননীরাও”।
স্নেহা উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন, “ওই দেখো জিজ্ঞাসাদিদি, একটা মশালের আলো ভেসে আসছে। আমরা নিশ্চয়ই কারাগৃহের অতি নিকটে চলে এসেছি”।
সকলে সেই আলোক দেখতে পেয়ে উৎফুল্ল হয়ে সেদিকে গেলে, সরাসরি সেই কারাগৃহের সম্মুখে এসে তাঁরা উপস্থিত হলেন, যেখানে মানস, ধরা, চন্দ্রনাথ, সূর্যনাথ, চন্দ্রপ্রভা, তথা সকল তাঁদের প্রজারা নিক্ষিপ্ত ছিলেন। না মানসদের অসুবিধা হলো জিজ্ঞাসাদের তাঁদের পৌত্রী ও পৌত্র রূপে সনাক্ত করতে, আর না জিজ্ঞাসাদের অসুবিধা হলো, মানসদের আপন মাতামহরূপে সনাক্ত করতে।
বিশ্বাস দেখলেন, অদূরে কিছু সেনা রয়েছে, আত্মের সেনা। কিন্তু তাঁদেরকে একটি অন্য সেনা কি যেন বলতে, তাঁরা আগ্রাসী হয়েও শান্ত হয়ে গেলেন, আর সেই সেনা, যিনি কিছু বলছিলেন, তিনি হন্তদন্ত হয়ে কোথাও চলে গেলেন।
আত্ম তখন নিজের রানীদের, পুত্রদের এবং পৌত্রপৌত্রীদের নিয়ে খোশমেজাজে ছিলেন। মদিরাপান করছিলেন আর নর্তকীদের নৃত্য দেখছিলেন। সেই সময়ে সেই সেনা এসে উপস্থিত হতে, আত্ম তাঁকে সম্মুখে আসার নির্দেশ দিলেন। সম্মুখে এসে সেই সেনা বললেন, “তাঁরা এসে গেছে মহারাজ, সংখ্যায় তাঁরা ৫জন”।
মহারাজ আত্ম হেসে বললেন, “এমন দেখাও যেন তোমরা জানোই না তাঁরা এসেছে। তাঁদের দেখিয়ে দেখিয়ে কারাগৃহের চাবি ফেলে রাখো ভূমিতে, আর তাঁদের প্রস্থানের প্রতিটি গতিবিধি আমার চাই। যা বললাম, তা করো। বাকি আমি করছি যা করার”।
সেনা চলে গেলে, দেবী কল্পনা প্রশ্ন করলেন, “কারা এসেছে মহারাজ! … কারাগৃহ থেকে কাদের মুক্তির কথা বললেন আপনি!”
রাজা আত্ম হেসে বললেন, “মেধাদের সন্তানরা এসেছে, মানসদের উদ্ধার করতে। … তাই তাঁদের সামনে চাবি ফেলে রাখতে বললাম, যাতে তাঁরা কারাগৃহের দরজা খুলে সকলকে নিয়ে যাবার প্রয়াস করতে পারে”।
দেবী ইচ্ছা বললেন, “এ কি মহারাজ, আপনি কারারুদ্ধদের এমন ভাবেই চলে যেতে দেবেন!”
দেবী চিন্তা হেসে বললেন, “চলে যেতে দেবেন কেন? চলুন মহারাজ, আমরা যাই সেই স্থলে। আমাদের উদ্দেশ্য দ্বারের সন্ধান করা। একবার দ্বারদেশ কোথায় অবস্থিত দেখে নিতে পারলে, আর আমাদের অন্য কিছু লাগবেনা, তখন আমরা পুনরায় মানসদের আর এবার তাঁদের সাথে সাথে মেধাসন্তানদেরকেও বন্দি করবো”।
মহারাজ আত্ম হেসে বললেন, “চলুন, তবে হ্যাঁ, আমি ও আপনারা তিনজন আসবেন মাত্র। আমরাই যথেষ্ট এঁদের সকলকে আবদ্ধ করতে। অধিক কেউ হলে, শব্দ করে, এঁদেরকে তটস্থ করে দেবে। আর ভুলে যাবেন না যে, এঁরা মেধাসন্তান, তাই আমাদেরকে পরাস্ত করতে না পারলেও, সম্পূর্ণ ছায়াপুরকে তছনছ করে দেবার সামর্থ্য ধরে এঁরা”।
মহারাজের সাথে তাঁর তিন রানী যুদ্ধবেশে সজ্জিত হয়ে সেই স্থানে অতিগোপনে গেলেন। আর অন্যদিকে, সেনাকে যেমন বলা ছিল, তেমনই করলে, স্নেহা সেই চাবি নিয়ে এসে কারাগারের দরজা খুললেন। মানস তাঁর পৌত্র ও পৌত্রীদেরকে দেখে আপ্লুত হয়ে কিছু বলতে গেলে, বিশ্বাস বললেন, “দাদু, এখন নয়। একবার আমরা আমাদের স্থানে প্রত্যাবর্তন করি, তারপর অনেক কথা হবে। মেধামা আমাকে বলেছেন, আত্ম চাবি দিয়ে দেবে, আর যখনই আমরা পলায়নের প্রয়াস করবো, সে এসে আমাদেরকে বন্দি করার প্রয়াস করবে”।
দেবী সমর্পিতা বললেন, “হ্যাঁ দাদু, চলুন আপনারা এক্ষণে। পিতা বলে রেখেছেন, কনো অস্ত্র নিয়ে এই দ্বারে প্রবেশ করা যায় না, আর এও বলে রেখেছেন যে, এই দ্বারের ঊর্ধ্বদেশ থেকে আত্ম ও তাঁর রানীরা ছাড়া কেউ প্রবেশ করতে সক্ষম নয়। তাই একবার যদি আমরা সকলে দ্বারের মধ্যে পদার্পণ করে যেতে পারি, তাহলে আর কনো ভয় নেই। শীঘ্রতা করুন”।
পৌত্রী ও পৌত্রের কথা মত, মানস ও সকলে ইতস্তত ভ্রমণ করতে থাকলেন দ্বারের দেশে। দ্বার দিয়ে সমস্ত প্রজাকে প্রথমে প্রবেশ করানো হলে, একে একে চন্দ্রপ্রভা, চন্দ্রনাথ, সূর্যনাথ, এবং ধরা প্রবেশ করলেন, আর ঠিক সেই সময়ে সমরবেশে সজ্জিত হয়ে আত্ম ও তাঁর তিন রানীকে আসতে দেখলেন সমস্ত মেধাসন্তানরা। তাই দেখে দেবী জিজ্ঞাসা বললেন, “শীঘ্রতা করো। দাদু তাড়াতাড়ি প্রবেশ করো। আত্ম এসে গেছে”।
মানস দ্রুততা করলে, জিজ্ঞাসা একে একে, তাঁর সমস্ত ভ্রাতা ভগিনীদের প্রবেশ করালেন। আত্ম এবার আগ্রাসী হয়ে দৌড়ে এলেন। প্রায় জিজ্ঞাসার কেশ আকর্ষণ করে নেবেন, এমন সময়ে জিজ্ঞাসা পলায়নে সক্ষম হলো, আর দ্বার বন্ধ হয়ে গেল।
পলায়ন করতে সক্ষম হলেও, সমর্পিতা বললেন, “দিদি, আমাদের এখনো দ্রুততা করতে হবে। আত্ম যদি একবার অস্ত্র ও রণসজ্জা ছেড়ে দ্বারে লম্ফ দেয়, তাহলে সে এখানে এসে উপস্থিত হবে। … আমাদেরকে বেশ খানিকটা আগিয়ে যেতে হবে, যাতে করে, বনের পথে পথ হারিয়ে ফেলে আত্ম আর আমরা মূলাধারে ফিরে যেতে পারি অনায়সে”।
জিজ্ঞাসা বললেন, “সঠিক কথা, দ্রুততা করো সকলে”।
মানস সকল প্রজাকে নির্দেশ দিলে, তাঁরা কনো শব্দ না করে, অতিদ্রুত পথ অতিক্রম করে এগিয়ে যেতে থাকলো। অন্যদিকে আত্ম ও তাঁর রানীরা একাধিকবার প্রয়াস করেও সেই দ্বার দিয়ে প্রবেশ করতে না পারলে, বিরক্ত ও আগ্রাসী হয়ে, আত্ম নিজের ভয়ানক কুঠারকে ছুড়ে মারলেন। কুঠার প্রবেশ করতে পারলো না। বিরক্ত হয়ে, নিজের সমস্ত রণসজ্জা নিজের তনু থেকে খুলে ফেলে দিলো আত্ম। এবং বিরক্তি সহকারে সেই স্থান যেখান থেকে জিজ্ঞাসা পলায়ন করলো, সেখানে পদাঘাত করতে, আত্ম ভূমি ভেদ করে নিম্নে পরে গেলেন।
রানীরা আর্তনাদ করে উঠলেন, “মহারাজ!”
আত্ম ধীরে ধীরে উপরে উঠে এলে, রানীরা তাঁর হাত ধরে তাঁকে উপরে তুললেন। আত্ম উপরে উঠে বললেন, “কনো প্রকার অস্ত্র বা সাজ ধারণ করে এই পথে যাওয়া যাবেনা। এটাই বুঝলাম। দেবী চিন্তা, আপনি একবার রণবেশ ত্যাগ করে, অস্ত্র ত্যাগ করে লম্ফ দিয়ে দেখুন তো!”
দেবী চিন্তা সেই অনুসারে ক্রিয়া করলে, তিনিও পথের মধ্যে চলে গেলেন। আত্ম হুঙ্কার দিয়ে বললেন, “তাহলে আমাদের যোজনা সার্থক হয়েছে, কি বলেন রানীরা! আমরা মেধাদের কাছে যাবার পথ খুঁজে পেয়ে গেছি। … বেশ তাহলে এক কাজ করুন দেবীরা। আমি, আপনারা, আর সাথে আমাদের পুত্ররা, আর পৌত্র পৌত্রীরা, সকলে প্রস্তুত হন। আমরা এই পথে যাত্রা করবো”।
দেবী ইচ্ছা বললেন, “কিন্তু মহারাজ অস্ত্র ছাড়া! অস্ত্র ছাড়া যুদ্ধ কি করে করবো!”
আত্ম ক্রুর হাস্য প্রদান কলরে বললেন, “কেবল কি ধাতুর অস্ত্রই অস্ত্র হয় দেবীরা! … আমাদের যোজনাই আমাদের অস্ত্র হবে এক্ষেত্রে। আপনারা সকলকে প্রস্তুত করুন। রানীরা, আপনারা তিনজন বিচার, বিবেক ও বৈরাগ্যকে পরাস্ত করতে সক্ষম, আর আমার পুত্ররা, পৌত্ররা, আর পৌত্রীরা মিলে ভাবেদের তথা বাকি ভূতদের। আর মেধাকে আমি দেখে নেব। চিন্তা কেন করছেন দেবীরা, আমরা যেমন নিরস্ত্র, তারাও তো নিরস্ত্রই। সেই কথা ভুলে যাচ্ছেন কেন?”
কথা না বাড়িয়ে দেবী কল্পনা ও দেবী চিন্তা সকলকে প্রস্তুত করে দ্বারের মুখে আনলে, মহারাজ আত্ম সকলকে একে একে দ্বারের মধ্যে প্রবেশ করতে বললেন। কিন্তু সেখানেও আরেক সমস্যা হলো। না আত্মের পৌত্ররা, না পৌত্রীরা আর না পুত্ররা প্রবেশ করতে পারলেন দ্বারের মধ্যে। সেই দেখে আত্ম চিন্তিত হয়ে উঠলেন। তাই দেবী চিন্তা মহারাজের চিন্তা শান্ত করতে বললেন, “দুশ্চিন্তা করবেন না মহারাজ। আপাতত আপনি ও আমরা তিনজনই যাত্রা করছি দ্বারের মধ্যে। তারপর, আমরা সেখানে উপস্থিত হয়ে কিছু না কিছু যোজনার নির্মাণ করবো”।
দেবী ইচ্ছা উদ্বিগ্ন হয়ে প্রশ্ন করলেন, “এক তো আমরা অস্ত্র নিয়ে যেতে পারবো না। তারপরও আমরা সকলে প্রবেশ করতে পারবো না। কি করবো আমরা! কি করে কি করবো আমরা!”
দেবী কল্পনা বললেন, “দিদি, তুমি চিন্তা করছো কেন? আমরা ভিতরে গেলে, ভিতরের পরিস্থিতি দেখে, আমরা কিছু না কিছু সিদ্ধান্ত ঠিকই নেব। তখন দেখবে, অস্ত্রও নিয়ে যেতে পারছি, আর সকলেই যেতে পারছি আমরা। একটা না একটা উপায় ঠিকই করবেন মহারাজ। তুমি চিন্তা করো না”।
দেবী চিন্তা বললেন, “মহারাজ, আপনি সাধুর বেশ ধারণ করুন। সেটিই সঠিক হবে, এঁদের সকলকে বশ করার। এঁরা সাধুজনে বিশ্বাস করে, আর তাই এঁদেরকে বশ করার শ্রেষ্ঠ উপায় হলো সাধুর বেশ ধারণ করা। কল্পনা আর আমি আপনার শিষ্যা হবো, আর দিদি হবে আপনার ঘরণী। পুত্ররা, তোমরা বাইরে সমস্ত অস্ত্র ধারণ করে মহারণের জন্য প্রস্তুত হও। সঠিক সময়ে, হয় আমি নয় কল্পনা এসে, তোমাদেরকে রণক্ষেত্রে নিয়ে যাবো, যদি তার প্রয়োজন পরে”।
দেবী ইচ্ছা বললেন, “কিন্তু তারা প্রবেশই বা কি করে করবে, আর অস্ত্র নিয়েই বা কি ভাবে যাবে সেখানে!”
আত্ম বললেন, “এই দ্বার দিয়ে যেতে পারবে না ঠিকই। আমরা মূলাধারে গিয়ে, সেদিক থেকে নিশ্চিত ভাবে কনো পথের সন্ধান করবো। উদ্বিগ্ন হবেন না। জয় তো আমাদেরই হবে, নিশ্চিত থাকুন”।
এত বলে, পরবর্তী প্রভাতে, আত্ম সাধুবেশ ধারণ করে, দেবী ইচ্ছা তাঁর ঘরণী হয়ে আর দেবী কল্পনা ও দেবী চিন্তা তাঁর দুই শিষ্যার বেশ ধারণ করে, পিঙ্গলার ঊর্ধ্বপানের দ্বার দিয়ে প্রবেশ করলেন।
উষ্মাপূর্ণ সেই পথ। তবে যতই তাঁরা নিম্নের দিকে যেতে থাকলেন, ততই শীতল হতে থাকলো আবহাওয়া। আত্ম তাঁদের অবস্থান করার স্থান খুঁজছিলেন। দেবী চিন্তা ও কল্পনাও। এরই মধ্যে দেবী চিন্তা বললেন, “মহারাজ, আমাদের এমন স্থানে অবস্থান করতে হবে, যেই স্থানে অবস্থান করলে, এঁদের মনে হয় যেন, আমরা আগে থেকেই ছিলাম, কিন্তু তাঁরাই আমাদেরকে লক্ষ্য করে নি। … অর্থাৎ, আমরা তাঁদের থেকে আদি, এই ভাব প্রদান করতে হবে এঁদেরকে, তবেই এঁদের বিশ্বাস অর্জন হবে”।
দেবী কল্পনা বললেন, “যতদূর আমি জানি, এটি পিঙ্গলা মার্গ। আর আরো যা জানি আমি, সেই অনুসারে, এমন আরো একটি পথও আছে, যার নাম ইরা। সম্ভবত পিঙ্গলা থেকে মুক্ত হয়ে বাম দিকে হবে সেই পথ। আমাদেরকে সেখানে প্রস্থান করতে হবে। … সেইদিকটা আশা করি, এঁরা কখনো যায়নি। তাই সেখানে অবস্থান করলে, এঁদেরকে বোঝানো সহজ হবে যে আমরা তাঁদের থেকে আদি”।
দেবী ইচ্ছা মৃদুস্বরে আর্তনাদ করে উঠলেন, “মহারাজ, মশাল জ্বলছে, দেখুন”।
আত্মও মৃদুস্বরে ধমক দিয়ে উঠলেন, “মহারাজ নয়, সাধুমহারাজ, আর দেবী ইচ্ছা, আমি আপনার নাথ। তাই আপনি আমাকে নাথ বলবেন, আমি আপনাকে দেবী বলবো। আর কল্পনা চিন্তা আমাকে প্রভু নামে ডাকবে, তবেই সাধুর ভেক সফল হবে আমাদের”।
দেবী চিন্তা বললেন, “এখন রাত্রি এখানে, নিশ্চিত ভাবে, সূর্যনাথ নিদ্রাতে আছেন। তিনি উঠলেই আলোকিত হয়ে যাবে স্থান। আমাদের তাঁর নিদ্রাভঙ্গ হবার পূর্বে, ইরার মুখে যেতে হবে। দিদি, একটিও শব্দ করো না। আমরা সঠিক পথেই যাচ্ছি। এই স্থান অতিক্রম করে, আমাদেরকে আরো নিম্নে নামতে হবে”।
দেবী চিন্তার কথা অনুসারে, সকলে অতি নিস্তব্দে নিম্নের দিকে নামতে থাকলে, একসময়ে সকলে দেখলেন, মশালের অগ্নি, আর সেই অগ্নিতে দেখা যাওয়া যেই আবাসসমূহ ছিল, তা ক্রমশ দূরে চলে যাচ্ছে, অর্থাৎ তাঁরা নিশ্চিত হলেন যে, মেধাদের অবস্থান করার স্থান অতিক্রম করে চলে এসেছেন তাঁরা।
দেবী ইচ্ছা বলে উঠলেন, “নাথ, এখানে যে বড় অন্ধকার! কিচ্ছু দেখা যাচ্ছেনা!”
দেবী কল্লনা বললেন, “দিদি, ওই দিকে তাকিয়ে দেখো। একটি কক্ষে যেন আলোক জ্বলছে, আর তা ছায়ার মত করে সম্মুখের স্থানে পরছে। নিশ্চিত ভাবে কিছু আছে সেখানে”।
আত্ম বললেন, “আমরা সাধু পরিবার। এটাই আমাদের একমাত্র পরিচয়। আসুন আমরা দেখি ওখানে কি আছে!”
আত্মের পিছনে পিছনে সকলে গমন করলে, দেখলেন আরো একটি সুরঙ্গ, ঠিক পিঙ্গলার মত, তবে এখানে অন্ধকার নেই, রয়েছে আলোক। কেউ নেই, সম্পূর্ণ নির্জন দেখে, দেবী কল্পনা বললেন, “প্রভু, এখানে আমরা নিবাস করতে পারি তো!… তবে এখানের আবহাওয়া বড় উষ্মাপূর্ণ, ঠিক যেমন পিঙ্গলার দ্বারের দিকে ছিল”।
আত্ম বললেন, “এই দেখুন দেবী, একটি বন্ধদ্বার, অতি সুসজ্জিত একটি বিশালাকায় প্রস্তর সম্মুখে উপস্থিত, যেন প্রস্তরটি বন্ধ করে রেখেছে এই দ্বারকে। আর দেখুন, এই দ্বারের আর দ্বার বন্ধ করা পাথরের মাঝে একটি রেখার ন্যায় ছিদ্র রয়েছে। আলোক এখান থেকে আসছে আর সেই আলোকের ছটা ইরাতে পরার জন্য মনে হচ্ছে যেন ইরা থেকেই আলোক আসছে”।
দেবী কল্পনা মৃদু স্বরে আশ্চর্য হয়ে বললেন, “এই কি সুষুম্না প্রভু! … সমস্ত উর্জার উপস্থিতি কি এখান থেকেই! সূর্যনাথের আলোকও কি এখান থেকেই প্রকাশিত হয়! আর ধরার অন্তরের তাপও কি এখান থেকেই আগত হয়!”
আত্ম মাথা নেড়ে বললেন, “মনে তো তেমনই হচ্ছে। তবে সাধু আমরা, তাই মনে হচ্ছে বলা যাবেনা। গালগল্প যা কিছু দিতে হবে, এমন ভাবে দিতে হবে যেন, আমরাই প্রথম তা প্রত্যক্ষ করেছি। আমরা এই দ্বারের দেশে অবস্থান করবো। আর এই প্রস্তর সরানোর প্রয়াস করবো। একবার এই পথে প্রবেশ করতে পারলে, আমরা অজেয়। তখন আর মেধা কেন, মেধার সাথে সকলে যুক্ত হলেও, আমাদের কিচ্ছু করতে পারবেনা। এই দ্বারের অন্তরে অসম্ভব কিছু শক্তি আছে। আমি তো যা জানি, সেই অনুসারে, স্বয়ং দেবী ব্রহ্মময়ীর শক্তি সঞ্চিত আছে এই পথে”।
দেবী ইচ্ছা প্রশ্ন করলেন, “কিন্তু নাথ, এই প্রস্তরকে আজ পর্যন্ত কেউ অপসারণ করেন নি কেন?”
দেবী চিন্তা বললেন, “আমি যতদূর জানি, এই পথে প্রবেশ কেবলমাত্র মাতা ব্রহ্মময়ী এবং তাঁর অনুগতরাই করতে পারেন, তবে তাঁর অনুগতরাও প্রবেশ তখনই করতে পারে, যখন তিনি সেই অনুগতদের সঙ্গ দেন”।
দেবী ইচ্ছা মৃদু হেসে বীরদর্পে বললেন, “এমন কনো পথই হতে পারেনা, যার ইচ্ছা আমি করে, চিন্তা তার চিন্তা করে, আর কল্পনা তার কল্পনা করেও উন্মোচিত হতে পারেনা। … চলো ভগিনীরা, আমরা আমাদের সামর্থ্য প্রদর্শন করি”।
দেবী কল্পনা মাথা নেড়ে বললেন, “প্রথম কথা আমরা আপনার ভগিনী নই গুরুমাতা, আমরা আপনার শিষ্যা, তাই আপনি আমাদের মাতা। আর দ্বিতীয় কথা এই যে, আমরা তিনজন একত্রে প্রয়াস করেও, একটি পথও উন্মোচিত করতে সক্ষম নই, যদি সেই পথ আমাদের নির্মিত না হয়। যেই পথের নির্মাতা আমরা, সেই পথকেই আমরা কল্পনা করতে পারি, সেই পথেরই চিন্তা করতে পারি, আর সেই পথে চলারইইচ্ছা করতে পারি। ভুলে কেন যাচ্ছেন মাতা আপনি যে, আমরা মায়ার প্রসারক। যেই মায়ার রচয়িতা আমরা, সেই মায়াকেই আমরা ভেদ করতে পারি”।
আত্ম বললেন, “পুত্রী বিচিত্রা, আরো এক কর্ম করতে সক্ষম তোমরা, আর তা এই যে, তোমরা যার রচিত মায়া, তাঁকে বশ করে, তাঁর মায়ার রহস্য উদ্ধার করতে পারো”।
দেবী ইচ্ছা বললেন, “বিচিত্রা! কে বিচিত্রা!”
দেবী কল্পনা হেসে বললেন, “প্রভু আমাকে নতুন নাম দিলেন, বিচিত্রা”।
আত্ম বললেন, “চিন্তা হলো স্ফীতা, আর কল্পনা বিচিত্রা, আমার দুই শিষ্যা। আর আপনি হলেন রুচি, আমার ঘরণী। আজ থেকে আপনারা একে অপরকে এই নামেই ডাকবেন”।
দেবী কল্পনা বললেন, “আর আপনি হলেন ভগবন। প্রভু ভগবন। আমরা কেউ আপনার নাম মুখে নেবো না, কিন্তু আপনার পরিচয় এই নামেই প্রদান করবো”।
দেবী চিন্তা বললেন, “প্রভু, এই মায়ার রচয়িতা হলেন সাখ্যাত ব্রহ্মময়ী। আমাদের নির্মিত প্রতিটি ব্রহ্মাণ্ডে, তিনিই এই ইরা, পিঙ্গলা আর সুষুম্নার নির্মাণ করে রেখে দিয়েছেন। চিন্তা করুন একবার, আমাদেরই নির্মিত ব্রহ্মাণ্ড, তার মধ্যে এমন এক স্থান, যা আমাদেরই গমনকে প্রতিবন্ধকতা প্রদান করে! … এই ইরা পিঙ্গলা দিয়ে সুরক্ষিত রেখে, এই সুষুম্নাতে নিজের সমস্ত রহস্যকে আচ্ছাদিত করে রেখে দেন”।
দেবী কল্পনা বললেন, “সঠিক কথা স্ফীতি, কিন্তু কথা তো তবে এই দাঁড়ালো যে, ব্রহ্মময়ীকে জন্ম নিতে দিতে হবে। তা নাহলে যে আমরা তাঁর মায়ার রহস্য কখনোই ভেদ করতে পারবো না!”
আত্ম বললেন, “সঠিক কথা স্ফীতা বিচিত্রা, আমাদেরকে অপেক্ষা করতে হবে, তাঁর জন্মের। জন্মের মুহূর্তে যেমন কারুর বোধ থাকেনা যে তাঁর স্বরূপ কি, তেমন তাঁরও নিশ্চয়ই থাকবেনা। কিন্তু তাঁর অন্তরে এই পথের উন্মোচন করার সামর্থ্য তো থাকবেই। তাই তাঁকে দিয়ে এই পথ উন্মোচিত করাবো, আর তাঁর শক্তি আমরা হনন করে ধারণ করে নেব”।
দেবী চিন্তা বললেন, “সঠিক কথা প্রভু, প্রতিটি ব্রহ্মাণ্ডে, মেধা জাগতে পারেনা, তাই বিচার বিবেক বৈরাগ্যও তাঁদের মধ্যে উদিত থাকেনা, আর এর ফলে, তাঁদের মধ্যে ভাবগুলিও প্রস্ফুটিত থাকেনা। তাই আবেগ আর আমাদের পুত্রদের দিয়ে, আমরা অনায়সেই তাঁদের উপর রাজত্ব করি। কনো বিশেষ সামর্থ্যের প্রয়োজনই পড়েনা। কিন্তু এই ব্রহ্মাণ্ডে, মেধা জেগে গেছে, আর তাই তাঁর হাত ধরে বিচার, বিবেক বৈরাগ্য, এই তিন মহাভাবও জন্মে গেছে, আর তাঁদের থেকে পঞ্চভাবরাও উদিত হয়েছে। এখানে দিব্যতা ধারণ না করলে, এঁদের পরাস্ত করা অসম্ভব”।
দেবী ইচ্ছা বললেন, “কিন্তু স্ফীতা, আমার কাছে এটিই সব থেকে বড় দ্বন্ধ যে, এই ব্রহ্মাণ্ডে এমন কি হলো, যার কারণে মেধা প্রকাশিত হতে পারলো?”
দেবী কল্পনাও যোগদান দিয়ে বললেন, “সত্যই এ এক বড় বিচিত্র কথা প্রভু! এই ব্রহ্মাণ্ডে মেধা প্রকাশিত হতে পারলো কি করে! প্রতিটি ব্রহ্মাণ্ডে, মেধাকে আমরা জন্ম নেওয়া থেকেই আটকে রাখি, কিন্তু এই ব্রহ্মাণ্ডে পারলাম না কেন!”
আত্ম গম্ভীর হয়ে বললেন, “এই ব্রহ্মাণ্ডে সমস্ত কিছু প্রথম থেকেই ভিন্ন হচ্ছিল পুত্রীরা, একবার চিন্তা করে দেখ। প্রতিটি ব্রহ্মাণ্ডে, আমি আর মানস হই মাতা ব্রহ্মময়ীর অঙ্গজাত পুত্র, আর তোমরা তিনজন, চিন্তা, ইচ্ছা, কল্পনা হও সূর্যনাথের থেকে জন্ম নেওয়া সন্তান। চন্দ্রনাথের ও চন্দ্রপ্রভার থেকে ধরা জন্ম নেয়। এখানেও তাই হয়েছিল। কিন্তু অন্য ব্রহ্মাণ্ডে, ধরা আমার প্রতি আকর্ষিত হয়, কিন্তু মানস তাঁকে হনন করে তাঁর গর্ভে অগ্নি ও বায়ু অর্থাৎ শিখা ও বেগবতীকে জন্ম দেয়। আর আমার ও ধরার সম্পর্কের মধ্যে মানস প্রবেশ করে, তাই মানস খলনায়ক হয়ে যায় সেই সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডে।
আর মাতা ব্রহ্মময়ী, মানসের এমন আচরণের কারণে, সকলকে ত্যাগ দিয়ে সুপ্ত হয়ে যান। আমি পরে ব্রহ্মাণ্ডের রাজা হই, আপনাদের পত্নী করে। আর তখন মানসকে দণ্ড দেবার জন্য বন্দী করি। ধরা আমার প্রতি অনুরাগের কারণে আমার কাছে প্রত্যাবর্তন করে, আর তাঁর দুই কন্যা শিখা ও বেগবতী আমার কাছে অনুগত হয়ে থেকে যায়। আর এই সমস্ত কিছুর ফলে মেধা জন্ম নিতেই পারেনা।
কিন্তু এই ব্রহ্মাণ্ডে সমস্ত কিছুই অন্যরকম হয়। এখানে ধরা আমার প্রতি নয়, মানসের প্রতি আকৃষ্ট হয়। আর এর কারণ আমি। মাতা ব্রহ্মময়ী এই ব্রহ্মাণ্ডে যেন মানসকে অধিকই স্নেহ করছিলেন, আর তাই দেখে ঈর্ষা বশত, আমি মাতা ব্রহ্মময়ীকে অপসারণ করে, সেই অপসারণের দায় মানসের মাথার উপর রাখার প্রয়াস করেছিলাম আপনাদের যোজনাকে সঙ্গ নিয়ে। এর ফলে, মানসকে উদ্ধার করতে তৎপর থাকেন মাতা ব্রহ্মময়ী, আর তাই ধরা প্রথম তাঁর সাথেই সাখ্যাত করে, এবং তাঁকে বিবাহ করে।
সম্পূর্ণ বৈধ বিবাহ, তাই মেধাও জন্ম নিতে পারে শিখা আর বেগবতীর সাথে সাথে, আর এঁদের কেউ আমার প্রতি অনুরক্ত থাকেনা। আমি এঁদেরকে বশ করে, আমার প্রতি অনুরক্ত করার প্রয়াস করেও পারিনা। ফলে এই ব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত কিছু অন্যপ্রকার হয়ে যায়। আসল কথা এই যে, এই ব্রহ্মাণ্ড আমাদের নির্মিত ব্রহ্মাণ্ডই নয়। এই ব্রহ্মাণ্ড মাতা ব্রহ্মময়ীর নির্মিত ব্রহ্মাণ্ড, অবতার ব্রহ্মাণ্ড এটি, ঈশ্বরকটি ব্রহ্মাণ্ড এটি। তাই প্রথম থেকেই সমস্ত কিছু আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে অবস্থান করছিল”।
দেবী ইচ্ছা নিশ্চিন্তের হাস্য হেসে বললেন, “তাহলে চিন্তা কিছু নেই বলুন নাথ। এই ব্রহ্মাণ্ডে আমরা যদি পরাস্ত হইও, অন্য সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডে তো আমরা রাজ করবোই। কি বলেন!”
দেবী চিন্তা বললেন, “মাতা রুচি, ব্যাপারটা অত সহজ নয়। এই ঈশ্বরকটি ব্রহ্মাণ্ডতে যদি আমরা পরাস্ত হই, তাহলে তা মেধার কারণেই হবো, আর একবার যদি এই পরাজয়ের খবর, আর মাতা ব্রহ্মময়ীর মেধার হাত ধরে প্রত্যাবর্তনের সংবাদ সকলে পেয়ে যায়, যা এই ঈশ্বরকটি অবশ্যই দেবার প্রয়াস করবে, তাহলে কি হবে বুঝতে পারছেন মাতা!… সমাজে এমন সংস্কার নির্মিত হয়ে যেতে পারে যে, আত্ম নয়, মানসের সাথেই ধরাকে বিবাহ দেওয়া উচিত। কল্পনাকে নয় মেধাকেই ধারণ করা উচিত, চিন্তাকে নয় বিচারকেই ধারণ করা উচিত, ইচ্ছাকে নয় বিবেককেই ধারণ করা উচিত।
আর একবার যদি তা প্রচারিত হয়ে যায় ও সমাজ অবতারের কথনকে মেনে, এই প্রথাকে ধারণ করে নেওয়া শুরু করে, তাহলে তো সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডে, মেধার জাগরণ হয়ে যাবে, আর সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডতে আমাদের পরাজয় হতে থাকবে, আর সমস্ত ব্রহ্মাণ্ড মুক্ত হতে থাকবে, আর আমরা আমাদের রাজত্ব হারাতে থাকবো”।
দেবী ইচ্ছা এবার উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন, “তাহলে আমরা ব্রহ্মময়ীকে পুনরায় জন্ম নিতে দিচ্ছি কেন? মেধার হত্যা করে দিই চলো। মেধা ব্যতীত কেউ তো তাঁর জন্ম দিতে পারবেনা না! তাই না!”
আত্ম বললেন, “দেবী রুচি, আপনি এখনো ব্যাপারটা বুঝতে পারেন নি। মেধার কনো ক্ষতি আমরা করতে পেরেছি কি! … পুত্রদের যৌবন দ্বারা তাঁকে বশীভূত করতে প্রয়াস করেছিলাম, বিফল হয়েছিলাম। রাজপুর থেকে তাঁকে বহিষ্কৃত করে দিয়েছিলাম, লাভ হয়নি। তাঁর পবিত্রতা নষ্ট করার প্রয়াস করেছিলেন পুত্রদের দিয়ে, সেখানেও অসফল হয়েছিলেন আপনারা। … বুঝতে পারছেন আপনারা! মেধার কনো ক্ষতি করতে পারবেন না, স্বয়ং ব্রহ্মময়ী তাঁর রক্ষা করছেন”।
দেবী চিন্তা মাথা নেড়ে বললেন, “সঠিক বলেছেন প্রভু, মেধার জন্ম হওয়াকে রোধ করতে পারলে, কাজে দিত। আর আজ যখন সে অবস্থান করছে এই ব্রহ্মাণ্ডে, তখন ব্রহ্মময়ীকে প্রকাশ্যে না এনে সে থামবেনা। ব্রহ্মময়ী প্রকাশিতা হলেও, শৈশবে তিনিও নাদানই থাকবেন। সেই সময়ে তাঁকে আমাদের মায়াতে বদ্ধ করে, এই সুষুম্নার অন্তরে তিনি যা কিছু শক্তি সঞ্চয় করে রেখেছেন, তা হনন করে নিতে হবে। তবেই তাঁকে পরাজিত করা সম্ভব হবে, আর তিনি যদি পরাজিত হয়ে যান, তাহলে আমাদের আর কনো চিন্তার বিষয় থাকেনা। কারণ তখন আর কেউ এই ঈশ্বরকটির কথা জানতেও পারবেনা, স্বয়ং ব্রহ্মময়ী মাতাই প্রকৃতির মাধ্যমে যেই প্রচার করেন, তা করতে দেবেন না। আর তাই কনো ব্রহ্মাণ্ডে মেধা জাগবেনা, আর আমরাও সুরক্ষিত থাকবো”।
