সর্বাম্বা কাণ্ড (কৃতান্ত প্রথম কাণ্ড)

আজ্ঞার পালন হলো। চারিপাশে সমস্ত সেনা ছড়িয়ে পরলো, আর ধরাধামের সমস্ত প্রজাকে কারাবন্দী করে ফেলল। সঙ্গে সঙ্গে, মহারাজ আত্ম, স্বপুত্র ও স্বপত্নীদের সঙ্গে নিয়ে রাজপুরে প্রবেশ করলেন আর মানসের সম্মুখে গিয়ে, উগ্রস্বরে বললেন, “মানস, মোহিনী এই সম্পূর্ণ ছায়াপুরের অধীশ্বর ছিল, আর সেই অধীশ্বরকে পরাস্ত ও বিপর্যস্ত করার কৌশলগ্রহণে, তোমরা সকলে তোমাদের পুত্রীর সহায়ক ছিলে। সেই অপরাধে, রাজপুরের সকলকে এইমুহূর্তে ছায়াপুরের কারাগারে বন্দীকক্ষে নিক্ষেপ করা হলো”।

বন্দী হলেন সকল ধরাধামের অধিবাসী, আর ধরাধামের রাজপুরের সকলে। কেবল মেধা ও মেধার দুই ভগিনীকে কেউ কনো স্থানে খুঁজে পেলেন না। সমস্ত রাত্রি তন্যতন্য করে খুঁজেও তাঁদের খোঁজ না পেলে, বাকি সকলকে নিয়ে কারাগারের পথে গিয়ে, সকলকে মহারাজ আত্ম, তাঁর পত্নীরা ও তাঁর পুত্ররা দায়িত্ব নিয়ে বন্দী করলেন।

কিন্তু মহারাজ আত্মের ললাটে চিন্তা ভাঁজ। তাই দেখে, তাঁর প্রিয় পত্নী, দেবী কল্পনা প্রশ্ন করলেন, “কি হয়েছে মহারাজ, আপনি চিন্তিত কেন? মেধা ও তাঁর ভগিনীদের সন্ধান পাওয়া যায়নি বলে! চিন্তা করবেন না মহারাজ, শীঘ্রই তাঁদের সন্ধানও পেয়ে যাবো, আর তাঁদেরও বন্দী করে নেব”।

মহারাজ আত্ম বললেন, “না দেবী, চিন্তার বিষয় অন্য। … আপনি কি লক্ষ্য করেছেন ব্যাপারটা! … না ধরাধামের একটি প্রজা, আর না মানস সহ ধরাধামের রাজপুরের একজনও সদস্য, আমরা যখন বন্দী করতে গেলাম তাঁদেরকে, তাঁরা একজনও বিচলিত ছিলেন! যেন তাঁরা পূর্ব থেকেই জানতেন যে আমরা তাঁদেরকে বন্দী করতে যাবো, আর তাঁরা সেই ব্যাপারে প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু কেন?”

দেবী চিন্তা মদিরার পাত্র হাতে নিয়ে বিলাসের আরামকেদারায় নিজের সুন্দরী তনুকে শায়িত করে বললেন, “সঠিক কথা নাথ। … আপনার কি মনে হয়? আমাদেরই মধ্যে কেউ আমাদের সমস্ত কথা তাঁদের পূর্ব থেকেই জানিয়ে দিচ্ছে!”

মহারাজ আত্ম মাথা নেড়ে বললেন, “বিষয় কেবল জেনে যাওয়া নয়, কেবল যদি জেনে যেত, তাহলে প্রতিক্রিয়া ভিন্ন হতো”।

দেবী ইচ্ছা মদিরা হাতে, এবং বেশ কিছু খাদ্যসামগ্রী হাতে চিন্তার পার্শ্বে বসে, মদিরা পান করতে থাকা দেবী চিন্তার দিকে খাদ্যের থাল আগিয়ে দিয়ে বললেন, “তাহলে আপনি কিসের আশঙ্কা করছেন!”

ছায়াপুত্ররাও তাঁদের পিতামাতার কথা মনোযোগ সহকারে শুনছিলেন। তাঁদের লক্ষ্য মেধাকে হত্যা করা, আর মেধার ব্যাপারে তাঁরা অত্যন্ত স্বল্পই জানেন। তাই, মেধার ব্যাপারে অধিক জানতে, তাঁরা মনোযোগ সহকারে সমস্ত কথা শুনতে থাকলেন।

অন্যদিকে মহারাজ আত্ম কনো অন্যদিকে মনোযোগ স্থাপন না করে বলতে থাকলেন, “দেবী, আপনারা যে বলছেন, তাঁরা যদি আমাদের যোজনা জানতেন, তাহলে তাঁরা পলায়নের চিন্তা করতেন, এই ভাবে ধরা দিতেন না, আর এই ভাবে ধরা দিয়ে অবিচল হয়ে স্থিত থাকতেন না। তাঁরা অবিচল ছিলেন, এর অর্থ তাঁরা কেবল আমাদের যোজনা জানতেনই না, তাঁরা প্রস্তুত ছিলেন এই যোজনার মধ্যে অংশ গ্রহণ করতে।

অর্থাৎ … কেউ তাঁদেরকে এই যোজনার অন্তর্ভুক্ত হওয়াতেই তাঁদের কল্যাণ, এমন কিছু বুঝিয়েছেন? নচেৎ, এমন সহজ ভাবে সকলে ধরা দিলেন কেন? আর সেই ধরা দেওয়াতে এত স্বতঃস্ফূর্ততাই বা কেন?”

দেবী কল্পনা প্রশ্ন করলেন, “আপনি কেউ বুঝিয়েছেন বলতে কি মেধার কথা ইঙ্গিত করছেন?”

মহারাজ আত্ম কনোদিকে না তাকিয়েই মাথা নাড়লে, দেবী ইচ্ছা মদিরা পান করতে করতেই বললেন, “এই মেধাকে এতটা গুরুত্ব প্রদান করছেন কেন আপনি!… মেধা যখন সেই শিশু, তখন থেকে আপনাকে এমন করতে দেখছি। প্রথমে যোজনা করে, তাঁকে রাজপুরের সকলের থেকে আলাদা করলেন, অতঃপরে আপনার পুত্রদের বারংবার বলতেন কি ভাবে মেধাকে বশ করতে হবে। কিন্তু এতটা গুরুত্বপ্রদান কেন মহারাজ!”

মহারাজ আত্ম মৃদু হেসে বললেন, “আমাকে একটি কথা বলুন দেবী, আমি আপনাদের অধীনে স্থিত নাকি আপনারা আমার?”

দেবী ইচ্ছা বললেন, “প্রত্যক্ষ ভাবে, আমরা আপনার মহারাজ, কিন্তু এই কথা তো আপনিও জানেন যে, আমাদের ছাড়া, আপনি একপাও চলতে সক্ষম নন”।

মহারাজ হেসে বললেন, “এই কথা আপনারা ও আমি ব্যতীত আর কে জানে? আপনাদের পুত্ররা জানে?”

তিনদেবীই একাগ্রচিত্তে সমস্ত কথা শুনতে থাকলে, দেবী ইচ্ছা বললেন, “না আমরা তিনজন ও আপনি ছাড়া এই বিষয়ে আর কেউ জানেনা, এমন কি আমাদের মধ্যেই এই বিষয়ে কখনো কথা হয়নি”।

আত্ম হুঙ্কার দিয়ে হেসে বললেন, “মেধা যখন মাত্র ৫ বৎসরের ছিল, তখন আপনাদের স্মরণ আছে, আমি আপনাদের তিনজনকে একত্রে নিয়ে গেছিলাম ধরাধামে, মেধারই জন্মোৎসব পালনের উদ্দেশ্যে! … আপনারা শুনেছেন কিনা জানিনা! মেধা চুপিসারে, তাঁর পিতাকে বলছিল, “পিতা, ইনিই কি মহারাজ আত্ম! … মহারাজ কি পত্নীদের দ্বারা চালিত হন! তাহলে ইনি কেন পত্নীদের দ্বারা চালিত!”

মানস বিচলিত হয়ে তাঁকে বলেছিল, “এ কি বলছো মেধা! উনি মহারাজ, উনার দ্বারা সকলে চালিত। উনি কারুর দ্বারা চালিত হতে যাবেন কেন?”

মেধা উত্তরে বলল, “আমি তো স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি পিতা, মহারাজ আত্ম একটি কথারও উত্তর দিচ্ছেন না, সমস্ত কথার উত্তর দিচ্ছেন তাঁর তিন পত্নী”।

মানস পুনরায় বলল, “উনার পত্নীরা উনার সেনাপতি, মহামন্ত্রী, তাই তাঁরাই সমস্ত কথোপকথন করছেন”।

মেধা উত্তরে আবারও একটি প্রশ্ন করলো, “মহারাজ উপস্থিত থাকতে, সেনাপতি বা মহামন্ত্রী কথা বলতে পারেন, যদি মহারাজ তাঁদেরকে আদেশ না দেন! … এতো মহারাজকে অপমান করা হয়, তাই না!”

মানস তখন কন্যাকে চুপ করানোর প্রয়াসে বললেন, “বড়দের ব্যাপারে এই ভাবে কথা বলতে নেই, তুমি চুপ করে যাও”।

মেধার প্রকাণ্ড মেধার সাথে আমি সেদিনই পরিচিত হয়ে গেছিলাম। তবে মেধার বৈচিত্র্য সম্বন্ধে আমি কিছুই জানতাম না। তা জানা আমার এতদিনে সমাপ্ত হলো। তবে হ্যাঁ, এটুকু তো বুঝে গেছিলাম যে, যদি এই ধরাধামে আমাদের অধিকার স্থাপনে কেউ বাঁধা হয়, তবে তা হলো এই মেধা। তাই যখন থেকে জেনেছি যে, মেধার মন রাজপুরের থেকে অধিক রাজপুরের বাইরে থাকে, সেদিন থেকে তাঁকে রাজপুরের থেকে বাইরে ছিটকে দেবার চিন্তা করেছি।

আর হ্যাঁ, মেধার শক্তি যে তাঁর পবিত্রতা, সেই আন্দাজ করেছিলাম আমি, কারণ আমি মাতা ব্রহ্মময়ীকে দেখেছি, আর তাঁকে দেখে এটিই জেনেছি আমি যে, যে দিব্যশক্তির মূলাধারই হলো পবিত্রতা আর সুষুম্না কাণ্ডই হলো সরলতা। তাই আমার পুত্ররা যখন ধরাধামে ছিল, যখন তাঁরা শিখা ও বেগবতীর পবিত্রতার নাশ করছিল, তখন তাঁদের বিভিন্ন উপায়ে মেধার পবিত্রতাকে নষ্ট করতে বলেছিলাম, কিন্তু মেধা যে পবিত্রতা ও সরলতার সাথে সাথে প্রচণ্ডভাবে মেধাও ধারণ করে, ঠিক ব্রহ্মময়ী মাতার মতন, তাঁর ধারণা আমার ছিলনা। তাই, আমার পুত্ররা ব্যর্থ হয়, তাঁকে মায়ায় আবদ্ধ করে, তাঁর পবিত্রতাকে নষ্ট করতে”।

দেবী চিন্তা প্রশ্ন করলেন, “এর অর্থ মহারাজ, এই পবিত্রতাই মেধার সমস্ত শক্তির আধার!”

মহারাজ আত্ম বললেন, “দেবী, যেকোনো দিব্যশক্তির আধারই হলো পবিত্রতা। আর তাই যতক্ষণ এই পবিত্রতা তাঁর মধ্যে অবস্থান করছে, ততক্ষণ তাঁকে বশীকরণ করা সম্ভবই নয়। দেখুন না, একবার শিখা ও বেগবতীর পবিত্রতাকে আমার পুত্ররা নষ্ট করে দিলে, আর কি তারা কনো প্রকার প্রতিরোধ করতে পারলো? না, তারা সমস্ত দিব্যতা হারিয়ে ফেলল। একই ভাবে মোহিনীর মায়াতে আচ্ছন্ন হয়ে যেতে, মানস ও ধরাও সমস্ত দিব্যতা হারিয়ে ফেলল। কিন্তু মেধার পবিত্রতাকে নষ্ট করা যাচ্ছেনা, আর তাই তার দিব্যতাও হাতছাড়া হয়ে থাকছে”।

দেবী ইচ্ছা প্রশ্ন করলেন, “কি এই পবিত্রতার আধার মহারাজ! কে পবিত্র, আর কেই বা অপবিত্র!”

আত্ম বললেন, “দেবীরা, যাকে আমাদের কনো পুত্র, কনো পৌত্র বা পৌত্রী স্পর্শও করতে পারেনা, তিনিই পবিত্র। আমি হলাম আত্ম, অর্থাৎ আত্মভাব, আমিত্বের ভাব। আমার পুত্ররা হলেন, আমারই তিনগুণ, আর আমার পৌত্র ও পৌত্রীরা আমারই সমস্ত বিস্তার। এঁদের সকলের থেকে যিনি মুক্ত, তিনি আত্মভাব থেকে সম্পূর্ণ ভাবে মুক্ত, আর তাই তিনিই হলেন পবিত্র।

আত্মভাবই অপবিত্রতার কারণ, কারণ আত্মভাব মানেই সীমিত দৃষ্টিভঙ্গি, সীমিত তাঁর জগত, সীমিত তাঁর বিস্তার, সীমিত তাঁর জীবনশৈলী, সীমিত তাঁর ভাবধারা, এমনকি সীমিত তাঁর জীবনও। যখন কেউ এই আমিত্ব থেকে মুক্ত, তিনি সীমিত থেকে অসীমত্বের দিকে যাত্রারত। দেশ, কাল, জাতি, বর্ণ, লিঙ্গ, সমস্ত কিছুই তাঁর কাছে ফিকে হয়ে যায়, আর সে সমস্ত প্রকাশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে শূন্যের দিকে, মহাশূন্যের দিকে অগ্রসর হয়।

অর্থাৎ তিনি মাতা ব্রহ্মময়ীর দিকে অগ্রসর হন, ব্রহ্মসর্বস্ব হয়ে ওঠেন, এবং মুক্ত হয়ে যান। তাই একমাত্র তিনিই পবিত্র। চিন্তা করে দেখুন দেবীরা, আমরা কি করি সকলে মিলে? আমরা সকলে মিলে আমাদের প্রভাবকে সকলের উপর বিস্তার লাভ করার প্রয়াস করি। সকলকে হয় ভাষণের মাধ্যমে, নয় প্রবচনের মাধ্যমে, নয় চক্রান্ত করে বোঝানোর প্রয়াস করি। কি প্রয়াস করি? এই প্রয়াস করি যাতে তিনি নিজেকে নিয়ে চিন্তিত থাকেন, নিজের জীবন, নিজের পরিবার, নিজের জাতি, নিজের দেশ নিয়ে চিন্তিত থাকেন।

এতে আমাদের কি লাভ? যতই তাঁরা আত্মকেন্দ্রিক হতে থাকেন এইভাবে, ততই আমাদের প্রাধান্য বাড়তে থাকে, আমরা ততই শক্তিধর হতে থাকি। আমাদের আধিপত্য ততই বিস্তার লাভ করে। আত্মকেন্দ্রিক হতে শুরু করলেই ব্যক্তির মধ্যে আমার বিস্তার হয়, অর্থাৎ আমিত্বের ভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আর যেই ক্ষণে এই আমিত্বের ভাবের বিস্তার ঘটে ব্যক্তির মধ্যে, সেই ক্ষণে, আপনাদের বিস্তার হয় তাঁর মধ্যে।

আপনাদের বিস্তার হওয়া মাত্রই, ব্যক্তি দিবারাত্র নিজেকে নিয়ে চিন্তায় উলমালা হতে শুরু করেন। ভিন্ন ভিন্ন ইচ্ছার সঞ্চার হয় তাঁর মধ্যে, আর সেই ইচ্ছা পুড়ন করার জন্য ভিন্ন ভিন্ন কল্পনা করা শুরু করেন সকলে। অর্থাৎ আপনাদের তিনজনকে তাঁরা নিজেদের আরাধ্য করে নেন, আর তার ফলে আমার তিনপুত্রেরও বিস্তার ঘটে তাঁর মধ্যে। আর তাঁদের বিস্তার হওয়া মানেই আমার পৌত্রী ও পৌত্রদের বিস্তার। আর এই সকল বিস্তার মিলে, ব্যক্তি আত্মসর্বস্ব হয়ে ওঠেন।

আত্ম অর্থাৎ নিজেকে বিনা কিছুই তখন তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়না। ক্রমে, এই নিজেকে গুরুত্বদান তাঁর ভূতদেরকেও বশীকরণ করা শুরু করে। তেমন করলে, আমাদের পুত্রদের প্রভাবে, ব্যক্তির উর্জা বশীকরণের শিকার হন, এবং দিবারাত্র নিজের আহার, নিজের বিশ্রাম ও ক্রমে নিজের বিলাসিতার চিন্তাতে সর্বক্ষণ চিন্তিত থাকেন।

আমাদের পুত্রদের প্রভাবে ব্যক্তির প্রাণও বশ হয়ে যায়, এবং ব্যক্তি সর্বদাই নিজের প্রাণরক্ষার চিন্তায় রত থাকেন। আপনারা এই দৃশ্য দেখেছিলেন, দেখেন নি! যখন আমাদের তিন পুত্রের প্রভাবে, শিখা ও বেগবতী বশ হয়ে গেছিল, তখন আমাদেরকে কি কনো নীতি ধারণ করতে হয়েছিল, সকল প্রজাকে আহারসর্বস্ব, বিশ্রামসর্বস্ব, বিলাসিতা সর্বস্ব, বা প্রাণ নিয়ে চিন্তিত করে তোলার জন্য!

না করতে হয়নি। বুঝতে পারছেন কি বলছি আমি! আমি আপনারাও যেমন সাধারণ কেউ নয়, আমাদের প্রভাব বিস্তার হবার সাথে সাথে, যেমন সমস্ত প্রজা আত্মসর্বস্ব হয়ে ওঠে, তেমন মানস বা মানসের পরিবারও সামান্য কেউ নয়। তাঁদের সদস্যরা যেই দিশায় যায়, সমস্ত ধরাধাম সেই দিশাতেই যায়।

যখন শিখা ও বেগবতী বশ ছিল, তখন আমাদের কনো নীতির সাহায্য নিতে হয়নি ধরাধামের মানুষদের বশ করার জন্য। কিন্তু যাই তাঁদের উপর বশীকরণ বিনষ্ট হয়ে গেল, তাই মোহিনীকে নীতি ধারণ করতে হলো বশীকরণ করার জন্য।

অন্যদিকে দেখুন দেবীরা, মানস ও ধরা যাই বশ হয়ে গেল আমাদের পৌত্রীদের কাছে, আমাদের নীতি ধারণ করতে হলো যাতে প্রজা উর্জা অর্থাৎ শিখাকে, এবং প্রাণ অর্থাৎ বেগবতীকে নিয়ে চিন্তিত থাকেন, কিন্তু প্রজাকে দেহের দিকে মনোনিয়োগ করতে, বা নিজেদের ইচ্ছা, চিন্তা বা কল্পনার প্রতি মনোনিয়োগ করতে কনো নীতি ধারণ করতে হয়নি, কারণ প্রজা তখন স্বতঃই নিজেদের দেহ নিয়ে, নিজেদের ইচ্ছাসমূহ নিয়ে ব্যস্ত হতে শুরু করে দিল।

কিন্তু এই সমস্ত কিছুর মধ্যেও যাকে আমরা স্পর্শ করতে পারলাম না, সে হলো মেধা, অর্থাৎ সমস্ত প্রজার বুদ্ধি। হ্যাঁ, আমাদের বিস্তারের কারণে, সে সুপ্ত হয়ে গেল, কিন্তু বশ হলো না। একবার মেধা বশ হয়ে গেলে, আর যে ব্রহ্মময়ী মাতাও কিছু করতে পারতেন না, কারণ সমস্ত প্রজা যে আত্মসর্বস্ব হয়ে যেত, আর তাই তিনি বিকশিত হবার স্থানই পেতেন না”।

দেবী কল্পনা বললেন, “এমন কেন? সকলে আমাদের বশ হয়ে গেলে, ব্রহ্মময়ী আর বিকশিত হতে পারেন না কেন?”

আত্ম ক্রুর হাস্য হেসে বললেন, “ব্রহ্মময়ী কে? আমাদের বাস্তবতা। একমাত্র তিনিই বাস্তব, বাকি সমস্ত কিছুই ইচ্ছা, চিন্তা ও কল্পনা, অর্থাৎ আপনাদের তিনজনের প্রকাশ, আর আপনারা বিকশিত কখন হতে পারেন! যখন আমার ভাব অর্থাৎ আত্মভাবের বিস্তার হয়। ব্রহ্মময়ী কে? শূন্য তিনি, অসীম শূন্য তিনি। আর আমরা কে? আমরা সেই শূন্য, যার মধ্যে কনো ভেদ নেই, কনো বিভেদ নেই, কনো বৈষম্য নেই, তাঁর মধ্যে বৈষম্যের রচনাকারী।

যেই ক্ষণে আমরা সম্পূর্ণ বিস্তার লাভ করে ফেলি, সেইমুহূর্তে, মাতা ব্রহ্মময়ী তো থাকেন, কারণ তিনিই একমাত্র বাস্তব, কিন্তু তাঁকে আমরা সকলে মিলে ঢেকে ফেলি, আর তাই তাঁর বিকাশের সম্ভাবনাকে আমরা তরান্বিত করে দিই”।

দেবী চিন্তা চিন্তিত হয়ে বললেন, “অর্থাৎ মহারাজ, আপনি বলছেন, মাতা ব্রহ্মময়ীর জাগরণের এখনো সম্ভাবনা রয়েছে! কারণ মেধা তো এখনও আমাদের থেকে মুক্ত অর্থাৎ পবিত্রই রয়েছে!”

মহারাজ আত্ম বললেন, “প্রয়াস তো করেছিলাম দেবীরা। যখন আমার পুত্ররাও কিছু ভাবে মেধাকে বশ করতে পারলো না, তখন আমি আপনাদেরকে তাঁর বিকল্প করে রেখে দিয়েছিলাম, যাতে তাঁর মধ্যে আত্মশ্লাঘার নির্মাণ হয়, এই ভেবে যে তাঁর কনো গুরুত্বই রইল না আর। কিন্তু পবিত্রতার সামর্থ্য অত্যধিক দেবী। মেধা গুরুত্ব না পেয়েও, নির্বিকার থেকে গেল, যেন তাঁর কিছু এসেই যায়না গুরুত্ব লাভ করে বা না করে।

আর যখন তাঁর সমস্ত পরিবার বশ হয়ে গেল, তখন সে উঠে দাঁড়াল, আর তাঁর সামর্থ্য এমনই যে, মুহূর্তের মধ্যে আপনাদের তিনজনের প্রভাবকে সে কাটিয়ে দিল। না! সম্পূর্ণ ভাবে মেধার সামর্থ্য, এমন বলবো না, মেধার সামর্থ্যের সাথে পবিত্রতার সামর্থ্য একাকার হয়ে, তাঁর সামর্থ্যকে অসীম করে তুলল, আর অসীমত্বের কাছে আমি, আপনি বা আমাদের কেউ কখনোই দাঁড়াতে পারিনা, এবারও পারলাম না”।

দেবী ইচ্ছা প্রশ্ন করলেন, “তাহলে এখন উপায় কি নাথ!”

আত্ম বললেন, “দেখুন দেবী, মেধা সুপ্ত যতক্ষণ ছিল, ততক্ষণ আমরা তাঁকে বশ করার প্রয়াসও করতে পারতাম না। … তাই আমরা মেধা ব্যতীত সমস্ত কিছুকে, বশ করে নিয়েছিলাম। কিন্তু এখন মেধা সক্রিয় হয়েছে। আর তার সক্রিয়তার ধারা দেখে এটুকু তো বুঝে গেছি যে, তার সমস্ত পরিবারের বশীকরণই তাঁকে জাগিয়েছে।

তাই, তাঁর সমস্ত পরিবারকে বন্দী করলাম আমরা। অর্থাৎ মেধা এখন সক্রিয় থাকবে। সে সক্রিয় থেকে, নিজের পরিবারকে মুক্ত করার প্রয়াস করবে। আর এই প্রয়াসের দিকে তাঁর মনোনিয়োগ থাকাকালীন, যদি একবার ওর পবিত্রতাকে ভঙ্গ করে দিতে পারি, তাহলে …”

এতটা কথা মনোনিয়োগ করে শ্রবণ করে, ত্রিআত্মপুত্র সেখান থেকে প্রস্থান করলেন। তাঁরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে চোখে চোখে কথা বললেন যে, যা জানার ছিল, তা তাঁরা জেনে গেছেন, এবার সময় এসেছে পর্যালোচনা করার।

ত্রিভ্রাতার প্রস্থানের পর দেবী চিন্তা বললেন, “অর্থাৎ, আমরা আমাদের পরিচয় গোপন করে যদি মেধার কাছে যাই, তাঁর সাথে সম্পর্ক তৈরি করি, আর তাঁকে ঠিক তেমন ভাবেই বশ করি, যেই ভাবে তাঁর ভগিনীদের বশ করা হয়েছিল, অর্থাৎ শয্যাতে রমণে উন্মত্ত করে তুলে, তাহলেই আমাদের লক্ষ্যপূর্ণ হবে। এই তো মহারাজ!”

মহারাজ আত্ম হেসে বললেন, “সঠিক। … তবে এই কাজ অতি সহজ হবেনা দেবীরা। প্রথমে মেধাকে প্রয়াস করতে দিতে হবে তাঁর পরিবারকে মুক্ত করার জন্য। … বারংবার প্রয়াসে যখন সে ব্যর্থ হবে, তখন দিশাহারা মেধার কাছে আমাদের কনো একপুত্র চলে যাবে, সহায়তা প্রদান করার ছলনা করে। আর সেই সুযোগে, তাঁকে একবার শয্যা পর্যন্ত ছল করে নিয়ে যেতে হবে। একবার রমণসুখে তাঁকে বদ্ধ করে দিতে পারলে, সে নিজেই ক্রমশ সেই রমনসুখের নেশায় বশ হতে থাকবে, আর সে নিজের পবিত্রতা হারিয়ে ফেলবে”।

দেবী ইচ্ছা বললেন, “এর অর্থ কি এই মহারাজ যে, রমণসুখে রত ব্যক্তিই অপবিত্র হয়ে যান!”

আত্ম হেসে বললেন, “না দেবী, যতক্ষণ রমণ সমর্পণের ভাবসম্পন্ন হয়, অর্থাৎ যতক্ষণ ব্যক্তি রমণের কালে, নিজেকে নিজের প্রেমিক বা প্রেমিকার কাছে অর্পণ করার ভাবদ্বারা পরিচালিত হন, ততক্ষণ তিনি পবিত্র থাকেন। আমরা কেউ তাঁকে স্পর্শ করতে পারিনা। কিন্তু যেই ক্ষণে, তাঁর মধ্যে সমর্পণের পরিবর্তে আসে সম্ভোগের চিন্তা, নিজেকে অর্পণ করার নয়, প্রেমিক বা প্রেমিকাকে সম্ভোগ করার বাসনা যুক্ত হয়, সেই মুহূর্তে তিনি অপবিত্র হয়ে যান।

দেবী রমণ অত্যন্ত পবিত্রক্রিয়া, তার জন্যই তো এই রমণকে কেন্দ্র করে, মাতা ব্রহ্মময়ী সন্তান প্রদান করেন জননীদের গর্ভে। কিন্তু যতক্ষণ সেই রমণের মধ্যে এই ভাব থাকে যে, সাখ্যাত মাতা ব্রহ্মময়ীকে অনুভব হচ্ছে এই রমণের কালে, ততক্ষণই ব্যক্তি পবিত্র থাকেন। যেই ক্ষণে, যেই মুহূর্তে, ব্যক্তির মধ্যে আমার সুখ, আমার দেহসুখ, আমার দেহবাসনার ভাবের উদয় হয়, সেই একটি মুহূর্তেই তিনি অপবিত্র হয়ে যান।

অর্থাৎ দেবী, পবিত্রতা এক অসম্ভব সৌখিন ভাব, যা একটি মুহূর্তেই নষ্ট হয়ে যেতে পারে, আর একটি মুহূর্তের জন্যও যদি তা বিনষ্ট হয়ে যায়, জেনে রাখবেন, মাতা ব্রহ্মময়ীর সংস্পর্শ লাভ, তাঁর পক্ষে অসম্ভব হয়ে যায়”।

দেবী কল্পনা প্রশ্ন করলেন, “এর অর্থ কি এই মহারাজ যে, একবার অপবিত্র হয়ে গেলে, আর সে পবিত্র হতে সক্ষম নয়!”

আত্ম বললেন, “সম্ভব, আর তা তখনই সম্ভব, যখন অন্য একজন সম্পূর্ণ পবিত্র ব্যক্তি, অর্থাৎ যিনি সমস্ত ভেদভাব, সমস্ত আত্মভাবের থেকে মুক্ত, তাঁর প্রতি সমর্পিত হন সেই অপবিত্র ব্যক্তি”।

দেবী ইচ্ছা বললেন, “আমরা শিখা ও বেগবতীকেও বন্দী করতে পারিনি। তা এমনও তো হতে পারে যে তাঁরা মেধার সাথে রয়েছে। যদি তাঁরা মেধার প্রতি সমর্পিত হয়ে যায়, তার মানে কি পুনরায় তাঁরা পবিত্র হয়ে উঠবে!”

আত্ম মাথা নেড়ে বললেন, “হ্যাঁ সঠিক বচন দেবী। … সেই কারণে প্রহরীদের সর্বত্র নিযুক্ত রেখেছি আমি। মেধার প্রভাবে এসে যদি শিখা ও বেগবতীও পবিত্র হয়ে যায়, তখন আমাদের জন্য এই যুদ্ধ জয় আরো কঠিন হয়ে যাবে”।

অন্যদিকে, ত্রিভ্রাতা এই অন্তিম বার্তালাপ না শুনেই নিজেদের মধ্যে আলোচনা করা শুরু করলেন মেধাকে নিয়ে। প্রথম আক্ষেপই করলেন তামস, “সেই কালে মাতারা আমাদের বারবার বলেছিলেন, মেধাকে বশ করার কথা, কিন্তু আমরাই তা করতে ব্যর্থ হই। শুধুই কি শিখা আর বেগবতী! আমরাও তো ওদের মোহে আবদ্ধ হয়েছিলাম, তাই না! তাই যদি না হতাম, তাহলে মেধা যে আমাদের বশীকরণ থেকে মুক্ত থাকছে, সেই দিকে নজর কেন যেতো না আমাদের!”

প্রভাত বললেন, “হ্যাঁ, মেধা ওর দুই ভগিনীর থেকেও অধিক সুন্দরী। ওকে তো সকলে ওর গাত্রবর্ণের জন্য গৌরি বলেও ডাকে। কিন্তু সত্য বলতে, ইন্দ্রিয়ার দেহসৌন্দর্য আমাদের আকর্ষণ করেছিল, আর শিখা বা বেগবতীর রূপ! এই রূপ আমাদের এই ব্রহ্মাণ্ডপুরে কোথায় ছিল কারুর! … সেই রূপের সাথে সাথে, বশীকরণ হয়ে যাওয়ার পর, ওদের লাবণ্যের বিস্তার, ওদের লবণ যে আমাদেরকেও বশ করে নিয়েছিল!”

রজনী হতাশ হয়ে শুয়ে ছিলেন। সেই শুয়ে থাকা অবস্থা হতেই বললেন, “পূর্বেও শুনেছিলাম, সেদিন প্রত্যক্ষ করলাম। শুনেছিলাম যে মেধা যখন স্বেদময় হয়ে ওঠে, তখন তাঁর সর্বাঙ্গ থেকে এক মিষ্টপুষ্পের গন্ধ বিকশিত হয়। সেদিন মোহিনীর সাথে যুদ্ধের কালে, সেই সুবাস আমি প্রত্যক্ষ করেছি। … ভেবে দেখো ভ্রাতারা, রূপ শিখা ও বেগবতীর থেকেও অধিক, অঙ্গের বর্ণের জন্য তাঁকে সকলে গৌরি বলে থাকে, আর সঙ্গে অঙ্গের সৌরভ। ভেবে পাচ্ছ, কি মনোলোভাই না হবে, তাঁর সাথে সঙ্গমপর্ব!”

তামস বললেন, “কি বলতে চাইছো ভ্রাতা! … বশ তো সে আমাদের হয়না। তাহলে আমাদের করনীয় কি!… আমরা কি তবে তাঁর উপর বলপ্রয়োগ করবো!”

রজনী ক্রুর হাস্য হেসে বললেন, “পিতার কথা শুনলে না! … রমণে লিপ্ত, আর পবিত্রতার বিনাশ। তাই সে স্বেচ্ছায় আমাদের সাথে রমণে লিপ্ত হোক, বা আমাদের ইচ্ছার বলের কাছে তাঁকে পদানত করে রমণসুখ আসুক, অপবিত্র তো সে সবক্ষেত্রেই হবে!”

প্রভাত বললেন, “কিন্তু ভ্রাতা! স্ত্রীর উপর বলপ্রয়োগ করে তাঁকে সম্ভোগ করা, এতো অন্যায় হবে, তাই না!”

তামস ক্রুর হাস্য প্রদান করে বললেন, “আমরা রাজপুত্র, আমরা যা করবো, তাই ন্যায় আর বাকি সমস্ত কিছু অন্যায়। রমণ করে মেধার পবিত্রতার বন্ধন নষ্ট করাই আমাদের লক্ষ্য, আমাদের পিতার রাজত্ব তাহলে অক্ষয় হয়ে উঠবে। তাই সেটাই আমাদের কাছে কর্তব্য। তাই যদি বলপ্রয়োগ করেই সেই লক্ষ্যপ্রাপ্তি হয়, তাহলে ক্ষতি কি!”

রজনী বললেন, “আর তার থেকেও বড় কথা, বলপ্রয়োগ তো আমরা শুরু করিনি। শুরু করেছে মেধা স্বয়ং। মেধাই সকলকে বলে না, প্রতিটি চয়নের সাথে পরিণাম যুক্ত থাকে। তাহলে সে যে বল প্রয়োগ করে মোহিনীকে ক্ষতি প্রদান করেছে, আমাদের সকলের, মহারাজ আত্মের প্রতিষ্ঠাকে ক্ষতি প্রদান করেছে, সেই ক্ষতিসাধন করার চয়নেরও তো পরিণাম হবে!”

তামস ঔদ্ধত্য প্রকাশ করে বললেন, “আর সেই পরিণাম হবে, আমাদের বলকে সহ্য করা, আর আমাদের বলের কাছে নতি স্বীকার করে, আমাদের সম্ভোগের পাত্র হওয়া”। … এই বলে অট্টহাস্যে লিপ্ত হলেন রজনী ও তামস।

প্রভাত তখনও সন্দিহান। তিনি বললেন, “কিন্তু মেধার অঙ্গের সৌরভ, তা কি ওর পবিত্রতার প্রকাশ নয়! যদি আমরা ওর পবিত্রতার বন্ধনকে ছিন্ন করি, তাহলে কি ওর অঙ্গের সৌরভ আর থাকবে!”

রজনী এবার শায়িত অবস্থা থেকে উন্নত হয়ে, প্রভাতের নিকটে গিয়ে, তাঁর স্কন্ধে হাত রেখে বললেন, “ভ্রাতা, ভ্রাতা, ভ্রাতা! … মহারাজ আত্মের জ্যেষ্ঠ পুত্র আপনি। সমস্ত কিছুর রচয়িতা আপনি। এই সম্পূর্ণ ব্রহ্মাণ্ডপুরে অজস্র কিছুর জন্ম দিয়ে, আপনি তাকে সাজিয়ে তুলেছেন, আর তাই আপনাকে এখানের সকলে আপনাকে কি বলে! … ব্রহ্মাণ্ডের রচয়িতা, ব্রহ্মা। … শুধু ব্রহ্মা! … উমহুম, ভগবান ব্রহ্মা।

তা হে ভগবান ব্রহ্মা, আপনি আমাকে একটি কথা বলুন, পুষ্পের মধ্যে সৌরভ আপনি প্রদান করেছিলেন। কি কারণে? যাতে তা তাঁকে রমণকারী মক্ষিকাদের আকর্ষণ করে, তার কারণেই না! … আচ্ছা, মক্ষিকা যখন পুষ্পে অবস্থান করে, পুষ্পের মধুপান করে, তাঁকে রমণ করে, সেই মধুর মধ্যে কি সৌরভ লাভ করে মক্ষিকা! না কি সেই সৌরভের পরোয়া করে সে! … আপনার রচনা, আপনি ভালো বলতে পারবেন, তাই প্রশ্ন করলাম”।

প্রভাত আমতা আমতা করলে, রজনী পুনরায় বললেন, “এই আমাদের কনিষ্ঠ ভ্রাতা তামস। সে খুব ভালো করে জানে যে, মাতা যেই সামান্য পঞ্চভূত আমাদের প্রদান করেছেন, তাই দিয়েই আপনাকে নূতন রচনা করতে হবে, তাই সে দিবারাত্র শ্মশানে পরে থাকে। কেন? কেননা, যা যা আপনার রচনা সেখানে পরিত্যক্ত হয়ে গমন করবে, সেখান থেকে সে পুনরায় সমস্ত পঞ্চভূতদেরকে উদ্ধার করে, আপনাকে দিতে পারবে, আর আপনি আপনার রচনা কর্ম অব্যাহত রাখতে পারবেন, আর সেই সাথে সাথে ভগবান ব্রহ্মদেব হয়েই বিরাজ করবেন।

জানেন, এই কর্মের জন্য, আমাদের কনিষ্ঠ ভ্রাতাকে সকলে কি বলেন? শব নিয়ে কারবার, তাই সকলে তাঁকে বলে ভগবান শিব। আর এই সীমিত পঞ্চভূত, যা নিয়ে আমাদের কারবার, এই সমস্ত কিছুর উপর একপ্রকার প্রভুত্ব স্থাপন করে রেখে দিয়েছে সে, তার এই অসম্ভব কৃত্যের কারণে সকলে তাঁকে মহাদেব বলে ডাকে, আর সাথে সাথে এই পঞ্চভূতকে যেই বিচিত্র ধারায় সে মিলিত করে আমাকে প্রদান করে, তার কারণে তাঁকে ভগবান শংকরও বলে লোকে।

তা ভ্রাতা, একবার তাঁকে প্রশ্ন করুন তো, এই পঞ্চভূত নিয়ে শ্মশানে স্থিত হয়ে কারবার করার কালে, সে কনো সৌরভ পায় কিনা!… (ক্রুর ভাবে) ভ্রাতা ভ্রাতা ভ্রাতা, ব্যপারটা বোঝার প্রয়াস করুন। আপনি যে মাতার প্রদত্ত সীমিত পঞ্চভূত দ্বারা, নূতন নূতন নির্মাণ করেন বলে ভগবান ব্রহ্মা, আমি যে এই নূতন নূতন নির্মাণদের সুব্যবস্থিত করার জন্য বিশ্বের রক্ষক, ভগবান বিষ্ণু, আর আমাদের কনিষ্ঠ ভ্রাতা যে নাশপ্রাপ্ত আপনারই রচনাদের থেকে পঞ্চভূতকে পুনরোদ্ধার করে নিয়ে এসে ভগবান শিব, কেন এই সমস্ত কিছু!

সীমিত আমাদের কাছে উপলব্ধ পঞ্চভূতসামগ্রী, তাই দিয়ে কি নিজেকে ভগবান রূপে স্থাপিত করা যেতে পারে! … কিন্তু আমাদের পিতাকে দেখুন, নামে তিনি আত্ম, কিন্তু বাস্তবে তিনি পরমাত্ম। আপনার নির্মাণ করা সমস্ত রচনা কেন সক্রিয়, কেন জীবন্ত? আপনার রচনা বলে? না, আমাদের পিতা তাঁদের সাথে যুক্ত হয়েছেন বলে।

যেমন মানস মাতা ব্রহ্মময়ীর অঙ্গজাত সন্তান, তেমনই মহারাজ আত্মও। আর তাই এঁদের দুইজনেই যেখানে যেখানে যুক্ত হন, সেখানে সেখানে মাতার অবস্থান নিশ্চিত ভাবে থাকে। তাই যখন যখন আমাদের পিতা, সাখ্যাত পরমাত্ম আপনার সমস্ত রচনার সাথে যুক্ত হন, তখন তখন তা আত্ম ও চেতনা লাভে, জীবন্ত হয়ে ওঠে।

ভ্রাতা, কি বলছি, বুঝতে কি পারছো? আমাদের সকল প্রজা, সমস্ত কেউ যারা আমাদেরকে ভগবান নামে ডাকে, তাদের রচয়িতা আপনি, তাদের পালক আমি, আর যাতে তাদের সংখ্যা হ্রাস না পায়, তাই সমানে প্রয়াসরত তাদের পঞ্চভূতকে ফিরিয়ে আনতে, সে হলো আমাদের কনিষ্ঠ ভ্রাতা, আর এই সমস্ত রচনা, যারা আমাদের ভগবান আখ্যা দিয়ে থাকে, কারণ আমরাই তাঁদের পিতা, তারা যে জীবন্ত, তার কারণ আমাদের পিতা, সাখ্যাত পরমাত্ম।

ভ্রাতা, একটু হলেও চিন্তা করে দেখুন, মাতা ব্রহ্মময়ীর এই রাজ্যে, আমাদেরকে কেউ ভগবান বলবেন কেন? বাস্তবে, আমাদের কেউই ভগবান বলেন না, আমরাই আমাদেরকে ভগবান বলি, কারণ, যা কিছু আপনার রচনা, তাদের সকলের ভূত স্বয়ং আমাদের পিতার কাছে প্রদান করা মাতার সীমিত ভূতরাই।

অর্থাৎ পিতার ভূত থেকে আপনি এত এত রচনার নির্মাণ করেন, সেই রচনার সাথে পিতাই নিযুক্ত থেকে, তাঁদেরকে তিনি প্রজার রূপ প্রদান করেন, আমিও সেই প্রজাদেরই পালক, যারা স্বয়ং আমাদের পিতারই প্রকাশ, অঙ্গে ও অন্তরে। আর যেহেতু আমাদের কাছে ভূতসামগ্রী অত্যন্ত সীমিত, অর্থাৎ কেবলই পিতার ভূতসামগ্রীসমূহই, তাই তামস সমস্ত শব হয়ে যাওয়া আপনার রচনার ভূতকে পুনরায় উদ্ধার করে নিয়ে আসে, আর আপনি পুনরায় আমাদেরকে যারা ভগবান বলবেন, তাঁদের রচনা করতে থাকেন।

বোঝার প্রয়াস করুন ভ্রাতা, যাদেরকে আমরা ছায়াপুরের বিস্তার করে বশ করে রেখেছিলাম, তাঁরা আমাদের পিতার ভূতদের সামগ্রী বহন করেন না, তাঁরা মানসের ভূতসমূহ বহন করেন, আর মানস কে? মানস স্বয়ং মাতা ব্রহ্মময়ীর সম্পূর্ণ ভূতের প্রকাশ। অর্থাৎ তাঁর ভূতদের যদি আমরা বশ করে নিতে পারি, তাহলে সমস্ত সৃষ্টি আমাদের করতলে চলে আসবে, আর আমাদের কাছে সীমিত ভূত থাকবেনা, আর আমাদের সীমিত ভূত নিয়ে কারবার করতে হবেনা।

ভেবে দেখুন ভ্রাতা, এই মানসের প্রজারা, যারা নাশ হয়েছে, তাদের শব থেকে ভূত উদ্ধার করে নিয়ে আসার কারনে, আপনার রচনার বিস্তার কতখানি হতে পারতো! … আমাদের আধিপত্য কতখানি বিস্তৃত হতে পারতো! … কিন্তু তা হয়নি! কেন হয়নি, কারণ আমরা সেই অসীমিত ভূতসমূহকে আনতে পারিনি আমাদের বশে।

মানসকে বশ করে, আকাশতত্ত্ব লাভ করেছি; ধরাকে বশ করে, মৃত্তিকাতত্ত্ব লাভ করেছি; যখন শিখা আর বেগবতী আমাদের বশ ছিল, তখন অগ্নি ও বায়ুতত্ত্বকে লাভ করেছি; কিন্তু মেধা কখনো বশ হয়নি, আর তাই জলতত্ত্ব আমরা কিছুতেই লাভ করতে পারছিনা। আর তার ফলে, আমাদেরকে এখনো সেই সীমিত ভূতদ্বারাই সমস্ত ভক্ত নির্মাণ করে করে, নিজেদেরকে ভগবান রূপে স্থাপিত করতে হচ্ছে।

ভেবে দেখুন একবার, যদি এই সমস্ত অসীমিত ভূতদের আমরা নিজেদের অধিকারে স্থাপিত করতে পারি, তাহলে আমরা অজেয় হয়ে যাবো, অজেয়। কি মনে হয় আপনার, কেন পিতাশ্রী মানস, ধরা আর সমস্ত প্রজাদের একত্রে বন্দী করে রেখেছেন! … কারণ একটিই, আমাদের বশীকরণ ভঙ্গ হয়ে গেছে সেই মুহূর্তে, যেই মুহূর্তে মোহিনীকে মেধা পরাস্ত করে দিয়েছে।

ভেবে দেখুন, কখনোই অসীমিত পঞ্চভূতকে পিতা একত্রিত হতে দেন নি। মাতাদের সাহায্যে, তিনি সর্বদা এঁদের মধ্যে ভেদ রেখে দিয়েছিলেন। মানস মেধাকে স্নেহ করতেন, তো ধরা মেধার থেকে দূরে থাকতেন। শিখা বেগবতী মেধাকে স্নেহ করতেন তো মানস শিখা ও বেগবতীকে উচ্ছন্যে যাওয়া কন্যা মনে করে দূরে রাখতেন। শিখা ও বেগবতীকে যখন ধরা আর মানস স্বীকার করে কাছে টেনে নিলেন, তখন মেধাকে দূরে রাখতেন।

কেন এই ভেদ? কারণ এঁরা যেই ক্ষণে একে অপরের সাথে সংযুক্ত হয়ে যাবেন, সেই ক্ষণে, সমস্ত অসীম ভূতরা একত্রিত হয়ে মাতাকে পুনরায় দেহপ্রদান করে দেবেন। … মোহিনীর পরাজয়ের ফলে, এই সমস্ত ভূতরা নিকটে চলে এসেছিলেন। তাই পিতা পরি কি মরি করে, মানস ও ধরা, ও তাঁদের সমস্ত প্রকাশ, অর্থাৎ সমস্ত তাঁদের অনুগত প্রজাদের বন্দি করে, বাকি তিন ভূতের থেকে পৃথক করে দিলেন”।

প্রভাত বললেন, “এর অর্থ এই যে, হয় আমাদেরকে পঞ্চ অসীমভূতকে বশ করে নিয়ে, তাঁদেরকে নিজেদের অধীনে স্থাপিত করতে হবে, না হলে মাতার উদয় অনিবার্য, আর তাঁর উদয় হলেই, আমাদেরকে ভগবান মানা স্তব্ধ হয়ে যাবে! … আমাদের সমস্ত রচনার মধ্যেও পিতারই প্রকাশ রয়েছে, আর পিতার সাথেও চেতনা যুক্ত আছে। অর্থাৎ একবার মাতা দেহধারণ করলে, আমাদের রচনারাও আমাদেরকে ভগবান বলা বন্ধ করে দিয়ে, মাতাকে ঈশ্বর রূপে মেনে, তাঁর নিকটে চলে যাবে!”

তামস এবার বললেন, “তাহলে বুঝতে পারছেন ভ্রাতা, মেধা ও তাঁর ভগিনীদের বশ করা কতটা আবশ্যক আমাদের জন্য। আর যখন জেনে গেছি যে, রমণসুখ দ্বারা তাঁদেরকে বশ করা যেতে পারে, তখন আর দেরি কেন? … স্বেচ্ছায় তাঁরা রমণে রাজি না হলে, বলপ্রয়োগ করেও তাঁদেরকে সম্ভোগ করা আবশ্যক আমাদের জন্য। তবেই আমরা সমস্ত ভূতদের অধিকার করতে পারবো, আর তবেই আমরা মাতার দেহধারণকে আটকাতে পারবো। একবার তাঁর দেহধারণকে আটকে তাঁর সমস্ত ভূতদের অধিকার করে নিতে পারলে, (অট্টহাস্য) আমাদের পিতা আর আত্ম থাকবেন না, তিনি হয়ে যাবেন পরমাত্ম। তিনি হয়ে উঠবেন একচ্ছত্র ঈশ্বর”।

প্রভাত বললেন, “কিন্তু, মেধা, শিখা আর বেগবতীকে তো আমাদের সেনারা খুঁজেই পাচ্ছেনা! তাদেরকে আমরা খুঁজবো কি করে?”

রজনী হেসে বললেন, “চিন্তা করবেন না ব্রহ্মদেব, আমাদের সেনার অনুসন্ধান আর আমাদের অনুসন্ধানের মধ্যে ভেদ তো থাকবেই। … আমাদের সেনার অনুসন্ধান কেবলই ইন্দ্রিয়দ্বারা অনুসন্ধান হবে, কিন্তু আমাদের সাথে যে আমাদের তিন মাতার বলও আছে। চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনা দ্বারা যখন আমরা অনুসন্ধান করবো, তখন যা প্রত্যক্ষ নয়, তাও প্রত্যক্ষ করা সম্ভব হয়ে যাবে। চলুন আমরা ধরাধামের অঞ্চল পরিদর্শনে নির্গত হই। বাকি যা করনীয়, তা অবস্থা বুঝেই নিশ্চয় করা যাবে”।

তিন অহমপুত্র একত্রে ধরাধামে যাত্রা করে, প্রথমে রাজপুরের সমস্ত স্থানে স্থানে সন্ধান করতে থাকলেন, কিন্তু কোথাও মেধা, শিখা ও বেগবতীকে দেখতে না পেয়ে, হতাশ হতে থাকলেন। অবশেষে, দীর্ঘ কয়েক মাসযাবত প্রয়াসেও যখন মেধার সন্ধান পেলেন না, তখন তাঁরা তাঁদের মাতাদের কাছে উপস্থিত হয়ে বললেন, “মাতা, মেধা, শিখা বা বেগবতী তো আর গায়েব হয়ে যেতে পারেনা! কোথায় যে তাঁরা গাঢাকা দিয়ে অবস্থান করছে, তার অনুমানও করতে পারছিনা”।

দেবী ইচ্ছা বললেন, “কি দরকার এত অনুসন্ধানের! ওদের কথা ভুলে যাও পুত্ররা”।

দেবী চিন্তা বললেন, “না দিদি, ভুললে চলবে না, মেধা হলো মাতা ব্রহ্মময়ীর সম্পূর্ণ জলতত্ত্ব, শিখা তাঁর অগ্নিতত্ত্ব, আর বেগবতী তাঁর বায়ুতত্ত্ব। অগ্নি বা বায়ুর নিজেস্ব কনো জ্ঞানবুদ্ধি নেই। কিন্তু মেধার আছে, প্রবল ভাবে আছে। আর একবার যদি এই তিন ভূত একত্রিত হয়ে যায়, আর আমাদের বশ্যতার থেকে মুক্ত থাকে তারা, তাহলে মাতা দেহলাভ না করলেও, মাতার সমস্ত ভাবেদের জন্ম হয়ে যাওয়া সম্ভব হয়ে যাবে”।

দেবী ইচ্ছা হেসে বললেন, “কিন্তু তার কারণে, মাতার তিন গুনেরও আবির্ভাব আবশ্যক, তাই না! … সেই তিনগুণ বিনা, মাতার বা মাতার ভাবদের, কারুরই প্রকাশ সম্ভব নয়। সম্ভব কি!”

দেবী কল্পনা কথার মধ্যে বিঘ্ন এনে বললেন, “দাঁড়াও দাঁড়াও দিদি, তিন গুণ মাতার! মানে! মাতার তিন গুণ কি কি? মাতা তো নির্গুণ বলেই জানতাম!”

দেবী চিন্তা বললেন, “স্বামীর থেকে জেনেছি, মাতা নির্গুণই, সেই ব্যাপারে কনো সন্দেহ নেই, কারণ মাতা হলেন শূন্য, আর শূন্যের কনো গুণ হয়না। কিন্তু মাতা যখন স্থূলে আবির্ভূতা হন, তখন তিনি তিন গুণধারণ করেন, আর তারা হলো বিচার, বিবেক ও বৈরাগ্য। এঁদের মধ্যে, বিচার ও বিবেকের সাথে মেধার সম্পর্ক ভগিনীর মত, কারণ বিচার ও বিবেক মেধার বুদ্ধির সামর্থ্য দ্বারাই পরিচালিত হয়। কিন্তু মেধা বৈরাগ্যের প্রতি গুণমুগ্ধ”।

দেবী কল্পনা মাথা নেড়ে বললেন, “এই কথা তোমরা আগে বলোনি কেন আমাকে! ভেবে দেখো, মেধা তিন বৃক্ষের কাছে নিজের সমস্ত জীবন অতিবাহিত করে। … ভেবে দেখো, আমাদের স্বামী কি শুনেছিলেন আড়াল থেকে, যা মাতা মানসকে বলছিলেন! তিনি তিন বীজ বপন করে রেখেছেন, সেই তিন বীজ থেকেই তিনি পুনরায় প্রকাশিত হবেন। … আর ভেবে দেখো, দেবী চন্দ্রপ্রভার কাহিনী। এই তিন বৃক্ষই তাঁকে চণ্ডালিনী থেকে চন্দ্রপ্রভা করে দিয়েছিল, আর মাতা এই তিনবৃক্ষেরই বীজ বপন করেছিলেন!”

দেবী চিন্তা উদগ্রীব হয়ে বললেন, “কি বলতে চাইছো কল্পনা! এই তিন বৃক্ষই তিন মাতার গুণ! আর তাই এঁদের প্রতি মেধার আকর্ষণ! … তারমানে তো এই তিন বৃক্ষই মেধা, শিখা আর বেগবতীকে লুকিয়ে রেখেছে! পুত্ররা, এই তিন বৃক্ষকে উৎপাটন করে দাও। যতক্ষণ তাঁরা বৃক্ষ, ততক্ষণ তারা তোমাদের উৎপাটনকে আটকাতে পারবেনা। তাই শীঘ্র যাও আর তাদেরকে উৎপাটিত করে দাও”।

তামস উদগ্রীব হয়ে বললেন, “এত কথা তো আমরা জানতাম না, তবে আমাদের ধারণা ছিল যে এই তিনবৃক্ষের প্রতিই মেধার আকর্ষণ, তাই নিশ্চয়ই এই তিন বৃক্ষেরই কনো স্থানে মেধা লুকিয়ে আছে। …কিন্তু মাতা, তন্যতন্য করে খুঁজেও, আমরা এই তিন বৃক্ষকে দেখতে পাইনি”।

দেবী চিন্তা এবার চিন্তিত হয়ে বললেন, “এর অর্থ আর তারা বীজ নেই। তাঁরা স্বরূপ ধারণ করার জন্য প্রস্তুত। … তাহলে কি করা যেতে পারে!”

দেবী কল্পনা বললেন, “একটি উপায় আছে। সমস্ত অষ্টপাশকে সঙ্গে নিয়ে যাও, আর নিজেরা তথা সকল অষ্টপাশ দ্বারা রাজপুরের দক্ষিণ দিকে, সমস্ত স্ত্রীদের নিয়ে এসে বলপূর্বক সঙ্গমে লিপ্ত করো তাদেরকে। ত্রিবৃক্ষ রাজপুরের দক্ষিণ দিকেই ছিল। ক্রমাগত এমন অত্যাচার দেখলে, না মাতার গুণরা আর না মেধারা চুপ করে বসে থাকতে পারবে। … আর একবার তারা প্রকাশিত হলে, অবশ্যই তোমাদের যেকোনো এক ভ্রাতাকে দিয়ে আমাদের কাছে বার্তা প্রদান করবে। এরপরটা আমরা দেখে নেব”।

যেমনটা দেবী কল্পনা বলে দিয়েছিলেন, তেমনই করলেন তিন অহমপুত্র। অষ্টপাশ একে একে, সমস্ত স্ত্রীদের রাজপুরের দক্ষিণ দিশায় নিয়ে যেতেন। সেখানে নিয়ে গিয়ে, বারংবার প্রশ্ন করা হতো, “মেধা কোথায় আছে বল”। … যখন সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারতেন না সেই স্ত্রী, তখন নিগ্রহ করে, তাঁকে একই প্রশ্ন করা হতো। অবশেষে, যখন তখনও স্ত্রীটি সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারতেন না, তখন তাঁকে সমস্ত অষ্টপাশ ও সুন্দরী স্ত্রী হলে ত্রিভ্রাতা মিলে ধর্ষণ করে করে, তাঁকে প্রশ্ন করতেন। সেই স্ত্রী বলতে বলতে হাঁপিয়ে উঠতেন যে তিনি জানেন না দেবী মেধা কোথায় আছেন, আর অবশেষে এই নিগ্রহ ও ধর্ষণের বেদনা সহ্য করতে না পেরে, দেহত্যাগ করতেন। আর দেহত্যাগ করা মাত্রই, সেই স্ত্রীদের ভূতকে নিষ্কাসন করতেন তামস ও তাদের নিয়ে নবতনুর নির্মাণ করতে থাকতেন।

এক এক করে, এমন ভাবে এক শত স্ত্রীকে নিগ্রহ ও ধর্ষণ দ্বারা মৃত্যু প্রদান করা হলে, মেধা, অস্থির হয়ে ওঠে। সে এবার তাঁর ভগিনীদের উদ্দেশ্যে বলে, “আর না দিদি, আর এঁদের স্ত্রীজাতির প্রতি নির্মমতা সহ্য করা যাচ্ছেনা। এবার আমি এঁদের সম্মুখে যাবো। যা হবার হবে, দেখা যাবে”।

দেবী শিখা মেধাকে আটকে রেখে বললেন, “মতিভ্রম হয়ে গেছে তোর! এই নিষ্ঠুর পুরুষদের নির্মম অত্যাচার দেখার পরেও … না না … না মেধা, কিছুতেই এঁদের সম্মুখে তুই একাকী যাবিনা। যদি যেতেই হয়, তবে আমরাও তোর সাথে যাবো। হ্যাঁ পরিণাম যাই হোক, আমাদের এবার যাওয়া উচিত, এমনটা আমারও মনে হয়, আমাদেরকে সামনে রেখে, একের পর এক স্ত্রীদের অসভ্যের মত নির্যাতন করে যাবে, আর আমরা চুপচাপ বসে থাকবো, এটা হতে পারেনা”।

বেগবতীও বললেন, “হ্যাঁ, আমরা একত্রেই যাবো। কি হবে আমাদের জানিনা, তবে এটুকু জানি যে, আমরা তিনজনে একত্রে গেলে, এই অষ্টপাশদের মৃত্যু দিতে না পারলেও, আর কনোদিন উঠে নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে পারবেনা, সে হাল তো করেই দেব”।

মেধাও উগ্র হয়ে বললেন, “আর আমি এই তিন অহমপুত্রের যৌনতাকে সমস্ত কালের জন্য এঁদের থেকে কেড়ে নেবো। এঁদের বড় দেমাক যে এই যৌনতার বলে ওরা সমস্ত স্ত্রীদের নিজেদের কাছে পরাভূত করে দিতে পারবে!”

এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে আগে এগতে গেলে, তিন কন্যা বৃক্ষ থেকে নিচে নামতেই পারলো না। যতবারই লম্ফ মারে, ততবারই দেখে যে, তাঁরা বৃক্ষের উপরেই অবস্থান করছে। এমন বহুবার ঘটার পর, শিখা উত্তেজিত হয়ে বললেন, “মেধা, আমরা তো বৃক্ষ থেকে নিচে যেতেই পারছিনা! … আমরা কি এক মায়া থেকে বাচতে এক নতুন মায়াতে ফেঁসে গেলাম!”

মেধা উত্তরে বললেন, “না দিদি, বৃক্ষ থেকে উত্তরণ করলেই, আমাদের সমূহ বিপদ, তাই আমাদেরকে আটকে রেখেছেন ইনারা”। … এবার বৃক্ষদের উদ্দেশ্যে হুংকার দিয়ে দেবী মেধা বললেন, “কিন্তু আমাদের যেতে হবে! আমাদের না পেয়ে, এই নরাধমরা সমস্ত স্ত্রীজাতিকে অবলা জ্ঞানে নিপীড়ন করছে! …

এঁদের এবার যে বোঝাতেই হবে, নারী অবলা, কিন্তু ততক্ষণই অবলা যতক্ষণ না তাঁর সন্তানের উপর ঘাত হচ্ছে। একবার তাঁর সন্তানের উপর ঘাত হলে, নারী আর অবলা থাকেনা, সে তখন শ্রেষ্ঠ সবলা হয়ে ওঠে। আর একবার নারী সবলা হয়ে উঠলে, সম্মুখে যদি স্বয়ং ভগবানও থাকে, সম্মুখে যদি স্বয়ং পরমাত্মও থাকে, তাহলে সেই অশরীরীকে শরীর প্রদান করে, তাঁর ছাতি চিড়ে, তাঁর জীবিত থাকা অবস্থায় তাঁর ছাতি থেকে হৃদযন্ত্রকে নির্গত করে নিয়ে আসার সামর্থ্য ধরে”।

মেধার এই কথাতে, শিখা ও বেগবতীও চমকে উঠলেন। সম্মুখে দেখা স্ত্রীদের নির্যাতনের কারণে, মেধার মধ্যে ঠিক কতখানি ক্ষিপ্রতা জন্ম নিয়েছে যে এমন ভয়ানক নিপীড়ন আত্মকে প্রদানের কথা ভাবতে পারলেন তিনি, সেই ভেবে আচম্বিত হলেন মেধার দুই ভগিনী। মেধার সন্তানপ্রেমভাব দেখেও আপ্লুত হলেন তাঁরা এবং নিজের ভগিনীর জন্য গর্বিত অনুভব করলেন।

তবে একা শিখা ও বেগবতী নয়, চমকিত হলেন আত্মপুত্ররাও। প্রথম তো মেধার সেই প্রকাণ্ড ধ্বনি তাঁদের কর্ণে প্রবেশ করলো, আর কারুকে দেখতে না পেয়ে, সেই ধ্বনিকে দৈববাণী মনে হতে থাকলো তাঁদের। উপরন্তু, এই কথার শেষে, সৌম্য রৌদ্র প্রজ্বলিত গগনে, এমন ভাবে গহন কালো বলাহক এসে উপস্থিত হলো, যেন সত্যই এই কথন দৈব্যবানী।

শিখা ও বেগবতী সেই দৃশ্য দেখতে পেলেন, কিন্তু মেধা নয়। সে এবার অস্থির হয়ে উঠেছে, উচ্চস্বরে বলে উঠলেন, “এই তিন অহমপুত্র একশত স্ত্রীর নির্যাতন করেছে, আমার ভগিনীদের মায়ার জালে আবদ্ধ করেছে, এঁদের দেহের ১০২টা অস্থিকে ভঙ্গ করে, এঁদের দেহকে বায়স, শকুন, শৃগালদের উদ্দেশ্যে ফেলে রেখে দেবো, ছাড়ো আমায়!”

সেই কথাতে পুনরায় মেগগর্জন করে উঠলে, এবার সেই বৃক্ষও মেধাকে অতিশয় আঁকরে ধরলেন, আর এই প্রথম তাঁর ধ্বনি শুনতে পেলেন শিখা ও বেগবতী। সেই বৃক্ষ বললেন, “না দেবী, বিশ্বাস করুন, এই জলধররা সম্মতি প্রদান করেছে, আপনি যা বলেছেন তাতে। অর্থাৎ সেই সমস্ত কিছু হবে, যা আপনি বলেছেন, তবে আপনি এঁদের সম্মুখীন হতে পারবেন না। আপনাকে সুরক্ষা প্রদান করা আমার কর্তব্য”।

মেধা একদিকে আপ্রাণ প্রয়াস করলেন নিজেকে মুক্ত করতে, কিন্তু একসময়ে, বৃক্ষের প্রবল বন্ধন আর সেই বন্ধনের মধ্যে থাকা অসম্ভব স্নেহভাব মেধাকে আপ্লুত করতে থাকলো। মেধার মধ্যে মিলনের ভাব জন্ম নিতে থাকলো আর তাই তাঁর অতিসুগন্ধি স্বেদবারি মুক্ত হতে থাকলো। ক্রমে সেই সুগন্ধ তথা অমৃতন্যায় স্বেদসুধা বৃক্ষও পান করতে থাকলেন, আর তাই ধীরে ধীরে মেধাকে বৃক্ষ নিজের মধ্যে আবিষ্ট করতে থাকলেন।

মেধাকে এমন ভাবে মিলনে আবদ্ধ হতে দেখে, শিখা ও বেগবতী একে অপরের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমাদের ভগিনী অত্যন্ত পবিত্র। তাই সঙ্গমে নয়, সে মিলনে আবদ্ধ হলো। বিশ্বাস, শ্রদ্ধা, সমস্ত কিছু একত্রিত করে, নিজেকে সে অর্পণ করে দিচ্ছে মেধার নাম দেওয়া বৈরাগ্যের প্রতি”। … তবে এমন বলেই ক্ষান্ত থাকলেন না দেবী শিখা ও দেবী বেগবতী। মেধার মিলন আবেশকে তাঁরা প্রত্যক্ষ করছিলেন। আর সঙ্গে সঙ্গে মেধার উৎকৃষ্টতর স্বেদসুধার সুগন্ধ লাভ করছিলেন।

সেই স্বেদ সুধার গন্ধে, যেমন শিখা ও বেগবতী মোহিত হতে থাকলেন, তেমনই তাঁরা যেই যেই বৃক্ষে ছিলেন, যাদেরকে মেধা বিচার ও বিবেক নামে ডাকতেন, তাঁরাও। আর তাই ক্রমে, শিখা ও বিচার, অন্যদিকে বেগবতী ও বিবেক আবিষ্ট হতে থাকলেন মিলনের বন্ধনে।

মিলনের উন্মত্ততার জেরে, শিখার প্রভাবে সম্পূর্ণ বিচার বৃক্ষ অগ্নিস্নান করা শুরু করে দিলেন, তো সম্পূর্ণ বিবেক বৃক্ষের সমস্ত পত্র তাঁর থেকে স্খলিত হতে হতে, আর তা তাঁকে নগ্ন করতে লাগলো। আর অন্যদিকে মেধার সুধার প্রভাবে, বৈরাগ্য জলধারায় স্নান করে করে, উন্নত ও সতেজ হতে থাকলো। ক্রমে বিচার ও বিবেক নগ্ন হতে হতে, এবং বৈরাগ্য সতেজ হতে হতে, এমনই ভাবে স্পষ্ট হয়ে উঠলেন যে, এবার আর তাঁরা লুক্কায়িত থাকতে পারলেন না, প্রত্যক্ষ হয়ে উঠলেন তাঁরা।

ত্রিবৃক্ষকে প্রত্যক্ষ অবস্থায় দেখে, এবং তাতে দেবী মেধা, শিখা ও বেগবতীকে নিরীক্ষণ করে, অষ্টপাশ চিৎকার করে উঠলেন, “ওই তো মেধা!”

তিন আত্মপুত্র স্বেদময় পরমা সুন্দরী তিন মানসকন্যাকে দেখে, কামভাবে অতিশয় আক্রান্ত হয়ে, এবার ধেয়ে গেলেন তাঁদের উদ্দেশ্যে। তাঁদের মধ্যে একটিই ভাব, যেই ভাবে ১০০ স্ত্রীকে সম্ভোগ করেছেন তাঁরা, একই ভাবে এবার মেধাকেও সম্ভোগ করবেন।

সেই ভাব নিয়েই, বৈরাগ্যবৃক্ষের কাছে উপস্থিত হলে, এক প্রবল বায়ুর বেগ, যেন বায়ু নয় বিশাল এক দৈত্যের পদাঘাতের ন্যায় সকলের বক্ষস্থলে লাগলো, আর সকলে বেশ কিছুটা দূরে ছিটকে পরলেন। এঁদের কিছুজন বাম দিকে ছিটকে পরলেন, বিচার বৃক্ষের তলে, আর বাকিরা বিবেক বৃক্ষের তলে।

উঠে দাঁড়িয়ে পুনরায় ক্ষিপ্ত ভাবে আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হলে, এবার শিখার মিলনাগ্নিতে দগ্ধ বিশাল বিচারবৃক্ষ পরে গেলেন তাঁর নিম্নে দাঁড়িয়ে থাকা সকলের ঘাড়ে। প্রভাত সহ ৫ পাশ অত্যন্ত গভীর ভাবে জখম লাভ করলে, তা দেখে তামস, রজনী ও বাকি তিন পাশ ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলে, এবার এক প্রবল বজ্রপাত হলো, আর তা এমন ভাবে বৈরাগ্য ও বিবেক বৃক্ষকে আঘাত করলো যে, কাণ্ডের সামান্য উপর থেকে সমস্ত বৃক্ষ হুমড়ি খেয়ে সকলের ঘাড়ে পরে গেল। কেবল গুরুতর ভাবে আহতই হলো না সকলে, প্রায় সকলেই মূর্ছা গেলেন, আর যদি কেউ মূর্ছা না গিয়ে থাকেন, সে জখমের বেদনায় সম্পূর্ণ ভাবে ঘায়েল। তাই এরপরে কি হলো সেখানে, তা তাঁরা দেখে উঠতে পারলো না।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22