সর্বাম্বা কাণ্ড (কৃতান্ত প্রথম কাণ্ড)

এত বলে, মেধা চলে গেলেন রাজপুরে, সরাসরি মানসের কক্ষে। দীর্ঘকাল পরে, রাজপুরে মেধাকে দেখে সকলেই চমকিত হলেন, আর মানস ধরাও তাঁদেরকে দেখে আচম্বিত হয়ে গেলেন। মেধা কনোদিকে দৃষ্টি না দিয়ে, মানসের সম্মুখে তাঁর চোখে চোখ রেখে বললেন, “পিতা, আপনার বিশ্বাসের ওষধি নিয়ে এসেছি আমি। যদি কৃপা করেন, তবে সেই ওষধি প্রদান করতে পারি, আপনাকে, আপনার প্রিয়জনদেরকে, তথা আপনার প্রিয় প্রজাসমূহকে”।

মানস ভ্রুকুঞ্চিত করে বললেন, “এতকাল পরে, তোমাকে রাজপুরে দেখে আমি বুঝতে পারছিনা যে আমার আপ্লুত হওয়া উচিত না ব্যথিত। … কিন্তু ওষধি! তাও আবার বিশ্বাসের ওষধি! কি বলতে চাইছো তুমি মেধা!”

মেধা উত্তরে হেসে বললেন, “তেমন কিছুই নয় মহারাজ মানস। আপনি, আপনার পরিবার তথা আপনার প্রজারা একজন মহীয়সীকে সাখ্যাত পরমেশ্বরী আখ্যা প্রদান করেছেন। হ্যাঁ, দেবী মোহিনী। তবে, এই ব্যাপারে, আমি ও আমার ভগিনীগন সহমত হতে পারছিনা। ত্রুটি আমাদেরই হবে, কারণ বিশ্বাসের অভাব আমাদেরই মধ্যে।

কিন্তু পিতা, আমি একটি ব্যাপার নিয়ে আমার ভগিনীদের সাথে আলোচনা করেছি। বিষয় এই যে, এই যে আমরা মোহিনীকে পরমেশ্বরী মানতে পারছিনা, কেন পারছিনা! … আমরা বিচার করে দেখেছি যে, আমরা স্বয়ং তো পরমেশ্বরী মানছি না নিজেদেরকে। তারপরেও, আমরা মোহিনীকে আমাদের সমতুল্য মানতে পারছিনা।

যদি তাকে আমাদের সমতুল্যই মানতে না পারি, তাহলে আমাদের থেকে শ্রেয় কিভাবে মানবো তাঁকে! … পিতা, আমাদেরকে এমন কিছু করতে হবে, যার থেকে এটি আমাদের কাছে প্রমাণিত হয়ে যায় যে, মোহিনী আমাদের থেকে অনেক অনেক গুনে শ্রেষ্ঠ। তাই আমি কিছু পরীক্ষণ রেখেছি, তাঁর ও আমাদের জন্য।

আপনার, আপনার পরিবার, তথা আপনার সমস্ত প্রিয় প্রজার সম্মুখে, আমি মোহিনীর সাথে দন্ধে নিযুক্ত হতে চাই। যদি সে স্বয়ং পরমেশ্বরী হয়, তবে তাঁর কাছে আমার বল তুচ্ছও নয়, অতি তুচ্ছ। তাই অতি সহজেই আমি পরাস্ত হবো তাঁর কাছে। আর তার ফলে তিনি আমাদের অবিশ্বাসের নাশ করে, নিজেকে পরমেশ্বরী রূপে স্থাপিত করে দেবেন। আশা করি, তার পরে আর আমার ভগিনীদের অসুবিধা হবেনা, তাঁকে জগন্মাতার রূপে গ্রহণ করতে। …

অর্থাৎ পিতা, আমি এই চাইছি যে, আমাদের এই অন্তরদ্বন্ধের নিষ্পত্তি হোক, আর আমরা দেবী মোহিনীর গুণগ্রাহী হয়ে উঠি। সর্বত্র তাঁর গ্রহণযোগ্যতা হয়ে কি লাভ, যদি তাঁর নিজের জননী ও জননীর ভগিনীরাই তাঁকে গ্রহণ না করে! … তাই তাঁর প্রসারকে সর্বজনীন করে তোলার জন্য আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস”।

বহুকাল পরে মেধা রাজপুরে এসে সরাসরি মানসের কক্ষে গিয়ে, তাঁর সাথে বাক্যালাপে নিযুক্ত হয়েছেন জেনেই, মোহিনী বুঝে গেছিলেন যে মেধা নিশ্চিত ভাবে কনো কূটনীতি সঙ্গে নিয়ে উপস্থিত হয়েছে। তাই সেও সরাসরি মানসের কক্ষের সমক্ষে চলে আসে। আর তাই, মানসের কক্ষের দ্বারের সম্মুখে দাঁড়িয়ে মেধার সমস্ত কথা সে শুনতে পায়।

আর তা শুনে, মানস কিছু বলতে পারার পূর্বে, মোহিনীই বলে ওঠেন, “সঠিক কথা, কিন্তু প্রতিটি দ্বৈরথে কিছু না কিছু শর্ত থাকা উচিত, নাহলে যে সেই দ্বৈরথ অসম্পূর্ণ হয়ে থাকে। তা আমাদের এই দ্বৈরথের শর্ত কি হবে!”

মেধা মৃদু হেসে বললেন, “দেবী মোহিনী, আমি পরাজিত হবো, এই আমার কামনা, আর আমার বিশ্বাসও। তাই আমি আমার বিজয়ের কনো শর্তই রাখিনি নিজের কাছে। তবে হ্যাঁ, শর্ত না রেখেও, একটি শর্ত থেকেই যায়, আর তা হলো, আমার বিজয় প্রমাণিত করবে যে, আমার পিতার ও পিতার প্রিয়জনদের বিশ্বাস মিথ্যা প্রমাণিত হবে। … তবে তা হবেনা, এই আমার বিশ্বাস। তাই আমি আমার পরাজয়ের শর্ত সম্মুখে রাখতে চাই। তবে এখানে, এই বদ্ধ কক্ষে নয়।

পিতার সমস্ত প্রিয়জন ও প্রিয়প্রজারা একত্রিত হবে, একটি স্থানে। আপনার প্রিয়জনদেরও আপনি রাখতে পারেন সেই স্থানে। সেখানেই আমাদের দ্বৈরথ হবে, আর সেই দ্বৈরথের শুরুতে আমি আমার পরাজয়ের সর্ত সম্মুখে রাখবো। … এবার আপনি আপনার কথা বলুন”।

মোহিনী হেসে বললেন, “আমি জগন্মাতা হয়ে শর্ত কি করে রাখতে পারি! … সন্তানের শর্ত আমার কাছে করা আবদার, আমি সেই আবদার পুড়ন করার জন্যই দ্বৈরথে যুক্ত হবো, আর তার দেওয়া শর্তই হবে আমার কাছে তাঁর প্রস্তাব রাখা আবদার। আমি তা অবশ্যই পুড়ন করবো। … তবে, তুমি তোমার জয়ের জন্য কনো শর্তই রাখবেনা!”

মেধা হেসে বললেন, “বিচার করে দেখুন দেবী, আমার পরাজয়ের অর্থ কি? আমার পরাজয়ের অর্থ, আপনি জগন্মাতা রূপে প্রমাণিত। তাই তো আপনার কাছে শর্ত স্থাপন বা বলতে পারেন, জগন্মাতার কাছে আবদার রাখা। আর যদি আমি বিজয়ী হই, তাহলে তো আপনি যে জগজ্জননী নন, তা প্রমাণিত। মেধা জগজ্জননীর কাছে আবদার রাখতে পারে, অন্য কনো কারুর কাছে নয়”।

মোহিনী অন্তরে অন্তরে ক্রুদ্ধ হলেও, বাহ্যে হাস্য প্রদান করে বললেন, “বেশ, তাই হোক। আজ তো সকলের সম্মুখে সকল কিছু প্রমাণ হয়েই যাক। … মদিনা, সকল স্থানে বার্তা প্রদান করো, মেধার প্রিয় ত্রিবৃক্ষতলের সম্মুখে, আজ দ্বিপ্রহর থেকে আমার ও মেধার মধ্যে দ্বৈরথ স্থাপিত হবে”।

মদিনা সকলকে নিয়ে সেই বার্তা সমস্ত রাজ্যে প্রচার করা শুরু করে দিলে, মোহিনী মেধার নিকটে এসে বললেন, “একটি প্রশ্ন জাগছে আমার, নিশ্চিত পরাজয় জেনেও, নিজের পরিহাস করানোর জন্য, এই অদ্ভুত যোজনা কেন?”

মেধাও হাস্যমুখে উত্তর দিলেন, “তোমার জগজ্জননী হওয়া নিয়ে দ্বন্ধ যদি শুধু আমার একার হতো, যা বরাবর ছিল, তাহলে আমি এই অঙ্গনে উপস্থিত হতামই না। … কিন্তু দেবী, এই দ্বন্ধ যে স্বয়ং তোমার জন্মদাত্রী জননীর। … জননীর আশীর্বাদ বিনা যে, জগজ্জননীও নিজের কর্মকে স্থাপন করতে ব্যর্থ। … ধরে নিতে পারো যে, তোমার জননীর দ্বন্ধকে দূর করার জন্যই আমার এই নিজের প্রহসনের ব্যবস্থা”।

মোহিনী বুঝলেন, মেধার অন্তরের শ্লাঘাকে বাইরে প্রকাশ্যে আনা, কঠিন নয়, প্রায় অসম্ভব। অর্থাৎ, তাঁর অন্তরের কথা অন্তরেই রয়েছে, তাঁর যোজনাকে জেনে ওঠা, সময়ের পূর্বে সম্ভবই নয়। তাই বক্র ওষ্ঠে হেসে বললেন, “প্রস্তুত হও মেধা। … কঠিন বেদনালাভের জন্য প্রস্তুত হও। রণাঙ্গনে আমি একবার উত্তীর্ণ হলে, তখন আমি সমস্ত স্নেহপ্রীতির থেকে মুক্ত থাকি। তাই এমন ভুলেও ভেবো না যে জগজ্জননীর করুণা তোমার উপর সেই কালে বর্ষিত হবে”।

মেধাও বক্র ওষ্ঠে হেসে বললেন, “যথা আজ্ঞা, সম্ভাব্য জগজ্জননী”।

এই সমস্ত ঘটনাতে, একাকজনের একাকপ্রকার, অর্থাৎ মিশ্র প্রতিক্রিয়া আসলেও, দেবী ধরার মধ্যে একটি আনন্দের স্রোত খেলে গেল। মেধা তাঁর পিতার অত্যন্ত প্রিয় পুত্রী, কিন্তু মোহিনীর উত্থানের সাথে সাথে, পিতাপুত্রীর মধ্যে এক ভয়ানক বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছিল। হয়তো এই দ্বৈরথ সেই সমস্ত বৈষম্যের নাশ করে দেবে।

কিন্তু মানস তাঁর কন্যাকে চেনেন। মেধা এমনিতে অত্যন্ত সরল। কিন্তু যখন যোজনার অঙ্গনে উত্তীর্ণ হয় সে, তখন শ্রেষ্ঠ জটিল সে। তাই মানস নিশ্চিত যে, মেধার মধ্যে অন্য কনো বিচার চলছে। মেধাও জানেন, তাঁর পিতা তাঁকে নিয়ে ঠিক কি ভাবেন। তাই রণাঙ্গনে যাত্রার পূর্বে, পিতার কাছে এসে, তাঁর কানে কানে বলে গেলেন, “আপনারা আজ রাত্রেই বন্দী হতে পারেন। জগন্মাতার প্রতি একনিষ্ঠতাই আপনাদেরকে কারাগৃহ থেকে মুক্ত করবে”।

এই একটি বচন, মানসের মেধার যোজনা সম্বন্ধে যেই অস্ফুট ধারণা ছিল, তাকে বিশ্বাসে পরিণত করে দিলে, সেই নিয়ে ভাবতে ভাবতেই দ্বিপ্রহর উপস্থিত হয়। দ্বিপ্রহরে সকল প্রজা ত্রিবৃক্ষতলে উপস্থিত হলে, সকলে দেখলেন, মেধা ও মোহিনী, যারা এই সম্পূর্ণ রাজ্যের শ্রেষ্ঠ দুই রূপসী, তাঁরা দ্বৈরথের জন্য উপস্থিত হয়েছেন।

মোহিনীর দেহসৌন্দর্য বহু পুরুষ দেখেছেন, প্রায় সমস্ত অষ্টপাশই দেখেছেন। তাঁর ভগিনীরাও দেখেছেন। তাই তাঁকে স্বল্প বস্ত্রে, অর্থাৎ স্তনযুগল ও নিম্নাঙ্গের উরু পর্যন্ত আচ্ছাদিত, কটিদেশ উন্মুক্ত, পৃষ্ঠদেশ উন্মুক্ত, ও উরুনিম্ন পাদুকাস্থল উন্মুক্ত অবস্থায় দেখে, প্রজাদের মধ্যে তেমন কনো ভাবাবেগ উপস্থিত না হলেও, অষ্টপাশ, যারা প্রায়শই মোহিনীর শয্যাসঙ্গী হতেন, তাঁদের মধ্যে কামনার উদয় হলো।

কিন্তু অন্যদিকে, মেধাকে মোহিনীর বেশে আজ পর্যন্ত কেউ দেখেনি, স্বয়ং মানসও নন। তাই তাঁর হরিদ্রাবর্ণের দেহশোভাতে অনেকেই কামাসক্ত হলেন। নির্মল গগনতলে, উন্মুক্ত সবুজ ঘাসের উপর মেধার হরিদ্রাবর্ণের মনোলোভা অবস্থান মানসপ্রিয়দের কাছে উৎফুল্লতার কারণ স্থাপিত করে। তাঁদের কাছে মেধা রমণীয় নয়, যেন তাঁদের আদরের প্রিয়পুষ্প বিরাজ করছে, এমনই প্রত্যক্ষ হয়।

দেবী ধরার মধ্যে প্রাণের নূতন হিল্লোল বইছিল, তাঁর কন্যা মেধাকে পুনর্বার নিকটে লাভ করার, কিন্তু তা ততক্ষণই যতক্ষণ না, মেধা নিজের সর্ত স্থাপন করলেন। মেধা নিজের সর্ত স্থাপন করতেই, সকল মানসপ্রিয় তথা মানসের মধ্যেও এক অজানা অশনিসংকেত উঁকিঝুঁকি মারা শুরু করে দেয়।

সকলকে শঙ্কিত করে মেধা বললেন, “আমার পিতা, আপনাদের রাজা মানসের ও তাঁর পত্নী তথা আমার জননীর দৃঢ় ধারণা যে, দেবী মোহিনী হলেন সাখ্যাত জগজ্জননী। তবে, এই বিষয়ে, আমি স্বয়ং সদাই অনিশ্চিত ছিলাম। তবে আমি নিশ্চিত থাকি বা অনিশ্চিত, তাতে জগন্মাতার কিই বা এসে যায়। কিন্তু একজনের দ্বন্ধে তাঁর সত্যই এসে যায়।

স্বয়ং জননী যদি জগজ্জননীর সঙ্গ না দেন, তখন জগজ্জননীর পক্ষেও তাঁর কর্ম সম্পাদিত করা সম্ভব হয়ে ওঠেনা। আর তাই দেবী শিখা, যিনি মোহিনীর জননী, তাঁর দ্বন্ধই আজ আমাকে এই রণাঙ্গনে স্থাপিত করেছে। আজ আমার ভগিনীর অর্থাৎ দেবী মোহিনীর জননীর দ্বন্ধনাশ হবে, কারণ হয় আজ মোহিনী জগন্মাতা রূপে অভিষিক্ত হবেন, নয় সকলে জেনে যাবেন যে তিনি জগন্মাতা নন, জগন্মাতার বেশ ধারণ করে সকলের সাথে ছলনা করছেন, যেমনটা তাঁর জননীর ধারণা।

কি ভাবে তা প্রমাণিত হবে? দ্বৈরথে। জগন্মাতার সাথে দ্বৈরথে কারুর পক্ষেই জয়লাভ করা সম্ভব নয়, আমি তো নিতান্ত এক তুচ্ছ অণু। তাই যদি আমার কাছে তিনি দ্বৈরথে পরাস্ত হন, তবে এটি প্রমাণিত হয়ে যাবে যে, নিজেকে জগন্মাতা বলে যেই দাবি করে এসেছেন দেবী মোহিনী, তা তাঁর জননীর কথন অনুসারেই এক ছলনা মাত্র।

তবে, যদি এটি প্রমাণিত হয় যে, দেবী মোহিনীই জগন্মাতা অর্থাৎ এই দ্বৈরথে আমি পরাজিত হই, তাহলেই দেবী শিখা, অর্থাৎ মোহিনীর মাতার দ্বন্ধের অবসান হবে। তবে এই সুত্রে আমার একটি শর্ত আছে। শর্ত আপনাদের সকলের কাছে, আর শর্ত স্বয়ং দেবী মোহিনী ও তাঁকে আদর্শ মেনে চলা সকলের কাছে।

যদি মোহিনী জগন্মাতা রূপে প্রমাণিত হন, তবে আমার এই দ্বৈরথে নিযুক্ত হওয়া আমার তরফ থেকে প্রদর্শন করা ঔদ্ধত্য ব্যতীত কিছুই নয়। তাই আমার শর্ত এই যে, আমি পরাজিত হলে, আমার এই ঔদ্ধত্য যেন ক্ষমা করা না হয়, এবং এই রণাঙ্গনেই আমাকে স্বয়ং দেবী মোহিনী হত্যা করে, তাঁর দিব্যরাজ্যকে বিরোধীমুক্ত করেন”।

দেবী মেধার কথাতে মানসপ্রিয় সকলে অত্যন্ত আচম্বিত হলেন। মেধা তাঁদের একান্ত প্রিয়, তাঁদের সকলের নিজের কন্যা সমই। নিজের সন্তানের নিধন তাঁরা নিজের চোখে দেখবেন! … এই কথা ভেবে সকলের অন্তর একটিবারের জন্য হলেও কম্পমান হয়ে উঠলো। অন্যদিকে, এই কথাতে মানসের নেত্র অশ্রুবারিতে পরিপূর্ণ হলো, আর দেবী ধরা, এই কথনে সন্তানহারা হবার শোকে বারংবার মূর্ছা যেতে থাকলেন।

বেগবতী শিখার দিকে তাকিয়ে বললেন, “দিদি, মেধা এ কি বলছে! … আমরা আমাদের ভগিনীকে হারাতে পারিনা!”

শিখা মৃদু হেসে বললেন, “রণকৌশলে হস্তক্ষেপ করো না বেগ। মেধাকে মেধার কাজ করতে দাও। সে জানে, সে কি করছে, কেন করছে। তাই তাঁর উপর দ্বন্ধ রেখো না”।

অন্যদিকে মেধার এই কথনে মোহিনীর পক্ষের সকলে অত্যন্ত আনন্দিত হলেন। সমস্ত ছায়াপুরে, তাঁদের যেই জয়ঘোষ হয়ে চলেছে, এই জয়ঘোষে একমাত্র বাঁধা হলেন মেধা। আর আজ মেধার মৃত্যু হতে চলেছে। তাই সকলে উৎফুল্ল হয়ে উঠলেন।

মোহিনী কনো প্রকার শব্দ মুখ দ্বারা উচ্চারিতই করলো না। এতকাল ধরে, যাকে অন্তর থেকে পরম শত্রু মেনে এসেছে, আজ সেই শত্রু তাঁর সম্মুখে সশরীরে উপস্থিত। তাই বাক্যব্যয়ের মাধ্যমে উর্জ্জা নষ্ট না করে, সরাসরি মেধার পৃষ্ঠে মুষ্ট্যাঘাত করলেন।

মেধা সম্মুখে হুমড়ি খেয়ে পরে গেলে, মোহিনী নিজের সম্পূর্ণ দেহবলকে এবার মুষ্টির মধ্যে আবদ্ধ করে, ভূপতিত মেধার মস্তকে আঘাত করার প্রয়াসে মুষ্টিজোরে লম্ফ দিলেন। মেধা নিজের দেহকে বাম দিকে গড়িয়ে নিয়ে গিয়ে, সেই আঘাত থেকে বাঁচালেন। কিন্তু সেও এক মহাযোদ্ধা, তা সম্বন্ধে কারুর কনো ধারণা ছিলনা।

মোহিনী লম্ফ দিলে, মেধা সেখান থেকে অপসারিত হলে, মোহিনী ভূপতিত হন। মেধা সেই সময়ের মধ্যে নিজের দেহেকে উত্তলিত করে নিয়ে, পূর্ণবল সঞ্চয় করে, মোহিনীর উদরস্থানে সজোরে পদাঘাত প্রহার করলেন। সকলে দেখলেন, মোহিনীর দেহটি বেশ কিছুক্ষণ আকাশে ভেসে থেকে তিন হাত দূরে গিয়ে ছিটকে পরলো।

মেধার বল দেখে, মদিনা সহ তাঁর সমস্ত ভগিনীরা ও অষ্টপাশও আচম্বিত হলেন। আর অন্যদিকে আত্ম তথা তাঁর স্ত্রী ও পুত্ররা, মেধার এই বল দেখে, এবং নিজেদের উত্থানের চাবিকাঠি, মোহিনীকে এমন ভাবে প্রহৃত হতে দেখে, দন্তপাটিযুগলকে কঠিন করে নিলেন।

মোহিনী এবার সম্পূর্ণ দ্বেষ সহকারে উত্থাপিত হয়ে, উড়ন্ত সেনের মত করে, দুই হস্ত প্রসারিত করে মেধার দিকে অগ্রসর হলে, মেধাও নিজের দুই বাহু প্রসারিত করে, মোহিনীর দুই বাহুকে নিজের করজোড়ে ধারণ করলেন, তবে মল্ল নয়, অদ্ভুত কায়দায়, মোহিনীর দেহকে তিনি নিজের দিকে আকর্ষণ করে নিয়ে, মোহিনী যেই ভাবে দেহের বল প্রয়োগ করতেন, তাকে বিনষ্ট করে, মেধা মোহিনীর জানুতে পদাঘাত করলেন।

মোহিনী নতজানু হতে বাধ্য হলে, মেধা মুহূর্তের মধ্যে সজোরে মোহিনীর থুতনিতে নিজের জানুদ্বারা আঘাত করলেন, এবং থুতনি একপ্রকার ভেঙে দিয়ে মোহিনীর মুখকে রক্তাক্ত করে দিলেন।

মোহিনী এই প্রহারে থতমত খেয়ে গেলে, মেধা তাঁর দ্বিতীয়বার প্রস্তুতি নেবার পূর্বেই, সজোরে দক্ষিণ করতল দ্বারা মোহিনীর কপোলে আঘাত করলে, সকলে যেন দেখলেন, মোহিনীর মুণ্ড সম্পূর্ণ একপাক ঘুরে গেল।

সকলে দেখলেন, মেধার দাপটের সামনে যেন মোহিনী নিতান্ত এক শিশু। এক দামাল শিশু যেই ভাবে তাঁর মাতার উপর বলপ্রয়োগ করলে, মাতা তাঁর সমস্ত আঘাতকে কেবলই প্রতিহত করতে থাকেন, এর পরবর্তী বেশ কিছু মুহূর্ত এমনই হতে থাকলো। মোহিনী হস্ত পাদুকা দ্বারা মেধাকে আঘাত করার প্রয়াস করলেন, আর মেধা তাকে ক্রীড়ার ছলে যেন আটকালেন। যেন মেধা নিজের শক্তিস্তরকে এই ফাঁকে পুনরোদ্ধার করে নিলেন, পরবর্তী প্রহারের জন্য।

যারা এমন ভাবছিলেন, তারা আনন্দে করতালি দিয়ে উঠলেন, কারণ মেধা এরপরে পরেই এক মোক্ষম আঘাত করলেন মোহিনীর উদ্দেশ্যে। বিকট সেই প্রহার ছিল একটি মুষ্ট্যাঘাত। তবে তা না তো মুখমণ্ডলে আর না উদরে, সরাসরি হৃদয়দেশে সেই প্রচণ্ড মুষ্ট্যাঘাত মোহিনীকে রক্তবমনের জন্য বাধ্য করে, আর তাঁকে মূর্ছিত করে দেয়।

কিন্তু তা হতেই, দ্বৈরথ আর দ্বৈরথ থাকেনা, কারণ মদিনা, লিপ্সা, ঈর্ষা সকলে একত্রে ঝাঁপিয়ে পড়তে সচেষ্ট হয়ে মেধার উপর। সেই দেখে, ভগিনীর সহায়তার জন্য বেগবতী ও শিখাও নিযুক্ত হয় সেই রণে, এবং প্রবল মুষ্ট্যাঘাত করতে শুরু করে সকলকে।

সেই দেখে, অষ্টপাশ এবার নিজেদের যুক্ত করলেন এই যুদ্ধে, কিন্তু মেধার প্রহারসামর্থ্য প্রচণ্ড। উড়ন্ত সেনের ন্যায় প্রবল বেগে, তিনি অষ্টপাশদের একাকীই ধরাশায়ী করলেন, পদাঘাত দ্বারা।

শিখা ও বেগবতী নিজের সন্তানদের আঘাত তো করলেন না, কিন্তু বামাল শিশুকে তাঁদের মাতা যেমন করে আটকে রাখেন, তেমন করেই মদিনা, লিপ্সা, ঈর্ষা, রাজ্ঞী ও কামিনীকে আটকে রাখলেন। কিন্তু সেই বন্ধনও ছিল প্রবল। বহু প্রয়াস করেও, তাঁরা কিছুতেই তাঁদের জননীদের বন্ধন থেকে মুক্ত হতে পারছিলেন না।

কখনো কখনো একাকজন যখন বন্ধন মুক্ত হয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন মেধার দিকে, মেধার প্রবল আঘাত, তাঁদেরকেও মূর্ছা প্রদান করছিল। … এঁদের মধ্যে প্রধান হলেন কামিনী ও মদিনা।

মদিনাকে বেগবতী আটকে রেখেছিলেন। কনো ক্রমে নিজেকে ছাড়িয়ে যখন মেধার কাছে সে উগ্রতার সাথে উপস্থিত হয়, মেধা তার দ্বিগুণ উগ্রতা সহ, তাঁর পদতলে বসে পরে, তাঁর চরণ দুটিকে আকর্ষণ করে ভূপতিত করে, সেই চরণদুইকে দুই হস্তে ধারণ করে, শূন্যে ঘূর্ণন করিয়ে, মস্তককে ত্রিবৃক্ষের তৃতীয় বৃক্ষে এমনই বলের সাথে আঘাত করালেন যে, মদিনার মুখমণ্ডল রক্তাক্ত হয়ে গিয়ে, সে মূর্ছা যায়।

সেই দেখে কামিনী অত্যন্ত বিচলিত হয়ে গিয়ে পলায়নের প্রয়াস করলে, মেধা যে আর সামান্য স্ত্রী নেই, সে যে ভয়ানক যোদ্ধা হয়ে উঠেছে। লম্ফ দিয়ে কামিনীর কটিদেশে পদাঘাত করে, তাকে ভূশায়িত করে, পুনরায় উঠে লম্ফ দিয়ে, কামিনীর কটিদেশের উপর পদাঘাত করে, তাঁর দুই স্কন্ধকে আকর্ষণ করে পিছন দিকে উন্নীত করলে, কামিনীর কটিদেশের অস্থির যুগ্মতাকে সম্পূর্ণ ভাবে বিপর্যস্ত করে দেয়।

এমন দৃশ্য দেখে রাজ্ঞী ক্রোধিত হয়ে, মেধাকে আক্রমণ করতে গেলে, তাঁর আক্রমণের উদ্দেশ্যে উন্নত বাহুকে ধারণ করে, তাঁরই দেহের পশ্চাতের তাঁকে মুদ্রিত করে, স্কন্ধ থেকে হস্তের অস্থিজোরকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়, আর রাজ্ঞী প্রবল বেদনার সাথে ভূমিতে শায়িত হয়ে ছটফট করতে থাকে।

এই সমস্ত কিছুর মধ্যেই, অষ্টপাশরা বারবার আক্রমণের প্রয়াস করলে, মেধা তাদের কারুকে সামান্য একটি পদাঘাতে দূরে ঠেলে দেয়, আবার কারুকে একটি মুষ্ট্যাঘাতে। কিন্তু এই সমস্ত কিছুর মধ্যেই, দেবী মোহিনীর মূর্ছা ত্যাগ হয়।

চারিপাশে তাকিয়ে দেখেন, তাঁর ভগিনীরা ও তাঁর শয্যাসঙ্গীরা আহত হয়ে ভূমিতে কাতরাচ্ছেন। সেই দেখে, অতিশয় ক্রুদ্ধ হয়ে, অদূরে পরে থাকা একটি বেশ বড় আকৃতির প্রস্তরকে ধারণ করে, পিছন থেকে মেধার মস্তকে আঘাত করে, তাঁকে মৃত্যু দিতে উদ্যত হলে, দেবী ধরা আর্তনাদ করে উঠলেন, “মেধা পিছনে!”

মেধা অত্যন্ত ক্ষিপ্রগতি সম্পন্ন। মাতার কথা শ্রবণ করার মুহূর্তেই, সে নিজের তনুকে দ্রুততার সাথে তিনকদম পিছনে নিয়ে চলে গেলেন। মোহিনী যেই স্থানে প্রস্তরের আঘাত করতেন, সেই স্থানের থেকে মেধা পিছনে চলে যেতে, মেধার দেহের সাথে মোহিনীর দেহ আঘাত পেল, আর তাঁর শূন্যে তুলে রাখা দুই বাহু চলে গেল মেধার সম্মুখে, আর তাতে ধারণ করা প্রস্তর পরে গেল মেধার সম্মুখের ভূতলে।

মোহিনীর রক্তাক্ত মুখশ্রী তখন মেধার স্কন্ধে পতিত, কয়েক মুহূর্তও নয়, কিছু লহমার ব্যাপার। মেধা অতিক্ষিপ্রতার সাথে, সেই মস্তকের কেশকে আকর্ষণ করলেন, নিজের দেহকে মোহিনীর দেহের পশ্চাতে নিয়ে গেলেন, মুহূর্তের মধ্যে নিজের তনুকে নিম্নে স্থাপিত করলেন, এবং মোহিনীর চরণ ধরে নিজের দিকে আকর্ষণ করলে, মোহিনীর সম্পূর্ণ দেহ সম্মুখে হুমড়ি খেয়ে পরে গেল।

মেধা এতেই থামলেন না, নিজের চরণতলকে মোহিনীর মস্তকের উপর রাখলেন, এবং দক্ষিণ হস্তে মোহিনীর চরণ ধরে, সমানে নিজের দিকে আকর্ষণ করতে থাকলেন। মোহিনী বেদনায় চিৎকার করতে শুরু করলেন, কিন্তু মেধা রণমূর্তিতে অবস্থিত, শত্রুর চিৎকার তখন তাঁকে উৎসাহ প্রদান করছিল। তাই সেই চিৎকারকে উল্লঙ্ঘন করে, মস্তকের থেকে চরণকে সরিয়ে, মোহিনীর চরণকে নিজের করমুষ্টিতে ধারণ করে, মোহিনীর মস্তিষ্ককে ভূমির উপরে, এবং চরণকে শূন্যে স্থাপিত করে রাখলেন।

তারপর, মোহিনীর বক্ষস্থলে একাধিক ঘাতক পদাঘাতে, মোহিনীকে একাধিকবার রক্তবমন করতে বাধ্য করালেন, এবং অবশেষে মোহিনী সম্পূর্ণ ভাবে মূর্ছা চলে গেলেন।

প্রজা উল্লসিত, মেধা হয়েছেন বিজেতা। মোহিনীও জগন্মাতা নন, আর তাঁর ভগিনীরাও জগন্মাতার অংশ নন, মানসের সম্পূর্ণ ধারণা ভ্রান্ত। … মানস নিজের উপর নিজে ক্রুদ্ধ হলেন। তাঁর ভ্রমের কারণে, তাঁর কন্যারা তাঁর থেকে দূরে চলে গেছিলেন। …

নিজের এই শ্লাঘার কারণে, এবার ফিরে তাকালেন মোহিনীর সমস্ত কীর্তির দিকে। যা এতাবৎকাল দেখতে পাচ্ছিলেন না, এখন সেই সমস্ত কিছু দেখতে পেলেন। দেখলেন, কেমন করে সমস্ত কিছুকে নিজবশে রাখার জন্য মোহিনী এতকাল ক্রিয়া করেছেন। দেখলেন কেমন ভাবে, কেমন করে প্রজার মধ্যে নিরদের ব্যবহার বৃদ্ধি করে, কামনার বীজ অঙ্কুরিত করেছিলেন।

দেখলেন, কেমন ভাবে মিথ্যা নাট্যকে সত্য করে সমাজে স্থাপিত করে, মহাকাশ অভিযানের নাম করে, নিজেকে শ্রেষ্ঠ বলে দাবি করে গেছেন মোহিনী। আরো দেখলেন, কেমন করে কলা তথা সমস্ত শিক্ষাকেও বাণিজ্যের স্তরে নামিয়ে নিয়ে গিয়ে, সকল প্রজাকে প্রতিযোগিতার মধ্যে আবদ্ধ করে, একপ্রকার তাঁদেরকে প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে বাধ্য করে, তাঁদের সকলকে সকলের শত্রু করে দিয়েছেন।

দেখলেন কেমন করে স্ত্রীদের পুরুষের সমতুল্য মনে করিয়ে করিয়ে, সন্তানের জন্ম দেওয়াকে জটিল করে তুলে, ওষধির বাণিজ্যের বিস্তার করেছেন। দেখলেন সংবাদের নাম করে, কেমন ভাবে নিজেরই সমস্ত ভাবকে তিনি সকলের সম্মুখে তুলে ধরেছেন। আরো দেখলেন, কি ভাবে কামনাকে সমাজে প্রেমরূপে স্থাপিত করে রেখে দিয়েছে মোহিনী, কি ভাবে চাওয়াপাওয়ার বাসনাকে ভক্তি বলে স্থাপিত রেখেছেন, আর সেই বাসনায় নেশাগ্রস্তদের ভক্ত বলে স্থাপিত করে রেখেছেন।

কেমন করে চরম অবিশ্বাসকেই বিশ্বাস করে স্থাপিত করে রেখে দিয়েছেন, আর বিরক্তিকে বৈরাগ্য বলে মানিয়ে চলেছেন সকলকে। সমস্ত কিছু দেখতে দেখতে, মানসের নেত্র অশ্রুবারিতে ভরে উঠলো। তিনি দেখলেন, চিন্তাকে মেধা বলে স্থাপন করা হয়েছে, আর কল্পনাকে বিচার। কি করে? কি করে তিনি এই সমস্ত কিছু দেখেও দেখতে পেলেন না! …

ভয়ে, গ্লানিতে, এক বিকট অস্বস্তিতে ঘর্মাক্ত হতে শুরু করলেন মানস। নিজের উত্তরীয়তে নেত্রের অশ্রু মুছতে যাবেন, এমন সময়ে, এক স্নেহস্পর্শের অনুভব করে, পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখলেন, তাঁর আদরের হরিদ্রা, তাঁর মেধা পূর্ণ ঘর্মাক্ত অবস্থায়, ললাটের সিন্দূরের বিন্দি স্বেদে সমস্ত ললাটময় হয়ে গিয়ে, অপরূপ সাবলীল সৌন্দর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে, তাঁর দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসছেন।

মানস, নিজেকে আর সামলাতে পারলেন না। তিনি উচ্চৈঃস্বরে কেঁদে উঠে বললেন, “কি মুখ দেখাবো এবার মাতাকে! … পুত্রী, আমি যে নিজের হাতে নিজেকে শেষ করে দিলাম! … বর্ষপূর্বে আমার উপর মাতার হত্যা করার লাঞ্ছন দেওয়ার প্রয়াস হয়েছিল, কিন্তু তা ছিল সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও নিরাধার, নিছকই এক ছলনা ও কপটতা। কিন্তু আজ! … আজ যা আমি করেছি, তা মাতাকে হত্যা করার থেকে কোন অংশে কম! …

যার মধ্যে মাতার লেশমাত্রও ভাব নেই, না আছে পবিত্রতা, না আছে মমতা, না স্নেহ, না বিশ্বাস আর না সমর্পণ, তাকে সমানে মা বলে গেলাম! … যে সর্বদা মাতারই ভাবকে হত্যা করার প্রয়াস করে গেল, আমি তাঁকেই সমর্থন করে এলাম!

আরে আমার প্রজারা তো অজ্ঞ! তাঁরা জানেন যে, তাঁদের মহারাজ মাতার নিজের পুত্র, তাঁদের মহারাজের থেকে অধিক নিকট থেকে জগন্মাতাকে কেউ কনোদিন দেখেনই নি। তাই তিনি যখন একে মা বলছেন, তখন নিশ্চিত ভাবেই ইনি মা। … আর আমি! … আমি নিজেকে, আমার সমস্ত প্রজাকে, আর স্বয়ং মাতাকে ধোঁকা দিতে থাকলাম!”

দেবী ধরাও লজ্জিত হয়ে গেলেন, সেই কথাতে। তিনিও এগিয়ে এসে বললেন, “নাথ, মানছি, আপনি এই দোষের তালিকায় আমার থেকে অনেক উপরে, কিন্তু আমিও যে নির্দোষ নই। শিখা, বেগবতীর সন্তান এঁরা, নিজের গর্ভ থেকে জাত সন্তান। জননী হয়ে তাঁরা এঁদের বিরোধ করছিল, তারপরেও আমার সন্দেহ জাগলো না! … এতই অন্ধবিশ্বাস আমার!”

প্রজারা সম্মুখে এসে বললেন, “মহারাজ, আমরাও নির্দোষ নই। লোভ, আসক্তি, মোহ, আমাদের গ্রাস করে নিয়েছিল। আমাদের মেধা তো বরাবরই বলে এসেছে যে মোহিনী মাতার রূপ হতে পারেনা। সে তো যুক্তি দিয়েও আমাদেরকে বলেছে। মহারাজ, আপনি তো বরাবরই বলতেন, মাতা তো নয়, কিন্তু মাতার প্রসাদ যেন মেধা। … না দ্বন্ধ আমাদের নেই সেই কথাতে।

জানিনা, মাতা ঠিক কতটা পবিত্র, হয়তো তাঁর পবিত্রতার ধারণাও করা সম্ভব নয়, জানিনা মাতার শক্তির অসীমতা মানে ঠিক কি, জানিনা মাতার স্নেহের, ত্যাগের, সৌন্দর্যের, মমতার কনো সীমা আদপে আছে কিনা, কিন্তু অসীম না হলেও, এই সমস্ত কিছুর প্রাচুর্য আমরা মেধার মধ্যে তো সব সময়েই পাই। তা ছাড়াও, তাঁর দুই ভগিনী নিজেদের সন্তানদের অপেক্ষায়, নিজেদের ভগিনীর পক্ষ নিচ্ছেন। এই সমস্ত কিছু দেখেও, আমরা যেন অন্ধ হয়ে গেছিলাম মোহিনীর মোহতে!”

মেধা হেসে বললেন, “পিতা ও সন্তানের সম্পর্কের সব চাইতে মনোরম ভাব কখন প্রকাশিত হয় জানেন! যখন সন্তানের দুর্ভাগ্যের জন্য পিতা নিজেকে দোষারোপ করেন, আর সন্তান সম্মুখে এসে বলেন যে তিনিও সম্পূর্ণ নির্দোষ নন, অর্থাৎ পিতার কাঁধের থেকে বোঝা হালকা করার প্রয়াস করেন। … যাক, দেখেও ভালো লাগলো যে মোহিনী ও তাঁর সরকার আপনাদের পিতাসন্তানের মধ্যে ভেদ করতে পারেননি, আজও আপনারা পিতা ও সন্তানই আছেন।

তবে… (মানসের দিকে তাকিয়ে) পিতা, অনেকটা দেরি হয়ে গেছে। দিদিরা আপ্রাণ প্রয়াস করেছিলেন যাতে, সময়ের আগে তোমাদের এই সমস্ত কিছু বলতে পারেন। তাঁরাও গ্লানিতে দগ্ধ হচ্ছিলেন কারণ এই সমস্ত সন্তানদের তাঁরাই নিজেদের গর্ভ থেকে জন্ম দিয়েছেন। মায়ায় আবদ্ধ হয়ে, সমস্ত কিছুতে তাঁরা জরিয়ে পরেন, আর সেই একই মায়ার ভিন্নশাখায় আপনারা সকলে। … তা বুঝতে পেরে, দিদিরা সময়ের আগে, তোমাদেরকে জাগরণের প্রয়াস করছিলেন, কিন্তু সময় যে সদাই বলবান।

আমাদের কৃত কর্মই সময়ের নির্মাণ করে। কর্মের মনোভাব কর্মফল রূপে যতক্ষণ না আমাদের সম্মুখে আসে, সেই কালের অন্তরায়কেই তো আমরা সময় বলে থাকি। তাই যেই মায়াতে আমরা স্বেচ্ছায় নিযুক্ত হয়েছি, সেই মায়া যতক্ষণ না নিজের প্রকৃত স্বরূপ দেখাচ্ছে, ততক্ষণ যে আমাদের কৃতকর্ম আমাদের নিজেদেরই বোধগম্য হয়না, আর যতক্ষণ না তা হচ্ছে, ততক্ষণ সময়ের গতিকে বাধ্য করা যে কারুর পক্ষে সম্ভব নয়!

আমার জীবনের সময়কালকে যে আমি ছাড়া আর কেউ নিয়ন্ত্রণই করতে সক্ষম নই। আমার মনোভাবই এই সময়ের নির্মাতা, আর তাই আমার সেই মনোভাবের সত্যতা যতক্ষণ না আমার সম্মুখে আত্মপ্রকাশ করছে, ততক্ষণ সেই নির্মিত সময়ের থেকে মুক্তিলাভ অসম্ভব। … সেই কারণেই, দিদিরা ততক্ষণ নিজেদের নির্মিত সময়ের থেকে পরাস্ত হতে থেকেছেন, যতক্ষণ না তাঁদের কর্মের মনোভাব অর্থাৎ মোহান্ধতা তাঁদের কাছে আত্মপ্রকাশ করেছিল।

যেদিন তাঁদের সম্মুখে তাঁদের মোহান্ধতা আত্মপ্রকাশ করলো, তাঁরা স্বতই জেনে গেলেন যে, তাঁরা মোহে আবদ্ধ, আর মোহে আবদ্ধ হয়ে, তাঁরা ছয় সামান্য সন্তানের নন, ষড়রিপুর জন্ম দিয়েছেন। একই ভাবে, আপনারাও এই আত্মসর্বস্ব ভাবের চয়ন করে নিয়েছিলেন, আর তাই এই আত্মসর্বস্ব ভাব যতক্ষণ না আপনাদের অস্তিত্বকেই সম্পূর্ণ ভাবে তরান্বিত করে দিচ্ছিল, ততক্ষণ আপনাদের এই চক্র থেকে মুক্তি সম্ভব ছিলনা।

তাই নিজের নিজের কৃতকর্মকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। আমাদের ভিন্ন ভিন্ন মনোভাব আমাদেরকে একটি একটি চক্রে আবদ্ধ করে দেয়, আর সেই চক্রের বেষ্টন থেকে মুক্তি তখনই লাভ হয়, যখন সেই মনোভাবের বাস্তবিকতা আমাদের বোধগম্য হয়। কেউ আমাদের এই বোধ করিয়ে দিতে পারেনা। হ্যাঁ প্রয়াস অবশ্যই করতে পারেন, কিন্তু এই বোধ অনুভব নিজেকেই করতে হয়, কারণ এই বোধের জন্মদাতা আমরা স্বয়ং।

সেই কারণে আমিও ব্যর্থ হয়েছিলাম দিদিদের মায়া থেকে উদ্ধার করতে, আর দিদিরাও ব্যর্থ হয়েছেন, আপনাদেরকে মায়া থেকে উদ্ধার করতে। … কিন্তু আপনারা এক্ষণে, এক নূতন চক্রের নির্মাণ করে ফেলেছেন, আর তাই এবার এই নূতন চক্রের মধ্যে আপনাদেরকে এবার প্রবেশ করতেই হবে”।

মানস সম্মুখে এসে বললেন, “কি সেই চক্র পুত্রী!”

মেধা মৃদু হেসে বললেন, “গ্লানির চক্র। … মাতার প্রতি আপনারা অপরাধ করে ফেলেছেন, এই গ্লানির ভাব আপনাদের এক নূতন চক্রে আবিষ্ট করে ফেলেছে”।

বৃদ্ধ চন্দ্রনাথ সম্মুখে এসে বললেন, “এটুকু তো বুঝে গেছি দিদিভাই যে, প্রতিটি চয়নের একটি পরিণাম থাকে, যতক্ষণ না সেই পরিণাম লাভ হচ্ছে, ততক্ষণ চয়নের পর্ব সমাপ্তই হয়না। কর্মফল লাভ না হলে, কর্মই যে অসমাপ্ত থেকে যায়। কিন্তু আমাদের এই গ্লানিভাবের পরিণতি কি হবে দিদিভাই!”

মেধা বৃদ্ধ চন্দ্রনাথের থুতনি আকর্ষণ করে বললেন, “এই বৃদ্ধ বয়সে কারাবাসে যেতে হবে তোমাকে দাদুভাই। … মহারাজ আত্ম এই ছায়াপুরের অধীশ্বর। তাঁর সন্তানদের এমন দুর্দশা প্রদান করা হয়েছে, তাই তাঁরা আমাদের সকলকে বন্দী করবেন, এবং কারাগারে আবদ্ধ করবেন।

দাদুভাই, এটি তাঁর চয়ন হবে, তাই তা তাঁর কাছেই পরিণাম হয়ে ফিরবে। কিন্তু তাঁর চয়ন তোমাদের চয়নের পরিণাম প্রদান করবে। এমনই কালচক্রের নিয়ম। দুইজন আলাদা আলাদা ভাবে নিজের নিজের জীবনের চয়ন করেন, আর ভিন্ন ভিন্ন পরিণামও ভোগ করেন, কিন্তু একজনের চয়ন অন্যজনের পরিণামকে নিশ্চিত করে, তো সেই দ্বিতীয়ের চয়নের পরিণাম প্রদান করেন সেই প্রথমজন। আর এই ভাবেই একের পর এক কর্মচক্রের আবর্তন হতে থাকে”।

দেবী চন্দ্রপ্রভা সম্মুখে এসে প্রশ্ন করলেন, “অদ্ভুত ভাবে এই আবর্তনের কথা বললি তো মা! … একজন চয়ন করছেন, অন্য একজন নিজের চয়নের মাধ্যমেই, সেই প্রথমজনের চয়নকে পরিণাম দিচ্ছেন। আবার প্রথমজন বা তৃতীয়জন আরো এক চয়ন করছেন, আর দ্বিতীয়জন নিজের চয়নের পরিণাম পাচ্ছেন, আর এই ভাবে চয়ন পরিণাম, চয়ন পরিণামের মালা নির্মাণ হয়ে যাচ্ছে, আর আমরা সেই মালার মধ্যে আবদ্ধ একাকজন ফুল। … কিন্তু মা, এই অদ্ভুত জ্ঞান তুই পেলি কোথা থেকে? আমরা তো কেউ এই জ্ঞান অর্জন করিনি!”

মেধা কিছু বলার আগেই, দেবী শিখা এগিয়ে এসে বললেন, “এই ত্রিবৃক্ষ থেকে। … মেধার সমস্ত জ্ঞানের আধার যে তাঁরাই। তাঁরাই যে আমার মেধার দেখাশুনা করে। যখন আমরা সকলে ওকে একপ্রকার ত্যাগ দিয়ে দিয়েছিলাম, তাঁরাই তো তাঁর সমস্ত দেখভাল করেছিল”।

দেবী ধরা এগিয়ে এসে মেধার সম্মুখে নতমস্তক হয়ে দাঁড়িয়ে বললেন, “জন্মের কাল থেকে, আমি তোকে ভুলই বুঝে গেলাম মেধা! … মা আমি তোর, কিন্তু সত্য বলতে, কোথায় দিয়েছি তোকে মায়ের আঁচল! হ্যাঁ গ্লানি আমার হচ্ছে, তবে সেই গ্লানি জগন্মাতার থেকেও অধিক হচ্ছে, যা আমি তোর সাথে করেছি, তার জন্যে। সকলে সন্তানকে ছেড়ে দিলেও, মা কি করে তাঁর সন্তানকে ছেড়ে দিতে পারে! … কিন্তু আমাকে দ্যাখ! …

তুই বৃক্ষতলে দিনযাপন করছিস, আর আমি আরাম ও বিলাসের সাথে রাজপুরে। ছি! ধিক্কার আমার বিলাসপ্রিয়তাকে! … জানি তুই বলবি, মায়া, মোহ, অন্ধবিশ্বাস, চয়ন বা পরিণামের ভারি ভারি তত্ত্বের কথা। কিন্তু মেধা, আমার যে এতো মেধা নেই, সেই সমস্ত কিছু বোঝার! … হ্যাঁ থাকতো মেধা, যদি তোকে এমন ভাবে দূরে ঠেলে না রাখতাম। তোকেও কখনো কাছে টানলাম না, আর তাই মেধাও আমার মধ্যে প্রকাশ পেলো না”।

মানস এবার বললেন, “কিন্তু মেধা, এই আবর্তনের কি কনো অন্ত নেই! চিরকাল অনন্তকাল কি আমারা এই চয়ন পরিণামের আবর্তনেই আবদ্ধ থাকবো! … এর থেকে কি কনো মুক্তি নেই!”

মেধা মুচকি হেসে বললেন, “পিতা, আমার গুরু, এই বৃক্ষরাজিরা বলেন, তাঁরা এমন হতভাগ্য গুরু যে, তাঁরা শিষ্যকে পরখ করার জন্য প্রশ্ন করেন না, উপরন্তু নিজেদের না লাভ করা উত্তরের আশাতে শিষ্যকে প্রশ্ন করেন। … হ্যাঁ পিতা, তাঁরা বলেন যে, তাঁদের কাছে এমন অনেক প্রশ্ন আছে, আর সেই প্রশ্ন সমূহ নিয়েই তাঁরা গুরু। সাখ্যাত জগন্মাতাকে শিষ্য করে লাভ করে, তাঁর থেকে সেই প্রশ্নের উত্তর লাভ করার আশা হৃদয়ে নিয়ে, তাঁরা গুরু”।

সূর্যনাথ এবার সম্মুখে এসে বললেন, “ছাড়ো ওসব কথা। এখন ওসব কথার সময় নয়। এখন সময় যোজনা করার। … শোনো মানস, আমরা নিশ্চিত ভাবে শ্লাঘা আক্রান্ত। তুমি হয়তো আমাদের থেকে অধিক ভাবে আক্রান্ত সেই একই শ্লাঘাতে, কিন্তু আমরাও সেই শ্লাঘাতেই আক্রান্ত। তাই, এই কারারুদ্ধতাই যদি আমাদের শ্লাঘারূপ চয়নের পরিণাম হয়, তবে তা আমাদের স্বীকার করতেই হবে।

কিন্তু কথা এই যে, আমাদের এই তিন পৌত্রীরা, মেধা, শিখা ও বেগবতী, তাঁরা তো এই শ্লাঘাতে আক্রান্ত নয়। তাঁরা কেন এই পরিণাম ভোগ করবে? … শোনো মানস, রাজনীতি বলে যে, যখন আপদকালীন সময় উপস্থিত, তখন নিজের সুরক্ষার কথা চিন্তা না করে, তাকে বা তাদেরকে সুরক্ষিত রাখা কর্তব্য, যাদেরকে সুরক্ষিত রাখলে, পরিবর্তীতে রক্ষালাভ সম্ভব। আমাদেরকে কারা অবস্থাতে রুদ্ধ করলে, আত্ম কিছুতেই আমাদের মুক্ত করবেনা। অর্থাৎ আমাদের কারুকে প্রয়োজন, যিনি আমাদেরকে মুক্ত করবেন এই অবস্থা থেকে। আর তারা আমাদের এই তিন পৌত্রী। তাই তাঁদেরকে সুরক্ষিত করার চিন্তা করো”।

মেধা ভাবিত হয়ে বললেন, “কিন্তু দাদু, আমাদের তিনজনের মিলিত ভাবেও সামর্থ্য নেই যে, আমরা আত্ম বা তাঁর পত্নীদের সম্মুখীন হতে পারি!”

সূর্যনাথ পুনরায় বললেন, “জানি সেই কথা পুত্রী, আর এও জানি যে, তোমরা তিনজনে মুক্ত থাকলে, যেই উপায়ে আমাদেরকে বন্ধনমুক্ত করা সম্ভব, সেই উপায়ের সন্ধানও অবশ্যই করবে। … তাই মানস, এঁদেরকে মুক্ত রাখার যুক্তি নির্মাণ করো”।

শিখা বললেন, “এই তিনবৃক্ষই আমাদেরকে সুরক্ষিত করতে সক্ষম, অন্য কেউ নয়”।

দেবী চন্দ্রপ্রভা বললেন, “কিন্তু কি ভাবে দিদিভাই! … সমস্ত ছায়াপুর এঁদের। সমস্ত ছায়াপুরের মধ্যে এই বৃক্ষরাজিরাও আসে!”

দেবী বেগবতী হেসে বললেন, “বুঝতে পেরেছি, তোমরা আমাদের কথার অর্থ বুঝতে পারোনি। … মেধা, দিদি, চল তো উনাদের একবার প্রত্যক্ষ প্রমাণ দেখাই”।

এতো বলে, তিনটি বৃক্ষের সম্মুখের দিকে ডালে তিন কন্যা উঠে বসলেন, কিন্তু মজার কথা, কেউ তাঁদেরকে দেখতেই পেলেননা। বেশ কিছুক্ষণ পরে, তাঁরা বৃক্ষ থেকে ভূমিতে নেমে এলেন। তখন সকলে পুনরায় তাঁদেরকে দেখতে পেলেন। সেই আশ্চর্য দৃশ্য দেখে, দেবী ধরা বললেন, “এই বৃক্ষগুলিতে আমরা সকলেই তো উঠে থাকতে পারি! … তাহলে তো আমরা সকলেই তো বেঁচে যাবো বন্দী হওয়া থেকে!”

মানস বিরক্ত হয়েই বললেন, “নির্বোধের মত কথা বলো না দেবী। … পুত্রী, আরো একবার বৃক্ষে উঠে বসে, কিছু কথা বলো আমার উদ্দেশ্যে”।

শিখা তেমনই করলেন, আর মানস সহ সকলে শিখার সমস্ত বলা কথা শ্রবণ করলেন, আর মনে হলে যেন অদৃষ্টের বচন, কারণ কথককে দেখা যাচ্ছেনা। … মানস এবার ধরার দিকে তাকিয়ে বললেন, “বুঝলেন দেবী! … এঁরা তিনজন, আলাদা আলাদা, তাই নিঃশব্দে এঁরা বসে থাকবে, কেউ জানতেও পারবেনা। কিন্তু যাই অনেকে বসবো, তাই কখনো না কখনো তো আমরা কথা বলবই, আর তখনই এঁদের সন্দেহ হয়ে যাবে, আর এঁরা আমাদের সাথে সাথে, এই তিন দিব্যবৃক্ষকেও উৎপাটিত করে দেবে।

আর তা ছাড়া দেবী, মাতা বলতেন, চয়ন করার পরে, চয়নের পরিণাম থেকে বাঁচার অতিরিক্ত প্রয়াস করি আমরা, আর সেই প্রয়াসের ফলে, আমরাই আমাদের সময়কালকে বিস্তৃত করে দিই। মাতার কথার অর্থ আমি তখন তো বুঝিনি, তবে আজ যখন মেধা চয়ন ও পরিণামের মহাজ্ঞান প্রদান করছিল, তখন সেই কথাকে মেলাতে পারলাম।

দেবী চয়নের সম্পন্নতাই তার পরিণামের কারণে। তাই যদি আমরা চয়ন করার পরে, তার থেকে উৎপন্ন হওয়া পরিণামকেই স্বীকার না করি, এর অর্থ আমরা আমাদের আবর্তনচক্রকে আরো মন্থর করে দিচ্ছি, অর্থাৎ যদি এই চক্র কখনো ভঙ্গ হবার হয়, সেই ভগ্নতাকে আমরা বিলম্বিত করে দিচ্ছি। … অর্থাৎ দেবী, আমাদের সাগ্রহে নিজেদের চয়নের পরিণাম স্বীকার করা উচিত। মেধার কথা থেকে আমি যা উদ্ধার করতে পেরেছি, তাই এই যে, চয়ন আমাদের মনোভাবের অভিব্যক্তি। আর পরিণাম আমাদেরকে সেই মনোভাবই প্রদর্শন করে।

সেই মনোভাবের অন্তরালে থাকা দোষত্রুটি প্রদর্শন করে, আর আমাদেরকে সেই দোষত্রুটি সংশোধন করার সুযোগ প্রদান করে। তাই, যদি আমরা চয়ন করার পর, পরিণামকে স্বীকার না করি, বা পরিণামকে পরিবর্তিত করতে যাই, তাহলে আমাদের আর একটি নয়, একাধিক চয়ন হয়ে গেল। একটি চয়ন যা আমরা পূর্বে করেছিলাম, আর দ্বিতীয় চয়ন পূর্বের চয়নের পরিণামকে আটকানোর প্রয়াসে করা চয়ন।

আর এই ভাবে, আমাদের চয়নের পরিণাম বাড়তেই থাকবে, আর এক সময়ে তা ভয়ানক পরিণাম হয়ে আমাদের সম্মুখে আসবে। দেবী, মেধার থেকে আমি যা শিখলাম, সেই অনুসারে, আমরা আমাদের মনোভাব সম্বন্ধে কিছুই জানিনা। যখন আমরা কনো চয়ন করছি, তখন সেই মনোভাবেরই ব্যবহার হয়, কিন্তু তাও আমরা জানিনা যে কি মনোভাব আমরা ব্যক্ত করছি। আমাদের এই অজানা মনোভাবই আমাদের কাছে পরিণাম এনে দেখিয়ে দেয় যে আমাদের মনোভাব ঠিক কি প্রকার।

তাই পরিণাম অত্যন্ত আবশ্যক, কারণ পরিণামই আমাদেরকে আমাদের মনোভাবের দোষত্রুটি বলে দেবে আর তাকে সঠিক করে করেই আমরা নিজেদের শুদ্ধ করে, মাতার কাছে নিজেদের উপস্থিত করতে সক্ষম হবো। তাই দেবী পরিণাম থেকে বাঁচার নয়, পরিণামকে সাগ্রহে স্বীকার করার চিন্তা করুন”।

মানস এবার মেধার কাছে এগিয়ে গিয়ে, দুই হস্ত প্রসারিত করে আলিঙ্গন করলেন পুত্রীকে। আলিঙ্গনের সময়ে নিজের নেত্রের অশ্রুকে ধরে রাখতে পারলেন না। আলিঙ্গনের পরে, মেধার স্কন্ধ থেকে নিজের বদন মুক্ত করে মেধার দুই স্কন্ধকে নিজের দুই করদ্বারা আকর্ষণ করে বললেন, “সাহস হচ্ছিল না পুত্রী, আলিঙ্গন করার। … নিজের প্রিয়পুত্রীকে আলিঙ্গন করার জন্য প্রাণ ছটফট করছিল, কিন্তু যেই অন্যায় আমি তোমার সাথে করেছি, তারপর সাহস হচ্ছিল না! … তাই…!”

মেধা এবার দ্বিতীয়বার আলিঙ্গন করলেন পিতাকে। আর মানস এবার নিজের সমস্ত বাঁধ ভেঙে দিয়ে কাঁদলেন। বেশ কিছুক্ষণ এমন রোদনের শেষে, মানস হালকা হলে, মেধা তাঁর থুতনিতে হাত দিয়ে বললেন, “কন্যা আমি আপনার। আপনার আমার প্রতি অবিচার করারও অধিকার আছে। … আমার সামর্থ্য তো নেই, তাই এমন বলবো না যে আমি ঠিকই আপনাদের উদ্ধার করবো। তবে হ্যাঁ, আপনাকে, আমার মাতাকে, আমার দিদিভাই, দাদুভাইদের, আর আমাকে যারা কন্যার স্নেহে দেখেন, সেই সমস্ত প্রজাদের, কিছু না কিছু করে তো উদ্ধার করবোই। … কনো না কনো উপায় নির্গত করবই”।

সূর্যনাথ সম্মুখে এসে বললেন, “সেই কথা পরে ভাববে পুত্রী, প্রথমে এই বৃক্ষদের আচ্ছাদনে নিজেদেরকে সুরক্ষিত করে রাখো। … ভেবো না যে, তোমাদেরকে দেখতে না পেয়ে, বন্দী করতে না পেরে, এঁরা তোমাদেরকে খোঁজা ছেড়ে দেবে। … তাই অতি সাবধানে থেকো পুত্রী। আমাদের এবার অনুমতি দাও। আমরা এবার আমাদের চয়নের পরিণামের জন্য প্রস্তুত হবো”।

কথাটা শুনে, দেবী মেধার মধ্যে এক বেদনার সুর বেজে উঠলো। দেবী ধরার কাছে এগিয়ে গিয়ে, তাঁকে প্রবল আলিঙ্গনে আবদ্ধ করে বললেন, “মা, তোমার অনুপস্থিতি আমি বুঝতেই পারবো না, কারণ আমার দুই দিদি যে আমার মায়েরই সমান। তাঁরা যে আমাকে কন্যার থেকে কনো অংশে কম দেখেনি কনোকাল। … কিন্তু মা, তোমার যে তিন কন্যাই তোমার থেকে দূরে চলে যাবে!”

দেবী ধরা হেসে, কন্যার মুখবদনকে নিজের দুই করে ধারণ করে, বারংবার তাঁর মুখচুম্বন করে, পুনরায় হেসে বললেন, “পুত্রী, আমার এই প্রজারা যে আমার সাথে থাকবেন! … এঁরা আমার সন্তান নয়!… (পুনরায় স্নেহহাস্য প্রদান করে) পুত্রী, জানি তুমি শিশুকাল থেকে এই বৃক্ষদের সম্মুখে থেকে এক অজ্ঞাত তপস্যা করছো, আমার মন বলছে, এবার তোমার তপস্যার অন্তিম চরণ উপস্থিত হয়েছে, তোমার চয়নের মধুর পরিণাম আসতে চলেছে। তাই নিজের তপস্যায় এবার মনোনিয়োগ করো। জানি, স্বার্থপরতা তোমার একটি লহুবিন্দুতেও নেই। কিন্তু এখন সামান্য স্বার্থপর হবারই সময়”।

মেধা হেসে বললেন, “বেশ মা, সাধনা তো করবো। তবে স্বার্থপর যদি হতেই হয় তপস্যার জন্য, তবে এই স্বার্থ কেবল এই মানবদেহে সীমাবদ্ধ মেধার স্বার্থ হবেনা। সেই স্বার্থ হবে, এই সম্পূর্ণ ব্রহ্মাণ্ডেপুরের কন্যার স্বার্থ। এই ব্রহ্মাণ্ডপুরের জননীর জন্য সম্পূর্ণ ব্রহ্মাণ্ডপুর হাহাকার করছে। তাঁকে ছাড়া, সকলে অনাথ। তুমি একজন মা, আমার দিদিরা মা, আমার দিদিভাই মা। …

কিন্তু তোমরাও জানো, তোমরা সকলে মিলে সেই মায়ের অন্তর্ধানের ফলে, তাঁরই সন্তানদের সামলাচ্ছ, আর তা সামলাতে গিয়ে তোমরা হিমসিম খাচ্ছ। … তাই মা, আমার তপস্যা, সেই মাকে ফিরে পাবার তপস্যা, যাকে ছাড়া আমরা সকলে অনাথ, যাকে ছাড়া সমস্ত মায়েরাও অসহায়। তাই যদি স্বার্থের চিন্তা করতেই হয়, তবে এই দেহের মধ্যে সীমাবদ্ধ মেধার স্বার্থ হবে না তা, হবে এই ব্রহ্মাণ্ডপুরের মেধার স্বার্থ, যা তাঁর ও তাঁর সকল ভ্রাতাভগিনীর জননীকে পুনরায় লাভ করার উদ্দেশ্যেই বিস্তারিত থাকবে”।

একদিকে যখন ধরাধামের পুরাতন সমস্ত সদস্যদের মধ্যে এইরূপ আলাপচারিতা চলছে, তখন অন্যদিকে আত্মের মহলে শোকের ও উত্তেজনার ছায়া। মোহিনী সহ সকল ভগিনীই আঘাতপ্রাপ্ত, তবে কামিনী, মদিনা অত্যন্ত অধিক ভাবে আক্রান্ত, আর মোহিনী বারবার অচেতন অবস্থা থেকে প্রত্যাবর্তন করছেন, আর বারংবার অচেতন হয়ে যাচ্ছেন।

শ্রেষ্ঠ বৈদ্যরা তাঁদের চিকিৎসার কর্ম করছেন, কিন্তু এই সমস্ত কিছুর মধ্যে উত্তেজিত হয়ে উঠলেন আত্মপুত্ররা, অর্থাৎ প্রভাত, রজনী ও তামস। চক্ষু তাঁদের রক্তাক্ত, সকলেই উদগ্রীব মেধার হত্যা করার জন্য। ছায়াদেবীরাও অস্থির হয়ে রয়েছেন, ধরাধামের এই নবউত্থানের কারণে। কিন্তু একজন অত্যন্ত ভাবে শান্ত।

যতই তিনি শান্ত হচ্ছেন, ততই অধিক ক্রুর হচ্ছেন তিনি। কিন্তু তাঁর অন্তরের ক্রুরতা দেখতে না পেয়ে, বাহ্যিক শান্তিকে লক্ষ্য করে, অধিক উত্তেজিত হয়ে উঠে, আত্মপুত্ররা তাঁদের শান্ত পিতা, আত্মের উদ্দেশ্যে ক্ষিপ্ত হয়ে বললেন, “আপনি শান্ত আছেন থাকুন, আমাদের অনুমতি দিন, মেধার হত্যা করার জন্য”।

শান্ত আত্ম, এই কথার উত্তর প্রদান করতে যখন পুত্র ও পত্নীদের দিকে তাকালেন, তখনই তাঁর অন্তরে চলতে থাকা ক্রুর স্রোতের সন্ধান পেলেন সকলে। ক্রুর সেই দৃষ্টি ক্রুর ও কর্কশ স্বরে বলে উঠলেন, “পুত্ররা, রিপু তোমাদের কন্যাসমূহ, আর পাশ তোমাদের পুত্র সমূহ, আর তোমারই পুত্র ও পুত্রীদের সঙ্গম থেকে জন্ম নিয়েছে অসংখ্য আবেগ। কিন্তু এই আবেগদের আমরা বরণ করবো বলে জন্ম দেওয়া হয়নি।

এঁদের জন্ম দেওয়াই হয়েছে, আমাদের রাজত্ব সর্বত্র বিস্তৃত করবো বলে। বিনা যুদ্ধে শত্রুকে জয় করে নেবার কৌশল হলো এই আবেগরা। তাই তোমরা কেন এই আবেগে তরান্বিত হচ্ছ! … দেবী চিন্তা, দেবী ইচ্ছা ও দেবী কল্পনা, আপনারা বরাবর প্রশ্ন করতেন আমাকে যে, কেন আমি মেধার স্থান গ্রহণ করতে বলতাম আপনাদের, আশা করি এবার আপনারা আপনাদের প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেছেন!

মেধা একাকীই এতটা সামর্থ্যবান যে, তাঁর সম্মুখীন হবার সামর্থ্য সমস্ত রিপু, সমস্ত পাশ ও সমস্ত আবেগের মিলিত ভাবেও নেই। তাই এই দ্বৈরথের যা পরিণত হবার ছিল, তাই হয়েছে, কিন্তু এই দ্বৈরথ হওয়া অত্যন্ত আবশ্যক ছিল, কারণ আপনারা মেধাকে আটকে রাখার আমার যোজনার ব্যাপারে সদাই সন্দিহান ছিলেন। তাই মেধার সামর্থ্য ঠিক কি, তার ধারণা আপনাদের কাছে স্পষ্ট হওয়া আবশ্যক ছিল, আর তাই এই দ্বৈরথও আবশ্যক ছিল।

এই দ্বৈরথের পরিণাম তোমাদের কাছে আশাপ্রদ নয়, তবে এই পরিণামই লব্ধ হবার ছিল এই দ্বৈরথ থেকে। তাই আমাকে তোমরা শান্ত দেখছো, কারণ এই পরিণাম আমার পূর্বজ্ঞাত, আর আবেগদের দ্বারা তোমরা বশ ছিলে, তাই তোমাদের কাছে এই পরিণাম পূর্বজ্ঞাত নয়, আর তাই তোমরা চঞ্চল। তবে, পুত্ররা, আমার সুন্দরী পত্নী ছায়ারা, এটা চঞ্চল হবার নয়, স্থির হয়ে যোজনা স্থির করার সময়।

মানস, ধরা, শিখা ও বেগবতী, এঁরা একাধারে বিপদের মধ্যে আবিষ্ট হতে, তবেই মেধা জাগ্রত হলো। এবার কথা এই যে, মেধার এই জাগরণকে থামতে দেওয়া যাবেনা। আর দ্বিতীয় কথা এই যে, মেধার এই সামর্থ্যকে আমাদের কাজে লাগাতে হবে। … কিন্তু কি উপায়ে?”

দেবী কল্পনা বললেন, “মেধার জাগরণ যদি, তাঁর পিতামাতা ও ভগিনীদের বিপদের কারণে হয়ে থাকে, তবে তাঁর পিতামাতা ও ভগিনীদের পুনরায় বিপদের মুখে ঠেলে দিলে, মেধার জাগরণ অব্যাহত থাকবে। এর নিদান করা যেতেই পারে, যদি সকল ধরাধামের ব্যক্তিদের কারাগারে বন্দী করা যেতে পারে”।

দেবী ইচ্ছা বললেন, “হ্যাঁ, মোহিনী ছিল ছায়াপুরের অধীশ্বরী, তাঁকে এমন বিষম ভাবে আঘাত করার অপরাধে তাঁদেরকে কারাগারে নিক্ষেপ তো করা উচিতও। তাই না মহারাজ!”

দেবী চিন্তা প্রশ্ন করলেন, “হ্যাঁ, এমন তো করা যেতেই পারে। এমন করলে মেধাও জাগ্রত থাকবে, কিন্তু নাথ, মেধাকে আপনি কি রূপে ব্যবহার করার কথা ভাবছেন! তাঁকে বশ করা অত্যন্ত কঠিন। … আমাদের পুত্ররা শিখাকে ও বেগবতীকে বশ করেছিল, কিন্তু তাঁরাও মেধাকে বশ করতে পারেনি”।

মহারাজ আত্ম সমস্ত কথাতে সম্মতি জানিয়ে বললেন, “কিন্তু মেধা তখন জাগ্রত ছিলনা, আর তাই আমাদের পুত্ররা সুরক্ষিত ছিল, কিন্তু আজ সে জাগ্রত। কিছু একটা করতে তো হবেই, তবে কি করতে হবে, তা মেধার পরবর্তী পদক্ষেপের উপর দাঁড়িয়েই আমরা সিদ্ধান্ত নিতে পারবো। তাঁর নেওয়া পদক্ষেপ যে কতটা বিচিত্র ও কতটা ঘাতক সিদ্ধ হয় আমাদের জন্য, তা তো দেখেই নিলেন আপনারা। তাই তাঁর পদক্ষেপকে এরপর থেকে চালরূপেই ধরে চলবেন, অর্থাৎ সম্মুখে যা দেখাবে সে, তা তার যোজনার মাত্রই ডগা হবে, সম্পূর্ণ যোজনা হবেনা।

এইবারের মত ভুলেও তাঁর চালে পা দিয়ে দেবেন না। তাঁর চালের বিপরীতে চাল মেরে মেরেই, তাকে বশীকরণ করতে হবে, আর একবার মেধাকে বশীকরণ করা হয়ে গেলে, ছায়াপুরে কেবল ও কেবল আমাদের রাজত্ব থাকবে। তাই মেধাকে পরবর্তী চাল গ্রহণের জন্য আমাদের বাধ্য করতে হবে, আর তা সে তখনই গ্রহণ করবে, যখন তাঁর মাতাপিতা ও ভগিনীরা বিপদে আচ্ছন্ন  থাকবে। তাই তাঁদেরকে আজ রাত্রেই কারাবন্দী করে নাও, আর মেধাকে পরবর্তী চাল গ্রহণে বাধ্য করো। সে চাল দিলে, তবেই তাকে কিস্তিমাত দেওয়া সম্ভব হবে। হ্যাঁ, ওরই চালে ওকে মাত দিতে হবে”।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22