জগদ্ধাত্রেয় কাণ্ড (কৃতান্ত দ্বিতীয় কাণ্ড)

কাতারাজ্যের সেনা মেদিনী রাজ্যের সীমান্তেই অপেক্ষা করছিল। এই দুইরাজ্যের সেনাকে একত্রিত করে, বিশাল সেনা নির্মিত হলে, সেই ৭ সহস্র সেনা নিয়ে বীর্য ও ভৃগুসেন আক্রমণ করলেন মেদিনীরাজ্য। মেদিনীরাজ্যের সেনাবল বিশাল। ১৩ সহস্র সেনাবল। তারই সাথে অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সাথে যুদ্ধ করা সেই সেনার একটি বিশেষ বিশেষত্ব। আর তারই সাথে মেদিনীরাজ্যের নামকরা মজবুত দুর্গ।

এটি তিনের কারণে, যুদ্ধ জয় যে অতি সহজ হবে ভেবেছিল বীর্য আর ভৃগু, তা কিন্তু হলো না। প্রায় তিন মাস যুদ্ধ করতে হয় তাঁদেরকে, তবে দুর্গের দ্বার ভাঙতে সক্ষম হয় তাঁরা। দুর্গের ভিতরে গিয়েও, সহজ হয়না সেনার পক্ষে, যুদ্ধ জয় করা। পদে পদে বিপদ অপেক্ষা করে সেনার জন্য। আর সেই সমস্ত বিপদ পেরিয়ে, সেনা যখন রাজা বিশারদের কাছে পৌঁছান, তখন আর মাত্র এক সহস্র সেনা অবশিষ্ট ছিল তাঁদের কাছে।

দুর্গের পশ্চাৎদেশের ৩ সহস্র সেনার সাথে মোকাবিলা করা তখনও শেষ ছিল, কিন্তু সেই যুদ্ধ আর হতে হলো না। প্রায় আরো দুই মাসের যুদ্ধপর যখন রাজা বিশারদের সম্মুখে এসে পৌঁছালেন বীর্য ও ভৃগু, তখন বিশারদ প্রাণ হাতে করে পলায়ন শুরু করলেন।

বিশারদকে মৃত্যু দেবেন, এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে এসেছিলেন দুই রাজা। তাই তাঁরাও পশ্চাৎধাবন করলেন বিশারদের। সম্মুখে তিন সহস্র সেনা প্রতিরোধ করা শুরু করলে, বীর্য ও ভৃগু তথা তাঁদের ১ সহস্র সেনা ভয়ঙ্কর যুদ্ধে লিপ্ত হলেন, আর তারই মাঝ থেকে বীর্য ও ভৃগু সেনার ভিড় থেকে সরে গিয়ে, দুর্গের শেষ প্রান্তে এসে নাগাল পেলেন বিশারদের। নাগাল পেলেন বলাও ভুল হবে, কারণ অবশেষে বীর্যকে নিজের তরবারি নিক্ষেপ করে বিশারদের পাদুকাদের বিদ্ধ করতে হয়, তাঁর পলায়নকে বন্ধ করার জন্য।

পলায়ন স্তব্ধ হলে, ক্লান্ত বীর্য ও ভৃগু বিশারদের নিকটে যেতে, বিশারদ হাতজোর করে ক্রন্দন করতে করতে বলতে শুরু করলেন, “আমার রাজ্য নিয়ে নাও, আমাকে প্রাণে মেরো না!”

ক্রুদ্ধ ভৃগু বললেন, “কেন? তুই তো মাতা সর্বাম্বাকে আমাদের প্রাণ নেবার জন্যই বারবার যাচনা করতে গেছিলিস, তাই না! … তুই কি তাঁকে এই বলতে গেছিলিস যে, বীর্য আর ভৃগুকে প্রাণে মেরো না, তাঁদের রাজ্য ছিনিয়ে নাও! … তাহলে আজ তোকে প্রাণে কেন মারবো না!”

বীর্যও ক্লান্ত হয়ে বললেন, “তোর সেনা এত পরিশ্রমী, এতো ক্ষিপ্র আর নিষ্ঠাবান যোদ্ধা, আর তাদের রাজা এমন ভীরু! … সাহস থাকে তো যুদ্ধ করো আমাদের সাথে। চলো, যেকোনো একজনকে বেছে নাও আমাদের মধ্যে, সে-ই তোমার সাথে যুদ্ধ করবে। … উঠে দাঁড়াও, যুদ্ধ করো”।

বিশারদ ক্রমগত নিজের হাতের তালু নাড়তে নাড়তে ক্রন্দন করতে থাকলেন আর বলতে থাকলেন, “আমি যুদ্ধ করতে পারবো না, জখম লাগলে খুব লাগে! …”

অনেকবার এমন বলার পর, ধৈর্যচ্যুতি ঘটলো ভৃগুর মধ্যে। সে বলে উঠলো, “অহেতুক সময় নষ্ট করছো এঁর সাথে মিত্র। ভীরু, কায়ের একজন। একে তুমি যোদ্ধা বলো! হাতে চুরি পড়ে বসে রয়েছে। খালি এর পায়ে পড়ে, আর ওর পায়ে পড়ে”। এই বলে তরবারি চালিয়ে হত্যা করতে চাইলে, ভয়ে বিশারদ সরে গেলে, তার মুণ্ডের পরিবর্তে তার চরণ কাটা যায়। আর তাই সে প্রবল আওয়াজ করে ওঠে বেদনায়।

বীর্য এবার ক্রুদ্ধস্বরে বলে উঠলো, “এই স্বর শুনে না মাতা সর্বাম্বা জেগে ওঠেন!” এই বলে, সরাসরি, কেশ আকর্ষণ করে, গরদানে প্রহার করে, মুণ্ডচ্ছেদ করে দিলেন বিশারদের।

রাজার পতনের পর, অবশিষ্ট সেনা নিজেদের অস্ত্র ত্যাগ করে দিলে, মেদিনী রাজ্যকেও অধিকার করে নিয়ে, একাধারে কাতা, মালদ ও মেদিনী রাজ্যের অধিকার করে নিলেন ভৃগু ও বীর্য। সেই সাথে সাথে, ভৃগুসেনকে ঘৃতকুমারীদের সাথে বিবাহ প্রদান করে, প্রায় ৭ মাস পড়ে, বীর্য মালদরাজ্যে নিজের রাণী, দেবী শৃঙ্খলার কাছে প্রত্যাবর্তন করে দেখলেন তিনি তখন তাঁর সন্তানকে গর্ভে ধারণ করে অন্তঃসত্ত্বা।

অন্যদিকে, এই কালে দেবী হুতা, মিতা ও স্ফীতার সর্বাধিক প্রয়োজন ছিল বীর্যের, কিন্তু তাঁরা সেই কালে বীর্যের সাথে যোগাযোগও স্থাপন করতে পারলো না। আর সেই কালে, চন্দননগরে একের পর এক অনুষ্ঠান হয়েই চলেছিল। যেমন দেবী চিত্তার সাথে সলাপরামর্শ করেছিলেন, সেই অনুসারেই, ছন্দচিৎকে যুবরাজ ঘোষণা করে, নিজের সঙ্গে উপবেশন করানো শুরু করেছিলেন করিমুণ্ড।

দেবী হুতারা একাধিকবার এই বিষয়ে নিজেদের পুত্রদের নাম সুপারিশ করতে গেছিলেন, কিন্তু কিছুতেই তাঁদের কথাকে কর্ণকুহরে স্থান দেন নি, মহারাজ করিমুণ্ড। দেবী হুতা এই বিষয়ে নিজের ভগিনীদের কাছে গর্জন করে উঠে বারংবার বলতে থাকলেন, “প্রথমে ওই চিত্তাকে রাজ্য থেকে নিষ্কাসিত করলো না, এখন তার পুত্রকেও যুবরাজ ঘোষণা করে, তাকে মহারাজ হয়ে ওঠার শিক্ষা প্রদান করে চলেছেন। … কি এতো চিত্তার প্রতি আঠা কে জানে! … কামুকীও তো নয় চিত্তা, না বুঝতাম যে, স্বামী চলে যাবার পর, দেওরকে নিজের কামপাশে আবদ্ধ করেছে”।

স্ফীতা বলতেন উত্তরে, “রূপ, রূপেই বশ করে নিয়েছে চিত্তা আমাদের স্বামীকে। দাসীরা কি বলে শুনেছ! তারা বলে, আগে মহারাজ দেবী চিত্তার কক্ষে প্রবেশ করতেন না। অন্ধ হয়ে যাবার পর, কক্ষেও প্রবেশ করে। কক্ষের দ্বারে দাস সুধামাকে দাঁড় করিয়ে রেখে যান”।

দেবী মিতা বললেন, “একবার সুধামাকে ডেকে প্রশ্ন করলে কেমন হয়! মহারাজ কি কথা বলেন, সেই সম্বন্ধে পূর্ণ ছবি লাভ করা যাবে”।

তিন রাণী এমন পরামর্শ করলে, সুধামাকে ডেকে পাঠানো হয়। সুধামাকে প্রশ্ন করলে, সুধামা বলেন, “মহারানীরা, মহারাজ সর্বদাই দেবী চিত্তার পবিত্রতা দর্শন করে অবিভুত থাকতেন। মহারাজ আমার মালিক হবার সাথে সাথে আমার মিত্রও। তাই আমি তাঁকে এই বিষয়ে প্রশ্নও করেছি যে তিনি কি দেবী চিত্তাকে নিজের পত্নী করে লাভ করতে চেয়েছিলেন! উত্তরে মহারাজ সর্বদা বলেছেন, দেবী চিত্তা হলেন মাতা জগদ্ধাত্রীর ভৌতিক প্রকাশ যেন। তাঁকে স্ত্রী করে লাভ করার স্বপ্ন তাঁরই দেখা উচিত যিনি স্বয়ং পবিত্র, আমি সেই তালিকাতে পরিনা নিশ্চয়ই।

মহারাজ বরাবর বলেন, দেবী চিত্তাকে সর্বদাই তাঁর মাতা বেশে লাভ করার আকাঙ্ক্ষা থাকে। মা রূপে পেয়েওছেন তাঁকে, কারণ বৌদি মানে মাতাসমানই। কিন্তু নিজের চরিত্রের দিকে তাকিয়ে, দেবী চিত্তার ন্যায় পবিত্র স্ত্রীর অঙ্গে কালিমা লেপিত হতে পারে, তাই দেবী চিত্তাকে মাতারূপ পেয়েও, তাঁর নিকটে কখনো যেতেন না। সর্বদা তাঁর দ্বারে গিয়ে, দ্বারে দাঁড়িয়েই তাঁর সাথে আলাপ করতেন, যাতে দাসীরা জানতে পারেন যে দেবী চিত্তা তাঁর মাতৃরূপা ভিন্ন অন্য কিচ্ছু নয়।

আসলে মহারাজ সর্বদা দেবী চিত্তার সম্মান, পবিত্রতা আর শুদ্ধতার প্রশংসক, আর নেপথ্যে তার রক্ষকও। ঈর্ষা ছিল তাঁর ভ্রাতার প্রতি, কিন্তু তাই জন্য কভু ভ্রাতাকে স্নেহ করেননি, এমন হয়নি। তাঁর ভ্রাতা, প্রয়াত মহারাজ পদ্মচিত্ত, তাঁর কাছে সর্বদা এক সাধুতুল্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন। সর্বদা তিনি আমাকে বলতেন, আচ্ছা মাতাকে তো আমিও পাইনি, আর ভ্রাতাও পাননি। আমি এমন দুচরিত্রের হলাম কি করে, আর পাশাপাশি আমার ভ্রাতা এমন নিস্বার্থপর সাধুতুল্য কি করে হলেন!

ভ্রাতা চলে যাবার পর, দেবী চিত্তার পবিত্রতাকে বিনষ্ট করার প্রয়াস অনেকেই করবে, এমন তাঁর ধারণা ছিল, দেবী চিত্তার অপার রূপের কারণে। তাই তিনি কিছুতেই রাজি হননা, বিধবা রাণীকে রাজপ্রাসাদের বাইরে রাখার রীতি মানতে। দেবী চিত্তা তাঁর কাছে মাতা জগদ্ধাত্রীর প্রতিবিম্ব। অপার সম্মান তাঁর দেবীর প্রতি, আর দেবী চিত্তাও মহারাজকে পুত্রসমান ভ্রাতা জ্ঞান করেন। স্বামীর ভ্রাতা, বরাবরই তাঁর কাছে ভ্রাতা সমানই ছিলেন।

আজ যখন মহারাজ অন্ধ হয়ে গেছেন, তখন আর দ্বারে দাঁড়িয়ে কথা বলা মহারাজের পক্ষে সম্ভব হয়না, কারণ দ্বারে আমি দণ্ডায়মান থাকি মহারাজের সাথে। তাই মহারাজকে স্নেহের ভ্রাতাজ্ঞান করে, দেবী চিত্তা তাঁকে দ্বার থেকে কক্ষের মধ্যে নিয়ে যান, আর কথাবার্তার শেষে, দ্বারে পুনরায় দিয়ে যান”।

দেবী হুতা প্রশ্ন করলেন, “কি কথা হয়, তুমি শুনতে তো পাও নিশ্চয়ই! তা কি বিষয়ে কথা বলেন?”

সুধামা হেসে বললেন, “মহারানী, রাজমাতার দ্বার একমাত্র তিনি যখন রজসিলা থাকেন, তখনই বন্ধ থাকে, অন্যসকল সময়ে রাজমাতার দ্বার উন্মুক্ত থাকে। … তাই কানপাততে হয়না, মহারাজের কথাবার্তা শ্রবণের জন্য। মহারাজ রানিমার কাছে যান রাজ্যের কল্যাণ কি ভাবে সাধিত হবে, সেই পরামর্শ করার জন্য”।

সুধামাকে আর প্রশ্ন করলেন না হুতারা। কিন্তু সুধামা চলে যাবার পর, হুতা নিজের বস্ত্রগহনাসমূহ একত্রিত করতে শুরু করলেন। সেই দেখে মিতা প্রশ্ন করলেন, “কি করছো দিদি! কোথাও যাবার চিন্তা করছো?”

দেবী হুতা উগ্র হয়ে বললেন, “যেখানে মহারাজ আমাদের সাথে পরামর্শ না করে চিত্তার সাথে পরামর্শ করে শাসনপন্থা নির্ণয় করেন, সেখানে আমি থাকবো না”।

স্ফীতা বললেন, “শান্ত হও দিদি, আমাদের পুত্রদের অধিকার পাইয়ে না দেওয়া পর্যন্ত আমরা এখান থেকে যাবো না। এখন যদি আমরা চলে যাই এখান থেকে আমাদের পুত্ররা সম্পূর্ণ ভাবে নিজেদের অধিকার হারিয়ে ফেলবে এই রাজ্যের উপর থেকে আর রাজ্যের সিংহাসনের উপর থেকে”।

হুতা পুনরায় উগ্র হয়ে বললেন, “সে তো হারিয়ে ফেলেইছে, আবার নতুন করে কি হারাবে!”

স্ফীতা বললেন, “দিদি, আমাদের পুত্ররা এখনো তার মাতুলের সাথে ঘুরে বেড়াচ্ছে। প্রথম তাদেরকে এখানে আনার ব্যবস্থা করতে হবে, আর তার সাথে বীর্যকেও। এঁরা একত্রে চিত্তার পুত্রদের নিশ্চিত ভাবে রাজ্যছাড়া করে দেবে। কনো না কনো যোজনা ওরা ঠিক করবেই, প্রয়োজনে প্রাণও নিয়ে নেবে এঁদের”।

মিতা সংশয় প্রকাশ করে বললেন, “তোমার মনে হয় যে, চিত্তাপুত্রদের প্রাণ নেওয়া সম্ভব!… কি পরিমাণ বলশালী, সমস্তই তো শুনেছ!”

স্ফীতা ক্রুর হাস্য হেসে বললেন, “যুদ্ধে প্রাণ নেওয়া সম্ভব নয়, কিন্তু ষড়যন্ত্র তো প্রাণ নিতেই পারে। … অত্যন্ত সরল তারা। সহজে সকলকে বিশ্বাস করে। বীর্য তাদের গুরু, আর আমাদের পুত্ররা তাদের ভ্রাতা। কনো না কনো কিছু করে, ছলে বলে বা কৌশলে, এঁদের হত্যা করতেই হবে, কারণ এঁরা জীবিত থাকলে, আমাদের পুত্ররা কখনোই কনো পদে স্থাপিত থেকেও শান্তি পাবে না। কখনোই একচ্ছত্র সম্রাট হতে পারবেনা তারা”।

হুতা বিরক্ত হয়ে উঠে বললেন, “সম্রাট এমনিতেও হতে পারবেনা। সম্রাট হবার জন্য সমস্ত রাজ্যকে জয় করে নিতে হয়। মুর্শিদরাজ্য মানে শূন্যপুরকে জয় করতে পারবে বীর্য? সর্বাম্বার সম্মুখে দাঁড়াতেও পারবে সে?”

মিতা বিরক্ত হয়ে উঠে বললেন, “এই সর্বাম্বা এক বড় বাঁধা। বুড়ি হয়ে গেল, এখনও নিজের অবতার লীলা শেষ করে যাবার সময় এর হলো না। … সমস্ত অঙ্ক গরমিল করে দেয় এই একাকী সর্বাম্বা”।

স্ফীতা বাতায়নের দিকে ক্রুর দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললেন, “করবে, সময় আসন্ন। দেখলে না, নিষ্ঠাবানকে বাঁচাতে তিনি এলেন না, অর্থাৎ তিনি চিত্তাপুত্রদের প্রতি আসক্ত। একবার যদি তাঁর এই আসক্তিকে ভেঙে দেওয়া যায়, তাহলে নিশ্চিত ভাবেই তিনি দেহত্যাগ করবেন। আর একবার বিচার করে দেখো, চিত্তার পুত্ররা নেই, সর্বাম্বা নেই। সমস্ত জম্বুদেশ আমাদের পুত্ররা দখল করে নেবে। করিন্দ্র হবে সম্পূর্ণ জম্বুদেশের সম্রাট, আর ভ্রাতা বীর্য হবেন সমস্ত জম্বুদেশের আমাত্য”।

হুতা নির্মোকটির সাথে মাথা নেড়ে বললেন, “তুমি দিবাস্বপ্নই দেখো স্ফীতা। তোমার এই স্বপ্ন কখনো পূর্ণ হবেনা”।

তৃতীয় এক কণ্ঠস্বর বলে উঠলেন, “হবে হবে, স্ফীতার কথার মধ্যে আমি এক অদ্ভুত আলোক দেখতে পেলাম। সঠিক বলেছে সে, চিত্তাপুত্ররা নিহত হলে, সর্বাম্বাও নিশ্চিত ভাবে দেহ ছেড়ে দেবেন। আর তখন করিন্দ্রদের আটকানো কনো ভাবেই সম্ভব হবেনা”।

সকলে ঘুরে দেখলেন, “ভ্রাতা তুমি!… এতাবৎ কাল তোমাকে দেখতে না পেয়ে কেমন যেন অসহায় অসহায় লাগছিল। … খবর সমস্ত কুশল তো?”

হাস্যপ্রদান করে, বীর্য বললেন, “শৃঙ্খলা গর্ভবতী ছিল। একই সাথে চার যমজ কন্যার জন্ম দেবার কালে, তাঁর স্বাস্থ্যের অবস্থা অত্যন্ত চিন্তাদায়ক হয়ে উঠেছিল বলে এদিকে আসতে পারিনি। … আজ আমি তোমাদের কাছে তোমাদের পুত্রদের নিয়ে সেই সুসংবাদই দিতে এসেছিলাম যে, শৃঙ্খলা চার পুত্রীর জন্ম দিয়েছে, আর আমি তাঁদের নামকরণ করেছি, রীতি, আচার, প্রথা ও পরম্পরা। …

এছাড়াও তোমরা জানোই যে মেদিনীরাজ্য আমরা অধিকার করেছি আর ঘৃতকুমারীরা ভৃগুসেনের বীর্য ধারণ করে এখন সকলেই গর্ভবতী। অর্থাৎ যতটা আমাদের যোজনা ছিল যে, কাতারাজ্য, মালদরাজ্য আর মেদিনীরাজ্য আমাদের অধীনে আসবে, তা এসে গেছে। এবার প্রশ্ন হলো মুর্শিদরাজ্য, অর্থাৎ শূন্যপুর। … সত্য বলতে, আমি এঁর কনো কিছু সমাধান খুঁজেই পাচ্ছিলাম না। তবে স্ফীতা সঠিক বলেছে। চিত্তাপুত্ররাই সর্বাম্বার অন্তিম আশা।

আসলে সে দেহ ধরে অবস্থানই করছিল, শক্তিশালী এবং তাঁর প্রতি অনুগত কিছু রাজপুত্রদের জন্য। আর চিত্তার পুত্ররা অনুকূল ভাবে তাঁর আবশ্যকতা অনুসারে স্থিত। তাঁর অভিসন্ধিই ছিল যে, তাঁর অনুগত কারুর হাতে রাজ্য সঁপে চলে যেতে। কিন্তু সেই অনুগত থাকলেও, তেমন শক্তিধর ছিলেন না যে জম্বুদেশের সম্রাট হতে পারবে। তাই নিশ্চিত ভাবে, সর্বাম্বা চিত্তাপুত্রদের সম্রাট করার দৃষ্টি নিয়েই বসে আছে। অর্থাৎ যদি চিত্তার পুত্ররা সম্রাট হতে পারে, বা যদি তাঁদের নাশ হয়ে যায়, তবেই সর্বাম্বা নিজের অবতারলীলা ত্যাগ করবে।

এবার প্রসঙ্গ এই যে, চিত্তার পুত্রদের যদি একবার সম্রাট করে দেওয়া হয়, তাহলে সর্বাম্বা এমন ভাবে সমস্ত কিছুকে নিজের অধিকারে করে নেবে যে তাঁর থেকে সেই অধকার ছিনিয়ে নেওয়া কনো ভাবেই সম্ভব হবেনা। অর্থাৎ, চিত্তাপুত্রদের হত্যার চিন্তা করাই সঠিক রাজনীতি হবে। কিন্তু কথা হুতা আর মিতারও সত্য, চিত্তাপুত্ররা এতটাই শক্তিশালী যে সম্যক যুদ্ধে এক সর্বাম্বাই তাঁদের পরাস্ত করতে সক্ষম, অন্যকেউ নন। তাহলে কি করনীয়?

একটিই উপায়, ষড়যন্ত্রের বলে, এঁদের হত্যা করতে হবে। একবার জম্বুদেশ এই বলশালীদের থেকে মুক্ত হয়ে গেলে, হতাশ সর্বাম্বা দেহ ছেড়ে দেবেন, আর নিজের অবতারলীলার সমাপ্তি করে দেবেন। আর একবার তা হয়ে গেলে, অর্থাৎ চিত্তাপুত্ররা নেই, সর্বাম্বা নেই, তো সম্যক জম্বুদেশ আমাদের হয়ে যাবে। সর্বাম্বার এতকালের প্রয়াস যেই কৃতান্তিকরাজ্য স্থাপনের, তা সম্পূর্ণ ভাবে সমাপ্ত হয়ে যাবে, আর আমরা পুনরায় জম্বুদেশকে আর্যরাজ্য করে তুলতে পারবো।

পুনরায় বৈদিক আচার স্থাপন করতে পারবো এখানে। পুনরায় আচার অনুষ্ঠান, রীতি রেওয়াজ, প্রথা পরম্পরা স্থাপন করে করে, সকল মানুষকে মূর্খ করে তুলতে পারবো, আবার প্রকৃতিকে বিনষ্ট করে, আত্মের পূজা, পরমাত্মের পূজা স্থাপন করে, সকলকে আত্মকেন্দ্রিক করে তুলতে পারবো, আর একবার তারা আত্মকেন্দ্রিক হয়ে উঠলে, ঠিক যেভাবে আমাদের মাতা, দেবী মোহিনী দশ-এগারোটি পেশার দ্বারা সমস্ত প্রজাকে অলিখিত ভাবে পরাধীন করে দিয়ে, তাঁদের সমস্ত ধন, মান, সম্মান ও দেহ সম্ভোগ করার উপায় করেছিলেন, ঠিক অনুরূপ ভাবে আমরাও তাই স্থাপন করতে পারবো।

ধন্যবাদ স্ফীতা। সঠিক সময়ে সঠিক বুদ্ধি দেবার জন্য। … ভৃগুসেন তাঁর পত্নীদের নিয়ে এখন সন্তানপ্রাপ্তির জন্য প্রয়াসরত। সেই ফাঁকে, আমাদেরকে চিত্তাপুত্রদের নাশ নিশ্চয় করে, সর্বাম্বার অবতারলীলার অন্ত নিশ্চয় করে ফেলতে হবে। একবার তা হয়ে গেলে, আমার চার কন্যা আর ঘৃতকুমারীদের ১৬ কন্যার সাথে রাজপুত্রদের বিবাহ দিয়ে, করিন্দ্রকে সম্রাট করে স্থাপিত করতে পারবো। আর তারপর শুরু হবে আমাদের মোহিনীরাজ্য, ছায়াপুর স্থাপনপ্রক্রিয়া”।

কক্ষে এবার করাভকে সঙ্গে নিয়ে করিন্দ্র প্রবেশ করে, বললেন, “মামা, দেবী মোহিনীর ছায়াপুর রাজ্য নির্মাণের প্রক্রিয়া আমি শুনেছি। কিন্তু আমি সেই সম্পূর্ণ ব্যাপারের মধ্যে যোজনাটি ঠিক কি, তা ধরতে পারিনি। কি ভাবে বেদের বিস্তার দ্বারা, এগারোটি পেশার নির্মাণ আর প্রজাকে নিজেদেরই আত্মবোধে বদ্ধ করে দেওয়া সম্ভব হলো, তা আমার কাছে বোধগম্য হয়নি। সেই বিষয়ে আমাকে একটু বুঝিয়ে বলো না”।

দেবী হুতা পুত্রকে বহুদিন পড়ে দেখে, আনন্দিত হয়ে তাঁর কাছে এগিয়ে গিয়ে, তাঁর অঙ্গে বারংবার নিজের কর দ্বারা স্নেহপ্রদান করে করে বললেন, “কেমন আছিস তুই করিন্দ্র! তোদের ছাড়া তো তোদের মায়েরা অসহায় হয়ে পরেছিল!”

করিন্দ্র হেসে বললেন, “ভালো নেই মা! পিতা সরাসরি ছন্দকে যুবরাজ করে দিয়ে মটেও উচিত কাজ করেন নি। তিনি বুঝিয়ে দিলেন, নিজের পুত্রদের তিনি একদমই স্নেহ করেন না”।

দেবী মিতা উত্তরে বললেন, “এমন বলতে নেই পুত্র। তোমার উপর আসা বাণকে তিনি নিজে গ্রহণ করে অন্ধ হয়ে গেছেন। এরপরেও তুমি এমন কি করে বলো? … হতে পারে, তোমার আচরণের কারণে অন্ধ হয়ে যেতে হয়ে, ব্যথিত তোমার পিতাই এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন”।

দেবী স্ফীতা বললেন, “পুত্র করিন্দ্র, তোমার সমস্ত ভ্রাতাদের উপস্থিত করো এখানে আর মোহিনীস্থাপিত ছায়াপুরের যোজনাকে তোমরা সকলে শ্রবণ করো। এমন করো যেন, আর কেউ উপস্থিতই না থাকেন যে এমন অভিশাপ প্রদান করার সামর্থ্য ধরুক। তার জন্য, মোহিনীযোজনা স্থাপন অনিবার্য পুত্র। তাই তোমরা সকল ভ্রাতা মিলে সেই যোজনার গুহ্যনীতি শ্রবণ করো আর সময় আসলে, তা ব্যবহার করো”।

সকলে সেই কথাতে সহমত হলে, করিন্দ্র নিজের সমস্ত ভ্রাতাদের উপস্থিত করলেন সেই কক্ষে, আর বীর্য সকল ২০ ভাগ্নে, এবং তাঁদের তিন মাতার উদ্দেশ্যে বললেন, “বেদের আরাধ্য হলেন পরমাত্ম। পরমাত্মের অর্থ হলো পরম আত্ম। আত্ম অর্থাৎ আমিত্ব, অর্থাৎ অহম। অর্থাৎ বেদ আমিত্বের আরাধনা করে। আমিত্বের ত্রিগুণ, সত্ত্ব, রজ ও তম বেদের প্রধান আরাধ্যা। আর এই আত্মবোধসর্বস্বতাই ছিল দেবী মোহিনীর রাজ্য বিস্তারের যোজনা।

এগারোটি পেশার মাধ্যমে, প্রজাকে এমন অবস্থায় উন্নীত করেছিলেন যাতে তাঁরা ধন ও সম্ভোগ ব্যতীত কনো কিছুকে ধারণ না করে, কারণ এই এগারো পেশাতে নিযুক্ত যারা, তাঁরাই ছিলেন রাজ্যের সর্বাধিক সম্মানীয় ব্যক্তি, আর তাছাড়া রাজ্যে সমস্ত কিছুই ক্রয় করতে হতো সেখানে, অর্থাৎ ধন আবশ্যক ছিল। এরবার কথা এই যে, যখনই এমন কনো কিছুকে মাত্রা রূপে স্থাপন করা হয়, যার প্রাচুর্য থাকলে প্রজা সম্মানের অধিকারী হন, আর তা হয় ভৌতিক বস্তু, অর্থাৎ এই ক্ষেত্রে যা ছিল ধন, তখনই প্রজার মধ্যে জেগে ওঠে প্রতিযোগিতার বাতাবরণ জন্ম নেয়, কারণ এই ভৌতিক বস্তু তো যে কেউ অর্জন করতে সক্ষম।

তাই, প্রথমেই দেবী মোহিনী ধনকে ও ধনীকে শ্রেষ্ঠত্বের মান দেওয়া শুরু করেন, আর তা করার জন্য এগারোটি পেশাকে স্থাপন করেন। এর মধ্যেও, প্রকৃতি জ্ঞান, কালের জ্ঞান, ও জীবনের জ্ঞান, মানুষকে ধনবিমুখ করে তুলতে পারে। তা যাতে না করে, সেই জন্যে, বিদ্যালয়ের নির্মাণ করে, তাতে কল্পনাশিক্ষার প্রচলন করেন, যান্ত্রিকতার সঞ্চার করেন, আর চিকিৎসার নাম করে রোগের বিস্তার করেন, আর এই সমূহকে পেশা করে রেখে দেন।

এর ফলে, ধনকে সর্বস্ব না মানার কনো স্থানই অবশিষ্ট রাখেন না দেবী মোহিনী। এমন করার ফলে, প্রতিযোগিতা যেমন বৃদ্ধি পায় সমস্ত প্রজার মধ্যে, তেমনই যেই স্নেহের রুক্ষতা নির্মাণ করে, সেই রুক্ষতার থেকে রক্ষা পেতে, কামসম্ভোগের বিস্তার হয় প্রজার মধ্যে। আর এই ধন, কাম ও সর্ব প্রকার সম্ভোগ এবং অধিক ধনলাভ করে অধিক সম্মানীয় হবার লোভ যখন প্রজাকে প্রতিযোগিতামূলক করে তোলে, তখন তাঁদেরকে বাধ্য করে, আত্মসর্বস্ব হতে।

সর্বসময়ে আমার কিসে ধনলাভ হবে, এবং অন্যের কিসে ধনহানি হবে; আমি কি করে অধিক কামসম্ভোগ লাভ করতে পারবো, আর কি ভাবে অন্যের কামসম্ভোগের উপর নিজের অধিকার স্থাপন করতে পারবো; সর্বক্ষণ অন্যের ধনসম্পত্তি করায়ত্ত করে নেবার প্রয়াস; ইত্যাদি সর্বস্বভাবে নিজেদের আত্মকে নিয়েই উলমালা থাকতে শুরু করে। আর ঠিক সেই কালেই বেদের মন্ত্র তাঁদের সম্মুখে স্থাপন করেন দেবী মোহিনী। প্রজা দেখেন যে, তাঁরা যা করছেন, তা যে ধর্মসম্মত, কারণ বেদ তো এই আত্মেরই পরম অবস্থাকে আরাধনার কথা বলে।

তাঁরা দেখেন, বেদ তো এই আত্মেরই ত্রিগুণ, সত্ত্ব, রজ ও তমকে আরধনা করার জন্য প্রেরণা দেয় এবং তাঁদের আরাধনাকেই ধর্ম বলেছে। বেদ তো বলেইছে, প্রকৃতির উপর অধিকার স্থাপন করে বশ করো প্রকৃতিকে, এবং আত্মকে আরাধনা করো। এই আত্মই, এই পরমাত্মই এই ব্রহ্মাণ্ডই নির্মাণ করেছে, আর তাই সে-ই সর্বেসর্বা। মাঝে এই প্রকৃতি এসে যেতে পরমাত্মকে যোজনা করতে হয়, কি ভাবে এই প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

বেদে এও বলেছে যে, এই পরমাত্ম নিয়তিকে কিছুতেই করায়ত্ত করতে পারেনা। কিন্তু দেবী মোহিনী অতি কৌশলে সেই কথাকে চেপে দেন, কারণ বেদও সেই কথাকে চেপেই রাখতে চেয়েছে। আর তাই প্রজা যে আত্মসর্বস্ব হয়ে উঠেছিল, তাকেই ধর্মসম্মত মেনে নিয়ে, উদ্যন্ড, সম্ভোগী, মহাস্বার্থপর হয়ে, কেবলই আমিত্ব, অর্থাৎ আমি, আমার, আমাকে, এইসমস্ত কিছুর মধ্যে নিজেদের আবদ্ধ করে রাখলে, দেবী মোহিনী, আত্মসর্বস্ব প্রজার সমস্ত আত্মসন্তুষ্টির স্থান, যার প্রতি প্রজা ছিলেন আসক্ত, তার থেকে কর গ্রহণ করে করে, মিথ্যাচার করে, তাকেই সত্য বলে স্থাপন করে তার থেকে অধিক থেকে অধিক শুল্ক গ্রহণ করে করে, মহাধনি আর মহাশক্তিশালী হয়ে উঠছিলেন”।

করিন্দ্র মাথা নেড়ে বললেন, “বুঝে গেছি, সেই পাকা ধানে মই দিয়েছিলেন দেবী সর্বাম্বা, অর্থাৎ যিনি তখন দেবী মেধার বেশে ছিলেন। বেদের কথন অনুসারে সমস্ত কিছু করার কারণে, দেবী মোহিনী হয়ে উঠছিলেন সেখানের ভগবান, আর তাই তাঁকে বিনষ্ট করে দিয়ে, তাঁর উৎস, অর্থাৎ সমস্ত আত্মকুলকে বিনষ্ট করে দেন সর্বাম্বা। এই সর্বাম্বাকে হাতের নাগালে পেলে না! …”

দেবী হুতা গর্জন করে বলে উঠলেন, “কিচ্ছু করতে পারবে না … পুত্র, আত্ম অর্থাৎ আমাদের কুলের শুরু যার থেকে, দেবী মোহিনী অর্থাৎ আমাদের মাতা, এঁরা সকলে বেদকে ধারণ করে, নিজেদের ভগবান রূপে স্থাপিত করতে চেয়েছিলেন। বেদও একই ভাবে, নিজেকে দিব্যগ্রন্থরূপে প্রচার করে, আত্মকে ও পরমাত্মকে ভগবান রূপে স্থাপনের প্রয়াস করেছে মাত্র। কিন্তু দেবী সর্বাম্বা হলেন সাখ্যাত ঈশ্বর। তাঁকে তাঁর ঈশ্বরত্ব স্থাপন করার জন্য প্রয়াস করতে হয়না। কৃতান্ত হলো সাখ্যাত তাঁর কথন, তাঁর বচন। তাঁকে ঈশ্বরীয় গ্রন্থ রূপে নিজেকের প্রচার করতে হয়না।

তাই পুত্র, তাঁর কিচ্ছু করতে পারবেনা, কারণ তিনি ঈশ্বর হতে চাননা, তিনি স্বয়ং ঈশ্বর। … তাই পুত্র, তোমাদের মামা যা বলছেন, সেই কথা শ্রবণ করো মনোনিয়োগ করে। মাতা সর্বাম্বা এসেছেন আত্মমুক্ত জগত নির্মাণের উদ্দেশ্যে। আর তাই তাঁর প্রয়োজন ছিল শক্তিশালী কারুকে যারা আত্মসর্বস্ব তো ননই, বরং ঈশ্বরসর্বস্ব। … দীর্ঘ অপেক্ষার পর, মাতা সর্বাম্বা চিত্তাপুত্রদেরকে সেই রূপে লাভ করেছেন। … আর তাই তাঁদের প্রতি তিনি নির্ভরশীল ও আসক্ত”।

করাভ প্রশ্ন করলেন, “কিন্তু তিনি তো ঈশ্বর। তাঁকে অপেক্ষা করতে হলো কেন? তিনি তো নির্মাণ করেই নিতে পারতেন!”

করিন্দ্র ও অন্যভ্রাতারাও সেই কথাতে সমর্থন করলে, দেবী স্ফীতা বললেন, “এখানেই তো তোমাদের ভুল ধারণা। … পুত্র বেদ কোথাও বলেনি যে ঈশ্বর এই জগতের নির্মাতা, বলেছে পরমাত্ম এই জগতের নির্মাতা। আর পরমাত্মের আরাধনা করে করে বেদ পরমাত্মকে ঈশ্বর রূপে দাবি করে গেছে মাত্র। … কিন্তু বাস্তব তো এই যে, পরমাত্ম তো ঈশ্বরই নন। ঈশ্বর হলেন সাখ্যাত নিয়তি, যিনিই পরমসত্য অর্থাৎ পরব্রহ্মের সেই সাকার প্রকাশ যা প্রকাশিতই হয়, সমস্ত চেতনাদের আত্মের কবল থেকে মুক্ত করে সত্যে প্রত্যাবর্তন করানোর জন্য।

ঈশ্বর হলেন শূন্য। তাঁর কেবল মাতৃত্ব, মমতা, প্রেম ও স্নেহ প্রদান করার ইচ্ছা হয়েছে বলে, তিনি ব্রহ্ম থেকে ব্রহ্মময়ী অর্থাৎ নিয়তি হয়ে উঠে, মানস ও আত্মকে সৃষ্টি করেছিলেন, আর তাঁদের উপবেশনের জন্য ধরা কে নির্মাণ করেছিলেন। ব্যাস, এতটুকুই তাঁর সৃষ্টি। এরপর, ধরার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে, ধরাকে অধিগ্রহণ করার জন্য, আত্ম নিজেকে পরমাত্ম রূপে স্থাপিত করে, অজস্র আত্মরূপ ধারণ করে, ধরাকে সম্ভোগ করতে উদ্যত হন, আর সেই কৃত্যের কারণে, মানসের সাথে নিযুক্ত চেতনা আত্মের কাছে বন্দী হয়ে যায়।

আর তবে থেকে মাতা ব্রহ্মময়ী সেই সমস্ত চেতনাদের সত্যের আলোকে আলোকিত করে করে, আত্মের কবল থেকে মুক্ত হবার প্রেরণা প্রদান করে যাচ্ছেন। সেই চেতনাকেই সুপ্ত রেখে রেখে, আত্ম বিস্তার করে এই ব্রহ্মাণ্ডের, সমস্ত যোনির , সমস্ত কিছুর। কিন্তু সেই সমস্ত কিছুর মধ্যেও সেই ব্রহ্মময়ীই প্রকৃতি বেশে স্থিত থেকে সমস্ত চেতনাদের প্রেরণা দিতেই থাকেন। আত্ম সেই চেতনাদের বশ করে নিয়ে কর্মে নিযুক্ত করেন, কিন্তু সেই কর্মের মধ্যেও ব্রহ্মময়ী নিজেকে যুক্ত করে নিয়ে, কালের নিয়ন্ত্রক কালী হয়ে, সমস্ত সময়ে চেতনাদের মধ্যে তাঁর কাছে যাবার আগ্রহ বৃদ্ধি করেই চলেছেন।

অর্থাৎ পুত্র, সমস্ত কিছু সৃষ্টি পরমাত্মের, ঈশ্বরের নয়, ব্রহ্মময়ীর নয়। সমস্ত জীব, সমস্ত যোনি, সমস্ত কিছু পরমাত্মেরই নির্মাণ। ব্রহ্মময়ী সবেতে চেতনাবেশে অবস্থিত, কিন্তু আত্ম সেই চেতনাকে চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনাদ্বারা সুপ্ত করে রাখতে ব্যস্ত। কিন্তু ব্রহ্মময়ী আত্মের সমস্ত সৃষ্টির মধ্যে প্রকৃতি বেশে থেকে, সমস্ত জীবদের দ্বারা করানো কর্মের মধ্যে দিয়ে কাল বেশে প্রবাহিত হয়ে, সেই চেতনাদের উস্কানি দিয়েই যাচ্ছেন।

ঠিক তেমনই ভাবে, চিত্তাপুত্রদের নির্মাণও হয়েছে পরমাত্মের কারণেই। তবে তাঁদের মধ্যে চিত্তার পবিত্রতা স্থাপিত থাকার কারণে, আর জগদ্ধাত্রীর বল থাকার কারণে, তাঁরা হয়ে উঠেছে অত্যন্ত বলশালী আর প্রকৃতির প্রতি, কালের প্রতি অনুগত। আর তাই সর্বাম্বা তাঁদেরকে যথার্থ রূপে ধারণ করে নিয়েছে, আত্মের স্ফীতিকে রোধ করার উদ্দেশ্যে। পুত্র ঈশ্বর না তো কনো কিছু সৃষ্টি করেন, আর না তাঁর সৃষ্টি করার কনো প্রয়োজন আছে। তিনি তো পূর্ণ ভাবে শূন্য, নিরাকার, নির্বিকার, অসীম, অচিন্ত্য, অব্যক্ত”।

করিন্দ্র গভীর হয়ে বললেন, “এবার বুঝতে পেরেছি। চিত্তাপুত্রদের প্রতি সর্বাম্বার আসক্তির কারণ কি। … ঠিক বলেছেন মাতা স্ফীতা, মামাও ঠিক বলেছে, একবার এই চিত্তাপুত্রদের হত্যা করতে পারলে, আর কনো আশা অবশিষ্ট থাকবেনা সর্বাম্বার, আর তাই তিনি দেহত্যাগ করে দেবেন। আর আমরা হয়ে উঠবো জম্বুদেশের সম্রাট, আর দেবী মোহিনীর স্বপ্ন, অর্থাৎ বেদের আরাধনা হবে আর ছায়াপুর নির্মাণ হবে, তা হতে পারবে। কিন্তু এবার সব থেকে বড় প্রশ্ন, চিত্তাপুত্রদের হত্যা হবে কি উপায়ে?”

মনকরি বললেন, “একাধিক যোজনা করে রাখতে হবে। যেটিতে কাজ হয়ে যায়, অর্থাৎ সময় অমুসারে সকল যোজনাই প্রদান করতে হবে, যেমন ধরা যাক বিষপ্রয়োগ, বা গৃহে স্থাপন করে গৃহ প্রজ্বলিত করা ইত্যাদি ইত্যাদি”।

করিঞ্জল বললেন, “না না ভ্রাতা, চিত্তাল তো বিষ হজমই করে নেবে, নিশ্চিত থাকতে পারো। এমন কনো বিষ নেই যা চিত্তালকে ঘায়েল করতে পারে। অন্যদিকে গৃহে অগ্নির কথা যা বললে, সুর তো অতি সহজে তা অনুধাবন করে নেবে। আর সত্য বলতে গেলে, আমরা তাঁদেরকে দ্বিতীয় বারে হত্যা করার সুযোগ পাবো না। একবার যদি তাঁরা সতর্ক হয়ে যায় যে, আমরা তাঁদের হত্যা করার চিন্তা করছি, তাহলে আর তাদেরকে হত্যা করাই যাবেনা”।

বীর্য মাথা নেড়ে বললেন, “সঠিক কথা বলেছে করিঞ্জল, বারবার তাদেরকে হত্যা করার সুযোগ আমরা পাবো না। যা করতে হবে, অত্যন্ত বিচার করে ভাবনা চিন্তা করে করতে হবে”।

করাভ বললেন, “কিন্তু মামা, হত্যা করবো আমরা কি করে তাদের? বিষদিয়ে মারতে পারবো না, গৃহজ্বালিয়ে মারতে পারবো না। তাহলে?”

স্ফীতা বললেন, “বিপরীত দিশায় ভাবো পুত্র। যদি অগ্নিদ্বারা হত্যা করা যেতে না পারে, তাহলে জলে ডুবিয়ে হত্যা তো করাই যেতে পারে! বিপদের মুখে পরলে, ওদের রক্ষক হয়ে ওঠে চিত্তাল। আর চিত্তাল হলো অত্যন্ত দেহভারে আক্রান্ত ব্যক্তি। তাই বিপুল জলরাশির মধ্যে, সে কিচ্ছু করতে পারবেনা। ভেবেছ সেই দিকটা!”

বীর্য ভ্রুকুঞ্চিত করে বললেন, “প্রস্তাব তো বড়ই সুন্দর, কিন্তু নদীর জলস্তরে কি ডুবিয়ে মারা সম্ভব তাঁদেরকে?”

মিতা বললেন, “বড় কিছু ভাবো ভ্রাতা, বড় কিছু। … ভৃগুর পত্নীরা, মানে ঘৃতকুমারীদের প্রকৃতিনিয়ন্ত্রণের বিদ্যা, জানোই তো তুমি ভ্রাতা। কেন না আমরা কনো ভাবে একবার সাগরদেশের গহনে, জম্বুদ্বীপে প্রেরণ করে, সেখানে ঘৃতকুমারীর মায়াতে গহন ঘূর্ণাবর্ত এনে, অসহায় চিত্তা ও চিত্তাপুত্রদের নিঃশেষ করে দিই!”

চমকিত হয়ে উঠলেন দেবী হুতা, এই প্রস্তাবে। তিনি বলে উঠলেন, “জম্বুদ্বীপের নিকটে, সুন্দর বৃক্ষে পরিব্যপ্ত সুন্দরবনে আমার এক সহেলি নিবাস করে, ফুলেস্বরি নাম তাঁর। কিছু দিবস আগেই সে আমার কাছে এসেছিল একটি সমস্যা নিয়ে। তাঁর দুই কন্যা, পদ্মিনী ও নলিনী। এই দুই কন্যার পিছনে এক বিশাল বড় দৈত্য, বৃহৎব্যঘ্র পরেছে, তাদেরকে রমণ করে, সন্তানপ্রাপ্তির জন্য। তাই ফুলেস্বরি অত্যন্ত চিন্তিত তাঁর দুই কন্যাকে নিয়ে। … আচ্ছা ভ্রাতা, ছন্দ তো যুবরাজ। আর মহারাজ করিমুণ্ডেরও এই সুন্দরবন আর তাকে ঘেরা সমুদ্রাঞ্চল, তথা সাগর ও জম্বুদ্বীপকে নিয়ে অনেক উচ্ছ্বাসা, কারণ সেখানে বিপুল ধনাপর্জন সম্ভব বলে। কিছু করে কি…?”

বীর্য বললেন, “অসাধারণ উপায় বাতলেছ ভগিনী। বৃহৎব্যঘ্র ভয়ানক দৈত্য, যে আকৃতিতে প্রায় চিত্তালের দ্বিগুণ আর বলের দিক থেকেও। আর সে-ই হলো এই সমস্ত অঞ্চলের অধিপতি। অর্থাৎ এঁকে দমন করলেই, এই অঞ্চলকে চন্দননগর অধিকার করে নিতে পারবে, আর মহারাজের লোভও আছে এই ছেত্রের উপর। তাই যুবরাজকে প্রেরণও করবেন। সঙ্গে সঙ্গে বৃহৎব্যঘ্রের কাছে অসম্ভব মায়াবী শক্তিও আছে শুনেছি, যার জন্য এই অঞ্চলের দিকে কনো নৃপতি তাকানও না। তাই একে ব্যবহার করে, আর তোমার সখীকে সুরক্ষিত করে রাখার কথা বলে, মহারাজকে সহজেই ভ্রিমিত করা সম্ভব, কি বলো করিন্দ্র?”

করিন্দ্র একটি খল হাস্য দিয়ে বললেন, “মহারাজের কাছে বলতে হবে, এই বৃহৎব্যঘ্রকে পরাস্ত করলেই, সেই অঞ্চল আমাদের। আর বৃহৎব্যঘ্রকে একমাত্র সুর আর তালই হেনস্থা করতে সক্ষম। সঙ্গে সঙ্গে মাতার সখির কথা বললে, দেবী চিত্তাকেও প্রেরণ করবেন সেই অঞ্চলে। … সেই কালে, জম্বুদ্বিপে দেবী ফুলেস্বরি আর তাঁর দুই কন্যা, পদ্মিনী আর নলিনীকে প্রেরণ করে দিলে, একই সাথে বৃহৎব্যঘ্র সকলকে পরাস্ত করে, দেবী চিত্তা তথা তাঁর সমস্ত পুত্রের হত্যা করে, দুই কন্যাকে গ্রহণ করে নেবে। আর তারই সাথে সাথে, ঘৃতকুমারীদের মায়ায় ঘূর্ণাবর্ত প্রেরণ করতে পারলে, বৃহৎব্যঘ্র বা সুরতাল, যেই জীবিত থাকবে, তাকে সেই বিচ্ছিন্ন দ্বীপে সেই ঘূর্ণাবর্তই হত্যা করে দেবে। এর ফলে, সেই সাগরছেত্র, সুন্দরবন, তথা জম্বুদ্বীপ ও সমুদ্রতট সমস্ত কিছুকে আমরা অধিকার করে নিতে পারবো। আর দেবী চিত্তা সহ চিত্তাপুত্রদের হত্যা হয়ে গেলে, দেবী সর্বাম্বাও দেহত্যাগ করে দেবেন”।

বীর্য ও সকলে বললেন, “অসাধারণ কর্মসূচি। কিন্তু আমাদের এই কর্ম অত্যন্ত সন্তর্পণে করতে হবে। কারপর কি কি কি করতে হবে, আগে তা সাজিয়ে নিতে হবে তবেই আমরা অগ্রসর হবো সমস্ত কিছু নিয়ে। … বলো এবার একেক একে হুতা, কারপর কি কি করা উচিত”।

দেবী হুতা উৎসাহিত হয়ে বললেন, “প্রথমে, আমি, মিতা আর স্ফীতা ভ্রমণ করতে যাই সুন্দরবনে, যাতে সেখান থেকে ফিরে মহারাজকে সমস্ত কিছু বলে যোজনার মধ্যে স্থাপিত করে দিতে পারি, আর তাঁকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে বাধ্য করতে পারি। সাথে সাথে, ফুলেস্বরির সাথেও সমস্ত কথা বলে আসতে হবে আমাদেরকে”।

দেবী মিতা বললেন, “সেদিকে সমস্ত কিছুর আয়োজন করে নিতে পারলে, এদিকে মহারাজকে রাজি করাবো এসে দেবী ফুলেস্বরিকে ও তাঁর কন্যাদের সুরক্ষিত করার জন্য দেবীচিত্তাকে জম্বুদ্বীপে প্রেরণের উদ্দেশ্যে, আর সেই সুরক্ষাকে নিশ্চিত করার জন্য বৃহৎব্যঘ্রের সাথে যুদ্ধে রত হবার জন্য চিত্তাপুত্রদের প্রেরণের উদ্দেশ্যে। … তারপর, বীর্য তুমি সেখানে গিয়ে, মহারাজের সেনা সেখানে যাবার পূর্বে, ফুলেস্বরি আর তাঁর কন্যাদের সেখানে অপসারিত করে দেবে গোপনে। আর ঘৃতকুমারীদের সাথেও কথা বলে নেবে”।

বীর্য বললেন, “ঘৃতকুমারীরা ততক্ষণে তাঁদের কন্যাদের জন্মদানও করে দেবেন, তাই মায়ার রচনা করার জন্য প্রস্তুত হয়ে যাবেন। … বেশ, তোমরা ভ্রমণের জন্য প্রস্তুত হও, আর মহারাজকে ভ্রমণে প্রেরণের জন্য মানাও। … আর শোনো, ঘূর্ণাবর্তের কথা ভুলেও বলবেনা ফুলেস্বরিকে। বলবে, চিত্তা ও চিত্তাপুত্ররা তাঁদেরকে সুরক্ষিত করে নিয়ে যেতে আসবেন। তাঁরা বিশাল বলশালী আর সহজেই বৃহৎব্যঘ্রকে হত্যা করে দেবে”।

যোজনা অনুসারেই, যোজনাকে আরো মোক্ষম করে নেবার জন্য, দেবী হুতা, মিতা ও স্ফীতা মহারাজ করিমুণ্ডের থেকে ভ্রমণের অনুমতি চাইলে, মহারাজ খুশী খুশী সেই অনুমতি প্রদান করে দিলেন। আর তাই বীর্যের ত্রিভগিনী যাত্রা করলেন সুন্দরবনে, আর অন্যদিকে করিন্দ্র ও মনকরিকে সঙ্গে নিয়ে বীর্য গেলেন মেদিনীরাজ্যে, ভৃগুসেনের কাছে।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28