জগদ্ধাত্রেয় কাণ্ড (কৃতান্ত দ্বিতীয় কাণ্ড)

রাজা করিমুণ্ডকে নিয়ে করিপুত্ররা চন্দননগরে প্রবেশ করলেন। করিন্দ্র তথা তাঁর সকল ভ্রাতারাও আজ বিভ্রান্ত। তন্ত্রসিদ্ধের অভিশাপের কথা তারা শুনেছিলেন, কিন্তু তা যে এমন ভয়ঙ্কর হয়, তার ধারণা তাঁদের ছিলনা। পিতার এই অবস্থা দেখে, তাঁরা আজ ভীত ও সন্ত্রস্ত। চন্দননগরে প্রবেশ করতে, রাজবেশ ত্যাগ না করেই, মহারাজ করিমুণ্ড, তাঁর এক বিশ্বস্ত সেবক, সুধামাকে বললেন, তাঁকে দেবী চিত্তার কাছে নিয়ে যেতে।

অন্যদিকে, রাজ্যবাসী জানলেন যে মহারাজ তন্ত্রসিদ্ধ উগ্রশাস্ত্রীর অভিসাপে অন্ধ হয়ে গেছেন, কিন্তু কেন সেই অভিশাপ, সেই ঘটনা জানলেন না। তাই সকলে মহারাজের জন্য শোকাহত হলেন। অন্যদিকে দেবী চিত্তার কাছে যখন পৌঁছালেন করিমুণ্ড, ততক্ষণে দেবী চিত্তা, তাঁর অন্ধত্বের বার্তা পেয়ে গেছেন। আর মহারাজ যে তাঁর কাছেই আসছেন, সেই বার্তাও তিনি পেয়ে গেছেন। তাই দেবী চিত্তা, নিজের কক্ষের দ্বারদেশেই অপেক্ষা করলেন মহারাজের জন্য।

মহারাজ তাঁর প্রিয় সেবক সুধামার সাথে দেবী চিত্তার দ্বারে উপস্থিত হলে, দ্বারে সুধামাকে দণ্ডায়মান রেখে, প্রথমবারের মত করিমুণ্ড দেবী চিত্তার কক্ষে প্রবেশ করলেন। দেবী চিত্তা অন্ধ করিমুণ্ডকে দেখে বেদনায় কাতর হয়ে ব্যকুল হয়ে বললেন, “কি হয়ে গেল ভাই এইসব!”

করিমুণ্ড হেসে বললেন, “একই সঙ্গে অভিশাপ ও বরদান লাভ হলো আমার বৌদি। … পুত্ররা অভিশপ্ত হয়ে যাবে, তাঁদের আচরণের জন্য, তাঁদেরকে রক্ষা করতে হবে, তাই শাসন না করে তাঁদের হয়ে সালিশি করতে যাবার অভিশাপ পেলাম, অথচ আমার পুত্র আর তোমার পুত্রদের মধ্যে যেই বৈরী দিনপ্রতিদিন বাড়ছে, সেই বৈরী যদি যুদ্ধ পর্যন্ত চলে যায়, সেই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে না হবার বরদান লাভ করলাম আমি। তুমি বলেছিলে না বৌদি, যদি অন্তর থেকে ভাব আসে, তাহলে নিয়তি কনো না কনো উপায় করেই দেবন। তিনি দিলেন নিদান বাতলে।

বেদনাগ্রস্ত অবশ্যই আমি, নেত্রে কিচ্ছু দেখতে পাচ্ছিনা বলে। তবে অন্তরে অন্তরে তৃপ্তও। … কিন্তু বৌদি, সেই কথা বলার জন্য আসিনি তোমার কাছে বৌদি। একটি ব্যাপারে, আমার মস্তিষ্কে অন্য কেউ কুটিল বুদ্ধি প্রদান করার আগে, তোমার সাথে পরামর্শ করে, সুবুদ্ধি গ্রহণ করে নিয়ে যেতে চাই আমি, আর তাই আমি তোমার কাছে রাজ্যে প্রবেশ করেই প্রথম এসেছি”।

দেবী চিত্তা ভ্রুকুঞ্চিত করে বললেন, “কি ব্যাপারে সুবুদ্ধি লাগবে তোমার ভাই!”

করিমুণ্ড বললেন, “বৌদি, তন্ত্রসিদ্ধ উগ্রশাস্ত্রী আমাকে বলেছেন, অন্ধরাজা রাজসিংহাসনে বসার অযোগ্য, তাই আমাকে রাজসিংহাসন ত্যাগ করে, উপযুক্তকে রাজা রূপে স্থাপিত করতে হবে। উপযুক্ত বলতে আমার কাছে একজনেরই বিচার আসে, আর তা হলো ছন্দচিৎ। কিন্তু বৌদি, রাজসিংহাসনে অবিবাহিত কেউ তো উপস্থাপন করতে পারেন না। আর ছন্দের মাত্র ১৫ বৎসর বয়স। সে এখন বিবাহের পূর্বের অভিজ্ঞতা অর্জন করছে। এমন অবস্থায় কি যে সঠিক আর কি যে বেঠিক, তা কিছু বুঝতে পারছিনা”।

দেবী চিত্তা হেসে বললেন, “যাকে তোমার উপযুক্ত মনে হয়, তাকে যুবরাজ করে ঘোষণা করে দাও, আর তাকে তোমার সিংহাসনের অর্ধেক অংশ ছেড়ে দাও। অর্থাৎ নিজের পাশে বসিয়ে তাঁকে রাজা হবার উপযোগী করে নাও প্রথমে। অতঃপরে তাঁর বিবাহদান করে, তাঁকে সিংহাসন প্রদান করবে। … এটিই সঠিক হবে বোধ করি”।

করিমুণ্ড মাথা নেড়ে বললেন, “কিন্তু এই বিষয়েও একটি সংশয় আছে আমার বৌদি। ছন্দকে যুবরাজ পদে স্থাপিত করলে, আমার পুত্ররা তাঁর বিরোধিতা করে ষড়যন্ত্র করবে না তো!… আমার পুত্রদের যেই রূপ আমি দেখে অন্ধ হয়েছি, তাতে তো আমার সেইরূপই সন্দেহ হচ্ছে বৌদি”।

দেবী চিত্তা হেসে বললেন, “ভাই, একজন যুবরাজ পদে অবস্থান করে যদি ষড়যন্ত্রের শিকারই না হন, যদি ভিন্নমনস্কতার সম্মুখীনই না হন, আর সেই সমস্ত কিছুকে অতিক্রমই না করতে পারেন, তাহলে সে তো রাজা হবার জন্য অযোগ্য। ছন্দ অত্যন্ত হৃদয়বাণ, সরল। কিন্তু রাজসিংহাসনে বিরাজ করে রাজ্যচালনা করে তুমি ভালো করেই জানো। সরল হওয়া, হৃদয়বাণ হওয়া, এক রাজার জন্য অতি সুন্দর চরিত্র। কিন্তু এই সমস্ত কিছুর পরেও, তাঁকে ততটা জটিল ও কুটিল হতেই হয়, যার মাধ্যমে রাজ্যের অহিত কামনাকারীদের জটিলতা ও কুটিলতা থেকে প্রজাকে রক্ষা করা যেতে পারে।

তাই ভাই, শত্রুতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করো না। যুবরাজ পদে স্থাপিত হলে, না সে তোমার ভাতুস্পুত্র আর না সে তোমার পুত্র বা পুত্রসমান। সে তখন কেবলই প্রজার রক্ষকের পদে অবস্থান করার জন্য শিক্ষার্থী। তাই তোমারই কর্তব্য হবে তাঁকে সেই কর্তব্য বোধ করানো, আর ব্যক্তিগত সমস্ত সম্পর্ক থেকে মুক্ত করা। এক রাজার কখনো কনো ব্যক্তিগত সম্বন্ধ থাকতে পারেনা, বিশেষ করে যখন তিনি রাজসিংহাসনে আঢ়ুর, আর যখন তিনি রাজকর্মে নিযুক্ত।

তাঁর একটিই সম্বন্ধ, আর তা হলো তাঁর প্রজার সাথে তাঁর সম্বন্ধ। যদি কনো রাজা, রাজসিংহাসনে উপস্থাপন করেও, নিজের জাতি, নিজের সম্প্রদায়, নিজের সংঘ, নিজের পরিবার নিয়ে চিন্তিত থাকেন, সেই ব্যক্তিকে রাজা রূপে লাভ করা, রাজ্যের জন্য এক ভয়ানক অভিশাপই হয়ে যায়। নিঃস্বার্থ হওয়াই এক রাজার প্রধান তপস্যা ভাই, তা তো তুমি জানো। … এক রাজা নিজের সাথে করে চলা সমস্ত ষড়যন্ত্রকে প্রত্যক্ষ করবেন, কিন্তু নিষ্ক্রিয় থাকবেন। কিন্তু যখনই সেই ষড়যন্ত্র প্রজার সাথে করা হবে, তিনি তার প্রতিকার করবেন। সেই প্রতিকার করার জন্য যদি পরিবারের বিরোধিতা করতে হয়, যদি জাতির, সম্প্রদায়ের, এমনকি সঙ্ঘেরও বিরোধ করতে হয়, তা হবে রাজার প্রধান কর্তব্য।

তাই, রাজার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হতে পারে, এটি কখনো কারুকে রাজা করা বা না করার সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিসয় হতে পারেনা। সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয় তখন হবে যখন সেই ব্যক্তি সেই ষড়যন্ত্রকে পরাস্ত করতে অক্ষম। তাই ভাই, যুবরাজ পদে যাকেই তুমি উপস্থাপন করবে, তাঁকে প্রাথমিক ভাবে এই শিক্ষাপ্রদান করা তোমার কর্তব্য। যদি সেই যুবরাজ প্রজাকে সমস্ত ষড়যন্ত্র থেকে মুক্ত রাখার পথে অগ্রসর হতে পারে, সে রাজা হবার যোগ্য, আর যদি না পারে, তাকে যুবরাজ পদ থেকে অপসারিত করা আবশ্যক, সেই ক্ষণেই।

ভাই, জ্যেষ্ঠকেই সিংহাসনে আঢ়ুর করতে হবে, এই প্রথা আর্যদের। প্রথার মধ্যে নিজেকে নিয়জিত করো না। রাজা এক প্রজার ও ঈশ্বরের দাস, অন্য কিছুর দাস নয় সে। কনো প্রথার নয়, কনো সঙ্ঘের নয়, কনো জাতি বা সম্প্রদায়ের নয়, এমনকি কনো পরিবারেরও নয়। যদি কনো রাজা এই সমস্ত কিছুর দাস হন, তিনি রাজা হবার জন্য সম্পূর্ণ ভাবে অযোগ্য একজন ব্যক্তি। এই অযোগ্যতা থাকার পরেও যদি তিনি রাজসিংহাসনে অবস্থান করতে থাকেন, তাহলে তিনি স্বয়ং ঈশ্বরের থেকে দণ্ড ভোগের পাত্র হয়ে যান।

প্রজাকে জ্যেষ্ঠ রাজা নয়, যোগ্য রাজা উপহার দাও। তোমার যাকে যোগ্য মনে হচ্ছে, তাকে যুবরাজ করে, তাকে শিক্ষা দাও। যদি সেই শিক্ষা সে গ্রহণ করে যোগ্য হয়ে উঠতে পারে, তাকে রাজাসনে উপস্থাপন করো, নয়তো তাকে যুবরাজের পদ থেকে অপসারিত করে, অন্যকারুকে যুবরাজ ঘোষণা করো”।

করিমুণ্ড বললেন, “বৌদি, ছন্দচিতের থেকে অধিক প্রজাপ্রিয় কারুকে আমি সম্পূর্ণ রাজকুলে একজনকেই দেখতে পাই, আর সে হলো সুরচিৎ। কিন্তু সুরচিৎ অন্যমনা, সে রাজপুত্র কম, সাধক অধিক। প্রজার চিন্তা তাঁর আছে, কিন্তু মাতা জগদ্ধাত্রীর থেকে অধিক চিন্তা সে কারুর করেনা। কিন্তু ছন্দ সর্বক্ষণ প্রজার চিন্তা করে, ঠিক আমার ভ্রাতার মত। তাই তার থেকে অধিক শ্রেয় চয়ন আমার কাছে আর নেই। … জানি সে আমার পুত্রদের ষড়যন্ত্রের শিকার হবে। আমি তাকে সেই ষড়যন্ত্রের সাথে পরিচয় তো করে দেব, তাঁর কর্তব্য তাঁকে স্মরণ করাতে থাকবো, কিন্তু বুদ্ধিদাতা হবো না। সে স্বতন্ত্র থাকবে। যদি সে ষড়যন্ত্রকে অতিক্রম করতে পারে, সেই হবে রাজা। যদি না করতে পারে, আমার দ্বিতীয় বিকল্প হবে আমার অতিপছন্দের সুর। এই ব্যাপারে কি বলো বৌদি”।

দেবী চিত্তা হেসে বললেন, “ষড়যন্ত্রের সম্মুখীন হওয়া, ছন্দের জন্য একটি বড় বিপ্লব হবে। আশা করি, সে সামলে নিতে পারবে সেই সমূহ কিছু। সুরের সম্বন্ধে আমি এটুকু বলবো, সে আমার অত্যন্ত পছন্দের। সে বিশেষ। সে রাজ্যকে রক্ষা করার জন্য শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি, কিন্তু রাজা হয়ে নয়, সেনাপতি হয়ে। রাজার কাছে প্রজার থেকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ কিচ্ছু হতে পারেনা, কিন্তু সুরের কাছে মাতা জগদ্ধাত্রীর থেকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ কিচ্ছু নেই, আর এটিই তাঁর রাজা হবার পথে বাঁধা। কিন্তু ভাই, এই বাঁধা এমনই সৎগুণ যে, তাকে পরিবর্তন করার প্রয়াসও যেন স্বয়ং ঈশ্বরের সাথে বিরোধিতা করা। তাই সুরকে রাজার আসনে স্থিত করার চিন্তা করোই না। ছন্দকে চয়ন করতে পারো। তবে তাকে পরীক্ষণ করে নিও। অন্ধের মত তাকে মদত দিতে থেকো না। আর যদি সম্ভব হয়, তাহলে তাকে নিজেকেও নিজের পরীক্ষণ করা শিখিয়ে দিও, এতে রাজ্যের তথা রাজ্যের প্রজার, সকলের কল্যাণ”।

হাস্য প্রদান করে রাজা করিমুণ্ড বললেন, “কি করে করো বৌদি এমন? যখন তুমি স্ত্রী, তখন স্বামীর থেকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ কেউ নন, যখন তুমি জননী, তখন সন্তানের থেকে গুরুত্বপূর্ণ কেউ নন । আবার যখন রাজমাতা রূপে অবস্থানরত, তখন প্রজার থেকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ কেউ নন। এই পরিবর্তন নিজের মধ্যে কি করে আনো? এই পরিবর্তন আনার পর, যেই কক্ষে প্রবেশ করো, তা স্বামী হোক, প্রজা হোক বা সন্তান হোক, তাতে পূর্ণনিষ্ঠাবান কি করে হও? … আমার কাছে এটি একটি বড় বিস্ময় বৌদি। এই বিস্ময়ের জন্য, তুমি আমার কাছে কখনোই এক স্ত্রীবেশে বিরাজ করলে না, সর্বদাই আমার কাছে তুমি দেবী”।

দেবী চিত্তা হেসে বললেন, “এবার নিজের কক্ষে যাও। নিজেকে শুদ্ধ করে, নিজের পরিবর্তী কর্মযোজনার পথে যাত্রা করো ভাই। তোমার পত্নীরাও ব্যকুলই থাকবেন, তাঁদের স্বামীর এই অন্ধত্বের সমাচারে।… তাঁদের দুশ্চিন্তা দূর করো”।

মহারাজ করিমুণ্ড করজোড়ে সেখানে থেকে বিদায় গ্রহণ করলেন, এবং নিজের কক্ষে চলে গেলেন সুধামার সাথে। দ্বারে দাঁড়িয়ে সুধামা প্রায় সমস্ত কথাই শুনতে পেলেন। দেবী চিত্তা তাঁর কাছে সর্বদাই মাতৃসমা ছিলেন, আর নিজের সেই ধারণা যে কতটা সঠিক, তার প্রমাণ পেয়ে আনন্দিতও হলেন।

অন্যদিকে, গুরুদক্ষিণার কামনা রেখে, চিত্তাপুত্রদের নিয়ে বীর্য মালদরাজ্যে উপস্থিত হলেন। বীর্যের সাথে যেই তিন বালক উপস্থিত ছিলেন, তাঁদের বাস্তবিক পরিচয় সম্বন্ধে অজ্ঞান নিষ্ঠাবান, রনসজ্জে সজ্জিত হয়ে, রণাঙ্গনে মহাতেজস্বী হয়ে উপস্থিত হন। বীর্য মোহিনীর পুত্র, কেবল সেই কারণেই নয়, বীর্যের খল ও ছল সম্পূর্ণ জম্বুদেশেই প্রসিদ্ধ। তাই সেই বীর্য তাঁর সম্মুখে রণে উপস্থিত হয়েছে জেনে, তাঁকে পরাজিত করে, জম্বুদেশকে খল ও ছলমুক্ত করার অঙ্গিকার নিয়ে, মালদরাজ নিষ্ঠাবান সমরক্ষেত্রে অবতীর্ণ হন।

সঙ্গে তাঁর বিশাল অজেয় সেনা। কিন্তু সম্মুখে দেখলেন, এক বীর্যদণ্ডায়মান আর তাঁর সাথে মাত্র তিনটি বালক। বালক বলাই পছন্দ করলেন নিষ্ঠাবান, কারণ চিত্তাপুত্র, যারা বীর্যের সাথে উপস্থিত ছিলেন রণক্ষেত্রে, তাঁদের সঠিক করে মুখকেশরেখাও ওঠেনি। তাই নিষ্ঠাবান একপ্রকার উপহাস করেই বললেন, “কি ব্যাপার মোহিনীপুত্র বীর্য, তুমি কি যুদ্ধে রুচি রেখে এখানে উপস্থিত হয়েছ, নাকি সন্ধি করতে এসেছ!

যুদ্ধ করতে এলে, এই তিন নাবালককে সঙ্গে কেন নিয়ে এসেছ? এঁদের তো আননে কেশরেখাও প্রত্যক্ষ হয়নি! … দেখে তাঁদেরকে বেশ বলশালীই মনে হচ্ছে, বিশেষ করে (চিত্তালকে চিহ্নিত করে) ওই মধ্যের বালককে, কিন্তু একবার তাকিয়ে দেখো আমার এই বিশাল সেনার দিকে! … যদি সন্ধি করতে আসো, তাহলে ফিরে যাও, আমি কনো ছলপারদর্শীর সাথে সন্ধি করিনা। আর যদি অতিথি হবার ইচ্ছা থাকে, তাহলেও বলে দাও স্পষ্ট ভাবে। অতিথির উপর অস্ত্রাঘাত করার কনো অভিসন্ধি আমার নেই।

আর যদি বলো যুদ্ধ করতে এসেছ, তোমার এই শিশুর ন্যায় আচরণ দেখে আমার হাস্য আসছে। এই বিপুল সেনার সম্মুখে, এই তিন বালককে কেন স্থাপন করছো? কেন এই তিন কিশোরপ্রাণের বলি চরাচ্ছ! … এঁরা কি তোমার পরমশত্রু!”

বীর্য হেসে বললেন, “আমি মোহিনীপুত্র বীর্য, মহারাজ নিষ্ঠাবান। কথা বলার কালে কথা বলি, আর কর্ম করার কালে কর্ম করি। এখন আমি কর্ম করতে এসেছি, তাই কথা বলে আপনার ন্যায় বৃথা সময় ও উর্জ্জাব্যয় আমি করিনা। আপনার উর্জ্জাব্যয়কে আমি বেশ বুঝতে পারি। আপনি তো নিজের ভরসায় যুদ্ধ করতে আসেন না, আসেন মাতা সর্বাম্বার ভরসায়। তিনিই আপনার হয়ে যুদ্ধ করেন, তাই আপনার নিজের উর্জ্জার প্রয়োজনই বা কি। কিন্তু আমি কেবল নিজের ভরসাতেই যুদ্ধে রত হই। তাই আমি একাকী এসেছি তোমার সাথে যুদ্ধে।

আর এই তিন বালক! চিন্তা করো না, এঁরা কনো বালক নয়, এঁরা হলেন এই বীর্যের তিন মোক্ষম অস্ত্র। অর্থাৎ আমি একাকীই এসেছি তোমার সাথে যুদ্ধ করতে, সঙ্গে এনেছি তিন মোক্ষম অস্ত্র। বাকি তুমি যদি ভীত হয়ে থাকো, রাজ্যত্যাগ করে যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করে পলায়ন করতে পারো। পলাতকের পিছনে আমি আঘাত করিনা। তাই নিশ্চিন্তে থাকো আমি তোমাকে পলায়ন করতে কনো বাঁধা দেবনা। আর যদি যুদ্ধ করতে চাও, তবে কথা না বাড়িয়ে, যুদ্ধ করো মহারাজ নিষ্ঠাবান, পরাস্ত করে দেখাও আমাকে”।

নিষ্ঠাবান ভয়ঙ্কর কুপিত হলেন বীর্যের দর্পপূর্ণ কথা শুনে, আর তাঁকে ধুলিশ্যাত করে দেবার মানসিকতা নিয়ে, নিজের তিন সহস্র সেনার একতৃতীয়াংশকে আক্রমণের বার্তা দিলেন। সেই এক সহস্র সেনার অঙ্গসেনাপতি, প্রজাপতি ভয়ানক সোরগোল তুলে রণক্ষেত্রে আক্রমণের জন্য অগ্রসর হলে, ছন্দ তালের দিকে তাকালেন, এবং চোখের ইশারায় সেই আক্রমণের উত্তর দিতে বললেন। মুশলধারি মহাবলশালী চিত্তাল, অবিকল হস্তির ন্যায়, বেশ কিছুবার ধুলায় নিজের চরণ ঘসে নিয়ে, দুই বিশাল বিশাল হস্ত দ্বারা নিজের অঙ্গে ধুলা লেপন করে নিয়ে, মহাতেজে দৌড় লাগালে, এমন ধুলার নির্মাণ হলো যে, প্রজাপতি আর তাঁর সেনা টুকরি কিচ্ছু দেখতে পেলেন না। যখন দেখতে পেলেন, তখন দেখলেন, তাঁদের সম্মুখে এক অতিকায় কিশোর মুশল হস্তে দণ্ডায়মান, আর তাদের চারিপাশে একটি বৃত্তাকার সুরঙ্গ নির্মাণ করে দিয়েছে সেই বলবান নিজের মুশলের সাহায্যে।

প্রজাপতি এই সমস্ত কিছুর অর্থ না বুঝে আক্রমণের নির্দেশ দিলে, সেনা যখন ক্ষিপ্রতার সাথে অগ্রসর হলেন, মহাক্রোধে চিত্তাল, একটিবার নিজের মুশল দ্বারা ভূমিতে আঘাত করতে, সকলে যেন একটি মহাকায় ভূমিকম্পের সম্মুখীন হয়ে গেল, আর নিষ্ঠাবান দেখলেন, তাঁর সেনারা চারিপাশে পতঙ্গের ন্যায় ছিটকে পড়ে যাচ্ছে। কেবল এতটাই নয়। সেই আঘাতের জোর এতটাই ছিল যে, স্বয়ং গঙ্গাও ভাগীরথীর ধারার থেকে একটি বিচ্ছিন্ন ধারার সঞ্চার করে দিলেন, যাকে পরবর্তীকালে নিষ্ঠাবান নিজের মাতার নামে নামকরণ করে বলেছিলেন, পদ্মা।

সেই প্রকাণ্ড আঘাতে, একটি সেনাও সেই সহস্র সেনার মধ্যে এমন অবস্থায় থাকলেন না যে, তাঁরা প্রত্যাঘাত করবেন। উড়ন্ত পতঙ্গের মত পতিত হবার কারণে, কেউ তাঁদের হাত ভেঙ্গেছেন, তো কেউ অন্য অঙ্গ বা কেউ মাথা। স্বয়ং প্রজাপতির অবস্থাও এমন হয়েছে যে সে নিজের পায়ের ভরে উঠে দাঁড়াতে পাচ্ছেনা। সেই দেখে, ক্ষিপ্ত নিষ্ঠাবান, নিজের আরো দুই সহস্র সেনাকে না প্রেরণ করে, প্রেরণ করলেন, তাঁর রাজ্যের ১০টি মহাযোদ্ধা, যাদেরকে একত্রে বলা হয় গ্রহেন্দ্র।

ছন্দ তালকে পশ্চাতে ডেকে নিয়ে, এবার সম্মুখে যাবার নির্দেশ দিলেন সুরকে। এই গ্রহেন্দ্ররা মহাধনুর্ধর, যাদের সামনে কনো কেউ দাঁড়াতে পারেনা। তাঁরা নিজেদের ধনুক ব্যবহার করে সহস্র সহস্র বাণ একত্রে নিক্ষেপ করলে, সেই সমস্ত বাণের সংখ্যা এমনই যে সমগ্র আকাশ তাতে ভরে উঠলো। সুর একটি বাণও ব্যবহার না করে, কেবলই নিজের ধনুকের জ্যাতে একটি মহাটঙ্কার করলে, সেই টঙ্কারের শব্দ এতটাই বলশালী ও ক্ষিপ্র হয় যে, সেই শব্দ সমস্ত গ্রহেন্দ্রদের নিক্ষেপ করা বাণকে একটি সারিতে আবদ্ধ করতে থাকলে, তা একটি দড়ির ন্যায় দেখাতে থাকে। এবার ধনুক ত্যাগ করে, সুর নিজের দেহকে এমন এক ঘূর্ণনের মধ্যে স্থাপিত করলেন যে, তার থেকে একটি বালুকার তুফান নির্মাণ হলো।

সেই তুফানের চরণস্থলে নিজের ধনুক দ্বারা একটিবার আঘাত করতে, সেই ঘূর্ণাবাত উর্ধ্বে উঠে, সেই রশির ন্যায় দেখতে বাণের সারিকে সঙ্ঘবদ্ধ করে, বাস্তবেই এক লৌহরশির নির্মাণ করে দিল। অতঃপরে, সেই রশির একটি প্রান্ত ধারণ করে, একাগ্রচিত্ততা ধারণ করে, এমন গতি প্রদান করলো সুর যে, তা সরাসরি সমস্ত গ্রহেন্দ্রদের বেষ্টন করে, তাঁদের উদরে এমন চাপ সৃষ্টি করতে থাকলো যে, তাঁরা ক্রমাগত রক্তবমন করা শুরু করলেন।

এমন অদ্ভুত কৃত্য নিষ্ঠাবান কখনো দেখেননি। প্রকৃতির উপর এতটা নিয়ন্ত্রণ কারুর কি করে থাকতে পারে! এবার তিনি কনো সেনা না প্রেরণ করে স্বয়ং তরবারি নিয়ে আক্রমণ করতে এলে, তাল নিজের মুশলকে নিক্ষেপ করলে, সেই মুশলে প্রবল গতিময় একটি পদাঘাত করলেন সুর, সম্পূর্ণ ভাবে উড়ন্ত পক্ষীর মত গগনে উন্নীত হয়ে, আর সুরের প্রদান করা প্রকাণ্ড গতি ধারণ করলে, না নিষ্ঠাবান, আর না অন্যকেউ দেখতে পেলেন যে কিভাবে নিষ্ঠাবানের তরবারি চূর্ণ হয়ে গেল সেই মুশলের আঘাতে।

নিষ্ঠাবান চমকিত হলেন, আর হতে থাকলেন, আর অন্তরে অন্তরে বলতে থাকলেন, এখনো মাতা সর্বাম্বা কেন উদিত হচ্ছেন না! … কিন্তু সেই শব্দের উচ্চারণ দ্বিতীয়বার বলতে পারলেন না নিষ্ঠাবান, কারণ এই একটিবার উচ্চারণের মধ্যেই প্রকাণ্ড গতির সুর, তাঁর রথের নিকটে উপস্থিত হয়ে, প্রবল বেগে চলা নিষ্ঠাবানের রথের চাকাতে নিজের ধনুকথেকে একটি সামান্য বাণকে ভয়ানক গতিদ্বারা নিক্ষেপ করলেন।

এই আঘাতের ফলে, নিষ্ঠাবান শূন্যে উন্নীত হলে, নিজের চরণের অঙ্গুলির উপর ভর দিয়ে, প্রবল গতিতে সুর লম্ফ দিয়ে নিষ্ঠাবানকে আঘাত করলে, নিষ্ঠাবানের দেহ ভূমিতে পতিত না হয়ে, সরাসরি পতিত হলো পদ্মার জলে। যেখানে তাঁর দেহ নিক্ষিপ্ত হলো, সেখানের কুলেই, নিষ্ঠাবানের দেহের থেকে প্রায় হাত দশেক দূরে দণ্ডায়মান ছিলেন ছন্দ ও বীর্য।

বীর্য এবার হাস্যস্বরে বললেন, “যদি বাঁচতে চাও, তাহলে পলায়ন করো নিষ্ঠাবান, কারণ সুর বা তালের পরবর্তী প্রহার সহন করার শক্তি তোমার দেহে আর অবশিষ্ট নেই। … যাও পলায়ন করো”। এতো বলে, সেখান থেকে ছন্দকে নিয়ে বীর্য চলে এলেন, আর তিন চিত্তাপুত্রকে নিকটে দেখে বললেন, “পুত্ররা, তোমাদের প্রদেয় গুরুদক্ষিণা আমি গ্রহণ করেছি। তোমরা আজ থেকে গুরুঋণ থেকে মুক্ত হলে। যাও তোমরা তোমাদের রাজ্যে প্রত্যাবর্তন করো। এখানে আমার কর্ম আছে কিছু”।

নির্দেশ লাভ করে, চিত্তাপুত্ররা নিজধামে প্রত্যাবর্তনের জন্য রওনা দিলে, তাঁরা নিজেরা যা পূর্বে সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিলেন, সেই অনুসারেই রাজা নিষ্ঠাবানের নিকট উপস্থিত হলেন। নিষ্ঠাবান তখন একাকী পদ্মার নদীর তটে শায়িত ছিলেন। দেহব্যাথায় তাঁর উঠে দাঁড়াবার ক্ষমতা নেই। চিত্তাপুত্ররা তাঁর সম্মুখে দণ্ডায়মান হলে, কিছুটা ভয় পেয়েই, সিটকে গেলেন নিষ্ঠাবান। সেই দেখে ছন্দ বললেন, “ভয় পাবেন না মহারাজ। এখানে গুরুদেব বীর্য নেই। তাঁর গুরুদক্ষিণা ছিল, আপনাকে পরাস্ত করা। তাই আপনাকে পরাস্ত করেছি আমরা গুরুঋণ থেকে মুক্ত হয়েছি। এখন আর তিনি আমাদের সাথে নেই”।

অভয়লাভ করে নিষ্ঠাবান বললেন, “কে তোমরা? এই অদ্ভুত শক্তি আর অদ্ভুত গতি তোমরা কার থেকে লাভ করেছ? কে তোমাদের মাতা? কে তোমাদের পিতা?”

ছন্দ বললেন, “মহারাজ, আমরা চিত্তাপুত্র, সুরতাল ও ছন্দ। দেবী চিত্তা আমাদের জননী, আর প্রয়াত মহারাজ পদ্মচিত্ত আমাদের পিতা। … মহারাজ, আপনাকে আঘাত করার জন্য আমরা দুঃখিত, কিন্তু আপনার ন্যায় নিষ্ঠাবানের হত্যা করা, আমাদের পক্ষে সম্ভব ছিলনা, তাই আপনাকে ধাক্কা দিয়ে সুর নদীজলে পতিত করেন, যাতে আপনি আহত তো হন, কিন্তু সুরক্ষিত থাকেন”।

নিষ্ঠাবান বললেন, “কিন্তু আমার কাছে মাতা সর্বাম্বার বরদান ছিল, তিনি স্বয়ং আমার হয়ে যুদ্ধ করবেন!”

ছন্দ হেসে বললেন, “আমার কনিষ্ঠ ভ্রাতা, সুর। তাঁর নিষ্ঠা সম্বন্ধে এখন প্রায় সম্পূর্ণ জম্বুদেশই জানে, আপনিও নিশ্চয়ই জানেন। তাঁর নিষ্ঠার কারণে মাতা আসেন নি, আর তেমনটাই তাঁর দেওয়া বচন ছিল, স্মরণ করে দেখুন। মাতা কখনোই নিজের দেওয়া বচনের অবমাননা করেন না নাথ”।

নিষ্ঠাবান প্রশ্ন করলেন, “আর এখন কেন এসেছ তোমরা আমার কাছে?”

সুর বললেন, “সেবা করতে আপনার নাথ। আপনার ন্যায় নিষ্ঠাবানকে এমন অসহায় অবস্থায় কি করে ফেলে যেতে পারি আমরা? তাহলে মাতার কাছে কি মুখ দেখাবো নাথ?”

নিষ্ঠাবান আর কনো কথা বললেন না। প্রায় দিন সাতেক চিত্তাপুত্রদের সেবা গ্রহণ করলেন এবং সুস্থ হলেন। সাথে সাথে এও অনুভব করলেন যে চিত্তাপুত্ররা অদ্ভুত, অতি অদ্ভুত। যেমন তাঁদের বল, তেমন গতি, তেমন মেধা, আর তেমনই হৃদয়বাণ তাঁরা। যথার্থ ভক্ত মাতার। সেই অনুভব করে, এবার নিষ্ঠাবান চিত্তাপুত্রদের উদ্দেশ্যে বললেন, “তোমরা কি জানো, বীর্য কেন এমন করেছে আমার সাথে?”

ছন্দ বললেন, “জানি মহারাজ। আপনার থেকে অধিক নিষ্ঠাবান না লাভ করলে, আপনাকে পরাজিত করা অসম্ভব ছিল। আপনাকে পরাজিত না করলে, আপনার ভগিনী, দেবী শৃঙ্খলাকে বিবাহ করতে পারছিলেন না মোহিনীপুত্র, আর তা যদি না করেন, তাহলে মেদিনীরাজ্যকে অধিকার করে, ঘৃতকুমারীদের কাতারাজ, ভৃগুসেনের সাথে বিবাহ দিতে পারছেন না।

মহারাজ, তাঁর উদ্দেশ্য, তাঁর ভাগ্নে, অর্থাৎ করিপুত্রদের বিবাহ দানের পাত্রী লাভ করা, আর করিন্দ্রকে জম্বুদেশের অধিপতি করে তোলা। সেই উদ্দেশ্যেই তিনি এইসমস্ত কিছু করেছেন”।

নিষ্ঠাবান বিচলিত হয়ে বললেন, “আর এই সমস্ত কিছু জেনেও, তোমরা তাঁকে তাঁর যোজনা সফল হবার জন্য সাহায্য করলে!”

ছন্দ হেসে বললেন, “মহারাজ, কালের থেকে অধিক বলবান কেউ নেই, আমার অনুজ এমনই বলে। এই কালই মোহিনীপুত্রকে গুরু মানতে বাধ্য করেছে আমাদের। তাঁকে গুরু মানিয়ে, আমাদের অস্ত্রশিক্ষা প্রদান করিয়েছে, আর এও বুঝিয়েছে যে, সরলতা, ঈশ্বরপ্রেম, প্রজাপ্রেম, এঁদেরকে যদি জীবিত রাখতে হয়, এই ভৌতিক জগতে অবস্থান করে, তাহলে জটিলতার ছদ্মবেশ আবশ্যক। অস্ত্র শিক্ষা তো তা যা তিনি আমাদেরকে শিক্ষা দিচ্ছেন বলে শিখিয়েছেন। আর এই জটিলতার আবশ্যকতা তিনি নিজের চরিত্রদ্বারা, নিজের অজান্তেই, স্বয়ং নিয়তির ইচ্ছাতেই আমাদের শিখিয়েছেন।

মহারাজ, আগামী দিনে কি হবে, তা আমাদের জ্ঞাত নয়, তবে এটুকু বুঝতে পেরেছি যে, আগামীদিনে বড় কিছু হতে চলেছে, আর তার কারণে নিয়তি স্বয়ং আমাদেরকে প্রস্তুত করছেন। মহারাজ, যোজনা আমরা করিনা। আমার কনিষ্ঠ ভ্রাতা সুর আমাদের শিখিয়েছে, নিজের যোজনা নয়, জগন্মাতার যোজনাকে অনুভব করে, তার যোজনাতে চলতে হয়। তিনিই আমাদের মা, আর তিনি আমাদের কল্যাণ আমাদের থেকে অনেক অনেক ভালো জানেন ও বোঝেন। তাই তিনি যেই পথে চালিত করছেন, সেই পথই শ্রেষ্ঠ পথ।

সে বলে, কনো প্রয়োজন নেই, সেই পথে আগামীদিনে আমাদের কোথায় স্থাপিত করবে তা জানার, কারণ সেই পথের নির্মাতা স্বয়ং আমাদের মা, আর আমরা তাঁর অতিপ্রিয় সন্তান। তিনি আমাদের জন্য সঠিক নয়, এমন কিচ্ছু না কনোদিন করেছেন আর না কনোদিনও তা করবেন। সে আরো বলে যে, যা প্রয়োজন তা হলো, বর্তমানে তিনি আমাদেরকে কি করতে বলছেন, তা অনুভব করা, আর তাই করতে থাকা।

তাই মহারাজ, আগামীদিনে আমাদেরকে মাতা কি নির্দেশ দেবেন, তার চিন্তা করিনা। তিনি প্রকৃতি, তিনি কালের নিয়ন্ত্রিকা, তিনি স্বয়ং নিয়তি। যা কিছু তিনি আমাদের জন্য স্থির করবেন, তা এই কাল, প্রকৃতি আর নিয়তি স্বয়ং আমাদের সম্মুখে রেখে দেবেন। মহারাজ, না চাইতেও, প্রতিটি জীব প্রকৃতির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। তাই প্রতিটি জীব, প্রতিটি পরিস্থিতি, প্রতিটি কালের ক্ষণ, জীবনের প্রতিটি মোড় আমাদেরকে জীবনের বর্তমান ক্ষণে কি করনীয় তা বলতে থাকে।

আমার ভ্রাতা সুর বলে, নিষ্ঠা তাই, যা আমাদেরকে সমস্ত ভাবনা থেকে , সমস্ত চিন্তা, ইচ্ছা কল্পনা থেকে মুক্ত হয়ে, বর্তমানে মাতা যেই পরিস্থিতি আমাদের সম্মুখে রাখছেন, তাতে অংশগ্রহণ করাকে বলে। সে সর্বদা তাই করে, আর তাকে অনুসরণ করতে করতে, আজ আমরা তাঁর দুই জ্যেষ্ঠভ্রাতাও তেমনটাই করি। হ্যাঁ, তাঁর মত এত সাবলীল ভাবে আমরা বর্তমানকে অনুভব করতে পারিনা, কারণ তাঁর মত দৃঢ় বিশ্বাস আমাদের নেই। তাই, অধিকসময়ে তাকে প্রশ্ন করে, তার অনুসরণ করেই, আমরা জীবনের পথে চালিত হতে থাকি।

মহারাজ হতে পারি, কাল ও পরিস্থিতি আমাকে কাল নেতা বা মার্গদর্শক রূপে চিহ্নিত করবে, কিন্তু বাস্তব এই যে আমার কনিষ্ঠ ভ্রাতা, স্বয়ং আমার মার্গদর্শক। আমার মাতা কেবল বলেন আমাদেরকে যাতে এই কথা ভুলেও আমরা সুরের সম্মুখে না বলি। সে এখন কিশোর। এই কথা শ্রবণ করে তাঁর মধ্যে অহংকার জন্ম নিতে পারে। তাই তাঁর সম্মুখে এই কথাকে আমরা স্বীকার করিনা। কিন্তু সত্য বলছি মহারাজ, তাঁর কিন্তু এই সমস্ত কিছুতে বিন্দুমাত্র ধ্যান নেই। সে কেবলই মাতার নিকট উপস্থিত হবার জন্য ব্যকুল”।

নিষ্ঠাবান বললেন, “তোমরা এখন এসো, তোমাদের মাতা তোমাদের অপেক্ষা করছেন নিশ্চয়ই। যদি মাতা চান, তাহলে আবারও আমাদের সাখ্যাত হবে পুত্র। যাও তোমরা রাজ্যে ফিরে যাও। তোমাদের যাত্রা শুভ হোক”।

নিষ্ঠাবানের থেকে অনুমতি গ্রহণ করে, রাজ্যে প্রত্যাবর্তন করলেন চিত্তাপুত্ররা। আর অন্যদিকে, নিষ্ঠাবান ভগিনী, দেবী শৃঙ্খলার সাথে শৃঙ্গাররসে মেতে উঠলেন বীর্য।  না তিনি নিজের রাজ্যে ফিরলেন, আর না ফিরলেন তাঁর ভগিনীদের কাছে। সত্য বলতে, রাজদরবারে তিনি কেবল মালদরাজ্যের নৃপতিরূপে মুকুট ধারণ করার জন্যই উপস্থিত হয়েছিলেন। তাছাড়া একটি দিবসের জন্যও তিনি রাজদরবারে উপস্থিত ছিলেন না, আর না তাঁকে দাসীরা আহার করার কাল ছাড়া নিজের কক্ষের বাইরে দেখতে পেতেন।

এমতঅবস্থায় যখন দিনযাপন করছেন বীর্য, তখন একদিন কাতার রাজা, রাজা ভৃগুসেন মালদরাজ্যেন এসে উপস্থিত হয়ে, বীর্যকে বারংবার ডাকতে থাকেন। সম্ভোগকর্মে সদালিপ্ত থাকা বীর্যের তাঁর সখার উপস্থিত জানাই ছিলনা। তাই এক দাসী তাঁর গৃহের কোপাত আন্দোলিত করতে, পোশাক ধারণ করে, দরজা উন্মোচিত করতে, দাসী বললেন, “মহারাজ, কাতা রাজ্যের মহারাজ ভৃগুসেন আপনার সাখ্যাত কামনা করে রাজদরবারে উপস্থাপন করেছেন, এবং আনার অপেক্ষা করছেন”।

সম্ভোগের সুতীব্র কামনার নেশায় সম্পূর্ণ ভাবে ভ্রমিত হয়ে গেছিলেন ভৃগুসেনের কথা। তাই মালদরাজ্যের নূতন রাজা, মহারাজ বীর্য এবার অতিশীঘ্র রাজপোশাক ধারণ করে রাজদরবারের উদ্দেশ্যে গেলেন। রাজা হবার পর প্রথমবার রাজদরবারে যাচ্ছেন মহারাজ, তাই সকলেই একটু সতর্ক হয়ে গেলেন। রাজদরবারে যখন তিনি উপস্থিত হলেন, তখন দেখলেন, অতিথির আসন অধিকার করে, রাজা ভৃগুসেন উপস্থিত।

সখাকে দেখামাত্রই, ভৃগুসেনের উদ্দেশ্যে বীর্য বললেন, “তুমি রাজদরবারে উপস্থিত হয়েছ কেন মিত্র। এসো আমার সাথে। চলো অন্দরমহলে চলো। তোমাকে অন্দরমহলে নিয়ে যাবো বলেই, এখানে এলাম”।

এই বলে দুই মিত্র অন্দরমহলে যাত্রা করলে, ভৃগুসেন বললেন, “আরে তুমি শুনলাম, রাজা হবার পর দীর্ঘ একটিমাস হয়ে গেছে, একদিনও রাজসভাতে বসো নি! কি ব্যাপার? এতই সম্ভোগে ব্যস্ত! … দেবী শৃঙ্খলা কি দেবী চিত্তার থেকেও সুন্দরী!”

বীর্য সেই কথাতে হাস্য প্রদান করে বললেন, “আরে রাজদরবার তো আমারই। আগে কিছুদিন ভোগ করে নিতে দাও। তারপর নয় রাজসিংহাসনে বসবো। ওই সিংহাসনে একবার নিয়মিত বসা শুরু করলে তো আবারও শুধু রাজনীতি। আর কি পড়ে থাকে বলো!… আর সৌন্দর্যের কথা যা বললে! চিত্তা তোমার খুব পছন্দের ছিল না!”

ভৃগু বললেন, “না পছন্দ বললে ভুল হবে। হ্যাঁ রূপের কথা বললে, আমার বিবাহযোগ্যা, তাঁর থেকে অধিক সুন্দরী আমি এখনো দেখিনি। তবে কি জানো তো! … শুধু সৌন্দর্য নিয়ে কি হবে! সম্ভোগের মানসিকতা, কামনাবাসনায় মেতে ওঠার মানসিকতাও তো লাগে। সেই মানসিকতা চিত্তার নেই। চিত্তা দেহসুখের ব্যাপারে সম্পূর্ণ উদাসীন। সর্বক্ষণ খালি ভক্তি, স্নেহ, মমতা নিয়েই ব্যস্ত। আরে এই সমস্ত কিছু নিয়ে প্রজাপালন হয়, সন্তানপালন হয়, এই মনোভাবের কারুকে নিয়ে কি সম্ভোগক্রিয়া করা যায়!… কি বলো তুমি”।

বীর্য হেসে বললেন, “তা ঠিক বলেছ। সম্ভোগ করার জন্য, একজন সম্ভোগপ্রিয় স্ত্রীর প্রয়োজন। সেই স্ত্রী চিত্তার মত সুন্দরী না হলেও চলে”।

ভৃগু পুনরায় বললেন, “সম্ভোগপ্রিয়তা এমন জিনিস না মিত্র যে, এই সম্ভোগপ্রিয়তা যার মধ্যে বর্তমান, তাকে এমনিই সুন্দরী করে দেয়, সম্ভোগের জন্য এই সম্ভোগপ্রিয়তাই সৌন্দর্য। তবে কি বলো তো! আমরা রাজারা, শ্রেষ্ঠ সম্ভোগপ্রিয়দের রাখি রাজসভার সেই দ্বারে, যেই দ্বার দিয়ে আমরা প্রবেশ করবো, অর্থাৎ কেবল রাজা প্রবেশ করে। খুব শীঘ্র, সেই সম্ভোগপ্রিয় তোমার সঙ্গমসঙ্গিনী হয়ে যাবে। … এই কৃত্য সকলেই করে। তোমাদের রাজা করিমুণ্ডও তো করে। তাই তো বলছি মিত্র। রাজদরবারে আসা শুরু করো। রাজা হওয়ার ফলে সম্ভোগলাভের যেই নতুন দ্বার খুলে যায়, সেই দ্বার তো তুমি এখনো খোলোই নি!”

বীর্য হাস্যছলে বললেন, “এই খানেই তো তোমরা ভুল করো মিত্র। আগে বিবাহিত স্ত্রীর কোলে সন্তান তুলে দাও। সে সন্তান নিয়ে এবার ব্যস্ত থাকবে। তারপর রাজা হবার সুযোগ নাওনা। তোমাকে কেউ বাঁধা দিতেও আসবেনা”।

ভৃগু হেসে বললেন, “কিন্তু সেই সুযোগ তুমি আমাকে কোথায় দিচ্ছ মিত্র! … তুমি তো আমার বিয়ে নিয়ে উদাসীন হয়ে গেলে! … রাজা নিষ্ঠাবানের পতন হতে আমি ভাবলাম, এই বুঝি তুমি আমাকে ডেকে পাঠালে। বিবাহ করলে, সিংহাসনে বসলে, কিন্তু আমাকে তো স্মরণই করলে না!”

বীর্য হেসে বললেন, “এটা কিন্তু অপরিকল্পিত মিত্র। আসলে সম্ভোগের নেশাতে এমনই চূর হয়ে গেছিলাম যে, বাকি সমস্ত কিছু ভুলে গেছিলাম। … না না, চলো কাল প্রভাতেই, আমরা মেদিনীরাজ্যকে আক্রমণ করবো”।

ভৃগু মাথা নাড়িয়ে বললেন, “আরে ওদিকে কি হচ্ছে তুমি জানোই না। রাজা বিশারদ, মানে মেদিনীর রাজা, সে নিষ্ঠাবানের মৃত্যুর পর কি করে বেড়াচ্ছে একটা। পাগলের মত সে মাতা সর্বাম্বার কাছে যেতে চাইছে। প্রায়ই সেখানে যায়, আর ফিরে চলে আসে। ওর দাসদাসীদের থেকে জেনেছি যে, মাতা সর্বাম্বার থেকে আমার আর তোমার মৃত্যু কামনা করার জন্যই নাকি বারংবার সে যাচ্ছে শূন্যপুরে মানে মুর্শিদরাজ্যে”।

বীর্য মাথা নাড়িয়ে বললেন, “ও কিছু নয়। আসলে বিশারদ শৃঙ্খলাকে বিয়ে করতে লালায়িত ছিল। নিষ্ঠাবান তাঁর মিত্রও ছিল। খুব আশায় ছিল সে, এক না একদিন, সেও নিষ্ঠাবানকে সাহায্য করে, তাঁর ভগিনীকে বিবাহ করতে চাইবে। … কিন্তু তেমনটা হলো না, সেই জন্যই এই নাচনকোদন”।

ভৃগু পুনরায় বললেন, “তুমি এর একটি দিক দেখছো। অন্যদিকটাও তো দেখো মিত্র। একবার যদি মাতা সর্বাম্বা আমাদের দুইজনের প্রাণ নেবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে দিতেন, তারপর কি হতো ভেবে দেখেছ! আমরা ব্রহ্মাণ্ডের যেই কোনাতেই থাকিনা কেন, মাতা সর্বাম্বা আমাদেরকে টেনে এনে হত্যা করতেন”।

বীর্য বিরক্তির সুরে বললেন, “ওই ভদ্রমহিলাকে নিয়ে বড় অশান্তি। অনেক তো হলো। রূপ দেখে তাঁর বয়স বোঝা যায় না। কিন্তু হিসাব করে দেখো, সে আমাদের দিদার বয়সই। কিন্তু জগতের মায়া ছেড়ে যাবার নামই নেই। … আসলে কি বলো তো, এই ভদ্রমহিলাকে রাজনীতির কনো চাল দিয়েই কিস্তিমাত করা সম্ভব নয়। সবসময়ে তটস্থ থাকতে হয় এঁর থেকে। … তবে না, কথাটা ঠিকই বলেছ তুমি মিত্র। একবার সর্বাম্বা আমাদের পিছনে পড়ে গেলে কি হতো! … আর বিশারদ বেঁচে থাকলে, তা যেকোনোদিন হতে পারে। … একটা কাজ করি চলো, কাল আক্রমণ করি বিশারদকে, আর তাকে হত্যা করি”।

ভৃগু বললেন, “শুধু হত্যা করলেই হবেনা। এমন হহাবে হত্যা করতে হবে, যাতে সকলের মধ্যে একটা ত্রাশ তৈরি হয়ে যায়, এমন কৃত্য করার আগে”।

বীর্য মাথা নাড়িয়ে বললেন, “বেশ তাই হবে। চলো তুমি আগে বিশ্রাম নাও। আমি দেবী শৃঙ্খলাকে আগে নিয়ে আসি। তাঁর সাথে সাখ্যাত করো। … তুমি কি সেনা টুকরি নিয়ে এসেছ?”

ভৃগু উত্তরে বললেন, “আমার সেনা মেদিনী রাজ্যের থেকে মাত্র এক হাজার গজের দূরত্বে রয়েছে। শুধু আক্রমণের হুংকার পেলেই তারা আক্রমণ করে দেবে”।

বীর্য বললেন, “হুম, বেশ। তুমি বিশ্রাম করো আহারাদি করে। ততক্ষণে আমি মালদরাজ্যের সেনাকে প্রস্তুত করে আসি। … কাল প্রভাতে আমরা রওনা দেব। … দুইদিনের মধ্যে বিসারদের মুণ্ড আর ঘৃতকুমারী উভয়ই তোমার দুই হস্তে বিরাজ করবে, এই বীর্যের প্রতিশ্রুতি”।

সেই রাত্রে আহারাদি করে বিশ্রাম নিলেন ভৃগু আর বীর্য, আর এরই মধ্যে বীর্য সমস্ত সেনাকে প্রস্তুত করে, তাঁদেরকে পরের দিন প্রভাতে যাত্রা করার বার্তা প্রদান করে, প্রস্তুতি নেবার জন্য সচেতন করে রাখলেন। এবং পরের দিন প্রভাতে দেবী শৃঙ্খলাকে বিদায় জানিয়ে, দুই মিত্র, ভৃগু ও বীর্য চলে মালদরাজ্যের সেনা নিয়ে যাত্রা করলেন মেদিনীরাজ্য দখলের উদ্দেশ্যে।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28