৯.৩। বিস্ময়কর পর্ব
রাজপুত্রদের শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে পরবর্তীদিবস যখন সমস্ত করিপুত্র ও চিত্তাপুত্রদের একত্রিত করে, দক্ষিণের ময়দানে উপস্থিত হলেন করিমুণ্ড ও বীর্য, তখন থেকে শুরু হলো, বিস্ময়ের। চিত্তাপুত্ররা বিস্ময়কর প্রথম থেকেই ছিলেন, কিন্তু এতাবৎকাল যতটা বিস্ময়কর ছিলেন তাঁরা সকলের নজরে, প্রকৃত অর্থে যে তাঁরা আরো অধিক বিস্ময়কর, তা এবার প্রকাশ পাওয়া শুরু হলো।
বীর্য জানেন, এই চিত্তাপুত্ররা বিস্ময়কর, তাই যাতে তাঁরাও তাঁকে গুরু বলে মেনে নেয়, সেই উদ্দেশ্যে তিনি নিজেকেও অতি বিস্ময়কর প্রদর্শন করার প্রয়াস করলেন। আর তাই প্রথমেই, ধনুর্বাণ দ্বারা, একটি বৃক্ষে শর নিক্ষেপ করে নামিয়ে আনলেন অজস্র ডাল, যার দ্বারা নির্মাণ করলেন নিজের আসন। সেই আসনে উপবেশন করে তিনি বললেন, “পুত্ররা, তোমাদের অবিভাবক, মহারাজ করিমুণ্ড আমাকে তোমাদের অস্ত্রগুরু রূপে নিযুক্ত করেছেন। গুরুর আসন উচ্চে, তাই তোমাদের থেকে উচ্চ আসন নির্মাণ করলাম”।
আরো বললেন তিনি, “পুত্ররা, অস্ত্রবিদ্যা এমনই বিদ্যা, যার মাধ্যমে কঠিন থেকে কঠিন কাজ সহজ হয়ে যায়, চোখের নিমেষে তা সম্পন্ন করা যায়, আর তার প্রমাণ তোমরা তো দেখতেই পেলে। এই প্রকার সমস্ত কলাকুশলী আমি তোমাদের শিখিয়ে দেব। কিন্তু তার পূর্বে, সঠিক ভাবে মুশল চালনা, বল্লম চালনা, তরবারি চালনা তথা ধনুর্বাণ চালনা তোমাদের শেখা আবশ্যক। তোমরা কি তার জন্য প্রস্তুত?”
সম্মুখে স্থিত ছন্দ বললেন, “গুরুদেব, আপনাকে আমরা সঠিক ভাবে দেখতে পাচ্ছিনা। যদি আপনি আরো উচ্চস্থান অধিকার করতেন, তাহলে আপনাকে দেখতে সুবিধা হতো আমাদের। ছন্দের উপরে চাল মারার স্বভাব করিন্দ্রের সহজাত, আর তা ছাড়াও তাঁর মাতুল বীর্য তাঁর কাছে অত্যন্ত প্রিয়। তাই মাতুলকে সুউচ্চে তোলার জন্য করিন্দ্র বললেন, “মামা, গুরুর আসন তো স্বর্ণমণ্ডিত হওয়া উচিত। তাই না!”
সেই কথা শুনে, সুর ও তাল একে অপরের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে, সুর সকলের সম্মুখে উপস্থিত হলে, তাল নিজের প্রবল বল দ্বারা ভূমিতে পদাঘাত করলে, একটি অগ্নির স্ফুলিঙ্গ ভূমি থেকে প্রকাশিত হলো। সুর উড়ন্ত বেশে সেই অগ্নির স্ফুলিঙ্গকে নিজের হস্তে ধারণ করে, প্রবল গতির সাথে তাঁকে পুনরায় ভূমিতে প্রেরণ করলে, এক চকচকে ধাতুগুচ্ছকে সেই স্থানে সকলে পতিত হয়ে থাকতে দেখলো।
সেই চকচকে ধাতুগুচ্ছকে এবার তাল প্রবল বল দ্বারা একত্রিত করলে, ছন্দ এসে সেই জমিত ধাতুখণ্ডকে পশ্চাৎ থেকে একটি বস্ত্র দ্বারা আবৃত করে দিলে, সকলে দেখলেন সেই ধাতুখণ্ডে সকলে নিজেদের মুখ দেখতে পাচ্ছেন। সেই ধাতুসমষ্টির নির্মিত দর্পণকে এবার প্রবল বলের সাথে তাল শূন্যে প্রেরণ করলে, এক ভয়ানক লম্ফের দ্বারা সুর সেই ধাতুদর্পণকে ধারণ করলে, তাল পুনরায় ভূমিতে আঘাত করলেন এবং প্রবল তাপের সঞ্চার করলেন।
সেই তাপ সুরের ধারণ করা দর্পণে প্রতিফলিত হলে, সকলে প্রবল তাপ ও আলোক অনুভব করতে থাকলেন। বারংবার এমন লম্ফ দিয়ে সুর আলোক ও তাপের সঞ্চার করতে থাকলে, সকলে দেখলেন ভূমির একটি স্থানে প্রচুর ঘাস জন্ম নিতে শুরু করলো। এরপর তাল পুনরায় ভূমিতে প্রহার করলে, সেই তৃণআবৃত স্থান উচ্চগগনে উঠতে থাকলো, আর সকলে দেখলো, সেই একটি প্রস্তর খণ্ড যা উন্নীত হলো, তা স্বর্ণে আচ্ছাদিত।
আর এই ভাবে গুরু বীর্যকে স্বর্ণমণ্ডিত, তৃণদ্বারা আচ্ছাদিত এক প্রস্তর প্রদান করলেন চিত্তাপুত্ররা, যা হলো তাঁর গুরুরূপে উপবেশন করার আসন। এই অদ্ভুত কৃত্য করিপুত্ররা দেখলেন, করিমুণ্ড স্বয়ং দেখলেন, আর দেখলেন বীর্য, আর সকলেই স্তম্ভিত ও বিস্মিত হয়ে উঠলেন, এই চিত্তাপুত্রদের সামর্থ্য আর প্রকৃতিবিজ্ঞানের জ্ঞান দেখে।
করিন্দ্র অন্তরে অন্তরে বললেন, “এই চিত্তাপুত্রদেরকে বল ও জ্ঞান দ্বারা পরাস্ত করা অসম্ভব। এঁদের সাথে ছল করলে, তবেই এঁদেরকে পরাস্ত করে সিংহাসন হরণ করা সম্ভব হবে”।
করিমুণ্ড নিজের ভাতুস্পুত্রদের এহেন কীর্তি দেখে আপ্লুত হয়ে বারংবার নিজের অন্তরে বললেন, “এই সমস্ত আমার ভ্রাতার আর দেবী চিত্তার অসামান্য পবিত্রতার ফল যে, তাঁরা এমন পুত্র লাভ করেছেন। জানিনা আমার পুত্ররা এঁদের এই অসামান্য প্রতিভাকে কুর্নিশ জানাবে কিনা! যদি জানাতো আর আপন করে নিত, তাহলে সম্পূর্ণ চন্দননগর স্বর্ণমণ্ডিত হয়ে যেত। … এঁরা তো রুক্ষভূমিকে জলাবৃত করতে পারে! এরা তো দরিদ্রকে স্বর্ণে সুসজ্জিত করতে পারে! … এঁরা তো দেবতারূপ হয়ে অবস্থান করে!”
অন্যদিকে বীর্য একই সঙ্গে আশাবাদীও হন যে, এই চিত্তাপুত্ররাই তাঁকে ও তাঁর ভাগ্নেকে সম্রাট করে দেবে মালদ তথা মেদিনীকে জয় করিয়ে, আর অন্যদিকে ভাবিতও হন যে, এহেন শক্তিশালী আর প্রকৃতিজ্ঞানীকে করিন্দ্ররা বশে রাখতে পারবে তো!
এই বিস্ময়কর কীর্তি দেখার পর, বীর্য সেদিনের মত শিষ্যদের সাথে আলাপ পর্বের সমাপ্তি ঘোষণা করলেন, আর মহারাজ করিমুণ্ডের কাছে গিয়ে বললেন, “মহারাজ, আমাকে এই পুত্রদের একত্রে নিয়ে বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করতে হবে। কনো একটি স্থানে এরা উপবেশন করলে, সেই স্থানের ভুগলই পরিবর্তিত করে দেবে এঁরা। তাই এঁদেরকে নিয়ে আমাকে বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করার অনুমতি প্রদান করুন”।
করিমুণ্ড হেসে বললেন, “মহারাজ রূপে এই অনুমতি আমি আংশিক দিতে পারি মিত্র। তুমি এখানেই অপেক্ষা করো। আমি তোমার ভগিনীদের আর দেবী চিত্তাকে দরবারে উপস্থিত হবার অনুরোধ করছি। সম্পূর্ণ অধিকার, তাঁদের পুত্রদের নিয়ে অন্যত্র যাবার তো তাঁরাই তোমাকে দিতে পারবেন”।
মহারাজের নির্দেশ অনুসারে, হুতা, মিতা, স্ফীতা ও দেবী চিত্তা রাজদরবারে উপস্থিত হলে, মহারাজ করিমুণ্ড সকলের জন্য ঘোষণা করলেন, “দেবীরা, আপনাদের পুত্ররা আজ প্রথম অস্ত্রশিক্ষা গ্রহণের দিনেই এমন কীর্তি করে দেখিয়েছেন যে, তাঁদের গুরু রূপে আমি যেই অস্ত্রবিদকে নিয়জিত করেছিলাম, তিনি অর্থাৎ আমার শ্যালক, বীর্য এই চিন্তা প্রকট করেছেন আমার কাছে যে, যদি আপনাদের পুত্ররা এখানেই অবস্থান করেন, তাহলে এই স্থানের মানচিত্রকেও পরিবর্তিত করে দিতে পারে। তাই তাঁর অনুরোধ যে আমরা যেন আমাদের পুত্রদের তাঁর সাথে বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণের অধিকার প্রদান করি। এবার আপনাদের যা মতামত, তা ব্যক্ত করুন”।
দেবী হুতা কিছু বলতে গেলে, মহারাজ করিমুণ্ড তাঁকে চুপ করিয়ে, দেবী চিত্তাকে অনুরোধ করে বললেন, “দেবী চিত্তা, আপনি সবার থেকে বয়স্কা, সবার থেকে অধিক অনুভব আপনার। বয়োরূপে ও সম্বন্ধরূপে দেখলে, আপনি আমারও জ্যেষ্ঠা। তাই দেবী আপনিই প্রথম বলুন”।
হুতা ও তাঁর ভগিনীরা মহারাজের এই কথনকে নিজেদের অপমান জ্ঞান করে রক্তিম হয়ে উঠলেও, কিচ্ছু বলতে পারলেন না, কারণ রাজদরবারে রাজার কথাই শেষকথা। দেবী চিত্তা হাস্যবেশে বললেন, “মহারাজ, রাজ্যের উপরে কেউ হয়না এক ঈশ্বর ব্যতীত, আর রাজ্যের শিরোমণি মহারাজ। তাই রাজপুত্রদের ভবিষ্যৎ কি হবে, সেই সিদ্ধান্ত মহারাজ স্বয়ং করাই কাম্য। যদি পুত্রদের অবিভাবিকা রূপে আমাকে কিছু বলার আদেশ দেন মহারাজ, তাহলে এই বলতে পারি যে, গুরুর সিদ্ধান্ত শিষ্যের জন্য শ্রেষ্ঠবিচার হয়। তাই গুরুর নির্দেশের বিচার করার অধিকার আমার মনে হয় জনকজননীরও নেই। আসলে জনকজননী ভগবতীর সন্তানদের দেহদান করলেও, গুরুই তাঁদেরকে পরিচয় দান করেন। তাই পরিচিতি প্রদানের কালে, এক শিষ্যের একমাত্র অবিভাবক গুরুই হন, আর তাই তাঁর সিদ্ধান্তই অন্তিম সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত”।
মহারাজ হেসে বললেন, “অতি উত্তম দেবী। যখন যখন আপনার উচ্চারিত শব্দ আমি শুনেছি, তখন তখন মানসিক ভাবে আমি উন্নতই হয়েছি। … মিত্র বীর্য, তুমি আমাদের পুত্রদের নিয়ে যেতে পারো নিজের সাথে। জানি যত্ন রাখবে, তাও পিতা আমি এঁদের সকলের, ঈষৎ মোহগ্রস্তও। তাই চিন্তা তো থাকেই। পারলে, কেমন আছো, আর আমার পুত্ররা কেমন আছে, সেই বিষয়ে সময়ে সময়ে বার্তা প্রদান করো। কাল প্রভাতে, তুমি তোমার শিষ্যদের নিয়ে নির্গত হও ভ্রমণে”।
বীর্য হাস্যমুখে বললেন, “মহারাজ, আমি আপনার সমস্ত পুত্রকে মাত্র ৫ বৎসরের জন্য নিয়ে যাবো নিজের সাথে। আমার বিশ্বাস, এই ৫ বৎসর যথেষ্ট তাঁদের শিক্ষা প্রদান করার জন্য। আজ ছন্দের ও করিন্দ্রের বয়স ১৩। ৫ বৎসর পর, তাঁদের বয়স যখন ১৮ হবে, তখন আমি সমস্ত রাজপুত্রদের পুনরায় আপনার হাতে সঁপে দেব, পূর্ণভাবে অস্ত্রশিক্ষায় নিপুণ করে, এই আমার বচন”।
এরপরে অন্তঃপুরে সকলে চলে গেলে, দেবী চিত্তা প্রথমবার পুত্রদের থেকে দূরে থাকবেন, তাই পুত্রদের যেন একটি বেশিই যত্ন করা শুরু করলেন। সেই দেখে, ছন্দ মাতার কাছে এগিয়ে গিয়ে বললেন, “মা, আমরা শীঘ্রই ফিরে আসবো। তুমি এমন চিন্তা করো না”।
দেবী চিত্তা হেসে বললেন, “পুত্র, তোমাকে নিয়ে আমি বিন্দুমাত চিন্তিত নই, কারণ তোমার দুই ভ্রাতা থাকতে, তাঁরা তোমার কিচ্ছু হতে দেবেনা। কিন্তু ছন্দ, তোমার দুই ভাইয়ের যত্ন নিও। আহার পেলে তাল সমস্ত দিগ্বিদিকশূন্য হয়ে যায়। কত আহার করছে তার কনো হুঁশই থাকেনা। তার যত্ন করো, আর জ্যেষ্ঠভ্রাতা রূপে শাসন করো সময়ে সময়ে, যাতে সে এমন অধিক আহার না করে যে অসুস্থ হয়ে যায়। আর তোমার কনিষ্ঠ ভ্রাতা, সুর যে সর্বসময়েই আত্মভোলা। মাতা জগদ্ধাত্রীর থেকে দূরে যাচ্ছে সে, তাই বেদনাতেই থাকবে। তাঁকে যত্নে রেখো”।
তাল মাতার কাছে এসে, তাঁর দুই প্রশস্ত বিশাল বাহু দ্বারা দেবী চিত্তাকে বেষ্টন করে বললেন, “আমি সংযত থাকবো মা, আর সুরকে সবসময়ে আগলে রাখবো। আজ সুর যা করেছে, করিন্দ্র ওকে ঈর্ষা করতে আরম্ভ করেছে। কে জানে, ওই কুটিল কি মতলব করছে সুরকে নিয়ে। তাই সুরকে নিয়ে আমি চিন্তিতই থাকবো, আর তাই সবসময়ে তার কাছে কাছে থাকবো। তুমি চিন্তা করো না”।
তালছন্দ এমন বললেও, সুর একটি কথাও বলল না। একস্থানে উপবেশন করে সে বসে আছে সেই বৈকাল থেকে। তাই দেবী চিত্তা তাঁর কাছে গিয়ে, তাঁকে পিছন থেকে আলিঙ্গন করলে, সুর নিজের খেয়াল থেকে উন্নত হয়ে মাতার দিকে তাকালে, দেবী চিত্তা দেখলেন, সুরের দুই নেত্রপূর্ণ অশ্রু। মৃদু হেসে নিজের আঁচল দিয়ে পুত্রের অশ্রু মুছিয়ে দিতে দিতে দেবী চিত্তা বললেন, “ধুর বোকা ছেলে! কাঁদছিস কেন? হতে পারে মাতা জগদ্ধাত্রীর আরাধনা অন্যত্র হয়না। হতে পারে তাঁর মুখ তুই ৫ বছর দেখতে পাবিনা। কিন্তু তিনি তো সর্বত্র আছেন! … তাহলে কাঁদছিস কেন? … নিজের দুই নেত্র বন্ধ করবি, আর অন্তরে মাতাকে দেখার প্রয়াস করবি। দেখবি, তাঁর মুখশ্রী তোর হৃদয়পটে মুহূর্তের মধ্যে ভেসে উঠবে”।
সুর মাতার ক্রোড়ে মাতা রেখে, শিশুর ন্যায় মাতার ক্রোরেই ঘুমিয়ে পরলো। আর তাঁর বাকি দুইপুত্রও সেই রাত্রে, বিছনায় না শুয়ে, তাঁদের মাতাকে বেষ্টন করেই নিদ্রা গেল। এই ছিল চিত্তার পরিবারের কথা সেই রাত্রের। একে অপরের জন্য বেঁচে থাকা এই পরিবারের এই ছিল আনন্দের হাট। সুর বাঁচতেন মাতা জগদ্ধাত্রীর জন্য, দেবী চিত্তা বাঁচতেন তাঁর পুত্রদের জন্য, ছন্দ বাঁচতেন তাঁর মাতার জন্য, আর তাল বাঁচতেন তাঁর দুই ভ্রাতা ও মাতার জন্য। এঁদের কেউই নিজের জীবন বাঁচতেন না, সকলেই অন্যের জীবন বাঁচতেন, আর তাই তো তাঁদের সকলের মধ্যে এমন আনন্দ, এমন আপনভাব, এমন কামনামুক্ত মিলন তাঁদের সকলের মধ্যে।
অন্যদিকে, সেই দিনের সমস্ত সন্ধ্যা, হুতা, মিতা ও স্ফীতা নিজেদের মধ্যে গর্জন করতে থাকলেন, এই বলে যে, মহারাজ করিমুণ্ড তাঁদেরকে সভায় ডেকে নিয়ে গিয়ে অপমান করেছেন। দেবী মিতাও উগ্র হয়ে বললেন, “যখন আমাদের কনো কথা বলতেই দেওয়া হবেনা, তখন আমাদের ডেকে নিয়ে যাবার অর্থ কি ছিল?” স্ফীতাও সেই একই সুরে বললেন, “যেন এক চিত্তার পুত্রদেরই নিয়ে যাচ্ছে ভ্রাতা, আমাদের পুত্ররা তো এমনিই …!”
এই উগ্র কথোপকথনের মধ্যে বাঁধা দিয়ে বীর্য কক্ষে প্রবেশ করতে করতে বললেন, “তোমরা বৃথাই চিন্তিত এই সমস্ত কিছু নিয়ে। দেবী চিত্তা যা বলেছেন, তারপর আর কনো কথাই হয়না। তাই মহারাজ আর কারুকে কিছু বলতে দেবার স্থানেই রইলেন না। … এই সমস্ত কিছু ছাড়ো, আর তোমাদের পুত্রদের কি হবে, সেই নিয়ে ভাবো। আজ সুরতাল যা করে দেখিয়েছে, তাতে আমার উদ্বেগ বেড়ে গেছে। এই বিদ্যা তো আমিও জানিনা! … এঁদেরকে আমি কি শিক্ষা দেব? যেই পারদর্শীতা তাঁরা দেখিয়েছে, তা তো আমারও জন্যে অসম্ভব কৃত্য। … যদি এমনই থাকে তারা, তাহলে তো তারা অনিয়ন্ত্রিতই থেকে যাবে”।
কক্ষে করিন্দ্র প্রবেশ করতে করতে বললেন, “আমি পূর্বেই বলেছিলাম মামা, এঁদেরকে হত্যা করে দাও। তুমিই তো বাঁধা দিয়েছিলে!”
বীর্য তির্যক দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললেন, “একটি কাজ আছে আমার এঁদের থেকে। প্রথম সেই কাজ সম্পন্ন করে নিই। তারপর এঁদের হত্যাই করতে হবে, এছাড়া কনো গতি নেই। … আমার তো মনে হচ্ছে, ৫ বছর অপেক্ষা করলে, অতি দেরি হয়ে যাবে। … তুমি ঠিকই বলছো, এঁরা বেঁচে থাকার অর্থই চিন্তার বিষয়। ভাগ্নে, তুমি ওদের দিকে না তাকিয়ে, আমার থেকে যতটা শীঘ্র পারো, রণকৌশল আর অস্ত্রশিক্ষা গ্রহণ করো। আমি শীঘ্রই এঁদেরকে সঙ্গে নিয়ে আমার সেই কর্ম করে, অতঃপরে এঁদের হত্যার ষড়যন্ত্র করতেই হবে। নাহলে এঁরা তোমাদের সম্রাটের আসনে উপবেশন করতেই দেবেনা”।
পরবর্তী দুই বৎসরে করিপুত্র ও চিত্তাপুত্রদের নিয়ে নিয়ে জম্বুদেশের বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করলেন বীর্য, আর এই দুই বৎসরে, চিত্তাপুত্রদের নাম সমস্ত জম্বুদেশ জেনে গেল। জানবে নাই বা কেন? মল্লদেশে গিয়ে, যেই কৃত্যকে সুর তালের সাহায্যে করতেন, ধনুর্বাণ বিদ্যা শিখে গিয়ে, একাকীই প্রস্তর থেকে স্বর্ণরেখা নির্মাণ করে দিলেন, আর মুশল ব্যবহার শেখা তাল, সেখান থেকে নির্মাণ করে দিলেন স্বর্ণরেখা নদী।
মল্লদেশেই, শৈত্যপ্রবাহ থেকে গুরুকে রক্ষা করতে, ধনুর্বাণ সহকারে সুর, ও মুশলধারি তাল একাধিক তাল নির্মাণ করে দিলেন, যেখানে উষ্ণবাড়ি উত্তলিত হতে থাকে ভূমি থেকে। একই কৃত্য তন্ত্রক্ষেত্রে উপস্থিত হয়েও করেন তাঁরা। সঙ্গে থাকে, অদ্ভুত মনুষ্যত্বশিক্ষা প্রদায়নি ছন্দের বার্তা ও শিক্ষাদান। পশুদের কেবল আহারের জন্যই শিকার সঠিক, সখের জন্য তাঁদের শিকার করার অর্থ প্রকৃতির ভারসম্য নষ্ট করা; প্রকৃতি মানুষকে উদ্ভিদ তথা মাস দুইই আহার করার সামর্থ্য প্রদান করেছেন। তাই সেই দুই আহারকেই একত্রে করতে হয়, যাতে সর্বদা ত্রিগুণ ভারসম্যে থাকে আর সমস্ত আবেগও নিয়ন্ত্রণে থাকে।
যেমন ব্যবহার প্রদান করবে, তেমনই ব্যবহার লাভ করবে, তাই মনুষ্যত্ব হলো সকলকে স্নেহকরা, কারণ তবেই সকলের থেকে স্নেহলাভ সম্ভব হবে। এমন অজস্র শিক্ষার দ্বারা ছন্দ সমস্ত জম্বুদেশে প্রসিদ্ধ হতে থাকলে, মালদরাজ্যের নৃপতি, নিষ্ঠাবান, যিনি মাতা সর্বাম্বার ঐকান্তিক ভক্ত, তাঁর অন্তরে অত্যন্ত সাধ জাগে এই তিনরাজপুত্রকে দর্শন করার।
অন্যদিকে, ধনুর্বাণ বিদ্যা, মুশলবিদ্যা, তরবারি বিদ্যা তথা বল্লমবিদ্যাতে করিন্দ্র ও তাঁর ভ্রাতারাও পারদর্শী হয়ে ওঠেন এই দুই বৎসরের অধ্যাবশায়তে। কিন্তু যেই প্রকাণ্ড মেধা, একাগ্রতা আর গতি ও বল ধারণ করে সুর ও তাল, তা ধারণ করেনা করিপুত্ররা, তাই তাঁদের কীর্তি এমন কখনোই হয়না যা তাঁদেরকে জনপ্রিয় করে তোলে। এই সমস্ত কিছুর সাথে সুরতালছন্দের কাছে ছিল অসম্ভব প্রকৃতি ও সময়ের জ্ঞান, আর সেই জ্ঞানের কারণেই তাঁদের অস্ত্রচালনা গুণ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন ও দিব্য।
তবে বিনা দিব্যতায়, অস্ত্রচালনাতে করিপুত্ররাও অসাধারণ ছিলেন, কিন্তু চিত্তাপুত্ররা তো কনো প্রকার দিব্যাস্ত্রের ধার ধারে না। তাঁদের জ্ঞানই তাঁদের দিব্যতা, আর সেই দিব্যতা তাঁদের কথাবার্তাতে, চালচলনে, অস্ত্রচালনে, সর্বত্র প্রকাশিত হতো, কারণ সেই দিব্যতা তো জ্ঞানের দিব্যতা, সহজাতদিব্যতা, স্বয়ংজাত দিব্যতা।
আর এই সমস্ত কিছুর মধ্যে অত্যন্ত বিশেষ ছিলেন সুর। দিবারাত্র সে জ্ঞান আহরণ করে ফেরে। সকলেই মাতা জগদ্ধাত্রীর সন্তান। তাই সকল সন্তানদের থেকে মাতাকে জানার প্রয়াস করে করে, সম্যক মানবজাতির মানসিকতা, মনোভাব, বিকৃতি, পারঙ্গমতা, অপারঙ্গমতা, সমস্ত কিছু জেনে ফেলেছে সে। মাতা জগদ্ধাত্রী স্বয়ং প্রকৃতি, তাই সম্যক প্রকৃতি তাঁর কাছে জননী আর তাই সম্যক প্রকৃতির জ্ঞান যেন তাঁর অন্তরে পূর্বসঞ্চিত। মাতা জগদ্ধাত্রী স্বয়ং কালের নিয়ন্ত্রক, তাই কালের পূর্ণ জ্ঞান তাঁর কাছে গচ্ছিত।
আর সেই সাথে মাতাকে লাভ না করার বেদনা তাঁর মধ্যে সর্বদা ব্যপ্ত। সর্বদা মাতার থেকে কথন শ্রবণের জন্য সে ব্যগ্র, আর সেই বেদনার ভাব, সেই ব্যগ্রতা, তাঁকে সদাসতর্ক করে রেখে, তাঁকে অসামান্য ভাবে মেধাবী করে তুলেছে, অসম্মানয় ভাবে একাগ্রচিত্ত করে তুলেছে। আর নিজের জ্ঞান, অস্ত্রচালনায় পারদর্শীতার সাথে সাথে এই মেধা, এই একাগ্রচিত্ততা, তাঁকে প্রবল ভাবে গতিশীল করে রাখে সর্বদা। আর তাই সে এক অপ্রতিরোধ্য যোদ্ধা।
এক কথায় বলতে গেলে, সুর একাকীই যথেষ্ট সম্যক শত্রুসেনাকে বিনষ্ট করে দেবার জন্য। তার সাথে যখন ছন্দের বাঁধন যুক্ত হয়, আর তালের প্রচণ্ড বল যুক্ত হয়, তখন মনে হয় যেন এই চিত্তাপুত্রত্রয় একাকী সম্যক জম্বুদেশের সমস্ত যোদ্ধাকে পরাস্ত করে দিতে সক্ষম। তাঁদের বীরত্বের গাঁথা, জনসেবারে গাঁথা, জ্ঞানের গাঁথা, শ্রেষ্ঠত্বের গাঁথা এবং সুরের জগদ্ধাত্রীপ্রেমের গাঁথা এমনই ভাবে সমস্ত জম্বুদেশে প্রচারিত হয়ে গেছিল যে, তাঁরা অলিখিত ভাবে সম্যক জম্বুদেশের নায়ক হয়ে উঠেছিলেন। আর এই সমস্ত কিছু, বিশেষ করে সুরের, তালের আর ছন্দের প্রসিদ্ধি করিন্দ্রের কাছে হয়ে ওঠে ঈর্ষার কারণ, আর করিন্দ্রের সম্ভাব্য ঈর্ষার ধারণা করে, করিমুণ্ডের চিন্তার কারণ।
বীর্য তাঁর শিষ্যদের নিয়ে তখন তন্ত্রক্ষেত্রেই বিরাজ করছিলেন। চারিদিকে সুরতালছন্দের জয়গান হতে থাকলে, করিমুণ্ড নিশ্চিত হন যে করিন্দ্র এবং তাঁর ভ্রাতারা সেই জয়গানে অত্যন্ত ঈর্ষান্বিত হয়ে রয়েছেন। আর এই চিন্তা করতে থাকেন দিবারাত্র যে, সেই ঈর্ষার কারণে এমন কিছু না করে বসে করিন্দ্র যার কারণে তাদের বা তাদের ভ্রাতাদের প্রাণসঙ্কট উপস্থিত হয়। এই সমস্ত কিছু বিচার করেই তিনি স্থির করেন, একবার পুত্রদের সাথে সাখ্যাত করে আসবেন।
এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, তিনি নিজের আরোহী ঘটককে নিয়ে, এবং একগুচ্ছ দেহরক্ষক নিয়ে তন্ত্রক্ষেত্রের উদ্দেশ্যে নির্গত হয়ে গেলেন। যখন তিনি পৌঁছালেন তাঁর পুত্রদের নিকটে, তখন ছন্দ তাঁর দুই ভ্রাতাকে কাছে নিয়ে মনুষ্যদেহের সমস্ত তত্ত্বজ্ঞানের বিবরণ প্রদান করছিলেন। আর করিন্দ্রকে দেখলেন তাঁর ভ্রাতাদের নিয়ে ক্রীড়ায় মত্ত। বীর্য মহারাজকে অকস্মাৎ সেখানে উপস্থিত হতে দেখে, ব্যস্ত হয়ে উঠলেন, আর তাঁর নিকটে গিয়ে বললেন, “মহারাজ, আপনি এক্ষণে এখানে?”
মহারাজ করিমুণ্ড হেসে বললেন, “পুত্রদের বহুদিন দেখিনি। প্রায় দুইবৎসর হয়ে গেল পুত্রদের দেখিনি। তাই তাঁদের দেখার বড় ইচ্ছা জাগতে, এসে উপস্থিত হলাম এখানে”।
বীর্য বক্র হাস্য প্রদান করে বললেন, “তা ভালোই করেছেন মহারাজ। পুত্রদের শিক্ষাদান প্রায় সমাপ্তই। তারা সকলে এখন ধনুর্বাণ বিদ্যায়, মুশল বিদ্যায়, বল্লম বিদ্যায়, আর তরবারি বিদ্যায় অসম্ভব ভাবে দক্ষ। তাই চিন্তা করছিলাম যে, তাঁদের থেকে এবার গুরুদক্ষিণা গ্রহণ করবো। আপনি এসে যেতে ভালোই হলো। গুরুদক্ষিণার ঘোষণা করে, আপনার কাছে তাঁদের অর্পণ করে দেব আজই”।
মহারাজ করিমুণ্ড বিচলিত হয়ে বললেন, “আজই! আজ কেন? তুমি তো বলেছিলে ৫ বছর লাগবে সমস্ত শিক্ষা প্রদান করতে!”
বীর্য হাস্যছলে বললেন, “মহারাজ রাজপুত্রদের মেধাই এমন যে, তাঁরা ৫ বছরের বিদ্যার্জনকে মাত্র দুই বৎসরে সম্পন্ন করে ফেলেছে। … আর আজকেই সেই ঘোষণা করার কারণ একটিই। চিত্তাপুত্ররা এখানে আছেন জেনে, তন্ত্রতাপস, মহামান্য উগ্রশাস্ত্রী মহাশয় আজ উপস্থিত হবেন তাঁদের সাথে আলাপ করার উদ্দেশ্যে। … তিনি এসে রাজপুত্রদের বিদ্যার্জন যথার্থ হয়েছে ঘোষণা করলেই, তাঁরই সম্মুখে আমি গুরুদক্ষিণার প্রসঙ্গ স্থাপন করবো। আপনি কি বলেন এই বিষয়ে?”
মহারাজ করিমুণ্ড এই কথাতে বেশ খানিকক্ষণ স্তব্ধ রইলেন। বীর্য তাঁর এই স্তব্ধতার কারণে বিচলিত হয়ে উঠে পুনরায় বললেন, “মহারাজ, আপনি যে কিছু বললেন না!”
রাজা করিমুণ্ড নিজের আনমনা অবস্থা থেকে মুক্ত হলেন, বীর্যের কণ্ঠস্বরে, আর বললেন, “শুনেছি, উগ্রশাস্ত্রী মহাশয় অত্যন্ত ক্রোধী স্বভাবের! … তিনি নাকি প্রায়শই নিজের ক্রোধকে সম্বরণ না করতে পেরে, অভিশাপ দিয়ে দেন!”
বীর্য মাথা নেড়ে বললেন, “শুনেছি তো আমিও সেইরূপ। তবে তাতে আপনি চিন্তিত কেন হচ্ছেন। চিত্তাপুত্ররা অনুগত। তাই তাঁদের উপর ক্রুদ্ধ হতে পারবেন না উগ্রশাস্ত্রী মহাশয়। তাই নিশ্চিত থাকুন আপনি”।
রাজা করিমুণ্ড মস্তক আন্দোলিত করে, বললেন, “আমি চিত্তাপুত্রদের নিয়ে চিন্তিত নই মিত্র। আমি আমার পুত্রদের চিনি। অবিচল ভাবে যদি মহাশয় উগ্রশাস্ত্রী চিত্তাপুত্রদের প্রশংসা করতে থাকেন, তাহলে ঈর্ষার অগ্নিতে জ্বলে উঠে, আমার পুত্ররা এমন কিছু না বাচাল কর্ম করে বসে, যার কারণে তাঁদেরকে তিনি অভিশাপ দিয়ে দেন। … এখানে আসছেন তাই, আমার পুত্রদের সাথেও তো তিনি সাখ্যাত করবেন। তাই এমনও বলতে পারিনা যে আমার পুত্রদের তুমি কোথাও গোপন করে রেখে দাও। … তাই আমার পুত্রদের ভবিষ্যৎ নিয়েই আমার চিন্তা হচ্ছে, চিত্তাপুত্রদের নিয়ে নয়”।
বীর্য মাথা নাড়িয়ে মহারাজের কথাকে সম্মতি জানিয়ে বললেন, “বেশ আমি রাজপুত্রদের বলে দিচ্ছি যাতে তাঁরা অধিক কথা না বলেন। যথা প্রশ্ন, তথা সংক্ষিপ্ত উত্তর হয় যেন”।
যেমন বীর্য বললেন, তেমনই রাজপুত্রদের শেখালেন, কিন্তু চিত্তাপুত্রদের প্রশংসা শ্রবণের পরপরই কেমন যেন রং বদলে যায় করিন্দ্র, করাভদের। উগ্রশাস্ত্রী মহাশয় এলেন, তাঁকে সকলে প্রণাম করলেন, আর তিনি বিশেষ ভাবে ছন্দের স্কন্ধে হাত রেখে বললেন, “তোমার বিবিধ বিষয়ে জ্ঞান এই টুকু বয়সে সঞ্চয় করলে কি করে?”
ছন্দ হেসে বললেন, “মহাশয়, এই শিক্ষা আমি আমার কনিষ্ঠ ভ্রাতার থেকে লাভ করেছি। মাতা জগদ্ধাত্রী অন্ত প্রাণ সে। সর্বক্ষণ, সর্বস্থানে মাতার সন্ধান করে ফেরে সে। বিবিধ জিনিস সে জানে সেই কারণে, আর তা অদ্ভুত ভাবে সঞ্চিত হয়ে যায় তার মধ্যে। এই নিয়ে তার বিস্ময় জাগে আর এই ধারণা হয় যে, যা কিছু সঞ্চিত হচ্ছে, তার উপর তার নাকি নিয়ন্ত্রণ নেই। যদি নিয়ন্ত্রণ থাকতো, তাহলে সমস্ত কিছুকে একত্রিত করে করে, মাতার সন্ধান করতে পারতো সে।
এমন ধারণা থেকে, সে নিজের মনের তিনস্তরকেই ধারণা করে ফেলে। যেই স্তর সম্মুখে থাকে, তার ধারণা তো আমরা সকলেই করতে পারি, কিন্তু যেই দুই স্তর অন্তরালে থাকে আর সমস্ত ক্রিয়া করতে থাকে, আমার ভ্রাতা তাদেরকেও ধারণ করে, ত্রিস্তর মনের সমস্ত কিছুকে ধারণ করা শুরু করে। তার থেকেই অনুপ্রেরণা লাভ করে, আমিও সেইরূপ করতে গেলে, দেহের বিজ্ঞান, মনের বিজ্ঞান, জীবনের বিজ্ঞান, এই সমস্ত কিছুকে উদ্ধার করতে শিখি মহাশয়। আজ আপনাকে আমাদের মধ্যে লাভ করে খুব আপ্লুত। আমাদের এই পদ্ধতিতে কোথাও কনো ভুলত্রুটি হচ্ছেকিনা, যদি আপনি সংশোধন করে দেন!”
মহাশয় উগ্রশাস্ত্রী অত্যন্ত আপ্লুত হলেন এই কথা শুনে। তিনি বললেন, “যিনি সত্য সত্য জ্ঞান আহরণ করেন, তিনি স্বাভাবিক ভাবেই অত্যন্ত বিনম্র হয়ে যায়। তোমার বিনম্রতা, অন্যকে কৃতজ্ঞতা অর্পণ, আর সর্বদা নিজের জ্ঞানের যথার্থতা নিয়ে সংশয়, এই তিন বলে দেয় যে, তোমরা যথার্থই জ্ঞান আহরণ করেছ। তোমার সঙ্গে এই বিষয়ে সুদীর্ঘ আলোচনা করে, অবশ্যই বিচার করবো, কোথাও কনো ভুলত্রুটি হচ্ছে কিনা, সেই ব্যাপারে। তার পূর্বে, আমার শ্রবণকরা বিস্ময় বালকের সাথে আলাপ করে নিই আগে”।
এই বলে মহাবলবান তালের দিকে এগিয়ে গেলে, উগ্রশাস্ত্রীকে প্রণাম জানিয়ে, তাল বললেন, “মহাশয়, সেই বিস্ময় বালক আমি নই, আমার অদ্ভুতভাবে সুদর্শন কনিষ্ঠ ভ্রাতা। আমি মধ্যের ভ্রাতা। আমার একভ্রাতার মেধা আর অন্য ভ্রাতার বিচক্ষণতার থেকে বল লাভ করে, বলশালী হয়ে উঠেছি মাত্র”।
উগ্রসেন সেই কথাতে হাস্য প্রদান করে বললেন, “হুম, তোমাদের সকলের মধ্যেই এই অন্যকে কৃতিত্বপ্রদানের গুণ বর্তমান। বড় ভালো গুণ পুত্র, এতে কখনো মদ্যাসক্ত হয়না জীব। অতি উত্তম”। এই বলে সুরের সম্মুখে গেলে, সুর প্রণাম করলেন, কিন্তু একটি কথাও বললেন না। সেই দেখে উগ্রশাস্ত্রী বিচলিত হয়ে বললেন, “আমার উপর তুমি কি ক্ষিপ্ত সুর?” … ছন্দ বলতে গেলেন, “না মহাশয় আসলে…”
উগ্রশাস্ত্রী বামহস্ত দেখিয়ে ছন্দকে চুপ করতে বললে, সুর বললেন, “ক্ষমা করবেন মহাশয়। আপনি বললেন, নিজের জ্ঞানের যথার্থতার বিচার করার কথা, মহাশয় কি করে না করে থাকি তা বলুন তো? এই প্রকৃতিকে জানা, মনুষ্যকে জানা, সমস্ত জীবদের জানা, কালকে জানা, এই সমস্ত কি জন্য! মাতার কাছে পৌঁছাবার জন্যই তো! … কিন্তু তা সম্পন্ন হলো কোথায় প্রভু!” কান্নায় গলা ভেঙে গেলে, সেই ভাঙা সুরেই সুর বলে উঠলেন, “আচ্ছা প্রভু, আপনি তো মহামুনি মার্কণ্ড, যিনি একজন পূর্ণ অবতার তাঁর নির্মিত তন্ত্রমার্গের শ্রেষ্ঠ সাধক। আপনি তো মহাকালকে যিনি নিয়ন্ত্রণ করেন, সেই মহাকালীর মহাসাধক। প্রভু বলুন না, মাতা কি আমার উপর রুষ্ট! যদি না হন, তাহলে তিনি কেন কথা বলছেন না! … কেন তিনি নিজের বেদনার কথা নিজে মুখে বলছেন না!”
উগ্রশাস্ত্রী সম্বন্ধে সকলে জানেন, তিনি অত্যন্ত কঠোর, নির্দয় আর কঠিন শুষ্ক কাষ্ঠের ন্যায়। তিনি যে অন্তর থেকে এতটা কোমল তা কারুর জানা ছিলনা। কান্নায় ভেঙে যাওয়া সুরকে তিনি আলিঙ্গনসুখ প্রদান করে বললেন, “তুমি বিশেষ বাবা! বিশেষ। যার অন্য কনো দিকে ধ্যান নেই, জ্ঞান নেই, কেবলই মাতার থেকে নির্দেশ, আদেশ, তাঁর বেদনা শ্রবণের জন্য যে ব্যকুল, সে যে অত্যন্ত বিশেষ পুত্র। … আর বিশেষকে যে ধৈর্য ধরতেই হয় পুত্র। স্বর্ণকে দেখো পুত্র। সমস্ত পার্থিব ধাতুর মধ্যে সে বিশেষ। সে এমনই বিশেষ যে, তার সাথে শত খাদ, শত অপবিত্রতা মিলিত করলেও, সে যেমন তেমনই থাকে। তার নিজস্ব চরিত্রে কনো ধারার পরিবর্তন আসেনা।
তুমিও ঠিক তেমনই পুত্র। শত শত অপবিত্রতা মিলেও তোমাকে আচ্ছাদিত করতে পারেনা, তোমার অন্তরে অন্য কনো সুর বাজাতে পারেনা। কিন্তু পুত্র এই স্বর্ণকেই আবার দেখো। কি ভাবে তার নির্মাণ হয়? দিনের পর দিন, বছরের পর বছর, ধরিত্রী নিজের তাপকে সূর্যের মাধ্যমে প্রতিফলিত করিয়ে করিয়ে, নদী নির্মিত পলিমাটির গহনতলে সেই তাপ সঞ্চিত করলে, তবেই না তা স্বর্ণ হয়! …
পুত্র, তাই ধৈর্য ধরো। নিষ্ঠাবান থাকো। আর নিজের সংকল্পে দৃঢ় থাকো। মাতার কাছে সকলে যেতে চান নিজের দাবি পুড়নের জন্য। মা তিনি, তাই দাবিদার সন্তানদের কাছে সহজলভ্য তিনি। কিন্তু বিচার করে দেখো। দাবিদার সন্তানের কাছে জননী কতক্ষণ থাকেন? তাঁর সম্মুখে আসেন, তাঁকে প্রশ্ন করেন কি কারণে তাঁর এই দাবি, বিচার করেন কতটা যৌক্তিক সেই দাবি। যদি যৌক্তিক মনে করেন, সেই দাবি পুড়ন করেন আর সেখান থেকে প্রত্যাবর্তন করেন।
কিন্তু পুত্র, সেই সন্তানের কথা স্মরণ করো, যার কনো দাবি নেই। কেবলই মাতাকে দেখতে চায় সে, কেবলই মাতার কাছে থাকতে চায় সে, কেবলই মাতার কিসে সুখবৃদ্ধি হয়, তার চিন্তা করে সে। মাতা সমস্ত কাজ করে, ঝাড়াহাতপা হয়ে সেই সন্তানের কাছে আসেন। কেন? কারণ সেই সন্তানের কাছে এসেই তিনি চলে যাবেন না। সেই সন্তানের কাছে এসে তিনি বিরাজ করবেন। থাকবেন তাঁর কাছে, ক্রোড়ে নিয়ে বিভিন্ন কথা বলবেন তাঁকে, বারে বারে তাঁর অঙ্গচুম্বন করে, নিজে তৃপ্ত হবেন আর সন্তানকে তৃপ্ত করবেন।
বিচার করে দেখো পুত্র, সেই পুত্র কি মাতাকে সহজে লাভ করেন? না! যতবার সে মাকে ডাকে, ততবার মা তাকে পরীক্ষা করে নেয় যে, কনো দাবি পুড়নের জন্য ডাকছে সে, নাকি মায়ের প্রতি প্রেম অর্পণ করার জন্য ডাকছে। যখন তিনি নিশ্চিত হয়ে যান যে সেই সন্তানের ডাকার কারণ একমাত্র প্রেম অর্পণ, যখন তিনি তাঁর বাকি সকল সন্তানের কাছেও তা প্রমাণ করে দেন, তখনই তাঁর সম্মুখে আসেন, আর একবার সম্মুখে এসে গেলে, আর তাঁর থেকে সরে যান না। …
পুত্র, যদি সেই মায়ের অনেক সন্তান থাকেন, তখন তিনি বারংবার বিভিন্ন ভাবে পরীক্ষা করেও দেখে নেন যে, সেই সন্তানের যে দাবি যে, কেবলই মাতাকে প্রেম করে বলেই ডাকে সে, তা কতটা সত্য। সেই প্রমাণ গ্রহণের কালে, তিনি সন্তানকে একাধিকবার বিপাকেও ফেলেন, আর পরীক্ষা করেন যে, সেই বিপাকে পরার কারনে সে মাতাকে স্মরণ করছে, নাকি সে তখনও মাতাকে সুরক্ষিত করার চিন্তাই করে যাচ্ছে।
তাই পুত্র, তোমাকে যে কঠিন পরীক্ষা দিতেই হবে, আর সত্য বলতে তোমার উপর বিশ্বাস রাখার জন্য, তোমার ভ্রাতাদেরকেও কঠিন পরীক্ষা দিতে হবে, তবেই তোমার মনস্কাম পূর্ণ হবে। তবে নিশ্চিত থাকো, একবার যদি মাতাকে লাভ করো, আর কনো শর্তে, মাতা তোমাকে ছেড়ে যাবেন না। মাতা যে প্রেম সর্বস্ব। যিনি তাঁকে বিনাকারনে প্রেম করেন, কেবল প্রেমই করেন, সত্য বলতে তিনিও তাঁর প্রতি আসক্ত।
কিন্তু পুত্র, তিনি কি করে ভুলে যান যে, তিনি জগন্মাতা! জগন্মাতা যদি কনো একটি সন্তানের কাছে এসে তাঁকে বিশেষ ভাবে সঙ্গ দেন, তাহলে যে তাঁকে অন্যসন্তানদের কাছে প্রমাণ করতে হয় যে, সেই সন্তান বিশেষ। সেই কারণেই সেই সন্তানের জন্য তাঁর বিশেষ আচরণ”।
উগ্রশাস্ত্রীর উত্তরে অত্যন্ত তৃপ্ত সুর আনন্দিত হয়ে উগ্রশাস্ত্রীকে প্রণাম করতে গেলে, উগ্রশাস্ত্রী সুরের স্কন্ধ আকর্ষণ করে, তাঁকে আলিঙ্গন করে বললেন, “মাতার এমন সন্তানকে চরণে স্থাপিত করতে লজ্জা লাগে পুত্র। তোমার আলিঙ্গন লাভ করে আমি নিজেকে ধন্য মনে করছি”।
করিন্দ্র বহুক্ষণ নিজেকে শান্ত রেখেছিলেন, যদিও চিত্তাসুতদের এহেন প্রশংসায় তাঁর সর্বাঙ্গ অগ্নিদগ্ধ হয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু এবার আর সে আর নিজেকে শান্ত রাখতে পারলো না। সে উগ্র হয়ে বলে উঠলেন, “হ্যাঁ তা তো আপনি হবেনই, ধন্য হয়ে যাবেন আপনি! আমরা তো আপনার কাছে ব্রাত্য!”
করিন্দ্রের এমন আচরণে বীর্য বিব্রত হয়ে উঠে বলে উঠলেন, “মহাশয় উগ্রশাস্ত্রী, আমার এই শিষ্যদের শিক্ষাদান যদি সম্পন্ন বলে বোধ করেন তাহলে, আমি এঁদের থেকে গুরুদক্ষিণা কামনা করতে পারি এবার!”
সেই কথাতে করাভ উগ্র হয়ে উঠে বললেন, “আবার গুরুদক্ষিণা কেন?”
সেই কথাতে ছন্দ বললেন, “অনুজ, গুরুদক্ষিণা হলো গুরুর প্রদত্ত শিক্ষা ও বিদ্যার পারিশ্রমিক। সেই পারিশ্রমিক না প্রদান করা পর্যন্ত, সম্পূর্ণ শিক্ষা ও বিদ্যা আমাদের আয়ত্ত হয়না, কারণ তা ঋণ রূপেই ততক্ষণ আমাদের কাছে থেকে যায়। এই গুরুদক্ষিণা হলো সেই ঋণ পরিশোধের মানদণ্ড”।
করিন্দ্র পুনরায় উগ্র হয়ে উঠে বললেন, “তোমাকে আর জ্ঞান বিলিয়ে বেরাতে হবেনা, যখন দেখো তখন খালি দেখানো যে কত জ্ঞানী সে!”
উগ্রশাস্ত্রী এবার সেই কথাতে উগ্র হয়ে উঠলে, করিমুণ্ড নিজের পুত্রদের রক্ষা করার অর্থে বললেন, “মিত্র বীর্য, তুমি যে তোমার গুরুদক্ষিণা রূপে কি চাই, তা বললে না। আমি তোমাকে এই কর্মে নিযুক্ত করেছিলাম। আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি, সেই দক্ষিণা আমি তোমাকে প্রদান করবো”।
বীর্য হেসে বললেন, “কিছুই নয় মহারাজ, মালদরাজ্যের রাজকন্যা, দেবী শৃঙ্খলা আমার প্রেমিকা। কিন্তু তাঁর ভ্রাতা ও মালদ রাজ্যের মহারাজ, নিষ্ঠাবান মাতা সর্বাম্বার থেকে বরদান লাভ করে রেখেছে যে, যদি তাঁর থেকে কম নিষ্ঠাবান কেউ তাঁকে আক্রমণ করে, তবে তাঁর হয়ে স্বয়ং মাতা সর্বাম্বা যুদ্ধ করবেন। তাই আমি আর আমার প্রেমিকা মিলিত হতে পারছিনা। তাই গুরুদক্ষিণা বেশে আমি আমার প্রেমিকার হাত কামনা করি, এই মাত্র। হে মহাশয় উগ্রশাস্ত্রী, আমার দক্ষিণা কামনার মধ্যে কি কনো ত্রুটি রয়েছে?”
উগ্রশাস্ত্রীর অন্তরের উগ্রতাকে ইতিমধ্যেই করিন্দ্র জাগ্রত করেছে। কিন্তু তাও এক গুরুর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে, উগ্রশাস্ত্রী বললেন, “শিষ্য গুরুর কাছে আপনের থেকেও অধিক আপন হয়। সেই শিষ্যের থেকে আপন জীবনসঙ্গিনী লাভের কামনা রাখা, তা যথাযথ গুরুদক্ষিণা”।
করিন্দ্র আবার ক্রুদ্ধ আবেশে বলে উঠলেন, “কই পিতা, পুড়ন করুন গুরুদক্ষিণা, খুব তো বড় গলা করে বললেন, আপনিই গুরুদক্ষিণা প্রদান করে দেবেন। করুন! … এমন গুরুদক্ষিণা রেখেছে মামা যে, ওই চিত্তাপুত্ররা ছাড়া তা কেউ পুড়ন করতেই পারবেনা”।
উগ্রশাস্ত্রী এবার উগ্র হয়ে উঠে বললেন, “পিতার সাথে, মহারাজের সাথে এ কেমন ধারার আচরণ, গুরু বীর্য! এই কি আপনার শিক্ষা দান!”
রাজা করিমুণ্ড এবার দৃঢ়নিশ্চয়, তাঁর পুত্ররা আর উগ্রশাস্ত্রীর উগ্রতা থেকে মুক্তি পাবেনা। তাই গদগদ হয়ে বললেন, “শিশু ভেবে ক্ষমা করে দিন ওদের মহাশয়। আমি তাঁদের পিতা, তাঁদের হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করছি আপনার কাছে”।
ছন্দ বললেন, “মহারাজ, গুরুদক্ষিণা তো গুরুর তাঁর শিষ্যদের কাছে দাবি। সেই দাবি যতটা না পারিশ্রমিক, তার থেকেও অধিক, গুরু তাঁর শিষ্যদের কি শিখিয়েছেন, কতটা শিখিয়েছেন, তার পরীক্ষাও। তাই গুরুদক্ষিণা প্রদানের অধিকার তো কেবল শিষ্যেরই, শিষ্যের অবিভাবকের কি সেই অধিকার থাকে, আপনি এই বিষয়ে আলোকপাত করুন মহারাজ”।
ছন্দের বিনম্রতা করিন্দ্রের কাছে নাট্য মনে হলে, সে পুনরায় ক্রুদ্ধ হয়ে বলে উঠলো, “যখন দেখো, খালি বিনম্রতার নাট্য, সর্বক্ষণ খালি নাট্য আর নাট্য!”
উগ্রশাস্ত্রী এবার ভয়ঙ্কর উগ্র হয়ে উঠলে, তাঁর ক্রোধকে অনুভব করে মহারাজ করিমুণ্ড বলে উঠলেন, “শিশু মহাশয়। নিতান্তই শিশু তাঁরা। তারউপর রাজপুত্র, তাই একটু বাচালও। ক্ষমা করবেন মহাশয়। আরো একটু বড় হয়ে উঠলে, অনুভব এসে যাবে, তখন ঠিক হয়ে যাবে”।
উগ্রশাস্ত্রীর উগ্রতা আর শান্ত হবার নয়। সে এবার ক্রুদ্ধ আস্ফালন করে বলে উঠলো। করিন্দ্র এমন, কারণ তাঁর পিতা একজন অন্ধ। পুত্রপ্রেমে অন্ধ তার পিতা। কিছুই সময়ের পার্থক্য তার ও ছন্দের। তার থেকে সুর ও তাল কনিষ্ঠ। তাঁরা সংযত যখন তাদের ভ্রাতা কথা বলছে। কনিষ্ঠ হয়েও তাদের সেই অনুভব আছে, আর তাদের থেকে জ্যেষ্ঠ হয়েও তোমার পুত্রের সেই বোধ নেই! হ্যাঁ নেই, কারণ সে তোমার আস্কারা পেয়ে এসেছে। … তোমার আস্কারার কারণেই সে লাগামছাড়া। তোমার মোহান্ধতার কারণেই তারা লাগামছাড়া। তুমি তো তাদের দোষ দেখতেই পাওনা! শাসন করার বিপরীতে, তাদের হয়ে সাফাই গাও যে তারা শিশু”।
প্রবল বেগে নিশ্বাস নিতে নিতে, উগ্র উগ্রশাস্ত্রী এবার হুংকার করে বলে উঠলেন, “আমি উগ্রশাস্ত্রী, উদ্দন্ড করিন্দ্র, যে এক অসুরের সমান, তার জন্য মোহে অন্ধ হয়ে থাকা, তার পিতাকে শ্রাপ দিচ্ছি যে, সে মৃত্যুর কাল পর্যন্ত অন্ধ হয়ে থাকবে। … যদি ভবিষ্যতে তাঁর কনো কিছু দেখা আবশ্যক হয়ে যায়, স্বয়ং মাতা তাঁকে সেই দৃশ্য দেখার সামর্থ্য প্রদান করবেন”।
এই কথা বলার সাথে সাথে, মহারাজ করিন্দ্র নেত্রের দৃষ্টিশক্তি ক্রমাগত হারাতে থাকলে, কিছুক্ষণের মধ্যে সম্পূর্ণ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যায় তাঁর কাছে সমস্ত জগত, আর তিনি পতিত হতে থাকলেন। এই দৃশ্য দেখে, করিন্দ্র তথা সকল করিপুত্ররা প্রথমবার এমন ভাবে অভিশাপ ফলতে দেখে ভয়ার্ত হয়ে উঠলেন, তো তাল করিমুণ্ডের পশ্চাতে গিয়ে তাঁকে ধরলেন, এবং তাঁর সাহারা হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।
ছন্দ উগ্রশাস্ত্রীর চরণে পতি হয়ে বললেন, “মহাশয়, ইনি চন্দননগরের মহারাজ। ইনি যদি এমন অন্ধ হয়ে যান, তাহলে প্রজার কি হবে! কৃপা করুন মহাশয়। দয়া করে, উনাকে এই শ্রাপ থেকে মুক্ত হবার উপায় বলে দিন”।
উগ্রশাস্ত্রী অভিশাপ দিয়ে শান্ত হয়ে গেছেন। শান্ত চিত্তে এবার তিনি বললেন, “মহারাজ জানেন, আমি তার উপর কৃপাই করেছি। স্মরণ করে দেখুন মহারাজ, দেবী চিত্তাকে আপনি আপনার কোন দুশ্চিন্তার কথা ব্যক্ত করেছিলেন, আর তার উত্তরে তিনি কি বলেছিলেন? আপনার দুশ্চিন্তার সমাধান আমি করে দিলাম। এবার চন্দননগরের সিংহাসনে উপযুক্তকে স্থাপন করে, তাঁর কাছে সমস্ত দায়িত্ব অর্পণ করুন মহারাজ”।
করিমুণ্ডের সমস্ত কিছু স্মরণ এসে গেছে। ভ্রাতার পুত্রের সাথে তিনি যুদ্ধ করতে পারবেন না, এর নিদান কি। দেবী চিত্তা বলেছিলেন, নিয়তি ঠিকই উপায় করে দেবেন। সত্যই নিয়তি উপায় করেই দিলেন। করিমুণ্ড এখন অন্ধ। আর তাঁকে রণক্ষেত্রে প্রবেশ করতেই হবেনা।
