জগদ্ধাত্রেয় কাণ্ড (কৃতান্ত দ্বিতীয় কাণ্ড)

মোহিনীপুত্র বীর্য, ঠিক কতটা শক্তিশালী, সেই সম্বন্ধে কারুর সঠিক ধারণা নেই, তবে তাকে মানুষ করা পিতা থেকে তাঁর ভগিনীরা সকলে একটি জিনিস জানতেন যে, ছল ও মায়াতে সে উপযুক্ত মোহিনী সন্তান। আশানুরূপ ভাবেই, চন্দননগর এসেই তিনি সরাসরি চলে গেলেন মহারাজ করিমুণ্ডের সাথে সাখ্যাতে। মহারাজ তখন রাজসভায় উপস্থিত হবার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন নিজের সাজঘরে। সেই স্থানে উপস্থিত হয়ে, সরাসরি মহারাজের চরণে পতিত হয়ে বলতে থাকলেন, “আমাকে বাঁচান। মহারাজ, একামত্র আপনিই আমাকে বাঁচাতে সক্ষম। বাঁচান!”

নিজের একমাত্র শ্যালককে এমন ভাবে চরণে পতিত দেখে, তাঁকে উদিত করে, ব্যকুল ভাবে প্রশ্ন করলেন করিমুণ্ড, “কি হয়েছে, সেটি তো বলবে পূর্বে! … মোহিনীপুত্র, মানস সুরক্ষিত বীর্যকে কার সাহস হয়েছে এই দুর্দশা করার! কি থেকে তোমার প্রাণের সঙ্কট? ব্যক্ত করো আমায় বীর্য”।

নাট্যরূপ তখনও ত্যাগ না করেই, বীর্য বললেন, “সেই কথা আর কিই বা বলি মহারাজ। আমার শত্রু আমারই আকর্ষণ হয়ে গেছে, আর আমার আকর্ষণ আমাকে হত্যা করতে চলেছে। দিবারাত্র সে আমাকে ছুরিকাঘাত করেই চলেছে। এইরূপ চললে, আর যে আমি অধিকদিন দেহে প্রাণ ধরে রাখতে পারবো না, সেই ব্যাপারে আমি সুনিশ্চিত”।

মহারাজ করিমুণ্ড বিচলিত হয়ে বললেন, “আকর্ষণ! এর অর্থ তুমি কনো কিছুর প্রতি তীব্র ভাবে আকর্ষিত, আর তা তুমি লাভ করছো না। এই তো! … কিন্তু বীর্য। ত্রিভুবনে এমন কিই বা আছে, যা তুমি, মোহিনীপুত্র ধারণ না করতে পারো? আমি কি তোমাকে সেই বস্তু লাভ করাতে বিন্দুবিসর্গও সহায়তা করতে সক্ষম তোমাকে? ব্যক্ত করো আমাকে সমস্ত কিছু বিস্তারে”।

বীর্য নিজের নাট্যকে সফল করতেই থাকলেন, আর সেই নাট্য বেশেই বলতে থাকলেন, “মহারাজ, বস্তু নয়, এক ব্যক্তি। হ্যাঁ এক কন্যা। সুতীব্র ভাবে আমি তাঁর প্রতি আকৃষ্ট, আর তাঁকে লাভ করার কনো উপায় আমার কাছে উন্মুক্ত নেই। এক আপনিই সাহারা মহারাজ। যদি কিছু করতে পারেন, তো আপনিই করতে পারেন”।

মহারাজ করিমুণ্ড এবার উচ্চৈঃস্বরে হাস্য প্রদান করে বললেন, “আচ্ছা এই ব্যাপার! … কন্যার পিতা বুঝি মানছেন না! … কিন্তু না মানার কারণই বা কি! মানসের সংরক্ষণ তোমার সাথে আছে। স্বয়ং মোহিনী তোমার মাতা। তোমাকে পাত্র রূপে অস্বীকার করার কারণ কি বীর্য! … আর যদি কারণ ছাড়াই কন্যার পিতা এরূপ করে থাকে, তোমার তো বাহুবল যথাযথ আছে। তোমাকে প্রতিরোধ করে, এমন সামর্থ্য কার? সেই কন্যাকে হরণ করে নিয়ে এসে, গন্ধর্বমতে বিবাহ করে নাও”।

বীর্য নাট্যে মনোদুঃখ প্রদর্শন করে বললেন, “এইখানেই তো শঙ্কা মহারাজ। সামান্য মানুষ যদি প্রতিরোধ করতো, কনো বলশালী রাজা বা সম্রাট প্রতিরোধ করলেও, আমি সেই কন্যাকে হরণ করে নিয়ে আসতাম আর বিবাহ করে নিতাম। কিন্তু সম্মুখে বাঁধা মাতা সর্বাম্বা স্বয়ং”।

করিমুণ্ড ভ্রুকুটি উত্তোলন করে বললেন, “মাতা সর্বাম্বা! তিনি আবার কবে বিবাহ করলেন? তাঁকে বিবাহ করে তাঁর উদ্দেশ্যে নিজের বীর্য অর্পণ করে, ত্রিভুবনে তো এমন কনো পুরুষই সম্ভব নয়! … তাঁর কন্যা তাহলে কি করে থাকতে পারে? দেবী চিত্তা তাঁর ভগিনী, যিনি তাঁর থেকে বয়সে অনেকটাই কনিষ্ঠ হবার দরুন, তাঁকে তিনি কন্যার ন্যায় মানুষ করেছেন। কিন্তু সেই চিত্তা তো আমার ভাতুস্পত্নি। দেবী চিত্তার কনো ভগিনী আছেন, সেই বিষয়ে তো আমার জানা ছিলনা!”

বীর্য এবার নিজের কথা বলার জন্য যেই পটভূমি প্রয়োজন ছিল, তা সম্পূর্ণ ভাবে সাজিয়ে নিয়েছেন। তাই এবার অনায়সে, নিজের বক্তব্য ব্যক্ত করতে থাকলেন। তিনি বললেন, “মহারাজ ব্যাপারটা ততটা সহজ নয়। মালদরাজ্যের রাজা, নিষ্ঠাবান একজন পূর্ণভাবে মাতা সর্বাম্বার প্রতি নিষ্ঠাবান। তিনি একজন মনেপ্রাণে ভক্ত, এবং আজীবন মাতার সেবায় নিজেকে নিয়জিত করেছেন। নিজের রাজ্যেও মাতার দ্বারা নির্ধারিত নিয়মাবলীই স্থাপিত রেখেছেন তিনি। তিনি সিংহাসনে উপস্থাপনও করেন না। সিংহাসনে মাতার চরণপাদুকা স্থাপিত রেখে, তিনি তাঁর বামপার্শে যুবরাজের সিংহাসনে স্থিত হয়ে রাজ্য পরিচালনা করেন।

তাঁর এই নিষ্ঠা, আর পূর্ণ সমর্পণের কারণে, মাতা তাঁকে বরদান প্রদান করেছেন যে, তাঁর রাজ্যের উপর যখন যখন কনো বহিরাগত আক্রমণ করবে, সেই বহিরাগত দস্যু, রাজা, সম্রাটকে স্বয়ং তাঁর সাথে যুদ্ধ করতে হবে। একমাত্র যদি সম্মুখে উপস্থিত শত্রু, তাঁর থেকেও অধিক নিষ্ঠাবান হন, তাহলে তিনি সেই যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করবেন না। অন্যথা সমস্ত সময়ে, তিনি রাজা নিষ্ঠাবানের রক্ষক, বুদ্ধিদাতা এবং সহায়ক হয়ে থাকবেন। … এই রাজা নিষ্ঠাবানও বিবাহ করেন নি। তিনি নিজের সমস্ত বীর্যগুণকে মাতার সেবাতেই নিয়জিত করে রেখেছেন। কিন্তু ইনার একটি ভগিনী আছে, যার নাম দেবী শৃঙ্খলা।

মহারাজ রূপেগুণে অসামান্য, দেবী শৃঙ্খলার সাথে আমার আলাপ এক রাজশিবিরে হয়ে থাকে, যেখানে আমি ও তাঁর ভ্রাতা উভয়েই নিমন্ত্রিত ছিলাম। তারপর থেকে আমাদের আলাপ ক্রমশ ঘনিষ্ঠ হতে থাকে, আর আজ আমি ও তিনি একে অপরকে ছাড়া জীবিতই থাকতে পারবো না, এই পর্যায় আমাদের ঘনিষ্ঠতা এসে উপস্থিত হয়েছে। কিন্তু মহারাজ আমাদের চার হাত এক হওয়ার অন্তরায় বাঁধা হলেন, মহারাজ নিষ্ঠাবান, তাঁর সর্বাম্বাভক্তি, আর মাতা সর্বাম্বার আশ্বাসবাণী”।

মহারাজ করিমুণ্ড, নিজের মুকুট ধারণ করতে করতে বললেন, “তাতে কি হয়েছে! যখন রাজা নিষ্ঠাবানের ভগিনীও সেই একই ভাব ধারণ করেন, যা তুমি করো, তখন তুমি নিষ্ঠাবানের সম্মুখে যেতে না পারো, সে তো তাঁর ভ্রাতাকে এই বিবাহের জন্য মানাতেই পারে!”

বীর্য মাথা নেড়ে বললেন, “উপযুক্ত বলেছেন মহারাজ, কিন্তু আপনি একটি কথা ভুলে যাচ্ছেন! আমি মোহিনীপুত্র। সেই মোহিনী যিনি সর্বাম্বাজননী দেবী মেধার সাথে শত্রুতা ধরতেন। সেই মোহিনী যিনি মাতা সর্বাম্বার প্রমুখ শত্রুদের মধ্যে একটি। … বুঝতে পারছেন মহারাজ! মোহিনীপুত্রের সাথে বিবাহদান কিছুতেই করবেন না মহারাজ নিষ্ঠাবান”।

মহারাজ করিমুণ্ড সম্পূর্ণ সজ্জ হয়ে বললেন, “মাতা সর্বাম্বাকে মানানো সম্ভব নয়, তাই না! … তাহলে আমি কি ভাবে সাহায্য করতে পারি তোমাকে বীর্য?”

বীর্য এবার সঠিক সময় লাভ করেছে, নিজের আসল কথা বলার জন্য। তাই গদগদ হয়ে বললেন, “মহারাজ, আপনি হলেন স্বয়ং জগদ্ধাত্রীপুত্র। আপনার থেকে অধিক শ্রেষ্ঠ আর কেই বা হতে পারে এই ব্যাপারে। আপনি নিষ্ঠাবানের সম্মুখে স্থিত হলে, নিশ্চিত ভাবে মাতা সর্বাম্বা তাঁর সহায়তা করতে আর আসবেন না”।

মহারাজ করিমুণ্ড মাথা নেড়ে বললেন, “না বীর্য, ভুল ধারণা রাখছো তুমি। আমার জ্যেষ্ঠ যদি জীবিত থাকতেন, তিনি হতে পারতেন তোমার সহায়ক। আমি নই। আমার কুকীর্তি অগণিত। সম্ভোগী আমি, অজস্র কন্যাকে সম্ভোগ করেছি। ধনলোভী আমি, পদমর্যাদার লোভী আমি। না না, বীর্য। শুধুই জগদ্ধাত্রী সন্তান হলেই হয় না। সেই হিসাবে বলতে গেলে, সকলেই তো মাতা সর্বাম্বার সন্তান, কারণ তিনি তো সর্বের অম্বা। কিন্তু শুধু সন্তান হবার কথা তো তুমি বললেও না আমাকে।

তাই না! তুমি তো বললে, নিষ্ঠাবানের থেকেও অধিক নিষ্ঠা যার থাকবে। কিন্তু সেই নিষ্ঠা আমার নেই। সেই নিষ্ঠা আমার জ্যেষ্ঠের ছিল। তাই বীর্য, আমি তোমার সহায়তা করার সঠিক ব্যক্তি নই এই ক্ষেত্রে”।

এতবলে মহারাজ করিমুণ্ড রাজসভার উদ্দেশ্যে প্রস্থান করলে, বীর্য শিশুর মত লাফিয়ে লাফিয়ে তাঁর সম্মুখে উপস্থিত হয়ে, তাঁর পথকে অবরোধ প্রদান করে বললেন, “মহারাজ, মহারাজ। … আরো একজন আছে। … আছে মহারাজ”।

মহারাজ করিমুণ্ড খানিক বিরক্ত হয়েই বললেন, “যা বলার তাড়াতাড়ি বলো বীর্য। রাজসভায় উপস্থিত হবার সময় হয়েছে। সভাসদরা আমার অপেক্ষা করছেন। বিলম্ব করিও না”।

বীর্য বললেন, “মহারাজ আপনার ভাতুস্পুত্ররা আছেন। ছন্দচিৎ নিষ্ঠাবান, চিত্তাল তাঁর ভ্রাতা ও মাতার প্রতি নিষ্ঠাবান। আর সর্বাধিক ভাবে, সুরচিৎ মহামেধাবী, আর পূর্ণরূপে সমর্পিত”।

মহারাজ পুনরায় বিরক্ত হয়ে পথ চলতে চলতেই বললেন, “কিন্তু তারা কিশোর। আর তার থেকেও বড় কথা, তাঁরা বলশালী, নিষ্ঠাবান, সমস্ত কিছু সত্য, কিন্তু তাঁরা অস্ত্রশিক্ষাই গ্রহণ করেনি এখনো। … মানলাম মাতা সর্বাম্বা এই তিন চিত্তাপুত্রকে দেখে সহায়তার জন্য এলেন না। কিন্তু মহারাজ নিষ্ঠাবান, মালদরাজ্যের নৃপতি। তিনি স্বয়ংও মহাবলশালী আর মহান যোদ্ধা। অস্ত্রবিদ্যায় তিনি স্বয়ংও পারঙ্গম। অস্ত্রশিক্ষা না নেওয়া, আমার ভাতুস্পুত্ররা তাঁর সম্মুখীন কি করে হবে রাজপুত্র বীর্য!”

বীর্য এবার এক খল হাস্য প্রদান করে বললেন, “আপনার আশীর্বাদে, সমস্ত অস্ত্রের শ্রেষ্ঠ বিদ্যা আমার কাছে উপস্থিত মহারাজ। আপনি অনুমতি প্রদান করলে, আমি চিত্তাপুত্র তথা, করিপুত্র, সকলকে অস্ত্রশিক্ষায় পারঙ্গম করে তুলবো। আর তাঁদের থেকে বরং গুরুদক্ষিণা স্বরূপ, নিষ্ঠাবানের মুকুট দাবি করবো”।

মহারাজ করিমুণ্ড এবার একটি মসৃণ হাস্য প্রদান করে বললেন, “সত্যই মোহিনীপুত্র তুমি বীর্য। ছলনা ও মায়াতে, তোমার জুরি মেলা ভার। এই কথাই আমাকে বলতে এসেছিলে, কিন্তু এতকথার পর আমাকে সেই কথা বললে। … ভাই বীর্য, তুমি আমার কাছেই থেকে যাও না। তোমার ছলনা আর মায়া যদি আমার সাথে আমার পুত্রদের সাথে একত্রিত হয়, তাহলে সমস্ত জম্বুভূমি আমাদের অধীনে থাকবে, বিশ্বাস করো আমার কথাকে”।

বীর্য হেসে বললেন, “শৃঙ্খলাকে আমার পত্নী করে দিন মহারাজ, আমি আপনার চিরভৃত্য থাকবো”।

করিমুণ্ড এবার হাস্যস্বরে সভায় যাত্রা করতে করতে উচ্চৈঃস্বরে বললেন, “ভৃত্য নয়, পরম মিত্র করে রাখবো তোমাকে বীর্য। … রাজসভা থেকে ফিরে এসে, পুত্রদের আর চিত্তাপুত্রদের শিক্ষার ব্যবস্থায়ন নিয়ে কথা বলছি তোমার সাথে বিস্তারে। ততক্ষণ নিজের ভগিনীদের সেবা আস্বাদন করো”।

এতবলে মহারাজ রাজসভায় প্রস্থান করলে, আড়াল থেকে বীর্যের তিন ভগিনী নির্গত হয়ে, তাঁদের আদরের ভ্রাতাকে আলিঙ্গন করলেন, তাঁদের সকলের যোজনা সফল হবার দরুন। তাঁদের ভ্রাতা তাঁদের লক্ষ্যপুড়নের উদ্দেশ্যে হস্তক্ষেপ করেছেন, এবং তাঁদের স্বামীর থেকে, এই চন্দনবংশের সাথে থাকার বচন আদায় করে নিয়েছেন। তাই আপ্লুত হুতা, মিতা ও স্ফীতা, তাঁদের ভ্রাতাকে যত্নখাতির করে সেবা ও আহার করালে, দ্বিপ্রহরে উদরপূর্তির পর সুখনিদ্রাযাপনের শেষে, মহারাজ করিমুণ্ডের সাথে আলাপের জন্য উদগ্রীব রইলেন বীর্য।

বৈকালে মহারাজ সভা সমাপ্ত করে, পুনরায় নিজের কক্ষে প্রত্যাবর্তন করে, হাতমুখ ধুয়ে, সান্ধ্যভোজন করার উদ্দেশ্যে, তিনরাণীদের কক্ষে এলে, সেখানে বীর্যকে দেখে, আপ্লুত হয়ে বললেন, “বীর্য, আমার পুত্ররা তো তোমাকে চেনেই শুধু নয়, তুমি তাঁদের শ্রেষ্ঠ ভরসার পাত্রও। তবে তোমার চিত্তাপুত্রদের সাথে আলাপ নেই। তাঁদের সাথে আলাপ করিয়ে দেব, আর তোমাকে তাঁদের অস্ত্রগুরু রূপে নিযুক্ত করবো”।

দেবী হুতা বললেন, “কেবল অস্ত্রগুরু কেন মহারাজ, শাস্ত্রগুরু ও সস্ত্রগুরু রূপেও তো ভ্রাতাকেই নিযুক্ত করা চলে। আমাদের ভ্রাতার ন্যায় সস্ত্র ও শাস্ত্র জ্ঞাতা আর কয়জন আছেন!”

করিমুণ্ড আহার করতে করতেই বললেন, “দেবী, সর্বাম্বা ভগিনী, দেবী চিত্তা যাদের জননী, তাঁদেরকে শাস্ত্র বা সস্ত্র জ্ঞান প্রদানের জন্য ভিন্ন গুরু স্থাপন এক বাচালতা ব্যতীত কিছুই নয়। দেবী চিত্তা, তাঁর পুত্রদের শাস্ত্র ও সস্ত্র জ্ঞান ইতিমধ্যেই প্রদান করেছেন। আর সেই জ্ঞানের ঝলক বীর্যও শিক্ষাদানের সময়েই দেখে ফেলবে। … পঞ্চভূত তথা চতুর্বিংশতিতত্ত্ব চিত্তাপুত্রদের সর্বদা নিয়ন্ত্রণে থাকে। কেবল অস্ত্রশিক্ষা নেই, তাই সেই সমূহ নিয়ন্ত্রিত মহাবলদের ব্যবহার করতে পারেনা তারা। …

এমন নয় যে, আমার পুত্রদের দেবী চিত্তা শাস্ত্র ও সস্ত্রজ্ঞান প্রদান করতে অনিচ্ছুক ছিলেন, কিন্তু আমার পুত্রদের ধারা ভিন্ন। পবিত্রতা তথা গুরুপ্রেম তাঁদের মধ্যে লেশমাত্রও নেই। তাই তাঁরা সেই শিক্ষা গ্রহণ করতে পারেনি, বা বলা উচিত সেই শিক্ষা গ্রহণ করতে সচেষ্ট হয়নি। ওদেরকে সঠিক পথে বীর্যই চালিত করতে পারবে, কারণ বীর্য তাঁদের কাছে কেবল মাতুল নয়, একজন আদর্শ পুরুষও”।

এই বিষয়ে আহার গ্রহণের কালে আর একটি কথাও না হলে, মহারাজ করিমুণ্ড আহারাদি সমাপ্ত করার শেষে, বীর্যকে বললেন, “মিত্র বীর্য। চলো না একটু বাগিচা দর্শন করে আসি, আর আমরা দুইজনেই একটু মনের কথা বলে হাল্কা হয়ে আসি”।

বীর্য বেশ বুঝতে পেরেছিলেন যে মহারাজ করিমুণ্ড অনেক কিছু বলতে চাইছেন, কিন্তু স্ত্রীদের সম্মুখে সেই কথা বলতে অনিচ্ছুক। তাই বীর্য একটি কথাও বলেননি, মহারাজের আহার করার কালে। হাতমুখ ধৌত করার শেষে, করিমুণ্ড ও বীর্য একত্রে বাগিচার দিশায় যেতে থাকলে, বাতায়ন থেকে দুইজনকে দেখে, দেবী চিত্তা শান্ত ভাবে, তাঁর তিনপুত্রকে নিকটে ডেকে উপস্থাপন করিয়ে, কিছু কথা বললেন তাঁদের উদ্দেশ্যে।

তিনি বললেন, “পুত্ররা, গুরু যতক্ষণ গুরুর আসনে স্থিত, তাঁর কখনো বিচার করবে না। মন্দবুদ্ধি হলেও তিনি গুরু, আর সদ্বুদ্ধির হলেও তিনি গুরু। আর গুরুর সম্মুখে যারা যারা উপস্থিত, তাঁরা সকলেই গুরুভ্রাতা। আর ভ্রাতা কখনোই প্রতিস্পর্ধার ব্যক্তিত্ব হননা। তাই অন্যগুরুভ্রাতাদের প্রতি কখনো প্রতিস্পর্ধার ভাব রাখবেনা। হতে পারে, অন্যরা তোমাদের সাথে এমন প্রতিস্পর্ধার ভাব রাখবে, তাও তোমরা সেই ভাব রাখবেনা, কারণ তাঁর তোমাদের ভ্রাতা, গুরুভ্রাতা।

গুরু যখন শিক্ষা প্রদান করছে, তখন সেই শিক্ষাই তোমাদের শ্বাসবায়ু হওয়া উচিত, সেই শিক্ষাগ্রহণ ব্যতীত দ্বিতীয় কনো প্রকার ভাব জন্ম নেওয়ার অর্থ জানবে শিক্ষা গ্রহণে অপদার্থতা। অর্থাৎ শিক্ষা গ্রহণ ব্যতীত অন্য দ্বিতীয় কনো ভাব, যেমন প্রতিস্পর্ধা, বিদ্বেষ, শঙ্কা ইত্যাদি যাই জন্ম নিক, জানবে তা তোমাদের শিক্ষা গ্রহণ থেকে বিরত রাখার জন্যই নির্মিত করছে তোমাদের আত্মবোধ, আর তাই তার থেকে বিরত থাকবে। আশা করি কি বললাম, তা অনুভব করেছ তোমরা। সর্বদা এই কথাকে নিজের অনুভূতির মধ্যে সঞ্চিত রাখলে, কখনোই অপবিত্রতার ভাব তোমাদেরকে গ্রাস করতে পারবেনা; কখনোই আত্মভাব তোমাদের চেতনাকে গ্রাস করতে পারবেনা”।

নিয়িতি জানেন, দেবী চিত্তা অত্যন্ত বিচক্ষণ ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন, আর দেবী চিত্তা নিয়িতির মান রেখে, প্রমাণও করলেন যে, তিনি কেবল বিচক্ষণ নন, কেবল দূরদৃষ্টিসম্পন্নই নন, তিনি জানেন, পবিত্রতার নাশ কি কি ভাবে, কখন কখন হয়। তাই তাঁর তিন পবিত্রপুত্রকে সচেতন করে দিলেন সেই ব্যাপারে।

বাগিচায় ভ্রমণের কালে, মহারাজ করিমুণ্ড বীর্যের উদ্দেশ্যে বললেন, “মিত্র বীর্য, আমার খুব চিন্তা হয়, আমার পুত্রদের নিয়ে। চিত্তার পুত্ররা অত্যন্ত বলশালী, আর মেধাবী। তাঁদের মেধা ও বলের কাছে আমার পুত্ররা অতিতুচ্ছ বললেই সঠিক শব্দপ্রয়োগ হয়। সে তো চিত্তার উচ্চসংস্কার, যার জন্য তাঁর পুত্ররা আমার পুত্রদের শত্রুর বেশে দেখেনা। নাহলে আমার পুত্ররা যথেষ্ট কর্ম করেছে, যার দ্বারা তাঁরা আমার পুত্রদের শত্রু মানতে পারতেন।

কিন্তু কথা সেটি নয় মিত্র। কথা এই যে, ছন্দচিৎ হলো জ্যেষ্ঠ পুত্র, প্রজার অতিপ্রিয়, আর প্রকৃত উত্তরাধিকার চন্দননগরের রাজসিংহাসনের। আমার কনো আপত্তি নেই, তাঁকে এই রাজ্যের সিংহাসনে স্থাপন করাতে। কিন্তু আমার দুশ্চিন্তা অন্যত্র। আমার চিন্তা এই যে, একবার তাঁকে রাজসিংহাসনে স্থাপন করা হলে, আমার পুত্রদের কি মনমানসিকতা দাঁড়াবে, সেই নিয়ে। তাঁরা যদি শত্রুতার রূপ ধারণ করে সেইকালে, তাহলে তো রাজসিংহাসনের রক্ষার্থে, চিত্তাপুত্ররা আমার পুত্রদের মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে দেবে!”

বীর্য ক্রুরহাস্য প্রদান করে বললেন, “মহারাজ, আপনি চন্দননগরকেই কেন জম্বুদেশ জ্ঞান করছেন। এই প্রাচীন ভূখণ্ড, যাকে আমরা আজ বঙ্গ বলি, তা হলো জম্বুদ্বীপ, যা এই সম্যক ভারতভূখণ্ডের আদিমতম স্থান। এই স্থান ও তাঁর সংস্কার ও দর্শনের উর্বরতা সেই কাল থেকে, যখন আর্যরা সুদূর আফগান থেকে এই দেশে এসে সিন্ধু নদীর তটে বসবাসও শুরু করেনি।

মহারাজ, এই জম্বুদেশে চন্দননগরের ন্যায় বহু রাজ্য রয়েছে। একবার বিচার করুন মহারাজ, জ্যেষ্ঠ পুত্র হবার জন্য যদি ছন্দকে এই রাজ্যের রাজা করে নিযুক্ত করেও দেন, তারপরেও তাঁকে ও তাঁর ভ্রাতাদেরকে আপনার পুত্ররা নিজেদের অধীনে রাখতে সক্ষম, যদি তাঁরা সম্পূর্ণ বঙ্গ অর্থাৎ জম্বুদেশের অধিপতি হয়ে ওঠে। কি ভুল বললাম মহারাজ?”

মহারাজ করিমুণ্ড ভ্রুকুঞ্চিত করে বললেন, “তা কি করে সম্ভব?”

বীর্য হাস্যবশে বললেন, “মহারাজ, নটিসূতা আর গোবিন্দনগরকে একত্রিত করে, কাতা রাজ্য স্থাপন করেছে যিনি, সেই ভৃগুসেন আমার পরম মিত্র। তাঁর নজর মেদিনীরাজ্যের রাজকন্যা, যাদেরকে বলা হয় ঘৃতকুমারী। আর সেই রাজ্যের সুরক্ষা নিশ্চয় করেন নিষ্ঠাবান, অর্থাৎ মালদ রাজ্যের রাজা। মহারাজ একবার মানচিত্রটি স্মরণ করে দেখুন। চন্দনরাজ্য, কাতারাজ্য, মালদরাজ্য, মেদিনীরাজ্য আর শূন্যপুর, অর্থাৎ মুর্শিদরাজ্য, এঁদের সমষ্টি হলো জম্বুদেশ।

যদি আমরা মালদরাজ্য দখল করে নিতে পারি, তাহলে সেখানের রাজকন্যা, অর্থাৎ দেবী শৃঙ্খলা আমার পত্নী হবেন। আর তাঁর বরদান আছে, তিনি চার বিশেষ কন্যার মাতা হবেন। অন্যদিকে মালদরাজ্যকে অধিকার করে নিতে পারলে, মেদিনীরাজ্যকে আমরা ও কাতারাজ্য একত্রে আক্রমণ করলে, সেই রাজ্যও আমাদের অধীনে চলে আসবে। সেই রাজ্যের ঘৃতকুমারীর কাছে বরদান আছে যে তাঁরা চারবার চারটি করে বিশেষ কন্যার জন্ম দেবেন। অর্থাৎ কটি কন্যা রইল মহারাজ? ২০টি।

এবার সেই ২০টি কন্যা কাকে বিবাহ করবে? আপনার ২০টি পুত্রকে। অর্থাৎ সম্পূর্ণ জম্বুদেশের অধিপতি হয়ে উঠবে, আপনার পুত্ররা। শূন্যরাজ্য অর্থাৎ মুর্শিদরাজ্য মাতা সর্বাম্বার রাজ্য। শান্তি বজায় রেখে তাঁর কাছে আবেদন করলে, তিনি এমনিই নিজের রাজ্যকে জম্বুর অধিপতি সম্রাটের কাছে নিবেদন করে দেবেন। আর তাঁরই ভগিনীর রাজ্য হলো চন্দননগর। তাই তাঁরাও নিবেদন করে দেবে। তাহলে বুঝতে পারলেন? আপনার পুত্ররা একচ্ছত্র সম্রাট হয়ে উঠবে, এই সম্পূর্ণ জম্বুরাষ্ট্রের। আর যখন চিত্তাপুত্ররা আপনার পুত্রদের অধীনেই স্থিত থেকে করদাতা হয়ে উঠবে, তখন আর কিসের চিন্তা?”

সমস্ত কথা শ্রবণ করে বিস্মিত মহারাজ করিমুণ্ড বললেন, “অদ্ভুত! অদ্ভুত তোমার বিচক্ষণতা বীর্য। সত্যই তোমার বুদ্ধির জবাব নেই। … তুমি কি এই সমস্ত পূর্ব থেকেই পরিকল্পনা করে রেখেছিলে!”

বীর্য হেসে বললেন, “হ্যাঁ মহারাজ। দেবী সর্বাম্বা আমাদের সম্পূর্ণ কুলকে নাশ করে দিয়েছেন। তিনি যতদিন থাকবেন, ততদিন অশান্তির স্থাপন হলে, তিনি পুনরায় তাই করবেন, যা তিনি পূর্বে করেছিলেন। তাই আমাদের একটিই কর্ম করতে হবে। আমাদেরকে শান্তি বজাই রাখতে হবে। করিন্দ্রকে আমি শিক্ষিত করবো। তাকে উপযুক্ত সম্রাট করে দেখিয়ে দিতে পারলে, মাতা সর্বাম্বা নিজের দেহ ত্যাগ করে দেবেন। আর কতদিন অবতার তনু ধারণ করে থাকবেন তিনি! … আর একবার তিনি চলে গেলে, আর কারুকে ভয় নেই। সম্পূর্ণ জম্বুদেশে কেবল ও কেবল করিন্দ্রের একচ্ছত্র বিরাজ করবে। করিবংশ হয়ে উঠবে, জম্বুদেশের নূতন ইতিহাস রচয়িতা”।

মহারাজ করিমুণ্ড যেন নিশ্চিন্ত হলেন, আর সাথে সাথে প্রফুল্লিতও হলেন। তাঁর বংশের জয়জয়কার যেন তিনি ভবিষ্যতে ভ্রমণ করে শ্রবণ করে এলেন। আর তাই প্রবল ভাবে আনন্দিত হয়ে, বীর্যকে বারংবার আলিঙ্গন করলেন। দেবী চিত্তা বাতায়ন থেকে সেই দৃশ্যও দেখলেন, আর সমস্ত কিছু দেখে এক গভীর নিশ্বাস ছাড়লেন। ছন্দ মাতার কাছেই দণ্ডায়মান ছিলেন। তাই সে মাতার এমন গভীর নিশ্বাসকে প্রত্যক্ষ করে প্রশ্ন করলেন, “কি হলো মাতা?”

দেবী চিত্তা ম্লান একটি হাস্য প্রদান করে, ছন্দের মস্তকে ন্সেহহস্ত রেখে বললেন, “ও কিছু না বাবা। দূরে যেন মনে হলো সিঁদুরে মেঘ ঘনাচ্ছে। … ও নিয়ে তুমি চিন্তা করো না। নিজেদের সর্বদা পবিত্র রাখবে। তোমার কনিষ্ঠ ভ্রাতা যেমন বলে, প্রয়োজনে আমাকে উপেক্ষা করলেও, কভু মাতা জগদ্ধাত্রীকে তথা পরামাতৃকাকে উপেক্ষা করা যাবেনা, সেটি স্মরণ রাখবে সর্বদা”।

ছন্দ প্রশ্ন করলেন, “সিঁদুরে মেঘ মানে কি যুদ্ধ! … শুনেছি মাসিমনি, মাতা সর্বাম্বা একবার ভয়ানক যুদ্ধ করেছিলেন, তেমনই যুদ্ধের ইঙ্গিত দিচ্ছেন মাতা! আচ্ছা মা! যুদ্ধ মানেই তো রক্তপাত, যুদ্ধ মানেই তো প্রাণহানি। তাহলে কেন এই যুদ্ধ?”

দেবী চিত্তা পুনরায় মিষ্ট হাস্য প্রদান করে তাঁর জ্যেষ্ঠ অবোধ পুত্রকে বললেন, “বাবা, যুদ্ধ হলো অন্তিম বিকল্প, কারণ যুদ্ধ মানেই ওই যে তুমি বললে, প্রাণহানি, রক্তপাত। কিন্তু পুত্র, যখন অসত্য সত্যকে গ্রাস করে নিতে আগ্রহী হয়, তখন এই প্রাণহানি আর রক্তপাত আবশ্যক হয়ে যায়, নাহলে যে সমস্ত জীব লক্ষ্যচ্যুত হয়ে যাবে অসত্যের কবলে এসে। তবে হ্যাঁ, অন্তিম ক্ষণ পর্যন্ত প্রয়াস করে যেতে হয় যাতে সেই যুদ্ধ না বাধে। তবে যদি সমস্ত প্রয়াস বিফল হয়, তবে যুদ্ধই একমাত্র বিকল্প হয়ে যায়।

তবে পুত্র, স্মরণ রাখবে, সত্যস্থাপনের জন্যই কেবল যুদ্ধ করবে। সত্য এই যে, নিয়তিই সত্য, শূন্যতাই সত্য, আর সেই শূন্যতার পাঠ প্রদান করেন স্বয়ং প্রকৃতি ও সময়। তাই যখন যখন এই প্রকৃতি ও সময়কে উপেক্ষা করার অবস্থা আসে, যখন যখন এই সময়কে ব্যবহার করা হয় প্রকৃতির থেকে দূরে অপসারিত করার জন্য, তখন তখনই যুদ্ধ করবে। নিজ অধিকার স্থাপনের জন্য, নিজ সত্ত্বাস্থাপনের জন্য কখনো যুদ্ধ করবেনা।

আর যদি পুত্র কখনো কারুকে দেওয়া বচনের মান রাখতে যুদ্ধ করতে হয়, স্মরণ রাখবে, কনো শর্তে বিবেকশূন্য হবেনা। তবে হ্যাঁ, যদি সত্যরক্ষার্থে অসত্যের সাথে যুদ্ধ করতে উদ্যত হও, শত্রুর নাশই তখন একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত। ন্যায় বা অন্যায়, কনো কিছুই তখন অবস্থান করেনা। অসত্যের নাশ করাই ন্যায়, সত্যের স্থাপনই ন্যায়। সেই ন্যায় করার জন্য, প্রচলিত সকল অন্যায় যদি একত্রে করতে হয়, তেমন করাই তাই তখনের মত লক্ষ্য হওয়া উচিত। এই কথা কখনো ভুলে যেওনা পুত্র”।

দেবী চিত্তা যেন বীর্য ও করিমুণ্ডের আলিঙ্গনের মধ্য দিয়ে সমস্ত ভাবীকালকে দেখে ফেললেন। তাই নিজের জ্যেষ্ঠ পুত্র, যিনি সর্বদাই তাঁর বাকি দুই ভ্রাতার মার্গদর্শক, তাঁকে উচিত ও অনুচিতের পাঠ প্রদান করে দিলেন। আর অন্যদিকে, করিমুণ্ড অতিতৃপ্ত বীর্যের প্রতি, আর তাই পরবর্তীদিবস প্রভাতে সকল চিত্তাপুত্র ও করিপুত্রদের পশ্চাতের বিশাল মাঠে একত্রিত হতে নির্দেশ দিলেন।

দেবী চিত্তার কাছে তিনি স্বয়ং এসে, বীর্যকে অস্ত্রগুরু রূপে নিযুক্ত করার সমাচার দিলেন মহারাজ করিমুণ্ড। সেই শুনে হাস্য প্রদান করে দেবী চিত্তা বললেন, “ওদের পিতা চলে যাবার পর, তুমিই ওদের অবিভাবক ভাই। তাই তুমি যেই সিদ্ধান্ত নেবে, তা ওদের কল্যাণের জন্যই নেবে, এই আমার বিশ্বাস। পিতা সমান তুমি তাঁদের। তাই তাঁদের হয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করাতে কখনো কুণ্ঠিত থেকো না ভাই”।

মহারাজ নামে দেবী চিত্তা তখনই সম্বোধন করেন করিমুণ্ডকে যখন তিনি রাজদরবারে উপস্থিত থাকেন। অন্য সকল সময়ে, করিমুণ্ডকে ভাই নামেই ডাকেন দেবী চিত্তা। আর শুধু ডাকেন, তাই নয়, মানেনও। আর সেই কারণেই তো যখন করিমুণ্ড উদ্দন্ড যুবক ছিলেন, তখনও দেবী চিত্তার দিকে মলদৃষ্টি নিক্ষেপ করেননি কভু। আসলে দেবী চিত্তা, এতটাই পবিত্র যে, মলমানুষিকতা নিয়ে কেউ তাঁর সম্মুখে এলেও, তাঁর পবিত্রতা সেই ব্যক্তিকে মলভাবত্যাগের জন্য বিবশ করে দেয়। আর সেই কারণেই, মহারাজ করিমুণ্ড অনায়সে দেবী চিত্তার কাছে আসতে পারেন, যেকোনো সময়ে।

দেবী চিত্তার কথা শুনে করিমুণ্ড প্রত্যাবর্তন করছিলেন, কিন্তু তাঁর যেন প্রত্যাবর্তন করার মধ্যে কনো গতি ছিলনা। সেই দেখে দেবী চিত্তা নিজে থেকেই বললেন, “আরো কিছু বলবে ভাই?”

করিমুণ্ড পিছন ফিরে ইতস্তত করেই নিকটে এলেন দেবী চিত্তার আর বললেন, “জীবনে অনেক অপকর্ম করেছি আমি বৌদি, তা তুমি জানোই। আমার পুত্রদের স্বভাবও তোমার অজানা নয়। আমার যেমন স্বভাব ছিল, তেমনই তাঁদের স্বভাব হয়েছে, কিন্তু আমি বলবো, আমি যেখানে থামতাম, আমার পুত্ররা সেখানেও থামে না। … বৌদি, আমি কখনো আমার ভ্রাতার বিরোধিতা করিনি, কারণ আমার ভ্রাতাকে আমি খুব ভালো বাসতাম। তুমি জানো সেই কথা”।

কথা বলার কালে কুণ্ঠিত থাকার কারণে, দেবী চিত্তা হেসে বললেন, “এসো ভিতরে এসো ভাই। আরাম করে বসে, তোমার কথা বলো”।

করিমুণ্ড বললেন, “না বৌদি। আমার অনেক কলঙ্ক। আর এমনই কলঙ্ক আমার যে, কনো কক্ষে একাকী একটি স্ত্রী ও আমি থাকলেই, সেই কলঙ্ক রটিত হয়। বৌদি, মাতা সর্বাম্বাকে আমি দেখেছি, তবে তাঁকে ততটা নিকট থেকে দেখিনি, যতটা তোমাকে দেখেছি। তাই আমার দেখা তুমি হলে আমার জগতের শ্রেষ্ঠসম্ভব পবিত্রা নারী। তাই বৌদি, আমি কনো ভাবে চাইনা যে, তোমার নামে কনো কলঙ্ক লাগুক। … তাই বৌদি, আমাকে ভিতরে যেতে বলো না। এখানে দাঁড়িয়েই আমি আমার কথা বলছি।

আসলে বৌদি, কুণ্ঠা আসছে, কারণ যেই ভবিষ্যৎ আমি দেখতে পাচ্ছি, সেই ভবিষ্যৎকে আমি নিজেও মান্যতা প্রদান করছিনা। আসলে মান্যতা প্রদান করছিনা বলাও ভুল হবে, মান্যতা প্রদান করতে চাইছি না, কারণ সেই ভবিতব্য আমার অত্যন্ত অপ্রিয়। কিন্তু তাও বৌদি, আমি যেন দেখতে পাচ্ছি যে চিত্তাপুত্র আর করিপুত্র একে অপরের সাথে যুদ্ধেরত হবে। … দ্বন্ধ আমার সেখানে নয় বৌদি। তুমি জানো আমি অত্যন্ত স্বার্থপর, নিজেরটুকু ছাড়া আমি কিছু ভাবতেও অপারঙ্গম।

বৌদি আমার দ্বন্ধ আমাকে নিজেকে নিয়ে। যদি সেই যুদ্ধ হয়, আর আমি তখনও অস্ত্রধারণে সমর্থ হই, তাহলে তো আমাকেও সেই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে বলা হবে। বৌদি, আমি আমার ভ্রাতার উপর আঘাত করতে পারবো না, কিছুতেই পারবো না। … কি করে নিজেকে সেই অংশগ্রহন থেকে অপসারিত করবো, আমাকে উপায় বলে দাও বৌদি”।

দেবী চিত্তা হেসে বললেন, “প্রেম, সম্মান ও স্নেহের কখনো পরাজয় হতে পারেনা ভাই। যদি তোমার ভ্রাতাকে তুমি হৃদয় থেকে স্নেহ করে থাকো, সম্মান করে থাকো, নিশ্চিন্ত থাকো, যদি এমন কনো পরিস্থিতি আসেও, স্বয়ং নিয়তি তোমাকে সেই যুদ্ধে অংশগ্রহণ থেকে বিরত করে দেবেন। … নিয়তি হলেন জননী, সন্তানের শুদ্ধতা যদি যৎসামান্যও উপস্থিত থাকে, তাকে তিনি কিছুতেই নষ্ট হতে দেন না। বিশ্বাস রাখো তাতে ভাই”।

মহারাজ করিমুণ্ড এবার নতজানু হয়ে দেবী চিত্তার চরণবন্দনা করতে গেলে, দেবী চিত্তা বাঁধা দিয়ে বললেন, “প্রথমে মুকুট খুলে হাতে ধরো ভাই। তুমি নতজানু হতেই পারো, তোমার রাজ্য নয়। … রাজ্য আমার তোমার সকলের থেকে বড়। রাজ্য কেবল জগন্মাতার কাছেই নতজানু হতে পারে, অন্য কারুর কাছে নয়। … তাই মুকুট খুলে হাতে ধরে, প্রণাম করতে পারো তুমি”।

মুকুট খুলে, হাতে ধরে, নতজানু হয়ে প্রণাম করে, নেত্রে প্রেমাশ্রু ধারণ করে করিমুণ্ড বললেন, “তুমি যদি আমার জননী হয়ে আমার কাছে থাকতে, আমি কখনোই হয়তো এতটা কলঙ্কলিপ্ত হতাম না বৌদি। … যখন নিজের ভাগ্যরূপে নিজের কুটিলা পত্নীদের দেখি, নিজের বিভ্রান্ত পুত্রদের দেখি, এটিই স্মরণ আসে বৌদি। আমারই কালিমালিপ্ত মনের দ্বারা যেই কর্ম করেছি, তারই তো কর্মফলরূপে আমি এই সমস্ত পেয়েছি। আর সত্য বলছি, তোমায় যত দেখি তত অবাক হয়ে যাই।

আমি অত্যন্ত কালিমালিপ্ত, বলা চলে যুবাকালে তো আমি দুশ্চরিত্রই ছিলাম, কিন্তু তোমার নেত্রের দিকে যখন যখন তাকিয়েছি, কখনো তোমার নেত্রে নিজেকে পুরুষ রূপে দেখিনি। তুমি সর্বদা আমাকে এক শাবকের দৃষ্টিতেই দেখেছ, আর তাই তুমি আমার কাছে কখনোই কনো স্ত্রী ছিলেনা, ছিলে দেবী হয়ে। … তুমি আমাকে একটি সত্য প্রমাণ করে দিয়েছ বৌদি। আমার ধারণা ছিল যে, স্ত্রীদের সম্ভোগের পাত্র হবার পিছনে কনো দোষ থাকেনা, পুরুষেরই লালসার শিকার তাঁরা।

কিন্তু তুমি প্রমাণ করে দিয়েছ যে, আমি ভুল। কেউ যখন পবিত্র হন, তা তিনি স্ত্রী হন বা পুরুষ, তিনি কখনোই সম্ভোগের বস্তু হননা, তিনি পূজার মূর্তি হয়ে যান। … নাহলে আমার মত দুশ্চরিত্রকে তুমি নির্ভয়ে ভাই বলে কাছে টেনে নিতে পারলে কি করে! … একটিবারও তোমার চরিত্র হননের ভয় হয়নি!… না না, প্রশ্ন করছি না, উত্তর আমার জানা। তুমি পবিত্র। আর তাই, তোমার চোখে আমি ছিলাম শুধুই একটি শাবক। আর সেই ছবি তো আমিও দেখেছি বৌদি। আমার মা হলেন মাতা জগদ্ধাত্রী, কিন্তু তাঁকে আমি পাইনি, কারণ আমার পিতা তাঁকে অনধিকার পত্নী করেছিলেন, কিন্তু যখন তোমাকে দেখেছিলাম, আমার মনে হয়েছিল, আমি আমার মা পেয়ে গেছি।

খুব ইচ্ছা হয়েছিল জানো বৌদি, তোমাকে মা বলে ডেকে, তোমার সান্নিধ্য লাভ করি। কিন্তু নিজের চরিত্রের উপর নিজেরই ভরসা হয়নি। এতো এতো স্ত্রীকে আমি কলঙ্কিত করেছি। তাঁদের কারুর মধ্যে তোমার ন্যায় বা তোমার মত সামান্যও পবিত্রতা ছিলনা। তাই তাঁদের চরিত্র হননে, আমি লজ্জিত তো ছিলাম না। কিন্তু তোমার ন্যায় পবিত্রার চরিত্রে যদি কনো প্রকার আঁচও এসে যেত, আমি নিজেকে ক্ষমা করতে পারতাম না। তাই নিজের চরিত্রের উপর অবিশ্বাসের কারণে, তোমাকে মা বলে ডেকে, তোমার সান্নিধ্য গ্রহণ করতে পারিনি। আজও আক্ষেপ হয়।

মনে হয় যেন, সাখ্যাৎ আমার মা, মাতা জগদ্ধাত্রী আমার মাতৃহারা হয়ে থাকার বেদনাকে ঘোচাতে তোমাকে প্রেরণ করেছিলেন, কিন্তু তোমার এখানে আসার আগেই আমি এতটা নিচে নেমে গেছিলাম যে, মাকে পেয়েও মাকে হারিয়েছিলাম। … কনো উত্তর চাইনা বৌদি। ব্যাস মনের অন্দরে থাকা কিছু কথা বলতে ইচ্ছা হলো। বৌদি, ভাবিকালে হয়তো তোমার পুত্রদের সাথে অনেক অন্যায় হবে। হ্যাঁ হতেও হবে, তারা পবিত্র, আর পবিত্রদের অনেক পরীক্ষা দিতে হয়, তাই তাদেরকেও পরীক্ষা দিতে হবে। কিন্তু তোমার পুত্রদের বলো, পিতা তো নই আমি তাঁদের, তবে পুত্রের থেকে কম স্নেহ করিনা তাদেরকে। …

হ্যাঁ, আমার নিজের পুত্রদের প্রতি আমি মাঝে মধ্যেই একটু বেশি আবেগপ্রবণ হয়ে যাই, কারণ আমি তো মোহগ্রস্ত অধম, কিন্তু তাঁদেরকেও আমি স্নেহ করি। পুত্র কম, ভ্রাতা অধিক মানি তাদেরকে, কারণ তাঁরা আমার ভ্রাতার ছবি, তাঁরা আমি যাকে মাতা জ্ঞান করি, তাঁর পুত্র। তাঁদেরকে বলো যেন, আমি আমার মোহগ্রস্ত হবার জন্য যা যা অপরাধ করবো, তাকে অন্তিমকালে ক্ষমা করে দিয়ে, নিজের ভ্রাতা জেনে একবার বুকে টেনে নেয়। আর কিছু নয় বৌদি”।

দেবী চিত্তা একটি কথাও বললেন না উত্তরে, কেবল করিমুণ্ডের মস্তকে নিজের স্নেহহস্ত রেখে তাঁকে আশীর্বাদ করলেন। করিমুণ্ড সেখান থেকে চলে গেলেন। দাসীরা দেখলেন, মহারাজের নেত্রে অশ্রু, আর সেই অশ্রু মুছতে মুছতে তিনি চলে গেলেন। সমস্ত কথাও শুনেছেন দাসীরা, তাই নিজেদের মধ্যে কথোপকথন করলেন, “দেবী চিত্তা, কতই না পবিত্র, স্বয়ং কামদেব বলে আমরা যাকে চিহ্নিত করি, সেই মহারাজ করিমুণ্ডও তাঁকে মাতা মানেন”।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28